খবর্দার (ডিসেম্বর ২৩)


লিখছেন -- হাট্টিমাটিম


আপনার মতামত         


এবারের খবর্দার জুড়ে শুধুই অ-মানুষ আর না-মানুষের নানান কান্ডকারখানা। দু-পেয়েদের বেয়াক্কেলে কার্যক্রম তো রোজই দেখা যায় খবরের পাতায় পাতায়। আজকে বরং দেখে নেওয়া যাক ডালে ডালে আরো কোনো নাটক জমে উঠছে কিনা। জঙ্গল চেয়েও না পেয়ে কবি বিদায় নিয়েছেন। এখনও ছায়া ঘনাতে ঢের দেরী, তাই আমাদেরও তাড়া নেই। বনপথে দু টুকরো পাঁউরুটি, চাট্টি চিনেবাদাম আর ডিমের খোলা বা গুটিকয় পেপসির ক্যান ফেলতে ফেলতে হাঁটুন। শুভ সাফারি।

উড়ন্ত গালিচা
------------
যে সমস্ত জিনিসের দেখা শুধুমাত্র রূপকথাতেই পাওয়া যেত সেসবই একে একে আমাদের হাতে তুলে দিচ্ছে বিজ্ঞান। সম্প্রতি ম্যাসাচুসেটস এর কয়েকজন বিজ্ঞানী হাতে কলমে দেখিয়ে দিয়েছেন আরব্য রজনী খ্যাত জাদু গালিচা বাস্তব জীবনে বানানো যেতেই পারে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে খুব হালকা পলিমারের চাদরকে শক্তিশালী ইঞ্জিনের সাথে জুড়ে এর মধ্যেই ভাসিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। অবিকল উড়ন্ত গালিচার মতই ঢেউ তুলে তুলে ভেসে থাকে এই বিশেষ পলিমারের চাদর, আর তরঙ্গের দিক অনুসারে এগিয়ে যায় ""চালকের"" ইচ্ছানুসারে কখনও জোরে, কখনও আস্তে। গতিবেগের সাথে সাথে বেড়ে যায় তরঙ্গের মাত্রা, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে ঝাঁকুনি। আপাতত পরীক্ষায় যে বস্তুটি সফলভাবে ভাসানো হয়েছে, তার দৈর্ঘ্য মাত্রই দশ সেন্টিমিটার, পুরুত্ব দৈর্ঘ্যের দশভাগের একভাগ। সেকেন্ডে দশবার কাঁপতে কাঁপতে সেটা নির্দিষ্ট দিকে ভেসে যেতেই স্পষ্ট হয়, আগামীদিনে আরো হালকা পদার্থ বা আরো শক্তিশালী ইঞ্জিন ব্যবহার করে আরো বেশী ভারবাহী ""গালিচা"" বানানো সম্ভব। তবে মানুষ বয়ে নিয়ে যাওয়ার মত শক্তিশালী যন্ত্র বানাতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও শক্তির অপচয় হবে সেকথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যদিও তাতে উৎসাহে ভাঁটা পড়ার কারণ নেই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,
খবরের শিরোনামে উঠে আসা এই বিজ্ঞানীদলের পুরোভাগে আছেন লক্ষ্মীনারায়ণ মহাদেবন নামে একজন ভারতীয় ।

যোগবিদ্যা
-----------
পিঠেভাগ নিয়ে বাঁদরদের চিরকাল ঠাট্টা করা হয়ে থাকে। প্রচলিত মত, বাঁদরেরা মোটেই অঙ্কে ভালো নয়। তাই পরীক্ষায় অঙ্ক না পারলেই মাষ্টারমশাইরা ছাত্রদের বাঁদরের সাথে তুলনা করে থাকেন। সেই প্রতিবাদেই কিনা কে জানে, সম্প্রতি রিসাস জাতীয় দুটি বাঁদর ১৪ জন আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্রছাত্রীর সাথে অঙ্কে পাল্লা দিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে। নির্ভুলভাবে যোগ করার পরীক্ষায় কোনমতে ""জিতে"" মুখরক্ষা করলেও প্রমাণ হয়ে গেছে বাঁদরদের অবজ্ঞা করার দিন শেষ। পরীক্ষায় মানবকুলের সঠিক হিসেবের হার শতকরা ৯৪%, যা বাঁদরদের হারের (৭৬%) থেকে খুব দূরে নয়। আরো অবাক করার মত ব্যাপার, অঙ্ক ক্রমশ জটিল হওয়ার সাথে সাথে দুদলেরই ভুলের পরিমাণ একই হারে বেড়েছে।
আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিউরোসায়েন্টিস্টরা মিলে এই পরীক্ষা করেছিলেন মূলত দেখার জন্য যে সাধারণ যোগবিয়োগের যে নিয়ম আমরা মেনে চলি, তার কোন প্রাগৈতিহাসিক উৎস আছে কিনা। এই পরীক্ষার ফলাফলে এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ পাওয়া যাচ্ছে যে অভিব্যক্তির নিয়ম মেনেই বিভিন্ন প্রজাতির প্রাইমেটদের মধ্যে সাধারণ গাণিতিক ক্ষমতার সৃষ্টি হয়েছে। শুধু একটা জায়গাতেই এখনও খটকা আছে। এই পরীক্ষায় ব্যবহৃত সমস্ত প্রাণীই ট্রেনিং প্রাপ্ত। আগে থেকে না শেখালে কি হবে সেটা দেখা বাকি আছে। এখন সেই আয়োজনই চলছে।

ম্যাও
-------
কথায় বলে, ম্যাও ধরা সহজ নয়। কথাটা যে কতটা সত্যি তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন রয়াল সোসাইটি বি'র জীববিজ্ঞানীরা। কিছুদিন আগে মানুষের মস্তিষ্কের ওপর বিভিন্ন প্রাণীর ডাকের প্রভাব লক্ষ্য করে বিস্মিত হয়েছেন তাঁরা। দেখা গেছে, বিড়ালের করুণ ম্যাও, আর মানবশিশুর আকুল কান্নায় একইরকম সাড়া জাগে আমাদের মস্তিষ্কে। ম্যাগনেটিক রেসোনেন্স ইমেজিং স্ক্যান নামের এই কিম্ভুত পরীক্ষায় আরো দেখা গেছে বিড়ালের জায়গায় বাঁদর রাখলেও ফল একইরকম হচ্ছে। করুণ বিলাপে সমস্ত জীবজন্তুর মস্তিষ্কই একভাবে আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে সেকথা বিজ্ঞানীরা আন্দাজ করেছিলেন, কিন্তু এতটা মিল আশা করেননি কেউই।

আশ্‌চর্যন্তু?
---------------
হযবরল মার্কা বিড়াল থাকবে, আর সুকুমার রায় এসে পড়বেন না, এও কি হতে পারে? সেই কবেই তিনি হাঁসজারু ইত্যাদির মত মৌলিক প্রাণীর কথা বলে গিয়েছেন। নেহাত সাহেবরা সুকুমার পড়েনি, নাহলে Euchoreutes naso নামের এই আজব প্রাণীটিকে বুঝতে তাঁদের এতদিন অপেক্ষা করতে হত না। বিরল প্রজাতির এই জীবটির কান হাতির মত, পা ক্যাঙ্গারুসম আর নাক
বরাহসুলভ। হাতের মুঠোর আকারের অদ্ভুৎ এই প্রাণিটিকে দেখতে যতই খারাপ হোক না কেন, মরুভূমিতে থাকার জন্য এদের অভিযোজন দেখে চমৎকৃত হন নি এমন লোক বিরল। নিজদেহের উচ্চতার দশগুণ লাফাতে পারা লুপ্তপ্রায় এই প্রাণীকে সম্প্রতি স্বাভাবিক পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হল পরীক্ষামূলকভাবে।

কলসীর প্যাঁচ
---------------
ছোটবেলায় পড়া পতঙ্গভুক উদ্ভিদের কথা মনে পড়ে? কিংবা সত্যজিতের সেপ্টোপাসের গল্প? কলসপত্রী গাছপালার তালিকার উল্লেখযোগ্য নাম Nepenthes rafflesiana । নামের মধ্যেই একটা সেয়ানা সেয়ানা ভাব আছে সেটা লক্ষ করেছেন নিশ্‌চয়। অন্যান্য কলসপত্রীদের মত এর থলিতে বিষাক্ত রাসায়নিক থাকেনা। তার বদলে থাকে এক ধরণের অর্ধতরল পদার্থ, অনেকটা সিমেন্টের মত। কলসীর ধারে বসা পতঙ্গ পিছলে ভেতরে পড়ে গিয়ে যতই ছটফট করে, ততই আরো তলিয়ে যায় সেই তরলে। এবং ক্রমশই জমাট হয়ে এক সময় সেই ম্যাজিক সিমেন্ট পতঙ্গটিকে আত্মসাৎ করে। এই ভয়ানক ফাঁদ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র উপায় শান্ত থাকা ও অতি ধীরে চলার চেষ্টা করা। যদিও তা একরকম অসম্ভব, কারণ বিজ্ঞানীদের কথায় staying calm is hard when you are on the dinner menu.


ডিসেম্বর ২৩, ২০০৭