• টইপত্তর  বইপত্তর

  • মলয়ের লেখাপত্তর

    pi
    বইপত্তর | ২৪ মার্চ ২০১২ | ৪০২৭৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • m | 012312.60.900.191 | ২২ ডিসেম্বর ২০১৮ ১৯:৫১541285
  • Malay Roychoudhury <[email protected]>

    Sat, Dec 8, 11:05 AM

    to bapinmail

    মলয় রায়চৌধুরী

    অবন্তিকার শতনাম
    অবন্তিকার দুটো মাইয়ের নাম দিয়েছি কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া…

    এক্সট্রা লার্জ মাই বলে ও বলে ওগুলো বাঁট...

    বড়ো-বড়ো মাই বলে কতো গর্ব...

    বড়ো মাই না থাকলে নাকি গরবিনী হওয়া যায় না...

    বাঁদিকেরটা আদর করলেই গোলাপি হয়ে যায়…

    ডানদিকেরটা আদর করলেই হলদেটে রঙ ধরে…

    বাঁদিকের বোঁটার নাম করেছি কুন্দনন্দিনী…

    বঙ্কিমের বিষবৃক্ষ তখন ও পড়ছিল চিৎ শুয়ে…

    ডানদিকের বোঁটার নাম ও নিজেই রেখেছে কর্নেল নীলাদ্রি সরকার...

    যে লোকটা সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের ডিটেকটিভ…

    ডিটেকটিভ বই পড়তে ওর জুড়ি নেই…

    ছুঁলেই কাঁটা দিয়ে ওঠে তাই…

    যোগেন চৌধুরীর আঁকা ঝোলা মাই ওর পছন্দ নয়…

    প্রকাশ কর্মকারের আঁকা কালো কুচকুচে মাই ওর পছন্দ নয়…

    পেইনটিঙের নাম রাখা গেল না…

    যোনির কি নাম রাখবো চিন্তা করছিলুম…

    অবন্তিকা চেঁচিয়ে উঠলো পিকাসো পিকাসো পিকাসো…

    পিকাসোর যোনির কোনো আদল-আদরা নেই…

    কখনও বাদামি চুল কখনও কালো কখনও কিউবিক রহস্য…

    তাহলে ভগাঙ্কুরের…

    ও বলল সেটা আবার কি জিনিস…

    ওর হাত দিয়ে ছুঁইয়ে দিতে বলল অমঅমঅমঅম কি দেয়া যায় বলতো…

    পান্তুয়া চলবে…ধ্যুৎ…রস পানেই পান্তুয়া নাকি আরও কতো রকম মিষ্টি হয়…

    ছানার পায়েস…নারকেল নাড়ু…রসমালাই…নকশি পিঠা…রাজভোগ…লবঙ্গলতিকা…

    হলদিরামে ভালো লবঙ্গলতিকা পাওয়া যায়…

    আমি বললুম যোনির স্বাদ কিছুটা নোনতা…

    ও বলল দুর ছাই আমি নিজে টেস্ট করেছি নাকি যাকগে বাদ দে…

    তোর গুদে দুদিকেই তিল আছে...দারুন...

    জানি...জানি...হেয়ার রিমুভার লাগাবার সময়ে দেখি তো...

    একটার নাম দিই ওগো বধু সুন্দরী...

    অন্য তিলটার নাম দিই বনলতা সেন...

    যখনও স্বপ্নে বনলতে সেনকে দেখি তিলটা দেখতে পাই...

    রাসকেল...বনলতা কেন...আমার তিল দেখলেই তো পারিস...

    না...তোকে দেখলে নাইটফল হয়...তাহলে গুদ ছেড়ে এগোই...

    যোনির চেয়ে গুদ কেমন বিটকেল শুনতে...না রে...

    যেন দুধ ভরা উটের বাঁট...উটের দুধ বেশ ঘন হয়...

    যাকগে এবার এগো দিকিনি...

    হ্যাঁ…এগোই…পাছার কি দুটো নাম হবে…

    ডিসাইড কর…ডিসাইড কর…

    তুই কর আমি তো দেখতে পাচ্ছি না…না না ফের ফের…

    লাবিয়া নোনতা হলেও ওটার নাম দিলুম গোলাপসুন্দরী…

    পারফেক্ট হয়েছে…তাহলে পাছার একটাই নাম দিই…

    নরম নরম কোনো নাম…পাসওয়র্ড…ঠিক…এর নাম দেয়া যাক পাসওয়র্ড…

    ধ্যাৎ…পুরো রোমান্টিক আবহাওয়া ফর্দাফাঁই করে দিচ্ছিস……

    গ্যাস পাস হয় বলে পাসইয়র্ড হতে যাবে কেন…ছিঃ…

    তাহলে এর নাম হোক গরমের ছুটি…

    গরমে বেশ ভাল্লাগে পাউডার মাখিয়ে পাছায় হাত বোলাতে…

    ওক্কে…তারপর…ঘুমোবো কখন…

    বাঁ উরুর নাম দিই ককেশিয়া…ডান উরুর নাম দিই লিথুয়ানিয়া…

    রাশিয়ানদের উরু দারুণ হয় বিশেষ করে শীতকালে যখন ওরা চান করে না…

    ভোদকা খেয়ে ভরভরিয়ে প্রতিটি রোমকুপ দিয়ে গন্ধ ছাড়ে…

    শুয়েছিস নাকি কখনও রাশিয়ান মেয়ের সঙ্গে…

    না কল্পনার যুবতীদের ইচ্ছেমতন হ্যাণ্ডল করা যায়…

    ছাড় ছাড়…এগো…মানে নামতে থাক…

    তাড়াতাড়ি কর নইলে গাধার দুলাত্তি দেবো…

    তা্হলে পায়ের নাম রাখছি জিরাফ…

    বামপন্হী জিরাফ আর দক্ষিণপন্হী জিরাফ…

    এবার ওপরে আয়,,,মুখে…ঠোঁট…ঠোঁটের নাম দিই আফ্রিকান সাফারি…

    আচ্ছা…ঠোঁটের নাম আফ্রিকান সাফারি…

    ব্লোজবে খণ্ড খণ্ড মাংস ছিঁড়ে খাবো…খাস…

    থুতনিতে সেকেন্ড চিন…পিৎজা কোক খাওয়া থামা…

    থুতনির নাম দিই গোলাপজাম…কেন কেন কেন…

    পরে বলব…এখন দুচোখের নামদিই…শতনাম হলো না তো…

    চোখ বোজ চোখ বোজ…

    তোর চোখের তিলের নাম দিলুম অ্যানাকোণ্ডা...

    সেই সাপের জুড়ি নেই...অমন যদি পেতুম...

    জানি...তুই হৃদয় পর্যন্ত পোঁছে দিতিস তোর শৌর্য...

    যাকগে...রাত অনেক হল...একশো নাম তো হল না...

    তুই তো একশোসমগ্র আবার শতনামের কী দরকার…

    ন্যাপকিন কিনিস এক্সট্রা লার্জ মাপের...

    তাহলে আয়…আজ তুই ওপরে না নিচে ?

    s
  • m | 012312.60.900.191 | ২২ ডিসেম্বর ২০১৮ ১৯:৫৪541286
  • 'দেশ প্রেমের ব্যাপার'
    মলয় রায়চৌধুরী

    মার শালাদের
    মার মার ওটা পালাচ্ছে
    ধর ধর ধর ধর
    তুই ওটাকে ধর
    আমি এগুলোকে সামলাচ্ছি
    পোঁদে লাধি মার চুতিয়াটাকে
    না না বিচিতে মার
    প্যাণ্ট খুলে নে বাঞ্চোৎটার
    ঢুকিয়ে দে ক্যালা না কি তুই
    ঢোকাতে পারছিস না
    মাটিতে ফেলে দে দনাদ্দন
    নাক ফাটিয়ে দে
    তোর তো ঘুষির জোর আছে
    একটাকেও পালাতে দিসনি
    কেস খাওয়ানো দেখাচ্ছিল গাণ্ডুগুলো
    চেনে না আমরা কোন কেউটের
    পেট থেকে বেরিয়েছি
    ন্যাপালা দেখাচ্ছিল রাণ্ডির বাচ্চা
    সব কটাকে ল্যাংটো কর
    বলছি তো কেউ আমাদের
    বালও ওপড়াতে পারবে না
    লাশ ফেলা কাকে বলে দেখাচ্ছি
    মন্ত্রীর বাপ দেখাচ্ছিল
    দেখে যাক যাদের দেখবার
    চল চল
    এদের এখানে পড়ে থাকতে দে
    শীতের শিশিরে ভেজার আনন্দ নিক
    কুত্তির বাচ্চাগুলো
  • m | 012312.60.900.191 | ২২ ডিসেম্বর ২০১৮ ১৯:৫৭541287
  • প্রথম পর্ব : ষড়যন্ত্র : মারণ
    ( কোরাণ ও গীতা : পুনঃপাঠ )
    মহম্মদ কহিলেন : হে আবুবক্কর ! মদিনা ্‌ইতে এই বিশাল সৈন্যবাহিনী লইয়া যে উদ্দেশ্যে হেথায় আসিয়াছি, তাহা বুঝি আর সফল হইল না । দেখো, সন্মুখসমরে আজ আমারই কোরেশ বংশের বংশজগণ । আর দেখো, উভয় সেনার মধ্যে আমারই পিতৃব্যগণ পিতামহগণ আচার্য্যগণ মাতুলগণ ভাতৃগণ পুত্রগণ পৌত্রগণ মিত্রগণ শ্বশুরগণ সুহৃদগণ অবস্হান করিতেছেন । আমি কাহাকে হত্যা করিব ? হে আবুবক্কর ! যুদ্ধেচ্ছু এই সকল স্বজনদিগকে সন্মুখে অবস্হিত দেখিয়া আমার শরীর অবসন্ন হইতেছে এবং মুখ শুষ্ক হইতেছে । ইহা সত্য যে, ৩৬০টি প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করিয়া ইহারা যুগযুগান্ত ধরিয়া আরববাসীগণকে প্রতারিত করিতেছে, আর ওই প্রতীকগুলির সাহায্যে পুরাতন জীবনব্যবস্হায় তাহাদিগকে মোহগ্রস্হ করিয়া রাখিয়াছে, তাহাদের ধনসম্পদ ভোগ করিতেছে । ইহাও সত্য যে, আমি এই বংশেরই এক কনিষ্ঠতম ও অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এক দুয়ো-রাজকুমার । তথাপি এক্ষণে ইহাদিগকে সমরাঙ্গনে সন্মুখস্হ দেখিয়া আমার হস্তপদ অবসন্ন হইয়া আসিতেছে ।

    আবুবক্কর কহিলেন : অয় মুহম্মদ ! এই সঙ্কট সময়ে স্বর্গহানিকর অকীর্তিকর তোমার এই মোহ কোথা হইতে উপস্হিত হইল ? এ যুদ্ধ স্বার্থপ্রণোদিত নহে, ইহা জেহাদ, ধর্মযুদ্ধ । হে পরন্তপ ! তুচ্ছ হৃদয়ের দুর্বলতা ত্যাগ করিয়া যুদ্ধার্থে উথ্থিত হও ! জেহাদ অপেক্ষা ইমানদার মোমিনের পক্ষে শ্রেয়ঃ আর কিছুই নাই । হে ধনঞ্জয় ! এই যুদ্ধ জগৎপিতার নিয়মে স্বয়ং উপস্হিত হইয়াছে । ইহা আমাদের নিমিত্ত জন্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করিবে । অতএব যুদ্ধার্থে উথ্থিত হও । অন্যথায় মহারথগণ মনে করিবেন, তুমি ভয়বশত যুদ্ধে বিরত হইতেছ, দয়াবশত নহে । সুতরাং যাহারা তোমাকে বহু সন্মান করেন, তাহাদিগের নিকট তুমি লঘুতাপ্রাপ্ত হইবে । তোমার শত্রুরাও তোমার সামর্থ্যের নিন্দা করিয়া অনেক অবাচ্য কথা বলিবে । তাহা অপেক্ষা অধিক দুঃখকর আর কী আছে ? এক হস্তে অধর্মের বিনাশ ও অপর হস্তে ধর্মের প্রতিষ্ঠা নিমিত্ত তুমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ধর্মভ্রষ্টদিগকে হত্যা করিতে দ্বিধা কিসের ? সুতরাং হে সব্যসাচী, যুদ্ধে কৃতনিশ্চয় হইয়া উথ্থান করো।

    সব্যসাচী কহিলেন : ইহা সত্য যে, ইহারা ধর্মভ্রষ্ট । এই কৌরবগণ আমাদিগের ন্যায় ইক্ষাকু বংশজ হইলেও ইহারা ধর্মের অমর্যাদা করিয়াছে । প্রজাপালন বিষয়ে ইহাদিগের দুঃশাসনের কোনও সীমা নাই । ইহাও সত্য যে, আমরা এই বংশেরই অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এই রাজবংশের দুয়ো-রাজকুমার এবং ইহারা আমাদিগকে আশৈশব প্রবঞ্চনা করিয়া আসিতেছে, সাধারণ প্রজাদিগের তো কথাই নাই । সেই হেতু ধর্মপ্রতিষ্ঠার স্বার্থেই ইহাদিগকে ক্ষমতাচ্যুত করা প্রয়োজন । কিন্তু এতৎসত্বেও, স্বজন ও গুরুজনদিগকে বধ করিয়া কীরূপে প্রাণধারণ করিব, এইরূপ চিন্তাপ্রযুক্ত হইয়া চিত্তের দীনতায় আমি অভিভূত হইতেছি । প্রকৃত ধর্ম কী, এ বিষয়ে আমার চিত্ত বিমূঢ় হইতেছে । ধর্মপ্রতিষ্ঠার নিমিত্ত এ আমি কাহার হত্যাকারী হইতে চলিয়াছি ? অতএব হে কৃষ্ণ ! যাহাতে শুভ হয়, আমাকে নিশ্চিত করিয়া তাহা বলো !

    শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন : প্রকৃতপক্ষে তুমি কাহারও হত্যাকারী নহ। স্বজন বা গুরুজন যাহাই হউন, যাহারা অন্যায়কারী, প্রজাবৃন্দের প্রতি নির্দয়, অচলায়তন রূপে সমাজের উপর প্রতিষ্ঠিত, তাঁহারা ধর্মভ্রষ্ট হইয়াছেন । কাল সমুপস্হিত হইলে স্বয়ং শিব ধর্মভ্রষ্টদিগের মহিমাহরণ করিয়া তাহাদিগকে হনন করিয়া রাখেন । এক্ষেত্রেও তাহাই হইয়াছে, তুমি নিমিত্তমাত্র । সত্যের জন্য, ধর্মের জন্য, স্বজন ও গুরুজনদিগের উপর বাণনিক্ষেপ করিলে কদাচ অধর্ম হয় না। সুতরাং, তুমি নিঃসংশয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও । যাহারা সত্যের নিমিত্ত ধর্মের নিমিত্ত পিতৃব্য ও পিতামহ প্রভৃতি স্বজনগণকে নিকেশ করিতে দ্বিধা করেন না, তাহারাই প্রকৃত ধার্মিক । ইতিহাস তাহার সাক্ষী । অতএব, হে পাশুপতধারী মোমিন ! হে দুয়ো-রাজকুমার ! হে বংশদ্রোহী! তুমি যুদ্ধ করো ।

    Posted by Malay Roychoudhury at 7:37 AM No comments: Email ThisBlogThis!Share to TwitterShare to FacebookShare to Pinterest
    Labels: Anti-Establishment, Kalim Khan, Malay Roychoudhury, Poetic Theory, আভিধানিক, কলিম খান, মলয় রায়চৌধুরীর কবিতাসমগ্র
    দ্বিতীয় পর্ব : ষড়যন্ত্র : মোহন
    ( দেবীপুরাণ : পুনঃপাঠ )
    ঋষিগণ কহিলেন : হে পণ্ডিতপ্রবর ! যথার্থ পথপ্রদর্শক নেতাই গুরুপদবাচ্য । তাঁহাকে সম্যকরূপে অবগত না-হইয়া তাঁহার অনুসরণ করা উচিত নহে । ইহা জানিয়াও অসুরগণ কী প্রকারে ভুল নেতৃত্বের দ্বারা প্রবঞ্চিত হইলেন, এক্ষণে সে বিষয়ে আমাদিগের কৌতূহল নিবারুণ করুন ।

    বৈশ্যম্পায়ন কহিলেন : বৃহস্পতি ও শুক্রাচার্য উভয়েই ভৃগুর সন্তান হইলেও তাঁহাদের অভিমত ভিন্ন ছিল । সেই কারণে সুরাসুর সংগ্রামে তাঁহারা যথাক্রমে দেবতা ও অসুরগণের পরামর্শদাতারূপে তাহাদের গুরুর আসনে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন ।

    একদা অসুরগণকে সংযত থাকিতে বলিয়া শুক্রাচার্য্য তপস্যার উদ্দেশ্যে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করিলেন । একথা জানিতে পারিয়া দেবগুরু বৃহস্পতি স্বল্পকাল অতিবাহিত হইলে শুক্রাচার্য্যের রূপ ধারণপূর্বক তথায় উপস্হিত হইলেন । তাঁহাকে সমুপস্হিত দেখিয়া অসুরগণ তাঁহাদিগের গুরুদেব প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন, এইরূপ প্রত্যয় করিল এবং তাঁহাকে পাদ্য অর্ঘ্য দানে যথাবিহিত সন্মান প্রদর্শনপূর্বক তাঁহার উপদেশের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিল । অনন্তর শুক্রাচার্য্যরূপী বৃহস্পতি তাহাদিগকে বলিলেন, বৈরিতা কুলক্ষয়ের কারণ । বৈরিতার কারণ বাসনা, অতএব বাসনা পরিত্যাগ করো । বাসনা না থাকিলে কেহই তোমাদিগকে বশীভূত করিতে পারিবে না । অতএব তোমরা বাসনামুক্ত হও, মস্তকমুণ্ডনকরতঃ গৈরিক বস্ত্র ধারণ করিয়া আচারনিষ্ঠ হও । আচারনিষ্ঠগণকে দেবতাও জয় করিতে পারিবে না । গুরুদেবের আদেশ শিরোধার্য করিয়া অসুরগণ তাহাই করিতে লাগিলেন । ইহার ফলে তাহাদিগের হৃদয় হইতে অসূয়াভাব ক্রমে তিরোহিত হইতে লাগিল ।

    ইট্যবসরে, দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য্য তাঁহার তপস্যা সমাপনান্তে তথায় সমাগত হইলেন । দেবগুরু বৃহস্পতিকে অসুরগণের গুরুপদে অধিষ্ঠিত দেখিয়া তিনি যারপরনাই বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ হইয়া অসুরগণকে কহিলেন--- এ কাহাকে তোমরা আমার আসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছ ? ইনি যে দেবগুরু বৃহস্পতি, তাহা কি তোমরা উপলবদ্ধি করিতে পারো নাই ? তোমাদিগকে বিপথগামী করিবার জন্য আমার অনুপস্হিতির সুযোগ গ্রহণ করিয়া এ প্রবঞ্চক তোমাদিগের সহিত প্রতারণা করিয়াছে । ইনি আমাদিগের ন্যায় স্বর্গদ্রোহী নহেন । তোমাদের নেতার আসন গ্রহণ করিয়া তোমাদের সংগ্রামকে ধ্বংস করাই এই প্রতারকের একমাত্র উদ্দেশ্য ।

    ইহা শুনিয়া শুক্রাচার্য্যরূপী বৃহস্পতি কহিলেন : হে অসুরগণ! অবধান করো ! আমার উপদেশে তোমরা অজেয় হইতে চলিয়াছ দেখিয়া দেবগুরু বৃহস্পতি তোমাদিগকে প্রতারণা করিবার উদ্দেশ্যে এক্ষণে আমার রূপ ধারণ করিয়া তোমাদিগের সন্মুখে উপস্হিত হইয়াছেন । ইনি দেবগুরু বৃহস্পতি । অবিলম্বে ইহার মুখে চুনকালি দিয়া গর্দভের পৃষ্ঠে আরোহন করাইয়া পশ্চাতে হ্ল্লা লাগাইয়া দাও এবং বিতাড়ন করো । অসুরগণ তাহাই করিল ।

    কিয়ৎকাল অতিবাহিত হইলে, অসুরগণ একদিন হৃদয়ঙ্গম করিল, তাহারা প্রবঞ্চিত হইয়াছে । কিন্তু তখন তাহাদিগের আর কিছুই করিবার রহিল না ।

    এইভাবে অসুরগণ ছদ্ম-দেবদ্রোহীকে তাহাদের নেতারূপে বরণ করিয়া মোহগ্রস্ত হইয়াছিল এবং সম্পূর্ণরূপে প্রবঞ্চিত হইয়াছিল ।
    Posted by Malay Roychoudhury at 6:51 AM No comments: Email ThisBlogThis!Share to TwitterShare to FacebookShare to Pinterest
    Labels: Anti-Establishment, Kalim Khan, Malay Roychoudhury, আভিধানিক, কলিম খান, সাহিত্য আলোচক
    তৃতীয় পর্ব : ষড়যন্ত্র : স্তম্ভন
    ( মুক্তধারা : পুনঃপাঠ )
    এক যে ছিল রাজা । তার ছিল দুই রানি, সুয়োরানি আর দুয়োরানি। সুয়োরানি সুখে থাকে রাজপ্রাসাদে আর দুয়োরানি থাকে বনের প্রান্তে, ছোট নদীর ধারে, কুঁড়ে ঘরে। দুয়োরানির ছেলে সেই নদীতে নৌকাবায় । পারানির কড়িতে তাদের দিন কাটে । কিন্তু একদিন তার সাধের নদী শুকিয়ে গেল । কারণ, দেশের রাজ-বিভূতি বাঁধ বেঁধেছেন । কেবল জলধারা নয়, ঈশ্বরের করুণার সকল ধারার সামনেই বাঁধ বেঁধেছেন তাঁরা । লোকে বিস্বাসই করতে পারল না যে, দেবতা তাদের যে জল দিয়েছেন, কোনও মানুষ তা বন্ধ করতে পারে । কিন্তু বন্ধ হল, করুণাধারার সব শাখাই ক্রমশ শুকোতে লাগল, আর প্রজাদের জীবন উঠল অতীষ্ঠ হয়ে । এদিকে একদিন দুয়োরানির ছেলে জানতে পারল সে রাজপুত্তুর । সে গেল রাজার কাছে, বললে, রাজপুত্রের অধিকার চাইনে । কেবল ঈশ্বরের করুণাধারার সামনে দেয়া তোমাদের ওই বাঁধগুলো খুলে দাও, এই প্রার্থনা । শুনে সুয়ো-রাজপুত্রেরা অবাক হলো । তারা সেপাই ডাকল, সান্ত্রী ডাকল । ঘাড়ধাক্কা দিয়ে রাজবাড়ি থেকে বার করে ছুঁড়ে ফেলে দিলো রাস্তায় ।

    ধুলো ঝেড়ে সে উঠে দাঁড়াল । তারপর গেল শিবতরাইয়ের প্রজাদের কাছে । সেখানে গিয়ে সে অবাক হয়ে গেল । সে দেখল, ধনঞ্জয় বৈরাগীর ছদ্মবেশে সুয়োরানির এক ছেলে । আর, তার পেছনে শিবতরাইয়ের মানুষগুলো চলেছে মুক্তধারার বাঁধ ভাঙতে । তখন সেই দুয়ো-রাজকুমার সবাইকে ডেকে বলতে লাগল, ওই বৈরাগী আসল বৈরাগী নয়, ও তো ছদ্মবেশী সুয়ো-রাজকুমার, ও তোমাদের ঠকাবে । এক নদীর মুখেই ওরা বাঁধ বাঁধেনি । সর্বহারার মুখেই ওরা বাঁধ বেঁধেছে । সেগুলি ভাঙতে হলে, তাদের রহস্য জানতে হবে । সেসব আমি জেনে এসেছি । আমার কথা শোনো । কিন্তু দু'চারজন আধপাগলা ছাড়া কেউ তার কথায় কান দিল না ।

    কথাটা গেল মিথ্যে-বৈরাগীর কানে, সে বললে -- ওটা বদ্ধ পাগল । ছন্নছাড়া । খেতে পায়না, হাংরি, তাই মিথ্যে কথা বলে । ওর মুখে চুনকালি মাখিয়ে গর্দভের পিঠে চড়িয়ে পিছনে ভিড়ের হল্লা লাগিয়ে দাও । মজা পেয়ে প্রজারা তাই করলে ।

    এরপর গাধার পিঠে সওয়ার দুয়ো-রাজকুমারের আর কিছুই করার রইলো না । তাই সে কেবল চিৎকার করে । চিৎকারের জন্য চিৎকার । চিৎকারের ভিতরে চিৎকার । চিৎকার করতে করতে একদিন সে বিস্মৃতিলোকে চলে গেলো ।

    তারপর অনেকদিন কেটে গেলে, শিবতরাইয়ের প্রজারা বুঝল তারা ঠকেছে । অতএব, তারা খোঁজ করতে লাগল সেই দুয়ো-রাজকুমারের, যে জানত সব বাঁধের রহস্য । কিন্তু তাকে আর পাওয়া গেল না । তখন যে আধপাগলারা সেসময় তার কথা শুনেছিল মন দিয়ে, তাদেরকে ধরা হলো । বাঁধ ভাঙার রহস্য ওই আধপাগলারা দুয়ো-রাজকুমারের কাছ থেকে জেনে-বুঝে নিয়েছিল কি না, সেটা জানার জন্য । কিন্তু কেউই সেসব কথা ঠিকঠাক বলতে পারল না ।

    রাজপ্রাসাদ থেকেও দুয়ো-রাজকুমারের খোঁজখবর করা হলো । কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না, পাওয়া গেল তার গাধাটাকে । তাকেই নিয়ে এসে ফুলমালা দিয়ে চন্দনের টিপ পরিয়ে রাজসভায় আনা হলো । রাজা সেই গাধাটাকেই শিরোপা দিলেন আর রাজপুরোহিত দিলেন আশীর্বাদ । সবাই বলে উঠল -- সাধু, সাধু !
    Posted by Malay Roychoudhury at 12:16 AM No comments: Email ThisBlogThis!Share to TwitterShare to FacebookShare to Pinterest
    Labels: Anti-Establishment, Kalim Khan, Malay Roychoudhury, Poetic Theory, আভিধানিক, কলিম খান
    Sunday, July 8, 2018
    চতুর্থ পর্ব : ষড়যন্ত্র : বিদ্বেষণ
    ( অভিচারতন্ত্র : পুনঃপাঠ )
    মানুষের উপর মানুষের চড়ে বসাকে বলা হয় 'অভিচরণ' বা 'অভিচার' । আদিকালে সর্বপ্রথম যে-পদ্ধতির সাহায্যে এই কর্মটি করা হতো, তাকে বলা হতো 'শ্যেনযাগাদি' অর্থাৎ অন্য গোষ্ঠীর লোকেদের উপর দলবদ্ধ লুঠতরাজ বা ছিনতাই । তবে সে সবই ছিল সাময়িক । তার সাহায্যে বহুকালের জন্য বা চিরকালের জন্য কারও উপর চেপে বসা যেত না । সেই উদ্দেশ্যে একদিন ভারতবর্ষ আবিষ্কার করে এক অভিনব প্রক্রিয়া ---'মূলনিখনন ও পদধূলিগ্রহণ'। এই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে সমাজের স্বাভাবিক জ্ঞানপ্রবাহের উপর বাঁধ বাঁধা হয় ও বৈদিকযুগের সূত্রপাত করা হয় । এটিই পৃথিবীর প্রথম বাঁধ ও আদি বাঁধ । ঈশ্বরের করুণার অন্যান্য ধারাগুলিকে বাঁধ বেঁধে নিয়ন্ত্রণ করার কথা তখনও ভাবা হয়নি ।

    তা সে যাই হোক, সেই 'মূলনিখনন ও পদধূলিগ্রহণ' উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি বলে এখনও আমরা 'বড়ো শত্রুকে উঁচু পিঁড়ি' দিই ; যার সর্বনাশ করা দরকার তার মূর্তি গড়ে পূজা করি ও তার নীতি অমান্য করি এবং এভাবেই আমরা আজও শিব রাম গান্ধী মার্কস রবীন্দ্রনাথের পূজা করি ও তাঁদের নীতি অমান্য করে থাকি।

    দুষমনকে 'পূজা করে মেরে ফেলার' এই বৈদিক নীতির বিপরীতে একসময় তান্ত্রিক নীতিরও জন্ম হয় এই ভারতবর্ষেই । 'নিয়ন্ত্রণসাধন'কে তখন বলা হতিও যন্ত্র, যা দিয়ে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালানো হতো, ঘাড়ের উপর চেপে বসা ক্ষমতাকে উৎখাত করার চেষ্টা চালানো হতো । তান্ত্রিকেরা শত্রুকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় হিসেবে ছয় রকম 'নিয়ন্ত্রণসাধন' বা যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন--- মারণ, মোহন, স্তম্ভন ( শত্রুকে স্ট্যাগন্যান্ট করে দেয়া ), বিদ্বেষণ ( ডিভাইড অ্যাণ্ড রুল ), উচ্চাটন ( স্বদেশভ্রংশন বা শত্রুকে তার কনটেক্সট থেকে উৎখাত করে দেয়া ) ও বশীকরণ । এই যন্ত্রগুলি প্রধানত বাঁধ ভাঙার কাজেই ব্যবহৃত হতো । বৈদিকদের পূজা করে মেরে ফেলার বিপরীতে তান্ত্রিকেরা এই ছয় রকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন বলে, বৈদিকপন্হীদের কালচারে এই 'ষড়যন্ত্র' ঘৃণ্য ও নিন্দাজনক হয়ে যায় এবং আধুনিক যুগে পৌঁছে পরিণত হয় 'কন্সপিরেসি'তে, যদিও তান্ত্রিক কালচারে 'ষড়যন্ত্র' যথারীতি প্রশংসাযোগ্য ও গৌরবজনক হয়েই থেকে যায় । অর্থাৎ কিনা, ভারতের তান্ত্রিক ঐতিহ্য অনুসারে ষড়যন্ত্রের প্রয়োগ অত্যন্ত ভালো কাজ এবং তা আদৌ কন্সপিরেসি নয়।

    তবে নিয়ন্ত্রণসাধনের এই চর্চা এখানেই থেমে থাকেনি । যুগ বহুদূর এগিয়ে চলে এসেছে, যন্ত্রকে করে তোলা হয়েছে 'মোস্ট সফিসটিকেটেড', ক্ষমতা হয়েছে নিরঙ্কুশ । শাসক ও বিদ্রোহীর হাতে ওইসকল যন্ত্রের বিপুল বিকাশ ঘটেছে । বিকাশ ঘটেছে শাসক এবং বিদ্রোহীরও । এখন শাসকের বহু রূপ, বহু সুয়ো ; বিদ্রোহীরও বহু রূপ, বহু দুয়ো । বহু ক্ষেত্রে শাসকই বিদ্রোহীর পোশাক পরে নেয়, কোনও কোনও দুয়ো ভুয়ো-বিদ্রোহী হয়ে সুয়োর দলে ভিড়ে যায় । তাছাড়া, এখন বাঁধের সংখ্যাও প্রচুর, যত ধারা ততো বাঁধ, বাঁধের নিচে বাঁধ, উপরে বাঁধ, সাপোর্টিং বাঁধ, কতো কী ! এমনকি লোকদেখানো মিথ্যে বাঁধও রয়েছে, বিদ্রোহী জনগণের আক্রোশ যার উপর ফেটে পড়ে বেরিয়ে যেতে পারবে, ডায়লুট ও ডাইভার্টেড হয়ে যেতে পারবে, অথচ প্রকৃত বাঁধটা থেকে যাবে অক্ষত ।

    আরও আছে, এখনকার প্রতিটি বাঁধের পাথরপ্রতিমার রূপগুণও ভিন্ন ভিন্ন, পৃথক পৃথক স্পেশালিস্ট বা দক্ষ বিভূতিদের দিয়ে বানানো । এসব বাঁধ ভাঙতে গেলে বিদ্রোহীদেরও ভিন্ন ভিন্ন শাখার স্পেশালিস্ট হতে হয়, দক্ষ হতে হয়, অনেক তপজপ করতে হয় । কেননা এমন ব্যবস্হা করে রাখা হয়েছে যাতে কৃষিবিজ্ঞানী সাংস্কৃতিক বাঁধের রহস্য জানতে না পারেন, জীববিজ্ঞানী রাজনৈতিক বাঁধের রহস্য জানতে না পারেন...ইত্যাদি ইত্যাদি। কারণ প্রতিটি বাঁধই সেই সেই বিষয়ের প্রতীকের পাথরপ্রতিমা দিয়ে গড়া । তাই, একালে একজন দুয়ো-রাজকুমারে কিছুই হবার নয় । যতোগুলি বাঁধ, বলতে গেলে ততোজন দক্ষ দুয়ো-রাজকুমার লাগে সেগুলি ভাঙবার আয়োজন করতে।

    তাই একালে দুয়ো-রাজকুমারের সংখ্যাও খুব কম নয় । এর ভিতর আবার জালি দুয়ো-রাজকুমার তো রয়েছেই । তার ওপর, কখনও বা কোনও কোনও দক্ষ দুয়ো-রাজকুমারকে রাতারাতি ফুটপাত বদল করতেও দেখা যায় । অবশ্য তার জন্য তাদের ফ্ল্যাট নিতে হয় 'কনখল'-এ । 'কনখল' সেই বিখ্যাত কমপ্লেক্স, যেখানে দাঁড়িয়ে আদি দক্ষ বলেছিল, 'কৌ ন খল অর্থাৎ কে খল নহে ? সব্বাই খল । অতএব আমিও কেন খল হবো না ?' এই বলে, সেও খল হয়ে যায় । সেই জন্য, সেই ভিত্তিভূমির নাম হয়ে যায় 'কনখল' । এলাকার ফুটপাত-বদল-পারদর্শী দক্ষেরা সেই কমপ্লেক্সে আশ্রয় নিয়ে ঘোষণা করে, 'কে খল নহে ? সব্বাই খল । কেউ কথা রাখেনি । অতএব আমিও কথা রাখব না ।' ---এই বলে তারা সুযোগ পাওয়া মাত্রই সুয়ো-রাজকুমারের দলে ভিড়ে যায় । তাই প্রকৃত বিদ্রোহী দুয়ো-রাজকুমারকে চিনতে পারা এযুগের এক কঠিন সমস্যা ।

    আবার বাঁ৭ ভাঙার ক্ষেত্রেও রয়েছে সমস্যা । পালটা প্রতীকের পাথরপ্রতিমা না বসিয়ে বাঁধের বর্তমান পাথরকে সরানোর কোনও উপায় রাখা হয়নি । আর সেটা করতে গেলেই নতুন প্রতীকের বাঁধ নির্মিত হয়েযায় । ফলে, যে ভাঙতে আসে, দেখা যায়, পাকে চক্রে সে আগের বাঁধ ভেঙে তার স্হানে নতুন আর একটা বাঁধ বেঁধে ফেলেছে নিজের অগোচরেই ।

    এই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে, সাম্প্রতিক কালের অধুনান্তিক ( পোস্টমডার্ন ) তান্ত্রিক বিদ্রোহীরা একটি অভিনব পন্হা উদ্ভাবন করেছেন । বাঁধের উৎখাতযোগ্য পাথরপ্রতিমাকে অত্যন্ত স্বল্পায়ু প্রতীক দিয়ে সরিয়ে ফেলা । এ যেন মানববোমা । উদ্দিষ্ট প্রতীকটাকে ধ্বংস করে দিয়ে নিজেও মরে যাবে । এমন জ্ঞানের ব্যবহার, যা পুরোনো জ্ঞানকে মেরে ফেলবে অথচ নতুন 'জ্ঞানের বোঝা' হয়ে দেখা দেবে না ।

    Posted by Malay Roychoudhury at 11:27 PM No comments: Email ThisBlogThis!Share to TwitterShare to FacebookShare to Pinterest
    Labels: Anti-Establishment, Kalim Khan, Malay Roychoudhury, Poetic Theory, আভিধানিক, কলিম খান, সাহিত্য আলোচক
    পঞ্চম পর্ব : যড়যন্ত্র : উচ্চাটন
    ( অ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্ট রিভোল্ট প্রোগ্রামিং : অ্যান আইটি এক্সপ্লোর )
    সবাই জানেন কমপিউটারের দুনিয়ায় উইনডোর নানা ভারশন প্রকাশিত হয়েছে । উইনডো ৯৫, উইনডো ০৭, উইনডো ৯৮ ভারসন ১, উইনডো ৯৮ ভারসন ২, উইনডো মিলেনিয়াম ভারসন ইত্যাদি ইত্যাদি । তবে যেটা অনেকেই নজর করেননি, তা হল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতারও অনেকগুলি ভারসন আমাদের মার্কেটে চালু আছে । প্রতিটি ভারসনের আবার অনেকগুলি করে এডিশন রয়েছে । যার যেটা পছন্দ তিনি সেটা কেনেন, ব্যবহার করেন । ক্রেতার অবগতির জন্য এখানে কয়েকটি ভারসনের একটি করে এডিশন-এর অতি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হল ।
    Posted by Malay Roychoudhury at 6:18 AM No comments: Email ThisBlogThis!Share to TwitterShare to FacebookShare to Pinterest
    Labels: Kalim Khan, Malay Roychoudhury, Poetic Theory, আভিধানিক, কলিম খান, সাহিত্য আলোচক
    ষষ্ঠ পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ১
    ( লঞ্চড বাই শিবশম্ভু পাষণ্ড/সনাতন এডিশন )
    ইট ইজ আ প্রিমিটিভ এডিশন অ্যান্ড প্রেজেন্টলি নট অ্যাভেলেবল ইন দ্য মার্কেট।
    Posted by Malay Roychoudhury at 6:09 AM No comments: Email ThisBlogThis!Share to TwitterShare to FacebookShare to Pinterest
    Labels: Kalim Khan, Malay Roychoudhury, Poetic Theory, আভিধানিক, কলিম খান, সাহিত্য আলোচক
    সপ্তম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ২
    ( লঞ্চড বাই বাল্মীকি/চণ্ডাশোক এডিশন )
    ১) শাসক...ব্রাহ্মণ
    ২) শাসিত...ক্ষত্রিয় বৈশ্য শুদ্র ও অন্যান্য ম্লেচ্ছ সম্প্রদায়
    ৩) বিরোধের কারণ...সামাজিক মুক্তধারার উপরে নির্মিত বাঁধ
    ৪) বাঁধের কারিগর...কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস ও তাঁর শিষ্যগণ
    ৫) বাঁধ গড়ার উপাদান...সামাজিক প্রতীকের পাথরপ্রতিমা দিয়ে দিয়ে
    ৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র...পালটা প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
    ৭) সুয়ো-রাজকুমার...রাবণ অ্যাসোশিয়েটস
    ৮) দুয়ো-রাজকুমার...রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম
    ৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার...বিভীষণ
    ১০) বিদ্রোহের নেতা...দাশরথীগণ
    ১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা...ঃঃঃঃঃঃঃঃ
    ১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান...রাম নাম সত্য হ্যায়
    ১৩ ) আধপাগলা...জটায়ু
    ১৪ ) গাধা...হনুমান
  • m | 012312.60.900.191 | ২২ ডিসেম্বর ২০১৮ ২০:০৩541288
  • বিনয় মজুমদার - কবিতার বোধিবৃক্ষ : মলয় রায়চৌধুরী

    ‘জাগতিক সফলতা নয়, শয়নভঙ্গির মতো
    অনাড়ষ্ট সহজবিকাশ সকল মানুষ চায়’

    আমার মনে হয়েছে, গাণিতিক সৌন্দর্য তত্বের ওপর বিনয় মজুমদার গড়ে তুলেছেন তাঁর চারটি সাব-জনার ( sub-genre )-এর কবিতার বনেদ, ‘ফিরে এসো, চাকা’, ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’, ‘বাল্মীকির কবিতা’ এবং হাসপাতালে ও শিমুলপুরে দিনযাপনের খতিয়ান ‘শিমুলপুরে লেখা কবিতা’, ‘কবিতা বুঝিনি আমি’, ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’ , ‘ছোটো ছোটো গদ্য ও পদ্য’ আর ‘পৃথিবীর মানচিত্র’ । ‘ফিরে এসো, চাকা’ ছিল বাংলা সাহিত্যে ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণের সঙ্গে তুলনীয়, এবং পরবর্তী সাব-জনারগুলো প্রতিবার নতুন স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে ।
    যিনি গণিতের সৌন্দর্যে সমর্পিত তিনি নান্দনিক তৃপ্তি পান, গণিতের নির্দিষ্ট রূপকে সুন্দর মনে করে আনন্দ উপভোগ করেন, দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণার মাঝেও তিনি হর্ষের মনন-জগতে বসবাস করেন । যাঁরা বিনয় মজুমদারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাঁরা জানেন যে উত্তর দেবার সময়ে তিনি হঠাৎই রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে উঠতেন, এবং শিমুলপুরে থাকাকালীন কয়েকটি গানও রচনা করেছিলেন ।
    ওমর খৈয়াম ও এমিলি ডিকিনসনও গণিতের সৌন্দর্যের বনেদে গড়ে তুলেছিলেন তাঁদের কাব্য। গণিতের সাথে কবিতা ও সঙ্গীতের, এমনকি পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মের আরাধ্য পুস্তকগুলোর গাণিতিক লেখনবিন্যাসে ( যেমন বাইবেল, কোরান, জেন্দাভেস্তা, গীতা, ত্রপিটক, গুরুগ্রন্হ, তোরা, তালমুদ, কিতাব-ই-আকদাস, অগমসমূহ, কোইজিকি ইত্যাদি ) পার্থক্য খুঁজে পান না গণিত ও কবিতার বিস্ময়ে আক্রান্ত বেশ কয়েকজন গণিতবিদ । কবিতা ও সঙ্গীতের মতো তাঁদের মননে গণিত অনির্বচনীয়, তা ব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি ক্রিয়ায় বিদ্যমান । গাণিতিক সৌন্দর্যের বিখ্যাত উদাহরণটি হল পিথাগোরাসের উপপাদ্যটি । বিনয় মজুমদারের সঙ্গে জীবনানন্দের প্রধান তফাত এখানেই । বিনয় দারিদ্র্য, দুঃখ, কষ্ট, অবহেলা, অসুস্হতা, নিঃসঙ্গতা সত্বেও থাকতেন আনন্দের প্রভায় জ্যোতির্ময় ।
    কবিতাকে জীবনের সঙ্গে একাত্ম করেছেন বিনয় মজুমদার । তাঁর কাছে অনেকেই জানতে চাইতেন ‘কবিতা কী?’ বিনয় ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে বলেছেন, “কবিতা কী তা বলা অসম্ভব । কেন ? বলুন তো আপনি কী ? আপনি কি একশো কোটি বছর আগে থেকে পৃথিবীতে আছেন ? আপনি মরলে কি যে-কোনো অবস্হায় হোক প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবেন ? আপনি যখন আলুডাল খান, এই আলুডাল পাকস্হলীতে গিয়ে হজম হয়ে শেষে প্রাণবন্ত মাংস হয় । তা হলে দেখা যাচ্ছে পাকস্হলীতে জড়বস্তু আলুডাল প্রাণবন্ত হচ্ছে অর্থাৎ পাকস্হলীতে প্রাণ সৃষ্টি হচ্ছে এই তত্বে কি আপনি বিশ্বাস করতে পারেন ? যদি না পারেন তবে আপনার প্রাণ কী ? এইভাবে দেখা যাবে যে আপনি নিজের সম্বন্ধে কিছু কথা জানেন না । নিজেকেই পুরোপুরি জানেন না আপনি । তা হলে কবিতা কী তাও আপনার জানা অসম্ভব ।”
    ২০০০ সালে প্রকাশিত ডেভলিন কিথ তাঁর ‘ডু ম্যাথেমেটিশিয়ানস হ্যাভ ডিফারেন্ট ব্রেইনস’ গ্রন্হে হাঙ্গরিয় গণিতবিদ পল এরডস -এর এই উদ্ধৃতির মাধ্যমে গণিতের সঙ্গে সঙ্গীতের সম্পর্ক স্পষ্ট করেছেন : Why are numbers beautiful ? It is like asking why is Beethoven’s Ninth Symphony beautiful. If you do not see why, someone can not tell you. If they are not beautiful, nothing is.
    ১৯১৯ সালে বারট্রাণ্ড রাসেল তাঁর ‘দি স্টাডি অফ ম্যাথেম্যাটিক্স’ গ্রন্হে লিখেছিলেন : Mathematics, rightly viewed, possesses not only truth, but supreme beauty — a beauty cold and austere, like that of sculpture ; without appeal to any part of our weaker nature, without the gorgeous trappings of painting or music, yet sublimely pure, and capable of a stern perfection such as only the greatest art can show. The true spirit of delight, the exaltation, the sense of being more than Man, which is the touchstone of the highest excellence, is to be found in mathematics as surely as poetry.
    আইনস্টাইন বলেছিলেন, Pure mathematics is, in its way, the poetry of logical ideas.
    গণিত ও কবিতা উভয়েরই যে ব্যাপারে মিল আছে তা হলো ভাষার মাধ্যমে পরিমাপ ও আঙ্গিকের প্রতি তাদের নিখুঁত হবার প্রচেষ্টা ; মাত্রা বা সংখ্যানিরূপণ ; সমানতা ; ছন্দ ; প্রণালী ; পুনরাবৃত্তি ; অনুক্রম এবং পরিণতি ; পৃষ্ঠার ওপরে আঙ্গিক ও লেআউট, এবং প্রকাশের সংক্ষেপণ, ঘণীভূত করার ইন্দ্রজাল । স্বকীয় মর্মার্থ থেকে পৃথক করার জন্য শব্দ ( সংখ্যা ) ও প্রতীকের একাত্মতাকে একটি স্তরে মান্যতা দিয়ে সংখ্যাবিন্যাস অথবা বাকবিন্যাসের নিরীক্ষা করে গণিত ও কবিতা উভয়ই । জ্ঞান ও বোধ-অভিজ্ঞতার একটি আদর্শ অথচ বিমূর্ত এলাকা গড়ে তোলে উভয়ই, যেখানে সত্য ও মর্মার্থের প্রকৃতি, এবং কেমন করে তাদের সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ করা যায়, বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্কায়িত করা যেতে পারে, তার অন্বেষন করে । উভয়ই কল্পনা ও আবিষ্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ । শৈশবে অক্ষর এবং সংখ্যা শেখার উপায় হলো ছন্দের মাধ্যমে মুখস্হ করা । সেই বয়স থেকেই অক্ষর ও নামতা মনে রাখার চেষ্টা করানো হয় একই ভাবে ; তাদের জন্য রচিত কবিতাগুলো গণিত মেনে লেখা হয় যাতে তাদের মনে থাকে । চন্দন ভট্টাচার্যকে বিনয় মজুমদার বলেছিলেন, “ছন্দে ও অন্তমিলে লিখলে সে-কবিতা পাঠকের মনে থেকে যায় । কাজেই পাঠকের স্মৃতিতে কবিতা সুমুদ্রিত করার এটাই সেরা পদ্ধতি।”
    বেদের শ্লোকগুলো, যা ছন্দে রচিত, তাতে গণিতের সংযোজন করেছিলেন অপস্তম্ব, বৌধায়ন, মানব, কাত্যায়ন, বরাহ, হিরণ্যকেশিন — ধর্মাচরণের বিষয়গুলো জ্যামিতিক ছক দিয়ে এবং সেগুলো ছন্দের মাধ্যমে উপস্হাপন করেছিলেন । অশ্বমেধ-হোম-যজ্ঞ ইত্যাদির সময়ে সেই জ্যামিতিক ছকগুলো আঁকা হতো । এখনও পুরোহিতরা অনেকে পুজো, অন্নপ্রাশন, বিয়ে, শ্রাদ্ধ ইত্যাদির সময়ে মাটিতে নকশা আঁকেন, জল দিয়ে, কুশকাঠি দিয়ে, বালির ওপর আঙুল দিয়ে, সিঁদুর দিয়ে । বর্তমান কালখণ্ডে পৌঁছে আমরা শূন্য ও এক-এর বাইনারি কবিতায় পৌঁছেছি । গণিতের ক্ষমতার অংশিদার হলো কবিতা, এই তর্কে যে ভাবকল্প যতো ব্যাপকই হোক না কেন, গণিত ও কবিতা তাকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংখ্যাপ্রণালী অথবা বাকপ্রণালীতে আঁটিয়ে দিতে পারে — এমনকি বিশাল ব্রহ্মাণ্ডকে্ অত্যন্ত ছোট ফর্মে ভরে ফেলতে পারে ।
    কিংবদন্তি অনুযায়ী ঋষি বৃহস্পতির সাতটি মুখগহ্বর থেকে সাত রকমের ছন্দ নিঃসৃত হয়েছিল, এবং প্রতিটির গণিত-কাঠামো সুস্পষ্ট । সংস্কৃত কাব্যরচনার জন্য গণিত নির্দেশিত ছিল । ছন্দের গণিত বর্ণিত আছে বেদাঙ্গতে, যথা গায়ত্রীঃছন্দ ( ৬ x ৪ ), উশ্নীঃছন্দ ( ৭ x ৪ ), অনুষ্টুভছন্দ ( ৮x ৪ ), বৃহতীঃছন্দ ( ৯x ৪ ), ত্রিষ্টুভছন্দ ( ১১x ৪ ) ইত্যাদি । পিঙ্গলের ‘ছন্দসূত্র’ গ্রন্হে গণিতের সঙ্গে মাত্রা ও শব্দের সম্পর্কনিয়ম আলোচনা করা হয়েছে । ‘নাট্যশাস্ত্র’তে বলা হয়েছে মাত্রার গণিতবর্জিত শব্দ হয় না ; শব্দের গণিতহীন মাত্রা হয় না । ছান্দস বিষয়ে গাণিতিক নিয়মগুলি আলোচিত হয়েছে অগ্নিপূরাণ, নাট্যশাস্ত্র, বৃহৎসংহিতা ও মানসোল্লাস-এ । ‘মহাভারত’-এর ছন্দের গণিত মূলত অনুষ্টুভ ও ত্রিষ্টুভ ।
    ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময়ে বিনয় মজুমদার বটানিকাল গার্ডেনে প্রায়ই যেতেন ; গঙ্গার ধারের দৃশ্যাবলী দেখতেন । পরে যখন শিমুলপুর গ্রামে বসবাস করতে গেলেন তখন আরও কাছ থেকে প্রতিদিন পুকুরের মাছ গাছপালা ফুলফলের জন্ম ও বিকাশ দেখার অফুরন্ত সময় পেতেন । ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হে তিনি গণিতের ফিবোনাচ্চি রাশিমালার বিস্ময়কে বকুলফুল এবং বিভিন্ন গাছের শাখা-প্রশাখার প্রসারণের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন । এই রাশিমালা আবিষ্কার করেছিলেন ত্রয়োদশ শতকের গণিতবিদ ফিবোনাচ্চি, যিনি বলেছিলেন, ‘প্রকৃতির মূল রহস্য তাঁর বর্ণিত রাশিমালা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় । এই রাশিমালা শুরু হয় শূন্যতে এবং সিরিজের পরবর্তী সংখ্যাগুলো প্রতিটি তার পূর্ববর্তী দুটি সংখ্যার যোগফল । সূর্যমুখী ফুলের পাপড়িবিন্যাস, শামুকের খোলের ওপরকার ডোরা, ফুলকপির ছড়িয়ে পড়ার বিন্যাস, মৌমাছির পরিবারতন্ত্র, বিভিন্ন গাছের শাখাবিন্যাস, আনারসের বাইরের বিন্যাস ইত্যাদিতে পাওয়া যাবে প্রকৃতির এই নান্দনিক-গাণিতিক খেলা ।
    গণিতে ‘ফিবোনাচ্চি সিরিজ’ নিয়ে বিনয় এই কবিতাটি লিখেছিলেন :-

    অনেক কিছুই তবু বিশুদ্ধ গণিতশাস্ত্র নয়
    লিখিত বিশ্লিষ্টরূপ গণিতের অআকখময়
    হয় না, সে-সব ক্ষেত্রে উপযুক্ত গণিতশাস্ত্রের
    নির্যাস দর্শনটুকু প্রয়োগ করেই বিশ্লেষণ
    করা একমাত্র পথ, গণিতশাস্ত্রীয় দর্শনের
    বহির্ভূত অতিরিক্ত দর্শন সম্ভবপর নয় ।
    সেহেতু ঈশ্বরী দ্যাখো গণিতের ইউনিট
    পাউণ্ড সেকেণ্ড ফুট থেমে থাকে চুপে
    এদের নিয়মাবদ্ধ সততা ও অসততা মনতস্ত্বে বর্তমান ইউনিটরূপে
    আলোকিত করে রাখে বিশ্বের ঘটনাবলী চিন্ত্যনীয় বিষয়গুলিকে
    আগামীর দিকে ।

    পোল্যাণ্ডের কবি উইসলাভা সিমবোরস্কা, যিনি ১৯৬৬ সালে কবিতায় গণিত ও জৈবজীবনের রহস্যকে একীভূত করার জন্য নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন, তাঁর ‘পাই’ শিরোনামের বিখ্যাত কবিতাটি পড়লে বোঝা যাবে, যে-কবিরা গণিতকে ভালোবাসেন তাঁদের কবিতা কীভাবে রূপায়িত হয়েছে । আমি ইংরেজি অনুবাদটিই এখানে তুলে দিচ্ছি :-

    The admirable number pi
    three point one four one.
    All the following digits are also initial,
    five nine two because it never ends.
    It can not be comprehended six five three five at a glance,
    eight nine by calculation,
    seven nine or imagination,
    not even three two three eight by wit, that is, by comparison,
    four six to anything else
    two six four three in the world.
    The longest snake on earth calls it quits at about forty feet.
    Likewise, snakes of myth and legend, though they may hold
    out a bit longer.
    The pageant of digits comprising the number pi
    does not stop at the page’s edge.
    It goes on across the table, through the air,
    over a wall, a leaf, a bird’s nest, clouds, straight into the sky,
    through all the bottomless, bloated heavens.
    Oh how brief — a mouse tail, a pigtail — is the tail of the comet !
    How feeble the star’s ray, bent by bumping up against space !
    While here we have two three fifteen three hundred nineteen
    my phone number your shirt size the year
    nineteen hundred and seventy-three the sixth floor
    the number of inhabitants the sixty five cents
    hip measurement two fingers a charade, a code,
    in which we find hail to thee blithe spirit, bird thou never
    were
    alongside ladies and gentlemen, no cause for alarm,
    as well as heaven and earth shall pass away,
    but not the number pi, oh no, nothing doing,
    it keeps right on with its rather remarkable five,
    in uncommonly five eight,
    its far from final seven,
    nudging, always nudging a sluggish eternity
    to continue.
    গণিতের সৌন্দর্য নিয়ে কবিতা ইউরোপ আমেরিকায় বহুকাল যাবত লেখা হচ্ছে । যেমন মারিয়ান মুর-এর ‘দি আইকোস্যাসফিয়ার’, কার্ল স্যাণ্ডবার্গের ‘অ্যারিথম্যাটিক’, ওয়ালেস স্টিভেন্সের ‘ল্যাণ্ডস্কেপ ফাইভ’, ভ্যাচেল লিন্ডসের ‘ইউক্লিড’ ইত্যাদি ।
    আল মাহমুদ যথার্থই বলেছিলেন, “বিনয় অগোছালো একজন কবি আর আমি খুব গোছানো কবি”, তিনি আশ্রয় নিয়েছেন ধর্মে, যখন কিনা বিনয় মজুমদার ধর্মকে ছোঁয়াচে-রোগের মতো পরিহার করে গণিতের আশ্রয় নিয়েছেন, এবং গণিত যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের মতন বিনয় মজুমদার একজন বেপরোয়া কবি । বিনয়ের এই গাণিতিক কবিতার মতো আল মাহমুদ কোনোদিন রহস্যময় কবিতা লেখেননি, লেখা সম্ভব ছিল না তাঁর শেষ পর্যায়ের মৌলবাদী জীবন পরিসরে । বিনয় মজুমদার লিখিত একটি গণিতাশ্রিত গান :-

    একটি গান
    X = 0
    এবং Y = 0
    বা X = 0 = Y
    বা X = Y
    শূন্য 0 থেকে প্রাণী X ও Y সৃষ্টি হলো
    এভাবে বিশ্ব সৃষ্টি শুরু হয়েছিল ।

    এবং একটি গাণিতিক কবিতা :-
    X, Y ও Z
    দুটো ভ্যারিয়েবল X ও Y
    X ও Y থেকে তৃতীয় একটি ভ্যারিয়েবল বানাতে চাই
    আমরা । তৃতীয় ভ্যারিয়েবল ‘Z’ সহজেই বানানো যায়
    ক্যালকুলাসের দ্বারা ।
    একমাত্র ঐ ক্যালকুলাসের জন্যই ময়ূরীর সন্তান আরেকটি
    ময়ূরীই হয় — ডিম থেকে ময়ূর হয়, তারপরে
    ‘Z’ হয় । Y আর X
    Y ইজ আ ফাংশন অফ X
    ঠিক ডিমটাও হয় সেইরকম । ডিমের ভিতরে
    ‘Y’- ও আছে ‘X’ -ও আছে । সুতরাং ‘Z’ সহজেই
    হয় Y নতুবা X -এর মতন হয়ে । ময়ূরীর ডিম
    তার ভিতরে ময়ূরীও আছে ময়ূরও আছে ।
    সুতরাং ডেরিভেটিভ হয় ময়ূর হবে নয়তো ময়ূরী হবে ।

    বিনয় লিখেছেন, এবং এখানে সত্য কথাটার ওপর আমি জোর দিতে চাই :-

    ক্যালকুলাসের এক সত্য আমি লিপিবদ্ধ করি ।
    যে-কোনো ফাংকশানের এনেথ ডেরিভেটিভে এন
    সমান বিয়োগ এক বসিয়ে দিলেই
    সেই ফাংকশানটির ফার্স্ট ইন্টিগ্রেশনের ফল পাওয়া যায় ।

    বিনয় মজুমদারের চিন্তার গাণিতিক ব্যাপ্তি, ১৪১৩ সালে ‘অউম’ পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকার যা বলেছিলেন, তা থেকে স্পষ্ট হবে, “তোমরা মহাগ্রন্হ শুনেছ কি ? পড়েছ কি ? জানো কি ? পৃথিবীর যত বই আছে, সব বই মিলে আসলে একখানি বই । তারই নাম মহাগ্রন্হ । এই মহাগ্রন্হ নিজের প্রয়োজনে বাড়ে । ঠিক আমগাছের মতো বাড়ে মহাগ্রন্হের শাখা-প্রশাখা । মহাগ্রন্হ এখনই বেড়ে যাচ্ছে, এই কলমের মুখ দিয়ে এই মুহূর্তে মহাগ্রন্হ বৃদ্ধি পাচ্ছে । বর্তমান পাঠক যা পড়তে পড়তে টের পাবেন । এবং এই যে পৃথিবীর যেখানে যত লোকই, এখন যারা লিখছে — সবার হাত দিয়েই মহাগ্রন্হ বেড়ে চলেছে । রসায়নশাস্ত্র, উড়োজাহাজ বানাবার বিদ্যা, লোকেদের লেখা চিঠি, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা — এইরূপ অসংখ্য বিষয়ে বর্তমান মুহূর্তে লেখা হচ্ছে, এ সবগুলিই একখানি মহাগ্রন্হের বৃদ্ধিমাত্র । যেমন আমগাছের ডাল একসঙ্গে অনেক গজায় এবং বাড়ে, তেমনি মহাগ্রন্হ একসঙ্গে অনেক গজায় এবং বাড়ে ।

    ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কবিতায় বিনয় এই একই গাণিতিক ব্যাপ্তি লক্ষ্য করেছেন দর্শনে । তিনি বলেছেন :-

    দর্শনের জগতেও নানা পরিবার আছে, অগণন পরিবার আছে
    সে-সকল পরিবারে — আলাদা যে কোনো পরিবারে সবার চেহারা
    চরিত্র ইত্যাদি প্রায় একরকমের হয়, তাই এত পরিবার হয়
    এমন পরিবারের কারো সাথে কথা বলে নিতে গিয়ে যদি তাকে
    পাওয়া নাই যায় তবে সেই পরিবারভূক্ত — একই পরিবারভূক্ত কারো
    অন্য কারো কাছে সেই কথা বলে আসা যায় একই আলোচনা করা যায়;
    তাতে খুব অসুবিধা হয় না, হয়তো বেশি সুবিধাও হয়ে যেতে পারে ।

    ‘লোক’ পত্রিকার জন্য ২০০১ সালে শামীমুল হক শামীম বিনয় মজুমদারের যে সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, তাতে ছন্দ সম্পর্কে এরকম প্রশ্নোত্তর হয়েছিল :
    প্রশ্ন : আপনি তো পয়ারেই কবিতা লিখলেন সারা জীবন । পয়ারেই কি আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?
    বিনয় : এখন আর পয়ারে লিখি না তো । হ্যাঁ, অধিকাংশই, সেই ১৯৬০ সাল থেকে শুরু করে ১৯৯৫ পর্যন্ত পয়ারেই লিখে গেছি । একটানা । তবে আমার পয়ারে তফাত আছে, অন্য পয়ারের মতো না । তফাতটা আমি বলছি ; শোনো, এটা হচ্ছে সংস্কৃত পয়ার, ছন্দিত সংস্কৃত ছন্দ আসলে । আর পয়ার ছন্দ বললাম দুটো । কিন্তু কর্কশ ছন্দ ছিল । সেটা মন্দাক্রান্তা ছন্দ । ওই মন্দাক্রান্তা ছন্দটা হচ্ছে মেঘদূতের ছন্দ । ছন্দটাকে ভেঙে আমি এমন বানালাম যে, পয়ার ছন্দটা খুব মিষ্ট হয়ে গেল । পয়ার ছন্দটাকে আমি মিষ্ট বানালাম নানান কাণ্ড করে । ‘আমার ছন্দ’ বলে একটি প্রবন্ধ লিখেছি আমি । সম্পাদক রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় তার পত্রিকায় ছাপিয়েছে ।
    প্রশ্ন : পরে সেটা বই হয়ে বেরিয়েছে ।
    বিনয় : কোন বইতে যেন ?
    প্রশ্ন : ‘ঈশ্বরীর স্বরচিত নিবন্ধ ও অন্যান্য’ বইতে ।
    বিনয় : হ্যাঁ, প্রতিভাস থেকে বেরিয়েছে । সেই বইতে ‘আমার ছন্দ’ প্রবন্ধটি আছে । ‘আমার ছন্দ’ প্রবন্ধে পয়ার ছন্দে কীভাবে লিখেছি, পয়ার ছন্দটাকে আমি কীভাবে নিজস্ব পদ্ধতিতে নিয়ে এসেছি সেটা বিশদভাবে লিখেছি, খুবই বিশদভাবে লিখেছি । গাণিতিক ছবি-টবি দিয়ে খুবই সুন্দরভাবে লিখেছি । তারপরে পয়ারটা খুব মিষ্ট ছন্দ হয়ে গেল । এ জন্য পয়ারেই, যেহেতু আমি পয়ারেই ওইরকমের মিষ্ট পয়ার লেখা আবিষ্কার করলাম ; সেই হেতু ঠিক করলাম যে আমি এর পরে শুধু পয়ারেই লিখব, আর কোনও ছন্দে নয় ।
    ‘ঈশ্বরীর স্বরচিত নিবন্ধ’ বইটিতে বিনয় মজুমদার লিখেছেন, “রূপ থেকে অরূপে আসা, আবার অরূপ থেকে রূপে ফিরে যাওয়া, রূপের সহিত অরূপের পারস্পরিক সম্পর্কে — এ সকল বিষয় অত্যন্ত মূল্যবান । গণিতশাস্ত্রেও ঠিক এই । একই ব্যাপার ঘটে । কোনো রূপের নির্যাসরূপে থিওরেম বা ফর্মুলা তৈরি করা হয় । অতঃপর সেই থিওরেম বা ফর্মুলা থেকে যত খুশি রূপ ফিরে পাওয়া যায়, যত খুশি রূপের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় । এই অর্থে –’এই করেছ ভালো,নিঠুর, এই করেছ ভালো…’ কবিতাটি একটি ফর্মুলা — জীবন ফর্মুলা ।”
    বিনয় মজুমদার রবীন্দ্রনাথের এই গানটিকে ফর্মুলা বলায়, অনুমান করা যায়, হয়তো, তিনি নিজের জীবনের ক্ষেত্রেই এই ফর্মুলাটিকে রূপায়িত হতে দেখলেন, যেমনটা রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ নিজেদের জীবনের ক্ষেত্রে দেখেছিলেন ।

    দুই
    উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে ব্রিটিশ সরকার, নিজেদের নিয়ন্ত্রণ তদানীন্তন বর্মায়, বর্তমানে মিয়ানমারে, প্রসারণ ঘটালে, নিজেদের সঙ্গে বহু বঙ্গভাষীকে টেনে নিয়ে যায়, প্রধানত সরকারি চাকরিতে ইংরেজির ব্যবহারে দক্ষ ঔপনিবেশিক শিক্ষায় সড়গড় কেরানি এবং জঙ্গলগুলো থেকে সেগুন ও অন্যান্য কাঠ কেটে সেগুলো রপ্তানির কাজে লাগাবার জন্য, স্বাস্হ্যবান চাষিদের তুলে নিয়ে যায়, যারা কালক্রমে বন্দরশহর রেঙ্গুন বা য়াঙ্গন,এবং প্রাকৃতিক জঙ্গলে ঘেরা মান্দালয়ে বসতি স্হাপন করে । সেসময়ে নিন্মবর্ণের চাষিদের নমঃশুদ্র বলা হতো না, বলা হতো চণ্ডাল, উচ্চবর্ণের বাঙালিরা যাদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতো, তাঁরা ছিলেন চতুর্বর্ণের বাইরে একটি অস্পৃশ্য বর্ণ । তখনকার পূর্ববঙ্গে চণ্ডাল বিদ্রোহের চাপে ১৯০১ এর আদমশুমারিতে ব্রিটিশ সরকার চণ্ডাল বর্গের পরিবারদের নমঃশুদ্র হিসাবে চিহ্ণিত করার হুকুম জারি করেছিল । বিনয় মজুমদারের বাবা ব্রিটিশ ভারতের পি ডাবলিউ ডিতে চাকরি করতেন এবং সেই সূত্রে মিয়ানমারে পোস্টেড ছিলেন । বিনয় মজুমদারের বয়স যখন সাড়ে সাত বছর তখন তাঁরা মিয়ানমার ত্যাগ করে স্বদেশে ফিরতে বাধ্য হন ।
    পাঠক নিশ্চয়ই ভাবছেন যে বিনয় মজুমদারের জীবন ও সাহিত্যে অবদান আলোচনা করতে বসে চণ্ডাল ও নমঃশুদ্রের প্রসঙ্গ কেন তুলছি । তার কারণ দুটি । প্রথম হলো এই যে ইরেজরা মিয়ানমারের জঙ্গলের গাছকাটার জন্য এবং ধান চাষের জন্য প্রধানত বাঙালি নমঃশুদ্রদের ও অবাঙালি অন্ত্যজদের তুলে নিয়ে গিয়েছিল, ঠিক যেভাবে তারা ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ফিজি, মরিশাস ও লাতিন আমেরিকায় ভারতীয়দের জোর করে বা ফুসলিয়ে কায়িক শ্রমের জন্য তুলে নিয়ে গিয়েছিল । দ্বিতীয় কারণ হলো বিনয় মজুমদারের কবিতায় তাঁর চণ্ডাল বা নমঃশুদ্র হবার কথা বেশ কয়েকবার এসেছে । সম্ভবত তিনি আঁচ করেছিলেন, যে তাঁর চেয়ে কম প্রতিভাবান উচ্চবর্ণের কবিদের ওপর প্রতিষ্ঠান আলো ফেললেও তাঁকে রেখে দিয়েছে অন্ধকারে । তাঁর অসুস্হতার সংবাদ প্রচারের পরও তাঁর কবিতায় এই প্রসঙ্গটি এনেছেন তিনি, এবং রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকি সম্পর্কে দুর্বলতার উৎসও হয়তো তাঁর জন্মসূত্রের এই বোধ, আমার মনে হয়, কেননা সাধনা করার পর নারদ বাল্মীকিকে ঋষি ও ব্রাহ্মণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন, যদিও বিনয় বলেছেন যে ‘বাল্মীকি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল বলে তাঁর একটি বিতর্কিত বইয়ের নাম ‘বাল্মীকির কবিতা’ ।
    সেই সময়ের মিয়ানমারে নিম্নবর্গের ভারতীয়দের বলা হতো ‘কা-লা’ অথবা ‘কা-লার’, তাদের ত্বক কৃষ্ণবর্ণের বলে। নিজের দেহত্বক সম্পর্কে সেনসিটিভ ছিলেন বিনয়, তিনি লিখেছেন, “সত্যব্রতর বাবাকে আমি দেখেছি/সত্যব্রতর বাবা-ই তখন রাজা/রাজা বলে যে দুধের মতন সাদা গায়ের রঙ তা নয়/প্রায় আমার মতনই গায়ের রঙ।” উল্লেখ্য যে বিনয় মজুমদার সম্পর্কে পশ্চিমবাংলায় যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই নিম্নবর্গের ।
    বাংলাদেশের একটি পত্রিকার জন্য শামীমুল হক শামীম, অমলেন্দু বিশ্বাস, মানসী কীর্তনীয়া এবং মানসী সরকারকে ২০০১ সালে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে এই ধরণের প্রশ্নোত্তর হয়েছিল:-
    প্রশ্ন : আপনার পাণ্ডুলিপিখানা এখানে ছাপানোর ব্যবস্হা না করে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের মিউজিয়ামে পাঠানোর উদ্দেশ্য কী ? এখানে কি কোনও রহস্য আছে ? কোনও গোপন ব্যাপার না থাকলে খুলে বলুন ।
    বিনয় : মূল উদ্দেশ্য — নমঃশূদ্র । আসল কথা হচ্ছে এটা । নমঃশূদ্র সমাজে তখন কবি বলে কেউ ছিল না । আমি প্রথম নমঃশূদ্র কবি । আমার কবিতা লিখতে বহু কষ্ট করতে হয়েছে । বহু অবহেলা সইতে হয়েছে । আমার বই কেউ ছাপতো না । প্রথম ছাপল মীনাক্ষী দত্ত, তার মানে জ্যোতির্ময় দত্তর বউ অর্থাৎ বুদ্ধদেব বসুর মেয়ে — ১৯৬৮ সালে । টাকা দিয়েছে মীনাক্ষী দত্ত নিজে । অথচ ‘ফিরে এসো, চাকা’ প্রথম ছাপা হয় ১৯৬২ সালে । তারপর, সেই নমঃশূদ্র বলে তো এখনও অবহেলা সইতে হচ্ছে ।
    প্রশ্ন : সেটা কি কবি-সাহিত্যিকদের কাছ থেকেও ?
    বিনয় : কবিদের কাছ থেকে, খবরের কাগজের কাছ থেকে, পত্রিকার কাছ থেকে, প্রকাশকের কাছ থেকে, অনুবাদকের কাছ থেকে, সমস্ত । দেখলাম ভেবে ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’টাকে বাঁচাতে হয় । আমার নিজের টাকায় তো ছাপা সম্ভব না । এত বড় বই, টাকা পাব কোথায় ? আমার চাকরি তো নেই । সুতরাং পাঠিয়ে দিলাম ব্রিটিশ মিউজিয়ামে । থাকুক ওদের কাছে । ওদের কাছে থাকলে তবু একটা সান্ত্বনা থাকবে যে — আছে ।
    বিনয় মজুমদারের দুটি রচনা আমার চোখে পড়েছে, হয়তো আরও কয়েক জায়গায় লিখে থাকবেন মনের কথা, অভিমানের কথা, প্রথম কবিতাটিতে উচ্চবর্ণের কবিরা, যাঁরা তাঁকে সাংস্কৃতিক রাজনীতির মাধ্যমে কোনঠাশা করে দিয়েছিল, তাঁদের তিনি বলছেন নাপিত, যে কবিরা শরীরের চুল কামিয়ে দ্যায় এবং চুগলি করে বেড়ায় । দ্বিতীয় কবিতাটি লেখার সময়ে তাঁর মনে যে মাইকেলের উক্তি বিঁধেছিল, তা প্রকাশ হয়ে পড়ে, নয়তো সাধারণ পাঠকরা মধুসূদনের লাইন তিনটি মনে রাখবেন না ।

    নাপিত বনাম নমঃশুদ্র
    নাপিত উপরে নাকি নমঃশুদ্র সম্প্রদায় উপরে — এ কথা
    যখন আলোচ্য হল তখন কেবলমাত্র এই বললাম
    সাহিত্য দিয়েও নয়, গোপাল ভাঁড়ের গল্প দিয়ে
    নয়, রাজনীতি দিয়ে ভাবো । কতজন মন্ত্রী হয়েছে এ
    নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ে — তাই দিয়ে ভাবো ।
    নাপিতদের কেউ মন্ত্রী হতে পারেনি তো আর
    বহু নমঃশুদ্র মন্ত্রী হয়েছে তো এ যাবৎ গুনে গুনে দ্যাখো ।
    এই রাজনীতি দিয়ে বোঝা যায় নমঃশুদ্র সম্প্রদায় নাপিতের উপরেই ঠিক ।
    ( ছোটো ছোটো গদ্য ও পদ্য [ ২০০৭ ] বই থেকে )

    সত্যব্রত ও আমি
    কবি মধুসূদন দত্তের কবিতা :
    ‘চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে ।
    কিন্তু নহি গঞ্জি তেমা, গুরুজন তুমি
    পিতৃতুল্য, ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে…’
    মধুসূদন দত্ত এই কবিতা লেখার শ-খানেক বছর পরে
    মৈমনসিংহের রাজা সত্যব্রত চৌধুরী এবং চণ্ডাল আমি
    এক ঘরের ভিতরে দুই বছর ছিলাম — ইডেন হিন্দু হোস্টেলে ।
    এইসব আমি ভাবি এবং অবাক হয়ে যাই ।
    সত্যব্রত ব্রেকফাস্ট খায় FIRPO হোটেলে ।
    এবং বর্তমানে ৭২ বছর বয়সে চা খাই তা সিনেমায়
    তুলে নিয়ে গেছে ঢাকার মুসলমানরা । আমি
    FIRPO রেস্তোঁরায় একবারই ব্রেকফাস্ট খেয়েছিলাম
    সত্যব্রতর সঙ্গে ।
    ( ছোটো ছোটো গদ্য ও পদ্য [২০০৭ ] বই থেকে )

    বিনয় যখন প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তেন তখন সত্যব্রত চৌধুরী নামে তাঁর এক সহপাঠী ছিল । সত্যব্রতর বাবা ছিলেম ময়মনসিংহের জমিদার । সত্যব্রতর দাদা শ্রীপতি চৌধুরী ছিলেন সিনেমার হিরো । কবি বিমল চন্দ্র ঘোষ তখন সিনেমার গান লিখতেন । সত্যব্রত চৌধুরী বিনয়কে বিমলচন্দ্র ঘোষের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দ্যান । বিমলচন্দ্র ঘোষ, বিনয় জানিয়েছেন, থাকতেন যদু ভট্টাচার্য লেনে এবং শীত গ্রীষ্ম যাই হোক, লেপ গায়ে দিয়ে শুয়ে থাকতেন । পাশে একটা বিরাট আকারের অ্যাশট্রে । তাতে অজস্র ক্যাপস্ট্যান সিগারেটের টুকরো । উনি বিনয়কে বলেছিলেন, তোমার কবিতা আমাকে দেখাবে তো । তখন প্রত্যেক রবিবার বিনয় যেতেন বিমলচন্দ্র ঘোষের বাড়ি । বিমলচন্দ্র ঘোষ কয়েকটা কবিতা প্রকাশ করেছিলেন ‘বারোমাস’ পত্রিকায় । বিমলচন্দ্র ঘোষের আগে রমাপদ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন বিনয় । কবিতার খাতা দিয়ে এসেছিলেন । রমাপদ চৌধুরী তখন ‘ইদানিং’ নামে একটা পত্রিকা বার করতেন । রমাপদ চৌধুরী কয়েকদিন খাতাটা রেখে বিনয়কে ফেরত দিয়ে বলেছিলেন, তুমি লিখে যাও, লিখে যাও ।
    বন্ধু মনোজ বিশ্বাসকে বিনয় মজুমদার একবার বলেছিলেন, “জানিস, মজুমদার পদবিটা নবাব-বাদশার কাছ থেকে পাওয়া যেতো । আমার মনে হয় ওরা যদি বুদ্ধি করে মজুমদার না দিয়ে, মজুতদার দিতো, তাহলে খুব মানানসই হতো — বিনয় মজুতদার । কি রে, মজুতদার দিলে ভালো হতো না ? দেখ না, কতো যন্ত্রণা, কষ্ট, নিঃসঙ্গতা, ব্যথা সব একটা খাঁচার মধ্যে মজুত করে বসে আছি !”
    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাপানিরা মিয়ানমার আক্রমণ করলে আরও বহু বাঙালি পরিবারের সঙ্গে বিনয় মজুমদারের বাবা বিপিনবিহারি মজুমদার ( বিনয়ের মায়ের নাম বিনোদিনী, ঠাকুরনগরের শিমুলপুর গ্রামে তাঁদের বাড়িটির নাম ‘বিনোদিনী কুঠি’ ) ছয় ছেলে-মেয়ে নিয়ে ফিরে এসে বর্তমান বাংলাদেশে ঢাকা ডিভিশনের গোপালগঞ্জ উপজেলার ( সে সময়ের ফরিদপুর জেলা ) বৌলতলিতে তাঁদের আদি নিবাসে বসবাস আরম্ভ করেন । বিনয়ের ঠাকুর্দার নাম নিমচাঁদ । বিনয়ের বাবা মারা গেছেন ৯৩ বছর বয়সে, ১৯৮৪ সালের ৪ঠা জুলাই । তাঁর ছয় মাস আগে মা মারা যান ।
    বেশির ভাগ বাঙালি যুদ্ধের সময়ে মিয়ানমার থেকে পায়ে হেঁটে বর্তমান বাংলাদেশে ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে পৌঁছে ছিলেন । বিপিনবিহারি মজুমদারও ছেলে-মেয়েদের নিয়ে পায়ে হেঁটে নিজেদের গ্রামে পৌঁছেছিলেন । বাংলাদেশের উপরোক্ত পত্রিকায় সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের বিনয় বলেছিলেন যে, “পাহাড় দিয়ে আমি হেঁটেছি যুদ্ধের সময় । দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ১৯৪২ সালে আমি নাগা খাসিয়া পাহাড়ের ওপর দিয়ে হেঁটে চলে ফিরেছি।” অতো দীর্ঘ পথ সাড়ে সাত বছরের বালকের পক্ষে পায়ে হেঁটে অতিক্রম করা সম্ভব ছিল না । একজন নাগা শ্রমিকের পিঠের ঝুড়িতে বসে বিনয়কে অনেকটা পথ পেরোতে হয়েছিল । তার স্মৃতিতে তিনি এই কবিতাটি লিখেছিলেন :-

    একটি নাগার কথা
    একটি নাগার কথা মনে এল কেন যে হঠাৎ।
    চা বাগানে মহিলারা যেমন ঝুড়িটি পরে, ফিতে
    কপালে ঝুলিয়ে নিয়ে, তেমনি একটি ঝুড়ি পরে
    সেই ঝুড়িটির ‘পরে আমাকে বসিয়ে সেই নাগা
    হেঁটে হেঁটে আসছিল উনিশ’শ বিয়াল্লিশ সালে ।
    তার মানে নাগাটির পিঠে ঝুড়ি, ঝুড়ির উপরে আমি বসা,
    ঝুড়িটি তো ঝুলছিল নাগার
    কপাল থেকে ফিতের সাহায্যে তাই মনে পড়ে গেল ।
    এভাবে আমাকে বয়ে আনছিল উনিশ’শ বিয়াল্লিশ সালে ।
    ( শিমুলপুরে লেখা কবিতা – ২০০৫ )
    বিনয়ের ভাই-বোনদের সম্পর্কে বিশদ তথ্য সংগ্রহ করতে পারিনি, তাঁর এক প্রয়াত অগ্রজ অনিল মজুমদার-এর তথ্য ছাড়া, যিনি মধ্যমগ্রামের হৃদয়পুরে বসবাস করতেন, এবং সম্ভবত মধ্যবয়সে অপ্রকৃতিস্হতায়, অর্থাৎ স্কিৎসোফ্রেনিয়ায়, আক্রান্ত হন । মেজো ভাই সুনীল কোথায় থাকতেন জানি না। দূর সম্পর্কের অথবা পরিচিত এক দিদি হাবড়ায় থাকতেন, এবং বিনয় মজুমদারের মৃত্যুর পর দিদির ছেলে উত্তম বিশ্বাস বিনয় মজুমদারের রচনাগুলো প্রকাশের দিকে খেয়াল রেখেছেন । পারিবারিক তথ্য প্রয়োজন এই জন্য যে মধ্যবয়সে তাঁদের পরিবারে অন্যান্য সদস্য ও আগের প্রজন্মের সদস্যরা অপ্রকৃতিস্হতা্য ভুগেছিলেন কিনা, কেননা আমার এক কাকা এবং মেজ জ্যাঠা মধ্যবয়সে অপ্রকৃতিস্হতায় আক্রান্ত হন, আমার ঠাকুর্দার ছোটো ভাইও মধ্যবয়সে অপ্রকৃতিস্হতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন ।
    অপ্রকৃতিস্হ বলতে আমি পাগল বলছি না, অসংলগ্ন কথাবার্তা বা আচরণের কথা বলছি, স্কিৎসোফ্রেনিয়ার কথা বলছি । মস্তিষ্কের রোগ আর জিনগত রোগের মধ্যে পার্থক্য আছে । জিনগত রোগ সারাবার জন্য জিন এডিটিং অথবা জিন থেরাপি করতে হয়, যা আমাদের দেশে এখনও এসে পৌঁছোয়নি । তা সম্ভব না হলে পরিবারের সদস্যদের মাঝে বসবাস থেরাপির কাজ করে । স্কিৎসোফ্রেনিয়া মূলত একটি জিনগত রোগ, এই জিনগত রোগ হোমো স্যাপিয়েনদের দেহে প্রবেশ করেছিল বহুকাল আগে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে,, যখন তাদের সঙ্গে নেয়ানডারথালদের সম্পর্ক ঘটে । বাংলাভাষায়, আমাদের দুর্ভাগ্য যে অস্বাভাবিক আচরণ দেখলেই তাকে পাগল বা ক্ষ্যাপা বলে চালিয়ে দেয়া হয় । ‘পাগল’ ছাড়া আর কোনো শব্দই নেই ।
    স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত বিদেশি কবি ও শিল্পীদের কথা আমরা জানি, যেমন আঁতোয়াঁ আর্তো, কনস্ট্যানটিন বাতিয়ুশনভ, রিচার্ড ব্রটিগান, ভিক্টর হিউগোর মেয়ে আদেলে হিউগো, ফিনল্যাণ্ডের কবি ইউনো কাইলাস, রাশিয়ার ব্যালে নর্তক ভাসলাভ নিজিন্সকি, লর্ড বায়রন, ডিলান টমাস, পাবলো পিকাসো, নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত গণিতজ্ঞ জন ন্যাশ যাঁর জীবনকাহিনি নিয়ে ‘এ বিউটিফুল মাইন্ড’ নামের একটি ফিল্ম হয়েছিল । আর বলা বাহুল্য ভ্যান গগ । মধ্যবয়স থেকে এই বিকলনের কারণে পিকাসো অতিযৌনতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন ।
    পশ্চিমবাংলায় ঋত্বিক ঘটক, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, রামকিঙ্কর বেইজ মানসিক বিকলনে আক্রান্ত হয়েছিলেন । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও চিকিৎসা করিয়েছেন লুম্বিনি পার্ক মানসিক চিকিৎসালয়ে । তাঁরা স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন না । তারাপীঠের বামাক্ষ্যাপার আচরণকে আমরা মনে করি সাধকের স্বাভাবিক দিনানুদৈনিক ব্যাপার, দাহরত শবের মাংসভক্ষণকে কেউই মস্তিষ্কবিকৃতি বলে মনে করেননি । রামপ্রসাদ সেন গঙ্গায় গলা পর্যন্ত জলে দাঁড়িয়ে শ্যামাসঙ্গীত গাইতেন, হিসেবের খাতায় শ্যামাসঙ্গীত লিখতেন, আমরা কখনও ভাবিনি যে তাঁকে ইলেকট্রিক শক দিতে হবে । তার কারণ প্রাগাধুনিক কালখণ্ডে সাধকদের সেই কাজগুলোকে আমরা স্বাভাবিক মনে করতুম । অঘোরী এবং তান্ত্রিকদেরও বঙ্গসমাজে পাগল বলা হতো না । বিনয় মজুমদারকে বার বার পাগল বলা হয়েছে বলে তিনি অপমানিত, আহত ও বিরক্ত বোধ করতেন ।
    বিনয় মজুমদারদের পারিবারিক পদবি ছিল মৃধা, এবং বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায় তাঁদের গ্রামের বাড়িকে গ্রামবাসীরা মৃধাবাড়ি নামে চিনতো । ব্রিটিশ পি ডাবলিউ ডিতে চাকরি পাবার সময়ে বিনয়ের বাবা মৃধা পদবি ত্যাগ করে নবাবি আমলে পাওয়া মজুমদার পদবি নিয়েছিলেন । অবিভক্ত বাংলায় ফিরে ১৯৪২ সালে বিনয় মজুমদার গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলতলির তারাইল পাঠশালায় ভর্তি হন । ১৯৪৪ সালে ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম হবার পর তাঁকে ভর্তি করা হয় ফরিদপুর হাই ইংলিশ স্কুলে । তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল স্কুলের ম্যাগাজিনে । কিন্তু বৌলতলিতে বেশিদিন বসবাস করা সম্ভব হয়নি । সুরাবর্দির ডায়রেক্ট অ্যাকশান ডের আহ্বানে হিন্দু ও মুসমান সম্প্রদায়ের মাঝে বহুকালের যে সম্পর্ক ছিল তা ভেঙে পড়া আরম্ভ হয়, ক্রমশ বৌলতলিতেও হিন্দুদের ওপর অত্যাচার আরম্ভ হলে অন্যান্য গ্রামবাসীদের সঙ্গে ১৯৪৮ সালে বিপিনবিহারী মজুমদারও ছেলে-মেয়েদের নিয়ে হিন্দু উদ্বাস্তুদের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন, কলকাতার উপকন্ঠে ঠাকুরনগরের শিমুলতলা গ্রামে চাষের জমিজমা কিনে বসবাস আরম্ভ করেন ।
    ভারতে চলে এসে বিপিনবিহারী মজুমদার বুদ্ধিমানের কাজ করেছিলেন । গত বছরে, মানে ২০১৬ সালে, আমরা দেখেছি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নমঃশুদ্র সম্প্রদায়ের পরিবারদের ওপর আক্রমণ হয়েছিল, আর দুর্গাপুজো-কালীপুজোর সময়ে তাঁদের উৎসব ভণ্ডুল করে দিয়ে মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছিল । তা সত্ত্বেও সেখানকার নামকরা কবি-লেখকরা সরকারি খুদকুঁড়ো পাবার আশায় মুখ খোলেননি । দেশভাগের আগে পূর্ববঙ্গের উচ্চবর্গের হিন্দু কমিউনিস্ট নেতারা দেশভাগ সমর্থন করেছিলেন । দেশভাগ হতেই সবচেয়ে আগে পালিয়ে আসেন তাঁরা, সেখানকার নিম্নবর্ণ হিন্দুদের দিশেহারা করে দিয়ে, আর পশ্চিমবঙ্গে এসে সাম্যবাদের নামে গদি দখল করে বসেন । নমঃশুদ্র জনগণকে পূর্ব পাকিস্তানে ধরে রাখার জন্য জিন্নাহ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে মন্ত্রীত্ব দিয়েছিলেন । যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের আশ্বাসে বেশির ভাগ নিম্নবর্ণের পরিবার থেকে গিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে । যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, যিনি নিজেও নমঃশুদ্র ছিলেন, ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত করাচিতে বসবাস করে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের ঘটনা সহ্য করতে না পেরে ভারতে পালিয়ে আসেন, এবং লিয়াকত আলি খানকে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন ।
    বিনয় মজুমদার জন্মেছিলেন মিয়ানমারের মেকটিলা অঞ্চলের তেডো শহরে ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪, অর্থাৎ, দেশভাগজনিত সাম্প্রদায়িক বিভাজনে বৌলতলীর দাঙ্গায় ভিটা ছাড়ার সময়ে তাঁর বয়স ছিল চৌদ্দ বছর । মিয়ানমার ছাড়ার সময়ে তাঁর বয়স ছিল সাড়ে সাত বছর । যুদ্ধ ও দাঙ্গায় আক্রান্ত বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে দেশ থেকে দেশান্তর ও স্হান থেকে স্হানান্তর, এই বিপর্যস্ত জীবন কাটানোর দুঃসহ ঘটনাবলী বিনয় মজুমদারের শৈশব-কৈশোরের চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলে থাকবে । স্কিৎসোফ্রেনিয়ার দুটি উৎসের কথা বলেছেন মনোবিদরা, পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলীর প্রভাবে স্কিৎসিফ্রেনিয়া জিনের প্রাণবন্ত হয়ে ওঠা, এবং বংশপরম্পরায় পাওয়া জিন যা যৌবনে দেখা দেয়। মিয়ানমার থেকে পলায়ন, দেশভাগজনিত দাঙ্গার প্রভাব কিশোর বিনয়ের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করেছিল নিঃসন্দেহে, এবং আমার মনে হয়, বংশের জিনগত প্রভাবও ছিল, কেননা বিনয়ের মৃত্যুর আগের দিন তাঁর মধ্যমগ্রাম নিবাসী দাদা অনিলবরণ মজুমদারকে ‘কবিতীর্থ’ সম্পাদক উৎপল ভট্টাচার্য ফোনে মৃত্যুশয্যায় বিনয়ের শারীরিক অবস্হা জানানো সত্বেও তিনি কোনো আগ্রহ দেখাননি ; বরং বিরক্ত বোধ করেন তাঁকে জানাবার জন্য ।

    তিন
    ১৯৮২ সালে সমর তালুকদারকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় জানিয়েছেন যে, “আমার বাবা ১৯৪৮ সালে এখানে ( শিমুলপুর ) এসে প্রায় এগারো বিঘার মতন জমি কিনে এই ছোট্ট বাড়িটা তেরি করেন । তখন এক বিঘা জমির দাম ছিল পঞ্চাশ টাকা । এখানে ঠাকুরনগর স্টেশানটি হয়েছে প্রাক্তন এম. পি. ঠাকুরবাবুর প্রচেষ্টায় । লোকও বেড়েছে অনেক । স্টেশনের কল্যাণে এখন জমির দাম কুড়ি হাজার টাকা বিঘা । এই তো, সেদিন বাবা দু’বিঘা জমি বিক্রি করে দিলেন ।”
    ১৯৪৯ সালে তাঁকে, বিনয় মজুমদারকে, কলকাতার মেট্রোপলিটান ইন্সটিটিউটের বউবাজার শাখায় ক্লাস নাইনে ভর্তি করা হয়েছিল। ১৯৫১ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে আই এস সি তে ভর্তি হন । সেই ব্যাচের ছাত্রদের মধ্যে গণিতে সর্বোচ্চ নম্বর পান । এর পর বিনয় মজুমদার শিবপুরের বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ১৯৫৭ সালে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিঙে স্নাতক হন, প্রথম শ্রেণিতে প্রথম । ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি । ইঞ্জিনিয়ার হবার পর কিছুকাল চাকরি করেন ইনডিয়ান ইন্সটিউট অফ পাবলিক হেল্হ দপতরে, ইনডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইন্সটিউটে, অধ্যাপনা করেন ত্রিপুরা গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে, এবং ইঞ্জিয়ারের চাকরি করেন দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্টে ।
    কলকাতার সাহিত্যিকদের সঙ্গে যোগাযোগের অভাবের কারণে এবং কবিতা রচনায় একাগ্র হতে চাইছিলেন বলে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে কলকাতা ফিরে আসেন। অবশ্য চাকুরিস্হলে তাঁর সহকর্মীরা তাঁর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন না, সেটাও একটা কারণ । মারুফ হোসেনকে ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকার জন্য দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন, “১৯৫৭ সালে আমি ছাত্রাবস্হায় কিছু যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছিলাম । সে সময়ে আমার সহপাঠী ও শিক্ষকেরা যে ব্যবহার করলেন আমার সঙ্গে তা ভোলবার নয় । তারপর চাকরি করলাম সেখানেও সহকর্মীরা আমার সঙ্গে যা ব্যবহার করলেন চাকরি ছেড়ে দিলাম । তখন মনে হল জীবনে একবার মাছের মতো শ্বাস নিতে জলের ওপরে উঠেছিলাম ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে । ইঞ্জিনিয়ারিঙে রেকর্ডস মার্কস পেয়ে ।”
    তারপর থেকে তিনি নিজের জীবনকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালিত করেছেন, তাঁর কবিতার স্পেকট্রাম বিশাল হয়ে ওঠে, গণিতবিদ রামানুজম এবং সুফি সন্তের চরিত্রের মিশেলে যে ধরণের প্রতিস্ব গড়ে উঠতে পারে, বিনয় পেয়েছিলেন সেরকমই প্রতিস্ব । এই বিশাল পরিধিতে ধরে রাখা জ্ঞান ও কবিত্বের সময়ানুগ বাঁকবদলগুলো তাঁকে বাংলা কবিতার বোধিবৃক্ষ করে তুলেছে । বলা যায় যে জীবনানন্দের পর তিনি বাংলা কবিতার প্রধান বাঁকবদলকারী কবি । বিনয় জীবনানন্দের মতন কবিতার একটি জনারেই আটক থাকেননি । চারটি বিভিন্ন সাব-জনারে ( sub-genre ) কাজ করেছেন, এবং তৃতীয়টি দুঃসাহসিক কাজ, বলা যায় মধ্যবিত্ত ডিসকোর্সকে ফাটিয়ে চৌচির করে দিয়েছেন ‘বাল্মীকির কবিতা’ নামের কাব্যগ্রন্হের সাব-জনারে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ কাব্যগ্রন্হের জনার থেকে বেরিয়ে যেতে চাননি, সারা জীবন তাতেই নিজেকে আটক রেখেছিলেন ।
    বিনয় মজুমদার প্রায় প্রতিটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে তিনি চাকরি ছেড়ে কবিতা লেখা আরম্ভ করেন বন্ধুদের কথায় — শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, জ্যোতির্ময় দত্ত, দীপক মজুমদার, শরৎ মুখোপাধ্যায়, শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখের কথায় । অথচ বিনয় যখন ঠাকুরনগরে নিষ্কপর্দক অবস্হায় জীবন কাটাচ্ছেন তখন তাঁর বন্ধুরা প্রতিষ্ঠিত, এবং ইচ্ছা করলেই বিনয়কে দিয়ে কোথাও অর্থকরী লেখালিখির ব্যবস্হা করে দিতে পারতেন । ২০০১ সালে শামীমুল হক শামীমকে বিনয় বলেছিলেন, “চাকরি না করে আমি ছিলামও বটে । ওরা চাঁদা তোলা শুরু করল বটে এবং দিয়েও ছিল বছরখানেক, বছর দেড়েক । তারপরে কিন্তু চাঁদা দেওয়া বন্ধ করে দিল । আমি অত্যন্ত, অতিশয় কষ্টে, দিন কাটিয়েছি তারপর । ১৯৬৪ সালের পরে ১৯৭০ সালে আমি আমার বাবার কাছে এখানে চলে আসি । ছয় বছর আমি অত্যন্ত টাকার অভাবে ভুগেছি । টাকার অভাব দেখে বাবা আমাকে ১০০ টাকা করে দিত । আমি প্রতি মাসে পয়লা তারিখে শিমুলপুর এসে টাকা নিয়ে চলে যেতাম কলকাতায় । কলকাতায় ঘর ভাড়া করে ছিলাম।”
    বিনয় মজুমদার সম্পর্কে তাঁর সমসাময়িক কবিদের আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গী ‘কবিতীর্থ’ পত্রিকায় প্রকাশিত সমর তালুকদারের ১৯৮২ সালের এই কটি কথা থেকে টের পাওয়া যায়, যা সমরবাবু বিনয়ের সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে লিখেছেন : “কফিহাউসের টেবিলে এক সন্ধ্যায় হঠাৎ হাঁপাতে-হাঁপাতে এসে বসলেন শ্রীঅমিতাভ দাশগুপ্ত, বসেই চিৎকার করে হাসতে শুরু করে দিলেন, সে হাসি থামতেই চায় না — আমরা যারা টেবিলে ছিলাম ভেবে নিলাম বোধহয় ক্লাবে ( খালাসিটোলায় ) প্রচুর হয়েছে । হাসি থামতে বললেন, ‘তোমরা শালারা একেবারেই অপদার্থ। কলকাতায় কী ঘটছে কিছুরই খবর রাখো না ।’ সত্তরের দশক — বড়-বড় চোখ করে ওঁর দিকে চেয়ে থাকলুম দুরুদুরু বুকে — এবার কে গেল ? কোন শ্রেণিশত্রু ! অমিতাভ বললেন, ‘বিনয়দা এ-যাত্রা বেঁচে গেলেন — গোবরা মানসিক হাসপাতালে আছেন — স্নানটা অন্তত করছেন নিয়মিত — খাওয়া দাওয়াও মন্দ করছেন না । বেশিরভাগ একা-একাই থাকেন, আর কী সব নাকি বিড়বিড় করে বলেই চলেন অনবরত । শুনেছি পাশের ঘরে এসে জুটেছিলেন ঋত্বিক ঘটক । বাংলা মদের সাপলাইয়ের কোনও অভাব ছিল না । এ যেন একটা এক্সকারশান । ওখানেই ঋত্বিক শেষ করেছেন তাঁর ‘জ্বালা’ নাটক, অভিনয়ও হয়ে গেছে ওই গোবরাতেই — প্রধান ভূমিকায় বিনয় মজুমদার ।”
    পরে ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন, “আমি সাম্প্রতিক কালের এক কবির সম্পর্কে আস্হা রাখি, যিনি কবিতার জন্য যথার্থ জন্মেছেন । আমার মনে হয় এ-কালে বাংলাদেশে এতোবড় শুভবুদ্ধি সম্পন্ন কবি আর জন্মাননি । তিনি হলেন বিনয় মজুমদার।” প্রৌঢ় বয়সে বিনয়ের স্মৃতি থেকে ঋত্বিক ঘটক মুছে গিয়েছিলেন ; বিনয় বলেছিলেন, ঋত্বিকের সম্পর্কে তাঁর কিছুই মনে নেই ।
    আমরা যারা সেই সময়ের অমিতাভ দাশগুপ্তকে খালাসিটোলায় মাতাল অবস্হায় উল্টোপাল্টা আচরণ করতে দেখেছি, বলতুম যে উনি হলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রতিলিপি । সেই সময়ে কলকাতায় মধ্যবিত্ত কমিউনিস্টদের বাংলা মদ অর্থাৎ শ্রমজীবিদের পানীয় খেয়ে বিশেষ বুদ্ধিজীবি প্রমাণ করার চল ছিল । তাছাড়া বুদ্ধদেব বসু বাঙালি লেখকদের বদলেয়ার, হেনরি মিলার, অ্যালেন গিন্সবার্গ প্রমুখের জীবন ও কাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার পর অনেকেই এই বিদেশি কবি-লেখকদের জীবনকে আত্মস্হ করার প্রয়াস করেছিলেন সেসময়ে, মদের জমঘট এবং যৌনপল্লীতে সমবেত হইচইয়ের মাধ্যমে ।
    বস্তুত বিনয় মজুমদারের ‘ফিরে এসো,চাকা’ ছিল বাংলা কবিতার জগতে, আগেই বলিছি, ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণ; ওই কাব্যগ্রন্হের কবিতাগুলোর পাশে পঞ্চাশ দশকের কবিদের কাজগুলো জোলো হয়ে যাচ্ছিল, একমাত্র শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য’ ছাড়া । শক্তির ছন্দময় অথচ দুর্বোধ্য কবিতার তুলনায় বিনয়ের কবিতা তরুণ কবিদের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল, তার কারণ তাঁর কবিতার ক্ল্যারিটি এবং অসাধারণ রূপকল্প । ফলে বিনয়ের বিরোধিদের সংখ্যা এবং ক্ষতিকারক লবি বেড়ে উঠতে সময় লাগেনি । বিনয়ের কবিতার উচ্ছ্বসিত বিশ্লেষণ করে জ্যোতির্ময় দত্ত ‘দি স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লেখার পর বিরোধিরা আরও বেশি বিনয়-নিন্দা আরম্ভ করে দিয়েছিল । ‘দি স্টেটসম্যান’ সংবাদপত্র সেসময়ে বর্তমানকালের আনন্দবাজারের চেয়ে বেশি নজরকাড়া প্ল্যাটফর্ম ছিল । সমসাময়িকদের কার্যকলাপে বিনয়ের ক্রুদ্ধ ও অপমানিত হওয়া স্বাভাবিক ছিল, বিভিন্ন টেবিলে গিয়ে তিনি গালমন্দ করতেন । একদিন তিনি কফিহাউসের এক বেয়ারার মাথায় লাঠি মারার দরুন বেয়ারাদের অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হন আর কুড়ি দিনের জেল-হাজতবাস করতে হয় । সেসময়ে গুজব ছিল যে তাঁর সমসাময়িক কয়েকজন কবি তাঁকে উসকেছিলেন।
    কলকাতার বিরক্তিকর পরিবেশ থেকে মুক্তি পাবার জন্য বিনয় মজুমদার ১৯৬৬ সালে পায়ে হেঁটে বনগাঁ সীমান্ত পেরিয়ে চলে গেলেন পূর্ব পাকিস্তান, ফরিদপুরের নিজেদের গ্রাম তারাইলে, তখন তাঁর বত্রিশ বছর বয়স । গ্রামে গিয়ে আত্মীয় আর পরিচিত লোকজন পেয়ে গেলেন । সেখানকার যুবকেরা দিব্বি তাঁর আদর আপ্যায়ন করল । ভোরবেলা একজনকে ইংরেজি পড়াতেন, দুপুরবেলায় শেখাতেন অঙ্ক। আর রাত্রিবেলা চার-পাঁচজনকে পড়াতেন — ক খ গ ঘ থেকে শুরু করে ক্লাস নাইনের পড়া পর্যন্ত । বাকি সময়টা আড্ডা মেরে বেড়াতেন । থাকা খাওয়া আর সিগারেটের বিনিময়ে । কলকাতা ছেড়ে সেখানে বেশিদিন থাকতে ভালো লাগলো না । একদিন স্হানীয় থানায় গিয়ে জানালেন যে তিনি অনধিকার প্রবেশকারী ভারতীয় নাগরিক, বিনা পাসপোর্ট-ভিসায় পাকিস্তানে প্রবেশ করেছেন, তাঁকে যেন ভারতে ফিরে যেতে বলা না হয়, যদি দরকার হয়, তিনি মুসলমান হয়ে যেতে রাজি, তিনি মুসলমান হয়েই তাঁর গ্রামে থাকবেন যেখানে তাঁর বাবা-মা জন্মেছিলেন, তাঁকে যেন ভারতে পাঠানো না হয় ।
    বিনয় জানিয়েছেন, “ঢাকা থেকে গোয়েন্দা এলো । আমাকে বলল, কবিতা লেখেন নাকি ? কাগজ দিচ্ছি, লিখুন দেখি কী কবিতা লেখেন । ফোটো তুললো আমার । সামনে, দুই পাশে, চুল দাড়িসহ, চুলদাড়ি কামিয়ে ইত্যাদি নানাভাবে ফোটোতোলা হল।” বিচারাধীন আসামি হিসাবে ছ’মাস জুডিশিয়াল কাস্টডিতে থাকার পর তাঁকে বেকসুর মুক্তি দেয়া হয় । সেই অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে বিনয় বলেছেন, “আমাদের হাজতের চেয়ে ওদের হাজত অনেক ভালো । লোকগুলো ভদ্র, খাওয়াদাওয়া ভালো । সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হলো কী জানো, যত্ন করে বেশ কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে দিলে, সঙ্গে দু’পাশে দু’জন এসকর্ট, যারা আমাকে সীমান্ত অব্দি পৌঁছে দিয়েছিল ।”
    শামীমুল হক শামীম বিনয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, “হঠাৎ মুসলমান হবার আকাঙ্খা জাগল কেন ?” উত্তরে বিনয় বলেছিলেন, “তখন এত কষ্টের ভিতরে চলছিল অবস্হা হিন্দুদের নির্যাতনে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যাওয়ার যোগাড় । তখন আমি পালিয়ে চলে গেলাম ফরিদপুর । বাল্যকালের বন্ধবান্ধবদের সঙ্গে দেখা । আমি বললাম মুসলমান হব । আমাকে তোমরা তোমাদের ধর্মে নিয়ে নাও । তারপর তারা বহু ভেবে বলল — তোমাকে আমরা মুসলমান করব না, তুমি হিন্দুই থাক । তোমাকে আমরা মুসলমান করতে রাজি নই ।”
    পরে, ১৯৯৮ সালে ধর্ম নিয়ে বিনয় মজুমদার এই কবিতাটি লেখেন ( ‘কবিতা বুঝিনি আমি’ কাব্যগ্রন্হের অন্তর্ভূক্ত ।

    এই এক
    এই এক গুপ্ত রোগ পৃথিবীর সবার হয়েছে ।
    যদিও গোপন খুব, তবুও সংবাদপত্রে মাঝে-মাঝে ছাপে —
    এসব রোগের কথা নিক্তি অনুসারে
    ছাপা হয়ে যায় দেখি । আড়াই হাজার বছর
    আগের ডাক্তার বুদ্ধ কিছু কিছু ওষুধ বলেছে–
    সে-সব ওষুধে কিন্তু মায়ামৃত সুফল ফলেনি ।
    আরেক ডাক্তার ছিল হজরত মোহম্মদ, তার
    কথামতো ওঠে বসে রোগীগণ, তবু
    রোগ তো সারে না, আরো বেড়ে যায়, দেখি
    সীমান্তেও গুলিগোলা অল্প স্বল্প বিনিময় হয় ।

    বিনয় মজুমদারের নিজের কলমেই পড়া যাক কবিতার বিশ্বে তাঁর প্রবেশের কথা : “কৈশোর থেকেই আমি কবিতা লিখতে শুরু করি । প্রথম কবিতা যখন লিখি তখন আমার বয়স তেরো বছর । নানা কারণে সেই ঘটনাটা আমার স্পষ্ট মনে আছে । কবিতাটির বিষয়বস্তু ছিল এই : এক পালোয়ান বাজি ধরে একটি চলন্ত মোটরগাড়িকে টেনে পেছিয়ে নিয়ে এলো । এর পরেও আমি মাঝে-মাঝে কবিতা লিখতাম । কিন্তু ষোলো-সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত কী লিখেছিলাম, কবিতাগুলির দশা কী হয়েছিল কিছুই এখন আর মনে নেই । তখন কলকাতার স্কুলে পড়ি । মাস্টারমশাইরা ঘোষণা করলেন যে স্কুলের একটা ম্যাগাজিন বেরোবে । ছাত্রদের কাছে লেখা চাইলেন । আমি একটা কবিতা লিখে ফেললাম ; তার একটা পংক্তি এখনও মনে আছে — ‘ভিজে ভারি হলো বেপথু যুথীর পুষ্পসার’ । মাস্টারমশাইয়ের হাতে নিয়ে দিলাম । তিনি পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন । কিন্তু কী জানি কেন, শেষ পর্যন্ত সে ম্যাগাজিন আর বেরোলো না । এর পরবর্তী সময়কার কবিতা লেখার ব্যাপার একটু বিশদ ভাবেই আমার মনে আছে । স্কুল ছেড়ে কলেজে এসে ভর্তি হলাম এবং আমার কবিতা লেখার পরিমাণও কিছু বাড়লো । আমার একটি খাতা ছিল । ডবল ক্রাউন সাইজের চামড়ায় বাঁধানো, কাগজের রঙ ইঁটের রঙের মতো । খাতাটি খুব মোটা । আমার সব লেখাই এই খাতায় লিখতাম । স্কুলে কবিতা লিখতাম কচিৎ-কদাচিৎ । কিন্তু কলেজে উঠে নিয়মিত লিখতে শুরু করি । লিখতাম বেশ গোপনে-গোপনে, যাতে কেউ টের না পায় । কারণ আমি কবিতা লিখি — একথা কেউ বললে খুব লজ্জা হতো আমার । কলেজের হোস্টেলে থাকতাম । ফলে অন্যান্য আবাসিকরা শীঘ্রই জেনে ফেললো যে আমি কবিতা লিখি । আমার ঘরে দুটি সিট ছিল । আমার রুমমেটই বোধহয় ফাঁস করে দিয়েছিল খবরটা । আমাদের রান্নাঘরের দেওয়ালে একটা নোটিসবোর্ড টাঙানো ছিল । হোস্টেল কর্তৃপক্ষের নোটিসগুলি ঐ বোর্ডে আঠা দিয়ে সেঁটে লাগানো হতো । কিছু দিনের ভেতরেই ঐ নোটিশবোর্ডে আমার লেখা কবিতাও সেঁটে দিতে লাগলাম — সবগুলিরই বিষয়বস্তু হোস্টলের খাবার দাবার সম্বন্ধে ছাত্রদের অভিযোগ । সবই হোস্টেলের সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট সম্পর্কে লেখা ব্যঙ্গ কবিতা । পড়ে ছাত্ররা কিংবা সুপারিনটেনডেন্ট যে প্রশংসা করতো তা নয় । ডালে কেন ডাল প্রায় থাকেই না, কেবল জল, মাংস কেন ঘন ঘন খেতে দেওয়া হয় না — এই সবই ছিল নোটিশবোর্ডে সাঁটা কবিতার বিষয়বস্তু । কলেজে একটা দেওয়াল পত্রিকাও ছিল । খুব সুন্দর হাতের লেখায় শোভিত হয়ে পত্রিকাটি নিয়মিত বেরোতো । আমার লেখা কবিতা কিন্তু কখনও এ-দেওয়াল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি । সেই সময় আমার সব কবিতায় মিল থাকতো । মিলগুলি অনায়াসে মন থেকে বেরিয়ে আসতো । তার জন্য একটুও ভাবতে হতো না । কবিতা যখন লিখতাম তখন মনে হতো আগে থাকতে মুখস্হ করা কবিতা লিখে যাচ্ছি, এতো দ্রুত গতিতে লিখতে পারতাম । এক পয়ার ভিন্ন অন্য সব ছন্দেই লিখতাম । কবিতাগুলোর বিষয়বস্তু ছিল বিচিত্র, প্রায় সবই কাল্পনিক । দু’একটা বিষয়বস্তু অবশ্য আমার এখনও মনে আছে — চিল্কা হ্রদের ধারে এক সঙ্গিনীসহ বসে বসে চারিপাশে নিসর্গকে দেখছি বা এক সঙ্গিনীসহ মোটরগাড়িতে করে খুব দ্রুত বেগে চলেছি, মনে হচ্ছে গাড়িটা পৃথিবীর এক উপগ্রহ বিশেষ বা ট্রেনে করে দৈনিক লক্ষ লক্ষ কেরানি কী ভাবে চাকুরি করতে কলকাতায় আসে ইত্যাদি ইত্যাদি । সেই সময়ে লেখা কবিতাগুলো খুব দীর্ঘ হতো । ছোটো কবিতা আমি প্রায় লিখতে পারতাম না । এবার একটু আগের কথা লিখে নিই । আমি যখন দশম শ্রেণিতে পড়ি, মনে হচ্ছে, তখনই সিগনেট বুক শপ নামক দোকানটি সবে খুললো । তখন দোকানের মালিক দিলীপবাবু নিজেই দোকানে বসে বই বিক্রি করতেন । কী করে যে তাঁর সঙ্গে আলাপ হলো ঠিক মনে নেই । আমি তখন দৈনিকই ঐ দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতাম । বোধ হয় বই কিনতে গিয়েই আলাপটা হয়ে থাকবে । আমি প্রায় দৈনিক একখানা করে কবিতার বই তাঁর কাছ থেকে কিনতাম । রবীন্দ্রোত্তর যুগের বাছা বাছা কবিদের বই অনেক কিনে ফেললাম, পড়েও ফেললাম সব । অথচ কোনো কারণে সেই বইগুলি মনে বিশেষ সাড়া জাগাতো না । বয়স কম বলেই হয়তো অমন হতো । যাই হোক, ইংরেজি ক্লাসিকাল কবিদের বই আমি প্রায়শই লাইব্রেরি থেকে এনে পড়তাম । সেই বয়সে তাদের কবিতা আমার ততো ভালো লাগতো না । আবার মনে হচ্ছে বয়স কম বলে অমন হতো — একথা বোধহয় ঠিক লিখিনি । কারন তখন রবীন্দ্রনাথের কাব্যগুলির মধ্যে আমার ভালো লেগেছিল ‘প্রান্তিক’ নামক ছোটো বইখানি । এখনও আমার ঐ বইখানি সবচেয়ে ভালো লাগে । বয়স বাড়ার ফলে আমার সে অল্প বয়সের ভালো লাগা পাল্টায়নি । যা হোক আমি নিজে কী লিখতাম সেইটেই এ প্রবন্ধের বিষয়বস্তু । বিষয়বস্তু লিখেই মনে পড়লো কবিতা লেখার অন্যতম প্রধান ব্যাপার হচ্ছে একটি ভালো বিষয়বস্তু মনে আসা । তখনকার বিষয়বস্তু ছিল অধিকাংশ কাল্পনিক একথা আগেই লিখেছি । শহরের দৃশ্যাবলী — পথ ঘাট মাঠ বাড়ি — এসকল আমার কবিতার বিষয়বস্তুতে আসতো না । মাঝে-মাঝে গ্রামে আসতাম । গ্রামের দৃশ্যাবলীও আমার বিষয়বস্তু হতো না । অর্থাৎ কেবল বর্ণনামূলক কবিতা আমি সেই বয়সেই লিখতে পারতাম না । এতোদিন পরে এখন কিছু কিছু লিখতে পারি । এ প্রসঙ্গে পরে আবার আসবো । ইতিমধ্যে কলেজ পালটে অন্য এক কলেজে চলে যেতে হলো । সেখানে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশুনা করতে হতো । সেখানে কলেজের পড়াশুনায় এতো বেশি সময় দিতে হতো যে অন্য কোনো বিষয়ে মনোনিবেশ করার সময় পাওয়া যেতো না । ফলে বছর দুয়েক আমার কবিতা লেখা বন্ধ থাকলো । গঙ্গার ধারে কলেজ, পাশেই বোটানিক গার্ডেন । নদীর পাড়ে বিরাট কাঠগোলা । আন্দামান থেকে জলপথে নিয়ে আসা বিশাল বিশাল সব কাঠের গুঁড়িতে নদীর পাড় ঢাকা। সেখান থেকে গঙ্গার দৃশ্য অপূর্ব । কেবল বর্ণনামূলক কবিতা আমি তখনও লিখতে শিখিনি । ফলে সেই কলেজে থাকাটা আমার কাব্যচর্চার ভিতরে বিশেষ স্হান পায়নি । সেই কলেজে ছিলাম চার বছর ছাত্রাবাসে । তার প্রথম দু’বছর কবিতা লেখার সময়ই পাইনি । শেষ দু’বছর কিছু কিছু সময় পেতাম এবং মাঝে মাঝে লিখতাম । কাপড়ে বাঁধানো রয়াল সাইজের একটা প্রকাণ্ড ডায়েরি আমি যোগাড় করেছিলাম। মিল দিতে বিশেষ বেগ পেতে হতো না । মিল যেন আপনিই এসে যেতো । এই কলেজে আসার পর আমি পয়ারে লেখার চেষ্টা করতাম । কিন্তু দুঃখের বিষয় নির্ভুল পয়ার আমি একবারও লিখতে পারতাম না। কোথায় ভুল হচ্ছে সেটি স্পষ্ট টের পেতাম । কিন্তু সে ভুল শোধরাবার উপায় খুঁজে পেতাম না । তখন থেকে শুরু করে চার বছর লেগেছিল আমার পয়ার লেখা শিখতে । এবং ১৯৬০ সালের শুরুতে আমি পয়ার লেখার নিখুঁত পদ্ধতি আবিষ্কার করি । তারপর পয়ার ভিন্ন অন্য কোনো ছন্দে লিখিইনি । এখন পয়ারই আমার প্রিয়তম ছন্দ । শুধু পয়ারেই লিখি । নানা কারণে এখন আমার মনে হয় কেউ নিখুঁত পয়ার লিখতে পারলেই তাকে কবি বলে স্বীকার করা যায়, স্বীকার করা উচিত । যাই হোক, সেই বয়সের কথায় ফিরে যাই। আমাদের কলেজ থেকে ছাত্রদের সম্পাদনায় একটা বার্ষিক সাহিত্য সংকলন বেরোতো । তাতে আমার লেখা কবিতা চেয়ে নিতো । গোটা কয়েক কবিতা ছেপেছিল । এই কলেজে পাঠকালে লেখা কবিতায় কাটাকুটি আবির্ভূত হয় । আগে কাটাকুটি করার বিশেষ দরকার হতো না । এবার দরকার হতে লাগলো । কবিতায় অলঙ্কার বলতে আগে দিতাম শুধু উপমা । এবার কবিতায় উপমার সঙ্গে সঙ্গে প্রতীকও ব্যবহার করতে লাগলাম । সে সময়কার কবিতার খাতাগুলি আমি সব হারিয়ে ফেলেছি । আমার যতোদূর মনে পড়ে ঐ কলেজে চার বছরব্যাপী পড়ার সময়ে আমি গোটা পঞ্চাশ কবিতা লিখেছিলাম । শুধু যে সময়াভাব এর জন্য দায়ী তা নয় । কাব্যিক বিষয়বস্তুর অভাবও এর জন্য দায়ী । অনেক পরে আমি যে কোনো বিষয়বস্তু নিয়ে কবিতা লেখার পদ্ধতি আবিষ্কার করি । অনেক পরে শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমার বইয়ের এক সমালোচনায় লিখেছিলো, আমি যে কোনো বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতে পারি, এমনকি ‘গু-গোবর’ নিয়েও আমি সার্থক কবিতা লিখতে পারি । কিন্তু তখনও অবস্হা অমন হয়নি । সেই কলেজে পাঠকালে ভাবলাম কিছু বিষয়বস্তু কাব্যিক, আর কিছু বিষয়বস্তু কাব্যিক নয় । এখন আমার মনে হয়, ব্যাপারটা তেমন নয় । সব বিষয়বস্তুই কাব্যিক এবং যার দৃষ্টিতে এই কাব্যিকতা ধরা পড়ে, তিনিই কবি । এমনকি চিন্তা করার নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে, যে পদ্ধতিতে ভাবলে কাব্যিকতা বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয় । বিষয়বস্তুর মধ্যে কাব্যিকতা লুকিয়ে থাকে, তাকে বের করার জন্য চিন্তার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে । এসব কথা আমি টের পাই, বুঝতে পারি, ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের গোড়া থেকে । তার আগে জানতাম না । যাই হোক, ১৯৫৭-ও শেষ হলো, আমার কলেজে পড়াও শেষ হলো । পঠদ্দশা শেষ হয়ে গেল । কলেজের ছাত্রাবাস ত্যাগ করে আমি শেষ অবধি কলকাতায় চলে এলাম । এই সময় কুশল মিত্র নামে এক কবির সঙ্গে আমার আলাপ হয় । তার কবিতার বই তখন সবে বেরিয়েছে । যেদিন বেরোলো সেদিন তিনি বললেন, চলুন মিষ্টির দোকানে, আপনাকে মিষ্টি খাওয়াই । এই বইয়ের প্রকাশক দেবকুমার বসুর সঙ্গে আমাকে আলাপ করিয়ে দিলেন । অধুনালুপ্ত ‘গ্রন্হজগৎ’ দোকানটি ছিল দেবকুমার বসুর । আমি মাঝে মাঝে দেবকুমার বসুর দোকানে গিয়ে বসে থাকতাম । আমি স্হির করলাম আমারও একখানি বই প্রকাশ করা দরকার । কলকাতায় তখন নিজেকে একেবারে নবাগতর মতন মনে হতে লাগলো । কফির আসরে, আড্ডাখানাগুলিতে, আমি যেতাম আমার অফিস ছুটি হলে পর । দেখতাম আলোচনার বিষয় সর্বত্রই সাহিত্য এবং রাজনীতি । অথচ বাংলা সাহিত্যের খবর আমি তখন রাখতাম না । রাখার সুযোগই হয়নি ইতিপূর্বে । ফলে আলোচনায় যোগদান করা আমার হতো না । চুপচাপ বসে শুনতাম কে কী বলে । তারপর ভাবলাম আর কিছু না হোক লোকজনের সঙ্গে মেশার জন্যই তখনকার কাব্যসাহিত্য কিছু পড়া ভালো । ফলে কিছু পড়াশুনা শুরু করলাম । এই সময় ‘দিগদর্শন’ নামে একটি পত্রিকার সম্পাদকের সঙ্গে আমার জানাশোনা হয় । তিনি আমার কাছ থেকে কিছু অনুবাদ চেয়ে নিয়ে তাঁর পত্রিকায় প্রকাশ করলেন । আনুবাদগুলি কবিতার নয়, গদ্যের । এই সময়ে মোহিত চট্টোপাধ্যায় ও অমিতাভ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার আলাপ হয় । ওঁরা তখন কবিরূপে অল্পপরিচিত । মোহিতবাবু তখন এম. এ. পড়তেন । আমি তখন সাহিত্য বিষয়ে আলোচনায় মোটামুটি যোগদান করতে শিখছি । আমার কোনো কবিতা আমি কোনো পত্রিকায় পাঠাতাম না । আপন মনে লিখে খাতাতেই রেখে দিতাম । দেবকুমার বসু আমার কবিতার বই প্রকাশ করতে রাজি হলেন । আমি তখন আমার পুরোনো কবিতার খাতা ফের পড়তে লাগলাম । পড়ে মনে হলো, গোটা পঞ্চাশ কবিতার মধ্যে কবিতাপদবাচ্য বলা যায় গোটা পাঁচেককে । মনটা খুব দমে গেলো । তখন নতুন কিছু কবিতা লিখতে গেলাম । সব পয়ারে । বাছাই ইত্যাদি করে অতো ছোটো একখানি পুস্তিকা প্রকাশ করা যায় বলে দেখা গেল । দেবকুমারবাবু অতি সজ্জন । তিনি বললেন, চলুন দেবুদার কাছে, মলাট আঁকিয়ে নিয়ে আসি । চললাম তাঁর সাথে দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে, বেলেঘাটায় । কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মুড়ি খেতে খেতে তিনি একটা ছবি এঁকে দিলেন । অতি সুন্দর হলো দেখতে । বই ছাপা হয়ে বেরোলো । মোট ষাট পাউন্ড অ্যান্টিক কাগজে ছাপা । জানাশোনা লোকেদের কয়েকজনকে দিলাম পড়তে । কিন্তু কেউ আমার কবিতা সম্বন্ধে উচ্চবাচ্য শুরু করলো না, প্রশংসাও করলো না । দেবকুমারবাবু নিশ্চয়ই সাময়িক পত্রিকায় দিয়েছিলেন । কেউ ভালো করে রিভিউ করলো না । সব চুপচাপ, যেন আমার বই প্রকাশিত হয়নি । এ-বইয়ের নাম ‘নক্ষত্রের আলোয়’ । দেবকুমার বাবুর মাধ্যমে আমার বহু তরুণ কবির সঙ্গে আলাপ হয় । তাঁরাও আমার বই সম্পর্কে কোনো আলোচনা করতেন না । তবে এটা ঠিক যে লক্ষ্য করে পড়ে দেখতাম অন্যান্য তরুণ কবির লেখা থেকে আমার কবিতা ভিন্ন প্রকারের, একই রকম নয় । আমার কবিতা বেশ পুরোনো ধাঁচের, সেগুলিকে ঠিক আধুনিক কবিতা বলা চলে না । এই সময় কবি বিষ্ণু দের সঙ্গে আমার আলাপ হয় । কী করে হয়েছিল এখন আর তা মনে নেই । মোট কথা মাঝে মাঝে সন্ধ্যার সময়ে তাঁর বাড়িতে যেতাম । কোনো কোনো দিন কবিতার খাতা নিয়ে যেতাম । তিনি খাতা পড়ার জন্য রেখে দিতেন । তৎকালে ‘সাহিত্যপত্র’ নামে একটি পত্রিকা বেরোতো বিষ্ণুবাবুর তত্বাবধানে । ঐ ‘সাহিত্যপত্রে’ আমার একটি কি দুটি কবিতা তিনি ছেপে দিয়েছিলেন । ‘নক্ষত্রের আলোয়’ বইখানা পাঠক-সমালোচক মহলে সমাদৃত না হওয়ায় আমি খুব ভাবিত হয়ে পড়লাম । অন্যান্য তরুণ কবির ঢঙে লেখা তো আর চাইলেই হয়ে ওঠে না । ফলে এরূপ চিন্তা আমি করতাম না । কলকাতার কোনো লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে যোগাযোগ তো দূরের কথা, জানাশোনাই ছিল না । আমার বয়স তখন তেইশ-চব্বিশ । ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ । এসময়ে লেখা আমার কবিতা বর্জন করে মন খুব বিষময় । এই ভেবে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ চলে গেলো । ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দটি চাকুরি না করে শুয়ে শুয়েই কাটিয়ে দিলাম । এই সময় প্রচুর বিদেশি সাহিত্য পাঠ করি । ধীরে ধীরে আমার মনে কবিতা রচনার একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি আবির্ভূত হয় । এই ১৯৫৯ সালে আমায় বেশ কিছু অনুবাদ করতে হয় । পাইকপাড়া থেকে ‘বক্তব্য’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হতো । সম্পাদক ছিলেন বিমান সিংহ । আমি থাকতাম গ্রামে ; আমার গ্রামের ঠিকানায় তিনি প্রায়ই চিঠি দিতেন অনুবাদ কবিতা প্রার্থনা করে । আমি অনুবাদ করে পাঠাতাম এটা ঠিক । কিন্তু তিনি আমার নিজের লেখা কবিতা কেন চান না — এ ক্ষোভ আমার মনে মনে থাকতো । কিছু বিরক্তও বোধ করতাম । আমি যে কবিতা লিখি সে কথা সম্পাদক জানতেন, ‘নক্ষত্রের আলোয়’ তিনি পড়েছিলেন । তবু কখনো আমার নিজের লেখা কবিতা চাইতেন না । এরপর ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের একেবারে গোড়ার দিকে আমি স্হির করলাম সর্বান্তঃকরণে কবিতাই লিখি । চাকুরি আপাতত থাক । গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় চলে এলাম । সকালে জাগরণ থেকে শয়ন পর্যন্ত সারাক্ষণ কবিতাই ভাবতাম । আশেপাশে শহরের যে দৃশ্যাবলী দেখতাম তার কোনো কিছু কাব্যিক মনে হলে তখনি নোটবুকে টুকে রাখতাম । ছোটো আকারের কবিতার নোটবই সর্বদাই প্যাণ্টের পকেটে রাখতাম । সৃষ্টির মূল যে সূত্রগুলি তা জড়ের মধ্যে প্রকাশিত, উদ্ভিদের মধ্যে প্রকাশিত, মানুষের মধ্যেও প্রকাশিত । এদের ভেতরে সূত্রগুলি পৃথক নয়, একই সূত্র তিনের ভেতর বিদ্যমান । এই সার সত্য সম্বল করে ভেবে দেখলাম জড়ের জীবনে যা সত্য , মানুষের জীবনেও তা-ই সত্য, উদ্ভিদের জীবনে যা সত্য মানুষের জীবনেও তা-ই সত্য । অতএব জড় ও উদ্ভিদের জীবন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করতে লাগলাম আমি । এবং তাদের জীবনের ঘটনাকে মানুষের জীবনের ঘটনা বলেই চালাতে লাগলাম । এইভাবে শুরু হলো কবিতার জগতে আমার পথযাত্রা, আমার নিজস্বতা । এইভাবে সৃষ্টি হলো ‘গায়ত্রীকে’, ‘ফিরে এসো, চাকা’ ।”

    ঠিক কী যে বিনয়কে উদ্বেলিত করেছিল, ১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে অসাধারণ প্রেমের কবিতাগুলো লিখতে, তা রহস্যই থেকে গেছে । শিবপুরের ছাত্রজীবন থেকে কলকাতায় ফিরে, কফিহাউসে যাতায়াত করে, প্রেসিডেন্সির করিডরগুলোয় ঘুরে, গায়ত্রী চক্রবর্তী নামের সেই কিশোরীটির স্মৃতিই কী ? স্মৃতির গোপন ঘায়ের রক্ত আবার যদি না বেরোতো তাহলে এই তিন বছরের কবিতাগুলো লেখা সম্ভব হতো না বলেই মনে হয় । এমনও হয়েছে যে একই দিনে তিনি দু’তিনটি কবিতা লিখেছেন ; রাতে তাঁর ঘুম হয় না, যৌবনের স্বাভাবিক কুসুম-কুসুম জ্বরে তপ্ত হয়ে ওঠেন, যার দরুন রস এসে চাপ দিতে থাকে, ছন্দিত ঘর্ষণে উত্তেজনা চরমে ওঠে, তারপর রসপাত হলে শান্তি হয় । বিনয়ের সঙ্গে জীবনানন্দের এখানে পার্থক্য এই যে, জীবনানন্দ ‘যোনি’ শব্দটি বহুবার প্রয়োগ করলেও, ব্রাহ্মধর্মের বেড়াজাল তাঁকে যুবকের যৌন উত্তেজনার যন্ত্রণা সম্পর্কে এরকম খোলাখুলি লিখতে দিতো না ।

    ২২ জুন ১৯৬২ তারিখে বিনয় মজুমদার এই কবিতাটি লিখেছিলেন :-

    যাক তবে জ্বলে যাক, জলস্তম্ভ, ছেঁড়া ঘা হৃদয় ।
    সব শান্তি দূরে থাক, সব তৃপ্তি, সব ভুলে যাই ।
    শুধু তার যন্ত্রণায় ডুবে থাক হৃদয় শরীর ।
    তার তরণির মতো দীর্ঘচোখে ছিল সাগরের
    গভীর আহ্বান, ছায়া, মেঘ, ঝঞ্ঝা, আকাশ বাতাস ।
    কাঁটার আঘাতদায়ী কুসুমের স্মৃতির মতন
    দীর্ঘস্হায়ী তার চিন্তা — প্রথম মিলনকালে ছেঁড়া
    ত্বকের জ্বালার মতো গোপন, মধুর এ-বেদনা ।
    যাক সব জ্বলে যাক, জলস্তম্ভ, ছেঁড়া ঘা হৃদয় ।

    ২৯ জুন ১৯৬২ তারিখে লিখেছিলেন এই কবিতাটি

    তুমি যেন ফিরে এসে পুনরায় কুন্ঠিত শিশুকে
    করাঘাত করে-করে ঘুম পাড়াবার সাধ করে
    আড়ালে যেও না ; আমি এতদিনে চিনেছি কেবল
    অপার ক্ষমতাময়ী হাত দুটি ; ক্ষিপ্র হাত দুটি…
    ক্ষণিক নিস্তারলাভে একা-একা ব্যর্থ বারিপাত ।
    কবিতা সমাপ্ত হতে দেবে না কি ? সার্থক চক্রের
    আশায় শেষের পংক্তি ভেবে-ভেবে নিদ্রা চলে গেছে।
    কেবল কবোষ্ণ চিন্তা, রস এসে চাপ দিতে থাকে ।
    তারা যেন কুসুমের অভ্যন্তরে মধুর ঈর্ষিত
    স্হান চায়, মালিকায় গাঁথা হয়ে ঘ্রাণ দিতে চায় ।
    কবিতা সমাপ্ত হতে দাও নারী, ক্রমে…ক্রমাগত
    ছন্দিত ঘর্ষণে, দ্যাখ, উত্তেজনা শীর্ষ লাভ করে
    আমাদের চিন্তাপাত, রসপাত ঘটে, শান্তি নামে ।
    আড়ালে যেও না যেন, ঘুম পাড়াবার সাধ করে ।

    চার
    বিনয় মজুমদার স্বীকার করেছেন যে তিনি কাল্পনিক বিষয় নিয়ে লেখেন না, তাঁর বিষয়বস্তু বাস্তবজগত থেকে সংগ্রহ করা । সুতরাং অনুমান করা যেতেই পারে যে ‘গায়ত্রী’ বাস্তব জগতেরই কেউ একজন ; বনলতা সেন, নীরা বা সুপর্ণার মতো কাল্পনিক নন । এখানে উল্লেখ্য যে জীবনানন্দ দাশ এবং ভাস্কর চক্রবর্তী স্ত্রীর সঙ্গে স্বাভাবিক মধ্যবিত্তের মতন দাম্পত্য সম্পর্কে গড়ে তুলতে পারেননি, যেকারণে তাঁরা কাল্পনিক প্রেমিকা তৈরি করে নিয়েছিলেন । ‘গায়ত্রীকে, বা ‘ফিরে এসো, চাকার’ পরে বিনয় মজুমদারের বড়ো কাজ ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ । এই বইটি সম্পর্কেও তাঁর কলমেই পড়ি তিনি কী বলছেন:
    “এ পর্যন্ত আমি কোনোদিন নিসর্গমূলক কবিতা লিখিনি । অধিকাংশই ঘটনার বিবৃতি লিখেছি । অতঃপর আমায় কলকাতার শহরতলিতে থাকতে হয়, যাকে প্রায় গ্রাম বলা যায় । চারিদিকে নানা গাছপালা লতাপাতা ছিলো, ছোট বড়ো পুকুর ছিল । ভাবলাম প্রকৃতির বর্ণনা লেখা যাক । এক মাসের ভেতর খুব দীর্ঘ ছয়টি কবিতা লিখলাম । হিসাব করে দেখলাম, বই আকারে ছাপলে এই ছয়টি কবিতা ৪৮ পৃষ্ঠার বেশি জায়গা নেবে । ফলে আর বেশি লিখলাম না । বইয়ের নাম দিলাম ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ এবং কবিতাগুলির কোনো নাম না দিয়ে সংখ্যাচিহ্ণ দিয়ে চিহ্ণিত করলাম — ১, ২, ৩, ৪, ৫ এবং ৬ । একবার ভাবলাম কায়দা করে ছ’টি কবিতাকে জোড়া লাগিয়ে একটা কবিতা করি, ৪৮ পৃষ্ঠার লম্বা একটা কবিতা । কিন্তু এতো দীর্ঘ কবিতা পত্রিকায় ছাপা অসম্ভব হবে ভেবে শেষ পর্যন্ত আলাদা আলাদা ছ’টি কবিতাই রাখলাম । এর প্রথম কবিতাটি ছাপতে নিলেন ‘অনুভব’ পত্রিকার সম্পাদক গৌরাঙ্গ ভৌমিক, দ্বিতীয় কবিতাটি নিলেন ‘এক্ষণ’ পত্রিকার সম্পাদক নির্মাল্য আচার্য, তৃতীয় কবিতাটির কী হয়েছিল তা গোপন রাখতে চাই, চতুর্থ ও পঞ্চম কবিতা দুটি ছাপতে নিলেন ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার সম্পাদক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং ষষ্ঠ কবিতাটি ছাপতে নিলেন ‘দৈনিক কবিতা’ পত্রিকার সম্পাদক বিমল রায়চৌধুরী । সকলেই যথা সময়ে ছেপে বার করলেন । পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ বইখানা আমি ছেপে বের করব, কবিতার সঙ্গে ইলাসট্রেশন দেবো । অমিতাভ দাশগুপ্ত বললো, তোর ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’র সমালোচনা লিখব, বই হয়ে বেরোবার আগেই । কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা গেলো তাদের কথা প্রশংসাবাক্য মাত্র। ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’র তৃতীয় কবিতাটি ছাপা হয়েছে জ্যোতির্ময় দত্ত সম্পাদিত ‘কলকাতা’ পত্রিকায় — ১৯৭০ সালে । এই একই প্রকার কবিতা আমি আরো লিখে যেতে পারতাম । কিন্তু পড়তে একঘেয়ে হয়ে যাবে ভেবে লিখিনি । এর পরে আমার কবিতা লেখার গতি খুব মন্দ হয়ে আসে ।”
    একজন কবি যদি আখের গোছাবার ধান্দায় থাকতেন তাহলে তিনি পরের পর ‘ফিরে এসো, চাকা’র মতোই কবিতা লিখে যেতেন, যা বিনয়ের পক্ষে সেই সময়ে সহজও ছিল, কেননা তিনি অমন কবিতা লেখার পদ্ধতি ও ছন্দ রপ্ত করে ফেলেছিলেন । কিন্তু সেই পথ ছেড়ে বিনয় লিখলেন আদিরসাত্মক কবিতা । র‌্যাবেলের ‘গার্গাঁতুয়া পাঁতাগ্রুয়েল’ আলোচনাকালে বাখতিন বলেছেন, লেখক যদি বেপরোয়া না হন তাহলে তাঁর পক্ষে কার্নিভালেস্ক রচনা সম্ভব নয় । বিনয় প্রচলিত গণ্ডি কেটে বেরিয়ে গেলেন এবং লিখলেন ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’, তারপর ‘বাল্মীকির কবিতায়’ ভুট্টা সিরিজ ও ডালাসারির কবিতাগুচ্ছ, এবং হাসপাতাল ও গ্রামজীবনের দিনপঞ্জিমূলক কবিতা , অর্থাৎ বিদ্যায়তনিক সাহিত্যের ক্যাননের তিনি ধার ধারলেন না, বলা যায় সপাটে চড় কষালেন সাহিত্যিক মূল্যবোধের মালিকদের গালে । গণ্ডিকেটে বেরোনোর সঙ্গে বিনয়ের স্কিৎসোফ্রেনিয়ার সম্পর্ক খোঁজা ভুল হবে কেননা র‌্যাবেল-এর এবং ডন কিয়োটের লেখক সেরভানথেসের স্কিৎসোফ্রেনিয়া ছিল না।
    নিজের জীবনকে কবিতার জগতে এমনভাবে নিয়ে গেলেন বিনয় যে আর সবাইকে শুনিয়ে বলার দরকার হলো না যে শুধু কবিতার জন্য তিনি অমরত্বের তোয়াক্কা করেননি, এবং সত্যই তাই, তিনি কারোর তোয়াক্কা করেননি, আর এই ধরণের কবিতাও তাঁকে লিখে যেতে হয়নি যা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘শুধু কবিতার জন্য’ রচনায় লিখলেন :-

    শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম শুধু কবিতার
    জন্য কিছে খেলা, শুধু কবিতার জন্য একা হিম সন্ধ্যাবেলা
    ভূবন পেরিয়ে আসা, শুধু কবিতার জন্য
    অপলক মুখশ্রীর শান্তি এক ঝলক ;
    শুধু কবিতার জন্য নারী, শুধু
    কবিতার জন্য এত রক্তপাত মেঘে গাঙ্গেয় প্রপাত
    শুধু কবিতার জন্য, আজো দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকতে লোভ হয় ।
    মানুষের মতো ক্ষোভময়, শুধু কবিতার
    জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি ।

    বিনয় মজুমদার যখন ২০০৩ সালে বাঙ্গুর সাইকিয়াট্রি ইন্সটিউটে চিকিৎসাধীন তখন তাঁর প্রয়াত মা ও বাবার সম্পর্কে মনকেমনকে কেন্দ্র করে দুটি কবিতা লিখেছিলেন, পড়লে টের পাওয়া যাবে তাঁর চিন্তাধারা কোন পথে চালিত হচ্ছিল সেসময়ে :

    মায়ের
    মায়ের ইনসোফেগাস ক্যানসার হয়েছিল
    কোনো কিছু গিলে খেতে পারত না, জল
    খেতে পারত না ।
    পীযুষ ডাক্তার
    গ্লুকোজ ইনজেকশান দিত দুই হাতে ।
    তাতে আর কী বা হয়, না খেয়ে পনেরোদিন থেকে
    মা-ও মারা গেল ।
    মরবার আগে একবার
    আমার বাবাকে মা তো কুকুর বলেছে ।
    মরবার আগে মা আমার
    বাড়ির চাকরটির পা-ও ধরেছিল ।
    এর নাম মৃত্যু মহাশয় ।

    নিজের মাকে নিয়ে এই ধরণের কবিতা বিনয়ের আগে আমরা আর কোনো কবিকে লিখতে দেখিনি । সকলেই মাকে নিয়ে যেসব কবিতা এযাবৎ লিখেছেন সেগুলো নাটুকে ও কৃত্রিম বলে মনে হয় । এবার পড়া যাক বাবাকে নিয়ে লেখা কবিতা :

    যখন আমার বাবা
    যখন আমার বাবা খুব বুড়ো হয়েছিল
    বয়স তিরানব্বই বৎসর হয়েছিল তখন তো বাবা
    বিছানায় বসতেই পারত না, শুয়েই থাকত ।
    বুড়ো হলে এই হয়, আমারো তো হবে ।
    বড় ভগ্নীপতি এসে হাবড়ায় নিয়ে
    বাবার পেটটি কেটে এনেছিল, পরে
    একটানা এগারোটি দিনব্যাপী রক্ত পড়েছিল
    কাটা পেট থেকে ।
    তারপরে বাবা মারা গেল ।
    বাবার তো আত্মা নেই পূনর্জন্ম নেই ।
    বাবাকে পোড়ালে পরে বাবার ছাই তো আছে, এই
    ছাই ভাবে পৃথিবীর মাটির সহিত ।

    বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বের জন্য বিনয় মজুমদার জার্মানিতে গণিত অধ্যাপকের চাকরি পেয়েও জাননি । ১৯৯৮ সালে ‘অধরা মাধুরী’ পত্রিকার জন্য বোধিসত্ব রায়কে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় জানিয়েছিলেন, “ বার্লিনে নেমন্তন্ন করেছিল আলেকজান্ডার ডি ভার্স্ট বলে একজন ভদ্রলোক । তিনি ছিলেন গণিতের অধ্যাপক । আমি তাঁকে দরখাস্ত দিই, আমি চাকরি করতে চাই জার্মানিতে । আমি তাঁকে আমার গণিতের গোটা কয়েক খাতা পাঠিয়েছিলাম । সেইগুলি পড়ে উনি আমাকে নিমন্ত্রণ করলেন । বললেন, তুমি এসো, আমাদের বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্ক কষাবে । তোমাকে মাইনে দেয়া হবে ইউ. এস. এ.’র স্কেলে । তখন আমি বাবাকে বললাম, আমাকে দেখছি জার্মানিতে ডেকেছে ! অঙ্ক কষাতে হবে এম. এস. সি ক্লাসে, জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে । বাবা বললেন, দ্যাখ, আমরা বুড়ো হয়ে গেছি । আমার বয়স আশি-পঁচাশি বছর । তোর মায়ের বয়সও ওইরকম । আমাদের বাড়িতে দেখাশুনা করার মতো কেউ নেই । তুই-ও একা আছিস। তুই আর যাসনে কোথাও । আমাদের দেখাশোনা কর । সুতরাং আমি আর জার্মানিতে যেতে পারিনি।”
    দার্শনিক-তাত্বিক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, যাঁকে নিয়ে’ গায়ত্রীকে’ ( পরিবর্তিত নাম’ ‘ঈশ্বরীকে’ এবং আরেকবার পরিবর্তিত নাম ‘ফিরে এসো, চাকা ) বইয়ের কবিতাগুলো বিনয় মজুমদার লিখেছেন , এবং বিনয় নিজেও তা প্রথম দিকে স্বীকার করেছিলেন, এবং জীবনের মধ্যভাগে তা স্বীকার-অস্বীকারের দোনামনায় ভোগা আরম্ভ করেন, তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক হন ১৯৫৯ সালে ।
    গায়ত্রী চক্রবর্তীর বাবার বাড়িতে বিনয় গিয়েছেন কয়েকবার তা তিনি ২০০১ সালে ‘লোক’ পত্রিকার সম্পাদক শামীমুল হক শামীম-এর কাছে স্বীকার করেছেন, এবং কিশোরী গায়ত্রীর প্রতি তিনি টান অনুভব করতে থাকেন, সেই টান তিনি আজীবন বয়েছেন, একতরফা প্রেমের টান, নিজের মনের কথা উচ্চবর্ণের ধনী পরিবারের স্মার্ট কনভেন্টে-পড়া ইংরেজি-বলিয়ে কিশোরীটিকে বলে উঠতে পারেননি । তাঁর অবস্হান থেকে তা বলা বিপজ্জনক ছিল ।
    শামীমুল হক শামীম প্রশ্ন করেছিলেন, “ফিরে এসো, চাকা’ যাঁকে উৎসর্গ করেছেন সেই গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক সম্পর্কে কিছু বলবেন কি ?”
    বিনয় মজুমদার উত্তরে বলেছিলেন, আমি যখন ইডেন হিন্দু হোস্টেলে ছিলাম তখন গায়ত্রীর বাবা ছিলেন সুপারিনটেনডেন্ট, জনার্দন চক্রবর্তী, দাদার নাম প্রসূন চক্রবর্তী । তখন ওর বয়স বারো । তখন থেকে দেখেছি । পুরোহিতের মেয়ে তো । বেশি কথাবার্তা হয়নি । আলাপ-আলোচনা হতো — কবিতা নিয়ে। ‘কবিতা লিখেছি কবে, দুজনে চকিত চেতনায়’ — এবার বুঝলে তো ! তারপর ভালো ছাত্রী হওয়ার ফলে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে ২৩ বছর বয়সে আমেরিকায় চলে গেল। আমি তিনটি বই তাকে উৎসর্গ করেছি।”
    গায়ত্রী স্মার্ট তন্বী ছিলেন, আকর্ষনীয়া, প্রতিভাময়ী, কিন্তু সুন্দরী বলতে যা বোঝায়, তাঁর যৌবনের ছবি দেখে তা মনে হয় না । মিষ্টি মেয়ে বলতে যা বোঝায়, তাই ছিলেন তিনি । কিন্তু তরুণ বিনয়ের অস্তিত্বে তিনি প্রগাঢ় ছাপ ফেলতে পেরেছিলেন, “কী উৎফুল্ল আশা নিয়ে” কবিতাটি পড়লে তার আঁচ পাওয়া যায় :

    কী উৎফুল্ল আশা নিয়ে সকালে জেগেছি সবিনয়ে ।
    কৌটার মাংসের মতো সুরক্ষিত তোমার প্রতিভা
    উদ্ভাসিত করেছিল ভবিষ্যৎ দিকচক্রবাল ।
    সময়ে ভেবেছিলাম সন্মিলিত চায়ের ভাবনা,
    বায়ুসেবনের কথা, চিরন্তন শিখরের বায়ু ।
    দৃষ্টিবিভ্রমের মতো কাল্পনিক বলে মনে হয়,
    তোমাকে অস্তিত্বহীনা, অথবা হয়তো লুপ্ত, মৃত ।
    অথবা করেছ ত্যাগ, অবৈধ পুত্রের মতো, পথে ।
    জীবনের কথা ভাবি, ক্ষত সেরে গেলে পরে ত্বকে
    পুনরায় কেশোদ্গম হবে না ; বিমর্ষ ভাবনায়
    রাত্রির মাছির মতো শান্ত হয়ে রয়েছে বেদনা–
    হাসপাতালের থেকে ফেরার সময়কার মনে ।
    মাঝে মাঝে অগোচরে বালকের ঘুমের ভিতরে
    প্রস্রাব করার মতো অস্হানে বেদনা ঝরে যাবে ।

    পাঁচ

    অরুণেশ ঘোষ ‘গায়ত্রীকে’ বা ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্হে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের প্রতি বিনয়ের আকর্ষণ স্বীকার করেননি । অরুণেশ লিখেছিলেন, “এমন একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বিনয় পাগল হয়ে গেছে আর সেই উন্মত্ত অবস্হার মধ্যে লেখা হয়েছে ‘ফিরে এসো, চাকা’র কবিতাগুচ্ছ । আরও গুজব ছিল, এমন একটি অভিজাত, উঁচু বংশীয় আর সুন্দরী মেয়েকে সে দূর থেকে ভালবাসত — সে ঘূনাক্ষরেও নাকি ধারণা করতে পারেনি, কোনো উন্মাদপ্রায় কবি তাকে ভালবেসে লিখে ফেলেছে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবিতাবলি । এই গুজবের রেশ এখনও রয়ে গেছে।”
    আসলে গায়ত্রী সম্পর্কে ক্রাশ এবং স্কিৎসোফ্রেনিয়া যে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ব্যাপার তা ধরতে পারেননি অরুণেশ । বোধিবৃক্ষের তলায় গৌতমবুদ্ধ উলঙ্গ হয়ে বসেছিলেন আমৃত্যু, কিন্তু তার জন্য তাঁকে তাঁর শিষ্যরা পাগল তকমা দেননি । একজন ভিখারিনিকে নিজের কাপড় খুলে দিয়ে উলঙ্গ হেঁটেছিলেন শিষ্যদের সঙ্গে, তার জন্য তাঁকে পাগল বলা হয়নি । সম্প্রতি হরিয়ানা বিধানসভায় জনৈক উলঙ্গ দিগম্বর জৈন সন্ন্যাসী বক্তৃতা দিয়েছিলেন ; তাঁকে কেউ পাগল বলেননি। মহাবীরও উলঙ্গ বসে সাধনা করেছিলেন, শিষ্যদের বাণী শুনিয়েছেন, তার জন্য কেউ তাঁকে সমাজবহির্ভূত উন্মাদ মনে করেনি । কবিদের বোধিপ্রাপ্তির পথে যাত্রাকে তাহলে কেন পাগলামি ইত্যাদি বলা হবে ! এই বিপর্যয় এনেছে আধুনিকতাবাদী শিক্ষা, ইউরোপের সংস্কৃতি । ব্রিটিশরা আসার আগে ভারতবর্ষে পাগলাগারদ বলে কিছু ছিল না।
    গণিতের অধ্যাপক নারায়ণচন্দ্র ঘোষও মনে করেন যে গায়ত্রী চক্রবর্তীকে নিয়ে অহেতুক মিথ সৃষ্টি করার চেষ্টা হয়েছে। ‘গায়ত্রীকে’ নামকরণ তিনি সম্পৃক্ত করেছেন হিন্দু ধর্মের গায়ত্রীমন্ত্রের সঙ্গে, যে মন্ত্রটি দ্বারা উপনয়নের সময়ে সদ্যব্রাহ্মণকে দীক্ষিত করা হয় । তিনি ‘সৃষ্টিসন্ধান’ ওয়েব-পত্রিকায় লিখেছেন যে, “বিনয় মজুমদারের ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্হটি বিভিন্ন নামে প্রকাশিত হয়েছে । ১৯৬১ সালে চোদ্দটি কবিতা নিয়ে বিনয়ের ‘গায়ত্রীকে’ নামের কবিতার বই প্রকাশিত হয় । চোদ্দর সঙ্গে আরও তেষট্টিটি কবিতা যোগ করে ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় ‘ফিরে এসো.চাকা’ কাব্যগ্রন্হ। ‘ফিরে এসো, চাকা’ নাম পালটিয়ে একই কবিতাগুচ্ছ নিয়ে ১৯৬৪ সালে নতুন নামে প্রকাশিত হয় ‘আমার ঈশ্বরীকে’ । নামকরণের কারণেই গায়ত্রী চক্রবর্তী-চাকা-ঈশ্বরী সম্পৃক্ত হয়ে এক মিথের জন্ম দিয়েছিল এবং গাণিতিক চেতনার কবির বিশ্লেষণাত্মক ছন্দময় কাব্যপ্রবাহকে ‘হতাশাজনিত মস্তিষ্কবিকৃতি’, ‘ব্যর্থ প্রেমিকের পাগলের প্রলাপ’ প্রভৃতি উক্তি দ্বারা অভিহিত করে কবি বিনয় মজুমদারের কাব্যভাবনার মূলকে সৃষ্টির আড়ালে রাখার সচেতন বা হেঁয়ালি প্রয়াস দেখা যায় । অনেক সময়ে মিথ যেন সত্য মনে হয়:
    ‘কী রহস্য যেন সর্বদা আমাকে ঘিরে রাখে’
    ‘রহস্য’ কবিতার এই পংক্তিটি যেন কবি বিনয় মজুমদারের নিজের জীবনযাপন, কাব্যকৃতি, প্রেম-বাসনা, বিষাদ-আনন্দের অনুরণন । তাঁর কবিতায় জননপ্রক্রিয়া, পদার্থবিদ্যা, বীজগণিত, কফিহাউস, পড়শি রঞ্জিত, পীযুষ ডাক্তার, কৃত্তিবাস, হাংরি আন্দোলন, বাবলা গাছ, লাঙল, হারাধন, বুচি, জীবনানন্দ, বাবা, মা, মানসিক হাসপাতাল, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, মঘা তারা, রেবতী, কৃত্তিকা, ছন্দভাবনা, সমাজভাবনা, সরস্বতীপুজো, সব একাকার হয়ে গেছে । সেখানে কোনো কাব্যের নামকরণ বা কাব্যভাবনাকে বিশেষ কৌণিক বিন্দু থেকে মূল্যায়ন করলে মিথ আরও মিথের জন্ম দেবে । বিনয় রহস্য উন্মোচনে তাই বড়ো বেশি সাবধানী হওয়া বোধহয় শ্রেয় :
    ‘তাকাই সামনে সোজাসুজি
    ব্যাকুল আশায় তাকে খুঁজি’
    যিনি ব্যাকুল আশায় তাঁকে খোঁজার প্রয়াস চালিয়েছেন সম্ভবত সেই বিনয় মজুমদারকে খুঁজতে দুচোখ ধারালো করা প্রয়োজন এবং এ-কাজে কোনো মিথর শিকার না হয়ে মনে রাখা দরকার : সংযম কবিদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, এক দুরূহ তপস্যার মতো । কেননা বিনয় মজুমদারের কথায় :
    ‘নিষ্পেষণে ক্রমে-ক্রমে অঙ্গারের মতন সংযমে
    হীরকের জন্ম হয়, দ্যুতিময়, আত্মসমাহিত’
    এ তো বিনয়ই শিখিয়েছেন । তাই মিথ নয়, যুক্তসমীকরণে বিনয়-প্রতিভার সন্ধান চালানো ভালো :

    যে কোনো গণিতসূত্র নিয়ে তার পরবর্তীদের
    বাঁপাশে আনার পরে সে সমীকরণে
    সমান চিহ্ণের পরে — ডানপাশে শূন্য হয়ে যায় ।
    এইভাবে কতিপয় যত খুশি সূত্র নিয়ে এগুলির বামপার্শ্বগুলি
    গুণ করে শুধুমাত্র একটি সমীকরণ সহজেই পাই
    এবং ডানপার্শ্বে শূন্য শূন্যের সমান
    সদ্য উল্লিখিত এই একটি সমীকরণ জ্যামিতিতে রূপায়িত হলে
    অনেক পৃথকরূপ পৃথক পৃথক চিত্র পাওয়া যায় সর্বদাই পাই ।
    মূল সমীকরণের — আলাদা আলাদা সব সমীকরণের
    আলাদা সকল চিত্র একীভূত সমীকরণের
    জ্যামিতিক রূপায়ণে তার মানে পাওয়া যায় অনেক সূত্রকে
    একীভূত করা যায় কেবল একটিমাত্র করে ফেলা যায় ।
    তাতে আমাদের কিছু লাভ হয় এখানে আমার বৌ রাধা
    এই লিখে রাখা ভালো সবার অবগতির জন্যই নিশ্চয় ।

    নারায়ণচন্দ্র ঘোষ আরও বলেছেন যে, “প্রকল্পিত সমীকরণের পদ্ধতি অজানা থাকলে রাধার একীভূত সত্তার প্রসঙ্গ সহজবোধ্য হয় না । অজানা থেকে যায় রূপময়তার পরিসরে আলাদা হয়ে যাওয়া, আলাদা থাকা, বহুময়তা আর সমন্বয়, সমাবিষ্ট, একীভূত হওয়ার সম্ভাবনাসূত্র — ভেদ ও অভেদের গমনপথ, পারস্পারিকতার রহস্য । বিনয়কে বুঝতে হলে, বিনয়ী হয়ে বলা ভালো, গাণিতিক চেতনায় সমৃদ্ধ হওয়া জরুরি ; অন্যথায় মিথ মিথের জন্ম দেবে ; বিনয় কেবলমাত্র অবিনশ্বর প্রেম কাহিনীর প্রতীক হয়ে থাকবেন। মিথপ্রেমীদের পথ তখন মহাশূন্যের কোটরে দীর্ঘ হতে দীর্ঘতর হবে । গণিতবিদ নারায়ণবাবু তাই পৌরাণিক মিথে টেনে নিয়ে গেছেন বিনয়ের ‘চাকা’কে । তিনি বলেছেন সুদর্শন চক্রের আবহমণ্ডলে ভারতবাসী তথা বাঙালির অবস্হান । কত না মিথ সুদর্শনচক্রকে উপলক্ষ্য করে । অশোকচক্র, সেও কি কম কথা । উপনিষদে বর্ণিত সত্যচক্র হলো একটি ত্রিমুখী সিংহের পায়ের নিচে একটি ছোটো চক্র আর মাথার উপরে আরেকটি বড়ো চক্র । এর অর্থ হলো পশু শক্তি সত্যকে দমন করতে চাইলে সত্য আরও বড়ো আকার নিয়ে পশু শক্তির উর্ধ্বে নিজের স্হান করে নেয় ।”
    বলা বাহুল্য, নারায়ণবাবুর এই যুক্তি আমি ঠিক বুঝতে পারিনি । বিনয়ের কবিতায় পুরোহিততন্ত্র ও ব্রা্‌হ্মণ্যবাদের প্রতি খোঁচা বেশ কয়েকটি কবিতায় ও সাক্ষাৎকারে পাওয়া যায় ।
    কবি জুবিন ঘোষ ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকার ২০১৬ সালের একুশে জানুয়ারি সংখ্যায় বিনয় মজুমদারের ‘ফিরে এসো চাকা’ কাব্যগ্রন্হটি সম্পর্কে আলোচনাকালে নারায়ণ ঘোষের বক্তব্যকে আরও প্রসারিত করেছেন গায়ত্রীমন্ত্র ও ষটচক্রের প্রেক্ষিতে । তিনি বলেছেন যে, গায়ত্রী শুধুমাত্র একটা মন্ত্র নয়, এটা হিন্দুদের একটা পরম সাধিত স্তব । যার সুর অমর । ‘শান্তিনিকেতন’ গ্রন্হে ‘ভক্ত’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ থাকুর লিখেছেন, “একদিকে ভূলোক, অন্তরীক্ষ, জ্যোতিষ্কলোক, আর একদিকে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তি, আমাদের চেতনা — এই দুইকেই যদি এক শক্তি বিকীর্ণ করছে, তার এই শক্তি বিশ্বের মধ্যে এবং আপনার বুদ্ধির মধ্যে ধ্যান করে উপলব্ধি করবার মন্ত্র হচ্ছে গায়ত্রী ।” বিনয় ‘আমার আশ্চর্য ফুল’ কবিতার শেষ কয়েক পংক্তির মধ্যে বলেছেন, “আমরা বিশুদ্ধ দেশে গান হবো, প্রেম হবো, অবয়বহীন/সুর হয়ে লিপ্ত হবো পৃথিবীর সকল আকাশে।” সেখানে এক অমরতার চিহ্ণ পাই সকল আকাশে বিচরণ করার শক্তির মধ্যেই । গায়ত্রী স্তবের সুর যা ‘জয় হয়ে, চিরন্তন কাব্য হয়ে’ আসে হিন্দুদের কাছে । এই অমরতা যা মন্ত্রের সুরেই সম্ভব । স্বর না থাকলেও সুর থেকে যায় অনাদিকাল, পুনরাবিষ্কার হয় তার । সেই গায়ত্রী শব্দোচ্চারণের সুরেই বিনয় বলেছেন, “লিপ্ত হবো পৃথিবীর সকল আকাশে।” এখন বেদ মন্ত্রের আলোকে দেখা যাক ‘ধী’ কী ! সূর্যের কল্যাণতম তাপ মানবের ব্যক্তিচৈতন্যের উপরে বেগ সৃষ্টি করে জ্ঞান, আত্মা বা ‘ধী’ এর পরিস্ফূটন ঘটায়। এই ‘ধী’, যা মানুষের আত্মশক্তিকে তেজপূর্ণ করে, সূর্যের অমৃতজ্যোতির সঙ্গে সাযুজ্যতা দিয়ে থাকে। ‘ধী’ প্রসঙ্গে ঋগ্বেদের ২/৪০/৬ ঋক বলছে, ‘ধিয় পূষা জিম্বতু বিশ্বামিত্রো রয়ি সোমা রয়িপতির্দাধতু।’ মানে হলো, সব জীবনের ধ্যানে, মননে, চিন্তনে রয়েছেন পূষা, তিনিই ‘ধী’ যা সবার ধ্যানচৈতন্যের স্ফূরণ করে, সোমলতাকে ‘ধী’ রসবন্ত করে । গায়ত্রী স্তবেও বলছে ‘ধিযো নঃ প্রচোদয়াৎ’। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, এই ধ্যানকে উপলব্ধি করতে হয়, আবিষ্কার করতে হয়, তাই তো ‘আমার আশ্চর্য ফুল’ কবিতায় বিনয় লেখেন, ‘দীর্ঘ তৃষ্ণা ভুলে থাকি আবিষ্কারে, প্রেমে।’ গায়ত্রীমন্ত্র একবার মনস্হ করে হয় না, তাকে ধীরে ধীরে ১০ থেকে ১০৮ বার করতে হয় । বিনয় ‘আমার আশ্চর্য ফুল’ কবিতায় লেখেন, ‘নিমেষেই/গলধঃকরণ তাকে না করে ক্রমশ রস নিয়ে/তৃপ্ত হই’ — এই ধীর স্বাদ গ্রহণের চমৎকার অবস্হায় প্রকৃত সাধক বিনয় মজুমদার ‘পরাবর ব্রহ্ম’ দর্শন করেন । দর্শনের শেষে যা আসে তা দেব দর্শনের মতো মিলিয়ে যায়, শরীর সাকার হয় না, চিত্ররূপ থেকে যায় মনে, ‘প্রাচীন চিত্রের মতো চিরস্হায়ী হাসি নিয়ে তুমি/চলে যাবে ; ক্ষত নিয়ে যন্ত্রণায় স্তব্ধ হব আমি’ ( ভালোবাসা দিতে পারি — ১৮.৫.৬২ ) । এই ভাবে স্তব বা বেদমন্ত্রে গায়ত্রী জীবন্ত মানুষী হয়ে ওঠেন । ঠিক যেমন গায়ত্রীমন্ত্রের মধ্যে অন্তর্নিহিত আছে এক অপূর্ব আলোর পরিস্ফূরণ, স্রোতের তরঙ্গশীর্ষে রয়েছে উত্তরণের সাংকেতিক লিপি । লক্ষ-কোটি মুহূর্তের প্রবাহে যিনি নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে এই শক্তিকে আত্মস্হ করেন, তিনিই যোগী । ‘ধী’ অর্থাৎ বোধ আমাদের রক্ষা করছে । বোধের পূজারী হলেন বিনয় মজুমদার । তিনি বারবার গায়ত্রীর মূল রসকে সেই স্তরের ব্যাখ্যায় অন্তস্হিত মর্মে পদার্পণ করেছেন । ‘ধী’ ও গায়ত্রীকে মিশিয়ে দিয়েছেন কাব্যের আধ্যাত্মিকতায় ।
    জুবিন ঘোষ আরও বলেছেন, এবং যা বলেছেন, খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে বিনয়ের ‘বাল্মীকির কবিতার’ ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য, যদিও জুবিন ঘোষ ‘বাল্মীকির কবিতা’র পপসঙ্গ তোলেননি এখানে । জুবিন বলেছেন, “ফিরে এসো, চাকা’ তো সভ্যতার প্রধান চক্র, যার মাধ্যমে মানবসভ্যতা গড়িয়ে এগিয়েছে, আর চক্র মানেই ‘ষটচক্র’ । সেখানে দেখব রয়েছে : ১) মূলাধারচক্র; ২) সাধিষ্ঠচক্র ; ৩) মণিপুরচক্র ; ৪) অনাহতচক্র ; ৫) বিশুদ্ধিচক্র ও ৬) আজ্ঞাচক্র । এই চক্রের পুনঃসাধনার কথাই বলেছেন কবি বিনয় মজুমদার। এতো সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক গভীরতার দিকে এগিয়েছে বিনয়ের ‘ফিরে এসো, চাকা’, যাকে বলতে পারি ফিরে এসো চক্র — সভ্যতার সাবলীল গতিসমূহ মানবদেহের সাবলীল সাধনাসমূহ । মূলাধারচক্র সাধনায় মানুষের বাসনা সিদ্ধ হয় — সে মুক্তি লাভ করে । বিনয় ‘আমার আশ্চর্য ফুল’-এ বলছেন, ‘কাকে বলে নির্বিকার পাখি/অথবা ফড়িং তার স্বচ্ছ ডানা মেলে উড়ে যায়/উড়ে যায় শ্বাস ফেলে যুবকের প্রাণের উপরে/…/আমি মুগ্ধ ; উড়ে গেছ ; ফিরে এসো চাকা । এই মুগ্ধ উড়ে যাবার মধ্যে মুক্তির স্বাদ । মুগ্ধতার অর্থ বাসনা পরিতৃপ্তির ফল । এই মুগ্ধ উড়াল আমরা বার বার পাই ‘ফিরে এসো, চাকা’র প্রথম কবিতাতেই, ‘একটি উজ্বল মাছ, যা ১৯৬০ সালের ৮ই মার্চ লেখায় আশ্রিত — ‘একটি উজ্বল মাছ একবার উঠে/দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে পুনরায় ডুবে গেল/ এই স্মিত দৃশ্য দেখে বেদনার গাঢ় রসে আপক্ক রক্তিম হল ফল/…/বিপন্ন মরাল ওড়ে অবিরাম পলায়ন করে ।’ আবার ‘কাগজ কলম নিয়ে’ ( ১৪/১০/১৯৬০) বিনয় লিখছেন, ‘তবু কী আশ্চর্য দ্যাখো, উপবিষ্ট মশা উড়ে গেলে/তার সেই উড়ে যাওয়া ঈষৎ সঙ্গীতময় হয়।’ এই ওড়াটাই হলো মুক্তির আর্কিটাইপ, উড়ে যেতে চাইছে সব ছিন্ন করে, মুক্তি পেতে চাইছে বাসনা তৃপ্ত করে, যা মূলাধারচক্র সাধনার মূল রস , যা আবার ফিরে এসেছে ‘মুকুরে প্রতিফলিত’ ( ২৬/৮/১৯৬০) কবিতায়, ‘মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়।’ এভাবেই ঈচ্ছিক মুক্তির পথে বার বার তাঁর কলম লিখে চলেছে মূলাধারচক্রের সার কথা। মণিপুরচক্র বলছে যে, এই সাধনার ফলে সাধক অন্যের শরীরেও প্রবেশ করতে পারেন, যেভাবে ‘আমার আশ্চর্য ফুল যেন চকোলেট এক বস্তুস্হিত অবস্হান থেকে অন্য বস্তুস্হিত অবস্হানে চলে যাচ্ছেন কবি । স্বচ্ছ জলে মিশে যাওয়াটাই মণিপুরচক্র । প্রায় প্রত্যেক কবিতায় এই বৌদ্ধিক সাধকের মিশে যাওয়াটাই অনুভব করতে হয় । একটা চিত্র বার বার অন্য চিত্রের সঙ্গে, অন্য আর্কিটাইপের সঙ্গেমিশে যাচ্ছে । বিশুদ্ধিচক্রে পরমযোগী হবার সাধনা বার বার তাঁর কাব্যে এসেছে, যেমন ‘কী উৎফুল্ল আশা নিয়ে সকালে জেগেছি সবিনয়ে’ । এমন তো একজন প্রকৃত ঋষিই পারেন, পরম সাধকেই তো তিনি উত্তীর্ণ ।”
    জুবিন ঘোষ বাসনা পরিতৃপ্তির যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা আমরা বিনয়ের ভুট্টা সিরিজ কবিতাতেও পাই। সেই কবিতাগুলোয় একটি আশ্চর্য ফুল রূপান্তরিত হয়েছেন একজন রক্তমাংসের ফুলে । হিন্দু তন্ত্রসাধকদের মতো বিনয়ও আশ্রয় নিয়েছেন রক্তমাংসের অভিজ্ঞতায় । বিনয় তাঁর জাগতিক অভিজ্ঞতাকে অসম্পূর্ণ রাখতে চাননি, যা তিরিশের মধ্যবিত্ত কবি-লেখকদের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল । ভুট্টা সিরিজের কবিকে আমরা হিন্দু তন্ত্রসাধকদের অন্বেষণের সঙ্গে তুলনা করতে পারি, যাঁরা তনুমনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করতেন । দেবীর আধারে নির্বাচিত সঙ্গিনীর সঙ্গে যৌন একাত্মের মাধ্যমে জরা, ব্যাধি, বার্ধক্য, মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণ করতেন ; মৃত্যুঞ্জয়ী ও ভয়জয়ী হয়ে অমরত্ব লাভ করতেন । হিন্দু ও বৌদ্ধিক তান্ত্রিকদের যৌন একাত্মতা ছিল দেহ ও মনের পরস্পরের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক বুনন, পুরুষের সঙ্গে নারীর, মানবের সঙ্গে দৈবের । বিনয় মজুমদার রক্তমাংসের ঈশ্বরীকে খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর রাধায় । সর্বোচ্চ প্রাপ্তির জন্য বিনয় মজুমদার স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চেয়েছেন, বোধিপ্রাপ্ত, এবং চেয়েছেন শেষতম শান্তি, যাতে মন থেকে যাবতীয় নোংরা বিদায় নিয়ে তাঁকে বামাক্ষ্যাপার স্তরের বোধিতে উন্নীত করতে পারে ।
    অরুণেশ ঘোষ, জুবিন ঘোষ ও নারায়ণচন্দ্র ঘোষ, এবং তাঁদের মতো আরও অনেকে বিনয়ের কবিতায় গায়ত্রী চক্রবর্তীর অস্তিত্ব নস্যাৎ করতে চাইলেন কেন বোঝা কঠিন । বিনয়ের ইনটারমিডিয়েট পড়ার সময়ে আরও ছাত্রী ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে । গায়ত্রীর নামটিই কেন তাঁর কাব্যগ্রন্হের নামকরণে এলো ? পুরাণের নানা রকমের চক্র বিনয়কে ‘ফিরে এসো, চাকা, অথবা ‘গায়ত্রীকে’ অথবা ‘আমার ঈশ্বরীকে’ নামকরণে উদ্বুদ্ধ করেছিল, এরকম ভাবতে খটকা লাগে । বিনয় যদি ব্রাহ্মণ পরিবারের বা উচ্চবর্ণের সন্তান হতেন তাহলে না হয় কিছু যুক্তি দেয়া যেতে পারত ।
    তরুণ বয়সে কোনো কিশোরীর প্রতি ক্রাশ যদি হয়েই থাকে এবং তা যদি মনের গভীরে বাসা বেঁধে তরুণটিকে সেই কিশোরীকে নিজের কবিতায় তুলে আনতে প্ররোচিত করে থাকে, সেটাই তো বরং স্বাভাবিক মনে হয় । তবে বিনয় নিজেই বলে গেছেন যে লিখিত কবিতার ভেতরে যা লুকিয়ে থাকে এবং পরবর্তীকালে তাকে পাঠ করলে যদি নতুন কিছু পাওয়া যায় তাহলে তা কবিতাটির অন্তর্গত ‘অতিচেতনা’ ; এই অতিচেতনা এবং অতিসত্য গণিতে থাকে, যে কারণে একই গণিততন্ত্র পরবর্তীকালে আরেকজন গণিতবিদের জন্য অন্য পথের দিশারী হয়ে ওঠে । তাই নারায়ণবাবু ও জুবিনবাবুর যুক্তিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা উচিত হবে না, তাঁরা বিনয়-কথিত ‘অতিচেতনা’ আবিষ্কার করেছেন তাঁর কবিতায় ।
    ১৯৮২ সালে ‘কোনো গোপনতা নেই’ শীর্ষক সাক্ষাৎকারে “বাস্তব কবিতা বলে কিছু হয়কি?” প্রশ্নের উত্তরে বিনয় মজুমদার বলেছিলেন, “পুরোটাই — কবিতার প্রত্যেক শব্দ, প্রত্যেক বাক্য, বাস্তব জগত, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া।” ১৯৬৬ সালে ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হে তিনি লিখেছেন যে একেবারে কাল্পনিক ভাবনা হলো চিন্তাশূন্য শূন্যস্হান, তার মানে মৃত :-

    সব মিলে একটিই বিশাল জীবন তবে ভূবক্ষে রয়েছে
    আপাত দৃষ্টিতে দেখা যে-কোনো তথাকথিত একটি ব্যক্তিকে
    বিশাল সমগ্র থেকে আলাদা করে নিলে হঠাৎ —
    যদি কোনোদিন নিতে কোনোভাবে পারা যায় তবেই হঠাৎ
    দেখা যাবে ব্যক্তিটির চিন্তা বলে কিছু নেই, মন তার শুধু
    চিন্তাশূন্য শূন্যস্হান — একেবারে কাল্পনিক, তার মানে মৃত

    অর্থাৎ পুরাণের কোনো মিথ থেকে তিনি চাকা ও গায়ত্রীকে এনেছেন বলে বিশ্বাস করা কঠিন । সুমন গুণও বলেছেন, “বিনয়ের ভাষ্য আক্ষরিক অর্থেই ব্যক্তিগত; নিজেকে কেন্দ্র করেই তাঁর বিস্তার ।
    ওই সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন, “আচ্ছা, কবিতা কি এমন হতে পারে না — ধরো, খাতা কলম নিয়ে রেল লাইনের ধারে গিয়ে বসলাম, যা দেখি ঠিক তাই লিখি — না দেখা একটা শব্দও যেন না থাকে — যেমন ধরো —
    সামনেই ধানক্ষেত দীর্ঘায়িত হয়ে পড়ে আছে
    ধানক্ষেতটির ওই পাশ দিয়ে রাস্তা চলে গেছে
    উত্তরের দিক থেকে ঠিক দক্ষিণের দিকে — তাই দেখি…।

    ‘গায়ত্রীকে’, ‘ফিরে এসো, চাকা, ‘ঈশ্বরীকে’ কাব্যগ্রন্হটির অসাধারণ প্রেমের কবিতাগুলোও বাস্তবজগতের, এবং এখানেই জীবনানন্দ দাশ-এর কবিতার সঙ্গে বিনয় মজুমদারের পার্থক্য । ১৯৮২ সালের উপরোক্ত সাক্ষাৎকারটিতে বিনয় মজুমদারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “গায়ত্রীকে কি তুমি ভালোবাসতে ?” উত্তরে বিনয় মজুমদার, একজন প্রেমিক যেভাবে নিজের গোপন প্রেমের কথা বলে, বলেছিলেন, “আরে ধ্যুৎ, আমার সঙ্গে তিনচার দিনের আলাপ — প্রেসিডেন্সি কলেজের নামকরা সুন্দরী ছাত্রী ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের, তারপরে কোথায় চলে গেলেন, আমেরিকা না কোথায়, ঠিক জানি না।”
    পরে অজয় নাগ জিগ্যেস করেছিলেন, “বিনয়দা, চক্র মানে কী ?” উত্তরে বিনয় মজুমদার বলেছিলেন, “চাকা, যা গড়িয়ে গিয়ে চলে আসে, যেখান থেকে শুরু করেছিল ; যে চাকা চালায় সে চক্রবর্তী, আমি সেই চক্রবর্তীকে ফিরে আসতে বলেছি, গায়ত্রী চক্রবর্তীকেই একটা আস্ত চাকা বানিয়ে দিয়েছি ।” ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে মারুফ হোসেন জিগ্যেস করেছিলেন, “গায়ত্রী চক্রবর্তী সম্পর্কে কিছু শুনতে চাই ।” উত্তরে বিনয় বলেছিলেন, “যিনি আমার গুরুদেব ছিলেন, বাংলা ভাষা পড়াতেন আমাকে প্রেসিডেন্সি কলেজে, সেই জনার্দন চক্রবর্তীর মেয়ে হলো গায়ত্রী চক্রবর্তী । ইডেন হিন্দু হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্টও ছিলেন । আমি ওই হোস্টেলে থেকেছি দুই বছর । গায়ত্রীর বয়স তখন কত হবে ? ১০-১১-১২ বছর । আমার তখন হবে ধরো ১৬-১৭-১৮ বছর । তখন আমি ওকে দেখেছি ।”
    ‘একটি উজ্বল মাছ’ কবিতাটি সম্পর্কে মাসুদুল হক বিনয় মজুমদারের মনোভঙ্গ বিশ্লেষণ করে বলেছেন যে, “ব্যাপারটি এভাবে উপলব্ধি করা যায় । পুকুরের তলদেশে একটি নারীমৎস্য দুঃখ নিয়ে সাঁতরে বেড়াচ্ছে । হঠাৎ একটি পুরুষ মৎস্য কোনো এক আনন্দের স্পর্শ দিল । সে-সুখে নারীমৎস্যটি জলমাধ্যম থেকে বায়ুমাধ্যমে উড়াল দেয় । কিন্তু সে আনন্দের উড়াল ক্ষণিকের, কেননা সে অনিবার্যভাবেই আবারও দুঃখের স্রোতে মিশে যাবে । কিন্তু মাঝখানে প্রকৃতির ঐক্যের কারণে, আপেক্ষিত তত্বের পরিপ্রেক্ষিতে, এই উড়াল দৃশ্য একটি ফল দেখে নিয়ে দার্শনিক বেদনাতে আপক্ক রক্তিম হয়ে ওঠে । নিউটনের সেই আপেলের ভূপৃষ্ঠে পতিত হবার যে ঘটনা তা দুঃখবাদের কেন্দ্রগামী বিন্দু । যাকে তিনি অভিকর্ষীয় ত্বরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন এই বস্তুবিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতে । কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে দুঃখবাদের এক অনন্ত সমীকরণ । সেই সমীকরণই ঘটান বিনয় মজুমদার, তাঁর ‘একটি উজ্বল মাছ’ কবিতায় গণিতের সমীকরণ দিয়ে । বিনয় তো নিজের সম্পর্কে বলেছেন, মূলত আমি গণিতবিদ, আমার অধিকাংশ সময় কাটে গণিত চিন্তায় ; আর কবিতা, মানুষ যেরকম কাজের অবসরে সুন্দর সুন্দর ফুলের বাগান তৈরি করে, তেমনি ।”
    মাসুদুল হক কিন্তু বিনয় মজুমদারের দুঃখের উৎসসূত্রটি জানাননি ।
    বিনয়ের চোখে গায়ত্রী নামের যুবতীটি সুন্দরী, তিনি একজন গর্বোদ্ধত স্মার্ট ইংরেজিতে-কথা-বলিয়ে কনভেন্টে-পড়া যুবতী সন্দেহ নেই, তবে ফিল্মস্টার বা মডেলদের মুখশ্রীর সৌন্দর্যের দাবিদার তাঁকে বলা যায় না । তাঁর সৌন্দর্য সবাইকে ছাপিয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হবার, এবং পরবর্তীকালে দেরিদার অনুবাদকের ও সাবঅলটার্ন দর্শনের মুখপাত্রীর। গায়ত্রীর চলে যাওয়াটাও ফিরে এলো ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্হে, এবং যে ছবিগুলো কবিতায় বিনয় মজুমদার নিয়ে এলেন, তা বাস্তব জগতের, চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা নয়, অবলোকিত বাস্তব :

    বেশ কিছু কাল হল চলে গেছ, প্লাবনের মতো
    একবার এসো ফের ; চতুর্দিকে সরস পাতার
    মাঝে থাকা শিরীষের বিশুদ্ধ ফলের মতো আমি
    জীবন যাপন করি ; কদাচিৎ কখনো পুরোনো
    দেওয়ালে তাকালে বহু বিশৃঙ্খল রেখা থেকে কোনো
    মানুষীর আকৃতির মতো তুমি দেখা দিয়েছিলে ।
    পালিত পায়রাদের হাঁটা, ওড়া, কুজনের মতো
    তোমাকে বেসেছি ভালো ; তুমি পুনরায় চলে গেছ ।

    বিনয় মজুমদারের কাব্যসমগ্রের সম্পাদক তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় কাব্যসমগ্রের প্রথম খণ্ডে উল্লেখ করেছেন, ‘গায়ত্রীকে’ কবিতাপুস্তিকাটির নামকরণ প্রসঙ্গে বিনয় মজুমদার তাঁকে লিখেছিলেন, গায়ত্রী চক্রবর্তী প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তো এবং ১৯৬০ কি ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে বি.এ. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে পাশ করেছিল । সে-ই আমার কবিতা বুঝতে পারবে ভেবে তাকেই উদ্দেশ্য করে ‘গায়ত্রীকে’ বইখানি লেখা । সেই হেতু বইয়ের নাম ‘গায়ত্রীকে’ রেখেছিলাম ।

    ছয়
    জীবনানন্দের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতা ‘বনলতা সেন’-এর যদি উল্লেখ করি তবে দেখা যাবে যে তা সম্পূর্ণ কবিকল্পিত, তা অবলোকিত বাস্তব নয়, যা আমরা বিনয় মজুমদারে পাই । তাছাড়া জীবনানন্দ বলছেন ‘থাকে শুধু অন্ধকার’ যা সারাজীবন দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করার পরও বিনয় মজুমদারকে বলতে শোনা যায় না । ‘পুনর্বসু’ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে ( ১৯৮৭ ) বিনয় মজুমদারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “আপনি এরকম থাকেন কী করে ? রহস্যটা কী ? সর্বদাই এমন আনন্দে ?” জবাবে বিনয় বলেছিলেন, “আমি সারাক্ষণ আনন্দে থাকি এটা সত্য কথা । তার জন্য আগে থাকতে ব্যবস্হা করে রাখতে হয় ।” পক্ষান্তরে জীবনানন্দ লিখেছিলেন :-

    হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে
    সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
    অনেক ঘুরেছি আমি ; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
    সেখানে ছিলাম আমি ; আরো দূর অন্ধকার বিদর্ভ নগরে
    আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
    আমারে দু’দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন

    চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা
    মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ; অতিদূর সমুদ্রের পর
    হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা
    সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর
    তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে ; বলেছে সে ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’
    পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন ।

    সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
    সন্ধ্যা আসে ; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল ;
    পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
    তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল ;
    সব পাখি ঘরে আসে — সব নদী — ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন ;
    থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন ।

    পাশাপাশি পড়ে দেখা যাক বিনয় মজুমদারের অবলোকিত বাস্তবের কবিতা, বিশেষ করে যেগুলো জনপ্রিয় । বিনয় প্রয়োগ করছেন যা বিজ্ঞানের দ্বারা প্রমাণিত, যা যুক্তিপূর্ণ, এমন ছবি :

    একটি উজ্জ্বল মাছ
    একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে
    দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে
    পুনরায় ডুবে গেলো — এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে
    বেদনার গাঢ় রসে আপক্ক রক্তিম হলো ফল ।
    বিপন্ন মরাল ওড়ে, অবিরাম পলায়ন করে,
    যেহেতু সকলে জানে তার শাদা পালকের নিচে
    রয়েছে উদগ্র উষ্ণ মাংস আর মেদ ;
    স্বল্পায়ু বিশ্রাম নেয় পরিশ্রান্ত পাহাড়ে পাহাড়ে ;
    সমস্ত জলীয় গান বাষ্পীভূত হয়ে যায় তবু
    এমন সময়ে তুমি হে সমুদ্রমৎস্য, তুমি… তুমি…
    কিংবা দ্যাখো, ইতস্তত অসুস্হ বৃক্ষেরা
    পৃথিবীর পল্লবিত ব্যপ্ত বনস্হলী
    দীর্ঘ দীর্ঘ ক্লান্ত শ্বাসে আলোড়িত করে
    তবু সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে যার ভূমিতে দূরে দূরে
    চিরকাল থেকে ভাবে মিলনের শ্বাসরোধী কথা ।

    আর যদি নাই আসো
    আর যদি নাই আসো, ফুটন্ত জলের নভোচরী
    বাষ্পের সহিত যদি বাতাসের মতো নাই মেশো,
    সেও এক অভিজ্ঞতা ; অগণন কুসুমের দেশে
    নীল বা নীলাভবর্ণ গোলাপের অভাবের মতো
    তোমার অভাব বুঝি, কে জানে হয়তো অবশেষে
    বিগলিত হতে পারো ; আশ্চর্য দর্শন বহু আছে
    নিজের চুলের মুগ্ধ ঘ্রাণের মতন তোমাকেও
    হয়তো পাইনি আমি, পূর্ণিমার তিথিতেও দেখি
    অস্ফূট লজ্জায় ম্লান ক্ষীণ চন্দ্রকলা উঠে থাকে,
    গ্রহণ হবার ফলে, এরূপ দর্শন বহু আছে

    জীবনানন্দ দাশ-এর ‘রাত্রি’ ( সাতটি তারার তিমির ) কবিতাটি এবার পড়ে দেখি । দেখবো যে জীবনানন্দ কলকাতা শহরকে পর্যবেক্ষণ করে কবিতাটি লিখেছেন ; বিনয় মজুমদারের অবলোকন পদ্ধতির ( act of observing, viewing, noticing from personal experience ) সঙ্গে জীবনানন্দের পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির ( act of seeing or looking at and act of ruminating historical events ) পার্থক্য আছে । বিনয় নিজের কবিতার খাতায় মার্জিনে যে নোটগুলো নিতেন, ‘ফিরে এসো, চাকা’ লেখার সময়ে, সেগুলো প্রধানত ছিল তাঁর ব্যক্তিজীবনে পাওয়া অভিজ্ঞতাগুলো, যখন কিনা জীবনানন্দ অন্য খাতায় নোট নিয়ে রাখতেন বাক্যের, শব্দবন্ধের, চিত্রকল্পের, যেগুলোর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিজীবনের তুলনায় বাইরের জগতের বিষয়বস্তু বা ঘটনা এবং পৃথিবীর লুপ্ত সভ্যতাগুলোর স্মৃতিচারণ বেশি । জীবনানন্দের ‘পর্যবেক্ষণ’ আর বিনয়ের ‘অবলোকন’ এর সূক্ষ্ম তফাত । ‘রাত্রি’ কবিতাটি :

    হাইড্র্যান্ট খুলে দিয়ে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল ;
    অথবা সে হাইড্র্যাণ্ট হয়তো বা গিয়েছিল ফেঁসে ।
    এখন দুপুর রাত নগরীতে দল বেঁধে নামে ;
    একটি মোটরকার গাড়লের মতো গেল কেশে

    অস্হির পেট্রল ঝেড়ে — সতত সতর্ক থেকে তবু
    কেউ যেন ভয়াবহভাবে প’ড়ে গেছে জলে ।
    তিনটি রিকশ ছুটে মিশে গেল শেষ গ্যাস ল্যাম্পে
    মায়াবীর মতো জাদুবলে ।

    আমিও ফিয়ার লেন ছেড়ে দিয়ে — হঠকারিতায়
    মাইল মাইল পথ থেঁটে — দেয়ালের পাশে
    দাঁড়ালাম বেণ্টিঙ্ক স্ট্রিটে গিয়ে — টেরিটিবাজারে ;
    চীনেবাদামের মতো বিশুষ্ক বাতাসে ।

    মদির আলোর তাপ চুমো খায় গালে ।
    কেরোসিন কাঠ, গালা, গুনচট, চামড়ার ঘ্রাণ
    ডাইনামোর গুঞ্জনের সঙ্গে মিশে গিয়ে
    ধনুকের ছিলা রাখে টান ।

    টান রাখে মৃত ও জাগ্রত পৃথিবীকে ।
    টান রাখে জীবনের ধনুকের ছিলা ।
    শ্লোক আওড়ায়ে গেছে মৈত্রেয়ী কবে ।
    রাজ্য জয় করে গেছে অমর আত্তিলা ।

    নিতান্ত নিজের সুরে তবুও তো উপরের জানালার থেকে
    গান গায় আধো জেগে ইহুদী রমণী ;
    পিতৃলোক হেসে ভাবে , কাকে বলে গান —
    আর কাকে সোনা, তেল, কাগজের খনি ।

    ফিরিঙ্গি যুবক কটি চলে যায় ছিমছাম ।
    থামে ঠেস দিয়ে এক লোল নিগ্রো হাসে ;
    হাতের ব্রায়ার পাইপ পরিষ্কার করে
    বুড়ো এক গরিলার মতন বিশ্বাসে ।

    নগরীর মহৎ রাত্রিকে তার মনে হয়
    লিবিয়ার জঙ্গলের মতো ।
    তবুও জন্তুগুলো আনুপূর্ব — অতিবৈতনিক
    বস্তুত কাপড় পরে লজ্জাবশত ।

    শার্ল বদল্যারের মতন জীবনানন্দও একজন পথচর ছিলেন, নিশাচরও, এবং তাঁর ‘পথ হাঁটা’ কবিতাটি পড়লে তা স্পষ্ট হবে :

    কী এক ইশারা যেন মনে রেখে একা-একা শহরের পথ থেকে পথে
    অনেক হেঁটেছি আমি, অনেক দেখেছি আমি ট্রাম বাস সব ঠিক চলে
    তারপর পথ ছেড়ে শান্ত হয়ে চলে যায় তাহাদের ঘুমের জগতে
    সারারাত গ্যাসলাইট আপনার কাজ বুঝে ভালো করে জ্বলে ।
    কেউ ভুল করেনাকো — ইঁট বাড়ি সাইনবোর্ড জানালা কপাট ছাদ সব
    চুপ হয়ে ঘুমাবার প্রয়োজন বোধ করে আকাশের তলে ।
    একা একা পথ হেঁটে এদের গভীর শান্তি হৃদয়ে করেছি অনুভব ;
    তখন অনেক রাত — তখন অনেক তারা মনুমেন্ট মিনারের মাথা
    নির্জনে ঘিরেছে এসে ; মনে হয় কোনোদিন এর চেয়ে সহজ সম্ভব
    আর দেখেছি কি ? এক রাশ তারা আর মনুমেন্ট ভরা কলকাতা ?
    চোখ নিচে নেমে যায় — চুরুট নীরবে জ্বলে — বাতাসে অনেক ধুলো খড় ;
    চোখ বুজে একপাশে সরে যাই — গাছ থেকে অনেক বাদামি জীর্ণ পাতা
    উড়ে গেছে ; বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতরে
    কেন যেন ; আজো আমি জানিনাকো হাজার হাজার ব্যস্ত বছরের পর ।

    বিনয় মজুমদার পথচর ছিলেন না, নিশাচর তো নয়ই । মাঝবয়সে আসঙ্গ-উন্মুখ বিনয় যৌনপল্লীতে ( যাকে তিনি বলেছেন তাঁর ‘বৃন্দাবন’ ) হয়তো রাধার কাছেও, তিনি যেতেন ‘বিশাল দুপুরবেলায়’, ‘প্রকাশ্য দিনের বেলা’ । ‘বাল্মীকির কবিতা’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৬ সালে, তার মানে তখন তাঁর বয়স ৪২ । তার আগে ১৯৬৬ সালে তিনি লিখেছেন ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ নামে আদিরসাত্মক কবিতাটি, তখন তাঁর বয়স ৩২, যে বয়সে পঞ্চাশ দশকের কয়েকজন কবি সোনাগাছি যাওয়া আরম্ভ করেন । আমি তাঁদের সেই পাড়ায় দেখেছি বলে জানি । আমার হাংরি মামলার উকিলের বাড়ি ছিল ঠিক অবিনাশ কবিরাজ লেনের উল্টোদিকে, এবং উকিলের জানালা দিয়ে সবই দেখা যেতো ।
    কল্পনা নয়, বাস্তব জীবন থেকেই বিনয় তুলে এনেছেন তাঁর কবিতা ও গল্পের রসদ । ঠাকুরনগরের শিমুলপুরের গ্রামে চায়ের ঠেকে আড্ডা দিতে দিতে যা চোখে পড়ত, সেগুলোই উঠে আসত বিনয় মজুমদারের কবিতায় এবং গদ্যকাহিনিতে । এই পর্বে বিনয় তাঁর দিনপঞ্জীর কাব্যায়ন করতেন : “দিনপঞ্জী লিখে লিখে এতোটা বয়স হলো/দিনপঞ্জী মানুষের নিকটতম লেখা।” যৌনপল্লীতে রাধার কাছে দিনের বেলায় যাবার স্বীকৃতি রয়েছে তাঁর ‘চাঁদের গুহার দিকে’ কবিতায়:-

    চাঁদের গুহার দিকে নির্নিমেষে চেয়ে থাকি, মেঝের উপরে
    দাঁড়িয়ে রয়েছে চাঁদ, প্রকাশ্য দিনের বেলা, স্পষ্ট দেখা যায়
    চাঁদের গুহার দিকে নির্নিমেষে চেয়ে থাকি, ঘাসগুলো ছোটো করে ছাঁটা ।
    ঘাসের ভিতর দিয়ে দেখা যায় গুহার উপরকার ভাঁজ ।
    গুহার লুকোনো মুখ থেকে শুরু হয়ে সেই ভাঁজটি এসেছে
    বাহিরে পেটের দিকে । চাঁদ হেঁটে এসে যেই বিছানার উপরে দাঁড়াল
    অমনি চাঁদকে বলি, ‘তেল লাগাবে না আজ’, শুনে চাঁদ বলে
    ‘মাখব নিশ্চয়, তবে একটু অপেক্ষা কর’ বলে সে অয়েলক্লথ নিয়ে
    পেতে দিল বিছানায়, বালিশের কিছু নিচে, তারপর হেঁটে এসে চলে গেল
    নিকটে তাকের দিকে, একটি বোতল থেকে বাম হাতে তেল নিয়ে এল
    এসে তেল মাখা হাতে ভুট্টাটি চেপে ধরে ।
    যখন ধরল তার আগেই ভুট্টাটি খাড়া হয়ে গিয়েছিল ।
    চাঁদ আমি দুজনেই মেঝেতে দাঁড়ানো মুখোমুখি
    এক হাতে ঘসে ঘসে ভুট্টার উপরে চাঁদ তেল মেখে দিল ।

    বিনয়ের দৃষ্টিপথে ব্যবিলন, বিম্বিসার, অশোক, মালয় সাগর, আত্তিলা, বিদিশা, শ্রাবস্তী, দারুচিনি দ্বীপ, লিবিয়ার জঙ্গল ইত্যাদি পড়ে না । বিনয়ের কাছে গ্রামের তুচ্ছ জিনিস আর সামান্য চাষি বা দোকানিও গুরুত্বপূর্ণ, তিনি সকলের নাম জানেন, চেনেন। বিনয় লিখেছেন : “সকলকিছুর মানে আছে, মানে থাকে, মানে নেই এরকম কিছু/স্বাভাবিক প্রকৃতিতে কখনো সম্ভব নয়, সৃষ্টি হলে মানে হয়ে যায়।” ‘বিনয় মজুমদারের ছোটগল্প’ বইটিতে তাঁর গ্রামের মানুষজনদের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সূত্র পাই । শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় চম্পাহাটি গ্রামে জমিজমা কিনে বেশ কয়েক বছর ছিলেন, অথচ তাঁর গল্পগুলোয় সেই আন্তরিকতা পাওয়া যায় না যা বিনয়ের ছোটগল্পের চরিত্রদের সঙ্গে বিনয়ের কথাবার্তায় পাওয়া যায় । শ্যামল একটি সাহিত্যিক দূরত্ব গড়ে চরিত্রগুলোকে উপস্হাপন করেছেন ।
    জীবনানন্দ সম্পর্কে বিনয় মজুমদারের শ্রদ্ধা ১৯৯৯ সালে মারুফ হোসেনের সঙ্গে এই প্রশ্নোত্তরে ফুটে ওঠে :
    প্রশ্ন : আপনার মতে বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ কবিতা কোনটি ?
    বিনয় : জীবনানন্দের ‘সমারূঢ়’ অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা । ( বিনয় আবৃত্তি করেন )
    বরং নিজেই তুমি লেখোনাকো একটি কবিতা
    বলিলাম ম্লান হেসে ; ছায়াপিণ্ড দিল না উত্তর ;
    বুঝিলাম সে তো কবি নয় — সে যে আরূঢ় ভণিতা;
    পাণ্ডুলিপি, ভাষ্য, টীকা, কালি আর কলমের ‘পর
    বসে আছে সিংহাসনে — কবি নয় — অজর, অক্ষর
    অধ্যাপক ; দাঁত নেই — চোখে তার অক্ষম পিচুটি ;
    বেতন হাজার টাকা মাসে — আর হাজার দেড়েক
    পাওয়া যায় মৃত সব কবিদের মাংস কৃমি খুঁটি ;
    যদিও সে-সব কবি ক্ষুধা প্রেম আগুনের সেঁক
    চেয়েছিল — হাঙরের ঢউয়ে খেয়েছিল লুটোপুটি ।
    প্রশ্ন : হাঙর মানে ?
    বিনয় : হাঙর মানে মনস্তত্ববিদগণ, হাঙর মানে ডাক্তারগণ, হাঙর মানে পুলিশগণ, হাঙর মানে মন্ত্রীগণ, হাঙর মানে পুরোহিতগণ । এই হাঙরদের পাল্লায় পড়ে প্রাণ বেরিয়ে যাবার যোগাড় । বহু কবি মারা গিয়েছেন এদের দুর্ব্যবহারের জন্য । ভেবে দ্যাখো আমরা পাঁচ দশকে যারা কবিতা লিখতাম তাদের মধ্যে বর্তমানে কজন টিকে আছে ? জনা দশেক । তাও নয় । হাঙরেরা দিয়েছে বাকিগুলোকে শেষ করে । ফলে ভয়ে ভয়ে লেখা বন্ধ করে দিয়েছি । এখন একটু জ্বলাতন কম আছে । তবে মরে গেলেই মুক্তি পাব। আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে/আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ভাসে ভাসে ।
    এখানে মনে করিয়ে দিই যে বিনয় যাদের দ্বারা সীমাবদ্ধ হয়েছেন, বা যারা তাঁকে অসীমের দিকে যাত্রায় বাধা দিয়েছেন, তাদের বলছেন হাঙর, মনস্তত্ববিদরা, ডাক্তাররা, পুলিশরা, এমনকি গায়ত্রীর পরিবার যে পুরোহিতের পরিবার ছিল, সেই পরিবারকেও । সময় ও বয়সের সঙ্গে কিশোরী গায়ত্রী ক্রমশ আবছা হয়ে বিনয়ের কাছে হয়ে উঠেছেন বিমূর্ত ঈশ্বরী ।
    ২০০৩ সালে প্রৌঢ়া গায়ত্রী চক্রবর্তীকে নিয়ে এই কবিতাটি লিখেছিলেন বিনয় মজুমদার, কবিতাটি থেকে অনুমান হয় যে সেই কিশোরী গায়ত্রী যে তাঁকে আকর্ষণ করেছিল, সে তার স্মৃতিতে আর নেই, চাকা আর ফেরেনি :

    আমরা দুজনে মিলে
    আমরা দুজনে মিলে জিতে গেছি বহুদিন হলো।
    তোমার গায়ের রঙ এখনও আগের মতো, তবে
    তুমি আর হিন্দু নেই, খৃষ্টান হয়েছ ।
    তুমি আর আমি কিন্তু দুজনেই বুড়ো হয়ে গেছি ।
    আমার মাথার চুল যেরকম ছোটো করে ছেটেছি এখন
    তোমার মাথার চুলও সেইরূপ ছোট করা ছাটা,
    ছবিতে দেখেছি আমি, দৈনিক পত্রিকাতেই ; যখন দুজনে
    যুবতী ও যুবক ছিলাম
    তখন কী জানতাম বুড়ো হয়ে যাব ?
    আশা করি বর্তমানে তোমার সন্তান নাতি ইত্যাদি হয়েছে ।
    আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে,
    তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে,
    চিঠি লিখব না ।
    আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায় ।
    ( হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ )
    ২০১৩ সালে কলকাতায় যে লিটেরারি ফেস্টিভাল হয়েছিল, সেখানে বাংলা কবিতা আলোচনাকালে বিনয়ের কবিতাকে গায়ত্রী চিহ্ণিত করেছিলেন ‘জ্ঞানতত্ত্বের মহাকাব্য’ এবং ‘এপিসটেমলোজিকাল এপিক’ হিসাবে । গায়ত্রী পরবর্তীকালে লিখেছিলেন ‘ক্যান দি সাবলটার্ন স্পিক’ ; আমি বলব এর উত্তর তো বিনয় মজুমদার, যিনি সাবলটার্ন বর্ণের বলে কবিতা রচনা সত্ত্বেও জীবদ্দশায় সেরকম গুরুত্ব পাননি, যেমন পেয়েছেন তাঁর সমসাময়িক উচ্চবর্ণের কবিরা ।
    বিনয় যে বহুবার মানসিক চিকিৎসালয়ে ছিলেন এবং তাঁকে অনেকে পাগল মনে করে, তা তাঁর চেতনায় ক্ষতের মতন থেকে গিয়েছিল । অন্যের অস্বাভাবিক আচরণকে কেন পাগলামি বলে হবে না তা তিনি লক্ষ্য করেছেন এবং লিখেছেন । ‘কয়েকটি কবিতা’র পাঁচ সংখ্যক কবিতায় কলকাতা কফি হাউসে দুটি যুবতীর অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ে এই রচনাটি লিখেছিলেন বিনয় :

    আমাদের কফি হাউসে
    অন্তত দেড়শো জন লোকের সামনে বসে
    একজন যুবতী একজন যুবকের হাতে হাত বোলায়
    আর রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনায় — ‘তুমি কেমন করে
    গান করো হে গুণী…’
    যুবতীটি সবার সামনেই যুবকটির হাতে বহুক্ষণ যাবৎ
    হাত বোলায় আর বোলায় আর বলে —’আপনি আমার
    দাদার মতো।’
    এবং যুবতীর বোন আরেক যুবতী কফি হাউসের
    টেবিলের নীচে যুবকটির পা দুই পা দিয়ে
    জড়িয়ে ধরে সবার সামনেই, কফি
    হাউস ভর্তি লোকের সামনেই । এ করে প্রত্যহ ।
    অর্থাৎ পাঠকগণ আমার মতে সব মেয়েই একটি
    ‘মানসিক হাসপাতাল’
    ( ছোটো ছোটো গদ্য ও পদ্য, জানুয়ারি ২০০৭ )

    সাত
    ‘ফিরে এসো, চাকা, বইটির অসাধারণ কবিতাগুলো সত্বেও বিনয় মজুমদারকে সেই ধরণের গুরুত্ব দেয়া হচ্ছিল না, যেমন শক্তি-সুনীল শক্তি-সুনীল ধুয়ো তুলে একটা প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মে তাঁদের দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছিল । স্বাভাবিক যে নিজের মধ্যে পুষে রাখা অপরত্ববোধ বা আদারনেস বিনয় মজুমদারের মানসিকতায় প্রগাঢ় প্রভাব ফেলে থাকবে । আশ্চর্য যে ওই সময়ের কবিদের তরুণ বয়সের অজস্র ফোটো পাওয়া যায় অথচ বিনয়ের তরুণ বয়সের ফোটো দুষ্প্রাপ্য । বিনয় মজুমদারের প্রায় সমস্ত ফোটোই এমন যে যাঁরা ফোটোগুলো তুলেছেন তাঁরাও প্রমাণ করতে চাইছেন যে বিনয় একজন “অপর’’– উস্কোখুস্কো চুলের বিনয়, লন্ঠন হাতে চলেছেন বিনয়, মাথায় মাফলার জড়িয়ে বিনয়, হাতে বালতি ঝোলানো বিনয়, খালি গায়ে বেঞ্চে বসে বিনয়, ইত্যাদি । আর্যনীল মুখোপাধ্যায় এমনকি লিখেছেন যে বিনয় ছিলেন ‘একসেনট্রিক’ ; আমি বলব বিনয় ছিলেন ‘একলেকটিক’ । বিনয় তো সাহিত্য সভায় কবিতা পাঠও করতেন অথচ সেই সময়ের বিনয়ের ফোটো পাওয়া যায় না কেন ? শক্তি-সুনীল-শরৎ এমনকি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ফোটোও পাওয়া যায়, কিন্তু গায়ত্রীর প্রেমিক যুবক বিনয়ের ফোটো বিরল । অপর করে দেয়া বা ‘আদারিং’ শব্দটি গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের সৃষ্ট ।
    সবচেয়ে বিস্ময়কর, বিনয় মজুমদারের সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা নিয়ে কোনো লোভ ছিল না, যেমনটা ছিল তাঁর দশকের অধিকাংশ কবি-লেখকের, এবং পরের প্রতিটি দশকের কবি-লেখকদের মধ্যে । পুরস্কার, সম্বর্ধনা, রেডিও-টেভিতে রঙিন জামা পরে হাত-পা নাড়াতে দেখা যায়নি তাঁকে । আনন্দবাজার আর দেশ পত্রিকার করিডরে কোনোকালেই ঘুরঘুর করতে যাননি । কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন যে তাঁকে কোনঠাশা করে দেবার প্রয়াস চলছে । তিনি অনুমান করেছিলেন যে তাঁর পাণ্ডুলিপি সেইভাবে সংরক্ষিত হবে না যেভাবে খ্যাতনামা কবিদের পাণ্ডলিপি সংরক্ষণ করা হয় । “অঘ্রাণের অনুভূতিমালা” কাব্যগ্রন্হের পাণ্ডুলিপি যাতে সংরক্ষণ করা হয় তাই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও ওয়েস্ট বেঙ্গল আর্কাইভকে অনুরোধ করেছিলেন । তারা প্রত্যাখ্যান করলে পাঠিয়ে দেন ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে । পঁচিশ বছর পর একটা চিঠি লিখে বিনয় মজুমদার জানতে পারেন যে পাণ্ডুলিপিটি সেখানে সযত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে ।
    গণিত নিয়ে তাঁর গবেষণা সম্পর্কে ১৯৭২ সালে দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে দেয়া সাক্ষাৎকালে বিনয় মজুমদার জানিয়েছিলেন, “১৯৬৩ সালের কিছু চিন্তাকে আমি ভাবলাম মৌলিক আবিষ্কার এবং সেগুলোকে আমি লিখে ফেললাম । লিখে ফেলে প্রথমে আমি ম্যাকমিলান কোম্পানিকে দিয়ে বললাম যে, ভাই দ্যাখ তো তোমরা ছেপে দিতে পারো কিনা পুস্তকাকারে । তবে শেষ পর্যন্ত ছাপা হয়নি, তার কারণ আমি যা শুনেছিলাম, তা হল যে ওদের অধিকাংশই পাঠ্যপুস্তক ছাপার দিকে নজর । একদম একেবারে যা কিনা মৌলিক আবিষ্কার, যা কোথাও পাঠ্য নেই, সেটা ছাপতে ওদের অসুবিধা হয়, বিক্রির ব্যাপার রয়েছে, বিক্রি হয় না । যাই হোক পরে সেই ম্যানাসক্রিপ্ট, ১৯৬৩ সালের ব্যাপার বলছি, ১৯৬৪ সালের শেষ দিকে ব্রিটিশ মিউজিয়াম আমার কাছ থেকে অ্যাকসেপ্ট করল । আমি পাঠিয়েছিলাম, ওরা বলল, হ্যাঁ, আমরা আপনার পাণ্ডুলিপিখানাকে যত্নের সঙ্গে প্রিজার্ভ করছি, আমাদের মিউজিয়ামে রেখে দিচ্ছি । আমি নিশ্চিন্ত হলাম । সেই পাণ্ডুলিপিখানাকে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রিজার্ভ করে রেখেছে । এর মাস কয়েক পর আমি লিখলাম যে
    আমার কাছে তো কোনও কপি নেই ভাই, আমার একটা কপি দরকার । ওরা তখন পুরো ম্যানাসক্রিপ্টকে, ধরো একশো পৃষ্ঠা হবে, সেটাকে ওরা পুরো ফোটোকপি করে, ওই একশো পৃষ্ঠা আমাকে পাঠিয়ে দিলো । আমি সেই ফোটোকপিগুলোকে ভালো করে ভাঁজ করে বাঁধালাম, সুন্দর চামড়া দিয়ে বাঁধিয়ে আমাদের ন্যাশানাল লাইব্রেরি, ভারত সরকারের লাইব্রেরি, ওখানে জমা দিয়ে দিলাম । সে হচ্ছে তোমার ধরো ১৯৬৫ সালের গোড়ার দিকের কথা । আমার পাণ্ডুলিপি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে যে কপি রয়েছে, সেই কপির ভেতরে বারংবার ব্রিটিশ মিউজিয়ামের স্ট্যাম্প মারা রয়েছে । ওই স্ট্যাম্প দেখে ন্যাশানাল লাইব্রেরি ওটা অ্যাকসেপ্ট করল । আমার তারণা ওই পাণ্ডুলিপিখানা এক মৌলিক আবিষ্কার, গণিতের মৌলিক আবিষ্কার । Interpolation Series and Geometrical Analysis and United Analysis Roots of Calculus.” তবে ? যিনি এইভাবে নিজের রচনাবলী নিয়ে চিন্তা করতে পারেন তাঁকে কলকাতার সাহিত্যিকরা ‘পাগল’ হিসেবে দেগে দিল কেন ?
    ১৯৭২ সালে ‘গল্পকবিতা’ পত্রিকায় গণিত ও কবিতা নিয়ে দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেয়া বিনয়ের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল । বিনয় তখন কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছেন, এবং তার কারণ তিনি জানিয়েছিলেন যে গণিত তাঁর মস্তিষ্ক দখল করে আছে । প্রশ্নোত্তরের প্রাসঙ্গিক অংশটুকু পড়লে বিনয়ের সেই সময়কার ভাবনাচিন্তা কোন পথে প্রবাহিত হচ্ছিল তা স্পষ্ট হবে ।
    প্রশ্ন : কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে যে জীবিত খুব কম জনই আপনার মতো কবিতার এতো ভেতরে যেতে পেরেছেন । আপনি খুব সার্থক এবং সাবলীলভাবে, বলা যেতে পারে, কবিতার অতো ভিতরে গিয়েও কেন কবিতা ছেড়ে দিলেন এটা হচ্ছে প্রশ্ন । আর কবিতা লেখা ছেড়ে দেওয়ার আগে পর্যন্ত আপনি নিশ্চয়ই ভেবেছেন যে এই এই কারণে, এই এই অসুবিধে হচ্ছে আমার কবিতা লেখার জন্য — যার ফলে আমি কবিতা লেখা ছেড়ে দেব । আমরা সেই ভেতরের কারণটা জানতে চাইছি ।
    বিনয় : ভেতরের ?
    প্রশ্ন : ভেতরের কারণ বলতে আপনার মনের ভেতরে যে কারণটা ছিল, যেটা আপনাকে কবিতা লেখা ছেড়ে দিতে প্রণোদিত করেছে । এই আর কি !
    বিনয় : কিছুদিন আগে তুমি আমাকে লিখেছিলে যে ‘আমার ঈশ্বরীকে’ বইয়ের পিছনে গণিত গ্রন্হের বিজ্ঞাপন দেখেছ তুমি । শুধু ‘আমার ঈশ্বরীকে’ কেন, অনেকগুলো বইয়ের ভিতরে বিজ্ঞাপন আছে । ‘আমার ঈশ্বরী’ বইয়ের বিজ্ঞাপনও আছে । ‘ঈশ্বরীর’ বলে আমার একটা বই আছে, তার ভিতরেও বিজ্ঞাপন আছে। ‘ঈশ্বরীর কবিতাবলী’ বলে আরেকখানা বই আছে, তার ভিতরেও গণিতগ্রন্হের বিজ্ঞাপন রয়েছে । এমনকি এক ফর্মার একটি ছোটো পুস্তিকা বেরিয়েছিল ‘অধিকন্তু’, সেই ‘অধিকন্তু’র ভিতরেও আমার লেখা গণিত গ্রন্হের বিজ্ঞাপন রয়েছে । এই গণিতের জন্য আমি কবিতা লেখা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম।
    প্রশ্ন : কিন্তু গণিত এবং কবিতা কি পাশাপাশি চালানো যেত না ? আপনি চেষ্টা করলে পারতেন । সকলের পক্ষে সম্ভব না হলেও । এবং গণিত ও কবিতার মধ্যে কোথাও মিলও তো আছে । হায়ার ম্যাথমেটিকসের কথা আমি বলছি, আমি যতদূর শুনেছি অবশ্য।
    বিনয় : কথাটা অবশ্য সত্য । গণিত জিনিসটা ইচ্ছা করলে আত্মস্হ করা যায় না, আবার ইচ্ছা করলে এড়ানোও যায় না । মাথার ভিতরে যখন চিন্তা আসে, গণিত বিষয়ক চিন্তা, তখন তাকে ফেলবার উপায় থাকে না । চিন্তাগুলো বার বার আসতে থাকে । গণিতের নানা সূত্র, গণিতের নানা দর্শন, গণিতের নানা প্রকৃতি মাথার ভিতরে আসতে থাকে, সেটাকে ইচ্ছা করলে বন্ধ করা যায় না । কত সময় মাসের পর মাস মাঝে-মাঝে মাঝে-মাঝেই আসতে থাকে । এইভাবে গণিত একজনের চিন্তাকে, এবং আমার চিন্তাকে আত্মসাৎ করে নিয়ে বসে আছে । আমি এই যে বাড়িতে বসে থাকি, কখনও ঘুরে বেড়াই, যখনই একটু-একটু একা থাকি, অন্য মনে, তখনই দেখা যায় মাথায় গণিতের বিষয়ে চিন্তা আসছে । এই ভাবে আসা শুরু করেছে এমন নয়, বহু-বহু অনেক বছর আগে থেকেই, ১৯৫৬-৫৭ সাল থেকেই বলা যেতে পারে । তারপর প্রায়ই আসে মাঝে-মাঝে, আর আসতে-আসতে যখন কোনও চিন্তাকে মনে হয়, গণিত বিষয়ক চিন্তাকে মনে হয়, যে এটা লিখে রাখা উচিত, কাজে লাগতে পারে, আমার কিংবা অপরের যদি কাজে লাগে, তখন তাকে লিখেও রাখতে হয় । এইভাবে গণিতের চিন্তা আমার সমস্ত চিন্তার ভিতরে একটা প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে আছে দীর্ঘকাল থেকে ।
    প্রশ্ন : গণিতের বিষয় নিয়ে নতুন করে আপনি ভাবতে শুরু করেছেন আবার তাহলে !
    বিনয় : না, কবিতা আমি লিখতাম, এটা ঠিক, কিন্তু সেটা আমার গণিত চিন্তার ফাঁকে-ফাঁকে, এবং তুমি আমার কবিতাগুলো পড়লে দেখতে পাবে যে অধিকাংশই গাণিতিক কবিতা ।
    প্রশ্ন : হ্যাঁ, সেটা আমি লক্ষ্য করেছি ।
    বিনয় : এটা তুমি লক্ষ্য করেছ, ভালো করেছ । বইগুলি এখনও সব পাণ্ডুলিপি আকারে পড়ে আছে । গণিতের কোনও গ্রন্হ আমার ছাপা হয়নি, সমস্ত গ্রন্হই পাণ্ডুলিপি আকারে পড়ে আছে । এখন এই বর্তমানে আমায় তো সারাক্ষণ গণিত ভেবেই কাটাতে হয় । না ভেবে উপায় থাকে না, মাথায় এসে উদিত হয়, যাকে বলে আবির্ভূত হয় । সারাক্ষণ । অন্য কোনও চিন্তা করতেই পারি না । এই চিন্তার উপরে, এই চিন্তার আসা যাওয়ার উপরে, আমার নিজের কোনও হাত নেই । নিজের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই । মাথায় আসতে থাকে সারাবেলা, ফলে কবিতা লেখার কথা ভাবতেই পারি না, কবিতা আর মাথায় এখন আসেই না । তুমি নিজে কবি, কবিতার আবির্ভাব কী করে হয় নিজের মনে বুঝতেই পারো । নিশ্চয়ই টের পাও কবিতা কী করে আবির্ভূত হয় । সে ইচ্ছে করলে যে কবিতা আবির্ভূত হল সেরকমও নয়, আবার ইচ্ছে করে কবিতা এড়িয়ে গেলে সেরকমও নয় । কবিতার যখন আসার সময় তখন এসে যায় । গণিতও সেরকম, যখন আসার সময় তখন এসে যায় । আমার মাথায় এখন শুধু গণিতই আসছে, অন্য কিছু চিন্তা করার অবকাশ থাকছে না ।”
    ‘গ্রন্হি’ পত্রিকার জন্য ১৪১২ বঙ্গাব্দের সাক্ষাৎকারে চন্দন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিনয় মজুমদারের বিজ্ঞানভাবনা নিয়ে যে কথাবার্তা হয়েছিল, তা পড়লে বিনয়ের একটি সামগ্রিক ছবি তৈরি হয় :-
    প্রশ্ন : একজন কবিতা পাঠক হিসেবে যখন কবি বিনয় মজুমদারের মহত্ব বা uniqueness-এর কারণ খুঁজতে বসি, তখন মনে হয় বৈজ্ঞানিক মনন, বৈজ্ঞানিক যুক্তিপদ্ধতি আর বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে কাব্যরসে আগাগোড়া ডুবিয়ে হাজির করার অভূতপূর্ব গুণটিই আপনার কাব্য-সার্থকতার জন্য এক নম্বর কৃতিত্ব দাবি করতে পারে । ‘ফিরে এসো, চাকা’র খুব জনপ্রিয় কয়েকটি লাইন তুলে নিচ্ছি উদাহরণ হিসেবে । ‘মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়’– এই লাইনের শিরদাঁড়া একটি বৈজ্ঞানিক সাধারণ জ্ঞান বা যুক্তিসিদ্ধ পর্যবেক্ষণ ছাড়া আর কিছু তো নয় । অথচ লাইনটি একটি শ্রেষ্ঠ পংক্তি হয়ে উঠল কীভাবে ? ‘প্রকৃত’ শব্দের প্রয়োগের জন্য । ‘প্রকৃত’ শব্দটি কাব্যগুণের দ্যোতক হিসেবে কাজ করছে এখানে । একই ভাবে, ‘একটি উজ্বল মাছ…পুনরায় ডুবে গেল’, এই দীর্ঘ বিখ্যাত কবিতার লাইন মূলত বিধৃত করেছে ক্লাস নাইনের ফিজিক্স জ্ঞানকে, একটি নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিশিয়ে । আমরা সবাই পড়েছি জলের রঙ নেই । গভীর জলের মধ্যে যখন আলোকরশ্মি প্রবেশ করে, তখন রশ্মিগুচ্ছ বর্ণালীতে বিশ্লিষ্ট হয় । বর্ণালির সাতটি রঙের সাতটি বিভিন্ন চ্যুতিকোণ আছে । জলের গভীরতার ওপর নির্ভর করে কোনও নির্দিষ্ট রঙের চ্যুতি আমাদের চোখের অবস্হানের সঙ্গে মিলে-মিশে যায় । ফলে জলকে আমরা সেই রঙেই রঙিন দেখি। আপনি দৃশ্যত সুনীল না লিখে দৃশ্যত সবুজ বা দৃশ্যত তমস — যেখানে সব রঙ শোষিত — লিখতে পারতেন। কিন্তু লাইনটায় কবিতা সৃষ্টি হল ‘প্রকৃত প্রস্তাবে’ শব্দবন্ধের আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে । বিজ্ঞানভাবনার হাড়কাঠামোর ওপর সৌন্দর্যের মাংসত্বক বসিয়ে দিলো সে । এইরকম নানা উদাহরণ আছে । যেমন মশা উড়ে গেলে তার এই উড়ে যাওয়া ‘ঈষৎ সঙ্গীতময় হয়ে থাকে’ সেই বিষয়টা । এখন কথা হচ্ছে বৈজ্ঞানিক মননকে এভাবে বাংলা কবিতায় তো কেউ আনেননি ?
    বিনয় : তোমাদের এই কথাটা ভুল । প্রাচীনকালেও কবিরা বিজ্ঞানভাবনা থেকে কাব্যের আঙ্গিক সৃষ্টি করে নিয়েছেন । আমি যে খুব নতুন কিছু করছি তা নয় । যেমন ধরো কালিদাসের ‘কুমারসম্ভব কাব্য’ । একটি দৃশ্যে যখন হরপার্বতীর বিয়ে হচ্ছে, সেখানে কালিদাস লিখলেন, পৃথিবীর চারদিকে যেমন আলো আর অন্ধকার ক্রমাগত ফিরে-ফিরে আসে, তেমনি শিব আর উমা আগুনের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছেন । এটা তো বিজ্ঞানই । অথবা, এই সংস্কৃত শ্লোকটি লক্ষ্য করো — ‘হংসের্যথা ক্ষীরম অম্বু মধ্যাত’। মানে হল, হাঁস যেমন অম্বু অর্থাৎ জলের ভেতর থেকে ক্ষীর বেছে নেয় । তো, এটাও তো সেই তোমার ভাষায় যুক্তিসিদ্ধ বা বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকে কাব্যে প্রকাশ করা । তাই নয় কি ? আমিও লিখেছি ‘ব্রোঞ্জের জাহাজ আছে যেগুলি চুম্বক দ্বারা আকৃষ্ট হয় না । এরূপ জাহাজে বৈজ্ঞানিক সামুদ্রিক গবেষণা করে।’ এই কবিতাটি ‘গায়ত্রী’ কাব্যগ্রন্হে আছে । ‘ফিরে এসো, চাকা’তে নেওয়া হয়নি ।
    প্রশ্ন : বেশ । কিন্তু পরের দিকের কাব্যগ্রন্হে আর একটা জিনিস লক্ষ্য করা গেল । বিজ্ঞান বা অঙ্কের কোনো কনসেপ্টকে আপনি মানবজীবনের কোনও ঘটনার মতো উল্লেখ করেছেন কবিতায় । বা বহু জায়গায় অঙ্কের সূত্র দিয়ে মানুষের জীবনকে ব্যাখ্যা করতে চাইছেন । বিজ্ঞান ও অঙ্কের সূত্রেরা এভাবে রক্তমাংসে জীবিত হয়ে উঠছে ।
    বিনয় : মনুষ্যীকরণ । মনুষ্যীকরণ । আর কিছুই না । সেই সময়ে বিজ্ঞানের বেশ কিছু বই অনুবাদ করতে হয়েছিল আমাকে । বইগুলো মন দিয়ে পড়ে দেখলাম, বৈজ্ঞানিক সত্যদের মানুষের জীবনের সঙ্গে মেলানো যায় । এবং এটা কবিতা লেখার এক নতুন পদ্ধতি হতে পারে ।
    প্রশ্ন : সীমা, অসীম, কল্পনা, ব্যোম, রেখা ইত্যাদি জ্যামিতিক ধারণাগুলিকে আপনি মানব বা মানবীচরিত্র দিতে লাগলেন কবিতায় । জ্যামিতির ওপরও আপনার অসম্ভব টান লক্ষ্য করি ।
    বিনয় : ঠিক তাই । আচ্ছা আমি হচ্ছি ইঞ্জিনিয়ারিঙের ছাত্র । একটা কথা আছে, ড্রইং ইজ দি ল্যাঙ্গুয়েজ অফ ইঞ্জিনিয়ার্স । আমি যদি একটি ড্রইং এঁকে পাঠিয়ে দিই তবে পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তেই একজন ইঞ্জিনিয়ার সেটি দেখে বুঝতে পারবে আমি কী বলতে চেয়েছি । নানা রকম ভাবনা মনে আসে । ধরো ম্যাক্সিমা-মিনিমা বিষয়টা । একটা কার্ভড লাইনের পয়েন্ট অফ ইনফ্লেকশান-এ কার্ভটাকে ডিফারেনশিয়েট করলে পাচ্ছ একটা পজিটিভ ম্যাক্সিমা, তাকে আবার ডিফারেনশিয়েট করলে আসবে নেগেটিভ স্ট্রেট লাইন, তাকে ফের ডিফারেনশিয়েশানের ফল হলো নেগেটিভ মিনিমা বা ইনফিনিটি…অর্থাৎ অসীম । সুতরাং কার্ভটির পয়েন্ট অফ ইনফ্লেকশান-এ কী ঘটছে, তার একটা ডায়াগ্রাম এঁকে আমি একখানা জেরক্স করে রেখেছি ।
    প্রশ্ন : আপনার আরেকটি চূড়ান্ত রহস্যময় কবিতা হলো ‘সমান সমগ্র সীমাহীন’-এর ছয় নম্বর লেখাটি: ‘একটি বিড়ি ধরিয়ে সেই পোড়া দেশলাই/কাঠি দিয়ে আমি/টেবিলে লিখেছিলাম অসীম এক নং যোগ অসীম দুই নং যোগ অসীম তিন নং যোগ ফোঁটা ফোঁটা ফোঁটা…’ এবং তারপর লেখা যখন সমাপ্তিকে ছুঁতে চাইছে সেই সময়ে ‘পেলাম অসীম সিংহ/পেলাম অসীম বালা, অসীম মজুমদার/পেলাম অসীম রায় ভাইরে/অসীম’ । আমরা জানি ইনফিনিটি অবিভাজ্য । তো এই অসীমকে ভাগ করা বা বিভিন্ন অসীমের ধারণা করা কীভাবে সম্ভব ?
    বিনয় : কতকগুলো চিন্তা আমার মাথায় অনেকদিন ধরেই ঘুরপাক খায়, এটি তার অন্যতম । ধরা যাক, আমাদের এই ঠাকুরনগরে এক বিঘে বর্গ ক্ষেত্রাকার জমি আছে, অর্থাৎ দৈর্ঘ্যে এক বিঘে, প্রস্হেও এক বিঘে । এবার যদি মাটির ওপর ওই জমির অংশটুকু কল্পনা করি, তবে তা আকাশ ছাড়িয়ে অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে যাবে । একইভাবে জমিটির মাটির নীচেও নেমে যেতে অসীম পর্যন্ত ছড়িয়েছে । কাজেই এক বিঘে বর্গক্ষেত্রের এক টুকরো অসীম পাওয়া গেল ।
    প্রশ্ন : কিন্তু বর্গক্ষেত্র তো দৈর্ঘ্য আর প্রস্হের গুণফল । তার অস্তিত্বের ধারণা শুধুমাত্র টু-ডাইমেনশানাল । সেটি আকাশে বা পাতালে প্রসারিত হওয়ার উপায় কোথায় ?
    বিনয় : বেশ, তাতে না হয় আমি আরেকটি মাত্রা জুড়ে দিলাম । সুতরাং তাকে ত্রিমাত্রিক কল্পনা করতে আর অসুবিধা নেই । এইভাবে, ধরো, ওই এক বিঘে বর্গক্ষেত্রের পাশে আর এক টুকরো এক বিঘের বর্গক্ষেত্র, তার পাশে আরও একটা, এইভাবে টুকরো টুকরো অসীমকে পেয়ে যাচ্ছি । এই অংশগুলির কোনওটির নাম দেয়া যায় অসীম বালা, কেউ অসীম রায়, কেউ অসীম মজুমদার ইত্যাদি । আবার এই সব আলাদা অসীমের যোগফল এক পূর্ণ অসীমও কিন্তু রয়েছে । সে যেন এক ঈশ্বর, এই ব্রহ্মাণ্ডের রাজা । সম্পূর্ণ অসীম যেন এই ছোট-ছোট অসীমের সাহায্যে আমাদের বিশ্বকে শাসন করে চলেছে ।
    ২০০০ সালে ভালোবাসা নিয়ে রোমন্হন করেছিলেন বিনয় মজুমদার, এবং আরেকবার ভেবেছিলেন মানসিক শান্তির কথা এই কবিতাটিতে :-

    একমাত্র ভালোবাসা
    ভালোবাসা একমাত্র ভালোবাসা ভরে দিতে পারে মনে
    শান্তি এনে দিতে
    কেবল নারীর প্রতি পুরুষের কিংবা কোনো পুরুষের প্রতি
    কোনো নারীর প্রণয় ভালোবাসা ।
    — এ তো আছে থাকবেই, তদুপরি প্রতিটি বিশেষ্য পদকেই
    ভালোবাসা হল সেই ভালোবাসা যাতে মনে
    শান্তি এনে দেয়
    আর এই শান্তি কী বা আমাদের প্রয়োজন ?
    মনে যদি শান্তি থাকে তবে আর কোনো কিছু
    চাওয়ার থাকে না ।
    যদি বা চাওয়ার থাকে তা এরূপ যাতে মনে
    শান্তি ঠিক আগের মতন থেকে যায়
    আমাদের চাওয়া আর পাওয়ার তালিকাগুলি এইভাবে
    আমরাই তৈরি করে থাকি ।
    ( কবিতা বুঝিনি আমি — জানুয়ারি ২০০১ )

    আট

    যে লোকটির নিজের সম্পর্কে এই ইতিহাসবোধ আছে তাঁকে কেমন করে ‘পাগল’ বলা হয় ? এ যেন উস্কো-খুস্কো চুলের জন্য আইনস্টাইনকে পাগল বলার মতন । বস্তুত বিনয় মজুমদারের মানসিক চিকিৎসালয়ের প্রেসক্রিপশানগুলো কোনো গ্রন্হের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত ।
    বিনয় মজুমদারের রাজনৈতিক মতামত নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে, বিশেষ করে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত “আমি এক কমিউনিস্ট এই কথা উচ্চারিত হোক/দিকে-দিকে পৃথিবীতে’, কবিতাটি লেখার পর । ‘কবিতা বুঝিনি আমি’ কাব্যগ্রন্হে তাঁর এই কবিতাটিও বিতর্ককে উসকে দিয়েছে :-

    দেশে সাম্যবাদ এলে
    দেশে সাম্যবাদ এলে সকল মন্দির
    ডিনামাইটের দ্বারা ভেঙে ফেলা হবে
    আর যদি কেউ তার বিবাহের কালে
    পুরোহিত ডেকে আনে মন্ত্র পড়াবার
    নিমিত্ত তাহলে তাকে যাবৎ জীবন
    কারাদণ্ড দেওয়া হবে যথা ভগবান
    নামক ব্যক্তিকে দাহ করা দরকার
    হয়ে পড়ে একদিন অথবা যেমতি
    অন্ধকারে বজ্রপাত প্রয়োজন হয় ।
    মাঝে-মাঝে মন ক্রমে মহীর মানুষ
    অসভ্য অসভ্যতর হয়েই চলেছে
    এইভাবে মুহূর্তেই ভাবি মানুষের
    গড় আয়ু বেড়ে যাচ্ছে — এ চিন্তা আমার
    সান্ত্বনা আনত না মনে, আমি তো ভ্রান্ত না ।

    কিন্তু ১৯৮২ সালে ‘কবিতীর্থ’ পত্রিকার দেয়া সাক্ষাৎকারে সমর তালুকদার যখন তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, “শুনেছি সেই সময়ে ( ১৯৫১-১৯৫২ ) তুমি মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচিতই হওনি শুধু — ‘ডাস ক্যাপিটাল’-টাও নাকি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ে ফেলেছিলে ?” জবাবে বিনয় বলেন, “সে সময়টা বড়ো অদ্ভুত সময় ছিল । মার্কসবাদ সম্পর্কে লেখাপড়া, মার্কসবাদ নিয়ে আলোচনা একটা ফ্যাশানের মতোই দাঁড়িয়ে গিয়েছিল — বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে । Serious commitment of sincere conviction কতটা ছিল তা বুঝতেই পারি আজ ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট আন্দোলনের চেহারা দেখেই । চীনের পার্টি আর আমাদের পার্টির জন্ম প্রায় একই সময়ে — ওরা কোথায় আর আমরা কোথায় ! কী করেই বা হবে ? — ভাবা যায় কমিউনিস্ট পার্টির ( ভারতের ) ইতিহাস লেখা হচ্ছে বুর্জোয়া সরকারের জেলে বসে — ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস ! একে এক ধরণের অর্ডারি লেখা বলা যায় নাকি ? আমি নিজে ন্যাশানাল বুক এজেন্সিতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রুফ দেখে দিয়েছি।”
    সমর তালুকদার বিনয়কে বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে তো কমিউনিস্টরা শাসন চালাচ্ছেন এখন ?” উত্তর বিনয় বলেন, “ধ্যূৎ, এরা আবার কমিউনিস্ট নাকি !” লক্ষ্যনীয় যে বিনয় মজুমদার কথাটা বলছেন ১৯৮২ সালে, এবং তখনই তিনি আঁচ করে ফেলেছিলেন নেতাদের অধঃপতন, অথচ বহু কবি-লেখক সেসময়ে আর তারপরও বহুকাল বামপন্হীদের লোভী লেজুড় আর স্যাঙাত হয়ে সেঁটে ছিলেন । সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে তো মৃত্যুর কয়েক বছর আগেও দেখা গেছে বইমেলায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পেছন-পেছন ঘুরছেন । স্বাভাবিক যে বিনয়ের মতন এই ধরণের খোলাখুলি কথাবার্তা বললে কার্ড হোল্ডারদেরও পার্টিতে পাত্তা দেয়া হতো না ।
    ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকার জন্য মারুফ হোসেনের সঙ্গে বিনয়ে যে প্রশ্নোত্তর হয়েছিল তা থেকে তাঁর সামাজিক অবস্হানের আঁচ পাওয়া যায় ।
    প্রশ্ন : ষাট-সত্তরের উত্তাল সময় । খাদ্য আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, নকশাল আন্দোলন । বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সময়কে নিয়ে কবিতা লিখে চলেছেন একের পর এক, সহযাত্রী মণিভূষণ ভট্টাচার্য, সমীর রায় প্রমুখ । আর আপনি ১৯৬৬ সালে লিখলেন ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ । প্রকাশ হল ১৯৭৪-এ । এটা কি সময় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয় ?
    বিনয় : আমি লিখেছি আমাকে নিয়ে, অন্য কাউকে নিয়ে কবিতা লিখিনি । সবই আমার দিনপঞ্জি । দিনপঞ্জি লিখে লিখে এতটা বয়স হলো/দিনপঞ্জি মানুষের নিকটতম লেখা । ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ হল আমার একাকীত্ব নিয়ে ।
    প্রশ্ন : ওই সময় আপনার জীবনে কোনও প্রভাব ফেলেনি ?
    বিনয় : না, একদম না । আমি তখন থাকতাম কলকাতা -২৮, মানে দমদম ক্যাণ্টনমেন্টে দিদির বাড়ি । আসলে পঞ্চাশের কবিরা প্রায় সবাই আত্মজীবনীমূলক কবিতা লিখেছে । শুধুমাত্র নিজেদের নিয়ে লেখা । এটা একটা ট্রেণ্ড বলা যেতে পারে । কেননা এর আগে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বিষয়ে কবিতা লিখেছেন । জীবনানন্দ লিখেছেন, নজরুল লিখেছেন । পঞ্চাশের পরেও বিভিন্ন কবিরা লিখেছেন । কিন্তু পঞ্চাশের প্রায় সবাই নিজেদের নিয়ে লিখেছে ।
    প্রশ্ন : এর কারণ কী বলে মনে করেন আপনি ?
    বিনয় : তার আবার কারণ কী ! তখন দেশ সবে স্বাধীন হয়েছে । সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত কবি বলে আমাদের কবিতায় আনন্দের কথা ছিল । স্ফূর্তিও ছিল প্রচুর ।
    ২০০১ সালে ‘লোক’ পত্রিকার জন্য শামীমুল হক শামীম-এর সঙ্গে প্রায় একই বিষয়ে বিনয়ের সঙ্গে এই কথাবার্তা হয়েছিল :-
    প্রশ্ন : আপনি যখন লেখালিখি শুরু করেন তখনকার কলকাতার আর্থ-সামাজিক অবস্হা সম্পর্কে জানতে চাই ।
    বিনয় : আর্থ-সামাজিক অবস্হা কী হবে ? সবে দেশ স্বাধীন হয়েছে । প্রচুর উদ্বাস্তু এসে হাজির হয়েছে । কলকাতায় তাদের থাকতে দেওয়ার জায়গা হচ্ছে না । বাড়িঘর নেই, বেকার, চাকরি নেই, কী চাকরি দেবে ? চাল-ডালের অভাব । এখন একেক বিঘে জমিতে ধান হয় ২৫ মন, তখন হতো ৮ মন । খাবার নেই । পুরো বীভৎস অবস্হা তখন । ১৯৫৩ সালে অনেক হাতে-পায়ে ধরে নেহরু আমেরিকা থেকে গম আনায় । দেশ ভাগ হয়েছে ১৯৪৭-এ । সারা বছর না খেয়ে, শুটকি মেরে, চাকরি নেই, বাকরি নেই, থাকার জায়গা নেই — এ অবস্হায় থেকে ৬ বছর পর আমেরিকা দয়া করে গম পাঠাল । সেই গম খেয়ে-খেয়ে মানুষের দিন চলে । কিন্তু দেশ তো স্বাধীন । ৫০-এর কবিরা সেই স্বাধীনতা পাওয়ার ঠিক পরবর্তী সময়কার কবিরা, স্বাধীন যে বছর হল সেই বছর বেশ কিছু কবিতা লিখেছি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও তাই । কবিতাগুলো খুব আনন্দদায়ক হয়েছিল কিংবা আনন্দ-স্ফূর্তির কবিতা হয়েছিল ।
    প্রশ্ন : তার মানে কম বয়সে লেখার ফলে আনন্দদায়ক হয়েছিল ?
    বিনয় : না, স্বাধীনতা পাওয়ার ফলে ।
    ‘ পুনর্বসু’ পত্রিকার জন্য দেয়া ১৯৮৭ এর সাক্ষাৎকারে, রণজিৎ দাশ জানতে চেয়েছিলেন, “শেষ লেখাটায় আপনি বলেছেন, যে আমি এক কমিউনিস্ট, এই কথা উচ্চারিত হোক ?” জবাবে বিনয় বলেন, “হ্যাঁ, যখন আমি লিখেছিলাম, তখন আমার মনে হল যে এইটা হওয়াই ভালো বুঝলে, ‘পরিচয়’ পত্রিকা… ’পরিচয়’ পত্রিকা, আমার কাছে একটা কবিতা চাইল । কমিউনিস্টদের কাগজ, বুঝেছ ? তখন ভেবে চিন্তে দেখলাম, লিখে দেব । কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য আমি ছয়মাস ছিলাম । এত খাটতে হয়, এত দৌড়োদৌড়ি ছুটোছুটি, যে আর আমার দ্বারা হল না, ছেড়ে দিলাম । হ্যাঁ, রাত্তির সেই এগারোটা পর্যন্ত বক্তৃতা, বুঝতে পারছ ?”
    এখানে পরিষ্কার যে বিনয় মজুমদার সেই সময়ের চালু ধুয়ো “গরিব হওয়া ভালো, উদ্বাস্তু হওয়া ভালো, সর্বহারা হওয়া ভালো, ইংরেজি না শেখা ভালো, কমপিউটার না শেখা ভালো, অবরোধ করা ভালো, কারখানা লাটে উঠিয়ে দেয়া ভালো” ইত্যাদি ভাঁওতার খপ্পরে পড়েননি ।
    কেবল বামপন্হীদের সমালোচনায় নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি বিনয় মজুমদার । অগ্রজ আর সমসময়ের কবিদের সম্পর্কেও নিজের মনের কথা বলেছেন, রাখঢাক করেননি । ১৯৯৮ সালে ‘অধরা মাধুরী’ পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকারে বোধিসত্ব রায় বিনয়ের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলেন, “বাংলা আধুনিক কবিতা কি পাশ্চাত্যের অনুসারী ?” উত্তরে বিনয় বলেন, “না তো ! ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট আমলে যত বাঙালি কবি ছিল সবাই ইংরেজির অধ্যাপক । ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট এদের ছাড়া কাউকে কবি হতে দেয়নি । জীবনানন্দ, সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণুদে, সমর সেন, অমিয় চক্রবর্তী এঁরা ইংরেজির অধ্যাপক । ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের ইচ্ছানুসারে এই সব কবির কাজই ছিল ইউরোপিয়ান কবিতা নকল করা।”
    ২০০১ সালে ‘লোক’ পত্রিকার জন্য শামীমুল হক শামীমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেন, “শক্তি খুব ভালো কবিতা লিখত কিন্তু শেষ বয়সে মাথাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল । সুনীল যে কী লেখে তা আমি জানি না । মন্তব্য না করাই ভালো ।” ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকার জন্য মারুফ হোসেনের প্রশ্ন, “আপনার সমসাময়িক কবিদের কবিতা আপনার কেমন লাগে?” এর উত্তরে বিনয় বলেছিলেন, “এদের কবিতা আমার খুব বেশি ভালো লাগে বলি না । উৎপলকুমার বসুর কবিতা ভালো লাগত । ‘গোলাপ তোমাকে আমি ঈর্ষা করি/কত না সহজে তুমি তার মত্ত কেশে ঢুকে যাও ।” উৎপল বসুর এটুকু কবিতাই মনে আছে । অমিতাভ দাশগুপ্তর কবিতা একখানাও মনে নেই ।”
    ১৯৮২ সালে ‘কবিতীর্থ’ পত্রিকার জন্য নেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন, “সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর সে ধরনের কবিতা লিখছেন কোথায় — ওনাকে এখন বরঞ্চ ঔপন্যাসিক বলাই ভালো । নীরেন চক্রবর্তীর অনেক আগের লেখা মন্দ নয় — এখন উনি লেখা বন্ধ করে দিলেই ঠিক কাজ হবে বলে মনে হয় । শঙ্খ ঘোষ মাঝে মাঝে ভালো লেখেন ।” প্রতিষ্ঠানে যাঁরা ছড়ি ঘোরান তাঁদের সম্পর্কে এই ধরণের সাক্ষাৎকার দেবার পর যে সাহিত্যের জন্য পুরস্কার পাওয়া এবং বহুল প্রচারিত পত্রিকার পাতায় ঠাঁই পাওয়া কঠিন তা আমরা বহুকাল হলো জেনে গেছি ।
    জীবনের শেষ দিকে বিভিন্ন পুরস্কার পাবার আগে বিনয় মজুমদারকে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত পুরস্কার দেয়া হয়েছিল, দশ হাজার টাকা, প্রধানত তাঁর আর্থিক অবস্হার কারণে । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পুরস্কারের টাকা নিয়ে গিয়েছিলেন এবং বিনয়কে পুরস্কারটি দেবার জন্য একটি মঞ্চ তৈরি করে অনুষ্ঠান করা হয়েছিল । বিনয় মজুমদার বসে ছিলেন একটি চেয়ারে । একের পর এক বক্তা সাম্প্রতিক কবিতা নিয়ে, বিনয় মজুমদারের কবিতা নিয়ে বক্তৃতা দিতে থাকেন । ঘণ্টাখানেক পর বিরক্ত হয়ে বিনয় মঞ্চ থেকে নেমে নিজের ঘরে ফিরে যান । কিন্তু তারপরও বক্তৃতা থামেনি । কলকাতা থেকে যাঁরা বক্তৃতা দেবার জন্য গ্রামে পৌঁছেছিলেন, সবায়ের কোটা শেষ হবার পর অনুষ্ঠান ফুরোয় । চা-সিঙাড়া-সিগারেট পর্ব শেষে তাঁরা বিনয়ের ঘরে গিয়ে দেখেন যে তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন ।
    মৃত্যুর এক বছর আগে তাঁকে অকাদেমি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল, রবীন্দ্র পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল ওই বছরেই, তাও সেই পুরস্কারটি তাঁকে ভাগাভাগি করে নিতে হয়েছিল জীবনানন্দ গবেষক ভূমেন্দ্র গুহর সঙ্গে ! রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়ে বিনয় বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার একজন ডাক্তার আর একজন ইঞ্জিনিয়ারকে সাহিত্যের স্বীকৃতি দিলো । রবীন্দ্র পুরস্কার তাঁর আগে দেয়া হয়েছিল অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত, অমিতাভ দাশগুপ্ত এবং সমরেন্দ্র সেনগুপ্তকে । আনন্দ পুরস্কার তাঁকে দেয়া হয়নি, যে পুরস্কার পেলে তাঁর দৈনন্দিন খরচের সুরাহা হতো, অথচ ওই পুরস্কার দুবার করে দেয়া হয়েছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তসলিমা নাসরিন ও জয় গোস্বামীকে । অকাদেমি পুরস্কার নিতে তিনি যাননি, তাঁর ঠাকুরনগরের বাড়িতে এসে দিয়ে যান দিব্যেন্দু পালিত, উপস্হিত ছিলেন অমিয় দেব ।
    বিনয় মজুমদার কয়েকবার আত্মহত্যার প্রয়াস করেছিলেন বলে শোনা যায় । ঠিক কোন কারণে তিনি নিজের জীবনকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন, সে-বিষয়ে কোনো সাক্ষাৎকার অথবা নিকটজনের বিবৃতি পড়িনি । পুলিশও হস্তক্ষেপ করেছিল কিনা জানি না । তবে স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় জিন জাগ্রত হয়ে উঠলে সেই সময়টায় আত্মহত্যা করার রোখ মাথায় চেপে বসে ।
    জয় গোস্বামী, যিনি বিনয়ের কবিতার পাণ্ডুলিপি দেখেছেন, এবং টেলিফিল্মে বিনয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, তিনি ‘আকস্মিকের খেলা’ ( ২০০২) গ্রন্হে বলেছেন যে বিনয়ের ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্হের পাণ্ডুলিপি যেন কাফকার ডায়েরি । পাণ্ডুলিপির মার্জিনে আছে স্বপ্নের অনুবর্তীতা, দ্রুত-নেয়া নোট, সংক্ষিপ্ত লিখন — তাঁর মনে হয়েছে তিনি যেন কবির পাশেই রয়েছেন, যেমন যেমন কবি তাঁর লাইনগুলোকে আদল-আদরা দিচ্ছেন ।
    জয় গোস্বামী এই সূত্রে উল্লেখ করেছেন বার্গম্যানের ‘থ্রু এ গ্লাস ডার্কলি’ ফিল্মটির, যা মোটামুটি ‘ফিরে এসো, চাকা’ রচনার সমসাময়িক । ফিল্মটিতে একজন নারী দেয়ালের ফাটলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন, যা নারীটিকে এক ঐন্দ্রজালিক জগতে নিয়ে যায়, যেখানে সবাই আলোচনা করছে এবং অপেক্ষা করছে, লোকগুলোর মুখশ্রী উজ্বল, যে কোনো মুহূর্তে ঈশ্বরের দেখা পাবার জন্য । একজন কবি যদি ভিন্নভাবে আসপাশের বস্তু ও ঘটনাবলীর দিকে তাকান, এবং সাধারণ মানুষ যেটুকু সচরাচর দেখতে পায়, তার চেয়েও বেশি কিছু দেখতে পান কবি, তাহলে তাকে মানসিক রোগগ্রস্ত তকমা দিয়ে দেয়া হয়, ‘থ্রু এ গ্লাস ডার্কলি’ ফিল্মের নারীটির মতো ।
    গ্রামের পথে বাজারে বিনয় মজুমদার স্হানীয় একটি দোকানের দিকে তাকিয়ে যখন অবলোকন করেন, তা শার্ল বদল্যারের ফ্ল্যনেয়ার থেকে ভিন্ন । তিনি দোকানটি, দোকানে রাখা জিনিসপত্র, দোকানের বিক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং সম্পর্কটির বিস্তার ঘটিয়ে বিশাল সৃষ্টিজগতের সঙ্গে সম্বন্ধস্হাপন করেন । সাধারণ গ্রামীণ দোকানটির সম্পর্ক রয়েছে স্হানীয় খেতের চাষিটির সঙ্গে, পৃথিবীর অভিকর্ষের সঙ্গে, অক্লান্ত সূর্যের সঙ্গে, দেবী সরস্বতীর সঙ্গে । ‘বিনয় মজুমদারের ছোটগল্প’ ( ১৯৯৮ ) গ্রন্হে শিমুলপুরে তাঁর দিনযাপনের চিন্তাকর্ষক খতিয়ান মেলে ।

    নয়
    একজন কবির সঙ্গে জনসাধারণ কেমনতর আচরণ করেন তা আমরা কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে দেখেছি ; তাঁর জন্মদিন এলে তাঁকে বিয়ের বরের মতন কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করা হতো । অথচ কবি কিছুই বুঝতে পারছেন না । ভ্রাতৃতুল্য ব্যক্তির প্রতি নিষ্ঠুরতা হলো সম্পর্কের একটি প্রাগৈতিহাসিক আচারানুষ্ঠান । কবিরা এই সামাজিক শোষণপদ্ধতি থেকে পরিত্রাণ পান না, বিশেষ করে তাঁকে যদি মনে করা হয় মস্তিষ্কবিকৃত একজন প্রতিভাধর ব্যক্তি । জন্মদিন পালন এই আচারানুষ্ঠানে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুরতা ও অবমাননার উৎসব, যাতে অংশগ্রহণ করে লোকটিকে হেনস্হা করা হয়, এবং প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে মানুষটিকে সমভোগতান্ত্রিক বারোয়ারি পীঠস্হানে বসিয়ে হাস্যকর করে তোলা হয় । প্রতিভাবান মানুষকে নিষ্ঠুরতার অস্ত্র প্রয়োগ করে রোমান্টিসাইজ করার এটি একটি ভয়ঙ্কর খেলা । বিনয় এটি বুঝতে পেরেছিলেন, আর সে কথা তাঁর ‘কয়েকটি কবিতা’র ছয় সংখ্যক কবিতায় লিখেছেন :

    আমার জন্মদিন পালন করত আগে
    কয়েক বছর আগে ।
    আহ্বায়ক ছিল অমলেন্দু বিশ্বাস নৌকা পত্রিকার সম্পাদক ।
    দৈনিক ‘আজকাল’ পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হতো–
    ‘১৭ই সেপ্টেম্বর কবি বিনয় মজুমদারের
    জন্মদিন পালন করা হবে, আপনারা দল বেঁধে আসুন
    শিমুলপুরের কবির বাড়িতে ।’
    অনেকেই আসত । এসে কবিতাপাঠ গানবাজনা
    ইত্যাদি করত । এই অনুষ্ঠানে খাওয়া দাওয়াও হতো ।
    কয়েক অতিথি আমার প্রতি সদয় ছিল না–
    আমাকে কতবার মানসিক হাসপাতালে
    নেওয়া হয়েছিল সেই কথা আমাকে শুনিয়ে শুনিয়ে
    আলোচনা করত । তাতে আমি মনে খুব ব্যথা পেতাম ।
    ফলে আমি আমার জন্মদিন আর পালন করতে দিই না ।
    আমার জন্মদিন পালন বন্ধ হয়ে গেছে ।

    কবিতাটি থেকে স্পষ্ট যে, আয়োজকগণ এবং যাঁরা কলকাতা থেকে গিয়ে শিমুলপুরে জড়ো হতেন, তাঁরা গোপনে একজন প্রতিভাবান স্কিৎসোফ্রেনিয়া রোগির রোগটিকেই উৎসবে বদলে দিয়ে নিজেরা আনন্দ করতে চাইতেন । কবিকে মনে করিয়ে দিতেন যে তিনি কতোবার মানসিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ছিলেন, যেন মানসিক চিকিৎসালয়ে থাকা একজন দ্রষ্টা কবির বৈশিষ্ট্য । তাঁকে মনে করিয়ে দেয়া হতো যে তাঁর অসুস্হ জীবনের আরেকটি বছর হাতছাড়া হয়ে গেল । নিজের জন্মদিনে জড়ো হওয়া লোকগুলো সম্পর্কে যিনি এরকম কবিতা লিখতে পারেন, তাঁকে কি মানসিক অসুস্হ বলা যায় !
    ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’ ( ২০০৩ ) কাব্যগ্রন্হের ভূমিকায় বিনয় মজুমদার লিখেছেন, “কবিতীর্থ প্রকাশিত ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’ গ্রন্হের প্রায় সব কবিতাই হাসপাতালে থাকাকালে লিখেছি । একটা কথা আমি দিনে তিনচার বার বলি — সবই সৃষ্টিকর্তার লীলাখেলা । এবারেও তাই লিখি । আমাকে হাসপাতালে পুরে সৃষ্টিকর্তা কী পরীক্ষা করলেন কে জানে ! কী দুরূহ পরীক্ষা দিতে হয়েছে আমাকে সৃষ্টিকর্তার কাছে এবং পাঠকপাঠিকাগণের কাছে । পরীক্ষায় পাশ করেছি বোঝা যায় ।”
    “কবিতা লেখা আমি মাঝে-মাঝে ছেড়ে দিই । তখন এমন-এমন কাণ্ড ঘটে যাতে ফের লিখতে বাধ্য হই । এই বইখানাও তেমনি জোর করে লেখানো । কবিতা না লিখে বছর চারেক ছিলাম । তারপর আমাকে হাসপাতালে পুরে কাগজ এবং কলম দিয়ে আমাকে বলা হল — ‘কবিতা লিখলে ছাড়া হবে নচেৎ নয়।’ তার ফলে আমি লিখেছি ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’ বইখানা ।”
    স্কিৎসোফ্রেনিয়ার নিরাময় হিসাবে হয়তো মানসিক চিকিৎসকরা তাঁকে কবিতা লিখতে বলতেন ।
    রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বাঙালির নিষ্ঠুরতা বিষয়ে বিনয় একটি কবিতা লিখেছেন, শিরোনাম ‘কিছু কিছু কবির’ । এই কবিতাটিতে বিনয় মজুমদার দেখিয়েছেন যে মৃত্যুপথযাত্রী রবীন্দ্রনাথের প্রতি নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে যতো বেশি পারা যায় কবির প্রত্যাদেশ ছেঁকে বের করে আনার চেষ্টা করেছিল সমবেত জনগণ । রবীন্দ্রনাথের সেই মুহূর্তের কাঁপা কাঁপা কন্ঠের কবিতাকে দ্রষ্টার দিব্যদৃষ্টি করে তোলার চেষ্টা হয়েছিল, যাকে বলা যায় রবীন্দ্রনাথের ‘বাণী’ । একজন কবি, যিনি মানবজীবনের অস্হিরতা সম্পর্কে চিরকাল চিন্তা করে গিয়েছেন, তাঁকে মৃত্যুশয্যায় একটি স্বয়ংক্রিয় দিব্যদৃষ্টির যন্ত্রে পালটে ফেলার চেষ্টা হলো । এখনকার দিন হলে মোবাইল ফোনে রেকর্ড করা হতো, টিভি সাংবাদিকরা ক্যামেরা মাইক নিয়ে পৌঁছে যেতো আর জানতে চাইতো তিনি কেমন ফিল করছেন ! । বিনয়ের ক্ষেত্রেও, “মানসিক হাসপাতাল থেকে ফেরা” কিংবা “মানসিক হাসপাতালে প্রতিভাবান কবি বিনয়” নাম দিয়ে মোবাইলে তোলা হয়ে থাকবে হয়তো ।

    কিছু কিছু কবির সঙ্গে বাঙালিগণ
    খুব নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছেন ; এবং মনে হয়
    ভবিষ্যতেও করবেন । যেমন রবীন্দ্রনাথ যখন মৃত্যুশয্যায়
    হাত নাড়তে পারছিলেন না
    তখনো বাঙালিগণ দাবি করলেন যে
    রবীন্দ্রনাথ মুখে মুখে একটি কবিতা বলুন
    সেই কবিতা কাগজে লিখে নেবেন অন্য একজন ।
    অগত্যা রবীন্দ্রনাথ কবিতা বললেন এবং
    তা লিখে নিলেন একজন শ্রোতা ।
    এই হলো রবীন্দ্রনাথের শেষ কবিতা ।

    দাদা সমীর রায়চৌধুরী ‘অপর’ তত্ত্বটি বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে পুরাণ থেকে ‘সংজ্ঞা’ নিরুপণ আলোচনা করেছিলেন। উনি বলেছিলেন, মার্কণ্ডেয় পুরাণে সংজ্ঞা বিশ্বকর্মার মেয়ে আর সূর্যের স্ত্রী । সংজ্ঞাকে নিয়ে যে আখ্যান তা থেকে জানা যায় কখন তিনি চোখ বোজেন, আর কখনই বা চপলভাবে দৃষ্টিপাত করেন, আবার কখনও চোখ মেলে পরম মিলনে প্রস্ফূট হয়ে ওঠেন । এই অবলোকন বদলের ওপর নির্ভর করে কখন তিনি সংযমনকারী যমকে প্রসব করবেন, আর কখনই বা প্রসব করবেন চঞ্চলাস্বভাবা নদী যমুনাকে, আবার কখন জন্ম দেবেন যুগলদেবতা অশ্বিনীকুমারদের । অশ্বিনীকুমার যম নন, তবে যমজ, সৌন্দর্যের অধিকারী আর নিরাময়ে পারদর্শী — স্বর্গবৈদ্য ; বিশ্বচরাচরের মহাপারিবারিক আসঙ্গযুক্ত দ্বিপাক্ষিক শঙ্খিলতার মহাপরিপূরকতা বজায় রাখা যাঁর ধর্ম । চোখ মেলে সংজ্ঞা আরও প্রসব করেন রেবন্ত, যিনি সর্বদা সংঘর্ষে, প্রতিবাদে উদ্যত । যিনি পূর্বের ক্লেদ অপসারণ করে নবীনতাকে প্রশ্রয় দেন । এই আখ্যান বিনয় মজুমদারকে সংজ্ঞায়িত করে, অবলোকন ক্ষমতার মাধ্যমে তিনি জগতসংসারের বিশাল স্পেকট্রামকে পাঠকের সামনে মেলে ধরেন ।
    ‘আজকের পত্রিকা’র ১১ই ডিসেম্বর ২০১৫ সংখ্যায় বীরেন মুখার্জি লিখেছেন যে বিনয় মজুমদার একজন ইনট্রোভার্ট বা আত্মমুখিনতার রূপদক্ষ শিল্পী — অপ্রাপ্তির বিভিন্ন অনুষঙ্গ, স্বগতোক্তি কিংবা আত্মকথন যা শান্তরস-সিক্ত তা রয়েছে তাঁর ‘ফিরে এসো, চাকা’ পর্যায়ের কবিতায় — তীব্র ব্যঞ্জনাধর্মী ও গভীর অর্থবোধক, তাঁর কবিতার সুর তন্ময় ব্যক্তিগত কিংবা মন্ময় বস্তুগত ; তাঁর কাব্যবোধ তাঁর প্রেমিক সত্তাকে প্রজ্ঞাবান করার পাশাপাশি জ্ঞানের গভীরতায় জারিত । তবে বীরেন মুখার্জি মনে করেন যে বিনয় মজুমদারের ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ ও ‘বাল্মীকির কবিতা’ পাঠে তাঁকে ‘কামোন্মাদ’ বলে মনে হয় । তিনি বলেছেন, জৈবিক মিথুন-সত্তায় আক্রান্ত বিনয় না পাওয়ার তীব্রতর বেদনা শব্দমাধুর্যে উপস্হাপন করলেও, তা অত্যন্ত নিচুস্বরে, যেমন :-

    কবিতা সমাপ্ত হতে দাও, নারী, ক্রমে, ক্রমাগত
    ছন্দিত, ঘর্ষণে, দ্যাখো, উত্তেজনা শীর্ষলাভ করে,
    আমাদের চিন্তাপাত, রসপাত ঘটে, শান্তি নামে ।
    আড়ালে যেও না যেন ঘুম পাড়াবার সাধ করে ।

    বিনয় মজুমদারকে নানা ধরণের উন্মাদের তকমা দেয়া হয়েছে দেখে বীরেন মুখার্জি সম্ভবত ‘কামোন্মাদ’ তকমাটি ধরিয়ে দিলেন । ‘কামোন্মাদ’ ! এরকম ভয়ঙ্কর আরোপ আর হয় না, যেন বিনয় একজন গ্রিক দেবতা স্যাটারিয়াসিস । বিনয় নিজেই বলেছেন যে তিনি ‘ইরোটিক’ কবিতা লিখতে চান, কেননা ইরোটিক কবিতা লেখার যে চল ইংরেজরা আসার আগে ছিল তা শেষ হয়ে গেছে । কথাটা সত্যি । শ্রীরামপুরের পাদরি আর ম্যকলে সাহেবের ভিকটোরিয় শিক্ষাপদ্ধতির দরুণ প্রাগাধুনিক বাংলার ধারা থেকে নিজেদের মুক্ত করে নেওয়াকে মধ্যবিত্ত বাঙালি গৌরবের ব্যাপার মনে করেছে বহুকাল, তার ওপর ব্রাহ্মধর্মের হাস্যকর রক্ষণশীলতা মিশে সেই ধারাকে সম্পূর্ণ তামাদি করে দিয়েছে ।
    ইংরেজি ভাষার কবি নন বলে ওভিদ, কাতুল্লুস, সেক্সটাস প্রোপার্টিয়াস, পেত্রার্ক, পিয়ের লোয়ুস, গ্রেগোরিও দে মাত্তোস, হিল্ডা হিলর্স্ট, গ্লাউকো মাটোসো, ভিনি করেয়া, ম্যানুয়েল মারিয়া প্রমুখ বাদ গেছেন আমাদের বিদ্যায়তনিক জগত থেকে । ইংরেজিতেও কবিরা লিখেছেন, যেমন চার্লস সুইনবার্ন ( লাভ অ্যাণ্ড স্লিপ ), রবার্ট হেরিক ( আপঅন জুলিয়াজ ক্লোদস ), ই ই কামিংস ( মে আই ফিল সেড হি ), ডাবলিউ এইচ অডেন ( দি প্ল্যাটনিক ব্লো ), জন ডান ( টু হিজ মিসট্রেস গোইং টু বেড ), এমিলি ডিকিনসন ( কাম স্লোলি ইডেন ), ওয়াল্ট হুইটম্যান ( আই সিং দি বডি ইলেকট্রিক ), হার্ট ক্রেন ( ভয়েজেস ) ইত্যাদি । ইংরেজরা সবচেয়ে বড়ো যে ক্ষতি করে গেছে, তা হলো আমাদের সনাতন রসশাস্ত্রকে লোপাট করে দিয়ে নিজেদের ভাষার অলঙ্কার বাংলা ভাষায় চাপিয়ে দেয়া ।
    বাংলা সাহিত্যে ইরটিক কবিতা লেখার ঐতিহ্য ছিল । জেমস লঙ-এর কুযুক্তির দরুন বটতলা সাহিত্য বিলুপ্ত হতে সময় লাগেনি । চর্যাপদ, কালিদাসের মেঘদূত, বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মানসিংহ-ভবানন্দ উপাখ্যান, দৌলত কাজীর সতীময়না লোরচন্দ্রানী, সপ্তদশ শতকের শুকুর মামুদের গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস ইত্যাদি । বহু আলোচক বিনয়ের ‘ফিরে এসো, চাকা’র পর আর তাঁর কাব্য বিশ্লেষণে এগোন না, তাঁদের মধ্যমেধা-মধ্যবিত্ত মননে চোট লাগে । নৈসর্গিক বর্ণনার মাধ্যমে ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হে যে যৌনতা আছে তা হয়তো বহু পাঠক ধরতে পারেন না, কিন্তু ‘বাল্মীকির কবিতা’ কাব্যগ্রন্হের ভুট্টা সিরিজে ও ডালাসারির কবিতায় গিয়ে তাঁদের মধ্যবিত্ত চেতনা আক্রান্ত হয় । ‘বাল্মীকির কবিতা’ কাব্যগ্রন্হের পরেও বিনয়ের কবিতার বই বেরিয়েছে, ছোটো গল্পের বই বেরিয়েছে, সেগুলো নিয়ে আগ্রহ দেখা যায় না তাঁদের !
    কবিতা লিখে আনন্দের কথা বলেছেন বিনয়, তা যেমন কবিতাই হোক, তাঁর ‘কবিতালেখা’ নিবন্ধে, “তুমি কষ্ট পাচ্ছো সেই কষ্টের কথা লিখে তুমি আনন্দ পেতে পারো । সৃষ্টির ব্যাপারে এই আনন্দটা তিন স্তরে বিভক্ত । লেখার আগে একটা জিনিস ভাবতে হচ্ছে, তখনকার আনন্দ একরকম ; যখন লিখছি তখন আরেকরকম, আর লেখার শেষে আরেকরকমের আনন্দ । আনন্দ না থাকলে শিল্পসৃষ্টি হয় না ।” তারপর যোগ করেছেন, “ময়ূর পেখম তুলে নাচে — আমরা দেবতারা মন খুলে কবিতা লিখি । ময়ূরের নাচের মতনই কবিতা লেখা ব্যাপারটা ।”

    দশ
    বিনয়ের ঈশ্বরীতে ফিরি । উচ্চাকাঙ্খী গায়ত্রী আমেরিকায় গিয়ে ১৯৬০ সালে ট্যালবট স্পিভাককে বিয়ে করেন, এবং কিছুকাল পরেই তাঁদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় । আমার মনে হয় আমেরিকায় পাকাপাকি বসবাসের জন্য ট্যালবট স্পিভাককে বিয়ে করেছিলেন গায়ত্রী, আর ছাড়াছাড়ির পরেও তিনি নিজের নাম থেকে স্পিভাক পদবি বাদ দেননি। আমেরিকায় গিয়ে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর এবং তুলনামূলক সাহিত্যে পিএইচ ডি করেন । স্নাতক স্তরে ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন । বিনয় মজুমদার গায়ত্রীর প্রতিভায় আকৃষ্ট হয়ে থাকবেন, কেননা হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্টের বাড়িতে আত্মগর্বী গায়ত্রীকে তিনি দেখে থাকবেন কয়েক ঝলক মাত্র । পরবর্তীকালে গায়ত্রীর বিশ্বব্যাপী খ্যাতি তাঁকে বিনয়ের কবিতার কেন্দ্রে এনে থাকবে । ‘ফিরে এসো, চাকা’ বইটির খ্যাতির পরেও গায়ত্রী বহুকাল জানতেন না যে বিনয় মজুমদার নামে প্রতিভাবান অথচ উচ্চাকাঙ্খাহীন, প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া এক ইঞ্জিনিয়ার যুবক তাঁকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখেছেন। গায়ত্রী কেবল কলকাতার খ্যাতনামা উচ্চ পরিবারের মেয়ে নন, তাঁর দাদুর বাবা ছিলেন রামকৃষ্ণদেবের চিকিৎসক, গায়ত্রীর বাবা সারদা দেবীর কাছে দীক্ষা নিয়েছিলেন — কলকাতার বুর্জোয়া পরিবার বলতে যা বোঝায় । বিনয় তাই এঁদের বলেছেন পুরোহিত পরিবার ।
    ষাটের দশকে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে যখন আমার পরিচয় হয় তখন আমিও জানতুম না যে ‘ফিরে এসো, চাকা’ বইয়ের চাকা হলো গায়ত্রী চক্রবর্তী নামের একজন বিদুষী । বিনয় মজুমদার দুই বছরের জন্য হাংরি আন্দোলনে ছিলেন । সেই সময়ে তিনি একটার পর একটা চারমিনার সিগারেট খেয়ে তর্জনীকে নিকোটিনের রঙে মুড়ে ফেলে ছিলেন । উনি আমায় বলেছিলেন, “তুমি শক্তিকে নেতা করেছো আর শক্তি আমাকে নেতা করেছে।”
    ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকায় মারুফ হোসেনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছেন, মলয় “হাংরি সাক্ষাৎকারমালা” নামে একটা বই প্রকাশ করেছে । ওতে আমাকে বা শক্তিকে প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়নি।” এই বক্তব্য থেকে মনে হয় যে হাংরি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতার স্বীকৃতি বিনয় চেয়েছিলেন, এবং তাঁকে প্রতিষ্ঠাতার আসনে বসাইনি বলে আহত বোধ করেছিলেন । উনি স্পষ্ট বললে, ওনাকে প্রতিষ্ঠাতার স্বীকৃতি দিলে, বরং পরবর্তীকালে হাংরি আন্দোলন নিয়ে সুনীল-শক্তি-সন্দীপন যে সাংস্কৃতিক রাজনীতি আরম্ভ করেছিলেন তা ঘটত না ।
    সেই সময়ে কলকাতায় হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছিল, তাতে বিনয় মজুমদারও প্রভাবিত হয়ে থাকবেন । ২২ জুন ১৯৬৪ তারিখে দেবী রায় আমাকে একটা চিঠি লিখেছিলেন, তাতে এই কথাগুলো ছিল, “তুমি-আমি নাকি কলকাতায় অ্যারেস্ট হয়ে গেছি, চতুর্দিকে গুজব । কয়েকজন চেনা হেফচেনার সঙ্গে দেখা হলে অবাক চোখে তাকাচ্ছে । ভাবখানা এই : কবে ছাড়া পেলে ? আমার তো এখন একতারা নিয়ে বাউল হয়ে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে কলকাতায় । সবাই তালে আছে ‘বাঘে ছুঁইয়ে দেওয়ার’, পর্নোগ্রাফি প্রমাণ করে । সুবিমলকে মেসে কে একজন বলেছে, ‘দেখব কী করে হাংরি বুলেটিন বের হয় ।” সেপ্টেম্বর ১৯৬৪-এ আমরা সত্যিই গ্রেপ্তার হই আর আমার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা আরম্ভ হয় ।
    সেই সময়ের এলিট বঙ্গসমাজ যে কতোটা চটেছিলেন, হাংরি আন্দোলনের ওপর, তা অ্যালেন গিন্সবার্গকে লেখা আবু সয়ীদ আইয়ুব-এর ৩১ অক্টোবর ১৯৬৪-এর এই চিঠি থেকে অনুমান করা যায়:-
    Dear Mr. Ginsberg,
    I am amazed to get your pointlessly discourteous letter of 13th. That you agree with the Communist characterization of the Congress for Cultural Freedom as a fraud and a bullshit intellectual liberal anti-communist syndicate did not, however, surprise me ; for I never thought the Congress for Cultural Freedom had any charge of escaping your contempt for everything ‘bourgeois’ or ‘respectable’.
    If any known Indian writer or intellectual come under police repression for their literary and intellectual work, I am sure the Indian Committee for Cultural Freedom would move in the matter without any ungraceful promptings from you. I am glad to tell you that no repressions of that kind has taken place here currently. Malay Roychoudhury and his young friends of the Hungry Generation have not produced any worthwhile to my knowledge, though they have produced and distributed a lot of self-advertising leaflets and printed letters abusing distinguished persons in filthy and obscene language ( I hope you agree that the word ‘fuck’ is obscene and ‘bastard’ filthy, at least in the sentence ‘Fuck the bastards of the Gangshalik School of Poetry’; they have used worse language in regard to poets whom they have not hesitated to refer to by name ). Recently they hired a woman to exhibit her bosom in public and invited a lot of people including myself to witness this wonderful avantgarde exhibition ! You may think it your duty to promote in the name of cultural freedom such adolescent pranks in Calcutta from halfway round the world. You would permit me to differ from you in regard to what is my duty.
    It was of course foolish of the Police to play into the hands of these young men and hold a few of them in custody for a few days ( they have all been released now ) thus giving the publicity and some public sympathy — publicity is precisely what they want to gain through their pranks.
    I do not agree with you that it is the prime task of the Indian Committee for Cultural Freedom to take up the cause of these immature imitators of of American Beatnik poetry. I respect your knowledge of European literature but can not permit myself to be guided by your estimation of writers in my language — a language of which you to choose to remain totally ignorant.
    With all good wishes in spite of your grave disagreements and in admiration of some of your wonderful poems.
    Yours Sincerely
    Abu Sayeed Ayyub
    অ্যালেন গিন্সবার্গকে এই চিঠিটা লেখার সময়েও আবু সয়ীদ আইয়ুব আমাদের গ্রেপ্তার হওয়া ও মকদ্দমা সম্পর্কে কোনো খবর রাখেননি । আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কোমরে দড়ি বেঁধে আর হাতে হাতকড়া পরিয়ে, তা উনি জানতেন না । উনি যখন চিঠিটা লিখছেন তখন কেউই মকদ্দমা থেকে ছাড়া পায়নি ; তারা ছাড়া পেয়েছিল ১৯৬৫ সালের মে মাসে । আইয়ুব সাহেব জানতেন না যে আমার বিরুদ্ধে মামলা আরম্ভ হয়েছে য পঁয়ত্রিশ মাস চলেছিল । শঙ্খ ঘোষ যখন ১৯৭১ সালে ‘শব্দ আর সত্য’ প্রবন্ধটি লেখেন, তখন তিনিও খবর রাখেননি যে ইতিমধ্যে নিম্ন আদালতে আমার জেল-জরিমানার দণ্ডাদেশ হয়ে গেছে, বা হয়তো জেনেও চেপে গিয়েছিলেন, আর প্রবন্ধতে কেবল লিখে দিয়েছেন ‘কয়েকজন যুবককে একদিন হাজতবাস করতে হয়েছিল’ । শঙ্খ ঘোষের এই বইটি বিভিন্ন কলেজে বাংলা ভাষার সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত, এবং ছাত্রদের কাছে ভুল বার্তা চল্লিশ বছর যাবত চলেই চলেছে; নতুন সংস্করণেও তিনি সঠিক তথ্য দেবার প্রয়োজন মনে করেননি ।
    যাই হোক, পরে হাংরি বুলেটিন থেকে নেতা ব্যাপারটা আমি বাদ দিয়ে দিই । বিনয়ের কবিতা কয়েকটা বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছিল । সেসময়ে বিনয় মজুমদারের কথাবার্তায় অসংলগ্নতা লক্ষ্য করিনি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক রাজনীতিতে বিরক্ত হয়ে বিনয় মজুমদার আন্দোলন ত্যাগ করেন, কিন্তু আন্দোলন ছাড়ার সময়ে শক্তি আর সন্দীপনকে গালমন্দ করে একটা বুলেটিন নিজেই ছাপিয়েছিলেন, বিলি করতে দিয়েছিলেন আমাদের । বিনয়ের কবিতার নতুনত্বের কারণে ওনার খ্যাতি তরুণ মহলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল, যা সহ্য করতে পারছিলেন না পঞ্চাশ দশকের কবি আর লেখকরা। আমি গ্রেপ্তার হয়েছিলুম বলে হয়তো বিনয়ের কিছু ভীতিও জন্মেছিল হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে।
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নির্মল মৈত্র এবং সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে উল্লেখ করে তাঁর লেখা বুলেটিনটি তুলে দিচ্ছি এখানে । স্বাভাবিক যে এই বুলেটিনটির পর তাঁর সময়ের কবি-সাহিত্যিকরা, যাঁরা তাঁকে আর্থিক সাহায্য করার কথা বলেছিলেন, সেই সাহায্য বন্ধ করার জন্যে তদবির আরম্ভ করেন আর শেষাবধি বন্ধও করে দেন।
    ১) শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অনিপুণ নপুংসকরূপ আশা করি এযাবৎ পাঠকপাঠিকা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পাননি ; সরকার পৃষ্ঠপোষকতা করে অবস্হাকে বেশ মজাদার করেছেন ; পদলেহী কুকুরের নিয়োগকারিণী চালচুলোহীন এক নারীর আত্মার নির্দেশনা অনুসারে উক্ত কবি নিজেকে মহিলা মনে করে কবিতা লেখেন ; আর কথপোকথনকালে দেখি মহিলার অভিনয় করায় শ্রীমানটির কোনো ভাবলেশ উপস্হিত হয় না ; অথচ ক্রমে-ক্রমে আমার দাসীত্ব দিয়ে সেই বেয়াদপ আত্মাটিকে শায়েস্তা করেছি আর অঙ্কশাস্ত্রে শ্রীমতি এখন মতামত জ্ঞাপনের মতন স্হূলতা দেখাবার বিপদের ঝুঁকি নিতে সক্ষম হবে কি ? কবিটির জন্ম কি কুকুর আর গাধার সঙ্গমজাত ফল ।
    ২) স্হাপত্যবিদ্যায় ফেল মেরে-মেরে এক ছাগছানা বীর্যজাত নির্মল মৈত্রেয় জীবিকায় হাস্যকর ভিক্ষাবৃত্তি ঝুলে আছে । তবে ভয় নেই, যতক্ষাণ তার কচি পায়ু আছে, দালালী রয়েছে ।
    ৩) সন্দীপন, হে শ্রীমান, দাস-অনুদাস শব্দটি শুনেছিলাম কবে যে ঠিক মনে নেই । তবে এটা নিশ্চিতই কবুল করতে হবে — দাসী-অনুদাস বলে কোনো শব্দ এ যাবৎ আমি তো শুনিনি । ফলে যথাযথরূপে তোমার অবস্হা প্রকাশের স্বচ্ছতা, বৎস, ভবিষ্যতে ভেবে দেখা যাবে ।
    ৪) দল পাকাবার আগে, পরেও তাদের, রেকটাম বীট করে দিয়েছি বলেই, এইসব কেঁচোবৃন্দ বীটনিক নাম নিয়েছিল ।
    ১০.৬.১৯৬৪
    রচয়িতা ও প্রকাশক
    বিনয় মজুমদার
    ৬৯, মীর্জাপুর স্ট্রিট, কলকাতা – ৯

    কফিহাউসে বেয়ারার মাথায় লাঠি মারার দরুন পুলিশ হাজতে থাকার সময়ে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে পুলিশ দুর্ব্যবহার করে থাকবে, হয়তো থানার লকআপে তাঁর আচরণেও স্কিৎসোফ্রেনিয়া রোগির ব্যাখ্যাহীন আস্ফালন নিচু স্তরের পুলিশকর্মীদের বিরক্ত ও ভীত করে থাকবে । আর হাংরি আন্দোলনে আমাদের গ্রেপ্তারি-মামলা ইত্যাদি নিয়ে কলকাতার সাহিত্যজগত তখন বেশ উত্তপ্ত । বিনয়ের ওপর হাজতে পুলিশ সত্যই খারাপ ব্যবহার করে থাকবে, যে কারণে বিনয়ের বাঁ কান আর বাঁ চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল । সঞ্জয় চক্রবর্তীকে দেয়া ১৯৯৩ সালে ‘যোগসূত্র’ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছেন যে, বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার সময়ে তাঁর চোখ কান সবই ভালো ছিল। কিন্তু কলকাতাতেই পরে লোকে ধরে বাঁ-চোখ আর বাঁ-কান নষ্ট করে দিয়েছিল । সম্ভবত বারবার ইলেকট্রিক শক দেবার ফলে অবস্হা আরও খারাপ হয়ে গিয়েছিল । সঞ্জয় চক্রবর্তীকে বিনয় বলেছিলেন যে উনি চারবার জেল খেটেছেন । দ্বিতীয়বার জেলে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে গিয়ে । অন্য দুইবারের তথ্য আমি যোগাড় করতে পারিনি । ১৯৭২ সাল থেকে যে সাক্ষাৎকারগুলো বিনয় মজুমদার দিয়েছেন, তাঁর উত্তরগুলো থেকে মনে হয় যে তিনি ঠিকমতন শুনতে পারছেন না, এবং মাঝে-মাঝে তাঁর উত্তর অস্ফূট হয়ে যাচ্ছে । পরে তাঁর ডান কানের ব্যথা বেড়ে গিয়ে শ্রবণশক্তি কমে যায়, যা উনি এই কবিতাটিতে লিখেছেন :-

    চোদ্দই অগাস্ট আজ
    চোদ্দই অগাস্ট আজ দু-হাজার দুই সাল । কানে
    তীব্র ব্যথা, ফলে
    সব কাজ বন্ধ আছে, অতি কষ্টে কবিতাটি লিখছি এখন ।
    ডান কানে তীব্র ব্যথা, এবং ডাক্তার
    ওষুধ দিয়েছে কিন্তু ব্যথা তো সারেনি ।
    কানের শ্রবণশক্তি কিছুটা কমেছে ।
    যদি কেউ কথা বলে তাকে বলি ‘চিৎকার করো’।
    যদি চিৎকার করে তাহলে শুনতে পাই, না হলে শুনি না ।
    ( হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ – ২০০৩ )
    ১৯৯৯ সালে ‘প্রচ্ছায়া’ পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকারে মারুফ হোসেন বিনয় মজুমদারকে প্রশ্ন করেছিলেন, “হাংরি জেনারেশন সম্পর্কে কিছু শুনতে চাই”। জবাবে বিনয় মজুমদার বলেছিলেন, “শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘ফিরে এসো, চাকা’ সমালোচনা করতে গিয়ে সম্প্রতি পত্রিকায় প্রথম লিখল ‘খুতকাতর সম্প্রদায়’ । বলল আমি নাকি হাংরি জেনারেশনের প্রতিষ্ঠাতা । এরপর হাংরি জেনারেশন পত্রিকা বেরোলো ‘ক্ষুধার্ত’ । হাংরি জেনারেশনের বুলেটিন । সেই পত্রিকার প্রথম সংখ্যার প্রথম কবিতাটিই ছিল আমার । ‘খেতে দেবে অন্ধকারে সকলের এই অভিলাষ’ । আমার পরে শক্তির কবিতা । তারপরে মলয় রায়চৌধুরী প্রমুখের কবিতা । এরপর আমি শক্তিকে লিখলাম, না আমি প্রতিষ্ঠাতা নই । হাংরি জেনারেশন যখন শুরু হয়, যখন পত্রিকা বেরোয় তখন আমি দুর্গাপুরে চাকরি করি । ফলে আমার পক্ষে কোনো আন্দোলন শুরু করা সম্ভব নয় । সুতরাং আমি নই, শক্তি চট্টোপাধ্যায় হল হাংরি জেনারেশনের প্রতিষ্ঠাতা । পরে শক্তি হাংরি থেকে বিচ্যুত হল, আমিও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম । ফলে মলয় রায়চৌধুরী হাংরি প্রতিষ্ঠা করেছে বলে দাবি করে । কথাটা মোটামুটি সত্য কথাই । শেষ পর্যন্ত ও-ই যখন হাংরি জেনারেশন চালাচ্ছে তখন ওকেই প্রতিষ্ঠাতা বলা কর্তব্য বলে আমার মনে হয় । এটা উচিত ।”
    প্রথম সংখ্যায় নয় । বিনয়ের কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল দশ নম্বর বুলেটিন থেকে । তার আগের বুলেটিনগুলো আমি পাটনা থেকে ইংরেজিতে ছাপাতুম । দেবী রায় কলকাতায় ছাপানো আরম্ভ করলে বাংলায় নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে । আর “ক্ষুধার্ত” হলো সুভাষ ঘোষ-শৈলেশ্বর ঘোষ-বাসুদেব দাশগুপ্তদের সত্তর দশকের পত্রিকা, হাংরি বুলেটিন নয় । মামলায় রাজসাক্ষী হবার দরুন ওরা হাংরি শব্দটা তখন ব্যবহার করতে ভয় পেতো, তাই “ক্ষুধার্ত” বের করতো । আমি “হাংরি কিংবদন্তি” বইটা লেখার পরে ওদের টনক নড়ে । শঙ্খ ঘোষের বদান্যতায় হাংরি আন্দোলনের বিকৃত ইতিহাস ও আমাকে গালাগালসহ দে’জ থেকে “ক্ষুধার্ত” সংকলনগুলো হাংরি জেনারেশনের নামে প্রকাশিত হয়েছে । বলা বাহুল্য যে তাতে বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, দেবী রায়, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, অনিল করঞ্জাই, আলো মিত্র এবং আমার কোনো রচনা নেই । অর্থাৎ যাঁরা আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন তাঁদের লেখাই নেই ।
    শক্তি আর সন্দীপনও একই সময়ে হাংরি আন্দোলন ছাড়েন, প্রধানত আমেরিকা থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ওসকানিতে; সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মনে করেছিলেন যে তাঁর ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠী ভেঙে দেবার ষড়যন্ত্র হিসাবে হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করা হয়েছে, আর সেকথা তিনি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন । বস্তুত সেসময়ে তিনি এতোই হিংসুটে মনোভাবের হয়ে গিয়েছিলেন যে তারপর আমার কাছ থেকে কখনও কবিতা চাননি, দাদাকে চিঠিতে লিখেছিলেন যে মলয় কবিতা লিখতে জানে না, যদিও তার আগেই উনি ‘কৃত্তিবাস প্রকাশনী’ থেকে আমার ‘শয়তানের মুখ’ কাব্যগ্রণ্হ প্রকাশ করেছিলেন, ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় আমার যে কবিতা প্রকাশ করেছিলেন সেগুলো ‘কৃত্তিবাস সংকলন’ গ্রন্হে অন্তর্ভুক্ত করেছেন । তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ও আমাকে ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় কবিতা লিখতে বলেছিলেন । আমি ‘নীরার জন্য প্রেমের কবিতা’ লিখেছিলুম যা প্রকাশ করতে চাননি তাঁর সহসম্পাদকরা । এই কবিতাটা আমার ‘মাথা কেটে পাঠাচ্ছি যত্ন করে রেখো’ কাব্যগ্রন্হে আছে ।
    সেই সময়ে কফি হাউসের বেয়ারার মাথায় লাঠি মারার দরুন বিনয় মজুমদারকে পুলিস আটক করেছিল, কুড়ি দিন জেল-হাজতে কাটাতে হয়েছিল। আরেকটা মারামারির দরুণ মাতালদের সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বেশ আহত হয়েছিলেন, তাঁর চোখ-মুখে রক্তের কালশিটে পড়ে গিয়েছিল । সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় দাদাকে লেখা একটা চিঠিতে এই ব্যাপারগুলো বেশ রসিয়ে লিখেছিলেন । মারামারির একটা পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছিল তখন ; সুবিমল বসাককে কফিহাউসের সামনে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর অনুজ কবিরা ঘিরে ধরেছিলেন মারার জন্য কিন্তু সুবিমলের হিন্দি গালাগালের হুঙ্কারে সবাই পালিয়েছিল ।

    এগারো
    স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হবার বয়স হল ষোলো থেকে তিরিশ বছরের মধ্যে । তা মূলত জিনগত রোগ হলেও, জন্মের আগে গর্ভে ভ্রুণের দুর্বলতার জন্য, সামাজিক চাপে মস্তিষ্কে ডোপামাইন ও গ্লুটামেটের রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য, ভাইরাসের আক্রমণে জিনে প্রভাবের জন্যে ঘটতে পারে । চিকিৎসা হয় প্রধানত অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধের দ্বারা, বন্ধুবৎসল পরিবেশের দ্বারা, পরিবারে আদরযত্নের দ্বারা ।
    ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্হের কবিতাগুলো লেখা হয়ে যাবার পর বিনয় মজুমদার প্রথমবার স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে অনুমান করা যায় । প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময় তিনি স্বাভাবিক ছিলেন এবং ইডেন হোস্টেলের মাঠে ফুটবল খেলতেন ; ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ছাত্র ইউনিয়ানের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন । সুতরাং ছাত্রাবস্হায় তিনি স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হননি । তাহলে কি গায়ত্রীকে নিয়ে কবিতা রচনার প্রচণ্ড চাপ গড়ে উঠেছিল বিনয়ের ওপর ? সমর তালুকদার ১৯৮২ সালে কবিতীর্থ পত্রিকায় লিখেছিলেন, তিনি ষাটের দশকের মাঝামাঝি যখন বিনয় মজুমদারকে দেখেছিলেন তখন “বিনয়ের মাথায় ঝাঁকড়া অগোছালো চুল, মুখভর্তি দাড়ি, জামাকাপড়ে মালিন্যের করুণতম ছাপ, গায়ে দুর্গন্ধ, আঙুলে বড় বড় নখভর্তি ময়লা । আর ছিল সমস্ত শরীর, স্নায়ু-গ্ল্যাণ্ডভর্তি রাগ । সবাইকে ভেংচাচ্ছেন — কাউকে খামচে দিচ্ছেন নিজের খেয়ালখুশিমতো । অশ্লীল ভাষায় থুতু ছিটিয়ে চলেছেন টেবিলে টেবিলে।”
    আমি কিন্তু হাংরি আন্দোলনের শুরুতে বিনয়ের ওই রূপ দেখিনি । কোন ঘটনার চাপ তাঁর ভারসাম্যকে দুলিয়ে দিয়েছিল তা জানি না, কবিতা লেখার চাপ ছাড়া । হিন্দি লেখক ও ‘জ্ঞানোদয়’ পত্রিকার সম্পাদক শরদ দেওড়া এই সময়ের বিনয় মজুমদারকে নিয়ে “কলেজ স্ট্রিট কা নয়া মসিহা” নামে একটা বই লিখেছিলেন । অন্যান্য সমসাময়িক কবিদের তুলনায় বিনয় যে কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন তা অবাঙালি লেখক শরদ দেওড়ার সাহিত্যিক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন থেকে স্পষ্ট হয় ।
    স্কিৎসোফ্রেনিয়ার জন্য একজন লোক কবি বা আঁকিয়ে হন, নাকি তিনি কবি বা আঁকিয়ে বলে স্কিৎসোফ্রেনিয়ার জিন জাগ্রত হয়ে ওঠে, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর মনোবিদরা খুঁজে পাননি আজও । কোনো কোনো পুরাতাত্বিক মনে করেন যে গুহার দেয়ালে হোমো এরেকটারদের আঁকা যে ছবিগুলো দেখা যায় তা হয়তো স্কিৎসোফ্রেনিয়ার জিন দেহে ছিল এমন মানুষদের আঁকা । অধিকাংশ বিখ্যাত লেখক-কবি-আঁকিয়ের চরিত্রে সমাজের বাইরে বসবাস করার এবং সীমালঙ্ঘনের আগ্রহ দেখা গেছে । কবিতার ও ছবিআঁকার শৈলী সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকে আর পরিবর্তনের সেই উথ্থান-পতনের সঙ্গে নিজের কাজকে সামাল দেবার প্রয়াস করতে হয়, এই ব্যাপার যেমন দেখি পাবলো পিকাসো এবং পল গঁগার ক্ষেত্রে, তেমনই দেখা গেছে বিনয় মজুমদারের ক্ষেত্রে । এর দরুণ আলোচকদের প্রশংসা অথবা কটূ সমালোচনা জোটে কবি-লেখক-আঁকিয়ের । তাঁদের ভাবতে বাধ্য করে যে সাহিত্য বা ছবি আঁকা তাঁদের সারা জীবন হয়তো চাকুরিহীন থাকতে বাধ্য করবে, এই ভাবনা বিনয় মজুমদারে পাই আমরা । এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিগ্যেস করা হয়েছিল, তিনি বিয়ে করেননি কেন ? উত্তরে বিনয় বলেছিলেন, তাঁর কোনো চাকরি নেই, বাঁধা আয় নেই, তাই ।
    স্কিৎসোফ্রেনিয়া রোগের উপসর্গ হল অজীর্ণ, যা লোকটিকে সারা জীবন বইতে হয়, অনেক সময়ে পেট খারাপের দরুন যেখানে-সেখানে মলত্যাগ হয়ে যায় ; তারপর অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধের ক্রিয়ায় অজীর্ণ স্হায়ী হয়ে যায় ; ফলে ফ্যানাভাত খেতে হয় বা আলুসিদ্ধ খেতে হয় । বিনয় মজুমদার শেষ বয়সে তাঁর অজীর্ণ নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন, তাতে “মুগ্ধ মলত্যাগ” অভিব্যক্তিটি অসাধারণ :-

    আর গাইব না
    অজীর্ণ, তোমাকে নিয়ে আর গান গাই না তো ।
    যেখানে সেখানে মুগ্ধ মলত্যাগ শেষ হয়ে গেছে ।

    বর্তমানে বসে আছি আমার চৌকির উপরে ।
    পরনে একটি লুঙ্গি, গায়ে এক গেঞ্জি আছে ।
    ঢেকুর বেরোচ্ছে বটে, তবে এ ঢেকুর ধোঁয়া ঢেকুর নয় ।
    কোনো গন্ধ নেই এ ঢেকুরে ; আমি একা একা আছি ঘরের ভিতরে ।
    আমার বাড়ির সব আলো জ্বালা আছে ।
    তদুপরি হারিকেন লন্ঠনটি জ্বালা আছে টেবিলের উপরে ।
    অজীর্ণ, তোমাকে নিয়ে আর গান গাই না তো, আর গাইব না ।

    আধুনিকতাবাদের সবচেয়ে গোলমেলে ব্যাপার হলো যে বৃহত্তর সমাজ তাঁদের সম্পর্কে একটি নেগেটিভ ধারণা গড়ে তোলে, যেন নিউরোটিক এবং মনস্তাত্বিক বিপর্যয় কবিতা রচনা বা ছবি আঁকার জরুরি উপাদান । বঙ্গসমাজে আমরা দেখেছি যে প্রাগাধুনিক কালে এই ধরণের মানুষ সমাজের বাইরে বেরিয়ে অঘোরী-তান্ত্রিক-সন্ন্যাসী-সুফি-দরবেশ-ফকির-আউল-বাউলের জীবন বেছে নিতেন । সুফি সন্তরা যেভাবে নৃত্য করেন তাকে সালাফিস্টরা বলেন পাগলামি, তার কারণ সবাইকে সালাফিস্ট ভাবধারায় পিটিয়ে সমরূপী করার তত্ত্বকে অস্বীকার করেন সুফিরা ; এ এক ধরণের সাম্রাজ্যবাদি প্রয়াস, তত্বের উপনিবেশের জেলখানায় ঢুকিয়ে বন্দি করে রাখার চেষ্টা । পাকিস্তানে সুফি সন্তদের সমাধিগুলোকে সালাফিস্টরা বোমা মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে, তার দরুণ সমবেত তীর্থযাত্রীরাও মারা যাচ্ছেন । বুল্লে শাহের মতন সন্তের গান নিষিদ্ধ করে দিয়েছে সালাফিস্টরা । বিনয় মজুমদারের ক্ষেত্রেও , বহু আলোচক তাঁকে ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্হের সাব-জনারেই আটক রাখতে ভালোবাসেন , অথচ তিনি আরও তিনটি সাব-জনারের কবিতা লিখে গেছেন ।
    আজকাল দেখি অনেকেই, এমনকি দরবারি তাঁবেদাররাও, উপদেশ দেন যে হাংরি হলে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয় ! আমি পড়াশুনায় ভালো ছিলুম বলে গ্রামীণ উন্নয়নের কাজে উঁচু পদে চাকরি করেছি বলে আমাকে আক্রমণ করা হয়, যেন গরিব সেজে ঘুরে বেড়ানো উচিত ছিল । হাংরি আন্দোলনের সময়ে বিনয় মজুমদার যদি ভুট্টা সিরিজের কবিতা লিখতেন তাহলে সরকার সংবাদপত্র বিদ্যায়তনিক প্রতিনিধিরা তাঁর কি গতি করতেন তা সহজেই অনুমেয় । গোর্কি সদনের অনুষ্ঠান থেকে ‘বাল্মীকির কবিতা’র কবিতা পাঠ করার জন্য বিনয় মজুমদারকে অশ্লীল কবি ছাপ্পা দিয়ে বিতাড়ন করা হয়েছিল । ১৯৭৭ সালে প্রকাশক ‘বিশ্ববাণী’র কাছে লালবাজার থেকে নির্দেশ গিয়েছিল যাতে বইটি বিক্রি করা না হয় । পুলিশকর্তারা তো নিজে থেকেই নির্ণয় নেন না ; কোনো সাহিত্যিক খোচর তাঁদের কাছে বইটির কথা রসিয়ে-রসিয়ে বলে থাকবে, একটি কপি প্রেস সেকশানে জমা দিয়ে, একথা আমি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, হাংরি মামলায় ‘উপদ্রুত’ নামের পত্রিকার সম্পাদক পবিত্র বল্লভ পুলিশের খোচরের কাজ করতেন, এবং আমাদের যাবতীয় প্রকাশনা নিয়মিত পৌঁছে দিতেন লাল বাজারের প্রেস সেকশানে, তার বিভাগীয় প্রধান ডেপুটি কমিশনার ছিলেন আবার কবি তারাপদ রায়ের মেসোমশায় । এই খোচরটিকেই সৃজিত মুখার্জি তাঁর ‘বাইশে শ্রাবণ’ ফিল্মে তুলে ধরেছিলেন ।
    আধুনিকতাবাদের ফলে কবি বা ছবি আঁকিয়ের আর্থিক অবস্হা খারাপ হয়ে উঠলে সাধারণ সমাজ এবং রাজনীতিকরা কবি বা ছবি আঁকিয়ের চরিত্রের নেগেটিভ দিকগুলোকে গুরুত্ব দেন । বিনয় মজুমদারকে আর্থিক সাহায্যের সময়ে এই তর্ক তুলেছিলেন অনেকে । ইউরোপে নেগেটিভ ছাঁচে ফেলে মার্কা-মারা করে দেবার ইতিহাস বেশ প্রাচীন । আধুনিতাবাদের প্রভাবে আমরাও সেই ছাঁচটা নেগেটিভ বলে চিহ্ণিত করতে শিখেছি । এই ইউরোপীয় মানদণ্ডের ফলে সাহিত্য এবং ছবি আঁকার যে সৃজনশীল প্রক্রিয়া তার অর্থপূর্ণ বিশ্লেষণ হয় না । সৃজনশীল সাহিত্যিক ও ছবি আঁকিয়ে বা নৃত্যশিল্পীর ওপর ব্যাপারটা ভয়ংকর চাপের কাজ করে । এই প্রসঙ্গে আমরা আধুনিকতার বাইরে বসবাসকারী রামকিঙ্কর বেইজের প্রসঙ্গ তুলতে পারি । সামাজিক মানদণ্ডের বাইরে বসবাসকারি লালন সাঁই, তুকারাম, কবীর, রবিদাস-এর প্রসঙ্গ তুলতে পারি, যাঁদের এখন বলা হয় সন্ত ।
    কবি, লেখক, ছবি আঁকিয়ে যা করেন তার প্ররোচনার উৎস কোথায় ? যাঁরা টাকা রোজগারের জন্য করেন তাঁদের কথা আমি বলছি না । এই প্রশ্নটা আলোচকদের, দার্শনিকদের, মনোবিদদের, চিকিৎসকদের বহুকাল ধরে ভাবাচ্ছে । নতুন প্রজন্মে নতুনতর তত্ত্ব উপস্হাপন করা হয়েছে । সৃজনশীল প্রক্রিয়ার যুক্তিহীনতাকে নিদারুণ অবজ্ঞা করে প্ল্যাটো বলেছিলেন যে “কবিরা সঠিক চেতনার মানুষ নন, তাঁরা সৃজনদেবীর নিশিডাকে যুক্তির জগত থেকে বিচ্ছিন্ন ।”
    ১৪১৩ বঙ্গাব্দে ‘অউম’ পত্রিকার জন্য জয় মুখোপাধ্যায় ও সন্মোহন চট্টোপাধ্যায়ের নেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে এরকম প্রশ্নোত্তর হয়েছিল :-
    প্রশ্ন : ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’য় আক্রান্ত হয়ে স্বদেশ নির্বাচনের দায়িত্ব একদিন যে সাম্রাজ্যবাদ আপনাকে দিয়েছিল, আজ এই অন্ধকার ও প্রায় অজ্ঞাত পৃথিবীর মধ্যে বাঁচতে বাঁচতে আপনার কি মনে হয় না যে বস্তুত সেই সাম্রাজ্যবাদই আসলে কোনও দিন ছিল আপনার বাস্তুচেতনা ?
    বিনয় : কবি ঈশ্বর গুপ্ত লিখেছিলেন — “তুমি মা কল্পতরু/আমরা সব পোষা গোরু।” বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন, তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তখন লোকে বলেছিল, ‘একটি এঁড়ে বাছুর জন্মেছে।’ প্লেটো বলেছিলেন — তাঁর রিপাবলিকে কোনো কবি রাখা হবে না । এই মত এখনও এই পশ্চিমবঙ্গে ছাপা হয় ( ব্যঞ্জনবর্ণ পত্রিকা ) । আর কবিরা নিজেদের ঢাক নিজেরাই শুধু পেটায় । তবে ওই প্লেটোই যখন জন্মেছিল, তখন মন্ত্র পড়া হয়েছিল কবিতায়, ওই প্লেটোর অন্নপ্রাশনের সময় যে মন্ত্র পড়া হয়েছিল. সেই মন্ত্র কবিতা, ওই প্লেটোর বিয়ের সময় যে মন্ত্র পড়া হয়েছিল, সেই মন্ত্র কবিতা, ওই প্লেটোর শ্রাদ্ধের সময় যে মন্ত্র পড়া হয়েছিল, তা-ও কবিতা, এমনকি জীবিত অবস্হায় প্রত্যেক রবিবারে ওই প্লেটো গির্জায় যে প্রার্থনা করত, তাও কবিতা — এর পরে আর কী বলা যায় ।’
    বিনয় মজুমদার প্ল্যাটোকে একজন খ্রিস্টধর্মী অনুমান করে কথাগুলো বললেও, জয় মুখোপাধ্যায় ও সন্মোহন চট্টোপাধ্যায়ের তথাকথিত জোলো বামপন্হী ভাবধারাকে যুৎসইভাবে উপড়ে দিতে পেরেছিলেন । বিনয় মজুমদার ধর্মে আস্হা রাখেননি কিন্তু ‘সৃষ্টিকর্তা’ নামের কোনো ক্ষমতাকে বিশ্বাস করেছেন, যা তাঁর এই কবিতায় পাই আমরা :-

    ২০ আগস্ট ১৯৯৮
    তিন চোখ, চার হাত — এইসব দেবদেবীদের
    মূর্তি দেখে যেতে হবে চিরকাল ? কী করে টের
    পেয়েছিল হিন্দুগণ — এরা সব আছে ?
    ধীরে ধীরে যেতে হয় হিন্দুদের পঞ্জিকার কাছে ।
    পঞ্জিকায় ছবি ছাপা — দশভূজা, আরো কতোজন ।
    এদের এড়িয়ে দেখি বেঁচে থাকে খ্রিস্টানের মন ।
    এই বিশ্বে দীর্ঘকাল টিকে থাকে যা যা
    তা তা সত্য ; তাহলে দেবতাদের রাজা
    ইন্দ্র আর সরস্বতী, লক্ষ্মী এরা আছে
    তবুও আমার মনে সন্দেহ থেকেই যায়, বলি কার কাছে
    সেহেতু কখনো কারো পুজাই করিনি ।
    তবু সৃষ্টিকর্তা আছে যার কাছে আমি আজো ঋণী ।
    আমার বাঁহাত আছে এটা যত সত্য বলে মানি
    সৃষ্টিকর্তা আছে এটা তত সত্য বলে আমি জানি ।
    ( শিমুলপুরে লেখা কবিতা — ২০০৫ )
    বিনয় মজুমদারের সমসাময়িক কবিরা, এমনকি পরবর্তী প্রজন্মের কবিরাও, এই ফান্ডামেন্টাল প্রশ্নগুলো নিয়ে নিজেদের ভাবনাচিন্তা উপস্হাপন করেননি । তাঁরা কেবল আঙ্গিক আর বিষয়বস্তুর ভেতরে নিজেদের চিন্তাকে সীমিত রেখেছেন ।
    ফ্রেডরিক নিৎশে বলেছিলেন যে “মানসিক অসুস্হ না হলে কবি বা শিল্পী হওয়া যায় না ; অস্বাভাবিকতা থেকে সৃজনশীলতার সৃষ্টি হয় ।” আবার ফ্রেডরিক নিৎশেই বলেছেন যে খ্রিস্টধর্মের প্রসার ঘটেছে মানুষের চরিত্রে সৃজনশীলতার অস্বাভাবিকতা থেকে। খ্রিস্টধর্মের প্রসার সম্পর্কে একই কথা বলেছিলেন টমাস অ্যাকুইনা । গভীরভাবে ভেবে দেখলে ধর্ম ব্যাপারটাই অস্বাভাবিক ; সেকারণেই ধর্মের মতন অব্যাখ্যেয় চিন্তার দরুণ মানুষ পরস্পরের সঙ্গে লড়ে মরে। ২০০১ সালে বাংলাদেশের ‘লোক’ পত্রিকার জন্য শামীমুল হক শামীমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন, “ধর্ম জিনিসটা বড় গোলমেলে। আমি ওই সাতে পাঁচে নেই । ধর্মীয় কারণে জীবনানন্দের চেয়ে নজরুল এদেশে উপেক্ষিত হচ্ছে এবং ঠিক একই কারণে নজরুলকে তোমরা জাতীয় কবি করেছ।” ওই সাক্ষাৎকারে বিনয় আরও বলেছেন, “গান্ধী বলেছেন ‘ঈশ্বর আল্লাহ তেরো নাম সব কো সন্মতি দে ভগবান’ । এই কথা বলাতে গান্ধীকে গুলি করে মেরে ফেলল । ধর্মভিত্তিক একটা বিভাজন হয়ে গেছে । ধর্মের চেয়ে বরং মৃত্যু নিয়ে লেখা সাহিত্যিকদের স্মরণীয় করে রাখে। জীবনানন্দের ‘অদ্ভুত আঁধার’, ‘আট বছর আগে একদিন’ কী অদ্ভুত কবিতা !”
    সবাই কবিতা লেখেন না, ছবি আঁকেন না, কৈশোরে আর তরুণ বয়সে আরম্ভ করে ছেড়ে দেন, কিন্তু অনেকে ছাড়তে পারেন না, খ্যাতি বা টাকাকড়ির জন্য নয়, তাঁরা ছাড়তে পারেন না কেননা, তাঁরা আটক পড়েন কোনও এক অস্বাভাবিক মননঘুর্ণিতে, তাঁরা তাড়িত হন সাইকোপ্যাথিক সাহসের কোনো এক মানসিক চাঞ্চল্যের নিশ্চয়তায়, যা কিনা সৃজনশীল ব্যক্তিমানুষের চরিত্রের সৎ উপাদান, এবং সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে ক্রিয়াবৈগুণ্যে সম্পর্কিত । ‘ট্রেণ্ডস ইন কগনিটিভ সায়েন্সেস’ পত্রিকার জুলাই ২০১৫ সংখ্যায় ‘থিংকিং টু মাচ : সেল্ফ জেনারেটেড থট অ্যাজ দি ইনজিন অফ নিউরটিসিজম’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে যে স্বতঃচিন্তা সৃজনশীল কাজে সাহায্য করে বটে কিন্তু তা ব্যক্তিবিশেষের দুঃখেরও কারণ হয়ে ওঠে । বিনয় মজুমদার একটি লেখায় বলেছেন যে দুঃখের কবিতা লিখে কবি আনন্দ পান । ‘নেচার নিউরোসায়েন্স’ পত্রিকার জুন ২০১৫ সংখ্যায় বলা হয়েছে যে, স্কিৎসোফ্রেনিয়া এবং বাইপোলার ডিসঅর্ডার ব্যক্তিএককের ভেতরে ঘুমিয়ে-থাকা বংশগত জিনটি সহজাত সৃজনীপ্রতিভাকে জাগিয়ে তোলে, এবং এই জিনগুলো সাধারণ মানুষের থেকে ভিন্ন ।
    কে জেমিসন তাঁর ‘টাচড উইথ ফায়ার : ম্যানিক ডিপ্রেসিভ ইলনেস অ্যাণ্ড দি আর্টিস্টিক টেমপেরামেন্ট’ ( ১৯৯৬ ) বইতে বলেছেন যে কবি ও ছবি আঁকিয়েদের সৃজনশীলতার সঙ্গে তাঁদের মুডের বিশৃঙ্খলা এবং শৈল্পিক বাতিকজনিত মনোভঙ্গের সরাসরি যোগাযোগ আছে । তাঁদের শৈল্পিক ক্ষমতা যতো হ্রাস পেতে থাকে তাঁদের অবদমিত বিষণ্ণতাবোধ ও যৌনতায় বিফলতা ততো বেশি তাঁদের মেজাজকে বিধ্বস্ত করতে থাকে । স্টিফেন ডায়ামণ্ডস ‘অ্যাঙ্গার ম্যাডনেস অ্যাণ্ড দি ডায়ামনিক : দি সাইকোলজিকাল জেনেসিস অফ ভায়োলেন্স, ইভিল অ্যান্ড ক্রিয়েটিভিটি’ ( ১৯৯৯ ) গ্রন্হে বলেছেন যে, সৃজনশীলতার সঙ্গে ক্রোধ, ক্ষিপ্তাবস্হা, আকস্মিক উদ্দীপনা, উগ্রতা, মন্দচিন্তা, অশ্লীল ভাবনা ও অসংলগ্ন আচরণের সম্পর্ক আছে, এবং তা কবিতায়-ছবি আঁকায় বা আচরণে ফুটে ওঠে ; বহুক্ষেত্রে শিল্পী তাঁর পুরোনো গড়ে তোলা ইমেজের বাইরে বেরিয়ে যাবার প্রয়াস করেন ।
    বিনয় মজুমদারের কবিতাগুলো সম্পর্কে কেউ-কেউ সেরকম কথাই বলে থাকেন । অথচ বিনয় মজুমদার ইনসেন বা ম্যাড ছিলেন না, তিনি স্কিৎসোফ্রেনিয়ায় ভুগতেন । স্কিৎসোফ্রেনিয়া যদি জিনগত রোগ হয়, তাহলে কেন তাঁকে ‘পাগল’ তকমা দিয়ে ইলেকট্রিক শক দেয়া হতো ? প্রায় তিরিশ বার তাঁকে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়েছে ; আটবার ভর্তি করা হয়েছে মানসিক চিকিৎসালয়ে, যেখানে স্কিৎসোফ্রেনিয়ার চিকিৎসার কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ছিলেন না । যাঁরা চিকিৎসা করতেন তাঁরা হয় এম.বি.বি.এস অথবা মনোবিদ ।
    সুমন গুণ, ছন্দবিদ অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়ের একটি উক্তি উদ্ধৃত করে বলেছেন, বাঙালির সহজাত আলস্যপ্রবণতার একটি জনপ্রিয় প্রকাশ হলো জীবনানন্দের কবিতায় ছড়ানো অক্ষরবৃত্ত ছন্দ । এই ছন্দই বিনয় মজুমদারেরও পছন্দ । তাঁর প্রতিটি কবিতা পয়ারে লেখা । সুমন গুণ বলেছেন, এই প্রাকরণিক সখ্য তাঁদের সংঘবদ্ধ করেছে । এই দুজন কবির ঘরানার মধ্যে একটি বৈষয়িক সম্বন্ধও আছে । তাঁরা দুজনেই কবিতায় এক স্মিত দার্শনিকতার প্রশ্রয় দিয়েছেন । জীবনানন্দের দর্শন ভেতরে জড়িয়ে রাখে সময়ের ইতিহাসের ঘোর । আর বিনয়ের কবিতা ঘটনার, বিজ্ঞানের, গণিতশাস্ত্রের উদাহরণ পাওয়া যায় । রবীন্দ্রনাথের পরে সময় ও সমাচার নিয়ে এমন অক্ষুন্ন মনস্কতা অন্য কোনো কবির লেখায় বিশেষ পাওয়া যায় না । জীবনানন্দ ও বিনয় কোনও ঘটনার বিবরণ দিয়ে থেমে যান না, সেই ঘটনা বা প্রসঙ্গের একটি সাধারণ নির্ণয়ও রচনা করেন । সুমন গুণও ‘ফিরে এসো,চাকা’ কাব্যগ্রণ্হের পর সম্ভবত আর এগোননি ।
    বিনয় মজুমদার তাঁর ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে বলেছেন, “গোবরডাঙায় সন্দীপ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার একবার আলোচনা হয়েছিল । সন্দীপ এবং আমি একমত হলাম যে গত আড়াই হাজার বছরে যত বই লিখেছে ভারতীয়গণ, তার একটা মোটামুটি হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে দুইজন অমর কবি আছেন । এক শতাব্দীতে সারা ভারতে মাত্র দু’জন । এই হিসেবটাই সত্য । সুতরাং হে বাঙালিগণ, কবি জীবনানন্দের কী দশা হবে আগামী ২০০০ বছর পরে কে বলতে পারে ? কিন্তু জীবনানন্দ খুব খারাপ কবিতা লেখেননি । জীবন যোগ আনন্দ — একসঙ্গে মিলে জীবনানন্দ । তা সত্বেও জীবনানন্দ একটিও আনন্দের কথা লিখতে পারেননি । সব বেদনার কবিতা লিখেছেন ।”
    ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে বিনয় আরও লিখেছেন, “আমি কৈশোরে দাড়ি গোঁফ গজাবার আগে, প্রায় প্রত্যহ দিলীপ গুপ্ত মশাইয়ের সিগনেট বুকশপে যেতাম। দিলীপবাবু আমাকে একটানা আবৃত্তি করে শোনাতেন, তৎকালীন তরুণ কবিদের কবিতা — জীবনানন্দ, সমর সেন, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে প্রমুখ আরো নানাজনের কবিতার বাছা-বাছা অংশগুলি । আমি হাঁ করে শুনতাম । ফলে সপ্তাহে অন্তত একখানা এদের রচিত বই খানিকটা প্রেমে পড়েই কিনে ফেলতাম । জীবনের আনন্দের, মানে জীবনানন্দের কোনো কবিতার বই তখন কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ায় কেনার জন্য পাওয়া যেতো না । সুতরাং দিলীপ গুপ্ত মশাই জীবনানন্দের বাড়িতে গিয়ে একখানি ‘ধূসর পাণ্দুলিপি’ এনে আমাকে দিয়েছিলেন । যতখানি ব্যথাভারাতুর মন হলে জীবনানন্দের ব্যথাভারাতুর কবিতাগুলি ভালো লাগে, ততদূর ব্যথাভারাতুর মন আমার তখনো হয়নি । তবুও আমার কবিতাগুলির প্রতি কেমন যেন মায়া জন্মেছিল । ধূসর শালপাতায় জড়িয়ে যেমন মাংস বিক্রি করে, তেমনি দু-খানি ধূসর মলাটের মধ্যে কবির হৃৎপিণ্ড জড়িয়ে আমার হাতে দেওয়া হয়েছিল ।”
    মামুদ সীমান্ত, যিনি ভারতে এসে শিমুলপুর গ্রামে গিয়ে বিনয় মজুমদারের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, জোগিরার ১৮ অক্টোবর ২০১২ সংখ্যায় লিখেছেন, “যে দৃষ্টি দিয়ে বিনয়কে মানসিক অসুস্হ বিবেচনা করে থাকি, মূলত সেটাই বিনয়ের কাব্যভাষা । লক্ষ্য করার বিষয়, বিনয়কে আমাদের এই অপ্রকৃতিস্হ বোধ-বিবেচনার ফলে বিনয়ের কোনো কবিতায় ব্যঙ্গ-রসাত্মক উপমাটি আমাদের কাছে অন্য মানে তৈরি করে । জৈবনিক দীক্ষায় তিনি কি অন্যমনে শেষমেষ কবিতাকেই ধিকৃত করেছিলেন সমর্পণের দায়ে ? বিনয়ের এইরূপ ভাষা-প্রক্রিয়ায় খেলা করার বিষয়টি বাংলা কবিতার সমঝদার পাঠকশ্রেণিকে নিশ্চয়ই আন্দোলিত করে । বিষয়-বৈচিত্র্যে বিনয়ের কাব্যভাষায় যথেচ্ছ চমক আছে । বিনয় সেই অবতারপ্রাপ্ত হয়েই জন্মেছেন । কিন্তু সমকালের বিকৃত বিবেচনাই তাঁর সে অবস্হানকে ক্ষুন্ন করেছে । বৈচিত্র্যের বদলে হয়ে উঠেছেন মরুবৃক্ষের ন্যায় বিপন্ন, বৈভবহীন, ছিন্ন-মণিষা । ভুল আলোচনার শিকার হয়ে পীড়িত হয়েছেন তিনি। তাঁর কাব্যভাষা মহাকালের খণ্ডিত কম্পনরূপে সাক্ষরিত হয়ে থাকলো আমাদের কাছে ।”
    মামুদ সীমান্ত আরও লিখেছেন, “বিনয় তাঁর কাব্যে অবস্হান করেন উত্তমপুরুষে । এই উত্তমপুরুষটি এককেন্দ্রিক, অন্য অর্থে বহুধাবিভক্তও বটে । কবিতার অন্তর্গত সেই উত্তমপ্রকৃতিটিরই প্রকাশনা ঘটিয়েছেন নির্দ্বিধ, কোথাও ফাঁকি দেননি । এটি তাঁর একটি সেনশেশানাল ফেজ । অথচ তাতে বিনয়ের কোনো খেদ নেই । কেননা বিনয় সেদিকে ফিরেও তাকান না বা তাকানোর প্রয়োজন বোধ করেন না । তাঁর ‘বাল্মীকির কবিতা’, যাকে বলা হচ্ছে যৌনতার ভাষনির্মাণ, সেই কবিতাগুলোকেই আমার বহুল অর্থে লিখিত বলে মনে হয় । প্রশ্ন উদ্রেক হয় যে কবিতাগুলো পাঠের শুরুতেই পাঠক যৌনতা বিষয়ক আচ্ছন্নতায় মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন । এক্ষেত্রে যৌনতার সূত্র ধরে বাংলা কবিতায় উপমা ও বিবৃতির গাণিতিক ব্যাখ্যাটিকেই তিনি পাল্টে দিতে চেয়েছিলেন ।. কবিতাগুলোর মূল্যায়ন বিষয়ে অধিকাংশ পাঠকের নিম্নরুচির উপমাবিচার বাদ দিলে, কবিতাগুলো সর্বাধিক কাব্যশৃঙ্গারে উন্নীত । ভারতীয় উপমহাদেশে কামশৃঙ্গারের বিশ্লেষিত উপস্হাপনায় যেরূপ চিত্র সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত, বিনয়ের কবিতা মোটেও তা থেকে পিছিয়ে থাকে না । ‘আমার ভুট্টায় তেল’ জাতীয় কবিতায় রূপকার্থে ব্যবহৃত এমন সব শব্দ পাওয়া যায় যাকে বহু পাঠক, প্রাবন্ধিক, আলোচক এ যাবত কবিতাগুলিকে যৌনতার অপব্যাখ্যা দিয়ে কবিতার মূল টার্ম ভেঙে বিনয়কে কাণ্ডজ্ঞানহীন দোষী সাব্যস্ত করেছেন, যা একজন উচ্চমার্গীয় কবি-লেখকের ক্ষেত্রে কোনো কালেই প্রাপ্য ছিল না । কবিতাগুলি পাঠশেষে, সর্বাগ্রে আমি এটাই মনে করি, বিনয় মজুমদার এই কাব্যগুলোতেই ভাষার গূঢ়তাত্বিক কারিগরি করেছেন।”
    তিনটি কবিতা পাঠ করে দেখা যাক :-

    বসার পরে
    বসা শেষ হয়ে গেলে দেখা যায় ভুট্টা অতি সামান্যই নরম হয়েছে ।
    নদী সোজা উঠে পড়ে, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি গ্লাসের বাহিরে
    রস লেগে আছে কিনা, নদী তার হাত দিয়ে আমার ভুট্টাটা
    তখন — বসার শেষে কখনো ধরে না, ভুট্টা রসে ভেজা থাকে ।
    আমি কিন্তু হাত দিই, ঘাসের উপরে হাত বোলাতেই থাকি,
    ঘাস টেনে টেনে দেখি, ঘাসের উপরে হাত বোলাতেই থাকি,
    ঘাস টেনে টেনে দেখি, অনেক অশ্লীল কথা অনায়াসে বলি ।
    নদীর গ্লাসের দৃশ্য — গ্লাসের বাহিরটিকে প্রাণভরে দেখি
    ( গ্লাসের ভিতরে দেখি বসার সময়ে শুধু ) বসা শেষ হলে
    গ্লাস খুলে দেখতে সে এখনো দেয়নি, আমি বহির্ভাগ দেখি ।
    হঠাৎ বেলের দিকে চোখ পড়ে মুগ্ধ হয়ে যাই ।
    বেল দুটি এ বয়সে অল্প পরিমাণ ঝুলে পড়েছে, সে দুটি
    মনোমুগ্ধকর তবু চোখ ফের নেমে যায় নিচের গ্লাসের দিকে, সেই
    গ্লাসের উপরিভাগ বসার সময়ে যতো চওড়া দেখেছি
    এখন ততটা নয়, সরু হয়ে পড়েছে তা ঘাসগুলি ঘন হয়ে পড়েছে এখন ।

    যৌবন কাহিনী
    এখন ফুলকে খাই প্রায়শই কলকাতা গিয়ে ।
    কয়েক বছর ধরে খাওয়া হলো, ছেলেও হয়েছে ।
    আরো ছেলে মেয়ে চাই — এই কথা ফুলকে বলেছি,
    খাওয়ার সময়ে আমি ধাক্কা দিতে দিতে এই কথাই বলেছি ।
    ফুল তাতে রাজি আছে, এই ভাবে দুজনের জীবন চলেছে ।
    ফুলের ঘরের পাশে আরো বহু ঘর আছে, প্রতিটি ঘরেই
    নদী আছে, তারা সব আমার খাওয়ায় খুব সহযোগীতাই
    করে থাকে সর্বদাই, ফুল যেই বলে ‘আজ একবার বসি’
    অমনি সে নদীদের একজন জল এনে দেয় ।
    আমরা খাওয়ার পরে সেই জলে কলা গুহা ধুই ।
    আমি গেলে মাঝে মাঝে তাদের ভিতরে কেউ জিজ্ঞাসাও করে
    ‘আজ তুমি বসবে কি’ এইসব পরস্পর খাওয়ার সহযোগীতা করে
    সেখানে — আমার ফুল যেখানে রয়েছে সেই বাড়িটিতে
    নদী আছে, প্রতিবার খাওয়ার পরেই ভাবি তারা সব দেবী ।

    তিন ঘণ্টা পরে
    একবার বসা হলে কমপক্ষে সারাদিন তার
    আমেজ শরীরে থাকে, ভুট্টা থাকে কাৎ হয়ে পড়ে
    সহজে দাঁড়ায় না সে ; মাঝে মাঝে ভুট্টাকে ফুটিয়ে
    ময়লা ও লেগে থাকা রস তুলে আনি
    হাতের আঙুল দিয়ে এবং সে ময়লা ও রসের সুঘ্রাণ
    নাক দিয়ে শুঁকি খুব ভালো লাগে ; প্রথম প্রথম
    বসার পরেই আমি ভুট্টা ধুয়ে ফেলতাম — চাঁদ জল দিয়ে
    গুহা ধুয়ে ফেলবার পরেই আমার ভুট্টা ধুয়ে দিতো জল ঢেলে ঢেলে ।
    অবশ্য কয়েকবার নিজেও ধুয়েছি আমি নিজে জল ঢেলে ।
    তারপর ভাবলাম ভুট্টাতে গুহার রস লেগে থাকা ভালো ।
    তাতে বেশি সুখ পাবো, রস শুঁকে আনন্দও পাবো ।
    সেহেতু এখন আর ধুই না এবং আমি মাঝে মাঝে ভুট্টাকে ফুটিয়ে
    ময়লা ও লেগে থাকা রস তুলে এনে তাই শুঁকি ।
    ভালো লাগে, তার হেতু এই রস চাঁদের গুহার ।

    সমর তালুকদার বিনয় মজুমদারকে প্রশ্ন করেছিলেন, “নারী সংসর্গের অভাব বোধ কর না ?” উত্তরে বিনয় বলেছিলেন, “এটা ব্যক্তিগত — এ ব্যাপারে তোমার সঙ্গে কোনো আলোচনা করব না।”

    বারো

    ‘শব্দের শিশির’ গ্রন্হপ্রণেতা কবি ও প্রাবন্ধিক জয়িতা চক্রবর্তী বলেছেন যে, “প্রত্যেক সৃষ্টিশীল কাজেই প্রাথমিক উথ্থান কবিকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয় ; তাঁর সেরা সৃষ্টিগুলি একে-একে শেষ হতে থাকে । অধোগতি হয়েছে একথা শুনতে হয় তাঁকে । ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথ, যাঁর সেরা সৃষ্টিগুলি পরিণত ও শেষ পর্বে পাওয়া যায় । শিল্পী কখনও নিঃশেষিত হন না । পঞ্চাশের দশকের কবি বিনয় মজুমদার যতো জনপ্রিয় ততোটাই নিন্দিত । আমি মনে করি ‘ভালো কবিতা’ বা ‘মন্দ কবিতা’ বলে কিছু হয় না । বিনয় মজুমদারের প্রথম পর্বের কবিতাগুলিতে রোমান্টিসিজম ছিল, যা বাঙালি পাঠকের চির পছন্দের । শেষ পর্বের লেখাগুলো সময়ের চেয়ে এগিয়ে । কবিতা যেখানে জীবনের অপ্রিয় সত্য, জৈব সত্য ও জীবনের বাহ্যিক অর্থহীনতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে । অনেক কবির মতে বিনয় মজুমদারের সেসব কবিতা অপাঠ্য, বিকৃতরুচির পরিচায়ক । আমি জোর দিয়ে বলছি, তারা বদ্ধ জলাশয় । এমনকি ভুট্টা সিরিজের কবিতার বই পুলিশ অব্দি গড়ায় । স্টল থেকে তুলে নেওয়া হয় তাঁর বই । বাঙালির যৌনতা সম্পর্কে ছুঁৎমার্গ কাটবে না ; তাঁরা ঘোমটার আড়ালে খেমটা নাচ পছন্দ করেন । বিনয় মজুমদারের কবিতায় আছে কাব্যগুণ, আছে জীবনবোধ । তাই শেষজীবনে অসুস্হ শরীরে লেখা কবিতাগুলি অত্যন্ত উপভোগ্য ও উত্তরআধুনিক কবিতাধারায় সৃষ্ট ; একজন সাহসী লেখকের মননশীলতার পরিচয়।”

    এই প্রসঙ্গে পুনরাধুনিক কবিতার প্রবক্তা ও কবি অনুপম মুখোপাধ্যায় বলেছেন, “এই ভুট্টাপর্বের কবিতাগুলোর জন্য তাঁকে কম গালমন্দ খেতে হয়নি । অনেকেই তাঁকে সিরিয়াসলি নিতে চাইলেন না আর এই কবিতাগুলো লেখার পরে । কিন্তু বিনয় ভুট্টা পর্বের কবিতাগুলোয় সম্ভবত সেটাই করলেন, যেটা পিকাসো তাঁর অন্তিমপর্বের এচিংগুলোয় করেছিলেন । নিজের জৈবিক এবং প্রায় হাস্যকর ও অসহায় কামপ্রবৃত্তিকে তুলে আনলেন চোখের সামনে । তিনি ‘লিঙ্গ’ লিখলেন না, এমনকি তার দেশজ প্রতিশব্দটিও লিখলেন না, তিনি লিখছেন ভুট্টা। এটা শব্দের প্রতিস্হাপন । এই খেলাই আমি আজকাল নিজের কবিতায় খেলি । আমি তাঁর স্হানে থাকলে ‘লিঙ্গ’ কেটে ‘ভুট্টা’ লিখতাম, কিন্তু কাটা শব্দটিও পাশে রেখে দিতাম । বিনয় ‘রমণী’ লিখলেন না, তার বদলে ‘চাঁদ’ লিখলেন । ‘যোনি’ লিখলেন না, তার বদলে ‘গুহা’ লিখলেন । ‘সঙ্গম’ লিখলেন না, তার বদলে ‘নাচ’ লিখলেন । বললেন, মেয়েদের নিয়মিত নাচা উচিত । বেশ্যাগৃহে গিয়ে সঙ্গমকে ‘বসা’ লিখলেন । কোনো মেয়ের নাম দিলেন ‘ঔদার্য’, এবং মনে মনে তার সঙ্গে রমণ করে কবিতা লিখলেন । যোনিপ্রদেশকে বললেন মায়াসভ্যতা । বীর্যের ফোঁটাকে বললেন চন্দন । কিন্তু যখন তাঁর কবিতার নাম হলো ‘আমার ভুট্টায় তেল’, স্পষ্টই বোঝা গেল তিনি কী লিখছেন — একজন দেহপসারিণী নিজের যোনিতে নেওয়ার আগে একজন পুরুষের লিঙ্গে তেল মাখাচ্ছেন । যেমন গাছের তলায় রাখা লম্বাটে পাথর দেখলে মানুষ প্রণাম করে, কারণ তার মাধায় শিবলিঙ্গ উদ্ভাসিত হয়, যেমন আলুর শুঁড় দেখেই তাকে বস্তা থেকে সরিয়ে কুলুঙ্গিতে রাখা হয়, গণেশ হিসাবে । কিন্তু একজন প্রতিষ্ঠিত কবি এভাবে সরাসরি কামবিষয়ক কবিতা লিখবেন এটা অনেকেই মানতে পারেননি, আজও পারেন না । তাঁরা আজও ‘ফিরে এসো, চাকা’, অথবা খুব বেশি হলে ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’কেই বিনয় মজুমদার মনে করেন এবং স্বস্তিতে থাকেন, মধ্য ও শেষ পর্বের বিনয়কে উন্মাদ আখ্যা দিয়ে।” ( ২০১৬ )
    অনুপম মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য লক্ষনীয় । অনুপম বলছেন না যে বিনয় তাঁর এই কবিতাগুলোয় ‘উপমা’ প্রয়োগ করেছেন । বিনয় মজুমদার শব্দের ‘প্রতিস্হাপন’ ঘটালেন । এখানেই জীবনানন্দের সঙ্গে বিনয়ের পার্থক্য । জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় ‘মতো’ ‘যেন’ ইত্যাদি প্রয়োগ করে গেছেন, যা বিনয় ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ থেকে তাঁর পরের কবিতায় আর করেননি, ‘বাল্মীকির কবিতা’য় তো করেনইনি । উপমা বাদ দেবার দরুণ বিনয় প্রকৃতির সঙ্গে পরমাপ্রকৃতির অভেদকে সনাক্ত করছেন । কিন্তু জীবনানন্দ যে ক্রমে উপমা থেকে সরে গিয়ে প্রতীকে এবং প্রতীক থেকে বস্তু-সম্পর্কে চলে যেতে লাগলেন, তা বিনয় ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন তাঁর ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে । বিনয়ের এই পর্বের কবিতায় শব্দের প্রতিস্হাপনের কথা অর্ঘ্য দত্ত বকসীও বলেছেন তাঁর “প্ল্যানচেটে যৌনসমীক্ষায় বিনয় মজুমদার” আলোচনা পুস্তিকায়, তিনি এদের বলেছেন প্রতীক : চাঁদ, নদী, ফুল, গুহা,হ্রদ ( যোনি ), ঘাস ( যোনিরোম ), লেবু, বেল ( স্তন ), ভুট্টা, কলা, চন্দনকাঠ ( লিঙ্গ ) ।
    এই প্রতিস্হাপন বাংলা কবিতায় নতুন নয় । চণ্ডিদাস-এর ৮৭৯ পদ পাঠ করা যাক :

    সহজ সহজ সবাই কহয়ে
    সহজে জানিবে কে ।
    তিমির অন্ধকার যে হইয়াছে পার
    সহজে জেনেছে সে ।।
    চান্দের কাছে অবলা আছে
    সেই সে পিরীতি সার ।
    বিষে অমৃততে মিলন একত্রে
    কে বুঝিবে মরম তার
    বাহিরে তাহার একটি দুয়ার
    ভিতরে তিনটি আছে ।
    চতুর হইয়া দুইকে ছাড়িয়া
    থাকিব একের কাছে ।।
    যেন আম্রফল অতি সে রসাল
    বাহিরে কুশী ছাল কষা ।
    ইহার আস্বাদন বুঝে যেই জন
    করহ তাহার আশা ।।

    নিজের কবিতার কৃৎকৌশলের সঙ্গে বিনয় মজুমদার প্রথম থেকে শেষ পর্ব পর্যন্ত সচেতন ছিলেন ; কবিতার সৃজন এবং বর্জনীয় উপাদান সম্পর্কে অতিসতর্ক থাকতেন । সেকারণে দেখা যায় যে আলোচনাকালে তিনি আধুনিক পেইনটিঙ থেকে ব্রাশ স্ট্রোকের বিলয় এবং মেটাফর থেকে কবিতার মুক্তির কথা বলেছেন, যাতে জীবনের রহস্যময়তাকে সম্পূর্ণ উদ্ঘাটন করা না হয়, এবং সেই সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার ও পারলৌকিকতার ফাঁদে না পড়তে হয় ।
    প্রণব সরকার বলেছেন, “বিনয় একালের কামসূত্র বা ভুট্টা সিরিজের কবিতা বা ‘বাল্মীকির কবিতা’র ভিতরে রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার করেছেন দক্ষতার সঙ্গে, যা আমাদের কাছে সরাসরি অশ্লীল কোনো ভাব প্রকাশ করে না । বরঞ্চ প্রাপ্তবয়স্কদের মনস্ক করে ।”
    উপরোক্ত বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে প্রবীর ভৌমিক বলেছেন, “যে সৌন্দর্যময় নারীচেতনার তান্ত্রিক পূজারী বিনয়, তিনিও অপরিচ্ছন্ন, বিকৃত, বমন উদ্রেককারী এই লাইনগুলো লেখেন, ‘গুহায় বোজানো মুখ চেপে ধরে ঠেলা দিই/সঙ্গে সঙ্গে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ি/ভুট্টাটি সহজভাবে ঢুকে গেলে সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কা শুরু করি ।’ এ বিনয়কে মানায় না । বিনয়ের এই কবিতাগুলোকে মহিমান্বিত করে ছোট করবার একটা অপচেষ্টা চলছে । আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত।”
    রনজিৎ দাশ একটি যুক্তি দেবার প্রয়াস করেছেন । তিনি বলেছেন, “আর দশজন আধুনিকের মতো বিনয়ও হেঁটেছেন বদল্যার নির্দেশিত এই স্বপ্নসম্ভব পথেই, কিন্তু পৌঁছেছেন এক ভিন্ন গন্তব্যে।”
    প্রশ্ন হলো, ‘ফিরে এসো, চাকা’ লিখে বিনয় তো বাংলা কবিতার ইতিহাসে জীবনানন্দের পর নিজস্ব স্হান করেই নিয়েছিলেন । তাহলে তিনি ‘অঘ্রাণের অনূভূতিমালা’ আর ‘বাল্মীকির কবিতা’ এবং তার পরবর্তী সাব-জনারের কবিতাগুলো লেখার উদ্যোগ নিলেন কেন ! এগুলো লেখার জন্য তো তিনি টাকা পাননি, বরং পুরস্কারের লক্ষ্যবস্তু থেকে দূরে ছিটকে গিয়েছিলেন । বদল্যারের জীবনকাহিনির প্রভাবে পঞ্চাশের কবিরা কলকাতার যৌনপল্লি যাওয়া আরম্ভ করেন ঠিকই, বিনয়ও, আমার অনুমান, তাঁদের কিছু পর থেকে তাঁর নারীহীন যৌনজীবনের প্রয়োজন মেটাতে যাওয়া আরম্ভ করেছিলেন বটে, কিন্তু কবিতা লিখে তার প্রমাণ দিতে যাবেন কেন ?
    আমার মনে হয় যে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে-তুলে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীরা এবং তাঁর গুণমুগ্ধরা , একই খোঁচা বার বার দিয়ে তাঁকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছিলেন। তা থেকে মুক্তি পাওয়া জরুরি হয়ে উঠেছিল, এবং তার প্রথম ধাপ হিসাবে তিনি লিখলেন ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’. যেটিকে তিনি বললেন “নারীভূমিকা বর্জিত আদিরসাত্মক কবিতা”– ঈশ্বরী অথবা গায়ত্রীর ভূমিকা আড়াল করার এটি প্রথম পদক্ষেপ । বিনয় লিখলেন :-

    এইখানে পাহাড়ের ভাঁজ বলা যেতে পারে, বাঁক বলা যেতে পারে, অথবা
    দু-দুটি পাহাড় এসে মিলে গেছে যদি বলা হয় তবে একেবারে
    হুবহু বর্ণনা হয় ; …মিশেছে প্রায় সরলকোণের খুব কাছাকাছি এক স্হুলকোণে

    ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ থেকে প্রাসঙ্গিক লাইন তুলে তুলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন অর্ঘ্য দত্ত বকসী তাঁর ‘বিনয় মজুমদার ও অঘ্রাণের অনুভূতি– বিশাল দুপুরবেলার যৌনসমীক্ষা’ বিশ্লেষণে ( ২০১৪ ) । অর্ঘ্য বলেছেন, “অনেকটা উল্টোনো বিস্ময়বোধক চিহ্ণের মতো লাগে এই যোনি । বিস্ময়বোধক, তাই হয়তো উল্টোনো, ডিসপ্লেসড । দেহের সর্বাপেক্ষা গোপন স্হানে যোনির অবস্হান। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তি গোপনতায় । চাঁদের গুহার দিকে অনিমেষ চেয়ে থাকেন কবি । কবি বলছেন, প্রাণলোকে ( অনুভূতিমণ্ডলে ) প্রবেশাধিকার দিয়ে তৎলোকে বিক্ষোভ সৃষ্টি করে তৃপ্তিদান করানোর বাসনা এবং গোপনতার অনুভূতির সঙ্গে যোনির সরাসরি সম্পর্ক । যোনি varies directly as প্রাণলোকে প্রবেশাধিকার দেওয়ার বাসনা — গোপনতা । তাই পাহাড়ের জীবনেও গোপনভাবে প্রবেশ করে কবি বর্ণনা করেছেন এই জোড় ও মধ্যবর্তী গোপন গোপন ক্রীড়ার স্হান — বানিয়েছেন প্রাকৃতিক যোনি — প্রকৃত কবিতার মতো ! প্রকৃত সারসের মতো !”
    এক কোণে, পাহাড়ের কোণের ফাঁকেই হল আমার বাড়িটি, ঠিক কোণে
    পাহাড়ের ঢালু গায়ে চুড়ার কিছুটা নীচে ঢালু কোণে বাড়িটি ঢোকানো
    লম্বালম্বিভাবে পাহাড়ের ভিতরে অনেক দূর খুব বেশি সুন্দর উপায়ে

    অর্ঘ্য বলেছেন, “স্তন বা চূড়ার নীচে যৌনস্হান যা ঢালু অংশে স্হাপিত সেখানে যোনিমুখ থেকে ভিতরে ‘ঢোকানো’ দীর্ঘ যোনিগহ্বর ও তাতে নিত্য অবস্হানরত অনুপ্রবেশিত শিবলিঙ্গ, সদারমণরত নিত্য পূজা।”

    বারান্দাটি শুধু এই পাহাড়ের পাথরের গা থেকে বেরিয়ে ঝুলে আছে
    সামান্যই বেরিয়েছে, পাতলা লতার গাছে বারান্দাটি চারপাশে ঘেরা

    অর্ঘ্য মনে করেন, “বাড়ি যদি লিঙ্গ হয়, বারান্দা তবে স্বভাবতই বাইরে ‘ঝুলে’ থাকা চারপাশের যৌনরোমসহ অন্ডকোষ । বিনয় অন্যত্র ঘাসের কথা বলেছেন যা প্রকৃতপক্ষে যোনিরোম।”
    দ্বিতীয় পদক্ষেপ হল ‘বাল্মিকীর কবিতা’ — যা তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ও গুণমুগ্ধ স্তাবকদের থেকে গায়ত্রীকে সম্পূর্ণ আড়াল করার জন্য যথেষ্ট ছিল ।
    ‘বাল্মীকির কবিতা’ নিয়ে বিনয়ের মনে দোনামনা ছিল বলে মনে হয় । ‘গ্রন্হি’ পত্রিকার জন্য নেয়া সাক্ষাৎকারে ১৪১২ বৈশাখে চন্দন ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিনয়ের এরকম কথাবার্তা হয়েছিল :-
    প্রশ্ন : এখনকার বাংলা কবিতায় মেয়েরা যৌন আকাঙ্খামূলক লেখাগুলো বেশ খোলামেলা ভাবেই লিখছেন । প্রতিষ্ঠিত কবিরা স্বাগতও জানাচ্ছেন এই পরিবর্তন কে । উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গ্রন্হির বর্তমান সংখ্যাতেই তসলিমা লিখেছেন একটি গদ্য, নাম ‘নারী শরীর’ । আপনিও যৌন অভিজ্ঞতার কথা সরাসরি দু’একটি প্রতীকের আড়ালে লিখেছিলেন ভুট্টা সিরিজের কবিতায় । একটা ছোট কবিতার বইও সম্ভবত হয়েছে কবিতাগুলি জড়ো করে । পরে আপনি তাদের disown করেন । আজ এই মুহূর্তে কি পাল্টাবেন মতামত ? এই ধরণের কবিতার স্হায়ীমূল্য কি আছে ?
    বিনয় : ( মৃদুস্বরে বলে যান ) না, কোনও বই নেই তো । আমার জানা নেই এমন কোনও বইয়ের কথা । এগুলো উল্লেখযোগ্য লেখা নয় ( অস্বীকারের ভঙ্গীতে হাত নাড়েন ) । তবে মহিলা কবিরাই চিরকাল ভালো কবিতা লিখে এসেছেন । যেমন, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হবে ।’ কিংবা ওই লেখাটা, ‘ফুটফুটে জ্যোৎস্নায়…।’ আর স্হায়ী মূল্যের কথা বলছ ? দ্যাখো, প্রথমে যখন লিখতে শুরু করি তখন লক্ষ্য ছিল পাঠককে জ্ঞান দান, তার বুদ্ধি বাড়ানো, কবিতাগুলিকে তার মনে রাখানোর চেষ্টা, তার সঙ্গে যেন আমার কথাও মনে পড়ে, সেদিকে নজর রাখা ইত্যাদি । কবিতা কীভাবে হয়, কীভাবে সার্থক, আমিও জানি না । হয়ে যায়, এই পর্যন্ত।’
    ‘কবিতীর্থ’ পত্রিকায় ১৯৮২ সালে প্রকাশিত সমর তালুকদারের ঠাকুরনগর স্টেশানে ট্রেনের জন্য অপেক্ষার সময়ে কথাবার্তার মাঝে বিনয় মজুমদার সমরবাবুকে জিগ্যেস করেছিলেন, “১৯৭৭ সালে বিশ্ববাণী থেকে প্রকাশিত ‘বাল্মীকির কবিতা’ বইটি তিনি পড়েছেন কিনা।” ১৯৯৩ সালে কথাপ্রসঙ্গে ‘যোগসূত্র’ পত্রিকার জন্য নেয়া সাক্ষাৎকারে অজয় নাগকে বিনয় বলেছিলেন, “আদিরসাত্মক কবিতাগুলি নিয়ে একটা বই বেরোয় তার নাম দিই ‘বাল্মীকির কবিতা’ ; কেন যে লিখেছিলাম মনে নেই এখন ।”
    বিনয়ের কবিতাকে প্রতি-রোমান্টিসিজমের প্রসারণ থেকে, যা কিনা পুনরুদ্ধারের অতীত এক নিগূঢ় পন্হা, এবং যা কিনা অবিরাম রোমান্টিক-নিউরোটিককে , আর আমাদের জীবনযাপনের আধুনিকতাবাদী ব্যাজস্তুতিকে, পর্যদুস্ত করে, তা থেকে বের করে আনা দরকার । বিনয়ের কবিতা আক্রান্ত হয়েছে সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে, বাঙালি ভদ্রলোকের সাংস্কৃতিক রাজনীতিতে, যার পাল্লায় এক সময়ে জীবনানন্দকে পড়তে হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথকেও পড়তে হয়েছিল । এখানে বিনয়ের এই কবিতাটি প্রাসঙ্গিক :

    হাসপাতালে
    এজরা হাসপাতালে যখন ছিলাম
    তখন পাগল বলে ডাকত আমাকে
    রাত্রিবেলা অন্ধকারে দেখতাম আমাকে খাওয়ার
    নিমিত্ত রামদা হাতে আসত পরমেশ ও
    উমা দাশগুপ্ত, দেখে আমি
    বলতাম দরজায় লেখা আছে আমি আছি পাগলা গারদে
    আমি তো পাগল আর পাগলের মাংস খেলে
    তোরাও পাগল হয়ে যাবি
    প্রতিদিন রাত্রিবেলা এ কাণ্ড ঘটতো ।
    তখন আমাকে আর কেটে কেটে খেতে আসত না ।

    প্রত্যেকেই অস্তিত্বের পাগলাগারদে জীবন কাটান । সেটা হলো অক্ষমতার অস্তিত্ব । তা এই জন্য নয় যে আমরা মানসিকভাবে যুক্তিহীন প্রাণী, বরং মানুষকে মেরে ফেলে তার মাংস খাওয়াকে অসম্ভব মনে করা যায় না । আমরা সবাই কিনারায় দাঁড়িয়ে কাঁপছি । মানুষ মেরে তার মাংস খাবার সম্ভাবনাকে অস্বীকার করা যাবে না । সেই দিন আগত । প্রতিটি বাঁকে আমরা আমাদের সহযাত্রীদের প্রতি নিষ্ঠুর, এবং তা মেরে ফেলে মাংস খাওয়ার চেয়ে কম কিছু নয় । পাগলাগারদের পাহারাদার অভিভাবকদের ভূমিকা সেটাই । সুযোগ পেলেই মানুষ তার সহযাত্রীদের প্রতি নিষ্ঠুর হবার যারপরনাই প্রয়াস করে । পাগলাগারদের বিশেষ অভিভাবক হবার সংজ্ঞা সেইটাই । আমরা নিজেদের কেটে টুকরো করছি, আমাদের অস্হিরতা আমাদের তা করতে প্ররোচিত করছে, যাতে আমরা সমাজে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখতে পারি ।
    কলকাতা শহরের হাসপাতালগুলোয় রোগীদের ক্রুদ্ধ আত্মীয়দের আক্রমণাত্মক আচরণ দেখলেই তা টের পাওয়া যাবে । স্কিৎসোফ্রেনিয়ার চিকিৎসক আমাদের দেশে বিরল ; যে চিকিৎসকরা আছেন তাঁরা ম্যাডনেস ও ইনস্যানিটির ডাক্তার, যে কারণে সোভিয়েত দেশ ভেঙে পড়লে নিমু ভৌমিক তা সহ্য করতে না পেরে স্বদেশে ফিরে আসেন এবং উন্মাদ হয়ে যান, তাঁকে বাঁচানো যায়নি, তিনি জার্মান কবি ফ্রেডরিক হ্বেল্ডারলিনের মতন ‘হাইপোকনডিয়াইসিস’ মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন । সোভিয়েত দেশে নিমু ভৌমিক সারা জীবন সুস্হ ছিলেন। বাংলা ভাষায় ‘হাইপোকনডিয়াইসিস’-এর বাংলাও পাগল হয়ে যাওয়া, কেননা হাইপোকনডিয়াইসিসের বাংলা প্রতিশব্দ নেই ।
    মালটিপল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, প্যারানয়া, সাইকোসিস, ডিপ্রেশনজনিত অসংলগ্নতা, উদ্বেগের অসংলগ্নতা, ট্রমাজনিত আচরণ, ফোবিয়া, হ্যালুসিনেশনবোধ, ডেলিউজান, অ্যানেরোক্সিয়া নার্ভোসা, বুলিমিয়া নার্ভোসা সোমাটোফর্ম, স্মৃতিবিলোপ, সবই বঙ্গসমাজে পাগলামির নাম দিয়ে চালানো হয় । স্কিৎসোফ্রেনয়াও তিন রকমের হয় : অ্যাক্টিভ, ক্যাটাটনিক এবং ডিসঅর্গানিজড — শরীরে রাসায়নিক ও হরমোনের ভারসাম্যের তারতম্য দিয়ে নির্ধারিত হয় । সবগুলোকেই বলা হয় মস্তিষ্কবিকৃতি বা পাগল হয়ে যাওয়া ! লুম্বিনী পার্কের চিকিৎসকরাও শব্দগুলোর বাংলা প্রতিশব্দ তৈরি করেননি ।
    বাংলা ভাষায় শব্দসংখ্যা এতোই কম যে এই বিষয়ে ১৪১৩ বঙ্গাব্দে ‘অউম’ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে বিনয় মজুমদার জয় মুখোপাধ্যায় ও সন্মোহন চট্টোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, “ শিবরাম চক্রবর্তী বলেছিলেন যে, একটি কবিতায় একস্হানে একটিমাত্র শব্দ বসার কথা । জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানে ১,২০,০০০ শব্দ আছে । সেই শব্দের ভিতর থেকে একটিমাত্র শব্দ এনে বসাতে হবে । এই খুঁজে বের করা কবির বিষয় । এটা শিবরামের হলেও সমান চিন্ত্যনীয় । কারণ আগেই বলেছি যে ধেনুর সঙ্গে বেণু, গেনু, পেনু এইসব শব্দ অভিধান থেকে বেছে বের করার সময় সৃষ্টিকর্তার মাতব্বরির খপ্পরে পড়তে হয় ।” বস্তুত সৃষ্টিকর্তার মাতব্বরির খপ্পর থেকে বেরোবার জন্যই কবিরা একটি শব্দের জায়গায় আরেকটি শব্দ প্রতিস্হাপন করেন, যা বিনয় মজুমদার করলেন ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ ও ‘বাল্মীকির কবিতা’ কাব্যগ্রন্হে । উল্লেখ্য যে হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি শব্দের ডিজিটাইজেশনের পর জানিয়েছে যে তাতে শব্দসংখ্যা ১০,২২,০০০ ; অর্থাৎ আমাদের ভাষার দশগুণ । ইংরেজির চেয়ে তুর্কি ও জার্মান ভাষায় শব্দের সংখ্যা বেশি । শেক্সপিয়ার বহু শব্দ তৈরি করে দিয়ে গেছেন । জীবনানন্দের মতন বিনয় মজুমদারও বেশ কয়েকটি শব্দ তৈরি করেছেন। আটের দশক থেকে কবিরা শব্দ তৈরি করছেন, কলকাতার সাধারণ মানুষও সমবেত শব্দ তৈরি করেন । কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য অক্সফোর্ড ডিকশনারি কমিটি না থাকায় শব্দ সংগ্রহ করে অভিধানে ঢোকানো হয় না ।
    বিনয় মজুমদারের কোন ধরণের স্কিৎসোফ্রেনিয়া হয়েছিল তা তাঁর হাসপাতালের কাগজ দেখে গবেষকরা বের করবেন কখনও, আশা করি । তাঁর অসংলগ্নতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে অসফল আশপাশের মানুষেরা তাঁকে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিতেন মানসিক চিকিৎসালয়ে । এই প্রসঙ্গে বিনয় মজুমদার লিখেছিলেন, “পশ্চিমবঙ্গের পাগলাগারদ সমূহের পরিদর্শক আমি । আমার সরকারি চাকরিই তাই । যা বেতন পাই তাতে মোটামুটি সংসার চলে যায় — একার সংসার।” ১৯৯৩ সালে সঞ্জয় চক্রবর্তীকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন, সীমান্ত অতিক্রম করে পূর্ব পাকিস্তানে যখন ছিলেন, “তখন কেউই বড়ি-ফড়ি কিছু খাওয়াতেও এলো না । ইনজেকশানও দিতে এলো না । তোফা ছিলাম । আর ভারতবর্ষে আমাকে সাতবার পাগলাগারদে পোরা হয়েছে । অনেকেই তো পাগলাগারদে ছিলেন । তাঁদের জীবনীতে তা লেখা হয় না । আর আমার জীবনী লিখতে গেলে প্রথম বাক্যই লেখে — গোবরা মানসিক হাসপাতালে ছিলেন । পাগলাগারদে আর কে কে ছিলেন শুনবে ? লুম্বিনী পার্কে ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, ঋত্বিক ঘটক । এঁদের জীবনী যখন লেখে তখন তো একথা এভাবে লেখে না যে এঁরা পাগলা গারদে ছিলেন । অথচ আমার ক্ষেত্রে প্রথমেই ওই কথা — মানসিক হাসপাতালে ছিলেন ।”
    আমাদের মানসিক অবস্হা দিয়ে আমাদের প্রকৃতিস্হতা সংজ্ঞায়িত হয় না । হয় আমাদের বেঁচে থাকার উপরিতল দিয়ে – বিনয়ের উপরোক্ত কবিতার ক্ষেত্রে ‘মাংসভক্ষণ’ নিষ্ঠুরতাকে গোপন করে রেখেছে, মানুষের নিষ্ঠুরতা, প্রতিপদে সামনের শত্রুকে খেয়ে ফেলার ষড়যন্ত্র । এই নিষ্ঠুরতা যেন সহ্য হয়ে-যাওয়া নৈতিকতা । প্রতি রাতেই যে তা ঘটে তা বিনয়’ বাল্মীকির কবিতা’য় আমাদের দেখিয়েছেন । মানুষের মাংসভক্ষণ হয়ে ওঠে মানুষের অন্তরাত্মার ভক্ষণ । এই কবিতাটি পড়ে দেখা যাক :

    মাংস খাওয়া
    আমি যদি মুরগির মাংস খাই
    তাতে মুরগির উপকার হয় ।

    জীবিত অবস্হায় ছিল তুচ্ছ মুরগি
    তার মাংসে খুব উন্নত স্তরের কিছু ছিল ।

    প্রবাদ বাক্য হচ্ছে মাংসে মাংস বৃদ্ধি ।

    তার মানে যখন মুরগির মাংস খেলাম
    তখন সে মুরগির মাংস আমার শরীরের
    মাংস হয়ে গেল ।

    তার মানে সবই বুঝতে পারি
    আমার শরীরের মাংস মুরগির
    মাংসের চেয়ে উন্নত স্তরের কিছু ।

    এতে দেখা যাচ্ছে মুরগির উপকার হয়ে গেল ।

    তেরো

    বিনয় মজুমদারের অসুস্হতাকে তরুণ কবি-লেখকরা অনেকেই রোমান্টিসাইজ করার প্রয়াস করেছেন — তা একজন মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে ছেলেখেলা । কলকাতায় বসবাস করে দূরত্ব বজায় রেখে বিনয়ের অসুস্হতার নান্দনিকতা গড়ে তুলতে চেয়েছেন তাঁরা, যেন তাঁরা বিনয়ের কবিতার উদ্ধারকারী। কবি কিন্তু তাঁর পারক্যবোধকে সযত্নে আগলে রাখতেন, এবং অতিথি গুণমুগ্ধদের ভাবপ্রবণ আচরণকে প্রকৃতি-পৃথিবীর অত্যন্ত জটিল ব্যাখ্যার মাধ্যমে সীমায়িত করে দিতেন । বিনয়ের চরিত্রে ছিল অদম্য বলিষ্ঠতা। তাই তিনি নিজে যে ধরণের কবিতা ও গদ্য লিখবেন বলে মনস্হ করতেন, তাই লিখতেন । তাঁর ‘ধূসর জীবনানন্দ’ পড়লে বোঝা যায় তিনি ভাবনাকে কোন পথে পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন । কবিতায় দিনপঞ্জির অনুপ্রবেশ ঘটনোর মাধ্যমে তিনি নিজের জীবনচর্যা রেকর্ড করেছেন এবং এগিয়ে গেছেন, যেমনটা দিনপঞ্জি লেখকেরা করে থাকেন, আগের দিনের ঘটনাকে পেছনে ফেলে আসেন । কবিতা লেখা হয় ভাষার মাধ্যমে, এবং ভাষা চিরকাল সময়বন্দী, পরবর্তীকালে গিয়ে তা আটকে যায়, যেমন চর্যপদের ক্ষেত্রে ঘটেছে, সময়ের দ্বারা তা সীমায়িত । প্রতিষ্ঠানকে উপেক্ষা করেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন কাল্ট ফিগার, আর নিজের দুরাবস্হাকে উপস্হাপন করে সেই প্রতিষ্ঠানকে হাস্যকর ও অপ্রয়োজনীয় প্রতিপন্ন করে দিয়েছেন । কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত ব্যথা তিনি তাঁর কবিতাকেই অবিরাম জানিয়ে গেছেন, ‘ফিরে এসো, চাকা’ বইয়ের কবিতাগুলোর সময় থেকে । তাঁর একটি কবিতার শিরোনাম ‘আমরা সর্বাঙ্গ দিয়ে ভাবি’ — তাঁকে যারা পাগল তকমা দিয়েছিল তাদের এটা সরাসরি আক্রমণ, কেননা তিনি কেবল মস্তিষ্ক দিয়ে ভাবছেন না, সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে ভাবছেন ।

    আমরা সর্বাঙ্গ দিয়ে ভাবি

    আই গ্রাফটিং করা হয়
    তার মানে একজনের চোখ
    কেটে তুলে নিয়ে অন্য একজনের
    চোখের জায়গায় জোড়া লাগিয়ে
    দেওয়া হয় ।

    প্রথম ব্যক্তির চোখ উপড়ে
    নেওয়া হল । জোড়া লাগিয়ে
    দ্বিতীয় ব্যক্তির শরীরে ।

    এই উপড়ে নেওয়া এবং জোড়া
    লাগানো, এই করতে সময় লাগল
    ধরা যাক পাঁচ মিনিট । এই পাঁচ মিনিট যাবৎ
    চোখ জীবিত ছিল ।


    একজনের শরীরের রক্ত বার করে নিয়ে
    বোতলে পুরে রাখা হয় এবং কয়েক
    দিন পরে এই বোতলের থেকে অন্য
    একজনের শরীরে ঢুকিয়ে
    দেওয়া হয় এর থেকে বোঝা যায়
    বোতলে পোরা অবস্হায় রক্ত জীবিত
    ছিল, রক্তের প্রাণ ছিল, রক্ত ভাবছিল ।
    কারণ দ্বিতীয় ব্যক্তির শরীরে ঢুকে
    রক্ত স্বাভাবিক হয়ে গেল ।


    ‘খ’-এ যা লিখেছি ( বোতলে যখন রক্ত ছিল তখন রক্তের প্রাণ
    ছিল ) তাহলে মুরগি যখন কাটা অবস্হায় পড়েছিল ( ‘ক’ দেখো )
    তখন মুরগির মাংসের প্রাণ ছিল, ভাবছিল সুতরাং একজন মানুষ
    মুরগির মাংস খেলে পাকস্হলির ভিতরের মুরগির মাংস জীবিত,
    ভাবছিল পরে এই মুরগির মাংস মানুষের শরীরে মাংস হয়ে
    গেল । এই নতুন দ্বিতীয় অবস্হায় মুরগির উপকার হল ।

    অদ্রীশ বিশ্বাস তাঁর স্মৃতিচরণে লিখেছেন, “আমি যখন প্রেসিডেন্সির ছাত্র, তখন বিনয় মজুমদারকে ঠাকুরনগর থেকে মেডিকাল কলেজে এজরা ওয়ার্ডে ভর্তি করে নিয়মিত কলেজ থেকে এসে দেখাশোনা আর গল্প করার ভার দেন তৎকালীন দুই উচ্চপদস্হ আমলা তারাপদ রায় ও কালিকৃষ্ণ গুহ । সেই সময় থেকে বিনয় মজুমদার ওনার বিখ্যাত খবরের কাগজের সংবাদই কবিতায় ঢোকান । আর ছিল ডায়েরি বা দৈনন্দিনকে কবিতায় ঢোকানোর পর্ব। এই পদ্ধতির ব্যবহার নিজের চোখে দেখা । অনেক কবিতা আজও সংগ্রহে আছে । কিন্তু বিনয় মজুমদার যে মহাপয়ারের জন্য বিখ্যাত, সেই কবিতাগুলো, ‘ফিরে এসো, চাকা’ নিয়ে শৈবাল মিত্র একটা চমৎকার টেলিফিল্ম বানান যা অনালোচিত থেকে গেছে বাঙালি জীবনে । এই সেই একমাত্র টেলিফিল্ম যেখানে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাককে সেরিব্রাল ডিরেক্টারের মতো করে তুলে এনেছেন । কিন্তু বিনয় মজুমদারের সঙ্গে সময় কাটাতে কাটাতে আমি ওঁর লেখা দুষ্প্রাপ্য কাব্যগ্রন্হ ‘বাল্মীকির কবিতা’ বিষয়ে আলোচনা তুলি । দেখি, উনি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না, এড়িয়ে যাচ্ছেন । বললেন, কোথায় শুনলাম এই নাম । আসলে ‘বাল্মিকীর কবিতা’র কথা বলেন সন্দীপ দত্ত । তখন আমি কপি সংগ্রহ করি বইটার প্রকাশকের ঘর থেকে । কিন্তু দেখি সন্দীপ দত্ত কথিত সেটা একটা খণ্ডিত সংস্করণ ; মানে, সব কবিতা নেই। ব্রজগোপাল মণ্ডল ছিলেন প্রকাশক । তারপর বিনয় মজুমদার বলেন ‘এটা হলো বিনয় মজুমদারের একমাত্র ইরোটিক কবিতার বই বা বাংলা ভাষায় একমাত্র ইরোটিক কবিতা । ভারতীয় কামসূত্র বা দেশীয় আকাঙ্খাকে তত্ত্ব হিসাবে ব্যবহার করা ও ব্যক্তিজীবনকে মিশিয়ে কবিতার ইরোটিকা তৈরি করা ।’ কেউ জানতো না । প্রকাশক ছাপতে রাজি হয়নি । খণ্ড ছেপেছে । আমি সন্দীপ দত্তের কাছে কিছু পূর্ণসংস্করণের খোঁজ পাই । কপি মেলে না । তখন বিনয় মজুমদার ঠাকুরনগর থেকে কপি এনে দেন । পড়ে আমি অবাক হই যে কেন এমন একটা কবিতার ইরোটিকা বাঙালি পড়তে পারবে না । এটা নিয়ে লিখি ও পুনর্মুদ্রণের দাবি করি । এই দাবি বিনয় মজুমদার সমর্থন করে ইনটারভিউ দেন সুবীর ঘোষকে । তারপর দেজ থেকে ‘বাল্মীকির কবিতা’র পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ বের হয় । ওই ‘বাল্মিকীর কবিতা’র সূত্রেই আমি ওঁর বউ ও ছেলের খোঁজ পাই । তাদের নাম রাধা ও কেলো । একদিন সোনাগাছিতে গিয়ে তাদের আবিষ্কার করি আর সেলুলয়েডে ইনটারভিউ তুলে আনি।”
    অদ্রীশ বিশ্বাস যদি সংবাদপত্র থেকে গড়া বিনয়ের কবিতাগুলো প্রকাশ করেন তাহলে আমরা বিনয়-চরিত্রের আরেকটা ডাইমেনশনের সঙ্গে পরিচিত হবো, বিনয়ের কবিতার আরেকটি সাব-জনারের কথা জানতে পারবো ।
    এই সূত্রে সন্দীপ দত্ত জানিয়েছেন যে, “১৯৭৫ সালে এক সাহিত্য সন্মেলনে বিনয় মজুমদার ‘বাল্মীকির কবিতা’ বই থেকে কবিতা পড়া শুরু করা মাত্র ভদ্রলোকদের উঠে যেতে দেখেছিলাম।”
    পরে বিনয় মজুমদারকে নিয়ে একটি টেলিফিল্ম হয়ছিল যাতে বিনয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জয় গোস্বামী । বিনয় ফিল্মটা প্রতিবেশীর টিভিতে দেখেছিলেন । এই বিষয়ে চন্দন ভট্টাচার্য তাঁকে প্রশ্ন করলে প্রথমে তিনি নিরুত্তর থাকেন, পরে বলেন, “এক-দু ঘণ্টার সিনেমায় কি গোটা জীবন ধরা যায়!”
    বিনয় মজুমদারের বউ রাধা আর ছেলে কেলোকে নিয়ে লেখা কবিতাটি একটি গাণিতিক প্রতর্কে মোড়া :

    ভারতীয় গণিত
    ক্যালকুলাসের এক সত্য আমি লিপিবদ্ধ করি ।
    যে কোনো ফাংকশানের এনেথ ডেরিভেটিভে এন
    সমান বিয়োগ এক বসিয়ে দিলেই
    সেই ফাংকশানটির ফার্স্ট ইন্টিগ্রেশনের ফল পাওয়া যায়–
    এনেথ ডেরিভেটিভে এন
    সমান বিয়োগ দুই বসিয়ে দিলেই
    সেই ফাংকশানটির থার্ড ইন্টিগ্রেশনের ফল পাওয়া যায়–
    এই ভাবে সহজেই যে কোনো অর্থাৎ
    দশম বা শততম অথবা সহস্রতম ইন্টিগ্রেশনের
    ফল অতি সহজেই পাই ।
    এই কবিতায় লেখা পদ্ধতির আবিষ্কর্তা আমি
    বিনয় মজুমদার । আমার পত্নীর নাম রাধা
    আর
    আমার পুত্রের নাম কেলো ।

    বিনয়েরর স্মৃতিশক্তি বার্ধক্যেও প্রখর ছিল, সাক্ষাৎকারগুলোয় তিনি অনায়াসে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের কবিতা আবৃত্তি করতে পারতেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে উঠতেন । ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হের প্রকাশক উৎপল ভট্টাচার্য জানিয়েছেন যে এই গ্রন্হের জীবনানন্দ বিষয়ক নিবন্ধগুলো জীবনানন্দের বই ছাড়াই, কেবল স্মৃতি থেকে লিখেছিলেন বিনয় মজুমদার। বইটিতে ‘ধূসর জীবনানন্দ’ শিরোনামে তাঁর এই কবিতাটি আছে :-

    ধূসর জীবনানন্দ, তোমার প্রথম বিস্ফোরণে
    কতিপয় ছিল শুধু বলেছিল, ‘এই জন্মদিন’ ।
    এবং গণনাতীত পারাবত মেঘের স্বরূপ
    দর্শনে বিফল ব’লে, ভেবেছিলো, অক্ষমের গান ।
    সংশয়ে সন্দেহে দুলে একই রূপ বিভিন্ন আলোকে
    দেখে-দেখে জিজ্ঞাসায় জীর্ণ হয়ে তুমি অবশেষে
    একদিন সচেতন হরীতকী ফলের মতন
    ঝরে গেলে অকস্মাৎ, রক্তাপ্লুত ট্রাম থেমে গেলো ।
    এখন সকলে বোঝে, মেঘমালা ভিতরে জটিল
    পূঞ্জীভূত বাষ্পময়, তবুও দৃশ্যত শান্ত, শ্বেত ;
    বৃষ্টির নিমিত্ত ছিলো, এখনো রয়েছে, চিরকাল
    রয়ে যাবে ; সঙ্গোপন লিপ্সাময়ী, কল্পিত প্রেমিকা–
    তোমার কবিতা, কাব্য, সংশয়ে-সন্দেহে দুলে-দুলে
    তুমি নিজে ঝরে গেছো, হরীতকী ফলের মতোন ।

    নিজেকে বিনয় মজুমদার কখনও কবিতার শহিদ বলে মনে করেননি, কেননা সাহিত্যকে জীবিকা বা ধনোপার্জনের সঙ্গে একাসনে বসাননি তিনি, তাঁর সমসাময়িক কবিদের মতন। ‘কবিতার শহিদ’ তকমাটা শক্তি চট্টোপাধ্যায় চাপিয়েছিলেন বিনয়ের ওপর । প্রাপ্তির জন্য লালসা ছিল না তাঁর, কিংবা জাগতিক ধনদৌলতের জন্য দুঃখ। অনুষ্টুপ পত্রিকায় ২০১৩ সালে সুমন গুণ ঠিকই লিখেছিলেন যে “জীবনানন্দের সময় থেকে এখনও পর্যন্ত এই রকম সয়ম্ভর কবি আর কেউ নেই।” এক সময়ে বিনয় ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হের পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের জন্য পাঠিয়ে দিয়েছিলেন লণ্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে । সেই বিনয়ই শিমুলপুরে বসবাসের সময় থেকে পাণ্ডুলিপি এবং লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত কবিতা সংরক্ষণ করা আর জরুরি মনে করতেন না ।
    বিনয় এক স্বতন্ত্র সত্বার কবি, তাঁর সময়ের সবচেয়ে বৈচিত্রময় কবি তিনি, বিচিত্রপথগামী তাঁর ভাবনা । আঙ্গিকগত বিন্যাস, শব্দ, ছন্দ, চিত্রকল্পের মিশ্রণে তাঁর কাব্যচেতনা অভিনব । ‘আধুনিক কবিতার হালচাল’ প্রবন্ধে বিনয় বলেছেন, “কালোত্তীর্ণ নয়, কালোপযোগী লেখাই অমর।” সহিদুল হক ২০১৭-এর বাংলা কবিতা পোর্টালে লিখেছেন, “বিনয় মজুমদার তাঁর বহু কবিতায় তথাকথিত অশ্লীলতাকে এক আশ্চর্য সুন্দর শৈল্পিকরূপ দান করেছেন ।” বিনয় মজুমদার অত্যন্ত সচেতন মানুষ ছিলেন, নয়তো তাঁর কথা শোনার জন্য তাঁর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তরুণ কবিরা জড়ো হতেন না, এবং তা প্রায় প্রতিদিন ।, কেবল তাঁর লেখার ব্যাপারেই নয়, তাঁর পার্সোনা নিয়ে সাহিত্যিকরা যে ছবি গড়ে তুলতে চাইছেন তা সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন তিনি তা এই কবিতাটি থেকে পরিষ্কার হবে, তাঁর জীবনের শেষ পর্বে লেখা :-

    মনস্তত্ত্ববিদদের কীর্তি
    ভাস্কর চক্রবর্তী পাগলা গারদে ছিল
    কিন্তু পাগলা গারদ বলে না, বলে এটা মানসিক হাসপাতাল ।
    ভাস্কর চক্রবর্তীর বাবাকে মনস্তত্ত্ববিদগণ বলেছে আপনার
    ছেলে আপনার চাইতে বেশি খ্যাতিমান
    এই কথা বলাবলি করছে অন্যান্য কবি ও কবিবন্ধুগণ
    ভাস্কর চক্রবর্তী নিজেও একথা বলেছে ।
    এটা ভাস্কর চক্রবর্তীর মনোরোগ
    এই মনোরোগ আমরা সারিয়ে দিতে পারি
    কিভাবে সারাতে পারি ?
    ভাস্কর চক্রবর্তী নিজেই লিখবে যে আমার বাবা
    আমার চাইতে বেশী বিখ্যাত লোক
    আমাকে পশ্চিমবঙ্গে কেউ চিনল না বাবাকে চেনে
    এই কথা ভাস্কর চক্রবর্তী নিজেই লিখবে
    এই রকম মনোরোগীর চিকিৎসা আমরা বহু
    করেছি । সঞ্জয় ভট্টাচার্য, ঋত্বিক ঘটক এদের
    আমরা চিকিৎসা করেছি ।

    হে জনসাধারণ এই যে ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভাবে যে ভাস্কর চক্রবর্তী জনসাধারণের চাইতে
    উঁচু দরের বাঙালি একজন ।
    আমরা এই ভাস্কর চক্রবর্তীর মনোরোগ চিকিৎসা
    করতে পারি । চিকিৎসা করতে পারলে ভাস্কর চক্রবর্তী নিজেই
    বলবে যে আমি জনসাধারণের সমান মানে
    কেরানির সমান, স্কুল মাস্টারের সমান । চাষার
    সমান ।
    তোমরা শুধু অনুমতি দাও ভাস্কর চক্রবর্তীর
    চিকিৎসার জন্য তাহলে আমরা ভাস্কর চক্রবর্তীকে
    তোমাদের সমান অর্থাৎ কেরানি, চাষী, স্কুল মাস্টার
    রিকশাওয়ালার সমান । একথা ভাস্কর চক্রবর্তী
    নিজেই বলবে আমাদের এখানে চিকিৎসা করার
    পর ।

    বাঃ ভাস্কর চক্রবর্তীর বাবা অনুমতি দিয়েছেন
    জনসাধারণ অনুমতি দিয়েছেন । এইবার তাহলে
    হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করি ।
    এই রকমের পাগলাগারদে ডাক্তাররাও আছে
    যেমন রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস এম. বি. বি. এস. পাশ
    করা ডাক্তার সে আছে মেডিকাল কলেজের পাগলা
    গারদে । এইরকম ভাবে পুলিশও আছে পাগলা গারদে ।
    ( তার মানে মানসিক হাসপাতালে ) ।
    মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করা হচ্ছে
    পুলিশ অনন্ত দেবরায়কে অর্থাৎ এরা হচ্ছে বিশেষ
    বিশেষ উদাহরণ ।
    পুলিশ, এম.বি.বি.এস. পাশ করা ডাক্তার রবীন্দ্রনাথ
    বিশ্বাস । এর পরে কবি বাদ দিলাম । অন্যান্য
    যারা পাগলা গারদে ছিল এবং আছে ডাক্তার রবীন্দ্র
    নাথ বিশ্বাস, পুলিশ অনন্ত দেবরায়

    কিন্তু এই রকমের দু’একজন ডাক্তার পুলিশ
    এদের সঙ্গে পাগলা গারদে আছে শত শত জনসাধারণ
    হাজার হাজার জনসাধারণ এবং

    ডাক্তার রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস নিজেই বলল যে
    তার নিজের হয়েছে ক্রনিক শিজোফ্রেনিয়া
    এই অসুখের কোনো চিকিৎসা নেই রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস
    কে সারাজীবন ঔষধ খেতে হবে এবং আনুসঙ্গিক
    চিকিৎসা করাতে হবে ।

    এ তো হল একজন ডাক্তার, একজন কবি, একজন পুলিশ
    এদের ভাগ্য আর অন্যান্য যাদের এই ভাগ্য হয়েছে
    তারা হলেন হাজার হাজার জনসাধারণ ।

    ডি. জ্যাবলো হার্শম্যান এবং জুলিয়েন লিয়েব ( ১৯৯৮ ) তাঁদের ‘ম্যানিক ডিপ্রেশান অ্যাণ্ড ক্রিয়েটিভিটি’ গবেষণাপত্রে বলেছেন যে সৃজনশীল শিল্পীরা ম্যানিক ডিপ্রেশানকে নিজের জীবনে ও কাজে সদর্থক উদ্দেশে ব্যবহার করতে পারেন । পল গঁগা যখন দেখলেন তিনি ফ্রান্সে বসে আঁকতে পারছেন না তখন ইউরোপের সমাজকে পরিত্যাগ করার জন্য তাহিতি দ্বীপে বসবাস করতে চলে গিয়েছিলেন । ম্যানিক ডিপ্রেশানে আক্রান্ত হয়েছিলেন নিউটন , বিটোফেন এবং চার্লস ডিকেন্সও । মনোভঙ্গের বাঁধন কেটে বেরোবার জন্য ডিকেন্স লিখেছিলেন ‘ক্রিসমাস ক্যারল’ ।
    লুডউইগ এম অ্যারনল্ড ‘দি প্রাইস অফ গ্রেটনেস : রিজলভিং দি ক্রিয়েটিভিটি অ্যাণ্ড ম্যাডনেস কনট্রোভার্সি’ ( ১৯৯৫ ) গ্রন্হটি ১০০০ বিখ্যাত মানুষের জীবনকাহিনি বিশ্লেষণ করে লিখেছেন। তিনি তর্ক দিয়েছেন যে যাঁদের চেতনার স্তর সাধারণ মানুষের থেকে আলাদা, স্কিৎসিফ্রেনিয়া, হিস্টিরিয়া, সংবেদনের অতিরেক, যৌন অক্ষমতা, যাঁরা নিঃসঙ্গতা পছন্দ করেন, তাঁদের মুক্তির পথ হলো সৃজনশীল শিল্প, তাঁদের ক্ষেত্রে তা নিরাময়ের কাজ করে । বিনয় মজুমদারকে কেউ কেউ বলেছেন পাগল ; কিন্তু তাই যদি হবে তাহলে তিনি রুশভাষা শিখে ছয়টি বই অনুবাদ করলেন, একুশটি কাব্যগ্রন্হ লিখলেন, ছয়টি গদ্যের বই, গণিতের বই লিখলেন কেমন করে ? এখনও তাঁর বহু রচনা অগ্রন্হিত রয়েছে ।
    দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রশান্ত চক্রবর্তী, সম্প্রতি বিজেপির ছাত্র সঙ্গঠন যাঁকে আক্রমণ করে পাঁজরের হাড় ভেঙে দিয়েছে, তাঁর ‘দি অপুলেন্স অফ এক্সিসটেন্স : এসেজ অন ইসথেটিক্স অ্যাণ্ড পলিটিক্স’ ( জানুয়ারি ২০১৭ ) বক্তৃতামালায় বিনয় মজুমদার সম্পর্কে এই কথাই বলেছেন যে, “বিনয়ের কবিতা আলোচনাকালে চিরকাল তাঁর একাকীত্বপ্রিয়তা এবং নিউরটিক প্রলক্ষণকে তাঁর কবিতার মূল্যায়নের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে ; এর চেয়ে বেশি নাটুকে ও বিরক্তিকর ভাবপ্রবণতা আর হতে পারে না । বিনয়ের কবিতার বিশুদ্ধ প্রাণচাঞ্চল্য মূল্যায়নের পথে এটি পরিত্যাজ্য বাধা । বিনয় ছিলেন পরমোৎকর্ষ-সন্ধানী এবং সতর্ক কবিতাশিল্পী ।”
    প্রশান্ত চক্রবর্তী আরও বলেছেন, এবং এই প্রসঙ্গে ওপরে আলোচিত সংজ্ঞার অবলোকনের প্রসঙ্গ এসে পড়ে, কবিজীবনের শেষ পর্বে বিনয় মজুমদার কবিতাকে জার্নাল লেখার মতো করে তোলেন । তিনি নিজের চারিপাশের বস্তুগুলো এবং ঘটনাগুলোর দিকে গভীর ভাবে তাকাতেন এবং সেগুলি রেকর্ড করতেন । তার ফলে একদিকে আমরা যেমন একজন ঘটনাপঞ্জীর দ্রষ্টাকে পাই, তেমনিই আরেকদিকে পাই কলকাতার বাইরে চলতে থাকা সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো । পংক্তিগুলো জার্নাল রচনার অসাধারণ অভিব্যক্তি, তাতে কোনোরকম কৃত্রিম কবিত্ব করা হয়নি, তার চেয়েও বেশি কিছু উপস্হাপন করা হয়েছে যা বুনিয়াদি : স্রেফ বেঁচে থাকা । রেকর্ড করার অর্থ হল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও বস্তুদের পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসন্ধান ।
    বিনয়ের লেখার প্রথম কালখণ্ড ছিল মূলত ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৬ । এই সময়টাতেই পঞ্চাশের কবিদের অনেকে সোনাগাছি-হাড়কাটা-খিদিরপুর যাওয়া আরম্ভ করেন, প্রধানত বুদ্ধদেব বসুর বদল্যার সম্পর্কিত বইটি প্রকাশিত হবার পর । বিনয় মজুমদার একা সোনাগাছি এলাকায় যেতেন বলে অনুমান করি, তাঁর ‘বাল্মীকির কবিতা’ থেকে সেরকমই মনে হয় ; যৌনকর্মীর ঘরের যে বর্ণনা তাঁর কবিতায় পাই তা কেউ যৌনকর্মীর ঘরে না গেলে বলতে পারবেন না । অদ্রীশ বিশ্বাসের স্মৃতিচারণা থেকেও তেমনটাই আঁচ করা যায় । নিয়মিত গ্রাহক সোনাগাছিতে ‘বাবু’ অভিধা পান ; বিনয় হয়তো কিছুকালের জন্য রাধার ‘বাবু’ প্রেমিক ছিলেন । রাধা নামে এক যৌনকর্মী আর তার ছেলের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা বলে গেছেন বিনয়। অদ্রীশ বিশ্বাস জানিয়েছেন যে তিনি যৌনপল্লীতে গিয়ে রাধা আর কেলোর ফিল্ম তুলে এনেছিলেন । সেগুলো প্রকাশিত হলে পাঠকের অনুসন্ধিৎসা মেটে । ভুট্টা সিরিজের কবিতাগুলো পড়লে বিশ্বাস করা যায় যে তিনি নিয়মিত নারীসঙ্গ করতেন কোনো এক সময়ে । হয়তো লেখালিখি তাঁকে এই সময়টায় ছেড়ে গিয়েছিল বলে তিনি রাধায় আশ্রয় নিয়েছিলেন । হাংরি আন্দোলনের গল্পলেখক বাসুদেব দাশগুপ্ত যখন আর লিখতে পারছিলেন না তখন তিনি ‘বেবি’ নামে এক যৌনকর্মীর ‘বাবু’ হয়ে ওঠেন । হাংরি আন্দোলনের কবি প্রদীপ চৌধুরী জানিয়েছেন যে বাসুদেব দাশগুপ্ত সে-সময়ে ভায়াগ্রার সন্ধান করতেন ।
    “অঘ্রাণের অনুভূতিমালা” কাব্যগ্রন্হে ‘বিশাল দুপুরবেলা’ শিরোনামে একটি কবিতা আছে । যাঁরা দুপুরবেলায় সোনাগাছি নিয়মিত যান তাঁরা জানেন যে এই সময়টাতেই অনেকক্ষণের জন্য নিজের কাছে পাওয়া যায় প্রেমিকা-যৌনকর্মীকে । সময়টা বিশাল, দুজনে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করে সন্ধ্যার খদ্দের না আসা পর্যন্ত অঢেল সময় । যিনি ‘বাবু’ তিনিও নিজের জীবনের দুপুরবেলাতেই আগ্রহী হয়ে ওঠেন, অমন সম্পর্কে, বাসুদেব দাশগুপ্তের মতন । বাসুদেব দাশগুপ্ত অমন দুপুরবেলা কাটিয়ে সন্ধ্যার সময়ে আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরীর বাড়িতে এসে চিৎপটাঙ হয়ে শুয়ে পড়তেন, নেশা কেটে গেলে অশোকনগরে বাড়ি ফিরতেন ।
    আশি ও নব্বুই দশকে বিনয় মজুমদার অসুস্হ হয়ে পড়েন এবং তাঁকে দেখাশোনা করতো কলকাতা শহরতলীর ঠাকুরনগরের শিমুলপুরের একটি পরিবার । অনেকে এই আশ্রয়কে তুলনা করেছেন মানসিক রোগাক্রান্ত পরিবার-পরিত্যক্ত কবি ফ্রেডরিক হ্বেলডার্লিনের সঙ্গে, যাঁকে অমনই একটি গরিব মুচি পরিবার আশ্রয় দিয়েছিল । কেমন ছিল বিনয় মজুমদারের সে সময়ের জীবন ? এই কয়েকটা লাইন পড়লে কিছুটা আঁচ পাওয়া যাবে, কেবল কার্বোহাইড্রেট খেয়ে দিনের পর দিন চালিয়েছেন বিনয় মজুমদার, জীবনানন্দের পর শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি । সে সময় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ম্যাণ্ডেভিলা গার্ডেন্সে বসে খাচ্ছেন মুর্গির ললিপপ দিয়ে স্কচ এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় খাচ্ছেন স্ত্রীর রান্না করা উপাদেয় স্বাস্হকর খাদ্য । বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ বক্তৃতা দেবার জন্য সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিজের ক্যাম্পাসে আহ্বান করে নিয়ে গিয়েছিলেন, প্রধানত শক্তি-সুনীল ব্র্যাণ্ডটাকে ব্যবহার করার জন্য , বিনয়কে নিমন্ত্রণ জানাতে তাঁরা হয়তো ভয় পেয়েছিলেন । শিমুলপুরে পাকাপাকি থাকতে গিয়ে বিনয়ের দৈনিক জীবন কেমন কাটছিল তা উনি বিয়াল্লিশ মাত্রার মহাপয়ারে লিখে রেখে গেছেন :

    এইমাত্র পান্তাভাত
    এইমাত্র পান্তাভাত খেলাম অর্থাৎ আমি হাত ধুতে গেছলাম
    অবশ্য খাবার পরে এঁটোথালা ধুই আমি নিজে
    ভোরে ধুই দুপুরেও ধুই শুধু রাত্রিবেলা ধুই সে এঁটো থালা
    ভোরবেলা রাত্তিরের এঁটোথালা হাতে নিয়ে যাই
    বুচির বাড়ির কাছে, এঁটো থালা দিয়ে আসি তার হাতে, বুচি নিজে
    ধুয়ে দেয় রাত্তিরের এঁটো থালাখানি ।
    সেই ধোয়া থালাটিতে বুচি নিজে খাদ্য দেয় আমার ভোরের খাদ্য
    গতকাল দিয়েছিল বেগুনসিদ্ধ ও ভাত আর
    আজ দিল তো পান্তাভাত ; ভোরে বেশিদিন দ্যায় আলুসিদ্ধ আর ভাত
    মনে হয় আগামীকাল দেবে আলুসিদ্ধ ভাত।
    আজ আমি এঁটো থালা কলঘরে ধুয়ে এনে রেখেছি তো টেবিলের
    উপরেই, এই ধোয়া থালাটিতে ভাত দেবে বুচি ।
    ( ‘পৃথিবীর মানচিত্র’ কাব্যগ্রন্হ — ২০০৬ )
    অসুস্হতার পরে তাঁর কবিতা রচনার আরেকটি পর্ব শুরু হয়, প্রধানত লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের চাহিদা মেটাতে, যে কবিতাগুলিতে বিনয় তাঁর সামনেকার বস্তুজগতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং বস্তুগুলোর পারস্পারিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে চলেছেন ।
    ‘মনে থাকা’ শিরোনামে একটি কবিতায় বিনয় জানিয়েছেন যে, যে-কবিতার মানে বোঝা যায় না তাও ওনার মনে থাকে । তাঁর স্মৃতিশক্তি শেষ বয়সেও ছিল প্রখর । বিনয়ের মনে থাকলেও দুর্বোধ্য কবিতা আমার মনে থাকে না । বিনয় তিনটি উদ্ধৃতি দিয়েছেন :

    অমিয় চক্রবর্তী :
    “খড়মাঠ কথা কয়, অজানা খোটানি
    ঘনমেঘ চলে ছায়াটানি
    নয় নীল শূন্য ত্রিশূল
    টুকরো পাহাড়”

    বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় :
    “সাদা বা কালো ক্ষণপাথর
    এ কোন আলো হৃদয়ে বা
    অথবা নীচে নীল সাগর
    পাহাড়ে নাচে হৃদয়ে বা
    বুড়োর এ মন কবরে যায়
    যখের ধন গভীরে চায়
    হৃদয়ে তবু প্রেম নাচায়
    পাহাড়ে বা হৃদয়ে”

    মৃদুল দাশগুপ্ত
    “কয়েক মুহূর্তকাল থামো —
    আমি তাকে বলি
    থেমে অশ্ম মন্ত্র ও মেশিন”

    চোদ্দ

    ‘গ্রন্হি’ পত্রিকার জন্য চন্দন ভট্টাচার্যকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ( মে, ২০০৫ ) বিনয় মজুমদার কবিতা-বিশেষের মনে রাখা নিয়ে ছন্দ ও অন্ত্যমিলকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন :
    চন্দন : আপনি কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, ছন্দ ও অন্ত্যমিলে লিখলে সে কবিতা পাঠকের মনে থেকে যায়। কাজেই পাঠকের স্মৃতিতে কবিতাকে সুমুদ্রিত করার এটাই সেরা পদ্ধতি । এখনও কি তাই মনে করেন কবি ? তবে কি গদ্যে লেখা কবিতাগুলি মানুষ বিস্মৃত হবে কালে কালে ?
    বিনয় : আজও তাই মনে হয় ।
    চন্দন : কিন্তু ধরুন, লাতিন আমেরিকার বা ইউরোপেও তো শুধু গদ্য কবিতার ছড়াছড়ি । মিটার নামক শব্দটা ওরা হয়তো ভুলেই গেছে । শুধু কিছু গানের কথা ছাড়া —
    বিনয় : গানও আজ কবিতা হয়ে গেছে । আমিও তো গদ্য কবিতা লিখেছি, প্রথম কবিতাটির নাম ছিল “আমার প্রথম গদ্যকবিতা”, বেরিয়েছিল ‘রোপণ’ পত্রিকায় । আমার ধারণা লোকে গদ্য কবিতা পংক্তির পর পংক্তি এভাবে মনে রাখে না । মনে রাখে শুধু কবিতাটির বিষয়বস্তুকে ।
    চন্দন ভট্টাচার্য প্রশ্ন করতে পারতেন যে তাঁর ভুট্টা সিরিজের কবিতাগুলো কি তাহলে বিষয়বস্তুকে মনে রাখার জন্য ।
    বিনয় মজুমদারের কিন্তু প্রতিটি কবিতাই বোঝা যায় । ‘ফিরে এসো, চাকা’ এবং ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ বইয়ের কবিতাগুলো তো বটেই, স্কিৎসোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা করে ফিরে এসে লেখা যে কবিতাগুলোর জন্য তিনি অনেকের দ্বারা আজকাল নিন্দিত হন, সেই কবিতাগুলোও । ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ বইতে ছয়টি দীর্ঘ কবিতা আছে । বিনয় মজুমদার বলেছেন যে কবিতাগুলি যদিও নারীভূমিকাবর্জিত, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যাকে লেখা চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন কবিতাগুলো আদিরসাত্মক । ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হে বিনয় মজুমদার ‘অতিচেতনা’ ও ‘অতিসত্য’. নামে দুটি ভাবকল্পের সূত্রপাত ঘটালেন ।
    ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হে বিনয় লিখেছিলেন

    আমার সচেতনতা যেন অতিচেতনার সমপরিমাণ হয়ে যায়
    উভয় চেতনা যেন সমান কুশলী হয় সমান সক্ষম হয়ে যায়
    দুই চেতনার মাঝে যোগাযোগ ব্যবস্হাটি যেন খুব স্বচ্ছলতা পায়

    বিনয় সচেতনতা ও অতিচেতনায় পার্থক্য করেছেন । সচেতনা কবির প্রতিস্বের, যিনি কবিতাটি অথবা গল্প-উপন্যাস লিখছেন, তাঁর। কিন্তু অতিচেতনা ও অতিসত্য পাঠবস্তুতে লুকিয়ে থাকে । কিছুকাল পরে পড়লে কবি অথবা পাঠক টের পান যে তাঁর সচেতনতায় ছিল না এমন জিনিসও রয়েছে পাঠবস্তুতে ; আবার বহুকাল পরে পড়লে আরও নতুন উদ্ভাস পাবেন তিনি, যা প্রথমবার বা দ্বিতীয়বার পড়ে পাননি । অর্থাৎ পাঠবস্তুটি নিজের উপরিতলের নীচে অতিচেতনার ও অতিসত্যের বহুবিধ স্তর সঙ্গোপনে রেখে দেয় । বিনয়ের অতিচেতনা ও অতিসত্য তাঁর ব্যক্তিপ্রতিস্বের নয়, তা পাঠবস্তুটির ।
    ১৯৮৭ সালে ‘পুনর্বসু’ পত্রিকার জন্য রণজিৎ দাশের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বিনয়ের অতিচেতনা ও অতিসত্য বিষয়ে এরকম প্রশ্নোত্তর হয়েছিল :
    প্রশ্ন : কথা হচ্ছে যে, আমি একটা কথা মনে করি, সেটা হচ্ছে যে আমি মনে করি, আমার সঙ্গে তখন একমত হয়েছিলেন আপনি — যে কোনও অভিজ্ঞতাই একজন কবির লেখার বিষয় নয় ! মানে যে কোনও অভিজ্ঞতা, হঠাৎ একটা অভিজ্ঞতা হল, এটাই আমার লেখার বিষয় হয়ে উঠতে পারে না । মানে যতক্ষণ না সেই অভিজ্ঞতাটা আমার মধ্যে জারিত হচ্ছে । জারিত হতে হতে এমন একটা পয়েন্টে এসে পৌঁছোল, যখন সেটা, শুধুমাত্র অভিজ্ঞতা বা একটা সাধারণ উপলব্ধির স্তরে থাকে না — মানে সেটা একটা, কী বলব, অভিজ্ঞা বা আদ্যাজ্ঞানের অবস্হায় চলে যায় । তখনই একটা, সেই অবস্হা থেকে যখন একটি লোক লেখে, তখন সেটাই চূড়ান্ত কবিতা হয়ে উঠতে পারে, সম্ভাবনা থাকে । তো আপনি কি এটা মনে করেন ? কেননা আপনার কবিতা পড়ে তো — তাই মনে হয়েছে, কেননা চার বছর অতিক্রম করবার পরে–
    বিনয় : কবিতায় অবচেতন মন বলে একটা জিনিস আছে, শুনেছ ? সেটা কিছু-কিছু লোকের কবিতায় খুব থাকে । তুমি নিজের কবিতা রেখে দাও, ছাপা কবিতা…চার…পাঁচ, আস্তে আস্তে তোমার নিজের কবিতার মানেই তোমার কাছে কিন্তু ধীরে-ধীরে উন্মোচিত হতে থাকবে, মনে হবে যেন, এই মানেটাও, রয়ে গেছে কবিতার মধ্যে, খেয়াল, খেয়াল না করে লিখে ফেলেছ, বুঝতে পারলে, এই যে জিনিসটা এটাকে তোমার অবচেতনাই বল, অতিচেতনা, আমি ‘অতিচেতনা’ বলে একটা শব্দ সৃষ্টি করেছি, আলট্রা ভায়োলেট রে ।
    প্রশ্ন : এটা অনেক ভালো শব্দ, অনেক ভালো শব্দ ।
    বিনয় : অতিচেতনা ।
    প্রশ্ন : খুব ভালো, কাজে লাগবে ।
    বিনয় : আমি প্রথম ব্যবহার করেছি, ‘অতিচেতনা’ শব্দটা আগে ছিল না ।
    প্রশ্ন : আপনি তো ‘অতিসত্য’ বলেও একটা সাংঘাতিক শব্দ ব্যবহার করেছেন, এক জায়গায় আছে —অতিসত্য ।
    বিনয় : আচ্ছা, কনসাস মাইণ্ড, অ্যাঁ ?
    প্রশ্ন : অতিসত্য । অতিসত্য, আপনার লেখায় এক জায়গায় আছে । –’শুধু সত্য আমি’, ‘বাকিসব অতিসত্য, শুধু সত্য আমি’।
    বিনয় : অতিসত্যটা তখন….
    প্রশ্ন : আপনি ‘অতিসত্য’ ব্যবহার করেছেন । মানে, সমাসবদ্ধভাবে । তাহলে ‘আমার’ সঙ্গে চারিদিকের তফাত একটা আছে ?
    বিনয় : অ্যাঁ ?
    প্রশ্ন : আমার সঙ্গে ।
    বিনয় : তুমি যা লিখে রেখেছ, রেখে দাও, ছাপা হোক, বই হোক, দশ, পনেরো, কুড়ি বছর পরে নিজেই টের পাবে ভিতরে-ভিতরে একটা গভীরতম অনুভূতিও রয়ে গেছে, নিজেও ভালো করে লক্ষ্য করতে পারোনি লেখার সময় ! বুঝতে পারছ ! লেখার সময়ে তুমি নিজেও ভালো করে লক্ষ্য করনি, তোমার অজ্ঞাত, তোমার নিজেরই অজ্ঞাতসারে এমন কিছু হয়ে গেছে । তাকে আমি নাম দিলুম অতিসত্য, সেটা একদম অতিচেতন মন । সাবকনসাস, কনসাস, এদুটো ছিল, আলট্রাকনসাস বলে, আলট্রা কনসাস, আলট্রাকনসাস, নাম দিলুম ‘অতিচেতনা’ ।
    প্রশ্ন : আচ্ছা এটা কি সব লেখা সম্পর্কেই মনে হয়, না কিছু-কিছু লেখা সম্পর্কে মনে হয় ?
    বিনয় : তুমি নিজে মনে-মনে ভাব ।
    বিনয় মজুমদারের দেয়া সাক্ষাৎকারগুলো অন্যান্য কবিদের সাক্ষাৎকারের থেকে একেবারে আলাদা। বিনয় সাক্ষাৎকারের মাঝেই নিজের কবিতা, জীবনানন্দের কবিতা, রবীন্দ্রনাথের কবিতা আচমকা আবৃত্তি করে সাক্ষাৎকার যাঁরা নিচ্ছেন আর নিজের মাঝে একটি অভিকরসম্পর্ক গড়ে তোলেন, দূরত্বকে মুছে ফেলেন। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক তাঁর নিজের দেয়া সাক্ষাৎকার সম্পর্কে একবার বলেছিলেন যে তা হল Gesture towards a history of vanishing present এবং the interview is an enabling violation that allows the interviwee subject to produce a narrative of the self through a responsive encounter with the OTHER, as well as produce an ethics of accountable transformation. The interviewee not only articulates strategic essentialism but performs it. এই বক্তব্য বিনয় মজুমদারের দেয়া সাক্ষাৎকারগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোয্য। অন্যান্য লোকেদের যদি জিগ্যেস করা হয় ,কেমন আছেন, তাঁরা উত্তর দ্যান ‘চলছে’ । বিনয় কিন্তু জানান যে তিনি আনন্দে আছেন ।
    সত্তর দশকের কবি বারীন ঘোষাল ‘অতিচেতনা’ নামে একটি কাব্যিক ভাবকল্পের কথা বলেছেন যা বিনয় মজুমদারের চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন । বারীন ঘোষাল ব্যক্তিএককটির প্রতিস্বের অতিচেতনার কথা বলেছেন, সে কারণে বারীনবাবুর ‘অতিচেতনা’ কবিতার ভাবকল্পে সমর্পিত কবিদের আঙ্গিকে প্রতিফলিত হয়, এমনটাই তাঁরা মনে করেন, এবং সেই আঙ্গিকের প্রতি নজর দিলে স্তেফান মালার্মের বিখ্যাত কবিতা “এ রোল অফ দি ডাইস উইল নেভার অ্যাবলিশ চান্স’-এর প্রভাব সহজেই চোখে পড়ে । মালার্মে বলেছিলেন বস্তুজগতের সত্য স্বপ্রকাশিত হয় কবির অতিচেতনার ( সুপারকনসাশনেস ) দ্বারা । দি নিউ ইয়র্কার পত্রিকা এপ্রিল ২০১৬ সংখ্যায় বলেছে যে স্তেফান মালার্মে হলেন ‘প্রফেট অফ মডার্নিজম’ । বিট ঔপন্যাসিক উইলিয়াম বারোজ কিন্তু বলেছেন যে অতিচেতনা ( সুপার-কনসাশনেস ) সম্ভব হয় মাদক সেবনের মাধ্যমে এবং সেই অবস্হায় সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব নয়। বলা বাহুল্য যে বিনয় মজুমদারের অতিচেতনা থেকে এনাদের অতিচেতনা সম্পর্ণ আলাদা ।
    ‘নিশিকড়’ প্রবন্ধে বারীন ঘোষাল লিখেছেন, “চেতনা শব্দটা একটু গোলমেলে । অনেকে একে বিবেক, চৈতন্য ইত্যাদির সাথে গুলিয়ে ফেলেন । মানুষের মনে যখন একটা বদ্ধমূল ধারণা হয় যা অন্ধ সেটাকেই তার চেতনা মনে করে । একই বিষয়ে অনেক চেতনা, আবার অনেকানেক বিষয়ে বহুবিধ চেতনা তার হতে পারে। অনেক সময়েই চেতনাগুলোর মধ্যে সংঘাত হয় তাদের আপাতবিশৃঙ্খলার জন্য, কার্য ও কারণের মধ্যে সম্পর্কহীনতার জন্য, মিথ্যা বিশ্বাসের জন্য, এবং ভাষা ও শব্দের প্রতীকভাষ্যের জন্য । চেতনাগুলির মধ্যে যদি শৃঙ্খলা সম্ভব হয় তবে তার মানসিকতাও সমৃদ্ধ হয় । আবার দেখুন, মানুষের শরীরে বস্তুগত শূন্যতা ৭০%, যা তার প্রতিটি পরমাণুর কোয়ার্কের সমষ্টিগত অন্ধকার । এই অন্ধকারও সচল, তার ডাইমেনশান আছে, আলোয় আসতে চায় । এটা তার প্রগতির লক্ষণ, প্রকৃতির শিক্ষা । চেতনাদলের অপার বিশৃঙ্খলার মধ্যে মানুষের পরিবেশ-সঞ্জাত যে সর্বশ্রেষ্ঠ প্যাটার্নটি সম্ভাবিত হয় তা-ই তার অতিচেতনা ।” প্রশ্ন হলো বারীনবাবুর ‘নতুন কবিতা’ আন্দোলনের সকলেরই ব্যক্তি-প্রতিস্বে যা ঘটে তা কি অন্য মানুষদের থেকে আলাদা ?
    অতিচেতনা সম্পর্কে ‘অষ্টাবক্র গীতা’য় বলা হয়েছে যে, “তুমি তখন পৃথিবী নও, জল নও, আগুন নও, বায়ু নও, আকাশ নও তখন স্বাধীনতাবোধের জন্য নিজের আত্মনকে অতিচেতন বলে মনে করো এবং ওই স্হিতিতে সাক্ষী থাকো পঞ্চভুতের ।”
    একটি থেকে আরেকটি সাব-জনারে বিনয় স্বচ্ছন্দে চলে গেছেন । ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যগ্রন্হের কবিতাগুলো এবং তার পরে লেখা কবিতাগুলো আঙ্গিক ছন্দ ও ভৌতজগতের নৈসর্গিক বিস্তার ‘ফিরে এসো, চাকা’ থেকে সম্পূর্ণ সরে গেল । প্রশ্ন ওঠে, তা কি এইজন্য যে আলোচকরা তাঁর কবিতাকে বার বার জীবনানন্দের সঙ্গে তুলনা করছিলেন । বিনয় বলেছেন জীবনানন্দের কবিতা অত্যন্ত জটিল, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং উৎপলকুমার বসু চেষ্টা করেছিলেন জীবনানন্দের ঢঙে লিখতে । কিন্তু তিনি নিজে যে প্রভাবিত নন, এবং মৌলিকতা যাতে কবিতা রচনা করার সময়ে আসে শেষ পর্বের এই কবিতাটিতে বয়ান করে গেছেন :

    কলমটি পড়ে আছে টেবিলের কোণে
    হাত দিয়ে কলমটি ধরি…
    এইভাবে আমি কবিতা রচনা করি
    যাতে মৌলিকতা কবিতায় আসে
    কারো কাব্য অনুসরণের চেষ্টা তো করিনি আমি
    যা-যা ঘটে যা-যা করি তাই লিখি মাঝে -মাঝে ।

    পনেরো

    মাদুলি পত্রিকার বিনয় মজুমদার সংখ্যায় ( ২০১০ ) শিমুল সালাহউদ্দিন “‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ আবিষ্কার” প্রসঙ্গে লিখেছেন যে ঢাকার এক সাহিত্য আসরে একজন আবৃত্তিকার এই কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন, এবং খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন কবির নাম বিনয় মজুমদার :-

    বিড়িতো ফুরালো প্রায় । দুটি বিড়ি আছে
    শালপাতা দিয়ে এই বিড়ি বানায় । এপর্যন্ত লিখে
    মনে এলো রেললাইনের পাশে লম্বা এক শালবন
    বানিয়েছে । শালপাতাগুলির সেই শাদা শাদা ফুল ।
    গন্ধ আছে নাকি এই শালফুলে, ঘ্রাণ যদি না থাকে
    এই শালফুলে তবে শালফুল অঘ্রাণ
    এবং এই শালফুলের মানে শালফুলের মনের অনুভূতি
    ধরা আছে আমাদের পৃথিবীর ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালায়”

    শিমুল সালাহউদ্দিন লিখেছেন, “পড়িতে বসিলাম ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ । জীবন্ত সব ডালপালা সমেত যেন অন্ধকারে একটি মৃত গাছ আমার জানালায় নড়িয়া উঠিল । মৃত গাছ তথাপি প্রসারণশিল তার ডালপালা । জীবন্ত । নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে কথা কই্ছে যেন । ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’র সেই ঘোর বাধ্য করিল বিনয়ে আসক্ত হইতে, বিনয়কে ভয় পাইতে, বিনয় নিয়া পড়াশুনা চিন্তা করিতে । দেখিলাম বিনয় পণ্ডিতরা বিবৃতি করেছেন বিনয় মানসিক অসুস্হতার কারণে কলকাতা মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রহিয়াছিলেন । দীর্ঘ সময় । কিন্তু সেই সময়ে লিখিত এক পংক্তির দুইশত একটি কবিতার ভিতর দিয়া খেয়া-নাও পাড়ি দিতে দিতে এ অধমের কখনও মনে হয় নাই সেই মেদুর কবিতাপংক্তিসমূহের কোনো একটাও পাগলপ্রলাপ । বিনয়ের এ কবিতাগুলো যেন ভিন্নতর দর্শনের আয়না, জন্মশেকড় হইয়া দেখা দিলো আমার কাছে । কল্পনা, তাঁহার পরিচিত দৃশ্যকল্প জগতে কল্পনার স্হান বিনয়ের এ কবিতাগুলোতে নাই । যেন বা জীবনের প্রতি অনাসক্ত এক দ্রষ্টা বিপরীত আয়নায় দেখিতেছেন জগতকে । কবিতার সবকটি লাইন জুড়িয়াই রহিয়াছে অনন্য সব বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং অনুধাবন । কেবল কবিতা কেন, বিনয় গদ্য সাহিত্যও সাজান পরতে-পরতে, তাকে তাকে, থাকে থাকে, গণিত প্রভাবিত দার্শনিকতায় । প্রতিভা ও মেধার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা জানি না আমি । কোনো লেখক বা কবিকে আমাদিগের জগতে চরিয়া খাওয়া তথাকথিত অ্যাকাডেমিশিয়ানরা যে সকল অভিধায় ভূষিত করিয়া থাকেন, তা-ও করা যায় কিনা এ-লইয়া রহিয়াছে পক্ষে-বিপক্ষে প্রভূত বিতর্ক । তবে বিনয়ের কবিতা, তামাকে ডুবিয়া গিয়া যেমন, তেমনি বিনয়ের শত্রু ধরিয়া নিয়াও নিঃসন্দেহে বলা যায়, কোনো গণিতে, কোনো ভূগোলেই কোনো কবি-লেখক-সৃষ্টিশীল সত্ত্বাকে আটক করিয়া রাখা যায় না । দৃশ্যত এমনই এক অতিবাস্তব-অধিবাস্তব অনুধাবনের মাঝখানে নির্লিপ্ত দাঁড়াইয়া সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন একের পর এক । হইয়া উঠিয়াছেন রাজা । ঘোর আর প্রবণতার । আর শব্দ, ব্যঞ্জনা, উপমায় উপমিত করিয়াছেন কবিতার ঘরগেরস্হালি, শিথান-পৈঠা-উঠান । নিজস্ব ডায়েরির মতো সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র আঙ্গিকের কাব্যে হইয়া উঠিয়াছেন দৃশ্য আর বলিবার মতোন নিরাসক্ত, নির্মেদ, সাবলীল, বহমান, অক্ষরবৃত্ত ছন্দের ষোলোঘুটির ঘরের প্রবাদপুরুষ।”
    ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কবিতাটির তৃতীয় পর্ব কিছুটা পড়ে দেখা যাক, যে পর্বটি এক সম্পাদক ছাপবেন বলে নিয়ে অশ্লীলতার ভয়ে ছাপতে চাননি, কেননা তখনও হাংরি মামলা হাইকোর্টে চলছে আর বিনয় মজুমদার বছর দুয়েকের জন্য হাংরি আন্দোলনে ছিলেন । ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ রচনার পরে ‘বাল্মীকির কবিতা’কে স্বাভাবিক ও অনায়াস অগ্রগতি বলে চিহ্ণিত করা যায়, যে পথে হাঁটার সাহস আর কোনো কবি এতাবৎ দেখাতে পারেননি ।
    বহু পরে, জ্যোতির্ময় দত্ত ওনার ‘কলকাতা’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন তৃতীয় পর্বটি :-

    সকল বকুল ফুল শীতকালে ফোটে, ফোটে শীতাতুর রাতে
    যদিও বছর ভর, আষাঢ়ে-আশ্বিনে, চৈত্রে বকুলের নাম শোনা যায়,
    শুনি বকুলের খ্যাতি, বকুলের প্রিয়তার সকল কাহিনী
    তবু খুব অন্তরঙ্গ মহলেই শুধুমাত্র আলোচিত হয়
    তার ঢাকাঢাকি করে এ-সব নরম আর গোপন বিষয় ;
    অচেনা মহলে প্রায় কখনোই বকুলের নাম বা কাহিনী
    তোলে না, শরমবোধে চেপে যায় যেন কেউ বকুল দ্যাখেনি ;
    তবে — তবু আমি জানি সকলেই এ-সকল মনে মনে ভাবে
    বড়ো বেশি করে মনে মনে ভেবে থাকে সারাটা জীবন
    ভেবে বেশ ভালো লাগে বকুল ফুলের রূপ এবং সুরভি ।
    আমাদের সব চিন্তা অদৃশ্য বাস্তব হয়ে পাশে চারিধারে
    রূপায়িত হতে থাকে, হয়ে যায়, অবয়বসহ হয়ে যায়,
    চলচ্চিত্রাকারে হয়, চিন্তাগুলি অবিকল এমন বাস্তব
    বলেই হয়তো এতো ভালো লাগে বকুলের বিষয়ে ভাবনা ।
    বকুলের আকারের বিষয়ে ভাবনা তবু বেশি ভালো লাগে
    ঘ্রাণ ও রঙের চেয়ে অন্যান্য গুণের চেয়ে ফুলের আকার
    চিরকাল সকলেরই অনেক অনেক বেশি ভালো লেগে থাকে–
    মাঝখানে বড়ো এক ছিদ্রপথ, ছিদ্রপথ ঘিরে
    অনেক পাপড়ি আছে, এলোমেলো সরু সরু পাপড়ি ছড়ানো ;
    এই চেহারাটি আমি স্বভাবত সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি
    এ-সকল পাপড়িকে অতিশয় সাবধানে নাড়াচাড়া করি,
    এখন এই তো এই বকুলবাগানে একা অঘ্রাণের রাতে
    নাড়াচাড়া করে দেখি, অতি সাবধানে টানি, ধীরে-ধীরে টানি
    যাতে এ-সকল দল ছিঁড়ে বা উঠে না যায় ; কী রকম লাগে,
    মনে হয়, মনে পড়ে এতো বড়ো বাগানের শরীরের থেকে
    শুধুমাত্র ভালো-ভালো, মূল্যবান জিনিসকে বেছে-বেছে নিয়ে
    যে-রকম চর্চা হয়, সৌন্দর্যচর্চার রীতি চিরকাল আছে
    তার বিপরীতভাবে গদ্যময়তার থেকে বাদ দিয়ে দিয়ে
    সারহীন অঙ্গগুলি সরিয়ে-সরিয়ে রেখে ডালপালা পাতা
    একে-একে বাদ দিতে-দিতে শেষে যখন এমন
    আর বাদ দিতে গেলে মূল কথা বাদ যায় যার তখন থেকেই
    দেখা যায় জোছনায় ফুল ফুটে আছে, এই বকুল ফুটেছে,
    দেখা যায় একা-একা অঘ্রাণের জোছনায় আমি ও বকুল,
    বকুলের ফাঁকটির চারধারে সরু-সরু পাপড়ি ছড়ানো
    অতি সোজা সাদা কথা যেন অবশিষ্টরূপে পড়ে আছে তবু–
    তবু এ তো ডাল নয়, তবু এ তো পাতা নয়, এ হলো বকুল ।

    ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’র ছয়টি কবিতাই বেশ দীর্ঘ, এবং একই কথা শুনতে শুনতে পাঠক আগ্রহ যাতে হারিয়ে না ফেলেন, এবং পাঠকের মনে প্রশ্নের উদয় হয়, তাই বিনয় মজুমদার ‘এলিমিনেশান পদ্ধতি’ প্রয়োগ করে মাঝে-মাঝে কবিতার মাঝখানে বাঁকবদল ঘটিয়ে দিয়েছেন । এই এলিমিনেশন পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর একটি প্রবন্ধ আছে যা আমরা পরে আলোচনা করব । যেমন ওপরের ওই লাইনটির পরে একটি ভাঙন তৈরি করে তিনি আরম্ভ করছেন এইভাবে :

    শতকরা একেবারে একশতভাগ খাঁটি দর্শনের নাম
    সংজ্ঞা অনুসারে ধর্ম, মনে হয় চারপাশে মহাকাশময়
    অনাদি সময় থেকে, গণিতেরই মতো বহু কবিতা রয়েছে
    চুপচাপ পড়ে আছে কোনোদিন একে-একে আবিষ্কৃত হয়
    কোনো অঘ্রাণের রাতে বকুলবাগানে খুব মৃদু জোছনায়
    সুডৌল পাতার ফাঁকে গহ্বরের মতো কিংবা ছিদ্রের মতোন ।

    এর পরে বাঁকবদল করে কবিতাটিকে অন্যদিকে চালিত করলেন বিনয়, বা বলা যায়, যারা এতক্ষণ আঁচ করতে পাচ্ছিলেন না বকুলফুল প্রকৃতপক্ষে ঠিক কোন জিনিশ, তাঁদের নিয়ে গেলেন পথ দেখিয়ে :

    ছবি আঁকবার কালে কোনো যুবতীর ছবি আঁকার সময়ে
    তার সব প্রত্যঙ্গকে হাজির রাখাই হলো বেশি দরকারি–
    সবচেয়ে দরকারি, কোনো অঙ্গ কোনোক্রমে বাদ চলে গেলে
    অন্যান্য অঙ্গগুলি যতো ভালো আঁকিই না কেন এই ছবি দেখে
    ভয় করে, সকলেরই অতিশয় ভয়াবহ বলে মনে হয় ।
    তাই সব প্রত্যঙ্গকে হাজির রাখাই হলো বেশি দরকারি–
    দরকারি বকুলের কুঁড়িগুলি শাদা-শাদা গোল-গোল কুঁড়ি–
    এই কথা বকুলের কাছে আমি চোখ বুজে বলে ফেললাম,
    বলি, ও বকুল, তুমি বোঝো না কি কুঁড়িগুলি খুব বেশি ছোট,
    আরো ঢের বড়ো-বড়ো নরম-নরম হবার কথা না ?
    এ-সকল কুঁড়ি নেড়ে টিপে-টিপে সুখ পেয়ে — পাবার পরে না ?
    শুনে ফুল হেসে ফ্যালে, মৃদু-মৃদু হেসে ফ্যালে, কথা সে বলে না ।
    হেসে ফেললেই এই ঠোঁট দুটি এতো বেশি ফাঁক হয়ে যায়
    গোলটুকু এতো বেশি ফাঁক হয়ে যায় কেন বকুল-বকুল,
    হাসিকান্না যাই হোক গোল ঠিক এক মাপে থাকার কথা না —
    এই কথা আমি বলি, একটু বিস্মিত হয়ে বলে ফেলি আমি ।

    এলিমিনেশান পদ্ধতি প্রয়োগ সম্পর্কে বিনয় মজুমদার আলোচনা করেছেন তাঁর ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে । তিনি লিখেছেন, “যে-কোনো রচনা সম্পূর্ণ বিবরণ-সংবলিত হওয়ার কথা । কিন্তু তা থেকে কোনো অংশ ( স্তবক ইত্যাদি ) কিংবা বাক্য সুপরিকল্পিতভাবে বাদ দিলে, এই বাদ দেওয়ার ব্যাপারটিকে বলি ‘এলিমিনেশান’, যেমন রবীন্দ্রনাথের ‘পুজারিনি’ কবিতাটির শেষ স্তবক এবং ঠিক তার আগের স্তবক — এই দুইয়ের মাঝখানে ঘটনার বিবরণ মহাকবি স্বেচ্ছায় সুপরিকল্পিত ভাবে বাদ দিয়েছেন :-

    এমন সময়ে হেরিলা চমকি প্রাসাদে প্রহরী যত
    রাজার বিজন কানন-মাঝারে
    স্তূপপদমূলে গহন আঁধারে
    জ্বলিতেছে কেন যেন সারে সারে প্রদীপমালার মতো ।
    মুক্তকৃপাণে পুররক্ষক তখনি ছুটিয়া আসি
    শুধালো, “কে তুই ওরে দুর্মতি,
    মরিবার তরে করিস আরতি।”
    মধুর কন্ঠে শুনিল, শ্রীমতী, আমি বুদ্ধের দাসী”

    সেদিন শুভ্র পাষাণফলকে পড়িল রক্তলিখা ।
    সেদিন শারদ স্বচ্ছ নিশীথে
    প্রাসাদকাননে নীরবে নিভৃতে
    স্তূপপদমূলে নিভিল চকিতে শেষ আরতির শিখা ।।’

    শেষ স্তবকের ঠিক আগের স্তবকে কবি লিখেছেন যে প্রাসাদের প্রহরীরা দেখতে পেলো রাজার বিজন কাননে স্তূপপদমূলে প্রদীপমালা জ্বলছে । তার পরেই শেষ স্তবক — শেষ স্তবকে শুধু লিখেছেন যে সেদিন শুভ্র পাষাণফলক রক্তচিহ্ণিত হল এবং শেষ আরতির শিখা চকিতে নিভে গেল । এতে রচনা অধিকতর হৃদয়গ্রাহী হয়েছে, বেশি সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়েছে । অনুরূপভাবে কোনো রচনার কোনো বাক্য বা বাক্যাংশ বাদ দেওয়ার উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করছি বর্তমান প্রবন্ধের রচয়িওতারই একটি কবিতা । ‘আমার ঈশ্বরীকে’ গ্রন্হের তৃতীয় সংস্করণে ছিল, ‘যে গেছে সে চলে গেছে, দেশলাইয়ের বিস্ফোরণ হয়ে/বারুদ ফুরায় যেন, অবশেষে কাঠটুকু জ্বলে/আপন অন্তরলোকে’, ইত্যাদি । পরে ‘ঈশ্বরীর কবিতাবলী’র সংস্করণে পরিমার্জনার পর লিখি : ‘যে গেছে সে চলে গেছে, অবশেষে কাঠটুকু জ্বলে/আপন অন্তরলোকে’ ইত্যাদি । এতে কবিতাটি অধিকতর হৃদয়গ্রাহী হয়েছে বলে আমার ধারণা । চিত্রশিল্পীদেরও এই ধরণের এলিমিনেশান ব্যবহার করা ভিন্ন গত্যন্তর নেই । পিকাসোর চিত্রে ( একটি উদাহরণ ‘মা ও ছেলে’ ), মাতিসের চিত্রে ( একটি উদাহরণ সেই দীর্ঘ গ্রীবা বিশিষ্ট তরুণী মহিলা ), দেখা যায় বিশদরূপে আঁকতে গেলে যত রেখা ব্যবহার করতে হয়, তত রেখা তাঁরা ব্যবহার করেননি, বহু রেখাই বাদ দিয়ে দিয়েছেন । দিয়েছেন সংক্ষেপে কাজ সারার জন্য, শ্রীমণ্ডিত করার জন্য । এলিমিনেশানের ফল রহস্যময়তা ও দুর্বোধ্যতা । জীবনানন্দের নিজেরই রচনায় এলিমিনেশানের একটি সুন্দর উদাহরণ মনে পড়ল : ‘বিবর্ণ প্রাসাদ তার ছায়া ফেলে জলে।/ও প্রাসাদে কারা থাকে ? কেউ নেই — সোনালি আগুন চুপে জলের শরীরে/নড়িতেছে-জ্বলিতেছে -মায়াবীর মতো যাদুবলে’ ইত্যাদি । এখানে এই আগুন কি কোনো আলেয়ার, নাকি ওই প্রাসাদ থেকে আসা আলোর প্রতিফলন, না কি অন্য কোনো স্হান থেকে আসা আলোর প্রতিফলনও হতে পারে । কবি সে কথাটি বাদ দিয়ে দিয়েছেন, যেন বিষয়টি অত্যন্ত গোপন কথা । ফলে কবিতাটির এস্হানটি রহস্যময় হয়ে উঠেছে, পাঠক উপরিউক্ত সম্ভাবনাগুলির কোনটি হতে পারে ভাবতে শুরু করেন ; পথ চলতে-চলতে রহস্যের ঘ্রাণ পেয়ে থেমে পড়ার মতো, থেমে পড়ে চতুস্পার্শ্ব একটু খতিয়ে দেখার মতো । এর ফলে সেই খতিয়ে দেখা স্হানটি পথিকের মনে গেঁথে যায়, গেঁথে যায় অনুরূপভাবে কবিতাটির পংক্তিগুলিও । ফলে দেখা যাচ্ছে এলিমিনেশান কবিদের মস্ত সহায়, প্রায়শই ভরসা । এলিমিনেশানের ফলে রহস্যময়তা বাড়ে, দুর্বোধ্যতা বাড়ে– মাঝে-মাঝে কবিতার অর্থ ‘কোনোদিন বোঝা যাবে না’ অবস্হায়ও এসে দাঁড়ায় । কিন্তু কবির চরম উদ্দেশ্য পাঠককে ভালো লাগানো, বোঝানো নয়।”
    বিনয় মজুমদার ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে লিখেছেন যে জীবনানন্দের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতায় সৌন্দর্যতত্বের কয়েকটি ব্যাপার অনুপস্হিত ; প্রবন্ধটি ১৯৬৬ সালে লেখা ।

    অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ
    যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা ;
    যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই — প্রীতি নেই —
    করুণার আলোড়ন নেই
    পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড় ।

    যাদের গভীর আস্হা আছে আজো মানুষের প্রতি
    এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
    মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
    শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয় ।

    “এতে ‘এলিমিনেশান নেই । আলোকচিত্রধর্মিতা থেকে চ্যুতি নেই” । বিনয় বলেছেন, “অঙ্কিত চিত্র যেমন আলোকচিত্র নয়, কবিতাও তেমনি সাংবাদিকতাময় মাধ্যম নয় । অর্থাৎ চিত্রশিল্পীকে ভেবে-চিন্তে সুপরিকল্পিত ভাবে আলোকচিত্র হতে চ্যুত হতে হয় — তার উদ্দেশ্য দর্শককে অধিক পরিমাণে ভালো লাগানো। তেমনি কবিকেও ভেবেচিন্তে সুপরিকল্পিতভাবে সংবাদসুলভ রচনা থেকে চ্যুত হতে হয় । ফলে জন্ম হয়েছে ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রের, অ্যবসট্র্যাক্ট চিত্রের । ফলে জন্ম হয়েছে অ্যাবসট্র্যাক্ট চিত্রের সমধর্মী আধুনিক কবিতার। আলোকচিত্রধর্মিতা থেকে চ্যুতির একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত জীবনানন্দে — ‘ঘাসের উপর দিয়ে বয়ে যায় সবুজ বাতাস/অথবা সবুজ বুঝি ঘাস ? /অথবা নদীর নাম মনে করে নিতে গেলে চারিদিকে প্রতিভাত হয়ে ওঠে নদী’, ইত্যাদি । এখানে কবি স্বেচ্ছায় আলোকচিত্রধর্মিতা থেকে অত্যন্ত বেশি সরিয়ে নিয়ে এসেছেন রচনাকে এবং রচনাও আশ্চর্য হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠেছে ।”
    কবিতাটির বিশ্লেষণে বিনয় মজুমদার বলেছেন, “মূল বিষয়বস্তু যা কবিকে ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতায় উক্ত বা ব্যক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য করেছিল, সেই মূল বিষয়বস্তুটি নেই । অর্থাৎ সাক্ষপ্রমাণহীন অবস্হায় রয়েছে কবিতাটির বক্তব্যবিষয় । এগুলো কবিতাটির এডিটিং-এর অঙ্গ । কিন্তু এই কবিতাটিতে আছে: ১) আবিষ্কার । যে-কোনো নতুন আবিষ্কার চমকপ্রদ এবং মনকে সেহেতু নিজের দিকে আকৃষ্ট করে । ২) উপমার বদলে সাবস্টিটিউশান আছে । প্রকৃতপক্ষে মূলে সাংবাদিকসূলভ কতকগুলি বাক্য কবির লেখার ছিল ; সেই বাক্যগুলির সাবস্টিটিউটরূপে কতকগুলি বাক্য কবি লিখেছেন, মূল বাক্যগুলি একদম না লিখে । মূল বিষয়বাহী বাক্যের সাবস্টিটিউটরূপে কবি অ্যানালজাস বিষয়বাহী বাক্য লিখলেন, এবং তা করতে উপমা, উপমার থেকে প্রতীক তাঁকে সাহায্য করল । ৩) বারংবার পঠনেচ্ছা-উদ্রেকের ব্যবস্হা আছে । অন্যতম প্রকৃত চিন্তনীয় বিষয় এই যে কবিতার অদ্ভূত সংসৃজন, এতে বিবৃত দার্শনিক আবিষ্কার, এর অন্তর্নিহিত এবং অনুল্লেখিত বেদনা, কবিতায় সৃষ্ট বিষণ্ণ পরিবেশ, মন্হর গতি ইত্যাদি সব মিলিয়ে পাঠককে কবি দ্বিতীয়বার পাঠে বাধ্য করতে সমর্থ হয়েছেন । এবং প্রথমে, দ্বিতীয়বার পাঠের পরে তৃতীয়বার পাঠের আগ্রহ আরো বাড়তে থাকে — কারণ পাঠক নিজে তখন পাঠক থেকে কবি হতে থাকেন, চিন্তায় পড়ে, বাধ্য হয়ে । রবীন্দ্রনাথের কবিতা পাঠ করতে করতে পাঠক নিজেকে অত্যন্ত তুচ্ছ ( রবীন্দ্রনাথের তুলনায় ) মনে করতে বাধ্য, আর জীবনানন্দের কবিতা পাঠ করতে করতে পাঠক নিজেকে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করতে বাধ্য, যার ফলে পাঠকের পঠনেচ্ছা বাড়তেই থাকে । ৪) সহজে মুখস্হ করে রাখার ব্যবস্হা আছে । বারংবার পড়তে পড়তে যাতে কবিতাটি স্মৃতিস্হ হয়ে যায় সেদিকে কবি দৃষ্টি রেখেছেন । ৫) গভীরতা আছে । অর্থাৎ পাঠকের চিন্তার খোরাক প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান । ৬) সংযম আছে । সংযম কবিদের অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, এক দুরূহ তপস্যার মতো । যে-সব ব্যাপার লক্ষ্য করে কবি এই ‘সিদ্ধান্ততে’ পৌঁছেছেন, সেসব ব্যাপার অনুল্লেখিত, অলিখিত । ‘সিদ্ধান্তটিই’ কবিতা । ৭ ) বহুমাত্রিক চরিত্র আছে । বহুমাত্রিক শব্দটি আমি মাল্টিডাইমেনশানাল অর্থে ব্যবহার করছি । মাত্রা বা ডাইমেনশন মানে স্বয়ংসম্পূর্ণ কিন্তু একটিমাত্র বিষয় ধরছি — যেমন প্রেম, জীবনদর্শন, সমাজনীতি, রাজনীতি, বিজ্ঞান ইত্যাদি ।”
    ১৯৬৬ সালে লেখা উপরোক্ত বিশ্লেষণের মূল বিন্দুগুলো এই জন্যই উপস্হাপন করলুম যে বিনয় সেই সময়েই লিখছিলেন ছয় পর্বে দীর্ঘ তাঁর ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’। ১৯৯৯ সালে মারুফ হোসেনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিনয় বলেছিলেন ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা; কবিতাটি তিনি লিখেছেন তাঁর একাকীত্ব নিয়ে। আশা করি আলোচকরা বিনয়ের এই কবিতাটি এবং পরবর্তীকালে রচিত ‘বাল্মীকির কবিতা’ পড়ার সময়ে খেয়াল রাখবেন যে বিনয় তাঁর কবিতার ক্রাফটে কেমন ধরণের বৈশিষ্ট্য বুনে দ্যান । ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’র বকুল ফুল তার ছিদ্রপথ এবং ফাঁক আর পাপড়িদের নিয়ে আরো সুস্পষ্টভাবে ফিরে এসেছে ‘বাল্মীকির কবিতা’য় । ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ কাব্যটিকে বিনয় মজুমদার বলেছেন সেটি হলো ‘ধর্মগ্রন্হ’ ; এই ধর্ম তাঁর ব্যক্তিগত ধর্ম, কেননা একটা আগেই পড়েছি যে ধর্ম থেকে বিনয় সাত হাত দূরে । অর্ঘ দত্ত বকসী তাঁর ‘বিনয় মজুমদার ও অঘ্রাণের অনুভূতি — বিশাল দুপুরবেলার যৌনসমীক্ষা’ নিবন্ধে বলেছেন যে “জীবন থেকে, গণিত থেকে, আত্মসমীক্ষা থেকে পাওয়া যাবতীয় দর্শনের মহাবিস্ফোরণ আছে এই কবিতাগ্রন্হে” ।
    বিনয় মজুমদার যখন সীমান্ত পেরিয়ে পুর্ব পাকিস্তানে নিজের গ্রামে গিয়ে কিছুকাল ছিলেন, তখন তাঁর আচরণে গ্রামবাসীরা কোনো অস্বাভাবিকতা পাননি । বিনয় যখন শিমুলপুর গ্রামে পাকাপাকি বসবাস আরম্ভ করলেন তখনও তাঁর আচরণ থেকে অস্বাভাবিকতা বিদায় নিয়েছিল । তার কারণ পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামে এবং শিমুলপুরে তিনি ফিরে পেয়েছিলেন তাঁর কৌম-প্রতিস্ব, হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃতির সবুজ ভূখণ্ডের অঙ্গাঙ্গী । ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’ বিনয়ের সেই কৌম-প্রতিস্বকে উন্মুক্ত করেছে, কোনো রাখঢাককে তোয়াক্কা করেনি।
    ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বেরিয়ে কলকাতা মহানগরের জটিল ও সর্পিল পথসমষ্টির বিভ্রান্তিকর রাস্তা, পথ, গলির এবং সেখানকার মানুষদের ভুলভুলাইয়ায় তাঁর কৌম-প্রতিস্ব আবছা হয়ে উঠছিল ক্রমশ । তা থেকে মুক্তি পাবার জন্যই হয়তো তিনি পূর্ব পাকিস্তানে নিজেদের ছেড়ে আসা গ্রামে চলে গিয়েছিলেন । কলকাতা মহানগরে তিনি আক্রান্ত হচ্ছিলেন পারস্পরিক দূরত্বের অসম্বদ্ধতায়, অপসৃতির বোধে । শিমুলপুরে পৌঁছে তিনি স্রষ্টাকে খুঁজে পেলেন, যা একযোগে তাঁর ভেতরে এবং বাইরে বিদ্যমান । ‘অউম’ পত্রিকার জন্য দেয়া সাক্ষাৎকারে ১৪১৩ বঙ্গাব্দে তিনি বললেন, “শরীরই অন্তর আর অন্তরই শরীর — এই অনাদি একের থেকে সৃষ্টি হয়েছিল এ বিশ্বের সবকিছু । অত্রি তারা আমাকে বলেছিল, শরীরই অন্তর আর অন্তরই শরীর । আমারও তাই মত । বেঁচে থাকতে হলে এই একটি বাক্যাংশই মনে রাখতে হবে । আর কোনও মন্ত্র নেই ।” ‘ফিরে এসো, চাকা, ‘অঘ্রাণের অনুভূতিমালা’, ‘বাল্মীকির কবিতা’ ও পরের দিনপঞ্জিমূলক সাব-জনারের কাব্যগ্রন্হগুলোতে আমরা বিনয়ের এই বার্তাটিকেই প্রতিটি পংক্তিতে প্রবহমান দেখি ।

    ষোলো
    বিনয় মজুমদার কয়টি নাটক লিখেছিলেন জানি না । ‘ধূসর জীবনানন্দ’ গ্রন্হে একটি নাটক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, ১৯৯৫ সালে লেখা । নাটকটির নাম ‘আপনারা হাসুন’ । বইটি ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল, যে বছর উনি মারা যান । তার মানে আর কোনো নাটক সম্ভবত উনি লেখেননি ।
    রচনাটিকে আমি নাটক বলছি কেননা বিনয় মজুমদার একটি মঞ্চ কল্পনা করেছেন । আসল যে ব্যাপারটি তিনি ঘটিয়েছেন তা হল মঞ্চের মাঝখানে নাটকের প্রমটারকে একটি চেয়ারে বসিয়ে রেখেছেন, যার হাতে একটি গ্রন্হ, যখন কিনা প্রমটার উইংসের আড়ালে থাকেন এবং অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যাতে সংলাপ ভুলে না যান তাই আড়াল থেকে সংলাপ প্রমট করেন, দর্শকরা তাঁকে কখনও দেখতে পান না । ওই চেয়ারটি ছাড়া মঞ্চে আর কোনো আসবাব নেই । শাড়ি-ব্লাউজ পরা নামহীন তিনজন সুন্দরী নারী আছেন মঞ্চে যাদের কোনো সংলাপ নেই । বিনয় হয়তো বলতে চেয়েছেন, নারীদের প্রমট করার প্রয়োজন হয় না এবং তাঁরা অযথা সংলাপ খরচ না করে ঘটনাবলীর প্রতি নজর রাখেন । প্রমটারও নামহীন ।
    তিনজন পুরুষ আছেন মঞ্চে, এবং তারা প্রমটার যে সংলাপ বলে তার পুনরুক্তি করে । প্রমটার মাঝে-মাঝে সেই চরিত্রগুলোর নাম নিয়ে আদেশ করে, অমুক এবার তুমি বলো, অথবা তমুক এবার তুমি বলো, ইত্যাদি । পুরুষ চরিত্রগুলোর নাম হলো :
    ১ ) পিঙ্গুহুয়া : পাজামা পরা অভিনেতার বাংলা নাম কাহালি ।
    ২ ) টিরিনচাগা : প্যান্ট পরা অভিনেতার বাংলা নাম বুদ্ধ ।
    ৩ ) গেঞ্জি পরা অভিনেতার বাংলা নাম দীপক ।
    চরিত্রগুলোর নামকরণে গণিতের খেলা আছে কিনা তা ডিকোড করা দুরূহ । বিনয় মজুমদার মূলত একজন কবি ও গণিতজ্ঞ, তাই নাটকটির বাস্তবতাকে পাশে সরিয়ে তাকে মেটাফর হিসাবে ব্যাখ্যা করার প্রলোভন হয় । সংলাপগুলোতেও রহস্য বুনেছেন বিনয় কিন্তু তার মাধ্যমে চরিত্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে না । ফলে মঞ্চটাকে মনে হয় সমাজের একটি সামগ্রিক মানসিক স্হিতি। চরিত্রগুলো মঞ্চের কারাগারে আটক , তারা প্রমটারের সংলাপ আউড়িয়ে জীবনযাপন করতে বাধ্য । তারা নিজের মনের কথা বলার স্বাধীনতা পায়নি । অতএব মঞ্চটি অথবা এই জগতসংসারটিকে একটি আবদ্ধ জায়গায় আটক থাকার গারদ বলে অনুমান করা যায় । কিন্তু প্রমটার লোকটি তার কাজের মাধ্যমে চরিত্রগুলোকে নিয়ে একটি ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে অসমর্থ ।
    নাটকটির সংলাপের পুনরুক্তির পর পুনরক্তি থেকে আঁচ করা যায় যে, বিনয় মজুমদার একটি বাধ্যবাধকতার ও সীমাবদ্ধতার দমবন্ধকর পরিসরকে আগাম অনুমান করতে পেরেছিলেন, যাকে নিয়ন্ত্রণ করছে অন্ধকার ও ক্ষতিকর ক্ষমতাগুলো । সেই নিমিত্তবাদকে গড়ে তুলেছে একটি নিষ্ঠুরতা যার মুখোমুখি হতে মানবসমাজ বাধ্য । এখানে উল্লেখ্য যে বিনয় মজুমদার যখন এই নাটকটি লেখেন তখন বামপন্হী ভাবধারায় প্রভাবিত গ্রুপ থিয়েটারগুলোর রমরমা চলছে । তাছাড়া বিনয়ের নিবন্ধগুলোয় ‘নবান্ন’, ‘ছেঁড়া তার’, ‘উলুখাগড়া’ ইত্যাদি নাটকের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না । সাক্ষাৎকার গ্রহনকারীরাও তাঁকে নাটক বা গ্রুপ থিয়েটার সম্পর্কে প্রশ্ন করেননি । হয়তো তাঁরা জানতেন না যে বিনয় ১৯৯৫ সালে একটি নাটকও লিখেছেন ।
    বিনয় তাঁর নাটকটির মাধ্যমে সে-সময়ের নাটক-সংস্কৃতিকে তুলোধনা করেছেন । গ্রুপ থেয়েটার তখন ক্রমশ জীবাশ্ম হয়ে উঠছিল, জীবনের বুনিয়াদি প্রশ্নাবলী থেকে সরে গিয়ে র‌্যালি ও র‌্যালায় মজে যাচ্ছিল, দারিদ্র্যকে গৌরবান্বিত করা আরম্ভ করেছিল, যাকে বলা যায় এক ধরণের বামপন্হী এলিটিজম, নানা জারগণের ধুমধাড়াক্কা । থিয়েটার ক্রমশ হয়ে পড়ছিল লিখিত নাটকের চাকর । বিনয় তাই প্রমটারটিকে নিয়ে এলেন চাকরের ভূমিকায় যে আবার একই সঙ্গে প্রভূত্ব করে । প্রমটার খোলাখুলি দেখিয়ে দিচ্ছে যে যেগুলোকে নাটকের মাস্টারপিস মনে করা হয়, গ্রুপ থিয়েটারের সেই সব ভাষাপ্রবৃত্তির কোনো স্হান আর বাঙালিসমাজে নেই । তারা বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অক্ষম । তারা কেবল ব্যক্তি-বিশেষেরর মামুলি সমস্যাকে মানসিক সমস্যা বলে উপস্হাপন করতে চেয়েছে ।
    মানসিক সমস্যা বলতে যে ঠিক কী বোঝায় তা বিনয় মজুমদারের চেয়ে ভালো আর কেউ জানতেন না বাংলা সাহিত্যের জগতে ।

    ১৯৯৮ সালে বিনয় মজুমদারের চল্লিশটি ন্যারেটিভ’ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ‘বিনয় মজুমদারের ছোটগল্প’ । ছোটগল্পের সংজ্ঞা অনুযায়ী এগুলো ছোটোগল্প নয়, কোনো গদ্যেই সেই হুইপক্র্যাক এনডিং এবং ব্যক্তি-এককের সমস্যা নেই । ন্যারেটিভগুলো শিমুলপুরে বিভিন্ন গ্রামবাসীর সঙ্গে বিনয়ের কথোপকথন, বিনয়ের দিনপঞ্জিমূলক কবিতাগুলো গদ্যে রূপান্তরিত । এগুলোকে বলা যায় ‘গল্পহীন গল্প’ । বাংলা ভাষায় গল্পহীন গল্প বিনয়ই সম্ভবত প্রথম লিখেছেন ।
    বড়ো ও ছোটো আইডিয়াগুলোকে বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে উপস্হাপন করেছেন বিনয় ; ঠাকুরনগরের মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন সেই আইডিয়াগুলোকে । চল্লিশটি গদ্যকে যদি ঘটনা অনুযায়ী জুড়ে একটি দীর্ঘ গদ্য তৈরি করা হয়, তাহলে বিনয়ের সেই সময়ের জীবনযাপন ও গ্রামবাসীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে একটি ন্যারেটিভ গড়ে উঠবে ; সেগুলোকে বলা যায় গল্প সম্পর্কে গল্প । গদ্যগুলো দিয়ে ন্যারেটিভের নদী তৈরি করেছেন বিনয়, প্রতিটি গদ্য পৃথকভাবে তার শাখানদী । আর প্রতিটি শাখানদী তার সংলাপপ্রবাহে লুকিয়ে রেখেছে একটি বার্তা । গদ্যগুলো জুড়ে একটা দীর্ঘ পাঠবস্তু তৈরি করলেও তা মেটাফিকশান হবে না ।
    গদ্যগুলো গতানুগতিক গল্পের মতন ফরমুলাচালিত নয় । ফরমুলানির্ভর গল্প ক্রমশ একটি সমস্যা উপস্হাপন করে এবং শেষে গিয়ে তার সমাধান ঘটে । বিনয়, যিনি একজন গণিতবিদ, তিনি প্রতিটি গদ্যে ওই ফরমুলাতেই অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে দিলেন । ফরমুলা-নির্ভর গল্প রচিত হয় বাজারের কথা ভেবে এবং সেটি একটি মার্কেটেবল প্রডাক্ট — বাস্তব হোক বা কাল্পনিক । চিরাচরিত কাহিনি-প্রণালীকে চ্যালেঞ্জ করলেন প্রণালীহিনতার দ্বারা ।
    প্রথানুগত গল্পের মতন কোনো বাঁধাধরা আরম্ভ ঘটান না, সংলাপ দিয়ে আরম্ভ করেন, এবং পাঠককে তিনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন তা পাঠক সেই সংলাপগুলোকে অনুসরন করার পর টের পায় ; বহুক্ষেত্রে তিনি পাঠককে কোথাও নিয়ে গিয়ে মাঝপথে ছেড়ে দেন, যাতে বাকি পথটা পাঠক নিজেই নির্ণয় নিয়ে এগোতে পারে । তাতে কিন্তু ফরমুলা গল্পের নাটক জোড়েন না বিনয় । সংলাপের আঙ্গিকটি অনেক সময়ে এমনভাবে উপস্হাপিত হয় যে বোঝা যায় বিনয় নিজেই বিরুদ্ধ-যুক্তি-প্রদর্শক কিংবা মূল প্রতর্ক থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন, যাতে যাঁর সঙ্গে বিনয় কথা বলছেন তাঁকে ছোটো করা না হয় । সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় যাকে বলতেন ‘না-গল্প’, বিনয়ের ন্যারেটিভগুলো তা নয়, অর্ক দত্ত বকসী যাকে বলছেন ‘প্রগল্প’, তাও নয়, এবং অর্ক চট্টোপাধ্যায় যাকে বলেছেন ‘গল্পনা’ তাও নয় । বিনয়ের গল্পগুলোর উপসংহার এবং ক্যাথারসিস ঘটে কাহিনিটি ফুরিয়ে যাবার পর অন্য কোথাও ।
    ঠাকুরনগরের একজন বা কয়েকজনের সঙ্গে কোনো একটি বিষয়ে আলোচনা আরম্ভ করেন বিনয়, এবং তা বিনয় নামেই করেন । সেই আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে যুক্তি, শ্লেষ, বিদ্রূপ, ব্যাজস্তুতি, হাস্যরস, বৈজ্ঞানিক-তর্ক, সরল গণিত, ব্যঙ্গ, আমোদ, ঠাট্টা, কৌতুক, গভীর জ্ঞান, প্ররোচনা ইত্যাদির মাধ্যমে শ্রোতার মনে শেষ পর্যন্ত প্রত্যয় উৎপাদন করেন তিনি। কিছু-কিছু ক্ষেত্রে সমাজের বিরুদ্ধে আক্রমণ আছে, এবং সেগুলো এমনভাবে উপস্হাপন করেছেন তিনি যেন ব্যাপারগুলো স্বাভাবিক । কোনো-কোনো প্রতর্ক তাঁর কবিতাতেও আছে । প্রায় প্রতিদিন সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিতর্কিত বিষয়ের আলোচনা করে বিনয় মজুমদার, যাঁকে গ্রামের মানুষ জানে একজন বিখ্যাত কবি হিসাবে, পারস্পরিক হায়ারারকি ভেঙে ফেলেছেন।
    ‘মনা আজ এসেছিল আমার কাছে…’ গল্পটিতে তিনি মনে নামের ছেলেটিকে বলছেন, “দ্যাখো, আমিই চাঁদ নিয়ে কবিতা লিখেছি, ‘চাঁদের গুহার দিকে নির্নিমেষ চেয়ে থাকি…’, যা তাঁর ‘বাল্মীকির কবিতা”র লাইন, এবং কথা প্রসঙ্গে পাঠককে মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে তাঁর কাছে বইটির গুরুত্ব আছে । গল্পটিতে তিনি গণিতবিদ ও ইঞ্জিয়ার লেওনার্দো দা ভিঞ্চির সঙ্গে নিজের তুলনা করেছেন, লেওনার্দোর মতন তাঁরও অবিবাহিত থাকার প্রসঙ্গে এনেছেন, ‘মোনালিসা’ আঁকার কথা তুলেছেন, বলেছেন যে লেওনার্দোর মতন তিনিও ছবি এঁকেছেন সাহিত্যচর্চা করেছেন, কিন্তু একবারও গায়ত্রী প্রসঙ্গ আসেনি ।
    ‘পরোপকারী’ গল্পে বিনয় হোটেল মালিক মিত্র মশায়কে বোঝাচ্ছেন যে তিনি মুর্গির মাংস, পাঁঠার মাংস খাওয়াচ্ছেন খদ্দেরদের । মানুষেরা পাঁঠা পোষে, খাইয়ে দাইয়ে মোটা করে, তারপর তাকে কেটে খায় । কারণ মানুষ পাঁঠার চেয়ে অনেক উঁচুস্তরের জীব । তিনি প্রস্তাব দেন যে মিত্র মশায় সেই তর্কে যদি মানুষের মাংস কেটে খদ্দেরদের খাওয়ান তাহলে একজন মানুষের মাংস খেয়ে আরেকজন মানুষ দেবতার পর্যায়ে উন্নীত হবে । মিত্র মশায় বলেন বুঝেছি । বিনয় জানান যে কলকাতায় তিনি নিজের চোখে দেখেছেন যে মানুষের মাংস খাচ্ছে মানুষ, একবার নয়, অনেকবার ।
    ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ নামের পাঠবস্তুটিতে খাদ্যবস্তু থেকে মানুষের দেহে মাংস তৈরি হবার কথা আরেকবার এসেছে । মিষ্টি বিক্রেতা মুকুন্দ বণিকের সঙ্গে বিনয়ের কথাবার্তা হয় । মুকুন্দ বণিক প্রতিদিন মানুষকে মিষ্টি বিক্রি করে তাদের দেহে মাংস তৈরি করে দিচ্ছেন । তেমনই চাষিরাও মানুষের দেহে মাংস তৈরি করে । বিনয়ও বছরে আড়াই হাজার ডাব বেচে অন্তত আড়াইটে ডাবের সমান রক্ত তৈরি করে দেন মানুষের শরীরে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কিছুই করেন না, কেবল মুখে-মুখে গল্প মেরে বেড়ান । মুকুন্দ বণিককে বিনয় জানান যে সেই জন্যই তিনি মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ে অনেক উপরে । মুকুন্দ বণিক তর্কে বিশ্বাস করেন এবং বলেন যে যত মন্ত্রী আছে, বিধানসভায় সদস্য আছে, রাজ্যপাল তাঁরা মুকুন্দ বণিকের নীচেই । এই একই বিষয় ফিরে এসেছে ‘আমার চাষিভাইরা’ গদ্যে, যখন বিনয় দ্যাখেন যে রেলস্টেশনে মাইক বসিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে স্হানীয় নেতা গোবিন্দ দেব । বিনয় মজুমদার সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন দেখে তাঁকেও বক্তৃতা দিতে বলা হয়, চাষিদের ধানের দাম, পাটের দাম বাড়ানোর জন্য । বিনয় একটি দীর্ঘ বক্তৃতা দেন এবং জানান যে চাষিদের ফসল খেয়েই মানুষের দেহে বছর-বছর রক্তমাংস হয়, চাষিরা ভালো-লোক খারাপ-লোকের পার্থক্য করেন না, তাঁদের ফসল সকলেই খায়, সেকারণে ধানের আর পাটের দাম বাড়ানো জরুরি ।
    শেষ গদ্যটিতে যুগপৎ অনেককে ঠোনা মরেছেন বিনয় মজুমদার । গদ্যটির শিরোনাম ‘সম্রাট ষষ্ঠ জর্জ’ । গদ্যটিতে বিনয় একজন সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর নির্দেশেই নানা ঘটনা ঘটে । ভারতের লোকে স্বাধীনতা চাইছে এবং ষষ্ঠ জর্জ পরামর্শ চাইছেন মেরির কাছে । উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মতিলাল নেহরু, করমচন্দ গান্ধিকে এক এক করে পেশ করা হলো সম্রাটের সামনে। তাঁরা তিনজনেই জানালেন এ হলো বিনয়দার লীলাখেলা, স্বাধীনতা দিতে হবেই । মনস্ত্বত্ববিদরা সম্রাটকে জানালো যে এই ভারতীয়দের পরীক্ষা করে জানা গেছে যে তারা মনোরোগী । সম্রাটের অমাত্য নিলসন জানতে চাইল, এদের চিকিৎসা কোথায় করা হবে, লণ্ডনে না অন্যত্র ? সম্রাট আদেশ দিলেন, এই তিন যুবকের মনোরোগের চিকিৎসা করা হোক ভারতে — কলকাতায় মেডিকাল কলেজের এজরা ওয়ার্ডে ।
    বিনয় মজুমদারের ‘ছোটোগল্প’ নামের এই পাঠবস্তুগুলোকে বিদ্যায়তনিক ডিসকোর্সের বাইরে ঠেলে দেয়া হয়েছে অথচ মর্মার্থ ও সংলাপের এরকম বুননশৈলী আর কারো গদ্যে দেখা যায় না । সাধারণ মানুষ ও তাদের সংলাপ ব্যবহার করে বিনয় নির্মাণ করেছেন একটি দার্শনিক ভঙ্গী অথবা অভিগমন । গ্রামে জীবনযাপনের দরুন তিনি জানেন যে মানুষের জীবনে ভাষা একটি প্রাথমিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, তা একজনের সঙ্গে আরেকজনের সহজ যোগাযোগের মাধ্যম, তা বাস্তবতাকে পালটে দিতে পারে, অভিজ্ঞতাকে আদল দিতে পারে । সংলাপ তখনই নিজস্ব হয়ে ওঠে যখন বক্তার মস্তিষ্কে সেই সংলাপের উদ্দেশ্য গাঁধা হয়ে যায় । সাধারণ মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলার সময়ে বিনয় খেয়াল রেখেছেন যে গাম্ভীর্যের ভেতরে লুকোনো হাসাহাসি বুদ্ধির খেলাকে পরস্পরের মধ্যে জীবন্ত করে তোলে ।

    [ রচনাকাল জানুয়ারি – মার্চ ২০১৭ ]
  • m | 012312.60.90023.249 | ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮ ১০:৩৮541289
  • আরেকবার ক্ষুধিত পাষাণ -- রবীন্দ্রনাথের প্যাশটিশ
    মলয় রায়চৌধুরী
    আমি এবং আমার আত্মীয় বিদেশ ভ্রমণ সারিয়া দিল্লি বিমানবন্দর হইতে কলিকাতায় ফিরিয়া আসিতেছিলাম, এমন সময়ে দিল্লি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের লাউঞ্জে সহযাত্রীটির সহিত পরিচয় হয় ; তিনি লণ্ডনে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে বক্তৃতা দিয়া স্বদেশে ফিরিতেছিলেন । তাঁহার বেশভূষা শ্মশ্রুকেশ দেখিয়া প্রথমটা তাঁহাকে পশ্চিমদেশীয় মুসলমান বলিয়া ভ্রম হইয়াছিল । তাঁহার কথাবার্তা শুনিয়া আরো ধাঁধা লাগিয়া যায় । আলোকচিত্র বিষয়ে তো অবশ্যই, এতদ্ব্যতীত পৃথিবীর সকল বিষয়েই এমন করিয়া আলাপ করিতে লাগিলেন, যেন তাঁহার সহিত প্রথমে পরামর্শ করিয়া বিশ্ববিধাতা সকল কাজ করিয়া থাকেন । বিশ্বসংসারের ভিতরে ভিতরে যে এমন সকল অশ্রুতপূর্ব নিগূঢ় ঘটনা ঘটিতেছিল, রুশিয়ানরা যে এতোদূর অগ্রসর হইবার পরও আত্মধ্বংসের পথে চলিয়া গিয়াছে, চিনারা চেয়ারম্যান মাওয়ের বিশাল তৈলচিত্র টাঙাইয়া সাম্যবাদের পুঁজিবাদী পরীক্ষায় সফল হইয়াছে, পেটরল লইয়া আমেরিকানদের যে এমন সকল গোপন মতলব আছে, দেশীয় রাজনৈতিক নেতাদের অধঃপতন এবং বপুর স্ফীতি সীমা অতিক্রম করিয়াছে, গণতন্ত্র যে এমন খিচুড়ি পাকিয়া উঠিয়াছে, টাকার এভারেস্টে না উঠিলে নির্বাচনের শৃঙ্গ জয় অসম্ভব, এ সমস্ত কিছুই না জানিয়া আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হইয়া ছিলাম ।
    বাবুটি প্রকৃত কৃষ্ণবর্ণ, তাই বলিয়া তাঁহার গায়ে ভ্রমর বসিলে যে দেখা যাইবে না, অথবা কালি মাখিলে জল মাখিয়াছেন বোধ হইবে, কিংবা জল মাখিলে কালি মাখিয়াছেন বোধ হইবে, এমন নহে । যেরূপ কৃষ্ণবর্ণ আপনার ঘরে থাকিলে শ্যামবর্ণ বলি, পরের ঘরে হইলে পাতুরে কালো বলি, বাবুটির ত্বক সেইরূপ কৃষ্ণবর্ণ । তাঁহার চক্ষুদুটি এরূপ যেন সদাসর্বদা অগ্নিস্ফূলিঙ্গ নির্গত হইতেছে । দারপরিগ্রহে জ্ঞানোপার্জনের বিঘ্ন ঘটে আশঙ্কায় নিতান্ত নিরুৎসাহে অদ্যাবধি বাবুটি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন নাই, বসতবাটী হইতে দূরে রাজস্হানি মারোয়াড়ি অধ্যুষিত আকাশচুম্বী অট্টালিকায় একটি দুই কামরার আবাস ভাড়া লইয়া কম বয়সী যুবতীর সহিত একত্রে বসবাস করিতেছেন, সে তথ্য স্বয়ং স্বীকার যাইলেন ।
    আলোকচিত্র-বিশেষজ্ঞ আমাদের নবপরিচিত আলাপিটি ঈষৎ হাসিয়া কহিলেন : There happen more things in haven and earth. Horatio, than are reported in your newspapers. আমরা বহুকাল ইউরোপ আমেরিকায় সময় অতিবাহিত করিয়া স্বগৃহে ফিরিতেছি, সুতরাং আলোকচিত্র-বিশেষজ্ঞ লোকটির রকমসকম দেখিয়া অবাক হইয়া গেলাম । লোকটা সামান্য উপলক্ষে কখনো বিজ্ঞান বলে, কখনো বেদের ব্যাখ্যা করে, কখনো ইয়ে আজাদি ঝুঠা হ্যায় স্লোগানের বোমাবাজদিগের বহুরূপীস্বভাবের গল্প বলে, পাকিস্তানের দাবি করিয়া যে উচ্চবর্ণ বাঙালিরা নিম্নবর্গদিগকে ফেলিয়া পূর্ববঙ্গ হইতে ভারতে পলাইয়া আসিয়াছিল এবং সিংহাসনে বসিয়া পরমানন্দে আখের গোছাইয়া লইয়াছে তাহাদের গোপন কাহিনি শোনায় , আবার কখনো কোয়ান্টাম ফিজিক্স ও উত্তরাধুনিকতা আওড়াইতে থাকে । বিজ্ঞান, বেদ, মার্কসবাদী পুঁজিবাদ, জাতিপ্রথা-নির্ভর গান্ধিবাদ এবং কোয়ান্টাম ফিজিক্সে আমাদের কোনোরূপ অধিকার না থাকাতে, তাঁহার প্রতি আমাদের ভক্তি উত্তরোত্তর বাড়িতে লাগিল।
    আমার সমাজবাদী ঠিকেদার আত্মীয়টির মনে দৃঢ় বিশ্বাস হইল যে, আমাদের এই আলোকচিত্র-বিশেষজ্ঞ সহযাত্রীর সহিত কোনো-এক রকমের অলৌকিক ব্যাপারের কিছু একটা যোগ আছে -- কোনো-একটা অপূর্ব চৌম্বকত্ব অথবা দৈবশক্তি, অথবা সূক্ষ্ম শরীর, অথবা ঐ ভাবের একটা-কিছু । তিনি এই অসামান্য মানুষটির সমস্ত সামান্য কথাও ভক্তিবিহ্বল মুগ্ধভাবে শুনিতেছিলেন এবং গোপনে নোট করিয়া লইতেছিলেন । আমার ভাবে বোধ হইল, অসামান্য ব্যক্তিটিও গোপনে তাহা বুঝিতে পারিয়াছিলেন এবং কিছু খুশি হইয়াছিলেন ।
    আমার সমাজবাদী ঠিকেদার আত্মীয়টির কার্যকলাপ স্বচক্ষে দেখিয়া ভূমিসংস্কারক নেতা বিনয় চৌধুরী একদা বলিয়াছিলেন যে বঙ্গদেশের গণতন্ত্র বাই দি ঠিকেদার ফর দি ঠিকেদার অফ দি ঠিকেদার হইয়া গিয়াছে । আত্মীয়টি সিন্ডিকেট নামক একটি যুবক-সমবায় স্হাপন করিয়া প্রচুর কাঁচা টাকা একত্র করিয়াছিলেন এবং বিদেশভ্রমণের সাধ মিটাইবার ও বিখ্যাত মণীষীদের সাক্ষাৎ পাইবার জন্য রক্তপিপাসু জোঁকের ন্যায় আমার সঙ্গ লইয়াছিলেন । বিদেশে আমরা আলবার্ট আইনস্টাইন, রমাঁ রোলাঁ, এইচ জি ওয়েলস, ডাবলিউ বি ইয়েটস, এজরা পাউণ্ড, রবার্ট ব্রুজেস, আরনেস্ট রাইস, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, আগা খাঁ, রেজা শাহ পহলভি, হেনরি বার্গসঁ, রবার্ট ফ্রস্ট, টমাস মান, জর্জ বার্নার্ড শ, বেনিতো মুসোলিনি প্রমুখের সহিত দেশ ও দশের কল্যাণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সারিয়ে ফিরিতেছিলাম ।
    সমাজবাদী ঠিকেদার আত্মীয়টির প্রপিতামহ অভিবক্ত বঙ্গের স্বনামধন্য মানুষ ছিলেন, সেই সময়ের বঙ্গে, বর্তমানে যাহা ভারতীয় বঙ্গ ও বাংলাদেশ নামে দুইটি পৃথক দেশ, উভয় অংশেই তাঁহার প্রভূত জমিদারি জমিজমা ছিল এবং আফিম ও নীল চাষ হইত । চিনদেশে আফিম রপ্তানি করিয়া এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গগণকে নিয়মিত রৌপ্যমুদ্রা উপঢৌকন দিয়া কলিকাতায় একখানি বৃহৎ পারিবারিক অট্টালিকা নির্মাণ করিয়াছিলেন । কথিত আছে যে বিলাতে তাঁহার আকস্মিক মৃত্যু হয় এবং তথায় তাঁহাকে সমাধিস্হ করা হইয়াছিল, যদ্যপি তাঁহার বঙ্গদেশীয় হৃৎপিণ্ডখানি কর্তিত করিয়া স্বদেশে আনিয়া ধর্মমতে কলিকাতায় অন্ত্যষ্টি করা হইয়াছিল । কিন্তু আত্মীয়টির পিতামহ খ্রিস্টধর্মাবলম্বীগণের ধর্মাচরণ ও ধর্মগ্রন্হে আকৃষ্ট হইয়া তদৃশ একটি ধর্মস্হাপনের প্রয়াসে আত্মনিযুক্ত হইবার ফলে প্রপিতামহের ব্যবসায় এবং জমিদারির চাষবাস এতোই অবহেলিত হয় যে ক্রমে তাঁহাদের সন্তান-সন্ততি ধর্ম ও বিদ্যাশিক্ষায় আগ্রহান্বিত হইয়া প্রপিতামহের ব্যবসায়কে অতল জলরাশিতে নিমজ্জিত করিয়া দেন । পরবর্তী প্রজন্মের বংশধরগণ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন নাই যে ঐশ্বর্যের নিজের কোনো লজ্জাবোধ নাই । যাহাই হউক, সমাজবাদী ঠিকেদার আত্মীয়টি তাহা বুঝিতে পারিয়াছেন এবং উত্তরঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ধনবৈভবের পূজারীরূপে প্রতিষ্ঠা পাইয়াছেন ।
    আমি যখনই বিদেশযাত্রা করি, অথবা স্বদেশেও কোথাও ভ্রমণে যাইলে সঙ্গী লইয়া যাইতে পছন্দ করি, এই জন্য যে তাঁহারা পরবর্তীকালে আমাকে লইয়া স্মৃতিকথা লিখিয়া কিঞ্চিদধিক রোজগারপাতি করিবেন, এবং তাঁহাদের স্মৃতিকথার উপর নির্ভর করিয়া অধ্যাপকবৃন্দ আমাকে লইয়া ইচ্ছামতো গল্প ফাঁদিতে পারিবেন ও ছাত্রছাত্রীদিগকে পিএইচ ডি পাইতে পথনির্দেশ করিতে পারিবেন । একই কারণে আমি গুণগ্রাহী তরুণ-তরুণী এবং আত্মীয়-অনাত্মীয় পরিচিত-অল্পপরিচিত ব্যক্তিগণকে নিয়মিত চিঠি লিখিয়া থাকি, যাহাতে তাঁহারা আমার মৃত্যুর পর চিঠিগুলি ভাঙাইয়া খাইতে পারেন, আমার আলোকে কিঞ্চিদধিক অন্ধকারের বাহিরে আসিবার সুযোগ লইতে পারেন, আমার জীবনের দুঃখজনক ঘটনাবলী ফেনাইয়া কেচ্ছা লিখিয়া কোটিপতি হইতে পারেন ।
    লণ্ডনের হিথরো বিমানবন্দর হইতে আসিয়া আমাদের বিমানটি দিল্লিতে নামাইয়া দিল, আমরা দমদমগামী বিমানের অপেক্ষায় লাউঞ্জে সমবেত হইলাম। তখন রাত্রি সাড়ে দশটা । কলকাতায় সার্বিক ধর্মঘট অথবা ব্রিগেড সমাবেশ জাতীয় একটা-কী ব্যাঘাত হওয়াতে বিমান অনেক বিলম্বে আসিবে শুনিলাম । আমি সন্ধ্যার পান-ভোজন সারিয়া ইতিমধ্যে মখমলশোভিত সোফায় হেলান দিয়ে ঘুমাইব স্হির করিয়াছি, এমন সময়ে আলোকচিত্র-বিশেষজ্ঞ অসামান্য ব্যক্তিটি নিম্নলিখিত গল্প ফাঁদিয়া বসিলেন । যৎসামান্য সিঙ্গল মল্ট পান সত্ত্বেও সে রাত্রে আমার আর ঘুম হইল না :---

    ইন্টারন্যাশানাল জিওগ্রাফিক পত্রিকার পক্ষ হইতে বিদেশে কয়েকটি অভিশপ্ত প্রাসাদ ও গৃহাদির গোপন কাহিনি ও আলোকচিত্রের কর্মটি সুসম্পন্ন করিবার পর পত্রিকা কর্তৃপক্ষ ভারতের শরিফাবাদে অবস্হিত অভিশপ্ত অট্টালিকাটির আলোকচিত্র তুলিয়া একটি নিবন্ধ লিখিবার প্রস্তাব দিলে আমি তৎক্ষণাত রাজি হইয়া গিয়াছিলাম । আলোকচিত্র হইল আমার মাদকীয় আধ্যাত্মিকতা ।
    তখন দেশ অরাজক । ইংরাজ শাসক স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন । ইংরাজ শাসকের পর যাহারা গদিনশীন হইল তাহারা দেশকে ছারখার করিয়া দিবার খেলায় মত্ত হইয়া গেল । যাহারা গদিনশীন হইবার প্রয়াস করিতেছিল, তাহাদের অত্যাচারে বরেন্দ্রভূমি ডুবিয়া যাইতেছিল । অনেকেই কেবল খাইতে পায় না তা নয়, গৃহে পর্যন্ত বাস করিতে পারে না । যাহাদের খাইবার নাই তাহারা পরের কাড়িয়া খায় । কাজেই গ্রামে গ্রামে দলে দলে চোর-ডাকাত । কাহার সাধ্য শাসন করে । পারস্পরিক হত্যা, গ্রাম হইতে বিতাড়ন, জলচল বন্ধ, পাকা ফসল ও খামারে অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদির মাধ্যমে শাসক ও বিরোধী সম্প্রদায় জনগণকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়াস করিতেছিল ।
    অভিশপ্ত প্রবন্ধশৃঙ্খলা লিখিবার নিমিত্ত প্রথমে গিয়াছিলাম ক্যাম্বোডিয়াস্হিত তুয়োল স্লাঙ গণহত্যা প্রদর্শশালায় । এই গৃহটি তৎকালীন একাধিপতি পল পটের গুপ্তচরগণ, যে নাগরিকদিগকে সন্দেহ করিত তাহাদের তুলিয়া আনিয়া যৎপরোনাস্তি যন্ত্রণা দিয়া হত্যা করিত । চিকিৎসক অধ্যাপক শিক্ষক প্রযুক্তিবিদ বিজ্ঞানী প্রমুখ ব্যক্তিগণকে চাষবাসে নিযুক্ত করিয়াছিলেন পল পট, এবং তাঁহার বশংবদগণ সন্মানীয় ব্যক্তিগণকে খেতে-খামারে অকর্মণ্যতার জন্য চাবুক দ্বারা পিটাইত, বন্দুকের গুঁতা দিয়ে অষ্টপ্রহর খাটাইত, যে কারণে তাঁহারা প্রায় সবাই মৃত্যু বরণ করেন । প্রদর্শশালায় বর্তমানে সতেরো হাজারেরও বেশি নিহত মানুষের চিৎকার শুনিতে পাওয়া যায় ; পল পট যে কতো লক্ষ মানুষকে যাতনা দিয়া হত্যা করিয়াছিল তাহার হিসাব মেলে নাই, কিন্তু সেই নিহত মানুষগুলির ছায়াশরীর এখনও যাতনাদানকারীদিগের বংশধরদের পিছু ধাওয়া করে । আমি আমার শব্দধারকযন্ত্রে চিৎকারের কিয়দংশ ধরিয়া রাখিয়াছি, লিখিবার সময়ে ক্রন্দনাশ্রুর অনুনয়-বিনয় শুনিলে বাক্যাদি স্বাবলীলতায় কলমের সূচ্যাগ্রে চলিয়া আসে । বিস্ময়ের ব্যাপার হইল যে বামপন্হীগণ তিরিশ বৎসরেরও বেশি পশ্চিমবঙ্গে পলপটিয় সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস করিলেও অদ্যাপি কেহই পল পট সম্পর্কে কোনো কথা বলা সমিচীন মনে করেন নাই, তাহাঁদের মৌনতা একটি হুডিনি রহস্য ।
    স্কটল্যাণ্ডের এডিনবরায় মেরি কিংস ক্লোজ নামে একটি অভিশপ্ত অঞ্চলের আলোকচিত্র লইবার নির্দেশ পাইয়া কয়েক দিন কাটাইবার পর এক পক্ককেশ বৃদ্ধা ও একটি কম বয়সি মেয়ের ছায়াশরীরের অস্তিত্ব জানিতে পারি ; ভ্রমণকারীগণও অনেকে তাহাদের উপস্হিতি, পদধ্বনি ও হাসাহাসি শুনিতে পায় । আপনারা ইউনাইটেড কিংডম ভ্রমণে যাইলে অবশ্যই মেরি কিংস ক্লোজ দেখিয়া আসিবেন । সন্ধ্যার পর পর্যটকগণের প্রবেশ নিষেধ । দুর্ভাগ্য যে আমার আলোকচিত্রগুলিতে সেই বৃদ্ধা ও তাহার নাতনির মৃত্যুপরবর্তী ছায়াশরীরের কোনও আভাস ভাসিয়া উঠে নাই । আমার যন্ত্রে তাঁহাদের কন্ঠস্বরও ধরিয়া রাখিতে পারি নাই ।
    আমাদিগের দেশে রাজস্হান রাজ্যের আলওয়ারে ভাঙ্গার দুর্গে অবশ্যই যাইবেন । কথিত আছে যে জনৈক স্বাস্হ্যবান তন্ত্রসাধনাকারী যুবক প্রাসাদনিবাসিনী এক সুন্দরী রাজকন্যার প্রেমে আক্রান্ত হইয়া জাদুটোনার মাধ্যমে যুবতীটিকে বশীভূত করিবার প্রয়াসে বিফল হইবার পর আত্মহত্যা করিয়া লয় এবং মৃত্যুশয্যায় অভিশাপ দিয়া যায় যে দুর্গস্হিত সকলেই কয়েক দিবসের ভিতর উন্মাদ হইয়া যাইবে । কেহ উন্মাদ হইয়াছিল কিনা তাহার কোনো প্রমাণ নাই, তথাপি সন্ধ্যার পর দুর্গটিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করিয়া দেয়া হইয়াছে । বহু ভ্রমণার্থী মস্তিষ্কবিকারে আক্রান্ত হইয়াছেন । সন্ধ্যার পর দুর্গটিতে উন্মাদ অপচ্ছায়াদের চিৎকার এবং তান্ত্রিকের অট্টহাস্য শোনা যায় । এক্ষেত্রে আমার আলোকচিত্রে যদিও প্রমাণ পাই নাই, কন্ঠস্বর ধরিয়া রাখার যন্ত্রে উন্মাদ মানুষের চিৎকার ও তান্ত্রিকের অট্টহাস্য ধরা পড়িয়াছিল । ইন্টারন্যাশানাল জিওগ্রাফিকের সম্পাদক মহাশয় বলিয়াছিলেন যন্ত্রটি বহু পুরাতন বলিয়া অমন আওয়াজ হইতেছে, বিজ্ঞানীগণ শুনিলে বিশ্বাস যাইবেন না।
    তাহার পর গিয়াছিলাম সিংগাপুরের পুরাতন চাঙ্গি চিকিৎসালয় ভবনে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জাপানি সৈন্যগণ ভবনটিতে শত্রুসেনাগণকে অকথ্য যন্ত্রণা দিত এবং দেহগুলি এলাইয়া পড়িলে হত্যা করিত । বহু ভারতীয় সৈন্যকে তাহারা যাতনা দিয়া হত্যা করিয়াছে । পর্যটকগণ যন্ত্রণাকাতর মানুষের ক্রন্দন শুনিতে পান, মৃতদেহ ছুঁড়িয়া ফেলিবার শব্দ শুনিতে পান, ভারতীয় সৈন্যগণের হিন্দুস্তানি ভাষায় ক্রন্দন শুনিতে পাওয়া যায়, জাপানি সেনার বুটজুতার পদশব্দ শোনা যায় । আমিও শুনিয়াছি কিন্তু আলোকচিত্রগুলিতে সেই ক্রন্দন ও মৃতদেহ ফেলিয়া দিবার আভাস ধরিতে পারি নাই ।
    মেক্সিকোয় জোচিমিলকো নামে একটি স্হানের জনহীন দ্বীপে গিয়াছিলাম । দ্বীপটি এতোই অভিশপ্ত যে জলযানগুলি ভ্রমণকারীদের লইয়া দ্বিপ্রহরেই ফিরিয়া চলিয়া আসে । তথায় একদিন যে সময়ে মেঘপূঞ্জ স্বর্ণমালাবৎ পশ্চিম গগনে বিরাজ করিতেছিল, তৎসময়ে একটি বালিকা তাহার ডলপুতুল সামলাইতে গিয়া জলমগ্ন হইয়া মারা যায় । বালিকাটির আত্মার শান্তির জন্য জনৈক ব্যক্তি প্রচুর ডলপুতুল লইয়া গিয়া দ্বীপটিতে রাখিয়া আসিত । একদিন সেই ব্যক্তিটি সেই একই স্হানে জলে ডুবিয়া মারা যায় যেস্হানে বালিকাটি জলমগ্ন হইয়া অপঘাতে মারা গিয়াছিল । দিবাদ্বিপ্রহরেও বালিকার খিলখিল হাসি শুনিতে পাওয়া যায়। দ্বীপের যত্রতত্র রক্ষিত ডলপুতুলগুলি পর্যটকদিগের পানে তাকাইয়া থাকে এবং বহু ভ্রমণার্থী সেই দৃষ্টি এবং খিলখিল হাসি হইতে সারা জীবনেও মুক্তি পায় নাই । সৌভাগ্যবশত আমাকে কোনও ডলপুতুল বশীকরণ করিতে পারে নাই ।
    এক্ষণে একটি অভিশপ্ত অরণ্যের কথা বলিব । ঘন অরণ্যটি জাপানের আকিগাহারায় স্হিত । বহু জাপানি যুবক-যুবতী এমনকী বৃদ্ধ-বৃদ্ধাগণও সেই জঙ্গলে গিয়া আত্মহত্যা করিয়াছেন । অরণ্যে প্রবেশ করিবার পর তাঁহাদিগকে আর খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই । আজও অনেক হতাশ্বাস মানুষ চুপি-চুপি অরণ্যটিতে প্রবেশ করিয়া হারাইয়া যান, এবং আত্মীয়গণ অনুমান করেন যে তাঁহারা আত্মহত্যা করিয়া লইয়াছেন । অরন্যটির ভিতর দিবাবসানে বহু মানুষের হাহাকার ও বক্ষ-চাপড়ানি শুনিতে পাওয়া যায় । কর্তৃপক্ষের নির্দেশ আছে যে ভ্রমণের জন্য অরন্যটিতে প্রবেশ করিলে পথে পথে সীতার অলঙ্কারের ন্যায় চিহ্ণাদি রাখিয়া যেন অগ্রসর হন । অত্যন্ত ঘন জঙ্গল, আমি স্হানীয় এক অরণ্যপ্রদর্শক লইয়া ভিতরে প্রবেশ করিয়াছিলাম, সবুজের বিভিন্নপ্রকার পার্থক্যসমাবেশে আলোকচিত্রগুলি চমৎকার ফুটিয়া উঠিয়াছিল, এবং একাধিক বৃক্ষের শাখা হইতে যেন গলায় রজ্জু বাঁধিয়া মানুষ ঝুলিয়া আছে এমত ইশারা চাক্ষুষ করিয়াছিলাম ।
    এইবার স্বদেশের একটি অট্টালিকার ঘটনা বলিব । ইন্টারন্যাশানাল জিওগ্রাফিক নির্দেশ দিয়াছিল যে এবার যেন ভারতের শরিফাবাদের বহুল প্রচারিত অবহেলিত ও অতিঅভিশপ্ত খণ্ডহরটির আলোকচিত্রসহ ছায়াশরীরগণের চিৎকার ও ক্রন্দন ও তথ্যাদি সংগ্রহ করিয়া পাঠাই । অর্ধশতকাধিক পূর্বে যে উগ্রক্ষত্রিয় পরিবার খণ্ডহরটিতে বাস করিতেন, তাঁহাদের পরিবারের জনৈক জীবিত সদস্য একজন তত্ত্ববধায়ক নিযুক্ত করিয়াছেন যিনি তাঁহাদের ভগ্নপ্রায় নিবাসটিতে দিবাবসান পর্যন্ত থাকেন । শরিফাবাদ নিবাসী আমার শ্যালক, অর্থাৎ মৃত স্ত্রীর বৃদ্ধ ভ্রাতা, অভিশপ্ত অট্টালিকাটির বিষয়ে তথ্যাদি দিবার পর আমি সেই অট্টালিকাটিকে কেন্দ্র করিয়া আলোকচিত্রের কর্ম আরম্ভ এবং তথ্যাদি সংগ্রহ করা মনস্হ করি। শ্রীমতী ঝুমা চট্টোপাধ্যায় নামক এক প্রথিতযশা লেখিকা-আলোকচিত্রী অভিশপ্ত অট্টালিকাটির কাহিনি ও আলোকচিত্র সংগ্রহ করিয়া আমাকে এতদ্বিষয়ে সম্যক অবহিত করিয়াছিলেন, আমি তাঁহার অবদানের জন্য কৃতজ্ঞ ।
    শরিফাবাদস্হ খণ্ডহরের অভিশপ্ত দ্বিতল অট্টালিকাটির কেয়ারটেকার অর্থাৎ তত্ববধায়ক মহাশয়ের সহিত আমার শ্যালকের বহুদিনের পরিচয় ছিল । সহৃদয় তত্ববধায়ক মহাশয় আমাকে সেই অট্টালিকারই একটি অব্যবহৃত পরিত্যক্ত ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করিয়া খাট-বিছানা পাতিয়া, মশারির ব্যবস্হা করিয়া, টেবিল-চেয়ার আনিয়া দিয়া থাকিবার ব্যবস্হা করিয়া দিলেন । প্রথম দর্শনেই স্পষ্ট হইয়া গিয়াছিল যে আমার পূর্বে ঘরটি কেহ বহুকাল ব্যবহার করে নাই, অর্ধশতাধিক কাল চুনকাম হয় নাই । একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকা যে অভিশপ্ত তাহা আলোকচিত্রে ধরিয়া রাখিবার জন্য তথায় দুই-তিন দিন রাত্রিবাস প্রয়োজন, মনে করিয়াছিলাম, যেমন নামিবিয়ার জীবজন্তুর আলোকচিত্র লইবার সময়ে জঙ্গলের ভিতরেই তাঁবু খাটাইয়া রাত্রিবাস প্রয়োজন ছিল।
    যে সময়ে শরিফাবাদের দ্বিতল অট্টালিকাটি অভিশপ্ত হয় নাই, সেসময়ে বিজলি ব্যবস্হা ছিল, যত্রতত্র বিজলির তার ভাঙা টিউবলাইট ঝুলিতে দেখিয়া অনুমান করিলাম, এখন তত্ববধায়ক মহাশয় কেরোসিন লন্ঠন এবং মোমবাতি জ্বালাইয়া সন্ধ্যাপর্যন্ত এই গৃহে থাকেন । সন্ধ্যা হইলে নিজ বাসভবনে চলিয়া যান ।
    প্রথম দিবসেই মাথার উপরে শব্দতরঙ্গে আকাশমণ্ডল ভাসাইয়া পাপিয়া ডাকিয়া গেল । অনুমান করিলাম শুভলগ্নেই অট্টালিকাটিতে প্রবেশ করিয়াছি ।
    তৎকালে জায়গাটি বড়ো রমণীয় ছিল । নির্জন পাহাড়ের নিচে বড়ো-বড়ো বনের ভিতর দিয়া দক্ষিণ-পশ্চিমে দ্বারকেশ্বর ও দামোদর নদী দুটি, পূর্বপ্রান্ত ভাগিরতী ও উত্তরে অজয় নদী উপলমুখরিত পথে নিপুণা নর্তকীর মতো পদে পদে বাঁকিয়া বাঁকিয়া দ্রুত নৃত্যে চলিয়া গিয়াছে । ঠিক সেই নদীর ধারেই পাথরবাঁধানো বহুসোপানময় অত্যুচ্চ ঘাটের উপর একটি প্রাচীন স্হাপত্যের অট্টালিকা শৈলপদমূলে একাকী দাঁড়াইয়া আছে -- নিকটে কোথাও লোকালয় নাই । খণ্ডহরের তত্ত্ববধায়ক মহাশয় বলিয়াছিলেন দ্বিতল অট্টালিকাটিতে একদা একটি উগ্রক্ষত্রিয় জমিদার পরিবার থাকিত, তাঁহাদের প্রচুর জমিজমা খেত-খামার ছিল । বাড়িটি অভিশপ্ত হইবার পূর্বে জমিদারের খেতগুলি ও ফসলের আড়ত এই স্হান হইতে কিয়ৎক্রোশ দূরে ছিল । সে সময়ে এই অঞ্চলে জোতদারেগণ সংখ্যায় শতাধিক, তখনও জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয় নাই ।
    তত্তববধায়ক মহাশয়ের কাছে শুনিয়াছিলাম, তৎকালে যাহারা শরিফাবাদের প্রাচীন নিবাসী ছিলেন না, অন্যত্র হইতে আসিয়া তথায় ঘর বাঁধিবার প্রয়াস করিতেছেন, বিশেষ করিয়া দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান হইতে আশ্রয়প্রার্থীর দল, তাঁহারা কলহাস্যমুখর পরিবারের সেই দ্বিতল অট্টালিকা, যাহার মধ্যস্হলে একটি সুন্দর উদ্যান ছিল, তাহা দেখিয়া হিংসায় ও বিদ্বেষে জ্বলিয়া পুড়িয়া মরিতেন এবং মনে-মনে ষড় করিতেন যে কখনও সুযোগ পাইলে প্রাসাদটিকে আক্রমণ করিয়া বিদ্ধস্ত করিয়া দিবেন, ভূস্বামীর বৈভব প্রদর্শনের গর্বের জন্য নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিশেষে উগ্রক্ষত্রিয় গৃহনিবাসীদের উচিত শিক্ষা দিবেন । এই সংবাদ আমি পরবর্তীকালে অট্টালিকার তত্ত্ববধায়কের নিকট পাইয়াছিলাম, তৎসত্ত্বেও এই গৃহের নিবাসীগণের প্রতিই যে কেন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শীগণ বিদ্বিষ্ট হইয়াছিলেন তাহা তিনি ব্যাখ্যা করিতে পারেন নাই, আরও বহু ধনী জোতদারগৃহ তো শরিফাবাদে ছিল। সে যাহাই হউক, ভগ্নপ্রায় অট্টালিকাটি আলোকচিত্র লইবার উপযুক্ত ছিল ; এই প্রকার আরও অভিশপ্ত পরিবার ও গৃহাদি অন্যত্র খুঁজিয়া পাইব কিনা নিশ্চিত ছিলাম না । রাজনৈতিক মতাদর্শীগণ প্রকৃতই তাঁহাদের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন কিনা, তদ্বিষয়ে আমার সন্দেহ ছিল এবং পরবর্তীকালে তাঁহাদের কার্যকলাপ, চরিত্রদূষণ, হিংসা, প্রতিশোধস্পৃহা ও লোভ দেখিয়া আমার সন্দেহ আরও দৃঢ় হইয়াছে, তাঁহারা বহুলাংশে মতাদর্শ জলাঞ্জলি দিয়া লোভের আবর্তে নামিয়া ভিন্নমতাদর্শীগণের অনুচররূপে দাসখৎ লিখিয়া দিয়াছেন । ইহা মানবসমাজের উত্তর-সত্যের যুগ, নাগরিকগণ ক্রীড়নক মাত্র ।
    ####
    ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রশাসনের সহিত জমিদার জোতদার তালুকদারদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্হায় তাঁহারা ভূসম্পত্তির নিরঙ্কুশ অধিকারী হন ; স্বত্বাধিকারের সুবিধার সাথে চিরস্হায়ীভাবে অপরিবর্তনীয় এক নির্ধারিত হারের রাজস্বের জমিদারিস্বত্বও তাঁহারা লাভ করেন।
    সেই সময়ের এক উগ্রক্ষত্রিয় জমিদার মহাশয় এই দ্বিতল অট্টালিকাটি নির্মাণ করাইয়াছিলেন । তখন স্নানশালার ফোয়ারার মুখ হইতে গোলাপগন্ধি জলধারা উৎক্ষিপ্ত হইতে থাকিত এবং সেই শীকরশীতল নিভৃত গৃহের মধ্যে মর্মরখচিত স্নিগ্ধ শিলাসনে বসিয়া, কোমল নগ্ন পদপল্লব জলাশয়ের নির্মল জলরাশির মধ্যে প্রসারিত করিয়া, তরুণী বাঙালি রমণীগণ চুলে জবাকুসম তেল মাখিয়া, স্নানের পূর্বে দীর্ঘ কুঞ্চিত কৃষ্ণকেশ মুক্ত করিয়া দিয়া, রবীন্দ্রসঙ্গীত অথবা অতুলপ্রসাদী গান করিতেন । খণ্ডহরটিতে আজও সেই গানের আবছা রেশ ক্বচিৎ-কখনও বাতাসে ভাসিয়ে বেড়ায় ।
    লাহোরে শাহজাদা সেলিমের প্রেমিকা আনারকলিকে যেভাবে সম্রাট আকবরের নির্দেশে ইষ্টক গাঁথিয়া জীবন্ত সমাধিস্হ করা হইয়াছিল, সেই পদ্ধতিতেই এই অভিশপ্ত অট্টালিকাটির সদর দরজার সন্মুখভাগ ইষ্টক গাঁথিয়া বন্ধ করিয়া দেয়া হইয়াছে, গৃহস্হিত উদ্যানটির চতুর্দিকে অবিন্যস্ত অনিয়ন্ত্রিত ঝোপঝাড়, নামহীন লতা সুযোগ পাইয়া সরিসৃপের ন্যায় আঁকিয়া-বাঁকিয়া অন্দরে-কন্দরে প্রবেশ করিয়াছে, দ্বিতলের সিঁড়ি বাহিয়া উপরের ঘরগুলিতে নিজস্ব নৃত্যছন্দে হস্তপদ মেলিয়া দিয়াছে ।
    এখন আর সে ফোয়ারা খেলে না, সে গান নাই, সাদা পাথরের উপর শুভ্র চরণের সুন্দর আঘাত পড়ে না --- এখন ইহা আমাদের মতো নির্জনবাসপীড়িত সদাভ্রাম্যমান পেশাদার আলোকচিত্রীর অতিবৃহৎ এবং অতিশুন্য সাময়িক বাসস্হান । কিন্তু তত্ত্ববধায়ক এবং আমার শ্যালক উভয়েই আমাকে এই অট্টালিকার একটি পরিত্যক্ত বিজলিহীন ঘরে বাস করিতে বার বার নিষেধ করিয়াছিলেন ; বলিয়াছিলেন, “ইচ্ছা হয় দিনের বেলা থাকিবেন, কিন্তু কখনো এখানে রাত্রিযাপন করিবেন না ; স্পেনের ইনকুইজিশনের কাহিনি শুনিয়াছেন তো, ভিন্নবিশ্বাসী স্ত্রী-পুরুষকে জীবন্ত দগ্ধ করা হইত ? এই অট্টালিকায় দিন নাই রাত্রি নাই সেই অতিনিষ্ঠুর লুন্ঠন-অভিলাষী অগ্নিসংযোগকারীদের উল্লসিত কন্ঠস্বর ধোঁয়ার ন্যায় জাগিয়া উঠে, ছায়াশরীরেরা লুন্ঠনকারীর ন্যায় আমোদনৃত্য করে, আপনি বারুদের গন্ধ পাইলে অবাক হইবার কিছু নাই ।”
    আমি হাসিয়া উড়াইয়া দিলাম । তত্তবধায়ক বলিলেন, তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত আমার সঙ্গে থাকিবেন, কিন্তু রাত্রে এখানে থাকিবেন না, স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করিবেন । আমি বলিলাম, “তথাস্তু” । এই অভিশপ্ত খণ্ডহরের এমন রহস্য ও কিম্বদন্তি ছিল যে, রাত্রে দলীয় মাস্তানগণও এখানে আসিয়া গঞ্জিকা সেবনের আড্ডা দিতে সাহস করিত না , এবং পুলিশও জেল পলাতক কয়েদির অনুসন্ধানে এ-মুখো হইত না। সন্মুখের দ্বার ইষ্টক গাঁথিয়া বন্ধ করিয়া কর্তৃপক্ষ সম্রাট আকবরের ন্যায়ই এই গৃহের জীবনালোক নির্বাপিত করিয়া নিশ্চিন্ত ছিলেন বলিয়া অনুমান করি । একদা এই অট্টালিকা উৎফুল্লকমলজালশোভিত, বিহঙ্গমাক, স্বচ্ছ বারিবিশিষ্ট শান্তিনিকেতন ছিল, তাহা অনুমান করিতেও কষ্ট হয় ।
    প্রথম প্রথম গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া লতাগুল্মে আচ্ছন্ন এই পরিত্যক্ত ভগ্নপ্রায় অবহেলিত অট্টালিকার বিজনতা আমার বুকের উপর যেন একটা ভয়ংকর ভারের মতো চাপিয়া থাকিত, সূর্যোদয় এবং দ্বিপ্রহরে খণ্ডহরটির বিবিধ স্হানের আলোকচিত্র তুলিয়া আমি যতটা পারিতাম দ্বিপ্রহরের ভোজনের পর বাহিরে থাকিয়া, শরিফাবাদের অন্যান্য স্হানের আলোকচিত্র তুলিয়া ঘরে ফিরিয়া এক পাঁইট মদ্য সেবন করিয়া শ্রান্তদেহে নিদ্রা দিতাম এবং রাত্রিকালের অপেক্ষা করিতাম ।
    দ্বিতল অট্টলিকাটি বন্যলতার ঠাসবুনোটে বসবাসের অযোগ্য হইয়া গিয়াছে, দেয়াল ও গৃহের মাটিতে গুলঞ্চ, পাটেঙ্গা, কালকাসুন্দা, বিছুটি, শেয়ালকাঁটা, ভাটফুল, আলকুশি ইত্যাদি বিস্তার করিয়াছে নিজেদের স্বেচ্ছাচারী গণতন্ত্র । নিবিড় বন নহে, স্হানে স্হানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভিদ মণ্ডলাকারে কোনো কোনো ভূমিখণ্ড ব্যাপিয়াছে । উদ্যান হইতে উইপোকাগণ তাহাদের রানিমার নির্দেশে সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছে, দেয়ালে এবং সিঁড়িতে তাহাদের স্বেদ-লালার উত্তরাধুনিক অঙ্কনমালা ।
    আলোকচিত্রের ফিল্ম স্হানীয় বিপণীতে রসায়নে মুদ্রণ করিতে দিলে দোকানিটিও আশ্চর্য হইত কিন্তু ইন্টারন্যাশানাল জিওগ্রাফিকের একটি সংখ্যা তাহাকে দিবার পর একটি পৃষ্ঠায় আমার হাস্যময় মুখ মুদ্রিত দেখিয়া আমাকে সে শ্রদ্ধাপূর্বক সাহায্য করিতে আত্মনিবেদিত হইয়াছিল ।
    একদিন না যাইতেই অবহেলিত ভগ্নপ্রায় অট্টলিকাটির এক অপূর্ব নেশা আমাকে ক্রমশ মোহাবিষ্ট করিয়া ধরিতে লাগিল। আমার সে অবস্হা বর্ণনা করাও কঠিন এবং সেকথা লোককে বিশ্বাস করানোও শক্ত । সমস্ত অট্টালিকা একটা সামুদ্রিক অক্টোপাসের ন্যায় আমাকে তাহার আলিঙ্গনের বেগুনি ফুৎকারে ও তীব্র মোচড়ে জঠরোস্হ মোহরসে অল্পে অল্পে যেন নেশাগ্রস্ত করিতে লাগিল ।
    বোধহয় এ অভিশপ্ত বাড়িতে পদার্পণমাত্রেই, পরিত্যক্ত ঘরটির খাটে বিছানা পাতিবার ও মশারি টাঙাইবার পর এ প্রক্রিয়ার আরম্ভ হইয়াছিল -- কিন্তু আমি যেদিন সচেতনভাবে প্রথম ইহার সূত্রপাত অনুভব করি, সেদিনকার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে ।
    তখন গ্রীষ্মকালের কারণে উর্ধাঙ্গের পোশাক খুলিয়া বৈকালিক বাতাসের অপেক্ষা করিতেছিলাম । সূর্যাস্তের কিছু পূর্বে আমি সেই নদীতীরে ঘাটের নিম্নতলে একটা আরাম কেদারা লইয়া বসিয়াছি । দামোদর নদী শীর্ণ হইয়া আসিয়াছে ; ওপারে অনেকখানি বালুতট অপরাহ্ণের আভায় রঙিন হইয়া উঠিয়াছে, এপারে ঘাটের সোপানমূলে স্বচ্ছ অগভীর জলের তলে নুড়িগুলি ঝিক ঝিক করিতেছে । সেদিন কোথাও বাতাস ছিল না । দ্বিতল অট্টালিকাটির খণ্ডহরের ঝোপঝাড় হইতে বনতুলসী পুদিনা কালকাসুন্দা গুলঞ্চ ভাটফুল আলকুশি ও বন্যঘাসের একটা ঘন বনগন্ধ উঠিয়া স্হির আকাশকে ভারাক্রান্ত করিয়া রাখিয়াছিল ।
    আকাশে শাদা মেঘ রৌদ্রতপ্ত হইয়া ছুটিতেছে, তাহার নিচে কৃষ্ণবিন্দুবৎ পাখি উড়িতেছে, নারিকেল গাছে চিল বসিয়া, রাজমিস্ত্রির মতো চারিদিক দেখিতেছে, কাহার কিসে ছোঁ মারিবে । বক ছোটোলোক, কাদা ঘাঁটিয়া বেড়াইতেছে । ডাহুক রসিক লোক, ডুব মারিতেছে । আর আর পাখি হালকা লোক, কেবল উড়িয়া বেড়াইতেছে। হাটুরিয়া নৌকা হটর হটর করিয়া যাইতেছে -- আপনার প্রয়োজনে । খেয়া নৌকা গজেন্দ্রগমনে যাইতেছে -- পরের প্রয়োজনে । বোঝাই নৌকা যাইতেছে না -- তাহাদের প্রভূর প্রয়োজন মাত্র ।
    দিনমণি অস্তাচলগামী, সূর্য যখন দিগন্তের অন্তরালে অবতীর্ণ হইল, তৎক্ষণাৎ দিবসের নাট্যশালায় একটা দীর্ঘ ছায়াযবনিকা পড়িয়া গেল --- এখানে সূর্যাস্তের সময় আলোআঁধারির সম্মিলন অধিকক্ষণ স্হায়ী হয় না । সাইকেল সঞ্চালন করিয়া অথবা সাইকেল-রিকশ ভাড়া করিয়া একবার অঞ্চলটির পথে-পথে বেড়াইয়া আসিব মনে করিয়া উঠিব-উঠিব করিতেছি, কালধর্মে নিশারম্ভেই প্রবল ঝটিকাবৃষ্টি আরম্ভ হইয়া গেল, মস্তকোপরি বৃষ্টির ইলিশগুঁড়ি ধারাপাত হইতেছিল, নিশার সেই ঘোরতর অন্ধকারে দিগম্ত যখন স্হিত হইতেছে, এমন সময়ে সিঁড়িতে একাধিক পায়ের শব্দ ও বহু মানুষের আক্রমণাত্মক “মারো, মেরে ফ্যাল শালাদের, বড়ো বাড় বাড়িয়েছে, জমিজমার মালিক বইল্যা ধরাকে সরা জ্ঞান করতাসে, ধড় থিকা মাথা উড়ায়ে দে, চোখ খুবলাইয়া নে, আগুন ধরাইয়া দে” ইত্যাদি সমবেত কন্ঠস্বরের চিৎকার শুনিতে পাইলাম । আক্রান্ত পুরুষের অস্ফূট আতর্নাদ কর্ণে প্রবেশ করিল, যেনবা কাহারও প্রাণবায়ু নির্গত হইয়া গেল । পিছনে ফিরিয়া দেখিলাম, কেহ নাই । মনের চাঞ্চল্যহেতু একই স্হানে বসিয়া থাকিতে পারিলাম না ।
    ইন্দ্রিয়ের ভ্রম মনে করিয়া পুনরায় ফিরিয়া বসিতেই, একেবারে অনেকগুলি পায়ের শব্দ শোনা গেল --- যেন বিদ্বেষ ও ঈর্ষায় আক্রান্ত অনেকে মিলিয়া ছুটাছুটি করিয়া তিন-চারিজনকে ধরিবার নিমিত্ত নামিয়ে আসিতেছে । ঈষৎ ভয়ের সহিত এক অপরূপ বিস্ময় মিশ্রিত হইয়া আমার সর্বাঙ্গ পরিপূর্ণ করিয়া তুলিল । যদিও আমার সন্মুখে কোনো মূর্তি ছিল না তথাপি স্পষ্ট প্রত্যক্ষবৎ মনে হইল যে, এই গ্রীষ্মের সায়হ্ণে ভয়ে কন্ঠাগতপ্রাণ তিন-চারিটি রক্তাক্ত পুরুষ দামোদরের জলের মধ্যে লুকাইতে নামিয়াছে । জলের তলায় লুকাইয়া তাহারা যেন বিভিন্ন তরঙ্গবিন্যাসে কাঁদিয়া কন্ঠরুদ্ধ আর্তচিৎকার করিতেছিল । এমনই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া গিয়াছিলাম যে খেয়াল করি নাই বৃষ্টিতে ঈষৎ ভিজিতেছি ।
    যদিও সেই সন্ধ্যাকালে নিস্তব্ধ প্রায়ান্ধকারে, নদীতীরে, নির্জন অট্টালিকায় কোথাও কিছুমাত্র শব্দ ছিল না, তথাপি আমি যেন স্পষ্ট শুনিতে পাইলাম বর্ষাকালের পর্বতের পাথর নামিবার মতো সকৌতুক কলহাস্যের সহিত পরস্পরের দ্রুত অনুধাবন করিয়া ভয়ার্ত ও রক্তাক্ত পুরুষ তিন-চারিটির সন্ধানে আমার পার্শ্ব দিয়া মশাল বহনকারীরা তীর-ধনুক টাঙ্গি দা কাটারি লাঠি কুড়াল পেটরলের ও অ্যাসিডের জেরিক্যান লইয়া দৌড়াইতে দৌড়াইতে চলিয়া গেল, তাহাদের পশ্চাতে উৎসাহ দিবার নিমিত্ত খোল করতাল মৃদঙ্গ ডুগডুগি ঢোলক খঞ্জনি বাদকের দল । আমাকে যেন লক্ষ্য করিল না । তাহারা যেমন আমার নিকট অদৃশ্য, আমিও যেন সেইরূপ তাহাদের নিকট অদৃশ্য । মনে হইল বৃষ্টিও তাহাদের ভয়ে আতঙ্কিত হইয়া মেঘগুলিকে মাথার উপরের আকাশ হইতে নদীর ওই পারে লইয়া চলিয়া গেল ।
    নদী পূর্ববৎ স্হির ছিল, কিন্তু আমার নিকট স্পষ্ট বোধ হইল, স্বচ্ছতোয়ার অগভীর স্রোত অনেকগুলি বলয়শিঞ্জিত বাহুবিক্ষেপে বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছে ; জনৈক দলপতির নির্দেশে সমবেত যুবকগণ হাসিয়া হাসিয়া অগ্নিসংযোগের জন্য তীরগুলিকে কেরোসিন তেলে চুবাইয়া এই অট্টালিকার দিকে ছুঁড়িয়া মারিতেছে, এবং স্লোগানকারীগনের উৎসাহদানে উগ্রক্ষত্রিয়-গৃহমুখী যুবকগণ হোমারের মহাকাব্যে বর্ণিত গ্রিক সৈন্যগণের ন্যায় ট্রয়ের মানুষদের ধ্বংস করিতে উদ্যত হইয়াছে, কিন্তু তাহাদের পোশাক গ্রিক সৈন্যগণের ন্যায় নহে, তাহারা এতদ্দেশীয় পোশাক শার্টপ্যান্ট, লুঙ্গি, গামছা পরিয়া, হস্তে তীর-ধনুক দা কাটারি টাঙ্গি লাঠি কুড়াল মশাল জেরিক্যান লইয়া ছুটিয়া চলিয়া গেল । আপনারা নিশ্চয়ই অবগত যে দলপতিগণ মতাদর্শের উত্তরাধিকারী হইয়া জন্মায়, মানবসন্তান রূপে নহে ।
    যদ্যপি কে যে ইহাদের দলপতি তাহা সম্যক বুঝিয়া ফেলা দুষ্কর, কেননা যেখানে সবই কাঁটাবন, সেখানে পুষ্পচয়ন দুঃসাধ্য, তথাপি হইহইকারীদিগকে যে নির্দেশ দিতেছিল, সেই দলপতি কহিল, এতকাল শৃগাল কুক্কুরের মাংস ভক্ষণ করিয়াছি, ক্ষুধায় প্রাণ যায়, আজ নরমাংস খাইব । এই বলিয়া প্রেতবৎ ছায়াসকল অন্ধকারে খলখল হাস্য করিয়া হাততালি দিয়া নৃত্য করিতে লাগিল । চক্ষে চশমা পরিহিত দলপতির বাম হস্তে একটি ক্ষৌরকর্মের পেটিকা ঝুলিতে ছিল, মনে হইল তাহা একটি পুস্তক, বৈদ্যগণের সমাজ-চিকিৎসার বিদেশি গ্রন্হ । বৈদ্যগণের উৎসের সন্ধান মনুস্মৃতিতে নাই । উহারা বর্ণসংকর বলিয়া অনুমান করি, এবং সেহেতু জারজ ও প্রত্যেকের প্রতি বিদ্বিষ্ট । সম্ভবত, দুর্ভাগ্যবশত উগ্রক্ষত্রিয় পরিবারটি বৈদ্য দলপতির ঈর্ষার কেন্দ্র হইয়া উঠিয়াছিল । দলপতি মহাশয় এই জগৎ পবিত্র করিবার জন্য কোন কালসময়ে জন্মগ্রহণ করিয়াছিল, তাহার পিতামাতাই বলিতে পারিবে, ইতিহাস তাহা লিখে নাই, ইতিহাস এইরূপ বদমায়েশদের লইয়া অনেকপ্রকার বদমাইশি করিয়া থাকে ।
    ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে লিখিয়া গিয়াছেন, “অবস্হাবিশেষে মনুষ্য হিংস্র জন্তু মাত্র।” ছায়াশরীরগণ অট্টালিকাটিতে আয়োজিত অন্নপ্রাশনের শিশুটিকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করিলে ঋষির বাণীর অমোঘ সত্যতা উপলব্ধি করিলাম ।
    আমার বক্ষের মধ্যে একপ্রকার কম্পন হইতে লাগিল, আতঙ্কে ললাটে স্বেদস্রুতি হইতে লাগিল; সে উত্তেজনা উদ্বেগের কি উৎকন্ঠার কি কৌতূহলের, ঠিক বলিতে পারি না । বড়ো ইচ্ছা হইতে লাগিল ভালো করিয়া দেখি, কিন্তু সম্মুখে দেখিবার কিছুই ছিল না ; মনে হইল ভালো করিয়া কান পাতিলেই উহাদের কথা সমস্তই স্পষ্ট শোনা যাইবে ; কিন্তু একান্তমনে কান পাতিয়া কেবল ধ্বংসপ্রাপ্ত অট্টালিকার ঝিল্লিরব শোনা যায় । মনে হইল, পঞ্চাশ বৎসরের অধিক কৃষ্ণবর্ণ যবনিকা ঠিক আমার সম্মুখে আপন মাদকে দুলিতেছে --- ভয়ে ভয়ে একটি ধার তুলিয়া ভিতরে দৃষ্টিপাত করি --- সেখানে বৃহৎ সালিশি-সভা বসিয়াছে, কিন্তু গাঢ় অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না । সন্দেহ হইল যে এই বায়বীয় অপচ্ছায়াগুলির উপস্হিতির জন্যই হয়তো অট্টালিকাটিকে অভিশপ্ত তকমা দেয়া হইয়াছে ।
    হঠাৎ গুমোট ভাঙিয়া হু হু করিয়া একটি বাতাস দিল --- দামোদরের স্হির জলতল দেখিতে দেখিতে অপ্সরীর কেশদামের মতো কুঞ্চিত হইয়া উঠিল, এবং সন্ধ্যাছায়াচ্ছন্ন সমস্ত বনভূমি এক মুহূর্তে একসঙ্গে মর্মরধ্বনি করিয়া যেন দুঃস্বপ্ন হইতে জাগিয়া উঠিল । স্বপ্নই বলো আর সত্যই বলো, অর্ধশতাধিক বৎসরের অতীত ক্ষেত্র হইতে প্রতিফলিত হইয়া আমার সম্মুখে যে-এক অদৃশ্য মরীচিকা অবতীর্ণ হইয়াছিল তাহা চকিতের মধ্যে অন্তর্হিত হইল । যে আক্রমণকারীগণ আমার দেহের উপর দিয়া শরীরহীন দ্রুতপদে শব্দহীন উচ্চ ক্রোধে ছুটিয়া আসিয়াছিল, তাহারা অট্টলিকাটিতে তীর ও মশাল সংযোগে অগ্নিকাণ্ড ঘটাইয়া দিল । বাতাসে যেমন করিয়া গন্ধ উড়াইয়া লইয়া যায়, বসন্তের এক নিঃশ্বাসে তাহারা তেমনি করিয়া উড়িয়া অদৃশ্য হইয়া গেল । অগ্নিকাণ্ডের তাপের পরিবর্তে আমার ত্বকে শীতস্বেদের বিন্দু ফুটিয়া উঠিতে লাগিল ।
    তখন আমার বড়ো আশঙ্কা হইল যে, হঠাৎ বুঝি নির্জন পাইয়া ঠাকুমার ঝুলির রাজকন্যা, রাজপুত্র, রাক্ষস ও দানবগণ আমার স্কন্ধে আসিয়া ভর করিলেন ; আমি বেচারা নানাবিধ আলোকচিত্র তুলিয়া ব্যাখ্যা ও বিক্রয় করিয়া খাই, ঠাকুমার ঝুলির ঠাকুমাটি ঝুলি হইতে রাক্ষস-খোক্কোস ছাড়িয়া দিয়া এইবার বুঝি আমার মুণ্ডপাত করিতে আসিলেন । ভাবিলাম, ভালো করিয়া আহার করিতে হইবে ; শূন্য উদরেই সকল প্রকার দূরারোগ্য ব্যধি আসিয়া চাপিয়া ধরে । অট্টালিকার তত্ত্ববধায়ক মহাশয়কে ডাকিয়া বলিলাম স্বগৃহে যাইবার পূর্বে প্রচুর ঘৃতপক্ক মসলা-সুগন্ধি রীতিমত মোগলাই খানা স্হানীয় খ্যাতনামা রেস্তরাঁ হইতে আনাইয়া দিতে ।
    তত্ববধায়ক মহাশয় বিদায় লইলে, পথের দিকের গবাক্ষের কপাট খুলিয়া দেখিলাম, সন্মুখের পথ দিয়া যাইবার কালে এক পথচারী, দেখিতে অনেকটা হিন্দু পুরোহিতের ন্যায়, ব্রা্হ্মণ হইবেন বলিয়া মনে হইল, অতি দীর্ঘাকায় পুরুষ, শরীর শুস্ক, আয়ত মুখমণ্ডলে শ্বেতশ্মশ্রু বিরাজিত, ললাট ও বিরলকেশ তালুদেশে অল্পমাত্র বিভূতিশোভা, ব্রাহ্মণের কান্তি গম্ভীর ও কটাক্ষ কঠিন, আমাকে এই অভিশপ্ত অট্টালিকায় দেখিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল, “তফাত যাও, তফাত যাও, সব সত্য সব সত্য সব সত্য।” অনুমান করিলাম, বৃদ্ধ পুরোহিত হয়তো পাগল হইয়া গিয়াছেন, অথবা গলায় শালগ্রামশিলা ঝুলাইয়া হাঁটিবার সময়ে অমন চিৎকার করিয়া থাকেন । তৎসত্তবেও তিনি কলেজফেরত জিনস ও টপ পরিহিতা যুবতীগণের প্রতি অলক্ষ্যে চাহিয়া লইতেছেন ।
    রাত্রিশেষে ঘোরতর কুজ্ঝটিকা দিগন্ত ব্যাপ্ত করিয়াছিল, দিনমণি দিগন্তে উদিত হইলে, প্রাতঃকালে সমস্ত ব্যাপারটি পরম হাস্যজনক বলিয়া বোধ হইল । অদ্য আবহাওয়া মনোরম ছিল, প্রদোষকালে যৎসামান্য ঝটিকাবৃষ্টি হইয়া গিয়াছে । আনন্দ মনে শহরের বড়ো কোম্পানির আধিকারিকের মতো শার্ট ও গ্যালিসদেয়া প্যাণ্ট পরিয়া, সাইকেল সঞ্চালন করিয়া, দ্রুতবেগে আপন দৈনন্দিন কার্যে, অর্থাৎ পোস্টাপিসে গিয়া আলোকচিত্রগুলি অনুমোদনের নিমিত্ত পাঠাইয়া দিলাম, প্রবন্ধটির খসড়া লিখিবার জন্য একপ্রস্হ ফুলস্কেপ কাগজ কিনিলাম । সেই দিন প্রবন্ধটি আরম্ভ করিবার জন্য অট্টালিকায় নিজ ঘরে ফিরিয়া একাগ্রচিত্তে লিখিবার কথা । কিন্তু সন্ধ্যা হইতে না হইতেই আমাকে দ্বিতল ভগ্নপ্রায় অট্টালিকাটির রহস্য চুম্বকের ন্যায় টানিতে লাগিল । কে টানিতে লাগিল বলিতে পারি না ; কিন্তু মনে হইল, আর বিলম্ব করা উচিত হয় না । মনে হইল, অট্টালিকাটিতে কোনো পূজা অথবা শিশুর নামকরণের অনুষ্ঠান আরম্ভ হইতেছে, ধুপ-ধুনা চন্দন ও ফুলমালাদির সুগন্ধ ভাসিয়া আসিতেছে । সেই সন্ধ্যাধূসর তরুচ্ছায়াঘন নির্জন পথ সাইকেল সঞ্চালনের শব্দে সচকিত করিয়া অন্ধকার ভগ্নপ্রায় অবহেলিত নির্জন নিস্তব্ধ অট্টালিকাতে গিয়া উত্তীর্ণ হইলাম ।
    সিঁড়ির উপরে সম্মুখের ঘরটিতে মনে হইল দুটি ভাই-বোন গৃহশিক্ষকের নিকট পড়াশুনা করিতেছে, গৃহশিক্ষকের তিরস্কার ও কিশোর কিশোরীর কথাবার্তা কানে আসিতেছিল । সিঁড়ি দিয়া উঠিয়া দেখিলাম কেহই নাই, ঘরটিতে টিকটিকি , গিরগিটি , চামচিকা ও উইপোকাগণ আশ্রয় লইয়াছে, বন্য লতাও সুযোগ পাইয়া সিঁড়ি দিয়া উঠিয়া প্রবেশ করিয়াছে । যেন শুনিলাম কিশোর কন্ঠ যাতনায় চিৎকার করিয়া উঠিল, “মাথা ফাটিয়ে দিলো ওরা আমার মাথা ফাটিয়ে দিলো” । সিঁড়ি দিয়া কয়েকজনের দ্রুত নামিবার পদশব্দ শুনিতে পাইলাম কিন্তু কাহাকেও দেখিতে পাইলাম না । সম্ভবত নিজের পদশব্দকেই ভয়ে অন্যের পদশব্দ বলিয়া ভ্রম করিতেছি । তথাপি কয়েকজনের উচ্চকিত কন্ঠস্বর শুনিতে পাইলাম, “এই, মাস্টারটা পাঁচিল ডিঙিয়ে পালাচ্ছে, ধর ধর, পালাতে দিসনি।” শীতের সময়ে নতুন লেপ তৈয়ারির জন্য ধুনিরি লেপের উপর ছড়ি পেটাইয়া খোলের তুলাকে সর্বত্র ছড়াইয়া দেয়, সেই প্রকার শব্দ এবং আর্তচিৎকার, “মরে গেলুম মরে গেলুম মেরে ফেললে মেরে ফেললে”, কর্ণকুহরে প্রবেশ করিতে লাগিল । অথচ কাহাকেও কোথাও দেখিতে পাইলাম না ; অভিশপ্ত অট্টালিকাটি যেন আমাকেই অভিশপ্ত করিয়া তুলিতেছে এমত প্রতীয়মান হইল ।
    বিস্তীর্ণ দালান ও তাহার পার্শ্ববর্তী ঘরগুলি বিশাল ছাদ ধরিয়া রাখিয়াছে । এই প্রকাণ্ড দালান ও তৎপার্শ্ববর্তী ঘরগুলি যেন আপনার বিপুল শূন্যতাভারে অহর্নিশ নিজস্ব আতঙ্কে ছম ছম করিতে থাকে । সেদিন সন্ধ্যার প্রাক্কালে তখনও লন্ঠন জ্বালানো হয় নাই । দরজা ঠেলিয়া আমি একতলার একটি ঘরের কপাট ঠেলিয়া যেমন প্রবেশ করিলাম অমনি মনে হইল ঘরের মধ্যে যেন ভারি একটা বিপ্লব বাঁধিয়া গেল -- যেন হঠাৎ সভা ভঙ্গ করিয়া চারিদিকের দরজা জানালা ঘর পথ বারান্দা দিয়া কে কোন দিকে পলাইল তাহার ঠিকানা নাই । আমি কোথাও কিছু না দেখিতে পাইয়া অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম । শরীর এক প্রকার আবেশে রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল । যেন বহুদিবসের লুপ্তাবশিষ্ট বিড়ি-সিগারেট ও নস্যের গন্ধ আমার নাসার মধ্যে প্রবেশ করিতে লাগিল । আমি সেই দীপহীন জনহীন প্রকাণ্ড ঘরের প্রাচীন ইষ্টকপ্রণালীর মাঝখানে দাঁড়াইয়া শুনিতে পাইলাম --- ঝর্ঝর শব্দে দুইটি পাশাপাশি চৌবাচ্চায় কেহ স্নান করিতেছে । মনে হইল ট্রানজিসটারে সঙ্গীত বাজিতেছে, কী সুর বাজিতেছে বুঝিতে পারিতেছি না, কোথাও বা গৃহিনীগণের স্বর্ণভূষণের শিঞ্জিত, কোথাও বা কিশোরীর নূপুরের নিক্বণ, কখনোবা পুজার ঘণ্টাধ্বনি বাজিবার শব্দ, অনতিদূরে সানাইয়ে নহবতের আলাপ, বাতাসে দোদুল্যমান ঝাড়ের স্ফটিকদোলকগুলির ঠুন ঠুন ধ্বনি,বারান্দা হইতে খাঁচার বুলবুলের গান, বাগান হইতে পোষা পাখির ডাক আমার চতুর্দিকে একটা প্রেতলোকের রাগিণী সৃষ্টি করিতে লাগিল ।
    আমার এমন একটা মোহ উপস্হিত হইল, মনে হইল, এই অস্পৃশ্য অগম্য অবাস্তব ব্যাপারই জগতে একমাত্র সত্য, আর সমস্তই মিথ্যা মরীচিকা । আমি যে আমি --- অর্থাৎ আমি যে শ্রীযুক্ত মলয় রায়চৌধুরী, শ্রীযুক্তরঞ্জিত রায়চৌধুরীর কনিষ্ঠপুত্র, আলোকচিত্র তুলিয়া জগতে কিঞ্চিদধিক সুনাম অর্জন করিয়াছি, আমি যে শার্ট-প্যাণ্ট ও বুটজুতা পরিয়া কাঁধে একাধিক ক্যামেরা ঝোলাইয়া আলোকচিত্র লইয়া থাকি, লেন্সের ভিতর দিয়া দৃশ্যাবলীকে অনুপুঙ্খ যাচাই করি, এ-সমস্তই আমার কাছে এমন অদ্ভুত হাস্যকর অমূলক মিথ্যা কথা বলিয়া বোধ হইল যে, আমি সেই বিশাল অন্ধকার ভগ্নপ্রায় অট্টালিকার বন্য ঝোপঝাড়ের মাঝখানে দাঁড়াইয়া হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিলাম ।
    নিজ ঘরে প্রত্যাবর্তন করিয়া গবাক্ষের কপাট খুলিয়া দেখিলাম, সেই বৃদ্ধ পুরোহিত, লাল শালুতে মোড়া শালিগ্রামশিলা তাঁহার বুকে ঝুলিতেছে, এই ভগ্নপ্রায় অট্টালিকা ছাড়িয়া আমি চলিয়া যাই নাই দেখিয়া সম্ভবত অবাক হইলেন, এবং পূর্বেকার তুলনায় আরও তারস্বরে চিৎকার করিয়া উঠিলেন, “ তফাত যাও, তফাত যাও, সব সত্য সব সত্য সব সত্য ।” তাঁহার শ্লেষপূর্ণ ঘোষণা আমাকে সত্যই গৃহটি সম্পর্কে আরও আগ্রহান্বিত করিয়া তুলিল। আমার ভ্রুকুঞ্চন ও প্রশ্নময় চাহনি দেখিয়া পুরোহিতটি আমার প্রতি অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া কহিলেন, “অবস্হাবিশেষে মনুষ্য হিংস্র জন্তু মাত্র, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ ।” বুঝিলাম যে তিনি বহুবিধ দেবী-দেবতার সেবক, আমার পক্ষে তাঁহার বক্তব্যের নিহিতার্থে প্রবেশ সম্ভব নহে ।
    তখনই মোমের আলো নিভিয়া গেল এবং কিয়ৎক্ষণ পর তত্ত্ববধায়ক মহাশয় প্রজ্বলিত কেরোসিন ল্যাম্প হস্তে ঝুলাইয়া ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিলেন এবং টেবিলের উপর রাখিয়া চুপচাপ চলিয়া গেলেন । তিনি আমাকে পাগল মনে করিলেন কিনা জানি না, কিন্তু তৎক্ষণাৎ আমার স্মরণ হইল যে, আমি শ্রীযুক্ত রঞ্জিত রায়চৌধুরীর কনিষ্ঠপুত্র শ্রীযুক্ত মলয় রায়চৌধুরী, একজন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ; ইহাও মনে করিলাম যে, জগতের ভিতরে অথবা বাহিরে কোথাও অমূর্ত ফোয়ারা নিত্যকাল উৎসারিত ও অদৃশ্য অঙ্গুলির আঘাতে কোনো মায়া সেতারের অনন্ত রাগিনী ধ্বনিত হইতেছে কি না তাহা আমাদের মহাকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবিবর জীবনানন্দ দাশ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও বিনয় মজুমদার বলিতে পারেন, কিন্তু এ-কথা নিশ্চয় সত্য যে, আমি দেশ-বিদেশের আলোকচিত্র বিক্রয় করিয়া এবং তদ্বিষয়ে প্রবন্ধ লিখিয়া জীবন নির্বাহ করিয়া থাকি । তখন আবার আমার পূর্বক্ষণের অদ্ভুত মোহ স্মরণ করিয়া কেরোসিন-প্রদীপ্ত ক্যাম্পটেবলের কাছে খবরের কাগজ লইয়া আনন্দসংবাদ-এর দায়িত্ব হইতে রুপালিচুল মালিকের আকস্মিক পদত্যাগের খবরটি পড়িয়া সকৌতুকে হাসিতে লাগিলাম ।
    সংবাদপত্র পড়িয়া এবং মোগলাই খানা খাইয়া আলো নিবাইয়া দিয়া এই ভগ্নপ্রায় গৃহের পুরাতন খাটে বিছানায় গিয়া শয়ন করিলাম, পুরাতন খাটটির দুর্বল স্বাস্হ্যও এমন ভুতগ্রস্ত যে পাশ ফিরিলে ক্যাঁচকোঁচ শব্দ উঠে । আমার সম্মুখবর্তী খোলা জানালার ভিতর দিয়া উর্ধ্বদেশের একটি অত্যুজ্বল নক্ষত্র সহস্র কোটি যোজন দূর আকাশ হইতে এই অতিতুচ্ছ ক্যাম্পখাটের উপর শ্রীযুক্ত আলোকচিত্রীকে একদৃষ্টে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিতেছিল, ইহাতে আমি বিস্ময় ও কৌতুক অনুভব করিতে করিতে এবং চিন্তা করিতে করিতে কতক্ষণ যে তন্দ্রাভিভূত হইয়া পড়িয়াছিলাম বলিতে পারি না । মশকগণের সঙ্গীত ও অত্যাচার হইতে আত্মরক্ষার জন্য মশারি খাটাইয়া কতক্ষণ ঘুমাইয়া ছিলাম তাহাও জানি না । সহসা এক সময় শিহরিয়া জাগিয়া উঠিলাম ; ঘরে যে কোনো শব্দ হইয়াছিল তাহা নহে, কোনও যে লোক প্রবেশ করিয়াছিল তাহাও দেখিতে পাইলাম না । আকাশে অনিমেষ নক্ষত্রটি অস্তমিত হইয়াছে এবং কৃষ্ণপক্ষের ক্ষীণচন্দ্রালোক অনধিকারসংকুচিত ম্লানভাবে আমার বাতায়নপথে প্রবেশ করিয়াছে । যখন নিদ্রাভঙ্গ হইয়াছে তখন রজনী গভীর ।
    কোনো লোককেই দেখিলাম না । তবু যেন আমার স্পষ্ট মনে হইল, জরিপাড় ধুতি ও গরদের পাঞ্জাবি পরিহিত একজন পুরুষমানুষ মশারির একপাশ তুলিয়া আমাকে আস্তে আস্তে ঠেলিতেছে, তাহার পাঞ্জাবির সোনার বোতাম অন্ধকারে জ্বলজ্বল করিতেছে । আমি জাগিয়া উঠিতেই সে কোনো কথা না বলিয়া কেবল যেন তর্জনীর ইঙ্গিতে অতি সাবধানে তাহার অনুসরণ করিতে আদেশ করিল । তাহার দুইটি চোখে যেন সদ্য অ্যাসিড ঢালিয়া উপড়াইয়া তোলা হইয়াছে, এবং দরদর করিয়া রক্ত গড়াইতেছে । তাহাকে দেখিয়া আমি কি যে করণীয় তাহা নির্ণয় করিতে পারিলাম না, ভয়ে-ভয়ে তবু তাহার পিছু লইলাম । কাহারা এই ব্যক্তির চোখ উপড়াইয়া লইয়াছে, এবং তৎসত্ত্বেও সে কীরুপে আমাকে পথনির্দেশ করিতেছে তাহা জিজ্ঞাসা করিবার মতো আত্মপ্রত্যয় হইল না।
    আমি অত্যন্ত চুপিচুপি উঠিলাম । যদিও সেই ভগ্নকক্ষপ্রকোষ্ঠময় প্রকাণ্ড শূন্যতাময়, নিদ্রিত ধ্বনি এবং সজাগ প্রতিধ্বনিময় দ্বিতল অট্টালিকায় আমি ছাড়া আর জনপ্রাণীও ছিল না, তথাপি পদে-পদে ভয় হইতে লাগিল, পাছে আরও কেহ জাগিয়া উঠে । অট্টালিকার একতলার দালানের দুই পাশের অধিকাংশ ঘরের কপাট রুদ্ধ এবং সে-সকল বন্ধ ঘরে আমি কখনো রাত্রিবেলায় প্রবেশ করি নাই , আমার সাহসে কুলায় নাই। উঁকি দিয়া দেখিলাম একটি ঘরে, যাহার দ্বার রুদ্ধ করা হয় নাই, অথবা দিনের বেলায় রুদ্ধ দেখিয়াছিলাম, সেই ঘরে পূজার উপাচার সাজানো হইয়াছে, অন্নপ্রাশনের নিমিত্ত আসন পাতা হইয়াছে এবং একজন পুরোহিত মন্ত্রপাঠ করিতেছে । পুরোহিতটির শ্মশ্রু নাই, তবু মনে হইল পথে চিৎকারকারী পুরোহিতটির সহিত এনার মুখাবয়াবের যথেষ্ট মিল রহিয়াছে ।
    চোখ ওপড়ানো ব্যক্তিটি যেদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিল সেটি একটি উঠান, সেখানে নিমন্ত্রিত অতিথিগণকে খাওয়াইবার জন্য ভিয়েন বসানো হইয়াছে, থালায় থালায় অন্ন ব্যঞ্জন প্রভৃতি সাজানো, দেখিলাম হইহই করিয়া পঞ্চাশ-ষাটজন মানুষ, যাহাদের সহিত উৎসাহদানকারী খোল করতাল মৃদঙ্গ ডুগডুগি ঢোলক খঞ্জনিবাদকেরা ছিল, টাঙ্গি কাটারি দা শড়কি লাঠি অ্যাসিডের বোতল মশাল ইত্যাদি লইয়া দুইজন যুবকের পিছু ধাওয়া করিতেছে, তাহাদের একজন পাশের বাড়িতে পলাইবার প্রয়াস করিতে সেখান হইতে টানিয়া আনিয়া, দুইজন যুবককেই মাটিতে ফেলিয়া চাপিয়া ধরিল, এবং আমার সন্মুখেই দুইজনের গলায় কোপ মারিয়া ধড় হইতে মাথা পৃথক করিয়া দিল । স্পষ্ট অনুভব করিলাম আমার দেহে তাহাদের রক্ত ছিটকাইয়া আসিয়া লাগিল, মনে হইল বমন করিয়া ফেলিব । উঠানে আজানো থালা হইতে ভাত তুলিয়া সদ্যমৃত যুবকদিগের রক্ত তাহাতে মাখিয়া এক প্রৌঢ়াকে জোর করিয়া খাওয়াইবার চেষ্টা করিতে লাগিল আক্রমণকারীগণ । মহিলাটি যে বিধবা, তাঁহার পরিধেয় হইতে বুঝিতে পারিলাম, তিনি উন্মাদিনীর ন্যায় চিৎকার করিতেছিলেন, নিজেকে ছাড়াইয়া যুবকদ্বয়ের নিকটে যাইবার প্রয়াস করিতেছিলেন ; তাঁহার ঐ রুপ আচরণে তাঁহাকে যুবকদ্বয়ের মাতা বলিয়াই মনে হইল । একটি কিশোরী সিঁড়ি দিয়া নামিতে নামিতে বলিতে লাগিল, “এতো রক্ত কেন ? এতো রক্ত কেন ? এতো রক্ত কেন?”
    ঘর্মাক্ত কলেবরে খাটের উপর উঠিয়া বসিয়া বুঝিতে পারিলাম দুঃস্বপ্ন দেখিতেছিলাম, অথবা হয়তো ইহাই এই গৃহকে অভিশপ্ত করিয়া তুলিবার বিস্মৃত ঘটনাবলী, যাহা সেই অচেনা পুরোহিত, লাল শালুতে মোড়া শালিগ্রাম শিলা বুকে ঝুলাইয়া, সতর্ক করিয়া দুইবার বলিয়া গিয়াছেন “তফাত যাও, তফাত যাও, সব সত্য সব সত্য সব সত্য।” পুরোহিত মহাশয় ঘটনাবলীর কথা না জানিলে কেনই বা বার বার বলিবেন, “সব সত্য সব সত্য সব সত্য।” গবাক্ষ খোলা ছিল এবং বৃষ্টির ছাট আমার দেহের উপর পড়িবার ফলে আমি তাহাকে রক্তের ঝাপটা মনে করিয়াছিলাম । বৃষ্টিধারা ও ঝটিকার প্রবেশ রোধার্থ গবাক্ষের কপাট দুটি যোজিত করিলাম। আকাশে বারিধারার ভৈরব কল্লোল উথ্থিত হইয়াছে । নিজের অজ্ঞতায় নিজেই হাসিয়া উঠিলাম । প্রায়ান্ধকারে দেখিলাম বাদলা বাতাস ঘরে প্রবেশ করিয়া আমার আলোকচিত্রগুলিকে টেবিলের উপর হইতে উড়াইয়া মেঝেতে ফেলিয়া দিয়াছে । সেগুলি তুলিয়া একত্রিত করিয়া টেবিলের উপর ক্যামেরা চাপা দিয়া রাখিলাম । বৃষ্টির ছাটে কয়েকটি আলোকচিত্র ভিজিয়া গিয়াছিল।
    প্রদোষকালে ঝটিকাবৃষ্টি নিবারণ হইয়া গিয়াছিল ।
    জানি না স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন একত্রে কেমন করিয়া মস্তিষ্কে ক্রীড়া করে, কেমন করিয়াই বা বুঝিব তাহারা সত্য নহে, তাহারা অবাস্তব । রক্তমাংসের মনুষ্যই কি কেবল সত্যের অধিষ্ঠাতা ? দুঃস্বপ্নের অপচ্ছায়ারা নহে ? দুঃস্বপ্নকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা পাগলের যুক্তির ন্যা্য় সন্দেহজনক । ঘুমাইলে সুখস্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন মস্তিষ্কে আশ্রয় লইবে । সেকারণে মনুষ্য কি ঘুমাইবে না ? অনুমান করিলাম অন্ধকার অশান্ত ঘৃণায় নিমজ্জিত অভিশপ্ত খণ্ডহরটিই আমাকে দুঃস্বপ্নের চরিত্রগুলির সহিত সমঝোতা করিতে শিখাইতেছে, যেনবা অট্টালিকাটির গোপন কাহিনি মেলিয়া ধরিবার প্রয়াস করিতেছে। দুঃস্বপ্ন যেন একখানি আতঙ্কের কবিতা, যাহার প্রভাব সারা জীবন অন্তরজগতে সুপ্ত থাকিবে, এবং ক্বচিৎকখনও তাহার বিস্ফোরণের সুযোগ খুঁজিবে, যেমন আজ আপনাদের সন্মুখে মেলিয়া ধরিতেছি, নতুবা সদ্য পরিচিত দুইজন সহযাত্রীর নিকট কেনই বা অকস্মাৎ অভিজ্ঞতাখানি বাখান করিবার ধৃষ্টতা করিব ।
    সকালে, কুজ্ঝটিকার অন্ধকাররাশি হইতে দিঙমণ্ডল বিমুক্ত হইলে তত্ববধায়ক মহাশয়ের সশঙ্কচিত্ত আহ্বানে ঘুম ভাঙিবার পর রাত্রের দুঃস্বপ্নের ঘটনাবলী তাঁহাকে শোনাইলে, বারেক কথাবার্তা স্হগিত করিয়া তিনি ভয়কাতর কন্ঠস্বরে কহিলেন, “অদ্যই আপনার উচিত এই অট্টালিকা ছাড়িয়া কোনো হোটেলে রাত্রিবাস করিতে চলিয়া যাওয়া, নতুবা শ্বেতশ্মশ্রু পুরোহিতটির মতো আপনারও মস্তিষ্কবিকৃতির সম্ভাবনা আছে ।”
    পৃথিবীর এতো দেশ ভ্রমণ করিয়াছি, বহু অভিশপ্ত স্হানের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়াছি, দুর্গম স্হানে রাত্রিবাস করিয়াছি, সিংহের গর্জন শুনিয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছি, ইত্যাদি গল্প তত্ববধায়ক মহাশয়কে শোনাইবার পর তিনি কহিলেন, ‘যা ভালো বোঝেন তাই করুন, তবে অন্যত্র রাত্রিবাসই মঙ্গলকর’ । তাঁহাকে আমার মনের কথা বলিলাম না যে, এই গৃহের আলোকচিত্রাদির প্রতি আগ্রহ আমাকে রাত্রিবেলায় এক ভিন্ন জগতে লইয়া যায় এবং আমি সেই বর্ণনাতীত অদৃশ্য মনুষ্যগুলির নিয়তির প্রতি মাদকসেবকের ন্যায় আকৃষ্ট হইয়া পড়িয়াছি ।
    তত্ববধায়ক মহাশয় চলিয়া যাইবার পর টেবিল হইতে কল্যের আলোকচিত্রগুলি তুলিয়া প্রবন্ধের জন্য নির্বাচন করিব মনস্হ করিয়া এক এক করিয়া যাচাই করিতেছি, দেখিলাম তিনটি আলোকচিত্র কল্য দিনের বেলায় যেমন দেখিয়াছিলাম, তেমন নাই, আবছা হইয়া গিয়াছে । মনে হইল উঠানের কোণের লতাপাতাকীর্ণ প্রায়ান্ধকারের ছবিগুলিতে ধোঁয়ার ন্যায় দুটি যুবকের রক্তাক্ত ধড় দেখা যাইতেছে, তাহাদের উপর টাঙ্গি কুড়াল ইত্যাদি স্বয়ং বর্ষিত হইতেছে, কেহই সেগুলি ধরিয়া নাই, যুবক দুইটির দেহে যেন পেটরল ঢালিয়া জ্বালাইয়া দেয়া হইয়াছে। হয়তো কল্য আলোকচিত্রগুলি ঠিকমতো অনুধাবন করি নাই, আরেকবার আলোকচিত্রের বিপণীতে গিয়া মুদ্রণের জন্য দিতে হইবে ।
    পুনরায় মুদ্রণের জন্য আলোকচিত্রের বিপণীতে দিলে দোকানি যুবকটি কহিল, মুদ্রণ তো নিয়মমতোই করিয়াছিলাম, আপনি নিজেও তা যাচাই করিয়া লইয়াছিলেন, তথাপি এইরূপ বিকৃতি কেন ঘটিল জানি না । ওই গৃহ অভিশপ্ত, হয়তো প্রকৃত ঘটনা আপনার আলোকচিত্রে প্রেতের ন্যায় প্রবেশ করিয়া গিয়াছে, প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে কেহই ওয়াকিবহাল নহেন । এইরূপ অভিজ্ঞতা ইহার পূর্বে এক সাংবাদিকের হইয়াছিল, সে আতঙ্কে উৎকন্ঠায় বাধ্য হইয়া সংবাদপত্রের চাকুরি ত্যাগ করিয়া টিভিতে কুতর্ক-সঞ্চালকের কর্ম করিতেছে, আয়ও ভালো হইতেছে । দোকানিকে বলিলাম, উচিত কথাই বলিয়াছ, চক্ষে ঠুলি বাঁধিয়া হস্তিকে বর্ণনা করা কঠিন, একমাত্র হস্তিই জানে তাহার চারটি পা, একটি শুঁড় এবং দুইটি দীর্ঘ দন্ত রহিয়াছে । দেখি, যদি সম্পূর্ণ হস্তিটির আলোকচিত্র তুলিতে পারি ।
    আলোকচিত্রগুলিতে গোলমাল ঘটিতে দেখিয়া আমি নূতন যে লেন্স ইউরোপ হইতে আনিয়াছিলাম তাহা ক্যামেরায় পরাইয়া একের পর এক বহু আলোকচিত্র লইলাম । ইষ্টক দ্বারা সদর হইতে প্রবেশ নিষিদ্ধ হইলেও পাঁচিলের ভাঙনের ভিতর দিয়া প্রবেশ করিয়া প্রতিটি ঘরের অন্ধকারের ও আলোর খেলার, সিঁড়ির ও সিঁড়ির উপরের ঘরের, দুটি পাশাপাশি চৌবাচ্চার, একটি জলকূপের এবং উঠানময় যে আগাছা সবুজ-হলুদ পত্রাবলী মেলিয়া ছড়াইয়া পড়িয়াছে, প্রতিটি বস্তুর আলোকচিত্র লইয়া নিশ্চিত হইবার প্রয়াস করিলাম যাহাতে পুনরায় গোলমাল হইবার অবকাশ আর না থাকে ।
    আলোকচিত্রের বিপণীতে গিয়া মুদ্রণের জন্য নির্দেশ দিয়া আসিলাম ।
    তত্ববধায়ক মহাশয় টিফিন ক্যারিয়ারে আমার সন্ধ্যার খাবার একটি কিশোরের হাতে পাঠাইয়া দিয়াছিলেন । সে অবাক দৃষ্টি মেলিয়া প্রশ্ন করিল, ‘আপনি এই ঘরে থাকেন ?’ আমি মস্তক নাড়াইয়া হ্যাঁ বলিবার পর কিশোরটি অভিভাবকের ন্যায় বলিল, ‘এখানে থাকিবেন না, এই গৃহে একাধিক ভুত-প্রেত আছে, পুরোহিত মহাশয়কে দেখিয়াছেন তো ? পাগলের ন্যায় “তফাত যাও তফাত যাও, সব সত্য সব সত্য সব সত্য” চিৎকার করিতে করিতে পদযাত্রা করেন, উনি অন্নপ্রাশনের দিন ছিলেন, সবকিছু নিজ চক্ষে দর্শন করিয়া পাগল হইয়া গিয়াছেন । আপনিও এই গৃহে থাকিলে পাগল হইয়া যাইবেন ।’
    বালকটিকে মাথায় হাত বুলাইয়া একটি মুদ্রা দিয়া কহিলাম, ‘আমি যৎসামান্য পাগলই, আর পাগল হইবার সম্ভাবনা নাই ।’ সে আমার প্রতি কৌতূহলমিশ্রিত দৃষ্টি মেলিয়া পিছন ফিরিয়া বার বার আমাকে নিরীক্ষণ করিতে করিতে দ্রুত পলাইয়া গেল, যেন আমিও এই খণ্ডহরের অপচ্ছায়া-সমাবেশের সদস্য ।
    জল পান করিয়া পুনরায় ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম । মনে হইল চতুর্দিক হইতে অট্টালিকাটি লক্ষ্য করিয়া ইষ্টকবৃষ্টি হইতেছে । ইষ্টকবৃষ্টির পাশাপাশি আগুনের মশাল ও তীরে আগুন ধরাইয়া গৃহটির ভিতর নিক্ষেপ করা হইতে লাগিল । উঠিয়া বসিলাম এবং পুনরায় দুঃস্বপ্নে আক্রান্ত হইবার কারণে লজ্জিত হইলাম । কী আর করিব, স্বপ্নই হউক অথবা দুঃস্বপ্ন, তাহাদের উপর তো কোনো নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নহে, তাহারা যুক্তি তর্কের তোয়াক্কা করে না, যেনবা নানা প্রকার ব্যথা-যন্ত্রণার আমোদ-আহ্লাদে অভিষিক্ত করিবার জন্যই চুপিসাড়ে মস্তিষ্কে আশ্রয় লইয়াছে।
    সুটকেস হইতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিত গ্রন্হ লইয়া কেরোসিনের আলোয় তাঁহার ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পটি পড়িতে পড়িতে ঘুম পাইতে লাগিল । গ্রন্হটি বিছানার শিয়রে রাখিয়া দিলাম ।
    নিশ্চিন্ত হইবার নিমিত্ত ঘুমের একটি ট্যাবলেট খাইয়া শুইয়া পড়িলাম । বেলায় উঠিলেও চলিবে । বহু আলোকচিত্র ক্যামেরাবন্দি করিয়াছি ।

    বেশ ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম, মনে হইল কে একজন আমার কানের কাছে মুখ নামাইয়া আনিয়া নাম ধরিয়া ডাকিতেছে, সে পুরুষ না নারী অনুমান করিতে অক্ষম রহিলাম । আমি জাগিয়া উঠিতেই সে কোনো কথা না বলিয়া অতি সাবধানে তাহার অনুসরণ করিতে আদেশ দিল । আমি অত্যন্ত চুপি চুপি উঠিলাম । যদিও সেই অট্টালিকার প্রকাণ্ডশূন্যতাময়তায়, নিদ্রিতধ্বনি এবং এবং সজাগ প্রতিধ্বনিময় ভগ্নপ্রায় বাড়িটিতে আমি ছাড়া আর জনপ্রাণীও ছিল না, তথাপি পদে পদে ভয় হইতে লাগিল, পাছে কোনো মৃত মনুষ্য প্রাণ পাইয়া উঠিয়া দাঁড়ায়, আক্রমণকারীগণ টাঙ্গি তীর-ধনুক লাঠি দা কুড়াল প্রজ্বলিত মশাল লইয়া আমার দিকে ছুটিয়া আসে ।
    সে রাত্রে নিঃশব্দপদবিক্ষেপে সংযতনিঃশ্বাসে সেই অদৃশ্য আহ্বানছায়াকে অনুসরণ করিয়া আমি যে কোথা দিয়া কোথায় যাইতেছিলাম, আজ তাহা স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারি না । কত সংকীর্ণ অন্ধকার পথ, কত দীর্ঘ বারান্দা, কত গম্ভীর নিস্তব্ধ সুবৃহৎ সভাগৃহ, কত রুদ্ধবায়ু ক্ষুদ্র গোপন কক্ষ পার হইয়া যাইতে লাগিলাম তাহার ঠিকানা নেই ।
    আমার অদৃশ্য মায়ার ছায়াটিকে যদিও চক্ষে দেখিতে পাই নাই, তথাপি তাহার মূর্তি আমার মনের অগোচর ছিল না । আমার মনে হইল, আরব্য উপন্যাসের একাধিক সহস্র রজনীর একটি রজনী আজ শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসলোক হইতে উড়িয়া আসিয়াছে । আমি যেন অন্ধকার নিশীথে মহাকবি বাল্মীকির রামায়ণস্হ রাজা দশরথের সুপ্তিময় অযোধ্যার রাম-লক্ষ্মণ-সীতাহীন নির্বাপিতদীপ সংকীর্ণ পথে সংকটসংকুল পঞ্চবটীর বনবাসে যাত্রা করিয়াছি ।
    অবশেষে আমার মায়াপথিক একটি ঘননীল পর্দার সম্মুখে সহসা থমকিয়া দাঁড়াইয়া যেন নিম্নে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া দেখাইল । নিম্নে কিছুই ছিল না, কিন্তু ভয়ে আমার বক্ষের রক্ত স্তম্ভিত হইয়া গেল । আমি অনুভব করিলাম, সেই পর্দার সম্মুখে ভূমিতলে সাতজন উলঙ্গ খোজা কোলের উপর খোলা ভোজালি ও চাপাতি লইয়া দুই পা ছড়াইয়া দিয়া বসিয়া ঢুলিতেছে, স্বপ্নে যে জনগণ গৃহটিতে অগ্নিবাণ নিক্ষেপ করিতেছিল, সেই ভিড়ে ইহাদেরও দেখিয়াছিলাম । বহুদেশ ঘুরিয়াছি কিন্তু ইতোপূর্বে খোজা দেখি নাই, জানি না সম্রাট অথবা শাসক একজন পুরুষকে কেমন করিয়া খোজা করিয়া তোলেন, তাহা কি খাসি করিবার পদ্ধতিতেই করা হইয়া থাকে !
    মায়াপথিক লঘুগতিতে একজনের দুই পা ডিঙাইয়া পর্দার এক প্রান্তদেশ তুলিয়া ধরিল ।
    ভিতর হইতে একটি ঘরের কিয়দংশ দেখা গেল । তক্তের উপরে কে বসিয়া আছে দেখা গেল না --- কেবল রক্তপাড় ধুতির নিম্নভাগে কালো পামশু-পরা দুইটি পা ফুটরেস্টের উপর অলসভাবে স্হাপিত রহিয়াছে দেখিতে পাইলাম । মেজের একপার্শ্বে একটি বরফ-উপচানো মদিরার কাচপাত্রে শ্যাম্পেনের বোতল অতিথির জন্য অপেক্ষা করিয়া আছে । ঘরের ভিতর হইতে অত্যন্ত পুরাতন নথিসমূহ ও কাগজপত্রের ধুলাধুসরিত গন্ধ আসিয়া আমাকে বিহ্বল করিয়া দিল । দেখিলাম সন্মুখবর্তী একটি বিশাল ঘরে সারি-সারি টেবিলের উপর নথিপত্রের পর্বত এবং টেবিলে মাথা রাখিয়া যুবক-যুবতীরা ঘুমাইতেছে ।
    আমি কম্পিত বক্ষে লুঙ্গি পরিহিত জনৈক খোজার প্রসারিত পদদ্বয় যেমন লঙ্ঘন করিতে গেলাম, অমনি সে চমকিয়া জাগিয়া উঠিল --- তাহার কোলের উপর হইতে লোহার চাপাতি পাথরের মেজেয় শব্দ করিয়া পড়িয়া গেল । খোজাটির মুখ দেখিয়া মনে হইল আমার কোনো একটি আলোকচিত্রে ইহার মুখ আবছা ফুটিয়া উঠিয়াছিল এবং আমি তাহাকে আলোকচিত্র মুদ্রণের ভুল অনুমান করিয়াছিলাম । চাপাতি পড়িবার শব্দে অন্যান্য খোজাগণ ও যে যুবক-যুবতীগণ টেবিলে মাথা রাখিয়া ঘুমাইতে ছিল তাহারা সকলেই সুপ্তাবস্হা হইতে ফিরিয়া আসিল। সেই বিশাল ঘরখানি হইতে গোলাপি রঙের একাধিক শূকর, যেগুলিকে চিনদেশে দেখিয়াছিলাম এবং কাষ্ঠের আগুনের ধোঁয়ায় সিদ্ধ মাংস রসনা তৃপ্ত করিয়াছিল, তাহারা দল বাঁধিয়া একের পিছনে আরেক ওয়িংক ওয়িংক ওয়িংক চিৎকার করিতে করিতে পলাইতে লাগিল ।
    সহসা একটা বিকট চিৎকার শুনিয়া চমকিয়া দেখিলাম, আমার সেই ক্যাম্পখাটের উপরে ঘর্মাক্ত কলেবরে বসিয়া আছি, ভোরের আলোয় কৃষ্ণপক্ষের খণ্ডচাঁদ জাগরণক্লিষ্ট রোগির মতো পাণ্ডুবর্ণ হইয়া গেছে -- এবং আমাদের পাগলা পুরোহিত গলায় লাল রঙের শালুতে শালিগ্রাম শিলা বাঁধিয়া প্রাত্যহিক প্রথা অনুসারে প্রত্যুষের জনশূন্য পথে “তফাত যাও তফাত যাও, সব সত্য সব সত্য সব সত্য” বলিয়া চিৎকার করিতে করিতে চলিয়াছে
    এই রূপে আমার আরব্য উপন্যাসের এক রাত্রি অকস্মাৎ শেষ হইল --- কিন্তু এখনো এক সহস্র রজনী বাকি আছে ।
    আমার দিনের সহিত রাত্রের ভারি একটা বিরোধ বাধিয়া গেল । দিনের বেলায় শ্রান্তক্লান্তদেহে আলোকচিত্রগুলি সাজাইয়া প্রবন্ধটির খসড়া লিখিবার প্রয়াসে নাজেহাল হইতাম, শূন্যস্বপ্নময়ী মায়াবিনী রাত্রিকে অভিসম্পাত করিতে থাকিতাম, আবার সন্ধ্যার পরে আমার দিনের বেলাকার কর্মবদ্ধ অস্তিত্বকে অত্যন্ত তুচ্ছ মিথ্যা এবং হাস্যকর বলিয়া বোধ হইত ।
    সন্ধ্যার পরে আমি একটা মাদকের ধুম্রময় জালের মধ্যে মৎস্যের ন্যায় বিহ্বলভাবে জড়াইয়া পড়িতাম । অর্ধশতাধিক বৎসর পূর্বেকার কোনো-এক অলিখিত ইতিহসের অন্তর্গত আর-একজন অপূর্ব ব্যক্তি হইয়া উঠিতাম, তখন আর শার্ট এবং গ্যালিসবাঁধা প্যাণ্টালুন আমাকে মানাইত না । শীতল কুয়োর জলে স্নান সারিয়া. লুঙ্গি পরিয়া, দেহে সুগন্ধি পাউডার মাখিয়া, যেন রাত্রে কোনো এক অপূর্ব ঘটনাসম্মিলনের জন্য পরমাগ্রহে প্রস্তুত হইয়া থাকিতাম ।
    তাহার পর অন্ধকার যতই ঘনীভূত হইত ততই কী-যে এক অদ্ভুত ব্যাপার ঘটিতে থাকিত তাহা আমি বর্ণনা করিতে পারি না । ঠিক যেন একটা চমৎকার গল্পের কতকগুলি ছিন্ন অংশ বসন্তের আকস্মিক বাতাসে এই খণ্ডহরপ্রতিম অট্টালিকার বিচিত্র ঘরগুলির মধ্যে উড়িয়া বেড়াইত । খানিকটা দূর পর্যন্ত যাওয়া যাইত তাহার পরে আর শেষ দেখা যাইত না । আমিও সেই ঘূর্ণমান বিচ্ছিন্ন অংশগুলির অনুসরণ করিয়া সমস্ত রাত্রি ঘরে ঘরে ঘুরিয়া বেড়াইতাম, যেগুলির কপাট দিনের বেলায় বন্ধ থাকিত ।
    এই খণ্ডস্বপ্নের আবর্তের মধ্যে -- এই ক্বচিৎ ধুপ-ধুনার গন্ধ, ক্বচিৎ অগ্নিময় তীর বর্ষণ ও অগ্নিকাণ্ডের শব্দ, ক্বচিৎ বন্যলতাপাতামিশ্র বায়ুর হিল্লোলের মধ্যে একাধিক ধাবমান খোজার আক্রমণাত্মক চিৎকার ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎশিখার মতো চকিতে দেখিতে পাইতাম । তাহাদেরই রক্তবর্ণ পোশাক এবং হস্তে অস্ত্রশস্ত্র লইয়া উগ্রক্ষত্রিয় অট্টালিকাটিকে চতুর্দিক হইতে ঘিরিয়া ফেলিয়া “মেরে ফ্যাল, কেটে ফ্যাল, আগুন লাগিয়ে দে, চোখ উপড়ে নে, পিটিয়ে থেঁতো করে দে” ইত্যাদি আক্রোশের উক্তিতে অন্ধকার মথিত হইয়া উঠিত ।
    নৃশংস ঘটনাবলী আমাকে পাগল করিয়া দিয়াছিল । আমি প্রতি রাত্রে নিদ্রার রসাতলরাজ্যে স্বপ্নের জটিলপথসংকুল অট্টালিকাটির মধ্যে গলিতে গলিতে কক্ষে কক্ষে ভ্রমণ করিয়া বেড়াইয়াছি ।
    এক- এক দিন সন্ধ্যার সময় আয়নার দুই দিকে দুই মোমবাতি জ্বালাইয়া যত্নপূর্বক সাজ করিতেছি এমন সময় হঠাৎ দেখিতে পাইতাম, আয়নায় আমার প্রতিবিম্বের পার্শ্বে ক্ষণিকের জন্য অস্ত্রধারী খোজাগণের ছায়া আসিয়া পড়িল, তাহাদের পশ্চাতে একদল ছায়াশরীর ডুগডুগি খোল-করতাল ঢোলক ভেঁপু ইত্যাদি বাজাইতেছে --- পলকের মধ্যে চাপাতি তুলিয়া আমার গর্দান লইবার জন্য তাহারা প্রস্তুত হইল এবং আমি তাহাদের প্রতিরোধ করিবার প্রয়াস করিতেই তাহারা চিন দেশের গোলাপি শূকরে পরিবর্তিত হইয়া বাতাসে মিলাইয়া গেল, হাজার হইলেও তাহারা অতীতের সম্রাট অথবা শাসকের খোজাবাহিনী, বর্তমানযুগের মনুষ্যের সহিত দ্বন্দ্বযুদ্ধ করা তাহাদের পক্ষে সম্ভব নহে।
    একদিন অপরাহ্ণে আমি তত্ববধায়ক মহাশয়ের সাইকেল লইয়া বাহির হইব সংকল্প করিলাম --- কে আমাকে নিষেধ করিতে লাগিল জানি না -- কিন্তু সেদিন নিষেধ মানিলাম না । একটা কাষ্ঠদণ্ডে আমার শার্ট, গ্যালিসদেয়া ফুলপ্যাণ্ট দুলিতেছিল, পাড়িয়া লইয়া পরিবার উপক্রম করিতেছি, এমন সময় দামোদর নদীর বালি এবং নিকটবর্তী অঞ্চলের শুষ্ক পল্লবরাশির ধ্বজা তুলিয়া হঠাৎ একটা প্রবল ঘূর্ণাবাতাস আমার সেই শার্ট এবং গ্যালিস দেয়া ফুলপ্যাণ্ট ঘুরাইতে ঘুরাইতে লইয়া চলিল এবং একটা অত্যন্ত গম্ভীর আর্তনাদ সেই হাওয়ার সঙ্গে ঘুরিতে ঘুরিতে আতঙ্কের সমস্ত পর্দায় পর্দায় আঘাত করিতে করিতে উচ্চ হইতে উচ্চতর সপ্তকে উঠিয়া সূর্যাস্তলোকের কাছে গিয়া মিলাইয়া গেল ।
    সেদিন আর সাইকেল সঞ্চালন করিয়া শরিফাবাদের পথে ভ্রমণে যাওয়া হইল না এবং তাহার পরদিন হইতে সেই শার্ট এবং গ্যালিসদেয়া ফুলপ্যাণ্ট পরা একেবারে ছাড়িয়া দিয়াছি ।
    আবার সেইদিন অর্ধরাত্রে বিছানার মধ্যে উঠিয়া বসিয়া শুনিতে পাইলাম কাহারা যেন গুমরিয়া গুমরিয়া, বুক ফাটিয়া ফাটিয়া কাঁদিতেছে --- যেন আমার খাটের নীচে, মেঝের নীচে এই খণ্ডহরের সিমেন্টভিত্তির তলবর্তী একটা আর্দ্র অন্ধকার উদ্যানের ভিতর হইতে কাঁদিয়া কাঁদিয়া বলিতেছে, ‘তুমি আমাদের সত্য ঘটনাবলী পৃথিবীর জনগণের সন্মুখে স্পষ্টভাবে তুলিয়া ধরো --- কঠিন মায়া, গভীর নিদ্রা, নিষ্ফল স্বপ্নের সমস্ত দ্বার ভাঙিয়া ফেলিয়া, তুমি আমাদিগকে রাজনীতির পঙ্কিল আবর্ত হইতে তুলিয়া, বনের ভিতর দিয়া, পাহাড়ের উপর দিয়া, নদী পার হইয়া তোমাদের সূর্যালোকিত বিশ্বের দরবারে আমাদিগকে লইয়া যাও । আমরা বিস্মৃতির অতলে চাপা পড়িয়া আছি।’

    আমি কে ! আমি কেমন করিয়া উদ্ধার করিব ! আমি এই ঘূর্ণমান পরিবর্তমান স্বপপ্নপ্রবাহের মধ্য হইতে কোন মজ্জমান বিস্মৃত মনুষ্যদিগকে তীরে টানিয়া তুলিব । তোমরা কবে ছিলে, কোথায় ছিলে হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা কোন অগ্নিকুণ্ডের ভিতর নিক্ষিপ্ত হইবার পর ভস্মে রূপান্তরিত হইয়াছিলে ? তোমরা কোন মাতার কোলে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলে । তোমাদিগকে কোন বেদুইন দস্যু, বনলতা হইতে পুষ্পকোরকের মতো মাতৃক্রোড় হইতে ছিন্ন করিয়া, জগতসংসার হইতে নিশ্চিহ্ণ করিয়া দিয়াছে ?
    সেখানে সে কী ইতিহাস । সেই খোজাবাহিনীর চিৎকার, বাদ্যকরদিগের শ্রুতিকটূ বাজনা, এবং শাসকের সুবর্ণমদিরার মধ্যে মধ্যে ছুরির ঝলক, বিষের জ্বালা, চাপাতির উপর্যুপরি আঘাত, অন্তহীন গোলাপি শূকরদের সারি । কী অসীম বিস্মৃতি, কী অনন্ত কারাগার । শাসক বাদশার রক্তপাড় ধুতি ও পামশুর কাছে লুটাইতেছে তোমাদিগের ইতিহাস; বাহিরের দ্বারের কাছে যমদূতের প্রতিনিধিগণ ভোল পালটাইয়া দেবদূতের মতো সাজ করিয়া, খোলা ভোজালি ও চাপাতি হাতে দাঁড়াইয়া । তাহার পরে সেই রক্তকলুষিত ঈর্ষাফেনিল ষড়যন্ত্রসংকুল ভীষণোজ্বল ঐশ্বর্যপ্রবাহে ভাসমান হইয়া, তোমরা কোন নিষ্ঠুর মৃত্যুর মধ্যে অবতীর্ণ অথবা কোন নিষ্ঠুরতর মহিমাতটে উৎক্ষিপ্ত হইয়াছিলে !
    এমন সময়ে, দেখিতে পাইলাম, সেই পাগলা পুরোহিত, গলায় লাল শালুতে শালিগ্রাম শিলা বাঁধিয়া বুকের মাঝে ঝোলাইয়া, চিৎকার করিয়া উঠিলেন, “তফাত যাও, তফাত যাও , সব সত্য সব সত্য সব সত্য।” চাহিয়া দেখিলাম, সকাল হইয়াছে ; তত্ববধায়ক মহাশয় ডাকের চিঠিপত্র লইয়া আমার হাতে দিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, আজ কিরূপ ভোজন প্রস্তুত করিতে হইবে ।
    আমি কহিলাম, না, আর এ অট্টালিকার খণ্ডহরে থাকা হয় না ।
    সেই দিনই আমার জিনিসপত্র তুলিয়া হোটেলে গিয়া উঠিলাম, বৃদ্ধ শ্যালকের গৃহে আশ্রয় লইলে ইয়ার্কি করিত । হোটেলের রিসেপশানিস্ট যুবতীটি আমাকে দেখিয়া ঈষৎ হাসিল । আমি তাহার হাসিতে বিরক্ত হইয়া কোনো উত্তর না করিয়া লিফ্টে চাপিয়া নির্দিষ্ট ঘরে চলিয়া গেলাম ।
    যত বিকাল হইয়া আসিতে লাগিল ততই অন্যমনস্ক হইতে লাগিলাম -- মনে হইতে লাগিল, এখনই কোথায় যাইবার আছে --- আলোকচিত্রের কাজটা নিতান্ত অনাবশ্যক মনে হইল, ইন্টারন্যাশানাল জিওগ্রাফিকের দায়িত্বও আমার কাছে বেশি-কিছু বোধ হইল না --- যাহা-কিছু বর্তমান, যাহা-কিছু আমার চারিদিকে চলিতেছে ফিরিতেছে খাটিতেছে খাইতেছে সমস্তই আমার কাছে অত্যন্ত দীন অর্থহীন অকিঞ্চিৎকর বলিয়া বোধ হইল ।
    আমি লিফ্ট দিয়া নামিয়া একটি রিকশ ভাড়া করিয়া রিকশঅলাকে কোনো নির্দেশ ব্যতিরেকে সিটে বসিলাম । দেখিলাম, রিকশঅলা ঠিক গোধূলিমুহূর্তে আপনিই সেই ভগ্নপ্রায় খণ্ডহরের ইষ্টকদ্বারা বন্ধ দ্বারের কাছে গিয়া থামিল । ভাড়া মেটাইয়া দ্রুতপদে নিজের পূর্বের ঘরে প্রবেশ করিলাম।
    আজ সমস্ত নিস্তব্ধ । অন্ধকার ঘরগুলি যেন রাগ করিয়া মুখ ভার করিয়া আছে । অনুতাপে আমার হৃদয় উদবেলিত হইয়া উঠিতে লাগিল, কিন্তু কাহাকে জানাইব, কাহার নিকট মার্জনা চাহিব খুঁজিয়া পাইলাম না । আমি শূন্য মনে অন্ধকার ঘরে অবহেলিত উদ্যানের লতাপাতার জঙ্গলে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলাম । ইচ্ছা করিতে লাগিল এককখানা সঙ্গীতযন্ত্র হাতে লইয়া অদৃশ্য ছায়াশরীরদের উদ্দেশ করিয়া গান গাহি ; বলি, ‘হে প্রেতাত্মাগণ, যে আলোকচিত্রী তোমাদের কাহিনি উদ্ঘাটন করিতে না পারিয়া পলাইবার চেষ্টা করিয়াছিল, সে তোমাদিগের নিকট ক্ষমা প্রার্থনার জন্য আসিয়াছে । এবার তাহাকে মার্জনা করো, তাহার দুই পক্ষ দগ্ধ করিয়া দাও, তাহাকে ভস্মসাৎ করিয়া ফেলো।’
    হঠাৎ উপর হইতে আমার কপালে দুই ফোঁটা অশ্রুজল পড়িল । সেদিন শরিফাবাদের সন্ধ্যাকাশে ঘনঘোর মেঘ করিয়া আসিয়াছিল । দামোদরের মসীবর্ণ জল একটি ভীষণ প্রতীক্ষায় স্হির হইয়াছিল । জলস্হল আকাশ সহসা শিহরিয়া উঠিল ; এবং অকস্মাৎ একটা বিদ্যদ্দন্তবিকশিত ঝড় শৃঙ্খলছিন্ন উন্মাদের মতো শরিফাবাদের ভিতর দিয়া আর্ত চিৎকার করিতে করিতে ছুটিয়া আসিল । খণ্ডহরের শূন্য ঘরগুলো সমস্ত ভগ্নদ্বার আছড়াইয়া তীব্র বেদনায় হু হু করিয়া কাঁদিতে লাগিল ।
    আজ এখানে আলো জ্বালাইবার কেহ ছিল না । সেই মেঘাচ্ছন্ন অমাবস্যার রাত্রে খণ্ডহরের ভিতরকার নিকষকৃষ্ণ অন্ধকারের মধ্যে আমি স্পষ্ট অনুভব করিতে লাগিলাম -- তিনচারিজন মানুষ উঠানে উপুড় হইয়া পড়িয়া আছে এবং একজন প্রৌঢ়া দুই দৃঢ়বদ্ধমুষ্টিতে আপনার আলুলায়িত কেশজাল টানিয়া ছিঁড়িতেছে, তাহার গৌরবর্ণ ললাট দিয়া রক্ত ফাটিয়া পড়িতেছে, কখনো সে শুষ্ক তীব্র অট্টহাস্যে হা-হা করিয়া হাসিয়া উঠিতেছে, কখনো ফুলিয়া ফুলিয়া ফাটিয়া ফাটিয়া কাঁদিতেছে । মুক্ত বাতায়ন দিয়া বাতাস গর্জন করিয়া আসিতেছে এবং মুষলধারে বৃষ্টি আসিয়া তাহার সর্বাঙ্গ অভিষিক্ত করিয়া দিতেছে ।
    সমস্ত রাত্রি ঝড়ও থামে না, ক্রন্দনও থামে না । আমি নিষ্ফল পরিতাপে গৃহের অন্ধকারে ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিলাম । কেহ কোথাও নাই ; কাহাকে সান্ত্বনা করিব । এই প্রচণ্ড অভিমান কাহার । এই অশান্ত আক্ষেপ কোথা হইতে উথ্থিত হইতেছে ।
    শুনিতে পাইলাম, পুরোহিত চিৎকার করিয়া উঠিল, “তফাত যাও, তফাত যাও । সব সত্য সব সত্য সব সত্য ।”
    দেখিলাম ভোর হইয়াছে এবং পুরোহিত মহাশয় এই দুর্যোগের দিনেও গলায় লাল শালুতে শালিগ্রাম শিলা ঝোলাইয়া যথানিয়মে খণ্ডহরের সন্মুখে দাঁড়াইয়া তাহার অভ্যস্ত চিৎকার করিতেছেন । হঠাৎ আমার মনে হইল, হয়তো ওই পুরোহিতও আমার মতো এক সময় এই প্রাসাদে বাস করিয়াছিলেন, এখন পাগল হইয়া বাহির হইয়াও এই খণ্ডহরের বিস্মৃত ইতিহাসের মায়াজালে আকৃষ্ট হইয়া প্রত্যহ প্রত্যুষে স্মৃতি জাগরিত করিতে আসেন ।
    আমি তৎক্ষণাৎ সেই বৃষ্টিতে পুরোহিতের নিকট ছুটিয়া গিয়া তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “পণ্ডিত মহাশয় , কোন ঘটনাকে আপনি প্রতিদিন সত্য বলিয়া ঘোষণা করিয়া চলিয়া যান ?”
    তিনি আমার কথায় কোনো উত্তর না করিয়া আমাকে ঠিলিয়া ফেলিয়া অজগরের কবলের চতুর্দিকে ঘুর্ণমান মোহাবিষ্ট পক্ষীর ন্যায় চিৎকার করিতে লাগিলেন । যেন প্রাণপণে নিজেকে সতর্ক করিবার জন্য বারংবার বলিতে লাগিললেন, “তফাত যাও, তফাত যাও, সব সত্য সব সত্য সব সত্য ।”
    আমি সেই ঝড়জলের মধ্যে পাগলের মতো শ্যালকের গৃহে গিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “ইহার অর্থ কী আমায় খুলিয়া বলো।”
    শ্যালক যাহা কহিল তাহার মর্মার্থ এই : একসময় শরিফাবাদের ঐ অট্টালিকায় ফুলে-ফলে ভরা উগ্রক্ষত্রিয়দের বৈভবশালী পরিবার বাস করিত । তাহাদের আত্মগর্বী বৈভব ও রাজনৈতিক প্রতিপত্তি দেখিয়া বহু মানুষ বিদ্বেষ ও হিংসায় আলোড়িত হইত --- সেই সকল চিত্তদাহে, সেই সকল ক্রোধোন্মত্ত জনগণের ঈর্ষায় এই অট্টালিকার প্রত্যেক নোনালাগা ইষ্টক ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত হইয়া আছে, সজীব মানুষ পাইলে তাহাকে বিস্মরিত স্মৃতিতে মুড়িয়া ফেলিতে চায় । যাহারা ঘটনার দিন ওই খণ্ডহরে ছিল , তাহাদের মধ্যে কেবল পুরোহিত মহাশয় পাগল হইয়া বাহির হইয়া আসিয়াছেন, এ পর্যন্ত আর কেহ তাহার গ্রাস এড়াইতে পারে নাই । রাত্রির পর রাত্রি, শীতল উদাসীনতায় আচ্ছন্ন গৃহনিবাসীগণ পাতালের ভুতগ্রস্ত দ্বারগুলি খুলিয়া, তাহাদের অপূরণীয় শোকে আক্রান্ত চক্ষু হইতে অগ্নির অশ্রুবর্ষণ করে, প্রতিশোধস্পৃহার উন্মাদ নৃত্যে অবর্ণনীয় অপচ্ছায়াদের সহিত রহস্যময় বার্তালাপ করে, অপরাধীগণ নিজদিগের আত্মায় কলঙ্ক ও শিরায় বরফপ্রবাহ লইয়া অচেনা ভয়ে মুখহীন দেহ লইয়া পলাইয়া বেড়ায় ।
    আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “আমার বিস্মৃতির কি কোনো পথ নাই ।”
    শ্যালক কহিল, “একটিমাত্র উপায় আছে, তাহা অত্যন্ত দুরূহ । তাহা তোমাকে বলিতেছি --- কিন্তু তৎপূর্বে এতদ্দেশের জনৈক রক্তপাড় সম্রাটের পুরাতন ইতিহাস বলা আবশ্যক । তাঁহার স্কন্ধের উপর মস্তক ছিল না বলিয়া কিংবদন্তি প্রচলিত । তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া রাত্রিবেলায় কঙ্কালেরা নৃত্য করিত এবং উর্দ্ধমুখ শৃগালেরা অমাবস্যার অন্ধকারে ক্রন্দন করিত । তেমন আশ্চর্য এবং তেমন সন্দেহজনক ও শাসন ব্যবস্হায় সম্পূর্ণ উদাসীন মনুষ্যের আয়েশি জীবনের ঘটনা সংসারে আর কখনো কোথাও ঘটে নাই । ইতিহাসে তাঁহাকে একপ্রকার ভ্যামপায়ার হিসাবে চিহ্ণিত করা হইয়াছে”

    এমন সময়ে বিমানবন্দরে ঘোষণা হইল দমদমগামী বিমান আসিতেছে , যাত্রীগণ সিকিউরিটি চেক করাইয়া লউন । এত শীঘ্র ? একজন চিনা বৃদ্ধ ইলেকট্রনিক বোর্ডে বিমানের গন্তব্য ও সময় পড়িবার চেষ্টা করিতেছিল, আমার সহযাত্রী বন্ধুটিকে দেখিয়াই ‘নি হাও’ বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল এবং জড়াইয়া ধরিল । আমরা সিকিউরিটি চেকের জন্য নির্দিষ্ট দ্বারের দিকে অগ্রসর হইলাম । কৃষ্ণত্বক বাবুটি যে কে, খবর পাইলাম না, গল্পেরও শেষ শোনা হইল না । নিজের নাম বলিতেছিল মলয় রায়চৌধুরী, যেন তিনি জাদুকর পি সি সরকার, জগতসংসারে মানব মাত্রেই নামটির সহিত পরিচিত ।
    আমি বলিলাম, লোকটা আমাদিগকে বোকার মতো দেখিয়া কৌতুক করিয়া ঠকাইয়া গেল, গল্পটা আগাগোড়া বানানো ।
    এই তর্কের উপলক্ষে আমার সমাজবাদী ঠিকেদার আত্মীয়টির সহিত আমার জন্মের মতো বিচ্ছেদ ঘটিয়া গিয়াছে । ক্বচিৎ-কখনও সংবাদপত্রে তাঁহার সম্পর্কে পড়িয়া জানিতে পারি সরকারি ঠিকেদারির মাধ্যমে প্রভূত সম্পত্তি করিয়াছেন, শহরের পেজ থ্রি সুন্দরীগণের কোমরবেষ্টিত হস্তে ছিটকাপড়ের জামা পরিহিত তাঁহার হাস্যময় মুখ দেখা যায় ।
  • m | 012312.60.8923.236 | ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮ ১৭:১০541290
  • অর্ঘ্য দত্ত বক্সীর গদ্য বুঝে ওঠার চেষ্টা
    মলয় রায়চৌধুরী
    পাণ্ডুলিপি পাঠিয়েছেন অর্ঘ্য, দাঁড়ান গুনে বলছি কতোগুলো গদ্য আছে বইটায়, হ্যাঁ, সাতটা, তবে মাসখানেকের বেশি নানা সময়ে পড়েছি বলে জানি না, একআধটা হারিয়ে ফেললুম কি না ।
    পাণ্ডুলিপি হাতে পেয়ে প্রথম যে ভাবনাটা মাথায় এলো, তাহলো এই যে কতো বছর বয়সে লেখকীয় ইপিফ্যানিতে আক্রান্ত হয়েছেন অর্ঘ্য দত্ত বক্সী ?
    কোনো কিছু পড়ায় আমার বদভ্যাস হল যে অবান্তর চিন্তায় হারিয়ে যাই, ফলে আবার ফিরে আসতে হয় যেখান থেকে শুরু করেছিলুম সেখানে ; এই করে অর্ঘ্যর গদ্যগুলো পড়ে উঠতে বেশ সময় লেগে গেল । সাতাত্তর বছর বয়সে ডাইগ্রেশন স্বাভাবিক, নয়কি ?
    এই বয়সে সাহিত্য আলোচনা করতে আমি বড়োই অনাগ্রহী ।
    লরেন্স স্টার্ন অবশ্য বলে গেছেন যে ‘পড়তে বসে হারিয়ে যাওয়া হলো সূর্যের আলো, জীবন, বই পড়ার আত্মা’। সকালে ডাইনিং টেবিলে বসে যে গদ্যটা পড়ছিলুম, দুপুরে অন্য একটা গদ্যে আটকে যাই ; পরের দিন আবার আরেকটা অন্য গদ্য।
    পাণ্ডুলিপি পড়ে বইয়ের সামনে দিকে দুচারপাতা লিখতে বলেছেন অর্ঘ্য আর ওনার বন্ধু মৃগাঙ্কশেখর ।
    প্রস্তাবটা পেয়ে ভাবছিলুম যে আমার মতন একজন কমব্যাট্যান্টকে কেন ! আমাকে যা ক্রুদ্ধ করে, প্যাশনেট করে তোলে, অসংযত করে তোলে, বিরক্ত করে, মানুষের যা অপছন্দ করি, তা কি অর্ঘ্য দত্ত বক্সীর ক্ষেত্রেও একই ? তিনিও কি আমার মতন সমাজের হাতে বিধ্বস্তদের পক্ষে ভাবতে বসে ডিসটার্বড ? মানে খুঁজে বেড়ান যা কিছু অতর্কিত, তাইতে ? পরীক্ষা-নিরীক্ষার মতন অর্থহীন শব্দবন্ধের বদলে ইনোভেটিভ শব্দটা ব্যবহার করতে চান ?
    প্রথম পাঠে মনে হলো, অর্ঘ্য সম্ভবত স্বীকার করেন যে লেখকীয় কাজ যদি সত্য হতে হয়, তাহলে তাকে মানব-মনের গভীর, অন্ধকার, অসুস্হ, হেজে-যাওয়া, বিরক্তিকর কোনগুলোতে জোর-জবরদস্তি ঢুকে পড়তে হবে, কেবল ইনোভেশান দিয়ে সামলানো যাবে না। তারপর তো পাঠকের দায়িত্ব সেই কাজে অজস্র রাস্তা খুঁজে পাওয়া ।
    কিন্তু আমি অনেক বইকে কেবল ফিকশান বলে মনে করি, যেমন সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের বই, এতো ভালো উপন্যাস কম লেখকই লিখেছেন । আমি রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ ইত্যাদি সবই ফিকশান বলে মনে করি, ইতিহাস বলে মনে করি না ; যেমন মঙ্গলকাব্যের কাহিনিগুলো । তাই কোন চরিত্র কেন অমন আচরণ করলো, তার দায়-দায়িত্ব পাঠকের বলে মনে করি, লেখকের নয় ।
    পুতুল নাচের ইতিকথায় শশির এরেকটাইল ডিসফাংশান ছিল কিনা তা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখে যাননি, তার কারণ ওটা একটা ফিকশান । যে যেমন চায় ব্যাখ্যা করবে ।
    একটি সাহিত্যকর্মকে তার নিজের গুণে দাঁড়াতে হয়, যেমন রামায়ণ মহাভারত দাঁড়িয়ে আছে , কৃতিত্বটা বাল্মীকির ও ব্যাসদেব নামের লেখকদের । বাবরি মসজিদ ভাঙার আগে আমি ভেতরে ঢুকে দেখে এসেছি, অযোধ্যায় বহুবার গেছি চাকুরিসূত্রে । আমার কখনও বিশ্বাস হয়নি যে রামায়ণ কাহিনির রামের ওটা জন্মস্হান আর জন্মশহর । কুরুক্ষেত্র আর হস্তিনাপুর গেছি । সবই গল্প । বরং কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে-থাকা মহেঞ্জোদারোর কিশোরীটি আসল, এখনও কিশোরীরা অমন ভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে ।
    রামায়ণ মহাভারত সম্পর্কে অর্ঘ্যর আগ্রহ এবং মহাকাব্যগুলির চরিত্রদের নিয়ে তিনি খেলেছেন নিজের মতন করে, সেঁদিয়ে গেছেন ভেতরে ভেতরে ।
    আমি ভাবি যে রামায়ণ-এর গল্পটা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ল, আশেপাশে কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ল, আর ছড়িয়ে পড়ার সময়ে মূল রামায়ণ থেকে সরে গিয়ে যে-যার নিজের মতো করে গল্পটা তৈরি করে ফেলল, চরিত্রদের ওলোট-পালোট করে ফেলল । এই একই ব্যাপার মহাভারতের ক্ষেত্রে ঘটেনি কেন ? ব্যাসদেবরা মহাভারতে যেমন যে-যার নিজেদের লেখা ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন, তা কেন সম্ভব হয়নি রামায়ণের বেলায় ? শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে রাধাকেই বা কারা জুড়ে দিয়েছিল, মহাভারতে তো নেই !
    বাঙালিদের বাড়িতেও দেখি গোপাল, নাড়ুগোপাল, দোলগোবিন্দ, রাধাগোবিন্দ, রাধাকেষ্ট ইত্যাদি । তা বাঙালিরা রাধাকে কবে আর কোথা থেকে পেলো ? বঙ্গদেশে আমদানি-করা উত্তরভারতীয় ব্রাহ্মণরা এনেছিল কি নিজেদের পুঁটলিতে বেঁধে ? ব্রাহ্মণরা বঙ্গদেশে আসার আগে এখানকার দেবী-দেবতা এবং মিথগুলো কেন হারিয়ে গেল ! বৌদ্ধধর্মের দেবী-দেবতারাই বা চিরকালের জন্য কেন লোপাট হয়ে গেল !
    ন্যারেটিভে সোমরস প্রসঙ্গ এলে বেশ হতো, কেননা ওটা যে ঠিক কী জিনিস আমি আজও জেনে উঠতে পারিনি ।
    সরি, আবার ডাইগ্রেশন ঘটিয়ে ফেলছি ।
    সে যাক, পুতুল নাচের ইতিকথা নিজের গুণে দাঁড়িয়ে আছে ।
    একজন লেখক স্রেফ তার সৃজনকর্মের গাদ । রামায়ণ, মহাভারত এবং পুরাণ লেখকদের মতন তাঁদের আড়ালে চলে যাওয়া উচিত ।
    এর আগে কয়েকটা বইয়ের মুখবন্ধ বা ইনট্রো, ইংরেজি ও বাংলা বইয়ের, যা-ই বলুন, লিখেছি বটে, কিন্তু ন্যারেটিভ নিয়ে এরকম নিজের সঙ্গে নিজে বার্তা-বিনিময়ের একাধিক কন্ঠস্বরের নিরীক্ষা, মেইনস্ট্রিমের বাইরে বেরিয়ে, ফাঁকা জায়গায় শ্বাস নেবার ইনোভেশানের লেখা নিয়ে লিখিনি ।
    বলা যেতে পারে, অর্ঘ্য আমাকে বিপাকে ফেলে দিয়েছেন ।
    পড়তে গিয়ে আমি কোন গদ্যের পর কোন গদ্য, তাও বিছানায় শুয়ে, আরামচেয়ারে হেলান দিয়ে সামনের টেবিলে ঠ্যাঙ তুলে, আর ডাইনিং টেবিলে বসে পড়ার সময়ে গোলমাল করে ফেলেছি । অবশ্য জানি, অর্ঘ্যর তাতে খুব-একটা কিছু আসে যায় না । ছাপাতে দেবার আগে সাজিয়ে নেবেন ।
    অর্ঘ্য তাঁর প্রোটোফিকশানগুলোকে বলেছেন প্রগল্প । মনে হয় প্রথানুগত গল্প বলার কায়দাকে তিনি কনটেম্পচুয়াস মনে করেন । স্বাভাবিক । বালজাক বলেছিলেন যে, ফিকশান লেখার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো পরিবর্তনরত মূল্যবোধের ভয়াবহ প্রকোপ ফাঁস করে দেয়া । বালজাকের সময় থেকেই নয়, মানব সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ নিষ্ঠুরতা আবিষ্কার করেছে, সভ্যতার প্রসারে তা কাজে লাগিয়েছে । তা সত্ত্বেও ভাবুক ও সাহিত্যিকরা আশা করেন যে মানুষ মানবতাবাদী হবে, সাম্যবাদী হবে, কল্যাণকামী হবে, যুক্তিতে বিশ্বাস করবে, ইত্যাদি । এদিকে দেখতে দেখতে রাজনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থব্যবস্হার রক্ষিতা বা জিগোলো ।
    অর্ঘ্য ইচ্ছানুযায়ী ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেছেন, চিন্তার স্রোত বজায় রাখার কারণে, আমিও লিখতে বসে মগজে ইংরেজি শব্দ এসে গেলে তা-ই করবো ।
    অর্ঘ্যকে পড়ার সময়ে যে বিদেশি লেখদের কথা মনে এলো, তাঁরা উলিয়াম বারোজ, ইশমায়েল রিড, টেরি সাদার্ন, কার্ট ভনেগাট, রিচার্ড ব্রটিগান, টমাস পিনচন নয়, কেননা এঁরা একরৈখিকতা থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে যেতে পারেননি, এঁরা নির্ভর করেছেন প্রচলিত ন্যারেটিভের ডিভাইসের ওপর ; ফিকশান ও গদ্যের প্রথাকে ভেঙে ছাপিয়ে যাবার প্রয়াসের বদলে ফিকশানের ফিকশানালিটিকে মান্যতা দিয়েছেন ।
    অর্ঘ্যকে পড়ার সময়ে যাঁদের কথা মাথায় এলো তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য মেরি গেইটস্কিল, কেথি অ্যাকার, গ্যারি ইনডিয়ানা, কারেন ফিনলে, ডেনিস কুপার, ডেভিড ওজনারোইজ প্রমুখ ।
    হয়তো অর্ঘ্যের অবচেতনায় জাঁ জেনে, লুই ফার্দিনান্দ সেলিনে, জর্জ বাতাই, মরিস ব্লাশোঁ প্রমুখের রচনা পাঠের রেশ থেকে গেছে । এঁদের গদ্য ভিশনারি ও কাব্যিক মোডের । অর্ঘ্য নিজেই স্বীকার করেছেন ঋত্বিক ঘটক থেকে পাওয়া তাঁর প্রোটোফিকশানের উপাদান প্রাপ্তির ।
    হাংরি আন্দোলনের গদ্যকার সুভাষ ঘোষ ও সুবিমল বসাকের কথাও উল্লেখ করতে চাইবো, তুলনা নয়। তবে প্রথানুগত ন্যারেটিভ টেকনিকের কারণে বাসুদেব দাশগুপ্তের গদ্যের তুলনা করবো না । একই কারণে উল্লেখ করতে চাই না সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ফিকশান এবং শাস্ত্রবিরোধী গল্পকারদের । শাস্ত্রবিরোধী গল্পকাররা মুক্ত সূচনা দিয়ে আরম্ভ করলেও তাঁরা একরেখিকতা ও বদ্ধ সমাপ্তির বাঁধন থেকে বেরোতে পারেননি, তাঁদের চরিত্ররা কেলাসিত রয়ে গেছে ।
    উল্লেখ করতে চাইবো রবীন্দ্র গুহ, অজিত রায়, শাশ্বত সিকদার, সুব্রত সেন, অনুপম মুখোপাধ্যায়, সৌগত বালী প্রমুখের ইনোভেটিভ গদ্য ।
    সুবিমল মিশ্রকেও উল্লেখ করতে চাইবো, তাঁর টাইপোগ্রাফিকাল ইমেজখেলা ও অক্ষরকোলাজ বাদ দিয়ে। সুবিমল মিশ্রের একজন শিষ্য, স্বপনরঞ্জন হালদারের একটা বই আমি আলোচনা করেছিলুম, কিন্তু সেই সময়ের কমিউনিস্টদের রোগ থেকে বেরোতে পারেননি উনি, মুখ ফুটে বলতে পারেননি রক্তচোষার দিগ্বিজয়, উল্টে সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁদের গুরুঘণ্টাল পিঁজরাপোল ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন বলে তাঁর অপমানজনক সমালোচনা করেছিলেন ।
    ইনোভেটিভ গদ্যের এই এক বিপদ, কে যে কোথা থেকে ঢুকে পড়বে আর জিনিয়াসগিরির দাবি করবে স্পষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়ে ।
    যাঁদের নাম উল্লেখ করলুম, তাঁরা সকলেই, অর্ঘ্যের মতন, জানতেন যে সাহিত্যের রিসেপশানের মণ্ডপে ঢোকার মুখে তাঁদের পড়তে হবে বাউন্সারদের পাল্লায় । কারণ এনারা ফিকশানের সংজ্ঞা ও মূল্যবোধের মালিকানা নিজেদের হাতে তুলে নিতে চেয়েছেন ।
    আগের প্রজন্মের ওই লেখকদের লেখনজগতকে সরিয়ে এগোবার রাস্তা বের করতে হয়েছে অর্ঘ্যকে । শব্দ মুচড়ে গড়া ভাষা এবং আইডিয়া ও চিন্তা দিয়ে গড়া ভাষার যে গভীর পার্থক্য আছে তা নিজের গদ্যের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন অর্ঘ্য ।
    এক বাসুদেব দাশগুপ্তকে ছাড়া, মেইনস্ট্রিম বাংলা সাহিত্য অন্যান্যদের নিয়ে চিন্তা করেনি, তার কারণ অবিরাম বদলাতে থাকা সংস্কৃতির, ভাষাসংস্কৃতির প্রতি, আলোচকরা খেয়াল নিয়োজিত করেননি।
    অর্ঘ্যর হাতে পড়ে প্রতিটি অবজেক্ট মর্মার্থে ভরপুর হয়ে উঠেছে, কিন্তু অবজেক্টের মর্মার্থ প্রতিটি পাঠকের কাছে একই বার্তা পৌঁছে দেবে, তা আশা করা যায় না, কেননা অর্ঘ্যের মতামত তাতে কুঁদেকুঁদে ব্যক্তিগত গোপনতাসহ রাখা আছে, সবায়ের অভিজ্ঞতার বনেদ তো একই নয় ।
    অর্ঘ্যর গদ্যগুলোকে কোনো বিশেষ জনারে চিহ্ণিত করা যাচ্ছে না বলে আমি বলেছি প্রোটো-ফিকশান ; গদ্যগুলো পড়ে মনে হয়েছে অর্ঘ্য একজন Neo-gnostic, গোপন জ্ঞানের ভাঁড়াররক্ষক।
    শিরদাঁড়ার শীতল সিরসিরানিকে নিজের গদ্যে চারিয়ে দিতে চেয়েছেন অর্ঘ্য । সম্ভবত যখনই এই সিরসিরানি তাঁর অস্তিত্বে ঘটে তখন তিনি বাক্যগুলোয় যাতে তা থাকে এবং পাঠকের কাছে পৌঁছোয়, তার প্রয়াস করেন । পড়ার সময়ে পাঠক টের পান ঠিক কী ধরণের শীতলতার টর্চার তাঁকে সহ্য করতে হচ্ছে, চরিত্রগুলোকে রাস্তা থেকে, চায়ের ঠেক থেকে, গ্রন্হ থেকে, স্মৃতি থেকে, পুরাণ থেকে, তুলে আনার দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, কিংবা হয়তো কল্পনায় তৈরি করে নিতে হচ্ছে, ন্যারেটিভের জটিলতার সূক্ষ্ম তারতম্যকে বাছাই করতে হচ্ছে, কেননা মুহূর্তবিশেষের প্রয়োজনীয়তার দিকে খেয়াল দিতে হচ্ছে অর্ঘ্যর ন্যারেটিভকে ।
    কতো কতো ফিকশান পৃথিবী জুড়ে লেখা হয়ে চলেছে । তাদের লেখক-নির্মিত চরিত্ররা কি পৃথিবীর অদৃশ্য জনসংখ্যার একটা সমান্তরাল খাড়া করছে না ? পরের প্রজন্মের লেখকরা ওই অদৃশ্য জনসমুদায়ের সঙ্গে মিশে তাদের একজন হবার প্রয়াস করেন এবং সেই অদৃশ্য জগত থেকে বেরিয়ে এসে দৃশ্যমান জগতে নিজেই গড়ে তোলেন অদৃশ্য চরিত্রদের, পাঠকদের সামনে ছেড়ে দেন তাদের ।
    গদ্যগুলো পড়ে মনে হয়েছে যে আমরা জগতসংসারকে আর আধিবিদ্যক এবং মিসটিকাল পাটাতনে ফেলে বিচার না করলেও, ব্যাপারটা হলো যে ভারতীয় মিথগুলো আমাদের জাগিয়ে তোলার অপেক্ষায় থাকে, যাতে আমরা তা খোলা চোখেই দেখতে পারি । দুর্ভাগ্য যে বাংলা ভাষার সাহিত্যিক- সংস্কৃতিকে ঘেরাও করে নিয়েছে কিৎশ -- যেন একেবারে হোস্টেজ সিচুয়েশান ।
    অর্ঘ্যকে সংলাপ আবিষ্কার করতে হয়েছে, যাতে যে অভিজ্ঞতা তাঁর ঘটছে, তার সঙ্গে সংলাপগুলো খাপ খেয়ে যায় । আমরা তো সদাসর্বদা শব্দের মাধ্যমে চিন্তা করি না ; আমাদের ভেতরের গভীরতম এলাকাকে পুরোপুরি ধরতে সক্ষম হয় না কথাবার্তা । শব্দদের নিজস্ব সত্য ও সত্তা থাকে, এবং তা বেরিয়ে পড়ে তার আওয়াজের বা স্ফোটনের সূত্রে । ফলে বস্তু-বিশেষের সঙ্গে শব্দেরা হুবহু মিলে যেতে অস্বস্তি বোধ করে । বিভাবসু, কবি, এই কারণে শব্দগুলোকে ধ্বনিভিত্তিক করে নিয়ে লেখেন ।
    শব্দগুলোর নিজের নিজের ক্ষুধা থাকে এবং তারা তা-ই খেতে চায় যার অভিজ্ঞতা লেখকের হয়েছে। সমস্যা হল যে পাঠক-বিশেষের সেই একই অভিজ্ঞতা না-ও থাকতে পারে । ভিন্ন কিছু গড়ে তোলার জন্য ভাষাকে প্রয়োগ করতে অর্ঘ্য বাধ্য হন, কেননা জীবন আর ভাষা একই ব্যাপার নয় । বস্তুত পরাবাস্তব তখনই কাজ করে যখন তা বাস্তব থেকে চাগিয়ে উঠছে ।
    যা বলা হচ্ছে বা লেখা হচ্ছে, তা এক ব্যাপার, কিন্তু যা বলা হচ্ছে না, বা লেখা হচ্ছে না, তাও উপস্হিত থাকছে অর্ঘ্যর গদ্যে । যা লেখা হয়নি অথচ তা লিখিত পাঠবস্তুর সঙ্গে ভেসে বেড়াচ্ছে, তা লেখক অনুভব করতে পারেন এবং তাঁর লেখাটা এমনই হওয়া দরকার যে পাঠকও ওই ভাসতে থাকা মর্মার্থের সঙ্গে নিজেকে মিশ-খাওয়াতে পারবে ।
    অর্ঘ্যর বাক্যগুলো এলিপটিকাল, অনেকসময়ে ছোটো-ছোটো স্ফোটন জুড়ে-জুড়ে তৈরি, বাস্তব জগতকে অবিরাম স্ক্যানিং করার জন্য, যে বাস্তব জগত অর্ঘ্যর বয়সি যুবকের কাছে সতত পরিবর্তিত ও উপস্হাপিত হয় মেটাবলিজমের ও হরমোনের, প্রধানত প্রজেস্টেরনের, মাধ্যমে ।
    গদ্যের মাঝে আচমকা উদয় হন অর্ঘ্য। মেইনস্ট্রিম আলোচনায় শৈলীটা মনে হতে পারে সাধারণ্যের শৌখিন শোভনতাকে আক্রমণের পরিবর্তে এক ধরণের অমার্জিত মর্ষকামী বিকৃতি । ওই সাহিত্যিক প্রেজুডিসকেই তো বিধ্বস্ত করতে চাইছেন অর্ঘ্য, গদ্যের নান্দনিক স্ট্র্যাটেজির বর্শাফলক দিয়ে ।
    বেশ আনন্দের সঙ্গে স্যাটায়ার প্রয়োগ করেছেন অর্ঘ্য । স্যাটায়ার ব্যাপারটা একই সঙ্গে নীতিমূলক আর রাজনৈতিক । বলা চলে লেখকের বুনো ক্রোধের তরোয়াল লুকোবার খোপ । স্যাটায়ার হলো বাঁশের তৈরি ‘হস্তশিল্পের’ চোঁচ, যা ফুটে গেলে সময়মতো বের করে না দিলে বিষিয়ে কেলেঙ্কারি ঘটাতে পারে ।
    অর্ঘ্য ওনার গদ্যে নিজের প্রতিস্বে ব্যক্তিএককের ইউনিকনেস যেমন দিয়েছেন, তেমনই ওই ইউনিকনেসকে গুলিয়ে দেবার চেষ্টাও করেছেন । পাঠককে ধৈর্য ধরে এগোতে হবে । গ্রিক দেবতা জানুসের যেমন দুটো মুখ ছিল, মুক্ত সূচনার ও মুক্ত সমাপ্তির, যে দেবতার কোনো পুরোহিত ছিল না, অর্ঘ্যর গদ্যকে তেমনই দুই দিক থেকে বুঝতে হবে ।
    অর্ঘ্যকে প্ররোচিত করে আইডিয়া ও চিন্তা, এবং তাঁর অ্যাড্রেনালিনের উৎস ওনার আইডিয়া-বিশেষ, এক-একটি আইডিয়া উদয় হয় আর তা থেকে কথন-প্রক্রিয়া ধার নিয়ে এগোতে থাকেন । আইডিয়ার ফিকশান, যদিও অর্ঘ্যর গদ্যগুলোকে ফিকশনের চৌহদ্দিতে আটকে রাখা ভুল হবে, অবহেলিত থেকে গেছে, যেমন অতীন্দ্রীয় পাঠকের গদ্যগুলোর ক্ষেত্রে ।
    অর্ঘ্যর উদ্ভাবনা আনফেটার্ড, হয়তো বাক্যগঠনে আকস্মিকতা তাঁর অজানিতেও ঘটে গেছে, প্রতিরূপ উপস্হাপনে অবসেসিভ, বারবার বলেছেন একই কথা বা ঘটনা, তাঁর কনসেপচুয়ালাইজেশান নির্বাধ ।
    সাহিত্যিক ইনোভেশান বিকল্পকে দৃষ্টিগোচর এবং কল্পনাসাধ্য করে তোলে, আর এই সমস্ত বিকল্পের মধ্যে থেকেই ভবিষ্যতের বনেদ গড়ে ওঠে, লেখালিখির সম্পূর্ণ নতুন পাটাতন, যা কালক্রমে মেইনস্ট্রিম সাহিত্যে চুয়ে পড়ে । ইনোভেশানকে বলা যায় সাহিত্যিক রদবদলের ও পুনরুদ্ধারের ইনজিন ; সাহিত্য নিজেই নিজেকে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনরাবিষ্কার করে ।
    ইনোভেশান হলো জড়তাহীন, লৌকিকতাবর্জিত, রীতিনীতি অস্বীকারকারী, কাটিং-এজ সাহিত্য, যাতে থাকে অভিঘাতের লক্ষ্য, অপমানকরার উদ্দেশ্য, আইকনোক্লাজম ও জটিলতার মারপ্যাঁচ ।
    অর্ঘ্য লক্ষ্য স্হির করেছেন নিপুণ বাক-প্রতিবেদন আবিষ্কারে, আসঙ্গময় কন্ঠস্বরে, এবং প্রয়োগ করেছেন তাঁর দৃষ্টিপ্রতিভা, পথ কেটে বের করেছেন ভয়ঙ্কর সময়ের ভেতর দিয়ে, এবং স্ট্রোব লাইটের ঝলকানির সাহায্যে এগিয়ে গেছেন, জীবন প্রকৃতপক্ষে কী তার রহস্য অনুসন্ধানে, লিঙ্গোথ্থান হয় না এমন যৌন-প্রসঙ্গ এনেছেন, চুরো-করা বাক্যাংশের দুমড়ে ফেলা ছবি উপস্হাপনের সাহায্যে । পাঠকদের ধাঁধিয়ে দিতে পেছপা নন অর্ঘ্য ।
    নিৎশে বলেছিলেন ‘অশুদ্ধ চিন্তা”র কথা । তাঁর মতে, জীবনের বাস্তব ঘটনাবলীর সঙ্গে যখন বিমূর্ততা মিশে যায় তখন ‘অশুদ্ধ চিন্তা’ প্রশ্রয় পায়, পেয়ে বসে মানুষের ওপর, দুটোকে ছাড়িয়ে তারপর আলাদা করা যায় না । অর্ঘ্য বহু ক্ষেত্রে বিমূর্তের সঙ্গে বাস্তব জীবনের ঘটনাবলীকে উস্হাপন করেছেন ।
    অর্ঘ্য মনুস্মৃতির প্রসঙ্গ এনেছেন কিন্তু যাজ্ঞবল্ক্যের স্মৃতির প্রসঙ্গে তোলেননি, যখন কিনা কাব্যিক আঙ্গিকে রচিত যাজ্ঞবল্ক্যের স্মৃতিকে সাহিত্যিক কাজ বলা যায়, এবং যা মনুস্মৃতির পরবর্তীকালে লেখা । ব্রিটিশ শাসকরা নিজেদের পরিকল্পনা চরিতার্থ করার জন্য, প্রথম জনগণনার সময়ে ব্রাহ্মণদের সাহায্য নিয়ে মনুস্মৃতিকে গুরুত্ব দিয়েছিল, অথচ ততোটা গুরুত্ব দেয়নি যাজ্ঞবল্ক্যের স্মৃতিকে। প্রথম সেনসাসের চতুবর্ণকে প্রতিষ্ঠা করার ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র থেকে হিন্দু বাঙালি সমাজ আর বেরোতে পারেনি ; ব্রাহ্মণরা বাঙালি ক্ষত্রিয়দেরও শুদ্রে বর্গীকরণ করে দিয়েছিল, যে কারণে পিছড়াবর্গের কোটা নিয়ে মারাঠা, জাঠ, গুজ্জর, প্যাটেলদের মতন বর্গ বঙ্গসমাজে নেই ।
    যাজ্ঞবল্ক্যের স্মৃতি তিনটি খণ্ডে রচিত, আচারকাণ্ড ( রীতিপ্রথা ), ব্যবহারকাণ্ড ( বিচার ব্যবস্হা ) এবং প্রায়শ্চিত্ত কাণ্ড ( অপরাধের শাস্তি ও প্রায়শ্চিত্ত ) ।
    যাজ্ঞবল্ক্যের বক্তব্য ছিল যে মানুষের রয়েছে তেজোময়তা বা কর্মশক্তির উদ্বৃত্ত, যার একটা হিল্লে প্রতিটি ব্যক্তিএকককে করতে হয় । সেই উদ্বৃত্তই হলো জীবন । উদ্বৃত্ত বাদ দিয়ে জীবন সম্ভব নয় । একটি জনসমাজের মানুষ সমবেত উদ্বৃত্ত দিয়ে যা করে, তার দ্বারা সংস্কৃতিটির তো বটেই, মনেরও, আদল-আদরা নির্ধারিত হয় । এই দিকটি অর্ঘ্য নিয়েছেন, যদিও যাজ্ঞবল্ক্যের উল্লেখ তিনি করেননি ।
    অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো, বিশেষ করে একরৈখিক একেশ্বরবাদীদের মতো, সনাতন ভারতীয় চিন্তায় দেবতারা প্রথমে আসেননি । এসেছিলেন প্রজাপতি, এবং তিনি যে কে তা মিথই রয়ে গেছে । প্রজাপতির পর এসেছিলেন ঋষিরা । তারপরে দেবতারা । অতএব লেখক যখন মিথের জগতে প্রবেশ করছেন তখন বেশ ঝুঁকি নিয়েই তা করছেন, এবং মানুষ নিজের ভেতরে মিথের মাধ্যমে পুলক সৃষ্টি করে।
    মিথের রহস্যে , সেই বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশ করেন লেখক, কেননা ওই এলাকাটি অজানা । লেখক যা-ই করুন না কেন, তিনি একটি উপকথার জগতে ঢুকে পড়েন, এবং উপকথার সংজ্ঞানুযায়ী, তা মানুষের চেতনায় পুলক গড়ে তোলে ।
    মিথ কখনও একটি গল্পে ফুরোয় না । মিথ আনন্দ আনে এবং আনন্দ হলো এক বিস্ময়কর অসুখ । এই কারণেই দেবতাদের রাজা ইন্দ্রকে কেন্দ্র করে এতো অপমানজনক গল্প সংস্কৃতভাষীরা লিখে গেছেন যে মনে হয় বেচারা রাজা না হলেই পারতো ।
    সে যাক, এবার অর্ঘ্যের গদ্যের কিছু-কিছু অংশ পড়া যাক :

    নিম্নবর্গের খিস্তিমাত - চায়ের দোকানের Salanguage
    ব্লেড বা কাঁচির নাগাল পাবার আগেই যাবতীয় বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আমাদের ঋতবানস্বামী গুম মেরে বসে বসে নাকি পোঁদ উল্টে মটকা মেরে ধূমকেতুর মতোন “পাশের বাড়ির বৌদিকে ন্যাপা চুদে” নামক দেশী পর্ন দেখতে থাকে অথচ স্ফূতি পায় না যাহার নিকট মেয়ে দুই প্রকার, এক যারা চুষে দেবে, আর যারা চোষে না -- এই একমাত্র criteria তার কাছে মেয়ে বিষয়ক, নারীগুণ, --- একেও এক ব্যতিক্রমী নিম্নবর্গীয় চেতনা বলি, আক্ষরিক অর্থেই উন্নতবর্গে নিম্ন শ্রেণীর চেতনা ব্যতিক্রম, বিরল প্রাণী ঋতবান -- ঋত+বান -- এই সেই “ঋত”, ঋগ্বেদের, যাহা হইতে বরুণাদি দেবতা সৃষ্টি, যাহার অনুকরণ করেন পরমদেব ইন্দ্র, যাহাই প্রকৃতিস্বরূপ, যাহার মাধ্যমে গাভী, অন্ন প্রাপ্ত হয় ও যজ্ঞ যাহার অনুগামী, অনুগামী সকল দেবতা, ঋত -- যাহার উর্দ্ধে, যাহা অপেক্ষা কেহ নাই, সকলেই ঋতবান -- সেই অর্থেই যৌনতা আমাদের এ বালকে ও সকল বালকেই প্রায়, বিশেষত বাজার ঋত অর্থে ইহাই উপাসনা করে ।
    ---লাইক ব্রিটনি বিচ, ইটস জোডি বিচ…
    ---tell one more time and i will be off…
    ---ইটস জোডি জোডি জোডি বিচবিচারি
    ---ok, it’s over, bye, see u…
    হাসতে হাসতে যে সম্পর্ক শেষ করি সে এক ব্রিটেনের অজ পাড়াগাঁর নিম্নবর্গ কিশোরী, যে কিনা সদ্য রিহ্যাব-ফেরত ও লিভটুগেদারি । প্রেমটা অফুরন্ত হাসি আর ইয়ার্কির মধ্যে দিয়ে ভাঙল, i’m suffering from too much happiness…
    আমি বিলেতি নিম্নবর্গ, গরিব মানুষ চিনলাম, যারা তাদের মাতৃভাষা ইংরেজির বানান লেখে ধ্বনিভিত্তিক, আমাদের ডিকশনারীও প্রপার স্পেলিং নয়, যারা ব্যবহারকে অসোংখো চলতি ইংরেজি, যা কেবোল মাতৃভাষাতে কথা বলার সময়ি ব্যাবহার করা যায়, খোদ ব্রিটিশের মাত্রিভাষার সঙ্গে পরিচিত হয়ে উপলব্ধি করি ধ্বনিভিত্তিক বানানেই অবশ্যম্ভাবী ভবিষ্যৎ, ইহাই প্রোতিষ্ঠান বিরোধিতার ভাষা এখন, ভবিষ্যতে ইহাই নিওম হইবে…
    এবং আমি যখন একটি লেখার শেষ স্তরগুলি edit করে যোগ করি তখন এ ভেবেই করি অ্যাখন অব্দি যাবতীয় চিন্তা ম্যাচিওরিটি অভিজ্ঞতা এতে সর্বোৎকৃষ্টরূপে একত্র ও লিপিবদ্ধ থাক । এই লেখাই যদি শেষ লেখা হয় তবে কোনো খেদ যেন না থাকে । চলছে এরকমই, চলুক, কারণ কখন যে মাথা বিগড়োয় কিচ্ছু বলা যায় না…

    সন্ধ্যেবেলা সেদিন এক হিজড়ের দল এল তারকের দোকানে ।
    তারা বলিল --- আসবি ?
    প্রবল আমোদ হইল তারকের । সে নিজ বাম হস্তের কনিষ্ঠাটি দেখাইল । মধ্যমাটি দেখানোর বদলে । ইহাও সাংকেতিক অর্থে তোদের গুদও নেই পুরুষ মানুষের মতো বাঁড়াও নেই । আছে এক প্রতিবন্ধী বাঁড়া । না চোদা যায়, না চোদন দেওয়ার ক্ষমতা আছে ।
    তবুও তারা রাগিল না । তারকের দোকান হইতে চা কিনিয়া আমাকে ও তারককে চায়ের ভাগ দিল । আমার যথারীতি আপত্তিতে বলিল --- পি লে, পেয়ার বড়েগা ! তারক মাইতে হাত বুলাইল, তাহারা হাসিল, চলিয়া গ্যালো, তারক গান ধরিল, মহাতৃপ্তিতে, যৌনসঙ্গীত…
    সে নিম্ন, তাহা অপেক্ষা নিম্ন পাইয়া সে তো আহ্লাদিবেই । এই তো পিরামিড, সমাজের শ্রেণী পিরামিড, কেউ তোমার জ্বালায় মরে, তুমি কারো জ্বালায় মরো ।

    কিশোরের নীতা ও নামস্তোত্র
    কিশোর + নবনীতা
    Kishore + Nabanita
    কি Share + Na ব
    Ki শোর + ন Ba

    যে বয়সে মেয়েদের পিরিয়ড শুরু হয়, তখনো কিশোর মেয়ে দেখে নাই । মেয়ে চেনে নাই । তখন অবধি মা, দিদা, মাসী, জেঠী, দিদি ছাড়া মহিলা কি বোঝে নাই কিশোর ।

    যে বয়সে মেয়েরা ঝাড়ি মারা কি বুঝে ফেলে, সে বয়সে কিশোর মেয়ে বানান লিখিত ‘মে’ । গৃহশিক্ষকের চপেটাঘাত, ভর্ৎসনা ও ভ্রম সংশোধন শিখিল প্রকৃত মেয়ে বানান -- মেয়ে দিবস হয়ে ওঠে সেই জিয়ানস্টাল ! তবুও তখনো মেয়ে কি বস্তু -- মেয়ে নাম কেন, কেন উহাদের মেয়ে বলে শেখে নাই ।
    ---মা, যাদের লম্বা চুল তারাই কি মেয়ে ?
    ---মেয়ে কি তুই শুধু লম্বা চুল দিয়েই চিনিস ?

    কাহাদের মেয়ে কয়, কাহারা মেয়ে, কারাই বা ছেলে -- ইহা পৃথক করিতে শিখে নাই যখন, তখন মেয়েরা শিখে গেছে ঝাড়ি মারা কাকে বলে । যখন তাহার ক্লাসমেটরা প্রাথমিক শিশুযৌনতা -- শিশু যৌনঘটনা কিছু কিছু ঘটিয়ে ফেলেছে চুপি চুপি -- অথচ দ্যাখো মেয়ে কাকে বলে কেহই শেখায় নাই -- শেখায় নাই জাতীয় গ্রন্হ কি টেক্সটবুক তাহাকে উহা শেখায় নাই বলে কিশোরের কাছে যদ্যবধি মেয়ে না আসিল -- মা, দিদা, মাসী,জেঠী ব্যতিরেকে যখন সে মেয়ে দেখিল সে তখনও বোঝে নাই কাহাকে মেয়ে কয়, কি করে মেয়ে দিয়ে, কি ভাবে করে তা জানা তো প্রশ্নাতীত ।
    কিশোর অন কিশোর
    Kishore on Kishore
    নব অন নব
    Naba on Naba
    কিshore অN Kiশোর
    Niবস Oন নিBs

    যেই নাম সেই কৃষ্ণ ভজ নিষ্ঠা করি ।
    নামের সহিত আছে আপনি শ্রীহরি ।।

    কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম পড়ে আশ্চর্যান্বিত হই, ১০৮টি নাম মাহাত্মের তৎকালীন যুগানুযায়ী তা কর্ম পরিচায়ক । অর্থাৎ যে জীবনে মহৎ যে কাজগুলি করেছে ও তার চারিত্রিক গুণাবলী অনুযায়ী পরবর্তীকালে নামগুলি “আরোপিত” হয় । এগুলি বর্তমানের মতো জন্মকালীন নাম নয় । যথা মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিৎ । দুটিই পরবর্তীকালে । তার কীর্তির পরিচায়ক বিশেষণ । এ পর্যন্ত ভীষণ সাধারণ । কিন্তু কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম পড়ে চমকিত হয়ে যাই । ১০৮ জন ব্যক্তি বা ব্যক্তিগোষ্ঠী ১০৮ রকম নাম দিচ্ছে । যা নাম দিচ্ছে তা সবই কৃষ্ণের attribute, গুণ, বৈশিষ্ট্য, সুতরাং উহারা নাম বিশেষণ । এতো গেল । কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো এই যে, যে যে কৃষ্ণকে যা যা নাম দিচ্ছেন, তাঁর নিজের বৈশিষ্ট্যও তাইই । কৃষ্ণ যে mirror maze ; এতে যেরকম সে কৃষ্ণের মধ্যে তাই দেখছে । নিজেকেই দেখছে, নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছে। নাম--নামী--নামকারী অভেদ হয়ে যাচ্ছে । উদাহরণ দেয়া যাক ।
    যুধিষ্ঠির নিজে রাজা ও তার কাছে যাদব রাজনৈতিক শক্তির গুরুত্বই সর্বপ্রধান । তাই যুধিষ্ঠির নাম রাখে দেব যদুবর ।
    বিদুর মহামন্ত্রী হলেও কুরুক্ষেত্রের পরান্নভোজী দাসীসন্তান । তাই বিদুর রাখিল নাম কাঙ্গাল ঈশ্বর ।
    নারদ ভক্তশ্রেষ্ঠ । নারদ রাখিল নাম ভক্ত প্রাণধন ।
    অহল্যা যদিও রামায়ণের যুগের চরিত্র, তবু অহল্যার পাষাণ শাপমুক্তি celebrate হচ্ছে এই বলে যে অহল্যা রাখিল নাম পাযাণ-উদ্ধার ।
    প্রহ্লাদ রাখিল নাম নৃসিংহমুরারী।
    এই নাম সাহিত্যে এমন অসংখ্য রেফারেন্স পাওয়া যাবে যা কৃষ্ণযুগের বহু আগের চরিত্রের উল্লেখে পূর্ণ, বৈদিক যুগের, এমনকি দেবতাদেরও জননী আদি দেবী অদিতি থেকে বহু পরবর্তীকালের, মহাভারতের বহু বহু পরবর্তীযুগের চরিত্রদের উল্লেখ বর্তমান । এ লেখা তাই ইতিহাস চর্চার এক মহৎ উপাদান, manifold, অত্যন্ত অর্বাচীন যুগের এক রচনা এক অতি উত্তম গবেষণার বিষয় হয়ে উঠতে পারে ।
    যা বলছিলাম, যার যা বৈশিষ্ট্য তাই কৃষ্ণ বৈশিষ্ট্য ।
    অত্রিমুনি হলেন বিশেষ একটি নক্ষত্র অত্রি যা সপ্তর্ষিমন্ডলের অন্তর্গত, অর্থাৎ আকাশ সম্বন্ধীয় । অত্রিমুনি নাম রাখে কোটি চন্দ্রেশ্বর ।
    রুদ্রগণও ঋগ্বেদে আকাশের দেবতা ও পসুত্ব, উগ্রতা, শত্রুবিনাশকারী, ভয় উৎপাদক, ধ্বংসকারী ইত্যাদি গুণসম্পন্ন দেবতা যার সব বৈশিষ্ট্য পরে মআদেব আরোপিত । রুদ্রগণ নাম রাখে দেব মহাকাল ।
    এ জাতীয় বর্ণনা থেকে স্পষ্ট যে ঈশ্বর আমি স্বরূপ । আমিত্বের শ্রেষ্ঠত্বই ঈশ্বরত্ব ও আমার গুণলক্ষণ, বৈশিষ্ট্য, আমার মতাদর্শ, দৃষ্টিভঙ্গী, আমার যা মত ততই ঈশ্বর । কিশোরের নীতা পপেম নবনীতাই ঈশ্বরী । তার নামার্থ বদলে যায়, আসলে নীতাতেই অষ্টোত্তর শতনাম অর্পিত হতে গেলে কিশোর নিজেকে ১০৮ ভাগে, বৈশিষ্ট্যে, মতে, পরিস্হিতিতে সময়ে বাস্তবচাহিদায় বিভক্ত করে । করে নাম-নামী-নামকারী অভেদ হয় । কিশোর কৃষ্ণ হয়ে ওঠে । কারণ যার যা শ্রেষ্ঠ গুণ তা বিভূতিযোগে ঈশ্বরপ্রতিম হয়ে ওঠে ।

    কর্ণ-কৌরব সংবাদ --- অবতার সংস্করণ --- হোমো ফ্লেবার্ড --- একটি বাজে প্রগল্প
    ---কৌরব, আমি ও আমার লিঙ্গ বড্ড ইমোশানাল ফুল, বড় সেন্সেটিভ । বড় স্পর্শকাতর, অস্বাভাবিক কম রোধযুক্ত, ঘণ্টায় যেমন বাধ্যত ৬০টি একক, তেমনি বাধ্যত ওর নিত্য সেবা । না দিলে বড় সাফোকেশন হয়, বড্ড তার ছোঁয়াছুঁয়ি বাই, বড্ড তার খালি ক্ষরণ করা চাই...। এবং জলের বোতল, কল, টিপট ইত্যাদি যা যা থেকে লিঙ্গসদৃশ ক্ষরণ হয়, তা নারী ব্যবহার করছে দেখলে আমার লিঙ্গ বড্ড ইমোশানাল বড্দ সেন্সেটিভ হয়ে যায় । যথা যথা নেত্র পড়ে তথা তথা লিঙ্গ স্ফূরে, তথা তথাই কৌরব as a পুরুষোত্তম স্ফূরে স্ফূরে ওঠে…
    মাঝে মাঝে লিঙ্গ অণ্ড চেপে জঙ্ঘার ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে নারীযৌনাঙ্গ সুলভ এক ফিল আনি মুখ্যবিন্দুদেশে । সেখানে হাত বোলাই যেন যোনি নিয়েই খেলছি । পুরুষের আর কি আছে -- তার খেলার সঙ্গী তো ওই এক, সাত রাজার ধোন এক লিঙ্গ । স্বমিথুন করি । করে বীর্য উরুতে ফেলি । দেখি তার মুক্তাসম শ্বেতত্ব -- হোয়াইটনিং ফিলোজফি । পারদ, জল, বীর্যে ষড়বলের এক বল ( সারফেস টেনশন ) ধর্মতা দেখি । বীর্যকে দেখতে থাকলে -- কি ভাবে সে ঘনত্ব হারিয়ে তরল হয়ে ওঠে ক্রমশ যত ঠাণ্ডা হতে থাকে -- ধর্মের বিপরীত এই নিয়মে টেনশন কমে, রিলিজেই রিলিজড হয়ে কিছি বাস্তবোপযোগী উপদেশ দিয়ে যায়, বীর্য বেরিয়ে এসে দর্শন দিলে সিদ্ধাবস্হাই বলা হোক তাকে । আমি ভর পেট ভাত খেতে পাই বা পাই না, এই দেহামৃত ঘৃত আমি জানোয়ার শাস্ত্রানুযায়ী প্রেইজ করি । বীর্যময় বিবিধ প্রোডাক্ট ( স্পার্মস্যুপ কি স্পার্ম ডিও বা স্পার্ম ফ্লেবার্ড কন্ডোম । মার্কেটে লঞ্চ করা যায় কি না সে সব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখে থাকি।

    কর্ণ আপন মনে প্রশ্ন করে --- কে কৌরবকে ভালোবাসে ?
    কর্ণই উত্তর করে --- আমি কর্ণ ।
    ---কে কৌরবকে ভালোবাসে ?
    ---আমি কর্ণ ।
    ---কে কৌরবকে ভালোবাসে ?
    ---আমি কর্ণ ।

    ও রাত জাগানিয়া, তোমায় গান শোনাবো…

    সেলফ হিপনোটিক স্বমিথুন যেন ন্যায়া কুছ করনে কো মিলা । স্বমিথুন পুরুষভাবনা ধীরে ধীরে যা বোঝা যায় চলে আসবে কর্ণে, পুরুষের Porn আর ভালগার লাগবে না স্বমিথুন করে । বক্ষাকাশ, জঙ্গলশরীর, উদরসাগরে প্রাকৃতিক ধাতুবৃষ্টি কাদা কাদা করে দিলে আদিম আদিম ব্যঞ্জন হয় । তবে স্নানাগারে যাই । মৃতেঞ্জোদারোর স্নানাগার মনে হয় কাজের পর এই উঠে যাওয়ার প্রবল প্রযত্ন । ক্রমশঃ চুল ভেজে, বালী হয় ; গ্রীবায় জল আসে, সুগ্রিব হয় ; কন্ঠায় আসে, নীলকন্ঠ হয় ; হনুতে হনুমান হয় ; বক্ষ ভেজে -- সাহারায় হড়কায় স্নেহ ; উদর ভেজে, আদ্যা হয় ; নাভি সীতা হয় ; জঙ্ঘা জঙ্ঘুমুনি, পুরুষের নিতম্ব সৌন্দর্য নিয়ে একটা উপন্যাস হয়ে যাক --- শরীর বেয়ে নদী বেয়ে যায়, নাড়ির টানে এ-শরীর সদাশিব হয় । পুরুষ স্নান করে সঙ্গমোত্তর ।

    না, মিখায়েল বাখতিনের কারনিভালের প্রসঙ্গ তোলার জন্য অর্ঘ্যর পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধৃতি দিইনি ; বাখতিন থেকে আজকের সমাজে, সব দেশের সমাজেই, যা প্রাসঙ্গিক, তা হলো শরীরের ফাটলগুলোর আহ্লাদ । আজকের দিনে ফিকশানের ন্যারেটিভ আঙ্গিকগুলো আগেকার-কালের উপন্যাসের একটি চরম ও আত্মসচেতন, আত্মসচেতন কথাটায় লক্ষ্য রাখুন, রূপ, নানা রূপের মধ্যে একটি রূপ ।
    অর্ঘ্য নিজের পছন্দের রূপ বেছে নিয়েছেন প্রতিটি গদ্যে । অর্ঘ্যের গদ্যগুলো, প্রতিটি গদ্য, নিজের আঙ্গিককেই সমালোচনা করতে করতে এগিয়েছে, ডিসকোর্সের সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ককে যাচাই করতে করতে এগিয়েছে । আসলে সমস্ত আর্ট ফর্মই, ফিকশানের তো বটেই, সে তাকে প্রগল্প বলা হোক বা অন্য নাম দেয়া হোক, স্বয়ংসমালোচনায় আবিষ্ট । ওপরে যে উদ্ধৃতিগুলো দিয়েছি তা সেই অবসেশনকে পরখ করার উদ্দেশে ।
    অর্ঘ্য কী করছেন ? তিনি আর্ট ও বাস্তবের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে সরাসরি সন্দেহ করছেন, পাঠককে ফাঁসিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর নিজেরই নান্দনিক আত্মপরিচয়ে । এর ফলে তাঁর গদ্যগুলো সাহিত্য ও জীবনের সীমায় আত্মসচেতনতা নিয়ে উপস্হিত থাকছে, আর তার মাধ্যমে লেখকের সঙ্গে লেখক-সহযোগী পাঠকের সূক্ষ্ম পার্থক্য গড়ে তুলছেন ।
    অর্ঘ্যের গদ্যের আঙ্গিক এবং বিষয় ( কেন্দ্রহীন বিষয় ) দুটিই একযোগে যুক্তিতর্ক-নির্ভরতা, প্রচলিত রীতি ও আধিপত্যের কাঠামোয় অন্তর্ঘাত ঘটাচ্ছে, বা বলা চলে, অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে ঘটিয়ে এগিয়েছে। বাখতিন কিন্তু ব্যক্তিকে ততো গুরুত্ব দেননি যতোটা অর্ঘ্য দিচ্ছেন তাঁর গদ্যগুলোয় । আমরা পাই ব্যথা, যন্ত্রণা, কষ্ট, ইয়ার্কি, বিভ্রান্তি, বোকামির উল্টো টাঙানো, প্রায় অভাবনীয় একখানা জগত ।
    অর্ঘ্যর অন্তর্ঘাত অনেক সময়ে তথাকথিত উচ্ছৃঙ্খলতা ও স্বেচ্ছাচারিতার আদল-আদরা পায় । এমনকি পাঠককে চমকে দেবার, বিহ্বল করে দেবার জন্য তিনি বর্তমান কালখণ্ডের যে সমস্ত যৌন আচরণ যুবক-যুবতীরা পছন্দ করেন, মূলত সন্তানোৎপাদন এড়াবার জন্য, সমকাম, বীর্য নিয়ে খেলা, যোনির বাইরে বীর্য ফেলা বা ওনানিজম, মুখমেহন ইত্যাদিকে সন্দর্ভে তুলে এনেছেন । সবকিছুই স্পার্মফ্লেভার্ড হোক ।
    সন্তানোৎপাদনের বাইরে যৌনতার কথা বাংলা সাহিত্য এতোকাল এড়িয়ে গেছে, যে কোনো কারণেই হোক । অথচ সন্তানোৎপাদনের ভীতির কারণে যৌনতার মজা নষ্ট হয়ে যায় । সন্তানোৎপাদনের ভীতিকে যদি জলাঞ্জলি দেয়া যায়, যা আমরা অর্ঘ্যর গদ্যতে পাই, তাহলে যৌনতা হয়ে ওঠে আহ্লাদের, আনন্দের, সুখের, বিজয়প্রাপ্তির, জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপার, নারী ও পুরুষ উভয়েরই ।
  • | 012312.60.8923.236 | ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮ ১৯:১১541291
  • যখন ফালগুনী রায়ের সঙ্গে আকাশে উড়তুম
    মলয় রায়চৌধুরী

    যখনই ফালগুনী পাটনায় এসেছে, বলেছে, চলুন আকাশভ্রমণে যাওয়া যাক ।
    নীল তুলোয় গড়া আকাশ আমাদের দখলে, আমরা দুজনে ডানা মেলে যথেচ্ছ উড়তুম, পালকের রঙ আর মাপ ইচ্ছানুযায়ী বদলে নিতে পারতুম, উড়তে-উড়তে বা ওড়ার আগে ।
    পুনপুন নদীর ওই পারে, গণ্ডক নদী যেখানে বাঁক নিয়ে গঙ্গায় ঢুঁ মেরেছে, তার ওপরের আকাশে, শোনের বালিয়াড়ির ওপরের সোনালি আকাশে, কোইলওয়ারের ওপরের নীইইইইইল আকাশে, উড়েছি, উড়েছি, উড়েছি, এনতার, অপরিসীম টলারেন্স লেভেল গড়ে উঠল আকাশে গিয়ে ।
    ডানা, ঠোঁট, পা, পায়ের পাতা, যখন যে পাখির চাই, সেই পাখিদের কাছ থেকে পেয়ে যেতুম । সেই পাখির আকার পেয়ে যেতুম, আর দুজনে উড়তুম পাশাপাশি, কথা বলতে-বলতে বা ঠোঁট বুজে ।
    চাকরি থেকে সাসপেন্ড, মানে অফিসে যাবার বালাই নেই, ব্যাঙ্কশাল কোর্টে সাজা হয়ে গেছে, হাইকোর্টে রিভিশান পিটিশান করেছি, কবে ডেট উঠবে তার ঠিক নেই । হাইকোর্টের উকিল পেয়েছি সদ্য ইংল্যাণ্ড-ফেরত কিরণশঙ্কর রায়ের সহযোগীতায়, উনি যার আন্ডারে জুনিয়ার, সেই মৃগেন সেন, ক্রিমিনাল লইয়ার, লড়বেন মামলাটা, আরও চারজন অ্যাসিস্ট্যান্টের সাহায্যে ; বলেছেন, চিন্তা নেই ।
    সুবিমল বসাক যোগাযোগ রেখেছে ওনাদের সঙ্গে, ডেট উঠলে জানাবে ।
    চিন্তা যখন নেই, তখন আকাশেই উড়ি । চিন্তা কেবল টাকার ।
    ফালগুনী পাটনায় ওর দিদির বাড়িতে, যাঁর প্রতিবেশী ফালগুনীর প্রেমিকার স্বামী ।
    ফালগুনী সকাল-সকাল পৌঁছে গেছে আমাদের বাড়ি, দরিয়াপুরে । ইমলিতলা পাড়া ছেড়ে দরিয়াপুরে চলে এসেছি ; হিপি-হিপিনীরা নেপালে যাবার পথে দরিয়াপুরে হল্ট করে স্টিমারে বা নৌকোয় গঙ্গা পার হয়ে হিচহাইক করে চলে যায় কাঠমাণ্ডু ।
    ফালগুনী কাঠমাণ্ডু যেতে চায় না, পাটনায় দিদির বাড়ি আসার উদ্দেশ্য তো প্রেমিকার সঙ্গে চাউনি বিনিময়, যদি সুযোগ পাওয়া যায় ।
    চাউনি বিনিময় হয়ে গেলে, সেদিন আকাশে ওড়ার অফুরন্ত নীল, সারসদের পাশাপাশি, সাগর-ঈগলদের সঙ্গে, বেগুনি কালেমের ফিকে বেগুনি-নীল পালক আর গোলাপি ঠ্যাঙের, কালো চকচকে ফিঙের, শাদা-গোবকের ঝাঁকের, ভুবনচিলের সঙ্গে শীতের ফিনফিনে দুপুরের ওড়াউড়ি ।
    আকাশে ওড়ার অনেকরকম সরকারি হাওয়াইজাহাজ ছিল তখন, বোর্ডিং পাসও বেশ সস্তা, দু-আনা পুরিয়া, চার-আনা পুরিয়া, আট-আনা পুরিয়া, পৌয়া বাটলি আট আনা, ছটাক বাটলি চার আনা, সোমরস খুচরা দু আনা, ঠররা খুচরা চার আনা, লমনি তাড়ি পাতার দোনায় এক-আনা, মাটির ভাঁড়ে চার আনা ।
    হিপি-হিপিনিদের দেয়া লাইসারজিক অ্যাসিডে ভিজিয়ে শোকানো ব্লটিং পেপারের এক ঘন ইঞ্চের টুকরো আর পিসিপি বা অ্যাঞ্জেল ডাস্টের গুঁড়ো ফ্রি, পেইনটার করুণানিধান মুখোপাধ্যায় আর অনিল করঞ্জাইয়ের সৌজন্যে, স্টকে অবশ্য বেশি নেই ।
    একাধদিন ফালগুনী বলত, আজকে কাঁদতে-কাঁদতে উড়ব, ভুবনচিলেরা কাঁদে, চলুন চিলেদের পাশাপাশি উড়ি ; আপনি খেয়াল রাখবেন যাতে চোখের জল মাটিতে ঝরে না পড়ে, যেখানে পড়বে সেখানে হয়তো দৈত্যরা জন্ম নেবে, সে দৈত্যরা ধোঁয়ায় গড়া, আমি চাইনা ওই ধোঁয়া লোহানিপুর পাড়ায় দিদি-জামাইবাবুর বাড়ির দিকে ভেসে যাক ; আমার ভিতর এক কুকুর কেঁদে চলে অবিরাম ।
    আমি ওকে বলি, আমিও চাই না হে, তোমার জামাইবাবু সেই কলেজে পড়ার সময় থেকে আমার ওপর চটা । ওনার ক্লাসে সিটে বসে হিসি করেছিল কানাইলাল সাহা, আর উনি ভাবলেন কাজটা আমার, কেননা উনি যখন রিকশায় চাপছিলেন তখন আমি হেসে ফেলেছিলুম । উনি এতো মোটা যে রিকশঅলা বলেছিল, হুজুর আপনার ওজন তো দুজনের, আপনি একজনের ভাড়ায় কি করে যেতে চাইছেন ! রিকশয় চাপার আগে উনি প্রতিবার হুড ঝাঁকিয়ে পরখ করে নিতেন বইতে পারবে কি না ।
    ফালগুনী বললে, জানি, যেদিন থেকে শুনেছেন আপনি আমার বন্ধু , সেদিন থেকেই উনি আমাকে সাবধান করেছেন যে আপনি আমাকে উচ্ছন্নে নিয়ে যাবেন, দিদিকেও বলেছেন যাতে আপনার সঙ্গে না মিশি । আপনার গ্রেপ্তারির খবরটা ইনডিয়ান এক্সপ্রেস বেশ নোংরাভাবে প্রকাশ করেছিল ।
    তোমার দিদি আমাদের বাড়ি এসে মাকে বলে গেছেন যে আমি তোমাকে নষ্ট করে দিচ্ছি ।
    ফালগুনী বললে, ওনাদের তো পাখিদের সঙ্গে আকাশে ওড়ার, নদীর তলায় হাঙর, তিমি, সিলমাছ, ইলিশঝাঁকের সঙ্গে সাঁতার কাটার, মাটির নিচে ঢুকে ডাকিনি-প্রেতিনিদের সঙ্গে আগুনের হল্কার ভেতরে নাচবার অভিজ্ঞতা নেই, তাই ।


    আজকে গুলফি ঘাটের শ্মশানে গিয়ে ওড়া যাক, হাথুয়া মার্কেটের পানের দোকান থেকে দুখিলি গিলোরি পান কিনে খেতে-খেতে বললে ফালগুনী । তালশাঁসের মতন পানের ভেতরে ভাঙের মশলা ভরা, একটু সময় লাগে উড়তে, যতক্ষণে আমাদের ডানা আকাশ পাবে ততক্ষণে গান্ধি ময়দানের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাবো শ্মশানে ।
    তীরে বালি জমে-জমে গঙ্গা নদীর সঙ্গে শ্মশানও এগিয়ে চলেছে ; যাদের শব পুড়ছে তাদের দাদু-দিদা যেখানে পুড়েছিল, সেখানে ঘাস গজিয়েছে । শবদাহ চলছে দূরে । ভালই, আমাদের জন্য বসার জায়গা, শবাযাত্রীদের সঙ্গে, তারা একে-একে ন্যাড়া হচ্ছে, আর আমরা একটু-একটু করে উড়ছি, যেন লম্বাগলা বগিবক, ক্ষনিকেই ডানা মেলব দুজনে ।
    ফালগুনী বললে, ওই দেখুন, সময় ; আঘাত লুকিয়ে রাখাও শিল্প, বুঝেছেন ।
    বললুম হ্যাঁ, সময়কে দেখছি ।
    শবকে শোয়াবার আগে তার দেহ থেকে আঙটি ইত্যাদি খুলে নিচ্ছিল শ্মশানডোম । শবের ছেলে বললে, বাবার হাতের ঘড়িটা থাকতে দাও, ওটা ওনার প্রিয় রোলেক্স ঘড়ি, উনি বলেছিলেন যে মারা গেলে যেন ঘড়িটা খোলা না হয় ।
    সময়কে দেখলুম, পুড়ছে ।
    ফালগুনী বললে, নীল আকাশে পৌঁচেছেন কি ?
    নাহ, এখনও মাটির কাছাকাছিই উড়ছি, চড়ুই-শালিখদের মতন ।
    তাহলে চলুন, ওই সাধুদের জমায়েতটায়, ছিলিম ফুঁকছে ।
    দুজনে বসলুম গিয়ে, কিছুই বলতে হল না, ছিলিম এগিয়ে দেয়া হল আমাদের দিকে; সাধুরা কাপড় ভিজিয়ে ছিলিমে মুড়ে ফোঁকে না, আমি রুমাল বের করে মুড়ে নিলুম ।
    দুজনেই দু-ফুঁক করে মারলুম । ফিরে গিয়ে বসলুম আগের জায়গায় । হাতঘড়ি পুড়তে আরম্ভ করেছে শবের সঙ্গে ।
    পোড়া ঘড়িটা আমাকে কনফিডেন্স দিচ্ছে, মড়াটাকে ধন্যবাদ ; একটু থেমে, ফালগুনী বললে, সবই আছে, আমার জন্য নয় ।
    তুমি তার মানে ওড়া আরম্ভ করে দিয়েছ ! দাঁড়াও ওই আইসক্রিমের ঠেলা থেকে দুটো কাঠিবরফ কিনে আনি ।
    হ্যাঁ, আনুন, আমারও গলা শুকিয়ে গেছে, কাশতে চাই না, কাশতে ভয় করে, আমাদের পরিবারে কাশি ব্যাপারটা নিষিদ্ধ ।
    নিয়েলুম দুটো আইসক্রিম । চুষতে চুষতে মনে হচ্ছে সবকিছু নতুন, ন্যাড়ালোকগুলোর মাথা ঘিরে রুপোলি জ্যোতি, শবের আগুনে কমলা আর সবুজ রঙের পরিরা নাচছে, গঙ্গা আর নেই, সবুজের পর সবুজ ।
    ফালগুনী বললে, ভাঙের সঙ্গে পানের ভেতরে অন্যকিছুও ছিল, বুঝলেন, ওইপারের গাছগুলোও দেখতে পাচ্ছি, গাছেদের লালরঙের পাতাগুলো দেখতে পাচ্ছি, আগে এরকম গাছ দেখিনি, নৌকো দেখছেন, মাঝিদের গান শুনতে পাচ্ছেন, সালারা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইছে বোধহয় ।
    কোন গান ?
    আপনি রবীন্দ্রসঙ্গীত জানেন ? ওই গানটা, কেন যামিনী না যেতে জাগালে না ।
    জানি, চলো ওই দিকে, জলে গিয়ে বসি, এখানে বুড়ো শবযাত্রীরাও কাঁদতে আরম্ভ করেছে, বুড়োরা এরকম ভেউ-ভেউ করে কাঁদছে, আগে দেখিনি ।
    চলুন, ফিরতে ফিরতে শুকিয়ে যাবে , সব কান্নাই শুকিয়ে যায়।
    নদীর কিনারায় গিয়ে বসি দুজনে, জলের খুদে ঢেউ ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে । স্টিমার গেলে তখন ঢেউগুলো জোর পাবে ।
    আমি শুরু করি, গলা ছেড়ে, বেসুরো হলেও কিছু এসে যায় না, জানি, শ্রোতা বলতে গঙ্গা নদী আর ফালগুনী রায় । আমার স্কুলের বন্ধু বারীন গুপ্ত আর সুবর্ণ উপাধ্যায় থাকলে তিনজনে মিলে গাইতুম, বারীন গুপ্ত তাড়ির হাঁড়িতে তবলা বাজাত গাইতে গাইতে ।

    কেন যামিনী না যেতে জাগালে না, বেলা হল মরি লাজে
    শরমে জড়িত চরণে কেমনে চলিব পথের মাঝে
    আলোকপরশে মরমে মরিয়া হেরো গো শেফালি পড়িছে ঝরিয়া
    কোনোমতে আছে পরান ধরিয়া কামিনী শিথিল সাজে

    বললুম, ব্যাস এইটুকুই মনে আছে ।
    ফালগুনী বলল, ওই কটা লাইনই গাইতে থাকুন ।
    আরেকবার গাইবার পর দেখলুম ফালগুনীর চোখে জল । কয়েক ফোঁটা পড়ল নদীর ঢেউয়ে । স্মৃতির টর্চারের কাছে পুলিশের থার্ড ডিগ্রিও পালকের সুড়সুড়ি । কিংবা হয়তো ওই বৃদ্ধদের কান্নার শোক নিজেও নিণে নিয়েছে কিছুটা ।
    এই শ্মশানে আমার বড়োজ্যাঠার মুখাগ্নি করেছিলুম ; তখন পুরুতমশায় সতীশ ঘোষাল বলেছিলেন, শ্মশানে এলে একধরণের বৈরাগ্য হয় ।
    দুজনে চুপচাপ বসে রইলুম সন্ধ্যা পর্যন্ত । আমরা সেই স্হিতিতে, যাকে হিপি-হিপিনীরা বলে ‘স্টোনড’ ।
    ফেরার সময়ে, রূপক সিনেমার কাছে ঘুগনি খেলুম । ফালগুনী বললে, আমি কিন্তু ইনসেন নই, কেবল অযাচিত ঘটনার সঙ্গে সমঝোতা করে ফেলছি । আর আপনি যেচে লাৎ খাচ্ছেন ।
    বললুম, আমার টলারেন্স লেভেল এখন অমেয় ।


    আরেক দিন ফালগুনী । সেই একই পোশাকে, ঝোলা কোট আর ধুতি, দুটোই নোংরা, কখনও কাচা হয় না, দেখলেই বোঝা যায়, কোটটা ওর বাবা বা কাকার কারোর, বা তারও আগের, ওদের জমিদারির অবশেষের চিহ্ণ । মাঝখানে সিঁথিকাটা, কাঁধ পর্যন্ত চুল, স্নান করা হয়ে ওঠেনি বেশ কয়েকদিন, নখ বড় হয়ে উঠেছে । ওর আঙুলগুলো চিত্রকরদের মতন । পায়ে চটি ।
    আমার ঘরে গিয়ে বসবে চলো । ঘরে বসে ওড়ার সুবিধা হল অযথা হাঁটতে হয় না, বাইরে বেরোলে দুপুরের রোদে ডানার পালক শুকিয়ে ঝরঝরে হয়ে যায় ।
    ধোঁয়ার গন্ধে আপনার মা জেনে ফেলবেন, বলবেন না তো কিছু ?
    ফুঁকব না, গিলব । তাছাড়া হিপি-হিপিনীরা আমাদের বাড়িকে হলটিং স্টেশান করে মা আর বাবাকে কবি-আঁকিয়েদের জগতের সঙ্গে সম্যক পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, ছোটোলোক পাড়ায় বসবাস করার এই সুবিধা ।
    কী আছে ?
    অ্যাঞ্জেল ডাস্ট । করুণা-অনিল নেপাল থেকে ফেরার সময়ে একটু দিয়ে গিয়েছিল, বেশ মজার, নিজেকে হারিয়ে না ফেলেও ওড়া যায় । জলে গুলে খেয়ে নিলেই হল । ঘণ্টাখানেক পরে উড়তে থাকো ।
    অরেঞ্জজুসের সঙ্গে অ্যাঞ্জেল ডাস্ট বা পিসিপি গুলে খেলুম দুজনে ; অতিথিকে অরেঞ্জজুস খাওয়ানো যেতেই পারে ।
    ফালগুনী বললে রেকর্ড প্লেয়ারটা লাগান, রবীন্দ্রসঙ্গীত নয় ।
    মোৎসার্ট ছিল, লাগিয়ে দিলুম ।প্রথম-প্রথম মোৎসার্ট শুনে বুঝতে পারতুম না, রেকর্ডের লেবেল দেখে বুঝতুম । বারবার শুনে আইডিয়া হয়ে গেছে ।
    সোফায় রুপোলি মেঘের ওপর শুয়ে ফালগুনী বলল, আমিই সঙ্গীত হয়ে গেছি, সঙ্গীত শুনছি না, সঙ্গীত হয়ে গেছি, দেখুন গায়ে হাত দিয়ে, মিউজিকের ফ্রিকোয়েন্সি অনুভব করবেন । সবকিছু বেশ ভালো লাগছে, মনে হচ্ছে কল্পনাশক্তি আঙুলের ডগায় চলে এসেছে, জলের ফোঁটা টেবিলের ওপর পড়েছে, দেখুন, দেখতে পাচ্ছেন, প্রিজমের মতো দেখাচ্ছে, প্রিজমের সাতরঙা লাইট ছড়িয়ে পড়ছে, মোৎসার্ট বললেন তো ? মোৎসার্টকে বুঝতে পারছি, অনেকদিন পর রিল্যাক্সড ফিল করছি, সবায়ের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু কেউ তো আমার সঙ্গে কথা বলতে চায় না ।
    তুমি ওড়া আরম্ভ করে দিয়েছ ; উড়তে থাকো, মেঘের ওপর দিয়ে ওড়ো, বেশি কথা বোলো না, আরও ওপরে ওঠার পর কথা বোলো।
    কথা বলতে ভালো লাগছে, বারান্দার দরোজা দিয়ে দেখুন, আকাশের রঙ, বেগুনি হয়ে গেছে । সত্যিই কি বেগুনি ?
    বেগুনি রঙটা মোৎসার্টের সঙ্গীতের প্রতিধ্বনি, অবাস্তব নয় ।
    ধ্বনি শুনছি না কিন্তু, কেবল প্রতিধ্বনি শুনছি, কান পেতে শুনুন, রাস্তার লোকজন আর যানবাহন চলারও প্রতিধ্বনি শুনছি আয়নার দিকে তাকান, আয়নার দিকে তাকান, টান দিচ্ছে, আয়নাটাই আমাকে টান দিচ্ছে । রাস্তায় তাকান, রাস্তায় তাকান, রিকশটা ভাসছে, রিকশঅলা কই, ট্রাকটাও উড়তে উড়তে চলে গেল ।
    তুমি বললে, তুমিই সঙ্গীত হয়ে গেছ, নেশা করলে কি তুমি তোমার কবিতা হয়ে যাও ?
    সোফায় সটান মেঘের ওপর শুয়ে ফালগুনী বললে, এক্ষুনি বলতে পারব না, নেশা ছেড়ে গেলে বলতে পারব । এখন আমি ওই পিঁপড়েটার সঙ্গে কথা বলতে পারি, পিঁপড়েটা আমার কথা ঠিক বুঝতে পারবে ।
    দুপুরে মাংস-ভাত খাবার পর ফালগুনীকে আরেকবার প্রশ্নটা করলুম ।
    ফালগুনী বলল, জিজ্ঞাসা করেছিলেন নাকি ? তখনই বলতে পারতাম, এখন পারব না, এখন কবিতা নিয়ে ভাবতে চাই না ; বাড়ি গিয়ে ঘুমাতে চাই । কেমন একটা চাপ-দেয়া পীড়া ছিল যখন এসেছিলাম, কানে অস্পষ্ট কোলাহল ছিল, অ্যাঞ্জেল ডাস্টে পীড়া লাঘব হল মনে হয় । বাকি যেটুকু আছে, নিজে খাবেন না, আরেকদিন বসব । রিকশা ভাড়াটা প্লিজ দিয়ে দিন ।


    আজকে কনভেন্ট স্কুলের মোড়ের দোকান থেকে চরস কিনে খাওয়া যাক, কী বল ? ফালগুনীকে বললুম ।
    খাবার কথা বলছেন কেন ? ফুঁকলে বেশি আনন্দ হবে ।
    আনন্দের জন্য ফোঁকো ?
    দৈনিক ব্যানালিটি থেকে বেরিয়ে শান্তি পাই ! আমি কি বোদলেয়ার নাকি যে কবিতা লেখার জন্য নেশা করব !
    বোদলেয়ার, থিওফেল গতিয়ে আর ওনাদের আগে ডি কুইনসি, এই নেশাগুলোর কথা কিন্তু বলেছেন সৃজনশীল হয়ে ওঠার জন্য ।
    ধ্যুৎ । বোদলেয়ার হ্যাশিস, আফিম আর মারিহুয়ানার তুলনায় ওয়াইনকে গুরুত্ব দিয়েছেন ওনার আর্টিফিশিয়াল প্যারাডাইস বইতে ।
    তার কারণ হল রোমান্টিকরা প্রাচ্যের নেশাকে মনে করত জংলিদের সংস্কৃতি । তাইতো দেখা যায় এমিল জোলার বইতে মদ খাওয়া আর বৈভবের তোল্লাই ; উল্টো দিকে আমাদের দেশে ওনাদের ঢঙে মদ খাওয়াটা অধঃপতনের লক্ষণ । আসলে উপনিবেশবাদ ওইভাবে প্রতিফলিত হয়েছে আমাদের আর ওনাদের সংস্কৃতিতে। বোদলেয়ার আফিম আর হ্যাশিশের বিরুদ্ধে লিখে গেছেন ; আফিমের ব্যবসা ইউরোপই চালু করেছিল, ভারতে আফিম চাষ করে চিনে রপ্তানি করত । আফিম বিক্রির টাকায় তৈরি হয়েছিল রোমান্টিক যুগের বনেদ । বোদলেয়ারও আফিম খেতেন সিফিলিসের যন্ত্রণা উপশমের জন্য ; অথচ পরে গিয়ে আর্টিফিশিয়াল প্যারাডাইস লিখলেন প্রচ্ছন্নভাবে ওয়াইনের গুণগান করে ।
    ফালগুনী বললে, আমি কবিতা লেখার জন্য নেশা করি না, নেশা করি দৈনন্দিন ব্যানালিটি থেকে বেরোনোর জন্য, আপনি যদি আমাদের বাড়ির সদস্য হতেন তাহলে বুঝতে পারতেন, কলকাতায় সময় কাটানোটাও ব্যানাল হয়ে দাঁড়িয়েছে । মেঝে থেকে মার্বেলপাথর তুলে বিক্রি করে দিচ্ছে কেউ-কেউ । প্রেম নেই, প্রেমে না-থাকার ব্যাখ্যাহীনতা আছে ।
    তুমি তো তোমার বাড়ির বিষয়ে বলো না কিছু, জিগ্যেস করতেও কুন্ঠিত হই, তোমার দাদা তুষারের সঙ্গে মারামারি করেছিলে শুনেছি ।
    আমি করিনি, তুষারই দাদাগিরি ফলিয়ে মেরেছিল আমাকে ; হাংরি আন্দোলনে যোগ দেয়া ও পছন্দ করেনি, বলছিলো এই আন্দোলনের ভবিষ্যত নেই, তার ওপর মামলা-মোকদ্দমা ।
    তোমার চেয়ে দশ বছরের বড়ো, তাই হয়তো । আমার দাদা আমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়ো, কিন্তু আমাদের সম্পর্ক তো বন্ধুত্বের ।
    আপনি বুঝবেন না, আপনাদের কথা আলাদা । আপনাকে বলেছিলাম চাইবাসায় নিয়ে চলুন, নিয়ে গেলেন না, শালপাতায় হাড়িয়া খাওয়া হল না, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাছে শুনেছি, হাড়িয়া আর মহুয়ার কথা, টাটকা গরম-গরম মহুয়া । উনিও কবিতা লেখার জন্য নেশা করতেন না, নেশাগ্রস্ত থাকতে ওনার ভালো লাগত।
    ভাবলুম বলি যে তোমার মতনই প্রেমে চোট খেয়েছেন শক্তিদা, কিন্তু বললুম না । তার বদলে বললুম, যাকগে, চলো, দোকান খোলাই রয়েছে, ভিড়ের ভেতর দিয়ে হাত ঢোকাতে হবে । শিক্ষিত চেহারা দেখলে গাঁজা-চরসের দোকানের ভিড়টা আপনা থেকে জায়গা করে দ্যায়, মদের দোকানে কিন্তু করে না । বোদলেয়ার যে কেন মদের পক্ষে আর গাঁজা-চরসের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়েছেন তা এই ব্যাপারটা থেকে স্পষ্ট হয় । আমার সেজমামার শশুরের গনোরিয়া ছিল, উনি ব্যথা উপশমের জন্য আফিম খেতেন । শশুরের জন্য কিনে নিয়ে যেতেন সেজমামা, তখনকার দিনে সরকারি দোকানে যৌনরোগের জন্য চাই বললে, আফিম সহজেই কিনতে পাওয়া যেত ।
    এনাদের থেকে, এই ভিড়ের মানুষদের থেকে আমাদের কোনো পার্থক্য নেই মলয়, দেখতে কি আমি একই রকম নই, চুল আঁচড়াইনি কতদিন, দাড়িও বেড়ে চলেছে, স্নান করা হয়ে ওঠেনি বেশ কয়েক দিন ; আপনি তবু ডেইলি স্নান করেন, কিন্তু দাড়ি বাড়িয়ে চলেছেন, পোশাকেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন, এই একটা কর্ডুরয় ফুলপ্যান্ট আছে ?
    এটা নোংরা হয় না, কাচাকাচি করতে হয়না । একটাকার কয়েনটা ওদের কোমরের মাঝখান দিয়ে জানলার ভেতরে ঢুকিয়ে বলো দো পুরিয়া চাটনি ।
    মূর্খকুৎসিতদরিদ্র মানুষ-মানুষীর মিছিলে আমি ভেসে চলে ভুলে যাই সে সময়ে আমি বেটাছেলে না মেয়েছেলে ।
    ঠিকই বলেছ তুমি, এই ভিড়ে ঢুকে বোঝা গেল যে বোদলেয়ার, র‌্যাঁবো, করবিয়ের, লাফোর্গ, আঁতোয়া আর্তোর উদ্দেশ্যময় নেশা করা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা আমাদের উদ্দেশ্যহীনতা এই মূর্খ কুৎসিত দরিদ্র লোকগুলোর সঙ্গেই তুলনীয় ; তুমি এলে আমি নেশা করি, করুণা-অনিল এলে নেশা করি, রাজকমল চৌধুরী এলে করি, ফণীশ্বরনাথ রেণু বাড়িতে ডাকলে গিয়ে নেশা করি । নিজে একা-একা গাঁজা-চরসের নেশা করি না ।
    একদিন নিয়ে চলুন না ফণীশ্বরনাথ রেণুর বাড়িতে ।
    হাজিপুরের একজন বিডিও ডেকেছে আমাদের, রাজকমল, রেণুও যাবেন, তুমিও চোলো সঙ্গে, স্টিমারে করে ওপারে, পাকা কলার কাঁদি ঝোলা বাগানে সাহিত্যসভার আয়োজন করেছে বিডিও ।
    যাবো । বোর হয়ে গেছি এখানে । সুভাষরা পত্রিকা বের করবে বলছে । কবিতা লিখে রেখেছি কিন্তু এখনও চায়নি আমার কাছ থেকে । কেউই আমার কবিতা প্রকাশ করতে চায় না ।
    সুবিমল বসাকের কাছে দিয়ে রাখো কয়েকটা । সুভাষ পত্রিকা বের করছে চিঠিতে জানিয়েছে ত্রিদিব । আমি, দেবী, সুবিমল, ত্রিদিব বাদ যাচ্ছি । দ্যাখো তোমাকে ইনক্লুড করে কি না ।
    সুবিমলবাবুকে দিয়েছি ; বললেন বুলেটিন বেরোনো অনিশ্চিত ।
    হ্যাঁ, আমার মাইনে এখনও আটকে আছে, উকিলের কাছেও বকেয়া রেখেছি ।


    ফালগুনী বললে, গিলে তো নিলাম, ইউফরিয়া আরম্ভ হল না তো ! ফুঁকলে বরং এতক্ষণে শুরু হয়ে যেত । চলুন সবজিবাগের সামনের জাহাজঘাটায় গিয়ে বসা যাক, স্টিমার যাতায়াত দেখব চাতালটায় বসে । এখানে আন্টাঘাটে সবজিঅলাদের বড্ডো কিচাইন । এটা অ্যাফ্রোডিজিয়াক নয়তো ? বোদলেয়ার নাকি অ্যাফ্রোডিজিয়াক হিসাবে গিলতেন ।
    কম বয়স থেকে বেশ্যালয়ে ঢুঁ মারতেন, তারপর জাঁ দুভালকে সামলানো, দরকার পড়ত হয়ত অ্যাফ্রোডিজিয়াক হিসাবে ।
    হাঃ হাঃ, পা দুটো ক্রমশ মাখনের তৈরি মনে হচ্ছে, মাতালের মতন হাঁটছি না তো ? আপনিও লিকুইড হয়ে উঠছেন । চেয়ে দেখুন, চেয়ে দেখুন, ছায়ার খাপে-খাপে শরীর বসছে না ।
    এক্ষুণি উড়ো না, আরেকটু সামলে চলো, এই রাস্তাটার দু-পাশে ভিকিরি । গিন্সবার্গ যখন এসেছিল, এই ভিকিরিগুলোর ফোটো তুলে নিয়ে গেছে ।
    বিট-ফিটদের কথা বাদ দিন, শালারা প্রচুর টাকা কামাচ্ছে কবিতার বই বেচে, পৃথিবী ঘুরছে ; ওনাদের কবিতা ততো ফিল করতে পারি না । আমার ব্যক্তিগত-সত্য কি বিট কবিদের পক্ষে অনুভব করা সম্ভব ? আমার সত্যাবস্হা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে, আমি তা নিজে অনুভব করতে পারি, অবিরাম তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে । এক ঘণ্টার বেশি হয়ে গেল এখনও জাহাজঘাটায় পৌঁছোলাম না তো ।
    ঘড়ি তো পরে আসিনি, দাঁড়াও এই লোকটাকে জিগ্যেস করি । ভাইসাব কিতনা বজা হ্যায় ?
    ইগারা বজকে পঁয়তিস মিনট ।
    কেবল পাঁচ মিনিট হয়েছে, মনে হচ্ছিল একঘণ্টা ; কারো ঘড়িতে কটা বেজেছে জেনে কীই বা হবে । সময় জিনিসটা আনরিলায়বল । সেদিন দেখলেন পুড়তে, পুড়েই চলেছে । আপনি আমার হাতটা থরে থাকুন, হাওয়া যা দিচ্ছে, উড়ে না যাই , নাকি পৃথিবী অভিকর্ষহীন হয়ে গেল ।
    তুমি পৃথিবীকে অভিকর্ষহীন করে ফেলেছ । ইউফোরিয়া চাইছিলে !
    ব্যাপারটা কী বলুন তো ? টেম্পল অফ ইনফিনিটি খুলে যাচ্ছে চোখের সামনে । এটাই হ্যালুসিনেশান বুঝেছেন, স্বপ্ন থেকে আলাদা ।
    তোমার তো দেখছি কনশাসনেস দিব্বি রয়েছে । চলো ওখানটায় বসা যাক, স্টিমারযাত্রীদের ভিড় কম ওই জায়গাটায় । লোকগুলোর এতো চেঁচামেচির কী আছে বুঝিনা ।
    হ্যাঁ, আমার কোনো কিছুতেই আর তেমন নেশা হয় না । খালাসিটোলাতে গিয়েও মাতাল হইনি কোনোদিন। আপনার কি এরকম হয়েছে যে কবিতার লাইন চলে আসছে মনের মধ্যে অথচ লিখতে ইচ্ছা করছে না ।
    আমি মনে রাখতে পারি না, যদি কাগজ কলম কাছাকাছি থাকে তাহলে লিখে রাখার চেষ্টা করি ।
    জলে উড়ছি, জলে উড়ছি, মানুষগুলো মাছের মতন সাঁতার কেটে স্টিমারে উঠছে, দেখুন দেখুন । আবার কাশি পাচ্ছে, লেমোনেড খাওয়ান না, হাফ-হাফ ।
    দাঁড়াও, কেশো না, আনছি লেমোনেড, খসখসের গন্ধ থাকে সবুজ লেমোনেডে, কাশি কমাবে তোমার ।
    সুধীন দত্ত বেঁচে থাকলে ওনার বাড়ি যেতাম একবার, শুনেছি এক্কেবারে সাহেব মানুষ ছিলেন, মদ খাবার কেতা ছিল । পাতা ফুঁকে যেতাম কবিতা শোনাতে , ওনার প্রতিক্রিয়া এনজয় করতাম ।
    গলা ধাক্কা খেতে, ওনার অর্ডারলিকে ডেকে বলতেন, থ্রো হিম আউট । আমি বুদ্ধদেব বসুর কবিতা ভবনে গিয়েছিলুম । নাম শুনেই মুখের ওপর দড়াম করে দরোজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন । প্রথমটা খারাপ লেগেছিল, তারপর পথে নেমে এই ভেবে আনন্দ হল যে আমার দুর্নাম ওনার কাছে আগেই পৌঁছে গেছে ।
    মানুষ কেন মানুষকে অপছন্দ করে বলুন তো ? আমি তো কাউকে অপছন্দ করি না । সময় যেখানে পুড়ে নষ্ট হয়ে চলেছে, সেখানে কাউকে আঘাত দেবার কোনো মানে হয় না । এই যে সকলের সঙ্গে থাকি, থাকাটুকুই সার । আমাদের নাম নিউজপেপারের নোংরা পৃষ্ঠায় ছাপা হয়, তবু স্বর্গে যাবো, দেখে নেবেন ।


    সোফার ওপর মেঘে শুয়ে যাকে বলে ‘স্টোনড’ সেই তুরীয় অবস্হায় ফালগুনী, এলএসডিতে ভিজিয়ে শোকানো এক ঘন ইঞ্চের ব্লটিং চিবিয়ে ।
    আমি খাইনি ; ফালগুনীকে লক্ষ্য রাখার জন্য । দুজনে তুরীয় অবস্হায় থাকলে মা এসে দেখবেন আর বিরক্তি প্রকাশ করবেন । ফালগুনীর দিদি অলরেডি এসে কথা শুনিয়ে গেছেন ।
    ওর দিকে তাকিয়ে ভাবি, কিসে আক্রান্ত ফালগুনী ? রবীন্দ্রনাথের বৌঠান, জীবনানন্দ দাশের লাবণ্য, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের শীলা--- ফালগুনী কি সেভাবেই আক্রান্ত ? ওনারা কবিতায় নিয়ে গেছেন আত্মস্হিতিকে ; ফালগুনী সেইভাবে কবিতায় নিয়ে যেতে চাইছে না, অত্যন্ত গোপন রাখতে চাইছে, শেয়ার করতে চাইছে না আমার সঙ্গে, এমনকী নিজের কবিতার সঙ্গেও ! কেন ? কী বলব ওর আত্মস্হিতিকে ? দৌর্মনস্য ? লুগিয়াউব্রিয়াসনেস ? গোপন ঐকান্তিকতা ? অতৃপ্তি ? উদ্দেশ্যহীনতা ?
    গ্রিক ভাবুকরা মনে করতেন পিত্ত কালো হতে থাকলে দৌর্মনস্য দেখা দেয়, আর তা যদি সারতে বহুদিন লেগে যায় তাহলে বুঝতে হবে কোনো অপদেবতা ভর করেছে । ফালগুনীকে কথাটা বলেছিলুম একদিন । ও বললে, আমি তো চাই ডাকিনী-পিশাচিনী ভর করুক, ক্যাথারসিসের অদৃষ্ট করে তো আসিনি ।
    জ্যোতিষীরা মনে করেন শনির প্রকোপে পিত্তদোষ হয়, এবং তার দরুন দৌর্মনস্য । ফালগুনী বলেছিল একবার, ওর নাকি এখন শনির সাড়ে-সাতি চলছে, যা পারা যায় এই সাড়ে-সাতি পিরিয়ডেই লিখে ফেলতে হবে । অথচ লেখালিখি তো তেমন করছে না । ওয়েটিং ফর গোডোর মতন সদাসর্বদা যেন অপেক্ষা করে আছে, কিসের অপেক্ষা তার অনুসন্ধান করে চলেছে, প্রত্যাদেশের, অনুপ্রাণনার ।
    শুয়ে-থাকা ফালগুনীকে দেখে সুফি সন্তদের কথা মনে এলো । আরবরা ‘হুজুন’ বা ‘হুজ্ন’ বলে একটা শব্দ প্রয়োগ করে, নিজের ভেতরে নিজে প্রবেশ করে যাওয়া ব্যাখ্যা করার জন্য । ইরানের দার্শনিক-ডাক্তার বলেছিলেন ‘হুজ্ন’ হল এমনই এক স্হিতি যখন প্রেমিকার নাম শুনলেই ব্যর্থ প্রেমিকের নাড়ি-স্পন্দন তীব্র হয়ে ওঠে । আমি ফালগুনীর প্রেমিকার নাম জানতুম, কিন্তু এই নিরীক্ষা করে দেখিনি কখনও, কেননা জানতুম না ঠিক কী ধরণের ইনট্রিগ ওকে ছেঁকে ধরেছিল যে এই ক্যাটাসট্রফিক পরিস্হিতিতে ফালগুনী পৌঁছেচে । রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পৃষ্ঠভূমি জানি, অথচ নিকটবন্ধুর ব্যাপারই জানা হয়ে উঠল না । দাঁতে ঈশ্বরকে প্রেমিক কল্পনা করে বলেছিলেন যে, একজন মানুষ যদি হৃদয় দিয়ে, মন দিয়ে, আত্মা দিয়ে ঈশ্বরে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পিত না হয়, তা হলে সেই লোকটি এমনই এক গোপনতায় আক্রান্ত হয় যা সে কাউকে বলতে পারে না, সে একাই ওই ভার বইতে বাধ্য হয় ।
    জার্মান লেখক জিন পল ‘ওয়েলৎশমের্তস’ অভিধাটি কবি-লেখকদের এই বিশ্ববীক্ষার প্রেক্ষিতে তৈরি করেছিলেন : “বাস্তব জগতটি মনের জগতকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না” । পাশ্চাত্য সাহিত্যে এই আত্মস্হিতি নিয়ে যাঁরা কাজ করে গেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য হলেন চার্লস অগাস্টিন, সাঁৎ ব্যভ, শাতুব্রিয়ঁ, আলফ্রেদ দি ভিনি, আলেকজান্ডার পুশকিন, মিখাইল লেরমেনতোভ, ন্যাথানিয়েল হথর্ন, হার্মান হেস, হাইনরিখ হাইনে প্রমুখ ।
    বাংলা সাহিত্যে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ( ১৮৩৮ - ১৯০৩ ) এই ভাবনার ওপর ভিত্তি করে ‘চিন্তা-তরঙ্গিনী’ নামে একটি কাব্য লিখেছিলেন ; বাহুল্য বলা যে তখনকার সমালোচকরা ‘চিন্তা-তরঙ্গিণী’ কাব্যের আধুনিকতাকে উপলব্ধি করতে পারেননি । অক্ষয়চন্দ্র সরকার লিখেছিলেন, ‘হেমবাবু কালস্রোতের যেভাগে প্রথম দেখা দেন, সেই ভাগ অতি বিষম ; কালস্রোত তখন কেবলই ভাঙ্গিতে ছিল ; ভাঙ্গিব বলিয়াই ভাঙ্গিতে ছিল, গড়িব বলিয়া ভাঙ্গিতেছিল । হেমবাবুর জন্মসময়ে কোনও কিছু ভাঙ্গিতে পারিলেই কৃতবিদ্য আপনাকে গৌরবান্বিত মনে করিতেন । সমাজ ভাঙ্গিতে হইবে, ধর্ম ভাঙ্গিতে হইবে । এমনকী, অনাচারে অত্যাচারে স্বাস্হ্য ভঙ্গ করিয়া, অকালে কালগ্রাসে ডুবিতে থাকাও যেন সেই সময়ে গৌরবের বিষয় বলিয়া ধারণা হইত । আর এখন হেমবাবুর মৃত্যু সময়ে বোধ হয়, যেন সিকস্তির পর একটু পয়স্তি হইতেছে।’
    পড়ে মনে হবে অক্ষয়চন্দ্র সরকার যেন ফালগুনী রায়ের সমালোচকদের নকল করছেন ।
    আত্মস্হিতির এই অবস্হাটি বৌদ্ধধর্মে বহুকাল আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, যখন বুদ্ধ ‘দুঃখসত্য’-এর কথা বলেছিলেন, যে-সত্যটি চারটি সত্যের অন্যতম । বৌদ্ধধর্মে অবস্হাটি আশাবাদ বা নিরাশাবাদের নয়, তা বাস্তববাদের ।


    তুমি স্বর্গে চলে গেছো ফালগুনী, ১৯৮১ সালের মে মাসে, সাড়ে তিন দশক আগে ।
    তোমাকে বলেছিলুম গোলঘরের ভেতরে গিয়ে তোমার কবিতাপাঠ শুনব, তোমার কন্ঠস্বর একুশবার প্রতিধ্বনিত হবে, তা আর শোনা হল না, যেদিন আমরা গোলঘরে গিয়েছিলুম সেদিন বন্ধ ছিল, তাই একশো চুয়াল্লিশটা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে তোমার কবিতা শুনেছিলুম, সম্পূর্ণ নয়, অর্ধেক, কেননা তুমি কাশতে আরম্ভ করেছিলে, আমরা সঙ্গে করে জল বা পিপারমেন্ট লজেন্স নিয়ে যাইনি ।
    তোমাকে বলেছিলুম চাইবাসায় রোরো নদী আর লুপুংগুটু ঝর্ণা দেখাতে, শালপাতায় হাড়িয়া আর মাটির ভাঁড়ে মহুয়া খাওয়াতে নিয়ে যাব ; তা আর হতে পারেনি ।
    এই বাংলা আর দুই বাংলার বহু সংকলন প্রকাশিত হয়েছে । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পবিত্র মুখোপাধভায়, শান্তনু দাশ যেমন তোমাকে বাদ দিয়েছেন, তেমনই মণীন্দ্র গুপ্ত । অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত আর দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় তোমাকে বাদ দিয়েছেন ‘আধুনিক কবিতার ইতিহাস’ আর ‘ষাটের দশকের কবিতা’ সন্দর্ভে । প্রদ্যোত সেনগুপ্ত তাঁর ‘অন্য দিগন্ত : ষাটের কবিতা’ রচনাটিতে । আশিস সান্যাল তাঁর ‘ষাটের কবিতা’ গ্রন্হে । আরও বহু গ্রন্হে, যার হদিশ রাখিনি আমি, কী-ই বা হবে বলো ।
    তোমার ‘নষ্ট আত্মার টেলিভিসান’, বাসুদেব দাশগুপ্ত প্রথম প্রকাশ করার পর বারবার ছাপা হয়ে চলেছে । অলোক গোস্বামী, শুভঙ্কর দাশ, আলোক সরকার, মনফকিরা, সমীর রায়চৌধুরী পুনর্মুদ্রণ করেছেন, তোমার অপ্রকাশিত কবিতা যেগুলো সুবিমল বসাকের কাছে ছিল অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ।
    বইটি ছাপা হবার পরই ফুরিয়ে যাচ্ছে ।
    দুই বাংলায় তোমার পাঠকসংখ্যা অগুণিত ; তোমার সময়ে ইনটারনেট ছিল না । এখন ইনটারনেটে তোমার কবিতা খুঁজলেই পাওয়া যায়, সম্পূর্ণ বইটির কবিতা পাওয়া যায়, তোমার সম্পর্কে প্রবন্ধ-নিবন্ধ পাওয়া যায় ।
    তোমাকে আবার পাঠকদের সামনে আনছেন ‘চন্দ্রগহণ’ পত্রিকা ।
    জানি, সুফিসন্তদের মতো তুমি আগ্রহহীন ।
  • | 012312.60.8923.236 | ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮ ১৯:১৫541292
  • স্বপনরঞ্জন হালদার : অখ্যাত লেখকের অবহেলিত বই
    মলয় রায়চৌধুরী
    নন্দীগ্রাম
    পথে-পথে কৃষিমুণ্ড পথে-পথে আমাদের পরিত্যক্ত লাশ
    এইমাত্র শেষ হল আমাদের প্রতিরোধ, স্বপ্নতিতাস ।
    লালঝাণ্ডা কমরেড, বাবা ছিল তেভাগার চাষি
    কাস্তে হাতুড়ি তারা --- পরিসর পরিজন মাসি
    সকলেই দেখেছিল : ফেটে গেছে তলপেট, গাভী
    আমিও কি কমরেড ? সেই কথা সারাদিন ভাবি
    পথে-পথে কৃষিমুণ্ড, শকুনেরা মাংস খায় চিরে
    পরিত্যক্ত আমরা পড়ে থাকি চুপচাপ মার্ক্সবাদী নীড়ে
    মার্ক্সবাদ মার্ক্সবাদ, কাটা হাতে লাল ঝাণ্ডা তুলে
    মাঝরাতে আমরাও চাষিদের কান দিই মুলে
    ( জহর সেনমজুমদার )

    স্বপনরঞ্জন হালদারের নাম আমি প্রথম শুনলুম ‘উল্টো দূরবীন’ পত্রিকার সূত্রে, যখন পত্রিকাটির পক্ষ থেকে আমার একটি সাক্ষাৎকার তিনি নিতে চাইলেন । ‘উল্টো দূরবীন’ পত্রিকাটির সঙ্গেও সেই প্রথম পরিচয় । তাই, ওনার লেখা একটি বই, মানে এমন একজন যাঁর লেখা আমি বুড়ো বয়সে প্রথম পড়তে বসলুম, জানতে পারলুম যে উনিও ষাট পেরিয়েছেন, এইটি তাঁর একমাত্র বই, তাই একজন অখ্যাত লেখকের বেপরোয়া কাজ নিয়ে লেখার ইচ্ছে হল ।
    প্রথমেই বলে নেয়া যাক যে কেবল গ্লসি পত্রিকা ও রঙবেরঙ মলাটে মোড়া গল্পের বইয়ের সাধারণ পাঠকরাই নয়, বহু লিটল ম্যাগাজিন গোষ্ঠীর পাঠকদেরও এই বইটির গদ্যপাঠ মনে হবে জ্বালাতনমূলক, হুঁচটবহুল, বিরক্তিকর এবং অস্বস্তিকর । বইটি পড়ার জন্য চাই ধৈর্য ।
    ২০০১ থেকে ২০১০ এর মাঝে লেখা, গদ্যগুলো এর আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি । বইটির নাম ‘প্রকাশ্য দিবালোকে পাকা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ফটাফট কাপড়চোপড় খুলে ফেলছিল যে যুবতী পাগলিটা’, দেখার পর, কয়েকদিন ভেবেছি যে স্বপনরঞ্জন হালদার তাঁর বইটির নামে ‘ফটাফট’ শব্দটা যোগ করলেন কেন ? ‘ফটাফট’ শব্দটিতে যে ধ্বনি, তা কি ছবিটিতে হেরফের ঘটাচ্ছে ? বইটির গদ্যগুলোকে উপস্হাপনের ব্যাখ্যায় কি ‘ফটাফট’ জরুরি ছিল ? তারপর ‘পাগলিটা’ শব্দ কেন প্রয়োগ করলেন ? একজন বাঙালি যুবতী মাঝরাস্তায় দিনদুপুরে স্বতঃপ্রবৃত্ত উলঙ্গ হলে কি তার সঙ্গে কাপড়চোপড় খুলে ফেলতে থাকা একজন ‘পাগলির’ পার্থক্য আছে ? আর যদি তা থাকে তাহলে বইটির গদ্যের নির্মাণে কি প্রক্রিয়াটি বর্তমান বঙ্গসমাজ সম্পর্কে বিশেষ বার্তা দিতে চাইছে ? ‘প্রকাশ্য দিবালোকে’ শব্দবন্ধ থেকে অনুমান করি যে খবরের কাগজের চালু-সংবাদীয় রিডার-ফ্রেন্ডলি দিনানুদৈনিককে কটুতায় মুড়তে চেয়েছেন স্বপনরঞ্জন, নয়তো দিবালোকে বা দিনের বেলায় লিখতেন বলেই মনে হয় ।
    মানসিক অসুস্হ না হলে একজন যুবতী কেনই বা সকলের চোখের সামনে জামাকাপড় খুলে ফেলবেন, তা দিনদুপুরে হোক বা রাতের বেলাকার রাস্তায় । এখানে ‘পাকা’ শব্দটাও ভেবে দেখার ; কেন স্বপনরঞ্জন হালদার ‘পাকা’ শব্দটা রাখলেন । যে-কোনো রাস্তাই তো হতে পারত । অনুমান করি যে তিনি শহরের কথা বলছেন, বা শহুরে ঘটনার কথা বলছেন, যে অঞ্চলে ক্ষমতাপ্রতাপের আস্ফালন প্রদর্শিত হয় । মেট্রপলিটান কেন্দ্রের কথা । পাকা রাস্তা এখন পশ্চিমবাংলার মাঝ দিয়ে নানা জায়গায় গিয়েছে ; সেগুলো অনেকাংশে ফাঁকা । ফাঁকা রাস্তায় একজন উন্মাদিনী উলঙ্গ হতে চাইলে ‘প্রকাশ্য দিবালোকে’ শব্দবন্ধটা ওনার গদ্যের লক্ষ্যস্হলকে চিহ্ণিত করবে না । তাই, প্রকাশ্য দিবালোকে শুনলে শহরের ব্যস্ত কোনো রাজপথ বলেই মনে করতে হবে, অনুমান করি । দিনদুপুরে একজন যুবতী রাস্তায় দাঁড়িয়ে উলঙ্গ হতে চাইছে, বর্তমান বঙ্গসমাজের এরকম একটি ছবিই তাহলে স্বপনরঞ্জনের গদ্যকল্পনায় বাসা বেঁধে আছে । এরকম মনে হবার কারন, তিনি জানিয়েছেন বইটির
    রচনাকাল হল তাঁর ‘স্বপ্নভঙ্গের শেষ অধ্যায়’, অর্থাৎ ২০০১ থেকে ২০১০ । লক্ষ্য করবার যে তিনি বলছেন স্বপ্নভঙ্গের শেষ অধ্যায় ; তার মানে বেশ আগে থেকেই তাঁর স্বপ্নভঙ্গ ঘটতে আরম্ভ করেছিল । কবে থেকে, জানতে পারলে একজন লেখকের হেরে যাবার সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সের উৎস অনুধাবন করা যেতে পারত । অ্যাংস্টও সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সের বনেদ গড়তে পারে তাহলে ।
    গদ্যগুলোকে তিনি বলেছেন ‘কথন’ ; ‘গল্প’ হিসাবে চিহ্ণিত করেননি, যদিও ইংরেজিতে গদ্যগুলোকে বলা হয়েছে ‘স্টোরি’। গল্প বা স্টোরি বলতে সাধারণত যা বোঝায়, এই বইয়ের গদ্যগুলো তা নয় । আমার মনে হয়েছে, স্বপনরঞ্জন হালদার একজন লেখক নন, তিনি একজন পাঠক, এই বইটিও তাঁর গড়া স্বপাঠবস্তু । বহু গ্রন্হ ও দিনানুদৈনিক সংবাদপত্রের পাঠকরূপে তাঁর মস্তিষ্কে বিভিন্ন ঘটনার মৌমাছিদের প্রতিনিয়ত উড়ালের স্মৃতিগুঞ্জনের দুঃখ, কষ্ট, যাতনা, পরাজয়বোধ, গ্লানি, ক্ষোভ, ক্রোধ, কান্না, হতাশা, বিশ্বাসঘাতকতা, কৃতঘ্নতা, ইত্যাদির চাক । চাকটি তিনি নিজেই ভাঙছেন আর হুলের বিষ সহ্য করছেন ; তাঁর স্বীকৃতি অনুযায়ী ২০০১ সাল থেকে । অন্যান্য লেখকরা মুখোশ আর বোরখাজাল পরে থাকেন বলে তাঁদের অমন হুলের বিষ পোয়াতে হয় না, বা হলেও, তা জানাতে চান না সবাইকে, আখের গোলমালের ভয়ে ।
    তবে স্বপনরঞ্জন হালদার কি টের পাননি যে বিষটা ২০০১ সাল নয়, আশির দশকের মাঝামাঝি থেকেই তাঁর এবং তাঁর স্বপ্নজগতের বহু নাগরিকের ব্যক্তিক ও কৌম অস্তিত্বে সঞ্চারিত হচ্ছিল ! আমরা তো দেখেছি জঙ্গিপাড়ায় স্ত্রীর সামনে স্বামীকে হত্যা করে আঁজলাভরে রক্ত পান করা হয়েছে, হাওড়ার কান্দুয়ায় পাথরে হাত রেখে হাতের পাঞ্জা কেটে নে্য়া হয়েছে, যাদবপুরে থেঁতলে মেরে ফেলা হয়েছে বৃদ্ধাকে, বর্ধমানের দেওয়ানদিঘিতে আটজনকে বেদম পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, সতেরোজন সন্ন্যাসীকে দিনদুপুরে গায়ে পেট্রল ঢেলে পোড়ানো হয়েছে, বানতলায় ঘিরে মেরে ফেলা হয়েছে মহিলাকে, কুড়ি বছরের নাজিমা খাতুনকে উলঙ্গ করে পিটিয়ে ঘোরানো হয়েছে শ্যাওড়াফুলিতে, আওয়ামি লিগ নেত্রীকে পারাপারি ধর্ষণ করা হয়েছে হাওড়ার রেলের যাত্রীনিবাসে । আরও কত অমন নারকীয় ঘটনা ঘটানো হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই ।
    বইটিতে স্বপনরঞ্জনের নিবাসস্হান দেয়া আছে গাঁড়াপোতা, উত্তর চব্বিশ পরগণা । ‘উল্টো দূরবীন’ পত্রিকাটি তিনি এবং অমিত চক্রবর্তী দু’জনে সম্পাদনা করেন । অমিত চক্রবর্তী থাকেন কলকাতার বাগুইআটিতে ; অমিতবাবুর বাড়ি থেকেই প্রকাশিত হয় পত্রিকাটি । গাঁড়াপোতা অঞ্চলিটিতে আমি কখনও যাইনি, তাই জানি না যে সেখানে ‘পাকা রাস্তা’ বলতে ঠিক কী ধরনের পথ বোঝায় । এও জানি না যে গাঁড়াপোতায় বসবাসের আগে তিনি কলকাতা মহানগরে থাকতেন কি না, গাঁড়াপোতা ছাড়া পশ্চিমবাংলার অন্যত্র বসবাস করেছেন কি না, পশ্চিমবাংলার বাইরের ভারতবর্ষের অন্যত্র বসবাসের পার্সপেক্টিভ আছে কি না। গদ্যগুলো পড়ার সময় আমি চাকুরিসূত্রে গ্রামগঞ্জ চষে-বেড়ানো আমার দেখা পশ্চিমবঙ্গকে স্বপনরঞ্জনের গড়া বিভিন্ন ছবি-বক্তব্যের মাধ্যমে দেখতে ও বুঝতে চেয়েছি ।
    গদ্যের সূচি বা তালিকা, যাকে তিনি বলছেন ‘কথন-ক্রম’, তা দেয়া আছে বইটির একেবারে শেষে, যা থেকে জানতে পারি যে এগারটি গদ্য তিনি লিখেছেন তাঁর স্বপ্নভঙ্গের দশকে, মানে ২০০১ থেকে ২০১০র মাঝে। পাঠক গদ্যগুলো পড়ে নিয়ে কথন-ক্রমে পৌঁছোবেন । প্রথম গদ্যটির শিরোনাম ‘আসলে এটি সুবিমল মিশ্র নামক জনৈক আত্মঘাতী জঙ্গি লেখকের বৃত্তান্ত হয়ে উঠতে পারত।’ এই গদ্যটিতে স্বপনরঞ্জন স্পষ্ট করে দিতে চেয়েছেন যে তিনি সুবিমল মিশ্রের একজন গুণগ্রাহী একনিষ্ঠ পাঠক । গদ্যটি সুবিমল মিশ্রকে তাঁর ট্রিবিউট ; বইটি উৎসর্গও করেছেন সুবিমল মিশ্রকে । আর সত্যিই, বইটি সুবিমল মিশ্রের ‘ওয়ান পাইস ফাদার মাদার’ গ্রন্হটির কাজকে নকল করার প্রয়াস করা হয়েছে ।
    বইটির শেষে, ‘কথন-ক্রম’ তালিকার আগের পাতায়, বড় মাপের পাতাজোড়া অক্ষরে এই ঘোষণাটি রেখেছেন স্বপনরঞ্জন হালদার : “জানি, হয়তো, গড়ে উঠল না কিছুই -- তবু, অন্যদিক, উল্টোদিক থেকে শাবলটা, হ্যাঁ, ততটা মজবুত নয়, অবভিয়াসলি, পল্লবগ্রাহিতার জংজর্জর, তথাপি, সেটা কি সামর্থ অনুযায়ী আনাড়ির মতোই ঢুকিয়ে দেওয়া গেল পুরনো গাঁথনির ভেতর --- ইট খসানোর চেষ্টায়….ঝরে পড়ল কি অন্তত
    এক মুঠো জীর্ণ চুনবালি ?” আমি বলব, পড়ল না, কেননা এই বইটি সেই সময়ে প্রকাশিত হওয়া উচিত ছিল যখন পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে চলছিল রাজনৈতিক রক্তচোষাদের দিগ্বিজয় ।
    ডাকের মোড়ক খুলে, বইটি উল্টে-পাল্টে, প্রথম প্রতিক্রিয়ায় আমার মনে হয়েছিল যে স্বপনরঞ্জন হালদার সুবিমল মিশ্র দ্বারা পুরোপুরি প্রভাবিত । কিন্তু পরের দশটি গদ্য পড়তে-পড়তে স্পষ্ট হয়ে যায় যে তিনি এবং সুবিমল মিশ্র দুই বিপরীত চিন্তন-মেরুর নিবাসী । সুবিমল মিশ্রের লেখা আক্রমণাত্মক, যখন কিনা স্বপনরঞ্জন হালদারের লেখা একজন বিধ্বস্ত আক্রান্তের মনন জগতকে মেলে ধরে ; তিনি নিজেই বলেছেন তাঁর গদ্যগুলো স্বপ্নভঙ্গের, অর্থাৎ হেরে যাবার । সুবিমল মিশ্র, যতদূর জানি, হেরে গেছেন বলে স্বীকার করেন না, পশ্চিমবাংলায় বামপন্হীদের দ্বারা চর্চিত জুরাসিক বাগানের পত্তন, পচন এবং পতন সত্ত্বেও । সুতরাং স্বপনরঞ্জন হালদারের পরাজয়ের গদ্যবৃত্তান্তের দায় তাঁর নিজেরই, সুবিমল মিশ্রের নয় । সুবিমল মিশ্রকে আত্মঘাতী চিহ্নিত করার মাধ্যমে স্বপনরঞ্জন নিজেকেই মেলে ধরছেন, কেননা সুবিমল মিশ্রকে আত্মঘাতী মনে করাটা সুবিমল মিশ্রের লেখাপত্র সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা গড়ে তোলে । অবশ্য সুবিমল মিশ্রও এখন কিছুটা মেলোড ডাউন । সুবিমলবাবুর বই হার্পার কলিন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে, টেহেলকাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, ইউটিউবে নিজের সম্পর্কে ফিল্ম আপলোড করতে দিয়েছেন, গাঙচিল প্রকাশনী থেকে বই বের করার অনুমতি দিয়েছেন ।
    পাঁচের দশকের আমেরিকায় জেরক্স কোম্পানি তাঁদের মেশিনটি যখন বাজারে ছাড়েন, তখন সেদেশে একটি লিটল ম্যাগাজিন বিস্ফোরণ ঘটে । জেরক্স-করা এই লিটল ম্যাগাজিনগুলো যাঁরা প্রকাশ করতেন তাঁরা অনেকে পরবর্তীকালে ‘বিট আন্দোলনকারী’ হিসাবে চিহ্ণিত হন । সাহিত্য-বাজারের বাইরের লেখক ও ছবি-আঁকিয়েরা কাগজের ওপর যথেচ্ছ কাজ করার স্বাধীনতা পেয়ে যান । যেমন হরফ-মাপের হেরফের, হরফ সাজানো, ছবির সঙ্গে লেখা, ফাঁকা রেখে দেয়া পৃষ্ঠা, পত্রিকার সামনে দিক ও পিছন দিক থেকে পাঠের জন্য দু’রকম প্রচ্ছদ এবং একই পত্রিকার দুটি নামকরণ, ইংরেজি গদ্যের ভিতরে গ্রিক অথবা লাতিন হরফে লেখা বাক্য, ইত্যাদি । যেহেতু এই পত্রিকাগুলো ছিল বাজারের বাইরে, তাই, মধ্যবিত্ত বাঙালিসমাজে যাকে বলা হয় স্ল্যাং, গালাগালি, অশ্লীল অভিব্যক্তি বা যৌনশব্দ, তা প্রচুর ব্যবহার করা হতো, এবং নারী ও পুরুষের যৌনাঙ্গের ছবিও থাকত । উল্লেখযোগ্য পত্রিকাগুলো হল সিটিলাইটস জার্নাল, গেরিলা, স্যানফ্রানসিসকো আর্থকোয়েক, এল কর্নো এমপ্লুমাদো, ক্ল্যাক্টোভিডসেডস্টিন, কুলচুর, এভারগ্রিন রিভিউ, দি ভিলেজ ভয়েস, বার্নিং ওয়াটার, ইনটারগ্যালাকটিক, সলটেড ফেদার্স, এজরা, ড্যাম ইউ, ফাক ইউ, মাই ওন ম্যাগ, ভিনসেন্ট, প্যানিক, র‌্যামপার্টস, ইকো, আইকনোল্যাট্রে, ইমেজো, হোয়্যার, ওয়র্ক ইত্যাদি । আমেরিকায় অবশ্য রাষ্ট্রপতিরাও ফাক, শিট, আসহোল, সান অব এ বিচ ধরনের অভিব্যক্তি আইজেনহাওয়ারের সময় থেকেই প্রয়োগ করে আসছেন ।
    বিট আন্দোলনকারীদের আবির্ভাবের পূর্বে, নিউ ইয়র্কে ‘হার্লেম রেনেসঁস’-এর আফ্রোমার্কিন কবি-লেখক-ছবি আঁকিয়েরাও কেউ-কেউ এই টেকনিকগুলোর প্রয়োগ করেছেন, লিথোতে বা নিজেদের ঘেটোর ছাপাখানায় ছেপে প্রকাশ করা বই ও পত্রিকায় । তারও আগে ফ্রান্সের ডাডা আন্দোলনকারীরা প্রয়োগ করেছেন কয়েকটি টেকনিক। সুবিমল মিশ্র যেমন করেছেন, তেমনভাবে স্বপনরঞ্জন হালদারও তাঁর বইটিতে ন্যারেটিভকে বিঘ্নিত-করার এই টেকনিকগুলোর বেশ কয়েকটি প্রয়োগ করেছেন, বিশেষ করে হরফের মাপ, হরফ সাজানো, ভেঙে-ফেলা ইংরেজি বাক্য প্রয়োগ, ফাঁকা রেখে-দেয়া পৃষ্ঠা, সংবাদপত্রের দৃষ্টি আকর্ষণকারী বক্সের মতন বর্ডার-দেয়া টুকরো গদ্য ইত্যাদি । তবে ডাডা এবং বিটরা যে কাঁচিকাটা গদ্যশৈলীর প্রচলন করেন, যাকে এখন বলা হয় ‘ব্রায়ান জিসিন টেকনিক’, যা সুবিমল মিশ্র প্রয়োগ করেছেন, তা প্রয়োগ করেননি স্বপনরঞ্জন । ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হবার পর, স্বাভাবিক কারণে, বিট আন্দোলন ফুরিয়ে যায় এবং আমেরিকা-ইউরোপে অমনতর লিটল ম্যাগাজিন যুগের অবসান ঘটে । প্রকৃতঅর্থে ‘লিটল ম্যাগাজিন’ আর ইউরোপ আমেরিকায় প্রকাশিত হয় না । পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধারাও ভিজুয়াল থেকে সরে গেছে গদ্যশরীরে ।
    ডাডাবাদীরা, পরাবাস্তববাদীরা, বিট আন্দোলনকারীরা বলে গেছেন যে বাস্তববাদী লেখকরা মানুষের অবচেতনের আড়ালে লুকোনো তুমূল বিশৃঙ্খলাকে তুলে ধরতে পারেননি ; তাঁরা তাই অন্য উপায় খুঁজে বের করতে বাধ্য হলেন । বাধ্য হলেন ভাষাকাঠামোয় নতুনত্ব আনতে ; নতুন কোড, নতুন দ্যোতক, নতুনরূপক
    উদ্ভাবন করতে হল তাঁদের । যেহেতু শব্দ আর রূপকল্প নিজেই ধাবমান, অনিশ্চিত এবং বিশৃঙ্খল, কবি-লেখকরা উদ্ভাবন করতে চাইলেন মুহূর্ত-বিশেষের ছাপকে ধরে ফেলবার মতন বাকজগত গঠনের শৈলী । চাইলেন অভিঘাত সৃষ্টি করতে, ধাক্কা দিতে, উদ্দীপ্ত করতে, ঝাঁকুনি দিতে । মন্তাজ ও ব্রিকোলাজ ছিল ওই শৈলীগুলোর অন্যতম । একাধিক সময় ও পরিসরকে তাঁরা একটিমাত্র জমিতে বসিয়ে দিতে চেয়েছিলেন । বিধ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন একরৈখিকতাকে, কেননা খ্রিস্টধর্মের সময়ানুক্রমী প্রগতিতত্ব থেকে জন্ম নিয়েছিল রৈখিক কাহিনির বিন্যাস । তাঁরা বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন জনচিত্তরঞ্জন থেকে । এই প্রবণতাকে ডেভিড হার্ভে বলেছিলেন ‘সৃজনশীল বিনাশ।’ ডাডাবাদীরা, পরাবাস্তববাদীরা, বিট আন্দোলনকারীরা সনাতন নন্দনতত্বকে বিসর্জন দিতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত সাহিত্যের বাজার তাঁদের পৌঁছে দিয়েছিল এক বিপরীত নানন্দনিকতায় । তাঁদের স্বঘোষিত প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ও পাতিবুর্জোয়া শিল্পবোধের বিরোধিতা বাজারের খপ্পরে পড়ে ‘ব্র্যাণ্ড নেম’ হয়ে গেল । উইলিয়াম বেনিয়ানিন একে বলেছেন ‘জ্যোতির্ময় শিল্প।’
    যখন ডাডাবাদীরা এবং পরাবাস্তববাদীরা সাহিত্যের মাঠে নামেন তখন যান্ত্রিক মুদ্রণ এবং ফোটোগ্রাফি পালটে ফেলছিল সাহিত্যিক আর ছবি-আঁকিয়ের সামাজিক এবং রাজনৈতিক ভূমিকা । তাঁরা টের পাচ্ছিলেন যে চেতনার ভেতরে রয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা ; ব্যক্তিএকক যত ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে তত বেশি ওই বিশৃঙ্খলার খপ্পরে পড়ে । প্রশ্ন হল যে কেন স্বপনরঞ্জন হালদার, যাঁর মগজের বাস্তব জগতটি, বইটি পড়ে সেরকমটাই মনে হয়, মিডিয়া-প্ররোচিত, গ্রন্হ-তাড়িত, রাজনৈতিক-আড্ডা-প্রসূত, সেইসব টেকনিককে সাহিত্যে প্রয়োগ করতে চেয়েছেন যেগুলো ইউরোপের লেখক ও চিত্রকররা বহুকাল আগে তাঁদের বইতে ও ক্যানভাসে করে গেছেন, ডাডাবাদীরা করেছেন, পরাবাস্তববাদীরা করেছেন, বিট আন্দোলনকারীরা করেছেন, হার্লেম রেনেসঁসের লেখকরা করে গেছেন । আমার অনুমান, যে সমাজটিতে তাঁর বসবাস, তথ্যবিস্ফোরণের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সেই সমাজটির নানাত্ববাদী বিশৃঙ্খলার প্রতিনিধিত্ব করতে পারে এমন গদক্রীড়ায় নিজের নির্নয়কে পরখ করতে চেয়েছেন স্বপনরঞ্জন হালদার, যার দরুণ অত্যন্ত সিরিয়াস বিষয়ও, শ্লেষ-বিদ্রূপ-ব্যাজস্তুতি, খোঁচা, খুনসুটি, ঠাট্টা, ইয়ার্কি, মজা, চিমটি ইত্যাদির ক্ষুর দিয়ে চিরে ফালা-ফালা করে পাঠকের সামনে তুলে ধরা যায়। সন্দর্ভগুলো, গদ্যগুলোকে যদি তা-ই বলি, ওই শ্লেষ-বিদ্রূপ-ব্যাজস্তুতির অনুবর্তনের মাধ্যমে যাতে ক্রমাগত পাঠককে পাকে-পাকে জড়িয়ে ধরতে পারে, তার প্রয়াস করেছেন । স্বপনরঞ্জন হালদার ভুলতে দিতে চান না, যে, পাঠক যদিও একটা বানানো ঘটনাক্রম পড়বে, সে পশ্চিমবাংলার বাস্তব এবং লেখকের দ্বারা বানানো ঘটনার সম্পর্ককে সচেতনভাবে যাচাই করতে বাধ্য হবে । অবশ্য এই নির্মাণ-পক্রিয়ার আরেকটা দিকও আছে, আর তা হল গদ্যক্রীড়ার আড়ালে মর্মার্থ ও অনুযায়ীতার হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা । আসলে চতুর্দিকের বিশৃঙ্খলার মাঝে, যে বিশৃঙ্খলা ক্রমশ অনতিক্রম্য হয়ে দেখা দিচ্ছে, অমন ধ্বংসের মাঝে ওই বিশৃঙ্খলাকে দখল করে তারই খেলার চালগুলোকে রপ্ত করতে চেয়েছেন লেখক ; মিডিয়া-চালিত, তদ্বারা নির্মিত ও প্রোৎসাহিত বাস্তবকেই তুচ্ছতাচ্ছ্যল্যে হেয় করেছেন, তাঁর স্বপ্নভঙ্গের বদলা নেবার অভিপ্রায়ে, হেরে যাবার অসুস্হতার নিরাময় হিসাবে।
    গতানুগতিক ন্যারেটিভে ভঙ্গুরতা এবং অতিপ্রাতিস্বিকতাকে মনে করা হতো যে তা ব্যক্তিলেখকের আস্তিত্বিক অমূর্তাবস্হার বয়ান , কিংবা ফ্রয়েডিয় অন্তর্দ্বন্দ্বের বিশ্লেষণ, যার সমাধান করতেই হবে ; এবং সেই সমাধানসূত্রটি লেখক তাঁর রচনায় জানাবেন । গতানুগতিক ন্যারেটিভে একাধিক বিষয় এবং জনারের মিশ্রণকে মনে করা হতো সাহিত্য হিসাবে গদ্যকর্মটির পক্ষে ক্ষতিকর । এমনকী তা করলে লেখনকর্মটিকে সাহিত্য হিসাবে স্বীকার করা যাবে না । কিন্তু স্বপনরঞ্জন হালদার যা করেছেন তা চেষ্টাকৃতভাবেই করেছেন, বেরিয়ে যেতে চেয়েছেন প্রথাগত সাহিত্যের বিদ্যায়তনিক চৌহদ্দি থেকে । গোছানো সমাপ্তি থেকে রচনাগুলোকে মুক্তি দিয়ে লেখকের আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছেন । লেখক, পাঠবস্তু ও পাঠকের মাঝে যে গূঢ় চুক্তি, যে চুক্তির সাহায্যে একজন লেখক ব্র্যাণ্ড-নেম গড়ে তোলেন এবং পাঠকের বাজারে প্রবেশ করেন, তাতে অন্তর্ঘাত ঘটাতে চেয়েছেন । লেখক নিজেই গদ্যের ন্যারেটরের জীবনে ঢুকে পড়ছেন এবং ভাঙচুর চালাচ্ছেন, সৃষ্ট চরিত্রকে
    আক্রমণ করছেন । ফলে রচনার স্ট্র্যাটেজিটিই হয়ে উঠেছে ন্যারেটিভ ।
    সারোগেট পদ্ধতি, যাকে ইনটারটেক্সচুয়ালিটিও বলা হয়, সেই কৌশলটি প্রয়োগ করে, স্বপনরঞ্জন হালদার পূর্বতন সাহিত্যিক কাজগুলোর ওপর তাঁর নির্ভরতাকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন ; বিতর্ক তুলছেন সমাজ ও সাহিত্যের মাঝে গড়ে ওঠা সম্পর্ক নিয়ে । পাঠককে তিনি ভুলতে দিতে চাইছেন না যে তাঁর গদ্যগুলো নিছক গালগল্প নয় । এই মেটাফিকশান পদ্ধতির সাহায্যে তিনি নিজের উপস্হিতি জানান দিচ্ছেন, সন্দর্ভের অনুক্রমে উথাল-পাথাল ঘটাচ্ছেন ; গদ্যকে লাফিয়ে যেতে দিচ্ছেন পরিসর থেকে পরিসরে, সময় থেকে সময়ে, কমেডি থেকে আতঙ্কে, যাতে জঘন্য, মজাদার, পোলেমিকাল ও বিক্ষুব্ধ আত্মজ্ঞানের বর্ণনাকারী হিসাবে তিনি ব্যক্তিগত আবেগের যতটুকু-সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখতে পারেন ; ঘটনাবিশেষের সঙ্গে খাপ খায় না এমন সাংস্কৃতিক ও ইতিহাসিক প্রসঙ্গের অবতারণা করতে পারেন । রৈখিকতাকে চুরমার করছেন গদ্যপ্রবাহে ও পৃষ্ঠায় সাজানো দৃষ্টিগোচর কমপোজিশানে । ফলে গদ্যের সঙ্গে একযোগে পাঠকও ডিসওরিয়েন্ট হয়ে চলেছে । সম্ভবত লেখকের ধারণা যে সাহিত্যের গতানুগতিক গদ্যপদ্ধতি প্রয়োগ করে পশ্চিমবাংলার বর্তমান কৌম-বিশৃঙ্খলার ভয়াবহতাকে পাঠকের চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো যাবে না, তা হয়ে যাবে মেট্রপলিটান বাজারের একটি ক্রয়যোগ্য প্রডাক্ট, যেগুলো প্রতিদিনের ‘ব্যবহার করো আর ফেলে দাও’ বস্তুর মতন কিলো দরে কাগজের মণ্ড তৈরির কারখানায় গিয়ে নবজন্ম নিয়ে থাকে ।
    তবে ব্যক্তিগত আবেগ থেকে, নিজের অ্যাড্রেনালিনের স্ফূরণচমকের দরুণ, তনি, স্বপনরঞ্জন হালদার, প্রতিটি গদ্যে, নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি, বা অবচেতনায় চাননি । মনে হয় যেন একদা-প্রিয় নিজের তাত্ত্বিক বিশ্বাসই তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছে । ফলত আস্তিত্বিক স্হিতিটি তাঁর সামনে যে স্বপনরঞ্জনকে মেলে ধরছে তিনি ভঙ্গুর, অনিশ্চিত, সন্দেহত্রস্ত, অসম্বদ্ধ, অসংলগ্ন, শিথিল, সঙ্গতিহীন, আসঞ্জনহীন, বোধাতীত, নিষ্পত্তিহীন, অস্হির, বেমানান, বেখাপ্পা, এবং এই স্ববৈচিত্রগুলো ছাপ ফেলছে তাঁর গদ্যশরীরের কেন্দ্রহীনতায়, প্যারডিতে, আয়রনিতে, অক্রমিকতায়, খেয়ালে, বৈসাদৃশ্যে । তিনি সম্ভবত টের পাচ্ছেন যে এতাবৎকাল লালিত বিশ্বাসে দাঁড়িয়ে ব্যক্তির প্রতিস্ব কী ভাবে জ্ঞানের মাপকাঠি দিয়ে বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে চলেছে, কেনই বা চেতনা হারিয়ে ফেলছে প্রতিস্বটি, কোন কারণে যুক্তির আলো ফেলা যাচ্ছে না আচার-আচরণে । নিজেরই রচনার ট্র্যাজিক নাটকের তিনি নায়ক, যার শোকে তিনি মূহ্যমান । কিন্তু শোক যে ঘটছে তার স্বীকৃতিই স্বপনরঞ্জনের বিলাপের, আর্তনাদের প্রাপ্তিফসল । তিনি ঘটনাগুলোর ছবি তো সাজাচ্ছেন, কিন্তু কেন ঘটছে এই জিজ্ঞাসাটি রাখছেন না । এই প্রসঙ্গে কাফকা সম্পর্কে ডেভিড ফসটার ওয়ালেস-এর এই বক্তব্যটি মনে পড়ে : “ জীবনের মর্মার্থ অনুসন্ধানের শেষহীন, শাস্তিমূলক, প্রতিরোধী প্রয়াসের প্রক্রিয়াটিই জীবনের মর্মার্থ ; নিজেকে অন্বেষণের জন্য একজন মানুষ সারাজীবন যে প্রচেষ্টা চালায় শেষ পর্যন্ত ওই প্রচেষ্টাকেই তার বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে।”
    প্রথম গদ্যটির শিরোনাম ও বিষয়বস্তু আগেই জানিয়েছি । অন্য গদ্যগুলোর শিরোনাম পড়লে স্বপনরঞ্জন হালদারের চিন্তায় যে তোলপাড়, তা ধরা পড়বে : ২ ) কমরেড অজামিল তলাপাত্রের দিনক্ষণ এখন যেভাবে ; ৩) ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা ; ৩ ) অ্যাম্বুলেন্স সংক্রামক ব্যাধির জন্য নহে ; ৪ ) যে নকসি কাঁথাটির বুননে প্রতি বর্গ বিঘতে ছুঁচ ও আঙুলটুপি বদলানো হয়েছিল ; ৫ ) একটি গ্রামীণ পরচর্চাকেন্দ্রে অগ্ন্যুৎপাত ও শিলাবৃষ্টিজনিত ক্ষয়ক্ষতি, যতটুকু যা জানা গেছে ; ৬ ) ও হুজুর-- ; ৭ ) ঝুমকা গিরা রে/ বেরেলি কা বাজার মে ; ৮ ) দীনময়ী, সিমন দ্য বভ্যোয়া ও পবিত্রর বউ ; ৯ ) ইনট্রোডাকশান টু অ্যান অটোবায়োগ্রাফি; ১০ ) বিলিভ মি, যাহা বলিব সত্য বলিব । এই কথনগুলো সংক্ষেপে এক-এক করে দেখা যাক ।
    ‘কমরেড অজামিল তলাপাত্রের দিনক্ষণ এখন যেভাবে’ রচনাটিতে ‘কমরেড’, ‘অজামিল’ এবং ‘তলাপাত্র’ শব্দগুলো লক্ষ্যনীয় । প্রফুল্ল চক্রবর্তী তাঁর ‘দি মার্জিনাল মেন’ গ্রন্হে স্বাধীনতার পর লুম্পেন প্রলেতারিয়েত মাস্তানদের উদ্ভব, ও তারা কীভাবে রাজনীতিকদের ক্রীড়নক হয়ে উঠল আর রাজনীতির খেলা বুঝে তাতে
    ক্রমশ ঢুকে পড়তে লাগল, তা বিশ্লেষণ করে গেছেন । এই কথনের অজামিল তলাপাত্র, বিড়ি-বাঁধিয়ে মা আর কাপড়ের দোকানের সেলসম্যান বাবার সন্তান, সেইসব লুম্পেনদের ক্লোন । ক্লাস নাইনে ফেল করার পর সে বাসের ক্লিনার, কন্ডাক্টার, ইউনিয়ন, সিটু, সিপিএম, পঞ্চায়েত ইত্যাদির বোমা-বন্দুক ও সেক্স-সন্ত্রাসের সিঁড়ি বেয়ে এদল-সেদল করে নিচেতলা থেকে রাজনীতির ওপরতলায় ওঠে । লেখকের আপত্তি সম্ভবত এই জন্য যে একজন ‘কমরেড’ কেন অমন হবে ! সে তলাকার পাত্র মাত্র, এবং তার সঙ্গে স্বপ্নের কৌমসমাজের সম্পর্ক একটি গোঁজামিল । প্রশ্ন হল যে একজন মানুষ যদি সমাজের একেবারে নিচেতলায় জন্মায় তাহলে কেনই বা সে যেন-তেন-প্রকারেণ ওপরতলায় উঠবে না ? ওপরতলায় যাদের নিবাস তারা তো ভোটপালোয়ানদের কাজে লাগিয়ে নিজেদের আত্মীয় স্বজন জ্ঞাতিগুষ্টিদের পাইয়ে দেবার ধান্দায় ‘কমরেড’ সেজে তিরিশ বছর বসে ছিলেন। অজামিল তলাপাত্র যদি কমরেডি যোগাড়-যন্তর চালিয়ে তাই করে থাকে তাহলে তার দোষটা কোথায় ? তাকে বা তাদের মতো লোকেদের তো পরিকল্পিতভাবে ওপরে টেনে তোলার ব্যবস্হা ছিল না, নেই । তাছাড়া, নিচে থেকে যেসব অজামিল তলাপাত্ররা, তাদের অসামাজিক কাজের জোরে, ঠেলে ওপরে উঠছে, তাদের মধ্যে থেকে একটাও ‘দাউদ ইব্রাহিম’, ‘ছোটা শাকিল’ তৈরি হল না কেন !
    এই কথনের সূত্রে স্বপনরঞ্জন হালদার তাঁর কমরেডি দীর্ঘশ্বাস এই ভাবে ফেলেছেন : “ব্যক্তিস্বার্থই বানায় এক-একটা পুততুণ্ড কিংবা অমুক কিংবা তমুক কিংবা তলাপাত্র । আংকেল মদনের দলবলের কাঁধে শ্মশানে গেলেন পদাতিক কবি । তিনি কাকে যেন বলেছিলেন, চারু মজুমদারই শেষ কমিউনিস্ট । তিনি ধরে ফেলেছিলেন নিজের মূর্খামি । তাই, কবি বলেই, স্বহস্তে লিখেছেন --- সুভাষ মূর্খোপাধ্যায় ।” সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ওপর স্বপনরঞ্জনের ক্রোধ সুভাষবাবু বামপন্হা ছেড়ে তৃণমূলে ঝুঁকেছিলেন বলে । অথচ তার আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, যাঁরা কংগ্রেসি ছিলেন, তাঁরা বামপন্হীরা মসনদ দখল করতেই রাতারাতি যে বামপন্হী হয়ে গেলেন, তা স্বপনবাবুর কলম এড়িয়ে গেল ।
    তারপর, পশ্চিমবাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের আগে, তিনি লিখেছেন : “বিপ্লব হবে না । ক্ষমতা ছাড়া যাবে না । চাই ভোট । যেন তেন প্রকারেণ জয় । মানুষ কাকে ভোট দেবে ? কে চাইবে ভোট ? ছিটগ্রস্ত মহিলার হাতে রাজ্যভার তুলে দেওয়া কোনও সুস্হ মানুষের অভিপ্রায় হতে পারে না।” সমগ্র ভারতের পার্সপেক্টিভ থাকলে বিপ্লব হওয়ার কথা ভাবতেন কি স্বপনরঞ্জন হালদার ? নেপাল থেকে মহারাষ্ট্র পর্যন্ত জঙ্গল করিডরে যে বিপ্লবীরা মুক্তভূমি গড়েছেন, তা ওই জঙ্গলেই থেকে যাবে । ষাটের দশকে কলকাতার রাজপথে যা ঘটছিল এবং সেইসব ঘটনার মই বেয়ে যে বামপন্হীরা ক্ষমতায় এলেন তাঁরা তো অনেক কিছুই করতে পারতেন, অথচ করলেন না । কেবল অজামিল তলাপাত্র, পুততুণ্ড এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখকে দোষ দেয়া কেন ? স্বপনরঞ্জন হালদার তাঁর গদ্যের স্বনির্মিত ডিসওরিয়েন্টেশানের মাধ্যমে বিশ্বাসঘাতকতা থেকে যেমন নিষ্কৃতি ও আস্তিত্বিক অসুস্হতা থেকে নিরাময় চাইছেন, তেমনই সুভাষ মুখোপাধ্যায় চেয়েছিলেন গাঁটকাটা-জোচ্চোরদের সঙ্গ বর্জন করার মাধ্যমে । এই প্রসঙ্গে জানাই যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ( ইনি অতুল্য ঘোষের পত্রিকা ‘জনসেবক’-এর বিভাগীয় সম্পাদক ছিলেন ; অতুল্য ঘোষের সুপারিশপত্র নিয়ে বিগ বস হাউসে ঢোকেন ), শক্তি চট্টোপাধ্যায় ( এনার ‘সীমান্ত প্রস্তাব’ কবিতার একটি লাইন হল ‘জ্যোতি বসুকেই দাও বেন্টিক স্ট্রিটের চর্মমালা ), সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ( এনার ‘কম্যুনিস্ট পার্টি’ শীর্ষক গদ্যের লাইন হল ‘ এ দেশের কম্যুনিস্টরা যখন বেঁচে থাকতে চাইছে থাকুক না তারাও বেঁচে, তাতে কার কী ক্ষতি’ ) , এনারা সবাই ষাটের দশকে ছিলেন ঘোর কম্যুনিস্ট-বিরোধী ; কিন্তু বামপন্হীরা গদিতে বসতেই এনারা ভোল পাল্টে ল্যাংবোটে রূপান্তরিত হলেন । আমার অনুমান, বেঁচে থাকলে এনারা মসনদের নতুন ক্ষমতাধিকারীদের ল্যাংবোট হতেন । সিপিএম-এর ওয়েবসাইটে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যু সম্পর্কিত সংবাদের এই অংশটি স্বপনরঞ্জন হালদারের নজরে পড়েনি বলেই মনে হয় : “হোয়াইল রিকলিং দি মেমরিজ অব দি পাস্ট ইন সিক্সটিজ স্টুডেন্টস মুভমেন্ট ডেজ লেফ্ট ফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বাসু সেড দ্যাট উই ওয়্যার ডিপলি অ্যাট্র্যাক্টেড টু সুনীলদা’জ কৃত্তিবাস ডিউরিং দোজ টারবুলেন্ট ডেজ । বাসু অলসো অ্যাডেড দ্যাট কৃত্তিবাস রিমেইনড এ স্টলওয়ার্ট পাবলিকেশান অ্যামাং দোজ বিইং পাবলিশড ফ্রম কফিহাউস, ফর হুইচ দি এনটায়ার ক্রেডিট শুড গো টু সুনীলদা । হি ইনট্রোডিউসড দি টেল অফ হাংরি জেনারেশান ইন আওয়ার কানট্রি অ্যাজ ইফ উই ওয়্যার মেড অ্যাট পার উইথ বিটলস অফ ইউরোপ ।” ওপরতলায় যদি জ্ঞানের বহর এমনতর
    হয়, তাহলে নিচেতলার মানুষদের সম্পর্কে তাঁরা যে কেমনতর খোঁজখবর রাখেন তা সহজেই অনুমেয় । এবং এই কৌমপরিসরে স্বপনরঞ্জন হালদারের স্বপ্নভঙ্গ না হবার কারণ নেই ।
    ওপরতলা থেকে গোঁজামিল ফুটোপাত্রদের চাপিয়ে দিলে নিচে থেকে ওপরে ওঠার সব রাস্তাই বন্ধ । তা সে ওই সরকার হোক বা এই সরকার ।
    সোভিয়েত কাঠামো লাটে ওঠার পর জানা গিয়েছিল যে সবাইকে পিটিয়ে সমান করার একরৈখিক প্রগতির তত্বটি সমগ্র কাঠামোটিকে ভেতর থেকে কুরে-কুরে খেয়ে ফেলেছিল, অথচ হুদো-হুদো ফেলোট্র্যাভেলার বাঙালি বুদ্ধিজীবী বারবার সেখানে গিয়ে কুটোটিও টের পাননি, যখন কিনা সোভিয়েত খোরপোষে অনেকের সংসার চলত, পত্রিকা চলত, প্রকাশনা চলত, বইয়ের দোকান চলত, এমনকি তাঁদের ছেলে-মেয়েরা বিয়ের পর হানিমুন করতে যেত সেখানে । পাননি কেননা তাঁদের ব্যক্তিকস্তরে নৈতিক অধঃপতন ঘটে গিয়েছিল তার আগে থাকতে । তাঁদের জীবনে ব্যক্তিপ্রতিস্বের নৈতিকতা রাষ্টটির সঙ্গে একীভূত হয়ে গিয়েছিল--- রুণু গুহনিয়োগীর একের পর এক পদোন্নতি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ । স্বপনরঞ্জন হালদারের মতনই, পোস্টমার্কসিস্ট ভাবুক ও অ্যাক্টিভিস্টরা এখন একেবারে দিশেহারা ও শতধা । বস্তুত শতধা হয়ে তাঁরা নিজেরাই প্রতিষ্ঠা দিচ্ছেন বহুরৈখিকতার, বহুত্বের, অনির্ণেয়তার, কালক্রমের অনিশ্চয়তার----স্বপনরঞ্জন হালদারের এই বইটিই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ । পরিচয় আর দৈনিক কালান্তরের মতন বহু পত্রিকার অন্তর্জলী যাত্রা ঘটে গেল ।
    ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা’ রচনাটি শুরু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের এই উক্তিটি দিয়ে : “বহুমত প্রকাশের অধিকার যদি না থাকে তাহলে বার্লিন প্রাচীরও ভেঙে পড়তে বাধ্য ।” যখন বলেছিলেন, তখন প্রাক্তন হননি বলে মনে হয় । স্বপনরঞ্জন হালদারের এই গদ্যটি, বলাবাহুল্য, ওপরে বর্ণিত বিভিন্ন গদ্য-কৌশলের সাহায্যে তাঁর নিজেরই যুগ্মজবৈপরীত্য বা বাইনারি-অপোজিটের মাঝের টানাপড়েনজনিত অবস্হানকে স্পষ্ট করে তুলতে চায়, যেমন তিনি বলছেন টক্করের কথা, টিপিকাল মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্ট বনাম প্রকৃত বামপন্হা, শরৎ চাটুজ্যে বনাম মানিক বাঁড়ুজ্যে, শক্তি কাপুর বনাম ওম পুরি, স্বপন সাহা বনাম ঋট্বিক ঘটক, রুশ চ্যানেলের পর্ণোগ্রাফিক ছবি বনাম রুশ ছবি ‘টরাস’, রবীন্দ্রভবনে মদের দোকানের লাইসেনসিং লটারি বনাম একদা জ্যোতি বসুর উক্তি, “যে রাজ্যে সরকার অর্থের জন্য আফিম, মদ এইসব বিক্রি করে বিক্রি-কর বাবদ সাধারণ মানুষের উপর বোঝা চাপায়, সেই রাজ্যের ভবিষ্যৎ বড় অন্ধকার”, ইহুদি জেমাইমার মুসলমান স্বামী ইমরান খান বনাম খ্রিস্টান হিউ গ্রান্ট, আমলাশোলে কৈলাশ মুড়ার অনাহারী সত্য বনাম সিপিএম নেতৃত্বের পেট-ভরে ঢেঁকুরতোলা সত্য, ইত্যাদি । তিনি তাঁর রোষ কেন্দ্রীভূত করেছেন মধ্যবিত্তের সুবিধাবাদে । অথচ সত্য, বিচারবোধ ও রুচির সর্বজনীন অনুশাসন গড়তে গিয়ে ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করে দিয়েছে ‘প্রকৃত’ নামক ভাবকল্পটি । কী করছে ভাবকল্পে চোবানো লোকটা ? যুগ্মবৈপরীত্যকে অবস্হা বুঝে ব্যবস্হায় পরখ করছে । যেন ইতিবাচক দিকটিতে থাকে ‘প্রকৃত’ বামপন্হী । তাই ভালো/খারাপ, সুন্দর/কুৎসিত, জ্ঞানী/মূর্খ, ন্যায়/অন্যায়, সংস্কৃতি/প্রকৃতি, সাদা/কালো, মন/দেহ, নতুন/পুরানো, বন্ধু/শত্রু ইত্যাদির একটি দিকে ‘প্রকৃত’ বামপন্হী । অজামিল তলাপাত্ররা ( এই গদ্যে তার নাম পান্নালাল মজুমদার ) কেন শক্তি কাপুর, স্বপন সাহা, শরৎ চাটুজ্যে, মদ-খাওয়া, পর্নোগ্রাফিক ফিল্ম দেখার দিকে থাকবে না ? বিভাজনটি তো নকল । বাঙালিরা বহুকাল সরকারি চাকরি ‘ভালো’ আর ব্যাবসা করা ‘খারাপ’ মনে করত, যার দরুন সরকারি চাকরিতে তারা রূপান্তরিত হয়েছে অলস গাধায় এবং ব্যাবসায় অপাঙক্তেয় । পান্নালাল মজুমদাররা, তাদের অসততার জোরে, কেন ধিরুভাই আমবানি হতে পারেনি, পারে না ?
    উপরোক্ত পৃষ্ঠপটে সুকঠিন সনাতন ‘আদর্শ মূল্যবোধগুলো’ খেলো হয়ে গেছে । আফশোষ করা ছাড়া স্বপনরঞ্জন হালদারের অন্য কোনো নিদান নেই । অজামিল তলাপাত্র আর পান্নালাল মজুমদারকে কেনই বা মনে করা হবে সমাজবিরোধী ! তারা তো ‘প্রকৃত’ রাজনৈতিক ভাবুকদের বানানো সমরূপী মানুষ, মানব গড়ার কারখানায় তিরিশ বছর ধরে তৈরি । তাদের সাংস্কৃতিক বিবিধতা মুছে গেছে । নৈতিক ডিসকোর্সকে সরিয়ে
    বঙ্গসমাজ সে জায়গায় বসিয়েছে অবজেকটিভ, আন্তর্স্হানিক ও নৈর্ব্যক্তিক সত্যের ডিসকোর্স । ব্যাপারগুলোয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সিপিএম না তৃণমূল না কংগ্রেস না বিজেপি, সে প্রশ্ন সম্পূর্ণ অবান্তর হয়ে গেছে । বস্তুত নৈতিক নিয়মাবলী প্রণয়নের কাজটা বর্তেছে গিয়ে একটি অধিব্যক্তিক বা সুপ্রাইনডিভিজুয়াল স্তরে । এথিকাল অথরিটি ব্যাপারটাই হয়ে গেছে তামাদি । পশ্চিমবাংলার মানুষ পৌঁছে গেছে এমন একটা পর্যায়ে যাকে বলা যায় ‘উত্তরআদর্শবাদী’, এবং স্বপনরঞ্জন হালদারও দাঁড়িয়ে আছেন সেই ব্লেডের ধারের ওপর ।
    ‘অ্যাম্বুল্যান্স সংক্রামক ব্যাধির জন্য নহে’ রচনাটির শিরোনাম থেকেই ব্যঙ্গের খোঁচা সুস্পষ্ট ; পশ্চিমবঙ্গের মরাল ও এথিকাল ব্যাধিটি আজ সংক্রামক, এবং যে বাহনটির কাজ রোগিকে নিরাময়ের জন্য মসনদের শুশ্রুষার আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া, সেই রাষ্ট্র-বাহনটিই ঘোষণা করছে যে সে অমন রোগিদের পৌঁছে দিতে অপারগ । পশ্চিমবঙ্গের মতন অ্যাম্বুল্যান্স সেবা ভারতের আর কোনো রাজ্যে নেই, কেননা পশ্চিমবঙ্গের বেশিরভাব অ্যাম্বুল্যান্স কোনো-না-কোনো ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত । ক্লাবগুলো বিশেষ উদ্দেশ্যে পত্তন করেছিলেন প্রমোদ দাশগুপ্ত, দলের নেটওয়ার্কিঙের সুবিধার জন্য, প্রতিটি মোহোল্লা কমিটির নিয়ন্ত্রণে একটি ক্লাব, এবং ক্লাবের পরিষেবামূলক ছবির জন্য অ্যাম্বুল্যান্স । ক্লাব-সদস্যদের খোরপোষের দায়িত্ব ছিল মোহোল্লা নামক ঘাঁটিকর্তাদের জিম্মায়। ক্রমে সেবার পরিবর্তে এই ক্লাবগুলোই হয়ে উঠল ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনদের আঁতুড়ঘর । ক্লাবের ছেলেমেয়েদের রক্তে ঢুকে গেল সংক্রামক ব্যাধির বিষ । ক্রমশ সেগুলো চলে যেতে লাগল অজামিল তলাপাত্রদের কব্জায়, এবং বলাবাহুল্য, অজামিল তলাপাত্ররা, স্বপনরঞ্জন হালদার তা আগাম আঁচও করেছেন, যেদিকে মসনদ সেদিকে গিয়ে ভেড়ে, লাল হলে লালে, সবুজ হলে সবুজে । সরকারে বদল ঘটতেই বহু ডিগবাজি-বিশারাদ বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক ও ছবি-আঁকিয়ে, ব্যাঙ-লাফ মেরে গিয়ে পড়েছেন নতুন মসনদে । পুরস্কারপ্রাপকদের তালিকাও পালটে গেছে রাতারাতি ।
    আগে পুলিশের নিজস্ব ইনফরমার থাকত, প্রধানত ছিঁচকে চোর বা পকেটমাররা সে-কাজ করত । রাজনীতির তৈরি মাকড়জালে ক্লাবগুলো পয়দা করল নতুন ইনফরমার, যারা নিম্নমধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে, এবং সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে তাদের বিশেষ সময় লাগল না । পুজোর চাঁদার বদলে দেখা দিল তোলা আদায় । তোলা আদায় করা টাকায় প্রতিটি পুজোয় বাজতে লাগল হিন্দি ফিল্মের গান, এমনকি পাঞ্জাবি গান । ক্লাবদের আয়োজিত জলসায় গান গাইতে আমন্ত্রিত হন ডুপলিকেট কিশোরকুমার, ডুপলিকেট লতা মঙ্গেশকর বা যে হিন্দি গান তখন বাজার মাত করে রেখেছে । ক্লাবের প্রশ্রয়ে প্রতিটি রিকশা স্ট্যাণ্ডে শনিমন্দির, যা ভারতের অন্য কোনো রিকশা স্ট্যাণ্ডে পাওয়া যাবে না । সংক্রমণটা দুর্বৃত্তায়নের ; কলকাতায় মিছিলের দরকার পড়লে জড়ো করা হয় এদের । পার্টি নির্বিশেষে বিভিন্ন মিছিল ও র‌্যালিগুলোয় দেখা যায় পতাকাগুলোকে বহন করা হচ্ছে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের সৈন্যবাহিনীর ঢঙে ; পতাকাগুলোর আকারও থার্ড রাইখ বা স্তালিনিস্ত । এই সংক্রমণ চলে গেছে গ্রামস্তর পর্যন্ত । হাজার-হাজার অ্যাম্বুল্যান্স, কিন্তু তারা বিশেষ রোগীদের রোগ সারাতে নিয়ে যাবে না। আর বাছাই-করা রোগীকে নিয়ে যাবার মতন সরকারি হাসপাতাল নেই , তাই তাদের নিয়ে যেতে হবে কোনো রাজনৈতিক সমাজকর্তার নার্সিং হোমে । সরকারি স্হাস্হ্যকেন্দ্রগুলো নিজেরাই তো অসুস্হ ।
    ‘অ্যাম্বুল্যান্স সংক্রামক ব্যাধির জন্য নহে’ রচনাটিতে অজামিল তলাপাত্র বা পান্নালাল মজুমদার জাতীয় কৌমপ্রতীক নেই । গদ্যটি যুক্তিভাঙনের এবং ছবিলাফের একটি ম্যাশ-আপ ; বিভিন্ন ঘটনার, জ্ঞানের, বক্তব্যের, সংবাদের, সংলাপের ও পাঠরেচনের-- তাতে এসেছে রামকৃষ্ণ, বঙ্কিমচন্দ্র, জুনমালিয়া, এষা দেওল, বিল ক্লিন্টন-জেনিফার, অমিতাভ বচ্চন, স্যামুয়েল জনসন, গণেশের দুধপান, মহাদেবের ষাঁড়ের দুধপান, শ্বশুরের বধু-ধর্ষণ, শিশু-রক্ষাকারী পথকুকুর, মহাকাশযান, ফিনেগান্স ওয়েক, টেলিফিল্ম পিকুর ডায়েরি প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের লেখা খোকাদের জন্য সায়েন্স ফ্যান্টাসি ইত্যাদি । এবং অশ্লীলতা । অশ্লীলতা প্রসঙ্গে শঙ্খ ঘোষের কাছায় টান দিয়েছেন স্বপনরঞ্জন হালদার, তাঁকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য-কথিত ‘আমাদের বিবেক’ লেবেলটির ঠোনা মেরে । বিবেক কেন লাইন পালটালেন, সম্ভবত সে-প্রশ্নই স্বপরঞ্জনের চিন্তায় ঘূণপোকা হয়ে সেঁদিয়েছে । এক-একটি
    প্যারাতে ঘটনা থেকে ঘটনায় চলে যেতে পেরেছেন লেখক , বলা যায় অনায়াসে ।
    ‘যে নকসি কাঁথাটির বুননে প্রতি বর্গ বিঘতে ছুঁচ ও আঙুলটুপি বদলানো হয়েছিল’ রচনাটিতে স্বপনরঞ্জন হালদার প্রয়োগ করেছেন সাহিত্যিক সংকরায়ণ : সমসাময়িক ইতিহাসের চরিত্রে চাপিয়েছেন অসেতুসম্ভব ঘটনাবলী, হিন্দি গান গাইতে গাইতে দৌড়ে ফাঁসির মঞ্চে উঠে যাওয়া ধনঞ্জয়ের সঙ্গে অতিবাম রাজনীতি, জ্যোতির্ময়ীর মধুচক্রের সঙ্গে ‘হঠাৎ নীরার জন্য’ ফিল্মে সেন্সরের কেটে নেয়া সঙ্গমকালীন মুখাবয়ব, সুভাষ চক্রবর্তীর সঙ্গে অধীর চৌধুরী, ‘অপসংস্কৃতির’ বিরুদ্ধে বামপন্হী সংগ্রামের সঙ্গে লিঙ্গোথ্থানের আয়ুবর্ধক পাউডারের বিজ্ঞাপন, এবং সিন্ধুসভ্যতার ‘অবক্ষয়’ সম্পর্কে ডি ডি কোশাম্বীর বক্তব্যের হোর্ডিং । কবিতার লাইন ব্যবহার করে তিনটি ভাঁজে কথাগুলো চারিয়ে দিয়েছেন স্বপনরঞ্জন হালদার । ভাঁজের মধ্যেকার কাজে গাঁথুনি দেয়া হয়েছে ডেরিভেটিভ বা আহরিত গদ্যের, যেখানে তিনি ফ্লাক্সাস-পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন-- একই সঙ্গে উইট এবং বালখিল্য, যা পুরোপুরি একটি অ্যান্টি-আর্ট হস্তক্ষেপ হিসাবে ইউরোপে প্রথম প্রয়োগ করেছেন শিল্পী-সাহিত্যিকরা । এই পদ্ধতিকে রেডিমেড ম্যাডনেসও বলা হয়েছে, কেননা যে সমাজব্যবস্হা চলে গেছে ভোগবাদী বাজারের দখলে, পুঁজিবাদের প্রাথমিক স্তরে যাবার আগেই, সেখানে ম্যাডনেসকে অস্ত্র হিসাবে প্রয়োগ করা ছাড়া উপায় নেই । সুতরাং যে যুবতী পাকা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ‘ফটাফট’ কাপড়চোপড় খুলে ফেলছিল সে আদপে এই বিকৃতমস্তিষ্ক ব্যবস্হাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিল তার সর্বস্বহীনতা প্রদর্শন করে । স্বপনরঞ্জন হালদার স্পষ্ট করে দিতে চাইছেন যে কোন নকশি কাঁথা তিনি চেয়েছিলেন আর কোন নকশি কাঁথা তিনি শেষ পর্যন্ত পেলেন যেটি বুনতে আঙুলটুপি পরা সত্ত্বেও ক্ষত থেকে বাঁচানো যাচ্ছে না ।
    পরের গদ্যে, যার শিরোনাম ‘একটি গ্রামীণ পরচর্চা কেন্দ্রে অগ্ন্যুৎপাত ও শিলাবৃষ্টিজনিত ক্ষয়ক্ষতি, যতটুকু যা জানা গেছে’ স্বপনরঞ্জন হালদার প্রয়োগ করেছেন অ্যাবসার্ডিস্ট কনট্রাস্ট : অস্তিত্বের সহজাত মর্মার্থ-জিজ্ঞাসা ও তার উদ্দেশ্যসন্ধান, এবং তাতে অবধারিতভাবে বিফল হবার আগাম আশঙ্কা । গদ্যটি যেখানে শুরু হয়, সেখানেই শেষ হয়, অর্থাৎ একজন মানুষের জখম অবস্হায় পড়ে থাকা এবং তাকে ভবঘুরে মনে করে জনগণের অবহেলা । তার মাঝে একের পর এক ভাবনা, ভাবকল্প, ঘটনা, যৌনইশারা ও তাঁর মগজের অবধারিত কাঠপিঁপড়ে বিজেপি-সিপিএম-তৃণমূল এটসেটরার রাজনৈতিক চিন্তার স্লাইড সাদা-কালো ম্যাজিক লণ্ঠনে দেখাতে থাকেন স্বপনরঞ্জন হালদার, যাদের মধ্যে আপাতসম্পর্ক বলতে ওই অ্যাবসার্ডিস্ট কনট্রাস্টের কুটিল-কৌতুক। অবশ্য প্রতিটি গদ্যেই, গদ্যশরীর আর তার শিরোনামের মাঝে ওই কুটিল-কৌতুক বজায় রেখেছেন স্বপনরঞ্জন হালদার ; কয়েকটিতে শিরোনামের তলায় নামকরা লোকেদের উদ্ধৃতিও দিয়েছেন সেই মেজাজে ।
    ‘ও হুজুর--’ গদ্যে মনের সুখে ব্রিকোলাজ প্রয়োগ করেছেন স্বপনরঞ্জন হালদার, পেইনটিঙে বা কাটাজোড়া ছবিতে যেভাবে কোলাজ ব্যবহার করা হয় । নতুন ছাপাপ্রযুক্তির জন্য তাঁর সুবিধা হয়েছে, যা ডাডাবাদীদের এবং বিটদের নাগালে ছিল না । এই গদ্যেও রয়েছে প্রথাগত সংস্কারজনিত যৌনসম্পর্কের সীমালঙ্ঘন, যা ইপ্সিতা নামের একজন বাঙালি বউ করছে, কিন্তু ডায়না স্পেনসরকে করতে হয়নি যখন ডায়না ‘রিলেশানশিপ’ গড়ে তুলেছে একের পর এক দশ জনের সঙ্গে, যাদের নামের তালিকা দিয়েছেন স্বপনরঞ্জন, ডায়নাদের দেশে অমন সীমারেখা বহুকাল তামাদি হয়ে গেছে বলে । পরের প্যারায় আবার বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারে চুলের মুঠি ধরে মেয়েকে শাস্তি দিয়ে মা জানতে পারেন যে তার শিক্ষক তার সঙ্গে যৌনসম্পর্ক পাতিয়েছে । এভাবেই দৃশ্য থেকে দৃশ্যে গদ্যের ব্যাঙনাচন খেলিয়েছেন স্বপনরঞ্জন হালদার । পরের পৃষ্ঠায় চিরকুটের চিপ্পিমারা গদ্যটুকরো, সংবাদপত্র থেকে, শ্লীলতাহানি, মানববোমা, ধর্ষণ, মন্দিরে নারী-পুরুষ বৈষম্য বিষয়ক । কিশোর নায়ক আদিত্যর সঙ্গে মনীষা কৈরালার ফিল্মের সংলাপ । আর, বহু বহু বহু বহু রচনায় যেমন শশী-কুসুমের বাইনারি-অপোজিট সম্পর্কের কথাটি উল্লেখ করা হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়ানে, মানিকবাবুর জ্ঞানপরিসরের যৎসামান্য দখল নেবার আশায়, স্বপনরঞ্জন হালদারও করেছেন ।
    আমার মনে হয়েছে, আমাদের, অর্থাৎ আমার ও স্বপনরঞ্জন হালদারের যৌন-জীবনের সময়ে, যৌনসম্পর্কের যে সামাজিক সীমাগুলো ছিল, তার চৌহদ্দি অনেক বেড়ে গেছে, বিশেষ করে ভারতের মেট্রপলিসগুলোয়, এবং স্বপনরঞ্জন হালদার সেগুলোর সঙ্গে নৈতিকতার তাল রাখতে পারেননি । ‘নাইট-আফটার’ গর্ভনিরোধক পিল এবং প্রযুক্তির দ্রুতি তোলপাড় ঘটিয়ে দিয়েছে যুবক-যুবতীদের যৌনসম্পর্কে, প্রেমিক-প্রেমিকার সংজ্ঞায়, ভারতের আদালতে লিভ-ইন সম্পর্কের স্বীকৃতিতে । তাঁর গদ্যের ছককাটা দাবার ঘরগুলোয় যখন যেমন ইচ্ছে বোড়ে, ঘোড়া, উট, হাতিদের চালনা করার সময়ে লেখক ওই পরিবর্তনের আভাস দিতে পারেননি । ব্যক্তিক্রিয়ায় এককত্বের উদ্ভবের হদিশ দিতে পারেননি । আসলে, সতত নির্মীয়মান প্রতিস্বের বিশাল কালপ্রবাহ থেকে এক খাপচা তুলে নিয়ে কি বলা যায় যে ওটিই আমার স্বপ্ন ছিল ? একজন মানুষের অজস্র মানসিক অবস্হানের ফাঁকে-ফাঁকে ‘সুস্পষ্ট’ জলবিভাজক থাকে নাকি ? টুকরো তুলে-তুলে যদি জীবনের অতীত কালপ্রবাহে নজর দিই, তাহলে নিজেরই বহু চাহিদা নিজের কাছে স্ট্রেঞ্জ ঠেকবে । স্বপনরঞ্জন তাঁর গদ্যকে চালিয়ে নিয়ে গেছেন এই স্ট্রেঞ্জনেসের উড়ন্ত বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে । ফলে একনিষ্ঠ পাঠক ছাড়া অন্যেরা ধৈর্য হারিয়ে ফেলবেন তাঁর সনাতনী সংস্কারে কিঞ্চিদধিক আচ্ছন্ন চিন্তাভাবনা এবং চরম পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ।
    ‘ঝুমকা গিরা রে / বেরেলি কা বাজার মে...’ রচনাটি শুরু হয়েছে রামকৃষ্ণ কথিত একটি অ্যানেকডোট দিয়ে । আমার মনে হয় হিন্দি গানটায় ওই লাইনটা ছিল ; ‘বরইলি কে বাজার মেঁ’ । এই গদ্যের ধারাটিকে কী বলব ? সাবিত্রী-মদনের সম্পর্কের সূত্র ধরে গল্পের মতো আরম্ভ হয়ে ক্রমশ অন্যান্য ঘটনার সঙ্গে যেভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন লেখক, একে বলা যেতে পারে পরাবাস্তব কৌতুক । গদ্যের অস্বাভাবিক পরিমিতিবোধে সুচিন্তিত অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে লেখক গড়ে তুলতে চেয়েছেন এমন সমস্ত আচরণ ও পরিণাম যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে যুক্তিহীন, উদ্ভট পরস্পরবিরোধিতায় মোড়া, আকস্মিক, এবং, বাংলা প্রতিশব্দ মনে আসছে না বলে ইংরেজিতাই বলি, Non-Sequitur. গল্পের রেল-লাইন ধরে একটু এগিয়েই ঘটনার কামরা গুলো আলাদা হয়ে যেতে থাকে, অন্য ঘটনার কামরায় জুড়ে গিয়ে আবার ফিরে আসে আগেকার রেল-লাইনের কামরার সঙ্গে । পরাবাস্তব কৌতুক এই জন্য বলছি যে স্ট্রিম অব কনশাসনেস বলতে যে প্রবাহ বোঝায় তা একনাগাড় চিন্তার একই লাইন বরাবর এগিয়ে যাবার কথা । স্বপনরঞ্জন হালদার দুম করে সেই প্রবাহে ভিন্ন চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছেন । ফলে গদ্যটির চিন্তাধারায় ঘটছে অরাজকতা, যে অরাজকতা, সামাজিক-রাষ্ট্রিক-নৈতিক অরাজকতা ও অপ্রতিসাম্য, তাঁর ব্যক্তিগত স্বপ্নভঙ্গের কারণগুলোর অন্যতম ।
    একই প্যারায়, সাবিত্রী-মদনের গল্প শুরু হয়ে তারের ওপর দিয়ে হাঁটতে-থাকা জাঙিয়ে-কাঁচুলি যুবতী ; তা থেকে দুম করে স্বাধীনোত্তর কংগ্রেসি ‘অপশাসন’ থেকে অজয় মুখোপাধ্যায়, জ্যোতি বসু, হরেকৃষ্ণ কোঙার, জোতদার, খাস জমি, লাল ঝাণ্ডা, মেহনতি মানুষের লড়াই ; সেখান থেকে আন্দামান-নিকোবরের সরে যাওয়া, এবং ফিরে সাবিত্রী-মদন । এর পরের প্যারায় চলে আসে লেখকের স্বপ্নভঙ্গের খতিয়ান : হকারদের ফুটপাত, বস্তি উচ্ছেদ, শহর-শহরতলিতে শপিং মল, রেড স্যালুটু টু বেনি স্যান্টোসা, পুঁজিপতির হাতে গ্রেট ইস্টার্ন, বিমান বন্দরের বেসরকারীকরণ, আন্দোলন ইত্যাদি ।
    পরের প্যারায় চিন্তাগদ্যের ট্রেন ফেরে সাবিত্রী-মদনের রেললাইনে, জাঙিয়া-কাঁচুলি যুবতীতে, এবং আবার দুম করে স্বপ্নভঙ্গের রেললাইনে, শিল্পমন্ত্রী নিরুপম সেনের শিল্পস্হাপন বিষয়ক অবামপন্হীয় বক্তৃতায় । এখানে স্তালিনের উক্তিতে, ইংরেজিতে দিয়েছেন লেখক, জানি না ভুলটা ইচ্ছাকৃত না ছাপার ভুল, Live শব্দটা Leave ছাপা হয়েছে । যাই হোক, দুম করে গদ্যের চিন্তার রেললাইন পালটে চলে যায় ‘ব্যণ্ডিট কুইন’ ফিল্মে বিক্রম মাল্লা আর ফুলন দেবীর সঙ্গম দৃশ্যে । শেখর কাপুর এবং লেখক একযোগে এখানেই ‘কাট’ ঘোষণা করেছেন এবং লেখকের চিন্তার রেলগাড়িটি বাফারে ধাক্কা মেরে থেমেছে । যে ভাবনা নিয়ে ডিসকোর্সটি এগোয়, সেখানে ফেরে না । স্বপনরঞ্জন হয়তো বলতে চেয়েছেন, যে ডিসকোর্সের পত্তন বামপন্হী সরকার করেছিল, সেখান থেকে বহু দূরে, অন্য ভাবনায় চলে গেল তারা , রাষ্ট্রযন্ত্র হয়ে গেল ভবঘুরে, তার কুশীলবদের মগজ ভরে
    গেল ধোঁয়ায় ।
    ‘দীনময়ী, সিমন দ্য বভ্যোয়া ও পবিত্রর বউ’ গদ্যটি নারী-পুরুষ ‘রিলেশানশিপ’ নিয়ে । বাংলায় বোধহয় একে সম্বন্ধ-পাতিয়ে-থাকা বলা যায় । জাঁ পল সার্ত্রে-সিমন দ্য বভ্যোয়া, দীনময়ী-ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং পবিত্র সূত্রধর-পবিত্রর বউ জুটিদের সম্পর্কের জটিলতাকে অনুধাবন ও উপস্হাপন করতে চেয়েছেন লেখক তাঁর নিজস্ব গদ্যশৈলীতে । এই গদ্যে অন্ধকার চৌকাঠে ঠোক্কোর খাবার জিগস-হেঁয়ালি তেমন নেই । জাঁ পল সার্ত্রে যেমন অন্য নারীদের সঙ্গে সঙ্গমসম্পর্ক পাতাতেন, তেমনই সিমন দ্য বভ্যোয়া পাতাতেন অন্য পুরুষদের সঙ্গে ; অথচ দুজনে দুজনের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে নিজেদের মধ্যে তাঁদের পরস্পরের দেহ-মনের স্হায়ী সম্পর্কটি তার দরুন যেন বিঘ্নিত না হয় । পরস্পরের কাছে লুকিয়ে সম্পর্ক পাতানোর ‘চিটিং’, যা সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে ঘটে থাকে, তার আত্ম-কলুষ থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে পেরেছিলেন তাঁরা । ভারতের মেট্রপলিসগুলোয়, বিশেষ করে মুম্বাই বাঙ্গালোর দিল্লিতে, যৌনসম্পর্ককে আরেকটি স্তরে নিয়ে গেছেন বৈভবশালীরা--- সমবেত যৌনতার উৎসব উদযাপনের মাধ্যমে দম্পতিদের কাছে স্বীকৃত যে যুগ্ম-দোসররা নির্বাচিত রাতে আরেকজন বা আরও অনেকের সঙ্গে দেহসম্পর্কের আনন্দ উপভোগ করবে ; তাতে পরস্পরের কাছে যদিও লুকোছাপার ব্যাপার নেই, পুলিশ-প্রশাসনের আড়ালেই করতে হয় । বিত্তশালী বর্গে বিয়ে এড়িয়ে ‘রিলেশানশিপ’ গড়ে ‘লিভ ইন’ থাকার রেওয়াজ বাড়ছে । স্বপনরঞ্জন হালদার বলেছেন, “‘শান্তি’ ও ‘তৃপ্তির’ মধ্যে যে অমোচনীয় বৈরিতা, দ্বন্দ্ব, যার বিপরীতে দ্ব্যর্থকতায় লুকিয়ে রাখা অস্তিত্বের প্রকট অহমিকা, সমূহ সংঘটনের অন্তরঙ্গ, এক অন্ধ মৎস্যজীবীর আমিষ অন্বেষণ । অনির্বাণ তুমূল অস্হিরতায় ‘শান্তি’ বস্তুত বয়ে আনে আরও মদ ও মাৎসর্য -- উত্তুঙ্গতার হাতছানি , নেশা ।” আমার মনে হয়, ‘শান্তি’-’তৃপ্তির’ দ্বন্দ্ব শুধু নয়, বিপদের আকর্ষণ থেকে ব্যক্তিএকক নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারে না, সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়তে চায় । তাই মেট্রোপলিসগুলোয় আমদানি হয় অঢেল ‘পার্টি ড্রাগ’, আর বৈভবশালীদের শহরতলীর খামারবাড়িগুলোয় রেভ পার্টির রমরমা । লর্ড কর্নওয়ালিসের হাতে গড়া জমিদারদের সান্ধ্যকালীন বাগানবাড়ি আর বউবাজারের কথা মনে পড়িয়ে দ্যায়।
    পবিত্র সূত্রধর কাজ করে দুবাইতে, প্রচুর টাকা পাঠায় বউকে, সে-টাকায় বউ ধনী হয়ে ওঠে এবং নিজের দেহের খোরাক মেটায় নাড়ু মল্লিকের সঙ্গে । পবিত্র সূত্রধর আর তার বউকে লুকিয়ে সেই কাজ করতে হয় যা সার্ত্রে এবং সিমন লুকিয়ে করেননি । তার কারণ পবিত্র সূত্রধরের শ্রেণি ও শিক্ষা সার্ত্রের সমকক্ষ নয়, সংস্কৃতিও সম্পূর্ণ ভিন্ন । পবিত্র সূত্রধর, তার বউ আর নাড়ু মল্লিকের সম্পর্কের মাঝে যে অবিশ্বাসের বনেদ তা বঙ্গসংস্কৃতির তৈরি সনাতন সম্পর্কজালে আটক । নিম্নবিত্ত থেকে ওপরের দিকে উঠে গেলে তারা বিবাহবিচ্ছেদের আশ্রয় নিতে পারত, যেমন আকছার ঘটছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত দম্পতিদের মধ্যে ।
    লেখক প্রসঙ্গ টেনেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং তাঁর স্ত্রী দীনময়ীর । নিজের বিপুল কর্মযজ্ঞের পাহাড়ে বসে ঈশ্বরচন্দ্র তাঁর স্ত্রী দীনময়ীকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েছিলেন ; তাঁর মনে পড়ে বিয়ের ৪২ বছর পর । উপেক্ষিতা দীনময়ীকে ঈশ্বরচন্দ্রের জীবনীকাররাও কোনো গুরুত্ব দেননি, যদিও রামায়ণ আলোচনার সময়ে লক্ষ্মণের স্ত্রীর একাকীত্ব ও উপেক্ষা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে । স্বপনরঞ্জন হালদার বক্স আইটেম হিসাবে একটি বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট দিয়েছেন, ‘জিনেই লুকিয়ে যৌন রহস্য’ ; মস্তিষ্কে ডোপামিন রাসায়নিকের ক্ষরণ দ্বারা একজনের যৌনতা পরিচালিত হয় । তবে কি বিদ্যাসাগরের মস্তিষ্কে অমন ক্ষরণ একেবারেই হতো না ? লেখক কোনো উত্তর দেননি। বিদ্যাসাগরের গবেষকরাও ভয়ে বিষয়টি আলোচনা করেননি কখনও । গদ্যটির শেষে তাই একটি ফাঁকা পৃষ্ঠা রেখে দিয়েছেন স্বপনরঞ্জন হালদার ।
    ‘ইন্ট্রোডাকশন টু অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ রচনাটিতে স্বপনরঞ্জন হালদার আবার ফিরে গেছেন তাঁর সারোগেট বা ইনটারটেক্সচুয়াল গদ্যশৈলীতে । জানি না ‘পল্লবগ্রাহী’ টুকরোগুলোর ভেতর দিয়ে তিনি নিজের জীবনস্মৃতির দিকে, ভাবনাচিন্তার পাটাতনে, পাঠককে টেনে নিয়ে যেতে চাইছেন কি না । কোন অংশটা কার
    রচনা থেকে তোলা তা আমার স্মৃতির, পড়াশোনারও, বাইরে । এই রচনাটির বিশ্লেষণ হিসাবেই আমি মুখবন্ধরূপে জহর সেনমজুমদারের ‘নন্দীগ্রাম’ কবিতাটা তুলে দিয়েছি । স্বপনরঞ্জন হালদার তুলে দিয়েছেন ঋত্বিক ঘটকের কথা : “ গল্পের যুগ শেষ হয়ে গেছে, এখন এসেছে বক্তব্যের যুগ।” তারপর পাসোলিনির : The real marxist must not be a good marxist. His function is to put orthodoxy and codified certainties into crisis. His duty is to break the rules. গদ্যের নিয়মাবলী প্রতিটি রচনাতেই ভেঙেছেন স্বপনরঞ্জন হালদার । কিন্তু গুড মার্ক্সিস্ট যে হতে পারেননি, হওয়া সম্ভব নয়, তাও ওই ভাঙচুরের ভেতর দিয়ে যেতে-যেতে জানান দিয়ে গেছেন । যাদের গুড মার্ক্সিস্ট ভেবেছিলেন, তারাই তাঁকে ক্ষমাহীন পরাজয়বোধের খাদে ঠেলে ফেলে দিয়েছে ।
    রচনাটিতে কন্ঠস্বরগুলোর মাঝের প্রতর্ককে পাঠকের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন লেখক , যার দরুণ কোনো একটি টেক্সট কেন্দ্রীয়তা দাবি করার মতো থাকছে না, এমনকি স্বপনরঞ্জন লেখকের ভূমিকা থেকেই সরে গিয়ে বহুস্বরিক এবং সংকরায়িত বাকক্ষেত্রে আছড়ে পড়ে এই ঘোষণা ধার নিচ্ছেন : Art is not a pleasant trip, it is a mill that grinds. প্রশ্ন হল, ‘আর্ট’ নামে কোনো ব্যাপার আর আছে কি, এই ব্যবহার-করো-ফেলে-দাও কালখণ্ডে ? ‘ব্র্যাণ্ড নেম’ প্রয়োগ করে টাকা কামাবার কালখণ্ডে ?
    স্বপনরঞ্জন হালদারের তৈরি পাঠবস্তুর বাস্তবের সঙ্গে বহির্জগতের বাস্তবের মিশেল ঘটিয়ে লেখক দেখাতে চেয়েছেন যে এই দুটি পরস্পরের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে তাদের ছাড়ান যাবে না , তাদের পরস্পরের সীমাগুলো অপরিহার্যভাবে ঘোলাটে, এবং দুরূহভাবে কৌশলী । প্রতি প্যারায় ও তার ফাঁকফোকরে, স্বপনরঞ্জন হালদার পাঠককে মনে করিয়ে দিতে চাইছেন যে বর্তমানে সে এমন একটি রচনা পড়ছে যা আরেকজন মানুষ খেটেখুটে গড়ে তুলেছে -- আর এই সম্পর্কটি টেক্সটের সঙ্গে পাঠকের, পাঠকের সঙ্গে লেখকের, পাঠকের সঙ্গে পাঠকের, এবং তা তুলনামূলকভাবে গদ্যে বর্ণিত ঘটনাবলী ও চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের চেয়ে গভীর ও আন্তরিক, তা পাঠক যেন ভুলে না যান । ঘটনা বলতে-বলতে চটজলদি আরকটি ফ্যাঁকড়ার দিকে এগোন স্বপনরঞ্জন হালদার, চলে যান ভিন্ন প্রসঙ্গে, যাতে পাঠক তার পাঠকত্বের ভূমিকা ভুলে না যায়, যাতে সে ভুলে না যায় যে লেখাটা স্বপনরঞ্জন হালদারের মগজ থেকে বেরিয়েছে । এই প্রক্রিয়ায় স্বপনরঞ্জন হালদার দুটি সতত সক্রিয় আত্মচেতনার জন্ম দিতে চেয়েছেন : পাঠক টের পাচ্ছে যে সে আসলে পাঠক, আর বইয়ের গদ্য বুঝিয়ে দিতে চাইছে যে তা নির্মিত ঘটনাবলীর সমাহার ।
    শেষ গদ্য ‘বিলিভ মি, যাহা বলিব সত্য বলিব’ । এই গদ্যে স্বপনরঞ্জন তাঁর সবকটি কৌশল তারিয়ে-তারিয়ে ফুরিয়ে ফেলতে চেয়েছেন । এখানে পৌঁছে স্বপনরঞ্জন অস্বীকারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন অন্যান্যদের কন্ঠস্বর, চেষ্টা করেছেন অবিনির্মাণের সাহায্যে নির্মাণ করতে । ডাডাবাদীরা আর পরাবাস্তববাদীরা যেমন আহরণ করেছিলেন ইউরোপের উপনিবেশগুলোর সংস্কৃতি থেকে, স্বপনরঞ্জন আহরণ করতে চেয়েছেন ডাডাবাদীদের থেকে, বিট আন্দোলনকারীদের থেকে, বাংলা সাহিত্যের যে বইগুলো পড়ার পর তাঁর মগজে এই গদ্যটি লেখার সময়ে রেশ রয়ে গেছে সেই হেলাফেলা থেকে--- উদ্দেশ্য, তাঁর গদ্যশৈলীর জন্য উপাদান সংগ্রহ, যে উপাদানগুলোকে বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্যের মুখোমুখি দাঁড় করালে প্রতিস্পর্ধী ও বেমানান দেখাবে । তিনি নিজের গদ্যের মধ্যে ঠিক সেইভাবে আনন্দবিহ্বল, যেভাবে নর্তক তার নাচের সময়ে হয়ে ওঠে ; দর্শকদের আনন্দের চেয়ে নর্তকের নিজে নাচবার আনন্দ, নাচবার সময়ে সারা শরীর জুড়ে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপভোগের খেলা হিসাবে তার অস্তিত্ব ছেয়ে ফেলে, অনেকটা সেরকম ।
    গদ্যটিতে আচমকা নিজের খোলস ছেড়ে একআধবার বেরিয়ে তাঁর কটু আলোচকদের দিকে ছোরাছুরি চালিয়ে দিয়েছেন স্বপনরঞ্জন হালদার । চতুষ্পার্শের সন্নিহিত ইন্দ্রিয়গোচর জগত থেকে তথ্য, প্রভাব ও ঘটনার টুকরোটাকরা নির্বাচন করে বাস্তব সম্পর্কে যে ব্যক্তিগত ধারণা তিনি গড়ে তুলেছেন, তাকে ঘিরে যে যাপনযাত্রা, অন্যান্যদের মতামতের ঘূর্ণির ভেতরে যাতায়াত করে যে দৈনন্দিন , যেগুলো মোটামুটিভাবে সেই
    লোকগুলোরই অভিজ্ঞতাপ্রসূত, এবং যেগুলোকে সেই লোকগুলো মনে করেছে সত্য, তাদের যাচাই করেছেন স্বপনরঞ্জন হালদার, চটে উঠেছেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন, প্রশ্ন তুলেছেন তাদের সত্যতা সম্পর্কে । নানাবিধ অবস্হা উপস্হাপন করে তাদের অসংখ্য মর্মাথের সম্ভাবনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি সত্য ব্যাপারটির এড়িয়ে যাবার ক্ষমতাকে নিয়ে খেলা চালিয়ে গেছেন । এ যেন যে প্রশ্নের উত্তর হয় না তাকে সমাধানের প্রয়াস । সে সমস্যার কোনো নাম নেই । ফলে অবসন্ন লেখক আটকে পড়েছেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় দুঃখের ভুলভুলাইয়ায় । তাঁর গদ্যকে সেকারণে বলতে হয় Endless defferal. নিজের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে-দিতে স্বপনরঞ্জন হালদার লিখে গেছেন তাঁর পরাজয়বোধের আত্মজীবনী ।
    ( রচনাকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৪ )
  • m | 012312.60.6723.6 | ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮ ১১:১৫541293
  • কবি শম্ভু রক্ষিত : হাংরি আন্দোলন থেকে মহাপৃথিবী
    মলয় রায়চৌধুরী
    ‘তিতীর্ষু’ পত্রিকার শম্ভু রক্ষিত সংখ্যায় ( ২০১৭ ) শম্ভু রক্ষিত ‘আমি স্বাধীন’ শিরোনামে লেখাটি শুরু করেছেন ‘আমি স্বাধীন । আমি হাংরি।’ ঘোষণার মাধ্যমে । ওই প্রবন্ধেই তিনি বলেছেন, ‘মলয় রায়চৌধুরীদের সাথে পরিচয় হওয়ার ফলে হাংরি জেনারেশনের সাথে আমিও জড়িয়েছিলাম ।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘এর পরেও বাংলা সাহিত্যে অনেকে আন্দোলনের কথা বলে থাকেন ; কিন্তু আমার মতে হাংরি-র পর বাংলা সাহিত্যে সেই অর্থে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো আন্দোলন হয়নি ।’ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি চতুর্দশ লিটল ম্যাগাজিন মেলা ২০১২ স্মারক পত্রিকায় প্রকাশিত স্বরূপ মন্ডলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘কবিতা লেখার প্রেরণা প্রথম পাই মলয় রায়চৌধুরীর কাছ থেকে । ওঁর সাথে কফিহাউসে আলাপ । মলয় রায়চৌধুরী ও উৎপলকুমার বসু এই দু’জনের কাছেই আমি কবিতা লেখা শিখি।’
    হ্যাঁ, শম্ভু রক্ষিতকে আমিই হাংরি আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য উসকে ছিলুম । ওনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ১৯৬৩-৬৪ নাগাদ, সবে কবিতা লেখা আরম্ভ করেছেন, উৎসাহ দেবার মতন বন্ধুর প্রয়োজন, থাকেন মামার বাড়িতে, হাওড়ার কদমতলায় । হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে ওনার আগ্রহ প্রথম থেকেই এমন ছিল যে উনি নিজেই একটা হাংরি পত্রিকা প্রকাশ করার ইচ্ছের কথা জানান । আমরা সেসময়ে আন্দোলনের পক্ষ থেকে এক পাতার লিফলেট প্রকাশ করতুম, বড়োজোর এক ফর্মার বুলেটিন । শম্ভু ওনার সম্পাদনা আর প্রকাশনায় হাওড়ার বাড়ি থেকে বের করলেন ‘ব্লুজ’ নামে একটি পত্রিকা । কতোগুলো সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল মনে নেই, তবে শম্ভুর মধ্যে ভাষার প্রতিষ্ঠান ভাঙার যে হলকা ছিল তা পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতেই ধরা পড়েছিল । সেই সংখ্যায় উৎপলকুমার বসুর একটা ছোটো গদ্যও ছিল ভাষার প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলার ডাক দিয়ে ।
    মামারবাড়িতে তাঁর নিজস্ব একটি ঘর ছিল । শম্ভুর আশা ছিল যে তিনি বাড়ির একটা অংশ, অন্তত তাঁর ওই প্রিয় ঘরটা, পাবেন । কিন্তু দিদিমা মারা যাবার পর তাঁর মামারা তাঁকে ওই বাড়ি থেকে উৎখাত করেন, ( শম্ভুর কথায়, সিপিএম-এর ক্যাডারদের সাহায্যে ) আর তাই নিয়ে বেশ কিছুকাল মামলা করেছিলেন শম্ভু, যদিও শেষ পর্যন্ত মামলায় হেরে গিয়ে দেশের বাড়িতে ফিরে যান ।
    শম্ভু রক্ষিতের আদিবাড়ি মেদিনীপুরের বিরিঞ্চিবেড়িয়া গ্রামে, যেখান থেকে তিনি ‘মহাপৃথিবী’ নামের প্রায় নিয়মিত একটি পত্রিকা গত ছেচল্লিশ বছর যাবত সম্পাদনা ও প্রকাশ করে চলেছেন । কবিরাও ওনার ‘মহাপৃথিবী’ প্রকাশনা থেকে নিজেদের কাব্যগ্রন্হ প্রকাশ করে গর্ববোধ করেছেন । তাঁর জন্ম মামার বাড়িতে, ১৯৪৮ সালের ১৬ই আগস্ট । কিন্তু শৈশব কেটেছে বিরিঞ্চিবেড়িয়ায় ; পড়াশোনা হাওড়ার বাড়ি থেকে । তাঁর বাবা নন্দলাল রক্ষিত সিন্দুকের ব্যবসা আর চাষবাস করতেন ; স্বাভাবিক যে আধুনিকতার ধাক্কায় এই ধরণের ব্যবসা ক্রমশ ব্র্যাণ্ডেড লোহার আলমারি আর অ্যালুমিনিয়ামের ট্রাঙ্কের কাছে জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো । ফলে চাষাবাদ করেই তাঁকে সংসার চালাতে হতো । শম্ভুর মায়ের নাম রাধারানি দেবী ।
    শম্ভু রক্ষিত যে হাংরি আন্দোলনে ছিলেন, জানি না কতোজন জানেন ব্যাপারটা । যাঁরা পরে আদালতে মুচলেকা দিয়ে হইচই করলেন আন্দোলনটা নিয়ে, তাঁরা শম্ভুকে পাত্তা দিলেন না, অথচ প্রথম থেকেই শম্ভু রক্ষিত একেবারে নতুন ধরণের কবিতা লেখা আরম্ভ করেছিলেন । কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশকরা “হাংরি জেনারেশন” নামে যে-সমস্ত সংকলন প্রকাশ করেছেন তাতে উল্টো-পাল্টা অনেকের লেখাপত্র আছে, এমনকি হাংরি আন্দোলনের সময়ে জন্মাননি যাঁরা, তাঁদের লেখাও সংকলিত হয়েছে, কিন্তু শম্ভু রক্ষিতের লেখা সেগুলোয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। শম্ভু রক্ষিতেরও তাতে বিশেষ কিছু আসে-যায় না ।
    ‘তিতীর্ষু’ পত্রিকায় অধ্যাপক সুমিতা চক্রবর্তী ‘হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পটভূমি : শম্ভু রক্ষিত’ প্রবন্ধে লিখেছেন যে হাংরি আন্দোলনের ‘অষ্টম সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৪তে এবং অশ্লীলতার দায়ে সংখ্যাটির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয় । এই মামলায় অল্পসল্প হাজতবাস ছাড়া শেষ পর্যন্ত বিশেষ শাস্তি কারোরই হয়নি । বাংলার কবিরা একযোগে কবিদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।’ সুমিতা চক্রবর্তী যে ভুল বক্তব্য রেখেছেন হুবহু সেই একই বক্তব্য দেখা যায় আধ্যাপক শঙ্খ ঘোষের ‘শব্দ ও সত্য’ প্রবন্ধে : ওনারা দুজনেই জানেন না যে এই মামলা ৩৫ মাস চলেছিল আর ব্যাংকশাল কোর্টে আমার দুশো টাকা জরিমানা ( সেই সময়ে সর্বোচ্চ ) অনাদায়ে একমাস কারাদণ্ডের সাজা হয়েছিল । বলা বাহুল্য যে কবিরা একযোগে আমাদের পাশে দাঁড়াননি, শঙ্খ ঘোষও ছিলেন না আমাদের পাশে । সুমিতা চক্রবর্তী যে হাংরি বৈশিষ্ট্যগুলো শম্ভুর কবিতায় চিহ্ণিত করেছেন তা স্বীকার্য । আরেকটা কথা, ওই সংখ্যাটা মোটেই অষ্টম সংখ্যা নয় ; তার আগে শতাধিক বুলেটিন বেরিয়েছিল, বহু বুলেটিন স্টেনসিল করে, যাতে সুবিমল বসাকের আঁকা ড্রইং থাকতো ; বহু পোস্টার বুলেটিনও বের করেছিলেন অনিল করঞ্জাই এবং করুণানিধান মুখোপাধ্যায় ।
    অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষ সম্পর্কে ‘নতুন কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় ( এপ্রিল - জুন ২০১৭ ) ‘এক কৃত্তিবাসীর আত্মকথা’ স্মৃতিচারণে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় যে কথাগুলো লিখেছেন, তা, আমার মনে হয় লেখা জরুরি ছিল। শরৎ লিখেছেন, ‘শঙ্খ ঘোষ মহাশয় কিছুদিন আগে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের হাত থেকে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার গ্রহণ করলেন । কয়েক বছর আগে প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর হাত থেকে তিনি একটি পুরস্কার নিতে অসন্মত হন, কারণ তিনি ছিলেন হিন্দুবাদী, বিজেপি পার্টির নেতা । শঙ্খ ঘোষ যে সিপিএম-সিপিআই দলের সমর্থক, এ-কথা আমরা আগেই জানতাম, কিন্তু একথা জানতাম না প্রধানমন্ত্রীর পদ পেলেও পার্টির দুর্গন্ধ মোছে না।’
    হাংরি আন্দোলনের পক্ষ থেকে শম্ভু পত্রিকার নাম ‘ব্লুজ’ ( Blues ) কেন রেখেছিলেন আমার ঠিক মনে নেই, কয়টা সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল, তাও মনে নেই। আমরা তখন গাঁজা-আফিম-চরস-এলএসডি খেলেও শম্ভু খেতেন না সেই সময়ে, মানে আমরা দলবেঁধে বেরোবার সময়ে শম্ভুকে সঙ্গে পাইনি । কাঠমাণ্ডুতে আর খালাসিটোলাতেও তাঁকে সেই সময়ে দেখিনি কোনো দিন । বয়স কম হবার দরুন বেশ ইনোসেন্ট চেহারা ছিল শম্ভু রক্ষিতের । তখন শম্ভু হাওড়ার ঠাকুরদত্ত লেনে থাকতেন । হাংরি বুলেটিন ৯৯ নম্বরের প্রচ্ছদে হাংরি আন্দোলনকারীদের মুখগুলোর ফোটো সাজিয়ে একটা কোলাজ তৈরি করেছিলুম, তাতে আছে শম্ভুর ইনোসেন্ট মুখখানা ।
    শম্ভুর কবিতা কয়েকটা হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছিল । প্রকাশিত বুলেটিনগুলো নিজেদের সংগ্রহে রাখিনি বলে অধিকাংশই হারিয়ে গেছে । সম্প্রতি হিডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড্যানিয়েলা ক্যাপেলো এসেছিলেন, যিনি হাংরি আন্দোলন নিয়ে পিএইচডি করছেন, তাঁর কাছ থেকে জানতে পারলুম বিদেশের বিভিন্ন আরকাইভে হাংরি বুলেটিনগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে, এমনকি তিনি মুখোশ আর বিয়ের কার্ডও দেখেছেন কার্ল ওয়েসনারের আরকাইভে । প্রথম যে কবিতা শম্ভু লিখেছিলেন তার শিরোনাম ছিল ‘আমি বাঁচতে চাই’ ।
    হাংরি আন্দোলনের সময়ে আমি “জেব্রা” পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলুম, তার দ্বিতীয় সংখ্যায় শম্ভুর যে কবিতাটা প্রকাশিত হয়েছিল তার শিরোনাম ছিল “আমি স্বেচ্ছাচারী”, তাতে শম্ভু বলছেন যে তিনি রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছেনি-শাবল চান, এবং তিনি হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন যে বাঘের মতন লাফিয়ে পড়বেন --- শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের “আমি স্বেচ্ছাচারী” কবিতার অনেকদিন আগেই লিখেছিলেন শম্ভু। কবিতাটা এখানে দিলুম, লক্ষনীয় যে সেই সময়ের একরৈখিক কবিতার অনুশাসনকে শম্ভু ষাটের দশকে শুরুতেই অস্বীকার করেছিলেন :

    আমি স্বেচ্ছাচারী
    এইসব নারকেল পাতার চিরুনিরা, পেছন ফিরলে, এরাও ভয় দেখায় ।
    কিছুই, এক মিনিট, কিছুই জানি না, সাম্যবাদী পার্লামেন্টে জনশ্রুতি সম্পর্কে বা ।
    চণ্ডাল কুকুরদের আর্তনাদ আমাকে ঘিরে-- এবং আমাকে আলবৎ জানতে হবে, আলবৎ আমাকে
    ডুবতে দিতে হবে, যেতে দিতে হবে যেখানে যেতে চাই না, পায়চারি করতে দিতে হবে ।
    আমার গলা পরিষ্কার -- আমি স্বেচ্ছাচারী - কাঁচের ফেনার মধ্যে চুল -- স্পষ্ট করে কথা বলতে দিতে হবে
    আর কথাবার্তায় তেমন যদি না জমাতে পারি সেরেফ
    পায়চারি করে ঘুরে বেড়াবো -- সমস্ত পৃথিবীর মেঘলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে ।
    ক্রোধ ও কান্নার পর স্নান সেরে । ঘামের জল ধুয়ে -- শুদ্ধভাবে আমি সেলাম আলয়কুম জানিয়ে
    পায়চারি করে ঘুরে বেড়াবো ১ থেকে ২ থেকে ৩, ৪, ৫ গাছের পাতার মতো । রিরংসায় ।
    মাটিতে অব্যর্থ ফাঁদ পেতে রেখে । রাস্তায় । ব্রিজের ফ্ল্যাটে । ট্রেনে,
    যে কোনো কিশোরীর দেহে । শেষ রাতে -- পৃথিবীর মানচিত্র এঁকে, কেবল স্হলভাগের
    হু হু করে জেটপ্লেনে আমি যেতে চাই যেখানে যাবো না, এর ভেতর দিয়ে
    ওর ভেতর দিয়ে -- আর । হুম । একধরনের ছেনি-শাবল আমার চাই--
    যা কিছুটা অন্যরকম, রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দের নয় -- ঠিক
    খেলার মাঠে স্টার্টারের পিস্তলের মতো -- রেডি -- আমি বাঘের মতন লাফিয়ে পড়ব । খবরদার ।

    তারপর ১৯৬৪ সালে আমার মামলা-মকদ্দমা আরম্ভ হল, পঁয়ত্রিশ মাস চলল, শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ রাজসাক্ষী হল আমার বিরুদ্ধে । পুলিশের পক্ষের সাক্ষী হিসাবে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং উৎপলকুমার বসু । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যে চিঠি অ্যালেন গিন্সবার্গকে লিখেছিলেন তাতে উনি জানিয়েছিলেন যে পুলিশ সবসুদ্ধ ছাব্বিশজন কবি-লেখককে জেরা করেছিল লালবাজারে ডেকে । ‘নতুন কৃত্তিবাস’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন যে যাদের ডাকা হয়েছিল তাদের মধ্যে অনেকেই মুচলেকা দিয়েছিল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মুচলেকার বদলে হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় একটা সম্পাদকীয় লিখেছিলেন, যাকে মুচলেকাই বলা চলে, তখন কেস সাব জুডিস ।
    শম্ভু রক্ষিত আর বিনয় মজুমদারকে লালবাজারে ডেকে জেরা করা হয়েছিল কিনা জানি না । কিন্তু মামলার জন্য শম্ভু রক্ষিতের ‘ব্লুজ’ পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায় । তার বেশ কিছুকাল পরে উনি প্রকাশ করা আরম্ভ করেন ‘মহাপৃথিবী’ নামের পত্রিকা । বিনয় মজুমদার আর শম্ভু রক্ষিত দুজনেই কবিতা লেখা ছাড়া সারাজীবনে আর কিছু করেননি । আর এনারা দুজনে কবিতা লিখে জানাননি যে শুধু কবিতার জন্যই তাঁরা বেঁচে আছেন, যেমনটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখে গেছেন । যাই হোক, শম্ভু রক্ষিত আর বিনয় মজুমদার মুচলেকা দেননি এবং পুলিশের পক্ষের সাক্ষী হননি । আমার অনেক সময়ে মনে হতো যে হাংরি আন্দোলনে ছিলেন বলেই প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কারগুলো শম্ভু রক্ষিতকে দেয়া হয়নি এবং বিনয় মজুমদারকে মৃত্যুশয্যায় দেয়া হয়েছিল । তাছাড়া আত্মসন্মানের দরুণ এনারা দুজন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্তাবকদের দলে ঢোকেননি । অথচ কবিদের মধ্যে এঁদের দুজনের আর্থিক অবস্হা সবচেয়ে দয়নীয় বলা চলে, পুরস্কারের টাকা এনাদের কাজে লাগতো ।
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় মুচলেকা দিয়েছিলেন আর পুলিশের পক্ষে আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়েছিলেন । তিনি বলেছেন যে তিনিই প্রতিষ্ঠানবিরোধি, অথচ প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কারের জন্য দুবেলা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে গিয়ে বনসে থাকতেন । তাঁর অযুহাত ১৯৮৬ সালে সুমিতাভ ঘোষালের ‘গদ্য-পদ্য সংবাদ’ পত্রিকায় লিখে জানিয়েছিলেন ; লেখাটা তুলে দিচ্ছি এখানে, অনেকে পড়েননি বলেই মনে হয় :

    “সে-সময়ে আমাদের কেউই পাত্তা দিত না তা যারা হাংরি আন্দোলন শুরু করে সেই মলয় রায়চৌধুরী এবং সমীর রায়চৌধুরী আমাকে জানান যে আমার লেখা ওদের ভালো লেগেছে, ওরা যে ধরণের লেখা ছাপাতে চায়, তা নাকি আমার লেখায় ওরা দেখতে পেয়েছে, তাই আমার লেখা ওরা ছাপতে চায় । ওদের কাছে পাত্তা পেয়ে আমি খুবই আহ্লাদিত হয়েছিলুম।
    হাংরি আন্দোলনের ইস্তাহার আমি অনেক পরে দেখেছি । সসময়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের একটা গল্প আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল । বলতে গেলে সেই গল্পটার জন্যই আমি হাংরি আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলুম । গল্পটার নাম আমার ঠিক মনে নেই । গল্পটা ছিল অনেকটা এইরকম -- একটা ছেলে, তাত ভীষণ খিদে । একদিন ছাত্রীকে পড়াতে পড়াতে ছাত্রীর আঁচলের খুঁটটা খেতে শুরু করে । এই ভাবে সে একটু-একটু করে পুরো শাড়িটাই খেয়ে ফ্যালে । তাতে তার বেশ ভালোই লাগে । তখন সে ছাত্রীকেই খেতে শুরু করে । একটু টক টক লাগে কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরো ছাত্রিকেই সে খেয়ে ফ্যালে । এ বভাপারটায় সে বেশ মজা পেয়ে যায় । এরপর থেকে সে অনেককিছুই খেতে শুরু করে। যেমন জানালা, চেয়ার,ছাপাখানা, নোটবুক ইত্যাদি । একদিন এক হোটেলের সান্ত্রীকে সে খেয়ে ফ্যালে । এই ছেলেটিই একদিন গঙ্গার ধারে তার প্রেমিকাকে নিয়ে বসেছিল । হঠাৎ তার সেই খিদেটা চাগাড় দিয়ে ওঠে । তখন সেই ছেলেটি গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা জাহাজকে খেতে যায় । কিন্তু সেই ছেলেটি জাহাজটাকে খেতে পারে না । জাহাজটা ছেড়ে দ্যায় । তখন সেই ছেলেটি একটা চিরকুট গঙ্গায় ভাসিয়ে দ্যায় । সেটা ঠিক কার উদ্দেশ্যে ভাসিয়েছিল তা জানা যায় না । ছেলেটির প্রেমিকার উদ্দেশ্যেও হতে পারে । পৃথিবীর উদ্দেশ্যেও হতে পারে । বা অন্য কিছুও হতে পারে । এখানেই গল্পটার শেষ । এই গল্পটা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল এবং আমার মনে হয়েছে ক্ষুৎকাতর আন্দোলনের এটাই মূল কথা ।
    আমি হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে ভীষণভাবেই জড়িত ছিলাম । হাংরি আন্দোলনের আদর্শ -- আমার ভালো লেগেছিল এবং তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই আমি ওদের সঙ্গে ছিলাম । এ ব্যাপারে আমার কোনো দ্বিমত নেই । কিন্তু প