ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  বইপত্তর

  • মলয়ের লেখাপত্তর

    pi
    বইপত্তর | ২৪ মার্চ ২০১২ | ৮৯৫২৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিশ্বজিত সেন | 223.177.62.180 | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:১৩735106
  • মলয় রায়চৌধুরীকে নতুনভাবে দেখা :বিশ্বজিত সেন


    মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা
    বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাঁরা ভাবাভাবি করেন, তাঁদের কিছু মজার প্রবণতা আছে। তাঁরা কবিতাকে গদ্য থেকে একেবারে আলাদা করে দেখেন, ও সেই দেখা চিরস্হায়ি করতে নানাবিধ সাংস্কৃতিক প্রপেরও আয়োজন রয়েছে। যেমন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বেশিরভাগ অনুষ্ঠানেরই নাম--- কবিপ্রণাম । রবীন্দ্রনাথকে মূলত দেখা হয় কবি হিসাবে। গল্পকার, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ তেমন গুরুত্বপূর্ণ লোক নন। আমাকে প্রশ্ন করলে আমি বলব, গল্পলেখক রবীন্দ্রনাথই আমার কাছে সর্বাধিক গ্রাহ্য । যদিও রবীন্দ্রনাথের গল্প লেখার দর্শন আমার কাছে একেবারেই গ্রহণীয় নয়, তবু 'কবি' রবীন্দ্রনাথের চেয়ে, এই লোকটি আমার চোখে ঢের বাস্তব।
    কবিতাকে আলাদা করে দেখা, তাকে সুউচ্চ বেদিতে বসিয়ে রাখা, অহরহ গুজগুজ-ফিসফিস, আরে আজও যাচ্ছেতাই কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে বাংলা সাহিত্যে ও মধ্যবিত্ত জনজীবনে । এ নিয়ে চিন্তা করেছি, আজও মাঝে-মাঝে করি। এ ভাবনার উৎস কোথায়?কিছুটা কি "ভারতীয় অতীত"- এর ব্যাপার রয়েছে এর মধ্যে। বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত--- সবই কবিতায় । কবিকে রহস্যময় মানুষ মনে করা হত, যিনি নিজের চিন্তা-ভাবনাকে ছন্দবদ্ধ করতে সক্ষম। মনে করা হত স্বয়ং ঈশ্বর তাঁর কাছে বার্তা পাঠিয়ে থাকেন। ভগবানের স্পেশাল মেসেঞ্জার তিনি, 'নট টু বি টেকন লাইটলি'। তার বহু পরে, 'ভক্তি' যুগে ভারতীয় সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন কবিকে সাধক বানিয়ে কুলুঙ্গিতে লাল শালু মুড়ে রেখে দেওয়া হল।কবীর, দাদু, নানক, সুরদাস, রহিম, জয়দেব, চণ্ডীদাস । তুলসীদাসকে 'গোঁসাই' বানিয়ে তাঁরও একই হাল করা হল।'রামচরিতমানস'কে ধর্মগ্রন্হ মনে করে গদগদ আপামর হিন্দিভাষী জনসাধারণ। তার দোহায় দোহায় শব্দের যে অদ্ভুত খেলা, ভাষাকে কাদার মতো ব্যবহার করে তা থেকে বিচিত্র নানা মূর্তি গড়ে তোলা, সেদিকে দুচারজন ক্রিটিক ছাড়া কারো নজরই যায়নি প্রায়। হিন্দি সাহিত্য ঐশ্বরিক বিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে কবে একাজে হাত দেবে জানি না । আজকে ভারতের পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়, এ-কাজ করার সময় এসে গেছে ।
    ইংরাজপূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চল কিন্তু কবিকে অনেক সহজভাবে নিয়েছিল। কথক ও কবিয়াল ছিলেন, কবিগান ছিল। যাত্রার, পালার আসর ছিল, চণ্ডীতলা ছিল। অবশ্যই কবিকে স্পেশাল টেকনিকে দক্ষ লোক মনে করা হত; তবে সাউক বা অবতার, বা ভগবান নয় । কবির লড়াইতে তো কবিতা তৈরি হত সর্বসমক্ষে, মুখে-মুখে। আর হারজিতও ছিল। কাজেই রহস্যের সেখানে কোনো ভূমিকাই ছিল না । কবি স্পেশাল টেকনিকে দক্ষ বলে তাঁদের আদর-আপ্যায়নও হত, তবে তাঁকে একটি বেদিতে বসিয়ে তাঁর মুখের ওপর স্পটলাইট জ্বেলে রাখা ? নাঃ ! ইংরাজপূর্ব বাংলার গ্রামাঞ্চলে তা করা হত না।
    ইংরাজরা আসার পর বাংলা সাহিত্যে কবিতার রহস্যের আমদানি হয় । নিজস্ব সংস্কৃতি বলতে ইংরাজদের কিছু ছিল না। যাকে তারা নিজের সংস্কৃতি বলত, তার খুঁটিগুলো সবই ছিল গ্রিস, রোম থেকে ধার করা। গ্রিসে 'বার্ড' বা ভ্রাম্যমান কবিদের নিয়ে রহস্য গড়ার অভ্যাস প্রচলিত ছিল। ভক্তি যুগের আদলেই প্রায় বলা যায়, তাঁদের 'ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা', ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী, ইত্যাদি মনে করা হত। হোমারের স্হান গ্রিক মানসে প্রায় ঋষির জায়গাতেই ছিল, দাড়ি-টাড়ি সমেত। শেকসপিয়রও আরও কয়েকশো বছর আগে জন্মালে ঐ জায়গাতেই পৌঁছে যেতেন। আমাদের সৌভাগ্য, তিনি পরে জন্মানোর দরুন বিশ্বসাহিত্য একটি নিদারুণ দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়েছিল।
    রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং, সাহিত্যিক জীবনের পরবর্তীপর্বে, কবিতার বিশেষত্বের জায়গা থেকে অনেকটা সরে এসেছিলেন। যাকে সাহিত্যের বিশেষজ্ঞরা 'গদ্য কবিতা' বলেন, তা তাঁর এই বোধের সাক্ষ্য দেয়। তাঁর কিছু গদ্য কবিতা গল্পকেন্দ্রিক। সাহিত্যকর্ম ইশাবে অনেক উঁচু দরের কাজ সেগুলো। মোদ্দা ব্যাপার হল, আজ পাড়াব-পাড়ায় 'কবি প্রণাম' সত্ত্বেও সাহিত্যের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টির মাঝখানের দেওয়াল ধ্বসিয়ে দেবার পক্ষপাতী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। তাঁকে বাঙালি এত বেশি 'কবি' বানিয়ে ফেলেছিল যে হাত খুলে এই কাজটি করা সম্ভব ছিল না তাঁর পক্ষে। তবে কাজের মধ্য দিয়ে ঠারে-ঠারে যতটা পেরেছেন, করেছেন। বিশেষ করে ছবি আঁকার মাধ্যমে।
    কবিতাকে বা কবিকর্মকে ঘিরে একটা রহস্য সৃষ্টি করে রাখলে কবিতা কখনই সামাজিক পরিস্হিতির দলিল হয়ে উঠতে পারে না। কবিতার মিস্টিসিজমের প্রথম অসুবিধে এটা। কবিতা যদি সামাজিক পরিস্হিতির দলিল না হয়, তবে তাকে ড্রইংরুম সাজানোর ডলপুতুল বা অশ্রুমোছার রুমাল হয়ে থাকতে হয় কেবল।সেটা অবশ্য অনেকেরই মনঃপূত, বিশেষ করে যাঁরা 'সমাজ-টমাজ'কে দশ হাত দূরে রাখতে চান। সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো সাহিত্যেও লড়াই আছে, পক্ষ-প্রতিপক্ষ আছে। একটি পক্ষের বিশেষ দর্শন এটাই। কবিতার গায়ে গরম হাওয়ার ঝাপটা যেন না লাগে।
    কবিতার মিস্টিসিজমের দ্বিতীয় অসুবিধে ভাষার স্তরে। ভাষা তো একটি নদী বিশেষ। একূল-ওকূল দুকূলই সে ভাসায়। তাকে সিমিলি, মেটাফর, ছন্দবৃত্ত, মাত্রা, পয়ার ইত্যাদির গণ্ডীর মধ্যে সর্বদা বেঁধে রাখা যায় না। কবিতার নিয়মানুবর্তিতা থেকেই কবিতার মিস্টিসিজমের জন্ম। এই নিয়মানুবর্তিতার দরুনই, একটি বিশেষ শ্রেণীর প্রয়োজন অনুভূত হয়, যে কবিতা 'লিখতে পারে'। যে 'পারে না', তাকে দূর করো, দাঁড় করিয়ে রাখো দরজার বাইরে। তার ভাষাটিও ব্রাত্য।
    তাই, কবিতার স্বার্থেই, কবিতার রহস্যময়তাকে ভাঙা অত্যন্ত প্রয়োজন।
    বাংলা সাহিত্যের সিরিয়াস পাঠক সম্প্রতি নড়ে-চড়ে বসেছেন। ষাটের দশকে, যে একটি তুমুল ওলোট-পালোট ঘটে গিয়েছিল বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে--- সেদিকে নজর গেছে তাঁদের। দেরিতে হলেও, এটাই কাম্য ছিল।'হাংরি আন্দোলন' নিয়ে ইতিপূর্বে 'ধরি মাছ না ছুঁই পানি' গোছের কথাবার্তা হয়েছে। 'হাংরি আন্দোলনকারীদের' গভীর মননশীল পঠন-পাঠন ছিল, যাকে বলা যায় ওভারভিউ। হাংরির পরেও আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন এসেছে, তবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঝাঁকুনি হিসাবে হাংরিই ছিল "প্রথম"। বাংলা সাহিত্যের অবস্হা, হাংরি আন্দোলনের আগে ছিল অকালবৃদ্ধ আফিংখোরের মতো। রবীন্দ্র ঐতিহ্য পুঁটুলি বেঁধে কোলে নিয়ে বসে ঝিমোনো আর মাঝে-মাঝে চটকা ভেঙে, "অ্যাই, গোল কোরো না বলচি, পড়াশুনো করো, পড়াশুনো..."। অথচ দেশে-বিদেশে তখন ঘটছে যুগান্তকারী ঘটনা । 'গ্রানমা' জাহাজে চড়ে বিপ্লব করতে আসা কয়েকজন যুবক হঠাৎ জয়ী হয়েছেন। ওয়াশিংটন থেকে মাত্র নব্বই মাইল দূরে দেখা দিয়েছে বিদ্রোহের পতাকা। ওদিকে ঠাসবুনোট সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্রমে ঠোঙা বানাবার কাগজ বই আর কিছু নয়। স্হিতাবস্হাকামী বাণিজ্যিক সংবাদপত্র গোষ্ঠীর প্রচণ্ড একমাত্রিক দাপট বাংলা সাহিত্যে। তার দোরগোড়ায় মাথা না ঠুকলে কেউ মানুষই হবে না, সাহিত্যিক হওয়া তো দূরে রইল।
    এইরকম সময়ে বাংলা সাহিত্যের 'পীঠস্হান' কলকাতা থেকে দূরে, পাটনা শহরে, যেখানে ঐশ্লামিক ধর্মশাস্ত্র পড়তে গিয়েছিলেন রামমোহন রায়, আর বেশ কয়েক বছর চাকরি করে গেছেন দীনবন্ধু মিত্র, সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে একটি অপরিচিত গরিব পরিবারের যুবক মলয় রায়চৌধুরী আই আন্দোলনটির ছক কষেন। দাদা সমীর রায়চৌধুরী কলকাতায় সিটি কলেজে পড়েন, সেই সুবাদে যুবা বাঙালি লেখক-কবিদের সাথে আলাপ-পরিচয় । দেশ-দুনিয়ে জুড়ে উথালপাথাল সত্ত্বেও কলকাতা, ব্রিটিশের প্রিয় 'কালকুত্তা' তখনও শীতল। বামপন্হী দলগুলোর বিরুদ্ধে গান্ধীবাবার কংগ্রেস প্রতিপালিত গোপাল পাঁঠা, ইনু মিত্তিরদের দাপাদাপি; কলকাতা শীতল। কবিতা ভবন (!) থেকে 'কবিতা' বেরোয় । বুদ্ধদেব বসুর পরিশীলিত আঙুল কবি বাছাই করে, ফতোয়া দেয়। দোর্দণ্ডপ্রতাপ সেই উপস্হিতি। এককালে...'না না অমন বলবেন না । সুকান্তও কবি। ছন্দ বোঝে। এই দেখুন আমি দেখাচ্ছি --- পতা/কায় পতা/কায় ফেরমিল/আনবে ফেব্রু/য়ারি। দেখলেন ?
    অট্টহাসি উদ্রেক করা সেই সময়। সমীর রায়চৌধুরীর 'পাটনাই' হওয়ার দরুন কলকাতার যুবক কবিদের পাটনায় আনাগোনা। এঁদের মধ্যে অন্যতম শক্তি চট্টোপাধ্যায়। যাঁর বিষয়ে বাসব দাশগুপ্তকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মলয় বলেছেন, "শক্তির কবিতা সম্পূর্ণ নিজস্ব ও অসাধারণ। কেননা তিনি পাঁড় অশিক্ষিত, কোনো লেখাপড়া করেন না, এবং দর্শন, ইতিহাস, সমাজবোধ এসব ছিটেফোঁটা তাঁর মধ্যে নেই। নিজের খাঁটি বোধ থেকে তিনি লেখেন, তখন তাঁকে জীবনানন্দের পরের প্রভূত ক্ষমতাসম্পন্ন মনে হয়।" মনে রাখা প্রয়োজন, এই সাক্ষাৎকারটি যখন দিচ্ছেন মলয়, তখনও হাংরি আন্দোলনের স্মৃতি, তজ্জনিত তিক্ততা, সব কিছু মলয়ের মস্তিষ্ককোষে উপস্হিত। কিছুই ক্ষমা করেননি। অথচ কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে মলয়ের চোখা, টান-টান মূল্যায়ন। ব্যক্তিগত তিক্ততা সেখানে ছায়া ফেলেনি।
    হাংরি আন্দোলনের পরিকল্পনাপর্বে এই শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে মলয় সঙ্গে পেয়েছিলেন, আর পেয়েছিলেন দেবী রায় ( হারাধন ধাড়া) কে। পাটনার সুবিমল বসাক এসে যোগ দেন কিছুকাল পরে।একটি সাহিত্য আন্দোলন, যা বাংলা সাহিত্যের হাল-হকিকত পালটে দিয়েছিল, কত সামান্যভাবে শুরু হয়েছিল, ভাবলে অবাক লাগে। প্রেস পাওয়া যাচ্ছিল না, তাই মিষ্টির দোকানের বাকসো যে জব প্রেস ছাপতো, সেখানেই ছাপতে হয় হাংরি বুলেটিন। রিজার্ভ ব্যাঙ্কে মলয় তখন লোয়ার গ্রেড কেরানির চাকরিতে, কত মাইনে পেতেন জানা নেই, তবে প্রায় সম্পূণফ মাইনেটাই মনে হয় হাংরি বুলেটিনের পেছনে ঢালতে হত। বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে বাংলা কবিতায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রথম কাগজ বেরোনোর আরম্ভটা এইরকম। 'শতভিষা' পত্রিকার তুলনায় 'কৃত্তিবাস' ও নিজেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাগজই বলত, তবে হাংরি বুলেটিনের সাথে তার ছিল মৌলিক প্রভেদ। 'কৃত্তিবাস' ছিল সাহিত্যিক উচ্চাকাঙ্খীদের কাগজ। তাঁদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়িয়ে সুরে সুর মিলিয়ে। প্রতিষ্ঠান কখন যশ, প্রতিপত্তি, বৈভব, টাকাকড়ি, সামাজিক সুবিধার কাজে লেগে যায়, বলা তো যায় না। হাংরি বুলেটিনের উদ্দেশ্যই ছিল যুদ্ধ। আপসের জন্যে সেখানে কোনও জায়গাজমি রাখা হয়নি।
    অনেকের মতে হাংরি আন্দোলনকারীরা কয়েকটি গিমিকের আশ্রয় নিয়েছিলেন রাতারাতি খ্যাত হবার জন্য, যেমন শাদা দিস্তা কাকজ, জুতোর বাকসো ইত্যাদি রিভিউএর জন্য পাঠানো, টপলেস প্রদর্শনীর আয়োজন ( টপলেসের অর্থ যে মুন্ড বা মস্তিষ্কবিহীনও হয়, এই বোধটুকু কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের হয়নি), জীবজন্তু-জোকারের মুখোশ বিলি ইত্যাদি। 'হাংরি কিংবদন্তি'তে মলয় উদ্ধৃত করেছেন আবু সয়ীদ আইয়ুবের যে মন্তব্য, তা এ-প্রসঙ্গে দেখা যেতে পারে।কিন্তু মলয় বা তাঁর সঙ্গীরা কি জানতেন না যে প্রতিষ্ঠান ও প্রসাশন কতদূর হিংস্র হতে পারে? এ জানা সত্ত্বেও একজন চাকুরিজীবী ( মলয় ) নিজেকে এই ঝুঁকির সামনে এগিয়ে দিয়েছিলেন কেন ? শুধুই প্রচারের জন্য? না কি কিছু মূল্যবোধের ব্যাপারও ছিল ? মলয় তাঁর 'সাক্ষাৎকারমালা'র এক জায়গায় বলেছেন, 'ষাট দশকের সুস্হতা স্বাভাবিক ছিল না।' এই অস্বাভাবিক সুস্হতাকে ভালোমতো একটা ঝাঁকুনি দেওয়াই উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। তার জন্য দুহাতে হাতকড়া, কোমরে দড়ি পরে চোর-ডাকাতের সঙ্গে সার বেঁধে পাটনা শহরের রাস্তায় অতিপরিচিতজনের মাঝে হাঁটা, চাকুরি থেকে সাসপেন্ড হওয়া, পঁয়ত্রিশ মাস প্রতি সপ্তাহে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো--- সবই। প্রচার পাওয়ার জন্য যদি এত করতে হয়, তাহলে তো মুশকিল। এর চেয়ে সহজ রাস্তা তো কতই ছিল। বিশেষত, 'কৃত্তিবাস' গোষ্ঠীতে তাঁর দাদার বন্ধুরাই যখন সর্বেসর্বা। সমসাময়িক অন্যান্যদের মতন একটু মিঠে ব্যবহার রাখলেই আর দেখতে হচ্ছিল না। আর, 'কৃত্তিবাস'ও তেমন-তেন বৈশিষ্টহীন ও লুপ্ত হবার পথে এগিয়েছে। সাহিত্য আন্দোলন সম্পর্কে 'কৃত্তিবাসীয়'দের সততার এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে ?
    ( দ্রষ্টব্য: কবিতীর্থ, মাঘ ১৪১০)
    বলা যেতে পারে যে 'কৃত্তিবাস' যদি সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে না টিকে থাকে তবে 'হাংরি বুলেটিন'ও তো টেকেনি। হ্যাঁ, হাংরি বুলেটিন উঠে গিয়েছিল মামলা-মকদ্দমার দরুন, অন্তর্কলহের দরুন। কিন্তু হাংরিদের ঝগড়াঝাঁটি ছিল খোলাখুলি, তাতে মধ্যবিত্তের চাপ-চাপ ঢাক-ঢাক ছিল না। মামলা-মকদ্দমার ভয়ে কেউ রাজসাক্ষী হয়েছিলেন ( সুভাষ ঘোষ,শৈলেশ্বর ঘোষ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু প্রমুখ ), কেউ ভেবড়ে গিয়ে কলকাতার বাইরে কেটে পড়েছিলেন ( প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য প্রমুখ )। সেগুলোকে দেখার কোনও অর্থ হয় না।'হাংরি বুলেটিন' বন্ধ হবার পর অগনণ পেশিবহুল বাহু এগিয়ে এসেছে আন্দোলনের পতাকা তুলে নিতে।জেব্রা, উন্মার্গ, ফুঃ, স্বকাল, ক্ষুধার্ত খবর, জিরাফ, কনসেনট্রেশান ক্যাম্প, ওয়েস্ট পেপার, চিহ্ণ, প্রতিদ্বন্দী ইত্যাদি পত্রিকাও হাংরি বুলেটিনই। মলয় কোনোদিন বলেননি যে হাংরি আন্দোলনের কপিরাইট একমাত্র তাঁর। হ্যাঁ, আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও দার্শনিক প্রতিনিধি হিসাবে তাঁর কিছু বক্তব্য থাকতেই পারে, যা তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে পাঠকদের সামনে রেখেছেন।এই অধিকার থেকে তো আর তাঁকে বঞ্চিত করা যায় না। মলয়ের পরবর্তীকালীনরা হাংরি মতাদর্শকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন।এটিও একটি আন্দোলনের প্রাণশক্তির প্রমাণ। মলয়, হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে যাবার পর, পড়ালেখার নিজস্ব পৃথিবী গড়ে তুলেছেন, মন দিয়ে এবং চুটিয়ে বিভিন্ন শহরে চাকরি করেছেন, সংসার করেছেন, ভারতীয় জনজীবনকে দেখেছেন, জীবন থেকে শিখেছেন। আজ গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধের যে হতচকিত-করা ফসল তিনি আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন তা সম্ভব হতে পেরেছে এরই দরুন। বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠানের গদি-আঁটা চেয়ারে বসে আঙুলে চাবির রিং ঘোরাননি মলয়। এর জন্য তাঁর কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। অন্তত একটি আকাশ এমন রয়েছে, যাকে ঢেকে ফেলতে পারেনি কালো মেঘ।
    মলয়কে 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতাটির দরুন মামলায় পড়তে হয়। কবিতাটি বর্তমানে বহুল প্রচারিত, তাই তাকে আর সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করার প্রয়োজন নেই। তবে এই কবিতাটিকে কেন্দ্র করে অশ্লীলতা ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মামলা, যদি ধরেও নেওয়া যায় যে এর পেছনে কোনো অসূয়া কাজ করছিল না, একটি কৌতুকপ্রদ মাইন্ডসেট-এর দিকে ইঙ্গিত করে। এই মাইন্ডসেটটি তদানীন্তন বুদ্ধিজীবী বাঙালির, যিনি পুজোর ছুটিতে সস্ত্রীক খাজোরাহো দেখতে যান। তাহলে মলয়ের কবিতা কেন গ্রহণীয় নয় ? মজা কেবল এই জায়গাটুকুতে নয়, অন্যত্রও আছে। "আমরা যখন অসভ্য ছিলুম তখন ওইগুলো বানিয়েছি। এখন আমরা সভ্য, এখন তো আর এসব চলতে দেওয়া যায় না ।" এও মানলাম, কিন্তু মাই ডিয়ার, ব্যাপারটা যে আদপে তা নয় একেবারেই। ব্যাপার আগাগোড়া অন্যরকম। যৌন রূপকল্প, দ্যোতক ও বিম্ব কেবল ব্যবহার করেছেন মলয়, সেগুলির মাধ্যমে নিজের কথা বলেছেন। এও চলবে না ? তাহলে শিবলিঙ্গ তুলে দিন, গৌরীপট্ট নাকচ করুন, অম্বুবাচী ব্যান করুন। কামাখ্যা মন্দিরে মা-কামাখ্যার মাসিক যেন আর না হয়। কি বলেন ? যাঁরা "অশ্লীল অশ্লীল" চিল্লিয়েছিলেন, তাঁরা সম্ভবত 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার-এর এই লাইনগুলো নজর করে দেখেননি--
    ১.
    জন্মমুহূর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে
    আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই
    মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না
    তোমার তীব্র রূপালি য়ুটেরাসে কিছুকাল ঘুমোতে দাও শুভা
    শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও
    ২.
    হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা
    আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ
    মরে যাব কিনা বুঝতে পার্ছি না
    তুলকালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহ্যতায়
    সবকিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব
    শিল্পর জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোবো
    কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই...
    ৩.
    এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়
    আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই
    এখন আমার হিংস্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে
    মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে
    আমি মরে যাব...
    ৪.
    ৩০০০০০ লক্ষ শিশি উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে
    ঝাঁকেঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়
    এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে
    হিপ্নটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌনপর্চুলায়
    ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মার্মুখী আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি
    কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার অপ্রতিষ্ঠিত খেয়োখেয়ি
    এই পঙক্তিগুলো একটু মন দিয়ে পড়লে বাঙালি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর পক্ষে বোঝা দুষ্কর ছিল না যে নিছক যৌনতা নয়, আরো গূঢ় কোনো বোধের দ্যোতনা এই পঙক্তিগুলোয় রয়েছে।'সাত বছর আগের একদিন' কবিতায় জীবনানন্দ লিখেছিলেন, "অর্থ নয় কীর্তি নয় স্বচ্ছলতা নয় আরও এক বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে। আমাদের ক্লান্ত করে, ক্লান্ত ক্লান্ত করে। লাশকাটা ঘরে সেই ক্লান্তি নাই..."। এই পঙক্তিগুলোকে উদ্ধৃত করে জীবনানন্দকে শবসাধক সাব্যস্ত করা অবশ্যই উচিত হবে না, অথবা ঘোর অঘোরপন্হী। তেমনই হাস্যকর 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'-এ যৌনতার বহিঃপ্রকাশ খোঁজা। আসলে মলয়ের বিরুদ্ধে যখন ষাটের দশকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও অশ্লীলতার মকদ্দমা দায়ের করা হয়, তখন ষাটের দশকের 'অস্বাভাবিক সুস্হতা' রাজত্ব করছে পুরোদমে।'দেশ' পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে প্রবোধকুমার সান্যালের 'দেবতাত্মা হিমালয়' আর মেট্রো সিনেমার ফুটে রিফিউজি যুবতীদের শরীর নিয়ে চলছে অবাধ বাণিজ্য! পায়ের চটি ঘষটাচ্ছে রিফিউজি যুবক, 'মাই ওন সিসটার স্যার, ভেরি সুইট, ওনলি সিক্সটিন'। অথচ বাঙালি পাঠক 'কত অজানারে'র বারবেল সাহেব আর 'সখী সংবাদ' এর মিষ্টিদিদি, নতুন দিদি, এদের নিয়েই মুগ্ধ। সমাজ কোথাও নেই; সমাজের জ্ধবলাপোড়া, আর্তি, চিৎকার এগুলোও কোথাও নেই। বামপন্হীরা 'পরিচয়' পত্রিকা চালাচ্ছেন, তাতেও এন্ট্রি পারমিট নিয়ে ঢুকতে হয়। এইরকম এক সময়ে 'হাংরি বুলেটিন' এর দরকার ছিল, প্রয়োজন ছিল 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'-এর। মূল্যবোধ ভেঙে খানখান হওয়ার যে হরর, শিল্পপ্রতীক জোলো হয়ে যাওয়ার যে শক, তাকে যথার্থ ফুটিয়ে তুতে গেলে এই কবিতাই তো লিখতে হবে। মলয় তাই করেছিলেন।
    অবশ্য বিপদ চেনার ব্যাপারে প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠানের সূক্ষ্মদৃষ্টির প্রশংসা করতেই হয়। কেই বা পড়ে তখন 'হাংরি বুলেটিন', কটা লোক ? পাটনার দুই যুবক, একজন হাওড়ার, একজন বিষ্ণুপুরের, একজন শান্তিনিকেতনের, এদের বুলেটিন বেরোয়। তার জন্যও আবার এই প্রেস, ওই প্রেসের হাতে-পায়ে ধরাধরি। তাহলে? এমন কী ক্ষমতাসম্পন্ন এরা, যে ক্ষেপে উঠল গোটা কলকাতার বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রশাসন ? মলয়ের বিরুদ্ধে কেবল মামলাই নয়, তাঁকে ও অন্যান্য হাংরি আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করে অপমান করা হল চরম, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন এই জাতীয় প্রবণতা মাথা তোলার হিম্মত না করে ।
    বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসন যে সমাজকে বুঝতেন না তা নয়, ভালোমতোই বুঝতেন। তাঁরাও জানতেন যে, যে-বদমায়েশি তাঁরা শিল্প, সাহিত্য, সমাজ, সংস্কৃতির সর্বত্র বিছিয়ে রেখেছেন, তা মানুষের জন্য নয় । তবে শ্রেণী স্বার্থে এর প্রয়োজন তাঁদের ছিল। যেমন ইংরেজরা, আই.সি.এস.কে লৌহ কাঠামো হিসাবে গড়ে তুলতে ছেয়েছিল, তেমনই উত্তর-স্বাধীনতা যুগের ভারতীয় পুঁজিবাদ, আমলাতন্ত্র ও তার মিডিয়া-খানসামাদের লক্ষ ছিল একটি জড়, নির্বোধ, সংবেদনহীন মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে তোলা। তাদের রুচি, জীবনযাপন, মূল্যবোধ, সব কিছু হবে ছাঁচে ঢালা, সিনথেটিক। তারা হাসবে, কাঁদবে, গাইবে, সঙ্গম করবে একটি বিশিষ্ট কায়দায়। 'হাংরি প্রজন্ম'এর হুড়মুড় করে এসে পড়ায় এই গোটা গেমপ্ল্যানটি ধ্বসে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। মলয় এবং অন্যান্যদের ওপর আক্রমণ সেই কারণেই।
    প্রজাপতি-আঁকা বিয়ের কার্ডে হাংরি প্রজন্ম ধ্বনি তুলেছিল, "গাঙশালিক কাব্যস্কুলের জারজদের ধর্ষণ করো"। এই ধ্বনিটিতে অন্তর্নিহিত ছিল তদানীন্তন কাব্যধারার প্রতি বিবমিষা।
    প্রকৃতি, নিসর্গ এই ব্যাপারগুলো হয়ে দাঁড়িয়েছিলো বাংলা কবিতার কলোনোয়াল রোগবিশেষ। রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ ছিল একটা কমপালশান, যেমন লেখালিখি ছিল তাঁর কমপালশান। সেজন্য তাঁর লেখায় প্রকৃতি, নিসর্গ বিশেষভাবে উপস্হিত--- কবিতায়, নাটকে, উপন্যাসে। আঁকার সময়ে তিনি এগুলো বর্জন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে, বাংলা কাব্যধারায় এই ব্যাপারগুলো প্রয়োজনীয় অনুপান হয়ে ওঠে। এবং অনুপানেরও অধিক, অভ্যাস।জীবনানন্দ লেখেন 'রূপসী বাংলা'। তাতেও নিসর্গ ছিল; তবে সেই নিসর্গ, প্রকৃতির প্রতিটি কমপোনেন্ট আবহমানের বাঙালিজাতির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতিনিধিত্ব করেছিল।মানুষের সাথে সম্পর্কবিহীন ছিল না সেই নিসর্গ, সেই প্রকৃতি।সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, "একদা আষাঢ়ে এসেছি এখানে, মিলের ধোঁয়ায় পড়ল মনে; কালবৈশাখী নামবে যে কবে আমাদের হাত-মেলানো গানে"। এখানে মানুষের সংগ্রামকে আঁকা হয়েছে প্রাকৃতিক ঘটনার রং-তুলিতে। কিন্তু বাংলা ভাষার সেইসব কবিরা (গাঙশালিক কাব্যস্কুল) সৃষ্টি করছিলেন মনুষ্যবিহীন নিসর্গ, মানুষকে মাইনাস-করা প্রকৃতি। এ ছিল একজাতীয় পলায়নবাদ। শংকরের 'কত অজানারে' যেমন বাঙালি যুবকের বেকারত্ব থেকে পলায়ন করতে চেয়ে বারবেল সাহেবের মহানতায় বুঁদ হয়ে থাকা, বিমল মিত্রের মিষ্টি দিদি, নতুন বৌদি, ছোট বৌঠান যেমন নারী-পুরুষের স্বাভাবিক যৌনসম্পর্ক ফেস করতে না চাওয়ার যুক্তি, তেমনই 'গাঙশালিক কাব্যস্কুল' ছিল মানুষের দুঃখ, শোক, রোগ, ঘা-পাঁচড়া এগুলোকে দেখতে না চেয়ে স্টুডিওর পর্দায় আঁকা চাঁদ, তারা, নদী, ফুলে বিভোর হয়ে থাকা। ঠিক তখনই মানুষের জীবনধারণ কতদূর দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছিল, তা দেখতে পাওয়া যায় ঋত্বিক ঘটকের ফিলমগুলোতে। সেই দৈন্য, দুর্দশা, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াইয়ের প্রতিফলন এই কবিতাগুলোতে কোথাও ছিল না। কেন ? কেননা, তা করার অসুবিধে ছিল। তা করতে গেলে দীর্ঘ একটা লাফ দিতে হত, বিশেষ করে ভাষার ক্ষেত্রে।ঋত্বিক যেমন 'মেঘে ঢাকা তারা' বা 'কোমল গান্ধার' -এ গোটা ইডিয়মটিকেই ভেঙেচুরে ফেলেছিলেন, তেমনই ষাটের দশকের বঙ্গসমাজ ও মানুষেকে তুলে আনতে গেলে বাংলা কবিতার গোটা ইডিয়মটিকেই ভাঙতে হত। খানিকটা শ্রেণী পরিপ্রেক্ষিত আর কিছুটা গাড্ডায় পড়ে যাওয়ার ভয়, উভয়ে মিলে এ-কাজ করতে দেয়নি বাংলা ভাষার কবিদের। অতএব চাঁদ, তারা, নদী, ফুল, মৌমাছি...
    আরেকটি প্রশ্নও ছিল। কবি কি কেবল কবিতাই লিখবেন, না সামাজিক ভাষ্যকারও হবেন ? রবীন্দ্রনাথ কেবল কবি নন, সামাজিক ভাষ্যকারও ছিলেন। জীবনানন্দও তাই ( জীবনানন্দকে নিবীঢ়ভাবে পড়লে এই ব্যাপারটি ধরা পড়ে) । কিন্তু উত্তরোত্তর সামাজিক ভাষ্যের ব্যাপারটি বাংলা কবিতা থেকে উঠে যেতে থাকে। "কবিতা কবিতাই। সামাজিক ভাষ্যটাষ্য আবার কী?" এ-জাতীয় একটী প্রবণতা বাংলা কবিতাকে পেয়ে বসতে থাকে। একে ক্রমাগত হাওয়া দিতে থাকে স্বার্থান্ধ বাণিজ্যিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠান।
    খুব স্বাভাবিকভাবেই নভেম্বর ১৯৬১-এর প্রথম বুলেটিন থেকেই হাংরি প্রজন্ম এই প্রবণতার বিরুদ্ধে ছিল। সেই দিন থেকে আজ অব্দি মলয়, সামাজিক ভাষ্যকারের ভূমিকাটি কোনোদিনই হাতছাড়া করেননি। 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'এ যেমন সামাজিক বিশৃঙ্খলা নিয়ে তাঁর তীব্র বিবমিষা, তামনই আজও। তাঁর হালের একটি কবিতা নেওয়া যেতে পারে, 'যা লাগবে বলবেন' সংকলন থেকে । কবিতাটির নাম 'ক্ষুধার্ত মেয়ে':
    আমার আসক্তি নেই কোনো
    চলে যা যেখানে যাবি
    যার সঙ্গে শুতে চাস যা
    আমি একা থাকতে চাই
    ক্ষুধার্ত বা পেটুক মহিলা
    যে ঘোরে সবার হাতে
    খড়কুটোময় সংসারে
    তার কোনো প্রয়োজন নেই।'
    কবিতাটিতে জড়িয়ে আছে একটা ঈষৎ বোহেমিয়ান বাচনভঙ্গী। পড়লে মনে হবে কেউ একজন লিখছেন তাঁর শয্যাসঙ্গিনীর উদ্দেশ্যে। এটি কিন্তু কবিতার প্রথম স্তর। দ্বিতীয় স্তরে কবিতা ও সমাজ সম্পর্কে মলয়ের দার্শনিক বোধ সন্নিহিত। শয্যাসঙ্গিনী মহিলাটি আসলে কবিতাই। অথচ সবার হাতে ঘোরার প্রবণতা তার, সে হাত স্মাগলারের হোক বা বিপ্লবীর।কবিতার লয়ালটি সন্দিগ্ধ। ওদিকে সংসার অনিত্য, অতএব তার প্রয়োজন কিসের ?
    'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতায় যে-কথা বলার জন্য মলয়কে অনেক বেশি জায়গা ব্যবহার করতে হয়েছে, 'যা লাগবে বলবেন' গ্রন্হে সেই কথাই তিনি বলেছেন অনেক সংক্ষিপ্ত পরিসরে। 'হাংরি আন্দোলন' থেকে সরে এসে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ইন্সপেক্টিং অফিসার হিসেবে ভারতের গ্রামে-গঞ্জে শহরে শহরে ঘোরা, তারপর এ.আর.ডি.সি. ও নাবার্ডের গ্রামোন্নয়ন বিশেষজ্ঞের উচ্চপদে। যদিও মলয় তাঁর এই পরিবর্তিত জীবনশৈলী নিয়ে 'হাংরি কিংবদন্তি' গ্রন্হের শেষে মশকরাও করেছেন, "ছাই-এর জায়গায় আসে টুথপেস্ট, কয়লার উনুনের বদলে গ্যাস, সর্ষের তেলের বদলে সূর্যমুখী, শার্ট-প্যান্টের বদলে সাফারি, মাদুরের স্হানে বিছানা, ঢাবার বদলে রেস্তরাঁ, দিশির জায়গায় স্কচ, কলেজস্ট্রিট ও বইপাড়ার বদলে বাংলার গ্রামশহর।" কিন্তু তবু জীবনের এই অধ্যায়টিও যে কবি হিসেবে মলয়কে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে, তাতে সন্দেহ নেই।
    'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'-এ বাঁধন-ছেঁড়া রাগ ছিল মলয়ের কবিতার পরিচিত চিহ্ণ। কিন্তু এই পর্যায়ে এসে জীবনের বহু কিছু দেখে-শুনে মলয়ের কন্ঠস্বর তেতো, অম্লকষায়, আর তার সাথে এসে জুটেছে আয়রনির অধুনান্তিক পরিহাসও। তবু তা মলয়ের কবিতাকে সর্বজনগ্রাহ্যও করে তোলে বটে।'যা লাগবে বলবেন'-এর আরও একটি কবিতাকে নেওয়া যেতে পারে, যেমন 'দ্রোহ':
    এ-নৌকো ময়ূরপঙ্খী
    তীর্থযাত্রী
    ব্যাঁটরা থেকে যাবে হরিদ্বের
    এই গাধা যেদিকে দুচোখ যায় যায়
    যাযাবর
    ঘাট বা আঘাটা যেখানে যেমন বোঝে
    ঘুরতে চাই গর্দভের পিঠে
    মাথায় কাগুজে টুপি মুখে চুনকালি
    পেছনে ভিড়ের হল্লা ।
    ব্যাস! কবিতা এইটুকুই। অথচ বাঙালি সমাজের যে একটি বিশেষ প্রবণতা, কবিকে বেদিতে বসিয়ে রাখার, তাকে কত সার্থক ভাবে ভাঙঅ হয়েছে এখানে। পাটনার অন্ত্যজ মহল্লাগুলোতে হোলির দুতিন দিন আগে থেকে চোখে-পড়া একটি সুপরিচিত দৃশ্যকে ব্যবহার করেছেন মলয়, প্রশ্নাতীত দক্ষতাসহ। তার সাথে মিশিয়েছেন তীর্থযাত্রার জন্য বাঙালি হিন্দুর চিরাচরিত আতুরতাটিকে, যাতে পোস্টমডার্ন পরিহাস আরও তীব্র হয় । আর... হাংরি মামলার সময়ে তাঁকে যে-সামাজিক অবমাননা সইতে হয়েছে, তাও উঠে এসেছে। মাত্র কয়েকটি পঙক্তির মধ্যে কত প্রসঙ্গ যে এসেছে, অথচ বলার ভঙ্গিটি এত সহজ যে ভাবাই যায় না ।
    এই সংগ্রহের আরেকটি কবিতা 'যে পার্টি চাইছেন সে পার্টিই পাবেন'।
    বিশ্বাস এক দুর্ঘটনা
    বুকপকেটে শ্রেণী
    প্রতিরোধী থাকেন জেলে
    কাজু-ফলের ফেনি
    বরং ভালো
    ভুল অঙ্কের ডানা।
    ...মোড়ল দলের পাড়ার কেউ বা
    আওড়ায় বেঘোরে
    ছাদ ঢালায়ের সমরবাদ্য
    কর্তাবাবার জানা
    মেলাবেন তিনি অন্তরীক্ষে
    মোক্ষ একখানা ।
    কবিতার শেষ দুটি পঙক্তিতে অমিয় চক্রবর্তীর 'মেলাবেন তিনি মেলাবেন', এই শান্ত, স্হিত, প্রায় ব্রাহ্ম, উত্তর-রাবীন্দ্রিক বিশ্বাসের আদলটি একেবারে বিপরীত অর্থে প্রযুক্ত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে পার্টি আমলাতন্ত্রের যে প্রবল দাপত, যার দরুণ তেলে-জলে মিশ খেয়ে একেবারেই একাকার, পুতুল নাচের সুতোর শেষ প্রান্তটি ব্যক্তিবিশেষের হাতে, সেটিতে যেমন-যেমন টান পড়ছে, কাঠের পুতুলগুলো তেমন-তেমনই নাচছে; এই গোটা পরিবেশটি উঠে এসেছে কয়েকটি মাত্র পঙক্তির মাধ্যমে। মলয় বুঝিয়েছেন, যা বোঝাতে গেলে অন্তত কয়েকশো পাতার বই দরকার। আর? বিরোধীপক্ষ বলতে কিছু নেই আর। যারা বিরোধ করছে, তারাও বস্তুত নিজের-নিজের ছাদই ঢালাই করছে। সেই ছাদ ঢালাই-এর বাজনাকে মানুষ মনে করছে সমরবাদ্য।
    এত সূক্ষ্ম যাঁর ভাষার পরিমিতিবোধ, তিনি কিন্তু 'চিৎকারসমগ্র' গ্রন্হে এসে আবার অন্যরকম হয়ে যান। দড়ি ঢিলে দেন একটু, যাতে তাঁর সংবাদবাহক ঘুরতে পারে জায়গা-বেজায়গায়। 'ভাঙনের ছায়াগাছ' কবিতাটির অংশ পড়া যেতে পারে এই প্রসঙ্গে:
    হাজত থেকে ছাড়ান-পাওয়া সেই প্রৌঢ় নদী
    নাচছে দুর্গাবোঙার ফরসা কোমর জড়িয়ে
    শহর-পুরুতের গামছা কাঁধে
    তাককা হুরে
    আরে হুরে তাককা হুরে
    বোঙা আদিবাসী দেবতা-অপদেবতার সর্বনাম। দুর্গা বাঙালির আবহমানের দুর্গতিনাশিনী। তারই কোমর জড়িয়ে নাচছে হাজত থেকে ছাড়ান-পাওয়া প্রৌঢ় নদী, কাঁধে শহর-পুরুষের গামছা। তাককা হুরে, আরে হুরে তাককা হুরে, শহুরে মাস্তানদের উল্লাসধ্বনি।
    ভাঙনের ছায়াগাছ। এই ভাঙনকে সর্বদা দেখতে পাওয়া যায় না, অথচ সে তার কাজ করে চলেছে। ভাঙন বস্তুত একটি সার্বিক প্রক্রিয়া। এর দরুন সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে মজাদার মিলমিশ। বুর্জোয়ার বক্তব্য আশ্রয় করে লুমপেনের ভাষাকে।লুমপেন অ্যাডপ্ট করে বুর্জোয়ার চালচলন। এর সংস্কৃতি ঢুকে পড়ে ওর উঠোনে। ওর 'রোনাধোনা'য় শোনা যায় এর অনুরণন।
    চিৎকার করতে-করতে পড়ছে জলপ্রপাত চুলে
    ঢাউসপেট পোয়াতি অফিস-বারান্দায় আইল হাতে
    থ্যাতলানো ট্যাক্সিচালক হাওড়া স্টেশানে
    যেখানে সাপের ফণা জমা রাখতে হয়
    শহর বিষদাঁত খুলে নেয় প্রত্যেকের। ছোবলানো তো চলবেই না, ফোঁস করাও নয়। অফিস বারান্দায় ফাইল হাতে গর্ভিনী। কী প্রসব করতে চলেছে সে ? তারই মধ্যে ঝরে যেতে থাকা কেশপাশের চিৎকার। আলুলায়িত কেশপাশ বাঙালির আবহমানের সৌন্দর্য-মিথের অংশ।
    মেঝেময় ছড়িয়ে-থাকা গোঙানির টুকরো তুলে
    তারা বদলায়নি তবু আদল পালটেছে
    হে নাইলন দড়ি বাড়িতে এখন কেউ নেই
    কিন্তু বাইরে হাজার দুর্গন্ধে ভাগ-করা শহর
    কবিতাটি পড়তে-পড়তে বহু পুরোনো টার্কিশ ফিলম 'কংকারার্স অফ দি গোলডেন সিটি'র কথা মনে পড়ে। নিষ্পাপ একটি গ্রাম্য পরিবার শহরে এসে সব কিছু ধিরে-ধিরে হারাল। তার মেয়েরা হয়ে গেল বেশ্যা, পুরুষেরা অপরাধি। হাজার দুর্গন্ধে ভাগ-করা শহর--- গোল্ডেন সিটি। সোনার শহর। নারকেল দড়ির বদলে নাইলন দড়ি, সভ্যতার অগ্রগতি। বাড়িতে কেউ নেই , শূন্যতা অপরিসীম।
    কবিতাটির শেষ স্তবকে এসে মলয় দুর্বার ছুট লাগান--- এমন ছুট যে কবিতা ব্যাপারটাই দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
    কচি বালক-পাছার নধরমাংস দেবদূত
    মাখনমাখা ব্রয়লার যার শেষ খদ্দের
    চলে গেছে তিন বছর তার ব্লাউজে সেফটিপিনগাঁথা হৃদয়
    স্লুইস দরজা খুলে আলোর নারীশরীর
    যে জীবন বুকের সামনে উঁচিয়ে অচেনা পিস্তল
    তখনই সিঁড়িতে সাদা ছড়ির আওয়াজ তুলে
    গামছায় মুখ ঢেকঢ গাঁও বালিকার কান্না
    কেঁপে উঠেছে শিশুর গায়ে হাত ঠেকলে
    ভাঙন যখন সব কিছুকেই ভাঙছে, তখন কবিতাকেও সে ভাঙবে। ভাঙতে-ভাঙতে কবিতাও মুক্ত হয়ে যাবে। তখনই বোধহয় বিদ্যুৎ ঝলকের মত এক অন্য কবিতার সৃষ্টিমুহূর্ত।'ভাঙনের ছায়াগাছ' কবিতায় আমরা সেই প্রক্রিয়াটি দেখতে পাচ্ছি, চাক্ষুষ।মলয় রায়চৌধুরী থেকে বোধ হয় এক নতুন কবিকুলের সৃষ্টি হল, যাঁরা কেবল কবি নন, আপোষহীন সামাজিক ভাষ্যকারও বটে।

     
  • শুভদীপ রায় চৌধুরী | 223.177.62.180 | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:১৭735108
  • হাংরি আন্দোলন ও সাবর্ণ ভিলা : ইতিহাসের হাতছানি- শুভদীপ রায় চৌধুরী

    সাবর্ণ গোত্রীয় রায় লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার চৌধুরীর তৃতীয়পুত্র গোপাল রায়(২৩তম বংশধর) হুগলি জেলার বালিগ্রামের উত্তরাংশের জমিদারি দেখাশোনা করতেন সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। পরবর্তীকালে জগদীশ রায় চৌধুরীর তৃতীয়পুত্র রত্নেশ্বর রায় চৌধুরী(২৫তম বংশধর) এই উত্তরাংশের জমিদারি দেখাশোনা করার জন্য তিনি গঙ্গানদীর পূর্বপারের গাঁদিগ্রাম থেকে চলে আসেন অর্থাৎ সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিক অথবা অষ্টাদশ শতকের শুরুতে তিনি বালিগ্রামের উত্তরাংশে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। অতীতে এই অঞ্চলের নাম “উত্তরপাড়া” দিয়েছিলেন রায় লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার চৌধুরী। তিনিও(রত্নেশ্বর রায়) এই উত্তরপাড়া নামটাই বহাল রাখলেন। রত্নেশ্বর রায় উত্তরপাড়ায় যে বসতবাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন তা “সাবর্ণ ভিলা” নামে পরিচিত।বর্তমানে সামান্যকিছু ধ্বংসস্তূপ লক্ষ্য করা যায়। উত্তরপাড়ার  সাবর্ণভিলাতে হাংরি আন্দোলন ( বাংলা শিল্প-সাহিত্যের এক বিচিত্র আন্দোলন) বিকশিত হয়েছিল যদিও আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ছিল পাটনা।


    উল্লেখ্য রত্নেশ্বর রায়ের পৈতৃক নিবাস কুমারহট্ট হালিশহর হলেও তিনি জমিদারির কাজকর্ম দেখার জন্য বারাকপুরের নিকট গাঁতি বা গাঁদি নামক স্থানে বসবাস করতেন। সেই অঞ্চলের গোষ্ঠীপতিও ছিলেন এবং ধার্মিক নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ছিলেন। তিনি যে স্থানে বসতিটি নির্মাণ করেছিলেন সেই স্থানটি আজও চৌধুরীপাড়া নামে পরিচিত-

     

    ‘ব্রাহ্মণের পাকাবাড়ি বাজে ঘড়ি দরজার উপর।
    দাসদাসী কত আসি সেবে নিরন্তর।।’


    বর্তমানে এই বিশাল অট্টালিকা ভেঙে বহুতল অট্টালিকা নির্মিত হয়েছে, অতীতের ‘সাবর্ণভিলা’ সম্প্রতি লুপ্ত হলেও ইতিহাসের সাক্ষী রয়েছে উত্তরপাড়ার বিভিন্ন স্থান। বলাবাহুল্য এই ‘ভিলা’ শব্দটি সংযোজিত হয়েছে ঔপনিবেশিক মেজাজের তাগিদে। এই ভিলার প্রবেশদ্বার কাঠের গেটের বাঁদিকে ছিল ‘সাবর্ণভিলা’ ফলকটি। গেটের ডানদিকে একটি বিরাট জামরুল গাছ। বাকী গাছপালা ছিল অট্টালিকার পিছনদিকে। সাবর্ণ ভিলার প্রবেশ করলেই চওড়া পথ তারপরই দ্বিতীয় প্রবেশদ্বার। প্রবেশদ্বারের বাঁদিকে লেখা ছিল ‘যদুনাথ-মাতঙ্গিনী মন্দির’। সেই স্থান পেরিয়ে তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত হয় শরিকানা তাগিদে।


    এই সাবর্ণ ভিলা’র সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক ঘটনাবলী, যা আজও ইতিহাসের প্রাচীন কাহিনী মনে করায়। উত্তরপাড়ায় এই ভিলায় থাকতেন সাবর্ণ বংশীয় শ্রী সমীর রায় চৌধুরী এবং শ্রী মলয় রায় চৌধুরী(৩৩তম)। উভয়ই প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক, সেই কারণে সমীর রায় চৌধুরীর বন্ধু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়রা আসতেন সাবর্ণ ভিলায়। এই ভিলাতে একসময় ফনী গাঙ্গুলী থাকতেন ভাড়ায় সপরিবার নিয়ে, আবার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়’এর “নীরা” চরিত্রের জন্ম এই উত্তরপাড়ার অট্টালিকাতেই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রথম বই “একা এবং কয়েকজন” সমীর রায় চৌধুরী প্রকাশ করেছিলেন, তখন দাম ছিল দুটাকা। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছাড়াও সাবর্ণ ভিলাতে আসছেন বিভিন্ন তরুণ প্রজন্মের কবি সাহিত্যিকরা, বসত সাহিত্য ও কাব্যের আসর। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, দীপক মজুমদাররাও আসতেন এই আড্ডায়। সমীর রায় চৌধুরী প্রায় ২৫টির মতন গ্রন্থ রচনা করেছিলেন যেমন- ‘খুলজা সিমসিম’, ‘ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি’, ‘অধুনা কবিতা বিচার’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।



    এই উত্তরপাড়ার সাবর্ণদের অন্যতম বংশধর জন্মগ্রহণ করেছিলেন যোগীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী ১৮৬১ সালে যিনি পরবর্তীকালে স্বামী যোগানন্দ শ্রীশ্রীসারদাজননীর প্রথম মন্ত্রশিষ্য ছিলেন এবং শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব যোগীন মহারাজকে ঈশ্বরকোটি বলেও উল্লেখ করেছিলেন। বাংলা সাহিত্য জগতে উত্তরপাড়ার সমীর রায় চৌধুরী ও মলয় রায় চৌধুরীর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের সৃষ্টি ও কর্মকুশলতা বাংলা তথা ভারতবর্ষ ভুলতে পারবে না। ১৯৬১সালে নভেম্বর মাসে পাটনা শহর থেকে প্রথম বুলেটিন প্রকাশিত হয়, সূত্রপাত করেছিলেন সমীর রায় চৌধুরী, মলয় রায় চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও দেবী রায়। কারণ মলয় রায় চৌধুরীর কৈশোর ও যৌবনকালের বেশিরভাগ সময়ে কেটেছে পাটনা আর চাঁইবাসায়, সেখানেই গড়ে উঠেছিল শিল্পী সাহিত্যিকদের আড্ডা। বলা যেতে পারে তরুণ শিল্পীদের সাহিত্যের জমাটি আসর বসেছিল। মলয় রায় চৌধুরী ১৯৫৯-৬০ সালে চিন্তায় ক্লিষ্ট হয়েছিলেন যে শিল্প-সাহিত্যকে বাঁচানোর জন্য একটা কিছু করা প্রয়োজন। তিনি তাঁর এক প্রবন্ধে বলেছিলেন- ‘আমি কলকাতার আদি নিবাসী পরিবার সাবর্ণ চৌধুরীদের বংশজ এবং সেজন্যে বহু ব্যাপার আমার নজরে যেভাবে খোলসা হয় তা অন্যান্য লেখকদের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।’ তার প্রধানত কলকাতার বাইরে থেকে হাঙরি আন্দোলনের কর্মকাণ্ড চালিয়েছিলেন। হাঙরি আন্দোলন মলয় রায় চৌধুরীর মানবসন্তান তাকে লালন করেছিলেন সমীর রায় চৌধুরী।


    এই সময়ে মলয় রায় চৌধুরীর লক্ষ্য পড়ে কবি জিওফ্রে চসারের ছত্রটি ‘ইন দি সাওয়ার হাঙরি টাইম’-কাব্যছত্রটি। সেখান থেকেই “হাঙরি” শব্দটি গ্রহণ করেছিলেন মলয় বাবু। প্রথম বুলেটিনটি ইংরাজিতেই ছাপা হয়েছিল কারণ সেই সময় পাটনায় বাংলা ছাপার প্রেস পাওয়া যায় নি। বুলেটিন প্রকাশনার খরচ নেবে মলয় রায় চৌধুরী, সমস্ত কিছু সংগঠিত করার দায়িত্ব নেবেন সমীর রায় চৌধুরী, সম্পাদনা ও বিতরনের দায়িত্ব নেবেন দেবী রায় এবং নেতৃত্ব দেবেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। ১৯৬১-১৯৬৫ এই পাঁচবছর প্রকাশিত হয় হাঙরি আন্দোলনেরন শতাধিক বুলেটিন। আন্দোলনের ব্যতিক্রমী ভাবনা মাথায় রেখেই বুলেটিনগুলির আকৃতি অন্যরকম হয়- হ্যান্ডবিল, ফালি কাগজ, কুষ্ঠি ঠিকুজি সদৃশ কাগজ ছিল বুলেটিনের আকৃতি। বুলেটিনে লেখালেখি ও ইস্তাহার প্রকাশিত হত। বলাবাহুল্য বুলেটিন ছাড়াও পোস্টার, মুখোশ ইত্যাদি নানান রকম কিছু ব্যবহার করেছিলেন। একপাতার বুলেটিনে তাঁরা কবিতা, রাজনীতি, ধর্ম, জীবন, ছোটোগল্প, নাটক ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে লেখা ছাড়াও কবিতা, গদ্য, অনুগল্প ও স্কেচও প্রকাশ করা হত। ১৯৬২-৬৩ সালে আন্দোলনে যোগদান করেন বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, ফাল্গুনী রায়, আলো মিত্র, রবীন্দ্র গুহ, সুভাষ ঘোষ, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, প্রদীপ চৌধুরী, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সতীন্দ্র ভৌমিক, শৈলেশ্বর রায়, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, আশোক চট্টোপাধ্যায়, ভানু চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার মিত্র, দেবাশিষ মুখোপাধ্যায়, তপন দাশ, যোগেশ পাণ্ডা, অরুণেশ ঘোষ, বিজন রায়, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, অলোক গোস্বামী, দেবজ্যোতি রায়, নির্মল হালদার, সুব্রত রায়, অরুণ বনিক, জীবতোষ দাশ, দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, প্রিতম মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।



    হাঙরি আন্দোলনের বুলেটিনগুলি হ্যান্ডবিলের মতন প্রকাশ করায় ঐতিহাসিক ক্ষতি হয়েছিল কারণ অধিকাংশ বুলেটিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি সংগ্রাহকরের পক্ষে। কলকাতার লিটিল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি সংগ্রহ করেছেন বেশ কয়েকটি এবং ঢাকা বাংলা একাডেমিও কয়েকটি সংগ্রহ করে রাখতে পেরেছিলেন। হাঙরি আন্দোলন তখন জোরদার হয়ে উঠেছিল। এর আগে হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর নেতৃত্বে ইয়ং বেঙ্গল সাংস্কৃতিক আন্দোলন ঘটলেও এর আগে বাংলা সাহিত্যে ইশতিহার প্রকাশ করে এমন কোন আন্দোলন আগে হয়নি। ফলে হাঙরি আন্দোলন সমাজে ও প্রশাসনে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। দর্পন, জনতা, জলসা ইত্যাদি পত্রিকায় বিভিন্ন খবর প্রকাশিত হতে লাগল। পরবর্তীকালে যুগান্তর, দি স্টেটসম্যান, দিল্লির ব্লিৎস পত্রিকাও প্রকাশ করতে লাগল এই সম্পর্কিত খবর।


    হাঙরি আন্দোলনের প্রকাশিত বেশ কয়েকটি বিখ্যাত কবিতা হল- “পোপের সমাধি”-উৎপল কুমার বসু, “প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার”- মলয় রায় চৌধুরী, “সীমান্ত প্রস্তাবঃ মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি আবেদন”- শক্তি চট্টোপাধ্যায়, “হত্যাকাণ্ড”-ত্রিদিব মিত্র, “হনির জন্মদিন”- সমীর রায় চৌধুরী, “উন্মাদ শহর”-দেবী রায়, “ভৎর্সনার পাণ্ডুলিপি”- বিকাশ সরকার, “হাবিজাবি”-সুবিমল বসাক, “মানুষের সঙ্গে কোন বিরোধ নেই”-ফাল্গুনী রায় ইত্যাদি। কয়েকটি বিখ্যাত গদ্য হাঙরিলিস্ট হল- “স্মৃতির হুলিয়া ও প্রতুলের মা ওমলেট অবধি” সমীর রায় চৌধুরী, “কাঠের ফুল”- ফাল্গুনী রায়, “বমন রহস্য”- বাসুদেব দাশগুপ্ত, “বিজনের রক্তমাংস”-সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।


    প্রথম বুলেটিন’র নমুনা নীচে প্রদান করা হলঃ
    WEEKLY MANIFESTO OF THE HUNGRY GENERATION
    Editor: Debi Rai               Rai  Leader: Shakti Chatterjee
    Creator: Malay Roy Choudhury
    Poetry is no more a civilising manoeuvre, a replanting of the bamboozled gardens; it is a holocausi, a violent and somanambulistic jazzing of the hymning five, a sowing of the tempestual hunger.
    Poetry is an activity of the naaissisti spirit. Naturally, we have discarded the blankely-blank school of modern poetry, the darling of the press, where poetry does not resurrect itself in an orgasmic flow, but words come up bubbling in an artificial muddle. In the prosedrhyme of these born-old half-literates you must fail to find that scream of desperation of a thing wanting to be a man, the man wanting to be spirit……………….
    (Published by Hualhan Dhara, from 269 Netaji Subhas Road, Howrah,west Bengal, India)


    মলয় রায় চৌধুরীর হাঙরি আন্দোলন মুলত বিনা বাধায় এগিয়ে যেতে পারেনি। পদে পদে বাধা এবং প্রতিঘাত এসেছে। ১৯৬৩ সালের শেষদিকে সুবিমল বসাককে পর পর দুবার কলেজস্ট্রীটের কফি হাউসে হেনস্থা হতে হয়েছে এমন কি তাকে মারতেও উদ্যত হয়েছে। ১৯৬৪সালের সেপ্টেম্বরে হাঙরি আন্দোলনের কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার হলেন, ইউনিয়ান পিনাল কোডের ১২০বি, ২৯২ এবং ২৯৪ধায়ার। গ্রেপ্তার হলেন মলয় রায় চৌধুরী, সমীর রায় চৌধুরী, দেবী রায়, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর রায়, প্রদীপ চৌধুরী, উৎপলকুমার বসু, রমানন্দ চট্টোপাধ্যায়। এদের মধ্যে প্রথম ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয় ও কলকাতার ব্যাঙ্কশাল কোর্টে তোলা হয়। মলয় রায় চৌধুরী এমনই রাজরোষে পড়েছিলেন যে তাকে হাত কড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। মকদ্দমার ফলে উৎপলকুমার বসু অধ্যাপনার চাকরি থেকে বরখাস্ত হন, প্রদীপ চৌধুরী রাসটিকেট হন বিশ্বভারতী থেকে, সমীর রায় চৌধুরী সরকারি চাকুরি থেকে সাসপেন্ড হন, সুবিমল বসাক ও দেবী রায়কে কলকাতার বাইরে বদলি করে দেওয়া হয়, রমানন্দ চট্টোপাধ্যায় ফেরার হয়ে যান। হাঙরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা হয় ১৯৬৪ সালে তা চলে ৩৫মাস অর্থাৎ ১৯৬৭ সাল অবধি। সাম্প্রতিক কালে হাঙরি বুলেটিনে প্রকাশিত হয় মলয় রায় চৌধুরীর “প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার” কবিতা এবং তখন ১২০ এবং ২৯৪ ধারা তলে নিলেও ২৯২ধারায় চার্জশীট দেওয়া হয় তার বিরুদ্ধে। লালবাজারের কনফারেন্সরুমে মলয় রায় চৌধুরী ও সমীর রায় চৌধুরীকে জেরা করেন বিভিন্ন দপ্তরের গোয়েন্দাবিভাগ। গ্রেপ্তারের সময় প্রত্যেকের বাড়ি লণ্ডভণ্ড করা হয়েছিল এবং বইপত্র, ডায়রি, টাইপরাইটার, ফাইল যেগুলি পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল সেই গুলি তার আর ফেরত দেন নি।



    বর্তমানে প্রায় চল্লিশ বছর পরে হাঙরি জেনরেশনের আন্দোলনকে নিয়ে ব্যবসা হচ্ছে। “হাঙরি জেনেরেশন রচনা সংকলন” নামে বহু বই প্রকাশিত হচ্ছ। সেই বইয়ে মূল হোতা তথা হাঙরি আন্দোলনের শ্রষ্ঠা শ্রী মলয় রায় চৌধুরীর লেখা বা নামের অস্তিত্ব নেই। সই শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, বিনয়, সমীর রায় চৌধুরীর নাম নেই। এ এক ইতিহাসের বিকৃত রূপ-পরিহাস। ব্যাবসা বাণিজ্য ব্যাপারটা একটা ভয়ংকর সাংস্কৃতিক সন্দর্ভ। কিন্তু সাহিত্য মলয় রায় চৌধুরীর নাম সাহিত্যের পাতা থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তিনি নিজ প্রতিভায় বাংলা সাহিত্যে ঠাঁই পেয়েছেন। মলয় রায় চৌধুরী ২০০৪সালে “সাহিত্য আকাদমি” পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি চির প্রতিবাদী একজন সাহিত্যিক। লেখক তাঁর স্বভাবসিদ্ধ মানসিকতায় সহজই এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলেন। সর্বভারতীয় এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে তার বরাবরবর প্রতিষ্ঠান বিরোধী বলিষ্ঠ মানসিকতাই ফুটে উঠেছে। বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত ধ্যানধারণাকে তিনি যেভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছিলেন তাতে তার বলিষ্ঠ ভাবমূর্তিই ফুটে ওঠে। তিনি আমাদের কাছে চিরদিনের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হিসাবেই বিরাজ করবেন। কারণ তিনি আর পাঁচজন সাহিত্যিকের মতন বাজারি সাহিত্যের বাজারি উপাদানের মধ্যে যদি নিজেকে বিকিয়ে দিতে পারতেন তাহলে হয়ত আজকে তিনি ও “বুদ্ধিজীবী চূড়ামণি” হতে পারতেন।


    উপাদান:
    ১. হাওয়া ৪৯, তেত্রিশতম সংকলন, বইমেলা ২০০৬(সম্পাদক-সমীর রায় চৌধুরী)
    ২. প্রতি সন্দর্ভের স্মৃতি- মলয় রায় চৌধুরী, উৎসব সংখ্যা ২০০৪
    ৩. বঙ্গীয় সাবর্ণ কথা কালীক্ষেত্র কলিকাতা- ভবানী রায় চৌধুরী, প্রথম প্রকাশ ২০০৬
    ৪. হাঙরি কিংবদন্তী- মলয় রায় চৌধুরী, ১৯৯৭
    ৫. হাংরি আন্দোলন ও দ্রোহপুরুষ-কথা- ডঃ বিষ্ণুচন্দ্র দে, ২০১৩
    ৬. Intrepid Hungry Generation, Edited by Allan De Loach, USA-1968
    ৭. হাঙরি সাক্ষাৎকারমালা, অজিত রায় সম্পাদিত, মহাদিগন্ত প্রকাশনী, ১৯৯৯
    ৮. হাঙরি প্রজন্ম- উইকিপিডিয়া

  • বহতা অংশুমালী মুখোপাধ্যায় | 223.177.62.180 | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:২১735109
  • বহতা অংশুমালী মুখোপাধ্যায় : মলয় রায়চৌধুরীর পৌরুষ
    -----------------------------------------
    মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে হঠাৎ লিখছি কেন? এইজন্যে নয় যে আমার বই বেরোচ্ছে, আর বইএর ব্লার্বে তিনি যাচ্ছেতাই রকমের ভালো লিখে দিয়েছেন। সে তিনি অমনিও লিখতেন। (কাজ আদায় হয়েই গিয়েছে ) আমায় স্নেহ করেন, ভালোবাসেন একটু। আমি তাঁর বেশ-বয়সের অবন্তিকাদের মধ্যে একজন। ডিট্যাচড, পড়ুয়া, চোখে চশমা আঁটা, উচ্চাশী অবন্তিকা। তিনি আমার পিতৃপ্রতিম। জাগতিকে তাঁকে তেমনই ভালোবাসি। আর অন্য এক জায়গায় তাঁকে ভালোবাসি, যেমন ক’রে তাঁর অসাধারণ উপন্যাস “ডিটেকটিভ নোংরা পরীর কঙ্কাল প্রেমিকে”, অনেক আগে মরে যাওয়া কঙ্কালকে, এক বৃদ্ধের কংকালকে, তার জীবনের কনসেপ্টকে ভালোবেসে ফেলেছিল ইন্সপেক্টর রিমা খান। কেন? সেই গণিতবিদ, উৎশৃংক্ষল কংকালের পৌরুষের জন্য। আমি এই অদ্ভুত আখ্যানটি লিখছি কারণ, কবে এই কিংবদন্তীস্বরূপ বৃদ্ধ ফট ক’রে মরে যাবেন। এখনো দেখা করিনি। ফোন করিনি। যদি মরে যান, একা ফ্ল্যাটে ছটফট করবো শোকে। সেই ভয়ে, এখন কিছু দিয়ে রাখা। টিকে যেতেও পারেন অনেকদিন আরো। ভীষণ জীবনীশক্তি। জীবনকে ভালোবেসে চুষে খাবার ইচ্ছে।
    মলয় রচৌকে দাদা বলার দূরভিলাষ হয় নি কখনো আমার। এই গ্যালিভার কেন যে লিলিপুটের সংসারে নিজেকে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টায় সারা শরীরে তাদের মই বেয়ে উঠতে দেন, সেই নিয়ে আমার এক চাপা ক্ষোভ ছিল। ইনি ভীষন পণ্ডিত। বাকি বড় বড় কবিদের মতো দূর থেকে কিছু কিছু জ্ঞানের কথা লিখলেই লোকে আশেপাশে ঘুরতো বেশী বলে আমার বিশ্বাস। তাও আমাদের মতো নতুন শিঙওলাদের, এবং আমাদের চাইতেও আরো আরো খাজা জনগণকে উনি প্রশ্রয় দেন। এই মার্কেটিঙের স্টাইলটা আমার পছন্দ নয়। কিন্তু পুরুষালী কড়া মদের মতো তীব্র আত্মবিশ্বাসে উনি যে এটা ক’রে যান, প্রচণ্ড টেক-স্যাভি, সরাসরি, আড়ালহীন প্রচার, এটাও আমার আজকাল ভালই লাগে।
    তাঁর হাত দিয়ে যে কবিতা বেরিয়েছিল, (“প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার ১৯৬৩ সালে ভারতীয় কবি মলয় রায়চৌধুরী রচিত ৯০ লাইনের একটি জলবিভাজক কবিতা। কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে হাংরি বুলেটিনে।প্রকাশের পর সাহিত্যে অশ্লীলতার অভিযোগে কবিতাটি নিষিদ্ধ করা হয়। ভারতীয় আদালতে হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে তিনটি ধারায় মামলা হয় এবং মলয় রায়চৌধুরীসহ অন্যান্য আন্দোলনকারী গ্রেফতার হন। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে মামলাটি নাকচ হয়ে যায়। মামলা চলাকালীন সময়ে আমেরিকা ও ইউরোপে মলয় রায়চৌধুরীর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, এবং বিভিন্ন ভাষায় কবিতাটি অনুদিত হয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত 'মর্ডান অ্যান্ড পোস্টমর্ডান পোয়েট্রি অফ দ্য মিলেনিয়াম" সংকলনে দক্ষিণ এশিয়া থেকে একমাত্র কবিতা হিসেবে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।” (উইকিপিডিয়া থেকে)), সেই কবিতা কারোর হাত থেকে বেরোনো শক্ত। সারা পৃথিবীর কবিতাপ্রেমী তা জানে। আমি আর তা নিয়ে বলি কেন। ওরকম একটা কোনদিন নামাতে পারলে বুঝতাম, হুঁ, কিছু করা গেলো। হবে না। সে আধার নেই আমার। তাই বলে ওনার এখনকার অনেক কেমন-যেন কবিতাকে লাইক টাইক দিতে পারি না। প্রয়োজনও নেই। যার এত উপন্যাস আছে, তাকে কেবা কবিতায় যাচে?
    মলয় রচৌএর উপন্যাসগুলি ভীষণ ভীষণ আণ্ডাররেটেড। বাংলা সাহিত্যে ঠিক ওরকম উপন্যাস বেশি লেখা হয় নি। ভালোয় মন্দে শুধু না, অদ্ভুত অন্য ধারার জন্য। কেন লেখা হয় নি তার বড় কারণ আমার মতে এই যে, ওরকম টেস্টোস্টেরন সম্বলিত প্রেমিক পুরুষ খুব বেশী নেই মনে হয় বাংলা সাহিত্যজগতে।
    এই জগতের ক্যাচাল আমি তেমন জানি না। কিন্তু মলয় রচৌ, মাঝে মাঝেই কাজের মেয়ে না এলে স্ত্রীএর সঙ্গে মন দিয়ে রান্নাবান্না বাসনমাজা, কাপড় কাচা ইত্যাদি করে ফেলেন। করার তো কথাই। জানি না তিনি জীবনে কতটা বিশ্বাসী অবিশ্বাসী ছিলেন সামাজিক অর্থে। খালি জানি, ইনবক্সে যখন কোন প্রশ্নের উত্তরে বলেন “বলে ফ্যাল । আজকে কাজের বউ আসেনি । বুড়ো-বুড়িকে অনেক কাজ করতে হবে । লাঞ্চে খিচুড়ি । ডিনারে প্যাটিস।”, কি ভালো যে লাগে! এই বুড়ি, যাঁকে আমি খালি ছবিতে দেখেছি, একসময়ের দাপুটে হকি খেলোয়াড়, তাঁকে এই “অ-কংকাল প্রেমিক” ভীষণ দাপটে ভালোবেসে গেছেন, এমন একটা ছবি বেশ মনে মনে আঁকতে পারি, এঁকে ভালো লাগে।
    মলয় রচৌএর উপন্যাসের পুরুষদের মতো প্রেমিক আমি বাংলা উপন্যাসে কম দেখেছি। তাঁর “ডিটেকটিভ নোংরা পরির কংকাল প্রেমিক” উপন্যাসে, এক গণিতবিদ, বহুগামী অবিবাহিত পুরুষ, হঠাৎ এক স্বল্পপরিচিত সহকর্মী মহিলার “চলুন পালাই” ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গিয়েছিলেন বিন্ধ্যপর্বতের অন্য দিকে, তামিল দেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। নাগরিক সভ্যতার থেকে পালাতে চেয়েছিলেন এই উচ্চশিক্ষিতা তরুণী মায়া, আর মায়ার ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকে গেছিলেন সেই গণিতবিদ। এই উপন্যাসটি ছোট্ট, গোগ্রাসে গেলার মতো, নানান ভাবে রগরগে, আর নানান ভাবে ভীষণ ভীষণ সেরিব্রাল, মস্তিষ্কপ্রবণ। এই উপন্যাসে, জঙ্গুলে জীবনে ফিরতে চাওয়া মায়ার ঋতুস্রাবকালে, তাকে নিজ হাতে ধুইয়ে দিয়েছে তার প্রেমিক। অথচ দুজনে দুজনকে ডেকেছে “আপনির” দূরত্বের পবিত্রতায়, নিজেদের স্বত্ত্বাকে আলাদা বোঝাতে, “পবিত্রতার মতো অস্পষ্ট” শব্দকে ধূলিসাৎ করেও। এই উপন্যাসটির একটি রিভিউ আমি আগেও করেছি। বিশদে যাবো না। শুধু, এই প্রেমিকের প্রতি আমার গভীর মায়া যে বলে “চাল-পোড়া তো খাওয়া যাবে না , তাই মায়া চাল দাতাকে অনুরোধ করেছিল যে আমাদের একমুঠো ভাত দিলেই চলবে, কাঁচকলা পোড়া বা কাঁঠালবিচি পোড়া দিয়ে খেয়ে নেয়া যাবে, লঙ্কার টাকনা দিয়ে । প্রায় প্রতিদিনই ভাত পেতে লাগলুম , যদিও কলকাতায় যা খেতুম তার চেয়ে অনেক কমই, কিন্তু কম খেয়ে আর রাতে না খেয়ে অভ্যাস হয়ে যাচ্ছিল কম খাবার । আমি চাইতুম মায়া বেশি খাক, মায়া চাইত আমি বেশি খাই । আমি একদিন বলেই ফেললুম, প্রকৃত ভালোবাসা কাকে বলে জানি না, কেবল যৌনতাই জেনে এসেছি এতকাল, আপনি ভালোবাসতে শেখালেন। জবাবে মায়া বলেছিল, অতীতকে আনবেন না প্লিজ, আপনি কী ছিলেন, কী করেছিলেন, সব ভুলে যান, সমস্তকিছু মুছে ফেলুন, আমি কি কোনো স্মৃতিচারণ করেছি?”। বা যে বলে “জীবনের বাঁকবদলগুলো, যতবার ঘটেছে বাঁকবদল, সব সব সব সব নারীকেন্দ্রিক ; নারীর ইচ্ছার, নির্দেশের, দেহের, আকর্ষণের, রহস্যের মোহে । স্কুলের শেষ পরীক্ষায় ভাল, সান্মানিক স্নাতকে খুব-ভাল , স্নাতকোত্তরে অত্যন্ত ভাল, তাদেরই কারণে , প্রভাবে, চাপে, আদরে । চাকরিতে যোগ নারীর জন্যে উন্নতি নারীর জন্যে, চাকরি ছাড়া নারীর জন্যে , ভাসমান জীবিকা নারীর জন্যে , অবসরে পৈতৃক বৈভবে পরগাছাবৃত্তি নারীর কারণে । কে জানে, হয়তো মৃত্যুও নারীর হাতেই হবে । জীবনে নারীদের আসা-যাওয়া, সেনসেক্স ওঠা-পড়ার মতন, না ঘটলে, আমার ব্যর্থতা, ব্যথা, পরাজয়, গ্লানি, অপরাধবোধ, এ-সবের জন্যে কাকেই বা দায়ি করতুম ! কাকেই বা দোষ দিতুম আমার অধঃপতনের জন্যে ? লোভি লম্পট মাগিবাজ প্রেমিক ফেরারি হয়ে ওঠার জন্যে ? হবার, নাকি হয়ে ওঠার ? আসলে আমি একটা কুকুর । আগের সিডিতে লিখেছি, তবু রিপিট করছি শেষনির খাতিরে । যে-মালকিনির হাতে পড়েছি , সে য-রকম চেয়েছে, যে-রকম গড়েছে , তা-ই হয়েছি । সেবার কুকুর, কাজের কুকুর, প্রজননের কুকুর, গুপ্তচর কুকুর, ধাঙড় কুকুর, কুরিয়ার কুকুর, প্রেডাটার কুকুর, পাহারাদার কুকুর, মানসিক থেরাপি কুকুর, শোনার কুকুর, শোঁকার কুকুর, চাটার কুকুর, রক্ষক কুকুর, গাড়িটানার কুকুর, কোলের কুকুর, আদরের কুকুর, এই কুকুর, ওই কুকুর, সেই কুকুর ইত্যাদি । কিন্তু একমাত্র কুকুর যেটাকে আমি ভালবেসেছি, তা হল মালকিনিকে উন্মাদের মতন ভালবাসার কুকুর । কিন্তু আমার লেজটা জন্মের সময়ে যেমন আকাশমুখো ছিল , চিরকাল তেমনই থেকে গেছে।”।
    আমি নিশ্চিত যে, মলয় রচৌও এরকমই আকাশমুখো লেজের কুকুর। তিনি প্রবলভাবে, ভিতর থেকে, লিঙ্গসাম্যে বিশ্বাসী। “অরূপ, তোমার এঁটো কাঁটা” উপন্যাসে তিনি যে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী মহিলা চরিত্র বানিয়েছেন, যে লোভে লালসায়, ভালোবাসায়, প্রতিশোধে, ভীষণ রকম জীবন্ত ও অসহায়, মেয়েদের সবটুকু নিয়ে সবটুকু দিয়ে ভালো না বাসতে পারলে, রূপের মধ্যে ওরকম অরূপ, আর তার এঁটো কাঁটাসহ মচ্ছগন্ধ ধরে রাখা যায় না। এখানেই মলয় রচৌএর পৌরুষ। যে রকম পৌরুষ “দেহি পদপল্লবম উদারম” এর মতো উদাত্ত হাঁক দিতে পারতো জয়দেবের কালে, পারে একালেও। তাঁর “ছোটোলোকের ছোটোবেলা” আর “ছোটোলোকের যুববেলা” তেমনই অকপট, দাপুটে, উজ্জীবিত, ভিগরস। নিজেকে বিশ্রেণীকরণ করেছেন শুধু জোর করে নয়। তিনি সেরকম হয়েও উঠেছেন। তাঁর মেজদার জন্মরহস্য পড়ে এক একবার মনে হয়েছে, সবটা বলে দেওয়া কি তাঁর ঠিক কাজ হয়েছে পরিবারের প্রতি? আবার এক একবার মনে হয়েছে, বেশ করেছেন, ঠিক করেছেন। বিহারের প্রান্তিক মানুষের জীবন, তাঁর লেখায় দারুণ উঠে এসেছে। “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” উপন্যাস যেমন লিরিক্যাল কোথাও কোথাও, তেমনই, গভীর রাজনৈতিক চেতনায় প্রোথিত। তাঁর অনেক উপন্যাসই তাই। খুব কাটাকাটা, খুব ন্যাকামোহীন, নির্মোহ, নিজের প্রতিও, নিজের নায়কদের প্রতিও, অনেকটা নায়িকাদের প্রতিও। এরকম ধারাবিবরণী বাংলায় লেখা কম উপন্যাসেই আছে। খানিকটা সমরেশ বসুর “যুগযুগ জীয়ে”তে কাছাকাছি কিছু স্বাদ পাই। তাও, এই উপন্যাসগুলি লেখার ধরণে অনেক আলাদা। আর এই সবের পরেও রচৌকে জিগালে, তাঁর সব জীবনদর্শনের মধ্যে, সব ছাপিয়ে, হয়তো কৈশোরের ভুবনমোহিনী রাণা উঠে আসবে, প্রথম চুমুর টেণ্ডারনেস নিয়ে। কিশোর পুরুষে।
    এই লেখাটা আবেগতাড়িত। খাপছাড়া। কর্মক্লান্ত দিনের শেষে রাত দেড়টা থেকে তিনটের মধ্যে আজ লিখবোই, বলে লিখে ফেলা। পরে হয়তো সংশোধন করবো আরো। উপন্যাসগুলোর, প্রবন্ধগুলোর, কবিতাগুলোর, ইদানীং লেখা ওনার কিছু কেমন-যেন-ভাল-না কবিতাগুলোও আলোচনা করা যাবে আরো কিছু। তবে এই লেখা অনেকাংশে ব্যক্তিগত ভাবের লেখা। তাই এভাবেই অকপটে লিখছি। আমার গবেষণাপত্রটি যখন শেষও হয় নি, রচৌ আমাকে তখনই খুব উতসাহ দিতেন। আমাকে নিয়ে তাঁর যে অবন্তিকা, তা তখনই লেখা। পরে যখন গবেষণাপত্রটি বেরোলো, আমার ক্ষীণ অনুরোধ থাকা সত্ত্বেও, ফেসবুকে প্রায় সাতশোবার শেয়ার হওয়া এই লেখা, এবং আরো অনেকবার শেয়ার হওয়া লেখার নানান রেফারেন্স কিছুতেই টুইটারের মুখ দেখলো না বাঙ্গালি সমাজে। অথচ টুইটার কাউণ্টই জার্নাল মেট্রিক গ্রাহ্য করে। এই অশীতিপর বৃদ্ধ তখন, না বলতেই, বহুবার, চুপচাপ, এন্তার লোককে, সংস্থাকে ট্যাগ করে, টুইট করেছেন আমার গবেষণার লিংক, বহুদিন। ভালোবাসি কি সাধে?
    আমি যখন ভুলভাল কবিতা লিখতাম, একেবারে বাজে লিখতাম, একবার ওনাকে বলেছিলাম, “এই ছাপোষা জীবন! কোথাও যাই না। চাকরি, ছেলে, আর পড়াশুনো। কবিতায় প্রেমের, পৃথিবীর, মানুষের হাওয়া লাগবে কী করে?”। উনি দুকথায় বলেছিলেন “এটা কোন কাজের কথা না। লিখে যাও। হবে”। তারপর বলেছিলাম, “এখন চাকরি, গবেষণা (গবেষণা না ছাই)। সাহিত্য বাকি পরে পড়বো”। উনি বলেছিলেন, “এটা কোন কাজের কথা না। কমবয়সে না পড়লে রেসেপটিভিটি থাকে না, এখনই পড়তে হবে”। এই দুটো আপাতঃসাধারণ কথা, ওনার গম্ভীর পৌরুষের জোরেই, আমায় পালটে দিয়েছিল অনেকটা।
    এখন হাবিজাবি যা একটু লিখি, মনের দরজা খুলে গেছে তাই। মলয় রচৌরা বাংলাভাষাকে স্পর্ধা আর সাহস এনে দিয়েছিলেন। আমাকে, আমাদের এখনো সেই সাহস ভাঙ্গিয়েই খেতে হয়। আমাকে নিয়ে লেখা সেই কবিতাটা-
    বহতা অংশুমালী, তোর ওই মহেঞ্জোদারোর লিপি উদ্ধার
    কী গণিত কী গণিত মাথা ঝাঁঝা করে তোকে দেখে
    ঝুঁকে আছিস টেবিলের ওপরে আলফা গামা পাই ফাই
    কস থিটা জেড মাইনাস এক্স ইনটু আর কিছু নাই
    অনন্তে রয়েছে বটে ধূমকেতুর জলে তোর আলোময় মুখ
    প্রতিবিম্ব ঠিকরে এসে ঝরে যাচ্ছে রকেটের ফুলঝুরি জ্বেলে
    কী জ্যামিতি কী জ্যামিতি ওরে ওরে ইউক্লিডিনি কবি
    নিঃশ্বাসের ভাপ দিয়ে লিখছিস মঙ্গল থেকে অমঙ্গল
    মোটেই আলাদা নয় কী রে বাবা ত্রিকোণমিতির জটিলতা
    মারো গুলি প্রেম-ফেম, নাঃ, ফেমকে গুলি নয়, ওটার জন্যই
    ঘামের ফসফরাস ওড়াচ্ছিস ব্রহ্মাণ্ড নিখিলে গুণ ভাগ যোগ
    আর নিশ্ছিদ্র বিয়োগে প্রবলেম বলে কিছু নেই সবই সমাধান
    জাস্ট তুমি পিক-আপ করে নাও কোন প্রবলেমটাকে
    সবচেয়ে কঠিন আর সমস্যাতীত বলে মনে হয়, ব্যাস
    ঝুঁকে পড়ো খোলা চুল লিপ্সটিকহীন হাসি কপালেতে ভাঁজ
    গ্যাজেটের গর্ভ চিরে তুলে নিবি হরপ্পা-সিলের সেই বার্তাখানা
    হাজার বছর আগে তোর সে-পুরুষ প্রেমপত্র লিখে রেখে গেছে
    মহেঞ্জোদারোর লিপি দিয়ে ; এখন উদ্ধার তোকে করতে হবেই
    বহতা অংশুমালী, পড় পড়, পড়ে বল ঠিক কী লিখেছিলুম তোকে–
    অমরত্ব অমরত্ব ! বহতা অংশুমালী, বাদবাকি সবকিছু ভুলে গিয়ে
    আমার চিঠির বার্তা তাড়াতাড়ি উদ্ধার করে তুই আমাকে জানাস
    ------------------------------------------------------
    লেখায় বানান ভুল আছে নিশ্চই। কাল ঠিক করবো। কত কথা বাদ গেলো। পরে ঢোকাবো। কিন্তু অনেক সন্তানের বৃদ্ধ পিতাকে প্রস্টেটের ওষুধ খাওয়াতে খাওয়াতে সবচে’ ছোট মেয়েটা যেমন পৌরুষের বেঞ্চমার্ক তৈরি ক’রে মনের মধ্যে সেই বেঞ্চমার্কের উপরের রাজকুমার খোঁজে, তেমনই এই অশীতিপর পিতৃপ্রতিমকে দেখি। আর যেমন ক’রে রিমা খান কঙ্কাল প্রেমিককে ভালোবাসে, ভালোবাসি এঁকে। স্বধর্মে স্থিত, অতি প্রচারমুখী, ঝপঝপ কমেণ্ট ক’রে মুশকিলে ফেলে দেওয়া স্নেহার্দ্র, প্রবাদপ্রতিম পুরুষ। আমাদের খুব কাছে আছেন বলে, বড় বেশি ছোঁওয়া লেগে গেলো। দূরে চলে গেলে, মানুষ বুঝবে, গেলো কেউ। আর আমরা কেউ কেউ, একা ফ্ল্যাটে হাপসে কাঁদবো।
     
     
     
  • উদয়ন ঘোষ | 223.177.62.180 | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:২৬735110
  • উদয়ন ঘোষ : মলয় রায়চৌধুরীর পোস্টকলোনিয়াল, পোস্টমডার্ন ছোটোগল্প
    যত দিন যাচ্ছে, মলয়ের লেখা যত পড়ছি, ততই মনে হচ্ছে, তাঁকে নিয়ে মহাভারত লেখা যায় । মহাভারত অবশ্য কথার কথা, আসলে মলয় সম্পর্কে বহুবিধ কথা লেখা যায় । সেজন্য নিজের সুবিধার্থে এবং টাইম অ্যাণ্ড স্পেস ভেবে, আমি স্হির করেছি, মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে মাত্র ওই কথা লিখি, অর্থাৎ মলয়ের পোস্টকলোনিয়ালিজম এবং তাঁর পোস্টমডার্নিজম ।
    আর যে যাই ভাবুক, আমি ভাবি, এদেশে পোস্টকলোনিয়াল না হলে পোস্টমডার্ন হওয়া যায় না ।
    আদিতেই বলে রাখা ভালো, ওই পোস্টকলোনিয়ালিজম ও পোস্টমডার্নিজম সম্পর্কে আমার ধারণাকে, আমি, কিছুকাল হল, নিজের কাছে অন্তত, স্বচ্ছ করে রাখতে পেরেছি । কেননা দুটোই ঐতিহাসিক ভাববস্তুগত নির্দিষ্ট এক অবজেকটিভ কোরিলেশানে আছে । এবং দুটোই এককভাবে কোনও দর্শন, অথবা আচরণ কিংবা ঢঙ অথবা প্রবণতা নয়, তদুপরি এককভাবে এই দুই কোনও সাংস্কৃতিক অথবা পরিকাঠামোগত স্ফূরণও নয় । এবং এই দুই ওই সবকিছুর যোগফলও নয় । অথভ ওই পোস্টকলোনিয়ালিজম ও পোস্টমডার্নিজমে ওই সব তথাকথিত কোনও নির্দিষ্ট দর্শন, আচরণ, ঢঙ, প্রবণতা, সাংস্কৃতিক/পারকাঠামোগত স্ফূরণ ইত্যাদি ইতস্তত থাকলেও থাকতে পারে । কিছু গবেষক, ক্রিটিক, উৎসাহী পাঠক, অথবা ওই দুই ইজমের ধ্বজাধারী সেবক, লেখক, কিংবা সদাসর্বদা যাঁরা যে-কোনও ইজমের হঠাৎ দার্শনিক বনে যান, অথবা তদনুরূপ সমাজবিজ্ঞানী ওই দুই ইজমে, ওপরে, যা যা লক্ষণের কথা আছে -- তার সবগুলি, অথবা একাধিক, কিংবা যে-কোনও একটি লক্ষণকে ওই দুই ইজমের ধ্রুবতারা মনে করতে পারেন ।
    আমি বরাবরই ওই সব ইজম, এবং তৎসংক্রান্ত নানাবিধ টাইটেল-সাবটাইটেল, লেবেলসর্বস্বতা ইত্যাদি থেকে তফাতে থাকার চেষ্টা করি । জীবিকায় শিক্ষক হবার জন্যে, এবং ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসাবে আমাকে কিন্তু ওই সব পড়তে হয়েছে, এবং ক্লাসে ওই সব বলতেও হয়েছে, বিশেষত তথাকথিত নন্দনতত্বের ক্লাসে । আমাকে ক্ষমা করুন, পাঠক, ক্লাসে, প্রকাশ্যে ওই সব আমি মানিও বলতে হয়েছে, বা এই ঠিক যে রস নয় প্রকার, ছত্রিশ তার অনুষঙ্গ, যেভাবে ওই সব লেখা পোয়েটিইকস সম্পর্কিত গ্রন্হাদিতে, সেভাবেই বলতে হয়েছে । নিজের কথা বলার তো স্কোপ নেই, তাই ছাত্রদের কোনও দিনই বলা হয়নি যে, ওই সব জেনেও, সাহিত্যের চুলও ছোঁয়া যায় না ।
    এমতাবস্হায় আমাকে লিখতে হচ্ছে, ওই কথা অর্থাৎ মলয় রায়চৌধুরীর পোস্টকলোনিয়ালিজম এবং তাঁর পোস্টমডার্নিজম । পাঠক অবশ্যই ভাবতে পারেন, কী দরকার ছিল এইসব ঘটা করার । স্রেফ মলয় রায়চৌধুরী কী ও কে সহজ সরল ভাষায় সরলার্থ করলেই হত !
    হত না ।
    কেননা পাঠক হিসেবে পাঠকমনকে যতটা জানি, সাহিত্যের আলোচনায় যদি ওই সব ইজম, টাইটেল, লেবেল না-থাকে, তাহলে অ্যাকাডেমিক সাহিত্য বুঝতে বড় অসুবিধে হয় । যেই লেখা হল, মলয় হাংরি জেনারেশন অন্যতম ইশ্যু, অমনি পাঠকের যা বোঝার সহজে বোঝা হয়ে গেল । কেননা পাঠকের, যে-কোনো ভাবেই হোক, ওই সব টাইটেল চোখে পড়বেই এবং মূর্ত থেকে বিমূর্ত ধারণা থেকেই যাবে, বলা উচিত জন্মও নেয় ওই সব ইজম, টাইটেল একবার মগজে ঢোকাতে পারলে । এখন, কী করি, আপনিই বলুন পাঠক, যখন পাঠক হিসেবে আমাদের মাথায় ইতিমধ্যেই ঢুকে বসে আছে ওই সব, তখন ওই সব দিয়েই কাজ করে যেতে হবে । না-হয় বযোজোর আমি ইজম টাইটেলের ফ্রেম ভেঙে গড়ে দিলাম । এবং এভাবে পাঠকমন ও আমার ভেঙে দেয়ার মধ্যে সত্যবস্তুকে রক্ষা, দুই-ই সামলালাম । হ্যাঁ, পাঠক, দু-নৌকোয় পা দিয়েই কাজটা করতে হবে । মানুষের সে-অভ্যাস ভালোই আছে -- কেননা পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র তথাকথিত অনাবিল জানোয়ার হয়ে পরক্ষণেই আবার তথাকথিত আবিল মানবিক হতে পারে । এ-কাজকেই আবার মানুষই বলর দু-নৌকোয় পা দেয়া ।
    দুই
    যাই হোক, প্রথমে পোস্টকলোনিয়ালিজমের কথা হয়ে যাক । অর্থাৎ মলয় কোথায় পোস্টকলোনিয়াল । এ-ব্যাখ্যায় আমি মলয়ের নিজস্ব ‘ভূমিকা’ তথা ‘আত্মপক্ষ’ থেকে ওঁরই কথাগুলো হুবহু লিখে যাচ্ছি : “২৯ অক্টোবর ১৯৩৭ থেকে ২ নভেম্বর ১৯৩৯ এর মধ্যে কোনো ১১ই কার্তিক, পাটনার প্রিন্স অব ওয়েল্স মেডিকাল কলেজ হাসপাতালে, পৃথিবীর দিকে পা করে জন্মাবার’’’”ইত্যাদি । অথচ ক্ষণেক পরেই ওই মলয় জানাচ্ছেন, “হাসপাতালের রেকর্ড খুঁজে দেখেছিলুম ২৯ অক্টোবর -- ২ নভেম্বর ১৯৩৭, ১৯৩৮, ১৯৩৯ বৃহস্পতিবার শুক্রবার শনিবার কারুর, ছেলে হয়নি, হলেও মরা অবস্হায়।”--- ময় রায়চৌধুরীর ‘ভেন্নগল্প’-এর দ্বিতীয় ভূমিকার ‘প্রতিবন্ধী অস্তিত্ব’ থেকে হুবহু নেয়া ( পৃ ্ঞ-ট, মার্চ ১৯৮৪ ) ।
    এখন ব্যাখ্যা সরল যে, মলয় পোস্টকলোনিয়াল, কেননা মলয় কলোনিয়াল নন, কেননা মলয় কলোনিতে জন্মাননি, কেননা পৃথিবীর দিকে পা করে জন্মাবার সুযোগ পেয়েছিলেন, কেননা পরবর্তীতে ওই হাসপাতালের রেকর্ডে, যেখানে তিনি জন্মেছেন বলে লোকশ্রুতি, সেখানে কোনও পুত্রসন্তান ( ছেলে ) জন্মাবার তথ্য নেই । অর্থাৎ মলয় পোস্টকলোনিয়াল ইন দা ট্রুয়েস্ট সেন্স অব দা টার্ম । পোস্টকলোনিয়াল না হলে নিজের প্রতিবন্ধী কলোনিয়াল অস্তিত্বকে, এবং তার পরিকাঠামোর ফ্রেম এভাবে ভাঙতে পারতেন না । মলয় এখানে অপ্রাতিষ্ঠানিক, এবং উত্তরঔপনিবেশিক । ঠিক, তদুপরি বলি, মলয়ই একমাত্র, যিনি ঘোষণা করেন, “মলয় রায়চৌধুরীর কোনো গ্রন্হের কারুর কোনো কপিরাইট নেই’...কোনোরকম স্বত্ব কারুর জন্য সংরক্ষিত নয় । তা পাঠকের।” মলয় এখানে তৃণমূল গণতান্ত্রিক, অতএব উত্তরঔপনিবেশিক । বলা বেশি হোক, তবু বলি, পাঠক, এখানেই তাঁর পোস্টকলোনিয়ালিজম বুঝুন । এই পোস্টকলোনিয়াল হবার জন্যই মলয় বড় সহজে পোস্টমডার্ন হতে পেরেছেন । অবশ্য মলয় স্বয়ং মনে করেন, সাম্রাজ্যবাদে পতনের সঙ্গে উপনিবেশেরও পতন হয় । তবুও মলয়ের জন্মকালে, বাল্যকালে, কৈশোরেও কিন্তি ওই সাম্রাজ্যবাদের ঐতিহাসিক পতন ঘটেনি ।
    তিন
    এবার পোস্টমডার্নিজম পপসঙ্গে যাই, কেবল এই কথা বলে নিয়ে, মলয় যে-উত্তরঔপনিবেশিক তথা অধুনান্তিক, এ তাঁর জন্মবৃত্তান্তেই আভাসিত, কেননা সেখানে সে যৌগিক সংস্কৃতির । জন্মলাভও করেন, আবার রেকর্ড রাখেন না ।
    পশ্চিমী সভ্যতার এক শূন্যতায় পোস্টমডার্নিজম যে কেবল নঞর্থক প্রতিক্রিয়া, তা নয়, একটা প্রতিবাদের জায়গাও বটে । ১৯৭০ ও ৮০র দশকের সিনিসিজম ও হতাশার সঙ্গে সামঞ্জস্য বলেই এর চিন্তাভাবনা ক্রমশ প্রভাব বিস্তার করেছে । সাধারণ মানুষের অবিশ্বাস ও পরাজিত মনোভাবের ভূমিটি, পোস্টমডার্ন তত্ব, কবিতা, শিল্প অধিকার করার, সক্ষমতাতেই মনোযোগ আকর্ষণ করে । পোস্টমডানড চিনতায়, তার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা জাক দেরিদার ভাবনায়, পাওয়ার বা ক্ষমতা সম্পর্কেই সন্দেহ ঘনীভূত, ক্ষমতার দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার দিকে অঙ্গুলিসংকেত । দেরিদা বলেন, ক্ষমতা সবকিছুকে জোর করে এক করতে চায়, পার্থক্য অস্বীকার করে, সময় ও সময় ছাড়িয়ে জীবনশিল্পের নানামাত্রিক ব্যাখ্যাকে চেপে ধরে এক করতে চায়, প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্হাতেও এর ব্যত্যয় হয় না । পাওয়ারকে তাই অবিশ্বাস করো । মানুষের তুচ্ছতা ও ক্ষমতাহীনতাকে পোস্টমডার্ন সামনে নিয়ে আসে । অত্যাচারিত যে অত্যাচারিত, তার কারণ সমগ্র ব্যবস্হাই অনিবার্যভাবে অত্যাচার পুনরুৎপাদিত করে । পোস্টমডার্নে এ সত্যই ধ্বনিত হয়, ক্ষমতাবান অত্যাচারিতের ভালো তো মোটেও নয়, বরং খারাপ । শুধু তাই নয়, দেরিদা ও পোস্টমডার্নেরা মনে করেন, সক্রিয়তার কোনও নির্বাচন নেই, যে কোনও সক্রিয়তাই ক্ষমতার সামগ্রিকতায় আক্রান্ত হয়, কার্যকর সক্রিয়তা তাই অনৈতিক । স্বাধীনতা যদি পেতেই হয়, তাহলে প্রয়োজন ‘ডিকন্সট্রাকশান’-এর বা বিনির্মাণের । এখানেই মানুষ পোস্টমডার্নকে সঙ্গী হিসাবে পায় : কারণ জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় সে দেখে স্বাধীনতার অনুপস্হিতি, দেখে যে-কোনও রাজনৈতিক ব্যবস্হাই হোক, ফলাফল একই : হতাশা ও স্বাধীনতাহীনতা । আমাদের “বাস্তবেও অন্য প্রক্রিয়ায় প্রায় এরকমই অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় । পোস্টমডার্নের এই সাধারণ মানুষের অসহায়তা বোধের উপর গুরুত্ব দেওয়া, এখানেও তাই প্রাসঙ্গিক মানুষের তুচ্ছ হয়ে যাওয়া, মানুষের হতাশা এ-বাস্তবেও অন্যভাবে ক্রমশ মানব অস্তিত্বকে খাচ্ছে ।”
    উদ্ধৃতিটি পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের । তাঁর পোস্টমডার্নিজম তত্বের ব্যাখ্যায় ওইভাবে অগ্রসর হয়ে তিনিও জানাচ্ছেন, পোস্টকলোনিয়াল না হলে পোস্টমডার্নিজমে প্রবেশ করা যায় না অবশ্য তিনি এ কথাও বলতে ছাড়েন না, কলোনিয়াল তৃতীয় বিশ্বের যে-হতাশা প্রথম বিশ্বের দ্রুত গ্লোবালাইজেশান দেখে জন্মায়, সেখানে পরোক্ষে পোস্টমডার্ন হওয়া যায়, যদিও তা খানিক পুঁথিপড়া হবে, স্পন্টেনিয়াস হবে না । এবং এখানকার মানুষদের তুচ্ছ হয়ে যাওয়া প্রথম বিশ্বের মানুষদের দেখে, দ্রুত উল্লম্ফনের দ্বারা সব তুচ্ছতাকে কাটাবার মানসিকতায় বৈদেশিক ঋণ নিয়েও -- গ্রাম্য কলকাতায় মেট্রোরেল করা, যার শুরুতেও অদূরে গ্রাম্য আচরণ, তার শেষেও ওই আচরণ, শুরুর তুল্যই, নিকটবর্তী । অথবা হায়দ্রাবাদে প্রথম বিশ্বকেও চমকে দেবার জন্য প্রস্তুত ইন্টারনেটের মহিমা, যারও অদূরে তেলেঙ্গানার কাছাকাছি ব্রাহ্মণ্য দাপট সর্বকালের গ্রাম্যতাকে ছাড়িয়ে যায়, এখনও । অর্থাৎ আধুনিকতা এখানে আধিপত্যবাদী নয়, ভঙ্গুর । তাই পোস্টমডার্ন হওয়া যায় । কেননা গ্রাম্যতার আয়রনিকাল অস্তিত্বেই বস্তুত পোস্টমডার্নিজমের আবির্ভাব ।
    আমিও এসব মানি । বলা উচিত পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ওই ভাবনাকে অভিব্যক্ত করার জন্য আমি আমারই বাক্যসমূহকে কাজে লাগাই । এবং আজ একথা স্বীকার করা আমারই দায় যে এসবই আমি, বড় সম্প্রতি, মলয় রায়চৌধুরী থেকে সম্প্রসারিত হয়েছি ।
    চার
    সমীর রায়চৌধুরী সম্পাদিত ‘পোস্টমডার্নিজম : অধুনান্তিকতা’ গ্রন্হের প্রবন্ধ ‘পোস্টমডার্নিজম তত্ব : মলয় রায়চৌধুরী’ আমি একাধিকবার পড়লাম । সম্প্রতি খুব মন দিয়ে এমন নিবিড় পাঠ আর করিনি । কার্যত আমি প্রকৃতই বিস্মিত হচ্ছিলাম, এমন অনাবিল প্রক্রিয়ায় এদেশে বসবাস করে কীভাবে ওই প্রবন্ধ লেখা যায় । মাইল মাইল অসহনীয় জ্ঞান তো পযেই আছে কতকাল ধরে । কবেই আমি জানিবার জানিবার গাঢ় বেদনার ভার ঘাড় থেকে নামিয়ে, বেশ বহাল তবিয়তে আছি, ওই জ্ঞান আহরণের অসহনীয় বিদীর্ণ বিস্ময় থেকে মুক্ত হয়ে । স্হির করে নিয়েছিলাম, আর ওপথে যাব না । বড় জোর প্রিয় লেখকদের গদ্য-পদ্য পড়ে যাব, তাতে হবতো বা প্রাবন্ধিকতা থেকে যেতে পারে, অথবা ওই, জ্ঞান, যা আমার সুখের চুল অব্দি ছুঁতে পারে না । তবু ওই পর্যন্তই। আমি এখন শেকসপীয়ারের সবকিছু, বিশেষত সনেট, রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাস-গান-ছবি, জীবনানন্দের ও বিনয় মজুমদারের সবকিছু পড়ে যাই । ভেবেছিলাম, এভাবেই কাটিয়ে দেব আরও কিছুকাল । তারপর কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘মহাভারত’ । দ্রৌপদীর পঞ্চস্বামীর এপিসোডে বেদব্যাসের ম্যাজিক রিয়ালিটি । তারপর মৃত্যু অথবা মস্তিষ্কের স্তব্ধতা আসা স্বাভাবিক ।
    পাঁচ
    কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, আমি স্হির করে ফেলেছি, সঙ্গে মলয় রায়চৌধুরী পড়ে যাব । এবার হুবহু মলয়ের সেই কথাগুলো লিখে যাই :-
    “আধুনিকতার কালখণ্ডটির ছিল ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ । সাম্রাজ্যবাদের উথ্থান ও পতনের সঙ্গে ঘটেছে আর্ট ফর্ম রূপে উপন্যাসের উথ্থান ও পতন । সাম্রাজ্যবাদের পতনের সঙ্গে ফুরিয়েছে আধুনিকতা ও আধুনিকতার অবসানের সঙ্গে সম্পূর্ণ ছিতরে গেছে উপন্যাসের ফর্ম । উপন্যাসের আদি কাঠামো ভেঙে পড়ার সঙ্গে কাহিনিকেন্দ্র থেকে অপসারণ ঘটেছে নায়কের । যারা যারা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল, সাম্রাজ্যবাদ, আধুনিকতা, উপন্যাস বা নায়ক, সবাই আক্রান্ত হয়েছে অধুনান্তিক কালখণ্ডে । কেন্দ্র থাকলে থাকবে পরিধি বা প্রান্ত বা প্রত্যন্ত । সাম্রাজ্যবাদের প্রান্তিক যেমন উপনিবেশ । আগেকার উপন্যাসে অন্ত্যজ ছিল প্রান্তিক । শহর যদি ক্ষমতার কেন্দ্র হয়, গ্রাম তাহলে প্রান্তিক । আমি কেন্দ্রে থাকলে তুমি হবে প্রান্তিক । পুরুষ যদি কেন্দ্র হয়, নারী হবে প্রান্তিক । অধুনান্তিকতা চাগিয়ে ওঠে কেন্দ্রের বিনির্মাণ থেকে । আধিপত্যকে তা খর্ব কর সাহিত্যে, সংগীতে, শিল্পে, নৈতিকতায়, রাজনীতিতে, সমাজে, ভাবদর্শে । বাংলা সাহিত্যে গোরার জায়গায় এসেছে চোট্টি মুণ্ডা ।”
    “সাম্রাজ্যবাদ শেষ হবার পর উত্তরঔপনিবেশিকতা গড়ে তুলেছে নিজস্ব আগ্রহের এলাকাটি, যেটি অধুনান্তিকতার উদ্বেগজনক আগ্রহের এলাকাও বটে : প্রান্তিকতা, প্রত্যন্তবাসী, অন্ত্যজ, মফসসল, অনিশ্চয়তা, বহুচারিতা, লোকসংস্কৃতি, দোআঁশলাপনা, লালিকা, রঙের ছটা, এলোমেলো চিন্তা, যৌগিক সংস্কৃতি, অনির্ণেয়তা, আকস্মিকতা, বিশৃঙ্খলা, গৃহহীনতা, ভুতুড়ে পুঁজি, প্যাসটিশ, পণ্য, বহুত্ববাদ, ঠিকেদারি শ্রমিক চুক্তি, একযোগে অনেক কাজ, অপ্রাতিষ্ঠানিকতা, রূপের বৈচিত্র্য ও অজস্রতা, তৃণমূল গণতন্ত্র, পাড়ার নান্দনিকতা ইত্যাদি। উত্তরঔপনিবেশিকতা ও অধুনান্তিকতা মনে করে ইতিহাস একরৈখিক নয়, ইতিহাস অজস্র ও স্হানিক । সাম্রাজ্যবাদ, আধুনিকতার নামে যে ইশারা ও দ্যোতকগুলো নেটিভদের ওপর চাপিয়েছিল, সেগুলোকে অধুনান্তিকতার মাধ্যমে উপড়ে ফেলে দিতে চায় উত্তরঔপনিবেশিকতা । নেলো রিচার্ডস বলেছেন যে, ইউরোপ আমেরিকায় পোস্টমডার্নিজম সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা শুরু হবার আগেই অধুনান্তিকতার আসল প্রবণতাগুলো প্রাক্তন উপনিবেশগুলোয় চোখে পড়ে । কোনো উপনিবেশের ভাষাকে অপ্রভাবিত রাখেনি ইউরোপ । আধুনিকতার নামে চাপানো সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ধর্ম বিষয়ে ধারণা সবই ইউরোপের । সাম্রাজ্যবাদের শিকারটির সমস্যা, অতএব, অধুনান্তিক । তার ভাষার ভিত্তি নষ্ট হয়ে গেছে । বিচার, বিবেচনার মাধ্যম নষ্ট হয়ে গেছে । অভিব্যক্তির কাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে । অথচ সাহিত্য ও রাজনীতিতে, উত্তরঔপনিবেশিকতা আবর্তিত হয় ভাষাকে কেন্দ্র করে, কেননা, আত্মপরিচয় অন্য কোথাও পাওয়া যায় না । দেখা যাবে যে, শিল্পে ও সাহিত্যে একই ধরণের কাজ হচ্ছে উপনিবেশগুলোয় এবং পোস্ট-ইনডাসট্রিয়াল আমেরিকায় । এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকায় অধুনান্তিকতার প্রাসঙ্গিকতা এ থেকেই টের পাওয়া যায় । সাম্রাজ্যবাদের দরুণ উপনিবেশের নেটিভদের স্মৃতিবিপর্যয় ঘটে গেছে । পোস্টমডার্ন লেখালিখি ও ছবি আঁকায় যে প্রবণতাগুলো প্রখর তা তুলনীয় স্মৃতিবিপর্যয়ের সঙ্গে ।”
    “আমাদের দেশে বেশ কয়েকটি পোস্টমডার্নিস্ট প্রবণতা দেখা যাচ্ছে । কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক তা নিয়ে চলছে বিরামহীন খেয়োখেয়ি । সত্য, জ্ঞান, বৈধতার নানান রকমফের । যেমন উলফা, জেকেএলএফ, খালিস্তান, শিবসেনা, আমরা বাঙালি, ঝাড়খণ্ড, গোর্খাল্যাণ্ড, বোড়ো্যাণ্ড, উত্তরাখণ্ড, ইত্যাদির মতন ছোট ছোট ছাতার স্হানিক কেন্দ্রিকতা-বিরোধী চেতনা । যেমন ভূমিসেনা, লাচিত সেনা, কুঁয়র সেনা । যেমন অজস্র নাটকের দল । যেমন আঞ্চলিক ভাষার কবিতা । যেমন টুকরো টুকরো মহাআখ্যানবাদী মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট দল । যেমন রাজনীতিতে ক্রিমিনালদের দৌরাত্ম্য । যেমন সুমন-নচিকেতা-মৌসুমীর সংগীতের ক্ষমতাকেন্দ্র-বিরোধী গান । যেমন হাজার হাজার লিটল ম্যাগাজিন । এবং ঘরে ঘরে ‘আদর্শের শেষ’ । যেমন টিনশেড কোচিং ক্লাস শিক্ষা কাঠামো । যেমন প্রতিটি বাঙালির আঙুলে এনলাইটেনমেন্ট-বিরোধী গ্রহরত্ন । যেমন লোকনাথ বাবা, সত্য সাইবাবা, অনুকুল ঠাকুর, বালক ব্রহ্মচারী, আনন্দময়ী, দাদাজী, রজনীশ, মহেশ যোগী ইত্যাদি ধর্মের ছোট ছোট ছাতা যযা হিন্দু শুদ্রকেও প্রতিষ্ঠা দেয় । কম্যুনিটির ভাঙন এবং অ্যসোসিয়েশান সমূহের জন্ম, যে উত্তরাধুনিক বৈশিষ্ট্যের কথা কিথ টেস্টার বলেছেন, এখানে তা ঘটেছে দেশভাগের দরুণ এবং মহাআখ্যানবাদী পার্টি রাজনীতির কারণে । কৌমসমাজ ভেঙে যাবার কারণেই পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র আজ ছুতোর গয়লা নাপিত ধোপা ধুনুরি মুচি, এরা অবাঙালি।”
    “গ্রামকেন্দ্রিক নৈরাজ্য গড়ে উঠেছে রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই । আধুনিকতার অসুখ সারানো যাবে কিনা বলা মুশকিল । এই যে দাদা একটু সরুন, দাদু ভাড়াটা দিন, মাসি বেগুন কত করে, বলার সময়ে আমরা যে শুধু দাদা-দাদু-মাসির সম্পর্কচ্যুতি জানতে পারি তা নয়, আমরা টের পাই কৌমসমাজ ভেঙে যাবার খবর, আমরা টের পাই কীভাবে এই শব্দগুলোর ভেতর থেকে তাদের মানে বের করে ফেলে দিয়েছে সমাজ । পোস্টমডার্নিজমকে বাঙালির দোরগোড়ায় এনেছে বঙ্গসংস্কৃতির অধুনান্তিক পার্টি রাজনীতি এবং উত্তরঔপনিবেশিক আর্থিক দুর্গতি।”
    ছয়
    এবার মলয়ের কথাগুলি নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবা যায় । প্রথমেই বলা ভালো, আমি যে লিখেছিলাম, পোস্টকলোনিয়াল না হলে কেউ পোস্টমডার্ন হতে পারে না, সেখানে মলয়ের বক্তব্য ওই পোস্টকলোনিয়ালিজম এবং পোস্টমডার্নিজম আসলে একই বস্তুকেন্দ্রের দুটি অভিব্যক্তি, পরস্পর নির্ভর অথবা পারস্পরিক কিংবা যমঝ । অবশ্য মলয় আরও লজিকালি কথাটার বিস্তার ঘটিয়েছেন । তাঁর ধারণা, সাম্রাজ্যবাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে মডার্ন যুগের অবসান ঘটেছে, আধুনিকতার অবসানের সঙ্গে সঙ্গে উপনিবেশেরও অবসানের লক্ষণাদি মূর্ত হয়েছে।
    মলয়, বোধহয়, ধ্রুপদী সাম্রাজ্যবাদের অবসানের মধ্যেই সাম্রাজ্যবাদের চারিত্রিক অবসান দেখেছেন । আমি অবশ্য বরাবরই নিয়ো-ইমপিরিয়ালিজম টের পাই, এখনও পাই । নিয়ো-ইমপিরিয়ালিজমের অস্তিত্ব মেনে নিলেও, মলয়ের একটি কথা তবু সত্য হয়ে ওঠে । ধ্রপদী সাম্রাজ্যবাদের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে ধ্রুপদী উপনিবেশেরও অবসান ঘটেছে । এটা ঠিক । এবং মলয়কে সেলাম জানাই, আমার মধ্যকার এক নিগূঢ় জিজ্ঞাসা, যার উত্তর নানা সময়ে পেয়েও আবার জিজ্ঞাসায় আক্রান্ত হয়েছে আমার মন, অর্থাৎ আমার মস্তিষ্ক, সেখানে মলয়, সম্প্রতি, তাঁর রচনাদি পাঠকালে আমার শিক্ষক হয়েছেন । অর্থাৎ যথার্থ উত্তর দিয়েছেন, যার পর আর নাই ।
    একদা আমি তিন কমিউনিস্ট পার্টির কখনও সদস্য, ককনও দরদি মেম্বার হয়ে বার বার নানা মিটিং, কংগ্রেস, পার্টি ক্লাস করে যে-প্রশ্নে মন তথা মস্তিষ্ককে জেরবার করেছি, তা হল, আমাদের দেশের রাষ্ট্রচরিত্র বিশ্লেষণে ও বৈপ্লবিক স্তর নির্ণয়ে ওই নিয়ো-ইমপিরিয়ালিজম ও নিয়ো-কলোনিয়ালিজমের ভূমিকা খুঁজতে । বার বার ভুল হয়ে গেছে । সি পি আই ও সি পি এম বাহিত হয়ে যখন নয়া-সংশোধনবাদ-বিরোধী শিবিরে গিয়েছি, তখন যেন সঠিক বৈপ্লবিক পথের দিশা পেয়ে উৎসাহিত তথা আহ্লাদে আটখানা হয়ে প্রকৃতই গৃহে বাস করেও রণাঙ্গনের মাঠে যাবার উদ্যোগ নিচ্ছিলাম । সে-সময় সংশোধনবাদী সি পি আই ও নয়া-সংশোধনবাদী সি পি এম-এর মধ্যপন্হাকে ঘৃনায় বর্জন করে যখন প্রায় গৃহত্যাগে মনস্হির করচি, এমন সময়ে আমার লেখকসত্তা, যার ভিতরে কল্পনা ও যে-কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র সারবত্তা চরাচরের নানা সম্পর্কে আসছিল, যে-সত্তা ইহলোক স্বপ্নলোকের বর্ডার মানেনি, সে সহসা দেখল, প্রকৃত রণাঙ্গন নেই । অর্পিত তথা অ-লৌকিক রণাঙ্গন আছে কেবল । তখন ওই ধারাবাহিক সত্তা, যা একান্ত আমার, আমার চিন্তা জ্ঞানলব্ধ, পুনর্বার নয়া-উপনিবেশ ও নয়া-ফিউডাল তত্বে মনোনিবেশ করল ।
    এই সময়ে তথাকথিত তৃতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অফিশিয়াল অথবা কংগ্রেসসিদ্ধ অস্তিত্ব আসেনি । তখন নানা গ্রুপ, নানা কর্মচিন্তা মাথা তুলছিল, তার মধ্যে মতাদর্শগত বিতর্কে এক ধরণের গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাও মাথাচাড়া দিচ্ছিল । সেই উত্তপ্ত দাবানলী সময়ে আমার সঙ্গে একটি গ্রুপের যোগাযোগ ঘটে, ইতিহাসে তাদের নাম নয়া-সংশোধনবাদবিরোধী সোশ্যালিস্ট রিভলিউশানারি, সংক্ষেপে এস আর গ্রুপ । তাদের সঙ্গে দিনের পর দিন তর্কে যে জায়গায় পৌঁছেছিলাম, তার সঙ্গে মলয়ের বিশ্লেষণের গুণগত সাদৃশ্য আছে । সেই জায়গাটি হল, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে ক্ল্যাসিকাল ইমপিরিয়ালিজম তথা মনোপলি ক্যাপিটালিজমেরও অন্তিম সময় উপস্হিত । অতএব উপনিবেশেরও অবসান । স্তালিন তো এই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইমপিরিয়ালিজমের বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক দেশগুলির উৎসাহিত মুক্তিযুদ্ধের সম্ভাবনা দেখেছিলেন । এশিয়ায় সেই মিক্তিযুদ্ধ দুই বিশাল দেশ ভারতবর্ষ ও চিনে ততদিনের মধ্যে সূচিত হয়ে গেছে । এই বাংলার তথাকথিত এস আর গ্রুপ বলতে শুরু করেছে তখন, পঞ্চাশের দশকের শেষে, তথাকথিত স্বাধীনতা সংগ্রাম বা মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় বুর্জোয়ার উথ্থানে, এদেশে এক উল্লম্ফনে জাতীয় বুর্জোয়ারা নয়া-সাম্রাজ্যবাদী হয়ে গেছে, অন্তত তাদের সম্প্রসারণ তথা আগ্রাসী মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে ওই তথাকথিত স্বাধীনতা সংগ্রামে । সংগ্রামান্তে, জাতীয় বুর্জোয়ার অন্যতম নেতা, তথাকথিত গণতান্ত্রক জওহরলাল নেহেরু তাঁর ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়ার’ পাতায় পাতায় অনুশীলন করছেন এক বৃহৎ ভারতবর্ষ, এক উপমহাদেশের ।
    ক্ল্যসিকাল সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের দ্বারা অধিকৃত কাশ্মীর, অসম ইত্যাদি ভারতীয় মেইনস্ট্রিমের অন্তর্গত না হয়েও তথাকথিত স্বাধীন ভারতবর্ষের ম্যাপে একান্ত ভারতীয় হিসেবে চিহ্ণিত করেছেন ওই ডিসকভারার । জাতীয় বুর্জোয়ার ভ্রূণেই সম্্রসারণবাদী নয়া-সাম্রাজ্যবাদীর ম্যাচিওর হওয়া । অতএব ওই এস আর গ্রুপের মতে, ভারতবর্ষের রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষমতা এখন সম্পপসারণবাদী বুর্জোয়াদের হাতে । অর্থাৎ এই দেশের ঔপনিবেশিক মুৎসুদ্দি বুর্জোয়ার ভ্রূণে শৈল্পিক বুর্জোয়া তথা নয়া-পুঁজিবাদের ম্যাচুরিটি ঘটে গেছে । সুতরাং এখন এদেশের মূল দ্বন্দ্ব পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্হার সঙ্গে সর্বহারা শ্রমিকমনস্ক জনগণের দ্বন্দ্ব । অর্থাৎ বৈপ্লবিক স্তর হল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব । ওই সব তথাকথিত পিপলস ডেমোক্র্যাটিক রিভোলিউশান ফালতু কথা -- রণাঙ্গনে এখন পুঁজিবাদ বনাম সর্বহারা ।
    মলয়কে সেলাম, প্রকৃতই সাম্রাজ্যবাদের অবসান ঘটে গেছে । আধুনিক যুগ তার অন্তিম কালে শেষ চেষ্টা করে যাচ্ছে মডার্ন থাকার । কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের পতনের সঙ্গে সঙ্গে পোস্ট-ইনডাসট্রিয়াল যুগের সূচনা মূর্ত হতে চলেছে । এবং পোস্টইনডাসট্রিয়ালিজম আসলে ইনডাসট্রিয়াল তথা মডার্ন এজের অন্তিমে উপস্হিত হয় । এবং এটি একটি গ্লোবাল উদ্যোগ ।
    সুতরাং পোস্টমডার্নিজম তার নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে নানা ঢঙে সব দেশেরই দোরগোড়ায় কমবেশি উপস্হিত । সেলাম মলয় । আপনি ঠিকই দেখেছেন ।
    সাত
    সবকিছু ছেড়ে আমি কেবল মলয়ের ‘ভেন্নগল্প’ গ্রন্হটি দেখি, কেননা পোস্টকলোনিয়াল তথা পোস্টমডার্ন চরিত্র ওই ‘ভেন্নগল্পে’ বড় স্পষ্ট, ক্লিয়ার, সমুজ্জ্বল । ভূমিকায় মলয়ও বলেছেন : ‘দেখা যাবে, এই গ্রন্হটির পাঠবস্তুগুলো কেন্দ্রহীন ; বাস্তবতাকে বিনির্মাণ করে পাওয়া স্হিতিগুলো সমন্বয়হীন ; বিষয় অথবা আঙ্গিকে ঐক্য এবং সমাপ্তি নেই এবং কাঁচামালগুলো থেকে নির্মিত হচ্ছে না কোনোকিছু ; আমি কোনো অভিপ্রায় ছাপিয়ে দিচ্ছি না । বা গড়ে দিচ্ছি না শব্দব্যূহ ।...শরীর ও মন দুটো আলাদা আলাদা ব্যাপার, এরকম সরলীকরণের মধ্যে আমি কোনো রচনাকে টানিনি । লেখাগুলো বরং ভঙ্গুরতার স্বীকৃতি হিসেবে বর্ণনাকারীর, উত্তরঔপনিবেশিক মতদ্বন্দ্বের, জটিলতার, একরকম আলাপচারিতা ।’
    এখানে আমি ওই ভূমিকায় যুক্ত করতে চাই ওই ‘উত্তরঔপনিবেশিক’-এর সঙ্গে ‘উত্তরআধুনিক’ শব্দ, যে দুই শব্দ, পূর্বেই লিখেছি, যমজ ।
    ‘ভেন্নগল্প’-গ্রন্হের প্রথম প্রকাশ কলকাতা বইমেলা ১৯৯৬ । রচনাকাল ১৯৮৩ - ১৯৯৫ । আমি ওই রচনাকালের মাঝামাঝি রচিত, ১৯৯২ সালের ‘অলৌকিক দাম্পত্য’ গল্পটিকেই কেবল ধরে মলয়ের পোস্টকলোনিয়াল, মলয়ের পোস্টমডার্ন চরিত্র বোঝার চেষ্টা করব ।
    কেননা গল্পটি প্রতিনিধিস্হানীয় । আমার কাছে অসাধারণ । গল্পটির শুরু ও শেষ অনাদি ও অন্তহীন ।এবং আসলে গল্পটির মধ্যে কোনো স্টোরি এলিমেন্ট নেই । বলা উচিত এটি গল্প নয়, গদ্য ছাড়া আর কোনও অভিধা আমার জানা নেই । মলয়ের মতে Post-colonial episodes/Texts ; সবকিছুই বিনির্মাণের পর অভিব্যক্ত । শব্দগঠন বিনির্মিত । বাক্যবিন্যাস অব্দি বিনির্মিত । এই গদ্যের কোনো কেন্দ্র নেই, অতএব কোনো গ্রহ বা উপগ্রহ নেই ।
    আট
    তবে অন্যান্য গদ্য রচনাও আলোচনার মধ্যে আনলে ভালো হতো । সময় ও সুযোগের অভাব । পরন্তু আমার স্বভাবও এই যে, আমি নানা কিছুর মধ্যে আলোচনাকে বিন্যস্ত রাখতে পারি না । আমার পক্ষে সহজ একটি দুটির মধ্যেকার কথানুসন্ধান । যেমন ধরুন, কবিতা নাটক পুরো তফাতে রাখছি আপাতত । এমনকি বলা যায় উপন্যাসও, যদিও ‘নামগন্ধ’ উপন্যাসটি মাথায় থেকেই যাচ্ছে, জানি না কেন ! শুধু এটুকু জানি, মলয়ের পোস্টকলোনিয়াল তথা পোস্টমডার্ন সিনট্যাক্স নিয়ে যে ভাবনা গড়ে উঠল এই কদিনে, তাতে ওই ‘নামগন্ধ’ উপন্যসের কিছু ভূমিকা আছে । মলয়ের মালমশলা ছড়িয়ে রেখেছি চতুর্দিকে, এবার কেবল বেছে নেবার পালা । তাতে ওই ঘটল, ওই ‘অলৌকিক দাম্পত্য’ ।এই ‘অলৌকিক দাম্পত্য’-এর অন্তর্গত নয়, অথচ সঠিক বাইরেও নয়, এমনকিছু আপাত অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু যথার্থই পপাসঙ্গিক কথা হয়ে থাক ।
    মডার্ন যুগের মার্কসীয় রাজনীতির এক চমৎকার পোস্টমডার্ন অভীপ্সা আছে । গদ্যটির নাম ‘ভেন্ন’, সেখানে সীতেশের তারিখবর্জিত ডায়েরির লেখাটা :-
    “আজকাল আমাদের দেশে শ্রেণিচেতনা বলতে সাধারণত পুঁজিপতি জোতদার ধনী ব্যক্তি প্রভৃতির বিরুদ্ধে জঙ্গী মনোভাবকে বোঝানো হয়ে থাকে । এটা শ্রেণী চাতনার একটা স্হুল দিক মাত্র । আসলে শ্রেণীচেতনা হল সমাজের বস্তুবাদী বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সমাজ বিকাশের পথ অনুধাবন করে ওই মুহূর্তের প্রগতিশীল কর্তব্য নিরুপণ করার ক্ষমতা । এক্ষেত্রে মার্কসবাদের চিরায়ত তত্ব ও সংক্ষিপ্ত মূল সূত্রগুলি খুব বেশি সহায়ক হবে না । বরং মার্কসবাদী পদ্ধতির সৃষ্টিশীল প্রয়োগের মাধ্যমেই যে কোনও দেশের পরিস্হিতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ সম্ভব । এবং মার্কসবাদী সমাজ বিশ্লেষণের মূল কথা হল, ঐতিহাসিক বিকাশের পটভূমিতেই যেকোনো সমাজের বিশ্লেষণ করতে হবে ।”
    ‘ভেন্ন’ গল্পটি কিন্তু ১৯৮৩ সালে লেখা । অর্থাৎ ওই আশির দশকের গোড়ার থেকেই মলয়ের পোস্টমডার্নজম কাজ করছে ।
    এখানে ‘The Name Of The Rose’, যা একটি পোস্টমডার্ন উদ্যোগ, তার লেখক উমবের্তো একোর কিছু কথায় আসি…”it ( postmodernism ) demands, in order to be understood, not the negation of the already said, but its ironic rethinking.” মলয় লিখিত ওই ডায়েরি, পাঠক বুঝুন, not the negation of the already said, but its ironic rethinking.
    নয়
    এবার সত্য সত্যই ‘অলৌকিক দাম্পত্য’র চাবিকাঠি পেয়ে গেলাম । কেননা এই গদ্য, বস্তুত, দুর্ঘটনা, যা আকছার ঘটছে, তারই ironic rethinking । দুর্ঘটনা, এখানে বাস দুর্ঘটনা, মলয়ের সৃষ্টিশীল প্রয়োগে যে-দুর্ঘটনা অলৌকিক, তাই বলে অ-লৌকিক নয় । দাম্পত্যের যে কথা এখানে আছে, তাও ironic rethinking ।এখানে বলে রাখা ভালো, মডার্ন যুগেই দাম্পত্যের শেষ দেখা গেছে । লিভ টুগেদার মডার্ন সমাজ মেনে নিয়েছে । পোস্টমডার্ন সমাজ তারই ironic rethinking দেয় বলে ধারণা করি । এক্ষণে সরাসরি মলয়ের বাক্যে আসি :-
    “কুড়ি বছর আগে শহরের উদাসীন রেল স্টেশনের সামনে চকচকে দুপুরের রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছিলুম ফরসা যুবতীর কাটা তর্জনী, রক্তহীন, কাচের রঙের নীলচে নখপালিশ, সোনার অলস আঙটিতে গরম পদ্মরাগমণি ঠায় জেগে…”
    এবার, এই মলয়, কে বা কী, যিনি ওই অলৌকিক তর্জনী কুড়িয়ে পেলেন ? মলয় স্বয়ং বলেছেন, ওই পদ্মরাগমণি তো আসলে চুনি, এবং---
    “যে চুনিতে আজও গ্রীষ্মকালীন কেনিয়ার বহুচারী যুবক সিংহের থাবার থমথমে গন্ধ আমাকে দু’তিনশো বছর আগে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যখন আরা বালিয়া বা ছাপরা থেকে আমার কেঁদো পূর্বপুরুষরা পাকানো চামড়ার চাবুক খেতে আর অর্ধাহারে থাকার জন্যে কালোদের দ্বীপে জাহাজবন্দী কেনা গোলাম হয়ে চলে গিয়েছিলেন।”
    এখানে মলয় প্রকৃতই বিশ্ববাসী তথা আবহমানকালীন । এখানে সময় ও কালের বিনির্মাণ হচ্ছে । এটি একটি পোস্টমডার্ন উদ্যোগ । আবার দেখুন, দুর্ঘটনাগ্রস্ত মলয় ও তাঁর সহযাত্রীদের, ইতস্তত মৃত, অথবা জ্ঞানরহিত স্টেজের বিনির্মাণ । যেমন :-
    “যে-দুটো রূপসী শীতল হাত আমাকে পেছন থেকে নির্লজ্জ জড়িয়ে রয়েছে, নারীর আতর মাখা বাহু, সোনার কয়েকগাছা অমৃতসরী চুড়িসহ, আজকে, কুড়ি বছর পর, এই শীতের আধো অন্ধকার সকালে, সে-হাতের দক্ষিণ তর্জনীতে সেই হুবহু আঙটি পদ্মরাগমণি । চল্লিশোর্ধ অকৃতদারকে এভাবে আকুল আঁকড়ে থাকা রহস্যময়ী বাহু, এতো শক্ত করে ধরে থাকা, আমি পেছন ফিরে দেখার চেষ্টায় ঠাহর করতে পারলুম না ।”
    এবার পাঠক দেখুন, কুড়ি বছর আগে পাওয়া তর্জনী, এখন এই দুর্ঘটনার বিনির্মাণে রূপসীর অঙ্গীভূত । এবং তর্জনীতে । রহস্যময়ী বাহু ধীরে ধীরে অলৌকিক দাম্পত্যে নিয়ে যাচ্ছে । সে এক অসাধারণ বর্ণনা । এবং সে-বর্ণনাও মডার্ন ন্যারেটিভকে বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে পোস্টন্যারেটিভ ডিসকোর্সে নিয়ে যাচ্ছে । যেমন:-
    “---ভাগ্যিস আপনি মারা গেলেন, তাই আপনার সঙ্গে এই নিবিড় পরিচয়ের সুযোগ পেলুম।” আমি বললুম ওঁকে, শীতের নিরাপদ ফিকে সকালকে শুনিয়ে, যখন আশেপাশে সবাই মরে গেছে মনে হয়, শুধু আমি বেঁচে, আমদের অমোঘ খবর কেউ জানতে পারেনি।”
    “আপনার হৃদয় স্তব্ধ হয়ে গেছে । আপনি আমার কথা ভাবছেন না । কিন্তু তবু কেন ভালোবাসছেন আমায় ?”
    “........”, আমি ওঁর আলতো করে বলা কথাগুলো শুনতে পাই । নিঃশব্দ কল্লোল হয়তো এই, অভিব্যক্তিহীন কাকলি, স্খলিত কেকা ।
    “........”, উনি অজস্র কথা বলে যেতে থাকেন ।
    “.........”, চোখ বন্ধ করে শুনি ওঁর কথাগুলি । মাথা পেছনে করে ওঁর ঠাণ্ডা ঠোঁটে আমার গাল ঠেকাই ! আমার উত্তাপ ওঁকে মুগ্ধ করে ।
    আমিও বলে যেতে থাকি ।
    -----বেঁচে থাকতে আমাকে চেয়েও দেখতেন না হয়তো আপনি ।
    -----কতোদিন ভেবেছি আপনার কাটা আঙুল আর আঙটি আপনাকে খুঁজে ফেরত দিয়ে আসব ।
    -----এখন তো আপনি আমার ভাষাও বুঝতে পারছেন না । না ?
    -----বাসে, প্রতিটি মেয়েমেনুষকে বারবার দেখেছিলুম, কিন্তু কই, দেখিনিতো আপনাকে ।
    -----আমার সৌভাগ্য, এতো লোক থাকতে আমাকেই আপনি বেছে নিলেন, এক বিচারাধীন মধ্যবয়সীকে ।”
    পাঠক, দেখুন, এখানে, মডার্ন ডায়ালগের বিনির্মাণ, যা কিনা পোস্টমডার্নিজমের অন্যতম কোয়ালিটি । এ গদ্যে ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমিও আছে ।
    পোস্টমডার্নিজম তো অতীতকে, অতীতের রূপকথাকেও আহরণ করে, কিন্তু আয়রনিকালো ওই কার্য সম্পন্ন হয় । দেখুন :-
    “ব্যঙ্গমি : ওকে ফিরে যেতে হবে ।
    ব্যঙ্গমা : কোথায় ?
    ব্যঙ্গমি : লাৎখোরদের পৃথিবীতে । বিপ্লবে । সংঘর্ষে । পরাজয়ে । সেখানে হাতিশালে হাতির গু থাকে, ঘোড়াশালে পড়ে থাকে লোহার নাল । ছাদের ওপর নৌকো, সিংহাসনে গাধা, নহবতখানায় কাক, মন্ত্রণাঘরে মাকড়সা, কোষাগারে গোবর, কামারশালে নেহাইয়ের ওপর ছাইভস্ম, পালঙ্কে আরশোলা, বাঁশের সাঁকো দিয়ে তৈরি রামধনু, গেরস্ত বাড়িতে ঘরে ঘরে ধেনো-টানা মাতালচি, খোরপোষের টাকায় প্রতিপালিত রাজনীতিক, মৃতদেহের বদলে মুখাগ্নি করার তোষক ।”
    পাঠক, লক্ষ করুন, আধুনিকতাকে লাথি মেরে অধুনান্তিকতার অন্যতম লাৎখোর মলয়কে কোথায় ফিরে যেতে বলা হচ্ছে । ওই সব বিনির্মিত শব্দসমূহে আপনি অর্থ খুঁজতে পারেন, কিন্তু তাতে যেন বিনির্মিত অর্থ হয় । কেননা পোস্টমডার্নরা, স্বাভাবিক কারণেই, মডার্ন ভাষাতত্বকে অতিক্রম করে যান ।
    দশ
    পাঠক, এই ‘অলৌকিক দাম্পত্য’ গদ্যে যে-যৌনতা আছে, তাও মডার্ন যৌনতারই বিনির্মিত যৌনতা, যা পোস্টমডার্ন । এ-বিষয়ে পোস্টমডার্ন William Simon যা বলেছেন, তা শুনুন, “For many people, the sexual part of their lives will take on new and somewhat disruptive salience -- disruptive in the sense that the metaphoric richness of the sexual may have to risk real life testa, tests that involve the effort to bring one’s fantasies into one’s reality. Such efforts have commonly led either to crises or to an impoverishment of both fantasy and reality.”
    ‘অলৌকিক দাম্পত্য’ এখানেই সত্য । এ-গদ্যে ফ্যান্টাসি-রিয়্যালিটি একবার বিন্যস্ত, তন্মুহূর্তেই ডিকনসট্রাকটেড । একবার ব্যথিত, তন্মুহূর্তেই নির্বেদ ।
    আর এখানেই পোস্টকলোনিয়াল-মলয় এবং পোস্টমডার্ন-মলয়, এই বাংলায়, অদ্যাপি, সার্থক ও তুলনারহিত । সেলাম মলয় ।
    [ এপ্রিল, ২০০১ ]
  • মলয় রায়চৌধুরী | 223.177.62.180 | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:৩২735111
  • ব্লাইজি সঁদরা : ট্রান্স-সাইবেরিয়ান এক্সপ্রেস

                                           

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী                                                           

                                               

    images

    তখন আমি বেশ তরুণ ছিলুম

    আমি সবে ষোলো বছরের হবো হয়তো কিন্তু ছেলেবেলার স্মৃতি মুছে গিয়েছিল

    যেখানে জন্মেছিলুম সেখান থেকে ৪৮,০০০ মাইল দূরে

    আমি ছিলুম মসকোতে, তিনঘণ্টির হাজার মিনার

    আর সাতটা রেলস্টেশান

    আর ওই হাজার আর তিন মিনার আর সাতটা রেলস্টেশান

    আমার জন্যে যথেষ্ট ছিল না

    কারণ আমি ছিলুম গরমমেজাজ আর পাগল তরুণ

    আমার হৃদয় ইফিসিয়াসের মন্দির কিংবা

    মসকোর রেড স্কোয়ারের মতন ছিল তপ্ত

    সূর্যাস্তের সময়ে

    আর আমার দুই চোখ ওই পুরোনো রাস্তা-ধরে চলার সময়ে জ্বলজ্বল করতো

    আর আমি আগেই এমন খারাপ কবি ছিলুম

    যে আমি জানতুম না তা কেমন করে নিজের সঙ্গে বয়ে নিয়ে যাই

     

    ক্রেমলিন ছিল যেন বিরাট তার্তার কেক

    সোনার আইসিঙে সাজানো

    তার ওপরে বড়ো মাপের ভাজা কাগজিবাদামের গির্জা

    আর ঘণ্টাগুলো মধু-সোনালী…

    একজন বুড়ো সন্ন্যাসী আমাকে নোভোগোর্দের কিংবদন্তি পড়ে শোনাচ্ছিল

    আমি ছিলুম পিপাসার্ত

    আর আমি কীলকাকার বর্ণমালা পড়ার চেষ্টা করছিলুম

    তারপর তক্ষুনি রেড স্কোয়ারে উড়তে লাগলো ঈশ্বরের তৃতীয় রূপ

    উড়ে গেল আমার হাতও, যেন অ্যালবাট্রস পাখির উড়ালের শব্দ

    আর, হ্যাঁ, শেষ দিনের ওইটুকুই আমার মনে আছে

    শেষ যাত্রার

    এবং সমুদ্রের ।

     

    তবু, আমি সত্যিই ছিলুম একজন বাজে কবি ।

    আমি জানতুম না কেমন করে তা সহ্য করতে হবে ।

    আমি ছিলুম ক্ষুধার্ত

    আর সেইসব দিনগুলো আর সেইসব নারীরা সেইসব কফির দোকানে

    আর সেইসব কাচের গেলাস

    আমি গলায় ঢেলে নিতে চাইছিলুম আর ভেঙে ফেলতে চাইছিলুম

    আর সেইসব জানালা আর সেইসব পথগুলো

    আর সেইসব বাড়িগুলো আর সেইসব জীবন

    আর সেইসব ঘোড়ারগাড়ির চাকা ভাঙা ফুটপাথ থেকে ধুলো ওড়াচ্ছে

    আমি তাদের আগুনের হলকায় ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইছিলুম

    আর আমি তাদের হাড়গোড় গুঁড়িয়ে দিতে চাইছিলুম

    আর টেনে বের করে আনতে চাইছিলুম ওই জিভগুলো

    আমাকে ওদের অদ্ভুত পোশাকের ভেতরের যে ল্যাংটো পেল্লাই শরীর

    পাগল করে তুলছিল তাদের গলিয়ে ফেলতে চাইছিলুম…

    আর দেখতে পাচ্ছিলুম রুশ বিপ্লবের লাল যিশুখ্রিস্ট আসতে চলেছেন

    আর সূর্য একটা নোংরা ঘা

    লাল গরম কয়লার মতন ফাটছে

     

    তখন আমি বেশ তরুণ ছিলুম

    আমি সবে ষোলো বছরের হবো হয়তো কিন্তু ভুলে গিয়েছিলুম কোথায় জন্মেছি

    আমি ছিলুম মসকোতে আগুনের শিখাকে খেয়ে নিতে চাইছিলুম

    আর আমার চোখে ঝলমল করার মতন যথেষ্ট মিনার আর রেলস্টেশান ছিল না

    সাইবেরিয়ায় কামানের আওয়াজ — যুদ্ধ চলছিল

    ক্ষুধা শীত প্লেগ কলেরা

    আর আমুরের কাদাটে জল লক্ষ লাশ বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল

    প্রতিটি রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে দেখছিলুম শেষ ট্রেনের ছেড়ে যাওয়া

    ব্যাস ওইটুকুই : ওরা আর টিকিট বিক্রি করছিল না

    আর সেনারা বরং চাইছিল থেকে যেতে…..

    একজন বুড়ো সন্ন্যাসী আমাকে শোনাচ্ছিল নোভোগোর্দের কিংবদন্তি

     

    আমি, একজন খারাপ কবি যে কোথাও যেতে চায়নি, আমি কোথাও যেতে পারতুম না

    আর  ব্যবসাদার লোকটার নিশ্চয়ই যথেষ্ট টাকাকড়ি ছিল

    বিদেশে গিয়ে ধনরত্ন কামাবার ধান্দায় চলেছে ।

    ওদের ট্রেন প্রতি শুক্রবার সকালে ছাড়ে ।

    শুনে মনে হতো যে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে ।

    একজন লোক কৃষ্ণ অরণ্য থেকে নিজের সঙ্গে একশো বাক্স অ্যালার্ম ঘড়ি

    আর কোকিল ঘড়ি নিয়ে যাচ্ছিল

    আরেকজন টুপির বাক্স, স্টোভের পাইপ, আর নানাধরণের

    শেফিল্ড কোম্পানির কর্ক খোলার প্যাঁচ

    আরেকজন, ম্যালমো থেকে কফিনে ভরে নিয়ে যাচ্ছিল টিনের খাবার

    আর তেলে চোবানো সার্ডিনমাছ

    আর বহু মহিলা জড়ো হয়েছিলেন

    ভাড়া করার জন্য উলঙ্গ উরুর তরুণী

    যারা কফিনও সরবরাহ করতে পারে

    সবার কাছে অনুমতিপত্র ছিল

    মনে হচ্ছিল যেন অনেক মানুষ ওই দিকে মারা যাচ্ছে

    তরুণীরা যাত্রা করছিল তাদের জন্য বরাদ্দ কম দামের টিকিটে

    আর তাদের সকলেরই ছিল ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট ।

     

    এবার, এক শুক্রবার সকালে আমার যাবার পালা এলো

    তখন ডিসেম্বর মাস

    আর আমিও যাত্রা করলুম, হারবিনযাত্রী এক ধনরত্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে

    এক্সপ্রেস ট্রেনটায় আমাদের ছিল দুটো কামরায় ভরা রওরঝিম থেকে আনা

    ৩৪ বাক্স ধনরত্ন

    জার্মানির বাজে মাল “মেড ইন জার্মানি”

    লোকটা আমাকে কয়েকটা নতুন পোশাক কিনে দিয়েছিল

    আর ট্রেনে চাপার সময়ে আমি একটা বোতাম হারিয়ে ফেলেছিলুম

    —আমার মনে আছে, আমার মনে আছে, আমি অনেক সময়ে ব্যাপারটা নিয়ে ভেবেছি–

    আমি ধনরত্নের ওপরে শুয়ে রইলুম আর ওনার দেয়া

    নিকেলকরা মাউথঅর্গান নিয়ে দারুন বোধ করছিলুম

    আমি বেশ খুশ ছিলুম আর অসতর্ক

     

    যেন চোর-পুলিশের ব্যাপার

    আমরা গোলকুন্ডার ঐশ্বর্য চুরি করে নিয়ে যাচ্ছি

    আর আমরা ট্রান্স-সাইবেরিয়ানে চেপে নিয়ে যাচ্ছি

    যাতে পৃথিবীর উল্টো দিকে লুকিয়ে রাখতে পারি

    জুল ভার্নের সার্কাসযাত্রী দলকে উরালের যে চোরেরা আক্রমণ করেছিল

    তাদের থামাতে পাহারা দিচ্ছিলুম

    খুনখুজ থেকে, চিনের বাক্স

    আর মহান লামার ক্রুদ্ধ বেঁটে মোঙ্গোলদের থেকে

    আলিবাবা চল্লিশ চোর থেকে

    আর পাহাড়ের ভয়ঙ্কর বুড়ো লোকটার অনুচরদের থেকে

    আর সবচেয়ে খারাপ, সবচেয়ে আধুনিক

    বিড়ালের মতন চোরদের থেকে

    আর আন্তর্জাতিক এক্সপ্রেসের বিশেষজ্ঞদের থেকে

    আর তবু, আর তবু

    আমি ছিলুম বাচ্চা ছেলের মতন দুঃখি

    ট্রেনের ছন্দ

    যাকে আমেরিকান মনোবিদরা বলেন “ রেলপথের স্নায়ু”

    বরফজমা রেললাইনের ওপরে দরোজা কন্ঠস্বর অ্যাক্সেলের ঘষটানি

    আমার ভবিষ্যতের সোনালী সূত্র

    আমার পিস্তল পিয়ানো পাশের কামরায় তাস খেলুড়েদের গালমন্দ

    জিন নামের তরুণীর দুর্দান্ত উপস্হিতি

    নীল চশমা-পরা লোকটার করিডরে পায়চারি আর আড়চোখে আমার দিকে তাকানো

    মহিলাদের পোশাকের আওয়াজ

    আর হুইসেলের

    আর চাকাগুলোর বিরতিহীন শব্দ আকাশের গায়ে দেগে দেয়া বুনো রাস্তায়

    জানালার কাচ তুষারে ঢাকা

    প্রকৃতিবিহীন !

    আর ওইদিকে সাইবেরিয়ার সমতলভূমিতে নেমে আসা আকাশ

    দীর্ঘ অনিচ্ছুক ছায়ারা উঠে যাচ্ছে আর নামছে

    আমি ঘুমিয়ে পড়েছি

    তার্তার পশমের চাদর ঢেকে

    ঠিক আমার জীবনের মতন

    আমার জীবনে  স্কচ শালের চেয়ে বেশি উষ্ণতা দিচ্ছে না

    আর সমস্ত ইউরোপ বাতাস-চেরা এক্সপ্রেস ট্রেনের তীব্র গতি দিয়ে দেখা

    আমার জীবনের চেয়ে অর্থবহ নয়

    আমার দুঃখের জীবন

    এই শাল

    সোনায় ভরা সিন্দুকের ওপরে ছত্রাখান

    আমি  গড়াই

    স্বপ্নে

    এবং ধোঁয়ায়

    আর বিশ্বজগতে একমাত্র আলো

    একটি ফালতু চিন্তা…

     

    আমার হৃদয়তল থেকে কান্না উঠে আসে

    যদি ভাবি, হে প্রেম, আমার দয়িতার সম্পর্কে ;

    মেয়েটি বেশ নষ্ট, যাকে খুঁজে পেয়েছিলুম, ফ্যাকাশে

    এবং বিশুদ্ধ, এক বেশ্যালয়ের পেছন দিকে ।

     

    মেয়েটি ফর্সাত্বকের শিশু বেশ হাসে,

    দুঃখি, হাসে না, কখনও কাঁদে না ;

    কিন্তু কবির কুসুম, শ্বেতপদ্ম, কাঁপতে থাকে

    যখন তোমাকে ওর চোখের গভীরতায় তা দেখতে দেয় ।

     

    মেয়েটি বেশ মিষ্টি, তুমি শুনতে পাও এমনকিছু বলে না.

    দীর্ঘক্ষণের শিহরণ তুলে যখন তুমি কাছে টেনে নাও,

    কিন্তু যখন আমি ওর কাছে আসি, এখান থেকে, সেখান থেকে,

    এক পা এগিয়ে আসে আর চোখ বন্ধ করে — আরেক পা এগিয়ে আসে ।

     

    তার কারণ ও আমার প্রেম আর অন্য নারীরা

    সোনার চাদরে মোড়া বিশালদেহ আগুন

    আমার দুঃখি বন্ধু এতো একা

    ও সম্পূর্ণ নগ্ন, শরীর নেই — ও বড়োই দুঃখি ।

     

    মেয়েটি এক নিষ্পাপ ফুল, রোগা আর অপলকা,

    কবির কুসুম, করুণা-জাগানো শ্বেতপদ্ম,

    এতো শীতল, এতো একা, আর এখন এতো শুকিয়ে গেছে

    ওর হৃদয়ের কথা ভাবলে আমার কান্না পায় ।

     

    আর এই রাত আরও শত সহস্র রাতের মতন যখন রাতের ভেতর দিয়ে

    একটা ট্রেন গলে বেরিয়ে যেতে থাকে

    –ধুমকেতুর পতন হয় —

    আর একজন পুরুষ ও একজন নারী, যতোই কমবয়সী হোক, প্রেম করার আনন্দ নেয়।

     

    আকাশ যেন ভাঙা সার্কাসের ছেঁড়া তাঁবু

    ফ্ল্যাণ্ডার্সের মেছোদের ছোটো গ্রামে

    সূর্য যেন ধোঁয়াটে লন্ঠন

    আর ওপরে দোলনায় এক নারী দ্বিতীয়ার চাঁদ

    ক্ল্যারিনেট ভেরী তীক্ষ্ণ বাঁশি তালদেয়া ঢোলোক

    আর এখানে রয়েছে আমার দোলনা

    আমার দোলনা

    ওটা সবসময় পিয়ানোর কাছে থাকতো যখন আমার মা, মাদাম বোভারির মতন

    বিটোফেনের সোনাটা বাজাতেন

    আমি শৈশব কাটিয়েছি ব্যাবিলনের ঝুলন্ত বাগানে

    স্কুল-পালিয়ে, ট্রেনগুলোকে অনুসরণ করে

    যখন ওরা স্টেশন থেকে বেরিয়ে যেতো

    এখন আমি ট্রেনগুলোকে বাধ্য করেছি আমায় অনুসরণ করতে

    বাসেল-টিমবুকটু

    আতেউইল আর লঙচ্যাম্পসের মাঠের মতন ঘোড়াদের ছুটিয়েছি

    প্যারিস-নিউইয়র্ক

    এখন ট্রেনগুলো আমার পাশাপাশি ছোটে

    মাদ্রিদ-স্টকহোম

    সব হারিয়েছি ঘোড়দৌড়ের যৌথ আনন্দের খেলায়

    বেঁচেছে কেবল প্যাটাগোনিয়া, প্যাটাগোনিয়া, যার সঙ্গে আমার গভীর দুঃখের মিল

    প্যাটাগোনিয়া আর দক্ষিণ সমুদ্রে যাত্রা

    আমি রাস্তায়

    আমি চিরকাল রাস্তায় কাটিয়েছি

    আমি ফ্রান্সের ছোট্ট জিনের সঙ্গে পথে-পথে

    ট্রেন ডিগবাজি খেয়ে চার পায়ে দাঁড়ায়

    ট্রেন নিজের চাকায় ভর দিয়ে থামে

    ট্রেন চিরকাল নিজের চাকায় ভর দিয়ে থামে

     

    “ব্লাইজি, বলো, আমরা কি মমার্ত থেকে অনেক দূরে ?”

     

    অনেক দূরে, জিন, তুমি সাত দিন যাবত গড়িয়ে চলেছ

    তুমি মমার্ত থেকে অনেক দূরে, সেই পাহাড়তলি থেকে

    যেখানে তুমি বড়ো হয়েছ, সাকরে-কোয়ের যেখান ছিলে নিরালায়

    প্যারিস তার বিশাল ঝলকানিসুদ্ধ মুছে গেছে

    উড়ন্ত স্ফূলিঙ্গ ছাড়া সবকিছু মিইয়ে গেছে

    বৃষ্টি পড়ছে

    জলজঞ্জাল ফুলে ওঠে

    সাইবেরিয়া বাঁক নেয়

    তুষারের পরতের পর পরত জমতে থাকে

    আর নীল আলোয় উন্মাদনার পাগলাঘণ্টি বাজে শেষ আকাঙ্খার মতন

    ভারি দিগন্তের হৃদয়ে ট্রেনটা স্পন্দিত হতে থাকে

    আর তোমার এককীত্ব তোমায় কচুকাটা করে…

     

    “বলো, ব্লাইজি, আমরা কি সত্যিই মমার্ত থেকে অনেক দূরে ?”

     

    অশান্তি

    অশান্তির কথা ভুলে যাও

    পথের ভাঙাচোরা আর হেলেপড়া রেলস্টেশনগুলোকে

    যে টেলিগ্রাফ তার থেকে তারা ঝুলছে

    তাদের গলা টিপে ধরার জন্য হাত বাড়ানো গোমড়া স্তম্ভ

    পৃথিবীটা উন্মাদ মর্ষকামীর হাত দিয়ে বাজানো

    অ্যাকর্ডিয়ানের মতন বেড়ে দীর্ঘ হয় আবার কুঁচকে ছোট হয়ে যায়

    আকাশের চিড়ফাটল দিয়ে বুনো ইঞ্জিনগুলো উড়তে থাকে

    আর গর্তগুলোয়

    পাগলকরা চাকা কন্ঠস্বরের হাঁ-মুখ

    আর দুরবস্হার কুকুরেরা আমাদের চাকায় ঘেউঘেউ করে

    রাক্ষসদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে

    লোহায় নখ ঘষে

    সবকিছু আওয়াজ তোলে

    চাকার ঘ্যাঙঘ্যাঙে শব্দ থেকে

    সামান্য অন্যথা

    ঝাঁপায়

    নড়েচড়ে

    আমরা এক বোবা মানুষের খুলির ভেতরের ঝড়….

     

    “বলো, ব্লাইজি, আমরা কি সত্যিই মমার্ত থেকে অনেক দূরে ?”

     

    হ্যাঁ, আমরা তাইই, আমাকে বিরক্ত কোরো না, তুমি জানো, আমরা অনেক দূরে

    ইঞ্জিনের ভেতরে অতিউত্তপ্ত পাগলামি গোমরায়

    প্লেগ আর কলেরা আমাদের চারিধারে জ্বলন্ত স্ফূলিঙ্গের মতন ওড়ে

    আমরা যুদ্ধের সুরঙ্গে সরাসরি ঢুকে অদৃশ্য হয়ে গেছি

    ক্ষুধা, সেই বেশ্যাটা, আকাশে ছড়ানো মেঘ আঁকড়ে ধরে

    আর যুদ্ধের মাঠ ভরে যায় পচা লাশের দুর্গন্ধে

    তা যা চায় তাই করুক, তুমি তোমার কাজ করে যাও….

     

    “বলো, ব্লাইজি, আমরা কি সত্যিই মমার্ত থেকে অনেক দূরে ?”

     

    হ্যাঁ, আমরা দূরে, আমরা দূরে

    দুষ্কর্মের ভারবাহীরা ফুলেফেঁপে মরুভূমিতে নেতিয়ে পড়েছে

    এই খোসপাঁচড়ায় সেনার গরুর গলার ঘণ্টাধ্বনি শোনো

    টোমস্ক চেলিয়াবিনস্ক কানস্ক ওব টায়শেট ভের্কনে-উদিনস্ক কুরগান সামারা

    পেনজা-টুলুন

    মাঞ্চুরিয়ায় মৃত্যু

    সেখানেই আমরা নামবো আমাদের শেষ গন্তব্য

    এই যাত্রাটা ভয়াবহ

    কালকে সকালে

    ইভান উলিচের চুল পেকে গেল

    আর কোলিয়া নিকোলাই ইভানোভিচ দুই সপ্তাহ যাবত নিজের নখ খাচ্ছে…

    মৃত্যু আর দুর্ভিক্ষ যা করে তাই করো, তোমার কাজ করে যাও

    একশো ফরাসি টাকা লেগেছে — ট্রান্স-সাইবেরিয়ানে তা একশো রুবল

    বসার জায়গাকে তপ্ত করো আর টেবিলের তলায় লজ্জা ঢাকো

    শয়তানের কবজায় রয়েছে লেখবার চাবিকাঠি

    ওর গাঁটসুদ্ধ আঙুল নারীদের আপ্লুত করে

    সহজপ্রবৃত্তি

    ঠিক আছে মহিলাগণ

    তোমরা নিজেদের কাজ চালিয়ে যাও

    যতক্ষণ না আমরা হারবিনে পৌঁছোচ্ছি…..

     

    “বলো, ব্লাইজি, আমরা কি মমার্ত থেকে সত্যিই অনেক দূরে?”

     

    না, ওহে…আমাকে বিরক্ত কোরোনা….একা থাকতে দাও

    তোমার পোঁদ ঢাউস হয়ে গেছে

    তোমার পেট টকেছে আর রয়েছে তোমার প্রশংসা

    একমাত্র জিনিস যা প্যারিস তোমাকে দিয়েছে

    আর রয়েছে এক কচি আত্মা…কারণ তুমি অসুখি

    তোমার জন্য আমার কষ্ট হয় এসো আমার হৃদয়ে

    চাকাগুলো ককেন দেশের উইণ্ডমিলের মতন

    আর উইণ্ডমিলগুলো সেই ভিখারির যে নিজের লাঠি মাথার ওপরে ঘোরাচ্ছে

    আমরা শূন্যের নুলো

    আমরা আমাদের চার আঘাতের ওপর ভর দিয়ে চলাফেরা করি

    আমাদের ডানা ছেঁটে ফেলা হয়েছে

    আমাদের সাতটি পাপের ডানা

    আর ট্রেনগুলো হলো শয়তানের খেলনা

    মুর্গির খাঁচা

    এই আধুনিক জগতসংসার

    গতি কোনো কাজে লাগে না

    এই আধুনিক জগতসংসার

    ব্যবধানগুলো অনেক দূরে-দূরে

    আর যাত্রার শেষে একজন নারীর সঙ্গে একজন পুরুষের বসবাস ভয়াবহ…

     

    “ব্লাইজি, বলো, আমরা কি মমার্ত থেকে সত্যিই অনেক দূরে ?”

     

    তোমার জন্য কষ্ট হয় এখানে এসো একটা গল্প শোনাবো

    আমার বিছানায় এসো

    আমার কাঁধে তোমার মাথা রাখো

    আমি তোমাকে একটা গল্প শোনাবো…

     

    আরে এসো দিকিনি !

     

    ফিজিতে সব সময়েই বসন্তকাল

    তুমি সঙ্গম করে বেড়াও

    উঁচু ঘাসে প্রেমিক-প্রেমিকাদের মাতন লাগে আর তপ্ত সিফিলিস

    কলাগাছের বাগানে বইতে থাকে

    এসো প্রশান্তসাগরের দ্বীপগুলোয়

    ফিনিক্স, মারকোয়েসাস

    বোরনিও আর জাভা

    আর বিড়ালের মতন দেখতে সেলেবেস

     

    আমরা জাপানে যেতে পারব না

    মেকসিকোতে চলো !

    উঁচু সমতলভূমি টিউলিপ গাছে ছেয়ে থাকে

    সূর্য থেকে ঝুলে থাকা আলুলায়িত চুলের মতন আঙুরলতা

    যেন চিত্রকরের ব্রাশ আর প্যালেট

    বিস্ময়করভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে ঘণ্টাধ্বনির মতন–

     

    রুশো ছিলেন সেখানে

    ওনাকে চিরকালের জন্য ঝিলমিলিয়ে রেখেছিল

    দেশটা পাখির জন্য বিখ্যাত

    স্বর্গের পাখি বেহালার পাখি

    টউকান মকিংবার্ড

    আর কালো ফুলের মধ্যে টুনটুনি পাখিরা বাসা বাঁধে

    এসো !

    আমরা অ্যাজটেক মন্দিরের রাজকীয় ধ্বংসাবশেষে প্রেম করব

    তুমি হবে আমার দেবীপ্রতিমা

    খুকিরঙা জলের ছাটে কিছুটা কুৎসিত আর সত্যিকারের অপার্থিব

    ওহ এসো !

     

    তুমি চাইলে আমরা বিমানে চেপে হাজার হ্রদের দেশের ওপরে উড়ব

    সেখানে রাতগুলো দৌরাত্মপূর্ণভাবে দীর্ঘ

    ইঞ্জিনের আওয়াজে আমাদের প্রাগৈতিহাসিক পূর্বপুরুষরা ভয় পাবেন

    আমি নামবো

    আর ম্যামথের জীবাশ্ম দিয়ে গড়ে তুলব বিমান রাখার হলঘর

    আদিম আগুন আবার জাগিয়ে তুলবে আমাদের ক্ষীণ প্রণয়

    রুশদেশের চায়ের কেটলি

    আর আমরা সাধারণ মানুষের মতন মেরু অঞ্চলে সংসার পাতবো

    ওহ এসো !

    জিন জিনেট আমার খুকি আমার মাটির-পাত্র আমার পাদ

    আমার আমি মা পুপু পেরু

    পিপি কোকিল

    ডিঙডিঙ আমার ডঙ

    মিষ্টি শুঁটি মিষ্টি মাছি মিষ্টি ভ্রমর

    চিকাডি বেডি-বাই

    ছোট্ট পায়রা আমার প্রেমিকা

    ছোট কুকি-নুকি

    ঘুমোচ্ছে ।

     

    মেয়েটা ঘুমোচ্ছে

    আর সারা দিন পেটে কিছু পড়েনি

    স্টেশনে দেখা সেই সব মুখগুলো

    যাবতীয় ঘড়িগুলো

    প্যারিসের সময় বার্লিনের সময় সেইন্ট পিটার্সবার্গের সময় সেইসব স্টেশনের সময়

    আর উফাতে কামানদাজের রক্তাক্ত মুখ

    আর গ্রোন্ডোর অবাস্তব আলোজ্বলা ঘড়ির কাঁটা

    আর ট্রেন চলেই চলেছে শেষহীন

    রোজ সকালে তুমি তোমার ঘড়ি মিলিয়ে নাও

    ট্রেন এগোয় আর সূর্যের সময় ফুরোয় কোনো কাজে লাগে না ! ঘণ্টাধ্বনি শুনি

    নোট্রেদামের বিরাট ঘণ্টা

    সন্ত বার্থোলোমিউ দিবসে লুভরের তীক্ষ্ণ ঘণ্টাধ্বনি

    নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির বৈদ্যুতিক ঘণ্টাধ্বনি

    ভেনিসের ইতালীয় ঘণ্টাঘরের বাজনা

    আর বাজতে থাকে মসকোর ঘণ্টা, লাল সিংহদ্বারের ঘড়ি

    যা আমার জন্য সময় জানাতো যখন আমি একটা অফিসে কা্জ করতুম

    আর আমার স্মৃতিগুলো

    ট্রেন বিদ্যুৎচমকের মতন গোলঘরে প্রবেশ করে

    চলতে থাকে ট্রেন

    গ্রামোফোনে বেজে ওঠে ছোট্ট ভবঘুরে কুচকাওয়াজ

    আর জগতসংসার, প্রাগের ইহুদিপাড়ার ঘড়ির কাঁটার মতন

    পাগল হয়ে পেছন দিকে যেতে থাকে

     

    বাতাসের সতর্কতা উড়িয়ে

    ঝড় উঠেছে

    আর ট্রেনগুলো প্যাঁচালো রেললাইনে ঝড় তোলে

    নারকীয় খেলনা

    এমন ট্রেন আছে যাদের কখনও পরস্পরকে দেখা হয় না

    অন্যগুলো হারিয়ে যায়

    স্টেশানমাসটাররা দাবা খেলে

    ব্যাকগ্যামন

    শুট পুল

    ক্যারামের টুসকি

    প্যারাবোলা

    রেললাইনের প্রণালী হলো নতুন ধরণের জ্যামিতি

    সাইরাকিউজ

    আরকিমিডেস

    আর যে সৈন্যরা তাঁকে কোতল করেছিল

    আর ছিপনৌকা

    আর রণতরী

    আর বিস্ময়কর যন্ত্র যা উনি আবিষ্কার করেছিলেন

    আর যাবতীয় কোতল

    প্রাচীন ইতিহাস

    আধুনিক ইতিহাস

    জলঘুর্ণি

    জাহাজডুবি

    এমনকি টাইটানিকও যার বিষয়ে কাগজে পড়েছিলুম

    এতো চিত্রকল্পের জমায়েত আমি আমার কবিতায় আনতে পারছি না

    কেননা আমি এখনও সত্যিকারের খারাপ কবি

    কারণ ব্রহ্মাণ্ড আমার ওপর দিয়ে দ্রুত চলে যায়

    আর ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা পড়ার ব্যাপারে বীমার জন্য গা করিনি

    কেননা আমি জানিনা কেমন করে তা সারাটা পথে বয়ে নিয়ে যেতে হবে

    আমি বেশ ভয়ে আছি

    আমি ভিতু

    জানি না কেমন করে সারাটা পথ বয়ে নিয়ে যেতে হবে

    আমার বন্ধু শাগাল-এর মতন আমি যুক্তিবর্জিত ছবির সিরিজ আঁকতে পারি

    কিন্তু আমি প্রসঙ্গবিন্দু লিখে রাখিনি

    “আমার অজ্ঞতা ক্ষমা করুন

    ছন্দের প্রাচীন খেলা ভুলে গেছি বলে ক্ষমা করে দিন”

    গিয়ম অ্যাপলিনেয়ার যেমন বলেছেন

    যুদ্ধ সম্পর্কে যদি কিছু জানতে চাও তাহলে ক্রোপোটকিনের ‘স্মৃতিকথা’ পড়ো

    কিংবা নৃশংস ছবিসহ জাপানি সংবাদপত্র

    কিন্তু বইয়ের তালিকা তৈরি করে কীই বা হবে

    হাল ছেড়ে দিই

    লাফিয়ে ফিরে আসি আমার নাচতে থাকা স্মৃতিতে…

     

    ইরকুটস্কে যাত্রা হঠাৎ মন্হর হয়ে যায়

    সত্যি বলতে টেনে নিয়ে যেতে থাকে

    বাইকাল হ্রদের বাঁকে আমাদেরটাই ছিল প্রথম ট্রেন

    গাড়িটা লন্ঠনের আলোয় আর পতাকায় সাজানো ছিল

    আর দুঃখি গান “ঈশ্বর জারকে রক্ষা করুন” শুনে আমরা স্টেশন ছাড়লুম

    আমি যদি চিত্রকর হতুম এই যাত্রার শেষে প্রচুর হলুদ আর লাল রঙের ঝাপটা মারতুম

    কারণ আমার মনে হয় আমরা সবাই যৎসামান্য উন্মাদ

    আর সেই ছেয়েথাকা সন্মোহন আমার সহযাত্রীদের ক্লান্ত মুখ রক্তাভ করে তুলছিল

    আমরা যখন মোঙ্গোলিয়ার কাছাকাছি

    তা দাবানলের মতন গর্জন করছিল ।

    ট্রেন মন্হর হয়ে গিয়েছিল

    আর চাকার অবিরাম ঘষটানিতে আমি শুনতে পেলুম

    এক শাশ্বত প্রার্থনার

    উন্মাদ ফোঁপানি আর চিৎকার

     

    আমি দেখলুম

    আমি দেখলুম শেষ পূর্বপ্রান্ত থেকে যে শব্দহীন কালো ট্রেনগুলো ফিরে আসছে

    তারা যেন মায়াপুরুষ

    আর আমার চোখদুটো, গাড়ির পেছনের আলোর মতন,

    তখনও ট্রেনগুলোর পিছু ধাওয়া করেছে

    টালগাতে ১০০০০০ আহত লোক মারা যাচ্ছে অথচ কোনো সাহায্য আসছে না

    আমি ক্র্যাসনোইয়ার্সকের হাসপাতালে গেলুম

    আর খিলোকে আমাদের সঙ্গে সৈন্যদের এক সারির সঙ্গে দেখা হলো

    যারা পাগল হয়ে গেছে

    আলাদা করে রাখাদের দেহে দেখলুম জখমের হাঁ-মুখ থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে

    আর কেটে ফেলা অঙ্গগুলো চারিদিকে নাচছে কিংবা কাঁচা বাতাসে উড়ছে

    তাদের মুখমণ্ডলে আর হৃদয়ে ছিল আগুন

    জানালায় টোকা দিয়ে বাজনা বাজাচ্ছিল মূর্খ আঙুলগুলো

    আর ভয়ের চাপে এমনই চাউনি যা থেকে ফেটে বেরোবে নালি-ঘা

    স্টেশনগুলোয় ওরা মোটরগাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল

    আর আমি দেখলুম

    ষাটটা ইঞ্জিন তপ্ত দিগন্তের তাড়া খেয়ে দৌড়োচ্ছে

    আর বেপরোয়া কাকেরা

    উধাও হয়ে যাচ্ছে

    পোর্ট আর্থারের দিকে

     

    শিটাতে পেলুম কয়েক দিনের বিশ্রাম

    পাঁচ দিনের বিরাম ততোক্ষণ ওরা রেললাইন পরিষ্কার করছিল

    আমরা মিস্টার ইয়াঙ্কেলেভিচের বাড়িতে আশ্রয় নিলুম যিনি

    ওনার একমাত্র মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে চাইলেন

    তারপর যাবার সময় এলো ।

    এখন আমিই পিয়ানো বাজালুম আর আমার দাঁতে ব্যথা করছিল

    আর যখনই চাই আমি আবার দেখতে পাই সেই নিঃশব্দ ঘর আর ভাঁড়ার আর

    ওনার মেয়ের দুই চোখ যে আমার সঙ্গে প্রতিরাতে শুচ্ছিল

    মুসোর্গস্কি

    আর হ্যুগো উল্ফের জার্মান গীতিকবিতা

    আর গোবি মরুভূমির বালিয়াড়ি

    আর খাইলারে শাদা উটদের একটা যাত্রীদল

    আমি দিব্যি করে বলতে পারি ৩০০ মাইলের বেশি মোদোমাতাল ছিলুম

    কিন্তু আমি পিয়ানো বাজাচ্ছিলুম — এসবই দেখেছি

    যাত্রায় বেরোলে তোমার উচিত চোখ বন্ধ করে নেয়া

    আর ঘুমিয়ে পড়া

    আমি ঘুমোবার জন্যে পাগল হয়ে যাচ্ছিলুম

    চোখ বন্ধ করে গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারি আমি কোন দেশে

    আর কোন ধরণের ট্রেন যাচ্ছে তা শুনে বলে দিতে পারি

    ইউরোপের ট্রেনগুলো ৪/৪ যখন কিনা এশিয়ার ট্রেন ৫/৪ কিংবা ৭/৪

    অন্যগুলো ঘুমপাড়ানি গানের সুর তুলে যায়

    আর কয়েকটা এমন যাদের চাকার একঘেয়েমি আমাকে

    মাতেরলিঙ্কের কঠিন গদ্য মনে পড়ায়

    চাকাগুলোর খণ্ডিত উচ্চারণের মানে আমি বুঝতে পারছিলুম

    আর সৌন্দর্যের সন্ত্রাসের উপাদানকে একত্রিত করতে পারছিলুম

    যার আমি মালিক

    আর যা আমাকে চালিয়ে নিয়ে যায়

     

    সিৎসিহার আর হারবিন

    অতোটাই আমি যেতে পারি

    শেষ স্টেশন

    ওরা রেড ক্রসের দপতরে আগুন ধরিয়ে দেবার পর

    হারবিনে আমি ট্রেন থেকে নামলুম

     

    ও প্যারিস

    পরম উষ্ণ আরামগেহ তোমার পথগুলোর মোড়ের ফুলকি

    আর তার ওপরে হেলে থাকা বাড়িগুলো পরস্পরকে তাপ দেয়

    ঠাকুমা-দিদিমার মতো

    আর এখানে রয়েছে লাল সবুজ সমস্ত রঙের পোস্টার আমার অতীতের মতন

    এক কথায় হলুদ

    ফ্রান্সের উপন্যাসের গর্বিত রঙ হলো হলুদ

    বড়ো শহরগুলোয় যখন বাস যায় আমি তাতে হাত ঘষি

    সঁ-জারমেঁ-মমার্ত রুটে যা আমাকে নিয়ে যায় ছোটো পাহাড়তলিতে

    নিচের মোটরগুলো যেন সোনালি ষাঁড়

    সন্ধ্যায় গরুগুলো সাকরে-কয়েরে চরে বেড়ায়

    ও প্যারিস

    প্রধান স্টেশন যেখানে অস্হিরতার মোড়ে আকাঙ্খাগুলো নামে

    এখন কেবল রঙের দোকানে দরোজায় ছোট্ট আলো জ্বলছে

    ইনটারন্যাশানাল পুলম্যান আর গ্রেট ইউরোপিয়ান এক্সপ্রেস কোম্পানি

    তাদের পুস্তিকা আমাকে পাঠিয়েছে

    এটা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর গির্জা

    আমার বন্ধুরা আছে যারা আমাকে রেলিঙের মতন ঘিরে থাকে

    ওরা ভয় পায় যে আমি চলে গেলে আর ফিরবো না

     

    প্যারিস

    যে নারীদের সঙ্গে  পরিচিত হয়েছি তারা দিগন্তে আমার চারিধারে দেখা দেয়

    বৃষ্টিতে দুঃখি লাইটহাউসের মতন দেখতে তাদের হাত বাড়িয়ে দেয়

     

    বেলা, অ্যাগনেস, ক্যাথারিন, আর ইতালিতে আমার ছেলের মা

    আর সেই মেয়ে যে আমেরিকায় আমার প্রেমের মা

    অনেক সময়ে হুইসিলের কান্না আমাকে ছিঁড়ে ফ্যালে

    মাঞ্চুরিয়াতে একটি গর্ভ স্পন্দিত হচ্ছে, যেন জন্ম দিতে চলেছে

    আমার ইচ্ছেকে

    আমার ইচ্ছে যে আমার কখনও যাত্রা করা উচিত হয়নি

    আজকের রাতে এক গভীর প্রেম আমাকে পাগল করে তুলছে

    আর আমি ফ্রান্সের ছোট্ট জিনের কথা ভুলতে পারছি না ।

    এক দুঃখের রাতে তার সন্মানে এই কবিতাটা লিখছি

    জিন

    কচি গণিকা

    আমি বড়ো দুঃখি বড়ো দুঃখি

    ফুরিয়ে যাওয়া যৌবনকে মনে আনার জন্য যাচ্ছি লাপাঁ অ্যাগাইল

    কয়েক গেলাস মদ খাবো

    আর বাসায় ফিরবো একা

     

    প্যারিস

    তুলনাহীন মিনার আর মহান ক্রুশকাঠ আর চাকার শহর



     
  • মলয় রায়চৌধুরী | 223.177.62.180 | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:৩৫735112
  • জাঁ জেনে : চোরের জার্নাল : 

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    যারা জেল খাটে তাদের পোশাক গোলাপি আর শাদা ডোরাকাটা । যদিও আমার হৃদয়ের ওসকানিতে আমি সেই জগৎ বেছে নিয়েছি যেখানে আহ্লাদিত হই, আমি অন্তত সেখানে সেই সমস্ত মর্মার্থের ইশারা খুঁজে পাবার ক্ষমতা রাখি, যা আমি জানতে চাই : ফুল আর দণ্ডিতদের মাঝে একটা কাছাকাছি সম্পর্ক আছে । প্রথমটার যেমন অপলকাভাব আর সূক্ষ্মতা, তেমনই প্রকৃতির, যেমন দ্বিতীয়টার নির্দয় সংবেদনহীনতা । যদি আমাকে একজন দণ্ডিতের -- কিংবা অপরাধীর বর্ণনা করতে হয় -- আমি তাকে ফুলে এমনভাবে সাজাবো যে সে তার তলায় চাপা পড়ে যাবে, সে নিজেই ফুল হয়ে উঠবে, বিশাল আর নতুন ফুল । যাকে আমি পাপ বলে জানি তার জন্য, আমি আরামে এক অভিযানে বেরোলুম যা আমাকে কারাগারে পৌঁছে দিলো । যদিও তারা সব সময়ে সুপুরুষ নয়, যে মানুষেরা পাপে পর্যবসিত,  তাদের  পৌরুষের প্রচুর সততা থাকে । তারা নিজে থেকেই, কিংবা কোনও অঘটনের কারণে, যা তাদের জন্য বাছাই করা হয়েছে, তারা বিনা নালিশে কলঙ্কের, ঘৃণ্য ঘটনায় ঝাঁপিয়ে পড়ে, যেমন প্রেমে, যদি তা গভীর হয়, মানুষকে তার মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দ্যায় । যৌনতার খেলা এক নামহীন জগতকে ফাঁস করে, যা প্রেমিকদের রাতের ভাষায় প্রকাশিত হয় । সেই ভাষাকে লিখে রাখা যায় না । তা রাতের বেলায় কানে-কানে কর্কশস্বরে ফিসফিস করে বলা হয় । ভোর বেলায় তা লোকে ভুলে যায় । তোমাদের জগতের সদগুণকে প্রত্যাখ্যান করে, অপরাধীরা এক নিষিদ্ধ ব্রহ্মাণ্ডকে আশাহীনভাবে সঙ্গঠিত করার জন্য একমত হয় । তারা তার ভেতরে বসবাস করার জন্য আত্মসমর্পণ করে । সেখানকার হাওয়ায় বমি পায় : তারা তবু সেখানে শ্বাস নিতে পারে । কিন্তু -- অপরাধীরা তোমার ধরাছোঁয়ার বাইরে-- যেমন ভালোবাসায়, তারা পেছন ফেরে আর আমাকেও জগতসংসার আর তার আইনকানুন থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে বাধ্য করে । তাদের ঘাম, বীর্য, আর রক্তের গন্ধ । সংক্ষেপে, আমার দেহকে আর আমার তৃষ্ণার্ত আত্মাকে তা একনিষ্ঠতা উপহার দ্যায় । তাদের জগতের এই যৌনতার দরুন আমি অশুভের প্রতি আকৃষ্ট হই । আমার দুঃসাহসিক অভিযান, কখনও দ্রোহ বা অবিচারের অনু্ভূতির দ্বারা প্ররোচিত হয়নি, তা যেন এক দীর্ঘ সময়ের সঙ্গম, দুঃসহ, অদ্ভুত, যৌন উৎসব ছিল ( কাল্পনিক উৎসব যা কারাগারে নিয়ে যায় আর যাকে আগাম অনুমান করা যায় ) । যদিও তা অনুমোদিত, আমার দৃষ্টিতে তার ন্যায্যতা প্রতিপাদনও, জঘন্য অপরাধের, তা হবে অত্যন্ত অবক্ষয়ের নিদর্শন ।    সেই চরম বিন্দু যেখানে পুরুষদের জুগুপ্সাকে নিয়ে যায়, তাকে আমার মনে হতো বিশুদ্ধতার আদর্শ জায়গা, অর্থাৎ, সবচেয়ে ঘোলা প্রেমাত্মক সাদৃশ্য,  যেখানে উদযাপিত হয় মেকি বিয়ে ।    তাকে সুরে বাঁধবার ইচ্ছায়, আমি ব্যবহার করি স্বাভাবিক সংবেদনের আঙ্গিকে আমাকে দেয়া উপহার, যা দণ্ডিতের চেহারায় আগে থেকেই উত্তেজিত করে তোলে । ব্যাপারটা জাগিয়ে তোলে, তার রঙে আর তার বন্ধুরতায়, এক ধরণের ফুল যার পাপড়িগুলো কিছুটা কোঁকড়া, যার বর্ণনা আমার পক্ষে যথেষ্ট, শক্তিমত্তার ধারণাকে লজ্জার জুড়িদার করা ; লজ্জা যা কিনা প্রাকৃতিক স্তরে অত্যন্ত অপলকা আর মহার্ঘ । এই অনুষঙ্গ, যা আমাকে আমার সম্পর্কে অনেক কথা বলে, তা নিজের সম্পর্কে অন্য কোনো মনের কথা প্রস্তাব করবে না, আমার মন তা এড়াতে পারে না । এইভাবে আমি আমার কোমলতা দণ্ডিতদের উপহার দিয়েছি ; আমি তাদের মনোরম নামে ডাকতে চেয়েছি, তাদের অপরাধকে অভিহিত করতে চেয়েছি, শালীনতার কারণে, সূক্ষ্ম রূপকে ( যার আড়ালে আমি জানতে পারতুম না খুনির বৈভবী পৌরুষ, তার লিঙ্গের হিংস্রতা ) । এই ছবির মাধ্যমে আমি কি তাদের গিয়ানার পেনাল কলোনিতে কল্পনা করতে পারিনা : সবচেয়ে পালোয়ান, মাথায় শিঙ, সবচেয়ে কঠিন, মশারির ঢাকনার আড়ালে ? আর আমার ভেতরের প্রতিটি ফুল এমন এক বিষাদ ছড়ায় যে তার সবই দুঃখ আর মৃত্যুর নিদর্শন । এইভাবে আমি ভালোবাসা চাইলুম,  যেন তা বন্দিশিবিরের ব্যাপার । আমার প্রতিটি  কামেচ্ছা আমাকে তার আশায় আকৃষ্ট করলো, তার একটা আভাস আমায় দিলো, আমাকে অপরাধীদের উপহার দিলো, তাদের কাছে আমাকে উপহার দিলো কিংবা আমাকে অপরাধ করার জন্য অনুপ্রাণিত করলো । যখন আমি এই বইটা লিখছি, শেষ অপরাধীরা ফ্রান্সে ফিরছে । সংবাদপত্রে সেই খবর প্রকাশিত হচ্ছে । রাজার উত্তরাধিকারীরা এক শূন্যতায় ভোগে যদি তাকে অভিষেক থেকে প্রজাতন্ত্র বঞ্চিত করে । বন্দিশিবিরের সমাপ্তি আমাদের জীবন্ত মননকে পৌরাণিক অতল জগতে উত্তীর্ণ হওয়ায় বাধা দ্যায় । আমাদের সবচেয়ে নাটকীয় আন্দোলনকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে । আমাদের অভিনিষ্ক্রমণ, নৈপূণ্য, সমুদ্রের পথে মিছিল, মাথা নত করে ক্রিয়ান্বিত হয়েছিল । ফিরে যাওয়া, সেই একই মিছিলের প্রত্যাবর্তন, তা অর্থহীন হয়ে গেছে । আমার অন্তরজগতে, বন্দিশিবিরের ধ্বংস হয়ে দাঁড়িয়েছে শাস্তির শাস্তি : আমাকে খোজা করা হয়েছে, আমি আমার কলঙ্ক থেকে কর্তিত । আমাদের স্বপ্নকে তাদের গৌরব থেকে মুণ্ডহীন করার ব্যাপারে উদাসীন, ওরা আমাদের আগেই ঘুম ভাঙিয়ে দ্যায় । পেনাল কলোনির তুলনায় দেশের কারাগারগুলোর নিজেদের ক্ষমতা থাকে : পেনাল কলোনির মতো তা  নয় । তা ছোটোখাটো । তাতে সেরকম সৌষ্ঠব, কিছুটা বিনীত মহিমা নেই । আবহাওয়া সেখানে এমন গুমোটভরা যে তোমায় নিজেকে হিঁচড়ে বেড়াতে হবে । তুমি হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াও । দেশের কারাগারগুলো বেশ উঁচু, আরও অন্ধকার আর কড়া মেজাজের ; পেনাল কলোনির ধীর, বিষণ্ণ যন্ত্রণাবোধ ছিল চরম দুর্দশার নিখুঁতভাবে কুসুমিত হবার জায়গা । তাই এখন দেশের জেলগুলো, বজ্জাত পুরুষে ফেঁপে ওঠা, পোশাক কালচে, অনেকটা রক্তের মতন, যা কার্বনিক গ্যাস দিয়ে ভেজানো । ( আমি “কালচে” লিখেছি । দণ্ডিতদের পোশাক -- যারা ধরা পড়েছে, বিচারাধীন, এমনকি জেলবন্দিরাও, আমাদের নামকরণের জন্য যে শব্দগুলো বেছে নিয়েছে তা বেশ অভিজাত -- আমার ওপরে শব্দটা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে : পোশাকগুলো সাদাসিধে বাদামি রঙের ।) আমার হ্যাংলামি তাদের জন্য।  আমি জানি পেনাল কলোনি হোক বা দেশের কারাগার, তা প্রায়ই ব্যঙ্গাত্মক অনুকরণের মতন হয়।  আওয়াজ-করা ভারি কাঠের জুতোয়, শাস্তি-পাওয়া লোকগুলো সব সময়েই যেন ভার সামলাতে পারে না । মাল নিয়ে যাবার ঠেলাগাড়ির সামনে  হঠাৎ বোকার মতন ভেঙে পড়ে । কোনো পাহারাদারের উপস্হিতিতে ওরা মাথা নামায়, আর হাতে ধরে থাকে খড়ের তৈরি রোদ থেকে মাথা বাঁচাবার বড়ো টুপি -- যা কমবয়সীগুলো সাজিয়ে নেয় ( আমার তাই মনে হয়েছে ) পাহারাদারের অনুমতি-দেয়া চুরি করা গোলাপফুলে -- কিংবা বাদামি কাপড়ের বেরেটুপি। ওরা হতভাগা, বিনয়ের অভিনয় করে । যদি তাদের মারধর করা হয়, তাদের মগজে কোনো ব্যাপার নিশ্চয়ই কঠিন আকার নেবে : যারা ভিতু, তারা গুটিসুটি কেটে পড়ে, ভয় পাওয়া, কেটে পড়া, এগুলো হলো -- যখন সবচেয়ে কঠিন অবস্হায় রাখা হয়, বিশুদ্ধ ভয় আর কেটে পড়া-- তাদের শক্ত করে তোলা হয় “সুসিক্ত” করার মাধ্যমে, যেমন নরম লোহাকে শক্ত করা হয় সুসিক্ত করা হয় । এসব সত্বেও তারা চাটুকারিতা বজায় রাখে । যদিও আমি বিকলাঙ্গ আর দুর্ঘটনাগ্রস্তদের দুরছাই করি না, যারা সুপুরুষ অপরাধী,  আমার নমনীয়তা তাদের আকর্ষণ করে ।

     

    অপরাধ, আমি নিজেকে বললুম, পিলোরগে বা অ্যাঞ্জেল সান-এর মতন নিখুঁত সফলদের গড়ে তোলার আগে তাকে বহুকাল অপেক্ষা করতে হয় । তাদের সংহার করার আগে ( শব্দটা নিষ্ঠুর ) জরুরি হলো একযোগে কিছু ঘটনার সংশ্লেষ : তাদের মুখের সৌন্দর্য, তাদের দেহের শক্তি আর সৌষ্ঠব আর তার সঙ্গে যোগ করতে হবে অপরাধ সম্পর্কে তাদের প্রবৃত্তি, পরিস্হিতি যা অপরাধীকে গড়ে তোলে, অমন অদৃষ্ট বেছে নেবার নৈতিক প্রাণশক্তির ধারণক্ষমতা, আর সব শেষে, শাস্তি, তার নিষ্ঠুরতা, স্বকীয় বৈশিষ্ট্য যা একজন অপরাধীকে তাতে গৌরবান্বিত বোধ করার অধিকার দ্যায়, আর, এই সমস্ত কিছু ছাপিয়ে, অন্ধকারের এলাকাগুলো । নায়ক যদি রাতের সঙ্গে লড়াই করে জিতে যায়, তাহলে তার কাছে থেকে যায় বিজয়ের টুকরো-টাকরা ! সেই একই সংশয়, খোশমেজাজ পরিস্হিতির একই কেলাসন, একজন খাঁটি গোয়েন্দার সফলতাকে দিশানির্দেশ দ্যায় । আমি উভয়কেই সন্মান করি । কিন্তু আমি তাদের অপরাধকে ভালোবাসি, তার জন্য যে শাস্তি বরাদ্দ, “সেই পেনালটি” ( আমার মনে হয় না তারা এর আগাম আঁচ করেনি। তাদের একজন, প্রাক্তন মুষ্ঠিযোদ্ধা লেডো, হাসিমুখে তদন্তকারীদের জবাব দিয়েছিল : “আমার অপরাধগুলো ? সেগুলো করার আগে হয়তো আমি তা নিয়ে অনুতাপ করতুম” ) যাতে আমি তাদের সঙ্গে যেতে চাই , যাইই হয়ে যাক না কেন, আমার ভালোবাসা উপচে পড়বে।

     

    এই জার্নালে আমি অন্য কারণগুলো লুকোতে চাই না, যা আমাকে চোর বানিয়েছে, সবচেয়ে সহজ কারণ হলো ক্ষুধা, যদিও দ্রোহ, তিক্ততা, ক্রোধ কিংবা তেমন ধরণের ভাবপ্রবণতা আমার বাদবিচারে ঢোকেনি । গোঁড়ামিভরা যত্নে, “ঈর্ষান্বিত যত্নে”, আমি আমার দুঃসাহসিক অভিজানের খাতিরে নিজেকে গড়ে তুললুম, যেমনভাবে কেউ তার বিছানা বা ঘরকে ভালোবাসাবাসির আগে সাজায় ; অপরাধ করার  জন্য আমি ছিলুম গরম । আমার উত্তেজনা হলো এক থেকে আরেক জনের মাঝে দোল খাওয়া । তাকে বাতিল করে আমার যে কতো বড়ো ক্ষতি হয়েছে তা আমি গোপনে আবার কল্পনা করি, নিজের অন্তরে আর কেবল একা নিজের জন্য, গিয়ানার পেনাল কলোনির চেয়েও পঙ্কিল এক পেনাল কলোনি। আমি বলব যে দেশের কারাগারগুলোকে বলা চলে “ছায়াময়”। পেনাল কলোনিতে রয়েছে চড়া রোদে। সেখানে সবকিছু ঘটে নিষ্ঠুর আলোতে,  যাকে  আমি প্রাঞ্জলতার নিদর্শন হিসাবে বেছে নেয়া ছাড়া আর কিছু বলতে পারব না ।

     

    আমি সেই সাহসকে হিংস্রতার নাম দেবো,  যা অলস হয়ে অপেক্ষা করছে আর বিপদের অঙ্কশায়ী । তা দেখা যেতে পারে এক চাউনিতে, হাঁটাচলায়, এক হাসিতে, আর তোমার মধ্যেই যা আছে তা ফলত মুচড়ে ওঠে । তা তোমাকে কাবু করে ফ্যালে । হিংস্রতা হলো এক প্রশান্তি যা তোমাকে বিপর্যস্ত করে । বলাবলি করা হয় : “লোকটার আভিজাত্য আছে !” পিলোরগের অপলকা বৈশিষ্ট্য ছিল উদ্দাম হিংস্রতার । স্তিলিতানোর একটি মাত্র হাতের হিংস্রতার অভিসন্ধি, স্রেফ টেবিলের ওপরে রাখা, স্হির, নীরবতাকে বিঘ্নিত করেছে আর তা বেশ বিপজ্জনক । আমি চোরেদের আর কুটনিদের সঙ্গে কাজ করেছি, যাদের কর্তৃত্ব আমাকে তাদের ইচ্ছের কাছে ঝুঁকিয়েছে, কিন্তু কয়েকজনই সত্যিকারের সাহসী হিসাবে প্রমাণ করতে পেরেছে নিজেদের, তাদের মধ্যে যে জন সবচেয়ে বেশি সাহসী ছিল -- গি -- সে ছিল হিংস্রতাহীন । স্তিলিতানো, পিলোরগে আর মিশাই ছিল ভিতু । জাভাও তাই । এমনকি যখন বিশ্রাম নিচ্ছে, স্হির আর হাসিমুখ, তাদের চোখে, নাকের ফুটোতে, হাঁ-মুখে, হাতের তালুতে আর হাতে ধরা পড়তো, ফুলে ওঠা ঝুড়ি, সোয়েটার কিংবা ডেনিমের তলায় পেশির নিষ্ঠুর ঢিবি, এক উজ্বল আর নিরানন্দ ক্রোধ, দেখে মনে হতো আবছায়া।

    কিন্তু, প্রায় সব সময়েই, ব্যাপারটাকে  চিহ্ণিত করার মতো কিছু নেই, স্বাভাবিক ইঙ্গিতের অনুপস্হিতি ছাড়া । রেনের মুখ প্রথম দর্শনে মনোরম । ওর নিচু বেঁকা নাক দেখে মনে হতো যেন চতুর দুর্বৃত্ত, যদিও ওর মুখের সীসার মতন ফ্যাকাশে উদ্বেগ তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলবে ।  ওর চোখদুটো ক্ষর, ওর ঘোরাফেরা শান্ত আর অসন্দিগ্ধ । স্নানের ঘরে ও ঠাণ্ডা মাথায় সমকামীদের পিটুনি দ্যায় ; তাদের পোশাক তল্লাসি করে, যা পায় কেড়ে নেয়, অনেক সময়ে, শেষ বার্তা হিসেবে, গোড়ালি দিয়ে পোঁদে লাথি মারে । আমি ওকে পছন্দ করি না, কিন্তু ওর ঠাণ্ডা মেজাজ আমাকে ওস্তাদি শেখায় । ও গভীর রাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে, পেচ্ছাপখানা, বাগান, ঝোপঝাড়, শঁজে লিজের গাছের তলায়, স্টেশনগুলোর কাছে, পোর মাইলোতে, বোয় দ্য বুলোনে ( সব সময়ে রাতের বেলায় ) এমন এক গাম্ভীর্য নিয়ে থাকে যা থেকে কল্পনাপ্রবণতা একেবারে বাদ । যখন ও ফেরে, ভোর দুটো বা তিনটের সময়ে, আমার মনে হয় আমি দুঃসাহসিক অভিযানে ফুলেফেঁপে উঠেছি । ওর দেহের প্রতিটি অঙ্গ, যা নিশাচরের, ওর কাজে অংশ নেয় : ওর হাত, ওর বাহু, ওর পা , ওর ঘাড়ের পেছন দিক । কিন্তু ও, এই সমস্ত বিস্ময় সম্পর্কে অনবহিত, আমাকে সেগুলো সম্পর্কে সোজাসুজি  বলে । পকেট থেকে বের করে আঙটি, বিয়ের আঙটি, ঘড়ি, সন্ধ্যাবেলাকার লুটের মাল। একটা বড়ো কাচের পাত্রে রাখে যা তখনই ভরে উঠবে । রাস্তায় পায়ুকামীদের বা তাদের কাজ কারবার দেখে ও অবাক হয় না, তা বরং ওর কাজকে সাহায্য করে । ও যখন আমার বিছানায় বসে, আমি উৎকর্ন হয়ে উঠি, ওর অভিযানের টুকরো টাকরা শোনার জন্য : জাঙিয়া পরা একজন অফিসার যার মানিব্যাগ ও চুরি করেছিল সে তার আঙুল তুলে চিৎকার করেছিল : “বেরিয়ে যাও !” রেনে ব্যাটা বিজ্ঞের উত্তর : “তুই কি মনে করিস তুই সৈন্যবাহিনীর কেউ ?” বুড়ো লোকের খুলিতে একখানা কড়া ঘুষি । সে লোকটা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল যখন রেনে, বেশ উত্তেজিত, দেরাজ খুলে একগাদা মরফিনের শিশি পেয়েছিল । অনেক গল্প, যেমন, যে সমকামীর পয়সাকড়ি ছিল না আর যাকে ও নিজের সামনে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছিল । আমি এইসব ঘটনা শুনি বেশ একাগ্র হয়ে । আমার অ্যান্টওয়ের্পের জীবন মজার হয়ে ওঠে, ঋজু দেহের কাঠামোয়, আমার পুরুষালি ধরনধারন অনুযায়ী । আমি রেনেকে উৎসাহ দিই, আমি ওকে পরামর্শ দিই, ও আমার কথায় কান দ্যায় । আমি ওকে বলি যে নিজে প্রথমে কথা বলবে না । “লোকটাকে তোমার কাছে আসতে দাও, তাকে ঝুলিয়ে রাখো । অবাক হবার ভান করো, যখন সে বলবে, নাও করো। কার কাছে বোবা সাজতে হবে তা আঁচ করে নিও ।”

    প্রতি রাতে আমি তথ্যের অংশবিশেষ যোগাড় করি । আমার কল্পনা তাতে হারিয়ে যায় না । আমার উত্তেজনার কারন আমি নিজের মধ্যে শিকার আর অপরাধী উভয়ের ভূমিকা খুঁজে পাই। সত্যি বলতে কি, আমি নিঃসরণ করি, রাতের বেলায় আমি আমার থেকে পয়দা হওয়া শিকার আর অপরাধীকে উদ্ভাবন করি ; আমি তাদের দুজনকে একই জায়গায় আনি, আর সকালের দিকে আমি জানতে পেরে উৎফুল্ল হই যে শিকার মৃত্যুদণ্ডের আদেশের মুখে পড়েছিল আর অপরাধীকে পাঠানো হচ্ছিল পেনাল কলোনিতে বা আরেকটু হলে গিলোটিনে চাপানো হচ্ছিল । এই ভাবে আমার উত্তেজনা আমার এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, যা গিয়ানার পেনাল কলোনি ।

    ওরা না চাইলেও, এই লোকগুলোর ভাবভঙ্গী আর নিয়তি ঝঞ্ঝাময় । তাদের আত্মা এমন হিংস্রতা সহ্য করে যা তারা চায়নি আর যাকে তারা মানিয়ে নিয়েছে । যাদের স্বভাবগত পরিবেশ হিংস্রতার, অথচ তারা নিজেদের কাছে সহজ-সরল । এই দ্রুত আর ধ্বংসাত্মক জীবনকে যে গতিবিধিগুলো গড়ে তোলে তা সরল আর সরাসরি, একজন নামকরা নকশাকারের আঁকা রেখার মতন পরিষ্কার -- কিন্তু যখন রেখাগুলো চলন্ত অবস্হার মুখোমুখি হয়, তখনই ঝড় ওঠে, বিদ্যুতে তারা মারা পড়ে কিংবা আমি বিপদে পড়ি । তবু, তাদের হিংস্রতার সঙ্গে আমার হিংস্রতার কীই বা তুলনা, যার মানে তাদের হিংস্রতাকে মেনে নেয়া, তাকে আমার করে তোলা, তাকে আমার ইচ্ছে অনুযায়ী গড়ে নেয়া, তাকে থামিয়ে দেয়া, তাকে ব্যবহার করা, তাকে আমার ওপরে চাপিয়ে নেয়া, তাকে জানা, তাকে অনুমান করা, তার অনিষ্টপাতকে অনুধাবন আর উপলব্ধি করা ? কিন্তু যা আমার ছিল, আমার আত্মরক্ষার জন্য অভিলাষিত আর জরুরি, আমার বলিষ্ঠতা, আমার অনমনীয়তা, তাদের হিংস্রতার তুলনায়, যা তারা একটা অভিশাপের মতন পেয়েছে, যুগপৎ অন্তরজগতের আগুন আর বহির্জগতের আলো, যা তাদের পুড়িয়ে ছারখার করে আর আমাদের উদ্ভাসিত করে ? আমরা জানি যে তাদের অভিযানগুলো বালকসুলভ । তারা নিজেরা মূর্খ । তারা তাস খেলার হারজিত নিয়ে খুন করার জন্য বা খুন হবার জন্য তৈরি থাকে, যখন একজন প্রতিপক্ষ -- কিংবা তারা নিজেরা -- জোচ্চুরি করছিল । তা সত্বেও, অমন লোকেদের ধন্যবাদ, বিয়োগাত্মক ঘটনা সম্ভব হয় ।

    এই ধরণের সংজ্ঞা -- বহু পরস্পরবিরোধী উদাহরণ দিয়ে -- হিংস্রতা সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করছি।  আমি এমন শব্দ প্রয়োগ করব না কোনো ঘটনার নায়ককে তুলে ধরার খাতিরে, বরং তারা আমার সম্পর্কে কিছু  বলুক । আমাকে বুঝে ওঠার জন্য, কুকর্মে পাঠকের অংশগ্রহণ জরুরি । তবু আমি তাকে সতর্ক করে দেবো যখনই আমার ভাবোচ্ছাস আমার পদক্ষেপকে টলমলে করে তোলে ।

    স্তিলিতানো ছিল দীর্ঘদেহী আর পালোয়ান । ওর চলনভঙ্গী ছিল একযোগে নমনীয় আর গোদা, প্রাণবন্ত আর ঢিমেতালে, সর্পিল ; লোকটা ছিল চটুল । আমার ওপরে ওর ক্ষমতার বেশির ভাগ -- আর বারিও চিনোর বেশ্যাদের ওপর -- কারণ হলো এক গাল থেকে আরেক গালে চালান করা ওর মুখের লালা, যা ও অনেকসময়ে হাঁ-মুখের সামনে আনতো পরদা টানার মতন । “কিন্তু কোথা থেকে এতো থুতু যোগাড় করে,” আমি নিজেকে জিগ্যেস করতুম, “কোথা থেকেই বা আনে? আমার তো কখনও ওর মতন তেলালো আর রঙিন হবে না । তা হবে পাকানো কাচের মতন মামুলি, স্বচ্ছ আর অপলকা ।” আমার পক্ষে কল্পনা করা স্বাভাবিক ছিল যে ওর লিঙ্গটা কেমন হবে যদি আমার সুবিধার জন্য তাতে অমন সুন্দর একটা জিনিস মাখায়, ওই দামি মাকড়সার তন্তু, এমন এক পাতলা-জাল যা আমি গোপনে প্রাসাদের আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করেছি । ও একটা পুরোনো ধূসর টুপি পরতো যার সামনে দিকটা ভাঙা । যখন ও সেটা আমাদের ঘরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলতো, তা হঠাৎ হয়ে উঠতো যেন বেচারা কোনো ডানা কাটা মরা পায়রার মতন, কিন্তু যখন ও ওটা পরে নিতো, কান পর্যন্ত টেনে নামিয়ে, টুপির অন্য কিনারাটা ওপর দিকে উঠে যেতো আর দেখা যেতো ওর গৌরবান্বিত সোনালি চুল । ওর উজ্বল চোখের কথা যদি বলতে হয়, নম্রভাবে নামানো -- তবু স্তিলিতানো সম্পর্কে বলতে হবে : “ওর হাবভাব অবিনয়ী” -- যার ওপরে চোখ বন্ধ হয়ে আসতো আর চোখের পাতা এতো সোনালি, এতো উজ্বল আর ঘন, যে তা সন্ধ্যার ছায়া আনতো না বরং নিয়ে আসতো শয়তানের ছায়া। মোটের ওপর, কী মানে হয় যখন একটা দৃষ্টি আমাকে বন্দরের কাছে টলমলিয়ে দ্যায়, আমি দেখি জাহাজের পাল, একটু একটু করে, থেকে-থেকে, ছড়িয়ে পড়ে আর মাস্তুলের ওপর পর্যন্ত কষ্ট করে উঠে যায়, প্রথমে ইতস্তত, তারপর সুসংকল্পিত, যদি এই বিচলনগুলো স্তিলিতানোর প্রতি আমার প্রেমের বিচলনের প্রতীক না হয় তাছাড়া আর কীই বা হবে ? ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল বারসেলোনাতে । ও ভিখারি, চোর, পরী আর বেশ্যাদের জমঘটে বসবাস করছিল। ও ছোল সৌম্যকান্তি, কিন্তু এটা দেখার ছিল যে আমার অধঃপতনের সঙ্গে ওর সৌন্দর্যের কতোটা যোগাযোগ । আমার পোশাক ছিল নোংরা আর ছেঁড়া । আমি ছিলুম শীতে কাতর আর ক্ষুধার্ত। এই সময়টা ছিল আমার জীবনে সবচেয়ে দৈন্যপীড়িত ।

    ১৯৩২. স্পেন সে সময়ে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল ইঁদুর-ছুঁচোয়, তার ভিখারিতে । তারা গ্রাম থেকে গ্রামে যেতো, আন্দালুসিয়াতে কেননা জায়গাটা উষ্ণ, ক্যাটালোনিয়াতে কেননা জায়গাটা ধনী অধ্যুষিত, কিন্তু পুরো দেশটা ছিল আমাদের জন্য অনুকূল । ফলে আমি ছিলুম একটা উকুন আর সে ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলুম । বারসেলোনাতে আমরা কালে মেদিওদিয়া আর কালে কারমেন-এ ঘুরে বেড়াতুম । অনেক সময়ে আমরা বিনা চাদরের বিছানায় ছয়জন শুতুম, আর সকালে উঠে বাজারে যেতুম ভিক্ষা করার জন্য । আমরা দল বেঁধে বারিও চিনো ছাড়তুম আর ছড়িয়ে পড়তুম প্যারালেলোতে, হাতে বাজারের সাজি নিয়ে, কেননা বাড়ির বউরা পয়সার বদলে একটা পেঁয়াজ বা শালগম দিতেন । দুপুরে আমরা ফিরতুম, আর কুড়িয়ে বাড়িয়ে পাওয়া সবজি দিয়ে সুপ বানাতুম । ইঁদুর-ছুঁচোর জীবনের কথাই বলব । বারসেলোনাতে আমি পুরুষদের জুটি দেখতে পেতুম যার দুজনে মধ্যে একজনের ভালোবাসা বেশি সে অন্যজনকে বলত:

    “আজকে সকালের সাজিটা আমি নিয়ে যাবো।”

    সে তুলে নিয়ে বেরিয়ে যেতো । একদিন সালভাদোর আমার হাত থেকে সাজিটা আলতো করে টেনে নিয়ে বলল, “আমি তোমার হয়ে ভিক্ষা চাইতে যাবো।”

    বাইরে তুষার পড়ছিল । ও বরফজমা ঠাণ্ডা রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল, ছেঁড়া আর ফর্দাফাঁই জ্যাকেট পরে -- পকেটগুলো ছেঁড়া আর ঝুলন্ত -- আর তেলচিটে ময়লায় অনমনীয় শার্ট । ওর মুখটা ছিল গরিব আর দুঃখি, ছলনাভরা, ফ্যাকাশে আর নোংরা, কেননা ঠাণ্ডার দরুন আমরা কখনও ধুতুম না । দুপুরবেলায়, ও সবজি নিয়ে ফিরলো আর কিছুটা চর্বি । এখানে আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করব এক ধরণের ক্ষতের দিকে -- ভয়াবহ, কেননা বিপদ সত্বেও আমি উত্তেজিত করে দিতে পারতুম -- যার মাধ্যমে আমার সামনে মেলে ধরা হতো সৌন্দর্য । আর তীব্র -- ভাতৃসুলভ -- ভালোবাসা আমার দেহকে তাতিয়ে তুললো আর টেনে নিয়ে গেলো সালভাদোরের কাছে । ওর পেছন পেছন হোটেল ছেড়ে, আমি ওকে দেখতুম একজন মহিলাকে মিনতি করছে । আমি ফরমুলাটা জানতুম, কেননা আমি নিজের জন্য আর অন্যের জন্য ভিক্ষা করেছি : এতে খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে হিতৈষিতা মিশ খায় ; ঈশ্বরের সঙ্গে গরিব লোকটাকে মেলায় ; ব্যাপারটা হৃদয় থেকে বেরোনো এমন এক নিরহঙ্কার যে আমার মনে হয় তা থেকে সরাসরি সুগন্ধের প্রকাশ ঘটে, ভিখারির হালকা শ্বাস যে তা উচ্চারণ করে । সারা স্পেন জুড়ে সে-সময়ে ওরা বলতো: 

    “ঈশ্বরের জন্য।”

    ওর কথা শুনতে না পেলেও, আমি বুঝতে পারতুম যে প্রতিটি দোকানে, প্রতিটি গৃহবধূর কাছে এই কথাটাই ওগরাচ্ছা সালভাদোর । কোটনারা যেমন নিজেদের বেশ্যার দিকে নজর রাখে আমি ওর ওপর নজর রাখতুম, কিন্তু হৃদয়ে ওর জন্য কোমলতা পুষে ! এইভাবে, স্পেন আর আমার ভিখারির জীবন আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো অপমানের মহিমার সঙ্গে, কেননা তার জন্য দরকার ছিল গর্ববোধ ( অর্থাৎ, ভালোবাসার ) ওই সমস্ত নোংরা, ঘৃণ্য প্রাণীদের সুশোভিত করার জন্য । দরকার ছিল কর্মদক্ষতার, যা আমি একটু-একটু করে হাসিল করলুম । যদিও তোমাকে এর কায়দা আমি ঠিকমতন বলতে পারবো না, অন্তত এটুকু বলতে পারি যে আস্তে আস্তে আমি নিজেকে বাধ্য করলুম এই দুস্হ জীবনকে স্বেচ্ছাকৃত প্রয়োজনীয়তা হিসাবে মেনে নিতে । ব্যাপারটা যা আমি ঠিক তাই মেনে নেওয়া ছাড়া আর কিছু ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করিনি, আমি একে উঁচুতে তুলিনি, মুখোশ পরাইনি, বরং উল্টোটা, আমি এর অপরিচ্ছন্নতাকে হুবহু সত্যাপন করতে চেয়েছি, আর সবচেয়ে নোংরা নিদর্শনগুলো আমার কাছে হয়ে উঠলো জাঁকজমকের নিদর্শন ।

    এক সন্ধ্যায়, আমি আতঙ্কিত বোধ করলুম, যখন পুলিশের হানার পর আমার খানাতল্লাস করা হচ্ছিল -- আমি সেই সময়ের কথা বলছি যা এই বইয়ের শুরুতে লেখা ঘটনাগুলোর আগের -- অবাক গোয়েন্দা আমার পকেট থেকে টেনে বের করলো, অন্যান্য টুকিটাকির মধ্যে, ভেসলিনের একটা টিউব । আমরা এটা নিয়ে ঠাট্টা করতুম কেননা ভেসলিনটা ছিল মেনথল দেয়া । পুরো নথি দপতর, সেই সঙ্গে আমিও, যদিও কষ্ট করে, এইভাবে হাসিতে মুচড়ে উঠলুম :

    “তুমি এটা নাকে শোঁকো ?”

    “দ্যাখো, তোমায় আবার না সর্দিকাশিতে ধরে । তুমি তোমার জুড়িকে হুপিং কাফ দিয়ে ফেলবে।”

    আমি ভাসা-ভাসা অনুবাদ করলুম, প্যারিসের একজন জোচ্চোরের ভাষায়, সুস্পষ্ট আর বিষাক্ত স্প্যানিশ প্রবাদের বিদ্বেষপরায়ন বিড়ম্বনাটুকু । ব্যাপারটা একটা ভেসলিন টিউবের যার পেছন দিকটা মোড়া ছিল । যার মানে দাঁড়ায় যে তা ব্যবহার করা হয়েছে । পুলিশ হানায় পুরুষদের পকেট থেকে যে সমস্ত চমৎকার টুকিটাকি বের করা হয়েছিল, এটা ছিল তার মধ্যে অপমানের নিখুঁত প্রতীক, যা বেশ সাবধানে লুকিয়ে রাখা হয়, তবু তা গোপন মহিমার চিহ্ণ, যা আমাকে পরে অবমাননা থেকে বাঁচিয়েছে । যখন আমাকে লকআপে পোরা হলো, আর আমি আমার তেজোময়তা ফিরে পেলুম যাতে গ্রেপ্তারির দুর্ভাগ্য কাটিয়ে উঠতে পারি, ভেসলিনের টিউবের ছবিটা আমাকে ছেড়ে যায়নি । পুলিশের লোকটা আমাকে ওটা বেশ ক্রুরভাবে দেখিয়েছিল, যাতে তারা তাদের প্রতিশোধস্পৃহায়, ঘৃণায়, অবমাননায় আহ্লাদে আটখানা হতে পারে । কিন্তু, দ্যাখো দ্যাখো ! সেই নোংরা, অপকৃষ্ট জিনিসটা যার উদ্দেশ্য দুনিয়ার কাছে মনে হয়েছিল -- পৃথিবীর ওই প্রতিনিধি জমঘটের কাছে যা কিনা পুলিশের দল আর, তাছাড়া, ওই বিশেষ পুলিশের স্প্যানিশ দলটা, মুখে রসুনের দুর্গন্ধ, গায়ে ঘাম আর তেলের, কিন্তু দেখতে শাঁসালো, পেশি বেশ পালোয়ানি আর নিজেদের নৈতিক চালচলনে অটল -- অত্যন্ত জঘণ্য, আমার কাছে হয়ে উঠলো বেশ মহার্ঘ । যেসব জিনিস আমার কোমলতাকে ফাঁস করে তাদের থেকে আলাদা, এই জিনিসটা মোটেই অলৌকিক মহিমাদীপ্ত ছিল না ; তা পড়ে রইলো টেবিলের ওপরে ভেসলিনের ধূসর টিউব হয়ে, ভাঙা আর বিবর্ণ, যার বিস্ময়কর বিচক্ষণতা, আর কারাগারের মহাফেজখানায় মামুলি জিনিসপত্রের সঙ্গে তার অত্যাবশ্যক সংগতি ( বেঞ্চ, কালির দোয়াত, নিয়মের বই, মাপার স্কেল, দুগন্ধ ), সাধারণ উদাসীনতার মাঝে, আমাকে মর্মপীড়িত করতে পারতো, যদি না টিউবের ভেতরের মাল আমাকে মনে করিয়ে দিতো একটা তেলের কুপির কথা ( হয়তো তার প্রাণবন্ত বৈশিষ্ট্যের জন্য ), রাতের বেলায় একটা কফিনের পাশে রাখা।

    তা বর্ণনা করার জন্য, আমি আরেকবার একটা ছোটো লক্ষ্যবস্তু গড়ে তুলি, কিন্তু এই ছবিটা তাতে ঢুকে পড়ে : ল্যাম্পপোস্টের তলায়, যে শহরে বসে আমি লিখছি, একজন বুড়ির ম্লান মুখ, গোল, ছোটো, চাঁদের মতন, খুবই ফ্যাকাশে ; বলতে পারছি না আমি দুঃখ পেয়েছিলুম নাকি ভণ্ড সেজেছিলুম । বুড়ি এগিয়ে এলো আমার দিকে, বলল যে ও ভীষণ গরিব আর কিছু পয়সা চাইলো। ওই চাঁদামাছের মতন মুখের ভদ্রতা আমাকে তক্ষুনি বলল : বুড়িটা এখনই কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছে ।

    “বুড়িটা চোর”, আমি নিজেকে বললুম । আমি যখন ওর কাছ থেকে চলে যাচ্ছি, এক ধরণের  তীব্র ভাবাবেশ, আমার অন্তরের গভীরে ঘুমিয়ে, আর তা আমার মনের কিনারায় নয়, আমাকে ভাবতে প্ররোচিত করল যে হয়তো বুড়িটা আমার মা যার সঙ্গে আমার এখন দেখা হলো । আমি তাঁর সম্পর্কে কিছুই জানি না যিনি আমাকে দোলনায় ফেলে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু আশা করলুম যে রাতের বেলায় যে ভিক্ষা চাইছিল সেই বুড়িই আমার মা ।

    “যদি তিনিই হতেন তাহলে কী হতো?” আমি বুড়ির থেকে দূরে যেতে যেতে ভাবতে লাগলুম । ওহ! যদি তাই হতো, আমি ওনাকে ফুলে ঢেকে দিতুম, গ্ল্যাডিওলি আর গোলাপে, আর চুমু দিয়ে ! ওই চাঁদ-মাছ চোখের ওপরে আমি আবেগপ্রবণ হয়ে ফোঁপাতুম, ওই গোল, বোকা মুখের ওপরে ! “কিন্তু কেন”, আমার ভাবনা এগিয়ে চললো, “ কেনই বা তা নিয়ে কাঁদবো?” আবেগপ্রবণতার এই গতানুগতিক ছাপ আমার মগজ থেকে সরে যেতে বেশিক্ষণ লাগলো না, তার জায়গায় অন্য ব্যাপার এলো, সবচেয়ে নোংরা আর নিকৃষ্ট, যাকে আমি মর্মার্থের ক্ষমতা দিলুম চুমুর, কিংবা কান্নার কিংবা ফুলের ।

    আমি ভাবলুম, “আমি ওনার কাঁধে মাথা রেখে আবোলতাবোল বলতে পারলে আনন্দিত হবো”, ভেসে যাবো ভালোবাসায় ( এক্ষুনি যে গ্ল্যাডিওলি ফুলের কথা বলেছি তা কি বাচ্চার লালার কথা মনে পড়ায় ? )। ওনার চুলেতে লালা ফেলবো কিংবা ওনার হাতে দুধ ওগরাবো । কিন্তি আমি সেই চোরকে আদর করতে চাইবো যা আমার মা ।

    ভেসলিনের টিউব, যা আমার লিঙ্গকে তেলালো করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করি কিংবা আমার প্রেমিকদের লিঙ্গ, তাঁর মুখ মনে পড়িয়ে দিল যিনি, এক স্বপ্নবিহ্বলতার সময়ে যা শহরের অন্ধকার গলিতে ঘোরাফেরা করতো, তিনি ছিলেন মায়েদের মধ্যে সবচেয়ে অভীষ্ট । তা আমাকে আমার গোপন আনন্দগুলোর জন্যে গড়েপিটে তৈরি করেছিল, এমন সমস্ত জায়গায় যা অসম্বদ্ধ তুচ্ছতার, যা হয়ে উঠেছিল আমার খেয়ালখুশির শর্ত, এই যেমন আমার বীর্যের ছিটেফোঁটা লাগা রুমাল প্রমাণ করে । টেবিলের ওপরে শুয়ে, তা ছিল পুলিশের বিরুদ্ধে আমার ওড়ানো অদৃশ্য বিজয়কেতন । কারাগারের এক কুঠুরিতে । আমি জানতুম যে আমার ভেসলিনের টিউবটা সারারাত ধরে অপমানের মুখে পড়বে -- চিরকালীন উপাসনার উলটো ব্যাপার -- একদল সশক্ত, সৌম্যকান্তি, খসখসে কন্ঠে পুলিশের । এমনই তারা পালোয়ান যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল লোকটা সবকয়টা আঙুল মোচড়ায়, তা থেকে ফেটে বেরোবে, প্রথমে একটা ঠুসকি পাদ, ক্ষণিক আর পচা, গঁদের একটা ফিতে বেরিয়ে আসতে থাকবে হাস্যকর নৈঃশব্দে । যাই হোক, আমি জানতুম যে এই ছোটো আর বিনয়ী বস্তুটা ওদের বিরুদ্ধে নিজেই লড়ে যাবে ; তার সামান্য উপস্হিতি দিয়ে পৃথিবীর সমস্ত পুলিশকে বেশ চটিয়ে ফেলতে পারবে ; জিনিসটা নিজের দিকে টেনে আনবে অপমান, ঘৃণা, শাদা আর বোবা ক্রোধ । হয়তো জিনিসটা সামান্য বিদ্রুপ করবে-- বিয়োগান্ত নায়কের মতন যে দেবতাদের চটিয়ে মজা পায় -- তার মতনই অবিনাশী, আমার আনন্দে আত্মসমর্পিত, আর গর্বিত । আমি ফরাসি ভাষার নতুন শব্দে গান গাইতে চাইবো । কিন্তু আমি তার জন্য লড়তেও রাজি, তার সন্মানে সর্বসংহারের অনুষ্ঠান করতেও রাজি আর কোনো একটা গ্রামকে গোধুলীবেলায় লাল নিশান দিয়ে সাজিয়ে তুলতে চাইবো ।

    কোনো নৈতিক কাজের সৌন্দর্য নির্ভর করে তার প্রকাশ করার মধ্যে । একথা বলা যে এই জিনিসটা সুন্দর তার মানে হলো যে তা সত্যিই সুন্দর । তাকে প্রমাণ করে দেখাতে হবে । এটা হলো ছবির করণীয় কাজ, অর্থাৎ, বাস্তব জগতের প্রভার সঙ্গে তার একাত্মতা । কাজটা সুন্দর হবে যদি তা প্ররোচিত করে, আর আমাদের কন্ঠে বিকশিত হয়, গান । অনেক সময়ে যে চেতনার সাহায্যে আমরা একটা বিখ্যাত কুকর্মের কথা ভেবেছি, প্রকাশ করার ক্ষমতার জন্য জরুরি তাকে জ্ঞাপন করা, আমাদের গান গাইতে বাধ্য করা । এর মানে হলো প্রতারণা ব্যাপারটা সুন্দর হবে যদি তা আমাদের দিয়ে গান গাওয়ায় । চোরদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে তা যে আমাকে আবার নৈতিক জগতে নিয়ে গিয়ে ফেলবে, তা নয়, আমি ভাবলুম, তার ফলে আমি আরেকবার নিজেকে সমকামীতার জগতে পাবো । আমার গায়ে যতো জোর বাড়ে, আমি আমার শুভ হয়ে উঠি । আমি হুকুম জারি করি। পুরুষদের ক্ষেত্রে সৌন্দর্য বলতে আমি বুঝি একটা মুখের আর শরীরের সমন্বয়পূর্ণ বৈশিষ্ট্য আর তার সঙ্গে অনেক সময়ে যোগ করতে হয় পুরুষালি চারুতা ।  সৌন্দর্যের সঙ্গে তখন যোগ হয় দুর্দান্ত সৌষ্ঠব, প্রবলপ্রতাপ আকার-ইঙ্গিত। আমরা মনে করি তারা নির্ধারিত হয় বিশেষ নৈতিক আচরণের মাধ্যমে, আর নিজেদের ভেতর তেমন সদগুণ চর্চা করে যা আমাদের শুকনো মুখ আর অসুস্হ শরীরকে সেই ওজস্বিতা দেবে যা প্রেমিকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে থাকে । হায়, এই সমস্ত সদগুণ, যা তাদের কখনও থাকে না, তা আমাদের দুর্বলতা ।

    এই যে আমি লিখতে বসেছি, আমি আমার প্রেমিকদের নিয়ে ভাবি । আমি তাদের আমার ভেসলিন মাখিয়ে দিতে চাইবো, সেই মোলায়েম, মিহি মেনথলগন্ধ জিনিসটা ; আমি চাইবো তাদের পেশিগুলো স্নান করুক স্বচ্ছ হালকা জিনিসটায় যেটা ছাড়া সবচেয়ে সৌম্যকান্তির সাধনীটিও কম প্রণয়োদ্দীপক ।

    যখন কোনো প্রত্যঙ্গ বাদ দেয়া হয়, বলা হয় যে অন্য অঙ্গটা তখন শক্তপোক্ত হয়ে বেড়ে ওঠে। আমি আশা করেছিলুম যে স্তিলিতানোকে যে হাতটা খোয়াতে হয়েছিল তার প্রাণক্ষমতা ওর লিঙ্গে একত্রিত হবে । অনেককাল যাবত আমি কল্পনা করেছি একজন সারবান সদস্যের, সোঁটার মতন, যা সবচেয়ে সাংঘাতিক অর্ন্তদৃষ্টির ক্ষমতা রাখে, অথচ যা আমাকে প্রথমে উৎসুক করলো তাহলো এই যে স্তিলিতানো আমাকে ব্যাপারটা জানতে দিলো : মামুলি ভাঁজের দাগ, যদিও আশ্চর্যজনকভাবে বাঁ পায়ে, ওর নীল ডেনিম ট্রাউজারে । এই ব্যাপারটা আমায় দুঃস্বপ্নে দেখা দিতো যদি না স্তিলিতানো উদ্ভট মুহূর্তগুলোয়, ওর হাত জায়গাটায় না রাখতো, আর যদি না ও, মহিলারা যেমন সৌজন্য দেখান, ভাঁজের দাগটা দেখিয়ে নখ দিয়ে কাপড়ের ওপর চিমটি কাটতো। আমার মনে হয় না ও কখনও আত্মাভিমান হারিয়েছে, কিন্তু আমার কাছে ও থাকতো বিশেষভাবে প্রশান্ত । নির্লজ্জের মতন হেসে, যদিও বেশ নিস্পৃহ, ওকে আমার আদর করার পানে চেয়ে থাকতো । আমি জানতুম ও আমাকে ভালোবাসবে ।

    হাতে সাজি নিয়ে সালভাদোর, আমাদের হোটেলের চৌহদ্দি পেরোবার আগে, আমি এমন উত্তেজিত বোধ করছিলুম যে রাস্তাতেই ওকে চুমু খেলুম, কিন্তু ও আমাকে ঠেলে এক পাশে সরিয়ে দিলো :

    “তোমার মাথা খারাপ ! লোকেরা ভাববে আমরা গাণ্ডু !”

    ও ফরাসিভাষা ভালোই বলতে পারতো, পেরিপিয়াঁয় আঙুর ক্ষেতে কাজ করার সময়ে শিখেছিল। গভীর আঘাত পেয়ে আমি পেছন ফিরলুম । ওর মুখ বেগুনি হয়ে উঠলো। ওর গায়ের রঙ ছিল শীতের বাঁধাকপির মতন । সালভাদোর হাসলো না । ও মর্মাহত হয়েছে টের পেলুম । “আমি এরকম ব্যবহারই পাই”, ও নিশ্চয়ই ভেবেছিল, “সাতসকালে উঠে তুষারের মধ্যে ভিক্ষা করার বদলে। ও জানেই না কেমন আচরণ করতে হয়।” ওর চুল ভিজে গিয়েছিল আর জটপাকানো। জানালার ভেতর থেকে, মুখগুলো আমাদের দিকে তাকাচ্ছিল, কেননা হোটেলের একতলায় একটা কাফে ছিল যা ফুটপাত পর্যন্ত প্রসারিত, যার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো ওপরের ঘরে যাবার জন্য। আস্তিনে মুখ পুঁছে সালভাদোর ভেতরে চলে গেলো । আমি ইতস্তত করছিলুম । তারপর ওর পেছন পেছন ঢুকলুম । আমার তখন কুড়ি বছর বয়স । যদি নাকের ডগায় একটা ফোঁটা চোখের জলের মতন অনাবিল হয় তাহলে কেনই বা তা একই আগ্রহে চেটে নেবো না ? আমি আগে থেকেই যথেষ্ট জড়িয়ে পড়েছিলুম নীচকুলোদ্ভবদের পুনর্বাসনে । যদি না বেয়াড়া সালভাদোরের ভয়ের ব্যাপার হতো, আমি কাফেতেই ওকে চুমু খেতে পারতুম । ও, যদিও, নাকের জল ফেলছিল, আমি বুঝতে পারলুম ও নিজের শ্লেষ্মা গিলছিল । হাতে সাজি নিয়ে, ভিখারি আর ভবঘুরে নিরাশ্রয়দের পাশ কাটিয়ে ও রান্নাঘরের দিকে এগোলো । আমার আগে-আগে ।

    “তোমার সঙ্গে ব্যাপারটা কি বলোতো ?” আমি বললুম ।

    “তুমি লোকেদের মনোযোগ আকর্ষণ করছ।”

    “তাতে দোষের কি?”

    “লোকে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ওইভাবে চুমু খায় না । আজ রাতে, তুমি যদি চাও…”

    ও ঠোঁট ফাঁক করে এমনভাবে কথাগুলো বললো মনে হলো তা কমনীয়তাহীন আর সেই সঙ্গে একইরকম অবজ্ঞার সুরে । আমি শুধু আমার কৃতজ্ঞতা জানাতে চেয়েছিলুম, আমার দারিদ্রের স্নেহে উষ্ণতা দিতে চেয়েছিলুম ।

    “কিন্তু তুমি কি ভাবছিলে ?”

    কেউ একজন ওর সঙ্গে ধাক্কা খেলো আর দুঃখ প্রকাশ করলো না, ওকে আমার থেকে আলাদা করে দিলো । আমি ওকে রান্নাঘরের ভেতর পর্যন্ত অনুসরণ করিনি ।আমি স্টোভের কাছে একটা ফাঁকা বেঞ্চে গিয়ে বসলুম । যদিও আমি সতেজ সৌন্দর্যের প্রশংসা করি, আমি এখন আর মাথা ঘামালুম না যে এই গেরস্হ ধরণের লোকটাকে ভালোবাসার জন্যে নিজেকে কেমনভাবে উপস্হিত করব ; এমনই এক দারিদ্র্যপীড়িত ভিখারি যার ওপর কম সাহসীরাও তর্জন-গর্জন করতে পারে, কেমন করেই বা ওর তেকোনা পাছাকে আদর করতে পারবো...আর যদি, দুর্ভাগ্যবশত, ওর সাধনীটা প্রণয়োদ্দীপক হয় ?

    বারিও চিনো জায়গাটা, সে-সময়ে, ছিল একধরণের আস্তানা যেখানে স্পেনের লোকেরা কম আর বিদেশিরা বেশি ভিড় করতো, তাদের সব কয়টা ছাঁটাই মাল । আমরা অনেকসময়ে কাগজি-বাদাম সবুজ পোশাক পরতুম কিংবা নার্সিসাস-হলুদ রেশমের শার্ট আর ছেঁড়া ক্যাম্বিশ জুতো, আর আমাদের চুল এমন পেছন দিকে চেকনাই দেয়া থাকতো যে মনে হতো তাতে চিড় ধরবে । আমাদের কোনো নেতা ছিল না বরং পরিচালক ছিল । আমি বলতে পারছি না কেমন করে তারা অমন ক্ষমতা পেলো । বোধহয় আমাদের সামান্য মালপত্রের ভালো দাম যোগাড় করতে পারতো বলে । ওরা আমাদের সমস্যার খেয়াল রাখতো আর কাজকারবারের ব্যাপারে খবর দিতো, তার জন্য ওরা মোটামুটি একটা অংশ নিতো । আমরা ঢিলেঢালা দল গড়িনি, কিন্তু সেই বিরাট নোংরা বিশৃঙ্খলায়, যে পরিবেশে তেলকুটে দুর্গন্ধ, পেচ্ছাপ আর গুয়ের ছড়াছড়ি, কয়েকজন বাজে আর ইতর লোক নিজেদের চেয়ে চালাক-চতুরদের ওপর বেশি নির্ভর করতো। কলুষ আর কল্মষ আমাদের যুবকদের সঙ্গে ঝিলমিলিয়ে উঠতো আর হাতেগোণা কয়েকজনের রহস্যময় প্রতিভা, যারা সত্যিই স্ফূলিঙ্গ ছড়াতো, যুবকেরা যাদের দেহ, চাউনি আর ইশারা-ইঙ্গিত এমন এক চৌম্বকশক্তিতে আকর্ষণীয় ছিল যে আমাদের করে তুলতো তাদের শিকারী । এই ভাবেই আমি ওদের একজনের দ্বারা টলে গিয়েছিলুম । এক হাতের স্তিলিতানো সম্পর্কে লেখার জন্য আমি কয়েক পৃষ্ঠা অপেক্ষা করবো । শুরুতেই বলে ফেলা যাক ওর কোনো খ্রিস্টধর্মী মূল্যবোধ ছিল না । ওর পুরো ধীশক্তির, ওর পুরো ক্ষমতার, উৎস ছিল ওর দুই উরুর ফাঁকে । ওর লিঙ্গ, আর যা তাকে সম্পূর্ণ করে, সম্পূর্ণ যন্ত্রপাতি, এতোই সুন্দর ছিল যে আমি তাকে সৃজক অবয়ব বলতে পারি । যে কেউ মনে করতে পারতো যে ও মরে পড়ে আছে, কেননা ও কদাচিৎ, আর বেশ ধীরেসুস্তে, উত্তেজিত হতো : ও কেবল দেখতো । অন্ধকারে ভালোভাবে বোতামদেয়া অবস্হায় ও নিষ্পাদনের জন্য তৈরি হতো, যদিও কেবল এক হাতে বোতাম পরানো, যে আলোকময়তায় জিনিসটার বাহক উজ্বল হয়ে উঠবে ।

    সালভাদোরের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছয় মাস বজায় ছিল । এটা সবচেয়ে মোহক ভালোবাসা ছিল না, ছিল বহুপ্রসূ ভালোবাসাগুলোর অন্যতম । আমি ওই অসুস্হ দেহ, ধূসর মুখ, আর কয়েকটা চুলের হাস্যকর দাড়ির লোকটাকে ভালোবাসার জন্য নিজেকে বাগ মানিয়ে নিয়েছিলুম । সালভাদোর আমার যত্ন করতো, কিন্তু রাতের বেলায়, মোমবাতির আলোয়, আমি হুকুন বাছতুম, আমাদের পোষা প্রাণী, যেগুলো বাসা বাঁধতো আমাদের ট্রাউজারের খাঁজে-খাঁজে । উকুনগুলো আমাদের সঙ্গে বসবাস করতো । আমাদের জামাকাপড়কে প্রাণবন্ত করতো, এক উপস্হিতি, আর যখন ওরা বিদায় নিতো, আমাদের পোশাক হয়ে যেতো প্রাণহীন । আমরা জানতে চাইতুম -- আর অনুভব করতে -- যে এই আধা-স্বচ্ছ পোকাগুলো ঝাঁক বেঁধে রয়েছে, যদিও পোষা নয়, ওগুলো আমাদের জীবনের এমন অংশ হয়ে গিয়েছিল যে তৃতীয় কোনো লোকের উকুন আমাদের বিতৃষ্ণা জাগাতো ।  আমরা ওগুলোকে তাড়াতুম কিন্তু দিনের বেলায় ভাবতুম ডিমগুলো থেকে কচি উকুন বেরিয়েছে । ওগুলোকে নখে পিষে মারতুম, কোনোরকম বিতৃষ্ণা আর ঘৃণা ছাড়াই । লাশগুলোকে ফেলে দিতুম না -- বা অবশিষ্টাংশ -- জঞ্জালে ; ওগুলোকে পড়ে যেতে দিতুম, আমাদের রক্তে রক্তাক্ত, আমাদের অপরিচ্ছন্ন জাঙিয়ায় । আমাদের উন্নতির একমাত্র প্রমাণ ছিল উকুনগুলো, উন্নতির পাতালের নিদর্শন, কিন্তু ব্যাপারটা যুক্তিযুক্ত ছিল এই কারণে যে আমাদের অবস্হা একটা অপারেশান করতে পারলো যা ন্যায্যতা প্রমাণ করে, যে আমরা, একই শর্তে, আমাদের অবস্হার চিহ্ণগুলোকে ন্যায্যতা দিচ্ছি । উকুনগুলো ছিল দামি, কেননা আমাদের অবসানের জরুরি জ্ঞানের জন্য এই মণিরত্নগুলোকে, বলা যেতে পারে, আমাদের বিজয় । তারা চিল একযোগে আমাদের গৌরব ও লজ্জা । আমি বহুদিন একটা ঘরে থাকতুম যাতে জানালা ছিল না, কেবল দালানে একটা ঘুলঘুলি, যেখানে, সন্ধ্যাবেলায়, পাঁচটা চোটো মুখ, নিষ্ঠুর আর কোমল, হাসতো কিংবা গুমোট জায়গাটাকে আঁটার অযোগ্য করে তুলতো, টপটপে ঘাম ফেলে, ওই পোকাগুলো শিকার করতো যেগুলোর সুকৃতিতে আমরা অংশ নিয়েছি । ভালো ছিল যে অমন দুর্দশার গভীরে, আমি ছিলুম গৃহস্হের মধ্যে সবচেয়ে গরিবের প্রেমিক । আমি তাই পেয়েছিলুম এক বিরল সুবিধা । মুশকিল হতো বটে, কিন্তু আমার প্রতিটি বিজয় -- আমার নোংরা হাত, গর্বে মেলে ধরা, আমার দাড়ি আর দীর্ঘ চুলকে সদম্ভে প্রকাশ করতে পারতো -- আমাকে দিতো শক্তি -- কিংবা দুর্বলতা, আর এখানে দুটো ব্যাপারই এক-- কেননা বিজয় অনুসরণ করে, যা আমাদের ভাষায় বলা হতো অপমানপূর্ণ হতাশা । তবু, আমাদের জীবনে আলো আর প্রতিভা জরুরি হওয়ার কারণে, শার্শি আর জঞ্জালের ভেতর দিয়ে একটা সূর্যরশ্মি আসতো আর ঢুকে পড়তো নিষ্প্রভতায় ; এই উপাদানগুলোর জন্য আমাদের ছিল শিশির জমে তৈরি তুষার, মেঝের ওপরে বরফের পাতলা প্রলেপ, যদিও তারা দুর্যোগ সৃষ্টি করতে পারে, আমাদের কাছে যথেষ্ট ছিল, আনন্দের উৎস, যার চিহ্ণ, আমাদের ঘরে অনন্বিত : ক্রীসমাস আর নববর্ষ উৎসব সম্পর্কে আমরা যেটুকু জানতুম তা হল তার সঙ্গে যাকিছু থাকে আর যা উল্লাসিত লোকদের কাছে প্রিয় : তুষার ।

    নিজেদের ক্ষতকে চর্চা করাটাও ভিখারিদের কাছে বাড়তি পয়সা রোজগারের একটা উপায় --- যার ওপর নির্ভর করে জীবন চালানো যায় --- যদিও তারা হয়তো এই পথে চলে যায় তাদের দারিদ্র্যের হালতের  আলস্যের দরুণ, গর্বে মাথা তুলে দাঁড়ানো, অবজ্ঞাকে পরোয়া না করে, সেই জিনিসটা হলো পুরুষালি সততা । নদীতে পাথরের মতন, গর্বও ভেঙে পড়ে আর অবহেলায় চূর্ণ হয়, ফেটে যায় । আরও অপমানে প্রবেশ করলে, গর্ববোধ উন্নত হবে ( যদি সেই ভিখারিটা আমি হই ) যখন আমি জানি -- শক্তি বা দুর্বলতা -- অমন অদৃষ্টের সুযোগ নেবার জন্য । এটা খুবই জরুরি, যেমন এই কুষ্ঠরোগ আমাকে কাবু করছে, আমাকেও তাকে কাবু করতে হবে আর, শেষে, আমাকে জিততে হবে । তাহলে কি আমি ক্রমশ  করে জঘন্য হয়ে উঠবো, বেশির থেকে বেশি, বিতৃষ্ণার পাত্র, সেই অন্তিম বিন্দু পর্যন্ত যা এখনও অজানা কিন্তু যা এক নান্দনিকতা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হবে আর সেই সঙ্গে নৈতিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে ? বলা হয় যে কুষ্ঠরোগ, যার সঙ্গে আমি আমাদের অবস্হার তুলনা করি, টিশ্যুগুলোতে চুলকানির সৃষ্টি করে ;  রোগি নিজেকে চুলকাতে থাকে ; তার লিঙ্গোথ্থান হয় । স্বমেহন হয়ে দাঁড়ায় পৌনোঃপুনিক । তার নিঃসঙ্গ যৌনতায় কুষ্ঠরোগি নিজেকে সান্তনা দ্যায় আর নিজের রোগের স্তবগান গায় । দারিদ্র্য আমাদের ঋজু করেছে । সারা স্পেন জুড়ে আমরা এক গুপ্ত ব্যাপার বয়ে বেড়িয়েছি, ঔদ্ধত্বের সঙ্গে মিশেল না দেয়া অবগুন্ঠিত চমৎকারীত্ব । আমাদের অঙ্গভঙ্গী হয়ে উঠলো নম্র থেকে আরও নম্র, মিনমিনে থেকে আরও মিনমিনে, যেমন যেমন আমাদের নীচাবস্হার স্ফূলিঙ্গ আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য আরও দীপ্ত হতে থাকলো । এইভাবে আমার ভিখারির চেহারাকে মহিমায় মুড়ে তোলার জন্য আমার মধ্যে বিকশিত হলো বিশেষ কর্মদক্ষতা । ( আমি এখনও সাহিত্যিক প্রতিভার কথা বলিনি ।) এটা একটা কাজে লাগাবার শৃঙ্খলা বলে আমার মনে হয়েছে আর এখনও তার দরুণ আমি মৃদু হাসি হাসতে পারি সবচেয়ে নম্র পেঁকোদের মাঝে, তা মানুষ হোক বা জিনিসপত্র, এমনকি বমিও, এমনকি যে লালা আমি আমার মায়ের মুখের ওপর উগরে আবোলতাবোল বকতে পারতুম, এমনকি তোমার গু-পেচ্ছাপ । ভিখারি হবার অবস্হানের ধারণা আমি আমার মধ্যে সংরক্ষণ করে রাখবো ।

    আমি হতে চেয়েছিলুম মহিলাদের মতন যাঁরা, বাড়িতে, লোকেদের দৃষ্টির আড়ালে, নিজের মেয়েকে সামলে রাখে, এক ধরণের বীভৎস কদাকার দানব, বোকা আর শ্বেতাঙ্গ, যে চার পায়ে ঘোঁৎঘোৎ করে বেড়ায় । মা যখন জন্ম দিয়েছিলেন, তখন ওনার বিষাদ সম্ভবত এমন ছিল যা তা তাঁর জীবনের একমাত্র সারসত্তা হয়ে উঠেছিল । উনি এই দানবকে ভালোবাসবার নির্ণয় নিলেন, তাঁর পেট থেকে যে কদর্যতা বেরিয়ে এসেছিল, শ্রমের দ্বারা সুসম্পন্ন, আর তাকে ভক্তিভরে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন । তাঁর নিজের ভেতরে তিনি এক বেদিকে সাজিয়ে তুলেছিলেন যার ওপরে তিনি দানবের ধারণাকে সংরক্ষণ করেছিলেন । স্নেহে উৎসর্গ করে, আলতো হাতে, তাঁর প্রতিদিনের পরিশ্রমে তাতে কড়া পড়ে গিয়ে থাকলেও, আশাহীনের স্বেচ্ছাকৃত উদ্দীপনায়, তিনি নিজেকে পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিলেন আর পৃথিবীর বিরুদ্ধে তিনি দাঁড় করিয়ে দিলেন দানবটাকে, যা জগতের আর তার ক্ষমতার সমানুপাত নিয়ে নিলো । দানবকে বনিয়াদ করে নতুন রীতিনীতি প্রতিপাদন করা হলো, যে রীতিনীতি কে অবিরাম লড়ে যেতে হয়েছে জগতের পরাক্রমের সঙ্গে যা তাঁকে বিদ্ধস্ত করতে এগিয়ে এসেছে কিন্তু থেমে গেছে তাঁর বাসার দেয়ালের কাছে পৌঁছে যেখানে তাঁর মেয়ে অবরুদ্ধ ছিল ।

    কিন্তু, অনেকসময়ে চুরি করা দরকার ছিল, আমরা জানতুম সাহসের সুস্পষ্ট পার্থিব সৌন্দর্যের কথা । ঘুমোতে যাবার আগে, সরদার, মানে দলের কর্তা, আমাদের পরামর্শ দিতো । যেমন ধরা যাক, আমরা জাল কাগজ নিয়ে নানা কনসুলেটে যাবো যাতে আমাদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানো হয় । দেশের দূত, আমাদের দুঃখকষ্ট আর দুর্দশায় প্রভাবিত হয়ে বা চটে গিয়ে, আমাদের টিকিট কেটে দেবেন সীমা পর্যন্ত । আমাদের নেতা সেগুলো বারসেলোনা স্টেশানে বিক্রি করে দেবে । সে আমাদের বলতো গির্জায় কেমন করে চুরি করতে হবে -- যা স্পেনের লোক করতে সাহস পায় না -- কিংবা বড়োলোকদের ভিলায় ; আর ও নিজে নিয়ে আসতো নেদারল্যাণ্ড আর ইংরেজ নাবিকদের যাদের কাছে আমরা খুচরো পয়সার জন্য গাণ্ডুগিরি করতুম ।

    এইভাবে আমরা কখনও চুরি করতুম, আর প্রতিটি লুটতরাজ আমাদের কিছুদিনের জন্য খোলা জায়গায় স্বাস নিতে দিতো । রাতের তৎপরতার জন্য আমাদের আগে থেকে খবর রাখতে হতো অস্ত্রশস্ত্রের । ভয়ের চোটে তৈরি স্নায়বিক দুর্বলতা, আর অনেক সময়ে উদ্বেগ,  ধার্মিকের মতন মেজাজ গড়ে তোলে । সেরকম সময়ে আমি সামান্য দুর্ঘটনাতেও অশুভের সংকেত পেতুম । সুযোগের ইশারা হয়ে ওঠে অনেক ব্যাপার । অজানা ক্ষমতাগুলোকে আমি জাদুমুগ্ধ করে দিতে চাই যার ওপর আমাদের অভিযানের সফলতা নির্ভর করে । আমি নৈতিক কাজ দিয়ে তাদের জাদুমুগ্ধ করতে চাই, মূলত দান-খয়রাতের মাধ্যমে । আমি ভিখারিদের বেশি করে আর হাত খুলে দিত চাই, আমি বুড়ো লোকেদের আমার আসন ছেড়ে দিই, আমি একপাশে সরে দাঁড়াই যাতে তারা যেতে পারে, আমি অন্ধদের রাস্তা পার হতে সাহায্য করি, আরও কতো কি। এইভাবে, মনে হয় আমি মেনে নিই যে চুরিচামারির কাজের ওপর একজন দেবতার শাসন কাজ করে যাঁর কাছে নৈতিক কাজ গ্রহণযোগ্য । এই প্রয়াসগুলো হলো সুযোগের ওপরে জাল ফেলার কাজ যাতে এই দেবতা, যার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না, জালে ধরা পড়বে, আমাকে ক্লান্ত করবে, বিঘ্ন সৃষ্টি করবে আর ধার্মিক মনঃস্হিতি তৈরি করতে সাহায্য করবে । চুরি করার ব্যাপারে তারা আনুষ্ঠানিক কাজের গাম্ভীর্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করে । তা সত্যিই অন্ধকারের হৃদয়ে অনুষ্ঠিত হয়, তার সঙ্গে যোগ হব যে তা রাতে হলে ভালো, যখন লোকেরা ঘুমোয়, এমন জায়গা যা বন্ধ আর হয়তো কালোর মুখোশে ঢাকা । পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে হাঁটা, নৈঃশব্দ্য, দিনের বেলাতেও যে অদৃশ্যতা আমাদের দরকার হয়, হাতড়ানো হাতের অন্ধকারে ইশারা কোনো আসন্ন জটিলতা বা সতর্কতার । কেবল একটা দরোজার হাতল ঘোরানোতেও দরকার হয় অনেকগুলো প্রক্রিয়া, প্রতিটি পলকাটা মণিরত্নের মতন দীপ্তিমান । যখন আমি সোনা খুঁজে পাই, তখন মনে হয় আমি তা মাটির তলা থেকে বের করেছি ; আমি বহু উপমহাদেশকে, দক্ষিণ-সমুদ্রের দ্বীপগুলো লুট করেছি ; আমাকে নিগ্রোরা ঘিরে রেখেছে ; তারা আমার অসুরক্ষিত দেহকে বিষমাখানো বর্শা দিয়ে খোঁচা দেবার হুমকি দ্যায়, কিন্তু তখন সোনার সততা কাজ করা আরম্ভ করে, আর আমাকে দারুণ একটা বলিষ্ঠতা পিষে ফ্যালে কিংবা উল্লসিত করে । বর্শাগুলো নামানো হয়, নিগ্রোরা আমাকে চিনতে পারে আর আমি উপজাতির একজন সদস্য হয়ে যাই । 

    নিখুঁত কাজ : ভুল করে আমার হাত সৌম্যকান্তি এক ঘুমন্ত নিগ্রোর পকেটে ঢুকে যায়, আমার আঙুলে তার শক্ত হতে থাকা লিঙ্গ অনুভব করি আর হাত বের করে তার পকেট থেকে চুরি করা সোনার মুদ্রা আবিষ্কার করি -- বিচক্ষণতা, ফিসফিসে কন্ঠস্বর, উৎকর্ণ কান, অদৃশ্য, কোনো দোসরের স্নায়বিক দুর্বল উপস্হিতি আর তার ইশারা বুঝতে পারা, সবকিছু আমাদের নিজেদের মধ্যে কেন্দ্রিত করে, আমাদের একজুট করে, আমাদের করে তোলে উপস্হিতির নাচের দল, যা গি-এর মন্তব্য ভালো ব্যাখ্যা করে :

    “তুমি অনুভব করো যে তুমি জীবন্ত।”

    কিন্তু আমার অন্তরজগতে, এই সামগ্রিক উপস্হিতি, যা আমার মনে হয় কাজের গাম্ভীর্যকে অসাধারণ ক্ষমতার বোমায় পালটে দিয়েছে, তা যেন এক অন্তিক ভালোথাকা--- লুটতরাজ, যখন চলছে, সব সময়ে মনে হয় এটাই শেষ, এমন নয় যে তুমি ভাবো যে এর পর আরেকটা করবে না -- বস্তুত তুমি ভাবোই না -- বরং অমন অহং-এর একত্রীকরণ হতে পারে না ( জীবনে তো নয়ই, কেননা একে আরও চাপ দিলে জীবন থেকে কেটে পড়তে হবে ) ; আর কাজের এই একতা যা বিকশিত হয় ( যেমন গোলাপফুল তার দলমণ্ডল মেলে ধরে ) তা সচেতন ইঙ্গিত-ইশারার, তাদের নৈপূণ্য সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী, তাদের দুর্বলতা সম্পর্কেও আর তবু কাজটায় যে হিংস্রতা আছে, এখানেও তাকে ধার্মিক আচার-আচরণের মূল্য দ্যায় । প্রায়ই আমি তা কাউকে উৎসর্গ করি । প্রথমবার ছিল স্তিলিতানো যার অমন সন্মান ছিল প্রাপ্য । আমার মনে হয় ওর দ্বারাই আমি অভিষিক্ত হয়েছিলুম, মানে, ওর দেহ সম্পর্কে আমার আবেশ আমাকে পিছিয়ে আসতে দ্যায়নি। ওর সৌন্দর্যের প্রতি, ওর খোলাখুলি দুর্বিনয়ের প্রতি, আমি প্রথম দিকের চুরিগুলো উৎসর্গ করেছিলুম । ওই অসাধারণ বিকলাঙ্গের এককত্বও, যার হাত, কবজির কাছ থেকে কাটা, কোথাও পচছে, কোনো চেস্টনাট গাছের তলায়, ও আমাকে তাইই বলেছিল, মধ্য ইউরোপের জঙ্গলে । চুরি করার সময়ে, আমার শরীর ফাঁস হয়ে যায় । আমি জানি তা আমার ইশারা-ইঙ্গিতে ঝলমল করে । পৃইবী আমার সমস্ত চলাফেরা সম্পর্কে একাগ্র, যদি তা আমায় ল্যাঙ মারতে চায় । সামান্য ভুলের জন্য আমাকে বড়ো খেসারত দিতে হবে, কিন্তু যদি ভুল হয়ও আর আমি তা সময়মতো টের পাই, তাহলে আমাদের বাপের আস্তানায় সবাই আহ্লাদে আটখানা হবে । কিংবা, যদি ফেঁসে যাই, তাহলে বিপর্যয়ের পর বিপর্যয় আর তারপর কারাগার । কিন্তু বুনো অমার্জিতদের ক্ষেত্রে, যে দণ্ডপ্রাপ্ত পালাবার ব্যবস্হা করার ঝুঁকি নেয় সে তাদের সঙ্গে সেই উপায়ে দেখা করবে যা আমি সংক্ষেপে আমার অভ্যন্তরিক অভিযানে বর্ণনা করেছি । যদি অচেনা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে-যেতে, সে প্রাচীন উপজাতিদের পাহারা-দেওয়া কোনো মাল পাচারকারীর মুখোমুখি হয়, তাহলে তারা তাকে মেরে ফেলবে কিংবা বাঁচাবে । আদিম জীবনে ফিরে যাবার জন্য আমি দীর্ঘ, বহু দীর্ঘ পথ বেছে নিয়েছিলুম । যা আমি সবচেয়ে আগে চাই তা হল আমাদের জাতির দ্বারা নিন্দা ।

    সালভাদোর আমার কাছে গর্ববোধের উৎস ছিল না । ও যখন চুরি করতো, ও কেবল দোকানগুলোর সামনের জানলার তাক থেকে মামুলি জিনিস তুলে নিতো । রাতের বেলায়, যে কাফেতে আমরা সবাই জড়ো হতুম, ও আমাদের মধ্যে সবচেয়ে সৌম্যকান্তির পাশে দুঃখি মুখে সেঁদিয়ে যেতো । অমন জীবন ওকে হাঁপিয়ে তুলতো । যখন আমি ঢুকতুম, আমি ওকে কুঁজো হয়ে বসে থাকতে দেখে লজ্জা পেতুম, কোনো বেঞ্চে বসে, ওর কাঁধ সবুজ আর হলুদ সুতির কাঁথায় জড়োসড়ো, যেটা গায়ে জড়িয়ে ও শীতকালে ভিক্ষা করতে বেরোতো । ও একটা পুরোনো কালো শালও গায়ে জড়াতো, যেটা আমি নিতে চাইনি । সত্যিই, যদিও আমার মন সহ্য করতো, এমনকি চাইতো, নম্রতা প্রকাশ করি, কিন্তু আমার তেজি দেহ তা প্রত্যাখ্যান করতো । সালভাদোর দুঃখি, চাপা গলায় বলতো :

    “তুমি কি চাও আমরা ফ্রান্সে ফিরে যাই ? আমরা গ্রামের দিকে কাজ করবো।”

    আমি বললুম, না । ও আমার অপছন্দ বুঝতে পারেনি -- না, আমার ঘৃণা -- ফ্রান্সের প্রতি, এমন নয় যে আমার অভিযান, যদি বারসেলোনায় থেমে যায়, গভীরভাবে চলতেই থাকবে, বেশি বেশি করে গহনভাবে, আমার অন্তরজগতের প্রত্যন্ত এলাকায় ।

    “কিন্তু আমি সব কাজ করে দেবো । তোমাকে কষ্ট করতে হবে না ।”

    “না।”

    আমি ওকে ওর আনন্দহীন দারিদ্র্যে ওর বেঞ্চে ফেলে চলে যেতুম । আমি স্টোভের কাছে যেতুম কিংবা মদের জমায়েতে আর দিনের বেলায় কুড়িয়ে পাওয়া সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ফুঁকতুম, একজন দাঁত-খেঁচানো আন্দালুসীয়ের সঙ্গে, যার নোংরা শাদা পশমের সোয়েটার ওর ধড় আর পেশিকে ফুলিয়ে তুলতো । নিজের দুহাত কচলে, যেমন বুড়োরা করে, সালভাদোর ওর বেঞ্চ ছেড়ে সার্বজনিক রান্নাঘরে ঢুকে সুপ তৈরি করতে আরম্ভ করতো কিংবা গ্রিলের ওপরে একটা মাছ বসিয়ে দিতো । একবার ও প্রস্তাব দিলো যে হেউলভাতে যাওয়া যাক কমলালেবু তোলার মজুরের কাজ করতে । তখন সন্ধ্যা আর ও অনেকের কাছে অপমানিত হয়েছিল, আমার হয়ে ভিক্ষা করার জন্যে অনেক ধমক খেয়েছিল, তবুও আমাকে ভর্ৎসনা করে ক্রিয়োলায় আমার যৎসামান্য সফলতার কথা বলতে পারলো । 

    “সত্যিই, তুমি যখন কোনো খদ্দেরকে বেছে নাও, তোমার উচিত তাকে পারিশ্রমিক দেওয়া।”

    আমরা হোটেলের মালিকের সামনেই ঝগড়া করছিলুম, যে আমাদের বাইরে বের করে দিতে চাইছিল । সালভাদোর আর আমি তাই ঠিক করলুম পরের দিন দুটো কম্বল চুরি করবো আর দক্ষিণে যাবার মালগাড়িতে লুকিয়ে রাখবো । কিন্তু আমি এমন চালাক-চতুর ছিলুম যে সেদিন সন্ধ্যাতেই একজন কাস্টমস অফিসারের হাফকোট গেঁড়িয়ে আনলুম । যখন ডক দিয়ে যাচ্ছিলুম, যেখানে ওদের পাহারাদাররা থাকে, একজন অফিসার আমাকে ডাকলো । সে যা চাইলো আমি তাইই করলুম, সান্ত্রি কুঠরির ভেতরে । বীর্যপাতের পর ( সম্ভবত, আমাকে সেকথা বলার সাহস ছিল না লোকটার, ও একটা ফোয়ারার কাছে ধুতে চলে গেলো ), এক মুহূর্তের জন্য ও আমাকে একা ছেড়ে গিয়েছিল, সেই ফাঁকে আমো ওর পশমের বড়ো কালো উর্দি নিয়ে কেটে পড়লুম । আমি হোটেলে ফেরার আগে সেটা পরে নিলুম, আমি আমি জানতুম দ্ব্যর্থকতার মজা, তখনও পর্যন্ত বিশ্বাসভঙ্গের আনন্দ নয়, যদিও যে প্রতারণামূলক বিভ্রান্তি আমাকে বুনিয়াদি পরস্পরবিরোধিতাকে অস্বীকার করতে বাধ্য করবে তার বিরচন  ইতিমধ্যে আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল । কাফের দরোজাটা খোলার সময়ে সামনেই দেখলুম সালভাদোর । ভিখারিদের মধ্যে ও ছিল সবচেয়ে বিষণ্ণ । ওর মুখের বৈশিষ্ট্য, এমনকি গঠনবিন্যাস ছিল অনেকটা কাঠের গুঁড়োর মতন যা দিয়ে কাফের মেঝে ঢাকা থাকতো । তক্ষুনি আমি স্তিলিতানোকে দেখতে পেলুম জুয়াড়িদের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে । আমাদের চোখাচোখি হলো । ওর চাউনি আমার দিকে রইলো কিছুক্ষণ, একটু লজ্জিতও হলো । আমি কালো উর্দিটা খুলে ফেললুম, আর সবাই মিলে সেটা নেবার জন্য দরাদরি আরম্ভ করে দিলো । তাতে অংশ না নিয়ে স্তিলিতানো তাকিয়ে থাকলো তুচ্ছ দর-কষাকষির দিকে ।

    “যদি চাও, তাহলে তাড়াতাড়ি করো,” আমি বললুম । “তোমরা মনোস্হির করো, কাস্টমসের লোকটা নির্ঘাৎ আমার খোঁজে আসবে ।”

    তাস-খেলুড়েরা তৎপর হয়ে উঠলো । ওরা সবাই এরকম অজুহাতের ব্যাপার জানে । যখন তাসের শাফল আমাকে ওর দিকে নিয়ে এলো, স্তিলিতানো ফরাসি ভাষায় বলল :

    “তুমি প্যারিস থেকে ?”

    “হ্যাঁ । কেন ?”

    “না, এমনিই, কোনো কারণ নেই ।”

    যদিও ও-ই প্রথম এগিয়ে এসেছিল, আমি জানতুম, যখন উত্তর দিলুম, একজন অন্তমূখী মানুষের মরিয়া আচরণের ইঙ্গিত-ইশারা, যখন সে কোনো যুবককে চায় । আমার বিভ্রান্তিকে লুকোবার জন্য, আমি শ্বাসরুদ্ধ হবার ভান করলুম, আমার চারপাশে মুহূর্তটার হইচই ছিল । ও বলল, “নিজের জন্যে তুমি বেশ ভালোই কাজ করছ।”

    আমি বুঝতে পারলুম যে এই প্রশস্তি বেশ চালাকি করে দেয়া হলো, কিন্তু ভিখারিদের মাঝে কতো সৌম্যকান্তি যে স্তিলিতানো ছিল ( আমি তখনও ওর নাম জানতুম না ) ! ওর একটা হাতে বেশ বড়ো ব্যাণ্ডেজ বাঁধা আর বুকের কাছে ঝোলানো, কিন্তু আমি জানতুম ওই হাতটা ওর নেই । স্তিলিতানোকে কাফে বা রাস্তায় কোনোটাতেই ঘন ঘন দেখা যেতো না ।

    “উর্দিটার জন্য কতো দাম দিতে হবে ?”

    “তুমি আমাকে এর দাম দিতে চাও ?

    “কেন দেবো না ?”

    “কিসের মাধ্যমে দেবে ?”

    “তুমি কি ভয় পাচ্ছো ?”

    “তুমি কোথা থেকে এসেছো ?”

    “সার্বিয়া । আমি ফরাসি সৈন্যবাহিনীর লোক । আমি বাহিনী থেকে পালিয়ে এসেছি।”

    আমি স্বস্তি পেলুম । বিপর্যস্ত । যে আবেগ আমার মধ্যে গড়ে উঠলো তা এক শূন্যতার, যাতে ভরে গেল বিয়ের দৃশ্যের এক স্মৃতি । নাচের হলঘরে সৈন্যরা দলবেঁধে নাচছিল, আমি ওদের ওয়ালৎজ নাচ দেখছিলুম । সে সময়ে আমার মনে হচ্ছিল দুজন সৈনিকের অদর্শন সেখানে সামগ্রিক । ওরা আবেগে বয়ে যাচ্ছিল । যদিও প্রথম দিকে ‘রামোনা’ পর্বে তাদের নাচ ছিল অপাপবিদ্ধ, কিন্তু তাইই কি থাকবে আমাদের উপস্হিতিতে, ওরা হাসি বদল করে বিয়ে করে নিলো, যেমন প্রেমিক-প্রেমিকারা আঙটি বদল করে ? অদৃশ্য যাজকদের অনুজ্ঞা সত্বেও সৈন্যরা উত্তর দিল, “আমি দায়িত্ব গ্রহণ করছি।”   প্রত্যেকে ছিল দম্পতি, উভয়ই মুখের ওপরে কালো জাল ঢেকে আর এক উর্দি ( শাদা চামড়া, কাঁধের লাল আর সবুজ দড়ি )। ওরা থেমে-থেমে পরস্পরের কোমলতা আর স্ত্রীসুলভ শিষ্টতা অদলবদল করছিল । আবেগকে উঁচু স্তরে বজায় রাখার জন্য, ওরা নিজেদের নাচকে ধিমেতালে করছিল, যখন কিনা তাদের লিঙ্গ, দীর্ঘ কুচকাওয়াজে ক্লান্ত, পরস্পরকে রুক্ষ ডেনিমের ব্যারিকেডের আড়াল থেকে বিপজ্জনকভাবে ভয় দেখাচ্ছিল আর চ্যালেঞ্জ করছিল । পালিশ-করা চামড়া তৈরি শিরস্ত্রাণের মুখাবরণে ঠোকাঠুকি লাগছিল । আমি বুঝতে পারছিলুম স্তিলিতানো আমাকে আয়ত্ত করতে চাইছিল । আমি সেয়ানার খেলা খেলছিলুম: 

    “তা থেকে প্রমাণ হয় না যে তুমি দাম দিতে পারবে।”

    “আমাকে বিশ্বাস করো।”

    অমন কঠিন মুখ, অমন শক্তপোক্ত দেহের মানুষ, আমাকে বলছে বিশ্বাস করতে । সালভাদোর আমাদের দেখছিল । ও আমাদের বোঝাপড়া সম্পর্কে জানতো আর টের পেলো যে আমরা ওর ওর একাকীত্বের, সর্বনাশের নির্ণয় নিয়ে ফেলেছি । কোপনস্বভাব আর বিশুদ্ধ, আমি ছিলুম জীবনে ফিরিয়ে দেয়া পরীর দেশের নাটক । যখন ওয়ালৎজ নাচ থামলো, সৈন্য দুজন নিজেদের থেকে দূরে সরে গেলো । আর জাঁকজমকভরা ও বিহ্বল দুটি অর্ধাংশের প্রত্যেকে ইতস্তত করলো, আর, অদর্শন এড়ানোর আনন্দে, চলে গেলো, মাথা নামিয়ে, পরের ওয়ালৎজের জন্য কোনো যুবতীর দিকে ।

    “দাম দেবার জন্য আমি তোমাকে দুদিন সময় দেবো,” আমি বললুম । “আমি মালকড়ি চাই। আমিও সৈন্যবাহিনীতে ছিলুম । পালিয়ে এসেছি । তোমার মতন।”

    “তুমি পেয়ে যাবে ।”

    আমি উর্দিটা দিয়ে দিলুম ওকে । ও নিজের একটা হাতে নিলো আর আমাকে ফেরত দিয়ে দিলো। ও মৃদু হাসলো, যদিও উদ্ধতভাবে, আর বলল, “ওটা গুটিয়ে ফ্যালো।” আর তার সঙ্গে  রহস্যোচ্ছলে যোগ করলো, “ততক্ষণে আমি একটা গুটিয়ে নিই ।”

    অভিব্যক্তিটা সকলেই জানে : “স্কেটিংবোর্ড গুটিয়ে ফেলা ।” চোখের পাতা না ফেলে, ও যা বলল আমি তাই করলুম । উর্দিটা হোটেল মালিকের মালপত্র লুকোবার জায়গায় তক্ষুনি লোপাট হয়ে গেলো । হয়তো এই মামুলি চুরি আমার মুখকে উজ্বল করে থাকবে, কিংবা স্তিলিতানো ভালো সাজার অভিনয় করছিল ; ও যোগ করলো : “তুমি তাহলে বেল-অ্যাব-এর একজন প্রাক্তনীকে মদ খাওয়াচ্ছো ?”

    এক গেলাস মদের দাম দুই সউ । আমার পকেটে ছিল চারটে, কিন্তু আমি সেগুলো সালভাদোরকে ধার দিলুম যে আমাদের দেখছিল ।

    “আমি কপর্দকশূন্য,” স্তিলিতানো গর্বভরে বলল ।

    তাস খেলুড়েরা নতুন গোষ্ঠী তৈরি করছিল যার দরুণ কিছু এক মুহূর্তের জন্যে আমি সালভাদোর থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলুম । আমি দাঁতের ফাঁকে বিড়বিড় করলুম, “ আমার কাছে চার সউ আছে আর আমি সেগুলো তোমাকে পাচার করে দিচ্ছি, কিন্তু দাম তোমাকেই দিতে হবে ।”

    স্তিলিতানো মৃদু হাসলো । আমি পরাজিত । আমরা একটা টেবিলে বসলুম । ও সৈন্যবাহিনীর কথা বলা আরম্ভ করেছিল, কড়া চোখে আমার দিকে তাকিয়ে, কিন্তু অন্য কথা বলা শুরু করলো।

    “আমার কেমন মনে হচ্ছে আমি তোমাকে আগে কোথাও দেখেছি।”

    আমার কথা বলতে হলে, আমি স্মৃতিতে সবকিছু ধরে রেখেছিলুম।

    আমার অদৃশ্য দড়িদড়া আঁকড়ে ধরা জরুরি ছিল । আমি কূজন করতে পারতুম । শব্দাবলী, কিংবা আমার স্বরভঙ্গী, কেবল আমার আকুলতাকে  প্রকাশ করতে পারতো না, আমি শুধু গান শোনাতে পারতুম না, আমার কন্ঠ থেকে বেরোতে পারতো বুনো প্রণয়খেলার ডাক । হয়তো আমার ঘাড়ে শাদা পালকগোছা গজিয়ে উঠেছিল । একটা আকস্মিক দুর্ঘটনা সব সময়ে সম্ভব। আমাদের জন্য অপেক্ষা করে রূপান্তরিত আকৃতি ।  আতঙ্ক আমাকে রক্ষা করলো।

    আমি আকৃতির রূপান্তরের ভয়ে বসবাস করেছি । পাঠককে পুরো সচেতন করার জন্য, তারা দেখছে যে প্রেম আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে চলেছে -- এটা কেবল বাগ্মীতার ব্যাপার নয় যার জন্য তুলনা দরকার -- বাজপাখির মতন -- সবচেয়ে সূক্ষ্ম ভীতির জন্য আমি কাছিমঘুঘুর উদাহরণ ব্যবহার করি । জানি না সেই মুহূর্তে কেমন অনুভব করেছিলুম, কিন্তু আজকে আমি যা চাই তা হলো স্তিলিতানো সম্পর্কে আমার কল্পনাশক্তি, কেননা আমার দুর্দশার তুলনা করা যায় একটা নিষ্ঠুর পাখি আর তার শিকারের পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্গে । ( আমি যদি আমার ঘাড় মৃদু কূজনে ফুলে ওঠা অনুভব না করতুম তাহলে আমি বরং লালবুক রবিনপাখির কথা বলতুম)।

    এক বিদকুটে প্রাণী দেখা দেবে যদি আমার প্রতিটি আবেগ একটা পশু হয়ে দেখা দ্যায় : আমার ঘাড়ে কেউটের  ক্রোধ হিসহিস করে ; সেই একই কেউটে আমার লিঙ্গকে ফোলায় ; আমার বিনয়ের অভাব থেকে পয়দা হয়েছে আমার ঘোড়াগুলো আর নাগরদোলা….এক কাছিমঘুঘুর যার খসখসে স্বর আমি ধরে রেখেছি, যা স্তিলিতানো লক্ষ্য করেছিল । আমি কাশলুম।

    প্যারালেলোর পেছনে একটা ফাঁকা জায়গা ছিল যেখানে মাস্তানরা তাস খেলতো। ( প্যারালেলো হলো বারসেলোনার একটা অ্যাভেনিউ যা বিখ্যাত রামব্লাসের সমান্তরাল। আই দুই প্রশস্ত রাস্তার মাঝে, আক অন্ধকার, নোংরা, সরু গলি গযে তুলেছে বারিও চিনো জায়গাটাকে ।) মেঝেতে বসে, ওরা তাস-টাস খেলতে থাকে ; ধুলোর ওপরে চারচৌকো কাপড় বিছিয়ে তাসগুলো সাজিয়ে রাখে । এক তরুণ জিপসি তার মধ্যে একটা খেলা চালাতো, আর আমি আমার পকেটের কয়েকটা সউয়ের ঝুঁকি নিলুম। আমি জুয়াড়ি নই । ধনীদের ক্যাসিনো আমাকে আকৃষ্ট করে না । বিজলিবাতির ঝাড়লন্ঠনে আমি সিঁটিয়ে যাই । মার্জিত জুয়াড়ির মেকি ঘনিষ্ঠতা দেখে আমার বমি পায় । আর বল, রুলেট আর ছোট্টো ঘোড়াগুলো নিয়ে খেলার অসম্ভাব্যতা আমাকে অনুৎসাহিত করে, কিন্তু আমার ভালো লাগতো মাস্তানদের ধুলো, নোংরা আর চালবাজি ।

    আমি সামনে দিকে ঝুঁকে জিপসিটাকে পাশ থেকে দেখলুম, বালিশে চাপা, কোনও বেদনার কারণে। আমি ওর দৈহিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে দেখি ওর মুখবিকৃতি, কিন্তু ওর ব্যথার প্রভাও। আমি এটা প্রায়ই দেখেছি রাস্তায় বসে থাকা ছোঁড়াদের তেলচিটে মুখে । এখানকার পুরো জনসমপ্রদায় জেতা কিংবা হারার সঙ্গে যুক্ত । প্রতিটি উরু ক্লান্তি কিংবা উদ্বেগে কাঁপছে । সেইদিনকার আবহাওয়া ছিল আশঙ্কাজনক । আমি তরুণ স্পেনিয়দের যৌব অধীরতায় আটক পড়ে গিয়েছিলুম । আমি খেললুম আর জিতলুম । আমি প্রত্যেকটা দান জিতলুম । খেলার সময়ে আমি একটাও কথা বলিনি । তাছাযা, জিপসিটা ছিল আমার অচেনা । নিয়ম অনুযায়ী জেতা টাকাকড়ি নিয়ে আমার কেটে পড়ার কথা । ছেলেটাকে দেখতে আতো সুন্দর যে ওইভাবে ওকে ছেড়ে কেটে পড়াটা হবে সৌন্দর্যের অবহেলা । ও হঠাৎ দুঃখি হয়ে উঠলো, গরম আর অবসাদের মাঝে দাঁড়িয়ে ও মুখ নত করে নিয়েছিল । আমি দয়া করে ওকে টাকাটা ফেরত দিয়ে দিলুম। আচমকা অবাক হয়ে, ও সেগুলো নিয়ে নিলো আর আমাকে ধন্যবাদ জানালো ।

    “হ্যালো, পেপে,” একজন পাগলাটে কালচে চেহারার খোঁড়া লোক ডাক দিয়ে উঠলো আমার পাশ দিয়ে লেংচে যেতে যেতে ।

    “পেপে,” আমি নিজেকে বললুম, “ওর নাম পেপে।” জায়গাটা ছাড়লুম, কেননা আমি ওর কৃশকায়, প্রায় নারীসুলভ কমনীয় ছোটো হাত দুটো দেখেছিলুম । কিন্তু সবে কয়েক পা এগিয়েছি চোর, বেশ্যা, ভিখারি আর পায়ুকামীদের ছেড়ে, কেউ একজন আমার কাঁধে হাত রাখলো । ও ছিল পেপে। ও খেলা ছেড়ে চলে এসেছে। ও আমাকে স্প্যানিশে বলল :

    “আমার নাম পেপে।”

    “আমি হুয়ান।”

    ‘চলো, মদ খাওয়া যাক।”

    ও আমার চেয়ে লম্বা ছিল না । ওর মুখ, যা আমি ওপর থেকে দেখেছিলুম যখন ও মাটিতে বসেছিল, কম পুষ্ট মনে হলো । দেহ কাঠামো সুশীল ।

    “ছেলেটা একটা মেয়ে,” আমি ভাবলুম, ওর কোমল হাতের কথা মনে করে, আর আমি অনুভব করলুম ওর সঙ্গ আমাকে বিরক্ত করবে । ও এখনই ঠিক করে নিলো যে টাকাটা আমি জিতেছিলুম তা মদ খেয়ে ওড়াবে । আমরা শুঁড়িখানাগুলোয় চক্কর মারলুম, আর যতোক্ষণ একসঙ্গে ছিলুম ওকে বেশ কমনীয় লাগছিল । ওর পরনে ছিল, শার্টের বদলে, নিচু গলা নীল জার্সি। খোলা জায়গাটা থেকে দেখা যাচ্ছিল একটা মোটা ঘাড়, ওর মাথার মতনই চওড়া । যখন ও মাথা ঘোরালো, বুক না ঘুরিয়ে, একটা মোটা পেশিতন্তু জেগে উঠলো । আমি ওর দেহটা কল্পনা করার চেষ্টা করলুম, আর, কোমল প্রায় নরম হাত সত্বেও, মনে হলো তা বেশ পুরুষ্টু, কেননা ওর উরুগুলো ট্রাউজারের পাতলা কাপড়কে ভরে দিয়েছিল। আবহাওয়া ছিল উষ্ণ । ঝড় ওঠেনি । আসপাশের তাস খেলুড়েদের স্নায়ুচাপ হয়ে উঠেছিল তীব্র । বেশ্যাগুলোকে মনে হচ্ছিল গাগতরে ।ধুলো আর রোদ ছিল কষ্টকর । আমরা তেমন মদ খাইনি, খেলুম লেমোনেড । আমরা হকারদের কাছে বসলুম আর মাঝেসাজে এক-আধটা কথা বললুম । ও হাসি বজায় রেখেছিল, একধরনের ক্লান্তিময়তায় । মনে হচ্ছিল ও আমাকে প্রশ্রয় দিতে চাইছে । ও কি সন্দেহ করছিল যে ওর সুন্দর মুখ আমার ভালো লেগেছে ? আমি জানতে পারলুম না, কিন্তু ও আর এগোলো না । তাছাড়া, আমারও ওর মতন একই ধূর্ত চাউনি ; ভালো পোশাক পরে যারা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল তাদের কাছে আমি বোধহয় অমঙ্গলের সংকেত হয়ে দেখা দিয়েছি ; ছেলেটার যৌবন আর কলুষ আমার মতনই, আর আমি ছিলুম ফরাসি । সন্ধ্যার দিকে ও জুয়া খেলতে চাইলো, কিন্তু সব জায়গাগুলো দখল হয়ে গিয়েছিল বলে দেরি হয়ে গিয়েছিল । আমরা খেলুড়েদের আসেপাশে ঘুরে বেড়ালুম । বেশ্যাগুলোর গা ঘেঁষে ও যখন যাচ্ছিল, পেপে ঠাট্টা-ইয়ার্কি করলো ওদের সঙ্গে । কাউকে-কাউকে চিমটি কাটলো । গরম হয়ে উঠছিল অসহ্য । আকাশ আর মাটি হয়ে উঠেছিল ঘনিষ্ঠ । ভিযের স্নায়ুচাপ বিরক্তিকর লাগছিল । জিপসি ছোঁড়াটার ওপর ছেয়ে গিয়েছিল ধৈর্যচ্যুতি কেননা ও নির্ণয় নিতে পারছিল না কোন খেলাটায় যোগ দেবে । নিজের পকেটের টাকাগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল । হঠাৎ ও আমার বাহু আঁকড়ে ধরলো ।

    “এসো !”

    প্যারালেলোতে কয়েক পা দূরে একটা বিশ্রামাগারে ও আমাকে নিয়ে এলো । সেটা চালাচ্ছিল বুড়িরা । হঠাৎ অমন নির্ণয়ে অবাক হয়ে আমি জিগ্যেস করলুম :

    ‘কী করতে চলেছ তুমি ?”

    “আমার জন্য অপেক্ষা করো ।”

    “কেন ?”

    ও স্প্যানিশ একটা শব্দ ব্যবহার করে উত্তর দিলো যা আমি বুঝতে পারলুম না । সে কথা ওকে বললুম, এক বুড়ির সামনে, যে তার দুটো সউয়ের জন্য অপেক্ষা করছিল, শুনে হাসিতে ফেটে পয। ছোঁড়াটা আর স্বমেহনের ইঙ্গিত করলো । যখন ও বেরিয়ে এলো, ওর মুখে রঙ ধরে গিয়েছিল । ও তখনও হাসছিল ।

    “এখন সব ঠিক আছে । আমি তৈরি ।”

    ঘটনাটা থেকে আমি শিখলুম যে, বড়ো দাঁও মারার আগে, খেলোয়াড়রা ওখানে ঢুকে স্বমেহন করে যাতে নিজেদের শান্ত করে খেলতে পারে । আমরা জুয়ার জমঘটে ফিরে গেলুম । পেপে একটা গোষ্ঠীকে বেছে নিলো । ও হেরে গেলো । ওর কাছে যতো টাকা ছিল সব হেরে গেলো । আমি ওকে থামাতে চেষ্টা করেছিলুম ; ততক্ষণে সব হেরে বসে আছে । খেলার যেমন নিয়ম, যে লোকটা টাকাকড়ি ধার দিচ্ছিল বা জমা রাখছিল তাকে বলল তহবিল থেকে ওকে পরের খেলার জন্য ধার দিতে । লোকটা প্রত্যাখ্যান করলো । আমার তখন মনে হলো যা বৈশিষ্ট্যে জিপসির ভদ্রতা গড়া তা টকে গেল, যেমন দুধ ছানা কেটে যায়, আর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো যেরকম ক্রোধ আমি আগে কারোর দেখিনি । জিপসি ছেলেটা মহাজনটার টাকাকড়ি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তুলে নিলো । মহাজন ওর পেছনে ছুটে লাথি মারার চেষ্টা করলো । পেপে পাশ কাটিয়ে নিলো । ও টাকাগুলো আমার হাতে দিলো, কিন্তু যতোক্ষণে আমি সেগুলো পকেটে রাখতে যাবো ছোঁড়াটার ছুরি বেরিয়ে এসেছে । ছুরিটা ও বসিয়ে দিলো মহাজনের বুকে, একজন ঢ্যাঙা, তামাটে লোক, যে পড়ে গেলো মাসটিতে আর যে, তার ত্বকের তামাটে রঙ সত্বেও, ফ্যাকাশে হয়ে গেলো, গুটিয়ে গেলো, ছটফট করে ধুলোর ওপরে মরে গেলো । জীবনে প্রথমবার আমি কাউকে পটল তুলতে দেখলুম । পেপে সেখান থেকে অদৃশ্য  হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু যখন আমি লাশ থেকে দৃষ্টি ঘোরালুম, ওপর দিকে চাইলুম, সেখানে, মুখে মৃদু হাসি নিয়ে, দাঁড়িয়ে রয়েছে স্তিলিতানো । সূর্য তখন অস্ত যাচ্ছে । মৃত লোকটা আর সৌম্যকান্তি মানুষেরা যেন একই সোনালি ধুলোতে মিশে গেছে, পৃথিবীর সব জায়গা থেকে এসে উপস্হিত নাবিক, সৈন্য, মাস্তান আর চোরেদের সঙ্গে । পৃথিবী আর ঘুরছিল না : স্তিলিতানোকে নিয়ে তা সূর্যের কাছে কাঁপছিল । একই সময়ে আমি পরিচিত হলুম মৃত্যু আর ভালোবাসার সঙ্গে । এই দর্শনশক্তি, যদিও ক্ষণিকের, তবু আমি সেখানে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলুম না কেননা আমার ভয় ধরে গিয়েছিল যে আমাকে পেপের সঙ্গে দেখে মৃত লোকটার বন্ধুরা আমার পকেটে রাখা টাকাকড়ি কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু আমি যখন কেটে পড়ছি, আমার স্মৃতি জীবন্ত হয়ে উঠলো আর পরবর্তী দৃশ্যের কথা মনে পড়িয়ে দিলো, যা আমার মনে হয়েছিল সমারোহপূর্ণ : “হত্যাটা, এক সৌম্যকান্ত বালকের দ্বারা, একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষকে যার রোদেপোড়া ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যেতে পারে, মৃত্যুর রঙ ধরে গেলো, আর তা আরাম করে দেখলো একজন দীর্ঘদেহী ফর্সা লোক যার সঙ্গে আমি সম্প্রতি গোপনে বাগদত্ত হয়েছি।” আমার চাউনি ওর দিকে দ্রুত হলেও, আমার হাতে সময় ছিল স্তিলিতানোর পালোয়ানি পৌরুষকে স্বীকার করা আর দেখা, দুই ঠোঁটের মাঝে, আধখোলা মুখে, একটা শাদা, থুতুর গোলা, শাদা পোকার মতন মোটা, যা ও ঘোরাচ্ছিল, ওপর থেকে নিচে যতক্ষণ না তা ওর হাঁ-মুখ ঢেকে ফেলছে। ও ধুলোর ওপরে খালি পায়ে দাঁড়িয়েছিল । ওর ঠ্যাঙ ঢাকা ছিল ছেঁড়া নোংরা ফ্যাকাশে ডেনিম ট্রাউজারে। ওর সবুজ শার্টের হাতা ছিল গোটানো, তার একটা ওর কাটা হাতেরর ওপর পর্যন্ত ; কবজিটা, যেখানে সেলাই করা চামড়ায় একটা ফ্যাকাশে গোলাপি ক্ষতচিহ্ণ দেখা যাচ্ছিল, তা ছিল সঙ্কুচিত।

    বিয়োগাত্মক আকাশের তলায়, আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর প্রাকৃতিক ভূচিত্র পার হয়ে যাবার ছিল যখন রাতের বেলায় স্তিলিতানো আমার হাত ধরলো । কী ছিল সেই তরল জিনিসটার বৈশিষ্ট্য যা ওর কাছ থেকে আমার কাছে ধাক্কা দিয়ে চালান করা হতো ? আমি বিপজ্জনক নদীতীরে হেঁটেছি, উদয় হয়েছি বিষণ্ণ সমভূমিতে, শুনেছি সমুদ্রের আওয়াজ । যখন সিঁড়িবদল হলো, বলা চলে আমি ওকে ছুঁইনি : ও ছিল জগতের ওস্তাদ । সেই সংক্ষিপ্ত মুহূর্তগুলোর স্মৃতি নিয়ে, আমি তোমাদের কাছে বর্ণনা করতে পারি, শ্বাসহীন উড়াল, অনুসৃতি, পৃথিবীর সেই সব দেশের যেখানে আমি কখনও যাবো না ।

                                           

                                           

                                                                                                                                               
  • মলয় রায়চৌধুরী | 223.177.62.180 | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:৩৭735113
  • জাঁ জেনে’র কবিতা ( ১৯১০ - ১৯৮৬ )  ‘শবযাত্রার কুচকাওয়াজ’

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    এক কোনে আবদ্ধ, একটুখানি রাত রয়ে গেছে।

    আমাদের ভিতু আকাশে নির্মম আঘাতে স্ফূলিঙ্গ উগরে

    ( নৈশব্দের গাছেরা কিছু দীর্ঘশ্বাস ঝুলিয়ে রেখেছে )

    এই শূন্যতার শীর্ষে গরিমার এক গোলাপ জেগে।

    ঘুম বড়োই বিশ্বাসঘাতক যেখানে জেলখানা আমায় নিয়ে এসেছে

    যদিও আমার গোপন দালানে বেশ আস্পষ্টভাবে

    ওই অহংকারী ছোঁড়া গভীরভাবে নিজের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে

    নাবিকদের আলোয় ঝলমলিয়ে যারা শব-সুন্দরী  গড়ে তোলে ।

     

    ও আমাকে নিজের ভেতরে শেকল পরিয়ে রাখে

    জেলখানার এই কুড়ি বছর বয়সী পরিদর্শক

    আর ও আমায় চিরকালের জন্য শেকল পরিয়ে রাখে !

    একটিমাত্র ইঙ্গিত, ওর চোখ, দাঁতে চুল চিবোয় :

    আমার হৃদয় খুলে যায়, আর পরিদর্শক, উৎসবময় উল্লাসে

    আমাকে নিজের অন্তরে জেলবন্দী করে ।

    এই অসূ্য়াভরা দরোজা আবার বন্ধ হবার সুযোগ পায় না

    অনেক বেশি দয়ায়

    আর তুমি তো ইতোমধ্যেই ফিরেছো । তোমার পরিপূর্ণতা আমাকে আতঙ্কিত করে

    আর আমি আজকে শুনতে পাই আমাদের ভালোবাসা বর্ণিত হচ্ছে

    তোমার মুখে যা গান গায় ।

    এই ছোরামারা ট্যাঙ্গো যা জেলখুপরি শুনতে পায়

    বিদায়বেলার এই ট্যাঙ্গোনাচ ।

    তাহলে কি তুমি, হে প্রভূ, এই উজ্বল বাতাসে ?

    তোমার আত্মা গোপন পথে এগিয়েছে

    দেবতাদের থেকে পার পাবার জন্য ।

     

    যখন তুমি ঘুমোও রাতের আস্তাবল ভেঙে ঘোড়ারা 

    তোমার চ্যাটালো বুকে নামে, আর জানোয়ারগুলোর টগবগ

    অন্ধকারকে ছত্রভঙ্গ করে তোলা যেখানে ঘুম নিজের

    ক্ষমতার যন্ত্র চালায়, আমার মগজ থেকে ছিঁড়ে

    একটুও শব্দ না করেই ।

    ঘুম অনেক শাখা তৈরি করে

    তোমার পা থেকে ফুল

    তাদের কান্নায় কন্ঠরুদ্ধ হয়ে মারা যেতে আমি ভয় পাই ।

    তোমার মোলায়ের পাছার বাঁকের ওপরে, মিলিয়ে যাবার আগে

    তোমার শাদা ত্বকে তা নীলাভ।

    কিন্তু একজন জেল পরিদর্শক কি তোমাকে জাগিয়ে তুলতে পারে, আমার কচি চোর

    যখন তুমি তোমার হাত ধুয়ে নাও ( ওই পাখিগুলো তোমার দস্তানায়

    ডানা ঝাপটায়, একশো দুঃখের ভারে )

    তারপর তুমি নির্দয়ভাবে নক্ষত্রদের আলোকরশ্মিকে ছারখার করে দাও

    তোমার কাঁদতে-থাকা মুখের ওপরে ।

    তোমার শোকেভরা অবশিষ্টাংশে

    মহিমাময় অঙ্গভঙ্গী ধরে রাখা হয়

    তোমার হাত যেটা একে ছুঁড়ে দিয়েছিল, রশ্মি দিয়ে বীজ পুঁতেছিল।

    তোমার গেঞ্জি, তোমার শার্ট, আর তোমার কালো বেল্ট

    আমার জেলখুপরিকে অবাক করে আর আমাকে হতবুদ্ধি করে তোলে

    তোমার সুন্দর হস্তিদন্তের সামনে ।

     

    সারাদিনের সুন্দর রাতগুলো

    পিলর-এর অন্ধকার

    তোমার কালো পাকের ভেতরে

    আমার ছুরি জাল করা হয় ।

    ঈশ্বর, এখানে আমি উলঙ্গ

    আমার ভয়ঙ্কর লুভরেতে ।

    কেউ চিনতে পারে না

    তোমার বন্ধ মুঠো আমায় খুলে দ্যায় ।

    আমি ভালোবাসা ছাড়া কিছু নই

    আমার সমস্ত শাখা জ্বলে

    যদি আমি দিনটাকে অন্ধকার করে দিই

    তারপর আমার ভেতরের ছায়া নিজেকে গুটিয়ে নেয় ।

    বিশুদ্ধ হাওয়ায় এটা সম্ভব

    আমার শুকনো দেহ গুঁড়িয়ে ধুলোয় মেশার জন্য

    দেয়ালে পিঠ দিয়ে

    আমি বিদ্যুতের চমকের দখল নিই ।

    হৃদয় আমার সূর্য

    মোরগের ডাকে চৌচির হয়ে যায়

    ঘুম কখনও সাহস দেখায় না

    এখানে তার স্বপ্নগুলোকে উথলে দিতে।

    আমার আকাঙ্খায় শুকিয়ে যাওয়া

    আমি স্তব্ধতাকে মেরামত করে দিই

    পাখিদের আগুন দিয়ে

    যা আমার গাছ থেকে জেগেছে ।

     

    নিষ্ঠুর প্রকৃতির মনে হয় এমন মহিলাদের থেকে

    তাদের খবরিয়ারা গয়না পরে থাকে ।

    গলির এই ছিঁচকে চোরগুলো রাতের বেলায় জেগে ওঠে

    আর তাদের ইশারা পেয়ে তুমি সাহসে বেরিয়ে পড়ো।

    অমন এক কচিখোকা, নিজের মায়াময় পোশাকে কাঁপে

    ও ছিল আমার কাছে পাঠানো দেবদূত, যার আলোময় দিশা

    আমি অনুসরণ করি বিভ্রান্ত হয়ে, যাত্রায় পাগল হয়ে

    এই জেলখুপরি পর্যন্ত যেখানে তার প্রত্যাখ্যান ছিল জ্যোতির্ময়।

    যখন আমি অন্য সুরে গাইতে চাইলুম

    আমার পালক আলোকরশ্মিতে জড়িয়ে পড়লো

    এক ঝিমধরা শব্দে, মাথা নিচু করে

    আমি বোকার মতন পড়ে গেলুম, এই ভুলের মাশুল হিসেবে

    এই খাদের তলায় ।

     

    আর কিছুই গোলমাল

    বাধাবে না অনন্তকালীন ঋতুতে

    যেখানে আমি নিজেকে আটক আবিষ্কার করছি ।

    একাকীত্বের স্হির জলাশয়

    আমাকে পাহারা দেয় আর জেলখানা ভরে রাখে ।

    আমি চিরকালের জন্য কুড়ি বছর বয়সী

    তোমাদের নিরীক্ষণ সত্বেও ।

    তোমাদের মন রাখতে, ওহ বধির সৌন্দর্যের অনাথ

    মারা না যাওয়া পর্যন্ত আমি পোশাক পরে থাকবো

    আর তোমার আত্মা তোমার মুণ্ডকাটা ধড়কে ছেড়ে গিয়ে

    আমার ভেতরে খুঁজে পাবে এক শাদা আশ্রয় ।

    ওহ একথা জানতে পারা যে তুমি আমার মামুলি ছাদের তলায় শোও!

    তুমি আমার মুখ দিয়ে কথা বলো

    আমার চোখ দিয়ে দ্যাখো

    এই ঘর তোমার আর আমার কবিতা তোমার।

    যা ভালো লাগে তার জন্য আরেকবার বেঁচে নাও

    আমি নজর রাখছি ।

     

    হয়তো তুমিই ছিলে সেই দানব যে কেঁদেছিল

    আমার উঁচু দেয়ালের পেছনে ?

    রেশমি ফিতের চেয়েও মোলায়েম তুমি ফিরে এসেছো

    আমার দৈব দুর্বৃত্ত

    এক নতুন মৃত্যুর মাধ্যমে নিয়তি আবার তছনছ করে

    আমাদের নিরানন্দ ভালোবাসাগুলো

    কেননা তুমিই তো ছিলে আবার, পিলর, মিথ্যা বোলো না

    এই চুরিকরা ছায়াগুলো !

     

    যে খোকাটাকে আমি খুঁজছিলুম

    বাচ্চাদের মধ্যে খেলছে

    নিজের বিছানায় মরে পড়ে আছে, একা

    এক রাজকুমারের মতন ।

    নিজের আলতো পায়ে ইতস্তত করে

    এক মহিমা ওর পায়ে জুতো পরায়

    আর দেহ ঢেকে দ্যায়

    রাজকীয় পতাকায় ।

    হাতে গোলাপ ধরে-থাকা মিষ্টি ভঙ্গীতে

    শবগুলো কে যে হাত লুটপাট করছিল তা চিনতে পারলুম।

    একজন সেনা অমন কাজ করবে না

    যা তুমি, একা, করেছিলে

    আর তুমি তাদের মধ্যে নেমে গেলে

    ভয়ও পেলে না

    পশ্চাত্তাপও নয় ।

    তোমার দেহের মতন

    একটা কালো গেঞ্জি তোমার আত্মাকে দস্তানায় ঢুকিয়ে রাখলো

    আর যখন তুমি নির্দিষ্ট সমাধিকে অপবিত্র করলে

    তুমি ছুরির ডগা দিয়ে খোদাই করে দিলে

    শব্দ আন্দাজ করার ধাঁধা

    বিদ্যুৎ দিয়ে নকশাকাটা ।

    আমরা তোমার উথ্থান দেখেছি, উন্মাদনায় বয়ে যাওয়া

    নিজের চুলে ঝুলছ

    লোহার মুকুটে

    মুক্ত-বসানো ফিতেয় আর বাসি গোলাপে

    জীবন্ত ধরবার জন্যে মোচড়ানো হাত ।

    তোমার মৃদু হাসি আমাদের দেখাবার জন্য সবেই ফিরেছ

    তুমি দ্রুত উধাও হয়ে গেলে আমার মনে হয়

    আমাদের কিছু না জানিয়ে, তোমার ঘুমন্ত গরিমা

    আরেক মুখের সন্ধানে অন্যান্য আকাশে ঘুরে বেড়িয়েছে।

    পথচলতি এক বালককে লক্ষ করি

    তোমার সুগঠিত দেহের ঝলক

    আমি তার মাধ্যমে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছি

    কিন্তু তার এক সামান্য ইশারা

    তার কাছ থেকে তোমাকে উধাও করে দিলো

    আর তোমাকে আমার কবিতায় ছুঁড়ে ফেললো

    যেখান থেকে তুমি পালাতে পারবে না ।

    কোন দেবদূত তাহলে

    তোমাকে পাশ দিয়ে যাবার অনুমতি দিলো

    অকাতরে বস্তুর ভেতর দিয়ে যেতে

    হাত দিয়ে বাতাসকে দুফাঁক করে

    ক্ষেপণাস্ত্রের ডগার সূক্ষ্ম ঘূর্ণনের মতো

    যা নিজের দামি পথ খুঁজে নিজেই তাকে নষ্ট করে ?

    তোমার পালাবার সংকীর্ণতা আমাদের নিরানন্দ করেছিল ।

    এক দ্যুতিময় পিছুটান তোমাকে আমাদের আলিঙ্গনে এনে দিয়েছিল।

    তুমি আমাদের গলায় টোকা মেরে আমাদের মন ভরাতে চাইলে

    আর তোমার হাত ছিল ক্ষমাময়

    কামানো চুলের দরুণ ।

    কিন্তু তুমি আর দেখা দাও না, ফর্সা খোকা যাকে আমি খুঁজি।

    আমি কোনো শব্দে হুঁচোট খাই আর তোমাকে তার বিপরীতে দেখি।

    তুমি আমার কাছ থেকে সরে যাও, কবিতা আমাকে রক্ষা করে।

    কান্নার কাঁটাঝোপের ভেতর দিয়ে আমি বিপথগামী হই ।

    তোমাকে ধরার জন্য আকাশ নানা ফাঁদ পেতেছিল

    করাল আর নতুন, মৃত্যুর সঙ্গে ষড় করে

    এক অদৃশ্য সিংহাসন থেকে নজর রাখছিল

    সুতোগুলো আর গিঁটগুলো

    সোনার ববিনে পরানো ।

    আকাশ এমনকি মৌমাছিদের যাত্রাপথ ব্যবহার করেছিল

    কতোরকমের রশ্মি আর কতোরকমের সুতোর পাক খুলে

    যে সেষ পর্যন্ত ওকে গোলাপের সৌন্দর্য ধরে ফেললো :

    ছবিতে দেখানো এক শিশুর মুখ ।

    এই খেলা যদি নিষ্ঠুর হয় তাহলে আমি নালিশ করব না

    তোমার সুন্দর চোখ খুলে ফেলার জন্য

    দুঃখের এক গান তোমাকে দেখার জন্য পাগল হয়ে গেল

    অতো সন্ত্রাসকে আয়ত্ত করে

    আর এই গান, হাজার বছরের জন্য

    তোমার কফিনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল ।

    দেবতাদের ফাঁদে আটক, তাদের রেশমিসুতোয় কন্ঠরুদ্ধ

    কেন আর কেমন করে না জেনেই তুমি মারা গেলে ।

    তুমি আমাকে ছাপিয়ে জিতে গেছ

    কিন্তু সাপসিঁড়ি লুডোখেলায় হেরে গেছ

    যেখানে আমি তোমাকে ধর্ষণ করার সাহস দেখাই

    ওগো আমার পলাতক প্রেমিকা ।

    কালো সেনারা তাদের বন্দুক নত করলেও

    তুমি ওই বিছানা ছেড়ে পালাতে পারো না যেখানে লোহার মুখোশ

    তোমাকে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে -- কিন্তু হঠাৎ তুমি উঠে দাঁড়াও

    নড়াচড়া না করেই পেছনে পড়ে যাও

    আর নরকে ফেরো ।

     

    ১০

    আমার ভালোবাসার কালকুঠুরি

    তোমার স্পন্দিত ছায়ায়

    আমার চোখ, আচমকা, এক গোপনকথা আবিষ্কার করেছে ।

    আমি কতো রকম শোয়া শুয়েছি তা জগত জানে না

    যেখানে সন্ত্রাস নিজেই গিঁট পাকায় ।

    তোমার অন্ধকার হৃদয়ের দর-দালানগুলো আঁকাবাঁকা পথ

    আর তাদের জড়োকরা স্বপ্নগুলো স্তব্ধতাকে সঙ্গঠিত করে

    কবিতার সঙ্গে মিল আছে এমন এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়া

    আর তার হুবহু তীব্রতা ।

    আমার চোখ আর আমার কপাল থেকে

    তোমার রাত কালির বন্যা বয়ে যেতে দ্যায়

    এমন ঘন পালক যার ওপরে আমি এখানে শুই

    নিয়ে আসবে কুসুমিত নক্ষত্রদের

    যেমন কেউ গোলাগুলির বেড়াজালে দেখতে পায় ।

    আমি তরল অন্ধকারের দিকে এগোই

    যেখানে অবয়বহীন ষড়যন্ত্রেরা

    ধীরে ধীরে আকার পাওয়া আরম্ভ করে ।

    কেনই বা আমি সাহায্যের জন্য আর্তনাদ করব ?

    আমার সমস্ত অঙ্গবিক্ষেপ ভেঙে টুকরো হয়

    আমার আমার কান্নাগুলো

    খুবই সুন্দর ।

    আমার চাপা দুর্দশা থেকে শুধু তুমিই জানতে পারবে

    দিনের মেলে দেয়া অদ্ভুত সৌন্দর্যগুলো ।

    ওদের হাজার রকমের ভেলকিবাজির পর

    যে বজ্জাতদের কথা আমি শুনি

    খোলা বাতাসে ভিড় জমায় ।

    পৃথিবীতে তারা একজন কোমল প্রতিনিধি পাঠায়

    এক শিশু যে কারোর পরোয়া করে না, আর নিজের যাত্রাপথ চিহ্ণিত করে

    অনেকরকমের চামড়া ফাটিয়ে

    আর ওর খোশমেজাজি বার্তা

    এখানে পায় নিজের জাঁকজমক ।

    কবিতাটা পযে তুমি লজ্জায় ফ্যাকাশে হয়ে যাও

    অপরাধী অঙ্গভঙ্গী দিয়ে একজন বয়ঃসন্ধির লেখা

    কিন্তু তুমি কখনও জানতে পারবে না

    মৌলিক গিঁটগুলোর কোনও ব্যাপার

    যা আমার মলিন ক্রোধের ফসল

    কেননা ওর রাতে যে গন্ধগুলো গড়াচ্ছে তা খুবই তীব্র।

    ও সই করবে পিলর আর ওর মহিমান্বয়ন হবে

    গোলাপ-স্রোতের উজ্বল ফাঁসিমঞ্চ

    মৃত্যুর সুন্দর কর্মফল ।

     

    ১১

    সম্ভাবনা -- সবচেয়ে মহার্ঘ সম্ভাবনা !

    প্রায়ই আমার পালককে তৈরি করতে বাধ্য করেছে

    আমার সমস্ত কবিতার হৃদয়কেন্দ্র

    সেই গোলাপ যার ওপরে শাদা শব্দে লেখা মৃত্যু

    বাহুর ফেট্টিতে নকশা করা

    যে কালো যুদ্ধাদের আমি ভালোবাসি তাদের নাম।

    আমার রাতের ভেতর দিয়ে কোন বাগানই বা ফুল ফোটাতে পারে

    কোন যন্ত্রণাময় খেলা এখানে হয় যে

    এই কেটে নেয়া গোলাপ থেকে পাপড়ি ছেঁড়া হয়

    আর কে তাকে নিঃশব্দে ফাঁকা কাগজে নিয়ে যায়

    যেখানে তোমার হাসি তাকে অভিবাদন করে ?

    কিন্তু মৃত্যুর ব্যাপারে বিশেষকিছু আমি জানি না

    মেয়েটির বিষয়ে এতো কথা বলার পরও

    আর গুরুতর উপায়ে

    তাহলে মেয়েটি আমার ভেতরেই বাস করে

    যাতে সহজে জেগে উঠতে পারে

    আমার আমার আবোলতাবোল থেকে বইতে পারে

    অন্তত আমার শব্দগুলো ।

    মেয়েটির বিষয়ে আমি কিছুই জানি না

    বলা হয় যে ওর সৌন্দর্যের ইন্দ্রজাল

    অনন্তকালকে খেয়ে ফ্যালে

    কিন্তু এই বিশুদ্ধ বিচরণ পরাজয়ে বিদীর্ণ হয়

    আর এক বিয়োগান্তক বিশৃঙ্খলার গোপনীয়তাকে ফাঁস করে ।

    অশ্রুবিন্দুর আবহাওয়ায় ঘুরে বেড়িয়ে ফ্যাকাশে

    মেয়েটি খালি পায়ে আসে ফুৎকারে আত্মপ্রকাশিত হয়ে

    আমার উপরিতলে যেখানে ফুলের এই তোড়াগুলো

    আমাকে শেখায়  মৃত্যুর

    কন্ঠরোধী কোমলতা।

    আমি নিজেকে তোমার আলিঙ্গনে ছেড়ে দেবো, হে বর্ণোজ্বল মৃত্যু

    কেননা আমি জানি কেমন করে আবিষ্কার করতে হয়

    আমার উন্মুক্ত শৈশবের চলমান চারণভূমি

    যেখানে তুমি আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে যাবে

    অপরিচিত লোকটার ফুলেফুলে সাজানো লিঙ্গের কাছে ।

    আর এই শক্তিতে বলবান, হে রানি, আমি হবো

    তোমার ছায়াদের নাটকের গোপন মন্ত্রী ।

    মিষ্টি মৃত্যু, আমাকে নাও, আমি তৈরি

    এই যে আমি এখানে, আমি যাচ্ছি

    তোমার নিরানন্দ শহরে ।

     

    ১২

    একটা শব্দে আমার কন্ঠস্বর হুঁচোট খায়

    আর অভিঘাত থেকে তুমি উৎসারিত হও

    এই অলৌকিকতার জন্য ততোটা উৎসাহী

    যতোটা তুমি তোমার অপরাধগুলোর জন্য !

    কেই বা তাহলে অবাক হবে

    যখন আমি আমার নথিগুলো খুলে ধরব

    যাতে পূঙ্খানুপূঙ্খভাবে অন্বেষণ করা যাব

    শব্দের ঝোপঝাড়গুলো ?

    আমার হাতে আরও দড়ি ধরিয়ে দেবার জন্য বন্ধুরা লক্ষ রাখে

    জেলখানার ছড়ানো ঘাসে তুমি ঘুমিয়ে পড়ো ।

    তোমার জন্য, এমনকি তোমার বন্ধুত্বের জন্য

    আমি পরোয়া করি না ।

    আমি এই সৌভাগ্যকে আগলে রাখি

    যা বিচারকরা আমাকে দেন ।

    এটাকি তুমি, অন্য আমি, তোমার রুপোর চটি ছাড়াই

    সালোম, যে আমাকে একটা গোলাপ কেটে এনে দ্যায় ?

    এই রক্তাক্ত গোলাপ, শেষ পর্যন্ত তার ব্যাণ্ডেজ থেকে খোলা

    তা কি মেয়েটির, নাকি এটা জাঁ জেনের মাথা ?

    উত্তর দাও পিলর ! তোমার চোখের পাতাকে পিটপিট করতে দাও

    আমার সঙ্গে তির্যক কথা বলো, তোমার গলায় গান গাও

    তোমার চুলের কাছে কাটা আর গোলাপঝাড় থেকে পড়ে যাওয়া

    হুবহু শব্দে, হে আমার গোলাপ

    আমার প্রার্থনাকে মেনে নাও ।

     

    ১৩

    হে আমার কারাগার যেখানে আমার বয়স না বাড়লেই আমি মারা পড়ি

    আমি তোমাকে ভালোবাসি ।

    জীবন, মৃত্যু দিয়ে সাজানো, আমাকে শুষে নেয় ।

    তাদের ধীর কঠিন ওয়ালৎজ উল্টোদিকে নাচা হয়

    প্রত্যেকে নিজের মহিমান্বিত কার্যকারণের পাক খোলে

    অন্যের বিরোধীতায় ।

    তবু, আমার অনেকটা জায়গা আছে, এটা আমার সমাধি নয়

    আমার জেলখুপরি বেশ বড়ো আর আমার জানালা অতিবিশুদ্ধ ।

    আবার জন্ম নেবার জন্য অপেক্ষা করছি জন্মের আগের রাতে

    আমি নিজেকে তেমনভাবে বাঁচার অনুমতি দিয়েছি যাতে আমাকে

    মৃত্যু চিনতে পারে

    উচ্চতর ইশারার মাধ্যমে ।

    আকাশ ছাড়া আর সকলের জন্য আমি আমার দরোজা চিরকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছি

    আর আমি কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ মুহূর্তের অনুমতি দিই

    খোকা চোরগুলোকে যাদের ফিসফিসানিতে আমার কান গুপ্তচরগিরি করে

    নিষ্ঠুর আশায়, আমার সাহায্যের ডাকের জন্য

    তাদের সমাপ্ত গানের মাধ্যমে ।

    যদি আমি ইতস্তত করি আমার গান নকল নয়

    কেননা আমি আমার গভীর মাটির তলায় খোঁজ করি

    আর আমি প্রতিবার একই ধ্বনন নিয়ে উঠে আসি

    জীবন্ত কবর দেয়া ঐশ্বর্যের টুকরো-টাকরা

    যা জগতের আরম্ভ থেকে ছিল ।

    যদি তুমি দ্যাখো আমার টেবিলের ওপরে ঝুঁকে আছি

    সাহিত্যে বরবাদ আমার মুখাবয়ব

    তাহলে বুঝবে যে এটা আমাকেও পীড়িত করে

    এই ভয়ঙ্কর দুঃসাহসিক কাজ

    আবিষ্কার করার স্পর্ধা

    সেই লুকোনো সোনার

    এই প্রচুর

    পচনের তলায় ।

    এক আনন্দময় জ্যোতি আমার চোখে উদ্ভাসিত হয়

    যেন উজ্বল ভোরবেলায় এক জাজিম

    পাথরের ওপরে বেছানো 

    তোমার চলাফেরায় বাধা দেবার জন্য

    গোলোকধাঁধা জুড়ে

    কন্ঠরুদ্ধ দর-দালানগুলোতে

    তোমার চৌকাঠ থেকে

    ভোরের

    সিংহদ্বার পর্যন্ত ।

     

    ( কবিতাটি মরিস পিলর [ Maurice Pilogre ] নামে একজন নামকরা অপরাধীকে উদ্দেশ্য করে। জেলে তার সঙ্গে জাঁ জেনের পরিচয় ।  ১৯৩৯ সালে গিলোটিনে তার মাথা কাটা হয়েছিল । মরিস পিলর হাসিমুখে গিলোটিনে মাথা দিয়েছিল ; রাষ্ট্রপতির ক্ষমাভিক্ষা চায়নি । )

  • মলয় রায়চৌধুরী | 223.177.62.180 | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:৩৭735114
  • জাঁ জেনে’র কবিতা ( ১৯১০ - ১৯৮৬ )  ‘শবযাত্রার কুচকাওয়াজ’

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    এক কোনে আবদ্ধ, একটুখানি রাত রয়ে গেছে।

    আমাদের ভিতু আকাশে নির্মম আঘাতে স্ফূলিঙ্গ উগরে

    ( নৈশব্দের গাছেরা কিছু দীর্ঘশ্বাস ঝুলিয়ে রেখেছে )

    এই শূন্যতার শীর্ষে গরিমার এক গোলাপ জেগে।

    ঘুম বড়োই বিশ্বাসঘাতক যেখানে জেলখানা আমায় নিয়ে এসেছে

    যদিও আমার গোপন দালানে বেশ আস্পষ্টভাবে

    ওই অহংকারী ছোঁড়া গভীরভাবে নিজের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে

    নাবিকদের আলোয় ঝলমলিয়ে যারা শব-সুন্দরী  গড়ে তোলে ।

     

    ও আমাকে নিজের ভেতরে শেকল পরিয়ে রাখে

    জেলখানার এই কুড়ি বছর বয়সী পরিদর্শক

    আর ও আমায় চিরকালের জন্য শেকল পরিয়ে রাখে !

    একটিমাত্র ইঙ্গিত, ওর চোখ, দাঁতে চুল চিবোয় :

    আমার হৃদয় খুলে যায়, আর পরিদর্শক, উৎসবময় উল্লাসে

    আমাকে নিজের অন্তরে জেলবন্দী করে ।

    এই অসূ্য়াভরা দরোজা আবার বন্ধ হবার সুযোগ পায় না

    অনেক বেশি দয়ায়

    আর তুমি তো ইতোমধ্যেই ফিরেছো । তোমার পরিপূর্ণতা আমাকে আতঙ্কিত করে

    আর আমি আজকে শুনতে পাই আমাদের ভালোবাসা বর্ণিত হচ্ছে

    তোমার মুখে যা গান গায় ।

    এই ছোরামারা ট্যাঙ্গো যা জেলখুপরি শুনতে পায়

    বিদায়বেলার এই ট্যাঙ্গোনাচ ।

    তাহলে কি তুমি, হে প্রভূ, এই উজ্বল বাতাসে ?

    তোমার আত্মা গোপন পথে এগিয়েছে

    দেবতাদের থেকে পার পাবার জন্য ।

     

    যখন তুমি ঘুমোও রাতের আস্তাবল ভেঙে ঘোড়ারা 

    তোমার চ্যাটালো বুকে নামে, আর জানোয়ারগুলোর টগবগ

    অন্ধকারকে ছত্রভঙ্গ করে তোলা যেখানে ঘুম নিজের

    ক্ষমতার যন্ত্র চালায়, আমার মগজ থেকে ছিঁড়ে

    একটুও শব্দ না করেই ।

    ঘুম অনেক শাখা তৈরি করে

    তোমার পা থেকে ফুল

    তাদের কান্নায় কন্ঠরুদ্ধ হয়ে মারা যেতে আমি ভয় পাই ।

    তোমার মোলায়ের পাছার বাঁকের ওপরে, মিলিয়ে যাবার আগে

    তোমার শাদা ত্বকে তা নীলাভ।

    কিন্তু একজন জেল পরিদর্শক কি তোমাকে জাগিয়ে তুলতে পারে, আমার কচি চোর

    যখন তুমি তোমার হাত ধুয়ে নাও ( ওই পাখিগুলো তোমার দস্তানায়

    ডানা ঝাপটায়, একশো দুঃখের ভারে )

    তারপর তুমি নির্দয়ভাবে নক্ষত্রদের আলোকরশ্মিকে ছারখার করে দাও

    তোমার কাঁদতে-থাকা মুখের ওপরে ।

    তোমার শোকেভরা অবশিষ্টাংশে

    মহিমাময় অঙ্গভঙ্গী ধরে রাখা হয়

    তোমার হাত যেটা একে ছুঁড়ে দিয়েছিল, রশ্মি দিয়ে বীজ পুঁতেছিল।

    তোমার গেঞ্জি, তোমার শার্ট, আর তোমার কালো বেল্ট

    আমার জেলখুপরিকে অবাক করে আর আমাকে হতবুদ্ধি করে তোলে

    তোমার সুন্দর হস্তিদন্তের সামনে ।

     

    সারাদিনের সুন্দর রাতগুলো

    পিলর-এর অন্ধকার

    তোমার কালো পাকের ভেতরে

    আমার ছুরি জাল করা হয় ।

    ঈশ্বর, এখানে আমি উলঙ্গ

    আমার ভয়ঙ্কর লুভরেতে ।

    কেউ চিনতে পারে না

    তোমার বন্ধ মুঠো আমায় খুলে দ্যায় ।

    আমি ভালোবাসা ছাড়া কিছু নই

    আমার সমস্ত শাখা জ্বলে

    যদি আমি দিনটাকে অন্ধকার করে দিই

    তারপর আমার ভেতরের ছায়া নিজেকে গুটিয়ে নেয় ।

    বিশুদ্ধ হাওয়ায় এটা সম্ভব

    আমার শুকনো দেহ গুঁড়িয়ে ধুলোয় মেশার জন্য

    দেয়ালে পিঠ দিয়ে

    আমি বিদ্যুতের চমকের দখল নিই ।

    হৃদয় আমার সূর্য

    মোরগের ডাকে চৌচির হয়ে যায়

    ঘুম কখনও সাহস দেখায় না

    এখানে তার স্বপ্নগুলোকে উথলে দিতে।

    আমার আকাঙ্খায় শুকিয়ে যাওয়া

    আমি স্তব্ধতাকে মেরামত করে দিই

    পাখিদের আগুন দিয়ে

    যা আমার গাছ থেকে জেগেছে ।

     

    নিষ্ঠুর প্রকৃতির মনে হয় এমন মহিলাদের থেকে

    তাদের খবরিয়ারা গয়না পরে থাকে ।

    গলির এই ছিঁচকে চোরগুলো রাতের বেলায় জেগে ওঠে

    আর তাদের ইশারা পেয়ে তুমি সাহসে বেরিয়ে পড়ো।

    অমন এক কচিখোকা, নিজের মায়াময় পোশাকে কাঁপে

    ও ছিল আমার কাছে পাঠানো দেবদূত, যার আলোময় দিশা

    আমি অনুসরণ করি বিভ্রান্ত হয়ে, যাত্রায় পাগল হয়ে

    এই জেলখুপরি পর্যন্ত যেখানে তার প্রত্যাখ্যান ছিল জ্যোতির্ময়।

    যখন আমি অন্য সুরে গাইতে চাইলুম

    আমার পালক আলোকরশ্মিতে জড়িয়ে পড়লো

    এক ঝিমধরা শব্দে, মাথা নিচু করে

    আমি বোকার মতন পড়ে গেলুম, এই ভুলের মাশুল হিসেবে

    এই খাদের তলায় ।

     

    আর কিছুই গোলমাল

    বাধাবে না অনন্তকালীন ঋতুতে

    যেখানে আমি নিজেকে আটক আবিষ্কার করছি ।

    একাকীত্বের স্হির জলাশয়

    আমাকে পাহারা দেয় আর জেলখানা ভরে রাখে ।

    আমি চিরকালের জন্য কুড়ি বছর বয়সী

    তোমাদের নিরীক্ষণ সত্বেও ।

    তোমাদের মন রাখতে, ওহ বধির সৌন্দর্যের অনাথ

    মারা না যাওয়া পর্যন্ত আমি পোশাক পরে থাকবো

    আর তোমার আত্মা তোমার মুণ্ডকাটা ধড়কে ছেড়ে গিয়ে

    আমার ভেতরে খুঁজে পাবে এক শাদা আশ্রয় ।

    ওহ একথা জানতে পারা যে তুমি আমার মামুলি ছাদের তলায় শোও!

    তুমি আমার মুখ দিয়ে কথা বলো

    আমার চোখ দিয়ে দ্যাখো

    এই ঘর তোমার আর আমার কবিতা তোমার।

    যা ভালো লাগে তার জন্য আরেকবার বেঁচে নাও

    আমি নজর রাখছি ।

     

    হয়তো তুমিই ছিলে সেই দানব যে কেঁদেছিল

    আমার উঁচু দেয়ালের পেছনে ?

    রেশমি ফিতের চেয়েও মোলায়েম তুমি ফিরে এসেছো

    আমার দৈব দুর্বৃত্ত

    এক নতুন মৃত্যুর মাধ্যমে নিয়তি আবার তছনছ করে

    আমাদের নিরানন্দ ভালোবাসাগুলো

    কেননা তুমিই তো ছিলে আবার, পিলর, মিথ্যা বোলো না

    এই চুরিকরা ছায়াগুলো !

     

    যে খোকাটাকে আমি খুঁজছিলুম

    বাচ্চাদের মধ্যে খেলছে

    নিজের বিছানায় মরে পড়ে আছে, একা

    এক রাজকুমারের মতন ।

    নিজের আলতো পায়ে ইতস্তত করে

    এক মহিমা ওর পায়ে জুতো পরায়

    আর দেহ ঢেকে দ্যায়

    রাজকীয় পতাকায় ।

    হাতে গোলাপ ধরে-থাকা মিষ্টি ভঙ্গীতে

    শবগুলো কে যে হাত লুটপাট করছিল তা চিনতে পারলুম।

    একজন সেনা অমন কাজ করবে না

    যা তুমি, একা, করেছিলে

    আর তুমি তাদের মধ্যে নেমে গেলে

    ভয়ও পেলে না

    পশ্চাত্তাপও নয় ।

    তোমার দেহের মতন

    একটা কালো গেঞ্জি তোমার আত্মাকে দস্তানায় ঢুকিয়ে রাখলো

    আর যখন তুমি নির্দিষ্ট সমাধিকে অপবিত্র করলে

    তুমি ছুরির ডগা দিয়ে খোদাই করে দিলে

    শব্দ আন্দাজ করার ধাঁধা

    বিদ্যুৎ দিয়ে নকশাকাটা ।

    আমরা তোমার উথ্থান দেখেছি, উন্মাদনায় বয়ে যাওয়া

    নিজের চুলে ঝুলছ

    লোহার মুকুটে

    মুক্ত-বসানো ফিতেয় আর বাসি গোলাপে

    জীবন্ত ধরবার জন্যে মোচড়ানো হাত ।

    তোমার মৃদু হাসি আমাদের দেখাবার জন্য সবেই ফিরেছ

    তুমি দ্রুত উধাও হয়ে গেলে আমার মনে হয়

    আমাদের কিছু না জানিয়ে, তোমার ঘুমন্ত গরিমা

    আরেক মুখের সন্ধানে অন্যান্য আকাশে ঘুরে বেড়িয়েছে।

    পথচলতি এক বালককে লক্ষ করি

    তোমার সুগঠিত দেহের ঝলক

    আমি তার মাধ্যমে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছি

    কিন্তু তার এক সামান্য ইশারা

    তার কাছ থেকে তোমাকে উধাও করে দিলো

    আর তোমাকে আমার কবিতায় ছুঁড়ে ফেললো

    যেখান থেকে তুমি পালাতে পারবে না ।

    কোন দেবদূত তাহলে

    তোমাকে পাশ দিয়ে যাবার অনুমতি দিলো

    অকাতরে বস্তুর ভেতর দিয়ে যেতে

    হাত দিয়ে বাতাসকে দুফাঁক করে

    ক্ষেপণাস্ত্রের ডগার সূক্ষ্ম ঘূর্ণনের মতো

    যা নিজের দামি পথ খুঁজে নিজেই তাকে নষ্ট করে ?

    তোমার পালাবার সংকীর্ণতা আমাদের নিরানন্দ করেছিল ।

    এক দ্যুতিময় পিছুটান তোমাকে আমাদের আলিঙ্গনে এনে দিয়েছিল।

    তুমি আমাদের গলায় টোকা মেরে আমাদের মন ভরাতে চাইলে

    আর তোমার হাত ছিল ক্ষমাময়

    কামানো চুলের দরুণ ।

    কিন্তু তুমি আর দেখা দাও না, ফর্সা খোকা যাকে আমি খুঁজি।

    আমি কোনো শব্দে হুঁচোট খাই আর তোমাকে তার বিপরীতে দেখি।

    তুমি আমার কাছ থেকে সরে যাও, কবিতা আমাকে রক্ষা করে।

    কান্নার কাঁটাঝোপের ভেতর দিয়ে আমি বিপথগামী হই ।

    তোমাকে ধরার জন্য আকাশ নানা ফাঁদ পেতেছিল

    করাল আর নতুন, মৃত্যুর সঙ্গে ষড় করে

    এক অদৃশ্য সিংহাসন থেকে নজর রাখছিল

    সুতোগুলো আর গিঁটগুলো

    সোনার ববিনে পরানো ।

    আকাশ এমনকি মৌমাছিদের যাত্রাপথ ব্যবহার করেছিল

    কতোরকমের রশ্মি আর কতোরকমের সুতোর পাক খুলে

    যে সেষ পর্যন্ত ওকে গোলাপের সৌন্দর্য ধরে ফেললো :

    ছবিতে দেখানো এক শিশুর মুখ ।

    এই খেলা যদি নিষ্ঠুর হয় তাহলে আমি নালিশ করব না

    তোমার সুন্দর চোখ খুলে ফেলার জন্য

    দুঃখের এক গান তোমাকে দেখার জন্য পাগল হয়ে গেল

    অতো সন্ত্রাসকে আয়ত্ত করে

    আর এই গান, হাজার বছরের জন্য

    তোমার কফিনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল ।

    দেবতাদের ফাঁদে আটক, তাদের রেশমিসুতোয় কন্ঠরুদ্ধ

    কেন আর কেমন করে না জেনেই তুমি মারা গেলে ।

    তুমি আমাকে ছাপিয়ে জিতে গেছ

    কিন্তু সাপসিঁড়ি লুডোখেলায় হেরে গেছ

    যেখানে আমি তোমাকে ধর্ষণ করার সাহস দেখাই

    ওগো আমার পলাতক প্রেমিকা ।

    কালো সেনারা তাদের বন্দুক নত করলেও

    তুমি ওই বিছানা ছেড়ে পালাতে পারো না যেখানে লোহার মুখোশ

    তোমাকে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে -- কিন্তু হঠাৎ তুমি উঠে দাঁড়াও

    নড়াচড়া না করেই পেছনে পড়ে যাও

    আর নরকে ফেরো ।

     

    ১০

    আমার ভালোবাসার কালকুঠুরি

    তোমার স্পন্দিত ছায়ায়

    আমার চোখ, আচমকা, এক গোপনকথা আবিষ্কার করেছে ।

    আমি কতো রকম শোয়া শুয়েছি তা জগত জানে না

    যেখানে সন্ত্রাস নিজেই গিঁট পাকায় ।

    তোমার অন্ধকার হৃদয়ের দর-দালানগুলো আঁকাবাঁকা পথ

    আর তাদের জড়োকরা স্বপ্নগুলো স্তব্ধতাকে সঙ্গঠিত করে

    কবিতার সঙ্গে মিল আছে এমন এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়া

    আর তার হুবহু তীব্রতা ।

    আমার চোখ আর আমার কপাল থেকে

    তোমার রাত কালির বন্যা বয়ে যেতে দ্যায়

    এমন ঘন পালক যার ওপরে আমি এখানে শুই

    নিয়ে আসবে কুসুমিত নক্ষত্রদের

    যেমন কেউ গোলাগুলির বেড়াজালে দেখতে পায় ।

    আমি তরল অন্ধকারের দিকে এগোই

    যেখানে অবয়বহীন ষড়যন্ত্রেরা

    ধীরে ধীরে আকার পাওয়া আরম্ভ করে ।

    কেনই বা আমি সাহায্যের জন্য আর্তনাদ করব ?

    আমার সমস্ত অঙ্গবিক্ষেপ ভেঙে টুকরো হয়

    আমার আমার কান্নাগুলো

    খুবই সুন্দর ।

    আমার চাপা দুর্দশা থেকে শুধু তুমিই জানতে পারবে

    দিনের মেলে দেয়া অদ্ভুত সৌন্দর্যগুলো ।

    ওদের হাজার রকমের ভেলকিবাজির পর

    যে বজ্জাতদের কথা আমি শুনি

    খোলা বাতাসে ভিড় জমায় ।

    পৃথিবীতে তারা একজন কোমল প্রতিনিধি পাঠায়

    এক শিশু যে কারোর পরোয়া করে না, আর নিজের যাত্রাপথ চিহ্ণিত করে

    অনেকরকমের চামড়া ফাটিয়ে

    আর ওর খোশমেজাজি বার্তা

    এখানে পায় নিজের জাঁকজমক ।

    কবিতাটা পযে তুমি লজ্জায় ফ্যাকাশে হয়ে যাও

    অপরাধী অঙ্গভঙ্গী দিয়ে একজন বয়ঃসন্ধির লেখা

    কিন্তু তুমি কখনও জানতে পারবে না

    মৌলিক গিঁটগুলোর কোনও ব্যাপার

    যা আমার মলিন ক্রোধের ফসল

    কেননা ওর রাতে যে গন্ধগুলো গড়াচ্ছে তা খুবই তীব্র।

    ও সই করবে পিলর আর ওর মহিমান্বয়ন হবে

    গোলাপ-স্রোতের উজ্বল ফাঁসিমঞ্চ

    মৃত্যুর সুন্দর কর্মফল ।

     

    ১১

    সম্ভাবনা -- সবচেয়ে মহার্ঘ সম্ভাবনা !

    প্রায়ই আমার পালককে তৈরি করতে বাধ্য করেছে

    আমার সমস্ত কবিতার হৃদয়কেন্দ্র

    সেই গোলাপ যার ওপরে শাদা শব্দে লেখা মৃত্যু

    বাহুর ফেট্টিতে নকশা করা

    যে কালো যুদ্ধাদের আমি ভালোবাসি তাদের নাম।

    আমার রাতের ভেতর দিয়ে কোন বাগানই বা ফুল ফোটাতে পারে

    কোন যন্ত্রণাময় খেলা এখানে হয় যে

    এই কেটে নেয়া গোলাপ থেকে পাপড়ি ছেঁড়া হয়

    আর কে তাকে নিঃশব্দে ফাঁকা কাগজে নিয়ে যায়

    যেখানে তোমার হাসি তাকে অভিবাদন করে ?

    কিন্তু মৃত্যুর ব্যাপারে বিশেষকিছু আমি জানি না

    মেয়েটির বিষয়ে এতো কথা বলার পরও

    আর গুরুতর উপায়ে

    তাহলে মেয়েটি আমার ভেতরেই বাস করে

    যাতে সহজে জেগে উঠতে পারে

    আমার আমার আবোলতাবোল থেকে বইতে পারে

    অন্তত আমার শব্দগুলো ।

    মেয়েটির বিষয়ে আমি কিছুই জানি না

    বলা হয় যে ওর সৌন্দর্যের ইন্দ্রজাল

    অনন্তকালকে খেয়ে ফ্যালে

    কিন্তু এই বিশুদ্ধ বিচরণ পরাজয়ে বিদীর্ণ হয়

    আর এক বিয়োগান্তক বিশৃঙ্খলার গোপনীয়তাকে ফাঁস করে ।

    অশ্রুবিন্দুর আবহাওয়ায় ঘুরে বেড়িয়ে ফ্যাকাশে

    মেয়েটি খালি পায়ে আসে ফুৎকারে আত্মপ্রকাশিত হয়ে

    আমার উপরিতলে যেখানে ফুলের এই তোড়াগুলো

    আমাকে শেখায়  মৃত্যুর

    কন্ঠরোধী কোমলতা।

    আমি নিজেকে তোমার আলিঙ্গনে ছেড়ে দেবো, হে বর্ণোজ্বল মৃত্যু

    কেননা আমি জানি কেমন করে আবিষ্কার করতে হয়

    আমার উন্মুক্ত শৈশবের চলমান চারণভূমি

    যেখানে তুমি আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে যাবে

    অপরিচিত লোকটার ফুলেফুলে সাজানো লিঙ্গের কাছে ।

    আর এই শক্তিতে বলবান, হে রানি, আমি হবো

    তোমার ছায়াদের নাটকের গোপন মন্ত্রী ।

    মিষ্টি মৃত্যু, আমাকে নাও, আমি তৈরি

    এই যে আমি এখানে, আমি যাচ্ছি

    তোমার নিরানন্দ শহরে ।

     

    ১২

    একটা শব্দে আমার কন্ঠস্বর হুঁচোট খায়

    আর অভিঘাত থেকে তুমি উৎসারিত হও

    এই অলৌকিকতার জন্য ততোটা উৎসাহী

    যতোটা তুমি তোমার অপরাধগুলোর জন্য !

    কেই বা তাহলে অবাক হবে

    যখন আমি আমার নথিগুলো খুলে ধরব

    যাতে পূঙ্খানুপূঙ্খভাবে অন্বেষণ করা যাব

    শব্দের ঝোপঝাড়গুলো ?

    আমার হাতে আরও দড়ি ধরিয়ে দেবার জন্য বন্ধুরা লক্ষ রাখে

    জেলখানার ছড়ানো ঘাসে তুমি ঘুমিয়ে পড়ো ।

    তোমার জন্য, এমনকি তোমার বন্ধুত্বের জন্য

    আমি পরোয়া করি না ।

    আমি এই সৌভাগ্যকে আগলে রাখি

    যা বিচারকরা আমাকে দেন ।

    এটাকি তুমি, অন্য আমি, তোমার রুপোর চটি ছাড়াই

    সালোম, যে আমাকে একটা গোলাপ কেটে এনে দ্যায় ?

    এই রক্তাক্ত গোলাপ, শেষ পর্যন্ত তার ব্যাণ্ডেজ থেকে খোলা

    তা কি মেয়েটির, নাকি এটা জাঁ জেনের মাথা ?

    উত্তর দাও পিলর ! তোমার চোখের পাতাকে পিটপিট করতে দাও

    আমার সঙ্গে তির্যক কথা বলো, তোমার গলায় গান গাও

    তোমার চুলের কাছে কাটা আর গোলাপঝাড় থেকে পড়ে যাওয়া

    হুবহু শব্দে, হে আমার গোলাপ

    আমার প্রার্থনাকে মেনে নাও ।

     

    ১৩

    হে আমার কারাগার যেখানে আমার বয়স না বাড়লেই আমি মারা পড়ি

    আমি তোমাকে ভালোবাসি ।

    জীবন, মৃত্যু দিয়ে সাজানো, আমাকে শুষে নেয় ।

    তাদের ধীর কঠিন ওয়ালৎজ উল্টোদিকে নাচা হয়

    প্রত্যেকে নিজের মহিমান্বিত কার্যকারণের পাক খোলে

    অন্যের বিরোধীতায় ।

    তবু, আমার অনেকটা জায়গা আছে, এটা আমার সমাধি নয়

    আমার জেলখুপরি বেশ বড়ো আর আমার জানালা অতিবিশুদ্ধ ।

    আবার জন্ম নেবার জন্য অপেক্ষা করছি জন্মের আগের রাতে

    আমি নিজেকে তেমনভাবে বাঁচার অনুমতি দিয়েছি যাতে আমাকে

    মৃত্যু চিনতে পারে

    উচ্চতর ইশারার মাধ্যমে ।

    আকাশ ছাড়া আর সকলের জন্য আমি আমার দরোজা চিরকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছি

    আর আমি কেবল বন্ধুত্বপূর্ণ মুহূর্তের অনুমতি দিই

    খোকা চোরগুলোকে যাদের ফিসফিসানিতে আমার কান গুপ্তচরগিরি করে

    নিষ্ঠুর আশায়, আমার সাহায্যের ডাকের জন্য

    তাদের সমাপ্ত গানের মাধ্যমে ।

    যদি আমি ইতস্তত করি আমার গান নকল নয়

    কেননা আমি আমার গভীর মাটির তলায় খোঁজ করি

    আর আমি প্রতিবার একই ধ্বনন নিয়ে উঠে আসি

    জীবন্ত কবর দেয়া ঐশ্বর্যের টুকরো-টাকরা

    যা জগতের আরম্ভ থেকে ছিল ।

    যদি তুমি দ্যাখো আমার টেবিলের ওপরে ঝুঁকে আছি

    সাহিত্যে বরবাদ আমার মুখাবয়ব

    তাহলে বুঝবে যে এটা আমাকেও পীড়িত করে

    এই ভয়ঙ্কর দুঃসাহসিক কাজ

    আবিষ্কার করার স্পর্ধা

    সেই লুকোনো সোনার

    এই প্রচুর

    পচনের তলায় ।

    এক আনন্দময় জ্যোতি আমার চোখে উদ্ভাসিত হয়

    যেন উজ্বল ভোরবেলায় এক জাজিম

    পাথরের ওপরে বেছানো 

    তোমার চলাফেরায় বাধা দেবার জন্য

    গোলোকধাঁধা জুড়ে

    কন্ঠরুদ্ধ দর-দালানগুলোতে

    তোমার চৌকাঠ থেকে

    ভোরের

    সিংহদ্বার পর্যন্ত ।

     

    ( কবিতাটি মরিস পিলর [ Maurice Pilogre ] নামে একজন নামকরা অপরাধীকে উদ্দেশ্য করে। জেলে তার সঙ্গে জাঁ জেনের পরিচয় ।  ১৯৩৯ সালে গিলোটিনে তার মাথা কাটা হয়েছিল । মরিস পিলর হাসিমুখে গিলোটিনে মাথা দিয়েছিল ; রাষ্ট্রপতির ক্ষমাভিক্ষা চায়নি । )

  • মলয় রায়চৌধুরী | 223.177.62.180 | ০৭ নভেম্বর ২০২১ ১৯:৩৯735115
  • জাঁ জেনের কবিতা 

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    রণতরী

    একজন মুক্ত কয়েদি, জেদি আর ভয়ঙ্কর, ছুঁড়ে ফেলে দিলো

    পাটাতনের ওপরে একজন কেনা-গোলাম নাবিককে

    কিন্তু তরোয়ালের এক ঝটকায়

    কোটনা, দক্ষিণের ক্রস

    আর খুনি. উত্তরমেরু

    আরেকজনের কান থেকে 

    তার সোনার মাকড়ি হাতিয়ে নিলো ।

    সবচেয়ে সুন্দর হলো তারা

    যাদের চরিত্রে আছে অদ্ভুত গোলমাল ।

    গিটার বেজে ওঠে সুরে ।

    সমুদ্রের ফেনা থুতুকে ভিজিয়ে দ্যায় ।

    আমরা কি একজন পাশার 

    মুখ থেকে

    ফেলে দেয়া মানুষ ?

    «

    ওরা আমাকে পিটুনির কথা বলে আর আমি তোমার ঘুষির আওয়াজ শুনি।

    কে আমাকে গড়িয়ে নিয়ে যায়, হারকামোন, আর আমাকে সেলাই করে দিলো

    তোমার পরতের সঙ্গে ?

    «

    সবুজ-বাহু হারকামোন, উড়ন্ত রানি

    তোমার রাতের গন্ধে

    আর বনানি জেগে ওঠে

    তার নামের আতঙ্কে

    এই দুঃখি কয়েদি গান গায়

    আমার রণতরীতে 

    আর ওর গান

    আমাকে বিধ্বস্ত করে।

    «

    দাঁড়গুলো শেকল আর লজ্জার ভারে 

    ফেননিভ, নৌডাকাত, সমুদ্রের এই ষাঁড়গুলো

    আর তোমার অঙ্গভঙ্গী হাজার বছরের পরিশ্রমে

    তোমার স্মৃতিকে মনে পড়ায়

    আর নৈঃশব্দ

    রয়েছে তোমার স্পষ্ট চোখের রাতে ।

    «

    মৃত্যুর সুতো দিয়ে

    এই রাতের অস্ত্রগুলো

    মদে পক্ষাঘাতগ্রস্ত আমার বাহুকে ধরে নিয়ে গেল

    নাসারন্ধ্রের নীলাভ

    বিপথগামী গোলাপের চালনায়

    যেখানে ঝোপের তলায় কাঁপতে থাকে এক সোনালী হরিণী

    আমি নিজেকে অবাক করে তুলি আর নিজেকে হারাই

    তোমার পথ ধরে

    অবাক নদী

    কথাবার্তার শিরা থেকে বয়ে যায় ।

    «

    এই চিন্তাগুলো যা তুমি পাহারা দাও তার গন্ধ আমার রসনায়

    দুই মোড়া বাহুতে তোমার জুলফিতে বাঁধা 

    তোমার সোনার তলপেট খুলে দাও যাতে তাদের দেখতে পাই

    তোমার  নুন মাখানো বুকের মধ্যে।

    «

    এখানে একটা কুপি জ্বলে

    আমার আধখোলা কফিনের ওপরে

    ভিজে ফুলে সাজানো

    আর তাদের দেখতে থেকে

    যেগুলো ডুবে গেছে  ।

    «

    একটা ইঙ্গিত করো, হারকামোন

    তোমার বাহুকে একটু ছড়িয়ে দাও

    আমাকে পথ দেখাও

    যে পথে তুমি উড়ে যাবে ।

    তুমি ঘুমোও কিংবা মারা পড়ো

    কিন্তু তুমি আবার যোগ দেবে

    এই পাগলিটার সঙ্গে

    যেখানে  শেকলখোলা

    কেনা-গোলাম নাবিকরা ওড়ে

    আমার মতন ফিরে আসে

    কারাগারে, বন্দরে

    অসাধারণ পাতালকুঠুরিতে

    উষ্ণ মদ খেয়ে টলমল করতে করতে ।

    «

    যে সুরেলা পাদ তুমি চেপে যাও

    একদল রোগা কোটনাকে সবুজ ফুলে কারারুদ্ধ করে দ্যায়

    নাসারন্ধ্র ফোলা, আমরা ওদের জন্য অপেক্ষা করবো

    আর পৌঁছোবো ওদের কাছে

    ঢাকা দেয়া রথে ।

    «

    আমার শৈশব রাতের ওপরে সবেমাত্র বেছানো

    জ্বলতে থাকা কাগজে, এই রেশমকে মিশিয়ে

    যা এক মোটা কোটনা  পিঙ্গলরঙা দ্যুতিতে মেলে ধরেছে

    বহুদূরের শান্ত বাতাসে

    আমার শরীর থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

    «

    তা সত্তেও, হরিণী ধরা পড়ে তার পাতার ফাঁদে

    ভোরবেলায় জেগে ওঠে, এক স্বচ্ছ বিদায়

    «

    তোমার চোখের মধ্যে দিয়ে চলে যায়, তোমার স্ফটিক, আর প্রেমে পড়ে

    সমুদ্রে একবিন্দু চোখের জল পড়ার পর, স্বাগত জানায় ।

    «

    বিপদে-পড়া একজন চোর, একজন চোর সমুদ্রে গেছে।

    আর লোহার মুখ নিয়ে কতো কালো হারকামোন

    ফিতে আর চুল ওকে টেনে কাদায় নামায়

    কিংবা সমুদ্রে ? আর মৃত্যুর ?

    তার ভাঙাচোরা গম্বুজকে সাজায়

    পতাকার সেলাই-করা সুতোয়

    মজায় হাসে কোটনাটা ।

    মৃত্যু, যদিও, চালাক

    আমি ঠাট্টা করার সাহস পাচ্ছি না ।

    «

    আমাদের গল্পের অতলে আমি ঘুমন্ত লাফ দিই

    আর তোমার গলা দিয়ে নিজেকে কন্ঠরুদ্ধ করি

    বেচারা সুগন্ধিত হারকামোন ।

    মিষ্টি-মটরের মতন এক সমুদ্রে

    মৃত্যু থেকে চুরি করা তোমার কেবিন-বয় সাহায্যের ডাক দ্যায়

    মুখে তার পরিষ্কার ফেনা

    আকাশের কালো সৈন্যরা যা ছিঁড়ে ফেলেছে

    ফিরে গেছে ওই জলে ।

    ওরা তাকে ফেনা আর মখমল জলপানায় সাজায়।

    প্রেম তাদের পাগড়ি-পরা লিঙ্গকে নাচায়

    ( হরিণী, নীলাভ আর ফুটন্ত গোলাপকে সামলায় )

    দড়িদড়া আর দেহগুলো গিঁটে শক্ত হয়ে গেছে ।

    আর রণতরী নিরেট হয়ে উঠছিল ।

    এক বিহ্বল শব্দ

    জগতের শেষ প্রান্ত

    সুন্দর ব্যবস্হাকে শেষ করে দিলো ।

    আমি দেখলুম প্রবেশপথ কামড়ে ধরছে

    বেড়ি আর জরি ।

    «

    হায়, আমার কয়েদি-হাত না মরেই মারা গেছে ।

    বাগানগুলো বলে না হরিণীকে কোথায়  পরানো হচ্ছে

    তুষারের পোশাক, আমার মহিমায় নিহত

    ফেনার আলখাল্লায় ভালো করে পোশাক পরানো যেতো ।

    «

    কারাগার যা আমাদের ধরে রাখে তা পিছিয়ে যায় ।

    নিজের বিপর্যয়ে চিৎকার করে

    তোমার আঙুরলতায় এক নিশ্চল মুঠি

    তোমার পাতাগুলোয় জড়িয়ে ধরে

    তোমার শীতল সাজানো কন্ঠস্বরের

    মূল পর্যন্ত

    হারকামোন ।

    চলো ফ্রান্সকে আমাদের রণতরীতে ছেড়ে দিই..

    আমি যে কেবিন-বয় ছিলুম নিশ্চয়ই বজ্জাতদের আনন্দ দিয়েছে।

    আমি অসাধারণ ফাঁসুড়ের সামনে দাঁড় বাইছিলুম

    এই হাসিমুখ সৌন্দর্য আমাকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করেছিল

    যেমনভাবে ফুলগুলো জড়িয়ে ধরে

    ( রোকেটের সেই গোলাপফুল, জংলিঘাসের ফাঁস খুলে )

    আর ওর ঢাকনার তলায় গড়ে তুলেছে

    এক আদরের কুঞ্জবন যেখানে গায়ক পাখিরা ওড়ে ।

    মৃদু গানের সুরে পালিয়ে গেলো হরিণী

    একজন রণতরীর কেনা-গোলাম নাবিকের ওপরে ঝুঁকে

    স্বপ্নগুলো ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে চলে গেলো।

    «

    গাছের নীল শাখাগুলো

    নুন থেকে আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে । 

    আমার নিঃসঙ্গতা গান গায়

    আমার রক্তের শুকতারাকে শুনিয়ে

    সোনার বুদবুদে ভরা হাওয়া 

    আমার ঠোঁট চিপে গান বের করে ।

    «

    প্রেমের এক বালক গোলাপি পোশাক পরে

    নিজের বিছানায় মোহসঞ্চারী অঙ্গবিক্ষেপ করছিল ।

    মার্সাইয়ের এক ফ্যাকাসে মাস্তান, তার দাঁতে নক্ষত্র

    আমার সঙ্গে প্রেমে হেরে গেলো ।

    আমার হাত আফিমের বস্তার চোরাচালান করছিল

    বিপর্যয়ের ভার -- আর ঘন জঙ্গল থেকে

    পরের পর চারণভূমিতে

    ছিল ভ্রাম্যমাণ পথ

    তোমার চোখের আলোয়

    তোমার হাত পুনরাবিষ্কার করার জন্য

    তোমার পকেটগুলো, ঈগলের বাসা

    আর সেই বিখ্যাত জায়গা যেখানে  নৈঃশব্দ তুলে নিয়ে যায়

    অন্ধকারের ঐশ্বর্য ।

    বাতাসের বিরুদ্ধে আমার হাসি নিজেকে ভাঙচুর করছিল ।

    আমি বিরক্ত হয়ে আমার ঘেয়ো মাড়ি উৎসর্গ করি

    কারাগারের মশার ডিমগুলোকে

    যেখানে আমাকে সম্প্রতি ঢোকানো হয়েছে ।

    «

    দেয়ালের ওপরের ছায়ায়, যা থেকে নৌচালক--

    নুনে ক্ষয়ে যাওয়া ওর নখ

    যদিও আমার মাপের লম্বা

    রক্তাক্ত হৃদয়ের মাঝে চিন্তাকে বিভ্রান্ত করছিল

    পরিলেখগুলো, অস্ত্র নামিয়ে রেখে

    আমাদের কান্না হায়

    তার কাছে দুর্বোধ্য 

    যে রাতের বেলায় লড়তে পারে না

    যেখানে শব্দগুলো নেকড়ে---

    ঝকঝকে নখ কি অনুমতি দেবে

    আমার উন্মাদ চোখ যা গিলে ফেলতে চাইছে, তাকে

    হাড় পর্যন্ত মাংস তুলে নেয়া
    অ্যান্দোভোরান্তের নাম ?

    «

    গর্বিত লোকটা 

    যে লজ্জায় ভুগছিল

    তাকে কাছাকাছি ধরে রেখেছিল একজন কাউন্টের সদস্যদল ।

    ওরা তাকে হাঁটু আর ঘুষি মেরে পিটুনি দিচ্ছিল।

    বজ্রাহত লোকেরা আমাদের চারপাশে গড়াগড়ি দিচ্ছিল ।

    ( আলোয় উজ্বল হাঁটু, কাদায়

    হাঁটু থেকে হাঁটুতে, ডেকের ওপরে ছড়াচ্ছিল

    হাঁটু, জলেতে যে ঘোড়াগুলো মাথা তুলছিল

    বেঁকা হাঁটু, নাবিকদের হইচই )

    সূর্য গোলাপ পাপড়ি ছড়াচ্ছিল দ্বীপপূঞ্জে ।

    জাহাজ পাক খাচ্ছিল রহস্যময় মাইলের পর মাইল ।

    নিচু গলায় ওরা হাঁকছিল

    এক ঘোষণা যেখানে চুমু পাগলের মতন ফেরাফিরি করছিল 

    বিশ্রাম নিতে অসমর্থ । ফেনার ওপরে

    আমার ভেতরে এক স্হির জলরাশি ছড়িয়ে দিচ্ছিল

    ঠুনকো প্রতিবিম্বটাকে

    যা এক অবিনাশী কেবিন-বয়ের ।

    «

    তোমার দাঁত, প্রভু, তোমার চোখ, আমাকে ভেনিসের কথা বলো !

    তোমার কঠিন ঠ্যাঙের গর্তে ওই পাখিগুলো !

    আমার আলস্য তোমার পায়ের শেকলকে

    আমাকে এখানে ব্যবহার করার জন্য

    ভুলের চেয়েও ভারি করে তোলে !

    «

    বালিশের কিনারা মিটিমিটি হাসে আর পর্দাগুলো যেন ইঁদুর ।

    শার্শি থেকে তুমি আঙুল দিয়ে বাষ্প সংগ্রহ করো ।

    তোমার কোমল ঘুম নিজেকে গিঁটে বেঁধে ফেলছে

    আর তোমার মুখ কুঁচকে যায়

    যখন তোমার সুন্দর চোখ উধাও হয়ে যায়

    সমুদ্রের ছাদের ওপরে ।

    «

    ফাটা ঠোঁটের কিনারায়

    একটা ছেলে যে ঢেউ আর বাতাসে খাপ খায়

    নিশানগুলোর ভেতর দিয়ে অদ্ভুতভাবে বেরিয়ে যায়

    আমি প্রায়ই দেখেছি একটা সিগারেটের মোচড়

    আমার মেয়েলি স্কার্টের ভেতরে ।

    কুড়ি বছর বয়সী এক কেনা-গোলাম নাবিক

    যাকে নিয়ে মশকরা আর  ঠাট্টা করা হয় 

    দেখলো নিজেই মরছে

    নৌকোর দেয়ালে গেঁথে দিয়ে ।

    «

    হারকামোন, তুমি কি ঘুমোও, তোমার মুণ্ডু ঘোরানো

    তোমার মুখ জলেতে, স্বপ্ন দেখে ফিরেছে কি ?

    তুমি আমার বালির ওপরে হাঁটো যেখানে ভারি ফলগুলো ঝরে পড়ে

    যখন কিনা অদ্ভুতভাবে তোমার মখমল অণ্ডকোষ

    আমার চোখে ফেটে পড়ে

    এক ইন্দ্রজালিক গাছের ফুলে-ফুলে কুসুমিত ।

    তোমার রুদ্ধকন্ঠের স্বরে মরে যাওয়া সম্পর্কে যা আমি ভালোবাসি

    তা হল এই আঁটো ক্যানেস্তারায় গরম জল ফুটতে থাকা ।

    অনেক সময়ে তুমি বলো একটা শব্দ আর তার মানে হারিয়ে যায়

    যদিও যে কন্ঠস্বর তা ওগরায় তা বেশ ফুলে ওঠে

    যা এই আহত কন্ঠস্বরে ভেঙে পড়ে ।

    «

    তোমার থুতনি থেকে কুষ্ঠরক্তের বন্যা বইতে থাকে

    কোনো যোদ্ধার ক্রোধের চেয়েও ভয়ানক

    আমার গর্বিত ম্যানড্রিন ।

    «

    সবে মাত্র জোড়া লাগানো হয়েছে

    এমন গাছের শাখাগুলো

    আমি অন্য ফুলেদের থেকে চুরি করেছি

    যাদের পা একসময়ে দৌড়োতো

    আমার বাগানে হাসতে-হাসতে

    যেখানে পড়ে আছে আমার ছায়া

    গোলাপগুলোকে স্নান করাচ্ছে

    আমার গায়ে ছেটাচ্ছে জলরাশি ।

    «

    ( একমুঠো চারাডাঁটা, উথ্থিত দলমণ্ডল

    পালকের দলমণ্ডল আর নেতৃত্বের সদস্যরা )

    তাদের দ্রুত আদরে এক মারাত্মক বাতাসের আওয়াজ

    জল পড়ে যায়

    আমার গোড়ালির ধাক্কায় ।