• টইপত্তর  বইপত্তর

    Share
  • মলয়ের লেখাপত্তর

    pi
    বইপত্তর | ২৪ মার্চ ২০১২ | ১৫১৯৯ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন
আরও পড়ুন
করোনা - pi
আরও পড়ুন
- - স। র। খান
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Anamika Bandyopadhyay | 120.60.8.227 | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:২৫732391
  • মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস : "অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা"

    - নগ্ন ভোজ ও  হলাহলঃ বারুদ চিহ্ন ও অনৈতিক লাথের দিনলিপি  

    অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায়
     

    অনেকান্ত কথকতা 

    মলয় রায়চৌধুরীর ৪৬ পাতার নভেলা- অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা । উপন্যাসের চারটি কথক। লেখক মলয় রায়চৌধুরী, বারানসীর নকশালপন্থী পেইন্টার্স দলের এক সদস্য চিত্রকর নির্মল এর পিতা, সরকারী চাকুরে ও অতলান্ত প্রেম-বিলাসী শিশির ও বেনারসে মন্দির-ব্যবসা-সফল সাহসিনী কেকা। শুরুতে লেখক কথকতাটা নিজেই করেন, কাহিনীর চরিত্রগুলি ও সূত্র ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। এরপর বাকী তিন কথক তিনটি ভিন্ন সময়ে এই আখ্যান লিখে যাবেন। তিনজনই ডায়েরী লেখক। বলা ভালো একটিই ডায়েরী । মানে একই  খাতা। আর তার কাগজে তিনটি ভিন্ন সময়ে তিন কথক আঁচড় কেটে রাখেন। তাই নিয়েই এগোয় আখ্যান। ডায়েরীটির প্রাথমিক এবং আসল মালিকানা বারানসীর নকশালপন্থী পেইন্টার্স দলের সদস্য নির্মল এর পিতার। এঁর কথকতাটি মূলত প্রাবন্ধিক ধাঁচার দিনলিপি । রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের র‍্যান্ডম নোট্স্‌। ডায়েরীটি হাতবদল হয় কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র শিশির মারফৎ। মানে শিশির ডায়েরীটি হাতসাফাই করে। নির্মলের বাবার নোট্স্‌ের খাঁজে খাঁজে ফাঁকা পাতা । সেই ফাঁকা স্পেইস- আর তা ভরে ওঠে শিশিরের  বারানসী বসবাসের প্রায়-প্রাত্যহিক দিনলিপিতে । যা মুখ্যত দুই নারী- ভাইকিং বংশজাতা আমেরিকান তরুণী ম্যাডেলিন ও কেকা নাম্নী অন্ত্য-ত্রিশের বাঙ্গালিনীর সাথে তার শৃঙ্গার ও সঙ্গমের এরোটিক কলমদিহি। 

    এই ডায়েরী-পাতায় মলয়ের কথকরা পাঠকের সাথে কথা বলে চলেন। মনোলগের ঢং তাতে। সেই কথা তাদের নিজেদের সাথেও। নির্মলের বাবার চরিত্রটি গড়ে তোলেন না লেখক। তিনি নেহাতই ইতিহাসের কথক। এর বেশী তার  সম্পর্কে কোন তথ্য লেখক আমাদের দেননা। যাত্রা-ফর্মের বিবেকের মত এই কথকের সংযোজনে এক ব্রেশটীয় বিচ্ছিন্নতা তাই আমদানী সম্ভব হয়েছে। শৃঙ্গার, রতিক্রিয়ায় ভরপুর পাল্প-ফিকশনের ধাঁচায় যে 'কজালিটির' খেলা চলতে  থাকতে পারত, তাকে প্রথমেই ভাঙ্গার কাজটি করছে এই বিচ্ছিন্নতার উপপাদ্য। যাকে পরে আরও ভাঙছে উপন্যাসটির উদ্দেশ্যমূলক 'এরোটিকা' । যা নির্মাণের উদ্দেশ্য- 'মধ্যবিত্তের নীতিমুলে' শৈল্পিক লাথ। কামসূত্রের দেশে, পোস্ট-কলোনিয়াল গো-মল আর গোমূতের ছানবিন, আর কলোনি-পুর্ব মোজা পরা  ভিক্টোরীয় সমাজ-পুলিশীর লিগাসিকে মলয় প্রশ্ন করেছেন ষাটের দশক থেকেই।হাংরিদের এটি মুখ্য এজেন্ডাও বটে । কিন্তু বাংলাবাজারে সেক্সকে ট্যাবু-মুক্ত করতে লেখালিখিতে সেক্সিস্টও আখরও কেটে রেখেছেন। দুর্দান্ত প্রাবন্ধিক মলয়ের গদ্য-পদ্যের এটিই সর্বাপেক্ষা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়। এই উপন্যাসেও তা চোখে পড়েছে, তবে তা ছাপিয়ে ওঠার মত শান্‌-দার অধুনান্তিক মেহ্‌ফিলটিও  তিনি রচনা করে দিয়েছেন। 

    এবং উপন্যাসের ধাঁচাটি ক্রমে বিশ্ব-স্থানিক, বহু-কথক, এক্সটিক  লোকেল, এরোটিকা ও তার বিনির্মান এসবের আন্তর্জাল থেকে বহুস্বরিক হয়ে উঠল। বাংলা সাহিত্যে এইভাবে বহুস্বরিক হয়ে ওঠার বা তার অবসর নির্মান করার ক্র্যাফটটি তেমন জনপ্রিয় নয়।
     

    "আমার কোন স্থির কেন্দ্র ছিলনা।" 

    স্থির কেন্দ্র, ঘুর্ননের আপাত স্থির বিন্দু- যাকে জন অ্যাশবেরী  'আ হিম টু পসিবিলিটি' বলে থাকেন, তা এই নভেলাতে ঘেপ্‌টে আছে জটিল এক কেমোফ্ল্যাজে।   

    তিনটি ভিন্ন ডেমোগ্রাফির তিন কথককে উপস্থিত করে যে আখ্যানের বুনন তার স্থির কেন্দ্র দুটিঃ এক-  পোস্ট কোলোনিয়াল ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষিত। ভারতবর্ষ, তরুণতর মেধাবী বাঙ্গালীর রাজনৈতিক সচেতনতা আর তার  উত্তাল অভিমুখ; দুইঃ গ্লোবাল কানেকশন- আমেরিকার হিপ্সটার আন্দোলনের তরঙ্গ। সেই তরঙ্গ মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ছিল, ষাট থেকে সত্তরের  প্রথম ভাগে- নেপাল থেকে বারানসী। গুরু থেকে গাঞ্জা। বেলাগম সেক্স। তুলকালাম মাদক। অব্যর্থ শূন্যের ভেতর অনিশ্চিত জীবনের মানে খোঁজা। ভারত তখন  হয়ে উঠেছে ঘরছাড়া হিপিদের হতাশ-নিরঞ্জন অভয়াক্ষেত্র- ইহমুক্তি খুঁজতে আসা শয়ে শয়ে মার্কিনি তরুন-তরুণী বারানসীর গলিতে গলিতে। এই বেনারসকেই বেছে নিয়েছেন মলয় তার নভেলার স্থানিক পট হিসেবে। কলকাতা থেকে বিকেন্দ্রীকরণ । আবার কলকাতা ও প্রবাস, বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্র ও প্রান্তিক, এই দুই বাইনারি ছাপিয়ে তা মলয়ের আত্মজৈবনিক প্রয়াসও। ষাটের দশক। সত্তরের প্রথম ভাগ।  সারা আমেরিকা উদ্বেল, অসংযত । যৌন-মুক্তি, ভালবাসায় বিভোল ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পোর্টল্যান্ড, কলোরাডো থেকে নিউ ইয়র্ক। মাথায় ফুল লাগানো তরুণীরা, যুদ্ধবাজ মার্কিনি নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন। ভিয়েতনামের নামে প্রতিবাদে উচাটন হচ্ছে বার্কলি থেকে প্রগতিশীল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। মানবিক হত্যার কাছে আস্থা হারিয়ে ভালবাসা খুঁজতে জড় হয়েছেন হেইট অ্যাশবেরিতে। 'ভালবাসার একটি গ্রীষ্ম' তাদের আত্মপ্রত্যয়ী  করে তুলেছে, তারা ঘর ছাড়তে শিখেছেন বহর্বিশ্বের ডাকে ।যেমন বীটরা। আমেরিকা জুড়ে তখন তেমনই চূড়ান্ত চলছে বীট আন্দোলন। 

    বীটরা এসে যাবেন, কারণ- মলয় ও হাংরীদের  বীট-কানেকশন ও মিথ পর্যায়ের। মলয় আমাকে এক  সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন- হাংরিরা নয়, বরং বীটরাই অনেকভাবে  হাংরিদের প্রভাবে প্রভাবিত ছিলেন। 

    আমি ডেনমার্কে বীট সাহিত্য সেমিনারে সেই সাক্ষাৎকার দেখাই।  সন্ধ্যের পানশালায় মারিহুয়ানা ফুঁকতে ফুঁকতে নস্টালজিক হয়ে যেতে বসা অ্যালবয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সরেনসন  আমাকে রামকৃষ্ণের মত হাতের ভঙ্গিমা করে বল্লেন- কে কার থেকে কি নিল, তাতে কিবা এসে যায়। ভারতে যাওয়ার আগেই বীটরা স্বমহিমায়। আমি তাকে বুঝিয়ে বলি- মলয় সম্ভবত বলতে চান যে ভারত থেকে ফিরে গিন্সবার্গ  যেসব রচনা লিখছিলেন- কথ্য ভাষা সাহিত্যের আদলে, তাতে হাংরিদের প্রভাব আছে। তবে হাংরিদের ওপরও বীট-প্রভাবের আস্তরণ ছিল বা মলয়ের ওপর, তার একটি বড় লক্ষণ- তার হিপিবেলা, কারণ পুরো হিপি আন্দোলনের ওপরই বীটদের চূড়ান্ত প্রভাব ছিল। মলয় নিজেই তার মেময়ারকে 'হিপিবেলা' নাম দিয়েছেন। আর তা রাজনীতি হোক বা বীট বা বীটহীন হিপি- ঝড়টা আসলেই বহির্বিশ্বের।এরোটিকা লিখতে বসে, এই বহর্বিশ্বের ঝড়কে উপেক্ষা মলয়ের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কারণ তা ফলিত হচ্ছে সমানুপাতিক ভাবে । একদিকে মাও এর রাজনীতি, অন্যদিকে হিপি সংস্কৃতি। ভারতে উত্তর উপনিবেশকালে, চীনের চেয়ারম্যানের নামে প্রলেতারিয়েত সমাজ গঠনের শপথ থেকে, মার্কিনি দাদাগিরিতে হতাশ, দেহ, নেশা, মুক্তি, ভালবাসার খোঁজে উত্তাল একাংশ মার্কিন সমাজের হাউই-বাতাস,  উভয়ই মলয়কে পুষ্টি দিচ্ছে। 

    সানফ্রানসিস্‌কো রেনেসান্স, ষাটের বৈপ্লবিক হিপি চরাচর  ও ভালবাসার গ্রীষ্ম, বীটদের সাইকেডেলিক আন্দোলন, হিপিদের ভারত-অনুসন্ধান পর্ব  ছাড়া এ উপন্যাসের প্রেক্ষিতই গড়ে উঠতনা। 

    এসব জড়িবুটি পেরিয়ে মলয়ের কাছে চ্যালেঞ্জ হল- তার এই কেন্দ্র থেকে সরে এসে তাকে লিখতে হবে এরোটিকা, মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীর ভিক্টোরীয় নৈতিক পাছার  ফুটো দেখিয়ে- অ্যাস্‌হোল ঘোমটা-যৌনতার নিধন করা। আর শেষমেশ সেটি একটি প্রেমের আখ্যানই হবে- নয়তবা সিডাকশন, নিও-শৃঙ্গার-শাস্ত্র। আর ধুমাধার সেই দুয়েন্দেতে- অব্যর্থ ভাবে সফল এই পলিফনি। ভিন্ন ভিন্ন ডেমোগ্রাফির কোলাজ-কথন।
     

    “Depart from the tune" - বিযুক্ত কর

    পড়ছিলাম অ্যান লডেরবাক্‌। দেখছি তিনি  বলেন- “Depart from the tune" - বিযুক্ত কর,  ফর্মকে ভেঙ্গে যে ফর্ম, তার মধ্যে বিশ্বকে খোঁজো'। আবার বীটরা আসিয়া যাইতেছেন। বারোজে যেমন দেখি ন্যারেটিভ, ফ্যান্টাসি, স্বপ্ন, হ্যালুসিনেশন খেলা করে। এই উপন্যাসেও মারিহুয়ানা, কেমিক্যাল ড্রাগস ছাড়াও 'নেকেড লাঞ্চ' এর মতই  উপন্যাসের নামকরণে ফুড-মেটাফর এনেছেন মলয়। এঁটোকাঁটা আর ব্রাহ্মসাহিত্যের মত 'অরূপে'র ক্লাসিক সহাবস্থান, ভারতীয় যৌথ মনোনীতিতে গুরু আর চণ্ডালের অমসৃণ মিলনের মত। পৌষ্টিক ক্ষুধা, মাংস, রুটি, সুরা এবং শৃঙ্গার ও কাম-ক্ষুধার কেমোফ্ল্যাজ- 

    মেঝেয় নামিয়া দুইজনে, আদিম মানব মানবীর ন্যায় পোশাকহীন, রুটি-মদ্য-মাংস খাইলাম । লঙ্কা দেয় নাই বলিয়া, মাংস, যদিও নরম, ছিঁড়িয়া-ছিঁড়িয়া খাইল ম্যাডেলিন , ছাড়া কাপড় টানিয়া হাত-মুখ পুঁছিল । ওই একই পরিত্যক্ত পোশাকে আমিও হাত-মুখ পুঁছিলাম ।

    বীটদের মত সাইকেডিলিক ফ্যান্টাসি ও নেশার অদেখা জগতও এসে পড়ছে- যদিও তেমন জোরালো নয় ঃ  - 

    "গাঁজার ধোঁয়ায় মগজে কত যে খেলা তৈরি হয় ! আমি তাহলে অক্ষয়-অব্যয় অপ্সরা, মধুবালা আর মাধুরী দীক্ষিতের মতন সমুদ্র মন্হন থেকে উঠেছি , তপস্যা নষ্ট করতে এক্সপার্ট । " ---- কেকা উবাচ 

    আর শিশিরের  জবানীতে, 

    "শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন আঙ্গিক এবং চরস, আফিম, মারিহুয়ানা, এল এস ডি ক্যাপসুল এবং অটুলস ফ্যাগের পরিচয় করাইয়াছে ম্যাডি । মাদকগুলি আমাকে মধ্যবিত্তের নীতিবোধের ভ্রান্তি হইতে মুক্তি দিতে সাহায্য করিয়াছে । ম্যাডিই প্রস্তাব দিয়াছিল, সজ্ঞানে তো বহুবার হইল ; মাদকের অপার্থিব জগতে প্রবেশ করিয়া অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করা উচিত আমার । বালকসুলভ যৌনতার সীমা অতিক্রম করা সম্ভব হইবে তদ্বারা ।

    সে কি আলো বিচ্ছুরণ ! নিঃশব্দ ফুলকির বৃষ্টিফোঁটা রূপান্তরিত হইয়াছে নানা প্রকার ফুলে । ম্যাডিকে কখনও মনে হইয়াছে পালক, কখনও মাখন, কখনও অশরীরী অট্টালিকা, যাহার ভিতর প্রবেশ করিয়া পথ হারাইয়া সাঁতার কাটিতেছি ।"

    সারা উপন্যাসে এটুকুই মাত্র সাইকিডেলিক আয়োজন। আর তার বিবরণও নেহাতই নগণ্য। সেই দিক থেকে এটি মুখ্যভাবে সাইকুডেলিক ন্যারেটিভের চরিত্র ও গঠন বজায় রাখছেনা। যদিও মাদক ও ড্রাগস ও তার সেবন প্রথম দৃশ্য থেকেই প্রায় পুরো বারানসী বৃত্তান্তে ছড়িয়ে আছে। হাংরীরা বারবারই জানিয়েছেন যে তারা কেমিক্যাল ড্রাগস এর নেশায় ছিলেননা, বীটদের মত। তাই বীট বা অন্যান্য সাইকিডেলিক রচনার সাথে এ উপন্যাসের মিল খুঁজতে যাওয়া বৃথা। বর্ননা যেটুকু আছে তা গড় সাইকিডেলিক মোটিফ বা সিম্বলের সাথে বিশেষ মেলেনা। আলো ও ফুলের মোটিফটি ছাড়া। সেদিক থেকে পাঠককে নিয়ে এসেও মাদকের অপার্থিব স্তরে ভ্রমণ করাতে মলয় নিতান্তই কাঞ্জুশি করেছেন বলব। 

    ফিরে আসি ফর্মের আলোচনায়- তিনজন কথকের ডেমোগ্রাফি ভিন্ন। তাই বাক্যান্যাসের  ব্যাপারে লেখক যত্নবান হয়েছেন। বাখতিন তার The Dialogic Imagination এ একথা উল্লেখ করেছেন যে - 'পৃথ্বীটা পলিগ্লট অর্থাৎ বহুভাষক, হয়ে গেছে। আর উপন্যাস খুব সক্রিয়ভাবেই এই পলিগ্লট বিশ্ব  নির্মান করতে সক্ষম'। ভাষার ভিন্নতা বা বহু ভাষা বলতে এখানে আমি 'স্বর' বোঝাতে চাইছি। তা মূলত ডেমোগ্রাফির ভিন্নতার কারণে। এবং একই ঘটনার বা  প্রেক্ষিতের দুটি পৃথক উপস্থাপনার কারণে। কিউবিজমের ধাঁচায়- দুটি বয়ান- একটি শিশিরের অপরটি কেকার।

    উত্তম বচনে লেখা এই দিনলিপি আখ্যানে কেকা ও শিশির একটিই  ন্যারেটিভের দুইটি পার্সপেক্টিভ দেওয়ার কাজ করে বা পরস্পরকে কমপ্লিমেন্ট করে। এখানে যেমন শিশিরের বয়ানে পাচ্ছি- 

    "প্রাতঃকালের নয়টা-দশটা হইবে । লাল তাঁতের শাড়ি-ব্লাউজ পরিহিত, সম্পূর্ণ সিক্ত, চুল হইতেও জল ঝরিতেছে, এক ভারতীয় রমণী ঘরে প্রবেশ করিয়াই খিল তুলিয়া দিল । গঙ্গায় ডুব দিয়া ভিজিয়া গিয়াছি , শুকাইতে হইবে, বলিয়া এক-এক করিয়া সবকিছু পরিত্যাগ করিল, এবং আমার তোয়ালে লইয়া গা-মাথা পুঁছিতে লাগিল ।...এতই বিস্ময়াহত হইলাম যে, উঠিয়া, স্হিতি বোধগম্য হইতে সময় লাগিল । আত্মস্হ হইলে কন্ঠ ্‌ইতে নির্গত হইল, কেকা বোউদি, করিতেছেন কী, করিতেছেন কী ! কেকা বলিল, বউদি শব্দটি বাদ দাও, এবং এগুলি ছাদে শুকাইয়া দিয়া আইস, তারপর বলিতেছি । শুকাইতে দিয়া ঘরে ফিরিয়া দেখিলাম , অতুলের স্ত্রী বিছানায় শুইয়া সিগারেট ফুঁকিতেছে । নারীর বহু পোশাক ঘরে মজুত । অথচ সে নগ্ন, কোনো লজ্জা-সংকোচ নাই । বুঝিতে পারিলাম আমার কন্ঠ শুকাইয়া গিয়াছে, মুখ দিয়া কথা ফুটিতে সময় লাগিবে ।"

    এই  একই ঘটনা আবার লিপিবদ্ধ হতে দেখি কেকার জবানীতে, এক পুরুষত্বহীন স্বামী, আরেক লম্পট প্রেমিকের যৌন প্রত্যাখ্যানে অনশনক্লিষ্ট, যৌবনময়ী সে বেঁচে নিতে চায় জীবন-  

    "প্রথম দিনের ব্যাপারটা লিখতে গিয়ে শিশির কিছুটা বাদ দিয়ে ফেলেছে , বোধহয় উত্তেজনার বশে কিংবা নেশার ঘোরে লিখেছে বলে । আমার মনে হয়, ও হুহু করে লিখে গেছে, তারপর আর পড়ে দেখেনি । তার ওপর মাস্টারি-মার্কা বাংলা ।ও যখন ঘরে ঢুকে খাটের পাশে এসে দাঁড়ালো, মুখচোখ দেখে বুঝলুম ভীষণ অপ্রস্তুত, কী করবে কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না । একেবারে অস্হিরপঞ্চক । ওকে স্বাভাবিক করে তুলতে আমি সিগারেটের ধোঁয়ায় পর-পর দুটো রিং ওর দিকে উড়িয়ে বললুম, এই নাও বরমাল্য, তোমায় স্বয়ম্বর-সভায় বরণ করে নিচ্ছি ।শিশির কিছুটা স্বাভাবিক হল , কিন্তু জিগ্যেস করে বসল, তুমি আর গান গাও না ? এরকম গাড়লপুরুষ যে হতে পারে জানতুম না । সামনে শুয়ে রয়েছে এক নগ্ন মহিলা , সেদিকে নজর দেবে, প্রশংসা করবে, তা নয়, গান !  তবে বুঝে নিতে অসুবিধা হল না যে বঙড়শিতে মাছ আটকে পড়েছে, এখন যদি আমি মুখ থেকে বঁড়শি খুলে নিই তবেই ছাড়া পাবে, নয়তো আটকে নিয়ে খেলাবো, খেলাতে থাকবো । পুরুষরা ভাবে যে তারাই বুঝি ছিপ ফেলে গিঁথে তুলতে পারে।"

    এরপরই  ডায়েরী মালিকের ক্লাসিক-জবানীতে প্রায়  গোদারীয় জাম্পকাট। কেকার জবানী থেকে পাঠক এসে পড়ছে নির্মলের বাবার দিনলিপির পাতায়। তার বচনে- 

    "উৎপাদন ব্যাপারটা হয়ে উঠেছে সতত পরিবর্তনরত । আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজনের কারণে, প্রাযুক্তিক দ্রুতির কারণে, শ্রমের তুলনায় পুঁজি থেকে সর্বাধিক লাভের কারণে, এবং অবশ্যই ভোগ্যবস্তুর বিশ্বায়নের কারণে । আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের আদলটাই প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে  । বহুজাতিক সংস্হা ও তার মালিকদের স্বদেশ বলে কিছু থাকছে না । আবির্ভাব হয়েছে বিশ্বব্যাপী মাফিয়া-ভাতৃত্বের । বাজারের কতৃত্ব হয়ে চলেছে বিকেন্দ্রিত । অথচ বহুজাতিকগুলোর কর্মকাণ্ড কেবলমাত্র পুঁজি, মাল এবং উৎপাদনের আনাগোনায় সীমাবদ্ধ নয় । তারা বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাম্প্রদায়িক, সাংস্কৃতিক নকশাগুলোর হেরফেরকারীও বটে । ব্যক্তিমালিকের পক্ষে আর ঊৎপাদনের বিশাল কারবার চালানো সম্ভব নয় বলে, সমাজ-সম্প্রদায়-রাষ্ট্রের হাতে উৎপাদনকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সীমিত । নিয়ন্ত্রণ, নিয়ম, নীতি এক্ষেত্রে হয়ে দাঁড়ায় টলমলে । সেহেতু সংস্কৃতির সনাতন ভৌগলিক বাঁধন আলগা হয়ে যায় । সংস্কৃতি হয়ে যায় ভাসা-ভাসা । সংস্কৃতি হয়ে গেছে ধাবমান ও যাযাবর । ক্লাব, সমিতি, গোষ্ঠী, যারা সংস্কৃতির ধারক-বাহক বলে নিজেদের মনে করে, আসলে তারা উত্তরদার্শনিকতার প্রতিভূ।

    উৎপাদনের আন্তঃরাষ্ট্রিকতা একযোগে হয়ে উঠেছে অভূতপূর্ব বিশ্ব একতার সুত্র, আবার পুঁজিবাদের ইতিহাসে অচিন্ত্যনীয় ভঙ্গুরতার উৎস। পুঁজিবাদের এখনকার জায়মান গল্পটি আর ইউরোপীয় ইতিহাসের প্রসারিত গল্প নয় । এই গল্পের আর কেন্দ্র থাকছে না । অর্থনৈতক ভঙ্গুরতার শক্তিবিকিরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসেছে সাংস্কৃতিক ভঙ্গুরতা বা বহুসাংস্কৃতিকতা । এর ফলে ঘটছে সাংস্কৃতিক দেশান্তরণ, সীমানাগুলোর ( ভাষা, দেশ, জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী, লিঙ্গ ইত্যাদি ) অপলকাভাব, পার্থক্য ও অসাম্যের তৃণমূল পর্যন্ত প্রসার, সমাজের ভেতরে-বাইরে ওই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সমরূপী হবার চাপ, স্হানিক ও বিশ্বের পরস্পরের মধ্যে অনুপ্রবেশ । এগুলো উত্তরদার্শনিকতার লক্ষণ ।"

    ক্লাসিক প্রবন্ধের কেত্‌দার, চোস্ত্‌, আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ। প্রাবন্ধিক মলয় যিনি  উপন্যাসের কলমে নির্মলের বাবা, এই বচনের কথক। এতে এসে গাড়ি জুতছেন কেকা । 

    "একে তো কামুক ভোঁদাটা বিটকেল বাংলায় নিজের কাশীবাসের স্মৃতি লিখেছে, তাও আবার এমন ইজগুড়ি-বিজগুড়ি হাতের লেখায় যে তরতর করে পড়া যায় না ; তার ওপর মাঝে-মধ্যে ঢোকানো নির্মলের বাবার জ্ঞানবাক্যি ! হাতসাফাই যখন করলি, তখন ফাঁকা দেখে একটা খাতা নিতিস । নয়তো ছিঁড়ে ফেলে দিতিস নির্মলের বাবার লেখা জ্ঞানবাক্যির পাতাগুলো । ওনার দুয়েকটা পাতা পড়লুম । কী যা মাথামুন্ডু কিছুই তো বুঝলুম না । শিশির যেমন বাংলায় মাস্টারি ফলিয়ে কাব্যি করেছে, উনি তেমনি নিজেই নিজেকে জ্ঞান দিয়েছেন ।"

    লেখকের সূত্র অনুযায়ী ইনিই ডায়েরী মালিক। এই মূল অথরের ডায়েরিতে ঢুঁসো মেরে ঢুকে পড়ছে শিশির। কিন্তু পাতা ছিঁড়ে নিচ্ছেনা। প্রাথমিক অথরকে মারছেনা। রেখে দিচ্ছে ফাঁকা,  সাদা পাতা ইতস্তত। কোন পরিকল্পনা ছাড়া। সেখানে জমে উঠবে কেকা'র 'আত্মনং বিদ্ধি'- তার নিজস্ব বাক্যশৈলীতে, যা জীবন-তরতরে- প্রচলিত অভিজ্ঞান মতে- চটুল ও অ-ক্লাসিক। স্বেদ,ঘাম ও হমজায়েদী। এভাবেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে- কোলাজ-কথন।

    "ফাঁকে-ফাঁকে যেখানটায় লেখা হয়নি, শিশির আর নির্মলের বাবা যে পাতাগুলো ছেড়ে দিয়েছে; হয়ত আমার  জন্যেই । সেখানে আমার কথাগুলো ঢোকাবো ।" 

    মলয়ের পরীক্ষা-নিরিক্ষায়  বাংলা সাহিত্যে এই বহু কথকের, একে অপরকে নির্মান-বিনির্মানের  অধুনান্তিক ফর্মটি সাফল্যের সাথে থেকে গেল।
     

    দেহ,মন, অপর 

    'আমি শিশিরের প্রেমিকা নই । শিশির আমার প্রেমিক ছিল না । তাহলে আমরা পরস্পরের কী ? আমি শিশিরের দেহটাকে ভালোবেসেছি । শিশির আমার দেহটাকে ভালোবেসেছে । সত্যি কথা বলতে কি, আমরা দুজনে যে-যার নিজেকে ভালবেসেছি । অথচ আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা নই । এরকম  কাণ্ড তো সিনেমাতেও সম্ভব নয় । দেখাতেই পারবে না । আমি সত্যিই অপ্সরা, ঝড় দিয়ে গড়া অপ্সরা । আর শিশির হল বরফের মতন ঠান্ডা অন্ধকার দিয়ে গড়া বিশ্বামিত্র ।'

    ওপরের জবানীটি কেকার। কাহিনীতে বারানসীর দুইটি মুখ্য নারী চরিত্র- ম্যাডেলিন ও কেকা।  কিন্তু মলয়কাপল-ফর্মেশন ঘটাচ্ছেননা। এদের মধ্যে প্রেম বা বিবাহ সম্পর্ক হয়না। দেহ ও মনকে ব্যবচ্ছেদ করে, দেহ ও মনের এই কামরা-ভাগ, প্রেমিক ও যৌন সঙ্গীর আলাদায়ন, এই নবীনতা, পোস্ট-আধুনিক অগ্রসরতা,  বাংলা কেন তামাম সাউথ এশিয়ায় যথেষ্ট কষ্ট-মুমকিন, ভুলে যাবেননা উপন্যাসের ঘটনা ঘটছে ষাটের শেষ গোড়ায়, সত্তরে। 

    আবারো কথা হোল -  মলয়, শিশিরের চরিত্রকে,  কামরাজ-কাম-সাধু (কেকার উক্তিতে, বিশ্বামিত্র) গোছের এক সমসত্ব শিশির ভেজা রস-মণ্ড তৈরি করতে চেয়েছেন। শিশির নামক এই কথক চরিত্রটির হাতে জাদু আছে। সে জানে কামকলার ছলা। সে নারী শরীরের প্রতিটি আহ্লাদ-বিন্দুকে জাগিয়ে তুলতে পারে। আগাগোড়া দুটি নারী চরিত্রের সাথেই তার সঙ্গমের যে কামশস্ত্র মূলক রচনা, তাতে কামের, শৃঙ্গারের কলা পারদর্শিতায় পুরুষের ভূমিকাই মুখ্য। ম্যাডেলীন ও কেকা উভয়ই শিশিরের কামকলায় তৃপ্ত হয়। কিন্তু তাদের যৌনমুক্তির বা অরগ্যাজম বা উদ্দীপনের সুতোটি শিশিরের হাতে বাঁধা থাকে। মানে দাঁড়াচ্ছে- শিশির বা তার মত কোন পুরুষই পারে নারী শরীরকে বাজিয়ে তুলতে, (প্রসঙ্গতঃ  নারীর সমসাময়িক যৌনচেতনা একথা স্বীকার করবেনা, এনিয়ে বিস্তরআলোচনার অবকাশ আছে, এই আলোচনায় তার বিস্তৃতি ঘটালাম না ) যেমন জিমি হেনড্রিক্সঃ

    "ওঃ, জিমি হেনড্রিক্স ! ইনডিয়ায় আসিয়া এই প্রথম একজন ভারতীয়ের কন্ঠে জিমি হেনড্রিক্সের নাম শুনিলাম । গিটার তাঁহার হাতে যৌনতায় উত্তেজিত রমণীদিগের ন্যায় হইয়া উঠে ; যেনবা গিটারের অরগ্যাজম ঘটে ! শরীরে আনন্দের ঢেউ তুলিয়া ম্যাডেলিন কহিল। তদ্ব্যাতীত, অরগ্যাজম শব্দটি শুনিয়া প্রীত হইলাম । ইতোপূর্বে কোনো নারীর কন্ঠে এই শব্দটি শুনি নাই; বস্তুত, ভাষার ভিতরে যে আরাম প্রদানের ক্ষমতা হাছে তাহা মাঝে-মধ্যে অন্যের কন্ঠস্বর নিঃসৃত শব্দে অনেকসময়ে ফুটিয়া উঠে ।"

              (বিদেশিনী নারী চরিত্র ম্যাডেলিন )

    মানে যৌনতায় উত্তেজিত হতে গেলে জিমিকে বা জিমির মত কাউকে বাজাতে হয়। লেখক নারীর চাহিদায় সচেতন হওয়ার চেষ্টা করছেন, কেকাকে কথক হিসেবে খাড়া করে আখ্যান বুনেছেন। নারী শরীরকে পরম মমতায় যত্ন করতে চেয়েছেন। কিন্তু নারীর যৌনতাকে পুরুষের কেন্দ্র থেকে চালনা করার ইচ্ছাও  বার বার প্রকাশ করেছেন । এমনকি তা যখন নারী চরিত্রটির জবানীতেও বসানো হচ্ছে। উপন্যাসে নারীর যৌনতৃপ্তির পক্ষে সহমর্মীতা আছে। তবে দুটি নারীর ক্ষত্রেই সে প্যাসিভ গ্রহীতা। সবটুকু চালনা করে শিশির। আর অনাকাঙ্ক্ষিত হোল- 

    "তুমি নায়কের ভূমিকা পালন করিবে , খলনায়ক হহিতে পারিলে আরও ভালো, তাহারা অমিতবিক্রমে রেপ করিতে পারে ।তাহারা অমিতবিক্রমে রেপ করিতে পারে। " 

    অথবা, 

    সিক্ত তোয়ালেতে কান্তা সুগন্ধী ছিটাইয়া ভালোভাবে পুঁছিলাম ম্যাডেলিনের দেহ । চোখ বুজিয়া শীতল স্পর্শের আরাম লইতে-লইতে বলিল, ব্রেকফাস্ট করিয়া, একটি অটুলস ফ্যাগ ফুঁকিয়া পরস্পরকে চতুষ্পদের মত রেপ করিবার লড়াই করিব, কী বল ?

    রেপের ধারণায় মলয় রায়চৌধুরী এতো মশগুল কেন তা আমার বোঝাতীত। 

    'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' থেকেই এর ধারাবাহিকতা মলয় রেখে চলছেন। শৃঙ্গার, যৌনতার সাথে রেপের কি সম্বন্ধ একথা তার মত  বিদগ্ধ মানুষ কেবলই গুলিয়ে গেলেন বলে আশ্চর্য হতে হয়। দুঃখিতও। রেপ একটি জঘন্য ঘোরতর ক্রাইম। রেপ থেকে চূড়ান্ত শারীরিক জখম এমনকি মৃত্যু হয়। রেপের মূল রয়েছে পানিশমেন্টের মারমুখী, খুনী, ক্ষতি-ইচ্ছা। অ্যাগ্রেসিভ-সেক্স বা ডমিনেটেড  হওয়ার ফ্যান্টাসিকে 'রেপ' না বলে অন্য শব্দের কোন প্রতিস্থাপন তিনি খুঁজে পেলেননা না পেতে চাইলেননা, সেটি খোলসা করার জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম। 

    পুরুষ লেখক, কথক হিসবে তিনি নারী চরিত্রের সংলাপেও তা হাজির করছেন। নারী সত্যিই কি চান-  কোন নারী দুর্মর, বাধাহীন অরগ্যাজম্‌ পেতে চাইলে রেপড্‌ হতে চাইবেন কেন? হ্যাঁ, পরিসংখ্যান পাওয়া যায়- নারীরা সাবমিসিভ হতে চেয়ে বা পুরুষকে শরীরের বল প্রয়োগ করতে নির্দেশ দিয়ে  শৃঙ্গার করতে চাইছেন। তাকে 'রেপ-ফ্যান্টাসি' বলার এক অদ্ভুত কিমাশ্চর্জম চলও লক্ষ্য করা যায়। যারা এটা করেন তারা কিছুতেই বুঝে উঠতে চান না - রেপটা কোন ফ্যান্টাসি নয়- সেটা ক্রাইম! 

    মৃগাঙ্ক গাঙ্গুলিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলাম- শুভা নিয়ে দুয়েক কথা বলতে পারি, আমার বিশ্লেষণ । আমি শুভা হলে মলয়দা কে এক হাত নিতাম অথবা শুভার হয়ে। 

    একই জিনিশ লক্ষ্য করেছি সাম্প্রতিক অবন্তিকার ক্ষেত্রেও। মেল-গেজিও বলেও না।  পুরোপুরি, এক ধরণের পাওয়ার-প্লে আছে। মলয়দাকে যেটুকু জানি, কথা বলেছি, মলয়দার মত  লিবেরাল মানুষ এটা কেন এনেছিলেন, আনেন, জানতে ইচ্ছে হয়। 

    যেমন সম্প্রতি ''অবন্তিকার শতনাম' কবিতাটি। 

    "ওষ্ঠের নাম আফ্রিকান সাফারি, পাছা দুটির নাম- গোলাপসুন্দরী..." 

    এ জিনিশ এর আগে নিম্ন- উচ্চ-মধ্য কোন মেধার বাঙ্গালী কবির পক্ষেই লেখা সম্ভব হয়নি। মলয় চূড়ান্ত প্রেমিক, অবন্তিকাকে দুর্বার প্রেম ও অভিবাদন জানাচ্ছেন। কিন্তু কথা হইল পাছা তো অবন্তিকার । স্তন ও তার । সে কি এইরূপ নাম পাইয়া খুশী হইয়াছে? সে কি নাম রাখার প্রস্তাবে সম্মত হইয়াছে? এই কথা  মলয় রায়চৌধুরী আমাদের কখনওই জানান না। 

    ফলে 'Sex is Shameful'- এই ধারনাকে ভাঙলেও কিন্তু মেয়েদের যৌনমুক্তি বা স্বাধীনতার  যে ক্ষেত্র তাতে পুরোপুরি কাজে আসছেনা হাংরিদের কলম। এনিয়ে অন্য পরিসরে বলাই ভালো। উপন্যাসে ফিরি। এই উপন্যাসে অবশ্য মলয়কে স্বীকারোক্তিতে যেতে দেখি। শিশির যে  চরিত্র, যার সাথে  মলয় রায়চৌধুরীর হিপিবেলার উপাদান অনুযায়ী আত্মজৈবনিক মিল আছে ধারনা করছি, তার জবানীতেই এই আত্ম-উন্মোচনঃ - 

    "রাজগীরের কুণ্ডের চারিধারে খালি গায়ে বসেছিল, আর আমরা, কলেজিয়ানরা, দুচোখ মেলে দেখছিলুম, যতক্ষণ ওরা স্নান করেছে ততক্ষণ  “মেল-গেজ” দিয়ে গিলেছি ।"
     

    যৌথ ডায়েরি-  স্পেস, মেটাফর, মুক্তাঞ্চল 

    প্রকাণ্ড শিবলিঙ্গ। তার নীচে কেকার আখড়া। মন্দির খুলে বসে কেকার আয় দুরন্ত। চিহ্নের পোস্টাপিস এই  পোস্ট উত্তর-আধুনিকতাকালে তামাদি হইয়া গেছে । কিন্তু তামাদি হয়ে গেলেও চলচ্চিত্রের মানুষ এই কলমচীর সিগ্নিফায়ার ও সিগ্নিফায়েডের সংগম মাথায় চলে ফেরে। আর কেবলই মানের জন্ম হইতে থাকে । 

    শিবলিঙ্গ, মন্দিরের মেটাফরও এখানে আরেকটি ইস্যু-ভিত্তিক স্তর আমদানী করছে- ধর্ম ও তার ভণ্ডামির গার্বেজ । কেকা বৌদির  শিবের লিঙ্গ প্রতিস্থার মেটাফর, যা প্রজনন কাল্টের প্রতীক, যোনী ও লিঙ্গের সঙ্গমের প্রকাশ্য সনাতনী ইন্সটলেশন ( যা বারানসী  না হলেও একিভাবে বার্তাবহ হত, কিন্তু বারানসী শিবস্থান, লিঙ্গ পূজার মহাপীঠ, তাই মেটাফরের খেলা এখানে জমে ওঠে অব্যর্থ ) তাকে ঘিরে জমে উঠছে ব্যবসা। ধর্মের। যে ধর্মে যৌনতা ছিলাটান ট্যাবু। সেখানেই  ট্যাবু ভাঙ্গার আখ্যানে শান দিয়ে যাচ্ছে গঙ্গার ধারে গড়ে ওঠা প্রাচীন চলমান সভ্যতা। সত্তরের বারানসীতে মলয় তাই এখানেই নিও-কামশাস্ত্র লিখতে পারেন উত্তাল বারুদ্গন্ধে। দেহ, যা ঘিরে মৌতাত পায় যৌন-উৎসব। দেহধারী স্বপ্নময় চোখ- যা চেয়েছিল সমাজবদল, সেই  দেহকেই ধ্বংস হতে হচ্ছে, খুন হয়ে যাচ্ছে তরুণ সমাজ। স্বপ্নময় সত্তরের বিপ্লব আয়োজন। আয়োজক সেই দেহ গুলিকে নিঃশেষ করা হচ্ছে। পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হচ্ছে নকশাল উল্লাসের, ফেক এনকাউন্টারে। 

    দেহ, দেহজ আনন্দ, মৃত্যুর ভেতর দেহ বর্জন এই দেহদর্শন বার বার মীনের মত পাক খাচ্ছে ন্যারেটিভে। মলয় একে নাটকীয় করছেন। সম্পর্কের  এক জ্যামিতিক বিন্যাস ঘনিয়ে তুলছেন। তার মধ্যে দুটি নারী শরীরের সাথে তার শৃঙ্গার-লীলাকে মহিমান্বিত করে মলয় এরোটিকা নির্মান করেছেন। সেখানে যৌন মিলনের মধ্যে একের ফেলে যাওয়া অন্তর্বাস, অপরের কাম-জাগানিয়া প্রসাধনে সাহায্য করছে। আদার ও আত্ম'র বাইনারিকে গুলিয়ে দিতে গ্লোব্যাল-লোক্যাল, শ্বেত ও বাদামীর, উচ্চবিত্ত ও নিম্নের ইন্টারসেকশনালিটির উঠোনটি প্রশস্ত হচ্ছে। 

    উপন্যাসে যৌথ ডায়েরিটিই এক জাদু-স্পেস। এবং সেটিই এখানে হয়ে ওঠে সিক্রেট-গার্ডেন। গোপন উদ্যান। অন্তত এরোটিকার পার্টটি যেখানে লেখা হচ্ছে। চিলেকোঠার ছাদ। যার গা দিয়ে গঙ্গা বহতা । ভারতীয় যৌথ-মনস্তত্বে সে পাপমোচী। কলুষনাশী।  কাদাখানার সফেদ্‌দারী তার কর্ম। এই 'লোকেলে' মলয় খেলে দিয়েছেন পাল্টা ছক- উত্তর উপনিবেশে, বজরাঙ্গ-দল-পুর্ব্ব উত্তর প্রদেশে। তার সফেদ্দারী এখানে এক জোরালো লাথ- যেখানে গঙ্গা, তার বহতা বায়ু উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভিক্টোরীয় শুচিবায়ুতা। আর তিনি শুখরিয়া  আদা করছেন- ট্যাবু ভাঙ্গানিয়া মাদকের। 

    'শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন আঙ্গিক এবং চরস, আফিম, মারিহুয়ানা, এল এস ডি ক্যাপসুল এবং অটুলস ফ্যাগের পরিচয় করাইয়াছে ম্যাডি । মাদকগুলি আমাকে মধ্যবিত্তের নীতিবোধের ভ্রান্তি হইতে মুক্তি দিতে সাহায্য করিয়াছে ।'
     

    একিভাবে বহুস্বর ও কথকের  বিষয়ে লেখক মলয় উদার। এবং  বায়াসহীনও। অন্যস্বর গুলিকে স্পেস করে দেন তিনি একই ন্যারেটিভে কথা বলার। ভিন্ন পার্সপেক্টিভ রাখার। তাতে কেকা চরিত্রটি নায়ক শিশিরকে খাটো করতে চাইলেও লেখক মলয়  কেকাকে এই সুযোগ দেন। বোঝা যায় যে এ লেখকের এক আত্মবিশ্লেষন, কারণ মলয় রায়চৌধুরীর আত্মজৈবনিক উপাদান খেয়াল করলে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়- শিশির মলয়ের অল্টার ইগো। 

    কিন্তু এরোটিকা লিখতে বসেছে শিশির। সত্তরের দশকের নিও-কামশাস্ত্র। শৃঙ্গার মালা। মাঝে ধ্যানস্থ হাইফেনের মত  নির্মলের পিতার কাল-কথনের মহাকাল বাণী- এই হল কাঠামো। তার ভেতর অতি সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত নারীর আত্মনং বিধি- 'জীবনকে তোল্লাই দিবার কোনো প্রয়োজন নাই , যেমন-যেমন পাও তেমন তেমন নিতে থাকো ' ( কেকা উবাচ)।  অথবা বিত্তশীল দেশের অস্থির সমাজের জীবনদর্শন- " যাহা ইচ্ছা করি, যে দেশে ইচ্ছা যাই, যাহাকে ভালো লাগে তাহার সহিত শুই, খাইতে ভালোবাসি বলিয়া প্রতিটি দেশের খাদ্য খাই " ( ম্যাডেলিন উবাচ)।  

    চূড়ান্ত আধুনিক ভাঙ্গা ফর্ম-চিহ্ন ও ভদ্রাসন ভেঙ্গে ফেলবার মেটাফরে বারানসী তাই চরম নির্বাচন।

    লেখক এখানে লোক্যাল-গ্লোব্যাল, প্রেম-প্রেমহীন শৃঙ্গার আত্ম ও অপর  মারহাব্বা খেলে দিয়েছেন। তা সত্য এরোটিকার নির্মানের চেষ্টায়ও। দেহ এরোটিক 'আদার'কে খোঁজে। ইন্টিমেসি সেই ''আদার" কে তার অবস্থানকে গলিয়ে ফেলার চেষ্টা করে। কথকেরা রতিক্রিয়ায় অন্যের দেহগুলিকে যত্ন করতে শেখেন। একই সাথে চলে নারীর দেহের  ভিস্যুয়াল কনসাম্পশন, স্কোপোফিলিয়া, । কেকার জবানীতে এই ভ্যয়ার-কে অতিক্রম করার সুযোগ ছিল। কিন্তু লেখক পুরুষ- তার ভয়ারিজম এখানে কেকার নারী-গেজকে ছাড়িয়ে যায়। এরোটিক ট্র্যাডিশনে সাধারণত এ খেলা সমানেই চলতে থাকে। 

    তার পাশাপাশি  ভাষাতত্বের লুডো-বোর্ডে সাপ-লুডোর মত স্ল্যাং ও ধ্রুপদী  নামা ওঠা করছে। ছড়িয়ে পড়ছে। 

    ডায়রি লেখক- ধ্যানস্থ, শিশির এর ভাষা ধ্রুপদী সাধু, কেকার- লোকজ ফিচেল।  কিন্তু তার চটুলতা ম্যানিকিওর্ড ফ্ল্যাট-বাড়ি বা বহুতলের বাজার-উপন্যাস মার্কা চরিত্রের মত ভুসো-চটকা নয়। 

    বহুদিন আগে  তার প্রেমিক লর্ড আলফ্রেড বোসি ডগ্‌লাসকে লেখা অস্কার ওয়াইল্ডের অমূল্য কিছু চিঠি-চাপাটি পড়েছিলাম। ঝিম লাগানো  সুন্দর সেসব প্রেমালাপ। 

    বারানসীর সাব্‌-আর্বান, অনাধুনিক শহুরে প্রেক্ষাপটে এই উপন্যাসটিও ঝিম লাগানো সুন্দর। রহস্যময়ী প্রাচীন নগরী। তাতে ঘটে চলে বিষাদ আর মিলনের আনন্দ বিলাপ, ফ্যান্টাসি, গেইম। বোমা ও পিস্তলের মাঝে কয়েক  মানবিক মুহুর্ত। চলন্ত, জাগ্রত এক উৎসব। যৌনতার উৎসব। তার আয়োজন আছে। সামান্যই। কিন্তু আন্তরিক। 

    ম্যাডেলিন এর নিঃস্পৃহ বিষাদ, ট্রান্সন্যাশানাল দৃষ্টিপথ, শঙ্খ লেগে যাওয়া পাকে পাক। আর কেকার স্বেদ মাখা, সস্তা দামের লিপস্টিক ওষ্ঠ, অধর, সস্তার অগুরু ও  কান্তা। নিম্ন মধ্যবিত্তের ছাপা আঁচল। অদম্য বাঁচার ইচ্ছা, বেঁচে নেওয়া। শরীরকে আবিষ্কারের আনন্দ, আর টাবুর পাছায় গরম কশাঘাত। বাঙ্গলা সাহিত্যে এই অ্যাডাল্টারির বন্দনায় মনে পড়ল অ্যাডাম বেইগলি'র 'আপডাইক' কেও।  টাইম ম্যাগাজিন কাভার স্টোরি করে বলেছিল- 'He is also credited with making suburban sex sexy'। বাঙ্গালীর ধর-তক্তা ফুল-ফুল সেক্স-কাব্যকে সত্যিই পরিণত সেক্সি করে ফেলা উপন্যাসটির চলন তরতরে, ঘোরলাগা। মায়াময়। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, এটি মলয় রায়চৌধুরীরও প্রিয় উপন্যাস। যদিও এ বিষয়ে তার মতামত আমার  জানা হয়নি। 

    সত্তর একটা হাওয়া। হাওয়াটা উপন্যাসে বইছে- হাওয়ায় বারুদ গন্ধ, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্রোহ, সমাজ পাল্টানোর তীব্র জেদ আর শরীরী ট্যাবু ভাঙ্গার ঘোরলাগা, অনুপম মাদকতা। এর মধ্যে উপন্যাসে শৃঙ্গার, এরোটিকের প্রাণটিই সর্বাপেক্ষা অরূপ, মায়াময়। জীবনকে বেঁচে নেয়া। যেমনি অরূপ এই সুসফল ফলন্ত জীবন, তেমনই অরূপ তার এঁটোকাঁটাও। 


     

    "জীবনটা যে মাংসের উৎসব তা কেন মেনে নেয় না লোকে । আমার শরীরের রক্তমাংসে আমি উৎসব ঘটাব তো তাতে কার কী করার আছে ! বেঁচে থাকা ব্যাপারটা হল এই উৎসবকে সারা জীবন ধরে পালন করে যাওয়া । অবিরাম, অবিরাম, অবিরাম । মনের শান্তি এছাড়া কেমন করেই বা পাবো, কেউ বোঝাক আমাকে । জীবন তো একবারই । তাহলে নিজের জন্যে বাঁচব না কেন ? পল থেকে পল, সবসময় নতুন ; শিশির দেখিয়ে গিয়েছিল সেই পথটা, যে পথটা আমি জানতেই পারিনি শিশিরকে পাবার আগে । ভালবাসা ভালবাসা ভালবাসা ভালবাসা । উন্মাদিনীরা ছাড়া ভালোবাসার কথা আর কেউ বলতে পারে না । নিজেকে ভালবাস, হ্যাঁ, নিজেকে নিজেকে, আর অমন ভালবাসার জন্যে যা ইচ্ছা হয় করো ; ভালবাসার জন্যে বেপরোয়া হতে হবে ।" ---- কেকা উবাচ 

    খাজুরাহোর দেশে, বাৎস্যায়নকে পুঁথি লেখার জন্য আন্দোলন করতে হয়েছিলো কিনা জানা যাচ্ছেনা। তবে তার সহস্রাধিক বছর পরে এই দেশে  চুমু আন্দোলন করার প্রয়োজন হয়েছে । নেতা বলিয়াছেন- উহা ইম্পোর্টেড !! সব মিলিয়ে গোদারের 'জে. এল. জি বাই জে. এল. জি'র কথা মনে পড়ল- 

    “First there was Greek civilization. Then there was the Renaissance. Now we are entering the age of the Ass.” 

    অতএব এই  কেকা-উবাচ-  "জীবনকে তোল্লাই দিবার কোনো প্রয়োজন নাই, যেমন-যেমন পাও তেমন তেমন নিতে থাকো" -- ইহা এক জীবনমুখী সহজিয়া দর্শনের উল্লাস। সারা উপন্যাসে তারই  আয়োজন। 

    ইতিহাস, দর্শন, মনোবিশ্লেষণ, ক্র্যাফট ও  কৌশলের নিরিখে এটি, হতে পারে, মলয় রায়চৌধুরীর শ্রেষ্ঠ ফিকশন কাজ। আপনি থাকছেন স্যার। 



     

    _____________________________________


     

  • মলয় রায়চৌধুরী | 120.60.8.227 | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:২৯732392
  • জঁ আর্তুর র‌্যাঁবো : নরকে এক ঋতু । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী       

     

    আগে কোনো এক সময়ে,  যদি ঠিকমতম মনে থাকে, আমার জীবন ছিল ভুরিভোজের উৎসব যেখানে প্রতিটি হৃদয় নিজেকে মেলে ধরত, সেখানে অবাধে বয়ে যেতো সব ধরণের মদ ।

     

    একদিন সন্ধ্যায় আমি সৌন্দর্য্যকে জড়িয়ে ধরলুম -- আর তাকে আমার তিতকুটে মনে হলো -- আর আমি ওকে অপমান করলুম ।

     

    বিচারের বিরুদ্ধে নিজেকে করে তুললুম ইস্পাতকঠিন ।

     

    আমি পালালুম । ওহ ডাইনিরা, ওহ দুর্দশা, ওহ ঘৃণা, আমার ঐশ্বর্য্য ছিল তোমাদের হেফাজতে।

     

    যাবতীয় মানবিক আশা আমি নিজের মধ্যে নষ্ট করে ফেলেছি । বিরূপ জানোয়ারের নিঃশব্দ লাফ নিয়ে আমি গলা টিপে মেরে ফেলে দিয়েছি প্রতিটি আনন্দ ।   

     

    আমি জল্লাদদের আসতে বলেছি ; আমি তাদের বন্দুকের নল চিবিয়ে নষ্ট হয়ে যেতে চাই। আমি বালি আর রক্তে রুদ্ধশ্বাস হবার জন্য নিম্নত্রণ করেছি মহামারী রোগদের । দুর্ভাগ্য ছিল আমার ঈশ্বর । আমাকে পাঁকে শুইয়ে দেয়া হয়েছে, আর নিজেকে শুকিয়ে নিয়েছি অপরাধাত্মক হাওয়ায়। আমি উন্মাদনার সীমায় নিজেকে নিয়ে গিয়ে মূর্খের খেলা খেলেছি ।   

     

    আর বসন্তঋতুর দিনগুলো  আমাকে এনে দিয়েছে  বোকার আতঙ্কিত হাসি ।

     

    এখন কিছুদিন হলো, যখন আমি নিজেকে ভবিষ্যত অমঙ্গলের বার্তাবাহক হিসাবে আবিষ্কার করলুম, আমি ভাবতে লাগলুম পুরোনো দিনকালের ভোজনোৎসবের উৎসসূত্রের কথা, যেখানে আমি খুঁজে পাবো আবার নিজের বাসনার আকাঙ্খা ।

     

    সেই উৎসসূত্র হলো সর্বজনে প্রীতি -- এই ধারণা প্রমাণ করে যে আমি স্বপ্ন দেখছিলুম !   

     

    যে দানব একসময়ে আমাকে অমন সুন্দর আফিমফুলের মুকুট পরিয়েছিল, চিৎকার করে বলে ওঠে:  “তুমি হায়েনা  ইত্যাদি জানোয়ার হয়েই বেঁচে থাকবে”...। “মৃত্যুকে খুঁজবে তোমার আকাঙ্খাপুর্তির মাধ্যমে, আর যাবতীয় স্বার্থপরতা দিয়ে, আর সাতটি মারাত্মক পাপ দিয়ে।”

     

    আহ ! আমি সেসব অনেক সহ্য করেছি : তবু, হে প্রিয় শয়তান, অমন বিরক্তমুখে তাকিও না, আমি তোমার কাছে আবেদন করছি ! আর যতোক্ষণ অপেক্ষা করছি কয়েকটা পুরোনো কাপুরুষতার খাতিরে, কেননা তুমি একজন কবির মধ্যে সমস্ত রকমের চিত্রানুগ কিংবা নীতিমূলক স্বাভাবিকতার অভাবকে গুরুত্ব দাও, আমি তোমাকে এক অভিশপ্ত আত্মার রোজনামচা থেকে এই কয়েকটা অপবিত্র পৃষ্ঠা পাঠিয়ে দিচ্ছি ।   

     

    বদ রক্ত   

     

    ফরাসি দেশের প্রাচীন অধিবাসী গলদের থেকে আমি পেয়েছি আমার ফিকে নীল চোখ, একখানা ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক, আর প্রতিযোগীতায় আনাড়িপনা । আমার মনে হয় আমার জামাকাপড় তাদের মতনই অমার্জিত ।

     

    কিন্তু আমি চুলে তেল লাগাই না ।

     

    সেই প্রাচীন অধিবাসী গলরা ছিল তাদের সময়ের অত্যন্ত মূর্খ  চামার আর খড় পোড়ানোর দল। তাদের কাছ থেকে আমি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি : প্রতিমা-উপাসনা, আর যা-কিছু পবিত্র তাকে নোংরা করে দেবার প্রতি টান ; ওহ ! যতোরকমের কদভ্যাস হতে পারে, ক্রোধ, লাম্পট্য, -- ভয়ানক ব্যাপার, এই লাম্পট্য ; -- তাছাড়া মিথ্যে কথা বলা, আর সবার ওপরে আলস্য ।

     

    যাবতীয় ব্যবসাপাতি আর কাজকারবার সম্পর্কে আমি বেশ আত্ঙ্কে ভুগি । কর্তাব্যক্তিদের আর খেটে-খাওয়া লোকেদের সম্পর্কে, ওরা সব্বাই চাষাড়ে আর মামুলি । যে হাত কলম ধরে থাকে তা লাঙল ধরে থাকা হাতের মতনই শুভ। -- হাতের ব্যাপারে একটা শতাব্দী বলা যায় ! -- আমি কোনোদিনও আমার হাত ব্যবহার করতে শিখবো না । আর হ্যাঁ, পারিবারিক ঝুঠঝামেলা তো আরও এক কাঠি বাড়া । ভিক্ষা চাওয়ার মালিকানা আমাকে লজ্জা দেয় । অপরাধীরা অণ্ডকোষহীন পুরুষদের মতোই নিদারুণ বিরক্তিকর : আমি আছি বহাল তবিয়তে, আর আমি কাউকে পরোয়া করি না ।

     

    কিন্তু ! কে আমার জিভকে এতো বেশি মিথ্যা-সুদর্শনে ভরে তুলেছে, যা কিনা আমাকে এতোদিন পর্যন্ত পরামর্শ দিয়েছে আর অলস করে রেখেছে ? আমি তো আমার জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে শরীরকেও ব্যবহার করিনি । ঘুমন্ত কোলাব্যাঙের আলস্যকে ছাপিয়ে, আমি সব রকমের জায়গায় বসবাস করেছি । ইউরোপে এমন কোনো পরিবার নেই যাদের আমি চিনি না। -- পরিবার বলতে, আমি বোঝাতে চাইছি, যেমন আমার, যারা  মানুষের অধিকারের ফতোয়ার জোরে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে । -- আমি প্রতিটি পরিবারের সবচেয়ে বড়ো ছেলেকে চিনি! 

     

    -------------------------------

     

    যদি ফ্রান্সের ইতিহাসের কোনো একটা সময়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক থাকতো !

     

    কিন্তু তার বদলে, কিছুই নেই ।

     

    আমি ভালো করেই জানি যে আমি চিরটাকাল এক নিকৃষ্টতর জাতির মানুষ । আমি দ্রোহ ব্যাপারটা বুঝতে পারি না ।  নেকড়ের পালের মতন কোনো  জানোয়ারকে ছিঁড়ে খাবার জন্য, যা তারা নিজেরা মারেনি, আর লুঠপাচার বাদ দিলে, আমার জাতি কখনও উঠে দাঁড়ায়নি ।

    খ্রিস্টধর্মের বাড়ির বড়ো মেয়ে ফ্রান্সের ইতিহাস আমার মনে আছে । পবিত্র ভূমির জন্যে ক্রুসেডে লড়তে, আমিও চলে যেতে পারতুম, একজন গ্রাম্য চাকর হিসাবে ; আমার মগজের ভেতরে ব্যাভেরিয়ার বনানীর ভেতর দিয়ে অজস্র পথ রয়েছে, বসফরাসের বাইজেনটিয়াম সাম্রাজ্যের ছবি, জেরুজালেমের কেল্লা ; মেরির পুজোপদ্ধতি, ক্রুশকাঠে ঝোলানো যিশুর সম্পর্কে দুঃখদায়ক চিন্তা, আমার মগজের ভেতরে হাজার অবজ্ঞায় পুলকিত হতে থাকে। -- রোদ্দুরের কামড়ে ধ্বসে পড়া দেয়ালের কিনারায়, ভাঙাচোরা মাটির বাসনকোসন আর বিছুটিবনের মাঝে আমি একজন কুষ্ঠরোগির মতন বসে থাকি । --- আর তাছাড়া, আমি একজন উদ্দেশ্যহীন ভবঘুরে ভাড়াটে সৈনিক, জার্মান রাত্রির আকাশের তলায় সময় কাটাতুম ।

     

    আহ ! আরেকটা ব্যাপার : বুড়ি আর বাচ্চাদের দলের সঙ্গে অত্যুজ্জ্বল লালচে ফাঁকা মাঠে আমি স্যাবাথছুটির নাচ নেচে চলেছি ।

     

    আমি এই দেশ আর খ্রিস্টধর্মের বিষয়ে বিশেষ কিছুই মনে রাখতে পারিনি । আমি নিজেকে চিরটাকাল অতীতে দেখতে পাবো । কিন্তু সবসময়ে একা ; পরিবারহীন ; প্রকৃতপক্ষে, কোন সেই ভাষা, যাতে আমি কথা বলতুম ? আমি কখনও নিজেকে যিশুখ্রিস্টের পারিষদবর্গের সদস্য হিসেবে দেখি না ; সন্তদের সভাতেও নয়, -- যারা যিশুখ্রিস্টের প্রতিনিধি ।

     

    এক শতক আগে আমি ঠিক কী ছিলুম : আজকে আমি কেবল নিজেকে খুঁজে পাই । টো-টো করে ঘুরে বেড়ানো সেইসব লোকগুলো, ধূসর যুদ্ধগুলো উধাও হয়ে গেছে । নিকৃষ্ট জাতি চেপে বসেছে সবার ওপরে -- যাকে লোকে বলে  জনসাধারণ, যুক্তিপূর্ণতা ; রাষ্ট্র এবং বিজ্ঞান ।

     

    আহ ! বিজ্ঞান ! সমস্তকিছু অতীত থেকে নিয়ে আসা হয় । শরীর আর আত্মার জন্যে, -- শেষ আধ্যাত্মিক সংস্কার, -- আমাদের রয়েছে ওষুধ আর দর্শনতত্ব, বাড়িতে সারিয়ে তোলার টোটকা আর নতুনভাবে বাঁধা লোকগান । এবং রাজকীয় আমোদপ্রমোদ, আর যে সমস্ত খেলাধুলা রাজারা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে ! ভূগোল, আকাশবিদ্যা, যন্ত্রবিদ্যা, রসায়ন !...

     

    বিজ্ঞান, নবতর আভিজাত্য ! প্রগতি । জগতসংসার এগিয়ে চলেছে !.... আর কেনই বা তা করবে না ?

    আমাদের রয়েছে গণিতের দৃষ্টিপ্রতিভা । আমরা এগিয়ে চলেছি প্রাণচাঞ্চল্যের দিকে । আমি যা বলছি তা অমোঘ রহস্যপূর্ণ এবং ধ্রুবসত্য । আমি বুঝতে পারি, আর যেহেতু আমি পৌত্তলিকতার নিকৃষ্ট শব্দাবলী ছাড়া নিজেকে প্রকাশ করতে পারি না, আমি বরং চুপ করে থাকবো ।

     

    পৌত্তলিকতার নিকৃষ্ট রক্ত ফিরে বইতে থাকে শরীরে ! প্রাণচাঞ্চল্য এখন আয়ত্বে, যিশু কেন আমাকে সাহায্য করেন না, কেন আমার আত্মাকে আভিজাত্য আর স্বাধীনতা দেন না । আহ ! কিন্তু যিশুর উপদেশাবলী তো অতীতের ব্যাপার ! খ্রিস্টের উপদেশাবলী ! খ্রিস্টের উপদাশাবলী !

     

    আমি হাঘরের মতন ঈশ্বরের জন্যে অপেক্ষা করি । আমি চিরকালের জন্যে, চিরকালের জন্যে, এক নিকৃষ্ট জাতের মানুষ ।

     

    আর এখন আমি উত্তরপশ্চিম ফ্রান্সের ব্রিট্যানির সমুদ্রতীরে । শহরগুলো সন্ধ্যায় তাদের আলোকমালা জ্বালিয়ে দিক । আমার দিনকাল ফুরিয়ে গেছে ; আমি ইউরোপ ছেড়ে চলে যাচ্ছি । সমুদ্রের হাওয়া আমার ফুসফুসকে গরম করে তুলবে ; হারিয়ে-যাওয়া আবহাওয়া আমার ত্বককে পালটে ফেলবে চামড়ায় । সাঁতার কাটার জন্যে, ঘাসভূমি মাড়িয়ে চলার জন্যে, শিকার করার জন্যে, সবচেয়ে প্রিয় ধোঁয়াফোঁকার জন্যে ; কড়া মদ খাবার জন্যে, সে মদ গলিয়ে ফেলা লোহার মতন কড়া, -- আগুনের চারপাশে  আমার প্রণম্য পূর্বপুরুষরা যেমন ভাবে বসে থাকতেন ।

     

    আমি লোহার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে ফিরে আসবো, কালো ত্বক, আর রাগি দুটো চোখ : এই মুখোশে, ওরা সবাই মনে করবে আমি উৎকৃষ্ট জাতির মানুষ । আমার কাছে থাকবে স্বর্ণভাঁড়ার : আমি হয়ে উঠবো নৃশংস আর শ্রমবিমুখ । যে দুর্ধষ্য পঙ্গুরা গ্রীষ্মমণ্ডলের দেশ থেকে ফিরে আসে, তরুণীরা তাদের সেবা করে । আমি রাষ্ট্রনীতিতে জড়িয়ে পড়বো । বেঁচে যাবো ।

     

    এখন আমি অভিশপ্ত, আমি আমার নিজের দেশকে অপছন্দ করি । সবচেয়ে ভালো হলো মাতাল অবস্হায় ঘুমোনো, চিলতেখানেক কোনো সমুদ্রতীরে হাতপা ছড়িয়ে শুয়ে পড়া ।

     

    --------------------------

     

    কিন্তু কেউই ছেড়ে চলে যায় না । --- আরেকবার বেরিয়ে পড়া যাক আমাদের এলাকার পথে-পথে, আমার অধার্মিকতার ভার সঙ্গে নিয়ে, সেই অধার্মিকতা যা যুক্তিপূর্ণতার যুগ থেকে আমার অস্তিত্বে দুঃখকষ্টের শিকড় পুঁতে দিয়েছে -- স্বর্গ পর্যন্ত উঠে যাওয়া, আমাকে বিদ্ধস্ত করে, ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দ্যায়, আমাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে যায় ।

     

    চরম পাপহীনতা, শেষ মায়া । সবকিছু বলা হয়ে গেছে । পৃথিবীতে আমার জঘন্যতা ও বিশ্বাসঘাতকতা  আর টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবার নয় ।

     

    চলে এসো ! কুচকাওয়াজ করে, ভার কাঁধে তুলে, মরুভূমি, একঘেয়েমির বিরক্তি এবং ক্রোধ নিয়ে।

     

    কার কাছে গিয়ে ভাড়া করা মজুর হবো ? কোন সে জানোয়ারদের আদর করি ? কোন পবিত্র মূর্তিগুলোকে ধ্বংস করি ? কেমনতর হৃদয়কে ভাঙি ? কোন মিথ্যাকে প্রশ্রয় দিই ? -- কোন সে রক্তের নদী হেঁটে পার হই ? বরং বিচার থেকে দূরত্ব রাখা ভালো । -- এক কঠিন জীবন, সুস্পষ্ট বিস্ময়, -- কফিনের ঢাকা তোলার জন্যে একটা শুকনো মুঠো, শুয়ে থাকো, আর দম বন্ধ হয়ে যাক । এইভাবে বার্ধক্যে পৌঁছোবার কথা নয়, কোনো বিপদ নেই : সন্ত্রাস ব্যাপারটা অ-ফরাসী।

     

    --আহ ! আমি এমন পরিত্যক্ত যে নিজেকে কোনও না কোনও স্মৃতিমন্দিরে গিয়ে নিখুঁত হবার আবেগ  উৎসর্গ করব ।

     

    ওহ আমার আত্ম-অস্বীকৃতি, আমার মনোমুগ্ধকর বিশ্বপ্রেম ! আমার নিঃস্বার্থপর ভালোবাসা ! অথচ তবু আমি এই তলানিতে !

     

    গভীর অতল থেকে কেঁদে উঠি, আমি আসলে একটা গাধা !

     

    ----------------------------------

     

    যখন আমি এক ছোট্ট শিশু ছিলুম, আমি সেই দণ্ডিত অপরাধীকে শ্রদ্ধা করতুম যার মুখের ওপর কারাগারের দরোজা সদাসর্বদা বন্ধ থাকবে ; আমি সেই সমস্ত মদের আসর আর ভাড়াদেয়া ঘরগুলোয় যেতুম যেগুলোকে তার উপস্হিতি পবিত্রতায় উন্নীত করেছে ; আমি তার চোখ দিয়ে নীলাকাশ আর ফুলে ছাওয়া মাঠের কর্মোন্মাদনা দেখতুম ; শহরের রাস্তায় আমি তার সর্বনাশা সুগন্ধকে অনুসরণ করেছি । তার ছিল সন্তদের চেয়েও বেশি ক্ষমতা, যেকোনো অনুসন্ধানকারীর চেয়েও বেশি বোধশক্তি -- আর সে, কেবল সে-ই ! নিজের মহিমা  এবং নিজের ন্যায়পরায়ণতার সাক্ষী ছিল ।

     

    শীতের রাতের ফাঁকা রাস্তা-বরাবর, ঘরছাড়া, ঠাণ্ডায় কাতর, আর ক্ষুধার্ত, একটা কন্ঠস্বর আমার হিমায়িত হৃদয়কে আঁকড়ে ধরল : “দুর্বলতা হোক বা শক্তিমত্তা : তুমি টিকে আছো, তাইই হলো শক্তিমত্তা । তুমি জানো না তুমি কোথায় চলেছো কিংবা কেন তুমি কোথাও যাচ্ছো, যেদিকে চাও যাও, সবাইকে জবাব দাও । কেউই তোমাকে মেরে ফেলবে না, তুমি শবদেহ হলে যেরকম করতো তার চেয়ে বেশি কিছু নয় ।” সকালবেলায় আমার চোখদুটো এতো বেশি ফ্যালফ্যালে হয়ে উঠেছিল আর মুখ শবের মতন ফ্যাকাশে, যে যাদের সঙ্গে আমার দেখা হচ্ছিল তারা যেন আমায় দেখতে পাচ্ছিল না ।

     

    শহরগুলোয়, কাদার রঙ আচমকা বদলে গিয়ে লাল আর কালো হয়ে উঠল, পাশের ঘরে আলোর শিখা কাঁপলে আয়নায় যেমন হয়, জঙ্গলে গুপ্তধনের মতন ! আমি চেঁচিয়ে উঠলুম, গুড লাক, আর আমি দেখতে পেলুম আগুনশিখার সমুদ্র আর ধোঁয়া উঠে যাচ্ছে স্বর্গের দিকে ; এবং বাঁদিকে আর ডানদিকে, কোটি-কোটি বজ্রবিদ্যুতের মতন সমস্ত ঐশ্বর্য্য বিস্ফোরণে ফেটে পড়ছিল।

     

    কিন্তু উচ্ছৃঙ্খল পানোমত্ততা এবং নারীসঙ্গ ছিল আমার পক্ষে অসম্ভব । এমনকি কোনো বন্ধুসঙ্গও নয় । আমি দেখলুম আমি একদল রাগি মানুষদের সামনে পড়ে গেছি, ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখোমুখি, তারা যে দুঃখে কাঁদছিল তা তারা নিজেরাই বুঝে উঠতে পারছিল না, আর ক্ষমা করে দিচ্ছিল ! ঠিক যেন জোয়ান অব আর্ক ! -- “যাজকরা, অধ্যাপকরা আর ডাক্তাররা, আপনারা আমাকে আইনের হাতে তুলে দিয়ে  ভুল করছেন । আমি কখনও আপনাদের একজন ছিলুম না; আমি কখনও খ্রিস্টধর্মী ছিলুম না ; আমি সেই জাতির মানুষ যারা ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গায়; আমি তোমাদের আইনকানুন বুঝি না ; আমার নৈতিক জ্ঞানগম্যি আছে ; আমি ভালোমন্দজ্ঞানশূন্য ; তোমরা একটা বড়ো ভুল করে ফেলছো…”

     

    হ্যাঁ, তোমাদের ঝলমলে আলোয় আমার চোখ বন্ধ । আমি একটি পশু, একজন কৃষ্ণাঙ্গ । কিন্তু আমার পরিত্রাণ সম্ভব । তোমরা সব নকল কৃষ্ণাঙ্গ ; বাতিকগ্রস্ত, বুনো, কৃপণ, তোমরা সবাই । ব্যবসাদার, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; জজসাহেব, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; সেনাপতি, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; সম্রাট, বুড়ো চুলকানো-মাথা, তুমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ ; তুমি শয়তানের হেফাজত থেকে যে মদ খেয়েছো তাতে কেউ কর বসায় না । -- এই দেশকে উৎসাহিত করে জ্বরের তাপ আর কর্কটরোগ । পঙ্গু আর বুড়ো মানুষেরা এতো বেশি শ্রদ্ধার পাত্র যে তারা চায় তাদের উষ্ণতাপে সেদ্ধ করা হোক । -- সবচেয়ে ভালো হবে এই মহাদেশ ছেড়ে বিদায় নেয়া, যেখানে এই হতভাগাগুলোকে প্রতিভূ সরবরাহ করার জন্যে পাগলামি জিনিশটা ঘুরঘুর করে বেড়ায় । আমি প্রবেশ করবো ক্যাম্বোডিয়ার সত্যকার চাম রাজার সন্তানদের দেশে ।

     

    আমি কি প্রকৃতিকে বুঝতে পারি ? আমি কি নিজেকে বুঝতে পারি ? কোনও বাক্য আর আয়ত্বে নেই । আমি মৃত মানুষদের নিজের পাকস্হলিতে পুরে রাখি...হইহট্টোগোল, ঢোলঢোলোক, নাচো, নাচো, নাচো ! আমি সেই মুহূর্তের কথা চিন্তাও করতে পারি না যখন শ্বেতাঙ্গ মানুষরা পোঁছেচে, আর আমি শুন্যতায় তলিয়ে যাবো ।

    পিপাসা আর ক্ষুধা, হইহট্টোগোল, নাচো, নাচো নাচো !

     

    -----------------------------

     

    শ্বেতাঙ্গরা তীরে নামছে । কামানের গোলার আওয়াজ ! এখন আমাদের নির্ঘাত খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হবে, পোশাক পরে তৈরি হও, আর কাজে বেরোও ।

     

    আমার হৃৎপিণ্ডকে ঈশ্বরিক করুণায় বিদ্ধ করা হয়েছে । আহ ! আমি কখনও ভাবিনি যে আমার জীবনে এই ঘটনা ঘটবে !

     

    কিন্তু আমি কোনও অন্যায় তো করিনি । আমার দিনগুলো হয়ে উঠবে স্বস্তিময়, এবং পশ্চাত্তাপ থেকে আমাকে মুক্তি দেয়া হবে । যেখানে আনাড়ম্বর আলোকমালা শোকসভার মোমবাতির মতন আরেকবার জ্বলে ওঠে, আমাকে আধমরা আত্মার শুভত্বে পীড়ন করা হবে না । প্রথম সন্তানের অদৃষ্ট, সময়ের আগেই জন্মানো কফিন যা ঝিলমিলে কান্নাফোঁটায় ঢাকা । কোনও সন্দেহ নেই, ন্যায়ভ্রষ্টতা হলো বোকামি, কদভ্যাস হলো বোকামি ; পচনবিকারকে সদাসর্বদা দূরে সরিয়ে রাখতে হবে । কিন্তু দেয়ালঘড়িকেও শিখতে হবে বিশুদ্ধ যন্ত্রণার সময়নির্দেশের চেয়ে বেশিবার কাঁসরঘণ্টা কেমন করে বাজাতে হয় ! এই সমস্ত দুঃখকষ্ট ভুলিয়ে, আমাকে কি শিশুর মতন তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, যাতে স্বর্গোদ্যানে গিয়ে খেলা করতে পারি ! তাড়াতাড়ি করো ! সেখানে কি অন্যান্য জীবনও আছে ? -- বৈভবশালীদের পক্ষে শান্তিতে ঘুমোনো অসম্ভব । ঈশ্বর্য্য চিরকাল সবায়ের সামনে খোলামেলা থাকে । কেবল জ্ঞানের চাবিকাঠি দিতে পারে দেবোপম প্রেম। আমি তো দেখতে পাচ্ছি প্রকৃতি একধরণের দয়ামায়ার প্রদর্শনী । বিদায় বিশপের আঙরাখায় ঢাকা আগুনের নিঃশ্বাস-ওড়ানো দানব, আদর্শবোধ আর ভুলভ্রান্তি । 

     

    উদ্ধারকারী জাহাজ থেকে ভেসে আসছে দেবদূতদের উদ্দেশ্যময় গান : এ হলো দেবোপম ভালোবাসা। -- দুটি ভালোবাসা ! আমি জাগতিক প্রেমে মরে যেতে পারি, আনুগত্যের কারণে মরে যেতে পারি । আমি পেছনে ফেলে যাচ্ছি সেই সমস্ত প্রাণীদের, আমি চলে যাবার পর যাদের যাতনা ক্রমশ বাড়তে থাকবে  ! বাতিলদের মধ্যে থেকে তুমি আমাকে বেছে নিয়েছো, যারা রয়ে গেলো তারা কি আমার বন্ধু নয় ?

     

    তাদের অমঙ্গল থেকে বাঁচাও !

     

    আমি নিমিত্তসিদ্ধির খাতিরে দ্বিতীয়বার জন্মেছি । জগৎসংসার বেশ শুভময় । আমি জীবনকে আশীর্বাদ করবো । আমি আমার ভাইবেরাদরদের ভালোবাসবো ।  বাল্যকালীন প্রতিজ্ঞার ব্যাপার আর নেই। বার্ধক্য আর মৃত্যুকে এড়িয়ে যাবার আশা নেই । ঈশ্বর আমার শক্তি, এবং আমি ঈশ্বরের বন্দনা করি ।

     

    ----------------------------

    একঘেয়েমি-জনিত বিরক্তিকে আমি আর পছন্দ করি না । দুর্বার-ক্রোধ, বিকৃতকাম, উন্মাদনা, যাদের সব কয়টি স্পন্দনাঘাত আর দুর্বিপাকের সঙ্গে আমি পরিচিত, -- আমার সম্পূর্ণ ভার লাঘব হয়েছে । এবার আমার অপরাধশূন্যতার সীমাকে ঠাণ্ডা মাথায় মূল্যায়ন করা যাক।

     

    প্রহারের সন্তুষ্টি চাইবার মতন অবস্হায় আমি আর নেই । আমি কল্পনা করি না যে আমার শ্বশুর যিশুখ্রিস্টের সঙ্গে আমি মধুচন্দ্রিমায় বেরিয়েছি ।

     

    আমি আমার নিজের যুক্তিজালে আটক জেলবন্দি নই । আমি তো বলেছি । হে ঈশ্বর । আমি উত্তরণের মাধ্যমে স্বাধীনতা চাই : আমি কেমন করে সেই দিকে যাবো ? ছেলেমানুষির সেই স্বাদ আর নেই । আর দরকার নেই দেবোপম ভালোবাসার কিংবা কর্তব্যের প্রতি উৎসর্জন। আমি ছেলেবেলার আবেগ ও অনুভবের ত্রুটিকে দোষ বলে মনে করিনা । যে যার নিজের যুক্তিপূর্ণতায়, অবজ্ঞায়, সর্বজনপ্রীতিতে রয়েছে : শুভবুদ্ধির দেবদূতোপম সিঁড়ির সবচেয়ে ওপরের ধাপে নিজেকে রেখেছি আমি ।

     

    আর যদি সুস্হিত আনন্দের কথা বলতে হয়, গার্হস্হ হোক বা না হোক...। না, আমি পারবো না। আমি বড়ো বেশি তুচ্ছ, অত্যন্ত দুর্বল । কর্মকাণ্ড জীবনকে কুসুমিত করে তোলে, ওটা পুরোনো ধ্যানধারণা, আমার নয় ; আমার জীবন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়, তা কর্মকাণ্ডের থেকে দূরে লক্ষ্যহীন ভেসে চলে যায়, পৃথিবীর সেই তৃতীয় মেরুঅঞ্চলে ।

     

    বুড়ি চাকরানি হয়ে যাচ্ছি আমি, মৃত্যকে ভালোবাসার সাহস হারিয়ে ফেলেছি !

     

    ঈশ্বর যদি আমাকে সেই দিব্যশান্তি দিতেন, নির্মল প্রশান্তি, এবং প্রার্থনা, -- প্রাচীনকালের সন্তদের মতন  -- সেই সন্তরা ! তাঁরা ছিলেন শক্তিমন্ত ! নোঙোর, এমনই এক ধরণের শিল্পী যাঁদের প্রয়োজন আর আমাদের নেই !

    এই প্রহসনের কি এবার শেষ হওয়া প্রয়োজন ? আমাকে কাঁদাবার জন্যে আমার শুদ্ধতা যথেষ্ট। জীবন নামের প্রহসনে সবাইকে খেলতে হবে ।

     

    --------------------------

     

    এবার থামাও ! এটা তোমার শাস্তি । -- কুচকাওয়াজ করে এগিয়ে যাও !

     

    আহ ! আমার ফুসফুস জ্বলছে, কপাল দপদপ করছে ! রাত্রি ঘনিয়ে আসছে আমার চোখে, এই সূর্যের তলায় ! আমার হৃদয়….আমার দুই হাত আর পাদুটো….

     

    আমরা কোথায় চলেছি ? যুদ্ধ করতে ? আমি বেশ দুর্বল ! অন্যেরা এগিয়ে চলেছে । যন্ত্রপাতি, অস্ত্রশস্ত্র...আমাকে সময় দাও !

     

    গুলি চালাও ! আমাকে তাক করে গুলি চালাও ! নয়তো আমি তোমাদের হাতে ছেড়ে দেবো নিজেকে । -- ভিতুর দল ! -- আমি নিজেকে খুন করবো ! আমি নিজেকে ঘোড়ার খুরের তলায় নিক্ষেপ করবো !

     

    আহ !

     

    --আমি এ-সবে অভ্যস্ত হয়ে যাবো ।

     

    সেটাই হবে ফরাসি উপায়, শৌর্যের পথ ।

     

    নরকে এক রাত     

                                                  

    আমি এক্ষুনি মুখভরা ভয়ানক বিষ গিলে ফেলেছি । -- আমাকে যে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল তাতে আমি মহিমান্বিত, মহিমান্বিত, মহিমান্বিত ! -- আমার নাড়িভূঁড়িতে আগুন ধরে গেছে । বিষের ক্রিয়াক্ষমতায় আমার দুই হাত আর পাদুটো মুচড়ে উঠছে, পঙ্গু করে দিচ্ছে, মাটিতে থুবড়ে ফেলে দিয়েছে । তৃষ্ণায় মরে যাচ্ছি, শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে, আমি কাঁদতে পারছি না । এ হলো নরক, অনাদি-অনন্ত যন্ত্রণাভোগ ! দ্যাখো আগুনের শিখা কেমনভাবে ওপরে উঠে যাচ্ছে ! আমার যাওয়া উচিত, আমি জ্বলেপুড়ে মরছি । চালিয়ে যাও, হে শয়তান !

     

    আমি একবার শুভের সঙ্গে আর প্রকাশসৌষ্ঠভের সঙ্গে কথা কইবার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলুম, পাপের শাস্তি হিসাবে নরকভোগ থেকে মুক্ত । কেমন করেই বা আমি নিজের দৃষ্টিপ্রতিভা বর্ণনা করবো, নরকের বাতাস বন্দনাগান গাইবার পক্ষে বড্ডো গাঢ় ! সুসংবদ্ধ আত্মিক ঐকতান, বলিষ্ঠতা এবং শান্তি,  অভিজাত উচ্চাশা, তাছাড়া জানি না আরও কি ছিল সেখানকার লক্ষ-লক্ষ পরমানন্দিত প্রাণীদের ?

     

    পরমানন্দের উচ্চাশা !

     

    কিন্তু তবু আমি বেঁচে আছি ! -- মনে করো নরকযন্ত্রণা হলো শাশ্বত ! একজন মানুষ যে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করতে চাইছে সে নিশ্চয়ই অভিশপ্ত, নয়কি ? আমার বিশ্বাস আমি নরকে রয়েছি, তার মানে আমি বেঁচে আছি । এই প্রশ্নোত্তরপর্বই কাজ করে চলেছে । আমি আমার খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত কেনা-গোলাম । তোমরা, আমার বাপ-মা, আমার জীবন নষ্ট করে দিয়েছো, আর নিজেদের জীবনও । বেচারা খোকা ! -- পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে নরক ক্ষমতাহীন । -- আমি তবু বেঁচে আছি! পরে, নরকযন্ত্রণার মহানন্দ হয়ে উঠবে আরও নিগূঢ় । একটা অপরাধ, দ্রুত, আর মানুষের আইনে দণ্ডাদেশ পাওয়া আমাকে শূন্যতায় তলিয়ে যেতে দাও ।

     

    চুপ করো, তুমি কি চুপ করবে !...এখানে সবকিছুই লজ্জাকর আর কলঙ্কিত ; শয়তান বলছে যে আগুনটার কোনও মানে হয় না,  বলছে যে আমার ক্রোধ হলো হাস্যকর এবং নির্বোধ। -- আহ, থামো দিকিনি !...কেউ ফিসফিস করে ওই ভুলগুলোর কথা বলেছে, ইন্দ্রজালের সন্মোহন, বোকা-বানানো গন্ধ, শিশুতোষ সঙ্গীত । -- আর এই কথা ভাবা যে আমিই সত্যের অধিকারী, যে আমার আয়ত্বে চলে আসতে পারে বিচারের দৃষ্টিপ্রতিভা : আমার নির্ণয় বিচক্ষণ আর দৃঢ়, নিখুঁত হয়ে ওঠার জন্যে আমি শ্রেষ্ঠগুণসম্পন্ন… গর্ববোধ । -- আমার করোটি চেপে বসছে । দয়া করো ! হে নাথ, আমি সন্ত্রস্ত ! জল দাও, আমার তেষ্টা পাচ্ছে, আমার তেষ্টা পাচ্ছে ! আহ, শৈশব, ঘাসভূমি আর বৃষ্টি, পথের পাথরে জমা জল, যখন রাত বারোটা বাজে তখনকার চাঁদের আলো….শয়তান দাঁড়িয়ে রয়েছে ঘড়িমিনারের ছাদে, ঠিক এখনই ! মেরি । পবিত্র অক্ষতযোনি !...ভয়ংকর মূর্খতা।

     

    ওই দিকে তাকাও, ওরা কি মাননীয় মানুষ নয়, যারা আমার ভালো চেয়েছে ?...এসো...মুখের ওপরে বালিশ, ওরা আমাকে শুনতে পাবে না, ওরা তো কেবল প্রেত।

     

    যাই হোক, কেউ আর অন্য কারোর কথা ভাবে না । ওদের কাছে আসতে দিও না । আমার গা থেকে নিশ্চয়ই পোড়া মাংসের গন্ধ বেরোচ্ছে ।

     

    আমার অলীকদৃশ্যগুলো অসংখ্য । এগুলোই আমাকে সব সময় সহ্য করতে হয়েছে : ইতিহাস সম্পর্কে আমার বিশ্বাসহীনতা,  আদর্শগুলোকে উপেক্ষা । আমি এই বিষয়ে আর কোনও কথা বলব না : কবিরা এবং দ্রষ্টারা ঈর্ষা করবে । আমি সকলের চেয়ে ধনী, কয়েক হাজার গুণ, আর আমি তা সমুদ্রের মতন আগলে রাখবো ।

    হে ঈশ্বর -- এক মুহূর্ত আগে জীবনের ঘড়ি থেমে গেছে । আমি আর পৃথিবীর অন্তর্গত নই। -- ব্রহ্মবিদ্যা সঠিক ; নরক নিশ্চয়ই নিচের দিকে -- এবং স্বর্গ ওপরদিকে । -- ভাবাবেশ, দুঃস্বপ্ন, ঘুম, আগুনের নীড়ের ভেতরে ।

    দেশের মধ্যে কেমন করে অলস ঘুরে বেড়ায় মন...শয়তান, ফার্দিনান্দ, বুনো বীজের সঙ্গে উড়ে যায়...যিশুখ্রিস্ট ময়ূরপঙ্খী রঙের কাঁটার ওপর দিয়ে হেঁটে যান কিন্তু তাদের নত করেন না...যিশু হেঁটে যেতেন চঞ্চল সমুদ্রের ওপর দিয়ে । লন্ঠনের আলোয় আমরা ওনাকে সেখানে দেখেছি, শ্বেতবসনে, দীর্ঘ বাদামি চুল, পান্নারঙা এক ঢেউয়ের ওপরে দাঁড়িয়ে আছেন ।

     

    যাবতীয় রহস্যের চাদর আমি ছিঁড়ে ফেলবো : ধর্মের রহস্য হোক কিংবা প্রকৃতি, মৃত্যু, জন্ম, ভবিষ্যৎ, অতীত, সৃষ্টির উৎপত্তিতত্ব, এবং শূন্যতার রহস্য । আমি হলুম মোহাবিষ্ট চোখে-দেখা অলীক ছায়ামূর্তিদের মালিক ।

    শোনো !...

     

    প্রতিটি কর্মদক্ষতাই আমার ! -- এখানে কেউ নেই, ওখানে কেউ রয়েছে : আমি আমার ঐশ্বর্য নষ্ট করতে চাইবো না । -- আমি কি তোমাকে আফরিকার বাঁশি শোনাবো, তলপেট-নাচিয়েদের ? আমি কি উধাও হয়ে যাবো, আমি কি চেষ্টা করবো গসপেল-কথিত আঙটি খুঁজে আনার । যাবো? আমি তৈরি করব সোনা আর ওষুধ ।

    তাহলে,  আমাকে বিশ্বাস করো । বিশ্বাস আরাম দ্যায়, তা পথনির্দেশ করে এবং সারিয়ে তোলে। তোমরা সবাই আমার কাছে এসো, -- ছোটো বাচ্চারাও -- এসো তোমাদের সান্তনা দিই, তোমাদের সামনে আমার হৃদয়ের কথা মেলে ধরি -- আমার অলৌকিক হৃদয় ! -- হে দরিদ্রগণ, হে দরিদ্র শ্রমিকবৃন্দ ! আমি বন্দনাগান চাইছি না : তোমরা কেবল আমাকে বিশ্বাস করো, আর তাহলেই আমি আনন্দিত হবো ।

     

    -- এবার, আমার কথা ভাবো । এই সবকিছু পৃথিবীকে হারানোর ব্যাপারে আমাকে তাড়িত করে না । আমি ভাগ্যবান যে আমাকে আর যন্ত্রণা পেতে হবে না । আমার জীবন, দুর্ভাগ্যবশত, মিষ্টি বোকামি ছাড়া আর কিছুই ছিল না ।

     

    বাহ ! যতো রকমের কুৎসিত মুখভঙ্গী হতে পারে আমি তা করবো ।

     

    আমরা জগৎসংসারের বাইরে, নিঃসন্দেহে । কোনও শব্দ নেই ।  স্পর্শের বোধশক্তি আমার চলে গেছে । আহ, আমার দুর্গভবন, আমার স্যাক্সনি, আমার উইলোবনানী ! সন্ধ্যা ও সকাল, রাত আর দিন...আমি কতো ক্লান্ত !

    আমার ক্রোধের জন্যে একটা বিশেষ নরক থাকা উচিত ছিল, একটা নরক গর্ববোধের জন্যে, -- এবং একটা নরক যৌনতার জন্যে ; নরকের এক পরিপূর্ণ ঐকতান-সঙ্গীত !

     

    আমি পরিশ্রান্ত, আমি মরে যাচ্ছি । এটাই কবর আর আমি কীটে পরিণত হয়ে চলেছি, আতঙ্ক ছাপিয়ে গেছে আতঙ্ককে ! শয়তান, ভাঁড় কোথাকার, তুই নিজের চমৎকারিত্ব দিয়ে আমাকে গলিয়ে ফেলতে চাইছিস । ঠিক আছে, আমি তাইই চাই । আমি তাই চাই । কোদালকাঁটা দিয়ে আমাকে গিঁথে ফ্যালো, আমার ওপরে আগুনের ফোঁটা ঝরাও ।

     

    আহ ! জীবনে ফিরে যাওয়া ! আমাদের বিকলাঙ্গতার দিকে তাকিয়ে দ্যাখা । আর এই বিষ, এই শাশ্বত অভিশপ্ত আলিঙ্গন ! আমার দুর্বলতা, এবং জগতসংসারের নির্দয়তা ! হে ঈশ্বর, দয়া করো, আমাকে লুকিয়ে ফ্যালো, আমি নিজেকে একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না -- আমি আড়ালে রয়েছি, আর আমি নেইও ।

     

    আর যেমন-যেমন অভিশপ্ত আত্মা জেগে উঠতে থাকে, ঠিক তেমনই আগুনও ।

     

     

     প্রথম ডিলিরিয়াম : সেই বোকা অক্ষতযোনি মেয়ে          

                                                

     নরকবাসী একজন পুরোনো বন্ধুর আত্মস্বীকৃতি শোনা যাক, “হে প্রভু, হে দিব্য বিবাহের বর, তোমার সবচেয়ে সমব্যথী পরিচারিকাদের আত্মস্বীকৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না । আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি । আমি মাতাল । আমি অশুদ্ধ।

     

    এই কি জীবন !

     

    “ক্ষমা করো, স্বর্গের নিবাসী হে প্রভু, ক্ষমা করে দাও ! আহ ! ক্ষমা করো । এই কান্নার জল। এবং আরও যে অশ্রু পরে ঝরতে থাকবে, অনুমান করি !

     

    “পরে, আমি দিব্য বিবাহের বরের সঙ্গে দেখা করবো ! আমি তো জন্মেছিলুম তাঁর কেনা-গোলাম হবার জন্যে । -- ওরা এবার আমাকে পিটুনি দিতে পারে !

     

    “ঠিক এখনই, জগতসংসারের শেষ ! ওহ, মেয়েরা...আমার বন্ধুনিরা !...না, আমার বন্ধুনিরা নয়...আমি কখনও এমনতর অবস্হা সহ্য করিনি, ডিলিরিয়াম, পীড়নসমূহ, সমস্তকিছু...এটা এমন অর্থহীন ।

     

    “ওহ ! আমি কাঁদছি, আমি কষ্ট পাচ্ছি । আমি সত্যিই যন্ত্রণাভোগ করছি । তবু আমার যা ইচ্ছা করার অধিকার রয়েছে, যখন কিনা আমাকে ঘিরে ফেলা হয়েছে সবচেয়ে অবজ্ঞেয় হৃদয়গুলোর অবজ্ঞা দিয়ে ।

     

    “ঠিক আছে, আমাকে আত্মস্বীকৃতি করতে দেয়া তো হোক, যদিও আমাকে হয়তো তা কুড়িবার নতুন করে আওড়াতে হবে, -- এমনই নীরস, এবং এমনই গুরুত্বহীন !

     

    “আমি নারকীয় বিয়ের বরের একজন কেনা-গোলাম, সেই লোকটা যে বোকা অক্ষতযোনি মেয়েদের ফুসলিয়ে সতীত্বহানি করেছিল । ও একেবারে সেই রকমেরই শয়তান । ও মোটেই মায়াপুরুষ নয়, ও প্রেতও নয় । কিন্তু আমি, যে কিনা নিজের কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি, জগতসংসারের কাছে অভিশপ্ত আর মৃত ,-- কেউই আমাকে খুন করতে পারবে না ! কেমন করে তোমার কাছে তার বর্ণনা করি ! এমনকি আমি কথাও বলতে পারছি না । আমি পরে আছি শোকের পোশাক, আমি কাঁদছি, আমি বেশ ভয়ার্ত । দয়া করো, হে প্রভু, একটু টাটকা বাতাস, যদি তোমার খারাপ না লাগে, দয়া করো ! 

     

    “আমি এক বিধবা…-- আমি এক সময় বিধবা ছিলুম…--ওহ, হ্যাঁ, তখনকার সময়ে আমি ভীষণ গম্ভীর থাকতুম, আমি কংকাল হয়ে ওঠার জন্য জন্মাইনি !...ও ছিল কচিখোকা কিংবা বলা যায় প্রায়...ওর কোমল, রহস্যময় চালচলন আমাকে পুলকিত করেছিল । ওকে অনুসরণ করতে গিয়ে আমি আমার সব কর্তব্য ভুলে গেলুম । কি যে এক জীবন আমরা কাটাই ! সত্যকার জীবনের অভাব রয়েছে । আমরা এই জগতসংসার থেকে নির্বাসিত, সত্যি -- ও যেদিকে যায় আমিও সেই দিকে যাই, আমাকে যেতেই হয় । আর বেশির ভাগ সময়ে ও আমার ওপর ক্ষেপে যায়, আমার প্রতি, বেচারা পাপিষ্ঠ । সেই শয়তানটা ! ও সত্যিই একটা শয়তান, তুমি জানো, এবং মোটেই মানুষ নয় ।

     

    “ও বলে : “আমি মেয়েদের ভালোবাসি না । ভালোবাসাকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে, আমরা তা জানি । মেয়েরা যা শেষপর্যন্ত চায় তা হল সুরক্ষা । একবার ওরা তা পেয়ে গেলে, প্রেম, সৌন্দর্য্য, সবই জানালার বাইরে কেটে পড়ে : যা তাদের কাছে রয়ে যায় তা হলো তাচ্ছল্য, আজকাল বিবাহ তার ওপরই টিকে থাকে । অনেক সময়ে আমি এমন তরুণীদেরও দেখেছি যাদের খুশি থাকার কথা, যাদের সাথে আমি সঙ্গলাভ করতে পারতুম, কিন্তু তাদের তো আগে থেকেই মাস্তানরা এমন গিলে খেয়েছে যেন কাঠের গুঁড়ি ছাড়া তারা আর কিছুই নয়…”

     

    “আমি ওকে শুনি, বদনামকে শৌর্যে পালটে ফেলছে, নিষ্ঠুরতাকে মায়ায় । “আমি প্রাচীন এক জাতির সদস্য : আমার পুর্বপুরুষরা ছিল ভাইকিং যোদ্ধা : তারা নিজেদের দেহ ফালাফালা করে ফেলতো, নিজেদের রক্ত পান করতো ।---আমি আমার সমস্ত শরীর ফালাফালা করে ফেলবো, উল্কি দেগে দেবো সারা শরীরে , আমি মোঙ্গোলদের মতন কুৎসিত হয়ে উঠতে চাই : তুমি দেখো, রাস্তায় দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ আর্তনাদ করতে চাই । আমি সত্যিই রাগে ফুঁসিয়ে উঠতে চাই । আমাকে হীরে-জওহরত দেখিও না ; আমি চার হাতেপায়ে জাজিমের ওপরে হামাগুড়ি দিয়ে দুমড়ে উঠবো । আমি চাই আমার ধনসম্পত্তি রক্তে জবজবে হয়ে উঠুক । আমি কখনও কোনো কাজ করবো না… “বহুবার, রাতের বেলায়, ওর দানব আমাকে কাবু করেছে, আর আমরা কুস্তির দাঁওপ্যাঁচে গড়াগড়ি খেয়েছি ! -- অনেক সময়ে রাতের বেলায় যখন ও মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যায় তখন ও রাস্তার আনাচে-কানাচে কিংবা দরোজার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়, যাতে আমাকে ভয়ে আধমরা করে দিতে পারে ।-- আমি নির্ঘাৎ আমার গলা কেটে ফেলবো ; তা কি বিরক্তিকর হবে।” আর, ওহ ! সেই দিনগুলো যখন ও খুনি হবার ভান করে !

     

    “অনেক সময়ে ও ওর দেশোয়ালি বুলিতে কথা বলে, তা একেবারে আবেগে ঠাশা, মৃত্যু সম্পর্কে, আর তা কেমন করে আমাদের অনুতপ্ত করে, এবং জগতসংসারে নিশ্চয়ই দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ আছে, শ্রমে পরিশ্রান্ত, আর বিদায় জানাবার প্রসঙ্গ তোলে এবং তা কেমন করে তোমার হৃদয়কে বিদীর্ণ করে ফ্যালে । যে নোংরা পানশালাগুলোতে ও মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যেতো, তখন আমাদের চারিপাশের লোকজনদের দেখে কাঁদতো -- যেন বস্তি-অঞ্চলের গোরুমোষ । অন্ধকার রাস্তায় মাতালদের তুলে নিতো । ছোট্ট খোকাদের জন্য নির্দয় মায়ের দয়ামায়া ছিল ওর । রবিবারের স্কুলের পথে এক ছোট্ট খুকির মতন মধুরস্বভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াতো । ও ভান করতো যেন সবকিছুই জানে, ব্যবসাপাতি, শিল্প, ওষুধ । -- আর আমি সবসময় ওর সমর্থন করতুম, আমাকে করতে হতো !

     

    “ও নিজের কল্পনাজগতে যেসব ঝালর ঝুলিয়ে রাখতো তা আমি সুস্পষ্ট দেখতে পেতুম ; পোশাক-পরিচ্ছদ, কারিগরি, আসবাবপত্র….আমিই ওকে অস্ত্র ধার দিয়েছিলুম, আর মুখভঙ্গীতে রদবদল । ওকে যাকিছু প্রভাবিত করতো তা আমি টের পেতুম, ঠিক যেমনভাবে ও নিজেকে কল্পনা করে নিতো । যখনই ওকে মনে হয়েছে হতোদ্যম, আমি ওকে অদ্ভুত দুর্বোধ্য অভিযানে অনুসরণ করতুম, চলেছি তো চলেইছি, শুভ হোক বা অশুভ : কিন্তু আমি সবসময়ে জানতুম যে আমি ওর জগতের অংশীদার হতে পারবো না । ওর প্রিয় দেহের পাশে, শুয়ে থাকার সময়ে, জেগে থাকতুম ঘণ্টার পর ঘণ্টা, রাতের পর রাত, ভাবতে চেষ্টা করতুম যে কেন ও বাস্তব থেকে পালিয়ে যেতে চায় । এর আগে আর কোনো লোকের এই রকম ইচ্ছে হয়নি । আমি বুঝতে পেরেছিলুম, ওর সম্পর্কে বিনা ভয়ে -- যে, সমাজের পক্ষে ও ভয়ানক বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে । ওর কি, হয়তো, এমন কিছু গোপন ব্যাপার ছিল যা ওর জীবনের নবীকরন ঘটাবে ? না, আমি নিজেকে বলেছি, ও কেবল সেগুলোকে অনুসন্ধান করছিল । কিন্তু তবু, ওর বদান্যতা এক সন্মোহনে আবৃত, এবং আমি তাতে বন্দী । আর কারোর অমন শক্তিক্ষমতা থাকতে পারে না -- হতাশার শক্তিক্ষমতা --- তা সহ্য করবার, ওর ভালোবাসা আর শুশ্রুষা সহ্য করার ক্ষমতা । তাছাড়া, অন্য কারো সাথে আমি ওকে কল্পনাও করতে পারি না : আমাদের সকলের রয়েছে নিজস্ব কালো-দেবদূতের চোখ, অন্য লোকেদের দেবদূতদের নয়, --- অন্তত আমি তাইই মনে করি। আমি ওর আত্মার ভেতরে বাসা বেঁধেছিলুম,  যেন তা ছিল এক ফাঁকা প্রাসাদ যাতে সবচেয়ে অযোগ্য লোক হিসাবে তুমিই তাতে থাকো : ব্যাস এইটুকুই । আহ! সত্যি বলতে কি আমি ওর ওপর শোচনীয়ভাবে নির্ভর করতুম । কিন্তু আমার নিষ্প্রভ, আমার ভিতু অস্তিত্ব থেকে ও কিই বা চাইতো ? ও তো আমার উৎকর্ষসাধন করতে পারতো না, যদিও ও কখনও আমাকে মেরে ফেলার ব্যবস্হা করতে পারেনি ! আমি এমন ভেঙে পড়ি আর হতাশ হই : অনেকসময়ে আমি ওকে বলি: “আমি তোমাকে বুঝতে পারি।” ও তাতে কেবল কাঁধ নাচায় । 

     

    “আর তাই আমার হৃদয়ের বেদনা বাড়তেই থাকলো, আর আমি দেখলুম যে বেশি করে ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছি -- আর সবাই তা হয়তো দেখতে পেয়েছে, নিশ্চয়ই, আমি যদি এতোটা অবজ্ঞেয় না হতুম তাহলে কেউই আর আমার দিকে তাকিয়ে দেখতো না ! আর তবু আমি ওর অনুরাগের জন্যে আকুল কামনা করেছি...ওর চুমুগুলো আর ওর বন্ধুত্বের আলিঙ্গন ছিল স্বর্গীয়-- অন্ধকার স্বর্গ, যার মধ্যে আমি প্রবেশ করতে পারতুম, আর যেখানে আমি চাইতুম আমাকে রেখে দেয়া হোক -- গরিব, বধির, বোবা, এবং অন্ধ । আমি ইতিমধ্যে ওর ওপর নির্ভর করা আরম্ভ করেছিলুম । এবং আমি কল্পনা করতুম যে আমরা দুজন সুখী বালক দুঃখের স্বর্গোদ্যানে স্বাধীন ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি । আমাদের মধ্যে ছিল চরম সামঞ্জস্য । গভীর সমবেদনায়, আমরা পাশাপাশি খেটেছি । কিন্তু তারপর, এক ছিঁড়েফেলা আলিঙ্গনের শেষে, ও বলে উঠবে : “কতো মজার মনে হবে এই সমস্ত কাণ্ড, যা তুমি সহ্য করেছো, যখন আমি আর এখানে থাকবো না । যখন তুমি তোমার কাঁধ ঘিরে আমার বাহু অনুভব করবে না, তোমার তলায় আমার হৃদয়কেও পাবে না, তোমার চোখের ওপর আমার এই মুখ । কেননা একদিন আমাকে চলে যেতে হবে, অনেক দূরে । তাছাড়া, অন্যদেরও তো আমার সহচর্যের প্রয়োজন : সেই জন্যেই আমি এখানে রয়েছি, যদিও আমি সত্যিই তা চাই না...প্রিয় হৃদয়…”আর সেই মুহূর্তে আমি নিজেকে অনুভব করতে পারি, ও চলে যাবার পর, ভয়ে বিহ্বল, ভয়ঙ্কর কালোগহ্বরে তলিয়ে যাওয়া : মৃত্যুর দিকে । আমি ওকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করালুম যে ও আমাকে কখনও ছেড়ে চলে যাবে না । এবং ও প্রতিজ্ঞা করলো, কুড়িবার ; প্রেমিকের মতন প্রতিজ্ঞা করলো । ব্যাপারটা যেন ওকে বলা আমার এই কথার মতন অর্থহীন “আমি তোমায় বুঝতে পারছি”।

     

    “ওহ, আমি কখনও ওর সম্পর্কে ঈর্ষান্বিত হইনি । ও আমাকে কখনও ছেড়ে চলে যাবে না, আমি সে বিষয়ে নিশ্চিত । কিই বা ও করবে ? কোনো লোককেই ও চেনে না ; ও কোনও কাজও করতে পারবে না । ও ঘুমে-হাঁটা মানুষের মতন বাঁচতে চায় । ওর দয়া আর বদান্যতা কি বাস্তব জগতে ওকে ঠাঁই দেবে ? এমন মুহূর্তও আসে যখন আমি ভুলে যাই যে কোনও জঘন্য নোংরামিতে আমি জড়িয়ে পড়েছি : ও আমাকে শক্তি যোগাবে, আমরা দেশান্তরে যাবো, মরুভূমিতে শিকার করতে যাবো, অচেনা শহরের পথের ধারে ঘুমোবো, পিছুটানহীন আর মজায় । কিংবা হয়তো কোনোদিন জেগে উঠলুম আর -- ওর ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতা যাবতীয় আইনকানুন ও নীতি-নৈতিকতায় বদল ঘটিয়ে ফেলেছে, -- কিন্তু জগতসংসার ঠিক আগেকার মতনই রয়ে যাবে আর আমাকে রেখে যাবে আমার আকাঙ্খা আর আমার আনন্দ আর আমার উদ্বেগহীনতায়।

     

    ওহ! অভিযানের সেই বিস্ময়কর জগৎ যা আমরা বাচ্চাদের বইতে পেতুম -- তুমি কি সেই জগৎ আমাকে দেবে না ? আমি অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছি, আমি একখানা পুরস্কারের যোগ্যতা রাখি। ওর তা নেই । আমি সত্যিই জানি না ও ঠিক কী চায় । ও বলে যে ওর রয়েছে নানাবিধ আশা এবং পশ্চাত্তাপ : কিন্তু সেসব ব্যাপার নিয়ে আমার কিছুই করার নেই । ও কি ঈশ্বরের সঙ্গে কথা কয় ? আমারও উচিত ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলা । আমি অতলের তলানিতে, আর আমি ভুলে গেছি কেমন করে প্রার্থনা করতে হয় ।

     

    “মনে করো ও আমাকে নিজের দঃখকষ্ট ব্যাখ্যা করলো, আমি কি তা ওর ঠাট্টা-ইয়ার্কি এবং অপমানের চেয়ে ভালো করে বুঝতে পারবো ? ও আমাকে আক্রমণ করে, ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে লজ্জায় ফেলার জন্য সেইসব ব্যাপার যা আমার কাছে কখনও গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা নিয়ে বকে যায়, আর তারপর আমি যখন কাঁদি তখন ক্ষেপে যায়। 

     

    “-- তুমি কি ওই সৌম্যকাক্তি যুবকটিকে দেখতে পাচ্ছো সুন্দর, শান্তিপূর্ণ বাড়িটায় ঢুকছে? ওর নাম দুভাল, দুফো, আরমান্দ, মরিস, যা তুমি মনে করো। ওখানে এক মহিলা আছেন যিনি ওই অশুভ প্রাণীটাকে ভালোবেসে সারাজীবন কাটিয়েছেন : উনি মারা গেলেন। আমি নিশ্চিত উনি এখন স্বর্গবাসী একজন সন্ত । তুমি আমাকে সেইভাবেই খুন করবে যেভাবে ও ওই মহিলাকে খুন করেছে । যাদের রয়েছে পরার্থবাদী হৃদয় তাদের এটাই ভবিতব্য…”। হে প্রিয় ! এমনও দিনকাল ছিল যখন ওর মনে হতো উদ্যমী মানুষেরা ওর গ্রটেস্ক উন্মাদনার খেলনা : ও তারপর ভয়ানকভাবে হাসতেই থাকবে, হাসতেই থাকবে ।---তারপর ও কমবয়সী মায়ের মতন বা বয়স্কা বোনের মতন অভিনয় করায় ফিরে যাবে । ও যদি অমন বুনো জিনিস না হতো, তাহলে আমরা বেঁচে যেতুম । কিন্তু ওর মধুরস্বভাবও সাঙ্ঘাতিক । আমি একজন কেনা-গোলাম। -- ওহ, আমি আমার চিন্তাক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি !

     

    “কোনও দিন হয়তো ও অলৌকিকভাবে লোপাট হয়ে যাবে, কিন্তু আমাকে তা নিশ্চিত করে বলে যাওয়া দরকার, মানে আমি বলতে চাইছি ও যদি স্বর্গে বা অন্য কোথাও ফিরে যেতে চায়, যাতে আমি গিয়ে এক মুহূর্তের জন্যে দেখতে পারি অক্ষতযোনি মেরির ঢঙে আমার সোহাগের খোকাটার স্বর্গারোহন ।

     

    একটা নারকীয় গৃহস্হালী বটে !

     

     

     দ্বিতীয় ডিলিরিয়াম : শব্দের অপরসায়ন        

                                                                                                        

    এবার আমার পালা । আমার উন্মাদনাগুলোর এক কাহিনি ।

     

    অনেককাল যাবত আমি এই ভেবে দম্ভোক্তি করতুম যে সমস্ত সম্ভাব্য ভূদৃশ্যের আমি গুরু এবং আমি মনে করতুম যে আধুনিক তৈলচিত্র আর কবিতার মহান ব্যক্তিদের কাজগুলো হাস্যকর।

     

    যা আমি পছন্দ করতুম তা হলো : কিম্ভুতকিমাকার তৈলচিত্র, চৌকাঠের মাথার ওপরের ছবি, মঞ্চের সজ্জা, কার্নিভালের পশ্চাতপট, সাইনবোর্ড, রঙচঙে ছাপা ; পুরোনোদিনের সাহিত্য, গির্জার লাতিন, ভুল বানানে ভরা যৌনপুস্তক, যে ধরণের উপন্যাস আমাদের ঠাকুমা-দিদিমারা পড়েন, পরিদের গল্প, বাচ্চাদের বই, পুরোনো অপেরা, ফালতু পুরোনো গান, দেশোয়ালি গানের ঠুনকো তাল ।

     

    আমি ক্রুসেডের স্বপ্ন দেখতুম, এমন আবিষ্কারযাত্রায় বেরিয়েছি যা কেউ কখনও শোনেনি, ইতিহাসহীন গণরাজ্য, মুছে-ফেলা ধর্মযুদ্ধ, নৈতিকতায় বিপ্লব, মহাদেশ ও জনজাতির প্রসারণ : আমি সমস্ত রকমের ইন্দ্রজালে বিশ্বাস করতুম ।

     

    আমি প্রতিটি স্বরবর্ণের রঙ আবিষ্কার করেছি ! --A  কালো, E শাদা, I লাল,O  নীল, U সবুজ।

     

    ---আমি আঙ্গিকের নিয়ম তেরি করেছি এবং প্রতিটি ব্যঞ্জনবর্ণের বিচলন, এবং আমি নিজের অন্তরজগত থেকে ছন্দ আবিষ্কারের দম্ভোক্তি করতুম, এমনই এক ধরণের কবিতা যাকে প্রতিটি ইন্দ্রিয়, এখন হোক বা পরে, স্বীকৃতি দেবে । এবং কেবল আমিই হবো তার অনুবাদক।

     

    এটা আমি অনুসন্ধান হিসাবে আরম্ভ করেছিলুম । আমি নৈঃশব্দ আর রাতকে শব্দে পরিবর্তিত করে দিয়েছিলুম । যা উচ্চারণ করা যায় না, আমি তা লিখে ফেলতুম । আমি ঘুরন্ত পৃথিবীকে এক জায়গায় স্হির করে দিয়েছিলুম ।

     

                                                ----------------

     

    ঝাঁকের থেকে দূরে, পাখিদের আর গ্রামের খুকিদের,

    ওই পাতা-সবুজের ভেতরে আমি কী পান করেছিলুম

    কচি বাদামগাছে ঘেরা

    দুপুরের উষ্ণসবুজ কুয়াশায় ?

    এই নতুন ওয়াজ নদী থেকে আমি কী পান করতে পারি

    --জিভহীন গাছেরা, ফুলহীন ঘাসভূমি, অন্ধকার আকাশ !--

    এই হলুদ কুমড়োখোসা থেকে পান করব, সেই কুটির থেকে দূরে

    যা আমি ভালোবাসতুম ? একটু সোনালি চুমুক যার দরুন আমি ঘামছি।

    আমাকে দেখে কোনো সরাইখানার সন্দিগ্ধ প্রতিনিধি মনে হতে পারতো ।

    -- পরে, সন্ধ্যার দিকে, আকাশ মেঘেয় ভরা…

    বনের ভেতর থেকে জলধারা ছুটে চলেছে বিশুদ্ধ বালিয়াড়িতে,

    আর পুকুরের ওপরে স্বর্গীয় বাতাসে বরফের পুরু সর ;

    তারপর আমি দেখতে পেলুম স্বর্ণ, আর ফোঁপালুম, কিন্তু পান করা হলো না।

     

    গ্রীষ্মকালে, সকাল চারটের সময়ে

    ভালোবাসার খোঁয়ারি তখনও থেকে গেছে…

    ঝোপঝাড় ছড়িয়ে দিচ্ছে সুগন্ধ

    রাতের পানভোজনোৎসবের

    উজ্জ্বল নদীকন্যাদের ওইদিকে

    সূর্যের পশ্চিমা কারখানার মধ্যে, 

    ছুতোরেরা তাড়াহুড়ো করছে -- শার্টের হাত গুটিয়ে --

    এবার কাজ আরম্ভ হবে ।

    কাজ শুরু হয়ে গেছে ।

    আর ফাঁকা, শেওলা-ওপচানো পাথুরে জমিতে

    তারা তাদের দামি জিনকাপড় মেলে ধরছে

    যেখানে শহর

    এঁকে দেবে এক ফোঁপরা আকাশ

    ছবি আঁকা নিয়ে সেইসব মনোরম শখের চর্চাকারীদের জন্যে 

    যারা ব্যাবিলনের কোনো রাজার জন্যে পরিশ্রম করছে,

    ভিনাস ! একটু সময়ের জন্য ছেড়ে চলে যাও

    প্রেম-করিয়েদের উজ্বল হৃদয় ।

    হে মেষপালকদের রানি !

    শ্রমিকরা যেখানে জিরোচ্ছে 

    আর দুপুরের সমুদ্রে স্নান করছে

    সেখানে নিয়ে যাও ফলের বিশুদ্ধতম মদ ।

     

    --------------------------

     

    আমার শব্দের অপরসায়নে পুরোনো দিনের কবিতার ক্ষয়ে-যাওয়া ধারণাগুলো গূরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল ।

    আমি প্রাথমিক সন্মোহনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলুম : কারখানা দেখার বদলে আমি সুস্পষ্ট দেখতে পেতুম মসজিদ, দেবদূতদের ড্রামবাদকদল, আকাশের রাজপথে ঘোড়ার গাড়ি, ঝিলের জলের তলায় বৈঠকখানা ; দানবদের,  আর রহস্যগুলো ; এক প্রমোদানুষ্ঠানের নামপত্র আমাকে শ্রদ্ধায় ভীত করেছিল ।

     

    আর তাই আমি শব্দগুলোকে দৃষ্টিপ্রতিভায় বদলে দিয়ে আমার ঐন্দ্রজালিক কুতর্কগুলোকে  ব্যাখ্যা করলুম !

    শেষ পর্যন্ত আমার মগজের বিশৃঙ্খলাকে আমি পবিত্র বলে মনে করতে লাগলুম । গা এলিয়ে শুয়ে থাকতুম, জ্বরে গিলে খেয়ে ফেলছে শরীর : আমি জানোয়ারদের শান্তিময়তাকে হিংসে করতে লাগলুম -- গুটিপোকা, যারা দ্বিতীয় শৈশবের পাপহীনতাকে সুস্পষ্ট করে তোলে , গন্ধমুষিক, অক্ষতযোনি মেয়েদের  তন্দ্রাভাব !

     

    আমার মন বিষিয়ে উঠলো । আমি জগতসংসারকে গাথাসঙ্গীতের মতন কবিতায় বিদায় জানালুম :

     

    সবচেয়ে উঁচু মিনার থেকে গাওয়া একটি গান

    তাকে আসতে দাও, তাকে আসতে দাও,

    যে ঋতুকে আমরা ভালোবাসতে পারি

    আমি বহুকাল অপেক্ষা করেছি     

    যা আমি ভুলে যেতে পারি ;

    আর স্বর্গে রেখে দিতে পারি

    আমার ভয় ও পশ্চাত্তাপ ।

    এক অসুস্হ তৃষ্ণা

    আমার শিরাগুলোকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তোলে ।

    তাকে আসতে দাও, তাকে আসতে দাও,   

    যে ঋতুকে আমরা ভালোবাসতে পারি

    তাই সবুজ মাঠ,

    অনেক ছড়িয়ে পড়েছে, ফুলে ছেয়ে গেছে,

    সুগন্ধ আর বুনোঝোপে

    আর নোংরা পোকাদের

    নিষ্ঠুর আওয়াজে ।

    তাকে আসতে দাও, তাকে আসতে দাও,

    যে ঋতুকে আমরা ভালোবাসতে পারি  

     

    আমি মরুভূমিকে ভালোবাসতুম, পোড়া ফলবাগানকে, ক্লান্ত পুরোনো দোকান, গরম পানীয়। আমি নিজেকে দুর্গন্ধ গলির ভেতর দিয়ে টেনে নিয়ে গেলুম, আর দুই চোখ বন্ধ করে আমি  সূর্যের কাছে, যিনি আগুনের দেবতা,  নিজেকে উৎসর্গ করলুম ।

     

    “সেনাধিপতি,  যদি তোমার বিদ্ধস্ত পাটাতনের ওপরে একটা কামানও টিকে থাকে, আমাদের ওপরে শুকনো মাটি দিয়ে গড়া গোলা চালাও । দামি দোকানগুলোর আয়নাগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দাও ! এবং বৈঠকঘরগুলো ! শহরের মুখে তারই ধ্বংসধুলো ঢুকিয়ে দাও । মরচে পড়ে যেতে দাও ছাদের সিংহমুখো নালিগোলোয় । পদ্মরাগমণির আগুনগুঁড়ো দিয়ে বন্ধ করে দাও মহিলাদের গোঁসাঘরগুলো….”

     

    ওহ ! গ্রামের সরাইখানার পেচ্ছাপঘরের ছোট্ট মাছিটা, পচা আগাছার প্রেমে মশগুল, আলোর একটা রশ্মিতে ঝিমিয়ে পড়ে !     

     

    ক্ষুধা

     

    আমি আমার হাড়ের ভেতরে কেবল খুঁজে পাই   

    পৃথিবীর মাটি আর পাথর খাবার স্বাদ ।

    যখন আমি খাই, আমি বাতাস খেয়ে টিকে থাকি,

    নুড়ি আর কয়লা আর আকরিক লোহা ।

    পরিবর্তে, আমার ক্ষুধা । ক্ষুধা, খাওয়াও

    খেতভরা ভূষি ।

    যতো পারো যোগাড় করো সেই উজ্বল

    বিষের আগাছা ।

    একজন ভিখারির হাত দিয়ে ভাঙা পাথর খাও,

    পুরোনো গির্জার দেয়ালের পাথর ;

    নুড়িশিলা, বানভাসির শিশুরা,

    কাদায় পড়ে থাকা রুটি ।

     

    ----------------------------------

     

    ঝোপের পেছনে ডেকে উঠবে এক নেকড়ে

    মোরগের মাংসখাবার উৎসবে

    ঝলমলে পালকগুলো ছিঁড়ে :

    ওরই মতন, আমি নিজেকে গিলে ফেলি ।

    জড়ো করার জন্যে অপেক্ষা করে

    ফল আর ঘাস তাদের সময় কাটায় ;

    বেড়ায় যে মাকড়সা জাল বোনে

    শুধু ফুল খায় ।

    আমাকে ঘুমোতে দাও ! আমাকে সেদ্ধ হতে দাও

    সলোমনের পূজাবেদির ওপরে ;

    আমাকে শুষে নিতে দাও ছাতাপড়া মাটি,

    আর বয়ে যেতে দাও কেন্দ্রনে ।

     

    সব শেষে, হে যৌক্তিকতা, হে মহানন্দ, আমি আকাশ থেকে তার নীল সরিয়ে ফেলেছি যা আসলে অন্ধকার, আর আলোর প্রকৃতির সোনালি স্ফূলিঙ্গে বসবাস করেছি । আমার আনন্দের আতিশয্যে, আমি আমার মুখকে যতোটা পারি মজাদার আর আদিম করে তুলতে চেয়েছি:

     

    ওটা খুঁজে পাওয়া গেছে ।

    কী ? -- অনন্তকাল ।

    ঘুরন্ত আলোয়

    সমুদ্রের সূর্যে ।

    হে আমার চিরকালীন আত্মা,

    আকাঙ্খা আঁকড়ে ধরে থাকো

    রাত হওয়া সত্ত্বেও

    এবং আগুনের দিন ।

    তোমাকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে

    মানবের কঠোর সংগ্রাম থেকে

    আর জগতসংসারের সকলরব প্রশংসা থেকে

    তোমাকে উড়ে যেতে হবে যতোটা তুমি পারো….

    --চিরকালের আশা নেই

    নেই উথ্থানের অবকাশ ।

    বিজ্ঞান আর ধৈর্য,

    যাতনা অবশ্যম্ভাবী ।

    তোমার অন্তরের আগুন, 

    মোলায়েম রেশম-অঙ্গার,

    আমাদের সমস্ত কর্তব্য

    কিন্তু কেউই তা মনে রাখে না ।

    তা খুঁজে পাওয়া গেছে ।

    কী ? অনন্তকাল ।

    ঘুরন্ত আলোয়

    সমুদ্রের সূর্যে ।

     

    -------------------

     

    আমি হয়ে উঠলুম নীতিকাহিনির অপেরা : আমি দেখলুম জগতসংসারে সকলেই আনন্দে দণ্ডপ্রাপ্ত। কর্মশক্তি প্রয়োগই জীবন নয় : তা কেবল ক্ষমতাকে বরবাদ করার একটা উপায়, স্নায়ুকে ধ্বংস করার  নিমিত্তমাত্র । নৈতিকতা হলো মস্তিষ্কে ভরা জল।

     

    আমার মনে হয়েছে যে প্রত্যেকেরই আরও বেশ কয়েকটা জীবন থাকা উচিত ছিল। ওই লোকটা জানে না ও কি করছে : ও একজন দেবদূত । ওই পরিবারটা কুকুর-বাচ্চাদের গাদাঘর । কয়েকজনের ক্ষেত্রে, আমি অনেকসময়ে তাদের কোনো এক অপরজীবন থেকে চেঁচিয়ে কথা বলেছি। -- ওই সূত্রেই আমি একটা শুয়োরকে পছন্দ করেছিলুম ।

     

    উন্মাদনার একটিও মেধাবী যুক্তিতর্ক নয়, -- যে উন্মাদনাকে তালাচাবি দিয়ে আটক করা হয়, -- আমি কি ভুলে গেছি : আমি আবার তার কোটর দিয়ে যেতে পারি, পুরো প্রণালীটা আমার হৃদয়ে খোদাই করা আছে ।

    তা আমার স্বাস্হ্যে প্রভাব ফেলেছিল । সামনেই যেন সন্ত্রাস । আমি বারবার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তুম, যা এক লপ্তে অনেকদিন স্হায়ী হতো, আর যখন আমি জেগে উঠতুম, আমার দুঃখি স্বপ্নগুলো বজায় থাকতো । মারাত্মক ফসল তোলার জন্যে আমি ছিলুম তৈরি, আর আমার দুর্বলতা আমাকে জগতসংসারের বিপজ্জনক রাস্তার কিনার পর্যন্ত নিয়ে যেতো, সিমেরিয়ার সমুদ্রতীর পর্যন্ত, ঘুর্নিঝড় আর অন্ধকারের স্বর্গে ।

     

    আমাকে ভ্রমণ করতে হতো, যাতে মগজে জড়ো হওয়া জাদুগুলো উবে যেতে পারে । সমুদ্রের ওপরে, যা আমি এমন ভালোবাসতুম যে তা যেন আমার অশুদ্ধতা ধুয়ে দেবে, আমি দেখলুম দয়াময় ক্রুশকাঠ ওপরে উঠে এলো । আমি ছিলুম রামধনু দ্বারা শাপিত । প্রকাশসৌষ্ঠব ছিল আমার শাস্তি, আমার কুরে-খাওয়া মনস্তাপ, আমার কীট : তারপর আমার জীবন শক্তিমত্তা এবং সৌন্দর্যের তুলনায় অনেকটাই বড়ো হয়ে উঠবে । 

     

    আনন্দধারা ! তার মারাত্মক মিষ্টতার হুল আমাকে কাকডাকা ভোরে জাগিয়ে তুলবে, --রাত বারোটায়, যিশুর পুনরুথ্থানের মুহূর্তে, -- বিষণ্ণতম শহরে :

     

    হে ঋতুসকল, হে পল্লীদুর্গেরা !

    কোথায় আছে সেই নিখুঁত আত্মা ?

    আমি শিখলুম ইন্দ্রজাল

    আনন্দধারা, আমাদের সবাইকে সন্মোহিত করে।

    আনন্দধারা তোমাকে, জীবনের জয়গান করো

    যখনই ফরাসিদেশের কাক ডেকে উঠবে ।

    এখন সমস্ত আকাঙ্খা বিদায় নিয়েছে :

    আমার জীবনকে তা নিজের করে নিয়েছে ।

    সেই সন্মোহন প্রভাবিত করেছে আমার হৃদয় ও আত্মা

    আর প্রতিটি যোগ্যতাবিচারকে লণ্ডভণ্ড করেছে ।

    হে ঋতুসকল, হে পল্লীদুর্গেরা !

    আর, ওহ ! যেদিন তা মিলিয়ে যাবে

    সেইদিনই হবে আমার মৃত্যুর দিন ।

    হে ঋতুসকল, হে পল্লীদুর্গেরা !

     

    ----------------------

     

    তা সবই শেষ হয়ে গেছে । আজকে, আমি জানি সৌন্দর্যকে কেমন করে উদযাপন করতে হয় ।

     

    সেই অসাধ্যসাধন

     

    আহ ! বালক হিসাবে আমার জীবন, প্রতিটি আবহাওয়ায় খোলা রাস্তার মতন ; আমি ছিলুম অস্বাভাবিকভাবে মিতাচারী, সবচেয়ে ভালো ভিখারির চেয়েও উদাসীন, কোনো দেশ না থাকার চেতনায় গর্বিত, বন্ধুহীন, তা যে কি বোকামি ছিল । -- আর আমি এখন তা উপলব্ধি করছি!

     

    -- বুড়ো লোকগুলো যারা আদর করার সুযোগ ছাড়ে না তাদের অবিশ্বাস করার ব্যাপারে আমি সঠিক ছিলুম, আমাদের নারীদের স্বাস্হের গায়ে আর নির্মলতায় পরগাছা, যখন কিনা আজকে নারীরা আমাদের থেকে আলাদা এক জাতি ।

     

    যা কিছু আমি অবিশ্বাস করতুম সে ব্যাপারে আমি সঠিক ছিলুম : কেননা আমি পালিয়ে যাচ্ছি!

     

    আমি পালিয়ে যাচ্ছি !

     

    বলছি বিশদে ।

     

    এমনকি কালকেও, আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছি : “ঈশ্বর ! এখানে এই তলানিতে আমাদের মতন প্রচুর অভিশপ্ত রয়েছে ! তাদের সারিতে আমি ইতিমধ্যে যথেষ্ট দুর্দশায় ভুগেছি ! আমি ওদের সবাইকে চিনি । আমরা পরস্পরকে চিনতে পারি ; আমরা পরস্পরকে বিরক্ত করি । আমাদের কেউই পরার্থবাদীতার কথা শোনেনি । তবুও, আমরা মার্জিত ; জগতসংসারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বেশ নিয়মানুগ ।” তা কি অপ্রত্যাশিত ? এই জগতসংসার ! ব্যবসাদারের দল, আর মূর্খেরা ! -- এখানে থাকায় কোনো অসন্মান নেই । -- কিন্তু নির্বাচিত লোকজন, তারা আমাদের কীভাবে আপ্যায়ন করবে ? কেননা তেমন লোকজনও তো আছে, খুশমেজাজ লোকজন, নকলভাবে নির্বাচিত, কেননা তাদের সান্নিধ্যে যাবার জন্যে আমাদের সাহসী ও বিনয়ী হতে হবে। ওরাই প্রকৃত নির্বাচিত ।  মোটেই কপটাচারী সন্ত নয়, ওরা !

     

    যেহেতু দুই পয়সা দামের যুক্তিপূর্ণতা ফিরে পেয়েছি -- কেমন তাড়াতাড়ি তা চলে যায়! -- আমি দেখতে পাই যে আমার ঝঞ্ঝাটের উৎস হলো আগেই টের না পাওয়া যে এটা পাশ্চাত্য জগৎ । এগুলো পাশ্চাত্য জলাভূমি ! এমন নয় যে আলো ফিকে হয়ে গেছে, আঙ্গিক ক্ষয়াটে, কিংবা অগ্রগমন বিপথে চালিত...। ঠিক আছে ! প্রাচ্যের পতনের পর থেকে  আমার মনের মধ্যে যে রদবদল ঘটেছে আমার মন এখন নিশ্চিতভাবে সেই সব নিষ্ঠুর ঘটনার মোকাবিলা করতে চায়...। আমার মনের সেটাই চাহিদা !

     

    ...আর সেখানেই আমার দুই পয়সা দামের যুক্তিবোধের সমাপ্তি ! নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মন, তা দাবি করছে যে আমি পাশ্চাত্যজগতেই থাকি । যেমনটা আমি চিরকাল চেয়েছি, আমি যদি এটা শেষ করে ফেলতে চাই তাহলে একে চুপ করিয়ে দিতে হবে ।

     

    আমি আগে বলতুম, চুলোয় যাক শহিদদের করতল, শিল্পের যাবতীয় আলোকসঙ্কেত, আবিষ্কারকের গর্ববোধ, লুন্ঠনকারীর উত্তেজনা ; প্রাচ্যদেশে এবং মৌলিক, শাশ্বত জ্ঞানে আমার ফিরে যাবার কথা । কিন্তু এসবই নিঃসন্দেহে কলুষিত আলস্যের স্বপ্ন !

     

    আর তবুও আধুনিক যন্ত্রণাবোধ থেকে পালাবার ইচ্ছে আমার ছিল না । কোরানের মিশ্রিত পাণ্ডিত্য সম্পর্কে আমার গভীর কৌতূহল নেই। -- কিন্তু এই জ্ঞানে কি প্রকৃত পীড়ন নেই যে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রদোষ থেকে, খ্রিস্টধর্ম, মানুষ নিজেকে মূর্খ প্রতিপন্ন করে চলেছে, যা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান তাকে প্রমাণ করতে চাইছে, বারবার প্রমাণ দেখিয়ে গর্বে বুক ফোলাচ্ছে, আর কেবল তা নিয়েই বেঁচে আছে ! এটা একরকমের সূক্ষ্ম, বোকা পীড়ন ; আর এটাই আমার আত্মিক অসংলগ্নতার উৎস । প্রকৃতি হয়তো এই সমস্ত ব্যাপার নিয়ে বিরক্ত ! যিশুর সঙ্গেই জন্মেছিলেন প্রুধোম ।

     

    তা কি এই জন্যে নয় যে আমরা কুহেলিকার চর্চা করি ! জোলো শাকসবজির সঙ্গে জ্বরকে গিলে ফেলি । এবং মাতলামি ! আর তামাক । আর অজ্ঞানতা ! আর অন্ধ ধর্মবিশ্বাস ! -- এই সমস্তকিছুই কি প্রাচ্যের জ্ঞান, আমাদের আসল পিতৃভূমি, তার দর্শন থেকে দূরে নয় ? আধুনিক জগতসংসার নিয়ে কিই বা করার আছে, যদি অমন বিষ আবিষ্কার হয় !

     

    যাজকরা আর ধর্মোপদেশকরা বলবেন : নিশ্চয়ই । কিন্তু তুমি তো আদম আর ইভের নন্দনকাননের প্রসঙ্গ তুলছো । প্রাচ্য জাতিদের অতীত ইতিহাসে তোমার জন্য কিচ্ছু নেই...। সে কথা সত্যি । আমি নন্দনকাননের কথাই বলতে চাইছি ! প্রাচীন জাতিদের বিশুদ্ধতা কেমন করেই বা আমার স্বপ্নকে প্রভাবিত করবে ?

     

    দার্শনিকরা বলবেন : জগতসংসারের কোনো বয়স নেই । মানবতা স্হান থেকে স্হানান্তরে যায়, ব্যাস । তুমি একজন পাশ্চাত্য মানুষ, কিন্তু তুমি তোমার নিজস্ব প্রাচ্যে বসবাসের জন্য স্বাধীন, যতো পুরোনো তুমি চাও ততোই, -- আর সেখানে তুমি যেমন ইচ্ছে থাকতে চাও । হেরো হয়ে যেও না । দার্শনিকগণ, আপনারা পাশ্চাত্য জগতের পাকাপাকি অংশ !

     

    মন, সাবধান হও । উত্তরণের পেছনে পাগলের মতন ছুটো না । নিজেকে শিক্ষিত করো! --আহ!

     

    বিজ্ঞান আমাদের থেকে কখনও এগিয়ে থাকে না !

     

    --কিন্তু আমি দেখি আমার মন ঘুমিয়ে পড়েছে ।

     

    এই মুহূর্ত থেকে যদি তা পূর্ণসতর্ক থাকে, আমরা দ্রুত সত্যকে পাবো, যা হয়তো এখনই ফোঁপাতে থাকা দেবদূতদের দিয়ে আমাদের ঘিরে রেখেছে !....-- যদি তা এই মুহূর্ত পর্যন্ত পূর্ণসতর্ক ছিল, তাহলে, অনেককাল আগেই, আমি তা নীচ প্রবৃত্তির কাছে সোপর্দ করতুম না !...--যদি তা চিরটাকাল পূর্ণসতর্ক থাকতো, আমি প্রজ্ঞায় ভাসতুম!...

     

    হে বিশুদ্ধতা ! বিশুদ্ধতা !

     

    এই জাগরণের মুহুর্তে, আমার ঘটে গেল বিশুদ্ধতার দৃষ্টিপ্রতিভা ! মনের মাধ্যমে আমরা ঈশ্বরের কাছে পৌঁছোই !

     

    কী যে এক ঠুঁটো দুর্ভাগ্য !

     

                                                        সৌদামিনী

    ----------------

     

    মানুষের শ্রম ! সেই বিস্ফোরণ আমার অতলকে সময়ে-সময়ে আলোকিত করে।

     

    “জ্ঞান আহরনের পথে : কোনো ব্যাপারই আত্মশ্লাঘা নয়!” চেঁচিয়ে বলে ওঠেন আধুনিক ধর্মপ্রচারকদল, যার অর্থ সব্বাই । আর তবুও বজ্জাত ও অলসদের চাপ গিয়ে পড়ে বাদবাকিদের হৃদয়ের ওপরে….। আহ ! তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি ওইখানে চলুন ; রাতের ওই পারে...ভবিষ্যতের সেই পুরস্কার, সেই শাশ্বত পুরস্কার...আমরা কি তা থেকে নিষ্কৃতি পাবো?

     

    ---এর থেকে বেশি আমি কিই বা করতে পারি ? শ্রমের কথা জানি ; এবং বিজ্ঞান বড়োই মন্হর।  প্রার্থনা দ্রুতগামী আর আলোকমালার গর্জন...আমি তা ভালো করে জানি। ব্যাপারটা খুবই সহজ, আর আবহাওয়া বেশ তপ্ত ; আমাকে ছাড়াই তোমাদের চলে যাবে । আমার রয়েছে কর্তব্য ; একে একপাশে সরিয়ে রাখতে, আমি গর্ববোধ করবো. যেমন অন্যেরা করেছে ।

     

    আমার জীবন নিঃশেষিত  । ঠিকই, চলো ভান করা যাক, আমরা কোনো কাজই করবো না ! ওহ ! দুঃখদায়ক ! আর আমরা বেঁচে থাকবো, আর নিজেদের মনোরঞ্জন করবো, দানবিক প্রেম আর খেয়ালি জগতের স্বপ্ন দেখবো, পৃথিবীর আদল-আদরা নিয়ে অভিযোগ আর ঝগড়া করবো, দড়াবাজিকর, ভিখারি, শিল্পী, ডাকাত, -- যাজক ! আমার হাসপাতালের বিছানায়, ধুপকাঠির সুগন্ধ তীব্রভাবে আমার কাছে ফিরে এলো ; পবিত্র সৌরভের অভিভাবক, আত্মস্বীকৃতিকারী, শহিদ...।

     

    শৈশবের মলিন শিক্ষা সেখানে আমি চিনতে পারি । তারপর কী !...কুড়ি বছর বয়সে পৌঁছোও: আমি কুড়িবছর পালন করবো, অন্য সকলে যদি তা করে...।

     

    না ! না ! এখন আমি মৃত্যুর বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াচ্ছি ! আমার গর্ববোধের তুলনায় শ্রমকে মামুলি মনে হয় : জগতসংসারের কাছে আমাকে ফাঁসিয়ে দেয়াটা আমার শাস্তির পক্ষে যৎসামান্য হবে। শেষ মুহূর্তে আমি আক্রমণ করব, একবার ডানদিকে, আরেকবার বাঁদিকে....।

     

    ---ওহ ! -- বেচারা প্রিয় আত্মা, তাহলে অমরত্ব হয়তো হাতছাড়া হবে না !

     

                                            

     সকাল

     

    আমার কি একসময় তেমন যৌবন ছিল না যা মনোরম, বীরোচিত, কিংবদন্তিপ্রতিম, যা সোনার কাগজে লিখে ফেলা যায় ? -- আমি ছিলুম খুবই ভাগ্যবান ! কোন সে অপরাধ, কোন ভুলের কারণে আমার ওপর বর্তেছে বর্তমান দুর্বলতা ? তোমরা যারা মনে করো যে জানোয়াররাও দুঃখে ফোঁপায়,  অসুস্হরা বিষাদগ্রস্ত হয়,  মৃতেরা খারাপ স্বপ্ন দ্যাখে, এবার আমার পতনের সঙ্গে আমার ঘুমের সম্পর্ক খোঁজো ।  যে ভিখারিটা পাখির মতন এবং প্রভুর বন্দনাগান গায়, আমি নিজেকে তার চেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি না । কীভাবে কথা কইতে হয় তা আমি আর জানি না !

     

    অথচ তবু, আজকে, আমার মনে হয় এই নরকের হিসাব আমি শেষ করে ফেলেছি । আর তা নরকই ছিল : সেই পুরোনোটা, যার সিংহদরোজা খুলে দিয়েছিল মানবপুত্র ।

     

    সেই একই মরুভূমি থেকে, সেই একই আকাশপানে, আমার ক্লান্ত চোখ রূপালি নক্ষত্রের দিকে সবসময় চেয়ে থাকে, সব সময়ের জন্যে ; কিন্তু সেই তিন জ্ঞানী মানুষ একেবারও নিজেদের জায়গা থেকে নড়াচড়া করেন না, জীবনের মহারাজারা, হৃদয়, আত্মা, মন । আমরা যখন যাবো, পাহাড়ের ওপর আর সমুদ্রের তীরে, নতুন শ্রমের, নতুন জ্ঞানের জন্মের গুণগান করার জন্যে, অত্যাচারী এবং দানবরা  পালাবে , কুসংস্কারের সমাপ্তি ঘটবে, -- আমরাই হবো প্রথম ভক্ত ! -- পৃথিবীর মাটিতে খ্রিস্টের জন্মোৎসব !

     

    স্বর্গসমূহের গান, রাষ্ট্রদের অগ্রগমন ! আমরা কেনা-গোলাম , জীবনকে অভিশাপ দেয়া আমাদের উচিত নয় !

     

     

    বিদায়

     

    হেমন্ত এসে গেছে ! -- আমরা যদি দৈব উজ্বলতা অনুসন্ধানের জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাহলে চিরকালীন সূর্যের জন্যে কেনই বা দুঃখপ্রকাশ করা , -- ঋতুবদলের সঙ্গে যাদের মৃত্যু হয় তাদের থেকে বহু দূরে ।

     

    হেমন্ত । আমাদের নৌকা, ঝুলন্ত কুয়াশা থেকে উঠে এসেছে, বাঁক নেয় দারিদ্রের বন্দরের দিকে, দানবিক শহর, তার আকাশ আগুন আর কাদায় নোংরা । আহ ! সেইসব কটুগন্ধ কাঁথা, বৃষ্টিতে ভেজা রুটি, মাতলামি, আর হাজার প্রেম যা আমাকে ক্রুশকাঠে বিঁধেছে !  লক্ষকোটি মৃত আত্মা আর দেহের পিশাচিনী রানির  দিন কি কখনও ফুরোবে না, আর কবেই বা তাদের  সবায়ের বিচার হবে ! আমি নিজেকে আবার দেখতে পাই, নোংরায় আর রোগে আমার গায়ের চামড়া ক্ষয়ে গিয়েছে, মাথার চুলে আর বগলে পোকারা কিলবিল করছে, আর তাদের চেয়েও বড়ো-বড়ো পোকা চরে বেড়াচ্ছে আমার হৃদয়ে, আয়ূহীন, হৃদয়হীন, অচেনা আকারে ছেয়ে ফেলেছে...। আমি সেখানে অনায়াসে মরে যেতে পারতুম...। কি ভয়ানক স্মৃতি ! দারিদ্র্যকে আমি খুবই ঘেন্না করি।

     

    আর শীতকালকে আমি ভীষণ ভয় পাই কেননা তা বড়োই আরামদায়ক !

     

    ---অনেকসময়ে আমি আকাশে দেখতে পাই বালিছড়ানো সীমাহীন তীর শাদা উদ্দীপনাময় রাষ্ট্রে ছেয়ে গেছে । একটা সোনালি জাহাজ, আমার ওপরদিকে, সকালের হাওয়ায় নানা রঙের নিশান ওড়াচ্ছে । প্রতিটি ভোজনোৎসব, প্রতিটি বিজয়, প্রতিটি দৃশ্যকাব্যের আমি ছিলুম স্রষ্টা । নতুন ফুল, নতুন গাছপালা, নতুন মাংস, নতুন ভাষা আবিষ্কারের চেষ্টা করেছিলুম আমি । আমি ভেবেছিলুম আমি অর্জন করেছি অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা । 

     

    হাঃ ! আমাকে আমার কল্পনা আর আমার স্মৃতিকে গোর দিতে হবে ! শিল্পী আর গল্পকার হিসাবে জমকালো কর্মজীবনের কেমনতর সমাপ্তি!

     

    আমি !  নিজেকে ম্যাজিশিয়ান, দেবদূত, নৈতিকতার বাঁধন থেকে মুক্ত বলে মনে করেছিলুম ।

     

    আমাকে ফেরত পাঠানো হয়েছে যাতে চাষের জমির প্রতি কৃতজ্ঞতা শোধ করতে পারি, বাহুতে মুড়ে নিতে পারি গ্রন্হিল বাস্তবতা ! একজন চাষি !

     

    আমি কি প্রতারিত ? পরার্থবাদিতা কি হয়ে উঠবে মৃত্যুর বোন, আমার জন্যে ?

     

    ঠিক আছে, মিথ্যা আশ্রয় করে বেঁচে থাকার জন্য আমি  ক্ষমা চেয়ে নেবো। আর তাইই শেষ ।

     

    কিন্তু বন্ধুত্বের একটাও হাত নেই ! আর কোথায়ই বা আমি সাহায্য খুঁজবো ?

     

    ¯¯¯¯¯¯¯¯

    সত্যি, নতুন যুগ রূঢ় ছাড়া আর কিছুই নয় ।

     

    কেননা আমি বলতে পারি যে আমি একটা বিজয় পেয়েছি ; দাঁতের ওপর দাঁত চেপে, নরকের আগুনের ফোঁসফোঁসানি, দুর্গন্ধিত দীর্ঘশ্বাস ফুরিয়ে এসেছে । আমার রাক্ষুসে স্মৃতি মিলিয়ে যাচ্ছে।

    বিদায় নিচ্ছে আমার শেষ আকাঙ্খাগুলো, -- ভিখারিদের, ডাকাতদের, মৃত্যুর বন্ধুদের, যে জগত পাশ দিয়ে চলে গেছে, তার সম্পর্কে ঈর্ষা । --- অভিশপ্ত আত্মারা, যদি আমি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে পারতুম !

     

    চরম আধুনিক হওয়া দরকার ।

     

    ধন্যবাদোৎসবের স্তবগানকে গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন নেই : একবার যে ধাপে পা রেখেছো তা ধরে রাখো । এক দুঃসহ রাত ! আমার মুখের ওপরে শুকনো রক্তের ধোঁয়া, আর আমার পেছনদিকে ওই ছোট্ট বীভৎস গাছ ছাড়া আর কিছু নেই !...মানুষের সংগ্রামের মতনই আত্মার জন্য সংগ্রামও পাশবিক ; কিন্তু বিচারের আনন্দদর্শন কেবল ঈশ্বরের একার । 

     

    তবু এটাই রাত্রিকালের জাগ্রদবস্হা । চলো আমরা নতুন শক্তিক্ষমতাকে, আর প্রকৃত প্রেমপরায়ণতাকে মেনে নিই । এবং সকালে, দীপ্তমান ধৈর্যকে বর্ম করে, আমরা মহিমান্বয়ের শহরগুলোয় প্রবেশ করবো ।

     

    আমি কেন বন্ধুত্বের হাতের কথা বলেছিলুম ! আমার সবচেয়ে বড়ো সুবিধা হলো যে মিথ্যায় ভরা পুরোনো ভালোবাসা আমি হেসে উড়িয়ে দিতে পারি, আর অমন প্রতারণাভরা যুগলকে কলঙ্কে দেগে দিতে পারি, -- সেখানে আমি নারীদের নরকের অভিজ্ঞতাও পেয়েছি ; -- আর এবার আমি একই দেহ ও একই আত্মায় সত্যকে ধারণ করতে সক্ষম হবো ।

     

    [ রচনাকাল : এপ্রিল-আগস্ট, ১৮৭৩ ]

    [ অনুবাদ : ২০১৯ ]

     

     

               

                   

  • জাঁ আর্তুর র‌্যাঁবো : ইল্যুমিনেশন্স | 120.60.8.227 | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৩৩732393
  • জঁ আর্তুর র‌্যাঁবো : ইল্যুমিনেশানস

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    বানভাসির পর

    ইল্যুমিনেশান ১

    বানভাসির ধারনা শেষ হবার পরই, একটা খোরগোশ গোরুর গোয়ালে আর দুলতেথাকা ফুলগাছের কাছে থমকে দাঁড়িয়ে, মাকড়সার জালের ভেতর দিয়ে রামধনুকে প্রার্থনা শোনালো।

    ওহ ! যে দামি পাথরগুলো লুকিয়ে রেখেছিল, -- ফুলগুলো নিজেদের চারিধারে তাকিয়ে দেখছিল। নোংরা রাজপথে দোকান বসেছিল, তারা নৌকোগুলোকে টেনে নিয়ে গেল পরতে-পরতে ফুলে ওঠা সমুদ্রের ঢেউয়ে ঠিক যেমন পুরোনো ছবিগুলোতে দেখা যায় ।

    যে নীলদাড়ি লোকটা নিজের বউগুলোকে একের পর এক মেরে ফেলতো, তার বাড়িতে রক্ত বইতে লাগল --- সারকাসের কসাইখানায়  ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞা শাদা করে তুলছিল জানালাগুলোকে। রক্ত আর দুধ বইছিল ।

    ভোঁদোড়েরা গড়েছিল । শুঁড়িখানায় কফির পেয়ালায় উঠছিল ধোঁয়া ।

    চারাগাছের বিশাল কাচঘরে জলফোঁটা ঝরছিল তখনও, সুন্দর ছবিগুলোর দিকে চেয়েছিল শোকাতুর শিশুরা ।

    দরোজার পাল্লার আওয়াজ, আর, গ্রামের সবুজে, এক খোকা দুই হাত নাড়ালো, বেগবান ঝর্ণার তলায়, সব জায়গাকার ঘণ্টাঘরের হাওয়ামোরগ আর আবহাওয়া নির্দেশকগুলো তা টের পাচ্ছিল।

    ম্যাডাম অমুক আল্পস পাহাড়ে একটা পিয়ানো বসালেন । গির্জার একশো হাজার বেদির ওপরে উদযাপন করা হচ্ছিল খ্রিস্টের নৈশভোজনোৎসব-পর্ব আর প্রথম ধর্মসংস্কার ।

    চলে গেল মরুযাত্রীদল । আর বরফ ও মেরুরাত্রির বিশৃঙ্খলায় তৈরি করা হলো  দীপ্তিশীল হোটেল। 

    তারপর থেকে, সুগন্ধগুল্মের মরুভূমিতে শেয়ালের ডাক শুনতে পেল চাঁদ -- আর ফলবাগানে কাঠের জুতো পরে চারণকবিতাদের অসন্তুষ্ট বিড়বিড়ানি । তারপর, থইথই বেগনি জঙ্গলে, বনানীর উপদেবী আমাকে বললো যে এটা বসন্তঋতু ।

    ঝিলপুকুর, ফুলে ওঠো : ফেনায়িত হও, সাঁকোর ওপর আর গাছের তলা দিয়ে গড়িয়ে চলে যাও: -- কালো ঝালর আর অবয়ব -- বজ্র ও বিদ্যুৎ উঠে দাঁড়াও আর ঝাঁপাও : -- জল এবং দুঃখ ওঠো আর আরেকবার বানভাসিকে তুলে আনো ।

    জল নেমে গিয়েছিল বলে -- ওহ, দামি পাথরগুলো নিজেরা চাপা পড়ে গিয়েছিল আর ফুটে ওঠা ফুলের দল ! -- তা বড়োই ক্লান্তিকর ! আর সেই ডাকিনী রানি, যিনি পৃথিবীর মাটি দিয়ে তৈরি পাত্রে আগুন জ্বালান, কখনও বলবেন না তিনি যা জানেন, আর আমরা কোন ব্যাপারে অবিদিত। 

     

    শৈশব

    ইল্যুমিনেশান ২

    পূর্বপুরুষহীন কিংবা দরবারহীন প্রতিমা, কালোচোখ আর হলুদ-চুল, কিংবদন্তির চেয়েও সম্ভ্রান্ত, মেক্সিকোর কিংবা ফ্লানডার্সের : তার দেশ দুর্বিনীত সোনালি আর সবুজ, ঢেউয়ের নামে আঁকা সমুদ্রতীরকে পাক দেয়, জলপোতহীন, যাদের নাম ভয়ানকভাবে গ্রিক, স্লাভ, কেল্টভাষী।

    জঙ্গলের শেষে -- স্বপ্নেদেখা রুনুঝুনু ফুল : ফুটে ওঠে, ছড়িয়ে পড়ে -- কমলারঙা ঠোঁটের মেয়েটি, পশুচারণভূমি থেকে ছলকানো বানভাসির পরিষ্কার জলে হাঁটুমুড়ে, নগ্নতা ছায়ায় ঢাকা, তির্যক রামধনুর পোশাক পরানো ; ফুলের দল এবং সমুদ্র । 

    সমুদ্রের ধারে ছাদের ওপরে যে নারীরা পায়চারি করেন : অনেকে খুকি আর বিশালদেহ, তামাটে শ্যাওলায় অসাধারণ কৃষ্ণাঙ্গী, তরুবীথিকার উর্বর মাটিতে সাজানো মণিরত্ন এবং ছোটোখাটো গলাতুষার বাগান -- তরুণী মায়েরা আর বড়োদিদিরা যাদের মুখময় তীর্থযাত্রার প্রলেপ, প্রজাপীড়ক সাজপোশাকে নবাবজাদীরা, রাজকন্যারা, ছোটোছোটো বিদেশী মেয়েরা আর সুশীল অসুখী জনসাধারণ ।

    বড়োই একঘে্য়ে, ‘প্রিয়তম শরীর’ এবং ‘মহার্ঘ হৃদয়’ !

    এ তো সে, গোলাপঝাড়ের পেছনে, মৃত খুকিটা । -- কম বয়সী মা, মারা গেছে, সিঁড়ি দিয়ে নামে। -- খুড়তুতো ভাইয়ের গাড়ি বালির ওপরে খোনাস্বর আওয়াজ তোলে । -- ছোট্ট ভাই ( সে ভারতবর্ষে থাকে ! ) সেখানে, সূর্যাস্তের সামনে, কারনেশান ফুলের বাগানে দাঁড়িয়ে । দেয়ালের ফুলে ছেয়ে থাকা বাঁধের ওপরে বুড়োদের সোজা করে কবর দেয়া হয়েছে ।

    সেনাপতির বাড়ির চারিপাশ ঘিরে আছে সোনালি পাতার ঝাড় । ওরা সবাই দক্ষিণে । -- তুমি লালরঙা পথ ধরে ফাঁকা সরাইখানায় পৌঁছে যাও । জমিদারের গ্রামের বাড়ি বিক্রি হবে : খড়খড়িগুলো ঢিলেঢালা । -- পাদরিসাহেব চাবি নিয়ে গির্জায় চলে গিয়ে থাকবেন । -- পার্কের কাছাকাছি পাহারাদারদের কুটিরগুলো ভাড়া দেয়া হয়নি । বেড়াগুলো এতো উঁচু যে তুমি গাছের মাথার ঘষটানি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না ।

    চারণভূমিগুলো  উঠে গেছে মুরগিবর্জিত গ্রামগুলোর দিকে, কামারের নেহাইও নেই । জলকপাট ওপরে তোলা । হে বনজঙ্গলের ক্রুশকাঠ আর হাওয়াকল, দ্বীপপূঞ্জ আর ধোঁয়া-চিমনির সারি ।

    ম্যাজিক ফুলেদের গূঞ্জন । ঢালু জায়গা ওকে কোল দিয়েছিল । চারিদিকে ঘুরছিল রূপকথার বাহারঅলা প্রাণী । শাশ্বত উষ্ণ চোখের জলে তৈরি মেঘেরা জড়ো হচ্ছিল ফাঁকা সমুদ্রের ওপরে।

    বনের ভেতরে একটা পাখি রয়েছে, তার গান তোমাকে থামিয়ে দেয় আর  আরক্তিম করে তোলে।

    একটা দেয়ালঘড়ি রয়েছে যা কখনও বাজে না ।

    একটা গর্তে রয়েছে শাদা প্রাণীর বাসা ।

    একটা গির্জা রয়েছে যা নামছে, আর একটা ঝিল যা ওপরে উঠছে ।

    বেড়ার ঝাড়ের আড়ালে রাখা রয়েছে রাঙা ফিতেয় সাজানো ছোট্ট ঘোড়ারগাড়ি, কিংবা গলি ধরে দৌড়োচ্ছে, 

    বনের আড়াল থেকে রাস্তায় দেখা যাচ্ছে পোশাকপরা ছোটো অভিনেতাদের দল । 

    শেষ পর্যন্ত, কেউ তো রয়েছে, যখন তুমি ক্ষুধার্ত আর তৃষ্ণার্ত, যে তোমাকে তাড়িয়ে দিলো।

    ছাদের ওপরে প্রার্থনারত আমিই সেই সন্ত --- যখন শান্তিময় জানোয়ারেরা প্যালেসটাইনের সমুদ্র পর্যন্ত চরে ঘাস খেতে গেছে ।

    অন্ধকার আরামকেদারায় আমিই সেই পণ্ডিত । গ্রন্হাগারের জানালায় গাছের ডালপালা আর বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়ছে ।

    বেঁটে গাছের বনের ভেতর দিয়ে যে পথ দেখা যাচ্ছে, আমিই তার পর্যটক : আমার পদধ্বনিকে নিঃশব্দ করে দিচ্ছে খোলা জলকপাটের গর্জন । আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখতে থাকি সূর্যাস্তের দুঃখি সোনালি প্রক্ষালন ।

    আমি হয়তো সেই বালক যে সমুদ্রে ভেসে-যাওয়া জেটির ওপরে রয়ে গেছে, চাষিবাড়ির ছোটো ছেলে যে গলি ধরে হেঁটে যাচ্ছে তার চুলের ঝুঁটি আকাশ ছুঁয়েছে ।

    পথগুলো অসমতল । ছোটো ঢিবিগুলো ঝাঁকড়াগাছে ঢাকা । হাওয়া নিশ্চল । পাখিগুলো আর ঝর্ণা আর কতো দূরে ! সামনে সেটাই হয়তো পৃথিবীর শেষপ্রান্ত ।

    মাটির অনেক গভীরে --  রেখায় নকশাকাটা, চুনকামকরা, শেষের দিকের এই স্মৃতিস্তম্ভ  ওরা আমায় ভাড়া দিক ।

    টেবিলে হেলে পড়ি, লন্ঠনের আলো ঝলমল করে তুলেছে যে পত্রিকাগুলো সেইগুলো আমি বোকার মতন দ্বিতীয়বার পড়ি, অথচ বইগুলোতে আর আগ্রহ নেই ।

    মাটির তলায় আমার বাসার ওপরে অনেক দূরে বাড়িঘরের ভিতপোঁতা, কুহেলিকা জড়ো হয়। মাটির রঙ লাল কিংবা কালো । দানবিক শহর, শেষহীন রাত !

    তলায় রয়েছে নর্দমা । পাশটা কেবল কাচের পাত্রের মতন পুরু । হয়তো স্হলবেষ্টিত আশমানি উপসাগর , আগুনের কুয়ো,  উপসাগর । হয়তো এই স্তরে চাঁদ আর ধুমকেতু, সমুদ্র আর কিংবদন্তির সাক্ষাৎ ঘটে ।

    তিক্ত মানসিকতার সময়ে আমি ধাতুর, নীলকান্তমণির গোলকের কল্পনা করি । আমি নৈঃশব্দের প্রভূ । ধনুকের মতন ছাদের কোনায় কেনই বা কাচফোকরের মতন দেখতে জায়গাটার আলো ফিকে হয়ে আসবে ?

     

    গল্প

    ইল্যুমিনেশান ৩

    মামুলি বদান্যতায় নিজেকে একবার দিয়ে ফেলা দক্ষতা সম্পর্কে একজন রাজপুত্র অত্যন্ত কূপিত ছিল । ভবিষ্যতে প্রেমের যে বিস্ময়কর বিপ্লব ঘটবে তা ও দেখতে পাচ্ছিল, আর সন্দেহ করছিল যে ওর স্ত্রীদের রয়েছে বিলাসদ্রব্য আর আকাশের দেয়া সন্তোষ-উৎপাদন বাড়িয়ে তোলার চেয়েও বেশি চাহিদা । ও সত্য ঘটনা জানতে চাইছিল, আকাঙ্খা আর বাসনা চরিতার্থ করার প্রয়োজন জানতে চাইছিল । তা স্বধর্ম থেকে বিপথগমন হোক বা নাহোক ও জানতে চাইছিল। ওর অন্তত ছিল যথেষ্ট জাগতিক ক্ষমতা ।

    প্রতিটি নারী যে ওকে জানতো, খুন হয়ে যেতো গুপ্তঘাতকদের হাতে । সৌন্দর্যের বাগানে কি যে ব্যাপক ধ্বংস ! খাঁড়ার তলায় তারা ওকে আশীর্বাদ করেছিল । ও আর নতুন করে কাউকে চায়নি । --সেই নারীরা আবার দেখা দিলো ।

    যারা ওকে অনুসরণ করেছিল তাদের, শিকারের পর কিংবা মদে মাতাল হয়ে, সবাইকে ও হত্যা করল । -- সবাই ওকে অনুসরণ করা বজায় রাখল ।

    বিরল প্রাণীদের গলা কেটে নিজেকে ও আনন্দ দিতো । প্রাসাদগুলোয় ও আগুন ধরিয়ে দিলো। জনসাধারণের ওপর দিয়ে গিয়ে তাদের কুটিকুটি করে ফেললো । -- জনসাধারণ, সোনালি ছাদ, সুন্দর প্রাণীরা তবু বেঁচে রইলো ।

    কেউ কি ধ্বংসে খুঁজে পায় চরমানন্দ, নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে নিজেকে আবার তরুণ করে তুলতে পারে ? জনসাধারণ টুঁ শব্দও করেনি । কেউ ওর দৃষ্টিভঙ্গীকে সমর্থন করতে এগিয়ে যায়নি। এক সন্ধ্যায় ও গর্বে  ঘোড়ায় বসে তাকে ছোটাচ্ছিল । এক ডাকিনী দেখা দিলো, অনির্বচনীয়া এমনকি লজ্জাময়ী সুন্দরী । রাজপুত্রের মুখ আর ইশারায় দেখা গেল বহুবার জটিল প্রেম করার পুর্বলক্ষণ, বলার অযোগ্য এমনকি অসহিষ্ণু আনন্দ ! রাজপুত্র আর ডাকিনী সম্ভবত অন্তরজগতের ক্ষমতার দ্বারা পরস্পরকে হত্যা করল । কেমন করেই বা তারা পরস্পরকে এইভাবে মরতে সাহায্য করলো?  লোকে যেমন বলে থাকে, ওরা মারা গেছে।

    তবু রাজপুত্র নিজের প্রাসাদে বুড়ো হয়ে মারা গেল । রাজপুত্রই আসলে ডাকিনী ছিল । ডাকিনী ছিল রাজপুত্র ।

    সূক্ষ্ম সঙ্গীত আমাদের চাহিদার তুলনায় কম  ।

     

    প্যারেড

    ইল্যুমিনেশান ৪

    ভাঁড়গুলো বেশ পালোয়ান । অনেকে তোমার শব্দগুলোকে শোষণ করেছে । প্রয়োজনহীন,  তোমার  বিবেক সম্পর্কে ওদের বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষমতা নিয়ে খেলা করার কোনো তাড়াহুড়ো নেই ।

    কতো পাকতাড়ুয়া ওরা ! গ্রীষ্মরাতের মতন চোখদুটো হতবুদ্ধিময়, লাল আর কালো, তিনরঙা, ইস্পাতে সোনালি নক্ষত্র দেগে দেয়া ; আকৃতি বিকলাঙ্গ, সীসায় ভারি, ফ্যাকাশে, আগুনলাগা ; খসখসে গলার তড়িংবিড়িং নাচিয়েরা ! ফিকে হয়ে যাওয়া কারুকাজের নিষ্ঠুর দম্ভচলন ! --কেউ কেউ কমবয়সী--চেরুবিনোকে ওরা কোন দৃষ্টিতে দ্যাখে ? -- বিপজ্জনক সঙ্গতি আর আতঙ্ক-জাগানো কন্ঠস্বরের মালিক ওরা । শহরের রাস্তায় ওদের পাঠিয়ে দেয়া হয় খদ্দের ধরার জন্যে,  বিরক্তিকর অলঙ্কারে সাজিয়ে 

    ওহ পাগলামির ভেংচিকাটা নৃশংস পারিজাত ! তোমার ফকির আর নাটুকে ভাঁড়ামো থেকে দূরে। 

    বিনা প্রস্তুতিতে তৈরি দুঃস্বপ্নে পাওয়া পোশাক পরে ওরা ডাকাতদের উপদেবতাদের  রোমান্টিক, বিয়োগান্তক, আধ্যাত্মিক  ধর্মকাহিনির নাটক করে যে ঘটনাগুলো আদপে কখনও ঘটেনি । চীনা, হটেনটট, ভবঘুরে, মূর্খ, হায়েনা, রক্তখেকো দেবতা, পুরোনো পাগলামি, ভয়ংকর রাক্ষস, জনপ্রিয় গৃহস্হ প্রবণতাকে পাশবিক ভঙ্গী আর আদরের সঙ্গে মিশিয়ে ফ্যালে । ওরা নতুন স্বরলিপি আর মিষ্টি গানের জন্যে অপেক্ষা করছে । ওস্তাদ ভোজবাজিকর, ওরা জনগণকে আর জায়গাকে বদলে ফেলে চৌম্বক মঞ্চপদ্ধতি দেখায় । ফুলে-ওঠা চোখে, রক্ত গান গায়, হাড় পুরু হয়ে ওঠে, চোখের জল আর গালের রুজ গড়িয়ে পড়ে । ওদের গরাদ আর সন্ত্রাস মুহূর্তের জন্যে বা কয়েক মাস বজায় থাকে ।

    এই বর্বর প্যারেডের চাবিকাঠি আছে শুধু আমার হেফাজতে ।

     

    সেকেলে

    ইল্যুমিনেশান ৫

    গ্রিক অধিদেবতা প্যান-এর করুণাময় ছেলে ! ধনুকের মতন তোমার ভ্রুযুগল ফুলের তোড়ায় ঢাকা আর চোখ যেন বৈঁচিফল, মহার্ঘ শ্রবণসঙ্গীত, এগিয়ে চলো । মদের বাদামি  তলানির রঙে রাঙানো ; তোমার গালগুলো ভেতরে ঢোকা । তোমার চোখ-দাঁত ফ্যাকাশে । তোমার বুক এক বাদ্যযন্ত্র, তোমার ফ্যাকাশে হাতে তারগুলো বেজে ওঠে । তোমার পেটের ভেতরে স্পন্দন হয় যেখানে একজোড়া যৌনতা ঘুমোয় । রাতের বেলা, হেঁটে যাও, উরুকে সামান্য তুলে, তারপর অন্য উরু আর ওই বাঁ পা ।

     

    শোভাময় হয়ে ওঠা

    ইল্যুমিনেশান ৬

    তুষারপাতের উল্টোদিকে, এক ঢ্যাঙা সৌন্দর্যের প্রতিমা । এই আদর-পাওয়া দেহকে মৃত্যুর বাঁশি আর ঘিরেফেলা মৃদু সঙ্গীত ফাঁপিয়ে তোলে, এমনভাবে ফুলে ওঠে আর কাঁপে যেন ভুত : অসাধারণ মাংস থেকে  রক্তবর্ণ আর কালো ঘা ফেটে বেরোয় । জীবনের জন্য যুৎসই রঙগুলো গভীর হয়ে ওঠে, নাচতে থাকে আর গড়ে উঠতে-থাকা এই দৃষ্টিপ্রতিভা থেকে নিজেদের আলাদা করে ফ্যালে । কাঁপুনি তোলে আর আর্তনাদ করে যন্ত্রণায় আর এদের মদমত্ত সুগন্ধের প্রভাব ভরে দেয় সেই জাগতিক আর ভাসন্ত সঙ্গীতকে যা জগতসংসার, অনেক পেছনে, আমাদের সৌন্দর্যমাতার দিকে ছুঁড়ে মারে -- সে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, দুই পায়ে উঁচু হয়ে দাঁড়ায় । ওহ, আমাদের হাড়ে পরানো হয়েছে এক নতুন প্রণয়োদ্দীপক দেহ ! ওহ, ফ্যাকাশে মুখশ্রী ; ঘোড়ার চুলে-সাজানো ঢাল, কেলাসিত বাহু ! গাছের জঙ্গল আর ওজনহীন বাতাসের ভেতর দিয়ে আমাকে কামান দাগতে হবে !

     

    জীবনসমূহ

    ইল্যুমিনেশান ৭

    ওহ পবিত্রভূমির বিশাল অ্যাভেনিউগুলো, মন্দিরের চূড়াগুলো ! সেই ব্রাহ্মণের কী হলো যিনি আমাকে প্রবাদগুলো ব্যাখ্যা করেছিলেন ? আমি সেই বুড়িকে এখনও দেখতে পাই, একই সময়ে আর জায়গায় ! নদীদের রূপালি সময় আর আলোকমালা আমার এখনও মনে আছে, কাঁধের ওপরে আমার সঙ্গীর হাত, পরস্পরের আদর মনে আছে যখন আমরা দুজনে মশলার গন্ধেভরা মাঠে দাঁড়িয়েছিলুম । -- আমার চিন্তাকে ঘিরে একদল রক্তবর্ণ পায়রা বকবকম করে । -- এখানে নির্বাসিত, প্রতিটি সাহিত্যের সর্বোৎকৃষ্ট নাটক অভিনয় করার জায়গা আমার ছিল । আমি তোমাকে দেখাতে পারতুম অজানা ঐশ্বর্য । তুমি যে ধনসম্পদ খুঁজে পেয়েছিলে তার ইতিহাসকে আমি চিহ্ণিত করেছি । এবার দেখব কী ঘটতে যাচ্ছে ! বিশৃঙ্খলার মতনই আমার প্রজ্ঞাকে অবজ্ঞা করা হয় । কীই বা আমার শূন্যতা, তোমার জন্যে অপেক্ষমান নিশ্চলতার তুলনায় ?

    আমার পূর্বজদের তুলনায় আমি একজন গুণসম্পন্ন আবিষ্কারক ; এমনকি, সঙ্গীতবিশারদ, যে প্রেমের সূত্রের মতন কিছু খুঁজে পেয়েছে । বর্তমানে, মনোরম আকাশের তলায় বিটকেল এক দেশের ভদ্রমানুষ, নিজের ভিখারিসূলভ শৈশবের স্মৃতির মাধ্যমে আমি বিচলিত হবার প্রয়াস করি, আমার শিক্ষানবীশি আর কাঠের জুতো পায়ে এখানে আসা, আমার তর্কপ্রিয়তা, আমার পাঁচ কি ছয়বারের বৈধব্য, আর আমার কয়েকবারের মহামাতলামি, যখন আমার বিচক্ষণ মগজ আমার বেরাদরদের  হট্টগোলে অংশ নিতে বাধা দিয়েছিল । যেহেতু এই সন্দেহপ্রবণতা আর প্রয়োগ করা যাবে না, আর এমনিতেও আমি তরতাজা উদ্বেগে সমর্পিত -- আমি আশা করছি যে অত্যন্ত বিদ্বিষ্ট উন্মাদ হয়ে উঠবো ।

    বারো বছর বয়সে আমি যে চিলেকোঠায় বন্দী ছিলুম, আমি জগতসংসারের বিষয়ে জানতুম, আমি মানুষের হাস্যকর অবস্হা বর্ণনা করেছিলুম । মাটির তলাকার মদের ভাঁড়ারে আমি ইতিহাস শিখলুম । উত্তরের শহরের কোনো এক রাতের ভোজনোৎসবে আমি পূর্বসূরী মহান তৈলচিত্রকরদের নারীদের অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা পেয়েছিলুম । প্যারিসের এক প্রাচীন গলিতে, আমাকে ধ্রুপদী বিজ্ঞান শেখানো হয়েছিল । প্রাচ্যদেশ দিয়ে ঘেরা এক চমৎকার জায়গায় আমি সম্পূর্ণ করেছিলুম আমার প্রচুর কাজ আর কাটিয়েছিলুম আমার সুবিখ্যাত অবসরযাপনের দিনগুলো । নিজের রক্তকে করে তুলেছিলুম চঞ্চল । আমার কর্তব্য শেষ হয়েছে । সেই বিষয়ে আর ভাববারও দরকার নেই । আমি সত্যিই কবর অতিক্রম করে এসেছি, এবং কর্তব্য-বিষয়ে স্বাধীন ।

     

    প্রস্হান

    ইল্যুমিনেশান ৮

    যথেষ্ট দেখা হলো । সমগ্র আকাশের তলায় দৃষ্টিপ্রতিভার সঙ্গে আকস্মিক সাক্ষাৎ।

    অনেক পাওয়া হলো । শহরগুলোর আওয়াজ, সন্ধ্যাবেলা, এবং আলোয়, আর তা সদাসর্বদা।

    অনেক জানা হলো । জীবনের নির্ণয়গুলো । --হে দৃষ্টিপ্রতিভার ধ্বনিসমূচ্চয় !

    নতুন অনুরাগ এবং ধ্বনি লক্ষ্য করে সেইদিকে প্রস্হান !

     

    রাজকীয়

    ইল্যুমিনেশান ৯

    সুন্দর একটি দিনে, সুশীল মানুষদের মাঝে, চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন একজন মহিমান্বিত পুরুষ ও নারী : ‘বন্ধুগণ, আমি চাই ও রানি হোক !’ ‘আমি রানি হতে চাই !’ মহিলা হাসলেন আর কাঁপতে লাগলেন । পুরুষটি বন্ধুদের জানালেন রহস্যোদ্ঘাটনের কথা, কষ্টের জীবনের কথা । দুজনে পরস্পরের দেহে হেলান দিয়ে মূর্চ্ছা গেলেন ।

    সত্যিই, তারা সারা সকাল রাজা হয়ে কাটালো, বাড়িগুলোয় ঝোলানো হলো গাঢ় লাল ফেস্টুন, আর সারা দুপুরও, তারা হেঁটে চলল পামগাছের বাগানের দিকে ।

     

    যুক্তিযুক্ততার অভিমুখে

    ইল্যুমিনেশান ১০

    ড্রামের ওপরে তোমার একটা আঙুলের টোকায় সব আওয়াজ হারিয়ে যায় আর নতুন করে গড়ে তোলে ঐকতান ।

    তোমার একটা পদক্ষেপ উদ্দীপ্ত করে নতুন মানুষদের আর তাদের সামনে দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

    তোমার মুখ অন্য দিকে তাকায় : নতুন প্রেম ! তোমার মুখ নিজের জায়গায় ফেরে -- নতুন প্রেম!

    ‘আমাদের অদৃষ্ট পালটে দাও, মহামারী শেষ করো’, মহাসময়ের তালে তাল মিলিয়ে এই শিশুরা তোমাকে গেয়ে শোনায় । ‘যেখানেই হোক না কেন, আমাদের বৈভব এবং ইচ্ছা লালিত হোক’, ওরা দয়াভিক্ষা করে ।

    চিরকালীন থেকে তোমার আগমন, তুমি সব জায়গার জন্য প্রস্হান করবে । 

     

    মদোন্মত্ত সকাল

    ইল্যুমিনেশান ১১

    হে আমার শুভ ! হে আমার সুন্দরী ! আমি ভয়ে পশ্চাৎপদ হই না এমন বর্বর তূর্যনিনাদ !

    সন্মোহিত আরাম ! প্রথম বারের খাতিরে, সুন্দর দেহ আর অজানা কাজের জন্য হুররে !

    আরম্ভ হয়েছিল বাচ্চাদের হাসিতে, শেষও হবে সেইভাবে । এই বিষ আমাদের শিরায় তখনও বইবে যখন তূর্যনিনাদ ফিরে আসবে, আমাদের আরেকবার পুরোনো বিশৃঙ্খলার হাতে তুলে দেয়া হবে । ওহ, আমরা এখন অমন দৈহিক শাস্তির উপযুক্ত, আমাদের দেহ আর আত্মাকে দেয়া মানবোত্তর প্রতিশ্রুতিকে সঠিক বুঝে উঠতে হবে : এই প্রতিশ্রুতি, এই পাগলামি ! সৌষ্ঠব, বিজ্ঞান, সন্ত্রাস ! ওরা অঙ্গীকার করেছে যে শুভ এবং অশুভর বৃক্ষকে অন্ধকারে পুঁতে ফেলা হবে, স্বৈরতান্ত্রিক সদগুণগুলোকে নির্বাসন দেয়া হবে, যাতে এখানে আমরা বিশুদ্ধ প্রেম নিয়ে আসতে পারি । এটা আরম্ভ হয়েছিল বিশেষ বিরক্তি নিয়ে এবং ফুরিয়েও গেলো -- আমরা এই শাশ্বতকে তক্ষুনি দখল করতে পারিনি বলে -- তা সুগন্ধের দাঙ্গায় শেষ হয় ।

    শিশুদের হাসি, কেনা-গোলামদের বিচক্ষণতা, অক্ষতযোনি মেয়েদের আত্মসংযম, এখানকার মুখগুলো আর জিনিসপত্রের আতঙ্ক, সতর্কতার স্মৃতির দরুন তুমি পবিত্র । এটা আরম্ভ হয়েছিল 

    মূর্খতার সঙ্গে, এবার দ্যাখো, শেষ হচ্ছে আগুন আর বরফের দেবদূতদের দ্বারা । ক্ষণকালের মদ্যপ পবিত্র সতর্কতা ! যদি তুমি কেবল মুখোশের জন্য আমাদের বরাদ্দ করে থাকো । সাধনপ্রণালী, আমরা তোমাকে সমর্থন করছি ! আমরা ভুলিনি কালকে তুমি আমাদের  প্রতিটি শতককে মহিমান্বিত করেছিলে । বিষে আমাদের বিশ্বাস আছে । আমরা জানি কেমন করে প্রত্যেক দিন আমাদের সমগ্র জীবন দিয়ে দিতে হবে ।

    এই কালখণ্ড হলো গুপ্তঘাতকদের ।

     

    প্রবাদসমূহ

    ইল্যুমিনেশান ১২

    আমাদের চারটে অবাক চোখের জন্যে এই জগতসংসারকে যখন ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছে একটিমাত্র অন্ধকার জঙ্গলে -- দুটি অনুগত বাচ্চার জন্য একটি সমুদ্রতীরে -- আমাদের সুস্পষ্ট সমবেদনার জন্য সঙ্গীতের ঘরে -- আমি তোমাকে খুঁজে বের করবো ।

    এখানে তলায় কেবল একজনমাত্র বুড়ো লোক থাকুন, শান্ত আর সুন্দর, ‘অচেনা বিলাসে’ পরিবেষ্টিত -- আমি তোমার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসবো ।

    আমাকে তোমার স্মৃতিগুলো বাস্তবে পরিণত করতে দাও -- আমাকে যুবতী হতে দাও, যে তোমার গলা টিপে ধরবে -- আমি তোমার দম বন্ধ করে দেবো ।

    যখন আমরা যথেষ্ট বলশালী -- কে-ই বা পশ্চাদপসরণ করবে ? যথেষ্ট মৌজমস্তিতে থাকলে -- কে-ই বা ইয়ার্কি করতে ছাড়ে না ? যখন আমরা সবচেয়ে বেশি অসূয়াপূর্ণ -- ওরা আমাদের কি-ই বা বানাতে পারে ? নিজেকে সাজিয়েগুজিয়ে তোলো, নাচো, হাসো । -- আমি কখনও ভালোবাসাকে জানালার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারবো না ।

    ভিখারিনী মেয়েটা, দানবী খুকি, আমার কমরেড ! তুমি এই হতভাগিনী নারীদের কতোটা মনোযোগ দাও, এই প্যাঁচপয়্জার, আর আমার সমস্যা । তোমার অসম্ভব কন্ঠস্বর দিয়ে নিজেকে আমাদের সঙ্গে বেঁধে ফ্যালো, সেই কন্ঠস্বরখানা ! এই জঘন্য বিষাদের একমাত্র আশা ।

    জুলাই মাসের মেঘাচ্ছন্ন ভোর । বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ছাইয়ের স্বাদ -- বনানীর ঘামের গন্ধ ঝরে পড়ছে উনানের কোনে -- ভিজে ফুলগুচ্ছ -- তৃণাঞ্চলের ধ্বংসাবশেষ -- খেতের খালগুলো থেকে কুয়াশা -- তাহলে কেন খেলনাপাতি আর ধুপকাঠি নয় ?

    আমি এক ঘণ্টাঘর থেকে আরেক ঘণ্টাঘর পর্যন্ত দড়ি টাঙিয়েছি ; জানালা থেকে জানালা পর্যন্ত ফুলের মালা ; নক্ষত্র থেকে নক্ষত্র পর্যন্ত সোনার শেকল ; আর আমি নাচছি ।

     

    ওপরের ঝিল থেকে অবিরাম বাষ্প ওঠে । সফেদ সূর্যের বিপরীতে কোন জাদুনারীরা জেগে উঠবেন? কোন বেগুনি পাতার পর্ণরাজি ঝরে পড়বে ?

    জনগণের টাকা যখন ঢেলে দেয়া হচ্ছে ভাইবেরাদরদের ভোজনোৎসবে, মেঘের ভেতরে বাজতে থাকে গোলাপরঙা আগুন ।

    চিনা কালির আকর্ষণ সুগন্ধকে গভীর করে তোলে, আমার নিশিপালনে ক্রমান্বয়ে ঝরে পড়ে কালোরঙের পাউডার । -- আমি গ্যাসের আগুন কম করে দিই, বিছানায় নিজেকে ছুঁড়ে ফেলি, আর ছায়াগুলোর দিকে ফিরে, দেখতে পাই তোমাদের, আমার কন্যারা, আমার রানিরা !

     

    শ্রমিকেরা

    ইল্যুমিনেশান ১৩

    ওহ ফেবরুয়ারি মাসের সেই উষ্ণ সকাল ! আমাদের বিদকুটে অন্নবস্ত্রহীন স্মৃতি, আমাদের যৌবনের দারিদ্রদশা থেকে অসময়ের দখিনা বাতাস এসে জাগিয়ে তুললো ।

    বাদামি আর শাদা চাককাটা সুতির স্কার্ট পরেছিল হেনরিয়েকা, গত শতকের ফ্যাশান, সন্দেহ নেই ; ফিতে বাঁধা শিরাবরণ, রেশমের স্কার্ফ । শোকসন্তাপের চেয়েও তা দুঃখজনক । আমরা শহরতলিতে ঘুরে  বেড়াচ্ছিলুম । আবহাওয়া ছিল মেঘলা, আর ওই দখিনা বাতাস চঞ্চল করে তুলছিল বিধ্বস্ত বাগান আর শুকনো তৃণভূমি থেকে উড়ে আসা দুর্গন্ধকে । 

    এটা আমাকে যতোটা বিরক্ত করেছে ততোটা আমার স্ত্রীকে করতো না । ওপরের দিকের রাস্তায় গতমাসের বানভাসি তৈরি করে গেছে জলের  চাদর, ও আমাকে দেখালো তাতে কয়েকটা ছোট্ট মাছ ।

    শহরটা, কারখানাগুলোর আওয়াজ আর ধোঁয়াসুদ্ধ, রাস্তা ধরে আমাদের পিছু নিয়েছিল । ওহ, অন্য জগতসংসার, আকাশ আর ছায়ায় আশীর্বাদপ্রাপ্ত বসতি ! দখিনা বাতাস আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল দুর্দশাময় শৈশবের ঘটনাগুলো, আমার গ্রীষ্মের বিষাদ, ভাগ্য আমার থেকে সদাসর্বদা যে ভয়ংকর বিপুল শক্তিমত্তা ও জ্ঞান  দূরে সরিয়ে রেখেছে । না ! আমরা এই কৃপণ দেশে  গ্রীষ্ম কাটাবো না যেখানে আমরা বাগদত্ত অনাথ ছাড়া আর কিছুই হতে পারবো না। আমি  এই শক্ত হাত দিয়ে প্রিয় দৃশ্যগুলোকে টেনে নিয়ে যেতে দেবো না ।

     

    সেতুগুলো

    ইল্যুমিনেশান ১৪

    স্ফটিকের ধূসর আকাশ । সাঁকোগুলোর অদ্ভুত নকশা, কখনও সোজা, কখনও বেঁকা, আবার কোনোটা কোনাকুনি বেঁকে গিয়ে আগেরটার সঙ্গে যোগ দিয়েছে, আর এই নকশাগুলো খালের আলোজ্বলা বাঁকগুলোয় আবার তেমন করেই পুনরাবৃত্তি করেছে, কিন্তু এতো দীর্ঘ আর হালকা যে নদীর তীর, গুম্বজের গুরুভারে, ডুবে গিয়ে ছোটো হয়ে আসে । এই সাঁকোগুলোর কয়েকটা এখনও চাদরে ঢাকা । অন্যগুলোয় রয়েছে মাস্তুল, সঙ্কেত, অপলকা নিচু পাঁচিল । পাতলা তারে মোড়া, আর মিলিয়ে গেছে ; তীর থেকে দড়িদড়া উঠে আসে । তুমি একটা লাল কোট দেখে চিনতে পারো, হয়তো অন্যান্য কোটও এবং সঙ্গীতযন্ত্র । এই জনপ্রিয় রেশগুলো কি, বিখ্যাত কনসার্টের টুকরো, জনগণের জাতীয়-সঙ্গীতের অবশিষ্টাংশ ? জলের রঙ ধূসর এবং নীল, সমুদ্রের বাহুর মতন চওড়া ।

    একটা শাদা রশ্মি, অনেক ওপরে থেকে এসে, হাসির নাটককে লোপাট করে দ্যায় ।

     

     

    শহর

    ইল্যুমিনেশান ১৫

     

    এক মহানগর যাকে এই জন্যে আধুনিক মনে করা হয় যে বাড়িগুলোর বাইরের দিক সাজানোয় আর নগরের পরিকল্পনায় প্রয়োগ করার জন্য পরিচিত উপলব্ধিগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে ; তারই  আমি এক ক্ষণজীবী আর তেমন বিচ্ছিন্ন নাগরিক নই । এখানে তুমি কুসংস্কারের একটিও স্মৃতিস্তম্ভের হদিশ পাবে না । সংক্ষেপে, নৈতিকতা আর ভাষাকে সরলতম প্রকাশে নামিয়ে আনা হয়েছে ! লক্ষাধিক এই লোকজন যারা পরস্পরকে জানার প্রয়োজন অনুভব করে না, নিজেদের শিক্ষাদীক্ষা, কর্মকাণ্ড, বার্ধক্যে এতো মিল যে  তাদের আয়ু  মহাদেশের গোলমেলে সংখ্যাতত্ব যা বলেছে তার চেয়েও বেশ  কম । তাই, আমার জানালা দিয়ে, দেখতে পাই নতুন প্রেতরা শাশ্বত ঘন ধোঁয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে --- আমাদের বনানীঘেরা ছায়া, আমাদের গ্রীষ্মের রাত ! -- প্রতিহিংসর নতুন গ্রিক দেবতারা, আমার কুটিরের সামনে, যা আমার স্বদেশ, আমার সমগ্র হৃদয়, কেননা এখানে সবকিছুরই পরস্পরের সঙ্গে মিল আছে -- ক্রন্দনহীন মৃত্যু, আমাদের সক্রিয় কন্যা আর চাকরানি, রাস্তার কাদায় বেপরোয়া ভালোবাসা আর ফালতু অপরাধ ফুঁপিয়ে বেড়াচ্ছে ।  

     

    গাড়ির চাকার দাগ

    ইল্যুমিনেশান ১৬

    ডানদিকে বাগানের এই কোনে গ্রীষ্মের ভোর পাতাদের আর কুয়াশাকে এবং শব্দগুলোর ঘুম ভাঙায়, আর বাঁদিকের ঢালে স্যাঁতসেতে রাস্তায় বেগুনি ছায়ায় অগুন্তি দ্রুতগামী চাকার দাগ ধরে রাখে । ঐন্দ্রজালিক মিছিল । ওয়াগন, সত্যিই, ঝকমকে কাঠের তৈরি জানোয়ার তাতে, খুঁটি আর রঙবেরঙ চাঁদোয়া, কুড়িটা চিত্রবিচিত্র সার্কাস ঘোড়ার পাশ দিয়ে ছুটে চলে গেল, আর পুরুষেরা আর বাচ্চারা তাদের অদ্ভুত জানোয়ারের পিঠে -- কুড়িটা গাড়ি, ঢেউখেলানো, ঢাকাখোলা আর ফুলে সাজানো প্রাচীন ঘোড়ারগাড়ির মতন কিংবা যেমন পরীর গল্পে থাকে, শহরতলির যাত্রাভিনয় দেখতে যাবার পোশাক-পরা বাচ্চায় ঠাশা : -- এমনকি কফিনও, তাদের রাতের আচ্ছাদনের তলায়, জাঁকালো আবলুস পালকে, নীল-কালো মাদিঘোড়ার দৌড়কে পেছনে ফেলে এগিয়ে চললো ।

     

    নগরেরা

    ইল্যুমিনেশান ১৭

    শহরসমূহই বটে ! এই সেই লোকগুলো যাদের জন্যে স্বপ্নেদেখা উত্তর-আমেরিকার আলেঘানি পাহাড় এবং লেবানন মঞ্চায়িত হয়েছিল ! স্ফটিক আর কাঠের তৈরি রাখাল-কুটির যা অদৃশ্য রেললাইন আর কপিকলে চলে । গ্রিক সূর্যদেবের মূর্তি দিয়ে ঘেরা মরা আগ্নেয়গিরির হাঁমুখ, আর তামার তৈরি পামগাছেরা আগুনশিখায় সুরেলা ধ্বনি তুলছে । রাখাল কুটিরের পেছনে খালের ধারে ভালোবাসার পানোৎসব প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল । গিরিসঙ্কটের ভেতরে শিকারের রুনুঝুনু বাজে । দৈত্যবৎ গায়কদের সমাবেশ ঘটে মধ্যযুগের ফরাসি রাজার সোনালি ঝিলমিলে পোশাকের মতন শীর্ষদেশের আলোয় । 

    ঘুর্নিজলের ভেতরে পাটাতনের ওপরে, রাজা শার্লামেইনের বীরপুরুষেরা তাদের শৌর্যের ভেরীধ্বনি করে । অতলর ওপরের সাঁকোগুলোয়, আর সরাইখানার ছাদে, আকাশের তাপ মাস্তুলগুলোকে পতাকা দিয়ে ঢেকে ফ্যালে ।  দেবতাপ্রতিম ভঙ্গুর মূর্তিগুলো চারণভূমি দখল করে ফ্যালে যেখানে দেবদূততুল্য নারীসিংহীরা হিমানী-সম্প্রপাতে প্রবেশ করে । সর্বোচ্চ চূড়াগুলোর সারির ওপরদিকে, রয়েছে ভিনাসের শাশ্বত জন্মের ঝড়ঝাপটায় আক্রান্ত এক সমুদ্র, অরফিউসের ক্ষণস্হায়ী সঙ্গীতে উদ্বুদ্ধ আর দামি মুক্তো এবং শঙ্খধ্বনিতে মথিত -- সেই সমুদ্র জাগতিক বজ্রবিদ্যুৎকে অনেক সময়ে অন্ধকার করে তোলে । ঢালু জায়গায়, ফুলের ফসল, আমাদের তরোয়াল আর পেয়ালার মতন, নিচের দিকে । পিঙ্গলরঙা মোটা কাপড়ে স্বপ্নদায়িনী পরীরানিদের মিছিল । তাদের পা ঝর্ণায় আর বনগোলাপের ঝাড়ে, ওইখানে উঁচুতে মৃগয়ার অধিষ্ঠাত্রীদেবীর দুধ খাচ্ছে এক হরিণ । শহরতলির মাতালনারীরা ফোঁপাচ্ছে, আর চাঁদ জ্বলে যাচ্ছে আর শেয়ালেরা হুক্কাহুয়া করছে । ভিনাস সন্ন্যাসী আর স্যাকরাদের সঙ্গে প্রবেশ করছে গুহার মধ্যে । সারিসারি ঘণ্টাঘর গেয়ে উঠছে জনগণের অভিপ্রায় । হাড়ের তৈরি দুর্গ থেকে ভেসে আসছে অজানা সঙ্গীত । যাবতীয় কিংবদন্তির প্রকাশ ঘটছে আর শহরগুলোর ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে হরিণের দল । থেমে গেছে ঝড়ের পুণ্যালোক । রাতের পানোৎসবে অবিরাম নাচছে বর্বরেরা । এবং, একবার, আমি বাগদাদের রাস্তার গোলমালে নেমে পড়লুম, যেখানে ভিড়ের লোকেরা তরতাজা শ্রমের আনন্দ-গান গাইবার জন্য জড়ো হয়েছিল, নিস্তেজ হাওয়ায়, পাহাড়ের বিখ্যাত মায়াপুরুষদের এড়াবার জন্যে বিনা ক্ষমতায় পাক খাচ্ছিল । আমার তন্দ্রাভাব আর যৎসামান্য হেলডোল যে এলাকা থেকে আসে তা ফিরে পেতে কোন ধরণের অস্ত্র, কোন ধরণের মনোরম সময় প্রয়োজন ?

     

    ভবঘুরের দল

    ইল্যুমিনেশান ১৮

    সমব্যথী ভাই ! ওর কাছে আমার কোনও নৃশংস নিশিপালন আছে ! ‘আমি এই ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপ্রচেষ্টাকে দখল করে নিতে বিফল হয়েছিলুম । আমি ওর অকর্মণ্যতা নিয়ে ঠাট্টা করেছিলুম । যদি আমাদের নির্বাসনে যেতে হয়, কেনা-গোলমী করতে হয়, তা হবে আমার দোষ।’ অদ্ভুত দুর্ভাগ্য আর বোকামির জন্য ও আমার প্রশংসা করেছিল, আর তার সঙ্গে জুড়েছিল অশান্তিকর কারণ ।

    এই শয়তান পণ্ডিতকে আমি বিদ্রুপ করে উত্তর দিয়েছি, আর জানালার কাছে গিয়ে তা শেষ করেছি । বিরল সঙ্গীতরেখার চালচলনের অপর পারের চারণভূমিতে আমি ভবিষ্যতের রাতের বিলাসের মায়াপুরুষ গড়েছি ।

    এই অস্পষ্ট স্বাস্হবিধিসন্মত চিত্তবিক্ষেপের পর, আমি খড়ের মাদুরের ওপরে হাতপা ছড়িয়ে শুয়ে পড়তুম । এবং, বলতে গেলে প্রতি রাতে, যেই আমি ঘুমিয়ে পড়তুম, বেচারা ভাইটি উঠে পড়তো, মুখে দুর্গন্ধ, চোখে দেখতে পাচ্ছে না -- যেমন ও নিজের সম্পর্কে স্বপ্ন দেখতো -- আর নিজের নির্বোধ কান্নার স্বপ্নে বিভোর আমাকে ঘরের ভেতরে টানাটানি করতো !

    বাস্তবিক, সত্যি বলতে কি, আমি ওকে ওর সূর্যসন্তানের প্রাগৈতিহাসিক স্হতিতে ফিরিয়ে আনার প্রতিজ্ঞা করেছিলুম -- আর আমরা ঘুরে বেড়ালুম, গুহার মদে ভরণপোষণ করে, আর পথের বিসকিট খেয়ে, আমি পরিসর আর ফরমুলা খুঁজে পাবার জন্যে অধৈর্য ।

     

    নগরসকল

    ইল্যুমিনেশান ১৯

    আধুনিক বর্বরতার অপরিমিত ধারণাকে ছাপিয়ে যায় সরকারি নগরায়ন । পরিবর্তনাতীত ধূসর আকাশ যে অনুজ্বল আলো ছড়াচ্ছে তা বর্ণনা করা অসম্ভব ; স্হাপত্যের রাজসিক রোশনাই, আর মাটিতে অনন্তকালীন তুষার । ধ্রুপদী স্হাপত্যের বিস্ময়কর কাজগুলোকে, একান্ত আতঙ্কজনক রুচিতে, ওরা আবার গড়েছে । হ্যাম্পটক কোর্টের চেয়ে কুড়িগুণ বড়ো মিউজিয়ামে  তৈলচিত্রের প্রদর্শনী দেখি । মন্ত্রালয়ের সিঁড়িগুলোর নকশা তৈরি করেছিল নরওয়ের এক নেবুচাদনেজ্জার ; যে অধস্তন অধিকারীদের দেখেছিলুম তারা, যেমন হয় আরকি, ব্রাহ্মণদের থেকেও গর্বিত, আর বিশাল মূর্তিগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং এলাকার তত্ববধায়কদের দেখে আমি ভয়ে কেঁপে উঠছিলুম । চৌরাস্তার বাড়িগুলোর ঘেঁষাঘেঁষি, তাদের ছাদ, আর পাঁচিলঘেরা বারান্দা, তাদের ঘণ্টাঘরগুলো থেকে কোনঠাশা করে দিয়েছে । বিস্ময়কর  শিল্পচর্চায় পার্কগুলোয় উপস্হাপন করা হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক প্রকৃতি । ভালো জায়গাগুলোয় রয়েছে অনির্বচনীয় চৌহদ্দি : সমুদ্রের শাখা, নৌকাবর্জিত, তার নীল রঙের ঘষাকাচকে ছড়িয়ে দেয় মোমের তৈরি বিশাল গাছে গুরুভার জাহাজঘাটার মাঝবরাবর । একটা ছোটো সাঁকো চলে গেছে সন্ত চ্যাপেলের গোলাকার গম্বুজের ঠিক নিচের সিংদরোজা পর্যন্ত ।  গম্বুজটা পনেরোহাজার ফিটের ইস্পাতের কলাকৃতি দিয়ে গড়া ।

    তামার তৈরি সাঁকো, মাচান, সিঁড়ি যা আচ্ছাদিত বাজারকে পাক খেয়ে উঠেছে, কয়েকটা দৃষ্টিভঙ্গীতে, আমি ভাবলুম হয়তো শহরের ব্যাপ্তি বিচার করে দেখব ! তা ছিল মস্তোবড়ো ব্যাপার যার সম্পর্কে নির্ণয় নিতে পারলুম না : নগরদুর্গের ওপরদিকে আর নিচে যে এলাকাগুলো রয়েছে তাদের স্তর কেমনতর ? আমাদের দিনকালে পর্যটকদের পক্ষে দেখে বেড়ানোটা অসম্ভব । ব্যবসার চৌহদ্দি, সেকেলে গ্যালারিসহ, একই রকমের শৈলীর সার্কাস । কোনও দোকান চোখে পড়ছে না, কিন্তু পথের তুষারে মাড়িয়ে যাবার দাগ ; কয়েকজন নবাব, লণ্ডনের রবিবারের সকালে হাঁটার লোকেদের মতন বিরল, হীরের তৈরি ঘোড়ারগাড়ির দিকে এগোয়। কয়েকটা লাল মখমলের পালঙ্ক : মরুদেশের পানীয় বিতরন করা হচ্ছে, যার দাম আটশো থেকে আটহাজার টাকার মধ্যে পড়ে। সার্কাসের ভেতরে নাট্যালয় খোঁজার ধারণা সম্পর্কে আমি নিজেকে বললুম যে দোকানগুলোতে নিশ্চয়ই যথেষ্ট বিষণ্ণ নাটক অভিনীত হয় । আমার মনে হয় পুলিশও আছে ; কিন্তু আইনগুলো নিশ্চয়ই এমন অদ্ভুত যে অ্যাডভেঞ্চার করার ভাবনা আমায় এড়িয়ে যায়।

    শহরতলিগুলো, পারিসের যেকোনো সুন্দর রাস্তার মতন পরিচ্ছন্ন, সূর্যের আলোর সাদৃশ্যের আনুকূল্য পায় ; গণতান্ত্রিক উপাদানের সংখ্যা কয়েক হাজার আত্মা হবে । এখানেও, ঘোড়াগুলো সার বেঁধে নেই ; শহরতলিগুলো বিটকেলভাবে গাঁয়ের দিকে গিয়ে হারিয়ে যায়, যাকে বলে ‘প্রশাসনিক এলাকা’, যা ছড়িয়ে পড়েছে শেষহীন পশ্চিমদিকের জঙ্গল আর পাদপবাগান পর্যন্ত, যেখানে বর্বর কুলীনরা যে আলো নিজেরা তৈরি করেছে, সেখানে সংবাদ শিকার করতে বেরোয়। 

    নিশিপালন

    ইল্যুমিনেশান ২০

    এই হলো আলোয় আস্হা, বিছানার ওপরে কিংবা মাঠে, জ্বরে নয়, অবসন্নতাতেও নয়।

    ইনি বন্ধু প্রদীপ্ত নন দুর্বলও নন । তিনিই বন্ধু ।

    ইনি ভালোবাসবার ; যন্ত্রণা দেয়া হয়নি, এবং যন্ত্রণাদায়ক নন ।

    চাওয়া হয়নি বাতাস এবং জগতসংসারকে । জীবন ।

    --এটা কী, তাহলে ?

    --আর শীতল হয়ে যায় স্বপ্ন ।

    মাঝখানের স্তম্ভে আলো ফিরে আসে । ঘরের দুই প্রান্তসীমা থেকে, একরকম মঞ্চই বলা যায়, মিলবিশিষ্ট দ্রোহীদের সাক্ষাৎ ঘটে । পাহারাদারের মুখোমুখি দেয়ালে কার্নিসের মতন কোনাকুনি জায়গায় মনস্তত্বের পারম্পর্য, আবহাওয়ার চাদর এবং ভূতাত্বিক ঢেউ -- গভীরভাবে অনুভুত গাঢ় এবং দ্রুত দলাদলি, যেখানে সব ধরনের প্রাণী তাদের যাবতীয় দর্শনানুপাত নিয়ে রয়েছে।

    নিশিপালনের লন্ঠন এবং চাদর, ঢেউয়ের শব্দ তোলে, রাতের বেলায়, জাহাজের কাঠামোর পাশে, হালকে ঘিরে ।

    সমুদ্রের নিশিপালন যেন খেটে-খাওয়া অ্যামেলির স্তনযুগল ।

    কারুকার্য-শোভিত পর্দাগুলো, কিছুটা ওপরদিকে তোলা, পান্নারঙা লেসের ঝালর, যাকে লক্ষ্য করে নিশিপালনের পায়রারা উড়ে যায় ।

    কালো উনানের সামনের পাথর, সমুদ্রতীরের প্রকৃত সূর্য : আহ, ইন্দ্রজালের ঝর্ণা ; ভোরের একমাত্র দৃশ্য, ঠিক এখনই !

     

     

    অতীন্দ্রিয়

    ইল্যুমিনেশান ২১

    তীরের ঢালুতে দেবদূতেরা তাদের পশমের পোশাকে ইস্পাত আর পান্নার চারণভূমিতে পাক খায়।

    পাহাড়ের গোলাকার মাথার ওপরে লাফাতে থাকে আগুনশিখার মাঠ । বাঁদিকে খেতের আলগুলোকে পদদলিত করেছে পাক থেকে বেরিয়ে প্রতিটি হত্যা, প্রতিটি যুদ্ধ, প্রতিটি বিপর্যয়ের ধ্বনি। প্রান্তরেখার ওপারে ডানদিকে আরোহণরেখা, প্রগতির দিকে ।

    এবং,  যখন  শীর্ষের কার্নিস দিয়ে গড়ে উঠছে ছবির মোচড় আর লাফিয়ে ওঠা  মানবসমুদ্র আর রাত্রির শঙ্খধ্বনি ।

    নক্ষত্র এবং আকাশের ফুলেল মিষ্টতা আর বাদবাকিরা নেমে আসে বাঁধের উল্টোদিকে, যেন চুবড়ির ভেতরে -- আমাদের মুখোমুখি, এবং গড়ে তোলে অতল মঞ্জরী এবং নিচের নীল ।

     

    ঊষা

    ইল্যুমিনেশান ২২

    আমি গ্রীষ্মের ভোরকে গ্রহণ করে নিলুম ।

    প্রাসাদগুলোর সামনে এখনও কোনোকিছুর নড়চড় নেই । জল মারা গিয়েছিল । বনানিঘেরা পথকে ভিড়ের ছায়া এখনও ছেড়ে যায়নি । আমি হাঁটছিলুম, তপ্ত শ্বাস নিচ্চিলুম, আর দামি পাথরগুলো ওপর দিকে তাকিয়ে দেখলো, আর ডানাগুলো শব্দ না করে উড়লো । 

    প্রথম অভিযানে, শীতল ফিকে আলোয় আগে থেকেই আলোকিত রাস্তায়, একটা ফুল  আমাকে তার নাম জানালো ।

    দেবদারু গাছে ঘেরা ফর্সা আলুলায়িত ঝর্ণার দিকে তাকিয়ে হাসলুম : চাঁদির শীর্ষভূমির ওপরকার ঈশ্বরীকে চিনতে পারলুম ।

    তারপর একের পর এক অবগুন্ঠন সরালুম । গলির ভেতরে ঢুকে, হাত নাড়ালুম ।  সমতলভূমিতে গিয়ে আমি মেয়েটিকে মোরগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জন করলুম । শহরে ঢুকে, মেয়েটি ঘণ্টাঘর আর গম্বুজের মাঝে পালিয়ে গেল, এবং, ভিখারির মতন শ্বেতপাথরের জেটি পেরিয়ে, আমি ওকে ধাওয়া করলুম ।

    রাস্তার ওপর দিকে, জলপাই বনের কাছে, ওর  অবগুন্ঠনসুদ্ধ ঘিরে ফেললুম মেয়েটিকে, আর অনুভব করলুম ওর বিশাল শরীর বেশ ছোটো । জঙ্গলের পাদদেশে পড়ে গেল ভোর আর বালকটি ।

    ঘুম ভাঙতে, দুপুর ।

     

    ফুলগুলো

    ইল্যুমিনেশান ২৩

     

    সোনার ছাদ থেকে -- রেশমের সুতো, ধূসর পাতলা কাপড়, সবুজ মখমল এবং স্ফটিকের চাকার মাঝে যা রোদ্দুরে ব্রোঞ্জের মতন কালো হয়ে যায় -- আমি লক্ষ্য করি চাঁদির সুতোর কারুকাজ-করা জাজিমের ওপরে ফেলেরাখা শেয়ালকাঁটা, চোখ এবং চুল ।

    হলুদ সোনার টাকায় মণিরত্নের গুঁড়ো, পান্নার গম্বুজকে ধরে রেখেছে মেহগানি থাম, গোলাপজলকে ঘিরে সাদা সাটিনের টুকরো আর চুনীর মিহিন জল ছেটানো হয়েছে ।

    বড়ো নীল চোখ আর তুষার-আঙ্গিকের কোনো দেবতার মতন, শ্বেতপাথরের ছাদে সমুদ্র ও আকাশ ডেকে আনছে কচি ও তরতাজা গোলাপগুচ্ছ ।

     

    পার্থিব রাত্রি

    ইল্যুমিনেশান ২৪

    দেয়ালের প্রহসনমূলক ফাটল খুলে ফেলছে এক দমকা ঝড় -- ভাঙাচোরা ছাদগুলোর কড়িবরগাকে ঢেকে ফেলছে -- এলোমেলো করে দিচ্চে বাঁধের পাঁচিল -- অন্ধকার করে ফেলছে জানালাগুলো ।

    দ্রাক্ষালতার থেকে দূরত্বে, সিংহমুখ নর্দমার ওপরে আমার পা রেখে --- আমি এই জুড়িগাড়িতে চাপলুম যার সময় সুস্পষ্টভাবে উত্তল কাচে লেখা, বাইরে বেরিয়ে আসা প্যানেল, আর ঢেউখেলানো বসার জায়গা । আমার তন্দ্রার শবযান, আলাদা করে দ্যায়, আমার বোকামির মেষপালকের কুঁড়েঘর, বাতিল রাজপথের মাটিতে  আমার শকট বাঁক নেয় : এবং ঝাঁকুনির দরুণ ডানদিকের জানালায় ফিকে চাঁদনি আকারগুলো, গাছের পাতা, স্তন পাক খেতে থাকে।

    --একটা সবুজ আর একটা নীল, বেশ গভীর, দৃশ্যটাকে আক্রমণ করে । জোড়াতালি দেয়া নুড়িপথের ফলে ঘোড়ার বর্ম খুলে যায় ।  

    -- এখানে কেউ ঝড়ের জন্যে সিটি বাজায়, সোডোমের লোকজন আর জেরুজালেমের লোকজন, বন্য পশু এবং সৈন্যবাহিনী ।

    ( -- ঘোড়ারগাড়ির চালক এবং স্বপ্নের প্রাণীরা কি আবার নিয়ে যাবে শ্বাসরুদ্ধকর ঝোপঝাড়ে, রেশমি বসন্তঋতুর চোখে আমাকে ছুঁড়ে ফেলার জন্যে । )

    --এবং আমাদের,  চাবুক মেরে, লেহ্য জল আর ছড়িয়ে পড়া খরায়, কুকুরদের চিৎকারে গড়াগড়ির জন্যে পাঠানো হবে…

    --বাঁধের পাঁচিলগুলো এক নিঃশ্বাসে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ।

     

    সামুদ্রিক

    ইল্যুমিনেশান ২৫

    তামা ও চাঁদির রথ --

    চাঁদি ও ইস্পাতের জাহাজমুখ--

    সমুদ্রের ফেনায় লাঙল চালানো---

    কাঁটাগাছের খুঁটি ওপড়ানো ।

    উষর প্রান্তরের বিস্তার,

    আর জোয়ার-ভাটায় আঁকা রেখা,

    পূর্বদিকে ঘুরতে-ঘুরতে বয়ে চলে যায়,

    জঙ্গলের থামগুলোর দিকে,

    জেটির খুঁটিগুলোর দিকে,

    যার লোহার বাতাগুলো আলোর ঘুর্ণিঝড়ে চূর্ণ ।

     

    শীতকালের ভোজনোৎসব

    ইল্যুমিনেশান ২৬

    নাটুকে-মজার বস্তির পেছনদিকে আওয়াজের প্রপাত । গোলোকধাঁধার পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা অ্যাভেনিউ আর বাগানে, চক্রাকার বাজি অনেকক্ষণ জ্বলে -- সূর্যোদয়ের সবুজ আর লাল । চুল-সাম্রাজ্যের  বিনুনিতে হোরেসের কবিতার উপদেবীর দল -- গোলগাল সাইবেরিয় মহিলা, ফরাসি চিত্রকরের আঁকা ছবির মতন চিনা মেয়েরা ।

     

    মানসিক যন্ত্রণা

    ইল্যুমিনেশান ২৭

    এরকম কি হতে পারে যে মেয়েটি আমাকে  ক্ষমা পাইয়ে দেবে  শাশ্বতভাবে বিধ্বস্ত  উচ্চাকাঙ্খা থেকে-- বহুকালের দারিদ্র্যকে মেরামত করে  আরামদায়ক সমাপ্তি ঘটাবে -- আমাদের মারাত্মক আলস্যের লজ্জায় ঘুম পাড়িয়ে দেবে সাফল্যের দিন ?

    ( ও পামগাছ ! হীরক ! ভালোবাসা ! প্রাণশক্তি ! -- প্রতিটি আনন্দ ও গরিমার চেয়ে উচ্চতর !-- সবরকমের, সব জায়গায় -- রাক্ষস, দেবতা -- এখানে বসবাসের যৌবন ! )

    ঐন্দ্রজালিক বিজ্ঞান এবং সামাজিক ভাতৃত্বের আন্দোলনকে কি আদি স্বাধীনতার প্রগতিশীল পুনর্বাসন হিসাবে যত্নে পালন করা হবে ?...

    কিন্তু এই রক্তচোষা মেয়ে যে আমাদের শায়েস্তা করে সে হুকুম দেয় যে আমরা যেন ওর দেয়া খুদকুঁড়োয় নিজেদের মজায় রাখি, নয়তো আরও মজা চালিয়ে যাও ।

    ক্লান্ত বাতাস এবং সমুদ্রের মাঝ দিয়ে জখমের গমন ; যন্ত্রণায়, খুনি জল এবং বাতাসের নৈঃশব্দের ভেতর দিয়ে ; হাসিমুখ অত্যাচারের মাঝ দিয়ে, তাদের কোলাহলপূর্ণ স্তব্ধতার দিকে ।

     

    মেট্রপলিটান

    ইল্যুমিনেশান ২৮

    নীলাভ খাঁড়ি থেকে ওসিয়ানের সমুদ্র পর্যন্ত, গোলাপি ও কমলারঙের বালুকাবেলায়, মদের রঙের আকাশ যাকে ধুয়ে দিয়েছে, স্ফটিকের বীথি ওপরে উঠে গিয়ে আড়াআড়ি ভাগ করে ফেলেছে, যা তখনই দখল করে নিয়েছে গরিব কমবয়সী পরিবারেরা যারা ফলবিক্রেতাদের দোকানে কেনাকাটা করে । বৈভব নেই । -- এই নগর !

    আলকাতরার মরুভূমি থেকে, সরাসরি উড়াল দিয়ে কুয়াশার আতঙ্কজনক পরতগুলোর তলায় যে আকাশ বাঁক নেয়, পিছিয়ে যায়, নেমে যায়, তাকে গড়ে তুলেছে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর কালো ধোঁয়া যা  শোকার্ত সমুদ্র বিলিয়েছে, হেলমেট পরে পালিয়েছে, চাকা, জাহাজ, ঘোড়ার লেজের তলায় বাঁধা চামড়া -- সেই সংগ্রাম !

    মাথা তোলো : ওই ধনুকাকৃতি কাঠের সাঁকো ; সামারিয়ার শেষ সব্জি-উঠোন, শীতল রাতের দ্বারা কাঁপানো লন্ঠনের আলোয় উজ্বল মুখোশ ; আওয়াজ-তোলা পোশাকে বোকা জলপরী, নদীর তলদেশে ; মটরখেতে জ্বলজ্বলে করোটি -- এবং অন্যান্য অলীক ছায়ামূর্তির প্রবাহ -- গ্রামগুলো। রাস্তার দুই কিনারে রেইলিঙ আর দেয়াল, ঝোপঝাড়ের প্রসারণ থামাতে পারেনি, আর নৃশংস ফুলের দল যাকে তুমি বলবে আত্মা আর সহোদরা । একঘেয়েমি জাগানো নাটক-- রাইননদীর অতিঅভিজাতদের  পরীদের গল্পের সম্পত্তি, জাপানি, প্যারাগুয়ের গুয়ারানি, ওরা প্রাচীনকালের সঙ্গীত বুঝতে পারার জন্যে এখনও যোগ্য -- সরাইখানা আছে যা আর সবসময় খোলা থাকে না-- আছে রাজকুমারীরা, আর যদি তুমি বেশি অভিভূত না হয়ে থাকো, নক্ষত্রদের অধ্যয়ন করো-- আকাশ ।

    সকালে যখন, যুবতীটির সঙ্গে, তুমি তুষারের ফুলকির মাঝে লুটোলুটি খেয়েছিলে. সবুজ ঠোঁট, বরফ, কালো পতাকা আর নীলাভ আলোর রশ্মি, আর মেরু-সূর্যের বেগুনিরঙা সুগন্ধ -- তা তোমার জীবনীশক্তি ।

     

    অমার্জিতের দল

    ইল্যুমিনেশান ২৯

    ঋতুদের আর দিনগুলোর অনেক পরে, লোকজন আর দেশগুলো, রক্তমাখা মাংসের পতাকা সমুদ্রের রেশম এবং সুমেরুর ফুলগুলোতে ( তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই । ) 

    বীরত্বের পুরোনো তূর্যনিনাদ কাটিয়ে ওঠার পর -- আমাদের হৃদয়ে আর মাথায় আক্রমণ অব্যহত রেখেছে -- প্রাচীন গুপ্তঘাতকদের থেকে বেশ দূরে ।

    --ওহ ! রক্তমাখা মাংসের পতাকা সমুদ্রের রেশম এবং সুমেরুর ফুলগুলোতে ( তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই । )

    ভাবাবেশসমূহ !

    তুষারের ঝাপটায় ঝরছে আলোকচ্ছটা -- ভাবাবেশসমূহ ! -- জাগতিক হৃদয় থেকে ছোঁড়া হীরকের হাওয়ায় বৃষ্টিতে আগুন, আমাদের পোড়াবার জন্যে । -- হে জগতসংসার !--

    ( পুরোনো আশ্রয় এবং পুরোনো আগুনশিখা থেকে, যা তুমি শুনতে পাও আর অনুভব করো, )

    আলোকচ্ছটা এবং সামুদ্রিক ফেনা । সঙ্গীত, খাঁড়ির মন্থন আর নক্ষত্রে জমাটবাঁধা ঝুলন্ত তুষার।

    হে ভাবাবেশ, হে জগতসংসার, হে সঙ্গীত ! এবং এখানে, আকৃতি, ঘাম, চুল এবং দুই চোখ, ভেসে যায় । এবং শ্বেত অশ্রুজল, ফুটন্ত -- হে ভাবাবেশসমূহ ! -- এবং নারীকন্ঠস্বর পৌঁছে যাচ্ছে আগ্নেয়গিরির তলদেশে এবং সুমেরুর গুহাগুলোয় ।

    পতাকা...

     

    অভিক্ষিপ্ত সৈকতাংশ

    ইল্যুমিনেশান ৩০

    আমাদের গ্রামের বাড়ি আর তার বাগানের উল্টোদিকে সোনালি সকাল আর শিহরিত সন্ধ্যা খুঁজে পেল আমাদের দুই মাস্তুলঅলা পোত, সমুদ্র থেকে কিছুটা দূরে, তৈরি করে ফেলেছে শৈলান্তরীপ যা এপিরাসদেশ কিংবা গ্রিসের পেলোপনিজ, জাপানের প্রধান দ্বীপ, কিংবা আরবের মতন ছড়ানো!

    ফিরে-আসা তত্বে আলোকিত মন্দিরগুলো ; উপকূলের আধুনিক প্রতিরক্ষার অমেয় দৃশ্য ; উষ্ণমণ্ডলের ফুলদল আর গ্রিকদের আসবদেবতার নকশাকাটা বালিয়াড়ি ; কার্থেজের বড়ো খাল আর নোংরা ভেনিসের বাঁধ ; এটনা আগ্নেয়গিরির হালকা উদ্গীরণ, ফুলের আর গ্লেসিয়ারের জলের তৈরি তুষার-ফাটল ; জার্মান পপলার গাছে ঘেরা ধোপারঘাট ; জাপানি গাছের ঝাঁকড়া মাথায় ছাওয়া ঢালের ওপরে বর্ণনাতীত বাগান ; এবং স্কারবরো ও ব্রুকলিনের ‘রাজকীয়’ এবং ‘অভিজাতদের’ প্রাসাদের সামনেদিক ; আর তাদের দুই পাশে  রেললাইন , খোঁড়াজমি, হোটেলের চড়াই, ইতালি, আমেরিকা, এশিয়ার সবচেয়ে মনোরম সবচেয়ে বিশাল নির্মাণ, বর্তমানে দামি আলোকমালায় ঝিলমিলে, পানীয় এবং মৃদুমন্দ বাতাস, ভ্রমণকারী ও সম্ভ্রান্তদের দ্বারা প্রভাবান্বিত-- যারা দিনের আলোয়, অনুমতি দ্যায়, সাগরতীরের দ্রুতলয়ী নাচিয়েদের -- এমনকি শিল্পের মঙ্গলময় অলঙ্কারের সঙ্গীতকে, যাতে প্রাসাদের সৈকতাংশের সামনেদিককে অবিশ্বাস্যভাবে সাজিয়ে তোলা যায় ।

     

    দৃশ্যাবলী

    ইল্যুমিনেশান ৩১

    প্রাচীন মিলনানন্তক নাটক তার সমন্বয়কে অনুধাবন করে, তার রাখালিয়া কাহিনিকে বিভাজন করে : তক্তায় গড়া প্রশস্ত পথ ।

    পাথুরে জমির ওপরে একদিক থেকে আরেকদিক পর্যন্ত কাঠের দীর্ঘ বাঁধ, যেখানে অসভ্য ভিড় পাতাহীন গাছের তলায় চলাফেরা করে ।

    কালো পাতলা কাপড়ে তৈরি দরদালানগুলোয়, লন্ঠন-হাতে আর ফেলে যাওয়া পথচারীদের অনুসরণ,

    নাটুকে পাখি ঝাপট মেরে নেমে আসে রাজমিস্ত্রির তৈরি নৌকাসাঁকোয় যা দুলে ওঠে নামতে-থাকা দর্শকদের ভিড়ে ঢাকা দ্বীপপূঞ্জে ।

    বাঁশি আর মদ্যপানে-ভরা গীতিকবিতামূলক দৃশ্য, ছাদের মাপের উঁচু ঢালের কোনাকুনি আধুনিক আড্ডার বৈঠকখানায় কিংবা প্রাচ্যদেশের প্রাচীন হলঘরে । 

    ঝোপঝাড়ের ঝুঁটিতে ঘেরা অ্যামপিথিয়েটারের প্রান্তে ঐন্দ্রজালিক দৃশ্যাবলী কৌশল করে -- কিংবা সরে যায় এবং গ্রিসের বোয়েটিয়ানদের জন্যে সুর বাঁধে, দীর্ঘ গাছেদের সঞ্চরণশীল ছায়ায়, খেতের কিনারায় ।

    শিলা-বিভাজনের কাছে মজার অপেরা আমাদের মঞ্চের ওপরে টুকরো হয়ে যায়  যেখানে দশটা বিভাজক পরস্পরের সঙ্গে মেলে, যা গ্যালারি থেকে আলোর পাদদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে ।

     

     

    ঐতিহাসিক সন্ধ্যা

    ইল্যুমিনেশান ৩২

    যে সন্ধ্যাই হোক, বলতে গেলে, আমাদের আর্থিক আতঙ্ক থেকে যে পর্যটক ফিরে যাচ্ছেন, নিজেকে আবিষ্কার করেন, একজন গুরুর হাত চারণভূমির বীণাকে জাগিয়ে তোলে ; পুকুরের তলায় তাস খেলা হয়, আয়না, রানি আর অনুগতদের প্রিয় ; সেখানে রয়েছেন সন্তেরা, পালতোলা জাহাজ, ঐকতানের সূত্র, এবং সূর্যাস্তের কিংবদন্তিপ্রতীম সঙ্গীতময়তা । 

    শিকারিদের আর দলবলকে দেখে ও ভয়ে কেঁপে ওঠে । নাটক ঝরে পড়ে তৃণাচ্ছাদিত ভূমির চাপড়ায় । এবং গরিব ও দুর্বলদের এই বোকামির স্তরে বড়োই অপর্যাপ্ত !

    ওর কেনা-গোলাম চোখে, জার্মানি চাঁদের দিকে মিনার তুলে উঠে যায় ; তার্তারদের মরুভূমিতে আলো জ্বলে ওঠে ; দিব্য সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে প্রাচীন বিদ্রোহ প্ররোচিত হতে থাকে ;  সিঁড়ি আর পাথরের তৈরি আরামকেদারায় একটি ছোট্ট জগতসংসার, ফ্যাকাশে আর সমতল, তৈরি করা হবে । তারপর পরিচিত সমুদ্র ও রাত্রির নৃত্যানুষ্ঠান ; সদগুণহীন রসায়ন, এবং অসম্ভব সঙ্গীত ।

    সেই একই বুর্জোয়া ইন্দ্রজাল যেখানে আমাদের ছোটো নৌকা নামিয়ে দ্যায় ! সবচেয়ে সাধারণ ডাক্তারও মনে করে যে ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে নিজেকে সমর্পণ করা আর সম্ভব নয়, এ হলো দৈহিক আত্মগ্লানির কুহেলিকা, যার নিরীক্ষণ ইতিমধ্যে এক দুর্দশা হয়ে উঠেছে ।

    না ! বাষ্পঘরের মুহূর্ত, বাষ্পীভূত সমুদ্র, ভূগর্ভস্হ অগ্নিকাণ্ড,  অনুবর্তী অগ্নিকাণ্ড, ঘুরে-বেড়ানো গ্রহ এবং তার ফলে উন্মূলন, বাইবেলে বর্ণিত যৎসামান্য ঈর্ষার নিশ্চয়তা এবং যে নিয়মশৃঙ্খলায় তা মৌলিক সাক্ষ্যপ্রদান করবে -- যাই হোক, তা কিংবদন্তির ব্যাপার নয় !

     

    বিচলন

    ইল্যুমিনেশান ৩৩

    জাঙ্গালের কিনারায় কারুকার্যময় ফিতের অবস্হানভঙ্গিমা,

    স্টিমারের পেছনদিকে খাঁড়ি,

    ঢালের দ্রুতি,

    স্রোতের বিস্তারিত দোল

    অসাধারণ আলোর মাঝ দিয়ে আকর্ষণ করে ভ্রমণকারীদের

    এবং রাসায়নিক পরিবর্তন

    উপত্যকার জলে পরিবেষ্টিত

    এবং ঝড় ।

    এরা পৃথিবীকে জয় করেছে

    অন্বেষণ করেছে তাদের ব্যক্তিগত রাসায়নিক ধনসম্পদ ;

    তাদের ভ্রমণে সঙ্গ দ্যায় আমোদপ্রমোদ আর আরাম ;

    তারা নিজেদের সঙ্গে শিক্ষা নিয়ে যায়

    জাতিদের সম্পর্কে, শ্রেনির এবং প্রাণীদের, এই জাহাজে

    বিশ্রাম করে এবং ঘুর্নি

    পাললিক আলোয়,

    অভীষ্টসন্ধানের ভয়ঙ্কর রাত্রিগুলোতে ।

    কেননা জিনিসপত্র, রক্ত, ফুলদল, আগুন, রত্নাবলীর পারস্পরিক কথোপকথন থেকে,

    ধাবমান জাহাজের বারান্দায় উদ্বিগ্ন বিচার-বিবেচনা,

    --দেখতে পাওয়া যায়, জলের গতি দিয়ে চালিত পথের ওই দিকে খাতের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে

    দানবরা, অফুরান আলোয় আলোকিত করছে -- তাদের অভিষ্টসন্ধান ;

    নিজেদের সমন্বিত পরমানন্দের লক্ষ্যে,

    এবং আবিষ্কারের বীরত্বে ।

    বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনার মধ্যে

    কমবয়সী যুগল জাহাজের কোনায় একা,

    --তা কি ক্ষমার যোগ্য আদিম লজ্জা ?-

    আর গান গাইছে ও পাহারা দিচ্ছে ।

     

    তলদেশ

    ইল্যুমিনেশান ৩৪

    আমার মহান ব্যক্তিত্বের পক্ষে বাস্তব যেহেতু কন্টকময় --- তবু আমি নিজেকে আবিষ্কার করলুম, আমার প্রেয়সীর ডেরায়, তখন বেশ বড়ো এক নীল-ধূসর পাখি ছাদের আলসের দিকে উড়ে আসছিল কিংবা সন্ধ্যার ছায়ায় আমার ডানাকে অনুসরণ করছিল ।

    বিছানার শিয়রের দিকের পায়ার কাছে, আমি তখন সামলাচ্ছিলুম, মেয়েটির আদরের মণিরত্ন  এবং তার সেরা পার্থিব শিল্পকর্ম, বেগুনি মাড়ির এক বড়ো ভাল্লুক, লোমে দুঃখমাখানো, স্ফটিকের চোখ আর কনসোল-টেবিলের ওপরে রাখা চাঁদির বাসনপত্র

    তারা সব পরিণত হলো ছায়ায় এবং অগ্নিগর্ভ অ্যাকোয়েরিয়ামে ।

    সকাল বেলায় -- জুনমাসের মারমুখো ভোর -- দৌড়ে চলে গেলুম মাঠে, যেন গাধা, যতোক্ষণ না ইতালির শহরতলির স্যাবাইন তরুণীরা এসে আমার ঘাড়ের ওপর পড়ছেন, আমার অভিযোগগুলো নিয়ে হাঁক পাড়লুম আর তড়পালুম । 

     

    এইচ

    ইল্যুমিনেশান ৩৫

    যাকিছু দানবিক তা মালিনীর বিদকুটে অঙ্গভঙ্গীর অবমাননা করে । মেয়েটির একাকীত্ব হলো যৌনতার যন্ত্র ; ওর অবসন্নতা, প্রণয়োদ্দীপক কর্মশক্তি । শৈশবের দ্বারা কড়া নজরে রাখা, মেয়েটি ছিল, বিভিন্ন কালখণ্ডে, জাতিগুলোর অত্যুৎসাহী সুস্বাস্হবাহিকা । ওর দুয়ার গরিবিয়ানার জন্য অবারিত । সেখানে, যারা বেঁচে আছে তাদের নশ্বরতা মেয়েটির কামোচ্ছ্বাসে ও ক্রিয়ায় বিমূর্ত হয়ে ওঠে । 

    --ওহ, রক্তে জবজবে মেঝেতে আনাড়ি প্রেমের ভয়ঙ্কর কাঁপুনি এবং স্বচ্ছ উদযানে খুঁজে পাবে মালিনীকে ।

     

    প্রার্থনা

    ইল্যুমিনেশান ৩৬

    আমার সহোদরা ভোরিংঘেমের লুইজি ভানেনকে: -- উত্তর সমুদ্রের দিকে ফেরানো তার নীল খোঁপা। -- জাহাজডুবির কারণে । 

    আমার সহোদরা লেওনি অবোয় দ্য’অ্যাশবিকে । ওটস দিয়ে তৈরি মদ ! -- গুঞ্জরিত, জঘন্য, গ্রীষ্মের ঘাস । -- মায়েদের এবং বাচ্চাদের অসুখের খাতিরে ।

    লুলুকে -- রাক্ষসী -- যে ‘লেস অ্যামিস’ যুগের বাগ্মীতার প্রতি তার আকর্ষণ এখনও বজায় রেখেছে আর তার অসম্পূর্ণ শিক্ষার উদ্দেশে । পুরুষদের জন্য । --মাদাম অমুককে।

    যে বয়ঃসন্ধি আমার ছিল তার উদ্দেশে । এই বুড়ো সন্তকে, সন্ন্যাস কিংবা ধর্মপ্রচার । গরিবের প্রতিভাকে । এবং উচ্চপদস্হ যাজকদের । 

    প্রতিটি ধর্মবিশ্বাসকে, ধর্মবিশ্বাসের স্মৃতিস্হানকে এবং সেই সমস্ত ঘটনা যার কাছে লোকে আত্মসমর্পণ করে, সেই মুহূর্তের আকাঙ্খা অনুযায়ী কিংবা আমাদের নিজস্ব সঙ্কটপূর্ণ পঙ্কিলতার উদ্দেশে ।

    এই সন্ধ্যায়, সুমেরুর তুষারচূড়ার সিরসেটোকে, মাছের মতন মোটা, আর দশ মাসের লালচে আলোর মতন ঝলমলে -- ( মেয়েটির হৃদয় পীতাভ তৈলস্ফটিক এবং স্ফুলিঙ্গসম ) -- আমার একমাত্র প্রার্থনা রাতের এলাকার মতন নিঃশব্দ এবং এই মরুঅঞ্চলের বিশৃঙ্খল  সন্ত্রাসের চেয়েও দুঃসাহসী ।

    যে কোনো মূল্যে এবং প্রতিটি পোশাকে, এমনকি আধ্যাত্মিক যাত্রাতেও । কিন্তু তারপর আর নয়।

     

    গণতন্ত্র

    ইল্যুমিনেশান ৩৭

    ‘পতাকা এগোয় অপরিচ্ছন্ন ভূদৃশ্যের মাঝে, আর আমাদের দেশোয়ালি বুলি ড্রামের আওয়াজকে মৃদু করে দ্যায় । দেশের মধ্যাংশে আমরা সবচেয়ে নিন্দিত বেশ্যালয়কে লালন করবো । যুক্তিপূর্ণ বিদ্রোহগুলোকে নির্বিবাদে নিকেশ করবো ।

    মশলাদার এবং মদে বেহুঁশ দেশগুলোর উদ্দেশে ! -- সবচেয়ে দানবিক শোষণ, শিল্পোৎপাদনকারী বা মিলিটারি সেবার উদ্দেশে । এখান থেকে বিদায়, জানা নেই কোথায় । স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে আমরা গড়ে তুলব হিংস্র দর্শন : বিজ্ঞান সম্পর্কে অবিদিত, আমাদের আরামের জন্যে ছলনাময় : গলায় দড়ি দিক জগতসংসার । সেটাই আসল প্রগতি । ফরোয়ার্ড -- মার্চ !’

     

    পরী

    ইল্যুমিনেশান ৩৮

    নাক্ষত্রিক নৈঃশব্দে, হেলেনের জন্যে কুমারী ছায়ায় এবং অকম্পমান ঔজ্বল্যে সঞ্চারিত হচ্ছে প্রাণশক্তি । গ্রীষ্মের তাপ বোবা পাখিদের সোপর্দ করা হয়েছিল এবং অপরিহার্য আলস্য, একটা শোকাতুর দামের অতীত মৃত ভালোবাসা আর ডুবন্ত সুগন্ধের উপসাগরে এক বজরাকে উদ্দেশ্য করে। 

    কাঠুরিয়াদের স্ত্রীদের  চলনছন্দের পর, ধ্বংস হওয়া জঙ্গলের নীচের জলস্রোতের কলধ্বনিতে, এবং প্রতিধ্বনিত উপত্যকায় গোরুর গলার ঘণ্টার আওয়াজে, আর নিষ্পাদপ প্রান্তরের কান্নায়।                

    হেলেনের শৈশবের কারণে কেঁপে উঠতো ঝোপঝাড় আর ছায়ারা, গরিবের বুক, আর স্বর্গীয় কিংবদন্তি।

    আর ওর চোখদুটি এবং নৃত্য,  দামি রশ্মির চেয়েও উন্নত, শীতের প্রভাব, আর মুহূর্তটির একক দৃশ্যের আনন্দ ।

     

    যুদ্ধ

    ইল্যুমিনেশান ৩৯

    বাল্যকালে, আমার দর্শনানুপাতকে পরিশুদ্ধ করে দিয়েছিল বিশেষ আকাশ : যাবতীয় চরিত্রেরা আমার অবয়বে ছায়া ফেলেছিল । প্রপঞ্চরা সরে যেতো । এখন, মুহূর্তদের শাশ্বত সংক্রমণ

    এবং গণিতের অশেষ আমাকে এই জগতসংসারের মাঝ দিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে যায় যেখানে আমি প্রতিটি নাগরিক সন্মানে আত্মসমর্পণ করি, অপরিচিত বাচ্চাদের দ্বারা এবং পরিব্যপ্ত অনুভূতির দ্বারা । আমি যুদ্ধের স্বপ্ন দেখি, যা সঠিক তার কিংবা শক্তিমত্তার, অভাবিত যুক্তি ছাড়াই। গানের একটা কলির মতন এটা অত্যন্ত সরল ।

     

    দৈত্য

    ইল্যুমিনেশান ৪০

    ও হলো অনুরাগ এবং বর্তমান কেননা ও ফেনায়িত জলরাশির  এবং গ্রীষ্মের শব্দাবলীর সামনে বাড়িটা গড়ে তুলেছে, ও যে কিনা খাদ্য আর পানীয়কে বিশুদ্ধ করেছে, ও যে কিনা অপসৃয়মান জায়গাগুলোর আকর্ষণ এবং সাময়িক নিবৃত্তির অতিমানবিক আনন্দ। ও হলো ভবিষ্যতের অনুরাগ, যে ক্ষমতা ও ভালোবাসায় আমরা, ক্রোধ ও ক্লান্তিকে ধরে রাখি, দেখি আমাদের পাশ কাটিয়ে পতাকাগুলোর মহোল্লাসের ভেতর দিয়ে ঝোড়ো আকাশের পানে চলে যাচ্ছে।

    ও হলো ভালোবাসা, নিখুঁত এবং পুনরাবিষ্কৃত পরিমাপ, দারুণ এবং অপ্রত্যাশিত ফলাফলে,  এবং অসীম-অনন্ত : মারাত্মক ক্ষমতার প্রিয়তম যন্ত্র । আমাদের নিজেদের এবং ওর আত্মসমর্পণের ত্রাস সম্পর্কে আমরা জানি : হে আমাদের স্বাস্হ্যের আনন্দ, আমাদের মৌলিক মানসিক শক্তির প্রেরণা, ওর জন্যে স্বার্থপর অনুরাগ ও আবেগ, ও যে কিনা ওর অনন্তকালীন জীবনে আমাদের ভালোবাসে… । এবং আমরা ওকে ডাকি আর ও সঙ্গ দেয় আমাদের...। এবং যদি আদর ফুরিয়ে যায়, তা অনুরণিত হয়, ওর প্রতিজ্ঞা প্রতিধ্বনিত হয় : ‘এই সমস্ত কুসংস্কার দূর হোক, এই পুরোনো দেহগুলো, এই বাড়িঘর এবং এই সমস্ত কালখণ্ড । আসলে এই নবযুগ  অন্ধকার !’

    ও যাবে না ; ও আবার কোনো স্বর্গ থেকে নেমে আসবে না, ও নারীর ক্রোধ ও পুরুষের হর্ষকে, এবং যাবতীয় পাপের মুক্তি খুঁজে পাবে না : কেননা তা ফুরিয়ে গেছে, ওর অস্তিত্ব আছে, আর ওকে লোকে ভালোবাসে ।

    হে ওর শ্বাসপ্রশ্বাস, ওর মস্তক, ওর ছুটে চলা : আঙ্গিক ও কর্মশীলতার পূর্ণতাপ্রাপ্তির অসম্ভব দ্রুতি!

    হে মননশক্তির এবং বিশ্বলোকের বিশালতার বহুপ্রসূতা !

    ওর দেহ ! স্বপ্নে দেখা উত্তরণ, নব্য-সন্ত্রাসের মুখোমুখি চুরমার ঐশ্বরিক করুণা !

    ওকে নাগাল পাওয়া, ওর নাগাল পাওয়া ! ও পাশ দিয়ে চলে গেলে পুরোনো হাঁটুগাড়া আর ব্যথা উধাও হয় ।

    ওর আলো ! যাবতীয় নাকিসুর এবং অসহ্য কষ্ট গভীর সঙ্গীতে বিলুপ্ত হয় ।

    ওর পদক্ষেপ ! প্রাচীন আক্রমণের তুলনায় প্রচরণশীলতা আরও অস্বাভাবিক ।

    হে ও আর আমরা ! অন্যের পরিত্যক্ত সেবার চেয়ে গর্ববোধ বেশি দয়ালু ।

    হে জগতসংসার ! এবং নতুন দুর্ভাগ্যের সুস্পষ্ট গান !

     

    ও আমাদের সবাইকে জেনেছে এবং ভালোবেসেছে । আজকের এই শীতের রাতে হয়তো আমরা জানতে পারবো, অন্তরীপ থেকে অন্তরীপে, বিক্ষুব্ধ মেরু থেকে জমিদারের পল্লীভবন পর্যন্ত, ভিড় থেকে বালিয়াড়ি পর্যন্ত, চাউনি থেকে চাউনি পর্যন্ত, শক্তি ও অনুভব ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কেমন করে ওকে অভিবাদন জানানো হবে আর দেখা হবে, এবং আবার পাঠিয়ে দেয়া হবে ওর যাত্রায়, আর জোয়ারের তলায় ও তুষারের মরুভূমির ওপরে, ওর দৃষ্টিপ্রতিভাকে অনুসরণ করে, ওর নিঃশ্বাস, ওর দেহ, ওর আলো ।

     

    যৌবন

    ইল্যুমিনেশান ৪১

    রবিবার

    সমস্যা তো আছেই, আকাশ থেকে অবধারিত পতন আর স্মৃতির আগমন এবং একত্রিত ছন্দ বাসাকে দখল করে নেয়, মাথাকে আর জগতসংসারের মনকে ।

    --বনানী আর খেত পেরিয়ে একটা ঘোড়া শহরতলির ঘাসে দৌড়োতে আরম্ভ করে, প্লেগের অঙ্গারে ঝাঁঝরা । কোনো নাটকে একজন দুস্হ মহিলা, জগতসংসারের কোথাও, পরিত্যক্ত হবার অসম্ভাব্যতায় দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে । বেপরোয়া লোকেরা ঝড়ের , মাতলামির  আর আঘাতের জন্যে অপেক্ষা করে আছে । নদীর ধারে ছোট্ট বাচ্চারা অভিশাপের কন্ঠরোধ করে ।

    এবার আমাদের সমীক্ষা আবার শুরু করা যাক যা জনগণের মাঝে জেগে-ওঠা ক্লান্তিকর কাজের দ্বারা জড়ো করা হয়েছে ।

    সনেট

    স্বাভাবিক গড়নের পুরুষ, বাগানে ঝুলন্ত ফলের মাংসে তৈরি নয়, ওহ শৈশবের দিনগুলো ! দেহ হলো হেলাফেলায় নষ্ট করার ধনসম্পদ ; ওহ, প্রেমে, মননের দোষ না শক্তি ? রাজপুত্র এবং শিল্পীতে পৃথিবীর ঢালু অংশ ছিল উর্বর, এবং বংশধররা ও জাতি আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেছে অপরাধ ও শোকে : জগতসংসার, তোমার ভাগ্য ও তোমার বিপদ । কিন্তু এখন, সেই খাটুনির পুরস্কার, তুমি, তোমার হিসেবনিকেশ, তুমি, তোমার ধৈর্যহীনতা, তোমার নাচের ও কন্ঠস্বরের চেয়ে বেশি কিছু নয়, স্হিরীকৃত নয়, বলপ্রয়োগ করেও নয়, যদিও আবিষ্কার ও যুক্তির দ্বিগুণ সাফল্যের ফলাফলের দ্বারা, নিজেকে জাহির না করে এবং ভাতৃত্ববোধের মানবিকতায়, চিত্রহীন ভূমণ্ডলে -- শক্তিমত্তা ও অধিকার প্রতিফলিত করে সেই নৃত্য ও কন্ঠস্বরকে, যা কেবল এখনই প্রশংসিত...

    কুড়ি বছর

    নির্দেশক কন্ঠস্বর নির্বাসিত...দৈহিক অকপটতা তিক্তভাবে বাসি...ধীর লয়ের সঙ্গীত । আহ, বয়ঃসন্ধির অশেষ অহংকার, সাগ্রহ আশাবাদ : সেই গ্রীষ্মে, কতো ফুলে ভরা ছিল জগতসংসার ! বাতাস ও আদল শুকিয়ে যাচ্ছে...নপুংসকতা ও অনুপস্হিতিকে প্রশান্ত করার জন্যে গির্জার ঐকতান গায়কমণ্ডলী । কাচের ঐকতানমণ্ডলী রাতের সুর...সত্যিই স্নায়ুরা সত্বর শিকারে বেরোবে।

    তুমি এখনও অ্যান্টনির প্রলোভনে আকর্ষিত । ছেঁটে-ফেলা উৎসাহের সঙ, তুচ্ছ গর্ববোধের আক্ষেপ, দুর্বল হয়ে চলেছো, এবং সন্ত্রস্ত । কিন্তু তুমি নিজেকে কাজে লাগাবে : তোমার উচ্চাসনের চারিধারে যাবতীয় ঐকতানময় ও স্হাপত্যের সম্ভাবনা ঘুরে বেড়াবে । অদেখা নিখুঁত প্রাণীরা তোমার নিরীক্ষায় আত্মসমর্পণ করবে । তোমার চারিপাশে জড়ো হবে প্রাচীন জনগণের স্বপ্নালু কৌতূহল এবং অলস বৈভব । তোমার স্মৃতি এবং তোমার ইন্দ্রিয়েরা তোমার সৃষ্টির আবেগের খোরাক হয়ে উঠবে । আর যদি জগতসংসারের কথা বলো, তুমি উঠে দাঁড়াবে, তাতে কীই বা হবে ? কিচ্ছু নয়, যতোই যাই হোক, বর্তমানে যা আঁচ করা যাচ্ছে ।

     

    বিক্রয়

    ইল্যুমিনেশান ৪২

    বন্ধকী কারবারিরা যা বিক্রি করেনি তা বিক্রয়ের জন্যে, আভিজাত্য ও অপরাধ যে অভিজ্ঞতা আস্বাদন করেনি, যা প্রেমের কাছে এবং জনসাধারণের নারকীয় সততার কাছে অজানা; তাকে সমসময় ও বিজ্ঞানের স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই :

    কন্ঠস্বরগুলোর পুনর্গঠন হয়েছে ; তাবৎ ঐকতানীয় ও সুরসংযোজিত কর্মচাঞ্চল্য এবং তাদের তাৎক্ষণিক প্রয়োগ ; উপলক্ষ, একক, আমাদের ইন্দ্রিয়কে মুক্ত করার জন্য !

    দামের চেয়ে বেশি দরে দেহ বিক্রির জন্যে, অপরিচিত জাতির, জগতের, যৌনতার, কিংবা অধঃপতনের জন্য !

    প্রতি পদক্ষেপে ধনদৌলতের উৎসার ! হীরের অবাধ বিক্রি !

    জনগণকে বিক্রির জন্য নৈরাজ্য ; রসপণ্ডিতদের জন্য অদম্য আনন্দ ; প্রেমিক-প্রেমিকার জন্যে, অনুগতদের জন্যে নৃশংস মৃত্যু !

    বিক্রির জন্য রয়েছে বসত এবং স্হানান্তর, খেলধুলা, নিখুঁত পুলক ও আরাম, এবং শব্দাবলী, প্রণোদন ও যে ভবিষ্যৎ তারা গড়ে তুলবে !

    বিক্রির জন্যে রয়েছে শোনা যায়নি এমন গণনা ও ঐকতান-ধাবনের প্রয়োগ

    আকস্মিকতা আবিষ্কার করে অভাবিত স্হিতিকাল, তার তাৎক্ষণিক মালিকানাসহ।

    অদৃশ্য সমারোহ, অননুভবনীয় পরমানন্দের প্রতি আরণ্যক ও অশেষ আবেগ, সঙ্গে তাদের প্রতিটি পঙ্কিলতার জন্যে এবং ভিড়ের ভয়াবহ চালচলনের জন্যে পাগলকরা গোপনীয়তা।

    বিক্রির জন্য রয়েছে দেহ, কন্ঠস্বর, প্রচুর প্রশ্নাতীত ধনদৌলত, সবকিছুই যা কখনই বিক্রির জন্যে নয় । বিক্রেতারা এখনও পর্যন্ত তাদের মাল শেষ করতে পারেনি ! বহুদিন পর্যন্ত দোকানদাররা তাদের বেতন দাবি করতে পারবে না !

    [ রচনাকাল ১৮৭৩ - ১৮৭৫ ]

    [ অনুবাদ : ২০১৯ ]

    জঁ আর্তুর র‌্যাঁবো : ইল্যুমিনেশানস

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    বানভাসির পর

    ইল্যুমিনেশান ১

    বানভাসির ধারনা শেষ হবার পরই, একটা খোরগোশ গোরুর গোয়ালে আর দুলতেথাকা ফুলগাছের কাছে থমকে দাঁড়িয়ে, মাকড়সার জালের ভেতর দিয়ে রামধনুকে প্রার্থনা শোনালো।

    ওহ ! যে দামি পাথরগুলো লুকিয়ে রেখেছিল, -- ফুলগুলো নিজেদের চারিধারে তাকিয়ে দেখছিল। নোংরা রাজপথে দোকান বসেছিল, তারা নৌকোগুলোকে টেনে নিয়ে গেল পরতে-পরতে ফুলে ওঠা সমুদ্রের ঢেউয়ে ঠিক যেমন পুরোনো ছবিগুলোতে দেখা যায় ।

    যে নীলদাড়ি লোকটা নিজের বউগুলোকে একের পর এক মেরে ফেলতো, তার বাড়িতে রক্ত বইতে লাগল --- সারকাসের কসাইখানায়  ঈশ্বরের প্রতিজ্ঞা শাদা করে তুলছিল জানালাগুলোকে। রক্ত আর দুধ বইছিল ।

    ভোঁদোড়েরা গড়েছিল । শুঁড়িখানায় কফির পেয়ালায় উঠছিল ধোঁয়া ।

    চারাগাছের বিশাল কাচঘরে জলফোঁটা ঝরছিল তখনও, সুন্দর ছবিগুলোর দিকে চেয়েছিল শোকাতুর শিশুরা ।

    দরোজার পাল্লার আওয়াজ, আর, গ্রামের সবুজে, এক খোকা দুই হাত নাড়ালো, বেগবান ঝর্ণার তলায়, সব জায়গাকার ঘণ্টাঘরের হাওয়ামোরগ আর আবহাওয়া নির্দেশকগুলো তা টের পাচ্ছিল।

    ম্যাডাম অমুক আল্পস পাহাড়ে একটা পিয়ানো বসালেন । গির্জার একশো হাজার বেদির ওপরে উদযাপন করা হচ্ছিল খ্রিস্টের নৈশভোজনোৎসব-পর্ব আর প্রথম ধর্মসংস্কার ।

    চলে গেল মরুযাত্রীদল । আর বরফ ও মেরুরাত্রির বিশৃঙ্খলায় তৈরি করা হলো  দীপ্তিশীল হোটেল। 

    তারপর থেকে, সুগন্ধগুল্মের মরুভূমিতে শেয়ালের ডাক শুনতে পেল চাঁদ -- আর ফলবাগানে কাঠের জুতো পরে চারণকবিতাদের অসন্তুষ্ট বিড়বিড়ানি । তারপর, থইথই বেগনি জঙ্গলে, বনানীর উপদেবী আমাকে বললো যে এটা বসন্তঋতু ।

    ঝিলপুকুর, ফুলে ওঠো : ফেনায়িত হও, সাঁকোর ওপর আর গাছের তলা দিয়ে গড়িয়ে চলে যাও: -- কালো ঝালর আর অবয়ব -- বজ্র ও বিদ্যুৎ উঠে দাঁড়াও আর ঝাঁপাও : -- জল এবং দুঃখ ওঠো আর আরেকবার বানভাসিকে তুলে আনো ।

    জল নেমে গিয়েছিল বলে -- ওহ, দামি পাথরগুলো নিজেরা চাপা পড়ে গিয়েছিল আর ফুটে ওঠা ফুলের দল ! -- তা বড়োই ক্লান্তিকর ! আর সেই ডাকিনী রানি, যিনি পৃথিবীর মাটি দিয়ে তৈরি পাত্রে আগুন জ্বালান, কখনও বলবেন না তিনি যা জানেন, আর আমরা কোন ব্যাপারে অবিদিত। 

    শৈশব

    ইল্যুমিনেশান ২

    পূর্বপুরুষহীন কিংবা দরবারহীন প্রতিমা, কালোচোখ আর হলুদ-চুল, কিংবদন্তির চেয়েও সম্ভ্রান্ত, মেক্সিকোর কিংবা ফ্লানডার্সের : তার দেশ দুর্বিনীত সোনালি আর সবুজ, ঢেউয়ের নামে আঁকা সমুদ্রতীরকে পাক দেয়, জলপোতহীন, যাদের নাম ভয়ানকভাবে গ্রিক, স্লাভ, কেল্টভাষী।

    জঙ্গলের শেষে -- স্বপ্নেদেখা রুনুঝুনু ফুল : ফুটে ওঠে, ছড়িয়ে পড়ে -- কমলারঙা ঠোঁটের মেয়েটি, পশুচারণভূমি থেকে ছলকানো বানভাসির পরিষ্কার জলে হাঁটুমুড়ে, নগ্নতা ছায়ায় ঢাকা, তির্যক রামধনুর পোশাক পরানো ; ফুলের দল এবং সমুদ্র । 

    সমুদ্রের ধারে ছাদের ওপরে যে নারীরা পায়চারি করেন : অনেকে খুকি আর বিশালদেহ, তামাটে শ্যাওলায় অসাধারণ কৃষ্ণাঙ্গী, তরুবীথিকার উর্বর মাটিতে সাজানো মণিরত্ন এবং ছোটোখাটো গলাতুষার বাগান -- তরুণী মায়েরা আর বড়োদিদিরা যাদের মুখময় তীর্থযাত্রার প্রলেপ, প্রজাপীড়ক সাজপোশাকে নবাবজাদীরা, রাজকন্যারা, ছোটোছোটো বিদেশী মেয়েরা আর সুশীল অসুখী জনসাধারণ ।

    বড়োই একঘে্য়ে, ‘প্রিয়তম শরীর’ এবং ‘মহার্ঘ হৃদয়’ !

    এ তো সে, গোলাপঝাড়ের পেছনে, মৃত খুকিটা । -- কম বয়সী মা, মারা গেছে, সিঁড়ি দিয়ে নামে। -- খুড়তুতো ভাইয়ের গাড়ি বালির ওপরে খোনাস্বর আওয়াজ তোলে । -- ছোট্ট ভাই ( সে ভারতবর্ষে থাকে ! ) সেখানে, সূর্যাস্তের সামনে, কারনেশান ফুলের বাগানে দাঁড়িয়ে । দেয়ালের ফুলে ছেয়ে থাকা বাঁধের ওপরে বুড়োদের সোজা করে কবর দেয়া হয়েছে ।

    সেনাপতির বাড়ির চারিপাশ ঘিরে আছে সোনালি পাতার ঝাড় । ওরা সবাই দক্ষিণে । -- তুমি লালরঙা পথ ধরে ফাঁকা সরাইখানায় পৌঁছে যাও । জমিদারের গ্রামের বাড়ি বিক্রি হবে : খড়খড়িগুলো ঢিলেঢালা । -- পাদরিসাহেব চাবি নিয়ে গির্জায় চলে গিয়ে থাকবেন । -- পার্কের কাছাকাছি পাহারাদারদের কুটিরগুলো ভাড়া দেয়া হয়নি । বেড়াগুলো এতো উঁচু যে তুমি গাছের মাথার ঘষটানি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না ।

    চারণভূমিগুলো  উঠে গেছে মুরগিবর্জিত গ্রামগুলোর দিকে, কামারের নেহাইও নেই । জলকপাট ওপরে তোলা । হে বনজঙ্গলের ক্রুশকাঠ আর হাওয়াকল, দ্বীপপূঞ্জ আর ধোঁয়া-চিমনির সারি ।

    ম্যাজিক ফুলেদের গূঞ্জন । ঢালু জায়গা ওকে কোল দিয়েছিল । চারিদিকে ঘুরছিল রূপকথার বাহারঅলা প্রাণী । শাশ্বত উষ্ণ চোখের জলে তৈরি মেঘেরা জড়ো হচ্ছিল ফাঁকা সমুদ্রের ওপরে।

    বনের ভেতরে একটা পাখি রয়েছে, তার গান তোমাকে থামিয়ে দেয় আর  আরক্তিম করে তোলে।

    একটা দেয়ালঘড়ি রয়েছে যা কখনও বাজে না ।

    একটা গর্তে রয়েছে শাদা প্রাণীর বাসা ।

    একটা গির্জা রয়েছে যা নামছে, আর একটা ঝিল যা ওপরে উঠছে ।

    বেড়ার ঝাড়ের আড়ালে রাখা রয়েছে রাঙা ফিতেয় সাজানো ছোট্ট ঘোড়ারগাড়ি, কিংবা গলি ধরে দৌড়োচ্ছে, 

    বনের আড়াল থেকে রাস্তায় দেখা যাচ্ছে পোশাকপরা ছোটো অভিনেতাদের দল । 

    শেষ পর্যন্ত, কেউ তো রয়েছে, যখন তুমি ক্ষুধার্ত আর তৃষ্ণার্ত, যে তোমাকে তাড়িয়ে দিলো।

    ছাদের ওপরে প্রার্থনারত আমিই সেই সন্ত --- যখন শান্তিময় জানোয়ারেরা প্যালেসটাইনের সমুদ্র পর্যন্ত চরে ঘাস খেতে গেছে ।

    অন্ধকার আরামকেদারায় আমিই সেই পণ্ডিত । গ্রন্হাগারের জানালায় গাছের ডালপালা আর বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়ছে ।

    বেঁটে গাছের বনের ভেতর দিয়ে যে পথ দেখা যাচ্ছে, আমিই তার পর্যটক : আমার পদধ্বনিকে নিঃশব্দ করে দিচ্ছে খোলা জলকপাটের গর্জন । আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখতে থাকি সূর্যাস্তের দুঃখি সোনালি প্রক্ষালন ।

    আমি হয়তো সেই বালক যে সমুদ্রে ভেসে-যাওয়া জেটির ওপরে রয়ে গেছে, চাষিবাড়ির ছোটো ছেলে যে গলি ধরে হেঁটে যাচ্ছে তার চুলের ঝুঁটি আকাশ ছুঁয়েছে ।

    পথগুলো অসমতল । ছোটো ঢিবিগুলো ঝাঁকড়াগাছে ঢাকা । হাওয়া নিশ্চল । পাখিগুলো আর ঝর্ণা আর কতো দূরে ! সামনে সেটাই হয়তো পৃথিবীর শেষপ্রান্ত ।

    মাটির অনেক গভীরে --  রেখায় নকশাকাটা, চুনকামকরা, শেষের দিকের এই স্মৃতিস্তম্ভ  ওরা আমায় ভাড়া দিক ।

    টেবিলে হেলে পড়ি, লন্ঠনের আলো ঝলমল করে তুলেছে যে পত্রিকাগুলো সেইগুলো আমি বোকার মতন দ্বিতীয়বার পড়ি, অথচ বইগুলোতে আর আগ্রহ নেই ।

    মাটির তলায় আমার বাসার ওপরে অনেক দূরে বাড়িঘরের ভিতপোঁতা, কুহেলিকা জড়ো হয়। মাটির রঙ লাল কিংবা কালো । দানবিক শহর, শেষহীন রাত !

    তলায় রয়েছে নর্দমা । পাশটা কেবল কাচের পাত্রের মতন পুরু । হয়তো স্হলবেষ্টিত আশমানি উপসাগর , আগুনের কুয়ো,  উপসাগর । হয়তো এই স্তরে চাঁদ আর ধুমকেতু, সমুদ্র আর কিংবদন্তির সাক্ষাৎ ঘটে ।

    তিক্ত মানসিকতার সময়ে আমি ধাতুর, নীলকান্তমণির গোলকের কল্পনা করি । আমি নৈঃশব্দের প্রভূ । ধনুকের মতন ছাদের কোনায় কেনই বা কাচফোকরের মতন দেখতে জায়গাটার আলো ফিকে হয়ে আসবে ?

    গল্প

    ইল্যুমিনেশান ৩

    মামুলি বদান্যতায় নিজেকে একবার দিয়ে ফেলা দক্ষতা সম্পর্কে একজন রাজপুত্র অত্যন্ত কূপিত ছিল । ভবিষ্যতে প্রেমের যে বিস্ময়কর বিপ্লব ঘটবে তা ও দেখতে পাচ্ছিল, আর সন্দেহ করছিল যে ওর স্ত্রীদের রয়েছে বিলাসদ্রব্য আর আকাশের দেয়া সন্তোষ-উৎপাদন বাড়িয়ে তোলার চেয়েও বেশি চাহিদা । ও সত্য ঘটনা জানতে চাইছিল, আকাঙ্খা আর বাসনা চরিতার্থ করার প্রয়োজন জানতে চাইছিল । তা স্বধর্ম থেকে বিপথগমন হোক বা নাহোক ও জানতে চাইছিল। ওর অন্তত ছিল যথেষ্ট জাগতিক ক্ষমতা ।

    প্রতিটি নারী যে ওকে জানতো, খুন হয়ে যেতো গুপ্তঘাতকদের হাতে । সৌন্দর্যের বাগানে কি যে ব্যাপক ধ্বংস ! খাঁড়ার তলায় তারা ওকে আশীর্বাদ করেছিল । ও আর নতুন করে কাউকে চায়নি । --সেই নারীরা আবার দেখা দিলো ।

    যারা ওকে অনুসরণ করেছিল তাদের, শিকারের পর কিংবা মদে মাতাল হয়ে, সবাইকে ও হত্যা করল । -- সবাই ওকে অনুসরণ করা বজায় রাখল ।

    বিরল প্রাণীদের গলা কেটে নিজেকে ও আনন্দ দিতো । প্রাসাদগুলোয় ও আগুন ধরিয়ে দিলো। জনসাধারণের ওপর দিয়ে গিয়ে তাদের কুটিকুটি করে ফেললো । -- জনসাধারণ, সোনালি ছাদ, সুন্দর প্রাণীরা তবু বেঁচে রইলো ।

    কেউ কি ধ্বংসে খুঁজে পায় চরমানন্দ, নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে নিজেকে আবার তরুণ করে তুলতে পারে ? জনসাধারণ টুঁ শব্দও করেনি । কেউ ওর দৃষ্টিভঙ্গীকে সমর্থন করতে এগিয়ে যায়নি। এক সন্ধ্যায় ও গর্বে  ঘোড়ায় বসে তাকে ছোটাচ্ছিল । এক ডাকিনী দেখা দিলো, অনির্বচনীয়া এমনকি লজ্জাময়ী সুন্দরী । রাজপুত্রের মুখ আর ইশারায় দেখা গেল বহুবার জটিল প্রেম করার পুর্বলক্ষণ, বলার অযোগ্য এমনকি অসহিষ্ণু আনন্দ ! রাজপুত্র আর ডাকিনী সম্ভবত অন্তরজগতের ক্ষমতার দ্বারা পরস্পরকে হত্যা করল । কেমন করেই বা তারা পরস্পরকে এইভাবে মরতে সাহায্য করলো?  লোকে যেমন বলে থাকে, ওরা মারা গেছে।

    তবু রাজপুত্র নিজের প্রাসাদে বুড়ো হয়ে মারা গেল । রাজপুত্রই আসলে ডাকিনী ছিল । ডাকিনী ছিল রাজপুত্র ।

    সূক্ষ্ম সঙ্গীত আমাদের চাহিদার তুলনায় কম  ।

    প্যারেড

    ইল্যুমিনেশান ৪

    ভাঁড়গুলো বেশ পালোয়ান । অনেকে তোমার শব্দগুলোকে শোষণ করেছে । প্রয়োজনহীন,  তোমার  বিবেক সম্পর্কে ওদের বুদ্ধিবৃত্তির ক্ষমতা নিয়ে খেলা করার কোনো তাড়াহুড়ো নেই ।

    কতো পাকতাড়ুয়া ওরা ! গ্রীষ্মরাতের মতন চোখদুটো হতবুদ্ধিময়, লাল আর কালো, তিনরঙা, ইস্পাতে সোনালি নক্ষত্র দেগে দেয়া ; আকৃতি বিকলাঙ্গ, সীসায় ভারি, ফ্যাকাশে, আগুনলাগা ; খসখসে গলার তড়িংবিড়িং নাচিয়েরা ! ফিকে হয়ে যাওয়া কারুকাজের নিষ্ঠুর দম্ভচলন ! --কেউ কেউ কমবয়সী--চেরুবিনোকে ওরা কোন দৃষ্টিতে দ্যাখে ? -- বিপজ্জনক সঙ্গতি আর আতঙ্ক-জাগানো কন্ঠস্বরের মালিক ওরা । শহরের রাস্তায় ওদের পাঠিয়ে দেয়া হয় খদ্দের ধরার জন্যে,  বিরক্তিকর অলঙ্কারে সাজিয়ে 

    ওহ পাগলামির ভেংচিকাটা নৃশংস পারিজাত ! তোমার ফকির আর নাটুকে ভাঁড়ামো থেকে দূরে। 

    বিনা প্রস্তুতিতে তৈরি দুঃস্বপ্নে পাওয়া পোশাক পরে ওরা ডাকাতদের উপদেবতাদের  রোমান্টিক, বিয়োগান্তক, আধ্যাত্মিক  ধর্মকাহিনির নাটক করে যে ঘটনাগুলো আদপে কখনও ঘটেনি । চীনা, হটেনটট, ভবঘুরে, মূর্খ, হায়েনা, রক্তখেকো দেবতা, পুরোনো পাগলামি, ভয়ংকর রাক্ষস, জনপ্রিয় গৃহস্হ প্রবণতাকে পাশবিক ভঙ্গী আর আদরের সঙ্গে মিশিয়ে ফ্যালে । ওরা নতুন স্বরলিপি আর মিষ্টি গানের জন্যে অপেক্ষা করছে । ওস্তাদ ভোজবাজিকর, ওরা জনগণকে আর জায়গাকে বদলে ফেলে চৌম্বক মঞ্চপদ্ধতি দেখায় । ফুলে-ওঠা চোখে, রক্ত গান গায়, হাড় পুরু হয়ে ওঠে, চোখের জল আর গালের রুজ গড়িয়ে পড়ে । ওদের গরাদ আর সন্ত্রাস মুহূর্তের জন্যে বা কয়েক মাস বজায় থাকে ।

    এই বর্বর প্যারেডের চাবিকাঠি আছে শুধু আমার হেফাজতে ।

    সেকেলে

    ইল্যুমিনেশান ৫

    গ্রিক অধিদেবতা প্যান-এর করুণাময় ছেলে ! ধনুকের মতন তোমার ভ্রুযুগল ফুলের তোড়ায় ঢাকা আর চোখ যেন বৈঁচিফল, মহার্ঘ শ্রবণসঙ্গীত, এগিয়ে চলো । মদের বাদামি  তলানির রঙে রাঙানো ; তোমার গালগুলো ভেতরে ঢোকা । তোমার চোখ-দাঁত ফ্যাকাশে । তোমার বুক এক বাদ্যযন্ত্র, তোমার ফ্যাকাশে হাতে তারগুলো বেজে ওঠে । তোমার পেটের ভেতরে স্পন্দন হয় যেখানে একজোড়া যৌনতা ঘুমোয় । রাতের বেলা, হেঁটে যাও, উরুকে সামান্য তুলে, তারপর অন্য উরু আর ওই বাঁ পা ।

    শোভাময় হয়ে ওঠা

    ইল্যুমিনেশান ৬

    তুষারপাতের উল্টোদিকে, এক ঢ্যাঙা সৌন্দর্যের প্রতিমা । এই আদর-পাওয়া দেহকে মৃত্যুর বাঁশি আর ঘিরেফেলা মৃদু সঙ্গীত ফাঁপিয়ে তোলে, এমনভাবে ফুলে ওঠে আর কাঁপে যেন ভুত : অসাধারণ মাংস থেকে  রক্তবর্ণ আর কালো ঘা ফেটে বেরোয় । জীবনের জন্য যুৎসই রঙগুলো গভীর হয়ে ওঠে, নাচতে থাকে আর গড়ে উঠতে-থাকা এই দৃষ্টিপ্রতিভা থেকে নিজেদের আলাদা করে ফ্যালে । কাঁপুনি তোলে আর আর্তনাদ করে যন্ত্রণায় আর এদের মদমত্ত সুগন্ধের প্রভাব ভরে দেয় সেই জাগতিক আর ভাসন্ত সঙ্গীতকে যা জগতসংসার, অনেক পেছনে, আমাদের সৌন্দর্যমাতার দিকে ছুঁড়ে মারে -- সে নিজেকে গুটিয়ে নেয়, দুই পায়ে উঁচু হয়ে দাঁড়ায় । ওহ, আমাদের হাড়ে পরানো হয়েছে এক নতুন প্রণয়োদ্দীপক দেহ ! ওহ, ফ্যাকাশে মুখশ্রী ; ঘোড়ার চুলে-সাজানো ঢাল, কেলাসিত বাহু ! গাছের জঙ্গল আর ওজনহীন বাতাসের ভেতর দিয়ে আমাকে কামান দাগতে হবে !

    জীবনসমূহ

    ইল্যুমিনেশান ৭

    ওহ পবিত্রভূমির বিশাল অ্যাভেনিউগুলো, মন্দিরের চূড়াগুলো ! সেই ব্রাহ্মণের কী হলো যিনি আমাকে প্রবাদগুলো ব্যাখ্যা করেছিলেন ? আমি সেই বুড়িকে এখনও দেখতে পাই, একই সময়ে আর জায়গায় ! নদীদের রূপালি সময় আর আলোকমালা আমার এখনও মনে আছে, কাঁধের ওপরে আমার সঙ্গীর হাত, পরস্পরের আদর মনে আছে যখন আমরা দুজনে মশলার গন্ধেভরা মাঠে দাঁড়িয়েছিলুম । -- আমার চিন্তাকে ঘিরে একদল রক্তবর্ণ পায়রা বকবকম করে । -- এখানে নির্বাসিত, প্রতিটি সাহিত্যের সর্বোৎকৃষ্ট নাটক অভিনয় করার জায়গা আমার ছিল । আমি তোমাকে দেখাতে পারতুম অজানা ঐশ্বর্য । তুমি যে ধনসম্পদ খুঁজে পেয়েছিলে তার ইতিহাসকে আমি চিহ্ণিত করেছি । এবার দেখব কী ঘটতে যাচ্ছে ! বিশৃঙ্খলার মতনই আমার প্রজ্ঞাকে অবজ্ঞা করা হয় । কীই বা আমার শূন্যতা, তোমার জন্যে অপেক্ষমান নিশ্চলতার তুলনায় ?

    আমার পূর্বজদের তুলনায় আমি একজন গুণসম্পন্ন আবিষ্কারক ; এমনকি, সঙ্গীতবিশারদ, যে প্রেমের সূত্রের মতন কিছু খুঁজে পেয়েছে । বর্তমানে, মনোরম আকাশের তলায় বিটকেল এক দেশের ভদ্রমানুষ, নিজের ভিখারিসূলভ শৈশবের স্মৃতির মাধ্যমে আমি বিচলিত হবার প্রয়াস করি, আমার শিক্ষানবীশি আর কাঠের জুতো পায়ে এখানে আসা, আমার তর্কপ্রিয়তা, আমার পাঁচ কি ছয়বারের বৈধব্য, আর আমার কয়েকবারের মহামাতলামি, যখন আমার বিচক্ষণ মগজ আমার বেরাদরদের  হট্টগোলে অংশ নিতে বাধা দিয়েছিল । যেহেতু এই সন্দেহপ্রবণতা আর প্রয়োগ করা যাবে না, আর এমনিতেও আমি তরতাজা উদ্বেগে সমর্পিত -- আমি আশা করছি যে অত্যন্ত বিদ্বিষ্ট উন্মাদ হয়ে উঠবো ।

    বারো বছর বয়সে আমি যে চিলেকোঠায় বন্দী ছিলুম, আমি জগতসংসারের বিষয়ে জানতুম, আমি মানুষের হাস্যকর অবস্হা বর্ণনা করেছিলুম । মাটির তলাকার মদের ভাঁড়ারে আমি ইতিহাস শিখলুম । উত্তরের শহরের কোনো এক রাতের ভোজনোৎসবে আমি পূর্বসূরী মহান তৈলচিত্রকরদের নারীদের অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা পেয়েছিলুম । প্যারিসের এক প্রাচীন গলিতে, আমাকে ধ্রুপদী বিজ্ঞান শেখানো হয়েছিল । প্রাচ্যদেশ দিয়ে ঘেরা এক চমৎকার জায়গায় আমি সম্পূর্ণ করেছিলুম আমার প্রচুর কাজ আর কাটিয়েছিলুম আমার সুবিখ্যাত অবসরযাপনের দিনগুলো । নিজের রক্তকে করে তুলেছিলুম চঞ্চল । আমার কর্তব্য শেষ হয়েছে । সেই বিষয়ে আর ভাববারও দরকার নেই । আমি সত্যিই কবর অতিক্রম করে এসেছি, এবং কর্তব্য-বিষয়ে স্বাধীন ।

    প্রস্হান

    ইল্যুমিনেশান ৮

    যথেষ্ট দেখা হলো । সমগ্র আকাশের তলায় দৃষ্টিপ্রতিভার সঙ্গে আকস্মিক সাক্ষাৎ।

    অনেক পাওয়া হলো । শহরগুলোর আওয়াজ, সন্ধ্যাবেলা, এবং আলোয়, আর তা সদাসর্বদা।

    অনেক জানা হলো । জীবনের নির্ণয়গুলো । --হে দৃষ্টিপ্রতিভার ধ্বনিসমূচ্চয় !

    নতুন অনুরাগ এবং ধ্বনি লক্ষ্য করে সেইদিকে প্রস্হান !

    রাজকীয়

    ইল্যুমিনেশান ৯

    সুন্দর একটি দিনে, সুশীল মানুষদের মাঝে, চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন একজন মহিমান্বিত পুরুষ ও নারী : ‘বন্ধুগণ, আমি চাই ও রানি হোক !’ ‘আমি রানি হতে চাই !’ মহিলা হাসলেন আর কাঁপতে লাগলেন । পুরুষটি বন্ধুদের জানালেন রহস্যোদ্ঘাটনের কথা, কষ্টের জীবনের কথা । দুজনে পরস্পরের দেহে হেলান দিয়ে মূর্চ্ছা গেলেন ।

    সত্যিই, তারা সারা সকাল রাজা হয়ে কাটালো, বাড়িগুলোয় ঝোলানো হলো গাঢ় লাল ফেস্টুন, আর সারা দুপুরও, তারা হেঁটে চলল পামগাছের বাগানের দিকে ।

    যুক্তিযুক্ততার অভিমুখে

    ইল্যুমিনেশান ১০

    ড্রামের ওপরে তোমার একটা আঙুলের টোকায় সব আওয়াজ হারিয়ে যায় আর নতুন করে গড়ে তোলে ঐকতান ।

    তোমার একটা পদক্ষেপ উদ্দীপ্ত করে নতুন মানুষদের আর তাদের সামনে দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

    তোমার মুখ অন্য দিকে তাকায় : নতুন প্রেম ! তোমার মুখ নিজের জায়গায় ফেরে -- নতুন প্রেম!

    ‘আমাদের অদৃষ্ট পালটে দাও, মহামারী শেষ করো’, মহাসময়ের তালে তাল মিলিয়ে এই শিশুরা তোমাকে গেয়ে শোনায় । ‘যেখানেই হোক না কেন, আমাদের বৈভব এবং ইচ্ছা লালিত হোক’, ওরা দয়াভিক্ষা করে ।

    চিরকালীন থেকে তোমার আগমন, তুমি সব জায়গার জন্য প্রস্হান করবে । 

    মদোন্মত্ত সকাল

    ইল্যুমিনেশান ১১

    হে আমার শুভ ! হে আমার সুন্দরী ! আমি ভয়ে পশ্চাৎপদ হই না এমন বর্বর তূর্যনিনাদ !

    সন্মোহিত আরাম ! প্রথম বারের খাতিরে, সুন্দর দেহ আর অজানা কাজের জন্য হুররে !

    আরম্ভ হয়েছিল বাচ্চাদের হাসিতে, শেষও হবে সেইভাবে । এই বিষ আমাদের শিরায় তখনও বইবে যখন তূর্যনিনাদ ফিরে আসবে, আমাদের আরেকবার পুরোনো বিশৃঙ্খলার হাতে তুলে দেয়া হবে । ওহ, আমরা এখন অমন দৈহিক শাস্তির উপযুক্ত, আমাদের দেহ আর আত্মাকে দেয়া মানবোত্তর প্রতিশ্রুতিকে সঠিক বুঝে উঠতে হবে : এই প্রতিশ্রুতি, এই পাগলামি ! সৌষ্ঠব, বিজ্ঞান, সন্ত্রাস ! ওরা অঙ্গীকার করেছে যে শুভ এবং অশুভর বৃক্ষকে অন্ধকারে পুঁতে ফেলা হবে, স্বৈরতান্ত্রিক সদগুণগুলোকে নির্বাসন দেয়া হবে, যাতে এখানে আমরা বিশুদ্ধ প্রেম নিয়ে আসতে পারি । এটা আরম্ভ হয়েছিল বিশেষ বিরক্তি নিয়ে এবং ফুরিয়েও গেলো -- আমরা এই শাশ্বতকে তক্ষুনি দখল করতে পারিনি বলে -- তা সুগন্ধের দাঙ্গায় শেষ হয় ।

    শিশুদের হাসি, কেনা-গোলামদের বিচক্ষণতা, অক্ষতযোনি মেয়েদের আত্মসংযম, এখানকার মুখগুলো আর জিনিসপত্রের আতঙ্ক, সতর্কতার স্মৃতির দরুন তুমি পবিত্র । এটা আরম্ভ হয়েছিল 

    মূর্খতার সঙ্গে, এবার দ্যাখো, শেষ হচ্ছে আগুন আর বরফের দেবদূতদের দ্বারা । ক্ষণকালের মদ্যপ পবিত্র সতর্কতা ! যদি তুমি কেবল মুখোশের জন্য আমাদের বরাদ্দ করে থাকো । সাধনপ্রণালী, আমরা তোমাকে সমর্থন করছি ! আমরা ভুলিনি কালকে তুমি আমাদের  প্রতিটি শতককে মহিমান্বিত করেছিলে । বিষে আমাদের বিশ্বাস আছে । আমরা জানি কেমন করে প্রত্যেক দিন আমাদের সমগ্র জীবন দিয়ে দিতে হবে ।

    এই কালখণ্ড হলো গুপ্তঘাতকদের ।

    প্রবাদসমূহ

    ইল্যুমিনেশান ১২

    আমাদের চারটে অবাক চোখের জন্যে এই জগতসংসারকে যখন ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছে একটিমাত্র অন্ধকার জঙ্গলে -- দুটি অনুগত বাচ্চার জন্য একটি সমুদ্রতীরে -- আমাদের সুস্পষ্ট সমবেদনার জন্য সঙ্গীতের ঘরে -- আমি তোমাকে খুঁজে বের করবো ।

    এখানে তলায় কেবল একজনমাত্র বুড়ো লোক থাকুন, শান্ত আর সুন্দর, ‘অচেনা বিলাসে’ পরিবেষ্টিত -- আমি তোমার পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসবো ।

    আমাকে তোমার স্মৃতিগুলো বাস্তবে পরিণত করতে দাও -- আমাকে যুবতী হতে দাও, যে তোমার গলা টিপে ধরবে -- আমি তোমার দম বন্ধ করে দেবো ।

    যখন আমরা যথেষ্ট বলশালী -- কে-ই বা পশ্চাদপসরণ করবে ? যথেষ্ট মৌজমস্তিতে থাকলে -- কে-ই বা ইয়ার্কি করতে ছাড়ে না ? যখন আমরা সবচেয়ে বেশি অসূয়াপূর্ণ -- ওরা আমাদের কি-ই বা বানাতে পারে ? নিজেকে সাজিয়েগুজিয়ে তোলো, নাচো, হাসো । -- আমি কখনও ভালোবাসাকে জানালার বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারবো না ।

    ভিখারিনী মেয়েটা, দানবী খুকি, আমার কমরেড ! তুমি এই হতভাগিনী নারীদের কতোটা মনোযোগ দাও, এই প্যাঁচপয়্জার, আর আমার সমস্যা । তোমার অসম্ভব কন্ঠস্বর দিয়ে নিজেকে আমাদের সঙ্গে বেঁধে ফ্যালো, সেই কন্ঠস্বরখানা ! এই জঘন্য বিষাদের একমাত্র আশা ।

    জুলাই মাসের মেঘাচ্ছন্ন ভোর । বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে ছাইয়ের স্বাদ -- বনানীর ঘামের গন্ধ ঝরে পড়ছে উনানের কোনে -- ভিজে ফুলগুচ্ছ -- তৃণাঞ্চলের ধ্বংসাবশেষ -- খেতের খালগুলো থেকে কুয়াশা -- তাহলে কেন খেলনাপাতি আর ধুপকাঠি নয় ?

    আমি এক ঘণ্টাঘর থেকে আরেক ঘণ্টাঘর পর্যন্ত দড়ি টাঙিয়েছি ; জানালা থেকে জানালা পর্যন্ত ফুলের মালা ; নক্ষত্র থেকে নক্ষত্র পর্যন্ত সোনার শেকল ; আর আমি নাচছি ।

    ওপরের ঝিল থেকে অবিরাম বাষ্প ওঠে । সফেদ সূর্যের বিপরীতে কোন জাদুনারীরা জেগে উঠবেন? কোন বেগুনি পাতার পর্ণরাজি ঝরে পড়বে ?

    জনগণের টাকা যখন ঢেলে দেয়া হচ্ছে ভাইবেরাদরদের ভোজনোৎসবে, মেঘের ভেতরে বাজতে থাকে গোলাপরঙা আগুন ।

    চিনা কালির আকর্ষণ সুগন্ধকে গভীর করে তোলে, আমার নিশিপালনে ক্রমান্বয়ে ঝরে পড়ে কালোরঙের পাউডার । -- আমি গ্যাসের আগুন কম করে দিই, বিছানায় নিজেকে ছুঁড়ে ফেলি, আর ছায়াগুলোর দিকে ফিরে, দেখতে পাই তোমাদের, আমার কন্যারা, আমার রানিরা !

    শ্রমিকেরা

    ইল্যুমিনেশান ১৩

    ওহ ফেবরুয়ারি মাসের সেই উষ্ণ সকাল ! আমাদের বিদকুটে অন্নবস্ত্রহীন স্মৃতি, আমাদের যৌবনের দারিদ্রদশা থেকে অসময়ের দখিনা বাতাস এসে জাগিয়ে তুললো ।

    বাদামি আর শাদা চাককাটা সুতির স্কার্ট পরেছিল হেনরিয়েকা, গত শতকের ফ্যাশান, সন্দেহ নেই ; ফিতে বাঁধা শিরাবরণ, রেশমের স্কার্ফ । শোকসন্তাপের চেয়েও তা দুঃখজনক । আমরা শহরতলিতে ঘুরে  বেড়াচ্ছিলুম । আবহাওয়া ছিল মেঘলা, আর ওই দখিনা বাতাস চঞ্চল করে তুলছিল বিধ্বস্ত বাগান আর শুকনো তৃণভূমি থেকে উড়ে আসা দুর্গন্ধকে । 

    এটা আমাকে যতোটা বিরক্ত করেছে ততোটা আমার স্ত্রীকে করতো না । ওপরের দিকের রাস্তায় গতমাসের বানভাসি তৈরি করে গেছে জলের  চাদর, ও আমাকে দেখালো তাতে কয়েকটা ছোট্ট মাছ ।

    শহরটা, কারখানাগুলোর আওয়াজ আর ধোঁয়াসুদ্ধ, রাস্তা ধরে আমাদের পিছু নিয়েছিল । ওহ, অন্য জগতসংসার, আকাশ আর ছায়ায় আশীর্বাদপ্রাপ্ত বসতি ! দখিনা বাতাস আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল দুর্দশাময় শৈশবের ঘটনাগুলো, আমার গ্রীষ্মের বিষাদ, ভাগ্য আমার থেকে সদাসর্বদা যে ভয়ংকর বিপুল শক্তিমত্তা ও জ্ঞান  দূরে সরিয়ে রেখেছে । না ! আমরা এই কৃপণ দেশে  গ্রীষ্ম কাটাবো না যেখানে আমরা বাগদত্ত অনাথ ছাড়া আর কিছুই হতে পারবো না। আমি  এই শক্ত হাত দিয়ে প্রিয় দৃশ্যগুলোকে টেনে নিয়ে যেতে দেবো না ।

    সেতুগুলো

    ইল্যুমিনেশান ১৪

    স্ফটিকের ধূসর আকাশ । সাঁকোগুলোর অদ্ভুত নকশা, কখনও সোজা, কখনও বেঁকা, আবার কোনোটা কোনাকুনি বেঁকে গিয়ে আগেরটার সঙ্গে যোগ দিয়েছে, আর এই নকশাগুলো খালের আলোজ্বলা বাঁকগুলোয় আবার তেমন করেই পুনরাবৃত্তি করেছে, কিন্তু এতো দীর্ঘ আর হালকা যে নদীর তীর, গুম্বজের গুরুভারে, ডুবে গিয়ে ছোটো হয়ে আসে । এই সাঁকোগুলোর কয়েকটা এখনও চাদরে ঢাকা । অন্যগুলোয় রয়েছে মাস্তুল, সঙ্কেত, অপলকা নিচু পাঁচিল । পাতলা তারে মোড়া, আর মিলিয়ে গেছে ; তীর থেকে দড়িদড়া উঠে আসে । তুমি একটা লাল কোট দেখে চিনতে পারো, হয়তো অন্যান্য কোটও এবং সঙ্গীতযন্ত্র । এই জনপ্রিয় রেশগুলো কি, বিখ্যাত কনসার্টের টুকরো, জনগণের জাতীয়-সঙ্গীতের অবশিষ্টাংশ ? জলের রঙ ধূসর এবং নীল, সমুদ্রের বাহুর মতন চওড়া ।

    একটা শাদা রশ্মি, অনেক ওপরে থেকে এসে, হাসির নাটককে লোপাট করে দ্যায় ।


     

    শহর

    ইল্যুমিনেশান ১৫

    এক মহানগর যাকে এই জন্যে আধুনিক মনে করা হয় যে বাড়িগুলোর বাইরের দিক সাজানোয় আর নগরের পরিকল্পনায় প্রয়োগ করার জন্য পরিচিত উপলব্ধিগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে ; তারই  আমি এক ক্ষণজীবী আর তেমন বিচ্ছিন্ন নাগরিক নই । এখানে তুমি কুসংস্কারের একটিও স্মৃতিস্তম্ভের হদিশ পাবে না । সংক্ষেপে, নৈতিকতা আর ভাষাকে সরলতম প্রকাশে নামিয়ে আনা হয়েছে ! লক্ষাধিক এই লোকজন যারা পরস্পরকে জানার প্রয়োজন অনুভব করে না, নিজেদের শিক্ষাদীক্ষা, কর্মকাণ্ড, বার্ধক্যে এতো মিল যে  তাদের আয়ু  মহাদেশের গোলমেলে সংখ্যাতত্ব যা বলেছে তার চেয়েও বেশ  কম । তাই, আমার জানালা দিয়ে, দেখতে পাই নতুন প্রেতরা শাশ্বত ঘন ধোঁয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে --- আমাদের বনানীঘেরা ছায়া, আমাদের গ্রীষ্মের রাত ! -- প্রতিহিংসর নতুন গ্রিক দেবতারা, আমার কুটিরের সামনে, যা আমার স্বদেশ, আমার সমগ্র হৃদয়, কেননা এখানে সবকিছুরই পরস্পরের সঙ্গে মিল আছে -- ক্রন্দনহীন মৃত্যু, আমাদের সক্রিয় কন্যা আর চাকরানি, রাস্তার কাদায় বেপরোয়া ভালোবাসা আর ফালতু অপরাধ ফুঁপিয়ে বেড়াচ্ছে ।  

    গাড়ির চাকার দাগ

    ইল্যুমিনেশান ১৬

    ডানদিকে বাগানের এই কোনে গ্রীষ্মের ভোর পাতাদের আর কুয়াশাকে এবং শব্দগুলোর ঘুম ভাঙায়, আর বাঁদিকের ঢালে স্যাঁতসেতে রাস্তায় বেগুনি ছায়ায় অগুন্তি দ্রুতগামী চাকার দাগ ধরে রাখে । ঐন্দ্রজালিক মিছিল । ওয়াগন, সত্যিই, ঝকমকে কাঠের তৈরি জানোয়ার তাতে, খুঁটি আর রঙবেরঙ চাঁদোয়া, কুড়িটা চিত্রবিচিত্র সার্কাস ঘোড়ার পাশ দিয়ে ছুটে চলে গেল, আর পুরুষেরা আর বাচ্চারা তাদের অদ্ভুত জানোয়ারের পিঠে -- কুড়িটা গাড়ি, ঢেউখেলানো, ঢাকাখোলা আর ফুলে সাজানো প্রাচীন ঘোড়ারগাড়ির মতন কিংবা যেমন পরীর গল্পে থাকে, শহরতলির যাত্রাভিনয় দেখতে যাবার পোশাক-পরা বাচ্চায় ঠাশা : -- এমনকি কফিনও, তাদের রাতের আচ্ছাদনের তলায়, জাঁকালো আবলুস পালকে, নীল-কালো মাদিঘোড়ার দৌড়কে পেছনে ফেলে এগিয়ে চললো ।

    নগরেরা

    ইল্যুমিনেশান ১৭

    শহরসমূহই বটে ! এই সেই লোকগুলো যাদের জন্যে স্বপ্নেদেখা উত্তর-আমেরিকার আলেঘানি পাহাড় এবং লেবানন মঞ্চায়িত হয়েছিল ! স্ফটিক আর কাঠের তৈরি রাখাল-কুটির যা অদৃশ্য রেললাইন আর কপিকলে চলে । গ্রিক সূর্যদেবের মূর্তি দিয়ে ঘেরা মরা আগ্নেয়গিরির হাঁমুখ, আর তামার তৈরি পামগাছেরা আগুনশিখায় সুরেলা ধ্বনি তুলছে । রাখাল কুটিরের পেছনে খালের ধারে ভালোবাসার পানোৎসব প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল । গিরিসঙ্কটের ভেতরে শিকারের রুনুঝুনু বাজে । দৈত্যবৎ গায়কদের সমাবেশ ঘটে মধ্যযুগের ফরাসি রাজার সোনালি ঝিলমিলে পোশাকের মতন শীর্ষদেশের আলোয় । 

    ঘুর্নিজলের ভেতরে পাটাতনের ওপরে, রাজা শার্লামেইনের বীরপুরুষেরা তাদের শৌর্যের ভেরীধ্বনি করে । অতলর ওপরের সাঁকোগুলোয়, আর সরাইখানার ছাদে, আকাশের তাপ মাস্তুলগুলোকে পতাকা দিয়ে ঢেকে ফ্যালে ।  দেবতাপ্রতিম ভঙ্গুর মূর্তিগুলো চারণভূমি দখল করে ফ্যালে যেখানে দেবদূততুল্য নারীসিংহীরা হিমানী-সম্প্রপাতে প্রবেশ করে । সর্বোচ্চ চূড়াগুলোর সারির ওপরদিকে, রয়েছে ভিনাসের শাশ্বত জন্মের ঝড়ঝাপটায় আক্রান্ত এক সমুদ্র, অরফিউসের ক্ষণস্হায়ী সঙ্গীতে উদ্বুদ্ধ আর দামি মুক্তো এবং শঙ্খধ্বনিতে মথিত -- সেই সমুদ্র জাগতিক বজ্রবিদ্যুৎকে অনেক সময়ে অন্ধকার করে তোলে । ঢালু জায়গায়, ফুলের ফসল, আমাদের তরোয়াল আর পেয়ালার মতন, নিচের দিকে । পিঙ্গলরঙা মোটা কাপড়ে স্বপ্নদায়িনী পরীরানিদের মিছিল । তাদের পা ঝর্ণায় আর বনগোলাপের ঝাড়ে, ওইখানে উঁচুতে মৃগয়ার অধিষ্ঠাত্রীদেবীর দুধ খাচ্ছে এক হরিণ । শহরতলির মাতালনারীরা ফোঁপাচ্ছে, আর চাঁদ জ্বলে যাচ্ছে আর শেয়ালেরা হুক্কাহুয়া করছে । ভিনাস সন্ন্যাসী আর স্যাকরাদের সঙ্গে প্রবেশ করছে গুহার মধ্যে । সারিসারি ঘণ্টাঘর গেয়ে উঠছে জনগণের অভিপ্রায় । হাড়ের তৈরি দুর্গ থেকে ভেসে আসছে অজানা সঙ্গীত । যাবতীয় কিংবদন্তির প্রকাশ ঘটছে আর শহরগুলোর ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে হরিণের দল । থেমে গেছে ঝড়ের পুণ্যালোক । রাতের পানোৎসবে অবিরাম নাচছে বর্বরেরা । এবং, একবার, আমি বাগদাদের রাস্তার গোলমালে নেমে পড়লুম, যেখানে ভিড়ের লোকেরা তরতাজা শ্রমের আনন্দ-গান গাইবার জন্য জড়ো হয়েছিল, নিস্তেজ হাওয়ায়, পাহাড়ের বিখ্যাত মায়াপুরুষদের এড়াবার জন্যে বিনা ক্ষমতায় পাক খাচ্ছিল । আমার তন্দ্রাভাব আর যৎসামান্য হেলডোল যে এলাকা থেকে আসে তা ফিরে পেতে কোন ধরণের অস্ত্র, কোন ধরণের মনোরম সময় প্রয়োজন ?

    ভবঘুরের দল

    ইল্যুমিনেশান ১৮

    সমব্যথী ভাই ! ওর কাছে আমার কোনও নৃশংস নিশিপালন আছে ! ‘আমি এই ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপ্রচেষ্টাকে দখল করে নিতে বিফল হয়েছিলুম । আমি ওর অকর্মণ্যতা নিয়ে ঠাট্টা করেছিলুম । যদি আমাদের নির্বাসনে যেতে হয়, কেনা-গোলমী করতে হয়, তা হবে আমার দোষ।’ অদ্ভুত দুর্ভাগ্য আর বোকামির জন্য ও আমার প্রশংসা করেছিল, আর তার সঙ্গে জুড়েছিল অশান্তিকর কারণ ।

    এই শয়তান পণ্ডিতকে আমি বিদ্রুপ করে উত্তর দিয়েছি, আর জানালার কাছে গিয়ে তা শেষ করেছি । বিরল সঙ্গীতরেখার চালচলনের অপর পারের চারণভূমিতে আমি ভবিষ্যতের রাতের বিলাসের মায়াপুরুষ গড়েছি ।

    এই অস্পষ্ট স্বাস্হবিধিসন্মত চিত্তবিক্ষেপের পর, আমি খড়ের মাদুরের ওপরে হাতপা ছড়িয়ে শুয়ে পড়তুম । এবং, বলতে গেলে প্রতি রাতে, যেই আমি ঘুমিয়ে পড়তুম, বেচারা ভাইটি উঠে পড়তো, মুখে দুর্গন্ধ, চোখে দেখতে পাচ্ছে না -- যেমন ও নিজের সম্পর্কে স্বপ্ন দেখতো -- আর নিজের নির্বোধ কান্নার স্বপ্নে বিভোর আমাকে ঘরের ভেতরে টানাটানি করতো !

    বাস্তবিক, সত্যি বলতে কি, আমি ওকে ওর সূর্যসন্তানের প্রাগৈতিহাসিক স্হতিতে ফিরিয়ে আনার প্রতিজ্ঞা করেছিলুম -- আর আমরা ঘুরে বেড়ালুম, গুহার মদে ভরণপোষণ করে, আর পথের বিসকিট খেয়ে, আমি পরিসর আর ফরমুলা খুঁজে পাবার জন্যে অধৈর্য ।

    নগরসকল

    ইল্যুমিনেশান ১৯

    আধুনিক বর্বরতার অপরিমিত ধারণাকে ছাপিয়ে যায় সরকারি নগরায়ন । পরিবর্তনাতীত ধূসর আকাশ যে অনুজ্বল আলো ছড়াচ্ছে তা বর্ণনা করা অসম্ভব ; স্হাপত্যের রাজসিক রোশনাই, আর মাটিতে অনন্তকালীন তুষার । ধ্রুপদী স্হাপত্যের বিস্ময়কর কাজগুলোকে, একান্ত আতঙ্কজনক রুচিতে, ওরা আবার গড়েছে । হ্যাম্পটক কোর্টের চেয়ে কুড়িগুণ বড়ো মিউজিয়ামে  তৈলচিত্রের প্রদর্শনী দেখি । মন্ত্রালয়ের সিঁড়িগুলোর নকশা তৈরি করেছিল নরওয়ের এক নেবুচাদনেজ্জার ; যে অধস্তন অধিকারীদের দেখেছিলুম তারা, যেমন হয় আরকি, ব্রাহ্মণদের থেকেও গর্বিত, আর বিশাল মূর্তিগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং এলাকার তত্ববধায়কদের দেখে আমি ভয়ে কেঁপে উঠছিলুম । চৌরাস্তার বাড়িগুলোর ঘেঁষাঘেঁষি, তাদের ছাদ, আর পাঁচিলঘেরা বারান্দা, তাদের ঘণ্টাঘরগুলো থেকে কোনঠাশা করে দিয়েছে । বিস্ময়কর  শিল্পচর্চায় পার্কগুলোয় উপস্হাপন করা হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক প্রকৃতি । ভালো জায়গাগুলোয় রয়েছে অনির্বচনীয় চৌহদ্দি : সমুদ্রের শাখা, নৌকাবর্জিত, তার নীল রঙের ঘষাকাচকে ছড়িয়ে দেয় মোমের তৈরি বিশাল গাছে গুরুভার জাহাজঘাটার মাঝবরাবর । একটা ছোটো সাঁকো চলে গেছে সন্ত চ্যাপেলের গোলাকার গম্বুজের ঠিক নিচের সিংদরোজা পর্যন্ত ।  গম্বুজটা পনেরোহাজার ফিটের ইস্পাতের কলাকৃতি দিয়ে গড়া ।

    তামার তৈরি সাঁকো, মাচান, সিঁড়ি যা আচ্ছাদিত বাজারকে পাক খেয়ে উঠেছে, কয়েকটা দৃষ্টিভঙ্গীতে, আমি ভাবলুম হয়তো শহরের ব্যাপ্তি বিচার করে দেখব ! তা ছিল মস্তোবড়ো ব্যাপার যার সম্পর্কে নির্ণয় নিতে পারলুম না : নগরদুর্গের ওপরদিকে আর নিচে যে এলাকাগুলো রয়েছে তাদের স্তর কেমনতর ? আমাদের দিনকালে পর্যটকদের পক্ষে দেখে বেড়ানোটা অসম্ভব । ব্যবসার চৌহদ্দি, সেকেলে গ্যালারিসহ, একই রকমের শৈলীর সার্কাস । কোনও দোকান চোখে পড়ছে না, কিন্তু পথের তুষারে মাড়িয়ে যাবার দাগ ; কয়েকজন নবাব, লণ্ডনের রবিবারের সকালে হাঁটার লোকেদের মতন বিরল, হীরের তৈরি ঘোড়ারগাড়ির দিকে এগোয়। কয়েকটা লাল মখমলের পালঙ্ক : মরুদেশের পানীয় বিতরন করা হচ্ছে, যার দাম আটশো থেকে আটহাজার টাকার মধ্যে পড়ে। সার্কাসের ভেতরে নাট্যালয় খোঁজার ধারণা সম্পর্কে আমি নিজেকে বললুম যে দোকানগুলোতে নিশ্চয়ই যথেষ্ট বিষণ্ণ নাটক অভিনীত হয় । আমার মনে হয় পুলিশও আছে ; কিন্তু আইনগুলো নিশ্চয়ই এমন অদ্ভুত যে অ্যাডভেঞ্চার করার ভাবনা আমায় এড়িয়ে যায়।

    শহরতলিগুলো, পারিসের যেকোনো সুন্দর রাস্তার মতন পরিচ্ছন্ন, সূর্যের আলোর সাদৃশ্যের আনুকূল্য পায় ; গণতান্ত্রিক উপাদানের সংখ্যা কয়েক হাজার আত্মা হবে । এখানেও, ঘোড়াগুলো সার বেঁধে নেই ; শহরতলিগুলো বিটকেলভাবে গাঁয়ের দিকে গিয়ে হারিয়ে যায়, যাকে বলে ‘প্রশাসনিক এলাকা’, যা ছড়িয়ে পড়েছে শেষহীন পশ্চিমদিকের জঙ্গল আর পাদপবাগান পর্যন্ত, যেখানে বর্বর কুলীনরা যে আলো নিজেরা তৈরি করেছে, সেখানে সংবাদ শিকার করতে বেরোয়। 

    নিশিপালন

    ইল্যুমিনেশান ২০

    এই হলো আলোয় আস্হা, বিছানার ওপরে কিংবা মাঠে, জ্বরে নয়, অবসন্নতাতেও নয়।

    ইনি বন্ধু প্রদীপ্ত নন দুর্বলও নন । তিনিই বন্ধু ।

    ইনি ভালোবাসবার ; যন্ত্রণা দেয়া হয়নি, এবং যন্ত্রণাদায়ক নন ।

    চাওয়া হয়নি বাতাস এবং জগতসংসারকে । জীবন ।

    --এটা কী, তাহলে ?

    --আর শীতল হয়ে যায় স্বপ্ন ।

    মাঝখানের স্তম্ভে আলো ফিরে আসে । ঘরের দুই প্রান্তসীমা থেকে, একরকম মঞ্চই বলা যায়, মিলবিশিষ্ট দ্রোহীদের সাক্ষাৎ ঘটে । পাহারাদারের মুখোমুখি দেয়ালে কার্নিসের মতন কোনাকুনি জায়গায় মনস্তত্বের পারম্পর্য, আবহাওয়ার চাদর এবং ভূতাত্বিক ঢেউ -- গভীরভাবে অনুভুত গাঢ় এবং দ্রুত দলাদলি, যেখানে সব ধরনের প্রাণী তাদের যাবতীয় দর্শনানুপাত নিয়ে রয়েছে।

    নিশিপালনের লন্ঠন এবং চাদর, ঢেউয়ের শব্দ তোলে, রাতের বেলায়, জাহাজের কাঠামোর পাশে, হালকে ঘিরে ।

    সমুদ্রের নিশিপালন যেন খেটে-খাওয়া অ্যামেলির স্তনযুগল ।

    কারুকার্য-শোভিত পর্দাগুলো, কিছুটা ওপরদিকে তোলা, পান্নারঙা লেসের ঝালর, যাকে লক্ষ্য করে নিশিপালনের পায়রারা উড়ে যায় ।

    কালো উনানের সামনের পাথর, সমুদ্রতীরের প্রকৃত সূর্য : আহ, ইন্দ্রজালের ঝর্ণা ; ভোরের একমাত্র দৃশ্য, ঠিক এখনই !


     

    অতীন্দ্রিয়

    ইল্যুমিনেশান ২১

    তীরের ঢালুতে দেবদূতেরা তাদের পশমের পোশাকে ইস্পাত আর পান্নার চারণভূমিতে পাক খায়।

    পাহাড়ের গোলাকার মাথার ওপরে লাফাতে থাকে আগুনশিখার মাঠ । বাঁদিকে খেতের আলগুলোকে পদদলিত করেছে পাক থেকে বেরিয়ে প্রতিটি হত্যা, প্রতিটি যুদ্ধ, প্রতিটি বিপর্যয়ের ধ্বনি। প্রান্তরেখার ওপারে ডানদিকে আরোহণরেখা, প্রগতির দিকে ।

    এবং,  যখন  শীর্ষের কার্নিস দিয়ে গড়ে উঠছে ছবির মোচড় আর লাফিয়ে ওঠা  মানবসমুদ্র আর রাত্রির শঙ্খধ্বনি ।

    নক্ষত্র এবং আকাশের ফুলেল মিষ্টতা আর বাদবাকিরা নেমে আসে বাঁধের উল্টোদিকে, যেন চুবড়ির ভেতরে -- আমাদের মুখোমুখি, এবং গড়ে তোলে অতল মঞ্জরী এবং নিচের নীল ।

    ঊষা

    ইল্যুমিনেশান ২২

    আমি গ্রীষ্মের ভোরকে গ্রহণ করে নিলুম ।

    প্রাসাদগুলোর সামনে এখনও কোনোকিছুর নড়চড় নেই । জল মারা গিয়েছিল । বনানিঘেরা পথকে ভিড়ের ছায়া এখনও ছেড়ে যায়নি । আমি হাঁটছিলুম, তপ্ত শ্বাস নিচ্চিলুম, আর দামি পাথরগুলো ওপর দিকে তাকিয়ে দেখলো, আর ডানাগুলো শব্দ না করে উড়লো । 

    প্রথম অভিযানে, শীতল ফিকে আলোয় আগে থেকেই আলোকিত রাস্তায়, একটা ফুল  আমাকে তার নাম জানালো ।

    দেবদারু গাছে ঘেরা ফর্সা আলুলায়িত ঝর্ণার দিকে তাকিয়ে হাসলুম : চাঁদির শীর্ষভূমির ওপরকার ঈশ্বরীকে চিনতে পারলুম ।

    তারপর একের পর এক অবগুন্ঠন সরালুম । গলির ভেতরে ঢুকে, হাত নাড়ালুম ।  সমতলভূমিতে গিয়ে আমি মেয়েটিকে মোরগের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্জন করলুম । শহরে ঢুকে, মেয়েটি ঘণ্টাঘর আর গম্বুজের মাঝে পালিয়ে গেল, এবং, ভিখারির মতন শ্বেতপাথরের জেটি পেরিয়ে, আমি ওকে ধাওয়া করলুম ।

    রাস্তার ওপর দিকে, জলপাই বনের কাছে, ওর  অবগুন্ঠনসুদ্ধ ঘিরে ফেললুম মেয়েটিকে, আর অনুভব করলুম ওর বিশাল শরীর বেশ ছোটো । জঙ্গলের পাদদেশে পড়ে গেল ভোর আর বালকটি ।

    ঘুম ভাঙতে, দুপুর ।

    ফুলগুলো

    ইল্যুমিনেশান ২৩

    সোনার ছাদ থেকে -- রেশমের সুতো, ধূসর পাতলা কাপড়, সবুজ মখমল এবং স্ফটিকের চাকার মাঝে যা রোদ্দুরে ব্রোঞ্জের মতন কালো হয়ে যায় -- আমি লক্ষ্য করি চাঁদির সুতোর কারুকাজ-করা জাজিমের ওপরে ফেলেরাখা শেয়ালকাঁটা, চোখ এবং চুল ।

    হলুদ সোনার টাকায় মণিরত্নের গুঁড়ো, পান্নার গম্বুজকে ধরে রেখেছে মেহগানি থাম, গোলাপজলকে ঘিরে সাদা সাটিনের টুকরো আর চুনীর মিহিন জল ছেটানো হয়েছে ।

    বড়ো নীল চোখ আর তুষার-আঙ্গিকের কোনো দেবতার মতন, শ্বেতপাথরের ছাদে সমুদ্র ও আকাশ ডেকে আনছে কচি ও তরতাজা গোলাপগুচ্ছ ।

    পার্থিব রাত্রি

    ইল্যুমিনেশান ২৪

    দেয়ালের প্রহসনমূলক ফাটল খুলে ফেলছে এক দমকা ঝড় -- ভাঙাচোরা ছাদগুলোর কড়িবরগাকে ঢেকে ফেলছে -- এলোমেলো করে দিচ্চে বাঁধের পাঁচিল -- অন্ধকার করে ফেলছে জানালাগুলো ।

    দ্রাক্ষালতার থেকে দূরত্বে, সিংহমুখ নর্দমার ওপরে আমার পা রেখে --- আমি এই জুড়িগাড়িতে চাপলুম যার সময় সুস্পষ্টভাবে উত্তল কাচে লেখা, বাইরে বেরিয়ে আসা প্যানেল, আর ঢেউখেলানো বসার জায়গা । আমার তন্দ্রার শবযান, আলাদা করে দ্যায়, আমার বোকামির মেষপালকের কুঁড়েঘর, বাতিল রাজপথের মাটিতে  আমার শকট বাঁক নেয় : এবং ঝাঁকুনির দরুণ ডানদিকের জানালায় ফিকে চাঁদনি আকারগুলো, গাছের পাতা, স্তন পাক খেতে থাকে।

    --একটা সবুজ আর একটা নীল, বেশ গভীর, দৃশ্যটাকে আক্রমণ করে । জোড়াতালি দেয়া নুড়িপথের ফলে ঘোড়ার বর্ম খুলে যায় ।  

    -- এখানে কেউ ঝড়ের জন্যে সিটি বাজায়, সোডোমের লোকজন আর জেরুজালেমের লোকজন, বন্য পশু এবং সৈন্যবাহিনী ।

    ( -- ঘোড়ারগাড়ির চালক এবং স্বপ্নের প্রাণীরা কি আবার নিয়ে যাবে শ্বাসরুদ্ধকর ঝোপঝাড়ে, রেশমি বসন্তঋতুর চোখে আমাকে ছুঁড়ে ফেলার জন্যে । )

    --এবং আমাদের,  চাবুক মেরে, লেহ্য জল আর ছড়িয়ে পড়া খরায়, কুকুরদের চিৎকারে গড়াগড়ির জন্যে পাঠানো হবে…

    --বাঁধের পাঁচিলগুলো এক নিঃশ্বাসে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ।

    সামুদ্রিক

    ইল্যুমিনেশান ২৫

    তামা ও চাঁদির রথ --

    চাঁদি ও ইস্পাতের জাহাজমুখ--

    সমুদ্রের ফেনায় লাঙল চালানো---

    কাঁটাগাছের খুঁটি ওপড়ানো ।

    উষর প্রান্তরের বিস্তার,

    আর জোয়ার-ভাটায় আঁকা রেখা,

    পূর্বদিকে ঘুরতে-ঘুরতে বয়ে চলে যায়,

    জঙ্গলের থামগুলোর দিকে,

    জেটির খুঁটিগুলোর দিকে,

    যার লোহার বাতাগুলো আলোর ঘুর্ণিঝড়ে চূর্ণ ।

    শীতকালের ভোজনোৎসব

    ইল্যুমিনেশান ২৬

    নাটুকে-মজার বস্তির পেছনদিকে আওয়াজের প্রপাত । গোলোকধাঁধার পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা অ্যাভেনিউ আর বাগানে, চক্রাকার বাজি অনেকক্ষণ জ্বলে -- সূর্যোদয়ের সবুজ আর লাল । চুল-সাম্রাজ্যের  বিনুনিতে হোরেসের কবিতার উপদেবীর দল -- গোলগাল সাইবেরিয় মহিলা, ফরাসি চিত্রকরের আঁকা ছবির মতন চিনা মেয়েরা ।

    মানসিক যন্ত্রণা

    ইল্যুমিনেশান ২৭

    এরকম কি হতে পারে যে মেয়েটি আমাকে  ক্ষমা পাইয়ে দেবে  শাশ্বতভাবে বিধ্বস্ত  উচ্চাকাঙ্খা থেকে-- বহুকালের দারিদ্র্যকে মেরামত করে  আরামদায়ক সমাপ্তি ঘটাবে -- আমাদের মারাত্মক আলস্যের লজ্জায় ঘুম পাড়িয়ে দেবে সাফল্যের দিন ?

    ( ও পামগাছ ! হীরক ! ভালোবাসা ! প্রাণশক্তি ! -- প্রতিটি আনন্দ ও গরিমার চেয়ে উচ্চতর !-- সবরকমের, সব জায়গায় -- রাক্ষস, দেবতা -- এখানে বসবাসের যৌবন ! )

    ঐন্দ্রজালিক বিজ্ঞান এবং সামাজিক ভাতৃত্বের আন্দোলনকে কি আদি স্বাধীনতার প্রগতিশীল পুনর্বাসন হিসাবে যত্নে পালন করা হবে ?...

    কিন্তু এই রক্তচোষা মেয়ে যে আমাদের শায়েস্তা করে সে হুকুম দেয় যে আমরা যেন ওর দেয়া খুদকুঁড়োয় নিজেদের মজায় রাখি, নয়তো আরও মজা চালিয়ে যাও ।

    ক্লান্ত বাতাস এবং সমুদ্রের মাঝ দিয়ে জখমের গমন ; যন্ত্রণায়, খুনি জল এবং বাতাসের নৈঃশব্দের ভেতর দিয়ে ; হাসিমুখ অত্যাচারের মাঝ দিয়ে, তাদের কোলাহলপূর্ণ স্তব্ধতার দিকে ।

    মেট্রপলিটান

    ইল্যুমিনেশান ২৮

    নীলাভ খাঁড়ি থেকে ওসিয়ানের সমুদ্র পর্যন্ত, গোলাপি ও কমলারঙের বালুকাবেলায়, মদের রঙের আকাশ যাকে ধুয়ে দিয়েছে, স্ফটিকের বীথি ওপরে উঠে গিয়ে আড়াআড়ি ভাগ করে ফেলেছে, যা তখনই দখল করে নিয়েছে গরিব কমবয়সী পরিবারেরা যারা ফলবিক্রেতাদের দোকানে কেনাকাটা করে । বৈভব নেই । -- এই নগর !

    আলকাতরার মরুভূমি থেকে, সরাসরি উড়াল দিয়ে কুয়াশার আতঙ্কজনক পরতগুলোর তলায় যে আকাশ বাঁক নেয়, পিছিয়ে যায়, নেমে যায়, তাকে গড়ে তুলেছে ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর কালো ধোঁয়া যা  শোকার্ত সমুদ্র বিলিয়েছে, হেলমেট পরে পালিয়েছে, চাকা, জাহাজ, ঘোড়ার লেজের তলায় বাঁধা চামড়া -- সেই সংগ্রাম !

    মাথা তোলো : ওই ধনুকাকৃতি কাঠের সাঁকো ; সামারিয়ার শেষ সব্জি-উঠোন, শীতল রাতের দ্বারা কাঁপানো লন্ঠনের আলোয় উজ্বল মুখোশ ; আওয়াজ-তোলা পোশাকে বোকা জলপরী, নদীর তলদেশে ; মটরখেতে জ্বলজ্বলে করোটি -- এবং অন্যান্য অলীক ছায়ামূর্তির প্রবাহ -- গ্রামগুলো। রাস্তার দুই কিনারে রেইলিঙ আর দেয়াল, ঝোপঝাড়ের প্রসারণ থামাতে পারেনি, আর নৃশংস ফুলের দল যাকে তুমি বলবে আত্মা আর সহোদরা । একঘেয়েমি জাগানো নাটক-- রাইননদীর অতিঅভিজাতদের  পরীদের গল্পের সম্পত্তি, জাপানি, প্যারাগুয়ের গুয়ারানি, ওরা প্রাচীনকালের সঙ্গীত বুঝতে পারার জন্যে এখনও যোগ্য -- সরাইখানা আছে যা আর সবসময় খোলা থাকে না-- আছে রাজকুমারীরা, আর যদি তুমি বেশি অভিভূত না হয়ে থাকো, নক্ষত্রদের অধ্যয়ন করো-- আকাশ ।

    সকালে যখন, যুবতীটির সঙ্গে, তুমি তুষারের ফুলকির মাঝে লুটোলুটি খেয়েছিলে. সবুজ ঠোঁট, বরফ, কালো পতাকা আর নীলাভ আলোর রশ্মি, আর মেরু-সূর্যের বেগুনিরঙা সুগন্ধ -- তা তোমার জীবনীশক্তি ।

    অমার্জিতের দল

    ইল্যুমিনেশান ২৯

    ঋতুদের আর দিনগুলোর অনেক পরে, লোকজন আর দেশগুলো, রক্তমাখা মাংসের পতাকা সমুদ্রের রেশম এবং সুমেরুর ফুলগুলোতে ( তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই । ) 

    বীরত্বের পুরোনো তূর্যনিনাদ কাটিয়ে ওঠার পর -- আমাদের হৃদয়ে আর মাথায় আক্রমণ অব্যহত রেখেছে -- প্রাচীন গুপ্তঘাতকদের থেকে বেশ দূরে ।

    --ওহ ! রক্তমাখা মাংসের পতাকা সমুদ্রের রেশম এবং সুমেরুর ফুলগুলোতে ( তাদের কোনো অস্তিত্ব নেই । )

    ভাবাবেশসমূহ !

    তুষারের ঝাপটায় ঝরছে আলোকচ্ছটা -- ভাবাবেশসমূহ ! -- জাগতিক হৃদয় থেকে ছোঁড়া হীরকের হাওয়ায় বৃষ্টিতে আগুন, আমাদের পোড়াবার জন্যে । -- হে জগতসংসার !--

    ( পুরোনো আশ্রয় এবং পুরোনো আগুনশিখা থেকে, যা তুমি শুনতে পাও আর অনুভব করো, )

    আলোকচ্ছটা এবং সামুদ্রিক ফেনা । সঙ্গীত, খাঁড়ির মন্থন আর নক্ষত্রে জমাটবাঁধা ঝুলন্ত তুষার।

    হে ভাবাবেশ, হে জগতসংসার, হে সঙ্গীত ! এবং এখানে, আকৃতি, ঘাম, চুল এবং দুই চোখ, ভেসে যায় । এবং শ্বেত অশ্রুজল, ফুটন্ত -- হে ভাবাবেশসমূহ ! -- এবং নারীকন্ঠস্বর পৌঁছে যাচ্ছে আগ্নেয়গিরির তলদেশে এবং সুমেরুর গুহাগুলোয় ।

    পতাকা...

    অভিক্ষিপ্ত সৈকতাংশ

    ইল্যুমিনেশান ৩০

    আমাদের গ্রামের বাড়ি আর তার বাগানের উল্টোদিকে সোনালি সকাল আর শিহরিত সন্ধ্যা খুঁজে পেল আমাদের দুই মাস্তুলঅলা পোত, সমুদ্র থেকে কিছুটা দূরে, তৈরি করে ফেলেছে শৈলান্তরীপ যা এপিরাসদেশ কিংবা গ্রিসের পেলোপনিজ, জাপানের প্রধান দ্বীপ, কিংবা আরবের মতন ছড়ানো!

    ফিরে-আসা তত্বে আলোকিত মন্দিরগুলো ; উপকূলের আধুনিক প্রতিরক্ষার অমেয় দৃশ্য ; উষ্ণমণ্ডলের ফুলদল আর গ্রিকদের আসবদেবতার নকশাকাটা বালিয়াড়ি ; কার্থেজের বড়ো খাল আর নোংরা ভেনিসের বাঁধ ; এটনা আগ্নেয়গিরির হালকা উদ্গীরণ, ফুলের আর গ্লেসিয়ারের জলের তৈরি তুষার-ফাটল ; জার্মান পপলার গাছে ঘেরা ধোপারঘাট ; জাপানি গাছের ঝাঁকড়া মাথায় ছাওয়া ঢালের ওপরে বর্ণনাতীত বাগান ; এবং স্কারবরো ও ব্রুকলিনের ‘রাজকীয়’ এবং ‘অভিজাতদের’ প্রাসাদের সামনেদিক ; আর তাদের দুই পাশে  রেললাইন , খোঁড়াজমি, হোটেলের চড়াই, ইতালি, আমেরিকা, এশিয়ার সবচেয়ে মনোরম সবচেয়ে বিশাল নির্মাণ, বর্তমানে দামি আলোকমালায় ঝিলমিলে, পানীয় এবং মৃদুমন্দ বাতাস, ভ্রমণকারী ও সম্ভ্রান্তদের দ্বারা প্রভাবান্বিত-- যারা দিনের আলোয়, অনুমতি দ্যায়, সাগরতীরের দ্রুতলয়ী নাচিয়েদের -- এমনকি শিল্পের মঙ্গলময় অলঙ্কারের সঙ্গীতকে, যাতে প্রাসাদের সৈকতাংশের সামনেদিককে অবিশ্বাস্যভাবে সাজিয়ে তোলা যায় ।

    দৃশ্যাবলী

    ইল্যুমিনেশান ৩১

    প্রাচীন মিলনানন্তক নাটক তার সমন্বয়কে অনুধাবন করে, তার রাখালিয়া কাহিনিকে বিভাজন করে : তক্তায় গড়া প্রশস্ত পথ ।

    পাথুরে জমির ওপরে একদিক থেকে আরেকদিক পর্যন্ত কাঠের দীর্ঘ বাঁধ, যেখানে অসভ্য ভিড় পাতাহীন গাছের তলায় চলাফেরা করে ।

    কালো পাতলা কাপড়ে তৈরি দরদালানগুলোয়, লন্ঠন-হাতে আর ফেলে যাওয়া পথচারীদের অনুসরণ,

    নাটুকে পাখি ঝাপট মেরে নেমে আসে রাজমিস্ত্রির তৈরি নৌকাসাঁকোয় যা দুলে ওঠে নামতে-থাকা দর্শকদের ভিড়ে ঢাকা দ্বীপপূঞ্জে ।

    বাঁশি আর মদ্যপানে-ভরা গীতিকবিতামূলক দৃশ্য, ছাদের মাপের উঁচু ঢালের কোনাকুনি আধুনিক আড্ডার বৈঠকখানায় কিংবা প্রাচ্যদেশের প্রাচীন হলঘরে । 

    ঝোপঝাড়ের ঝুঁটিতে ঘেরা অ্যামপিথিয়েটারের প্রান্তে ঐন্দ্রজালিক দৃশ্যাবলী কৌশল করে -- কিংবা সরে যায় এবং গ্রিসের বোয়েটিয়ানদের জন্যে সুর বাঁধে, দীর্ঘ গাছেদের সঞ্চরণশীল ছায়ায়, খেতের কিনারায় ।

    শিলা-বিভাজনের কাছে মজার অপেরা আমাদের মঞ্চের ওপরে টুকরো হয়ে যায়  যেখানে দশটা বিভাজক পরস্পরের সঙ্গে মেলে, যা গ্যালারি থেকে আলোর পাদদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে ।


     

    ঐতিহাসিক সন্ধ্যা

    ইল্যুমিনেশান ৩২

    যে সন্ধ্যাই হোক, বলতে গেলে, আমাদের আর্থিক আতঙ্ক থেকে যে পর্যটক ফিরে যাচ্ছেন, নিজেকে আবিষ্কার করেন, একজন গুরুর হাত চারণভূমির বীণাকে জাগিয়ে তোলে ; পুকুরের তলায় তাস খেলা হয়, আয়না, রানি আর অনুগতদের প্রিয় ; সেখানে রয়েছেন সন্তেরা, পালতোলা জাহাজ, ঐকতানের সূত্র, এবং সূর্যাস্তের কিংবদন্তিপ্রতীম সঙ্গীতময়তা । 

    শিকারিদের আর দলবলকে দেখে ও ভয়ে কেঁপে ওঠে । নাটক ঝরে পড়ে তৃণাচ্ছাদিত ভূমির চাপড়ায় । এবং গরিব ও দুর্বলদের এই বোকামির স্তরে বড়োই অপর্যাপ্ত !

    ওর কেনা-গোলাম চোখে, জার্মানি চাঁদের দিকে মিনার তুলে উঠে যায় ; তার্তারদের মরুভূমিতে আলো জ্বলে ওঠে ; দিব্য সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে প্রাচীন বিদ্রোহ প্ররোচিত হতে থাকে ;  সিঁড়ি আর পাথরের তৈরি আরামকেদারায় একটি ছোট্ট জগতসংসার, ফ্যাকাশে আর সমতল, তৈরি করা হবে । তারপর পরিচিত সমুদ্র ও রাত্রির নৃত্যানুষ্ঠান ; সদগুণহীন রসায়ন, এবং অসম্ভব সঙ্গীত ।

    সেই একই বুর্জোয়া ইন্দ্রজাল যেখানে আমাদের ছোটো নৌকা নামিয়ে দ্যায় ! সবচেয়ে সাধারণ ডাক্তারও মনে করে যে ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে নিজেকে সমর্পণ করা আর সম্ভব নয়, এ হলো দৈহিক আত্মগ্লানির কুহেলিকা, যার নিরীক্ষণ ইতিমধ্যে এক দুর্দশা হয়ে উঠেছে ।

    না ! বাষ্পঘরের মুহূর্ত, বাষ্পীভূত সমুদ্র, ভূগর্ভস্হ অগ্নিকাণ্ড,  অনুবর্তী অগ্নিকাণ্ড, ঘুরে-বেড়ানো গ্রহ এবং তার ফলে উন্মূলন, বাইবেলে বর্ণিত যৎসামান্য ঈর্ষার নিশ্চয়তা এবং যে নিয়মশৃঙ্খলায় তা মৌলিক সাক্ষ্যপ্রদান করবে -- যাই হোক, তা কিংবদন্তির ব্যাপার নয় !

    বিচলন

    ইল্যুমিনেশান ৩৩

    জাঙ্গালের কিনারায় কারুকার্যময় ফিতের অবস্হানভঙ্গিমা,

    স্টিমারের পেছনদিকে খাঁড়ি,

    ঢালের দ্রুতি,

    স্রোতের বিস্তারিত দোল

    অসাধারণ আলোর মাঝ দিয়ে আকর্ষণ করে ভ্রমণকারীদের

    এবং রাসায়নিক পরিবর্তন

    উপত্যকার জলে পরিবেষ্টিত

    এবং ঝড় ।

    এরা পৃথিবীকে জয় করেছে

    অন্বেষণ করেছে তাদের ব্যক্তিগত রাসায়নিক ধনসম্পদ ;

    তাদের ভ্রমণে সঙ্গ দ্যায় আমোদপ্রমোদ আর আরাম ;

    তারা নিজেদের সঙ্গে শিক্ষা নিয়ে যায়

    জাতিদের সম্পর্কে, শ্রেনির এবং প্রাণীদের, এই জাহাজে

    বিশ্রাম করে এবং ঘুর্নি

    পাললিক আলোয়,

    অভীষ্টসন্ধানের ভয়ঙ্কর রাত্রিগুলোতে ।

    কেননা জিনিসপত্র, রক্ত, ফুলদল, আগুন, রত্নাবলীর পারস্পরিক কথোপকথন থেকে,

    ধাবমান জাহাজের বারান্দায় উদ্বিগ্ন বিচার-বিবেচনা,

    --দেখতে পাওয়া যায়, জলের গতি দিয়ে চালিত পথের ওই দিকে খাতের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে

    দানবরা, অফুরান আলোয় আলোকিত করছে -- তাদের অভিষ্টসন্ধান ;

    নিজেদের সমন্বিত পরমানন্দের লক্ষ্যে,

    এবং আবিষ্কারের বীরত্বে ।

    বায়ুমণ্ডলের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনার মধ্যে

    কমবয়সী যুগল জাহাজের কোনায় একা,

    --তা কি ক্ষমার যোগ্য আদিম লজ্জা ?-

    আর গান গাইছে ও পাহারা দিচ্ছে ।

    তলদেশ

    ইল্যুমিনেশান ৩৪

    আমার মহান ব্যক্তিত্বের পক্ষে বাস্তব যেহেতু কন্টকময় --- তবু আমি নিজেকে আবিষ্কার করলুম, আমার প্রেয়সীর ডেরায়, তখন বেশ বড়ো এক নীল-ধূসর পাখি ছাদের আলসের দিকে উড়ে আসছিল কিংবা সন্ধ্যার ছায়ায় আমার ডানাকে অনুসরণ করছিল ।

    বিছানার শিয়রের দিকের পায়ার কাছে, আমি তখন সামলাচ্ছিলুম, মেয়েটির আদরের মণিরত্ন  এবং তার সেরা পার্থিব শিল্পকর্ম, বেগুনি মাড়ির এক বড়ো ভাল্লুক, লোমে দুঃখমাখানো, স্ফটিকের চোখ আর কনসোল-টেবিলের ওপরে রাখা চাঁদির বাসনপত্র

    তারা সব পরিণত হলো ছায়ায় এবং অগ্নিগর্ভ অ্যাকোয়েরিয়ামে ।

    সকাল বেলায় -- জুনমাসের মারমুখো ভোর -- দৌড়ে চলে গেলুম মাঠে, যেন গাধা, যতোক্ষণ না ইতালির শহরতলির স্যাবাইন তরুণীরা এসে আমার ঘাড়ের ওপর পড়ছেন, আমার অভিযোগগুলো নিয়ে হাঁক পাড়লুম আর তড়পালুম । 

    এইচ

    ইল্যুমিনেশান ৩৫

    যাকিছু দানবিক তা মালিনীর বিদকুটে অঙ্গভঙ্গীর অবমাননা করে । মেয়েটির একাকীত্ব হলো যৌনতার যন্ত্র ; ওর অবসন্নতা, প্রণয়োদ্দীপক কর্মশক্তি । শৈশবের দ্বারা কড়া নজরে রাখা, মেয়েটি ছিল, বিভিন্ন কালখণ্ডে, জাতিগুলোর অত্যুৎসাহী সুস্বাস্হবাহিকা । ওর দুয়ার গরিবিয়ানার জন্য অবারিত । সেখানে, যারা বেঁচে আছে তাদের নশ্বরতা মেয়েটির কামোচ্ছ্বাসে ও ক্রিয়ায় বিমূর্ত হয়ে ওঠে । 

    --ওহ, রক্তে জবজবে মেঝেতে আনাড়ি প্রেমের ভয়ঙ্কর কাঁপুনি এবং স্বচ্ছ উদযানে খুঁজে পাবে মালিনীকে ।

    প্রার্থনা

    ইল্যুমিনেশান ৩৬

    আমার সহোদরা ভোরিংঘেমের লুইজি ভানেনকে: -- উত্তর সমুদ্রের দিকে ফেরানো তার নীল খোঁপা। -- জাহাজডুবির কারণে । 

    আমার সহোদরা লেওনি অবোয় দ্য’অ্যাশবিকে । ওটস দিয়ে তৈরি মদ ! -- গুঞ্জরিত, জঘন্য, গ্রীষ্মের ঘাস । -- মায়েদের এবং বাচ্চাদের অসুখের খাতিরে ।

    লুলুকে -- রাক্ষসী -- যে ‘লেস অ্যামিস’ যুগের বাগ্মীতার প্রতি তার আকর্ষণ এখনও বজায় রেখেছে আর তার অসম্পূর্ণ শিক্ষার উদ্দেশে । পুরুষদের জন্য । --মাদাম অমুককে।

    যে বয়ঃসন্ধি আমার ছিল তার উদ্দেশে । এই বুড়ো সন্তকে, সন্ন্যাস কিংবা ধর্মপ্রচার । গরিবের প্রতিভাকে । এবং উচ্চপদস্হ যাজকদের । 

    প্রতিটি ধর্মবিশ্বাসকে, ধর্মবিশ্বাসের স্মৃতিস্হানকে এবং সেই সমস্ত ঘটনা যার কাছে লোকে আত্মসমর্পণ করে, সেই মুহূর্তের আকাঙ্খা অনুযায়ী কিংবা আমাদের নিজস্ব সঙ্কটপূর্ণ পঙ্কিলতার উদ্দেশে ।

    এই সন্ধ্যায়, সুমেরুর তুষারচূড়ার সিরসেটোকে, মাছের মতন মোটা, আর দশ মাসের লালচে আলোর মতন ঝলমলে -- ( মেয়েটির হৃদয় পীতাভ তৈলস্ফটিক এবং স্ফুলিঙ্গসম ) -- আমার একমাত্র প্রার্থনা রাতের এলাকার মতন নিঃশব্দ এবং এই মরুঅঞ্চলের বিশৃঙ্খল  সন্ত্রাসের চেয়েও দুঃসাহসী ।

    যে কোনো মূল্যে এবং প্রতিটি পোশাকে, এমনকি আধ্যাত্মিক যাত্রাতেও । কিন্তু তারপর আর নয়।

    গণতন্ত্র

    ইল্যুমিনেশান ৩৭

    ‘পতাকা এগোয় অপরিচ্ছন্ন ভূদৃশ্যের মাঝে, আর আমাদের দেশোয়ালি বুলি ড্রামের আওয়াজকে মৃদু করে দ্যায় । দেশের মধ্যাংশে আমরা সবচেয়ে নিন্দিত বেশ্যালয়কে লালন করবো । যুক্তিপূর্ণ বিদ্রোহগুলোকে নির্বিবাদে নিকেশ করবো ।

    মশলাদার এবং মদে বেহুঁশ দেশগুলোর উদ্দেশে ! -- সবচেয়ে দানবিক শোষণ, শিল্পোৎপাদনকারী বা মিলিটারি সেবার উদ্দেশে । এখান থেকে বিদায়, জানা নেই কোথায় । স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে আমরা গড়ে তুলব হিংস্র দর্শন : বিজ্ঞান সম্পর্কে অবিদিত, আমাদের আরামের জন্যে ছলনাময় : গলায় দড়ি দিক জগতসংসার । সেটাই আসল প্রগতি । ফরোয়ার্ড -- মার্চ !’

    পরী

    ইল্যুমিনেশান ৩৮

    নাক্ষত্রিক নৈঃশব্দে, হেলেনের জন্যে কুমারী ছায়ায় এবং অকম্পমান ঔজ্বল্যে সঞ্চারিত হচ্ছে প্রাণশক্তি । গ্রীষ্মের তাপ বোবা পাখিদের সোপর্দ করা হয়েছিল এবং অপরিহার্য আলস্য, একটা শোকাতুর দামের অতীত মৃত ভালোবাসা আর ডুবন্ত সুগন্ধের উপসাগরে এক বজরাকে উদ্দেশ্য করে। 

    কাঠুরিয়াদের স্ত্রীদের  চলনছন্দের পর, ধ্বংস হওয়া জঙ্গলের নীচের জলস্রোতের কলধ্বনিতে, এবং প্রতিধ্বনিত উপত্যকায় গোরুর গলার ঘণ্টার আওয়াজে, আর নিষ্পাদপ প্রান্তরের কান্নায়।                

    হেলেনের শৈশবের কারণে কেঁপে উঠতো ঝোপঝাড় আর ছায়ারা, গরিবের বুক, আর স্বর্গীয় কিংবদন্তি।

    আর ওর চোখদুটি এবং নৃত্য,  দামি রশ্মির চেয়েও উন্নত, শীতের প্রভাব, আর মুহূর্তটির একক দৃশ্যের আনন্দ ।

    যুদ্ধ

    ইল্যুমিনেশান ৩৯

    বাল্যকালে, আমার দর্শনানুপাতকে পরিশুদ্ধ করে দিয়েছিল বিশেষ আকাশ : যাবতীয় চরিত্রেরা আমার অবয়বে ছায়া ফেলেছিল । প্রপঞ্চরা সরে যেতো । এখন, মুহূর্তদের শাশ্বত সংক্রমণ

    এবং গণিতের অশেষ আমাকে এই জগতসংসারের মাঝ দিয়ে ছুটিয়ে নিয়ে যায় যেখানে আমি প্রতিটি নাগরিক সন্মানে আত্মসমর্পণ করি, অপরিচিত বাচ্চাদের দ্বারা এবং পরিব্যপ্ত অনুভূতির দ্বারা । আমি যুদ্ধের স্বপ্ন দেখি, যা সঠিক তার কিংবা শক্তিমত্তার, অভাবিত যুক্তি ছাড়াই। গানের একটা কলির মতন এটা অত্যন্ত সরল ।

    দৈত্য

    ইল্যুমিনেশান ৪০

    ও হলো অনুরাগ এবং বর্তমান কেননা ও ফেনায়িত জলরাশির  এবং গ্রীষ্মের শব্দাবলীর সামনে বাড়িটা গড়ে তুলেছে, ও যে কিনা খাদ্য আর পানীয়কে বিশুদ্ধ করেছে, ও যে কিনা অপসৃয়মান জায়গাগুলোর আকর্ষণ এবং সাময়িক নিবৃত্তির অতিমানবিক আনন্দ। ও হলো ভবিষ্যতের অনুরাগ, যে ক্ষমতা ও ভালোবাসায় আমরা, ক্রোধ ও ক্লান্তিকে ধরে রাখি, দেখি আমাদের পাশ কাটিয়ে পতাকাগুলোর মহোল্লাসের ভেতর দিয়ে ঝোড়ো আকাশের পানে চলে যাচ্ছে।

    ও হলো ভালোবাসা, নিখুঁত এবং পুনরাবিষ্কৃত পরিমাপ, দারুণ এবং অপ্রত্যাশিত ফলাফলে,  এবং অসীম-অনন্ত : মারাত্মক ক্ষমতার প্রিয়তম যন্ত্র । আমাদের নিজেদের এবং ওর আত্মসমর্পণের ত্রাস সম্পর্কে আমরা জানি : হে আমাদের স্বাস্হ্যের আনন্দ, আমাদের মৌলিক মানসিক শক্তির প্রেরণা, ওর জন্যে স্বার্থপর অনুরাগ ও আবেগ, ও যে কিনা ওর অনন্তকালীন জীবনে আমাদের ভালোবাসে… । এবং আমরা ওকে ডাকি আর ও সঙ্গ দেয় আমাদের...। এবং যদি আদর ফুরিয়ে যায়, তা অনুরণিত হয়, ওর প্রতিজ্ঞা প্রতিধ্বনিত হয় : ‘এই সমস্ত কুসংস্কার দূর হোক, এই পুরোনো দেহগুলো, এই বাড়িঘর এবং এই সমস্ত কালখণ্ড । আসলে এই নবযুগ  অন্ধকার !’

    ও যাবে না ; ও আবার কোনো স্বর্গ থেকে নেমে আসবে না, ও নারীর ক্রোধ ও পুরুষের হর্ষকে, এবং যাবতীয় পাপের মুক্তি খুঁজে পাবে না : কেননা তা ফুরিয়ে গেছে, ওর অস্তিত্ব আছে, আর ওকে লোকে ভালোবাসে ।

    হে ওর শ্বাসপ্রশ্বাস, ওর মস্তক, ওর ছুটে চলা : আঙ্গিক ও কর্মশীলতার পূর্ণতাপ্রাপ্তির অসম্ভব দ্রুতি!

    হে মননশক্তির এবং বিশ্বলোকের বিশালতার বহুপ্রসূতা !

    ওর দেহ ! স্বপ্নে দেখা উত্তরণ, নব্য-সন্ত্রাসের মুখোমুখি চুরমার ঐশ্বরিক করুণা !

    ওকে নাগাল পাওয়া, ওর নাগাল পাওয়া ! ও পাশ দিয়ে চলে গেলে পুরোনো হাঁটুগাড়া আর ব্যথা উধাও হয় ।

    ওর আলো ! যাবতীয় নাকিসুর এবং অসহ্য কষ্ট গভীর সঙ্গীতে বিলুপ্ত হয় ।

    ওর পদক্ষেপ ! প্রাচীন আক্রমণের তুলনায় প্রচরণশীলতা আরও অস্বাভাবিক ।

    হে ও আর আমরা ! অন্যের পরিত্যক্ত সেবার চেয়ে গর্ববোধ বেশি দয়ালু ।

    হে জগতসংসার ! এবং নতুন দুর্ভাগ্যের সুস্পষ্ট গান !

    ও আমাদের সবাইকে জেনেছে এবং ভালোবেসেছে । আজকের এই শীতের রাতে হয়তো আমরা জানতে পারবো, অন্তরীপ থেকে অন্তরীপে, বিক্ষুব্ধ মেরু থেকে জমিদারের পল্লীভবন পর্যন্ত, ভিড় থেকে বালিয়াড়ি পর্যন্ত, চাউনি থেকে চাউনি পর্যন্ত, শক্তি ও অনুভব ক্লান্ত হয়ে পড়ে, কেমন করে ওকে অভিবাদন জানানো হবে আর দেখা হবে, এবং আবার পাঠিয়ে দেয়া হবে ওর যাত্রায়, আর জোয়ারের তলায় ও তুষারের মরুভূমির ওপরে, ওর দৃষ্টিপ্রতিভাকে অনুসরণ করে, ওর নিঃশ্বাস, ওর দেহ, ওর আলো ।

    যৌবন

    ইল্যুমিনেশান ৪১

    রবিবার

    সমস্যা তো আছেই, আকাশ থেকে অবধারিত পতন আর স্মৃতির আগমন এবং একত্রিত ছন্দ বাসাকে দখল করে নেয়, মাথাকে আর জগতসংসারের মনকে ।

    --বনানী আর খেত পেরিয়ে একটা ঘোড়া শহরতলির ঘাসে দৌড়োতে আরম্ভ করে, প্লেগের অঙ্গারে ঝাঁঝরা । কোনো নাটকে একজন দুস্হ মহিলা, জগতসংসারের কোথাও, পরিত্যক্ত হবার অসম্ভাব্যতায় দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে । বেপরোয়া লোকেরা ঝড়ের , মাতলামির  আর আঘাতের জন্যে অপেক্ষা করে আছে । নদীর ধারে ছোট্ট বাচ্চারা অভিশাপের কন্ঠরোধ করে ।

    এবার আমাদের সমীক্ষা আবার শুরু করা যাক যা জনগণের মাঝে জেগে-ওঠা ক্লান্তিকর কাজের দ্বারা জড়ো করা হয়েছে ।

    সনেট

    স্বাভাবিক গড়নের পুরুষ, বাগানে ঝুলন্ত ফলের মাংসে তৈরি নয়, ওহ শৈশবের দিনগুলো ! দেহ হলো হেলাফেলায় নষ্ট করার ধনসম্পদ ; ওহ, প্রেমে, মননের দোষ না শক্তি ? রাজপুত্র এবং শিল্পীতে পৃথিবীর ঢালু অংশ ছিল উর্বর, এবং বংশধররা ও জাতি আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেছে অপরাধ ও শোকে : জগতসংসার, তোমার ভাগ্য ও তোমার বিপদ । কিন্তু এখন, সেই খাটুনির পুরস্কার, তুমি, তোমার হিসেবনিকেশ, তুমি, তোমার ধৈর্যহীনতা, তোমার নাচের ও কন্ঠস্বরের চেয়ে বেশি কিছু নয়, স্হিরীকৃত নয়, বলপ্রয়োগ করেও নয়, যদিও আবিষ্কার ও যুক্তির দ্বিগুণ সাফল্যের ফলাফলের দ্বারা, নিজেকে জাহির না করে এবং ভাতৃত্ববোধের মানবিকতায়, চিত্রহীন ভূমণ্ডলে -- শক্তিমত্তা ও অধিকার প্রতিফলিত করে সেই নৃত্য ও কন্ঠস্বরকে, যা কেবল এখনই প্রশংসিত...

    কুড়ি বছর

    নির্দেশক কন্ঠস্বর নির্বাসিত...দৈহিক অকপটতা তিক্তভাবে বাসি...ধীর লয়ের সঙ্গীত । আহ, বয়ঃসন্ধির অশেষ অহংকার, সাগ্রহ আশাবাদ : সেই গ্রীষ্মে, কতো ফুলে ভরা ছিল জগতসংসার ! বাতাস ও আদল শুকিয়ে যাচ্ছে...নপুংসকতা ও অনুপস্হিতিকে প্রশান্ত করার জন্যে গির্জার ঐকতান গায়কমণ্ডলী । কাচের ঐকতানমণ্ডলী রাতের সুর...সত্যিই স্নায়ুরা সত্বর শিকারে বেরোবে।

    তুমি এখনও অ্যান্টনির প্রলোভনে আকর্ষিত । ছেঁটে-ফেলা উৎসাহের সঙ, তুচ্ছ গর্ববোধের আক্ষেপ, দুর্বল হয়ে চলেছো, এবং সন্ত্রস্ত । কিন্তু তুমি নিজেকে কাজে লাগাবে : তোমার উচ্চাসনের চারিধারে যাবতীয় ঐকতানময় ও স্হাপত্যের সম্ভাবনা ঘুরে বেড়াবে । অদেখা নিখুঁত প্রাণীরা তোমার নিরীক্ষায় আত্মসমর্পণ করবে । তোমার চারিপাশে জড়ো হবে প্রাচীন জনগণের স্বপ্নালু কৌতূহল এবং অলস বৈভব । তোমার স্মৃতি এবং তোমার ইন্দ্রিয়েরা তোমার সৃষ্টির আবেগের খোরাক হয়ে উঠবে । আর যদি জগতসংসারের কথা বলো, তুমি উঠে দাঁড়াবে, তাতে কীই বা হবে ? কিচ্ছু নয়, যতোই যাই হোক, বর্তমানে যা আঁচ করা যাচ্ছে ।

    বিক্রয়

    ইল্যুমিনেশান ৪২

    বন্ধকী কারবারিরা যা বিক্রি করেনি তা বিক্রয়ের জন্যে, আভিজাত্য ও অপরাধ যে অভিজ্ঞতা আস্বাদন করেনি, যা প্রেমের কাছে এবং জনসাধারণের নারকীয় সততার কাছে অজানা; তাকে সমসময় ও বিজ্ঞানের স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই :

    কন্ঠস্বরগুলোর পুনর্গঠন হয়েছে ; তাবৎ ঐকতানীয় ও সুরসংযোজিত কর্মচাঞ্চল্য এবং তাদের তাৎক্ষণিক প্রয়োগ ; উপলক্ষ, একক, আমাদের ইন্দ্রিয়কে মুক্ত করার জন্য !

    দামের চেয়ে বেশি দরে দেহ বিক্রির জন্যে, অপরিচিত জাতির, জগতের, যৌনতার, কিংবা অধঃপতনের জন্য !

    প্রতি পদক্ষেপে ধনদৌলতের উৎসার ! হীরের অবাধ বিক্রি !

    জনগণকে বিক্রির জন্য নৈরাজ্য ; রসপণ্ডিতদের জন্য অদম্য আনন্দ ; প্রেমিক-প্রেমিকার জন্যে, অনুগতদের জন্যে নৃশংস মৃত্যু !

    বিক্রির জন্য রয়েছে বসত এবং স্হানান্তর, খেলধুলা, নিখুঁত পুলক ও আরাম, এবং শব্দাবলী, প্রণোদন ও যে ভবিষ্যৎ তারা গড়ে তুলবে !

    বিক্রির জন্যে রয়েছে শোনা যায়নি এমন গণনা ও ঐকতান-ধাবনের প্রয়োগ

    আকস্মিকতা আবিষ্কার করে অভাবিত স্হিতিকাল, তার তাৎক্ষণিক মালিকানাসহ।

    অদৃশ্য সমারোহ, অননুভবনীয় পরমানন্দের প্রতি আরণ্যক ও অশেষ আবেগ, সঙ্গে তাদের প্রতিটি পঙ্কিলতার জন্যে এবং ভিড়ের ভয়াবহ চালচলনের জন্যে পাগলকরা গোপনীয়তা।

    বিক্রির জন্য রয়েছে দেহ, কন্ঠস্বর, প্রচুর প্রশ্নাতীত ধনদৌলত, সবকিছুই যা কখনই বিক্রির জন্যে নয় । বিক্রেতারা এখনও পর্যন্ত তাদের মাল শেষ করতে পারেনি ! বহুদিন পর্যন্ত দোকানদাররা তাদের বেতন দাবি করতে পারবে না !

    [ রচনাকাল ১৮৭৩ - ১৮৭৫ ]

    [ অনুবাদ : ২০১৯ ]

  • ট্রাউজার-পরা মেঘ : মায়াকভস্কি | 120.60.8.227 | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৩৭732394
  • ট্রাউজার-পরা মেঘ    : ভ্লাদিমির মায়াকভস্কি   

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী                    

    প্রস্তাবনা

    তুমি ভাবলে,

    স্যাঁতসেতে এক মগজের কল্পনায়,

    এক তেলচিটে খাটে হাত-পা-ছড়ানো পেট-মোটা চাকরের মতন,--

    আমার হৃদয়ের রক্তাক্ত ছেঁড়া টুকরো নিয়ে, আমি আবার  ঠাট্টা করব ।           

    যতক্ষণ না আমি উপেক্ষিত নই, আমি হবো নিষ্ঠুর আর পীড়াদায়ক ।

    আমার চিত্তে আর দাদুসুলভ স্নেহশীলতা নেই,

    আমার আত্মায় আর ধূসর চুল নেই !

    আমার কন্ঠস্বর দিয়ে জগতকে ঝাঁকিয়ে আর কাষ্ঠহাসি হেসে,

    আমি তোমাদের পাশ দিয়ে চলে যাই, -- সৌম্যকান্তি,

    বাইশ বছর বয়সী ।

    সুশীল ভদ্রমহোদয়গণ !

    তোমরা বেহালায় তোমাদের ভালোবাসা বাজাও ।

    অমার্জিতরা তা ঢোলোকে তারস্বরে বাজায় ।

    কিন্তু তোমরা কি নিজেদের অন্তরজগতকে বাইরে আনতে পারো, আমার মতন

    আর কেবল দুটো ঠোঁট হয়ে যেতে পারো পুরোপুরি ?

    এসো আর শেখো--

    তোমরা, দেবদূত-বাহিনীর ফুলবাবু আমলার দল !

    মিহি কাপড়ের বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে এসো

    আর তোমরা, যারা তোমাদের ঠোঁট পেতে দিতে পারো

    সেই রাঁধুনীর মতন যে নিজের রান্নার বইয়ের পাতা ওলটায় ।

    যদি তোমরা চাও--                                   

    আমি কাঁচা মাংসের ওপরে চারুশিল্পের শত্রুর মতন লালসিত হবো

    কিংবা সূর্যোদয় যে উদ্রেক ঘটায় তার রঙে পালটে দেবো,

    যদি তোমরা চাও---

    আমি হতে পারি অনিন্দনীয় সুশীল,

    মানুষ নয় -- কিন্তু ট্রাউজার-পরা এক মেঘ। 

    আমি সুন্দর অঙ্কুরোদ্গমে বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করি !       

    তা সত্ত্বেও আমি তোমাদের প্রশংসা করব, ---

    পুরুষের দল, হাসপাতালের বিছানার চাদরের মতন কোঁচকানো,

    আর নারীরা, অতিব্যবহৃত প্রবাদের মতন নির্যাতিত ।   

     

    প্রথম পর্ব

    তোমরা কি ভাবছ আমি ম্যালেরিয়ায় ভুল বকছি ?

    তা ঘটেছিল ।

    ওডেসায়, তা ঘটেছিল ।

    “আমি চারটের সময় আসব,” কথা দিয়েছিল মারিয়া ।

    আটটা…

    নয়টা…

    দশটা…

    তারপর তাড়াতাড়ি,

    সন্ধ্যা,

    বিরাগ দেখানো,

    আর ডিসেম্বরসুলভ,

    জানালাগুলো ছেড়ে

    আর ঘন অন্ধকারে মিলিয়ে গেল ।

    আমার পেছন থেকে, আমি শুনতে পাই হ্রেষা আর হাসি

    ঝাড়বাতিগুলোর ।

    তোমরা আমায় চিনতে পারতে না যদি আগে থেকে পরিচিত হতে :

    পেশীতন্তুর স্তুপ

    গোঙানি,

    স্নায়বিক অস্হিরতা ।

    এরকম একজন বোকাটে কি চাইতে পারে ?

    কিন্তু একজন বোকাটে অনেক কিছু চায় ।

    কেননা নিজের জন্য তা অর্থহীন

    তা তোমরা তামায় গড়া হও

    কিংবা হৃদয় হোক শীতল ধাতুর ।

    রাতের বেলায়, তোমাদের দাবিকে জড়িয়ে নিতে চাইবে

    মেয়েলি কোনোকিছু দিয়ে,

    কোমল ।

    আর এইভাবে,

    বিশাল,

    আমি কাঠামোর ভেতরে প্রতিষ্ঠিত হই.

    আর আমার কপাল দিয়ে, গলিয়ে ফেলি জানালার কাচ ।

    এই ভালোবাসা কি অসাধারণ হবে নাকি গতানুগতিক ?

    তা কি বজায় থাকবে নাকি উপেক্ষিত হবে ?

    বিরাট কেউ এরকম দেহে আঁটবে না :

    একটু ভালোবাসা জরুরি, -- একটা শিশু, হয়তো,

    যখন মোটরগাড়ি হর্ন বাজায় আর আওয়াজ করে তখন এ ভয় পায়,

    কিন্তু ঘোড়ায়-টানা ট্র্যামের ঘণ্টি পছন্দ করে ।

    আমি মুখোমুখি হলুম

    তরঙ্গায়িত বৃষ্টির সঙ্গে,

    তবু আরেকবার,

    আচ্ছা অপেক্ষা করো

    শহুরে ফেনার বজ্রপাতের গর্জনে ভিজে গেলুম ।

    ছুরি নিয়ে পাগলের মতন বাইরে বেরিয়ে,

    রাত ওকে ধরে ফেললো

    আর ছুরি মেরে দিলো,

    কেউ দেখেনি ।

    ঠিক মধ্যরাতে

    গিলোটিন থেকে খসা মুণ্ডুর মতন পড়ে গেলো।

    জানালার কাচে রুপোর বৃষ্টিফোঁটা

    জমিয়ে তুলছিল মুখবিকৃতি

    আর চেঁচাচ্ছিল ।

    যেন নত্রে দামের পশুমুখো নর্দমাগুলো

    চেল্লানো আরম্ভ করে দিলো ।

    ধিক্কার তোমাদের !

    যা ঘটেছে তাতে কি তোমরা এখনও সন্তুষ্ট নও ?

    কান্না এবার চারিধার থেকে আমার গলা কাটবে।

    আমি শুনতে পেলুম:

    আস্তে,

    বিছানার বাইরে রোগীর মতন,

    একটা স্নায়ু লাফালো

    নীচে ।

    প্রথমে,

    পুরুষটা সরে যায়নি, প্রায় ।

    তারপর, সন্দিগ্ধ

    আর সুস্পষ্ট,

    ও লাফাতে আরম্ভ করলো।

    আর এখন, ও আর আরও দুই জন,

    এদিক-ওদিক লাফাতে লাগলো, তিড়িঙ নাচ ।

    একতলায়, পলেস্তারা তাড়াতাড়ি খসে পড়ছিল ।

    স্নায়ুরা,

    বড়োগুলো

    ছোটোগুলো,--

    নানান ! --

    পাগলের মতন টগবগাতে আরম্ভ করলো

    যতক্ষণ না, শেষে,

    ওদের পা ওদের টানতে অক্ষম হলো ।

    ঘর থেকে রাত টপটপ করে বেরিয়ে এলো আর ডুবে গেলো।

    চটচটে মাটিতে আটকে গিয়ে, চোখ তা থেকে পিছলে বের করতে পারলো না।

    হঠাৎ দরোজাগুলো দুমদাম করতে লাগলো

    যেন হোটেলের দাঁতগুলো কিড়মিড় করতে শুরু করেছে ।

    তুমি প্রবেশ করলে,

    আচমকা যেন “এই নাও !”

    সোয়েড চামড়ার মোচড়ানো দস্তানা পরে, তুমি অপেক্ষা করলে,

    আর বললে,

    “তুমি জানো,--

    আমার শিগগির বিয়ে হবে।”

    তাহলে যাও বিয়ে করো ।

    ঠিকই আছে,

    আমি সামলে নিতে পারবো ।

    দেখতেই পাচ্ছো -- আমি শান্ত, নিঃসন্দেহে !

    কোনো শবের

    নাড়ির স্পন্দনের মতন ।

    মনে আছে ?

    তুমি বলতে :

    “জ্যাক লণ্ডন,

    টাকাকড়ি, 

    ভালোবাসা আর আকুলতা,”--

    আমি কেবল একটা ব্যাপারই দেখেছি : 

    তুমি ছিলে মোনালিসা,

    যাকে চুরি করা জরুরি ছিল !

    আর কেউ তোমায় চুরি করে নিলো ।

    ভালোবাসায় আবার, আমি জুয়া খেলা আরম্ভ করব,

    আমার ভ্রুর তোরণ আগুনে উদ্ভাসিত ।

    আর কেনই বা নয় ?

    অনেক সময়ে গৃহহীন ভবঘুরেরা

    পোড়া বাড়িতেও আশ্রয় খোঁজে !

    তুমি আমাকে ঠাট্টা করছো ?

    “উন্মাদনার কেবল গুটিকয় চুনী আছে তোমার

    ভিখারির কয়েক পয়সার তুলনায়, একে ভুল প্রমাণ করা যাবে না !”

    কিন্তু মনে রেখো

    এইভাবেই পম্পেইয়ের শেষ হয়েছিল

    যখন কেউ ভিসুভিয়াসের সঙ্গে ইয়ার্কি করেছিল !

    ওহে !

    ভদ্রমহোদয়গণ !

    তোমরা অশুচি 

    নিয়ে চিন্তা করো,

    অপরাধ

    আর যুদ্ধ ।

    কিন্তু তোমরা কি দেখেছো

    ভয়ঙ্কর সন্ত্রস্ত

    আমার মুখ

    যখন

    তা

    নিখুঁত শান্তিময়তায় থাকে ?

    আর আমি অনুভব করি

    “আমি”

    আমাকে ধরে রাখার জন্য খুবই ক্ষুদ্র ।

    আমার অন্তরে কেউ কন্ঠরুদ্ধ হচ্ছে ।

    হ্যালো !

    কে কথা বলছে ?

    মা ?

    মা !

    তোমার ছেলের হয়েছে এক অত্যাশ্চর্য অসুখ !

    মা !

    ওর হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে !

    তার বোন, লিডিয়া আর ওলগাকে বোলো

    যে আর কোথাও কোনো লুকোবার জায়গা নেই ।

    প্রতিটি শব্দ,

    মজার হোক বা অভদ্র,

    যা ও নিজের জ্বলন্ত মুখ থেকে ওগরায়,

    উলঙ্গ বেশ্যার মতন ঝাঁপিয়ে পড়ে

    জ্বলন্ত বেশ্যালয় থেকে ।

    লোকেরা গন্ধ শোঁকে--

    কোনো কিছু পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে ।

    ওরা দমকলকে ডাকে ।

    ঝলমলে হেলমেট পরে 

    তারা অবহেলাভরে ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে ।

    ওহে, দমকলের লোকদের বলো :

    বুটজুতো পরে ঢোকার অনুমতি নেই !

    গনগনে হৃদয় নিয়ে একজনকে বিচক্ষণ হতে হবে ।

    আমিই তা করব !

    আমি আমার জলভরা চোখ ঢেলে দেবো চৌবাচ্চায় ।

    আমাকে কেবল আমার পাঁজরকে ঠেলতে দাও আর আমি আরম্ভ করে দেবো।

    আমি লাফিয়ে পড়বো ! তোমরা আমাকে বাধা দিতে পারবে না !

    তারা বিদ্ধস্ত ।

    তোমরা হৃদয় থেকে লাফিয়ে পড়তে পারবে না !

    ঠোঁটের ফাটল থেকে,

    এক অঙ্গার-আস্তৃত চুমু উৎসারিত হয়,

    জ্বলন্ত মুখাবয়ব থেকে পালিয়ে যায় ।

    মা !

    আমি গান গাইতে পারি না ।

    হৃদয়ের প্রার্থনাঘরে, আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছিল গায়কদের গায়ে !

    শব্দাবলী আর সংখ্যাসমূহের প্রতিমাদের

    খুলির ভেতর থেকে,

    জ্বলন্ত বাড়ি থেকে শিশুদের মতন, পালাতে থাকে ।

    এইভাবে ভয়,

    আকাশে পৌঁছে, ডাক দেয়

    আর তুলে ধরে

    লুসিতানিয়ার আগুনে-বাহু আর উদ্বেগ ।

    শত-চোখ আগুন শান্তির দিকে তাকালো

    ফ্ল্যাটবাড়ির দিকে, যেখানে লোকেরা ঘামছিল ।

    এক শেষতম চিৎকারে,

    তুমি কি গোঙাবে, অন্তত,

    শতাব্দীগুলোকে প্রতিবেদন দেবার জন্য যে আমি অগ্নিদগ্ধ ?

     

    দ্বিতীয় পর্ব

    আমার মহিমাকীর্তন করো !

    প্রসিদ্ধরা কেউ আমার সমকক্ষ নয় !

    যাকিছু এপর্যন্ত করা হয়েছে তার ওপরে 

    আমি ছাপ মেরে দিই “নস্যাৎ।”

    আপাতত, আমার পড়ার ইচ্ছে নেই।

    উপন্যাস ?

    তাতে কি !

    বইপত্র এইভাবে তৈরি হয়,

    আমি ভাবতুম :--

    একজন কবির আগমন হয়,

    আর নিজের ঠোঁট অনায়াসে খোলে।

    অনুপ্রাণিত, মূর্খটা বেমালুম গাইতে আরম্ভ করে--

    ওহ ক্ষান্তি দাও !

    দেখা গেলো :

    উৎসাহে গাইবার আগে,

    নিজেদের কড়া-পড়া পায়ে ওরা কিছুক্ষণ তাল ঠোকে,

    যখন কিনা কল্পনার ঘিলুহীন মাছেরা

    হৃদয়ের পাঁকে কাদা ছেটায় আর মাখামাখি করে ।

    আর যখন, ছন্দে হিসহিসোচ্ছে, ওরা গরম জলে সেদ্ধ করে

    যাবতীয় ভালোবাসা আর পাপিয়া-পাখিদের ক্বাথের মতন ঝোলে,

    জিভহীন পথ কেবল কিলবিল করে আর কুণ্ডলী পাকায়---

    তাতে আর্তনাদ করার বা এমনকি বলার মতো কিছুই থাকে না ।

    আমরা নিজের গর্ববশে, সারাদিন সৎমেজাজে কাজ করি

    আর ব্যাবেলের শহর-মিনারগুলোর আবার পুনরানয়ন হয় ।

    কিন্তু ঈশ্বর

    গুঁড়িয়ে 

    এই শহরগুলোকে ফাঁকা মাঠে পালটে ফ্যালেন,

    শব্দকে মন্হন করে ।

    নৈঃশব্দে, রাস্তাকে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয় দুর্দশায়।

    গ্রাসনলিকার পথে এক চিৎকার ঋজু দাঁড়িয়ে পড়ে।

    যখন মোটাসোটা ট্যাক্সি আর মোটরগাড়ি অন্তরায়ে স্হির,

    গলার ভেতরে আটকে থাকে ।

    যেন ক্ষয়রোগের কারণে,

    নিষ্পিষ্ট বুক শ্বাস নেবার জন্য খাবি খাচ্ছিল ।

    শহর, বিষাদে আক্রান্ত, তাড়াতাড়ি রাস্তা বন্ধ করে দিলো ।

    আর তখন--

    তা সত্ত্বেও !--

    রাস্তাটা চৌমাথার মোড়ে নিজের ধকল উগরে দিলো কেশে

    আর গলা থেকে বারান্দাকে ঠেলে বের করে দিলো, শেষ পর্যন্ত,

    মনে হলো যেন,

    শ্রেষ্ঠশ্রেনির দেবদূতের গায়কদলের ধুয়ায় যোগ দিয়ে,

    সাম্প্রতিককালে লুন্ঠিত, ঈশ্বর তার তাপ আমাদের দেখাবে !

    কিন্তু রাস্তাটা উবু হয়ে বসে কর্কশকন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো :

    “খেতে যেতে দাও !”

    শিল্পপতি ক্রুপ আর তার আণ্ডাবাচ্চারা ঘিরে ধরে

    শহরে চোখরাঙানো ভ্রু আঁকার জন্য,

    যখন কিনা সঙ্কীর্ণ প্রবেশপথে

    শব্দাবলীর লাশ এদিক-ওদিক ছড়ানো পড়ে থাকে,--

    দুটো বেঁচে থাকে আর মাথাচাড়া দ্যায়,--

    “শুয়োর”

    আর অন্যটা,--

    আমার মনে হয় “খাবার সুপ” ।

    আর কবির দল, ফোঁপানি আর নালিশে ভিজে সপসপে,

    রাস্তা থেকে দৌড় লাগায়, বিরক্ত আর খিটখিটে :

    “ওই দুটো শব্দ দিয়ে এখন আর ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়

    এক সুন্দরী রমণী

    কিংবা ভালোবাসা

    কিংবা শিশির-ঢাকা ফুল।”

    আর কবিদের পর,

    অন্যান্য হাজার লোকের হুড়োহুড়ি আরম্ভ হলো :

    ছাত্রছাত্রীর দল,

    বেশ্যার দল,

    বিক্রেতার দল ।

    ভদ্রমহোদয়গণ,

    থামুন !

    আপনারা তো অভাবগ্রস্ত নন ;

    তাহলে ভদ্রমহোদয়গণ কেন আপনারা ওগুলো চাইছেন !

    প্রতিটি পদক্ষেপে দালান অতিক্রম করে,

    আমরা স্বাস্হ্যবান আর অত্যুৎসাহী !

    ওদের কথা শুনবেন না, বরং ওদের পিটুনি দিন !

    ওদের,

    যারা মাঙনার বাড়তি হিসাবে সেঁটে রয়েছে

    প্রতিটি রাজন্য-বিছানায় !

    আমাদের কি নম্রভাবে ওদের জিগ্যেস করতে হবে :

    “সাহায্য করো, দয়া করে !”

    স্তবগানের জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করতে হবে

    আর বাগ্মীতার জন্য ?

    আমরা জ্বলন্ত স্তবগানের সৃষ্টিকারী

    কলমিল আর রসায়ানাগারের গুনগুনানির পাশাপাশি ।

    আমি কেন ফাউস্তের কথা ভাবতে যাবো ?

    আতশবাজির লুন্ঠনে পরীদের প্রদর্শন করে

    ও মেফিসটোফিলিসের সঙ্গে নক্ষত্রপূঞ্জের নকশাকাটা পাটাতনে পিছলে চলেছে !

    আমি জানি --

    আমার বুটজুতোয় একটা পেরেক

    গ্যেটের কল্পনার চেয়ে বেশি ভয়াবহ !

    আমি 

    সবচেয়ে সোনালী-হাঁমুখের

    প্রতিটি শব্দের সঙ্গে আমি দিচ্ছি

    দেহের এক নামদিবস,

    আর আত্মাকে এক পূনর্জন্ম,

    আমি তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি :

    জীবজগতের কণাও

    আমি এই পৃথিবীতে যা কিছু করব তার চেয়ে অনেক বেশি !

    শোনো !

    বর্তমান যুগের জরাথুষ্ট্র,

    ঘামে ভিজে,

    তোমাদের চারিপাশে দৌড়োচ্ছে আর এখানে ধর্মপ্রচার করছে ।

    আমরা, 

    বিছানার কোঁচকানো চাদরের মতন মুখ নিয়ে,

    ঝাড়লন্ঠনের মতন ঝোলা ঠোঁটে,

    আমরা,

    কুষ্ঠরোগীর জন্য নির্দিষ্ট শহরে বন্দী,

    যেখানে, জঞ্জাল আর সোনা থেকে, কুষ্ঠরোগীদের ঘা দেখা দিয়েছিল,

    আমরা ভেনিসের নীলাভ সমুদ্রের চেয়ে পবিত্র,

    রোদ্দুরের মলম-রশ্মিতে ধোয়া ।

    আমি সেই তথ্যে থুতু ফেলি

    যে হোমার আর ওভিদ সৃষ্টি করেননি

    গুটিবসন্তে ঢাকা ঝুল,

    আমাদের মতন সব মানুষদের,

    কিন্তু সেই সঙ্গে, আমি জানি যে

    সূর্য ফ্যাকাশে হয়ে যাবে

    যদি তা আমাদের আত্মার সোনালি খেতের দিকে তাকায়।

    প্রার্থনার তুলনায় পেশী আমাদের কাছে নির্বিকল্প !

    আমরা আর ভরতুকির জন্য প্রার্থনা করব না !

    আমরা--

    আমরা প্রত্যেকে--

    নিজেদের মুঠোয় ধরে রাখি

    জগতকে চালনা করার লাগাম !

    এ-থেকেই সভাস্হলগুলোয় গোলগোথার সূত্রপাত

    পেট্রোগ্রাড, মসকো, কিয়েভ, ওডেসায়,

    আর তোমাদের একজনও সেখানে ছিলে না যারা

    এইভাবে হাঁক পাড়ছিল না :

    “ওকে ক্রুসবিদ্ধ করো !

    ওকে উচিত শিক্ষা দাও !”

    কিন্তু আমার কাছে,--

    জনগণ,

    এমনকি তোমরা যারা জঘন্য ব্যবহার করেছ,--

    আমার কাছে, তোমরা প্রিয় আর আমি গভীরভাবে তোমাদের কদর করি।

    দেখোনি কি

    যে হাত তাকে পেটাচ্ছে সেই হাতকেই কুকুরটা চাটছে ?

    আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে

    আজকালকার দলবল ।

    তারা তৈরি করেছে

    আমাকে নিয়ে 

    একটা নোংরা পরিহাস ।

    কিন্তু আমি সময়ের পাহাড়কে ডিঙিয়ে দেখতে পাই,

    ওনাকে, যাঁকে কেউ দেখতে পায় না ।

    যেখানে মানুষের দৃষ্টিশক্তি পৌঁছোয় না,

    বিপ্লবের কাঁটার মুকুট পরে,

    ক্ষুধার্ত মানুষদের নেতৃত্ব দিয়ে,

    ১৯১৬ সাল ফিরে আসছে ।

    তোমাদের মধ্যে, ওনার অগ্রদূত,

    যেখানেই দুঃখকষ্ট থাকবে, আমি থাকবো কাছাকাছি ।

    আমি সেখানে নিজেকে ক্রুশবিদ্ধ করেছি,

    প্রতিটি অশ্রুফোঁটার ওপরে ।

    ক্ষমা করার মতন এখন আর কিছু নেই !

    যে আত্মারা সমবেদনার অঙ্কুরের জন্ম দেয়, আমি পুড়িয়ে দিয়েছি তার ক্ষেত ।

    তা অনেক কঠিন

    হাজার হাজার ব্যাষ্টিল আক্রমণের তুলনায় ।

    আর যখন

    তাঁর আবির্ভাব ঘোষিত হয়,

    আনন্দে আর গর্বে,

    তোমরা এগিয়ে যাবে উদ্ধারককে অভ্যর্থনা জানাতে--

    আমি টেনে নিয়ে যাবে

    বাইরে আমার আত্মাকে,

    আর পায়ে পিষবো

    যতক্ষণ না তা ছড়িয়ে পড়ছে !

    আর তোমাদের হাতে তুলে দেবো, রক্তে লাল, পতাকা হিসাবে ।

     

    তৃতীয় পর্ব

    আহ, কেমন করে আর কোথা থেকে

    ব্যাপারটা এই পরিণতিতে পৌঁছেছে যে

    উন্মাদনার নোংরা মুঠোগুলো

    আলোকময় আনন্দের বিরুদ্ধে বাতাসে তুলে ধরা হয়েছিল ?

    মেয়েটি এলো,--

    পাগলাগারদের চিন্তায়

    আর আমার মাথা ঢেকে দিলো বিষণ্ণতায় ।

    আর যেমন ড্রেডনট যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসের বেলায়

    কন্ঠরুদ্ধ অঙ্গবিক্ষেপে

    সেনারা আধখোলা দরোজার ভেতরে লাফিয়ে পড়েছিল, জাহাজডুবির আগে,

    ভবিষ্যবাদী কবি বারলিয়ুক হামাগুড়ি দিয়ে এগোল, পেরিয়ে গেল

    তাঁর চোখের চিৎকাররত ফাঁক দিয়ে ।

    তাঁর চোখের পাতাকে প্রায় রক্তাক্ত করে,

    উনি দেখা দিলেন হাঁটু গেড়ে,

    উঠে দাঁড়ালেন আর হাঁটতে লাগলেন

    আর উত্তেজিত মেজাজে,

    কোমলভাবে, অমন মোটা একজনের কাছে অপ্রত্যাশিত,

    উনি কেবল বললেন :

    “ভালো !”

    ব্যাপারটা ভালোই যখন পর্যবেক্ষণে এক হলুদ সোয়েটার

    আত্মাকে লুকিয়ে রাখে !

    ব্যাপারটা ভালোই যখন

    ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে, আতঙ্কের মুখোমুখি,

    তুমি চেঁচিয়ে বলো :

    “কোকো খাও -- ভ্যান হুটেন কোম্পানির !”

    এই মুহূর্ত,

    বাংলার আলোর মতন,

    বিস্ফোরণে ঝলসে,

    আমি কিছুর সঙ্গেই অদলবদল করব না,

    কোনো টাকাকড়ির জন্যও নয় ।

    চুরুটের ধোঁয়ায় মেঘাচ্ছন্ন,

    আর মদের গেলাসের মতন বৃদ্ধিপ্রাপ্ত,

    যে কেউ কবি সেভেরিয়ানিন-এর মতো মাতাল-মুখো হতে পারে ।

    কোন সাহসে তুমি নিজেকে কবি বলো

    আর ধূসর, তিতির-পাখির মতন, নিজের আত্মাকে কিচিরমিচিরে ডুবিয়ে দাও !

    তখন

    পেতলের বাঘনখ দিয়ে

    ঠিক এই মুহূর্তে

    জগতের খুলিকে তোমায় চিরে ফেলতে হবে !

    তুমি,

    মাথায় শুধু একটিমাত্র ভাবনা নিয়ে,

    “আমি কি শৈলী অনুযায়ী নাচছি ?”

    দ্যাখো আমি কতো আনন্দিত

    তার বদলে,

    আমি,--

    সদাসর্বদা একজন ভেড়ুয়া আর জোচ্চোর ।

    তোমাদের সবার কাছ থেকে,

    যারা মামুলি মজার জন্য ভালোবাসায় ভিজেছো,

    যারা ছিটিয়েছো

    শতকগুলোতে অশ্রুজল, যখন তোমরা কাঁদছিলে,

    আমি বেরিয়ে চলে যাবো

    আর সূর্যের একচোখ চশমাকে বসাবো

    আমার বড়ো করে খোলা, একদৃষ্ট চোখে ।

    আমি রঙিন পোশাক পরব, সবচেয়ে অস্বাভাবিক

    আর পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াবো

    জনগণকে খুশি দিতে আর তাতিয়ে তুলতে,

    আর আমার সামনে

    এক ধাতব দড়িতে গলাবাঁধা,

    ছোটো কুকুরবাচ্চার মতন দৌড়োবে নেপোলিয়ান ।

    একজন নারীর মতন, শিহরিত, পৃথিবী শুয়ে পড়বে,

    আত্মসমর্পণ করতে চেয়ে, মেয়েটি ধীরে-ধীরে অবনত হবে ।

    জীবন্ত হয়ে উঠবে সবকিছু

    আর চারিদিক থেকে,

    ওদের ঠোঁট তোতলা কথা বলবে :

    “য়াম-য়াম-য়াম-য়াম !”

    হঠাৎ,

    মেঘের দল

    আর বাতাসে অন্যান্য ব্যাপার

    আশ্চর্য কোনো উত্তেজনায় আলোড়িত,

    যেন শাদা-পোশাকে শ্রমিকদল, ওপরে ওইখানে,

    হরতাল ঘোষণা করেছে, সবাই তিক্ত আর আবেগে আক্রান্ত ।

    বর্বর বজ্র মেঘের ফাটল থেকে উঁকি দিলো, ক্রুদ্ধ ।

    নাকের বিশাল ফুটো থেকে ঘোড়ার ডাক দিয়ে, গর্জন করলো

    আর এক মুহূর্তের জন্যে, আকাশের মুখ তেবড়ে বেঁকে গেলো,

    লৌহ বিসমার্কের ভেঙচির মতন ।

    আর কেউ একজন,

    মেঘের গোলকধাঁধায় জড়িয়ে,

    কফিপানের রেস্তরাঁর দিকে, হাত বাড়িয়ে দিলো এখন :

    দুটিই, কোমলতর,

    আর নারীমুখ নিয়ে

    আর একই সঙ্গে, কামান দাগার মতন ।

    তুমি কি ভাবছো

    ওটা চিলেকোঠার ওপরে সূর্য

    কফিপানের রেস্তরারাঁকে আলতো আদর করতে চাইছে ?

    না, আবার এগিয়ে আসছে সংস্কারকামীদের কচুকাটা করতে

    উনি জেনেরাল গালিফেৎ !

    ভবঘুরের দল, পকেট থেকে হাত বের করে নাও--

    বোমা তুলে নাও, ছুরি কিংবা একটা পাথর

    আর কেউ যদি লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে ছুঁড়তে না পারে

    তাহলে সে চলে আসুক কেবল নিজের কপাল দিয়ে লড়তে !

    এগিয়ে যাও, ক্ষুধার্ত,

    গোলামের দল,

    আর নির্যাতিতরা,

    এই মাছি ভনভনে জঞ্জালে, পোচো না !

    এগিয়ে যাও !

    আমরা সোমবারগুলো আর মঙ্গলবারগুলোকে

    ছুটির দিনে পালটে দেবো, তাদের রাঙিয়ে দেবো রক্তে !

    পৃথিবীকে মনে করিয়া দাও তাকে আমি হীন প্রতিপন্ন করতে চেয়েছিলুম !

     রূঢ় হও !

    পৃথিবী

    রক্ষিতার মুখের মতন ফুলে উঠেছে,

    যাকে রথসচাইল্ড বেশি-বেশি ভালোবেসেছিল !

    গুলির আগুনের বরাবর পতাকাগুলো উড়ুক

    যেমন ওরা ছুটির দিনে করে, জাঁকজমকসহ !

    ওহে, রাস্তার লন্ঠনেরা, পণ্যজীবীদের আরও ওপরে তোলো,

    ওদের মড়াগুলোকে হাওয়ায় ঝুলতে দাও ।

    আমি অভিশাপ দিলুম,

    ছুরি মারলুম

    আর মুখে ঘুষি মারলুম,

    কারোর পেছনে হামাগুড়ি দিলুম,

    তাদের পাঁজর কামড়ে ধরে ।

    আকাশে, লা মারসেইলিজ-এর মতন লাল,

    সূর্যাস্ত তার কম্পিত ঠোঁটে মরণশ্বাস তুলছিল ।

    এটা মানসিক বিকার !

    যুদ্ধ থেকে কোনো কিছুই বাঁচবে না ।

    রাত এসে পড়বে,

    কামড়ে ধরবে তোমাকে

    আর বাসিই গিলে ফেলবে তোমাকে ।

    দ্যাখো--

    আকাশ আরেকবার জুডাস-এর ভূমিকায়,

    একমুঠো নক্ষত্র নিয়ে কাদের বিশ্বাসঘাতকতায় চোবানো হয়েছিল?

    এই রাত

    তাতার যুদ্ধবাজ মামাই-এর মতন, আহ্লাদে পানোৎসব করে,

    উত্তাপে দগ্ধ করে দিলো শহরকে ।

    আমাদের চোখ এই রাতকে ভেদ করতে পারবে না,

    দুই পক্ষের চর আজেফ-এর মতন কালো !

    শুঁড়ির আসরে চুপচাপ এক কোণে হেলান দিয়ে, আমি বসে থাকি,

    আমার আত্মায় আর মেঝেতে মদ চলকে পড়ে,

    আর আমি দেখি :

    কোনের দিকে, গোল চোখের প্রভা

    আর তাদের সঙ্গে, ম্যাডোনা চেবাচ্ছে হৃদয়ের কেন্দ্র  ।

    এরকম মাতাল ভিড়ে অমন আনন্দবিচ্ছুরণ প্রদান করা কেন ?

    ওদের কিই বা দেবার আছে ?

    তোমরা দেখতে পাচ্ছ -- আরেকবার,

    ওরা কেন বারাব্বাসকে পছন্দ করে

    গোলগোথার মানুষটির তুলনায় ?

    হয়তো, ভেবেচিন্তে,

    মানবিক ভানে, কেবল একবার নয়

    আমি কি তরতাজা মুখ পরে থাকবো ।

    আমি, হয়তো,

    তোমার ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে সৌম্যকান্তি

    সম্পূর্ণ মানবজাতিতে ।

    ওদের দিয়ে দাও,

    যারা আহ্লাদে ডগমগ,

    এক দ্রুত মৃত্যু,

    যাতে ওদের ছেলেপুলেরা ভালোভাবে গড়ে ওঠে ;

    ছেলেরা -- পিতা হিসাবে

    মেয়েরা -- গর্ভবতী নারী হিসাবে ।

    সেই জ্ঞানী মানুষদের মতন, নব্যপ্রসূতদের 

    অন্তর্দৃষ্টি আর ভাবনাচিন্তায় ধূসর হয়ে উঠতে দাও

    আর ওরা আসবে

    শিশুদের নামকরণের অনুষ্ঠানে

    যে কবিতাগুলো আমি লিখেছি, তাদের।

    আমি যন্ত্রপাতি আর ব্রিটেনের শিল্পের গুণগান করি ।

    কোনো মামুলি, সার্বজনিক ধর্মোপদেশে,

    হয়তো লেখা হয়ে থাকতে পারে

    যে আমিই ত্রয়োদশতম দূত ।

    আর যখন আমার কন্ঠস্বর তারস্বরে ঘোষণা করবে,

    প্রতি সন্ধ্যায়,

    ঘণ্টার পর ঘণ্টা,

    আমার আহ্বানের অপেক্ষায়

    যিশুখ্রিস্ট, নিজে, হয়তো ঘ্রাণ নেবেন

    আমার আত্মার ফরগেট-মি-নট গুল্মের ।

     

    চতুর্থ পর্ব

    মারিয়া ! মারিয়া !

    ভেতরে আসতে দাও, মারিয়া !

    আমাকে রাস্তায় ফেলে যেও না !

    তুমি অমন করতে পারো ?

    আমার গাল চুপসে গেছে,

    অথচ তুমি নিষ্ঠুরভাবে অপেক্ষা করাও ।

    তাড়াতাড়ি, সবায়ের দ্বারা পরীক্ষিত,

    বাসি আর বিবর্ণ,

    আমি চলে আসবো

    আর বিনা দাঁতে তোতলাবো

    যে আজকে আমি

    “সাতিশয় অকপট।”

    মারিয়া, 

    চেয়ে দ্যাখো--

    আমার কাঁধ দুটো আবার ঝুলে পড়ছে ।

    রাস্তায়, লোকেরা

    তাদের চার-তলা পেটের চর্বিতে আঙুল বোলায়।

    ওরা চোখ দেখায়,

    চল্লিশ বছরের অবসাদে ক্ষয়িত, আর অস্হির---

    ওরা চাপা হাসি হাসে কেননা

    আমার দাঁতে,

    আবারও,

    আমি গত রাতের আদরগুলোর শক্ত-হয়ে-যাওয়া ধৃষ্টতা কামড়ে ধরে রেখেছি ।

    বৃষ্টি ফুটপাথের ওপরে কেঁদে ফেললো,--

    ও তো জমা-জলে কারারুদ্ধ জোচ্চোর ।

    রাস্তার লাশ, পাথরবাঁধানো পাথরের পিটুনি খেয়ে, নিজের কান্নায় ভিজে গেলো।

    কিন্তু ধূসর চোখের পাতাগুলো--

    হ্যাঁ !--

    ঝুলন্ত বরফের চোখের পাতা হয়ে উঠলো জমাট

    তাদের চোখ থেকে ঝরা অশ্রুজলে--

    হ্যাঁ !--

    ড্রেনপাইপগুলোর বিষাদভারাতুর চোখ থেকে ।

    প্রতিটি পথচারীকে চাটছিল বৃষ্টির শুঁড় :

    পথের গাড়িগুলোয় ঝিকমিক করছিল খেলোয়াড়ের দল ।

    ফেটে পড়ছিল জনগণ

    গাদাগাদি ভরা,

    আর তাদের চর্বি উথলে উঠছিল ।

    ঘোলাটে এক নদীর মতন, মাটিতে স্রোত গড়ে উঠেছিল,

    তাতে মিশেছিল

    বাসি মাংসের রস ।

    মারিয়া !

    কেমন করে আমি কোমল শব্দকে স্ফীত কানে আঁটাবো ?

    একটা পাখি

    ভিক্ষার জন্য গান গায়

    ক্ষুধার্ত কন্ঠস্বরে

    বরং ভালো,

    কিন্তু আমি একজন মানুষ,

    মারিয়া,

    আমি তো প্রেসনিয়ার নোংরা তালুতে অসুস্হ রাতের কাশি ।

    মারিয়া, তুমি কি আমাকে চাও ?

    মারিয়া, আমাকে গ্রহণ করো, দয়া করো ।

    কাঁপা আঙুলে আমি গির্জার ঘণ্টার লোহার গলা টিপে ধরবো !

    মারিয়া !

    রাস্তার চারণভূমিগুলো বুনো আর দর্শনীয় হয়ে গেছে !

    ওরা আমার গলা টিপে ধরেছে আর আমি প্রায় অজ্ঞান হতে চলেছি।

    খোলো !

    আমি আহত !

    দ্যাখো -- আমার চোখ খুবলে নেয়া হয়েছে

    মেয়েদের টুপির আলপিন দিয়ে !

    তুমি দরোজা খুলে দিলে ।

    আমার খুকি !

    ওহ, ভয় পেও না !

    এই মহিলাদের দেখছো,

    আমার গলায় পাহাড়ের মতন ঝুলে রয়েছে,--

    জীবনভর, নিজের সঙ্গে টেনে নিয়ে যাই

    কয়েক কোটি, প্রচুর, বিশাল, বিশুদ্ধ ভালোবাসাদের

    আর কোটি কোটি নোংরা, বিদকুটে ভাড়াপ্রেমিকাদের ।

    ভয় পেও না

    যদি সততার 

    প্রতিজ্ঞাভঙ্গ হয়,

    হাজার সুন্দরী মুখ দেখে, আমি নিজেকে তাদের দিকে ছুঁড়ে দেবো--

    “ওরা, যারা মায়াকভস্কিকে ভালোবাসে !”

    দয়া করে বোঝো যে ওটাও হল

    রানিদের বংশ, যারা একজন উন্মাদ মানুষের হৃদয়ে সওয়ার হয়েছে ।

    মারিয়া, কাছে এসো !

    নগ্ন আর লজ্জাহীন হও,

    কিংবা আতঙ্কে শিহরিত,

    তোমার ঠোঁটের বিস্ময়কে সমর্পণ করো, কতো নরম :

    আমার হৃদয় আর আমি কখনও মে মাসের আগে পর্যন্ত থাকিনি,

    কিন্তু অতীতে,

    শত শত এপ্রিল মাস জড়ো হয়েছে ।

    মারিয়া !

    একজন কবি সারা দিন কল্পিত সুন্দরীর বন্দনায় গান গায়,

    কিন্তু আমি--

    আমি রক্তমাংসে গড়া,

    আমি একজন মানুষ --

    আমি তোমার দেহ চাই,

    খ্রিস্টধর্মীরা যেমন প্রার্থনা করে :

    “এই দিনটা আমাকে দাও

    আমাদের প্রতিদিনের রুটি।”

    মারিয়া, আমাকে দাও !

    মারিয়া !

    আমি ভয় পাই তোমার নাম ভুলে যাবো

    চাপে পড়ে কবি যেমন শব্দ ভুলে যায়

    একটি শব্দ

    সে অস্হির রাতে কল্পনা করেছিল,

    ঈশ্বরের সমান যার প্রভাব ।

    তোমার দেহকে

    আমি ভালোবেসে যাবো আর তত্বাবধান করবো

    যেমন একজন সৈনিক

    যুদ্ধে যার পা কাটা গেছে,

    একা

    আর-কেউ তাকে চায় না,

    অন্য পা-কে সে সস্নেহে যত্ন করে ।

    মারিয়া,--

    তুমি কি আমাকে নেবে না ?

    নেবে না তুমি !

    হাঃ !

    তাহলে অন্ধকারময় আর বেদনাদায়ক,

    আরেকবার,

    আমি বয়ে নিয়ে যাবো

    আমার অশ্রু-কলঙ্কিত হৃদয়

    এগোবো,

    কুকুরের মতন,

    খোঁড়াতে খোঁড়াতে,

    থাবা বইতে থাকে সে

    যার ওপর দিয়ে দ্রুতগতি রেলগাড়ি চলে গেছে।

    হৃদয় থেকে রক্ত ঝরিয়ে আমি যে রাস্তায় ঘুরে বেড়াই তাকে উৎসাহ দেবো,

    আমার জ্যাকেটে ফুলের গুচ্ছ ঝুলে থাকে,  ধূসরিত করে,

    সূর্য পৃথিবীর চারিধারে হাজার বার নাচবে,

    স্যালোম-এর মতন

    ব্যাপটিস্টের মুণ্ডু ঘিরে যে নেচে ছিল ।

    আর যখন আমার বছরগুলো, একেবারে শেষে,

    তাদের নাচ শেষ করবে আর বলিরেখা আঁকবে

    কোটি কোটি রক্ত-কলঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে

    আমার পিতার রাজত্বের পথ

    আমি চড়ে বেরিয়ে আসবো

    নোংরা ( রাতের বেলায় গলিতে ঘুমিয়ে ),

    আর কানেতে ফিসফিস করে বলব

    যখন আমি দাঁড়িয়ে

    ওনার দিকে :

    শ্রীমান ঈশ্বর, শোনো !

    এটা কি ক্লান্তিকর নয়

    তোমার মহানুভব চোখদুটো মেঘেতে ডুবিয়ে দাও

    প্রতিদিন, প্রতি সন্ধ্যায় ?

    তার বদলে, এসো,

    বৃত্তাকারে পাক খাবার উৎসব আরম্ভ করা যাক

    শুভ আর অশুভের জ্ঞানবৃক্ষ ঘিরে !

    সর্বশক্তিমান, তুমি চিরকাল আমাদের পাশে থাকবে !

    মদ থেকে, মজাগুলো আরম্ভ হবে

    আর প্রেরিত দূত পিটার, যিনি সব সময়ে ভ্রুকুটি করেন,

    দ্রুত-লয়ের নাচ নাচবেন--- কি-কা-পু ।

    আমরা সব কয়জন ইভকে ইডেন স্বর্গোদ্যানে ফিরিয়ে আনবো :

    আমাকে আদেশ করো

    আর আমি যাবো --

    বীথিকাগুলো থেকে, প্রয়োজনের সুন্দরী মেয়েদের বেছে নেবো

    আর তাদের তোমার কাছে আনবো !

    আনবো তো আমি ?

    না ?

    তুমি তোমার কোঁকড়াচুল মাথা কেন অভব্যভাবে নাড়াচ্ছো ?

    কেন তুমি তোমার ভ্রুতে গিঁট ফেলছো যেন তুমি রুক্ষ ?

    তুমি কি মনে করো

    যে এই

    যার ডানা আছে, সে কাছেই,

    ভালোবাসার মানে জানে ?

    আমিও একজন দেবদূত ; আগেও ছিলুম--

    শর্করায় তৈরি মেশশাবকের চোখ নিয়ে, আমি তোমার মুখগুলোর দিকে তাকালুম,

    কিন্তু আমি ঘোটকিদের আর উপহার দিতে চাই না, --

    সেভরে-পাড়ার সমস্ত অত্যাচারকে ফুলদানির রূপ দেয়া হয়েছে ।

    সর্বশক্তিমান, তুমি দুটো হাত তৈরি করে দিয়েছো,

    আর তা সযত্নে,

    একটা মাথা গড়ে দিয়েছো, আর তালিকায় অনেককিছু রয়েছে--

    কিন্তু কেন তুমি তা করলে

    কেননা ব্যথা করে

    যখন কেউ চুমু খায়, চুমু, চুমু ?!

    আমি ভেবেছিলুম তুমিই মহান ঈশ্বর, সর্বশক্তিমান

    কিন্তু তুমি একজন ক্ষুদে মূর্তি, -- স্যুট-পরা একজন নির্বোধ,

    ঝুঁকে, আমি ইতিমধ্যে আয়ত্বে পেয়েছি

    সেই ছুরি যা আমি লুকিয়ে রেখেছি

    আমার বুটজুতোর ফাঁকে ।

    তোমরা, ডানাসুদ্ধ জোচ্চোরের দল

    ভয়ে জড়োসড়ো হও !

    নিজেদের কাঁপতে-থাকা পালকগুলো ঝাঁকাও, রাসকেলের দল !

    তুমি, গা থেকে ধুপের গন্ধ বেরোচ্ছে, তোমাকে চিরে ফালাফালা করব,

    এখান থেকে আলাস্কা পর্যন্ত ধাওয়া করে।

    আমাকে যেতে দাও !

    তুমি আমাকে থামাতে পারবে না !

    আমি ঠিক হই বা ভুল

    তাতে কোনো তফাত হয় না,

    আমি শান্ত হবো না ।

    দ্যাখো,--

    সারা রাত নক্ষত্রদের মাথা কাটা হয়েছে

    আর আকাশ আবার কোতলে রক্তবর্ণ ।

    ওহে তুমি,

    স্বর্গ !

    মাথা থেকে টুপি খোলো,

    যখনই আমাকে কাছে দেখতে পাবে !

    স্তব্ধতা । 

    ব্রহ্মাণ্ড ঘুমোচ্ছে ।

    কালো, নক্ষত্রে- কানের তলায়

    থাবা রেখে ।

     

    মেরুদণ্ড বেণু

    প্রস্তাবনা

    তোমাদের সকলের জন্যে,

    যারা কখনও আনন্দ দিয়েছিল বা এখনও দিচ্ছে,

    আত্মার সমাধিতে প্রতিমাদের দ্বারা সুরক্ষিত,

    আমি তুলে ধরব, মদের এক পানপাত্রের মতো

    উৎসবের অনুষ্ঠানে, খুলির কানায়-কানায় ভরা কবিতা ।

    .

    আমি প্রায়ই বেশি-বেশি ভাবি :

    আমার জন্যে অনেক ভালো হতে পারতো

    একটা বুলেট দিয়ে আমার সমাপ্তিকে  বিদ্ধ করে দেয়া ।

    আজকের দিনেই, 

    হয়তো বা, 

    আমি আমার অন্তিম প্রদর্শন মঞ্চস্হ করছি।

    .

    স্মৃতি !

    আমার মগজ থেকে সভাঘরে একত্রিত হয়

    আমার প্রেমের অফুরান সংখ্যা

    চোখ থেকে চোখে হাসি ছড়িয়ে দ্যায় ।

    বিগত বিয়ের ফেস্টুনে রাতকে সাজাও।

    দেহ থেকে দেহে ঢেলে দাও আনন্দ ।

    এই রাত যেন কেউ ভুলতে না পারে । 

    এই অনুষ্ঠানে আমি বেণু বাজাব ।

    বাজাবো আমার নিজের মেরুদণ্ডে ।

    .

     

    বড়োবড়ো পা ফেলে আমি মাড়িয়ে যাচ্ছি দীর্ঘ পথ ।

    কোথায় যাবো আমি, নিজের ভেতরের নরকে লুকোবো ?

    অভিশপ্ত নারী, কোন স্বর্গীয় কার্যাধ্যক্ষ

    তার কল্পনায় তোমাকে গড়েছে ?!

    আনন্দে মাতার জন্য পথগুলো অনেক বেশি সঙ্কীর্ণ ।

    ছুটির দিনের গর্ব আর শোভাযাত্রায় জনগণ বেরিয়ে পড়েছে রবিবারের সাজে।

    আমি ভাবলুম,

    ভাবনাচিন্তা, অসুস্হ আর চাপচাপ

    জমাটবাঁধা রক্ত, আমার খুলি থেকে হামাগুড়ি দিয়েছে ।

    .

    আমি,

    যাকিছু উৎসবময় তার ইন্দ্রজালকর্মী,

    এই উৎসব বাঁটোয়ারা করার কোনো সঙ্গী নেই।

    এবার আমি যাবো আর ঝাঁপাবো,

    নেভস্কির পাথরগুলোতে ঠুকবো আমার মগজ !

    আমি ঈশ্বরনিন্দা করেছি ।

    চিৎকার করে বলেছি ঈশ্বর বলে কিছু নেই,

    কিন্তু নরকের অতল থেকে

    ঈশ্বর এক নারীকে অবচিত করলেন যার সামনে পর্বতমালা

    কাঁপবে আর শিহরিত হবে :

    তিনি তাকে সামনে নিয়ে এলেন আর হুকুম দিলেন :

    একে ভালোবাসো !

    .

    ঈশ্বর পরিতৃপ্ত । 

    আকাশের তলায় এক দুরারোহ পাআড়ে

    এক যন্ত্রণাকাতর মানুষ পশুতে পরিণত হয়ে বিদ্ধস্ত হয়েছে ।

    ঈশ্বর হাত কচলান ।

    ঈশ্বর চিন্তা করেন :

    তুমি অপেক্ষা করো, ভ্লাদিমির !

    যাতে তুমি জানতে না পারো নারীটি কে,

    তিনি ছিলেন, নিঃসন্দেহে তিনি,

    যিনি নারীটিকে একজন বাস্তব স্বামী দেবার কথা ভাবলেন     

    আর পিয়ানোর ওপরে মানুষের স্বরলিপি রাখলেন ।   

    কেউ যদি হঠাৎ পা-টিপে-টিপে শোবার ঘরের দরোজায় যেতো

    আর তোমার ওপরের ওয়াড়-পরানো লেপকে    আশীর্বাদ করতো,

    আমি জানি

    পোড়া পশমের গন্ধ বেরোতো,

    আর শয়তানের মাংস উদ্গীরণ করতো গন্ধকের ধোঁয়া।

    তার বদলে, সকাল হওয়া পর্যন্ত,

    আতঙ্কে যে ভালোবাসবার জন্য তোমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে

    আমি ছোটাছুটি করলুম

    আমার কান্নাকে কবিতার মুখাবয়ব দিলুম,

    উন্মাদনার কিনারায় এক হীরক-কর্তনকারী।

    ওহ, কেবল এক থাক তাসের জন্য !

    ওহ, মদের জন্য

    শ্বাসে বেরোনো হৃদয়কে কুলকুচি করার জন্য ।

    .

    তোমাকে আমার প্রয়োজন নেই !

    তোমাকে আমি চাই না !

    যাই হোক না কেন,

    আমি জানি

    আমি তাড়াতাড়ি কর্কশ চিৎকারে ভেঙে পড়ব !

    .

    যদি সত্যি হয় যে তোমার অস্তিত্ব আছে,

    ঈশ্বর,

    আমার ঈশ্বর,

    যদি নক্ষত্রদের জাজিম তোমারই বোনা হয়,

    যদি, প্রতিদিনকার এই

    অতিরক্ত যন্ত্রণা, 

    তুমি চাপিয়ে দিয়েছ নিগ্রহ, হে প্রভু ;

    তাহলে বিচারকের শেকল পরে নাও ।

    আমার আগমনের জন্য অপেক্ষা করো।

    আমি সময়কে মান্যতা দিই 

    এবং এক দিনও দেরি করব না ।

    শোনো,

    সর্বশক্তিমান ধর্মবিচারক !

    আমি মুখে কুলুপ দিয়ে রাখব ।

    কোনো কান্না

    আমার কামড়ে-ধরা ঠোঁট থেকে বেরোবে না।

    ঘোড়ার ল্যাজের মতো ধুমকেতুর সঙ্গে আমাকে বেঁধে রাখো,

    আর ঘষটে নিয়ে চলো আমাকে,

    নক্ষত্রদের গ্রাসে ছিন্ন হয়ে ।

    কিংবা হয়তো এরকম :

    আমার আত্মা যখন দেহের আশ্রয় ছেড়ে 

    তোমার বিচারব্যবস্হার সামনে নিজেকে উপস্হিত করবে,

    তখন কটমট ভ্রু কুঁচকে,

    তুমি,

    ছায়াপথের দুই পাশে পা ঝুলিয়ে ছুঁড়ে দিও ফাঁসির দড়ি,

    একজন অপরাধীর মতন আমাকে গ্রেপ্তার করে ঝুলিয়ে দিও ।

    তোমার ইচ্ছানুযায়ী যা হয় কোরো।

    যদি চাও আমাকে কেটে চার টুকরো করো।

    আমি নিজে তোমার হাত ধুয়ে পরিষ্কার করে দেবো ।

    কিন্তু এইটুকু করো--

    তুমি কি শুনতে পাচ্ছো !---

    ওই অভিশপ্ত নারীকে সরিয়ে দাও

    যাকে তুমি আমার প্রিয়তমা করেছো !

    .

    বড়ো বড়ো পা ফেলে আমি মাড়িয়ে যাচ্ছি দীর্ঘ পথ ।

    কোথায় যাবো আমি, নিজের ভেতরের নরকে লুকোবো ?

    অভিশপ্ত নারী, কোন স্বর্গীয় কার্যাধ্যক্ষ

    তার কল্পনায় তোমাকে গড়েছে ?!

    .

     

    উভয় আলোয়,

    ধোঁয়ায় ভুলে গিয়েছে তার রঙ ছিল নীল,

    আর মেঘগুলো দেখতে ছেঁড়াখোড়া উদ্বাস্তুদের মতো,

    আমি নিয়ে আসবো আমার শেষতম ভালোবাসার ভোর,

    কোনো ক্ষয়রোগীর রক্তবমির মতন উজ্বল।

    উল্লাসময়তায় আমি ঢেকে ফেলবো গর্জন

    সমাগমকারীদের,

    বাড়ি আর আরাম সম্পর্কে বিস্মৃত।

    পুরুষের দল,

    আমার কথা শোনো !

    পরিখা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরোও :

    তোমরা এই যুদ্ধ আরেকদিন লোড়ো।

    .

    এমনকি যদি,

    মদ্যপানের গ্রিক দেবতার মতন রক্তে লুটোপুটি খাও,

    এক মত্ত লড়াই তার শীর্ষে পৌঁছে গেছে--

    তবুও ভালোবাসার শব্দেরা পুরোনো হয় না ।

    প্রিয় জার্মানরা !

    আমি জানি

    গ্যেটের গ্রেশেন নামের নারী

    তোমার ঠোঁটে উৎসারিত হয় ।

    ফরাসিরা

    বেয়োনেটের আঘাতে হাসিমুখে মারা যায় ;

    মৃদু হাসি নিয়ে বিমানচালক ভেঙে পড়ে ;

    যখন তাদের মনে পড়ে 

    তোমার চুমুখাওয়া মুখ, 

    ত্রাভিয়াতা ।

    .

    কিন্তু গোলাপি হাঁ-মুখের জন্য আমার আগ্রহ নেই

    যা বহু শতক এতাবৎ কামড়েছে ।

    আজকে আমাকে জড়িয়ে ধরতে দাও নতুন পা!

    তুমি আমি গাইবো,

    লালমাথায়

    রুজমাখা ঠোঁটে ।

     

    হয়তো, এই সময়কে কাটিয়ে উঠে

    যা বেয়োনেটের ইস্পাতের মতন যন্ত্রণাদায়ক,

    পেকে-যাওয়া দাড়িতে বহু শতক

    কেবল আমরাই থাকবো :

    তুমি

    আর আমি,

    শহর থেকে শহরে তোমার পেছন পেছন ।

    সমুদ্রের ওই পারে তোমার বিয়ে হবে,

    আর রাতের আশ্রয়ে প্রতীক্ষা করবে---

    লণ্ডনের কুয়াশায় আমি দেগে দেবো

    তোমায় পথলন্ঠনের তপ্ত ঠোঁট ।

    এক গুমোটভরা মরুভূমিতে, যেখানে সিংহেরা সতর্ক,

    তুমি তোমার কাফেলাদের মেলে ধরবে--

    তোমার ওপরে,

    হাওয়ায় ছেঁড়া বালিয়াড়ির তলায়,

    আমি পেতে দেবে সাহারার মতন আমার জ্বলন্ত গাল।

    .

    তোমার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি খেলিয়ে

    তুমি চাউনি মেলবে

    আর দেখবে এক সৌম্যকান্তি বুলফাইটার !

    আর হঠাৎ আমি,

    এক মরণাপন্ন ষাঁড়ের চোখের জন্য, 

    ধনী দর্শকদের দিকে আমার ঈর্ষা ছুঁড়ে দেবো ।

    .

    যদি কোনো সেতু পর্যন্ত তুমি তোমার সংশয়াপন্ন পা নিয়ে যাও,

    এই ভেবে

    নিচে নামা কতো ভালো--

    তাহলে সে আমিই,

    সেতুর তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে সিন নদী,

    যে তোমাকে ডাকবে

    আমার ক্ষয়াটে দাঁত দেখিয়ে ।

    .

    যদি তুমি, অন্য পুরুষের সাথে মোটর গাড়িতে দ্রুত চলে যাচ্ছো, পুড়িয়ে দাও

    স্ত্রেলকা-পাড়া বা সোকোলনিকি অঞ্চল--

    তাহলে সে  আমিই, উঁচুতে উঠছি,

    চাঁদের মতন প্রত্যাশী আর আবরণমুক্ত,

    যে তোমাকে আকাঙ্খায় আকুল করে তুলবে ।

    .

    তাদের প্রয়োজন হবে

    আমার মতো এক শক্তিমান পুরুষ--

    তারা হুকুম করবে :

    যুদ্ধে গিয়ে মরো !

    শেষ যে শব্দ আমি বলব

    তা তোমার নাম,

    বোমার টুকরোয় জখম আমার রক্তজমাট ঠোঁটে ।

    .

    আমার শেষ কি সিংহাসনে বসে হবে ?

    নাকি সেইন্ট হেলেনা দ্বীপে ?

    জীবনের ঝড়ের দাপটগুলোকে জিন পরিয়ে,

    আমি প্রতিযোগীতায় নেমেছি

    জগতের রাজত্বের জন্য

    আর 

    দণ্ডাদেশ-পাওয়া কয়েদির পায়ের বেড়ি ।

    .

    আমি জার হবার জন্য নিয়তি-নির্দিষ্ট--

    আমার মুদ্রার সূর্যালোকপ্রাপ্ত সোনায়

    আমি আমার প্রজাদের হুকুম দেবো

    টাঁকশালে ছাপ দিতে

    তোমার চমৎকার মুখাবয়ব !

    কিন্তু যেখানে

    পৃথিবী হিমপ্রান্তরে বিলীন হয়,

    নদী যেখানে উত্তর-বাতাসের সঙ্গে দরাদরি করে,

    সেখানে আমি পায়ের বেড়িতে লিলির নাম আঁচড়ে লিখে যাবো,

    আর  কঠোর দণ্ডাদেশের অন্ধকারে,

    বারবার তাতে চুমু খাবো ।

    .

     

    তোমরা শোনো, যারা ভুলে গেছ আকাশের রঙ নীল,

    যারা সেই রকম রোমশ হয়েছ

    যেন জানোয়ার ।

    হয়তো এটাই

    জগতের শেষতম ভালোবাসা

    যা ক্ষয়রোগীর রক্তবমির মতন উজ্বল ।

    .

     

    আমি ভুলে যাব বছর, দিন, তারিখ ।

    কাগজের এক তাড়া দিয়ে নিজেকে তালাবন্ধ করে রাখব।

    আলোকপ্রাপ্ত শব্দাবলীর যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে,

    সৃষ্টি করব তোমায়, হে অমানবিক ইন্দ্রজাল !

    .

    এই দিন, তোমার কাছে গিয়ে,

    আমি অনুভব করেছি

    বাড়িতে কিছু-একটা অঘটন ঘটেছে ।

    তোমার রেশমে কিছু গোপন করেছ,

    আর ধূপের সুগন্ধ ফলাও হয়ে ছড়িয়েছে বাতাসে ।

    আমাকে দেখে আনন্দিত তো ?

    সেই “অনেক”

    ছিল অত্যন্ত শীতল ।

    বিভ্রান্তি ভেঙে ফেলল যুক্তির পাঁচিল ।

    তপ্ত ও জ্বরে আক্রান্ত, আমি হতাশার স্তুপে আশ্রয় নিলুম । 

    .

    শোনো,

    তুমি যা-ই করো না কেন,

    তুমি শবকে লুকোতে পারবে না ।

    সেই ভয়ানক শব্দ মাথার ওপরে লাভা ঢেলে দ্যায় ।

    তুমি যা-ই করো না কেন,

    তোমার প্রতিটি পেশীতন্তু

    শিঙা বাজায়

    যেন লাউডস্পিকার থেকে :

    মেয়েটি মৃতা, মৃতা, মৃতা !

    তা হতে পারে না, 

    আমাকে জবাব দাও ।

    মিথ্যা কথা বোলো না !

    ( এখন আমি যাবো কেমন করে ? )

    তোমার মুখাবয়বে তোমার দুই চোখ খুঁড়ে তোলে

    দুটি গভীর কবরের ব্যাদিত অতল ।

    .

    কবরগুলো আরও গভীর হয় ।

    তাদের কোনো তলদেশ নেই ।

    মনে হয়

    দিনগুলোর উঁচু মাচান থেকে আমি প্রথমে মাথা নামিয়ে লাফিয়ে পড়ব।

    অতল গহ্বরের ওপরে আমি আমার আত্মাকে টেনে বাজিকরের দড়ি করে নিয়েছি

    আর, শব্দদের ভোজবাজি দেখিয়ে, তার ওপরে টাল সামলাচ্ছি ।

    .

    আমি জানি

    ভালোবাসা তাকে ইতিমধ্যে পরাস্ত করেছে ।

    আমি অবসাদের বহু চিহ্ণ খুঁজে পাচ্ছি ।

    আমার আত্মায় পাচ্ছি আমাদের যৌবন ।

    হৃদয়কে আহ্বান জানাও দেহের উৎসবে ।

    .

    আমি জানি

    আমাদের প্রত্যেককে এক নারীর জন্য চড়া দাম দিতে হবে ।

    তুমি কি কিছু মনে করবে

    যদি, ইতিমধ্যে,

    তোমাকে তামাক-ধোঁয়ার পোশাকে মুড়ে দিই

    প্যারিসের ফ্যাশনের বদলে ?

    .

    প্রিয়তমাষু,

    প্রাচীনকালে যিশুর বার্তাবাহকদের মতন,

    আমি হাজার হাজার পথ দিয়ে হাঁটবো ।

    অনন্তকাল তোমার জন্য এক মুকুট তৈরি করেছে,

    সেই মুকুটে আমার শব্দাবলী 

    শিহরণের রামধনুর জাদু তৈরি করে ।

    .

    হাতির দল যেমন শতমণ ওজনের খেলায়

    পুরুর রাজার বিজয় সম্পূর্ণ করেছিল,

    আমি তোমার মগজে ভরে দিয়েছি প্রতিভার পদধ্বনি ।

    কিন্তু সবই বৃথা ।

    আমি তোমাকে বিচ্ছিন্ন করে আনতে পারি না ।

    .

    আনন্দ করো !

    আনন্দ করো,

    এখন

    তুমি আমাকে শেষ করে দিয়েছ !

    আমার মানসিক যন্ত্রণা এতোটাই তীক্ষ্ণ,

    আমি ছুটে চলে যাবো খালের দিকে

    আর মাথা চুবিয়ে দেবো তার অপূরণীয় গর্তে ।

    .

    তুমি তোমার ঠোঁট দিয়েছিলে ।

    তুমি ওদের সঙ্গে বেশ রুক্ষ ছিলে ।

    আমি হিম হয়ে গেলুম ছুঁয়ে ।

    অনুতপ্ত ঠোঁটে আমি বরং চুমু খেতে পারতুম

    জমাট পাথর ভেঙে তৈরি সন্ন্যাসিনীদের মঠকে ।

    .

    দরোজায়

    ধাক্কা ।

    পুরুষটি প্রবেশ করলো,

    রাস্তার হইচইয়ে আচ্ছাদিত ।

    আমি

    টুকরো হয়ে গেলুম হাহাকারে ।

    কেঁদে পুরুষটিকে বললুম :

    “ঠিক আছে,

    আমি চলে যাবো,

    ঠিক আছে !

    মেয়েটি তোমার কাছেই থাকবে ।

    মেয়েটিকে সুচারু ছেঁড়া পোশাকে সাজিয়ে তোলো,

    আর লাজুক ডানা দুটো, রেশমে মোড়া, মোটা হয়ে উঠুক।

    নজর রাখো যাতে না মেয়েটি ভেসে চলে যায় ।

    তোমার স্ত্রীর গলা ঘিরে

    পাথরের মতন, ঝুলিয়ে দাও মুক্তোর হার ।”

    .

     

    ওহ, কেমনতর

    এক রাত !

    আমি নিজেই হতাশার ফাঁস শক্ত করে বেঁধে নিয়েছি ।

    আমার ফোঁপানি আর হাসি

    আতঙ্কে শোচনীয় করে তুলেছে ঘরের মুখ ।

    তোমার দৃষ্টিপ্রতিভার বিধুর মুখাকৃতি জেগে উঠলো ;

    তোমার চোখদুটি জাজিমের ওপরে দীপ্ত

    যেন কোনো নতুন জাদুগর ভেলকি দেখিয়ে উপস্হিত করেছে

    ইহুদি স্বর্গরাজ্যের ঝলমলে রানিকে ।

    .

    নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায়

    মেয়েটির সামনে যাকে আমি সমর্পণ করে দিয়েছি

    আমি হাঁটু গেড়ে বসি ।

    রাজা অ্যালবার্ট

    তাঁর শহরগুলোকে

    সমর্পণের পর

    আমার তুলনায় ছিলেন উপহারে মোড়া জন্মদিনের খোকা ।

    .

    ফুলেরা আর ঘাসভূমি, সূর্যালোকে সোনার হয়ে গেল !

    বাসন্তী হয়ে ওঠো, সমস্ত প্রাকৃতিক শক্তির জীবন !

    আমি চাই একটিমাত্র বিষ--

    কবিতার একটানা গভীর চুমুক ।

    .

     

    আমার হৃদয়ের চোর,

    যে তার সমস্তকিছু ছিনতাই করেছে,

    যে আমার আত্মাকে পীড়ন করে চিত্তবিভ্রম ঘটিয়েছে,

    গ্রহণ করো, প্রিয়তমা, এই উপহার--

    আর কখনও, হয়তো, আমি অন্যকিছু সম্পর্কে ভাববো না ।

    .

    এই দিনটিকে উজ্বল ছুটির দিনে রাঙিয়ে দাও ।

    হে ক্রুশবিদ্ধসম ইন্দ্রজাল,

    তোমার সৃষ্টি বজায় রাখো ।

    যেমনটা দেখছো--

    শব্দাবলীর পেরেকগুচ্ছ

    আমাকে কাগজে গিঁথে দাও ।

    .

    শোনো !

    শোনো   

    যদি নক্ষত্রদের আলোকিত করা হয়

    তার মানে -- কেউ একজন আছে যার তা দরকার।

    তার মানে -- কেই একজন চায় তা হোক,

    কেউ একজন মনে করে থুতুর ওই দলাগুলো

    অসাধারণ ।

    আর অতিমাত্রায় উত্তেজিত,

    দুপুরের ধুলোর ঘুর্নিপাকে,

    ও  ঈশ্বরের ওপর ফেটে পড়ে,

    ভয়ে যে হয়তো সে ইতোমধ্যে দেরি করে ফেলেছে ।

    চোখের জলে,

    ও  ঈশ্বরের শিরাওঠা হাতে চুমু খায়

    কোথাও তো নিশ্চয়ই একটা নক্ষত্র থাকবে, তাই ।

    ও শপথ করে

    ও সহ্য করতে পারবে না

    ওই নক্ষত্রহীন অদৃষ্ট ।

    পরে,

    ও ঘুরে বেড়ায়, উদ্বেগে,

    কিন্তু বাইরে থেকে শান্ত ।

     

    আর অন্য সবাইকে, ও বলে :     

    ‘এখন,

    সবকিছু ঠিক আছে

    তুমি আর ভীত নও

    সত্যি তো ?’   

    শোনো,

    যদি নক্ষত্ররা আলোকিত হয়,

    তার মানে - কেউ একজন আছে যার তা দরকার।

    তার মানে এটা খুবই জরুরি যাতে

    প্রতিটি সন্ধ্যায় 

    অন্তত একটা নক্ষত্র ওপরে উঠে যাবে

    অট্টালিকার শীর্ষে ।

     

    লিলিচকা

    তামাকের ধোঁয়া বাতাসকে গ্রাস করেছে ।

    ঘরটা

    ক্রুচেনিখের নরকের একটা পর্ব ।

    মনে রেখো --

    ওই জানালার ওদিকে

    রয়েছে প্রবল উত্তেজনা 

    আমি প্রথমে তোমার হাতে টোকা দিয়েছিলুম ।

    আজ তুমি এখানে বসে আছো

    লৌহবর্ম হৃদয়ে ।

    আরেক দিন পরে

    তুমি আমাকে তাড়িয়ে দেবে, 

    হয়তো, গালমন্দ করে ।

    সামনের প্রায়ান্ধকার ঘরে আমার বাহু,

    কাঁপুনিতে ভেঙে গেছে আর শার্টের হাতায় ঢুকবে না ।

    আমি বাইরে বেরিয়ে যাবে

    রাস্তায় নিজের দেহ ছুঁড়ে ফেলব ।

    আমি প্রলাপ বকব,

    নিয়ন্ত্রণের বাইরে,

    বিষাদে চুরমার ।

    তা হতে দিও না

    আমার প্রিয়া,

    আমার প্রিয়তমা,

    এখন দুজনে দুদিকে যাওয়া যাক।

    তা সত্বেও

    আমার প্রেম

    অত্যন্ত ভারি

    তোমার ওপরে

    তুমি যেখানেই যাও না কেন।

    আমাকে একবার শেষ চিৎকার করতে দাও

    তিক্ততার, আঘাতে জর্জরিত হবার চিৎকার ।

    তুমি যদি একটা ষাঁড়কে খাটিয়ে নিরতিশয় ক্লান্ত করে দাও

    সে পালিয়ে যাবে,

    শীতল জলে গিয়ে নেমে যাবে ।

    তোমার ভালোবাসা ছাড়া

    আমার

    কোনো সমুদ্র নেই

    আর তোমার প্রেম এমনকি চোখের জলে চাওয়া বিশ্রামটুকুও দেবে না ।

    যখন এক ক্লান্ত হাতি শান্তি চায়

    সে তপ্ত বালির ওপরও রাজকীয় কায়দায় শুয়ে পড়ে।

    তোমার ভালোবাসা ছাড়া

    আমার

    কোনো সূর্য নেই,

    কিন্তু আমি এমনকি জানি না তুমি কোথায় আর কার সঙ্গে রয়েছো।

    এভাবে যদি তুমি কোনও কবিকে যন্ত্রণা দাও

    সে

    তার প্রেমিকাকে টাকা আর খ্যাতির জন্য বদনাম করবে,

    কিন্তু আমার কাছে

    কোনো শব্দই আনন্দময় নয়

    তোমার ভালোবাসাময় নাম ছাড়া ।

    আমি নিচের তলায় লাফিয়ে পড়ব না

    কিংবা বিষপান করব না

    বা মাথায় বন্দুক ঠেকাবো না ।

    কোনো চাকুর ধার

    আমাকে অসাড় করতে পারে না

    তোমার চাউনি ছাড়া ।

    কাল তুমি ভুলে যাবে যে 

    আমি তোমায় মুকুট পরিয়েছিলুম,

    যে আমি আমার কুসুমিত আত্মাকে ভালোবাসায় পুড়িয়েছিলুম,

    আর মামুলি দিনগুলোর ঘুরন্ত আনন্দমেলা

    আমার বইয়ের পাতাগুলোকে এলোমেলো করে দেবে…

    আমার শব্দগুলোর শুকনো পাতারা কি

    শ্বাসের জন্য হাঁপানো থেকে

    তোমাকে থামাতে পারবে ?

    অন্তত আমাকে তোমার 

    বিদায়বেলার অপসৃত পথকে 

    সোহাগে ভরে দিতে দাও ।

     

    তুমি

    তুমি এলে--

    কৃতসঙ্কল্প,

    কেননা আমি ছিলুম দীর্ঘদেহী,

    কেননা আমি গর্জন করছিলুম,

    কিন্তু খুঁটিয়ে দেখে

    তুমি দেখলে আমি নিছকই এক বালক ।

    তুমি দখল করে নিলে

    আর কেড়ে নিলে আমার হৃদয়

    আর তা নিয়ে

    খেলতে আরম্ভ করলে--

    লাফানো বল নিয়ে মেয়েরা যেমন খেলে ।

    আর এই অলৌকিক ঘটনার আগে

    প্রতিটি নারী

    হয়তো ছিল এক বিস্ময়বিহ্বল যুবতী

    কিংবা এক কুমারী তরুণী যে জানতে চায় :

    “অমন লোককে ভালোবাসবো ?

    কেন, সে তোমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে !

    মেয়েটি নিশ্চয়ই সিংহদের পোষ মানায়,

    চিড়িয়াখানার এক মহিলা !”

    কিন্তু আমি ছিলুম জয়োল্লাসিত ।

    আমি ওটা অনুভব করিনি --

    ওই জোয়াল !

    আনন্দে সবকিছু ভুলে গিয়ে,

    আমি লাফিয়ে উঠলুম

    এদিকে-সেদিকে উৎক্রান্ত, কনে পাবার আনন্দে রেডিণ্ডিয়ান,

    আমি খুবই গর্বিত বোধ করছিলুম

    আর ফুরফুরে । 

       

     

  • Yezidi কবিদের কবিতা | 120.60.8.227 | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৪০732395
  • ইয়াজিদি ( Yezidi ) কবিদের কবিতা

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    আমি ইয়েজিদি

    আজি মেরশাউই

    আমি ৭৪টা গণহত্যার যন্ত্রণা বইছি

    আর কোটি বছরের ফোঁপানি ।

    আমার পার্থক্যের চিহ্ণগুলো হলো

    এক বন্ধ মুখ আর পক্ষাঘাতগ্রস্ত ইচ্ছাশক্তি ।

    সৃষ্টিকর্তা আমার কথা জানে না

    আর কোনো পথ-মানচিত্র আমাকে ধারণ করতে পারে না ।

    সবচেয়ে দয়ালু দেবদূতরা আমাকে ঘৃণায় পরিহার করে ।

    অনুকূল কেউই আমার সমর্থনে কথা বলবে না

    আর কুরআনের আয়াত আমার দেয়ালকে সুরক্ষিত করবে না ।

    আমি অন্যের স্বর্গোদ্যানে যাবার মসৃণ পথ ।

    যারা আমাকে খুন করেছে তাদের সবায়ের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি

    যদি তারা শেষ পর্যন্ত স্বর্গে গিয়ে না পৌঁছে থাকে ।

    যদি পৌঁছে থাকে, আমি আশা করব কৃতজ্ঞতা ।

    মৃত্যুযন্ত্রণা আমার জিনকোষে সহজাত ।

    যন্ত্রণা নিজের শিকড় বিছিয়ে রেখেছে আমার রক্তস্রোতে।

    আমার দেহের কোষগুলোয় বিষাদ বাসা বেঁধে আছে ।

    বেঁচে থাকার জন্য আমি নিয়তি নির্দেশিত

    কেবল অন্যেরা যেমনভাবে চাইবে ;

    মরার জন্য আমি নিয়তি নির্দেশিত

    কেবল যখন অন্যেরা তার হুকুম দ্যায়---

    ঈশ্বরের স্মৃতির ধ্বংসাবশেষে ক্রুশকাঠে ঝোলানো

    জীবনের প্রাণবন্ত এলাকা থেকে একঘরে,

    যন্ত্রণাদায়ক ফাঁসির দড়ির মতন ছুঁড়ে ফেলে দেয়া

    বিস্মৃতির ধারালো ক্ষুরের ওপরে ।

    আমার একমাত্র স্বদেশ রয়েছে আমার অশ্রুর চাকচিক্যে ।

    আমার একমাত্র শোকজ্ঞাপন হলো আমার দুঃখের শঙ্খধ্বনি ।

    আমার অন্তরে, কারারুদ্ধ, মানবিক ফোড়ার পুঁজের বন্যা ।

    কোনো মধ্যস্হতা আমাকে ওই ভুলে যাওয়া

    ঈশ্বরের কাছে নিয়ে যেতে পারবে না

    আর তার বদমেজাজি হুকুম থেকে

    আমার পালাবার কোনো পথ নেই ।

    আমি ভয়ের হিমে বন্দি,

    নিরাশার আটার তালে আমি চটকানো

    ফোঁপানিতে মিশে, তিক্ততায়--

    হাহাকারের ঝোপজঙ্গলে

    আমার গলার আওয়াজ এক কন্ঠরুদ্ধ গোঙানি।

    ব্রহ্মাণ্ডের কানে খড় ঢোকানো আছে

    আর প্রভু নিজেকে অন্যান্য অভিরুচিতে ব্যস্ত রেখেছেন ।

     

    যুদ্ধের রঙ

    দুন্যা মিখাইল

    দেয়ালে ডিজিটাল মানচিত্র ঝোলানো

    মার্কিন যুদ্ধ দেখাচ্ছে

    নানা রঙে :

    ইরাক বেগুনি

    সিরিয়া হলুদ

    কুয়েত নীল

    আফগানিস্তান লাল

    ভিয়েতনাম সবুজ।

    যুদ্ধ

    মানচিত্রে

    সুন্দর দেখায়

    রসবোধপূর্ণ

    আর রঙিন ।

     

    স্বভূমি

    আমেল হসকান

    কল্পনা করো কেবল কল্পনা, আমি সতেরো বছরের মেয়ে । পরিবারের সঙ্গে আনন্দে সিঞ্জার নামে একটা জায়গায় থাকি, যেখানের পর্বতমালা রাজকীয় আর ক্ষেতগুলো সবুজ, যেখানে এক সময়ে ছিল ভালোবাসা আর শান্তি ।

    আমার মা প্রতঃরাশ তৈরি করছে, বাবা কাজের জন্য তৈরি হচ্ছে, ছাদে ঘুমোচ্ছে ভাই, আমার বোন ফুলের বাগানে প্রজাপতিদের সঙ্গে নাচছে, প্রতিবেশিদের বাচ্চারা পাড়ায় খেলছে, আর তাদের হাসি পৌঁছোচ্ছে আকাশে ।

    ন ইরবতা, শান্তি, সুরক্ষা, ভালোবাসা, হাসি, সৌন্দর্য ।

    তখন আমি ভাবতুম আমি স্বর্গের অংশ, তা ছিল পৃথিবীর স্বর্গ ।

    দাঁড়াও, শব্দ আসছে কোথা থেকে, কিসের !! মাকে ডাকলুম, মা আওয়াজ কিসের ? বাগানে গেলুম, আকাশ ধোঁয়ায় কালো হয়ে গিয়েছিল, ফুলগুলো মুর্ছিত, আমি সর্বত্র রক্তের গন্ধ পেতে লাগলুম ।

    মাকে ডাকলুম, মা তুমি কোথায় ? বোন এখানে আছে তো, সে কোথায়? তুমি কোথায় ?

    তুমি সাড়া দিচ্ছ না কেন, তুমি কোথায় ?

    ওহ, আমার ভাই ছাদে ঘুমোচ্ছে, ও বলতে পারবে। আমি ভাইয়ের কাছে গেলুম ।

    ভাই, উঠে পড় ; এই আওয়াজে তুই কেমন করে ঘুমোচ্ছিস, উঠে পড়, ভাই,ভাই ।

    গন্ধটা ছিল আমার ভাইয়ের রক্তের, আমার ভাই বিছানায় খুন হয়েছে, আমার ভাইকে বিছানায় খুন করা হয়েছে । কেউ দয়া করে বলুক, এটা কি দুঃস্বপ্ন, বলুক এটা কি দুঃস্বপ্ন তাহলে জেগে যাবো।

    আমি কি করি ? আমি কি করব ?

    আমি পাহাড়ে যাবো । আমি শারফেদেন মন্দিরে যাবো, দুঃস্বপ্ন সেখানে শেষ হবে ।

    বেরোবার জন্য দরোজা খুললুম, দেখলুম কারোর ধড় থেকে মাথা কাটা । না, না, না,না, উনি তো আমার বাবা, ওটা আমার বাবার মাথা, না, না । এমন দুঃস্বপ্ন শেষ হচ্ছে না কেন?

    আমি যন্ত্রণা আর কান্না নিয়ে পাহাড়ের দিকে দৌড়োলুম ।

    দাঁড়াও, ওই কালো পতাকাগুলো রাস্তায় কেন দেখা যাচ্ছে ? এরা কারা কুৎসিত বিদেশি নোংরা দাড়ি ঝুলিয়ে ? দৌড়োই, ওরা আমাকে দেখতে পাবে না ।

    দৌড়োচ্ছিলুম, পাথরে হোঁচোট খেয়ে তার ওপরে পড়লুম, দেখলুম তার তলায় একটা শিশু পাশে খালি বোতল, না খেয়ে মারা গেছে ।

    শিশুটাকে দেখার অভিঘাতে আমি যখন বিস্মিত, ওরা আমাকে দেখতে পেলো, আমার সামনে দাঁড়ালো, হায় দেবতা, ওরা তো কাছে আসছে । আমি চিৎকার করতে লাগলুম, বাঁচাও, বাঁচাও, কেউ আমার কথা শুনতে পেলো না, কেউ সাহায্য করতে এলো না । আমাকে ছেড়ে দাও, কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমাকে । আমাকে ছেড়ে দাও...আমি কোথায় ? এতো অন্ধকার জায়গা কেন ? মা, তুমি এখানে রয়েছ, মা কথা বলছ না কেন ? মা !

    মা শুধু একটা কথা বারবার বলতে লাগল : তিনটে রাক্ষস তোর বোনকে আমার চোখের সামনে ধর্ষণ করেছে ।

    তিনটে রাক্ষস তোর বোনকে আমার চোখের সামনে ধর্ষণ করেছে, তোর বোনকে ধর্ষণ করেছে, তোর বোনকে ।

    মা ওরা আসছে, মা ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে মেয়েদের বাজারে, ওরা আমাকে দশ ডলারে বেচে দেবে মা । মা ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে…

    ওটা কি? তরুণীভরা জেল, এই মেয়েটা কে, পরীর মতন ছোট্ট । জিগ্যেস করলুম, তোমার খাবার খাওনি কেন । জবাব দিল, আমি খেতে চাই না, যদি খাই তাহলে বড়ো হয়ে যাও আর ওরা আমাকে নিয়ে গিয়ে বেচে দেবে ।

    তোমরা আমার মা কে ধরে এনেছো
    আমাকে মেরে ফ্যালো, এই মেয়েগুলোকে মেরে ফ্যালো ।

    কিন্তু তোমরা আমার ধর্ম বদলাতে পারবে না, তা আছে আমার হৃদয়ে । তোমরা আমার স্বদেশকে লুকোতে পারবে না, আমরা এমন রাষ্ট্র যারা পরাজয় কাকে বলে জানে না, আমাদের শ্লোগান হলো শান্তি । আমরা ৭৪টা গণহত্যা দেখেছি। আমরা মরিনি, মরব না ।

    আমাকে খুন করো, এই মেয়েগুলোকে খুন করো, কিন্তু আমার স্বদেশকে লুকোতে পারবে না ।

    আমরা শিঞ্জার পাহাড়ে থাকবো শারফেনদেন মন্দিরে ।

    মেয়েটি বুঝতে পারলো সে দুঃস্বপ্ন দেখছে না । তার সামনে রূঢ় বাস্তব ।

    আমরা বেঁচে থাকবো, এই কথা বলে মেয়েটি ধর্ষিত হবার আগে আত্মহত্যা করে নিলো ।

     

    ইয়াজিদি বোনেদের

    আইল্লা রুৎ

    আমি বই আর কবিতা লিখি

    দুর্দশা-আক্রান্ত নারীদের জীবন নিয়ে

    আর আমি নামকরা কবি

    আমার কলম আর কবিতার কারণে

    আমার একটা ওয়েবসাইট আছে

    যেখানে আমার কবিতা পড়া হয় আবৃত্তি হয়

    আমি পুরস্কার আর সম্বর্ধনা সংগ্রহ করি।

     

    তবু ওরা এখনও যন্ত্রণাভোগ করছে

    আমাদের মেয়েদের ধর্ষণ করা হচ্ছে

    আমাদের মেয়েদের শেকলে বেঁধে রাখা হচ্ছে

    আমাদের মেয়েরা তাদের আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলেছে

    আমাদের মেয়েদের বোরখায় চাপা দেয়া হয়েছে

    আমাদের মেয়েদের বিক্রি করা হয়

    চিনাবাদামের দামে ।

     

    কে তাদের মুক্ত করবে ?

    মায়েরা আর বাবারা কাঁদেন

    যতক্ষণ না অশ্রু ফুরিয়ে যাচ্ছে

    তাদের আর অশ্রূবিন্দু নেই

    কে শোনে কন্ঠরুদ্ধ চিৎকার ?

    ওই সুন্দর কালো চোখে 

    কে দেখতে পায় সন্ত্রাসের ভয় ?

     

    একটি মেয়ের অসহায়তা

    যে শুধু নিজের জীবন কাটাতে চেয়েছে

    তার পরিবারের সঙ্গে

    তার বাড়িতে

    তার জনগণের মধ্যে

    আর তার দেশে

     

    কে তাদের উদ্ধার করবে ?

    স্বাধীন জগতের রয়েছে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র

    তাদের বাঁচাবার জন্য

    অমন দানবতা থেকে

    তবু পাষাণ নৈঃশব্দ

    জগতের ঠোঁটে

     

    ছায়ায়

    পেশমেগরা নারীরা

    তাদের জমিজমা অন্ধকার থেকে

    আলোয় আনতে চাইছে

     

    ছায়ায় 

    অনামা কর্মীরা

    ভালোবাসায় ভরা হৃদয়ে

    হাত আর শব্দ দিয়ে

    মুক্ত করতে চাইছে

     

    তারা কখনও  সংবাদ হয় না

    কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায়

    অনেক সময়ে তারা মারা যায়

    শহিদের মৃত্যু

    যাদের সন্মানিত করে মরুভূমি

    কিংবা কোনো অলিভ গাছ ।

     

    নাদিয়া মুরাদ

    কেন ?

    আমাকে বলো, কেন ?

    ইয়াজিদিদের এতো যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে ?

    ইতিহাসের মাটিতে পড়েছে চোখের জল ।

    অস্বীকারের দেয়াল-পরদার পেছনে

    না-বলা প্রামাণিক সাক্ষপত্রগুলো উধাও হয়ে গেল, যতক্ষণ না…

    নাদিয়া মুরাদ মুক্ত এলাকায় পালিয়ে এলেন,

    আর নিজের গল্প বললেন ।

    কালো বুটজুতো নেমে এলো

    ইরাকে তাঁর কোচো গ্রামে।

    পুরুষরা এলো ধর্ষণ আর হত্যা করতে-করতে ।

    মেয়েটিকে করা হলো সাবাইয়া,

    যৌন ক্রীতদাসি।

    মেয়েটি বেঁচে রইলো,

    যাতে সবাইকে বলতে পারে ।

    ভুলে যেও না,

    ভুলে যেও না ।

    নাদিয়া মুইরাদ

    হবে শেষতম তরুণী !

    লড়বে আইসিসিসের বিরুদ্ধে ।

    গণহত্যার বিরুদ্ধে।

    অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে নয়, 

    কিন্তু শব্দ দিয়ে ।

    ন্যায়বিচারের জন্য ।

    আমরা সবাই বিশ্বনাগরিক ।

    মেয়েটি কতো সাহসী, কতো দৃঢ় ।

    ওর লড়াইকে বৃথা যেতে দিও না।

    আবার সবায়েরর জন্য সকাল আসুক।

    মেয়েটি আমাদের কন্ঠস্বর !

     

    আত্মপরিচয়

    হায়মান আলকারসাফি

    ওদের বলো যে আমি মরব না,

    ওরা লাঠি ভেঙে ফেললেও

    যা আমাকে ইতিহাসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে । 

    আমার শরীর শক্তি সঞ্চয় করে নেবে

    একগুঁয়েমিকে জয় করার জন্য ।

    সঞ্চয় করে নেবে দুর্দশা সহ্য করার ক্ষমতা,

    আর শিশুদের স্বপ্নের কাচের ফলার ওপর দিয়ে

    আমি আমার বাড়ি ফিরব ।

    ওদের বলো, ওরা ইঁদুরের মতন আমার সঙ্গে লড়েছে,

    কিংবা আমাকে কোতল করেছে,       

    আমার আত্মপরিচয়কে তাদের চোয়ালের মাঝে আটক করে ।

    এই পর্বতমালা প্রতিবেশির ছেলেকে জড়িয়ে নিয়েছে।   

     

    ওদের বলো   

    যে এগুলো কেবল ফিসফিস করে বলা কথা নয়

    কিংবা নকল দেশপ্রেমিকের কান্না -- তা আসলে

    আমার ব্যক্তিগত আত্মপরিচয়,

    আমার ইয়েজিদি অহং,

    আমার ভাষা,   

    আমার সিঞ্জারি আত্মা---

    আমি বিভ্রান্ত হবো না ।

     

    আমি এখনও বেঁচে আছি

    শিশুদের দেহে।

    আমি অনন্তকাল পর্যন্ত থাকবো,

    আমার হাতে শান্তি আর বিজয়ের পতাকা নিয়ে ।

     

    বন্দি

    মুরাদ সুলেইমান আল্লো

    ভালোবাসার মরুযাত্রীদলে যোগ দাও আর আমার যাত্রীদলের চেয়ে এগিয়ে যাও,

    নাওয়াফেল প্রার্থনায় একটা চিঠি দিয়ে দিও।

    মৃত্যুর কালো মুখের সামনে সজোরে চিৎকার করো,   

    আজকে পাপিয়াদের গান যথেষ্ট নয় ।

    তুমি কোন প্রার্থনা পছন্দ করো, হে হ্যাজেল-চোখ নারী ?   

    সিঞ্জারের শোকের কথা জানাও, প্রশ্ন কোরো না ।

    সবসময় ময়ূরপঙ্খী দেবদূতকে বিশ্বাস করো, তিনি দেবদূতদের প্রধান,

    তাঁর নামে, তাঁর ক্ষমতায় আমি তোমার শেকল আর বন্ধন ছিন্ন করব।

    দয়েশদের বলো জিব্রিল দেবদূতকে নিজেদের সততার প্রশ্ন করতে ।

    কবে থেকে নষ্ট অলসদের দেয়া হয়েছে খলিফাগিরি ?   

    তোমরা আমার রক্ত যদি ঝরাও, তা কখনও শুকোবে না ।     

    কবে থেকে মরুভূমির বালি ফুরিয়ে গেছে ?

    তোমদের হত্যার ফরমান আমাদের ধ্বংস করতে সফল হবে না ।

    ব্যাবিলনের সভ্যতাকে পুড়িয়ে তোমরা নষ্ট করতে পারোনো পারবেও না।

    প্রতিবেশিদের আপসে লড়িয়ে দেবার মধ্যে গৌরব নেই

    আর পোয়াতি নারীদের তুলে নিয়ে যাওয়ার কোনো পুরস্কার নেই ।

    তোমরা বলতে পারো যে তোমাদের আক্রমণ একটা ন্যায্য কাজ, 

    যেমন একসঙ্গে ডাঁটিকে ঘিরে থাকে কাঁটারা।

    তোমরা অজ্ঞ মূঢ়, তোমাদের পোশাকের মতন হৃদয়ও কালো

    মরুভূমির অপদার্থ বারবনিতাপুত্র তোমরা, জঞ্জালের প্রতিভূ ।

    আমরা দায়ুদ, মির্জা আর বাশার গৌরবকে আবার প্রতিষ্ঠা করব ।

  • চিনুয়া আচেবের কবিতা | 120.60.8.227 | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৪৩732396
  • নাইজেরিয়ার উত্তরঔপনিবেশিক সাহিত্যিক 

    চিনুয়া আচেবের  কবিতা ( ১৯৩০ - ২০১৩ )

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    শকুনেরা

    ধূসরতায়

    আর এক পশলা বৃষ্টিতে এক হতাশ

    সকাল অগ্রদূতদের দ্বারা অনালোড়িত

    সূর্যোদয়ে এক শকুন

    অনেক উঁচু গাছের ভাঙা

    হাড়ের ডালে বসে 

    কাছে ঘেঁষে বসল

    ওর সঙ্গীর মসৃণ

    চোট-খাওয়া মাথায়, একটা নুড়ি

    এক ডালে শেকড়-পোঁতা

    কুৎসিত পালকের জঞ্জালে

    আদর করে ঝুঁকলো

    শকুনির দিকে । কালকে ওরা পেয়েছিল

    জলভরা গর্তে একটা ফোলা লাশের

    দুটো চোখ আর নাড়িভুঁড়িতে 

    যা ছিল তা খেয়েছিল । পেট

    ভরে খেয়ে ওরা বেছে নিলো

    ওদের বিশ্রামের দাঁড়

    বাকি ফাঁপা মাংসের দিকে

    শীতল চাউনির সহজ

    দূরবিন চোখের আওতায়…

    অদ্ভুত

    সত্যিই প্রেম কেমন অন্য

    উপায়ে এতো সুনির্দিষ্ট

    একটা কোনা তুলে নেবে

    শব রাখার ওই বাসায়

    সাজিয়ে-গুছিয়ের গুটিয়ে বসবে সেখানে, হয়তো

    ঘুমিয়েও পড়বে -- শকুনির মুখ

    দেয়ালের দিকে মুখ করে !

    ...এইভাবেই বেলসেন ক্যাম্পের 

    কমাণ্ডান্ট দিনের শেষে বাড়ি 

    গেলেন সঙ্গে পোড়া মানুষের

    ধোঁয়া বিদ্রোহ করে নাকের

    চুলে ঝুলে আছে যা থামবে

    রাস্তার ধারে মিষ্টির দোকানে

    একটা চকোলেট তুলে নেবে

    তার কচি খোকার জন্য

    বাড়িতে অপেক্ষা করছে

    বাবা কখন ফিরবে…

    বদান্য দূরদর্শিতার

    গুণগান করো যদি চাও

    যে এমনকি মানুষখেকো

    রাক্ষসকেও একটা ছোটো

    জোনাকি উপহার দ্যায়

    কোষে মোড়া কোমলতা

    নিষ্ঠুর হৃদয়ের তুষার গুহায়

    নয়তো সেই বীজানুর জন্যেই

    হাহুতাশ করো স্বজাতীয় প্রেমে

    যাতে চিরকালের জন্য 

    প্রতিষ্ঠিত করে হয়েছে

    অমঙ্গল ।

    জবাব

    শেষ পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেললুম

    সন্ত্রাসের ঝালর-বসানো মোহ

    যা আমার প্রাচীন চাউনিকে বেঁধে রাখে

    ওই ভিড়ের মুখগুলোর সঙ্গে

    যা লুটতরাজের আর দখল করে আমার

    অবশিষ্ট জীবন এক অলৌকিকতায়

    শাদা-কলার হাতের নির্দেশের মাঝে

    আর নাড়িয়ে দিলুম এক সস্তা 

    ঘড়ির মতন আমার কানের কাছে

    আর আমার পাশে মেঝেয় ছুঁড়ে

    ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালুম । আমি

    তাদের কাঁধ আর মাথাকে

    ওপর-নিচ করালুম এক নতুন

    সিঁড়ি দিয়ে আর ঝুঁকলুম

    ওদের ঘেমো সারিতে

    আর উঠে গেলুম মাঝের হাওয়া পর্যন্ত

    আমার হাত কঠোরতার জন্য এতো নতুন

    পাকড়াও করতে পারলুম এক 

    ঝঞ্ঝাটে দিনের বন্ধুরতা

    আর তেষ্টা মেটালুম উৎসের

    যা তাদের পাগুলোকে উথালপাথাল 

    খাওয়াচ্ছিল । আমি এক নাটকীয়

    অবনমন আরম্ভ করলুম সেইদিন

    পেছন দিক ফিরে গুঁড়িমারা ছায়ায়

    ভাঙা মৌতাতের টুকরোয় । আমি

    খুলে ফেললুম অনেকদিনের বন্ধ জানালা

    আর দরোজা আর দেখলুম আমার চালাঘর

    ইন্দ্রধনুর ঝাঁটায় নতুন সাফসুথরো করা

    সূর্যের আলো আবার আমার বাড়ি হয়ে গেল

    যার নিয়তিনির্দিষ্ট মেঝেতে অপেক্ষা করছিল

    আমার গর্বিত চঞ্চল জীবন ।

    উড়াল

    ( নিই ওসুনদারের জন্য ) 

    দ্রাঘিমায় কিছু-একটা ক্ষমতার লালসাকে প্রশ্রয় দ্যায়

    নিছক বাড়ির ছাদটুকু আমিরের জন্য যথেষ্ট

    বৈভবশালী পাগড়ির দামি পাক থেকে বিলিয়ে দেন

    ধুলোয় হামাগুড়ি দেয়া কৃষকদের

    বিরল দুর্বোধ্য মাথা নাড়া যা প্যাঁচানো থাকে

    রাজকুমারীয় বিষণ্ণতায় ।

    আমিও জেনেছি

    ওই ঝলসানো আদিম ক্ষুধাবোধ,

    জীবন প্রকাশ করার দ্রুতি

    এক দীর্ঘ পিছুহটা প্রবৃত্তি ।

    যদিও দড়িবাঁধা আর হাতকড়া পরানো

    সেই দিন আমি চূড়া থেকে হুকুম দিলুম ।

    তিন তলা জগতের এক সেতু খাপ খেয়ে যায়

    আমার উন্মাদ গর্বিত মূর্তির সঙ্গে যা আমি হয়েছি।

    ভাসমান মেঘের এক ম্যাজিক লেপ

    নিজের শাদা কোমলতাকে ওড়ালো আর ঘষল

    আমার পায়ের তলায় পেশাদার পরীর আঙুলের মতন

    আর ব্যাণ্ডেজের কাপড়ের ছাঁকনি দিয়েঢ

    এক মহানগরের বিস্ময় প্রকাশ করল

    সে ম্যাজিক পরীর দেশের আয়তনের ।

    চাউনিকে বিভিন্নভাবে মাপজোক করে

    আমি মেঘগুলোকে ভাসিয়ে দিলুম

    এক স্হির চারণভূমির ওপরে, মিনারের ওপরে

    আর মাস্তুল আর ধোঁয়া-পালক চিমনিতে ;

    কিংবা পৃথিবীটাকেই উল্টে দিলুম, ছেড়ে দিলুম

    তা থেকেই, এক ভবঘুরে ফেরারিকে

    অবিচল আকাশের তলায় । তারপর এলো

    জগতের ওপরে এক আচমকা ঔজ্বল্য,

    তা ছিল বিরল শীতের হাসি, আর আমার

    মেঘ-জাজিমের ওপরে একটা কালো ক্রশ আঁকা

    যা ইন্দ্রধনুর অক্ষিগোলকে আটক । যাতে এলো

    খ্রিষ্টজন্মের অসাধারণত্ব -- তাছাড়া কেই বা আসতো

    ধূসর অখেলোয়াড়সুলভ তর্ক, অবিশ্বস্ত

    বিদ্যাবাগিশের উৎসর্গ-করা টেকো অবাধ্য ঘোষণা ?

    কিন্তু কি তুলনাহীন সৌন্দর্য ! কি গতি !

    রাতের এক রথ নিয়েছে আতঙ্কের উড়াল

    সেই দিনের আচার-বিচার সম্পর্কে আমাদের 

    রাজকীয় ঘোষণা থেকে ! আর আমাদের কল্পনার

    মিছিল ঘোড়ায় চেপে এগিয়েছে। আমরা এক প্রাচীন

    লোভকে দমিয়েছি যা যুগ যুগ পড়ে থেকে কুঁকড়েছিল

    যতক্ষণ না মহিমাময় শোভাযাত্রা দেখে ক্লান্ত চোখ

    ফিরে এলো বিশ্রাম নেবার জন্যে ওই ক্ষুদ্র

    কিংবদন্তিতে যা জীবনের পোশাককে টেনে নিয়ে গেল

    সব জায়গা ছেড়ে আমার আসনের তলায় ।

    এখন আমি ভাবি আমি জানি কেন দেবতারা

    উচ্চতার ক্ষেত্রে পক্ষপাত করেন -- পাহাড়ের

    শীর্ষকে আর গম্বুজকে, গর্বিত ইরোকো গাছগুলোকে

    আর কাঁটার পাহারা-দেয়া বোমবাক্সকে,

    কেন মামুলি গৃহদেবতারা

    কঠিন কাঠের দাঁড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি বসবেন

    ঝুরঝুরে কড়িকাঠ  থেকে বিপজ্জনকভাবে ঝোলানো

    চালাবাড়ির চালে যা আরামে বসে আছে

    পৃথিবীর নিরাপদ মাটিতে ।

    প্রতিশ্রুতি-ভীতি

    হুররে ! তাদের জন্য যারা কিচ্ছু করে না

    কিছুই দেখে না অনুভব করে না যাদের

    হৃদয়ে বসানো আছে দূরদর্শিতা

    পাতলা ঝিল্লির মতন গর্ভের উন্মুখ

    দরোজায় যাতে বীর্যক্রোধের কলঙ্ক

    না ঢুকতে পারে । আমি শুনেছি পেঁচারাও

    জ্ঞানের গোলক পরে থাকে তাদের

    চোখের চারিধারে প্রতিরোধ হিসেবে

    প্রতিটি অসুরক্ষিত চোখ দ্রুত আড়াল পেতে চায়

    আলোর ছোঁড়া কাঁকর থেকে । অনেকদিন আগে

    মধ্য প্রাচ্যে পনটিয়াস পাইলেট

    সবার সামনে তাঁর শাদা হাতের অবদান 

    ধুয়েছিলেন যা বিখ্যাত হয়েছিল । ( তাঁর আগের

    আর পরের রোমের কর্তাদের মধ্যে তাঁকে ছাড়া আর

    কাকে নিয়ে আলোচনা হয়েছিল প্রতিটি

    রবিবার পাঠানো প্রচারকদের ধর্মবিশ্বাস ? ) আর

    প্রচারকদের কথা বলতে হলে সেই অন্য লোকটা

    জুডাস অমন মূর্খ ছিল না মোটেই ; যদিও

    বড়ো বেশি বদনাম হয়েছিল পরের প্রজন্মের

    লোকেদের দ্বারা তবু তথ্য তো থেকেই যায় যে

    তারই একা ওই  নানা-পোশাক জমঘটে

    যথেষ্ট বোধবুদ্ধি ছিল এই কথা বলার

    একটা মারাত্মক আন্দোলন যখন ও দেখল

    আর তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল, একটা সুন্দর

    ছোটো পুঁটলি ওর কোটের পকেট ফুলিয়ে রেখেছে

    লেনদেনের ব্যাপারে -- ব্যাটা বেশ বিচক্ষণ ।

    প্রেমচক্র

    ভোরবেলায় আস্তে আস্তে

    সূর্য নিজের কুয়াচ্ছন্ন দীর্ঘ 

    বাহুর আলিঙ্গন ফিরিয়ে নেয় ।

    খোশমেজাজ প্রেমিক-প্রেমিকারা

     প্রেমের ঘষাঘষি-কারবারের 

    কোনোরকম স্বাদ বা ক্বাথ 

    ফেলে যায় না ; পৃথিবী

    শিশিরে সুগন্ধিত

    সুবাসে জেগে ওঠে

    নরম-চোখ আলোর

    ফিসফিসানিতে…

    পরে যুবক তার 

    গুণাবলীর সমতা খুইয়ে ফেলবে

    স্বর্গের বিশাল জমি চাষ করার

    সময়ে আর তার ফল ফলাবে

    যুবতীটির তপ্ত ক্রোধের

    ফুলকির ওপরে । বহুকাল যাবত

    অভ্যস্ত অমনধারা আবদারে

    যুবতীটি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করবে

    সন্ধ্যার জন্য যখন আরেক রাতের

    চিন্তাভাবনা যুবকটির প্রফুল্লতা

    পুনরুদ্ধার করবে 

    আর যুবতীটির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা

    যুবকটির ওপরে ।

    প্রজাপতি

    গতি হল উৎপীড়ন

    ক্ষমতা হল উৎপীড়ন

    ওজন হল উৎপীড়ন

    প্রজাপতি সুরক্ষা খোঁজে মৃদুতায়

    ভারহীনতায়, ঢেউখেলানো উড়ালে

    কিন্তু এক চৌমাথায় যেখানে নানারঙা আলো

    গাছেদের থেকে হঠকারী নতুন রাজপথে পড়ে

    আমাদের অভিসারী এলাকার সংযোগ ঘটে

    আমি দুজনের জন্য যথেষ্ট খাবার সঙ্গে করে আনি

    আর অমায়িক প্রজাপতি নিজেকে উৎসর্গ করে

    উজ্বল হলুদ আত্মবলিদানে

    আমার কঠিন সিলিকন ঢালের ওপরে ।

    উদ্বাস্তু মা আর ছেলে

    কোনো ম্যাডোনা আর

    শিশু ছুঁতে পারবে না

    মায়ের কোমলতার ওই ছবিটিকে

    একজন ছেলের খাতিরে ওনাকে দ্রুত ভুলে যেতে হবে।

    বাতাস দুর্গন্ধে কটু হয়ে উঠেছিল

    না-ছোঁচানো শিশুদের আমাশার

    যাদের ক্ষয়ে যাওয়া পাঁজর আর শুকনো

    পাছা ফুলে ফাঁপা তলপেট নিয়ে 

    দাঁড়াতে চেষ্টা করছিল । অনেকেরই

    মা বহুকাল যাবত পালন করা বন্ধ

    করে দিয়েছে কিন্তু এর নয় । মা

    দাঁতের পাটির মাঝখানে ভুতুড়ে 

    হাসি ধরে রেখেছিল আর দুই চোখে

    এক ভুতুড়ে মায়ের গর্ব যা আঁচড়ে দিচ্ছিল

    করোটিতে টিকে থাকা মরচেরঙা চুল

    আর তখনই --

    দুই চোখে গান নিয়ে -- যত্নে আরম্ভ করল

    সিঁথেকাটা...আরেক জীবনে এই কাজ

    হতো প্রতিদিনের ঘটনা যা তেমন গুরুত্বপূর্ণ

    নয়, ওর সকালের খাবার আর স্কুলে যাবার 

    আগে ; এখন মা

    একটা ছোটো কবরে

    ফুল রাখার মতন কাজটা করছিলেন ।



     

  • মলয় রায়চৌধুরী | 120.60.8.227 | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৪৬732397
  • হাংরি  আন্দোলন : এক সাহিত্যক উথালপাথাল যা অনেকে সহ্য করতে পারেন না

    মলয় রায়চৌধুরী

    এক

    চুঁচুড়া-নিবাসী মৃত্যুঞ্জয় চক্রবর্তী আমাকে জিগ্যেস করেছেন, “আপনাদের চিন্তাধারা যখন প্রবলভাবে সক্রিয়, তখন আমি কলেজ স্টুডেন্ট, ইংরেজিতে অনার্স সরকারি কলেজ, বাঘা বাঘা অধ্যাপক, কিন্তু তাঁরা কেউ হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে একটি কথাও উচ্চারণ করেন নি। গ্রামের ছেলে, ইংরাজি ভালো বুঝতাম না বলে বাংলার ক্লাসে গিয়ে আধুনিক কবিতা, তারপরের ট্রেন্ড সম্পর্কে কত কথা শুনলাম কিন্তু হাংরি আন্দোলন ----- মলয় রায়চৌধুরী, শম্ভু রক্ষিত, শৈলেশ্বর, সুভাষের নাম একবারও উচ্চারিত হ'তে শুনিনি। হ্যাঁ, স্যার, যদিও এখন আমার ষাট বছর বয়স কিন্তু স্মৃতিশক্তি ভালো আছে। আমি স্কুল শিক্ষক, আর ২৩ দিন বাকি আছে। স্কুলপাঠ্য একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেও আপনাদের নাম এবং অবদানের কথা লেখা নেই, অথচ পড়তে পড়তে জানতে পারলাম আপনার লেখার ওপর গবেষণা করে অনেকে পি.এইচ.ডি. করেছেন।” 

    মৃত্যুঞ্জয় যে প্রশ্ন তুলেছেন তা অনেকেরই । তা হল হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে বিদ্যায়তনিক ভীতি ; মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ আক্রান্ত হবার আতঙ্ক । অথচ কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয়েছে, কেবল পশ্চিমবাংলায় নয়, অন্যান্য ভাষাতেও, যেমন জার্মানিতে ড্যানিয়েলা লিমোনেলা করেছেন, আমেরিকায় ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করেছেন মারিনা রেজা । অবশ্য হাংরি আন্দোলন তবুও আলোচিত হয়, কিন্তু শ্রুতি, শাস্ত্রবিরোধী, নিমসাহিত্য একেবারেই আলোচিত হয় না । 

    হাংরি আন্দোলনকারীদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতিও একটা কারণ, বিশেষ করে হাংরি মামলায় কয়েকজন রাজসাক্ষী হবার পর । উত্তরবঙ্গে হাংরি জেনারেশনের প্রসার সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে, হাংরি পত্রিকা ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’ এর সম্পাদক অলোক গোস্বামী এই কথাগুলো লিখেছিলেন, তা থেকে যৎসামান্য আইডিয়া হবে :-

    “নব্বুই দশকে সদ্য প্রকাশিত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বগলে নিয়ে এক ঠা ঠা দুপুরে আমি হাজির হয়েছিলাম শৈলেশ্বরের বাড়ির গেটে। একা। ইচ্ছে ছিল শৈলেশ্বরের সঙ্গে মুখোমুখি বসে যাবতীয় ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলবো। যেহেতু স্মরণে ছিল শৈলেশ্বরের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি তাই আস্থা ছিল শৈলেশ্বরের প্রজ্ঞা,ব্যক্তিত্ব,যুক্তিবোধ তথা ভদ্রতাবোধের ওপর। দৃঢ় বিশ্বাস ছিল শৈলেশ্বর আমাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেবেন এবং যৌথ আলোচনাই পারবে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নতুন উদ্যমে একসাথে পথ চলা শুরু করতে। কিন্তু দুভার্গ্য বশতঃ তেমন কিছু ঘটলো না। বেল বাজাতেই গেটের ওপারে শৈলেশ্বর। আমাকে দেখেই ভ্রূ কুঁচকে ফেললেন।

    --কী চাই!

    মিনমিন করে বললাম, আপনার সঙ্গে কথা বলবো।

    --কে আপনি?

    এক এবং দুই নম্বর প্রশ্নের ভুল অবস্থান দেখে হাসি পাওয়া সত্বেও চেপে গিয়ে নাম বললাম।

    --কি কথা?

    --গেটটা না খুললে কথা বলি কিভাবে!

    --কোনো কথার প্রয়োজন নেই। চলে যান।

    --এভাবে কথা বলছেন কেন?

    --যা বলছি ঠিক বলছি। যান। নাহলে কিন্তু প্রতিবেশীদের ডাকতে বাধ্য হবো।

    এরপর স্বাভাবিক কারণেই খানিকটা ভয় পেয়েছিলাম কারণ আমার চেহারাটা যেরকম তাতে শৈলেশ্বর যদি একবার ডাকাত, ডাকাত বলে চেঁচিয়ে ওঠেন তাহলে হয়ত জান নিয়ে ফেরার সুযোগ পাবো না। তবে 'ছেলেধরা' বলে চেল্লালে ভয় পেতাম না। সমকামিতার দোষ না থাকায় নির্ঘাত রুখে দাঁড়াতাম।

    ভয় পাচ্ছি অথচ চলেও যেতে পারছি না। সিদ্ধান্তে পৌঁছতে গেলে আরও খানিকটা জানা বোঝা জরুরি।

    --ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি। তবে পত্রিকার নতুন সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে সেটা রাখুন।

    এগিয়ে আসতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন শৈলেশ্বর।

    --কোন পত্রিকা?

    --কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প।

    --নেব না। যান।

    এরপর আর দাঁড়াইনি। দাঁড়ানোর প্রয়োজনও ছিল না। ততক্ষণে বুঝে ফেলেছি ব্যক্তি শৈলেশ্বর ঘোষকে চিনতে ভুল হয়নি আমাদের। আর এই সমঝদারি এতটাই তৃপ্তি দিয়েছিল যে অপমানবোধ স্পর্শ করারই সুযোগ পায়নি।”

    এরকম দুর্ব্যবহার সাহিত্য ও চিত্র আন্দোলনে নতুন কিছু নয় । পরাবাস্তববাদ আন্দোলনে আঁদ্রে ব্রেতঁর সঙ্গে অনেকের সম্পর্ক ভালো ছিল না, দল বহুবার ভাগাভাগি হয়েছিল, অথচ সেসব নিয়ে বাঙালি আলোচকরা তেমন উৎসাহিত নন, যতোটা হাংরি আন্দোলনের দল-ভাগাভাগি নিয়ে ।                                                                             দুই                   

    ১৯৫৯-৬০ সালে আমি দুটি লেখা নিয়ে কাজ করছিলুম। একটি হল ইতিহাসের দর্শন যা পরে বিংশ শতাব্দী পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল। অন্যটি মার্কসবাদের উত্তরাধিকার যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। এই দুটো লেখা নিয়ে কাজ করার সময়ে হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজনটা আমার মাথায় আসে । হাংরি আন্দোলনের ‘হাংরি’ শব্দটি আমি পেয়েছিলুম ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসারের ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম বাক্যটি থেকে। ওই সময়ে, ১৯৬১ সালে, আমার মনে হয়েছিল যে স্বদেশী আন্দোলনের সময়ে জাতীয়তাবাদী নেতারা যে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তা টকে গিয়ে পচতে শুরু করেছে উত্তর ঔপনিবেশিক কালখন্ডে।

    উপরোক্ত রচনাদুটির খসড়া লেখার সময়ে আমার নজরে পড়েছিল ওসওয়াল্ড স্পেংলারের লেখা দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েষ্ট বইটি, যার মূল বক্তব্য থেকে আমি গড়ে তুলেছিলুম আন্দোলনের দার্শনিক প্রেক্ষিত। ১৯৬০ সালে আমি একুশ বছরের ছিলুম। স্পেংলার বলেছিলেন যে একটি সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরলরেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয়; তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে সমাজটির নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না। যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফুরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে। কিন্তু একটি সংস্কৃতির অবসান সেই সময়ে আরম্ভ হয় যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তাই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন। আমার মনে হয়েছিল যে দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মনীষীদের পর্যায়ের বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয়। এখানে বলা ভালো যে আমি কলাকাতার আদি নিবাসী পরিবার সাবর্ণ চৌধুরীদের বংশজ, এবং সেজন্যে বহু ব্যাপার আমার নজরে যেভাবে খোলসা হয় তা অন্যান্য লেখকদের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়।

    ওই চিন্তা ভাবনার দরুণ আমার মনে হয়েছিল যে কিঞ্চিদধিক হলেও, এমনকি যদি ডিরোজিওর পর্যায়েও না হয়, তবু হস্তক্ষেপ দরকার, আওয়াজ তোলা দরকার, আন্দোলন প্রয়োজন। আমি আমার বন্ধু দেবী রায়কে, দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে, দাদার বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে আমার আইডিয়া ব্যাখ্যা করি, এবং প্রস্তাব দিই হাংরি নামে আমরা একটা আন্দোলন আরম্ভ করব। ১৯৫৯ থেকে টানা দুবছরের বেশি সে সময়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় দাদার চাইবাসার বাড়িতে থাকতেন। দাদার চাইবাসার বাড়ি, যা ছিল নিমডি নামে এক সাঁওতাল-হো অধ্যুষিত গ্রামের পাহাড় টিলার ওপর, সে-সময়ে হয়ে উঠেছিল তরুণ শিল্পী-সাহিত্যিকদের আড্ডা। ১৯৬১ সালে যখন হাংরি আন্দোলনের প্রথম বুলেটিন প্রকাশিত হয়, এবং ১৯৬২ সালে বেশ কয়েক মাস পর্যন্ত, আমরা এই চারজনই ছিলুম আন্দোলনের নিউক্লিয়াস।

    ইউরোপের শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো সংঘটিত হয়েছিল একরৈখিক ইতিহাসের বনেদের ওপর অর্থাৎ আন্দোলনগুলো ছিল টাইম-স্পেসিফিক বা সময় কেন্দ্রিক। কল্লোল গোষ্ঠী এবং কৃত্তিবাস গোষ্ঠী তাঁদের ডিসকোর্সে যে নবায়ন এনেছিলেন সে কাজগুলোও ছিল কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়্যালিটি বা ঔপনিবেশিক নন্দন-বাস্তবতার চৌহদ্দির মধ্যে, কেননা সেগুলো ছিল যুক্তিগ্রন্থনা নির্ভর এবং তাদের মনোবীজে অনুমিত ছিল যে ব্যক্তিপ্রতিস্বের চেতনা ব্যাপারটি একক, নিটোল ও সমন্বিত। সময়ানুক্রমী ভাবকল্পের প্রধান গলদ হল যে তার সন্দর্ভগুলো নিজেদের পূর্বপুরুষদের তুলনায় উন্নত মনে করে, এবং স্থানিকতাকে ও অনুস্তরীয় আস্ফালনকে অবহেলা করে।

    ১৯৬১ সালের প্রথম বুলেটিন থেকেই হাংরি আন্দোলন চেষ্টা করল সময়তাড়িত চিন্তাতন্দ্র থেকে সম্পূর্ণ পৃথক পরিসরলব্ধ চিন্তাতন্ত্র গড়ে তুলতে। সময়ানুক্রমী ভাবকল্পে যে বীজ লুকিয়ে থাকে, তা যৌথতাকে বিপন্ন আর বিমূর্ত করার মাধ্যমে যে মননসন্ত্রাস তৈরি করে, তার দরুন প্রজ্ঞাকে যেহেতু কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়, সমাজের সুফল আত্মসাৎ করার প্রবণতায় ব্যক্তিদের মাঝে ইতিহাসগত স্থানাঙ্ক নির্ণয়ের হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিক তত্ত্বসৌধ নির্মাণ। ঠিক এই জন্যেই, ইউরোপীয় শিল্পসাহিত্য আন্দোলনগুলো খতিয়ে যাচাই করলে দেখা যাবে যে ব্যক্তিপ্রজ্ঞার আধিপত্যের দামামায় সমাজের কান ফেটে এমন রক্তাক্ত যে সমাজের পাত্তাই নেই কোন। কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর দিকে তাকালে দেখব যে পুঁজিবলবান প্রাতিষ্ঠানিকতার দাপটে এবং প্রতিযোগী ব্যক্তিবাদের লালনে সমসাময়িক শতভিষা গোষ্ঠী যেন অস্তিত্বহীন। এমনকি কৃত্তিবাস গোষ্ঠীও সীমিত হয়ে গেছে দুতিনজন মেধাস্বত্বাধিকারীর নামে। পক্ষান্তরে, আমরা যদি ঔপনিবেশিক নন্দনতন্ত্রের আগেকার প্রাকঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের কথা ভাবি, তাহলে দেখব যে পদাবলী সাহিত্য নামক স্পেস বা পরিসরে সংকুলান ঘটেছে বৈষ্ণব ও শাক্ত কাজ; মঙ্গলকাব্য নামক-ম্যাক্রো-পরিসরে পাবো মনসা বা চন্ডী বা শিব বা কালিকা বা শীতলা বা ধর্মঠাকুরের মাইক্রো-পরিসর। লক্ষণীয় যে প্রাকঔপনিবেশিক কালখন্ডে এই সমস্ত মাইক্রো-পরিসরগুলো ছিল গুরুত্বপূর্ণ, তার রচয়িতারা নন। তার কারণ সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানার উদ্ভব ও বিকাশ ইউরোপীয় অধিবিদ্যাগত মননবিশ্বের ফসল। সাম্রাজ্যবাদীরা প্রতিটি উপনিবেশে গিয়ে এই ফসলটির চাষ করেছে।

    ইতিহাসের দর্শন নিয়ে কাজ করার সময়ে আমার মনে হয়েছিল যে স্পেস বা স্থানিকতার অবদান হল পৃথিবী জুড়ে হাজার রকমের ভাষার মানুষ, হাজার রকমের উচ্চারণ ও বাকশৈলী, যখন কিনা ভাষা তৈরির ব্যাপারে মানুষ জৈবিকভাবে প্রোগ্রামড। একদিকে এই বিস্ময়কর বহুত্ব; অন্যদিকে, সময়কে একটি মাত্র রেখা-বরাবর এগিয়ে যাবার ভাবকল্পনাটি, যিনি ভাবছেন সেই ব্যক্তির নির্বাচিত ইচ্ছানুযায়ী, বহু ঘটনাকে, যা অন্যত্র ঘটে গেছে বা ঘটছে, তাকে বেমালুম বাদ দেবার অনুমিত নকশা গড়ে ফ্যালে। বাদ দেবার এই ব্যাপারটা, আমি সেসময়ে যতটুকু বুঝেছিলুম, স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল লর্ড কর্ণওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাঙালির ডিসকোসটি উচ্চবর্গের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায়, যার ফলে নিম্নবর্গের যে প্রাকঔপনিবেশিক ডিসকোর্স বাঙালি সংস্কৃতিতে ছেয়ে ছিল, তা ঔপনিবেশিক আমলে লোপাট হয়ে যাওয়ায়। আমার মনে হয়েছিল যে ম্যাকলে সাহেবের চাপানো শিক্ষাপদ্ধতির কারণে বাঙালির নিজস্ব স্পেস বা পরিসরকে অবজ্ঞা করে ওই সময়ের অধিকাংশ কবি লেখক মানসিকভাবে নিজেদের শামিল করে নিয়েছিলেন ইউরোপীয় সময়রেখাটিতে। একারণেই, তখনকার প্রাতিষ্ঠানিক সন্দর্ভের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনের প্রতিসন্দর্ভের সংঘাত আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল প্রথম বুলেটিন থেকেই এবং তার মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছিল প্রতিটি বুলেটিন প্রকাশিত হবার সাথে-সাথে, যা আমি বহু পরে জানতে পারি, ‘কাউন্সিল ফর কালচারাল ফ্রিডাম’-এর সচিব এ.বি.শাহ, ‘পি.ই.এন ইনডিয়ার অধ্যক্ষ নিসিম এজেকিয়েল, এবং ভারত সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা পুপুল জয়াকরের কাছ থেকে।

    আমনধারা সংঘাত বঙ্গজীবনে ইতোপূর্বে ঘটেছিল। ইংরেজরা সময়কেন্দ্রিক মননবৃত্তি আনার পর প্রাগাধুনিক পরিসরমূলক বা স্থানিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাঙালি ভাবুকের জীবনে ও তার পাঠবস্তুতে প্রচন্ড ঝাঁকুনি আর ছটফটানি, রচনার আদল-আদরায় পরিবর্তনসহ, দেখা দিয়েছিল, যেমন ইয়ং বেঙ্গল সদস্যদের ক্ষেত্রে (হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রসিককৃষ্ণ মল্লিক, রামগোপাল ঘোষ, রামতনু লাহিরী, রাধানাথ শিকদার, প্যারীচাঁদ মিত্র, শিবচন্দ্র দেব ও দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়) এবং মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও আরও অনেকের ক্ষেত্রে। একইভাবে, হাংরি আন্দোলন যখন সময় কেন্দ্রিক ঔপনিবেশিক চিন্তাতন্ত্র থেকে ছিড়ে আলাদা হয়, উত্তর ঔপনিবেশিক আমলে আবার স্থানিকতার চিন্তাতন্ত্রে ফিরে যাবার চেষ্টা করেছিল, তখন আন্দোলনকারীদের জীবনে, কার্যকলাপে ও পাঠবস্তুর আদল-আদরায় অনুরূপ ঝাঁকুনি, ছটফটানি ও সমসাময়িক নন্দন কাঠামো থেকে নিস্কৃতির প্রয়াস দেখা গিয়েছিল। তা নাহলে আর হাংরি আন্দোলনকারীরা সাহিত্য ছাড়াও রাজনীতি, ধর্ম, উদ্দেশ্য, স্বাধীনতা, দর্শনভাবনা, ছবি আঁকা, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে ইস্তাহার প্রকাশ করবেন কেন।

    হাংরি আন্দোলনের সময়কাল খুব সংক্ষিপ্ত, ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত। এই ছোট্ট সময়ে শতাধিক ছাপান আর সাইক্লোস্টাইল করা বুলেটিন প্রকাশ করা হয়েছিল, অধিকাংশই হ্যান্ডবিলের মতন ফালিকাগজে, কয়েকটা দেয়াল-পোস্টারে, তিনটি একফর্মার মাপে, এবং একটি (যাতে উৎপলকুমার বসুর ‘পোপের সমাধি’ শিরোনামের বিখ্যাত কবিতাটি ছিল) কুষ্ঠিঠিকুজির মতন দীর্ঘ কাগজে। এই যে হ্যান্ডবিলের আকারে সাহিত্যকৃতি প্রকাশ, এরও পেছনে ছিল সময়কেন্দ্রিক ভাবধারাকে চ্যালেঞ্জের প্রকল্প। ইউরোপীয় সাহিত্যিকদের পাঠবস্তুতে তো বটেই, মাইকেল মধুসুদন দত্তর প্রজন্ম থেকে বাংলা সন্দর্ভে প্রবেশ করেছিল শিল্প-সাহিত্যের নশ্বরতা নিয়ে হাহাকার। পরে, কবিতা পত্রিকা সমগ্র, কৃত্তিবাস পত্রিকা সমগ্র, শতভিষা পত্রিকা সমগ্র ইত্যাদি দুই শক্ত মলাটে প্রকাশের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপের এই নন্দনতাত্ত্বিক হাহাকারটিকে। পক্ষান্তরে, ফালিকাগজে প্রকাশিত রচনাগুলো দিলদরাজ বিলি করে দেয়া হতো, যে প্রক্রিয়াটি হাংরি আন্দোলনকে দিয়েছিল প্রাকঔপনিবেশিক সনাতন ভারতীয় নশ্বরতাবোধের গর্ব। সেই সব ফালিকাগজ, যারা আন্দোলনটি আরম্ভ করেছিলেন, তাঁরা কেউই সংরক্ষণ করার বোধ দ্বারা তাড়িত ছিলেন না, এবং কারোর কাছেই সবকটি পাওয়া যাবে না। ইউরোপীয় সাহিত্যে নশ্বরতাবোধের হাহাকারের কারণ হল ব্যক্তিমানুষের ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা প্রদান। যে ট্র্যাজেডি-ভাবনা গ্রেকো-রোমান ব্যক্তি এককের পতনযন্ত্রণাকে মহৎ করে তুলেছিল পরবর্তীকালের ইউরোপে তা বাইবেলোক্ত প্রথম মানুষের ‘অরিজিনাল সিন’ তত্ত্বের আশ্রয়ে নশ্বরতাবোধ সম্পর্কিত হাহাকারকে এমন গুরুত্ব দিয়েছিল যে এলেজি এবং এপিটাফ লেখাটি সাহিত্যিক জীবনে যেন অত্যাবশক ছিল।

    আমরা পরিকল্পনা করেছিলুম যে সম্পাদনা ও বিতরণের কাজ দেবী রায় করবেন, নেতৃত্ব দেবেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সংগঠিত করার দিকটা দেখবেন দাদা সমীর রায়চৌধুরী, আর ছাপা এবং ছাপানোর খরচের ভার আমি নেব। প্রথমেই অসুবিধা দেখা দিল। পাটনায় বাংলা ছাপাবার প্রেস পাওয়া গেল না। ফলে ১৯৬১ সালের নভেম্বরে যে বুলেটিন প্রকাশিত হল, তা ইংরেজিতে। এই কবিতার ইশতাহারে আগের প্রজন্মের চারজন কবির নাম থাকায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় ক্ষুন্ন হয়েছিলেন বলে ডিসেম্বরে শেষ প্যারা পরিবর্তন করে পুনঃপ্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৬৩ সালের শেষ দিকে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে অংশগ্রহণকারীদের নামসহ এই ইশতাহারটি আরেকবার বেরোয়। ১৯৬২ সালের শেষাশেষি সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। দাদার বন্ধু উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় যোগ দেন। আমার বন্ধু সুবিমল বসাক, অনিল করঞ্জাই, করুণানিধান মুখোপাধ্যায় যোগদেন। সুবিমল বসাকের বন্ধু প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরূপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত সুভাষ ঘোষ, সতীন্দ্র ভৌমিক, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, শৈলেশ্বর ঘোষ, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শংকর সেন, যোগেশ পান্ডা, মনোহার দাশ যোগ দেন। তখনকার দিনে বামপন্থী ভাবধারার বুদ্ধিজীবীদের ওপর পুলিশ নজর রাখত। দেবী রায় লক্ষ্য করেন নি যে পুলিশের দুজন ইনফর্মার হাংরি আন্দোলনকারীদের যাবতীয় বই পত্র, বুলেটিন ইত্যাদি সংগ্রহ করে লালবাজারের প্রেস সেকশানে জমা দিচ্ছে এবং সেখানে ঢাউস সব ফাইল খুলে ফেলা হয়েছে।

    এতজনের লেখালিখি থেকে সেই সময়কার প্রধান সাহিত্যিক সন্দর্ভের তুলনায় হাংরি আন্দোলন যে প্রদিসন্দর্ভ গড়ে তুলতে চাইছিল, সে রদবদল ছিল দার্শনিক এলাকার, বৈসাদৃশ্যটা ডিসকোর্সের, পালাবদলটা ডিসকার্সিভ প্র্যাকটিসের, বৈভিন্ন্যটা কখন-ভাঁড়ারের, পার্থক্যটা উপলব্ধির স্তরায়নের, তফাতটা প্রস্বরের, তারতম্যটা কৃতি-উৎসের। তখনকার প্রধান মার্কেট-ফ্রেন্ডলি ডিসকোর্সটি ব্যবহৃত হতো কবিলেখকের ব্যক্তিগত তহবিল সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। হাংরি আন্দোলনকারীরা সমৃদ্ধ করতে চাইলেন ভাষার তহবিল, বাচনের তহবিল, বাকবিকল্পের তহবিল, অন্ত্যজ শব্দের তহবিল, শব্দার্থের তহবিল, নিম্নবর্গীয় বুলির তহবিল, সীমালঙ্ঘনের তহবিল, অধ:স্তরীয় রাগবৈশিষ্ট্যের তহবিল, স্পৃষ্টধ্বনির তহবিল, ভাষিক ইরর্যাশনালিটির তহবিল, শব্দোদ্ভটতার তহবিল, প্রভাষার তহবিল, ভাষিক ভারসাম্যহীনতার তহবিল, রূপধ্বনির প্রকরণের তহবিল, বিপর্যাস সংবর্তনের তহবিল, স্বরন্যাসের তহবিল, পংক্তির গতিচাঞ্চল্যের তহবিল, সন্নিধির তহবিল, পরোক্ষ উক্তির তহবিল, স্বরণ্যাসের তহবিল, পাঠবস্তুর অন্তঃস্ফোটিক্রিয়ার তহবিল, তড়িত বাঞ্জনার তহবিল, অপস্বর-উপস্বরের তহবিল, সাংস্কৃতিক সন্নিহিতির তহবিল, বাক্যের অধোগঠনের তহবিল, খন্ডবাক্যের তহবিল, বাক্যনোঙরের তহবিল, শীংকৃত ধ্বনির তহবিল, সংহিতাবদলের তহবিল, যুক্তিছেদের তহবিল, আপতিক ছবির তহবিল, সামঞ্জস্যভঙ্গের তহবিল, কাইনেটিক রূপকল্পের তহবিল ইত্যাদি।

    ইতোপূর্বে ইযংবেঙ্গলের সাংস্কৃতিক উথাল-পাথাল ঘটে থাকলেও, বাংলা শিল্প সাহিত্যে আগাম ঘোষণা করে, ইশতাহার প্রকাশ করে, কোন আন্দোলন হয়নি। সাহিত্য এবং ছবি আঁকাকে একই ভাবনা-ফ্রেমে আনার প্রয়াস, পারিবারিক স্তরে হয়ে থাকলেও, সংঘবদ্ধ গোষ্ঠীর মাধ্যমে হয়নি। ফলত দর্পণ, জনতা, জলসা ইত্যাদি পত্রিকায় আমাদের সম্পর্কে বানানো খবর পরিবেশিত হওয়া আরম্ভ হল। হাংরি আন্দোলনের রাজনৈতিক ইশতাহার নিয়ে প্রধান সম্পাদকীয় বেরোল যুগান্তর দৈনিকে। আমার আর দেবী রায়ের কার্টুন প্রকাশিত হল দি স্টেটসম্যান পত্রিকায়। হেডলাইন হল ব্রিৎস পত্রিকায়। সুবিমল বসারের প্রভাবে হিন্দি ভাষায় রাজকমল চৌধুরী আর নেপালি ভাষায় পারিজাত হাংরি আন্দোলনের প্রসার ঘটালেন। আসামে ছড়িয়ে পড়ল পাঁক ঘেটে পাতালে পত্রিকাগোষ্ঠীর সদস্যদের মাঝে। ছড়িয়ে পড়ল বগুড়ার বিপ্রতীক এবং ঢাকার স্বাক্ষর ও কণ্ঠস্বর পত্রিকাগুলোর সদস্যদের মাঝে, এবং মহারাষ্ট্রের অসো পত্রিকার সদস্যদের ভেতর। ঢাকার হাংরি আন্দোলনকারীরা (বুলবুল খান মাহবুব, অশোক সৈয়দ, আসাদ চৌধুরী, শহিদুর রহমান, প্রশান্ত ঘোষাল, মুস্তফা আনোয়ার প্রমুখ) জানতেন না যে আমি কেন প্রথম হাংরি বুলেটিনগুলো ইংরেজিতে প্রকাশ করেছিলুম। ফলে তাঁরাও আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন ইংরেজিতে ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে।

    যার-যেমন-ইচ্ছে লেখালেখির স্বাধীনতার দরুন হাংরি আন্দোলনকারীদের পাঠবস্তুতে যে অবাধ ডিক্যাননাইজেশান, আঙ্গিকমুক্তি, যুক্তিভঙ্গ, ডিন্যারেটিভাইজেশান, অনির্ণেয়তা, মুক্ত সমাপ্তি ইত্যাদির সূত্রপাত ঘটে, সেগুলোর যথার্থ সার্থকতা ও প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্ন উত্থাপন করতে থাকেন তখনকার বিদ্যায়তনিক আলোচকরা, যাঁরা বিবিধতাকে মনে করেছিলেন বিশৃঙ্খলা, সমরূপ হবার অস্বীকৃতিকে মনে করেছিলেন অন্তর্ঘাত, সন্দেহপ্রবণতাকে মনে করেছিলেন অক্ষমতা, ঔপনিবেশিক চিন্তনতন্ত্রের বিরোধীতাকে মনে করেছিলেন অসামাজিক, ক্ষমতাপ্রতাপের প্রতিরোধকে মনে করেছিলেন সত্যের খেলাপ। তাঁদের ভাবনায় মতবিরোধিতা মানেই যেন অসত্য, প্রতিবাদের যন্ত্রানুষঙ্গ যেন সাহিত্যসম্পর্কহীন। মতবিরোধিতা যেহেতু ক্ষমতার বিরোধিতা, তাই তাঁরা তার যে কোন আদল ও আদরাকে হেয় বলে মনে করেছিলেন, কেননা প্রতিবিম্বিত ভাবকল্পে মতবিরোধীতা অনিশ্চয়তার প্রসার ঘটায়, বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত করে বলে অনুমান করে নেয়া হয়, তা যদি সাহিত্যকৃতি হয় তাহলে সাহিত্যিক মননবিশ্বে, যদি রাজনৈতিক কর্মকান্ড হয় তাহলে রাষ্ট্রের অবয়বে। এখানে বলা দরকার যে, পশ্চিমবাংলায় তখনও রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেনি। তখনকার প্রতিবিম্বিত বিদ্যায়তনিক ভাবাদর্শে, অতএব, যারা মতবিরোধের দ্বারা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছিল, অর্থাৎ হাংরি আন্দোলনকারীরা, তারা অন্যরকম, তারা অপর, তারা প্রান্তিক, তারা অনৈতিক, তারা অজ্ঞান, তারা সত্যের মালিকানার অযোগ্য। বলাবাহুল্য যে, ক্ষমতা ও সত্যের অমনতর পার্থক্যহীন পরিসরে যাদের হাতে ক্ষমতা তাদের কব্জায় সত্যের প্রভূত্ব। অজ্ঞানের চিন্তাভাবনাকে মেরামত করার দায়, ওই তর্কে, সুতরাং, সত্য মালিকের।

    প্রাগুক্ত মেরামতির কাজে নেমে বিদ্যায়তনিক আলোচকরা হাংরি আন্দোলনের তুলনা করতে চাইছিলেন পাঁচের দশকে ঘটে যাওয়া দুটি পাশ্চাত্য আন্দোলনের সঙ্গে। ব্রিটেনের অ্যাংরি ইয়াং ম্যান ও আমেরিকার বিট জেনারেশনের সঙ্গে। তিনটি বিভিন্ন দেশের ঘটনাকে তাঁরা এমনভাবে উল্লেখ ও উপস্থাপন করতেন, যেন এই তিনটি একই প্রকার সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি, এবং তিনটি দেশের আর্থ-রাজনৈতিক কাঠামো, কৌমসমাজের ক্ষমতা-নকশা, তথা ব্যক্তিপ্রতিস্ব নির্মিতির উপাদানগুলো অভিন্ন। আমার মনে হয় বিদ্যায়তনিক ভাবনার প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে সীমিত ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞতা, অর্থাৎ কেবলমাত্র বাংলা ভাষাসাহিত্য বিষয়ক পঠন-পাঠন। যার দরুণ সমাজ ও ব্যক্তিমানুষের জীবনকে তাঁরা ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন সাহিত্যের উপকরণ প্রয়োগ করে। যে-সমস্ত উপাদানের সাহায্যে কৌমসমাজটি তার ব্যক্তি এককদের প্রতিস্ব নির্মাণ করে, সেগুলো ভেবে দেখার ও বিশ্লেষণের প্রয়াস তাঁরা করতেন না। প্রতিস্ব-বিশেষের পাঠবস্তু কেন অমন চেহারায় গোচরে আসছে, টেক্সট-বিশেষের প্রদায়ক গুণনীয়ক কী-কী, পুঁজিপ্রতাপের কৌমকৃৎকৌশল যে প্রতিস্ব-পীড়ন ঘটাচ্ছে তার পাপে পাঠবস্ত-গঠনে মনস্তাত্ত্বিক ও ভাষানকশা কীভাবে ও কেন পাল্টাচ্ছে, আর তাদের আখ্যান ঝোঁকের ফলশ্রুতিই বা কেন অমনধারা, এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করার বদলে, তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত ভালোলাগা (ফিল গুড) নামক সাবজেকটিভ খপ্পরে পড়ে পাঠক-সাধারণকে সেই ফাঁদে টানতে চাইতেন। যে কোনও পাঠবস্ত একটি স্থানিক কৌমসমাজের নিজস্ব ফসল। কৌমনিরপেক্ষ পাঠবস্ত অসম্ভব।

    কেবল উপরোক্ত দুটি পাশ্চাত্য সাহিত্যিক ঘটনা নয়, ষাটের দশকের বাংলা সাহিত্যে অন্যান্য যে আন্দোলনগুলো ঘটেছিল, যেমন নিমসাহিত্য, শ্রুতি, শাস্ত্রবিরোধী এবং ধ্বংসকালীন, তাদের সঙ্গেও হাংরি আন্দোলনের জ্ঞান-পরিমন্ডল, দর্শন-পরিসর, প্রতিপ্রশ্ন-প্রক্রিয়া, অভিজ্ঞতা-বিন্যাস, চিন্তার-আকরণ, প্রতীতি, বিশ্লেষণী আকল্প, প্রতিবেদনের সীমান্ত, প্রকল্পনার মনোবীজ, বয়ন-পরাবয়ন, ভাষা-পরাভাষা, জগৎ-পরাজগৎ, বাচনিক নির্মিতি, সত্তাজিজ্ঞাসা, উপস্থাপনার ব্যঞ্জনা, অপরত্ববোধ, চিহ্নাদির অন্তর্বয়ন, মানবিক সম্পর্ক বিন্যাসের অনুষঙ্গ, অভিধাবলীর তাৎপর্য, উপলব্ধির উপকরণ, স্বভাবাতিযায়ীতা, প্রতিস্পর্ধা, কৌমসমাজের অর্গল, গোষ্ঠীক্রিয়ার অর্থবহতা, প্রতাপবিরোধী অবস্থানের মাত্রা, প্রতিদিনের বাস্তব, প্রান্তিকায়নের স্বাতন্ত্র্য, বিকল্প অবলম্বন সন্ধান, চিহ্নায়নের অন্তর্ঘাত, লেখন-গ্রন্থনা, দেশজ অধিবাস্তব, অভিজ্ঞতার সূত্রায়ন-প্রকরণ, প্রেক্ষাবিন্দুর সমন্বয়, সমষ্টী পীড়াপুঞ্জ ইত্যাদি ব্যাপারে গভীর ও অসেতুসম্ভব পার্থক্য ছিল। ষাটের দশকের ওই চারটি আন্দোলনের সঙ্গে হাংরি প্রতিসন্দর্ভের যে-মিল ছিল তা হল এই যে পাঁচটি আন্দোলনই লেখকপ্রতিম্ব থেকে রোশনাইকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল পাঠবস্তর ওপর। অর্থাৎ লেখকের কেরামতি বিচার্য নয়, যা বিচার্য তা হল পাঠবস্তুর খুঁটিনাটি। লেখকের বদলে পাঠবস্তু যে গুরুত্বপূর্ণ, এই সনাতন ভারতীয়তা, মহাভারত ও রামায়ণ পাঠবস্তু দুটির দ্বারা প্রমাণিত।

    অনুশাসন মুক্তির ফলে, লিটল ম্যাগাজিনের নামকরণের ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল হাংরি আন্দোলন, যে, তারপর থেকে পত্রিকার নাম রাখার ঐতিহ্য একবারে বদলে গেল। কবিতা, ধ্রুপদী, কৃত্তিবাস, শতভিষা, উত্তরসূরী, অগ্রণী ইত্যাদি থেকে একশ আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে হাংরি আন্দালনকারীরা তাঁদের পত্রিকার নাম রাখলেন জেব্রা, উন্মার্গ, ওয়েস্টপেপার, ফুঃ কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ইত্যাদি। অবশ্য সাহিত্য শিল্পকে উন্মার্গ আখ্যাটি জীবনানন্দ দাশ বহু পূর্বে দিয়ে গিয়েছিলেন, যদিও হাংরি আন্দালনের সময় পর্যন্ত তিনি তেমন প্রতিষ্ঠা পান নি। জেব্রা নামকরণটি ছিল পাঠকের জন্যে নিশ্চিন্তে রাস্তা পার হয়ে হাংরি পাঠবস্তুর দিকে এগোবার ইশারা। হাংরি আন্দোলন সংঘটিত হবার আগে ওই পত্রিকাগুলোর নামকরণেই কেবল এলিটিজম ছিল তা নয়, সেসব পত্রিকাগুলোর একটি সম্পাদকীয় বৈশিষ্ট্য ছিল। বুর্জোয়া মূল্যবোধ প্রয়োগ করে একে-তাকে বাদ দেয়া বা ছাঁটাই করা, যে কারণে নিম্নবর্ণের লেখকের পাঠবস্ত সেগুলোর পৃষ্ঠায় অনুপস্থিত, বিশেষ করে কবিতা। আসলে কোন-কোন রচনাকে ‘টাইমলেস’ বলা হবে সে জ্ঞানটুকু ওই মূল্যবোধের ধারক-বাহকরা মনে করতেন তাঁদের কুক্ষিগত, কেননা সময় তো তাঁদের চোখে একরৈখিক, যার একেবারে আগায় আছেন কেবল তাঁরা নিজে।

    ‘টাইমলেস’ কাজের উদ্বেগ থেকে পয়দা হয়েছিল ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’ ভাবকল্পটি, যা উপনিবেশগুলোয় চারিয়ে দিয়ে মোক্ষম চাল দিয়েছিল সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপ। এই ভাবকল্পটির দ্বারা কালো, বাদামি, হলদে চামড়ার মানুষদের বহুকাল পর্যন্ত এমন সম্মোহিত করে রেখেছিল সাম্রাজ্যবাদী নন্দনভাবনা যাতে সাহিত্য-শিল্প হয়ে যায় উদ্দেশ্যহীন ও সমাজমুক্ত, যাতে পাঠবস্তু হয়ে যায় বার্তাবর্জিত, যাতে সন্দর্ভের শাসক-বিরোধী অন্তর্ঘাতী ক্ষমতা লুপ্ত হয়, এবং তা হয়ে যায় জনসংযোগহীন। হাংরি বুলেটিন যেহেতু প্রকাশিত হতো হ্যান্ডবিলের মতন ফালিকাগজে, তা পরের দিনই সময় থেকে হারিয়ে যেত। নব্বইটির বেশি বুলেটিন চিরকালের জন্যে হারিয়ে গেছে। লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরির পক্ষেও ও বুলেটিনগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণ সম্ভব হয়নি।

    যে কোন আন্দোলনের জন্ম হয় কোন না কোন আধিপত্য প্রণালীর বিরুদ্ধে। তা সে রাজনৈতিক আধিপত্য হোক বা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক, নৈতিক, নান্দনিক, ধার্মিক, সাহিত্যিক, শৈল্পিক ইত্যাদি আধিপত্য হোক না কেন। আন্দোলন-বিশেষের উদ্দেশ্য, অভিমুখ, উচ্চাকাঙ্খা, গন্তব্য হল সেই প্রণালীবদ্ধতাকে ভেঙে ফেলে পরিসরটিকে মুক্ত করা। হাংরি আন্দোলন কাউকে বাদ দেবার প্রকল্প ছিল না। যে কোন কবি বা লেখক, ওই আন্দোলনের সময়ে যিনি নিজেকে হাংরি আন্দোলনকারী মনে করেছেন, তাঁর খুল্লমখুল্লা স্বাধীনতা ছিল হাংরি বুলেটিন বের করার। বুলেটিনগুলোর প্রকাশকদের নাম-ঠিকানা দেখলেই স্পষ্ট হবে (অন্তত যে-কটির খোঁজ মিলেছে তাদের ক্ষেত্রেও) যে, তা ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্নজন কর্তৃক ১৯৬৩-র শেষ দিকে এবং ১৯৬৪-র প্রথমদিকে প্রকাশিত। ছাপার খরচ অবশ্য আমি বা দাদা যোগাতাম, কেননা, অধিকাংশ আন্দোলনকারীর আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, উৎপল কুমার বসুও নিজের খরচে প্রকাশ করেছিলেন বুলেটিন। অর্থাৎ হাংরি বুলেটিন কারোর প্রায়ভেট প্রপার্টি ছিল না। এই বোধের মধ্যে ছিল পূর্বতন সন্দর্ভগুলোর মনোবীজে লুকিয়ে থাকা সত্ত্বাধিকার বোধকে ভেঙে ফেলার প্রতর্ক যা সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপীয়রা এদেশে এনেছিল। ইউরোপীয়রা আসার আগে বঙ্গদেশে পার্সোনাল পজেশান ছিল, কিন্তু প্রায়ভেট প্রপার্টি ছিল না।

    হাংরি আন্দোলনের কোন হেড কোয়ার্টার, হাইকমান্ড, গভর্নিং কাউনসিল বা সম্পাদকের দপ্তর ধরণের ক্ষমতাকেন্দ্র ছিল না, যেমন ছিল কবিতা, ধ্রুপদী, কৃত্তিবাস ইত্যাদি পত্রিকার ক্ষেত্রে, যার সম্পাদক বাড়ি বদল করলে পত্রিকা দপ্তরটি নতুন বাড়িতে উঠে যেত। হাংরি আন্দোলন কুক্ষিগত ক্ষমতাকেন্দ্রের ধারণাকে অতিক্রম করে প্রতিসন্দর্ভকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিল প্রান্তবর্তী এলাকায়, যে কারণে কেবল বহির্বঙ্গের বাঙালি শিল্পী-সাহিত্যিক ছাড়াও তা হিন্দি, উর্দু, নেপলি, অসমীয়া, মারাঠি ইত্যাদি ভাষায় ছাপ ফেলতে পেরেছিল। এখনও মাঝে মধ্যে কিশোর-তরুণরা এখান-সেখান থেকে নিজেদের হাংরি আন্দোলনকারী ঘোষণা করে গর্বিত হন, যখন কিনা আন্দোলনটি চল্লিশ বছর আগে, ১৯৬৫ সালে ফুরিয়ে গিয়েছে।

    বিয়াল্লিশ বছর আগে সুবিমল বসাক, হিন্দি কবি রাজকমল চৌধুরীর সঙ্গে, একটি সাইক্লোস্টাইল করা ত্রিভাষিক (বাংলা-হিন্দি-ইংরেজি) হাংরি বুলেটিন প্রকাশ করেছিলেন, তদানীন্তন সাহিত্যিক সন্দর্ভের প্রেক্ষিতে হাংরি প্রতিসন্দর্ভ যে কাজ উপস্থাপন করতে চাইছে তা স্পষ্ট করার জন্যে। তাতে দেয়া তালিকাটি থেকে আন্দোলনের অভিমুখের কিছুটা হদিশ মিলবে:

    ১৯৬৩ সালের শেষ দিকে সুবিমল বসাকের আঁকা বেশ কিছু লাইন ড্রইং, যেগুলো ঘন-ঘন হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত হচ্ছিল, তার দরুণ তাঁকে পরপর দুবার কফিহাউসের সামনে ঘিরে ধরলেন অগ্রজ বিদ্বজ্জন এবং প্রহারে উদ্যত হলেন, এই অজুহাতে যে সেগুলো অশ্লীল। একই অজুহাতে কফিহাউসের দেয়ালে সাঁটা অনিল করঞ্জাইয়ের আঁকা পোস্টার আমরা যতবার লাগালুম ততবার ছিঁড়ে ফেলে দেয়া হল। বোঝা যাচ্ছিল যে, কলোনিয়াল ইসথেটিক রেজিমের চাপ তখনও অপ্রতিরোধ্য। হাংরি আন্দোলনের ১৫ নম্বর বুলেটিন এবং ৬৫ নং বুলেটিন, যথাক্রমে রাজনৈতিক ও ধর্ম সম্পর্কিত ইশতাহারের, যাকে বলে স্লো বলিং এফেক্ট, আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল, এবং আমাদের অজ্ঞাতসারে ক্রুদ্ধ করে তুলছিল মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের এসট্যাবলিশমেন্টকে। আজকের ভারতবর্ষের দিকে তাকিয়ে ইশতাহার দুটিকে অলমোস্ট প্রফেটিক বলা যায়। এরপর, যখন রাক্ষস জোকার মিকিমাউস জন্তজানোয়ার ইত্যাদির কাগুজে মুখোশে ‘দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন’ বার্তাটি ছাপিয়ে হাংরি আন্দোলনের পক্ষ থেকে মুখ্য ও অন্যান্য মন্ত্রীদের মুখ্য ও অন্যান্য সচিবদের জেলা শাসকদের, সংবাদপত্র মালিক ও সম্পাদকদের, বাণিজ্যিক লেখকদের পাঠান হল, তখন সমাজের এলিট অধিপতিরা আসরে নামলেন। এ ব্যাপারে কলকাঠি নাড়লেন একটি পত্রিকা গোষ্ঠীর মালিক, তাঁর বাংলা দৈনিকের বার্তা সম্পাদক এবং মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের খোরপোষে প্রতিপালিত একটি ইংরেজি ত্রৈমাসিকের কর্তাব্যক্তিরা।

    ১৯৬৪ এর সেপ্টেম্বরে রাষ্টের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার হলুম আমি, প্রদীপ চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ, দেবী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ এবং দাদা সমীর রায়চৌধুরী। এই অভিযোগে উৎপল কুমার বসু, সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবো আচার্য এবং রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইসু হয়ে থাকলেও, তাঁদের প্রেপ্তার করা হয়নি। এরকম একটি অভিযোগ এই জন্যে চাপান হয়েছিল যাতে বাড়ি থেকে থানায় এবং থানা থেকে আদালতে হাতে হাতকড়া পরিয়ে আর কোমরে দড়ি বেঁধে চোরডাকাতদের সঙ্গে সবায়ের সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। অন্তর্ঘাতের অভিযোগটি সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ থেকে মে ১৯৬৫ পর্যন্ত বজায় ছিল, এবং ওই নয় মাস যাবৎ রাষ্ট্রযন্ত্রটি তার বিভিন্ন বিভাগের মাধ্যমে হাংরি আন্দোলনকারীরূপে চিহ্নিত প্রত্যেকের সম্পর্কে খুটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করে ফেলেছিল, এবং তাদের তখন পর্যন্ত যাবতীয় লেখালেখি সংগ্রহ করে ঢাউস-ঢাউস ফাইল তৈরি করেছিল, যেগুলো লালবাজারে পুলিশ কমিশনারের কনফারেন্স রুমের টেবিলে দেখেছিলুম, যখন কলকাতা পুলিশ, স্বরাষ্ট্র দফতর, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ ও ভারতীয় সেনার উচ্চপদস্থ আধিকারিক এবং পশ্চিমবঙ্গের অ্যাডভোকেট জেনারালকে নিয়ে গঠিত একটি বোর্ড আমাকে আর দাদা সমীর রায়চৌধুরীকে কয়েক ঘন্টা জেরা করেছিল।

    অভিযোগটি কোন সাংস্কৃতিক অধিপতির মস্তিস্কপ্রসূত ছিল জানি না। তবে অ্যাডভোকেট জেনারেল মতামত দিলেন যে এরকম আজেবাজে তথ্যের ওপর তৈরি এমন সিরিয়াস অভিযোগ দেখলে আদালত চটে যাবে। তখনকার দিনে টাডা-পোটা ধরণের আইন ছিল না। ফলত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে নিয়ে ১৯৬৫ সালের মে মাসে বাদবাকি সবাইকে ছেড়ে দিয়ে কেবল আমার বিরুদ্ধে মামলা রুজু হল, এই অভিযোগে যে সাম্প্রতিকতম হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত আমার ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি অশ্লীল। আমার বিরুদ্ধে মামলাটা দায়ের করা সম্ভব হল শৈলেশ্বর ঘোষ এবং সুভাষ ঘোষ আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে গেলেন বলে। অর্থাৎ হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে গেল। ওনারা দুজনে হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে মুচলেকা দিলেন, যার প্রতিলিপি চার্জশিটের সঙ্গে আদালত আমায় দিয়েছিল ।

    প্রসিকিউশনের পক্ষে এই দুজন রাজসাক্ষীকে তেমন নির্ভরযোগ্য মনে হয়নি । তাই আমার বিরুদ্ধে সমীর বসু আর পবিত্র বল্লভ নামে দুজন ভুয়ো সাক্ষীকে উইটনেস বক্সে তোলা হয়, যাদের আমি কোন জন্মে দেখিনি, অথচ যারা এমনভাবে সাক্ষ্য দিয়েছিল যেন আমার সঙ্গে কতই না আলাপ-পরিচয়। এই দুজন ভুয়ো সাক্ষীর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আমাকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা। আমার কৌশুলিদের জেরায় এরা দুজন ভুয়ো প্রমাণ হবার সম্ভাবনা দেখা দিলে প্রসিকিউশন আমার বিরুদ্ধে উইটনেস বক্সে তোলে, বলাবাহুল্য গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়ে, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে। ফলে আমিও আমার পক্ষ থেকে সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করাই জ্যোতির্ময় দত্ত, তরুণ সান্যাল আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। বহু সাহিত্যিককে অনুরোধ করেছিলুম, কিন্তু এনারা ছাড়া আর কেউ রাজি হননি। শক্তি এবং সুনীল, দুই বন্ধু, একটি মকদ্দমায় পরস্পরের বিরুদ্ধে, চল্লিশ বছর পর ব্যাপারটা অবিশ্বস্য মনে হয়। সবায়ের সাক্ষ্য ছিল বেশ মজাদার, যাকে বলে কোর্টরুম-ড্রামা।

    তেরটা আদালতঘরের মধ্যে আমার মকদ্দমাটা ছিল নয় নম্বর এজলাসে। বিচারকের মাথার ওপর হলদে টুনি বালবটা ছাড়া আলোর বালাই ছিল না জানালাহীন ঘরটায়। অবিরাম ক্যাচোর-ক্যাচোর শব্দে অবসর নেবার অনুরোধ জানাত দুই ব্লেডের বিশাল ছাদপাখা। পেশকার গাংগুলি বাবুর অ্যান্টিক টেবিলের লাগোয়া বিচারকের টানা টেবিল, বেশ উঁচু, ঘরের এক থেকে আরেক প্রান্ত, বিচারকের পেছনে দেয়ালে টাঙানো মহাত্মা গান্ধীর ফোকলা-হাসি রঙিন ছবি। ইংরেজরা যাবার পর চুনকাম হয়নি ঘরটা। হয়ত ঘরের ঝুলগুলোও তখনকার। বিচারকের টেবিলের বাইরে, ওনার ডান দিকে, দেয়াল ঘেঁষে, জাল-ঘেরা লোহার শিকের খাঁচা, জামিন-না-পাওয়া বিচারাধীনদের জন্যে, যারা ওই খাঁচার পেছনের দরোজা দিয়ে ঢুকত। খাঁচাটা অত্যন্ত নোংরা। আমি যেহেতু ছিলুম জামিনপ্রাপ্ত, দাঁড়াতুম খাঁচার বাইরে। ঠ্যাঙ ব্যথা করলে, খাঁচায় পিঠ ঠেকিয়ে।

    পেশকার মশায়ের টেবিলের কাছাকাছি থাকত গোটাকতক আস্ত-হাতল আর ভাঙা-হাতল চেয়ার, কৌঁসুলিদের জন্যে। ঘরের বাকিটুকুতে ছিল নানা মাপের, আকারের, রঙের নড়বড়ে বেঞ্চ আর চেয়ার, পাবলিকের জন্যে, ছারপোকা আর খুদে আরশোলায় গিজগিজে। টিপেমারা ছারপোকার রক্তে, পানের পিকে, ঘরের দেয়ালময় ক্যালিগ্রাফি। বসার জায়গা ফাঁকা থাকত না। কার মামলা কখন উঠবে ঠিক নেই। ওই সর্বভারতীয় ঘর্মাক্ত গ্যাঞ্জামে, ছারপোকার দৌরাত্মে, বসে থাকতে পারতুম না বলে সারা বাড়ি এদিক-ওদিক ফ্যা-ফ্যা করতুম, এ-এজলাস সে-এজলাস চক্কর মারতুম, কৌতুহলোদ্দীপক সওয়াল-জবাব হলে দাঁড়িয়ে পড়তুম। আমার কেস ওঠার আগে সিনিয়ার উকিলের মুহুরিবাবু আমায় খুঁজে পেতে ডেকে নিয়ে যেতেন। মুহুরিবাবু মেদিনীপুরের লোক, পরতেন হাঁটু পর্যন্ত ধুতি, ক্যাম্বিশের জুতো, ছাইরঙা শার্ট। সে শার্টের ঝুল পেছন দিকে হাঁটু পর্যন্ত আর সামনে দিকে কুঁচকি পর্যন্ত। হাতে লম্বালম্বি ভাঁজ করা ফিকে সবুজ রঙ্গের দশ-বারটা ব্রিফ, যেগুলো নিয়ে একতলা থেকে তিনতলার ঘরে-ঘরে লাগাতার চরকি নাচন দিতেন।

    আমার সিনিয়র উকিল ছিলেন ক্রিমিনাল লয়ার চন্ডীচরণ মৈত্র। সাহিত্য সম্পর্কে ওনার কোন রকম ধারণা ছিল না বলে লেবার কোর্টের উকিল সতেন বন্দ্যোপাধ্যায়কেও রাখতে হয়েছিল। চাকরি থেকে সাসপেন্ডেড ছিলুম কেস চলার সময়ে, তার ওপর কলকাতায় আমার মাথা গোঁজার ঠাই ছিল না। খরচ সামলানো অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল।

    আদালত চত্বরটা সবসময় ভিড়ে গিজগিজ করত। ফেকলু উকিলরা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে “সাক্ষী চাই? সাক্ষী চাই? এফিডেফিট হবে।” বলে-বলে চেচাত মক্কেল যোগাড়ের ধান্দায়। সারা বাড়ি জুড়ে যেখানে টুলপেতে টাইপরাইটারে ফটর ফটর ট্যারাবেকা টাইপ করায় সদাব্যস্ত টাইপিস্ট, পাশে চোপসানো মুখ লিটিগ্যান্ট। একতলায় সর্বত্র কাগজ, তেলেভাজা, অমলেট, চা-জলখাবার, ভাতরুটির ঠেক। কোর্ট পেপার কেনার দীর্ঘ কিউ। চাপরাসি- আরদালির কাজে যে সব বিহারিদের আদালতে চাকরি দিয়েছিল ইংরেজরা, তারা চত্বরের খোঁদলগুলো জবরদখল করে সংসার পেতে ফেলেচে। জেল থেকে খতরনাক আসামিরা পুলিশের বন্ধ গাড়িতে এলে, পানাপুকুরে ঢিল পড়ার মতন একটু সময়ের জন্যে সরে যেত ভিড়টা। তারপর যে কে সেই। সন্দর্ভ ও প্রতিসন্দর্ভের সামাজিক সংঘাতক্ষেত্র হিসেবে আদালতের মতন সংস্থা সম্ভবত আর নেই। 

    সাক্ষ্যাদি শেষ হবার পর দুপক্ষের দীর্ঘ বহস হল একদিন, প্রচুর তর্কাতর্কি হল। আমি খাঁচার কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে। রায় দেবার দিন পড়ল ১৯৬৫ সালের আঠাশে ডিসেম্বর। ইতিমধ্যে আমেরিকার ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে সংবাদ হয়ে গেছি। যুগান্তর দৈনিকে ‘আর মিছিলের শহর নয়’ এবং ‘যে ক্ষুধা জঠরের নয়’ শিরোনামে প্রধান সম্পাদকীয় লিখলেন কৃষ্ণ ধর। যুগান্তর দৈনিকে সুফী এবং আনন্দবাজার পত্রিকায় চন্ডী লাহিড়ী কার্টুন আঁকলেন আমায় নিয়ে। সমর সেন সম্পাদিত ‘নাউ’ পত্রিকায় পরপর দুবার লেখা হল আমার সমর্থনে। দি স্টেটসম্যান পত্রিকায় হাংরি আন্দোলনের সমর্থনে সমাজ-বিশ্লেষণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হল। ধর্মযুগ, দিনমান, সম্মার্গ, সাপ্তাহিক হিন্দুস্থান, জনসত্তা পত্রিকায় উপর্যুপরি ফোটো ইত্যাদিসহ লিখলেন ধর্মবীর ভারতী, এস. এইচ. বাৎসায়ন অজ্ঞেয়, ফনীশ্বর নাথ রেণু, কমলেশ্বর, শ্রীকান্ত ভর্মা, মুদ্রারাক্ষস, ধুমিল, রমেশ বকশি প্রমুখ। কালিকটের মালায়ালি পত্রিকা যুগপ্রভাত হাংরি আন্দোলনকে সমর্থন করে দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশ করল। বুয়েনস আয়ার্স-এর প্যানারোমা পত্রিকার সাংবাদিক আমার মকদ্দমা কভার করল। পাটনার দৈনিক দি সার্চলাইট প্রকাশ করল বিশেষ ক্রোড়পত্র। বিশেষ হাংরি আন্দোলন সংখ্যা প্রকাশ করল জার্মানির ক্ল্যাকটোভিডসেডস্টিন পত্রিকা, এবং কুলচুর পত্রিকা ছাপলো সবকটি ইংরেজি ম্যানিফেস্টো। আমেরিকায় হাংরি আন্দোলনকারীদের ফোটো, ছবি-আঁকা, রচনার অনুবাদ ইত্যাদি নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করল সল্টেড ফেদার্স, ট্রেস, ইনট্রেপিড, সিটি লাইটস জার্নাল, সান ফ্রানসিসকো আর্থকোয়েক, র্যামপার্টস, ইমেজো হোয়্যার ইত্যাদি লিটল ম্যাগজিন। সম্পাদকীয় প্রকাশিত হল নিউ ইয়র্কের এভারগ্রিন রিভিউ, আর্জেনটিনার এল কর্নো এমপ্লমাদো এবং মেকসিকোর এল রেহিলেতে পত্রিকায়। পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে কলকাতায় টিটকিরি মারা ছাড়া আর কিছু করেন নি বাঙ্গালি সাহিত্যিকরা।

    ভুয়ো সাক্ষী, রাজ সাক্ষী আর সরকারি সাক্ষীদের বক্তব্যকে যথার্থ মনে করে আমার পক্ষের সাক্ষীদের বক্তব্য নাকচ করে দিলেন ফৌজদারি আদালতের বিচারক। দুশো টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের কারাদান্ড ধার্য করলে তিনি। আমি হাইকোর্টে রিভিশন পিটিশন করার জন্যে আইনজীবির খোঁজে বেরিয়ে দেখলুম যে খ্যাতিমান কৌঁসুলিদের এক দিনের বহসের ফি প্রায় লক্ষ টাকা, অনেকে প্রতি ঘন্টা হিসেবে চার্জ করেন, তাঁরা ডজনখানেক সহায়ক উকিল দুপাশে দাঁড় করিয়ে বহস করেন। জ্যোতির্ময় দত্ত পরিচয় করিয়ে দিলেন সদ্য লন্ডন-ফেরত ব্যারিস্টার করুণাশঙ্কর রায়ের সঙ্গে। তাঁর সৌজন্যে আমি তখনকার বিখ্যাত আইনজীবি মৃগেন সেনকে পেলুম। নিজের সহায়কদের নিয়ে তিনি কয়েক দিন বসে তর্কের স্ট্রাটেজি কষলেন। ১৯৬৭ সালের ছাব্বিশে জুলাই আমার রিভিশন পিটিশানের শুনানি হল। নিম্ন আদালতের রায় নাকচ করে দিলেন বিচারক টি. পি. মুখার্জি। ফিস ইন্সটলমেন্টে দেবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন করুণাশঙ্কর রায়।

    হাংরি আন্দোলন চল্লিশ বছর আগে শেষ হয়ে গেছে। এখন শুরু হয়েছে তাকে নিয়ে ব্যবসা। সমীর চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি (আমার দাদার নামের মিলটা কাজে লাগান হয়েছে) ‘হাংরি জেনারেশন রচনা সংকলন’ নামে একটা বই বের করেছেন। তাতে অন্তর্ভূক্ত অধিকাংশ লেখককে আমি চিনি না। শক্তি, সন্দীপন, উৎপল, বিনয়, সমীর, দেবী, সুবিমল, এবং আমার রচনা তাতে নেই। অনিল, করুণা, সুবিমলের আঁকা ছবি নেই। একটিও ম্যানিফেস্টো নেই। বাজার নামক ব্যাপারটি একটি ভয়ংকর সাংস্কৃতিক সন্দর্ভ।

    তিন

    বাংলা সাহিত্যে হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে অভিজিৎ পাল একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, এবাদুল হক সম্পাদিত ‘আবার এসেছি ফিরে’ পত্রিকায়, তা থেকে উল্লেখ্য অংশ তুলে দিচ্ছি এখানে :

    বাংলা সাহিত্যে ষাটের দশকের হাংরি জেনারেশনের ন্যায় আর কোনও আন্দোলন তার পূর্বে হয় নাই । হাজার বছরের বাংলা ভাষায় এই একটিমাত্র আন্দোলন যা কেবল সাহিত্যের নয় সম্পূর্ণ সমাজের ভিত্তিতে আঘাত ঘটাতে পেরেছিল, পরিবর্তন আনতে পেরেছিল। পরবর্তীকালে তরুণ সাহিত্যিক ও সম্পাদকদের সাহস যোগাতে পেরেছে । 

    ১ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা সাহিত্যকে পণ্য হিসাবে চিহ্ণিত করতে অস্বীকার করেছিলেন । কেবল তাই নয় ; তাঁরা এক পৃষ্ঠার লিফলেট প্রকাশ করতেন ও বিনামূল্যে আগ্রহীদের মাঝে বিতরণ করতেন । তাঁরাই প্রথম ফোলডার-কবিতা, পোস্ট-কার্ড কবিতা, ও পোস্টারে কবিতা ও কবিতার পংক্তির সূত্রপাত করেন । পোস্টার এঁকে দিতেন অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায় । ফোলডারে স্কেচ আঁকতেন সুবিমল বসাক  । ত্রিদিব মিত্র তাঁর ‘উন্মার্গ’ পত্রিকার প্রচ্ছদ নিজে আঁকতেন। পরবর্তীকালে দুই বাংলাতে তাঁদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় ।

    ২ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা । তাঁদের আগমনের পূর্বে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করার কথা সাহিত্যকরা চিন্তা করেন নাই । সুভাষ ঘোষ বলেছেন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অর্থ সরকার বিরোধিতা নয়, সংবাদপত্র বিরোধিতা নয় ; হাংরি জেনারেশনের বিরোধ প্রচলিত সাহিত্যের মৌরসি পাট্টাকে উৎখাত করে নবতম মূল্যবোধ সঞ্চারিত করার । নবতম শৈলী, প্রতিদিনের বুলি, পথচারীর ভাষা, ছোটোলোকের কথার ধরণ, ডিকশন, উদ্দেশ্য, শব্দ ব্যবহার, চিন্তা ইত্যাদি । পশ্চিমবঙ্গে বামপন্হী সরকার সত্বেও বামপন্হী কবিরা মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ থেকে নিষ্কৃতি পান নাই । শ্রমিকের কথ্য-ভাষা, বুলি, গালাগাল, ঝগড়ার অব্যয় তাঁরা নিজেদের রচনায় প্রয়োগ করেন নাই । তা প্রথম করেন হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগন ; উল্লেখ্য হলেন অবনী ধর, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র প্রমুখ । সুবিমল বসাকের পূর্বে ‘বাঙাল ভাষায়’ কেউ কবিতা ও উপন্যাস লেখেন নাই। হাংরি জেনারেশনের পরবর্তী দশকগুলিতে লিটল ম্যাগাজিনের লেখক ও কবিদের রচনায় এই প্রভাব স্পষ্ট ।

    ৩ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের তৃতীয় অবদান কবিতা ও গল্প-উপন্যাসে ভাষাকে ল্যাবিরিনথাইন করে প্রয়োগ করা । এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা ও গল্প-উপন্যাস । মলয় রায়চৌধুরী সর্বপ্রথম পশ্চিমবাংলার সমাজে ডিসটোপিয়ার প্রসঙ্গ উথ্থাপন করেন । বামপন্হীগণ যখন ইউটোপিয়ার স্বপ্ন প্রচার করছিলেন সেই সময়ে মলয় রায়চৌধুরী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন ডিসটোপিয়ার দরবারি কাঠামো ।উল্লেখ্য তাঁর নভেলা ‘ঘোগ’, ‘জঙ্গলরোমিও’, গল্প ‘জিন্নতুলবিলদের রূপকথা’, ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ ইত্যাদি । তিনি বর্ধমানের সাঁইবাড়ির ঘটনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অবলম্বনে লেখেন ‘আরেকবারে ক্ষুধিত পাষাণ’ । বাঙাল ভাষায় লিখিত সুবিমল বসাকের কবিতাগুলিও উল্লেখ্য । পরবর্তী দশকের লিটল ম্যাগাজিনের কবি ও লেখকদের রচনায় এই প্রভাব সুস্পষ্ট ।

    ৪ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের চতুর্থ অবদান হলো পত্রিকার নামকরণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে পত্রিকাগুলির নামকরণ হতো ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’, ‘শতভিষা’, ‘পূর্বাশা’ ইত্যাদি যা ছিল মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ পত্রিকার নামকরণ করলেন ‘জেব্রা’, ‘জিরাফ’, ‘ধৃতরাষ্ট্র’, ‘উন্মার্গ’, ‘প্রতিদ্বন্দী’ ইত্যাদি । পরবর্তীকালে তার বিপুল প্রভাব পড়েছে । পত্রিকার নামকরণে সম্পূর্ণ ভিন্নপথ আবিষ্কৃত হয়েছে ।

    ৫ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনে সর্বপ্রথম সাবঅলটার্ন অথবা নিম্নবর্গের লেখকদের গুরুত্ব প্রদান করতে দেখা গিয়েছিল । ‘কবিতা’, ‘ধ্রুপদি’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’ ইত্যাদি পত্রিকায় নিম্নবর্গের কবিদের রচনা পাওয়া যায় না । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের বুলেটিনগুলির সম্পাদক ছিলেন চাষি পরিবারের সন্তান হারাধন ধাড়া । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ তৎকালীন কবিরা তাঁর এমন সমালোচনা করেছিলেন যে তিনি এফিডেভিট করে ‘দেবী রায়’ নাম নিতে বাধ্য হন । এছাড়া আন্দোলনে ছিলেন নিম্নবর্গের চাষী পরিবারের শম্ভু রক্ষিত, তাঁতি পরিবারের সুবিমল বসাক,  জাহাজের খালাসি অবনী ধর, মালাকার পরিবারের নিত্য মালাকার ইত্যাদি । পরবর্তীকালে প্রচুর সাবঅলটার্ন কবি-লেখকগণকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে দেখা গেল। 

    ৬ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো রচনায় যুক্তিবিপন্নতা, যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে মুক্তি, যুক্তির বাইরে বেরোনোর প্রবণতা, আবেগের সমউপস্হিতি, কবিতার শুরু হওয়া ও শেষ হওয়াকে গুরুত্ব না দেয়া, ক্রমান্বয়হীনতা, যুক্তির দ্বৈরাজ্য, কেন্দ্রাভিগতা বহুরৈখিকতা ইত্যাদি । তাঁদের আন্দোলনের পূর্বে টেক্সটে দেখা গেছে যুক্তির প্রাধান্য, যুক্তির প্রশ্রয়, সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতন যুক্তি ধাপে-ধাপে এগোতো, কবিতায় থাকতো আদি-মধ্য-অন্ত, রচনা হতো একরৈখিক, কেন্দ্রাভিগ, স্বয়ংসম্পূর্ণতা । 

    ৭) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে লেখক-কবিগণ আশাবাদে আচ্ছন্ন ছিলেন মূলত কমিউনিস্ট প্রভাবে । ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখতেন । বাস্তব জগতের সঙ্গে তাঁরা বিচ্ছিন্ন ছিলেন । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ প্রথমবার হেটেরোটোপিয়ার কথা বললেন । হাংরি জেনারেশনের কবি অরুণেশ ঘোষ তাঁর কবিতাগুলোতে বামপন্হীদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। হাংরি জেনরেশনের পরের দশকের কবি ও লেখকগণের নিকট বামপন্হীদের দুইমুখো কর্মকাণ্ড ধরা পড়ে গিয়েছে, বিশেষ করে মরিচঝাঁপি কাণ্ডের পর ।

    ৮ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে কবি-লেখকগণ মানেকে সুনিশ্চিত করতে চাইতেন, পরিমেয়তা ও মিতকথনের কথা বলতেন, কবির নির্ধারিত মানে থাকত এবং স্কুল কলেজের ছাত্ররা তার বাইরে যেতে পারতেন না । হাংরি জেনারেশনের লেখকগণ অফুরন্ত অর্থময়তা নিয়ে এলেন, মানের ধারণার প্রসার ঘটালেন, পাঠকের ওপর দায়িত্ব দিলেন রচনার অর্থময়তা নির্ধারণ করার, প্রচলিত ধারণা অস্বীকার করলেন । শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতার সঙ্গে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে ।

    ৯ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে ‘আমি’ থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক আমি থাকতো, লেখক-কবি ‘আমি’র নির্মাণ করতেন, তার পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড থাকতো, সীমার স্পষ্টিকরণ করতেন রচনাকার, আত্মপ্রসঙ্গ ছিল মূল প্রসঙ্গ, ‘আমি’র পেডিগ্রি পরিমাপ করতেন আলোচক। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ নিয়ে এলেন একক আমির অনুপস্হিতি, আমির বন্ধুত্ব, মানদণ্ড ভেঙে ফেললেন তাঁরা, সীমা আবছা করে দিলেন, সংকরায়ন ঘটালেন, লিমিন্যালিটি নিয়ে এলেন ।

    ১০ ) হাংরি  জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে শিরোনাম দিয়ে বিষয়কেন্দ্র চিহ্ণিত করা হতো । বিষয় থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক মালিকানা ছিল, লেখক বা কবি ছিলেন টাইটেল হোলডার। হাংরি জেনারেশনের লেখক-কবিগণ শিরোনামকে বললেন রুবরিক ; শিরোনাম জরুরি নয়, রচনার বিষয়কেন্দ্র থাকে না, মালিকানা বিসর্জন দিলেন, ঘাসের মতো রাইজোম্যাটিক তাঁদের রচনা, বৃক্ষের মতন এককেন্দ্রী নয় । তাঁরা বললেন যে পাঠকই টাইটেল হোলডার।

    ১১ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে কবিতা-গল্প-উপন্যাস রচিত হতো ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ অনুযায়ী একরৈখিক রীতিতে । তাঁদের ছিল লিনিয়রিটি, দিশাগ্রস্ত লেখা, একক গলার জোর, কবিরা ধ্বনির মিল দিতেন, সময়কে মনে করতেন প্রগতি । এক রৈখিকতা এসেছিল ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্হের কাহিনির অনুকরণে ; তাঁরা সময়কে মনে করতেন তা একটিমাত্র দিকে এগিয়ে চলেছে । আমাদের দেশে বহুকাল যাবত সেকারণে ইতিহাস রচিত হয়েছে কেবল দিল্লির সিংহাসন বদলের । সারা ভারত জুড়ে যে বিভিন্ন রাজ্য ছিল তাদের ইতিহাস অবহেলিত ছিল । বহুরৈখিকতারে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘মহাভারত’ । হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকগণ একরৈখিকতা বর্জন করে বহুরৈখিক রচনার সূত্রপাত ঘটালেন । যেমন সুবিমল বসাকের ‘ছাতামাথা’ উপন্যাস, মলয় রায়চৌধুরীর দীর্ঘ কবিতা ‘জখম’, সুভাষ ঘোষের গদ্যগ্রন্হ ‘আমার চাবি, ইত্যাদি । তাঁরা গ্রহণ করলেন প্লুরালিজম, বহুস্বরের আশ্রয়, দিকবিদিক গতিময়তা, হাংরি জেনারেশনের দেখাদেখি আটের দশক থেকে কবি ও লেখকরা বহুরৈখিক রচনা লিখতে আরম্ভ করলেন ।

    ১২ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে মনে করা হতো কবি একজন বিশেষজ্ঞ । হাংরি জেনারেশনের কবিরা বললেন কবিত্ব হোমোসেপিয়েন্সের প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য । পরবর্তী প্রজন্মে বিশেষজ্ঞ কবিদের সময় সমাপ্ত করে দিয়েছেন নতুন কবির দল এবং নবনব লিটল ম্যাগাজিন ।

    ১৩ ) ঔপনিবেশিক প্রভাবে বহু কবি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতেন । ইউরোপীয় লেখকরা যেমন নিজেদের ‘নেটিভদের’ তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করতেন । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে শ্রেষ্ঠ কবি, শ্রেষ্ঠ কবিতা, শ্রেষ্ঠত্ব, বিশেষ একজনকে তুলে ধরা, নায়ক-কবি, সরকারি কবির শ্রেষ্ঠত্ব, হিরো-কবি, এক সময়ে একজন বড়ো কবি, ব্র্যাণ্ড বিশিষ্ট কবি  আইকন কবি ইত্যাদির প্রচলন ছিল । হাংরি জেনারেশন সেই ধারণাকে ভেঙে ফেলতে পেরেছে তাদের উত্তরঔপনিবেশিক মূল্যবোধ প্রয়োগ করে । তারা বিবেচন প্রক্রিয়া থেকে কেন্দ্রিকতা সরিয়ে দিতে পেরেছে, কবির পরিবর্তে একাধিক লেখককের সংকলনকে গুরুত্ব দিতে পেরেছে, ব্যক্তি কবির পরিবর্তে পাঠকৃতিকে বিচার্য করে তুলতে পেরেছে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার কথা বলেছে । সার্বিক চিন্তা-চেতনা ও কৌমের কথা বলেছে । তাঁদের পরবর্তী কবি-লেখকরা হাংরি জেনারেশনের এই মূল্যবোধ গ্রহণ করে নিয়েছেন ।

    ১৪ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে শব্দার্থকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রচলন ছিল । রচনা ছিল কবির ‘আমি’র প্রতিবেদন । হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকরা বলেছেন কথা চালিয়ে যাবার কথা। বলেছেন যে কথার শেষ নেই । নিয়েছেন শব্দার্থের ঝুঁকি । রচনাকে মুক্তি দিয়েছেন আত্মমনস্কতা থেকে । হাংরি জেনারেশনের এই কৌম মূল্যবোধ গ্রহণ করে নিয়েছেন পরবর্তীকালের কবি-লেখকরা । এই প্রভাব সামাজিক স্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।

    ১৫ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত ছিল ‘বাদ’ দেবার প্রবণতা ; সম্পাদক বা বিশেষ গোষ্ঠী নির্ণয় নিতেন কাকে কাকে বাদ দেয়া হবে । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে সাংস্কৃতিক হাতিয়ার ছিল “এলিমিনেশন”। বাদ দেবার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংস্কৃতিকে তাঁরা নিজেদের আয়ত্বে রাখতেন । হাংরি জেনারেশনের সম্পাদকরা ও সংকলকরা জোট বাঁধার কথা বললেন । যোগসূত্র খোঁজাল কথা বললেন । শব্দজোট, বাক্যজোট, অর্থজোটের কথা বললেন । এমনকি উগ্র মতামতকেও পরিসর দিলেন । তাঁদের এই চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালের সম্পাদক ও সংকলকদের অবদানে স্পষ্ট । যেমন অলোক বিশ্বাস আটের দশকের সংকলনে ও আলোচনায় সবাইকে একত্রিত করেছেন । বাণিজ্যিক পত্রিকা ছাড়া সমস্ত লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রে এই গুণ উজ্বল ।

    ১৬ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত একটিমাত্র মতাদর্শকে, ইজমকে, তন্ত্রকে, গুরুত্ব দেয়া হতো । কবি-লেখক গোষ্ঠীর ছিল ‘হাইকমাণ্ড’, ‘হেডকোয়ার্টার’, ‘পলিটব্যুরো’ ধরণের মৌরসি পাট্টা । হাংরি জেনারেশন একটি আন্দোলন হওয়া সত্বেও খুলে দিল বহু মতাদর্শের পরিসর, টুকরো করে ফেলতে পারলো যাবতীয় ‘ইজম’, বলল প্রতিনিয়ত রদবদলের কথা, ক্রমাগত পরিবর্তনের কথা । ভঙ্গুরতার কথা । তলা থেকে ওপরে উঠে আসার কথা । হাংরি জেনারেশনের পরে সম্পূর্ণ লিটল ম্যাগাজিন জগতে দেখা গেছে এই বৈশিষ্ট্য এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রভাব ।

    ১৭ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত দেখা গেছে ‘নিটোল কবিতা’ বা স্বয়ংসম্পূর্ণ এলিটিস্ট কবিতা রচনার ধারা । তাঁরা বলতেন রচনাকারের শক্তিমত্তার পরিচয়ের কথা । গুরুগম্ভীর কবিতার কথা । নির্দিষ্ট ঔপনিবেশিক মডেলের কথা । যেমন সনেট, ওড, ব্যালাড ইত্যাদি । হাংরি জেনারেশনের কবি লেখকগণ নিয়ে এলেন এলো-মেলো কবিতা, বহুরঙা, বহুস্বর, অপরিমেয় নাগালের বাইরের কবিতা । তাঁদের পরের প্রজন্মের সাহিত্যিকদের মাঝে এর প্রভাব দেখা গেল । এখন কেউই আর ঔপনিবেশিক বাঁধনকে মান্যতা দেন না । উদাহরণ দিতে হলে বলতে হয় অলোক বিশ্বাস, দেবযানী বসু, ধীমান চক্রবর্তী, অনুপম মুখোপাধ্যায়, প্রণব পাল, কমল চক্রবর্তী প্রমুখের রচনা ।

    ১৮ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল স্হিতাবস্হার কদর এবং পরিবর্তন ছিল শ্লথ । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ পরিবর্তনের তল্লাশি আরম্ভ করলেন, প্রযুক্তির হস্তক্ষেপকে স্বীকৃতি দিলেন । পরবর্তী দশকগুলিতে এই ভাঙচুরের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, যেমন কমল চক্রবর্তী, সুবিমল মিশ্র, শাশ্বত সিকদার ও নবারুণ ভট্টাচার্যের ক্ষেত্রে ; তাঁরা ভাষা, চরিত্র, ডিকশন, সমাজকাঠামোকে হাংরি জেনারেশনের প্রভাবে গুরুত্ব দিতে পারলেন ।

    ১৯ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে নাক-উঁচু সংস্কৃতির রমরমা ছিল, প্রান্তিককে অশোভন মনে করা হতো, শ্লীল ও অশ্লীলের ভেদাভেদ করা হতো, ব্যবধান গড়ে ভেদের শনাক্তকরণ করা হতো । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকরা সংস্কৃতিকে সবার জন্য অবারিত করে দিলেন । বিলোপ ঘটালেন সাংস্কৃতিক বিভাজনের । অভেদের সন্ধান করলেন । একলেকটিকতার গুরুত্বের কথা বললেন । বাস্তব-অতিবাস্তব-অধিবাস্তবের বিলোপ ঘটালেন । উল্লেখ্য যে বুদ্ধদেব বসু মলয় রায়চৌধুরীকে তাঁর দ্বারে দেখামাত্র দরোজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন । পরবর্তীকালের লিটল ম্যাগাজিনে আমরা তাঁদের এই অবদানের প্রগাঢ় প্রভাব লক্ষ্য করি ।

    ২০ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল ইউরোপ থেকে আনা বাইনারি বৈপরীত্য যা ব্রিটিশ খ্রিস্টানরা হা্রণ করেছিল তাদের ধর্মের ঈশ্বর-শয়তান বাইনারি বৈপরীত্য থেকে । ফলত, দেখা গেছে ‘বড় সমালোচক’ ফরমান জারি করছেন কাকে কবিতা বলা হবে এবং কাকে কবিতা বলা হবে না ; কাকে ‘ভালো’ রচনা বলে হবে এবং কাকে ভালো রচনা বলা হবে না ; কোন কবিতা বা গল্প-উপন্যাস  উতরে গেছে এবং কোনগুলো যায়নি ইত্যাদি । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকরা এই বাইনারি বৈপরীত্য ভেঙে ফেললেন । তাঁরা যেমন ইচ্ছা হয়ে ওঠা রচনার কথা বললেন ও লিখলেন, যেমন সুভাষ ঘোষের গদ্যগ্রন্হগুলি । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন বহুপ্রকার প্রবণতার ওপর, রচনাকারের বেপরোয়া হবার কথা বললেন, যেমন মলয় রায়চৌধুরী, পদীপ চৌধুরী ও শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতা । যেমন মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা ও ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ উপন্যাস । যেমন সুবিমল বসাকের বাঙাল ভাষার কবিতা যা এখন বাংলাদেশের ব্রাত্য রাইসুও অনুকরণ করছেন । হাংরি জেনারেশনের পরের দশকগুলিতে  তাঁদের এই অবদানের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, এবং তা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিনগুলিতে ।

    ২১ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল আধিপত্যের প্রতিষ্ঠার সাহিত্যকর্ম । উপন্যাসগুলিতে একটিমাত্র নায়ক থাকত । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ আধিপত্যের বিরোধিতা আরম্ভ করলেন তাঁদের রচনাগুলিতে । বামপন্হী সরকার থাকলেও তাঁরা ভীত হলেন না । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে সেকারণে ছিল খণ্ডবাদ বা রিডাকশানিজমের গুরুত্ব । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন কমপ্লেকসিটিকে, জটিলতাকে, অনবচ্ছিন্নতার দিকে যাওয়াকে । যা আমরা পাই বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবিমল বসাক, মলয় রায়চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ প্রমুখের গল্প-উপন্যাসে । পরবর্তী দশকগুলিতে দুই বাংলাতে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয় ।

    ২২ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল গ্র্যাণ্ড ন্যারেটিভকে । হাংরি জেনারেশনের কবি লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন মাইক্রো ন্যারেটিভকে, যেমন সুবিমল বসাকের ‘দুরুক্ষী গলি’ নামক উপন্যাসের স্বর্ণকার পরিবার, অথবা অবনী ধরের খালাসি জীবন অথবা তৎপরবতী কঠিন জীবনযাপনের ঘটনানির্ভর কাহিনি । পরবর্তী দশকগুলিতে দেখা যায় মাইক্রোন্যারেটিভের গুরুত্ব, যেমন গ্রুপ থিয়েটারগুলির নাটকগুলিতে ।

    ২৩ ) হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ নিয়ে এলেন যুক্তির ভাঙন বা লজিকাল ক্র্যাক, বিশেষত দেবী রায়ের প্রতিটি কবিতায় তার উপস্হিতি পরিলক্ষিত হয় । পরের দশকের লেখক ও কবিদের রচনায় লজিকাল ক্র্যাক অর্থাৎ যুক্তির ভাঙন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে । যেমন সাম্প্রতিক কালে অগ্নি রায়,  রত্নদীপা দে ঘোষ, বিদিশা সরকার, অপূর্ব সাহা, সীমা ঘোষ দে, সোনালী চক্রবর্তী, আসমা অধরা, সেলিম মণ্ডল, জ্যোতির্ময় মুখোপাধ্যায়, পাপিয়া জেরিন,  প্রমুখ ।

    ২৪ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে রচনায়, বিশেষত কবিতায়, শিরোনামের গুরুত্ব ছিল ; শিরোনামের দ্বারা কবিতার বিষয়কেন্দ্রকে চিহ্ণিত করার প্রথা ছিল । সাধারণত বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত এবং সেই বিষয়ানুযায়ী কবি কবিতা লিখতেন । শিরোনামের সঙ্গে রচনাটির ভাবগত বা দার্শনিক সম্পর্ক থাকতো । ফলত তাঁরা মৌলিকতার হামবড়াই করতেন, প্রতিভার কথা বলতেন, মাস্টারপিসের কথা বলতেন ।হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ শিরোনামকে সেই গুরুত্ব থেকে সরিয়ে দিলেন । শিরোনাম আর টাইটেল হোলডার রইলো না । শিরোনাম হয়ে গেল ‘রুবরিক’ । তাঁরা বহু কবিতা শিরোনাম র্বজন করে সিরিজ লিখেছেন । পরবর্তী দশকের কবিরা হাংরি জেনারেশনের এই কাব্যদৃষ্টির সঙ্গে একমত হয়ে কবিতার শিরোনামকে গুরুত্বহীন করে দিলেন ; সম্পূর্ণ কাব্যগণ্হ প্রকাশ করলেন যার একটিতেও শিরোনাম নেই ।

    চার

    দেবেশ রায় প্রথম বলেছিলেন যে হাংরি আন্দোলন থেকে নকশাল আন্দোলনের দিকে সময় একটা বীক্ষার মাধ্যমে প্রসারিত হয়েছিল, কিংবা এই ধরণের কোনো কথা, তারপর অনেকেই নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনের ভাবনার একটা যোগসূত্র খুঁজতে চেয়েছেন । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে রফিক উল ইসলাম জিগ্যেস করেছিলেন যে দুটো আন্দোলনের নিজেদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কিনা । সুনীল বলেছিলেন যে নকশাল আন্দোলনে অনেক মহৎ আত্মত্যাগ হয়েছিল, অনেক তরুণ মারা গিয়েছিল । 

    আমার মতে দুটোর মধ্যে যে সম্পর্ক ছিল তা সময়-পরিসরের রেশের । হাংরি আন্দোলনের চিত্রকর অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান মুখোপাধ্যায় নকশাল আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন আর পুলিশ ওনাদের রাতের মিটিঙের কথা জানতে পেরে স্টুডিও ভাঙচুর করে যাবতীয় পেইনটিঙ নষ্ট করে দিয়েছিল । অনিল, করুণা আর ওদের ছবি আঁকার দলের যুবকরা আগেই খবর পেয়ে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল, অনিল দিল্লিতে আর তারপর এক মার্কিন যুবতীর সঙ্গে আমেরিকায় ; করুণা চুলদাড়ি কামিয়ে, চেহারা পালটিয়ে সপরিবারে পাটনায়, সেখানে দাদা করুণাকে একটা রঙিন মাছের দোকান খুলে দিয়েছিলেন । আমার কাকার মেয়ে পুটি উত্তরপাড়ার বাড়ির বড়োঘরের কড়িকাঠ থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়েছিল, তার কারণ যে নকশাল যুবকটিকে পুটি ভালোবাসতো তাকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়ে লোপাট করে দিয়েছিল । 

    ব্যাঙ্কশাল কোর্টে আমার এক মাসের সাজা হয়ে গিয়েছিল ২৮ ডিসেম্বর ১৯৬৫ আর কলকাতা হাইকোর্টে উকিলের খোঁজে আমি নানা লোকের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করছিলুম । জ্যোতির্ময় দত্ত পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সদ্য লণ্ডন ফেরা ব্যারিস্টার করুণাশঙ্কর রায়ের সঙ্গে, ব্যাঙ্কশাল কোর্ট থেকে কপি নিয়ে যাবতীয় কাগজপত্র দিয়ে আসতে হচ্ছিল, তাঁর বাড়িতে,  লোহাপট্টিতে, যাতে কলকাতা হাইকোর্টে রেজিস্ট্রারের দপতরে জমা দেয়া যায় । এদিকে কলকাতায় আমার মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, নানা জায়গায় রাত কাটাই, পকেট ফাঁকা হয়ে যায় আদালতের কাজে আর দুবেলা খেতে । অনেককাল স্নান না করলে যে নিজের গা থেকে নিজেরই মাংসের গন্ধ বেরোয় তা তখন জেনেছিলুম । বন্ধুবান্ধবরা, সুবিমল বসাক ছাড়া, সবাই হাওয়া ।

    তার মাঝেই ২২-২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৬৬ খাদ্য আন্দোলনে সারা বাংলা বন্ধ ডাকা হয়েছিল, মনে আছে । তখনকার কলেজ স্ট্রিট এখনকার মতন ছিল না, একেবারে ফাঁকা থাকতো, দিনের বেলাকার মিছিল সত্বেও, সন্ধ্যে হলেই অন্ধকার । বস্তুত, পুরো কলকাতাই একেবারে আলাদা ছিল । রণবীর সমাদ্দারের একটা লেখায় পড়েছিলুম যে নকশাল আন্দোলনের প্রকৃত সময়টা হলো ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ ; আর কোলকাতা হাইকোর্ট আমার মামলা এক দিনেই সেরে ফেলেছিল, ২৬ জুলাই ১৯৬৭ তারিখে, আমার দণ্ডাদেশ নাকচ করে । তাই হয়তো কেউ-কেউ মনে করেন যে হাংরিরা ১৯৬৭-পরবর্তী কালখণ্ডকে নকশালদের হ্যাণ্ডওভার করে দিয়েছিল । সময়-পরিসরকে হ্যাণ্ডওভার করার প্রক্রিয়া চলে আসছে সেই ব্রিটিশ-বিরোধিতার সময় থেকে। প্রফুল্ল চক্রবর্তী ওনার ‘মার্জিনাল মেন’ বইতে লিখেছিলেন যে দেশভাগের পর বহু তরুণ লুম্পেন প্রলেতারিয়েত হয়ে ওঠে এবং তাদের থেকেই পশ্চিমবঙ্গে মাস্তানদের জন্ম । বস্তুত মাস্তানরও সময়-পরিসরকে ক্রমশ হ্যাণ্ডওভার করে চলেছে এখনকার জিঙ্গোবাদী রাজনীতিকদের করকমলে ।

    ঔপনিবেশিক কালখণ্ডে স্বদেশি আন্দোলনের যে রেশ আরম্ভ হয়েছিল, সেই রেশ নানা বাঁক নিয়ে যখন দেশভাগের ঘুর্ণিতে পড়ল তখন তার চরিত্র পালটে গেল, তার আগে সেই রেশে তেমন অ্যাড্রেনালিন ছিল না বলা চলে । এই রেশটাই হাংরি আন্দোলনের উৎসভূমি । এই রেশকে প্রথমে কৃষক নেতারা এবং পরে তরুণ সমাজ নিয়ে যান নকশাল আন্দোলনে এবং এই রেশকেই কেন্দ্র করে বামপন্হীরা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসেন। এই রেশই নন্দীগ্রামে পৌঁছোবার পর বামপন্হীরা দিশেহারা হয়ে পড়েন আর তৃণমূল ক্ষমতা দখল করে । রেশটা থাকে জনগণের মাঝে । আমার মনে হয়, সব সময়েই থাকে,চিরকাল থাকে । 

    হাংরি আন্দোলনের পরে-পরেই নকশাল আন্দোলন ঘটেছিল অথচ যাঁরা হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ও পুলিশের কাছে নালিশ করেছিলেন তাঁরা কেন আসন্ন উথালপাথাল টের পাননি ? হাংরি আন্দোলনকারীরা সাহিত্যজগতের মূল্যবোধ-মালিক ও প্রকাশক-বাজারের জোতদারদের উৎখাত করতে চেয়েছিল, জন্তুজানোয়ারের মুখোশ পাঠিয়ে বিদ্যায়তনিক জোতদারদের টপলেস অর্থাৎ গলা কেটে ফেলতে চেয়েছিল, সাহিত্যিক ক্ষমতাকে দখল করে বিলিয়ে দিতে চেয়েছিল লিটল ম্যাগাজিনের মাঝে, জুতোর বাক্স রিভিউ করতে দিয়ে এবং শাদা ফুলস্কেপ কাগজকে ছোটোগল্প নামে বাজারি কাগজে জমা দিয়ে সাহিত্যিক জোতদারদের দলিদস্তাবেজ বেদখল করতে চেয়েছিল । এগুলো কোনোরকমের ইয়ার্কি বা প্র্যাঙ্ক ছিল না।

    যাঁরা নালিশ ঠুকেছিলেন তাঁদের মধ্যে বিদ্যায়তনিক প্রতিনিধিরাও ছিলেন যাঁদের হাংরি আন্দোলনকারীদের পাঠানো কার্ডে FUCK THE BASTARDS OF GANGSHALIK SCHOOL OF POETRY ঘোষণা পড়ে অপমানবোধ হয়েছিল, জানোয়ার ও দানবের মুখোশ পেয়ে মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল । অথচ তার কয়েক বছর পরেই নকশাল তরুণরা শিক্ষকদের গলা কাটা আরম্ভ করলেন, জোতদারদের বাড়ি লুঠ করে দলিল-দস্তাবেজ পুড়িয়ে দিলেন, জমি দখল করে বিলিয়ে দিলেন ভাগচাষিদের । নকশাল আন্দোলনকারীরা জোতদারদের বেদখল করার সময়ে, বাড়িতে-খামারে আগুন ধরিয়ে দেবার সময়ে FUCK THE BASTARDS -এর পরিবর্তে বাংলা ও চোস্ত হিন্দি গালাগাল দিয়েছিল, জোতদার আর ভূস্বামীদের মুখোশ চামড়াসুদ্দু ছিঁড়ে উপড়ে নিয়েছিল । 

    নকশাল তরুণরা এসে দেখিয়ে দিল যে হাংরি আন্দোলনকারীদের এই কাজগুলো ঠাট্টা-ইয়ার্কি করার ব্যাপার ছিল না, তা ছিল চোখে আঙুল ঢুকিয়ে বাস্তবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার প্রক্রিয়া । জোতদারদের বিরুদ্ধে যে ইতর বুলি কথাবার্তায় প্রয়োগ করে ক্ষান্ত থেকেছিলেন নকশালরা, তা নিজেদের লেখায় নিয়ে এসেছিলেন হাংরি আন্দোলনকারীরা যাকে মধ্যবিত্ত পরিবারের বিদ্যায়তনিক ও গ্লসি পত্রিকার চাকুরে আলোচনাকারীরা বলে এসেছেন অশ্লীল ও অশোভন । আলোচকরা ভুলে গিয়েছিলেন যে ছোটোলোকদের ভাষা অমনই হয়। নকশাল আন্দোলনের কবিতা  কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালির ভাষার আওতার বাইরে বেরোতে পারেনি বলেই মনে হয় । 

    যেমন কৃষ্ণ ধর-এর ‘একদিন সত্তর দশকে’ কবিতাটি :-

    শিকারকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে

    অন্ধকারে মিলিয়ে যায় জল্লাদের গাড়ি

    শহরের দেয়ালে দেয়ালে পরদিন দেখা যায় তারই কথা

    সে নিদারুণ তৃষ্ণায় একবার জল চেয়েছিল

    যে যন্ত্রণায় নীল হয়ে একবার ডেকেছিল মাকে

    তবু স্বপ্নকে অক্ষত রেখেই সে

    বধ্যভূমিতে গিয়েছিল

    একদিন সত্তর দশকে।”

    স্বপন চক্রবর্তী লিখেছিলেন :-

    ‘আমরা সাহায্য চাইনি’

    আমরা সাহায্য চাইনি

    কারণ আমরা বদল চেয়েছি।

    চেয়েছি ক্ষিদের মানসিক যন্ত্রণার বিরুদ্ধে

    একটি সকাল, দুপুর, রাত সময়, কাল, অনন্ত সময়।

    .কোনদিনই আমরা কমিউনিস্ট হতে চাইনি।

    এখন সময়

    মানুষের জন্যে আমাদের মানুষের মত হতে শেখাচ্ছে।

    মানুষের জন্যে আমাদের মানুষের মত হতে শেখাচ্ছে।

    আমরা চাইনি ইজ্জত খুইয়ে ঘাড় হেঁট করে পেট ভরাতে।

    আমরা বদল চেয়েছি

    চেয়েছি ক্ষিদের যন্ত্রণার বিরুদ্ধে

    একটি সকাল, দুপুর, রাত সময়, কাল, অনন্ত সময়।”

    নির্মল ঘোষ তার ‘নকশালবাদী আন্দোলন ও বাংলা সাহিত্য’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘অনস্বীকার্য, নকশালপন্থী কাব্যচর্চায় আঙ্গিকের চেয়ে বিষয়কেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। আর এর ফলে বক্তব্যে বহুক্ষেত্রেই আবেগের প্রাধান্য দেখা গেল, যা শেষপর্যন্ত পাঠক মানসকে প্রায়শ প্রভাবিত বা প্রাণিত করতে সমর্থ হয়নি।’ পক্ষান্তরে, কবিতার শৈল্পিক মানের এ বিতর্কে অর্জুন গোস্বামী নকশালবাদী কবিতার পক্ষেই রায় দিয়েছেন, ‘এটা সত্তরের দশক। এই দশক প্রত্যক্ষ করেছে শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে শোষিতশ্রেণীর লড়াই। এই দশকেই প্রমাণিত হয়েছে যে প্রতিক্রিয়াশীল শাসকচক্রকে উপরে উপরে যতই শক্তিশালী বলে মনে হোক না কেন আসলে তারা হলো কাগুজে বাঘ। স্বভাবতই এই দশকের মানুষের সচেতনতা অনেক বেশি। আমরা এমন কোন কবিতা পড়তে চাই না যাতে আছে হতাশা, আছে যন্ত্রণার গোঙানি। আমরা এমন কবিতা পড়তে চাই যাতে ধরা পড়বে শোষণের আসল স্বরূপ, যে কবিতা পড়ে অনুপ্রেরণা পাবেন লক্ষ লক্ষ খেটে খাওয়া মানুষ এবং যে কবিতা প্রকৃতই হবে শোষিতশ্রেণীর সংগ্রামী হাতিয়ার। আমাদের মধ্যে অনেকে বলেন কবিতা হলো এমন একটা জিনিস যা ঠিক স্লোগান নয়। আমাদের বক্তব্য হলো কবিতার বিষয় ও কবিতার আঙ্গিক এই দুটোর মধ্যে আগে বিষয়, পরে আঙ্গিক। বক্তব্যকে সাধারণের উপযোগী করে বলার জন্য কবিতা যদি কারুর কাছে স্লোগান বলে মনে হয় তবে সেই স্লোগানই হলো সত্তরের দশকের শ্রেষ্ঠ কবিতা।’

    হাংরি আন্দোলনের সময়ে আমিও বলেছিলুম,  “কবিতা কেবল মঞ্চে বিড়-বিড় করে পড়ার ব্যাপার নয় ; উন্মাদের মতন চিৎকার করে না পড়লে প্রতিষ্ঠান কষ্ট-যন্ত্রণার গোঙানি শুনতে পায় না ।” বাসব রায়কে দেয়া ‘যুগশঙ্খ’ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন যে মলয়ের কবিতায় অত্যধিক অব্যয় থাকে, চিৎকার থাকে । এই প্রেক্ষিতে নকশালদের সঙ্গে হাংরিদের তুলনা করা চলে, যেমন ত্রিদিব মিত্রের বিখ্যাত কবিতা ‘হত্যাকাণ্ড’ । হাওড়া স্টেশানের প্ল্যাটফর্মে বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে ‘হত্যাকাণ্ড’ কবিতাটা পড়ে ভিড় জমিয়ে ফেলেছিল ত্রিদিব মিত্র ।


     

    হাংরি আন্দোলনের গ্রন্হ রিভিউ করতে গিয়ে শৈলেন সরকার বলেছেন, “হাংরি-র পুরনো বা নতুন সব কবি বা লেখকই কিন্তু অনায়াসে ব্যবহার করেছেন অবদমিতের ভাষা। এঁদের লেখায় অনায়াসেই চলে আসে প্রকৃত শ্রমিক-কৃষকের দৈনন্দিন ব্যবহৃত শব্দাবলি। ভালবাসা-ঘৃণা বা ক্রোধ বা ইতরামি প্রকাশে হাংরিদের কোনও ভণ্ডামি নেই, রূপক বা প্রতীক নয়, এঁদের লেখায় যৌনতা বা ইতরামির প্রকাশে থাকে অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ বিবরণ— একেবারে জনজীবনের তথাকথিত শিল্পহীন কথা। অনেকেই প্রায় সমসময়ের নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনকে তুলনা করে এদের অরাজনৈতিক তকমা দেন, কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক নিয়ে হাংরি জেনারেশন যে প্রশ্ন তুলেছিল তা ছিল নকশালদের তোলা প্রশ্নের চেয়েও অনেক বেশি মৌলিক। এমনকী তুমুল প্রচার পাওয়া এবং নিজস্ব অস্তিত্ব তৈরি করা সত্ত্বেও দলিত সাহিত্য আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত হাংরি আন্দোলনের থেকে পিছিয়েই রাখতে হয়।” শৈলেন সরকার যে বইটি আলোচনা করেছেন তাতে কোনো কারণে সম্পাদকমশায় হাংরি আন্দোলনের রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো অন্তর্ভুক্ত করেননি । করলে স্পষ্ট হতো যে হাংরি আন্দোলন অরাজনৈতিক ছিল না ।

                                       

    প্রবুদ্ধ ঘোষ হাংরি আন্দোলন ও নবারুণ ভট্টাচার্য সম্পর্কে আলোচনা করার সময়ে বলেছেন, “বাড়ি ভেঙ্গে পড়ার শব্দ তখনই শোনা যায়, যখন তা শোনার জন্যে কেউ থাকে। সাহিত্যের কাজ কী? ক্যাথারসিস করা? মানে, মোক্ষণ? বরং হাংরিদের লেখা প্রতিমুহূর্তে ক্যাথারসিসের উল্টোদিকে হাঁটে। মোক্ষণ করা, শান্তি দেওয়া তাঁদের কাজ নয়, বরং আপাতশান্তির বোধটাকে আঘাত করাই মূল উদ্দেশ্য!” একটু আগে আমি যেকথা বলেছি, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান-সাহিত্যের জোতদারদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতে চেয়েছিল হাংরি আন্দোলনকারীরা, তাদের কাজের দ্বারা, লেখার দ্বারা, ড্রইং দ্বারা, সেকথাই বলেছেন প্রবুদ্ধবাবু । তবে প্রবুদ্ধবাবু একটা কথা ভুল বলেছেন, যে হাংরি আন্দোলনকারীরা কেবল আত্মবীক্ষণ ও আত্মআবিষ্কারে আলো ফেলতে চেয়েছেন। হাংরি আন্দোলনকরীরা যদি তাই করতেন তাহলে যে কাজগুলোকে মধ্যবিত্ত আলোচকরা ‘অসাহিত্যিক’ ব্যাপার বলে তকমা দেগে দেন তা তাঁরা করতেন না, বিভিন্ন বিষয়ে ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করতেন না । নকশালরা যে মূর্তির গলা কেটে প্রতীকিস্তরে বিশেষ মূল্যবোধকে আক্রমণ করেছিল, শিক্ষকদের খুন করেছিল, তার সঙ্গে হাংরি আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ-খুনের আক্রমণাত্মক কাজগুলো তুলনীয় ।

    সুবিমল বসাকের একটা কবিতা এখানে তুলে দিচ্ছি, যা হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছিল :-

    ‘হাবিজাবি’

    আমারে মাইরা ফেলনের এউগা ষড়যন্ত্র হইসে

    চারো কোনা দিয়া ফুসফুস আওয়াজ কানে আহে

    ছাওয়াগুলান সইরা যায় হুমকে থিক্যা

    অরা আমারে এক্কেরে শ্যায করতে সায়

    আমি নিজের ডাকাইতে্যা হাতেরে লইয়া সচেত্তন আসি

    কেউ আইয়া চ্যারায় দিশায় চ্যাবা কথা কয় না

    আমি সুপসাপ থাকি

    ভালাসির গুছাইয়া আমি কথা কইতে পারি না

    ২ কইতে গিয়া সাত হইয়া পড়ে

    ১৫ সাইলে ৯ আইয়া হাজির হয়

    ছ্যাব ফেলনের লাইগ্যা বিচড়াইতাসি অহন

    আহ, আমার দাঁত মাজনের বুরুশ পাইতাসি না

    বিশ্বাস করেন, কেউ একজনা আমার মুহের সকরা খাবার খাইসে ।

    (হাংরি বুলেটিন নং ১৮ থেকে)

    প্রবুদ্ধবাবু বলেছেন “হাংরিদের ‘ক্ষুধা’ বিষয়ে তাঁদের নিজস্ব মতামত ছিল ; এই ক্ষুধা আসলে নিজেকে দগ্ধ করে সত্য আবিষ্কারের ক্ষুধা। সত্য, যা ক্রমাগতঃ এমনকি নিজেকেও ছিঁড়েখুঁড়ে উন্মোচিত করে চলে। তাকাই ফাল্গুনী রায়ের কবিতায়, “আমার বুকের ভিতর লোভ অথচ হৃদয় খুঁজতে গিয়ে বুকের ভিতরে/ রক্তমাংসের গন্ধ পাচ্ছি কেবল”। আজ স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে; প্রকাশ্যে চুম্বন করে প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে রাষ্ট্রীয় বাধানিষেধ ও সমাজের প্রচলিত ‘ট্যাবু’গুলিকে। এই বিদ্রোহ কিন্তু ’৬০ এর দশক থেকেই শুরু করে দিয়েছিলেন ক্ষুধার্ত প্রজন্মের লেখকেরা। সমস্তরকম গোঁড়ামি এবং ‘ঢাকঢাকগুড়গুড়’ বিষয়ের ভিতে টান মেরেছেন। সাহিত্য বহু আগেই ভবিষ্যতের কোনো এক আন্দোলনের কথা স্বীকার করে যাচ্ছে- তার নিজের মত করে, নিজের প্রকাশে। না, নিশ্চিতভাবেই সাহিত্যের কাজ ভবিষ্যৎদর্শন নয়; কিন্তু হ্যাঁ, সাহিত্যের অন্যতম কাজ ভবিষ্যতের সামাজিক আন্দোলনের, সাহিত্য আন্দোলনের সূত্রগুলোর হদিশ দিয়ে যাওয়া। ফাল্গুনী রায় যখন কবিতায় বলেন, ‘শুধুই রাধিকা নয়, গণিকাও ঋতুমতী হয়’, তখন কি আজকের কথাই মনে হয় না? যেখানে, ঋতুমতী হওয়া কোনো ‘লজ্জা’র বিষয় নয়, ‘অশুদ্ধি’র বিষয় নয়, বরং তা স্বাভাবিক জৈবনিক প্রক্রিয়া। আর, প্রতিমুহূর্তের এই আত্মজৈবনিক বিষয়গুলিই উঠে আসে হাংরি জেনারেশনের লেখায়। বা, সগর্ব্ব মানুষ-প্রমাণ ‘আমি মানুষ একজন প্রেম-পেচ্ছাপ দুটোই করতে পারি’’। এগুলো তো দৈনন্দিন। এগুলো তো স্বাভাবিক। তাহলে? আসলে, ‘শুদ্ধতা’-র একটা অর্থহীন ধোঁয়াশাবোধ তো তৈরি করেই দেয় সমাজ, একটা বর্ডারলাইন। সাহিত্যের নায়ক রক্তমাংসের মতো হবে কিন্তু তার ক্ষুধা-রেচন ইত্যাদি থাকবে না বা পুরাণচরিত্রদের শারীরবৃত্তীয় কার্য নেই! এই ‘মেকি’ ধারণাসমূহ লালন করে আসা আতুপুতু প্রতিষ্ঠানগুলো যখন হাড়-মজ্জা-বোধ জীবন্ত হতে দেখে তখন ‘অশ্লীল সংস্কৃতি’ ছাপ্পা মারে। সমাজের জড়তা, মধ্যবিত্ত ভণ্ডামির মুখোশগুলো খুলে দেয় টান মেরে। আর, তাই ‘নিষিদ্ধ’, অশ্লীল মনে হয় এদের লেখাগুলি। হাংরি-দের যেখানে মূল বক্তব্যই ছিল প্রতিটি লেখায় ও সাহিত্যযাপনে আত্মউন্মোচন, সেখানে এই বিষয়গুলি স্বাভাবিক বীক্ষাতেই উঠে এসেছে। এবং, ‘সাহিত্য বিক্রির জন্যে আরোপিত যৌনতা’ বনাম ‘শিল্প ও জীবনের সাথে সম্পৃক্ত যৌনতা’ এই বিতর্কের ডিস্‌কোর্স তৈরি করেছে।” 

    প্রবুদ্ধবাবু আরও বলেছেন, “পণ্যসময়ে বেঁচে থেকে, কিচ্ছু না-পেয়ে বেঁচে থেকে, হতাশার অবিমৃষ্য বোধ তৈরি হয়। ’৬০-’৭০ র দশকের ক্রমাগত অর্থনৈতিক অবক্ষয়, মধ্যবিত্তের আশাহীনতার অভিঘাত নৈরাশ্যের জন্ম দেয়; এমনকি সাহিত্যেও। আর, সেই নৈরাশ্যকে এড়িয়ে গিয়ে কবিতা বা গদ্য লেখা যায় না। অরুণেশ ঘোষ তাঁর ‘কিচ্ছু নেই’ সময়কে লিখছেন- ‘১ পাগল এই শহরের চূড়ায় উড়িয়ে দিয়েছে তার লেঙ্গট/ ১ সিফিলিস রুগী পতাকা হাতে মিছিলের আগে/ ১ রোবট নিজেকে মনে করে আগামীকালের শাসক/ ১ মূর্খ ঘুমিয়ে থাকে শহর-শুদ্ধ জেগে ওঠার সময়... শীতের ভোর রাত্রে- মধ্যবিত্তের স্বপ্নহীনতার ভেতর/ আমাকে দেখে হো হো করে হেসে ওঠে বেশ্যাপাড়ার মেয়েরা’। এই স্বপ্নহীনতাকে বাড়িয়ে তোলে পুঁজিবাদের দমবন্ধ চেপে বসা। ভারতের তথা বাংলার অর্থনীতি-মডেলকে সাজানোর দোহাই দিয়ে বিদেশি শস্যবীজ এবং সবুজ বিপ্লবের সাথেই আমদানি হয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। আর, নগরায়ণের মুখ খুলতে থাকে। ’৯০ র দশকের পরে যে বীভৎস হাঁ-তে ঢুকে যেতে থাকবে ভারতবর্ষের একের পর এক গ্রাম-মফস্বল।”

    ১৯৬৮ সালে বিনয় ঘোষ ‘কলকাতার তরুণের মন’ নামক প্রবন্ধে লিখছেন- “গোলামরা সব উঁচুদরের ঊর্ধ্বলোকের গোলাম, আগেকার কালের মতো তাঁদের হাত-পায়ের ডাণ্ডাবেড়ি দেখা যায় না। তাঁদের ‘স্টেটাস’ আছে, ‘কমফর্ট’ আছে, ‘লিবার্টি’ আছে। তাঁরা নানাশ্রেণীর ব্যুরোক্র্যাট টেকনোক্র্যাট ম্যানেজার ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার সেলস-প্রমোটার বা ‘অ্যাড-মেন’- যাঁরা যন্ত্রের মতো সমাজটাকে চালাচ্ছেন। ব্যক্তিগত ভোগ-স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাধীনতার একটা লোভনীয় মরীচিকা সৃষ্টি করছেন তাঁরা সাধারণ মানুষের সামনে এবং দিনের পর দিন বিজ্ঞাপনের শতকৌশলে নেশার পিল খাইয়ে সেই ভোগস্বাধীনতার স্বপ্নে তাদের মশগুল করে রাখছেন।”। ’৬০-’৭০ র অবক্ষয়ী অথচ পণ্যপ্রিয় ভোগসমাজের কথা সেইসময়ের মতন করেই লেখেন হাংরি আন্দোলনের গল্পকাররা। আর, ভবিষ্যতের পণ্যসমাজের একটা আভাসও থাকে। “আপাতত প্রতীয়মান ধূম্রজালে জড়ানো ধীরে ধীরে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর একজন দৈত্যভৃত্য বলে,  ‘আপনার গোলাম, আকা কি হুকুম যা বলবেন যা চাইবেন জীবনে তাই হাজির... একটি সিগারেট। ...একটি সিগারেট। পাঁচ বছরে একটি টিভি সেট। দশ বছরে একটি গাড়ি আর বিশ বছরে সিগারেট খেতে খেতে একবার সারা দুনিয়ায় চক্কর দেব। বাতাস স্তব্ধ। অবাক হঠাৎ মেঘের আকাশ-কাঁপানো অট্টহাসি।”[ঘটনাদ্বয় ও তাদের সাজসজ্জাঃ রবিউল] 

    বোর্দ্রিয়ারের মতে, উত্তর-আধুনিক সমাজে শ্রেণিবিভাগ আর শুধুমাত্র উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকছে না, বরং তা এখন নির্ভর করছে ভোগের ওপর। কে কোন পণ্য ভোগ করছে, তার ‘ব্র্যাণ্ড’ এবং দামের ওপর নির্ভর করছে তার শ্রেণিঅবস্থান। অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন, পণ্যকৌশলে ভুলিয়ে দিতে চাওয়া দেশকাল-ইতিহাস আর, এমনকি প্রকৃত যৌনতা, সামাজিকতা, সবকিছুরই মৃত্যু ঘটছে- তখনই অধিবাস্তব টেনে নিয়ে চলেছে ‘ভার্চ্যুয়াল’ জগতে, এই সত্য তো হাংরি আন্দোলনকারীদের লেখাতে উদ্ঘাটিত হয়েছে! বস্তুতঃ, তাঁদের লেখায় তাঁরা এটাকেই আক্রমণ শানাতে চেয়েছেন। আজকের মানুষের পরিসর-মাফিক রূপবদলের কথা আমি লিখেছি আমার ‘জিন্নতুলবিলাদের রূপকথা’ নামের অধিবাস্তব গল্পে আর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ফাঁসিয়েছি ‘গহ্বরতীর্থের কুশীলব’ নামের অধিবাস্তব কাহিনিতে --- যা কিনা সময়-পরিসরের সঙ্গে অ্যাড্রেনালিনের রেশ এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রক্রিয়া ।


     

    হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা-মকদ্দমা করে তাদের বিক্ষিপ্ত করে দেবার পর, প্রতিষ্ঠানের লেখকরা লেখালিখি করে দেখাতে চাইলেন, নকশাল আন্দোলন মধ্যবিত্ত রোম্যাণ্টিকতা ও কাঁচা প্রেমের মতো, বামপন্থা মানেই তা ভ্রষ্ট সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখায় এবং আসলে নিরাজনীতিই মানুষকে ‘মানুষ’ করে তোলে! হাংরিদের পর থেকে তাদের বিরুদ্ধতাকারী পঞ্চাশের ও পরবর্তী সাহিত্যিকরা এহেন ভাবনাগুলোকে সচেতন ভাবেই প্রতিষ্ঠানের  মধ্যে দিয়ে ছড়িয়ে দিতে লাগলেন । প্রবুদ্ধ ঘোষ বলেছেন “আশির দশকের বাংলা সাহিত্য থেকেই আর, ’৯০ পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক ও ‘এলিট’ পত্রিকার সাহিত্যগুলি কিছু অবয়ববাদী বা স্ট্রাক্‌চারালিস্ট ধাঁচা (স্টিরিওটাইপ) এনে ফেলল। যেমন, নকশাল ছেলেটি লেখাপড়ায় মারাত্মক ব্রিলিয়াণ্ট ছিল, ‘ভুল’ রাজনীতির পাল্লায় পড়ে গ্রামে গেল রাজনীতি শিখতে ও ডি-ক্লাস্‌ড হতে, তার প্রেমিকা উচ্চবিত্ত ঘরের এবং যৌনসম্পর্কের বিশদ অনর্থক বর্ণনা, পুলিশের গুলিতে বা অত্যাচারে পঙ্গু হল, আদতে লড়াইটা এবং মতাদর্শটা ব্যর্থ হল এবং অ্যাপলিটিক্সের ওপরে সমাজসেবার ওপরে ভরসা রাখল ব্যর্থ নায়ক! এই অবয়ববাদী ধাঁচায় ফেলে প্রতিষ্ঠানগুলি বিক্রি বাড়াতে লাগল তাদের সাহিত্যের। আর, তার সাথেই ক্রমে ‘সক্রিয় রাজনীতি’ ও বামপন্থা থেকে বিমুখ করে দিতে লাগল বিশ্বায়ন পরবর্তী প্রজন্মকে। 

    প্রবুদ্ধবাবু বলেছেন, “হাংরি-দের গল্পের এবং গদ্যের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হচ্ছে, মুক্তসমাপ্তি। অর্থাৎ, কোনও স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন না লেখক; হয়তো স্থির সিদ্ধান্ত হয় না কোনও। অন্ততঃ, যে সময়ে তাঁরা লিখছেন, সেই সময়ে অচঞ্চল বিশ্বাস কিছু নেই, কোনও স্থিতি নেই, সিদ্ধান্তে আসার ভিত্তি নেই। বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘বমন রহস্য’ গল্পে আশাহীন এবং আলোহীন ভোগবাদী সমাজের প্রতি ঘৃণা ঠিকরে বেরোয়। গল্পের শেষ লাইন- “বমি করে যাই রক্তাক্ত পথের উপরে। সমস্ত চর্বিত মাংসের টুকরো, সমস্ত জীবন ভোর খেয়ে যাওয়া মাংসের টুকরো আমি বমি উগরে বার করতে থাকি। বমির তোড়ে আমার নিঃশ্বাস যেন আটকে আসে।”। 

    আসলে মুক্তসূচনা এবং মুক্তসমাপ্তির জনক হলেন জীবনানন্দ দাশ । ‘মাল্যবান’ যেভাবে শেষ না হয়েও শেষ হয়েছে, তা থেকে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয় । এই শৈলী প্রয়োগে পাঠকের যথেচ্ছ স্বাধীনতা থাকে, জীবনের সাথে মিলিয়ে পরিণতি ভাবার; সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেওয়ার দায় কবির বা লেখকের নয়। প্রবুদ্ধবাবুকে অবশ্য একথা বলার যে, নকশাল আন্দোলন বা ফিদেল কাস্ত্রোর আন্দোলনও ছিল মুক্তসমাপ্তির, আন্দোলনের পরে কি ঘটবে তা আগাম পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল না । নকশাল আন্দোলনকারীরা জানতেন নিশ্চয়ই যে পশ্চিমবঙ্গ বলতে ভারতবর্ষ বোঝায় না । চারু মজুমদার কি জানতেন না যে চীন আদপে তিব্বত দখল করার পর মাও-এর সাম্রাজ্যবদী দিকটাকে ফাঁস করে দিয়েছে ? এখন চীন যা করছে তার ভিত তো মাও-এর গড়ে দেয়া। 


     

    প্রবুদ্ধ ঘোষ বলেছেন, “নবারুণ কবিতার সংজ্ঞাও একপ্রকার নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। ঠিক যেভাবে হাংরি-রা তাদের কবিতার ধারণা স্বতন্ত্র করে দিয়েছেন । নবারুণের কবিতা চিরাচরিত চাঁদ-ফুল-তারার রোম্যাণ্টিকতা অস্বীকার করে। কবিতা যে ‘লেখার’ নয়, বরং কবিতা ‘হয়ে ওঠার’ বিষয়, তা স্পষ্টতর হয় অস্থির সময়ে- “কবিতা এখনই লেখার সময়/ ইস্তাহারে দেওয়ালে স্টেনসিলে/ নিজের রক্ত অশ্রু হাড় দিয়ে/ এখনই কবিতা লেখা যায়...”। কবিতার আসন্ন সম্ভাবনাও লিখে রাখেন শেষ পংক্তিগুলিতে। “কবিতার জ্বলন্ত মশাল/ কবিতার মলোটভ ককটেল/ কবিতার টলউইন অগ্নিশিখা/ এই আগুনের আকাঙ্খাতে আছড়ে পড়ুক”। হাংরি আন্দোলনকারীরাই প্রথম বলেছিল যে কবিতা চাঁদ-ফুল-তারা ইত্যাদির ব্যাপার নয় । আমি আমার কবিতা বিষয়ক প্রবন্ধে এ-কথা ষাটের দশকেই বলেছিলুম ।

    প্রবুদ্ধবাবু বলেছেন, “এখানেই কবিতাকে নতুনভাবে সাজিয়ে নেওয়ার ভাবনার সাথে মিল পাওয়া যায় হাংরি-দের। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা থেকে প্রথম হাংরি বুলেটিন বেরোয় ইংরাজিতে। ‘Weekly manifesto of hungry generation’, যার সম্পাদক দেবী রায়, মুখ্যনেতা শক্তি চ্যাটার্জ্জী এবং ক্রিয়েটর মলয় রায়চৌধুরি। তার প্রথম অনুচ্ছেদ- “Poetry is no more a civilizing maneuver, a replanting of the bamboozled gardens; it is a holocaust, a violent and somnambulistic jazzing of the hymning five, a sowing of the tempestual Hunger.” কবিতা কোনো নিরপেক্ষতার মাপকাঠি নয়, কবিতা শুধুমাত্র ছন্দ-শব্দ দিয়ে বেঁধে রাখার নান্দনিকতা নয়। বরং, অসহ্য জীবনকে তার মধ্যে প্রতিটি ছত্রে রেখে দেওয়া, অনন্ত বিস্ফারের সম্ভাবনায়। আর, এখানেই মনে পড়ে মারাঠি কবি নামদেও ধাসালের লেখা। দলিত জীবনের আখ্যান এবং প্রতিটি পংক্তিতে উল্লেখযোগ্য ঘৃণা; এই ঘৃণাই আসলে জীবন, এখান থেকে ভালবাসার জন্ম।” 

    এখানে উল্লেখ্য যে নবারুণ ভট্টাচার্যের বাবা-মা দুজনেই ছিলেন শিক্ষিত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের, কলকাতার সংস্কৃতি জগতের মানুষ । অপরপক্ষে হাংরি আন্দোলনের কবি দেবী রায় এসেছিলেন চাষি পরিবার থেকে; এমনকি কলকাতার সাহিত্যিকদের টিটকিরি প্রতিহত করার জন্য তিনি পতৃদত্ত নাম হারাধন ধাড়া বর্জন করতে বাধ্য হন।  সুবিমল বসাক এসেছিলেন তাঁতি পরিবার থেকে যাঁর বাবা স্যাকরার কাজ করতে বাধ্য হন এবং মোরারজি দেশাইয়ের গোল্ড কনট্রোলের দরুন দেনার দায়ে আত্মহত্যা করেন । অবনী ধর ছিলেন জাহাজের খালাসি, বাড়ি ফিরে কলকাতার রাস্তায় হকারি করতেন, ঠেলায় করে কয়লা বেচতেন, ফুটপাতে ছিট কাপড় বেচতেন । এই ধরণের জীবনে জড়িয়ে হাংরি-দের লেখায় পরিপার্শ্বের প্রেক্ষিতে আত্ম-কে আবিষ্কার জরুরি হয়ে ওঠে , জীবনের কেন্দ্রের মূল উৎস গুলোয় ফেরা, সন্ধান করা অসুখের উৎসের। কবিতা থেকে কবিতাযাপন হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া। ক্রাইসিস-গুলোকে চিনে নিতে নিতে প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠা। কবিতা মানে বাস্তব থেকে দূরে সরার, অথবা কিছু মিথ্যে স্তোকবাক্য দিয়ে বাস্তবকে আড়াল করার চেষ্টা আর নেই; চাঁদ ফুল তারা নদী আর অতটাও সুন্দর নেই যে তারাই হয়ে উঠতে পারে ‘Aesthetics’-র মাপকাঠি। এস্থেটিক্‌স-ও নিয়ন্ত্রিত হয় পুঁজির দ্বারা, পুঁজির স্বার্থেই! সেই এস্থেটিক্‌স কে প্রবল বিক্ষোভে উপহাস করেন ফাল্গুনী রায়ও- “রাজহাঁস ও ফুলবিষয়ক কবিতাগুলি আমি মাংস রাঁধার জন্যেই দিয়েছিলাম উনোনে...”। বরং দৈনন্দিন যুদ্ধদীর্ণ ‘অসুস্থ’ জীবন থেকেই উঠে আসে ‘Aesthetics’-র সারবত্তা। আর, কবির নিশ্চয়ই দায়বদ্ধতা থাকে সমাজের প্রতি; হাংরি-দের সেই নিজেকে, ভাষাকে, কবিতাকে, নাটককে,  ছিঁড়েখুঁড়ে সত্যের কাছাকাছি পৌছানোর উপলব্ধিকে ঔপনিষদীয় বলা ভুল হবে না ।

    রাষ্ট্রের ভণ্ডামিগুলো, ‘আদার্‌’ অর্থাৎ’অপর’ ছাপ্পা মেরে দেওয়াগুলো, ‘নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নেওয়া’র গড্ডালিকা স্রোতগুলোর পালটা স্রোত সাহিত্যে-জীবনযাপনে আসে। আর, যতোটা ‘সংস্কৃতি’ ঠিক করে দেওয়া কর্তারা থাকবে, ততটাই থাকবে সেই ‘সংস্কৃতিকে’ প্রত্যাখ্যান। হয়তো সমান্তরাল, তবু থাকবে। প্রবলভাবেই। সমাজশাসকেরা বরাবরই নিজেদের মত করে হেজিমনি চাপিয়ে দেয়, শাসনের ডিস্‌কোর্সের অভিমুখে দাঁড় করাতে চায় সব্বাইকে। আর, যখনই তার বিরুদ্ধে স্বর ওঠে, তা সে সাহিত্যেই হোক বা রাজনিতিতে , তাকে দমিয়ে দেওয়া হয়। ব্রাত্য করে রাখা হয় ‘সংস্কৃতি’-র শুদ্ধতার দোহাই দিয়ে। জাতীয় সাহিত্যের মাপকাঠিতে ‘অশ্লীল’ বা ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে প্রতিপন্ন হয় এই সাহিত্যগুলো ও রাজনীতিগুলো । হাংরি আন্দোলনকারীদের যেভাবে জেলে পোরার চক্রান্ত হয়েছিল, একইভাবে প্রতিষ্ঠানের আরও বৃহত্তর চক্রান্তে একের পর এক হত্যা করে নিশ্চিহ্ণ করা হয়েছিল নকশালদের, সমাজকে ‘শুদ্ধ’ করে তোলার জন্য। 

    অরবিন্দ প্রধান সম্পাদিত ‘অপর : তত্ব ও তথ্য’ বইতে সমীর রায়চৌধুরী লিখেছেন, “নিজেদের রয়ালিস্ট, প্রকৃত খ্রিস্টিয়, প্রগতিবাদী ইত্যাদি নির্দিষ্টাত্মক বিশেষণের খপ্পরের ছাঁচে ফেলে দেওয়ার তোড়জোড়ে সাম্রাজ্যবাদী চেতনার জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়েছেন ঔপনিবেশিক শ্রেষ্ঠত্ববোধসম্পন্ন লেখকরা, ফলে তাঁদের টেক্সটে আশ্রিত হয়েছে চরম অপরত্ব-বোধ । দক্ষিণ আফ্রিকার ঔপন্যাসিক জে. এম. কোয়েতসে তাঁর ‘ওয়েটিং ফর দ্য বারবারিয়ানস’ গ্রন্হে দেখিয়েছেন কীভাবে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য অপরায়নের প্রক্রিয়া কার্যকরী করে । এই প্রক্রিয়া তার নিজের শ্রেষ্ঠত্ব, এগিয়ে থাকা, সভ্যতাকে শ্রেয় এবং অপরের অসত্বিত্বকে হেয় করতে সাহয্য করে । কেবল টেক্সটে নয়, জীবনের সব এলাকাতে এভাবে স্ব-আধিপত্য প্রতিষ্ঠা সহজ হয়ে ওঠে ।” বলা বাহুল্য যে হাংরি আন্দোলন আর নকশাল আন্দোলনকে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন ‘অপর’ তকমা দিয়ে সমাজ থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল, যেমন আফ্রিকার আদিনিবাসদের মুছে ফেলতে চেয়েছিল ইউরোপের শাসক-সমাজ ।

    নারায়ণ সান্যালের বিবরণীতে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার এক অজানা কথা উঠে আসে। “কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যাসাগর-মশায়ের মর্মরমূর্তির যেদিন মুণ্ডচ্ছেদ হয় তার মাসখানেকের মধ্যে সিপিএম (এম. এল) দলের এক নেতৃত্বস্থানীয় ছাত্রনেতার সঙ্গে আমার সাক্ষাত্ হয়েছিল! ঘটনাচক্রে সে আমার নিকট আত্মীয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। কট্টর নকশাল। আমার পেচকপ্রতিম বিরস মুখখানা দেখে সে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, ‘বিশ্বাস কর ছোটকাকু! মূর্তিটা যে ভেঙ্গেছে তাকে আমি চিনি। গত বছর হায়ার সেকেন্ডারিতে সে বাংলায় লেটার পেয়েছে। ওর সেই বাংলা প্রশ্নপত্রে প্রবন্ধ এসেছিল তোমার প্রিয় দেশবরেণ্য নেতা। ও লিখেছিল বিদ্যাসাগরের উপর।”

    অধিকাংশ আলোচক বলেন হাংরি আন্দোলন এবং নকশাল আন্দোলন দুটিই ব্যর্থ্য এবং তাদের ব্যর্থতার কারণও এক : প্রথমত, প্রশাসনিক আক্রমণ ; দ্বিতীয়ত, আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ ; তৃতীয়ত, আন্দোনের সদস্যদের মধ্যে বিভাজন ; চতুর্থত, তাঁদের কার্যকলাপ । আমি শুধু বলতে চাই যে দুটি আন্দোলনই বাংলার বৌদ্ধিক সমাজে ছাপ ফেলেছে এবং তা ‘ব্যর্থ্য’ তকমা দিয়ে চাপা দেয়া যায় না ।

    পাঁচ

    হাংরি আন্দোলনকারীদের মত পরাবাস্তব আন্দোলনকারীদের মাঝেও ভাঙন ঘটত, সে কথাও জানিয়েছেন অভিজিৎ পাল ।

    ১৯১৭ সালে গিয়ম অ্যাপলিনেয়ার “সুররিয়ালিজম” অভিধাটি তৈরি করেছিলেন, যার অর্থ ছিল বাস্তবের অতীত। শব্দটি প্রায় লুফে নেন আঁদ্রে ব্রেতঁ, নতুন একটি আন্দোলন আরম্ভ করার পরিকল্পনা নিয়ে, যে আন্দোলনটি হবে পূর্ববর্তী ডাডাবাদী আন্দোলন থেকে ভিন্ন । ত্রিস্তঁ জারা উদ্ভাবিত ডাডা আন্দোলন থেকে সরে আসার কারণ হল ব্রেতঁ সহ্য করতে পারতেন না ত্রিস্তঁ জারাকে, কেননা কবি-শিল্পী মহলে প্রতিশীল্পের জনক হিসাবে ত্রিস্তঁ জারা খ্যাতি পাচ্ছিলেন। আঁদ্রে ব্রেতঁ সুররিয়ালিজম তত্বটির একমাত্র ব্যাখ্যাকারী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে আরম্ভ করেন। ১৯১৯ সালে ত্রিস্তঁ জারাকে কিন্তু ব্রেতঁ চিঠি লিখে প্যারিসে আসতে বলেছিলেন । একইভাবে ‘হাংরি’ শব্দটি মলয় রায়চৌধুরী পেয়েছিলেন কবি জিওফ্রে চসার থেকে । এই ‘হাংরি’ শব্দটি নেয়ার জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়েছে, তেমন কিছুই করা হয়নি আঁদ্রে ব্রেতঁ ও ত্রিস্তঁ জারা সম্পর্কে । মলয় রায়চৌধুরী হাংরি জেনারেশন আন্দোলন ঘোষণা করেন ১৯৬৫ সালের পয়লা নভেম্বর একটি লিফলেট প্রকাশের মাধ্যমে ।

    পরাবাস্তববাদী আন্দোলনে, প্রথম থেকেই, আঁদ্রে ব্রেতঁ’র সঙ্গে অনেক পরাবাস্তববাদীর সদ্ভাব ছিল না, কিন্তু পরাবাস্তববাদ বিশ্লেষণের সময়ে আলোচকরা তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন না । আমরা যদি বাঙালি আলোচকদের কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখব যে তাঁরা হাংরি জেনারেশন বা ক্ষুধার্ত আন্দোলন বিশ্লেষণ করার সময়ে হাংরি জেনারেশনের সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে অত্যধিক চিন্তিত, হাংরি আন্দোলনকারীদের সাহিত্য অবদান নিয়ে নয় । ব্যাপারটা বিস্ময়কর নয় । তার কারণ অধিকাংশ আলোচক হাংরি জেনারেশনের সদস্যদের বইপত্র সহজে সংগ্রহ করতে পারেন না এবং দ্বিতীয়ত সাংবাদিক-আলোচকদের কুৎসাবিলাসী প্রবণতা । 

    আঁদ্রে ব্রেতঁ তাঁর বন্ধু পল এলুয়ার, বেনিয়ামিন পেরে, মান রে, জাক বারোঁ, রেনে ক্রেভালl, রোবের দেসনস, গিয়র্গে লিমবোর, রোজের ভিত্রাক, জোসেফ দেলতিল, লুই আরাগঁ ও ফিলিপে সুপোকে নিয়ে ১৯১৯ পরাবাস্তববাদ আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন । কিছুকাল পরে, রাজনৈতিক ভাবাদর্শের কারণে তাঁর সঙ্গে লুই আরাগঁর ঝগড়া বেধে গিয়েছিল । মার্সেল দ্যুশঁ,  ত্রিস্তঁ জারা এবং আঁদ্রে ব্রেতঁ, উভয়ের সঙ্গেই ছিলেন, এবং দুটি দলই তাঁকে গুরুত্ব দিতেন, দ্যুশঁ’র অবাস্তব ও অচিন্ত্যনীয় ভাবনার দরুন।

    পরাবাস্তব আন্দোলনের আগে জুরিখে ডাডাবাদী আন্দোলন আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল এবং আঁদ্রে ব্রেতঁ পরাবাস্তববাদের অনুপ্রেরণা পান ডাডা আন্দোলনের পুরোধা ত্রিস্তঁ জারার কাছ থেকে, কিন্তু ব্রেতঁ চিরকাল তা অস্বীকার করে্ছেন । ডাডা ছিল শিল্পবিরোধী আভাঁ গার্দ আন্দোলন ; অবশ্য প্রতিশিল্পও তো শিল্প । ডাডাবাদের রমরমার কারণে ত্রিস্তঁ জারার সঙ্গে ব্রেতঁর সম্পর্ক দূষিত হয়ে যায় ; একজন অন্যজনের নেতৃত্ব স্বীকার করতে চাইতেন না । ডাডা (/ˈdɑːdɑː/) বা ডাডাবাদ (দাদাবাদ নামেও পরিচিত) ছিল ২০ শতকের ইউরোপীয় ভিন্নচিন্তকদের একটি সাহিত্য-শিল্প আন্দোলন, যার প্রাথমিক কেন্দ্র ছিল সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ক্যাবারে ভলতেয়ার ( ১৯১৬ নাগাদ ) এবং নিউ ইয়র্কে (প্রায় ১৯১৫ নাগাদ)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ডাডা আন্দোলন গড়ে ওঠে সেইসব শিল্পীদের নিয়ে, যাঁরা পুঁজিবাদী সমাজের যুক্তি, কারণ বা সৌন্দর্যের ধারণা মানতেন না, বরং তাঁদের কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করতেন আপাত-অর্থহীন, উদ্ভট, অযৌক্তিক এবং বুর্জোয়া-বিরোধী প্রতিবাদী বক্তব্য । আন্দোলনটির শিল্পচর্চা প্রসারিত হয়েছিল দৃশ্যমান, সাহিত্য ও শব্দ মাধ্যমে, যেমন- কোলাজ, শব্দসঙ্গীত, কাট-আপ লেখা, এবং ভাস্কর্য। ডাডাবাদী শিল্পীরা হানাহানি, যুদ্ধ এবং জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে অসন্তোষ প্রকাশ করতেন এবং গোঁড়া বামপন্থীদের সাথে তাঁদের রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল।

    যুদ্ধ-পূর্ববর্তী প্রগতিবাদীদের মধ্যেই ডাডার শিকড় লুকিয়ে ছিল। শিল্পের সংজ্ঞায় পড়েনা এমন সব সৃষ্টিকর্মকে চিহ্নিত করার জন্য ১৯১৩ সালে "প্রতি-শিল্প" শব্দটি চালু করেছিলেন মার্সেল দ্যুশঁ । কিউবিজম এবং কোলাজ ও বিমূর্ত শিল্পের অগ্রগতিই হয়তো ডাডা আন্দোলনকে বাস্তবতার গন্ডী থেকে বিচ্যুত হতে উদ্বুদ্ধ করে। আর শব্দ ও অর্থের প্রথানুগত সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করতে ডাডাকে প্রভাবিত করে ইতালীয় ভবিষ্যতবাদী এবং জার্মান এক্সপ্রেশনিস্টগণ । আলফ্রেড জ্যারির উবু রোই (১৮৯৬) এবং এরিক স্যাটির প্যারেড (১৯১৬-১৭) প্রভৃতি লেখাগুলোকে ডাডাবাদী রচনার আদিরূপ বলা যেতে পারে।  ডাডা আন্দোলনের মূলনীতিগুলো প্রথম সংকলিত হয় ১৯১৬ সালে হুগো বলের ডাডা ম্যানিফেস্টোতে। এই ম্যানিফেস্টোর প্রভাবে পরবর্তিকালে ব্রেতঁ সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টো লিখতে অনুপপ্রাণিত হন -- এই কথা শুনতে ব্রেতঁ’র ভালো লাগত না এবং সেকারণে তিনি বহু সঙ্গীকে এক-এক করে আন্দোলন থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন । তাছাড়া ব্রেতঁ মনে করতেন ডাডাবাদীরা নৈরাজ্যবাদী বা অ্যানার্কিস্ট, যখন কিনা তিনি একজন কমিউনিস্ট ।

    ডাডা আন্দোলনে ছিল জনসমাবেশ, মিছিল ও সাহিত্য সাময়িকীর প্রকাশনা; বিভিন্ন মাধ্যমে শিল্প, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি নিয়ে তুমুল আলোচনা হতো। আন্দোলনের প্রধান ব্যক্তিত্বরা ছিলেন হুগো বল, মার্সেল দ্যুশঁ, এমি হেনিংস, হানস আর্প, রাউল হাউসম্যান, হানা হৌক, জোহান বাডার, ত্রিস্তঁ জারা, ফ্রান্সিস পিকাবিয়া, রিচার্ড হিউলসেনব্যাক, জর্জ গ্রোস, জন হার্টফিল্ড, ম্যান রে, বিয়াট্রিস উড, কার্ট শ্যুইটার্স, হানস রিখটার এবং ম্যাক্স আর্নেস্ট। অন্যান্য  আন্দোলন, শহরতলীর গান এসবের পাশাপাশি পরাবাস্তববাদ, নব্য বাস্তবতা, পপ শিল্প এবং ফ্লক্সেস প্রভৃতি গোষ্ঠীগুলোও ডাডা আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। এই আন্দোলনের অনেকে সুররিয়ালিস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন ।

    পরাবাস্তববাদ আন্দোলনে যাঁরা ব্রেতঁর সঙ্গে একে-একে যোগ দিয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম হলেন ফিলিপে সুপো, লুই আরাগঁ, পল এলুয়ার, রেনে ক্রেভাল, মিশেল লেইরিস, বেনিয়ামিন পেরে, অন্তনাঁ আতো,জাক রিগো, রবের দেসনস, ম্যাক্স আর্নস্ত প্রমুখ । এঁদের অনেকে ডাডাবাদী আন্দোলন ত্যাগ করে পরাবাস্তববাদী আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯২৩ সালে যোগ দেন চিত্রকর আঁদ্রে মাসোঁ ও ইভস তাঙ্গুই । ১৯২১ সালে ভিয়েনায় গিয়ে ফ্রয়েডের সঙ্গে দেখা করেন ব্রেতঁ । ফ্রয়েডের ধারণাকে তিনি সাহিত্য ও ছবি আঁকায় নিয়ে আসতে চান । ফ্রয়েডের প্রভাবে ব্রেতঁ বললেন, সুররিয়ালিজমের মূলকথা হল অবচেতনমনের ক্রিয়াকলাপকে উদ্ভট ও আশ্চর্যকর সব রূপকল্প দ্বারা প্রকাশ করা। ডাডাবাদীরা যেখানে চেয়েছিলেন প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধকে নস্যাৎ করে মানুষকে এমন একটি নান্দনিক দৃষ্টির অধিকারী করতে যার মাধ্যমে সে ভেদ করতে পারবে ভণ্ডামি ও রীতিনীতির বেড়াজাল, পৌঁছাতে পারবে বস্তুর অন্তর্নিহিত সত্যে; সেখানে পরাবাস্তববাদ আরো একধাপ এগিয়ে বলল, প্রকৃত সত্য কেবলমাত্র অবচেতনেই বিরাজ করে। পরাবাস্তববাদী শিল্পীর লক্ষ্য হল তার কৌশলের মাধ্যমে সেই সত্যকে ব্যক্তি-অস্তিত্বের গভীর থেকে তুলে আনা। 

    সুররিয়ালিজমের প্রথম ইশতেহার প্রকাশ করেন ইয়ান গল। এ ইশতেহারটি ১৯২৪ সালের ১ অক্টোবর প্রকাশিত হয়। এর কিছুদিন পরেই ১৫ অক্টোবর আঁদ্রে ব্রেতঁ সুররিয়ালিজমের দ্বিতীয় ইশতেহারটি প্রকাশ করেন। তিনি ১৯৩০ সালে এ ধারার তৃতীয় ইশতেহারটিও প্রকাশ করেন। ইয়ান গল ও আঁদ্রে ব্রেতঁ—দুজনে দু দল সুররিয়ালিস্ট শিল্পীর নেতৃত্ব দিতেন। ইয়ান গলের নেতৃত্বে ছিলেন ফ্রান্সিস পিকাবিয়া, ত্রিস্তঁ জারা, মার্সেল আর্লেন্ড, জোসেফ ডেলটিল, পিয়েরে অ্যালবার্ট বিরোট প্রমুখ। আন্দ্রে ব্রেতঁর নেতৃত্বে ছিলেন লুই আরাগঁ, পল এলুয়ায়, রোবের ডেসনোস, জ্যাক বারোঁ, জর্জ ম্যালকিন প্রমুখ। এ দুটি দলেই ডাডাইজম আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। অবশ্য ইয়ান গল ও আন্দ্রে ব্রেতঁ এই আন্দোলন নিয়ে প্রকাশ্য-রেশারেশিতে জড়িয়ে পড়েন। তখন থেকেই পরাবাস্তববাদীরা ছোটো-ছোটো গোষ্ঠীতে বিভাজিত হতে থাকেন, যদিও তাঁদের শিল্প ও সাহিত্যধারা ছিল একই । পরে আন্দোলনে যোগ দেন জোয়ান মিরো, রেমণ্ড কোয়েনু, ম্যাক্স মোরিজ, পিয়ের নাভিল, জাক আঁদ্রে বোইফার, গেয়র্গে মালকাইন প্রমুখ । জিয়োর্জিও দে চিরোকো এবং পাবলো পিকাসো অনেক সময়ে গোষ্ঠির কর্মকাণ্ডে অংশ নিতেন, তবে আন্দোলনের ঘোষিত সদস্য ছিলেন না।

    সুররিয়ালিজম বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য ডাডাইজম থেকে নিলেও এই মতবাদটি, যে,  ‘শিল্পের উৎস ও উপকরণ’ বিবেচনায় একটি অন্যটির চেয়ে স্বতন্ত্র্য। সুররিয়ালিজম আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন ফরাসি কবি আঁদ্রে ব্রেতঁ। তিনি শিল্প রচনায় ‘অচেতন মনের ওপর গুরুত্ব’ দেওয়ার জন্যে শিল্পীদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি মনে করতেন, ‘অচেতন মন হতে পারে কল্পনার অশেষ উৎস।’ তিনি অচেতন মনের ধারণাটি নিঃসন্দেহে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। ডাডাবাদী শিল্পীরা শিল্পের উৎস ও উপকরণ আহরণে ‘অচেতন’ মনের ধারণা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না। সুররিয়ালিস্ট শিল্পীরা এসে অচেতন মনের উৎস থেকে শিল্প রচনার প্রতি গুরুত্ব দেন এবং সফলতাও লাভ করেন।

    আঁদ্রে ব্রেতঁ মনে করতেন, ‘যা বিস্ময়কর, তা সবসময়ই সুন্দর’। অচেতন মনের গহীনেই বিস্ময়কর সুন্দরের বসবাস। তার সন্ধান করাই সাহিত্যিক-শিল্পীর যথার্থ কাজ। অচেতন মনের কারণেই সুররিয়ালিজমের কবি-শিল্পীরা গভীর আত্মঅনুসন্ধানে নামেন। মনের গহীন থেকে স্বপ্নময় দৃশ্যগুলো হাতড়ে বের করতে এবং মনের অন্তর্গত সত্য উন্মোচনে তাঁরা আগ্রহী ছিলেন। যার কারণে চেতন ও অচেতনের মধ্যে শিল্পীরা বন্ধন স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সুররিয়ালিস্ট শিল্পীরা অচেতন মনের সেই সব উপলব্ধিকে দৃশ্যে রূপ দিলেন যা পূর্বে কেউ কখনো করেনি। অচেতনের ভূমিতে দাঁড়িয়ে বাস্তব উপস্থাপনের কারণে খুব দ্রুতই এ মতবাদটি বিশ্ব শিল্পকলায় ‘অভিনবত্ব’ যোগ করতে সমর্থ হয়। এমনকী, পুঁজিবাদ-বিরোধী এই আন্দোলন থেকে উপকরণ সংগ্রহ করেছেন বহু বিখ্যাত বিজ্ঞাপন কোম্পানি ।

    সুররিয়ালিজমকে ‘নির্দিষ্ট’ ছকে ফেলা কঠিন। সুররিয়ালিস্ট শিল্পীরা একই ছাতার নিচে বসবাস করে ছবি আঁকলেও এবং কবিতা লিখলেও, তাঁদের দৃষ্টি ও উপলব্ধির মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। ফলে এ মতবাদটি সম্পর্কে প্রত্যেকে ব্যাক্তিগত ভাবনা ভেবেছেন। ১৯২৯ সালে সালভাদর দালি এই আন্দোলনে যোগ দেন, যদিও তাঁর সঙ্গেও ব্রেতঁর বনিবনা হতো না । সালভাদর দালি মনে করতেন, ‘সুররিয়ালিজম একটি ধ্বংসাত্মক দর্শন এবং এটি কেবল তা-ই ধ্বংস করে যা দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ রাখে।’ অন্যদিকে জন লেলন বলেছেন, ‘সুররিয়ালিজম আমার কাছে বিশেষ প্রভাব নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। কেননা, আমি উপলব্ধি করেছিলাম আমার কল্পনা উন্মাদনা নয়। বরং সুররিয়ালিজমই আমার বাস্তবতা।’ ব্রেতোঁ বলতেন, ‘ভাবনার যথাযথ পদ্ধতি অনুধাবনের জন্যে সুররিয়ালিজম আবশ্যক।’ এ ধারায় স্বপ্ন ও বাস্তবতার মিশ্রণ হয় বলে সুররিয়ালিজমকে স্বপ্নবাস্তবতাও বলা হয়ে থাকে।

    সুররিয়ালিজমের ঢেউ খুব অল্প সময়েই শিল্পের সবগুলো শাখায় আছড়ে পড়ে। কবিতা, গান থেকে শুরু করে নাটক, সিনেমা পর্যন্ত সুররিয়ালিস্টদের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত সুররিয়ালিজম ধারায় অন্তত ছয়টি সিনেমা নির্মিত হয়। এ ধারার প্রধান শিল্পীরা হলেন জ্যাঁ আর্প, ম্যাক্স আর্নেস্ট, আঁদ্রে মেসন, সালভাদর দালি, রেনে ম্যাগরেট, পিয়েরো রয়, জোয়ান মিরো, পল ডেলভাক্স, ফ্রিদা কাহলো প্রমুখ। এ ধারার চিত্রকর্মের মধ্যে ১৯৩১ সালে আঁকা সালভাদর দালির ‘দ্য পারসিসটেন্স অব মেমোরি’ সবচেয়ে আলোচিত ছবি। এটি কেবল এ ধারার মধ্যেই আলোচিত চিত্রকর্মই নয়, এটি দালিরও অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভার নিদর্শন। ‘দ্য পারসিসটেন্স অব মেমোরি’-তে দালি ‘সময়ের’ বিচিত্র অবস্থাকে ফ্রেমবন্দি করতে চেষ্টা করেছেন। ‘মেটামরফসিস অব নার্সিসাস’, ‘নভিলিটি অব টাইম’, ‘প্রোফাইল অব টাইম’ প্রভৃতি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

    সুররিয়ালিজম ধারার প্রধানতম চিত্রকর্মের মধ্যে রেনে ম্যাগরেটের ‘দ্য সন অব ম্যান’, ‘দিস ইজ নট এ পাইপ’, জর্জিও দি চিরিকো-এর ‘দ্য রেড টাওয়ার’, ম্যাক্স আর্নেস্টের ‘দি এলিফ্যান্ট সিলিবেস’, ইভ তঁগির ‘রিপ্লাই টু রেড’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে সুররিয়ালিজম আন্দোলন থেমে যায়। শিল্পবোদ্ধারা মনে করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের মধ্য দিয়ে এ আন্দোলনটির অনানুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটে। কিন্তু অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্প আন্দোলনের মতো সুররিয়ালিজমের চর্চা বর্তমানেও হচ্ছে। বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনেও সুররিয়ালিজমের প্রভাব লক্ষ করা যায়।  ১৯২৪ সালে প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টো । মার্কসবাদের সঙ্গে আর্তুর র‌্যাঁবোর আত্মপরিবর্তনের ভাবনাকে একত্রিত করার উদ্দেশে ব্রেতঁ ১৯২৭ সালে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন । কিন্তু সাম্যবাদীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বেশিদিন টেকেনি । সেখান থেকেও তিনি ১৯৩৩ সালে বিতাড়িত হন । পরাবাস্তববাদীদের “উন্মাদ প্রেম” তত্বটি ব্রেতঁর এবং “উন্মাদ প্রেম” করার জন্য বেশ কিছু তরুণী সুররিয়ালিস্টদের প্রতি আকৃষ্ট হন । যৌনতার স্বেচ্ছাচারিতার ঢেউ ওঠে সাহিত্যিক ও শিল্পী মহলে ; পরাবাস্তববাদীদের নামের সঙ্গে একজন বা বেশি নারীর সম্পর্ক ঘটে এবং সেই নারীরা তাঁদের পুরুষ প্রেমিকদের নামেই খ্যাতি পেয়েছেন । 

    তাঁর রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং অন্যান্য কারণে প্রেভের, বারোঁ, দেসনস, লেইরিস, লিমবোর, মাসোঁ, কোয়েন্যু, মোরিস, বোইফার সম্পর্কচ্ছদ করেন ব্রেতঁর সঙ্গে এবং গেয়র্গে বাতাইয়ের নেতৃত্বে পৃথক গোষ্ঠী তৈরি করেন । এই সময়েই, ১৯২৯ নাগাদ, ব্রেতঁর গোষ্ঠীতে যোগ দেন সালভাদর দালি, লুই বুনুয়েল, আলবের্তো জিয়াকোমেত্তি, রেনে শার এবং লি মিলার । ত্রিস্তঁ জারার সঙ্গে ঝগড়া মিটমাট করে নেন ব্রেতঁ । দ্বিতীয় সুররিয়ালিস্ট ইশতাহার প্রকাশের সময়ে তাতে সই করেছিলেন আরাগঁ, আর্নস্ট, বুনুয়েল, শার, ক্রেভাল, দালি, এলুয়ার, পেরে, টাঙ্গুই, জারা, ম্যাক্সিম আলেকজান্দ্রে, জো বনসকোয়েত, কামিলে গোয়েমানস, পল নুগ, ফ্রান্সিস পোঙ্গে, মার্কো রিসটিচ, জর্জ শাদুল, আঁদ্রে তিরিয়ঁ এবং আলবেয়ার ভালেনতিন । ফেদেরিকো গারথিয়া লোরকা বন্ধু ছিলেন সালভাদর দালি এবং লুই বুনুয়েলের, আলোচনায় অংশ নিতেন, কিন্তু সুররিয়ালিস্ট গোষ্ঠিতে যোগ দেননি । ১৯২৯ সালে তাঁর মনে হয়েছিল যে দালি আর বুনুয়েলের ফিল্ম “একটি আন্দালুসিয় কুকুর” তাঁকে আক্রমণ করার জন্যে তৈরি হয়েছিল ; সেই থেকে তিনি সুররিয়ালিস্টদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন । আরাগঁ ও জর্জ শাদুল ব্রেতঁ’র গোষ্ঠী ত্যাগ করেছিলেন রাজনৈতিক মতভেদের কারণে, যদিও ব্রেতঁ বলতেন যে তিনিই ওনাদের তাড়িয়েছেন ।

    ১৯৩০ সালে কয়েকজন পরাবাস্তববাদী আঁদ্রে ব্রেতঁ’র একচেটিয়া নেতৃত্বে বিরক্ত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে একটি প্যামফ্লেট ছাপিয়েছিলেন । পরাবাস্তববাদ আন্দোলন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় । ১৯৩৫ সালে ব্রেতঁ এবং সোভিয়েত লেখক ও সাংবাদিক ইলিয়া এরেনবার্গের মাঝে ঝগড়া এমন স্তরে গিয়ে পৌঁছোয় যে প্যারিসের রাস্তায় তাঁদের দুজনের হাতাহাতি আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল । এরেনবার্গ একটি পুস্তিকা ছাপিয়ে বলেছিলেন যে পরাবাস্তববাদীরা পায়ুকামী । এর ফলে পরাবাস্তববাদীদের ইনটারন্যাশানাল কংগ্রেস ফর দি ডেফেন্স অফ কালচার সংস্হা থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল । সালভাদর দালি বলেছিলেন যে পরাবাস্তববাদীদের মধ্যে প্রকৃত সাম্যবাদী হলেন একমাত্র রেনে ক্রেভাল । চটে গিয়ে ক্রেভালকে পরাবাস্তববাদী আন্দোলন থেকে বের করে দ্যান ব্রেতঁ । অঁতনা অতো, ভিত্রাক এবং সুপোকে পরাবাস্তববাদী দল থেকে বের করে দ্যান ব্রেতঁ, মূলত সাম্যবাদের প্রতি ব্রেতঁর আত্মসমর্পণের কারণে এই তিনজন বিরক্ত বোধ করেন ।

    ১৯৩৮ সালে ব্রেতঁ মেকসিকো যাবার সুযোগ পান এবং লিও ট্রটস্কির সঙ্গে দেখা করেন । তাঁর সঙ্গে ছিলেন দিয়েগো রিভেরা ও ফ্রিদা কালহো । ট্রটস্কি এবং ব্রেতঁ একটা যুক্ত ইশতাহার প্রকাশ করেছিলেন, “শিল্পের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা” শিরোনামে । লুই আরাগঁর সঙ্গেও ব্রেতঁর সম্পর্ক ভালো ছিল না । ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ পর্যন্ত ডাডাবাদীদের সঙ্গে আন্দোলন করার পর ১৯২৪ সালে আরাগঁ যোগ দেন পরাবাস্তববাদী আন্দোলনে । অন্যান্য ফরাসী পরাবাস্তববাদীদের সঙ্গে তিনিও ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দ্যান এবং পার্টির পত্রিকায় কলাম ও রাজনৈতিক কবিতা লিখতেন । আরাগঁর সঙ্গে ব্রেতঁর বিবাদের কারণ হল ব্রেতঁ চেয়েছিলেন ট্রটস্কির সঙ্গী ভিকতর সার্জকে সন্মানিত করতে । পরবর্তীকালে, ১৯৫৬ নাগাদ, সোভিয়েত রাষ্ট্র সম্পর্কে নিরাশ হন আরাগঁ, বিশেষ করে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বিংশ কংগ্রেসের পর যখন নিকিতা ক্রুশ্চভ আক্রমণ করেন জোসেফ স্তালিনের ব্যক্তিত্ববাদকে । তা সত্ত্বেও স্তালিনপন্হী আরাগঁ ও ট্রটস্কিপন্হী ব্রেতঁর কখনও মিটমাট হয়নি । কাট-আপ কবিতার জনক ব্রায়ন জিসিনকেও গোষ্ঠী থেকে বিতাড়ন করেন ব্রেতঁ ; ব্রায়ান জিসিনের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ছিলেন বিট ঔপন্যাসিক উইলিয়াম বারোজ । বিট আন্দোলনের প্রায় সকলেই সুররিয়ালিজম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন । বিটদের যৌন স্বাধীনতার ভাবনা-চিন্তায় সুররিয়ালিস্টদের অবদান আছে ।

    পরাবাস্তববাদই সম্ভবত প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন, যেখানে নারীকে দূরতম কোনো নক্ষত্রের আলোর মতো, প্রেরণা ও পরিত্রাণের মতো, কল্পনার দেবী প্রতিমার মতো পবিত্র এক অবস্থান দেওয়া হয়েছিল। নারী তাদের চোখে একই সঙ্গে পবিত্র কুমারী, দেবদূত আবার একই সঙ্গে মোহিনী জাদুকরী, ইন্দ্রিয় উদ্দীপক ও নিয়তির মতো অপ্রতিরোধ্য। ১৯২৯ সালে দ্বিতীয় সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টোয় আদ্রেঁ ব্রেতঁ নারীকে এরকম একটি অপার্থিব অসীম স্বপ্নিল চোখে দেখা ও দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন। পুরুষ শিল্পীদের প্রেরণা, উদ্দীপনা ও কল্পনার সুদীর্ঘ সাম্পান হয়ে এগিয়ে আসবেন নারীরা। হয়ে উঠবেন পুরুষদের আরাধ্য ‘মিউজ’ আর একই সঙ্গে femme fatale। সুদৃশ্য উঁচু পূজার বেদি উদ্ভাসিত করে যেখানে বসে থাকবেন নারীরা। তাঁদের স্বর্গীয় প্রাসাদে আরো সৃষ্টিশীল হয়ে উঠবে পুরুষ।

    ব্রেতঁ ছিলেন সেই সময়ের কবিতার অন্যতম প্রধান পুরুষ। তাঁর সম্মোহক ব্যক্তিত্বে আচ্ছন্ন হননি তাঁর সান্নিধ্যে এসেও – এরকম কোনো দৃষ্টান্ত কোথাও নেই। উজ্জ্বল, সাবলীল, মেধাবী, স্বতঃস্ফূর্ত এবং নায়কসুলভ ব্রেতঁ একই সঙ্গে ছিলেন উদ্ধত, আক্রমণাত্মক ও অহমিকাপূর্ণ। নিজের তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে মাঝেমধ্যেই ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যেতেন। কিন্তু যদি তাঁর একবার মনে হতো যে কেউ তাঁর প্রভুত্বকে অগ্রাহ্য করছে, সর্বশক্তি দিয়ে তাকে আঘাত করতেন। নেতৃত্ব দেওয়ার সব গুণ প্রকৃতিগতভাবেই ছিল তাঁর মধ্যে। মহিলাদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার ছিল তরুণ প্রেমিকের মতো সম্ভ্রমপূর্ণ। তাঁর আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি, অভিজাত ভাষা – এসবের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই মেজাজ হারিয়ে সম্পূর্ণ লাগামহীন হয়ে পড়া আর দুর্বোধ্য জটিল মানসিকতার জন্য পারতপক্ষে অনেকেই ঘাঁটাতে চাইতেন না তাঁকে।

    নারী পরাবাস্তববাদীদের সংখ্যা কম ছিল না । কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে উল্লেখ্য ফ্রিদা কাহলো, আসে বার্গ, লিজে দেহামে, আইরিন হামোয়ের, জয়েস মানসোর, ওলগা ওরোজকো, আলেহান্দ্রা পিৎসারনিক, ভ্যালেনটিন পেনরোজ, জিসেল প্রাসিনস, ব্লাঙ্কা ভারেলা, ইউনিকা জুর্ন প্রমুখ । নারী চিত্রকররা সংখ্যায় ছিলেন বেশি । তাঁদের মধ্যে উল্লেখ্য গেরট্রুড আবেরকমবি, মারিয়ন আদনামস, আইলিন ফরেসটার আগার, রাশেল বায়েস, ফ্যানি ব্রেনান, এমি ব্রিজওয়াটার, লেনোরা ক্যারিংটন, ইথেল কলকুহুন, লেনোর ফিনি, জেন গ্রাভেরোল, ভ্যালেনটিন য়োগো, ফ্রিদা খাহলো, রিটা কার্ন-লারসেন, গ্রেটা নুটসন ( ত্রিস্তঁ জারার স্ত্রী ), জাকেলিন লামবা ( আঁদ্রে ব্রেতঁ’র স্ত্রী), মারুহা মালো, মার্গারেট মডলিন, গ্রেস পেইলথর্প, অ্যালিস রাহোন, এডিথ রিমিঙটন, পেনিলোপি রোজমন্ট, কে সেজ ( ইভস তাঙ্গুইর স্ত্রী ), ইভা স্বাঙ্কমাজেরোভা, ডরোথি ট্যানিঙ ( ম্যাক্স আর্নস্টের স্ত্রী ), রেমেদিওস ভারো ( বেনিয়ামিন পেরের স্ত্রী ) প্রমুখ । ভাস্করদের মধ্যে উল্লেখ্য এলিজা ব্রেতঁ ( আঁদ্রে ব্রেতঁ’র তৃতীয় স্ত্রী ), মেরে ওপেনহাইম ( মান রে’র মডেল ছিলেন ) এবং মিমি পারেন্ট । ফোটোগ্রাফারদের মধ্যে উল্লেখ্য ছিলেন ক্লদ কাহুন, নুশ এলুয়ার, হেনরিয়েতা গ্রিনদাত, আইডা কার, দোরা মার ( পাবলো পিকাসোর সঙ্গে নয় বছর লিভ টুগেদার করেছিলেন ), এমিলা মেদকোভা, লি মিলার, কাতি হোরনা প্রমুখ । পুরুষ পরাবাস্তববাদীদের বহু ফোটো এই নারী ফোটোগ্রাফারদের কারণেই ইতিহাসে স্হান পেয়েছে ।

    নারীদের নিয়ে পরাবাস্তববাদীদের এই স্বপ্নিল কাব্যময় উচ্ছ্বাস জোরালো একটা ধাক্কা খেল যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পশ্চিম ইউরোপে দ্রম্নত বদলাতে থাকা পরিস্থিতির ভস্ম ও শোণিত স্নাত শোণিত আত্মশক্তিসম্পন্ন নারীরা তাঁদের ভারী বাস্তবতা নিয়ে এসে দাঁড়ালেন সামনে। স্বপ্নে দেখা নারীর আয়না-শরীর ভেঙে পড়ল ঝুরঝুর করে আর বেরিয়ে এলো মেরুদ-সম্পন্ন রক্তমাংসের মানবী। সুররিয়ালিজম চেয়েছিল পুরুষের নিয়ন্ত্রণে নারীদের মুক্তি। কিন্তু যে গভীর অতলশায়ী মুক্তি দরজা খুলে দিলো নারীদের জন্য, সুররিয়ালিজম তার জন্য তৈরি ছিল না। মৃত অ্যালবাট্রসের মতো এই বিমূর্ত আদর্শায়িত ধারণা নারী শিল্পীদের গলায় ঝুলে থেকেছে, যাকে ঝেড়ে ফেলে নিজস্ব শিল্পসত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করা দুঃসাধ্য ছিল। সময় লেগেছে সাফল্য পেতে। কিন্তু দিনের শেষে হেসেছিলেন তাঁরাই। এমন নয় যে, পরাবাস্তবতার প্রধান মশালবাহক ব্রেতঁ চাইছিলেন যে পুরুষরাই হবেন এই আন্দোলনের ঋত্বিক আর দ্যুতিময় নারী শিল্পী এবং সাহিত্যিকদের কাজ হবে মুগ্ধ সাদা পালক ঘাসের ওপরে ফেলে যাওয়া এবং আকর্ষণীয় ‘গুজব’ হিসেবে সুখী থাকা। ১৯২৯ সালে দ্বিতীয় সুররিয়ালিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশের পরবর্তী প্রদর্শনীগুলোতে নারী শিল্পীরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু পুরুষ উদ্ভাবিত পরাবাস্তবতা থেকে তাঁদের ভাষা, স্বর ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বতন্ত্র। নিজেদের ভারী অসিত্মত্ব, শরীরী উপস্থিতি জোরালোভাবে জায়গা পেল তাঁদের ছবিতে।

    কিন্তু নারী শিল্পীদের কাছে আত্মপ্রতিকৃতি হয়ে উঠল একটি সশস্ত্র ভাষার মতো। নিজস্ব গোপন একটি সন্ত্রাসের মতো। এই আন্দোলনের মধ্যে নারীরা এমন এক পৃথিবীর ঝলক দেখলেন, যেখানে আরোপিত বিধিনিষেধ না মেনে সৃজনশীল থাকা যায়, দমচাপা প্রতিবাদের ইচ্ছেগুলোর উৎস থেকে পাথরের বাঁধ সরিয়ে দেওয়া যায়। নগ্ন ও উদ্দাম করা যায় কল্পনাকে। নোঙর নামানো জাহাজের মতো অনড় ও ঠাসবুনট একটি উপস্থিতি হয়ে ছবিতে নিজের মুখ তাঁদের কাছে হয়ে উঠল অন্যতম প্রধান আইকন। যে ছবি আত্মপ্রতিকৃতি নয়, সেখানেও বারবার আসতে থাকল শিল্পীর শরীরী প্রতিমা। ফ্রিদা কাহ্লোর (১৯০৭-৫৪) ক্যানভাস তাঁর যন্ত্রণাবিদ্ধ শান্ত মুখশ্রী ধরে রাখল। মুখের বিশেষ কিছু চিহ্ন যা তাঁকে চেনায় – যেমন পাখির ডানার মতো ভুরু, আমন্ড আকারের চোখ ছবিতেও আনলেন তিনি। রিমেদিওস ভারোর (১৯০৮-৬৩) ছবিতে পানপাতার মতো মুখ, তীক্ষন নাক, দীর্ঘ মাথাভর্তি চুলের নারীর মধ্যে নির্ভুল চেনা গেল শিল্পীকে। আবার লিওনর ফিনির (১৯১৮-৯৬) আঁকা নারীরা তাদের বেড়ালের মতো কালো চোখ আর ইন্দ্রিয়াসক্ত মুখ নিয়ে হয়ে উঠল ফিনিরই চেনা মুখচ্ছবি। ১৯৩৯ সালের ‘The Alcove : An interior with three women’ ছবিতে ভারী  পর্দা টাঙানো ঘরে দুজন অর্ধশায়িত মহিলা পরস্পরকে ছুঁয়ে আছেন। আর একজন মহিলা দাঁড়িয়ে। তিনজনেই যেন কোনো কিছুর প্রতীক্ষা করছেন চাপা উদ্বিগ্ন মুখে। যে তিনজন নারীর ছবি, তাঁরা যে লিওনর ফিনি, লিওনারা ক্যারিংটন এবং ইলিন অগার – এটা ছবিটিকে একঝলক দেখেই চেনা যায়। এমনকি যখন অন্য কোনো নারীর প্রতিকৃতি আঁকছেন তাঁরা, সেখানেও তাঁদের বিদ্রোহের অস্বীকারের জোরালো পাঞ্জার ছাপ এই শিল্পীরা সেইসব নারীর মুখে ঘন লাল নিম্নরেখা দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হতে ১৯৩৯ সালে অধিকাংশ পরাবাস্তববাদী বিদেশে পালিয়ে যান এবং তাঁদের মধ্যে আন্দোলনের উদ্দেশ্য ও বক্তব্য নিয়ে খেয়োখেয়ি বেধে যায় । অলোচকরা মনে করেন যে গোষ্ঠী হিসাবে পরাবাস্তববাদ ১৯৪৭ সালে ভেঙে যায়, প্যারিসে “লে সুররিয়ালিজমে” প্রদর্শনীর পর । যুদ্ধের শেষে, প্যারিসে ব্রেতঁ ও মার্সেল দ্যুশঁ’র ফিরে আসার পর প্রদর্শনীর কর্তারা সম্বর্ধনা দিতে চাইছিলেন কিন্তু পুরোনো পরাবাস্তববাদীরা জানতে পারলেন যে একদল যুবক পরাবাস্তববাদীর আবির্ভাব হয়েছে, যাঁরা বেশ ভিন্ন পথ ধরে এগোতে চাইছেন । যুবকদের মধ্যে উল্লেখ্য ছিলেন ফ্রাঁসিস বেকঁ, আলান দাভি, এদুয়ার্দো পোলোৎসি, রিচার্ড হ্যামিলটন প্রমুখ ।

    সুররিয়ালিজমের উদ্ভব সত্ত্বেও ডাডার প্রভাব কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি, তা প্রতিটি দশকে কবর থেকে লাফিয়ে ওঠে, যেমন আর্পের বিমূর্ততা, শুইটারের নির্মাণ, পিকাবিয়ার টারগেট ও স্ট্রাইপ এবং দ্যুশঁ’র রেডিমেড বস্তু বিশ শতকের শিল্পীদের কাজে ও আন্দোলনে ছড়িয়ে পড়ছিল । স্টুয়ার্ট ডেভিসের বিমূর্ততা থেকে অ্যান্ডি ওয়ারহলের পপ আর্ট, জাসপার জনসের টারগেট ও ফ্ল্যাগ থেকে রবার্ট রাউশেনবার্গের কোলাঝে -- সমসাময়িক সাহিত্য ও শিল্পের যেদিকেই তাকানো হোক পাওয়া যাবে ডাডার প্রভাব, সুররিয়ালিজমের উপস্হিতি । ১৯৬৬ সালে মৃত্যুর আগে, ব্রেতঁ লিখেছিলেন, “ডাডা আন্দোলনের পর আমরা মৌলিক কিছু করিনি । ডাডা ও সুররিয়ালিজম আন্দোলনকারীদের ওপর প্রচুর চাপ সৃষ্টি করেছিল এবং কয়েকজন আত্মহত্যা করেন, যেমন জাক রিগো, রেনে ক্রেভেল, আরশাইল গোর্কি, অসকার দোমিংগেজ প্রমুখ । অত্যধিক মাদক সেবনে মৃত্যু হয় গিলবার্ত লেকঁতে ও অঁতনা আতোর ।



     

  • বিট জেনারেশনের মহিলা কবি লেনোর কানডেল | 120.60.8.227 | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৫৩732398
  • বিট জেনারেশনের মহিলা কবি লেনোর কানডেল-এর কবিতা ( ১৯৩২ - ২০০৯ )

    অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী       

                                           

                                                        ঈশ্বরের/প্রেমের কবিতা   

    ভালোবাসার অন্য কোনো পথ নেই/কিন্তু/সুন্দর/

                আমি তোমার সবকিছু ভালোবাসি

    আমি তোমাকে ভালোবাসি/তোমার শিশ্ন আমার হাতে

    পাখির মতন চঞ্চল হয়ে ওঠে   

    আমার আঙুলগুলোয়

    যেমন যেমন তুমি ফুলে বেড়ে ওঠো আর কঠিন হও আমার হাতে

    বাধ্য করো আমার আঙুলগুলোকে খুলতে

    তোমার শক্ত শক্তি

    তুমি সুন্দর/তুমি সুন্দর   

    তুমি এক শতবার সুন্দর

    আমি আমার প্রেমের হাত দিয়ে তোমাকে আলোড়িত করি   

                  গোলাপি-নখ দীর্ঘ আঙুল

    আমি তোমাকে সোহাগ করি

    আমি তোমাকে আদর করি

          আমার আঙুলের ডগা...আমার হাতের তালু…

    তোমার লিঙ্গ উঠে দাঁড়ায় আর আমার হাতে স্পন্দিত হয়

    এক চমকপ্রদ জ্ঞান/যেমন আফ্রোদিতি জানতেন

              একটা সময়ে দরবতারা পবিত্র ছিলেন

              /আমি মনে করতে পারি লতাকুঞ্জের মধ্যে রাতগুলো

               আমাদের রস মধুর চেয়েও মিষ্টি

              /আমরা একইসঙ্গে ছিলুম মন্দির আর দেবতা/

    আমি তোমার সঙ্গে নগ্ন

    আর আমি আমার মুখ তোমাতে দিচ্ছি    শ্লথতায়

    আমি অপেক্ষা করছি তোমাকে চুমু খাবার জন্য

    আর আমার জিভ তোমাকে পুজো করছে

                          তুমি সুন্দর

                          তোমার দেহ আমার কাছে এগিয়ে আসে

    মাংসের সঙ্গে মাংস

    ত্বক পিছলে যায় সোনালি ত্বকে

    যেমন আমার তোমাতে

            আমার মুখ আমার জিভ আমার হাত

    আমার তলপেট আর পাদুটি

    তোমার মুখে            তোমার ভালোবাসায়

    অবাধে...অবাধে…

    আমাদের দেহ আলাদা হয় আর জোড়া লাগে

    অসহ্যভাবে

    তোমার মুখাবয়ব আমার ওপরে

                যাবতীয় দেবতাদের মুখাবয়ব

                আর সুন্দর রাক্ষসদের

       তোমার চোখ

       ভালোবাসা ভালোবাসাকে ছোঁয়

        মন্দির আর দেবতা

        এক   

    সন্মতির বয়স    

    দেবদূতদের সঙ্গে কথা না বলে আমি সন্তুষ্ট হই না

    আমি দেবতার চোখ দেখতে চাই

    যাতে ব্রহ্মাণ্ডে অলৌকিকতার টোপ দেবার জন্য নিজেরটা প্রয়োগ করতে পারি

    যাতে শ্বাস ফেলতে পারি আর বিষ ওগরাতে পারি

    যাতে ওই দরোজাটার তালা খুলতে পারি যেটা আগেই খোলা আর ঢুকতে পারি বর্তমানে

    যা আমি কল্পনা করতে পারি না

    আমি তার জবাব চাই যে প্রশ্নগুলো করতে এখনও শিখিনি

    আমি আলোকপ্রাপ্তিতে প্রবেসের দাবি করছি, অলৌকিকতার সংমিশ্রণে

    অসহ্য আলোর উপস্হিতিতে

    হয়তো সেই ভাবেই যেভাবে গুটিপোকারা তাদের উড়ালের ডানা দাবি করে

    কিংবা ব্যাঙাচিরা দাবি করে তাদের ব্যাঙজীবন

    কিংবা মানবসন্তান দাবি করে তার বেরোনো

    উষ্ণ গর্ভের সুরক্ষা থেকে

    প্রথমে ওরা দেবদূতদের জবাই করলো

    ১.

    প্রথমে ওরা দেবদূতদের জবাই করলো

    তারের দড়ি দিয়ে তাদের রোগা শাদা পা বেঁধে

    আর

    তাদের রেশমের কন্ঠ শীতল ছুরি দিয়ে চিরে

    মুর্গির বাচ্চার মতন ডানা ঝাপটিয়ে তারা মারা গেল

    আর তাদের অবিনশ্বর রক্ত জ্বলন্ত পৃথিবীকে ভিজিয়ে দিলো

    আমরা মাটির তলা থেকে তা দেখলুম

    সমাধিফলক থেকে, কবরের গুপ্তঘরে

    আমাদের হাড়গিলে আঙুল চিবিয়ে

    আর

    পেচ্ছাপে দাগ-ধরা গোটাবার চাদরে কাঁপতে লাগলো

    বিদায় নিয়েছে উচ্চশ্রেনির দূতেরা আর স্বর্গীয় দূতেরা

    ওরা ওদের খেয়ে ফেলেছে আর মজ্জার লোভে হাড় ফাটিয়েছে

    ওরা নিজেদের পাছা পুঁছেছে দেবদূতদের পালকে

    আর এখন তারা পাথুরে রাস্তায় হাঁটছে

    আগুনের গর্তের মতন চোখ নিয়ে

    ২.

    দেবদূতদের ব্যাপারে কে শাসকদের খবর দিয়েছে ?

    কে যিশুর শেষ-ভোজের পেয়ালা চুরি করেছে আর তা বদলে দিয়েছে একজগ মদ দিয়ে?

    কে গ্যাব্রিয়েলের সোনালি শিঙকে লোপাট করেছে ?

                                তা কি কোনো ভেতরের লোক করেছিল ?

    কে দেবতার মেষশাবককে পুড়িয়ে খেয়েছে ?

    কে সন্ত পিটারের চাবিগুলো উত্তর সাগরতীরের 

    পায়খানার মধ্যে ফেলেছে ?

    কে সন্ত মেরিকে ঘরসামলাবার ছাপ মেরেছে ?

                                তা কি কোনো ভেতরের লোক করেছিল?

    আমাদের অস্ত্রগুলো কোথায় ?

    আমদের গদাগুলো কোথায়, আমাদের আগ্নেয়তীর, আমাদের বিষ-গ্যাস

    আমাদের হাতবোমা ?

    আমরা বন্দুকের জন্যে হাতড়াই আর আমাদের হাঁটুতে গজায় ক্রেডিট কার্ড।

    আমরা বাতিল চেক বমি করি

    দুই পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকি চাপের সামনে সাবান-মাখা মুখে ফুঁপিয়ে

    আমাদের রেডিওঅ্যক্টিভ চোখে

    আর চিৎকার করি

    শেষতম রাইফেলের জন্য

    পয়গম্বরি কামান

    ইস্টারের বোমা

    নারীদের গর্ভ চিরে শিশুদের বের করে আনে

    বেয়োনেট দিয়ে

    অন্ধ নার্সদের চোখে রক্ত ছেটাতে থাকে

    তাদেরই তরোয়ালে তাদের কচুকাটা করার আগে

    পুরুষদের লিঙ্গ হয়ে উঠেছে নীল ইস্পাতের মেশিনগান,

    বুলেট বীর্যপাত হয়, মৃত্যুকে ওরা অরগ্যাজমের মতন ছড়িয়ে দ্যায়

    ঝোপের ভেতরে প্রেমিকরা একে আরেকের লিঙ্গ ওপড়াতে থাকে

    লোহার নখ দিয়ে

    টাটকা রক্ত খেতে দেয়া হয় স্বাস্হ্যের জন্য বীজানুহীন

    কাগজের কাপে

    ক্লাবের সিফিলিসে ভোগা মেয়েরা তা এক ঢোঁকে গিলে ফ্যালে

    পেপিয়ার মাশে মুখোশ পরে

    প্রত্যেকে মুখ হাতে রাঙানো হ্যামলেটের মা

    দশ বছর বয়সে

    আমরা মাটির তলা থেকে দেখি

    আমাদের চোখগুলো দূরবীনের মতন

    আমাদের আঙুল ছুঁড়ে দিই কুকুরদের দিকে লজেঞ্চুসের জন্য

    তাদের ডাক থামাবার উদ্দেশে

    শান্তি বজায় রাখার খাতিরে

    বন্ধুত্ব করা আর প্রভাবিত করার জন্য

    ৩.

    বোমা পড়লে আশ্রয় নেবার কোলাপসিবল ঘরগুলো আমরা কোলাপস করে দিয়েছি

    আমরা জীবন বাঁচাবার গোটাবার নৌকোগুলো গুটিয়ে ফেলেছি

    আর বারোটা বাজবার পর

    সেগুলো ভেঙেচুরে ইঁদুরের গুয়ে জমে পাহাড় হয়েছে

    সার হয়েছে বিষাক্ত ফুলের জন্য

    আর ভিনাসকুঁজো গাছের জন্য

    মাটির তলায় আমরা গুঁড়ি মেরে থাকি

    আমাদের ছ্যাঁদাকরা বুক জড়িয়ে ধরি ছাতাপড়া বাহু দিয়ে

    আমাদের ছিন্ন শিরা থেকে টপটপ রক্ত পড়ার আওয়াজ শুনতে থাকি

    আমাদের চেনলাগানো খুলির ব্রহ্মতালু উপড়ে তুলি

    মস্তিষ্কে হাওয়া খেলানোর জন্য

                       ওরা আমাদের দেবদূতদের খুন করেছে

    কৌতূহলীদের কাছে আমরা আমাদের দেহ আর সময় বিকিয়ে দিয়েছি

    আমরা আমাদের শৈশব বেচে দিয়েছি ডিশওয়াশার আর মিলশহরের বিনিময়ে

    আর নুন ঘষেছি রক্তাক্ত স্নায়ুতে

    অনুসন্ধানের সময়ে

                     আর ওরা দেবতার খোলা মুখে হেগেছে

    ওরা সন্তদের শেকল বেঁধে ঝুলিয়েছে আর ওরা

    পয়গম্বরদের ঘুমের ইনজেকশান দিয়েছে

    ওরা ক্রিস্ট আর শিশ্ন উভয়কেই অস্বীকার করেছে

    আর বুদ্ধকে বলেছে স্কিৎসোফ্রেনিবার রোগী

    ওরা যাযকদের আর পবিত্র পুরুষদের নপুংসক করে দিয়েছে

    এমনকি প্রেমের শব্দগুলোকে সেনসর করেছে

             প্রতিটি মানুষের জন্য মগজের শল্যচিকিৎসা!

    আর তারা রাষ্ট্রপতি পদের জন্য একজন অবমানবকে বেছেছে

             প্রতিটি গৃহিণীর জন্য মগজের শল্যচিকিৎসা!

             প্রতিটি ব্যবসাদারের জন্য মগজের শল্যচিকিৎসা !

             শিশুদের প্রতিটি স্কুলের জন্য মগজের শল্যচিকিৎসা !

    আর তারা দেবদূতদের খুন করেছে

    ৪.

    এখন গলিগুলোতে উভলিঙ্গীরা জড়ো হয় কুষ্ঠরোগিদের ঘণ্টা বাজিয়ে যেমন করে ধুনুচি জ্বালিয়ে দেবতাদের ধর্ষণ করার উৎসবের তোড়জোড় করে

             যে চর্বি ওদের ঠোঁটে চকচক করে তা দেবদূতদের দেহের

             যে রক্ত তাদের থাবায় জমে থাকে তা দেবদূতদের রক্ত

    ওরা রাস্তায় জড়ো হচ্ছে আর দেবদূতদের চোখ নিয়ে দাবা খেলছে

             ওরা শেষ মানুষদের প্রলয়ের জন্য গড়ে তুলছে

       

    ৫.

    এখন ভোরবেলার পরে

    আমরা মাটির তলায় পাথর সরাচ্ছি, গুহার ভেতর থেকে

    আমরা ফণিমনসার আঠায় পাওয়া দৃষ্টিপ্রতিভায় চোখ বড়ো করে তুলেছি

    আর দাঁত মেজেছি গত রাতের মদে

    আমাদের বগল ঠুসে বন্ধ করেছি ধুলোয় আর ছুঁড়ে দিয়েছি

    আর তর্পণ করেছি একে আরেকের পায়ে

    আর আমরা রাস্তায় ঢুকবো আর তাদের মধ্যে হাঁটবো আর লড়াই করব

    আমাদের রোগা ফাঁকা হাত তুলে ধরব ওপরে

    আমরা জগতের আগন্তুকদের মাঝে তিক্ত বাতাসের মতন প্রবেশ করব

    আর আমাদের রক্ত গলিয়ে ফেলবে লোহা

    আমাদের শ্বাস গলিয়ে ফেলবে ইস্পাত

    আমরা খোলা চোখে মুখোমুখি দাঁড়াব

    আর আমাদের চোখের জল ঘটাবে ভূকম্পন

    আর আমাদের বিলাপ পাহাযগুলোকে উঁচু করে তুলবে 

    সূর্যের পথচলা থামিয়ে দেবে

    ওরা আর কোনো দেবদূতকে খুন করতে পারবে না !

    সঙ্গমের সঙ্গে ভালোবাসাবাসি করা

    সঙ্গমের সঙ্গে ভালোবাসাবাসি করা

    ভালোবাসার সমস্ত উষ্ণতা আর আরণ্যকতা নিয়ে সঙ্গম করা

    তোমার মুখের জ্বর আমার তাবৎ গোপনীয়তা আর অজুহাত খেয়ে ফেলছে

    আমাকে রেখে যাচ্ছে বিশুদ্ধ জ্বলন্ত নিঃশেষে

    এই মিষ্টতা সহ্য করা কঠিন

          মুখ প্রায় ছুঁচ্ছে না মুখকে

          স্তনবৃন্তের সঙ্গে স্তনবৃন্ত আমরা ছুঁইয়েছি

          আর আমরা হয়ে গেছি সহসা অসাড়

          এক তেজোময়তার স্রোতে

    যা কিছু আমি এতোকাল জেনেছি তার অতিরিক্ত

          আমরা স্পর্শ করলুম

          আর দুই দিন পরে

           আমার হাত জড়িয়ে ধরল তোমার ধাতুরসাসিক্ত   শিশ্ন                                                 

           আবার !      

                        তেজোময়তা

                        বর্ণনাতীত

                        প্রায়       অসহনীয়    

    প্রপঞ্চগুণহীন বস্তু আর প্রপঞ্চের মাঝের আড়াল

                অতিক্রম করে

    বৃত্ত            সাময়িকভাবে পরিপূর্ণ

                                          ক্রিয়ার ভারসাম্য

                                                  নিখুঁত

              একসঙ্গে পাসাপ[আশি, আমাদের দেহ ভালোবাসায় মজে যাচ্ছে

              যা কখনও মজেনি এর আগে

              আমি তোমার কাঁধে চুমু খাই আর তা থেকে লালসার গন্ধ বেরোয়

              কামদগ্ধ দেবদূতদরা নক্ষত্রদের সঙ্গে সঙ্গম করছে

    আর চিৎকার করে স্বর্গকে জানাচ্ছে তাদের অপ্রশমণীয় আনন্দ

              ধুমকেতুদের লালসা ধাক্কা খাচ্ছে অপার্থিব মৃগিরোগে

              স্ত্রীপুরুষ লক্ষণান্বিত দেবতারা পরস্পরের সঙ্গে

              অচিন্ত্যনীয় কাজ করছে

              চিৎকার করেসমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে আর তা অতিক্রম করে 

                                           ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের আহ্লাদ

    আর আমরা পাসাপাশি, আমাদের দেহ ভিজে আর জ্বলন্ত,

    আর

          আমরা ফোঁপাই      আমরা ফোঁপাই আমরা ফোঁপাই অবিশ্বাস্য চোখের জলে

          যা সন্তরা আর পবিত্র মানুষেরা ঝরিয়েছে 

          তাদের নিজেদের জ্যোতির্ময়  দেবতাদের সামনে    

    আমি কানে কানে তোমার প্রতিটি রোমকূপে ভালোবাসা জানিয়েছি   

                                যেমন তুমি জানিয়েছ

                                      আমাকে   

    আমার সমস্ত দেহ হয়ে উঠেছে যোনিমুখ     

    আমার পা আমার হাত আমার তলপেট আমার বুক আমার কাঁধ আমার চোখ  

    তুমি তোমার জিভ দিয়ে 

    আমাকে অবিরাম সঙ্গম করো   তোমার দৃষ্টি দিয়ে

    তোমার কথা দিয়ে তোমার উপস্হিতি দিয়ে

    আমরা অন্য মূর্তিতে বদলে যাচ্ছি

    আমরা কোমল উষ্ণ আর কম্পনরত

    নতুন সোনালি প্রজাপতির মতন

                           তেজোময়তা

                           বর্ণনাতীত

                           প্রায় অসহনীয়

    রাতের বেলায় অনেক সময়ে আমি দেখি তোমার দেহ উদ্ভাসিত

    ভালোবাসার গ্রিক দেবতা/কবিতা

    ভালোবাসার যুবক গ্রিক দেবতাকে প্রণাম যিনি তরুণীদের সঙ্গে সঙ্গম করেন!

    কেবল দেবতারাই অমন ঔদার্য্য পছন্দ করেন 

    সবায়ের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেন সুষমা

    ভালোবাসার গ্রিক দেবতাকে প্রণাম ! যিনি সৌন্দর্য্যকে ভালোবাসেন

    আর তা সর্বত্র পান     

    হে ভালোবাসার গ্রিক দেবতা আমি তোমাকে আর তোমার দেবীদের দেখেছি

    ভালোবাসার কামনার কুয়াশায় মোড়া ফুলের মতন সত্য  

    যা নিজের দিনে ফোটে আর বাতাসে হারিয়ে যায়

    আমি তোমার চোখ দেখেছি আহ্লাদে ধিকিধিকি জ্বলছে    

    যখন তুমি তোমার সুন্দর জিভ দিয়ে মিষ্টি মননের সৌন্দর্য্যকে ভালোবাসছিলে  

    আর তারপর দেখেছি একই আহ্লাদের গভীরতায় ঝিকমিক করছে 

    যখন কোমল রমণীরা তোমার বাহুতে শুয়েছিল

    ভালোবাসার গ্রিক দেবতাকে প্রণাম ! যিনি প্রেমকে সঞ্চয় করে রাখেন না

    বরং তা খরচ করে ফ্যালেন সোনালি ছাঁকনিতে জলের মতন

    ভাগাভাগি করে নেন নিজের কোমল খেয়ালি গরিমা 

    সকলের সঙ্গে যারা তাঁর উপস্হিতিকে মান্যতা দেয়

    ফুলের মতন  অবিশ্বস্ত, বাতাস-তাড়িত প্রজাপতির মতন চপল

    ভালোবাসার গ্রিক দেবতাকে প্রণাম, তিনি দেবতাদের বালক !

    যিনি কেবল সৌন্দর্য্যকে ভালোবাসেন     

    আর তা খুঁজে পান সর্বত্র

    ফিনিক্সের গান                               

    তাহলে আমি আর বড়ো হবো না

    যদি শিশু বলতে বোঝায় বিস্ময়ের বোধ   

    আমার বৃষ্টিময় বাতাসে আমার মাথায় থাকে বৃষ্টি

    আমি সময়ের আগুনে উধাও হবো না

    বরং নিজেকে ফিনিক্স হিসাবে প্রমাণ করব

                       ( নক্ষত্রের গুঁড়োর মতন ছাই )

    আবার জন্ম আর আবার আর আবার                                                   

                                        

    স্বৈরাচারীদের জন্য কবিতা     

    সংবেদনশীল মানুষেরা অসংখ্য--

              আমি প্রতিজ্ঞা করেছি তাদের আলোকিত করব

    --বুদ্ধধর্মের প্রথম সঙ্কল্প

    মনে হয় তোমাকেও ভালোবাসতে হবে

    সুন্দরদের ভালোবাসা সহজ

    শিশুদের    সকালের গরিমা   

    সহজ  ( যেমন যেমন সমবেদনা বৃদ্ধি পায় )

    অচেনাকে ভালোবাসা

    অনুধাবন করা আরও সহজ ( সমবেদনায় )

    তাতে যে ব্যথা আর সন্ত্রাস লুকিয়ে আছে

    যারা নিজেদের চারিপাশের জগতকে

    হিংস্রতার সঙ্গে পরিচালনা করেন  এতো ঘৃণা

    কিন্তু ওহ     আমি যিশুখ্রিস্ট নই যে

    আমাকে যারা ফাঁসি দেয় তাদের আশীর্বাদ করবো

    আমি বুদ্ধ নই        কোনো সন্ত নই

    আমার সেই জ্যোতির্ময় ক্ষমতাও নেই

    বিশ্বাসে আলোকিত


     

    তবু     তা সত্তেও

    তুমি একজন সংবেদনশীল মানুষ

    এই বাতাসে শ্বাস নিচ্ছ

    এমনকি আমিও একজন সংবেদনশীল মানুষ

    এই বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি

    চাইছি নিজের আলোকপ্রাপ্তি

    তোমার জন্যেও চাইতে হবে

    যদি আমার যথেষ্ট ভালোবাসা থাকে

    যদি আমার যথেষ্ট বিশ্বাস থাকে

    হয়তো আমি তোমার পথকে পার হতে পারবো

    আর তাকে বদলাতেও পারব

    আমাকে ক্ষমা করুন, তাহলে--

    আমি এখনও আপনাকে ভালোবাসতে পারব না



     

  • বিট জেনারেশনের মহিলা কবি ডায়ানে ডি প্রিমা | 120.60.8.227 | ১৩ জুলাই ২০২০ ১৯:৫৫732399
  • বিট জেনারেশনের মহিলা কবি ডায়ানে ডি প্রিমা-র কবিতা । অনুবাদ : মলয় রায়চৌধুরী

    প্রথম তুষার, কেরহঙ্কসন

    অ্যালান-এর জন্য

    এটা, তাহলে, পৃথিবী আমাকে যা উপহার দিয়েছে

    ( তুমি আমাকে দিয়েছ )

    নরম তুষার

    কোটরে মুঠোমাপের

    পুকুরের জলের ওপরে পড়ে আছে

    দেখতে আমার দীর্ঘ মোমবাতির সমান 

    যা জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে

    যা সন্ধ্যায় জ্বলবে যখন তুষার

    ভরে তুলবে উপত্যকাকে

    এই কোটর

    কোনো বন্ধুই নেমে যাবে না

    কেউই মেক্সিকো থেকে বাদামি আসবে না

    ক্যালিফোর্নিয়ার সূর্যভূমি থেকে, মাদক নিয়ে

    তারা এখন ছড়ানো, মৃত বা নিঃশব্দ

    উন্মাদনায় ফাটানো

    আমাদের সমবেত দৃষ্টিচেতনার চিৎকাররত ঔজ্বল্য দিয়ে

    আর তোমার এই উপহার--

    শাদা নৈঃশব্দ্য ভরে তুলছে আমার জীবনের বর্ণালী-নকশা ।

    নববর্ষের বৌদ্ধ গান

    আমি তোমাকে সবুজ মখমলে দেখলুম, ঝোলাহাতা পোশাক

    আগুনের সামনে বসে আছ, আমাদের বাড়ি

    কোনোরকমে করে তোলা হয়েছে আরও সৌষ্ঠবপূর্ণ, আর তুমি বললে

    “তোমার চুলে নক্ষত্র রয়েছে”-- এই সত্য আমি

    নিজের সঙ্গে নিয়ে এলুম

    এই প্যাচপ্যাচে আর নোংরা জায়গায় যাকে আমরা করে তুলব সোনালি

    করে তুলব দামি আর কিংবদন্তিপ্রতিম, এটা আমাদের স্বভাব,

    আর এটাই সত্য, যে আমরা এখানে এসেছি, আমি তোমাকে বললুম,

    অন্য গ্রহ থেকে

    যেখানে আমরা ছিলুম দেবীদেবতা, আমাদের এখানে পাঠানো হয়েছে,

    কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে

    যে সোনালি মুখোশ আমি আগে দেখেছিলুম, তা খাপ খেয়ে গেলো

    তোমার মুখে এতো সুন্দরভাবে, ফেরত দিলে না

    ষাঁড়ের মুখ তুমি যোগাড় করেছিলে সেটাও

    উত্তরের লোকজনদের মাঝে, যাযাবরের দল, গোবি মরুভূমি

    ওই তাঁবুগুলো আমি আর দেখিনি, ওয়াগনগুলোকেও নয়

    অত্যন্ত ঝোড়ো উপত্যকায় অত্যন্ত শ্লথ,

    এতো ঠাণ্ডা, আকাশে প্রতিটি নক্ষত্রের ভিন্ন-ভিন্ন রঙ ছিল

    আকাশ নিজেই একটা জট পাকানো রঙচঙে পর্দা, ঝলমল করছিল

    কিন্তু প্রায়, আমি সেই গ্রহ দেখতে পাচ্ছিলুম যেখান থেকে আমরা এসেছি

    আমি মনে করতে পারিনি ( তখন ) আমাদের উদ্দেশ্য কি ছিল

    কিন্তু মহাকাল নামটা মনে ছিল, ভোরবেলায়

    ভোরবেলায় শিবকে প্রত্যক্ষ করলুম, শীতল আলো

    মেলে ধরল “মননপ্রসূত” জগতগুলো, তেমনই সহজ,

    আমি দেখলুম তাদের প্রচার, বয়ে যাচ্ছে,

    কিংবা, সহজভাবে বললে, একটা আয়না আরেকটাকে প্রতিবিম্বিত করছিল।

    তারপর আয়নাগুলো ভেঙে ফেললুম, তোমাকে আর দেখতে পেলুম না

    কিংবা কোনো উদ্দেশ্য, এই নতুন কালোময়তার দিকে তাকিয়ে রইলুম

    মননপ্রসূত জগতগুলো বিদায় হলো, আর মন হয়ে গেল স্তব্ধ :

    এক উন্মাদনা, নাকি এক সূত্রপাত ?

    ভালোবাসার একটি অনুশীলন

    জ্যাকসন অ্যালেনের জন্য

    আমার বন্ধু আমার স্কার্ফ নিজের কোমরে বেঁধে রাখে

    আমি ওকে দিই চন্দ্রকান্তমণি

    ও আমাকে দেয় ঝিনুক আর সমুদ্রগাছালি

    ও আসে অনেক দূরের শহর থেকে আর আমি ওর সঙ্গে দেখা করি

    আমরা একসঙ্গে বেগুনচারা আর সেলেরিশাক পুঁতবো

    ও আমাকে কাপড় বুনে দেয়

                       অনেকে উপহার এনেছে

                       আমি সেগুলো ওর আনন্দের জন্য কাজে লাগাই

                       রেশম আর সবুজ পাহাড়

                       আর ভোরবেলার রঙের সারস

                      

    আমার বন্ধু আলতোভাবে হাঁটে বাতাসে বোনার মতন

    ও আমার স্বপ্নগুলোকে আলো দেখায়

    ও আমার বিছানার পাশে বেদি তৈরি করে দিয়েছে

    আমি ওর চুলের গন্ধে জেগে উঠি আর মনে করতে পারি না

    ওর নাম, কিংবা আমার নিজের ।

    জানালা

    তুমি আমার রুটি

    আর চুলের সিঁথে

    আওয়াজ

    আমার হাড়গুলোর

    তুমি প্রায়

    সমুদ্র

    তুমি পাথর নও

    কিংবা লাভায় গড়া শব্দ

    আমার মনে হয়

    তোমার হাত দুটো নেই

    এই ধরণের পাখি পেছন দিকে ওড়ে

    আর এই ভালোবাসা

    জানালার কাচে ভেঙে যায়

    যেখানে কোনো আলো কথা বলে না


     

    এখন সময় নয়

    জিভ জড়াবার

    ( বালি এখানে

    কখনও সরে না )

    আমার মনে হয়

    আগামীকাল

    তোমাকে ওর বুড়ো আঙুলে বদলেছে

    আর তুমি 

    ঝকমক করবে

    ঝকমক

    আর ঝকমক

    যা খরচ হয়নি আর মাটির তলায়

    খুকি-ও’র গান, যার জন্ম হয়নি

    হৃদয়খুকি

    যষখন তুমি চিরে বেরোবে

    তুমি পাবে

    এখানে একজন কবি

    তেমন নয় যা কেউ বেছে নেবে।

    আমি কথা দেবো না

    তুমি কখনও ক্ষুধার্ত থাকবে না

    কিংবা তুমি কখনও দুঃখ পাবে না

    এই পোড়া

    ভাঙাচোরা

    ভূ-গোলকে

    কিন্তু আমি তোমাকে দেখাতে পারি

    খুকি

    যথেষ্ট ভালোবাস দিয়ে

    তোমার হৃদয়কে যা ভেঙে ফেলবে

    চিরকালের জন্য

    “মেয়েটিই বাতাস”

    মেয়েটিই বাতাস যাকে তুমি ছেড়ে যাবে না

    কালো বিড়ালকে তুমি মেরে ফেললে ফাঁকা গ্যারাজে, মেয়েটি

    গ্রীষ্মকালের ঝোপজঙ্গলের গন্ধ, এমন একজন যে 

    উঁকি দেয় ছেলেবেলার খোলা আলমারিতে, মেয়েটি কাশে

    পাশের ঘরে, শিস দেয়, তোমার চুলের পাখির বাসায় 

    সে ডিম পাড়ে

    জানালার দিকে মুখ করে

    মেয়েটি

    তোমার আগুনচিমনির বাঁশি, শ্বেতপাথরের প্রতিমা   

    ম্যান্টলপিসে খোদাই-করা

    যে রাতের বেলায় অপেক্ষা করে।

    মেয়েটি প্রাচুর্যদায়িকা

    যে রাতে কাঁদে, মৃত্যুর বাঁধন

    তুমি ছিঁড়তে পারবে না, কালো সজল চোখ

    ঝোপের পেছনে উন্মাদ মেয়েরা ক্যারল গাইছে, মেয়েটি   

    তোমার বিদায়গুলোর শিস ।

    সবুজ মণীতে কালো কণা, আওয়াজ

    নিঃশব্দ প্রণাম থেকে, মেয়েটি

    পুড়ে যাওয়া দেয়ালপর্দা

    তোমার মস্তিষ্কে, আগুনরঙা আলখাল্লা

    পালকের তৈরি তোমায় নিয় চলে যায়

    পাহাড়ের বাইরে

    যখন তুমি আগুন হয়ে দৌড়োও

    নীচের দিকে

    কালো সমুদ্রে                   

       

               

           



     

  • মলয় রায়চৌধুরী | 120.60.4.148 | ০৮ আগস্ট ২০২০ ২০:৩১732486
  • বাসন মাজা

    ম ল য় রা য় চৌ ধু রী

    রবীন্দ্রনাথ, আপনি কখনও বাসন মাজেননি সেটা জানি

    কেননা আপনি তো গুরুদেব যাঁরা বল্মীকের ভেতরে থাকেন

    বুদ্ধদেব বসু মহাশয়, রান্নাপটু, উনিও মেজেছেন কিনা সন্দেহ

    জীবনানন্দ বউকে একই সঙ্গে ভালো ও খারাপ বাসতেন

    ডায়েরিতে আইনস্টাইনি ফরমুলায় বলেননি বাসন মাজার কথা

    এবং বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন দত্তেরা জানি না জানতেন কিনা

    কাজের মেমরা এসে কোথায় বাসন মাজেন ! অলোকরঞ্জন থাকেন

    অর্ধেক বিদেশে আর বাকি হাফ দেশে ; আলোক সরকারও

    হয়তো জানতেন না বাজারে এসে গেছে বাসন মাজাকে কবিতার চেয়ে

    সহজ করার জন্য ঝুরোসাবান তারের নানান জালিকা ।

    মহিলা ও পুরুষ কবিদের এটাই তফাত — অনেকে জানে না ।

    আমি আর দাদা শৈশব থেকে শিখেছি বাসন মাজার কারিকুরি

    এখন তা কাজে দিচ্ছে ; বুড়ি তো ঝুঁকতে পারে না, আমি পারি

    এই বয়সেও রোজই বাসন মাজি ফুলঝাড়ু দিই বুঝলেন আলবেয়ার ক্যামু

    গারসিয়া মার্কেজ — প্লেগ নয়, করোনা ভাইরাসের দিনে বুড়ো-বুড়ি প্রেম !

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত