কিছু কবিতা


যশোধরা রায়চৌধুরী


আপনার মতামত         


কিছু কবিতা
যশোধরা রায়চৌধুরী


এক মসালা, মালাই মারকে...

আম্বালা ক্যান্টনমেন্টে বৃষ্টি নামে। বরফ শীতল।
ওইদিকে কম্বলের ঘোর থেকে বেরিয়েছে ঘুম ঘুম চোখ।
চা নিয়ে এসেছে কেউ? ঠুংঠাং গেলাসের গান
শুনব বলে উৎকর্ণ। এলে বোলো -
ঘন মেঘে রোদ্দুর আবার হারাল
বাকি পথ এমনই কুটিল।

কবে আর আসিবে সে? চা আমার, চাওয়াপাওয়া সব?

চড়া এলাচের গন্ধ। মিষ্টি , আঠালো?
মালাই প্রগাঢ় মারো, মসালা জীবনে এনে ঢালো
মাশা আল্লা, সাধে কি গো চেয়ে থাকি গোটা পথ? এসো পানিপাঁড়ে,
আপাতত জলই খাই... উলে মোড়া জলের ক্যান্টিনে
দুমড়োনো টিনের পাতে টোল বসিয়েছে রেলগাড়ি
ঝনঝন দুলুনিতে একা দোলে আংটায় টানানো।

এইবার আসিয়াছে। পুরুষ, প্রকৃতি মিলে গেল।
ওগো চায়ে, ওগো রতি, এইবার অন্ধকার ঘুমে
ছ্যঁ¡কা দাও উষ্ণতম। বাদামি তরল, নেমে এসো!




জানালা

যে জানালা খুলে রেখেছি সে জানালায় ভর্তি প্রেম, ভর্তি স্বপ্ন
ভর্তি জ্যোৎস্না সেই জানালায়, তুমি আমার কঠোর শৈশব
আমার জঠর ভরা কান্না তুমি আমার যত্নে বাঁধা কন্ঠনালী
তোমাকে আমি আদর করে বসাবো আমার চোখের সীমানায়,
ক্রোধের সীমানায়, ও প্রেম, তোমাকে আমার বুকের মধ্যে
গরিব মানুষের টাকার পুঁটলির মত দুই স্তনের মধ্যখানে বসাবো...
যত্নে বাঁধব গলায় গিলটি করা চেন, যা খুলে যাবে ভেবে সেপ্টিপিন বেঁধেছি এখন
যে জানালা খুলে রেখেছি,
সেই জানালায় একলা আকাশ,
আমার কাশি ওঠে, বুকভর্তি কফ,
কেননা যে জানালা খুলে রেখেছি সেই জানালায়
ঠান্ডা হাওয়া, বোরখার ভেতর অব্দি কাঁপিয়ে দেওয়া
ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া
ও প্রেম আমাকে জাগিয়ে রাখো মৃত্যুর আকাঙ্খা নিয়ে
কেননা আমাকে শুইয়ে রেখেছে বয়সে আঠারো বছরের বড়
একজন পুরুষের প্রহার
আর আর একজন না থাকা পুরুষের আদর,
পিঠোপিঠি ভাইটির মত প্রেমিকের আদর
আমাকে ধুইয়ে দিচ্ছে
ভেতরে ভেতরে
ও প্রেম আমাকে ভুলিয়ে রেখো না কেননা আমি জেগে থাকতেই চাই
মৃত্যুর আকাঙ্খার কথাটা যে বললাম ওটা মিছিমিছি
পাষন্ডেরা আমাকে ধর্ষণ করেও কিছুই পাবে না
কারণ বোরখার হেমের সেলাইয়ের মত ওদের মারে মারে একদিন আমি খুলে গেছি
তারপরে আর আটকানো যায় না বলে
ওসব মার, ওসব অত্যাচার, ওসব প্রহার আমি আর পাইনা
ঘাড়ে ধাক্কা দিতে দিতে রাস্তা দিয়ে ওসব নিয়ে চলা ,
গামছার মত দুদিক থেকে দুটি হাতের এসে আমাকে নিংড়োনো,
ওসব আর আমি পাইনা।
ও প্রেম, তোমাকে যে জানালা দিয়ে নিলাম
সেই জানালায় আমার হাহাকার
বিছিয়ে রেখেছি চুলের মত
আর মাথার উপর প্রচন্ড রোদ উঠলেই
আমি আমার বোরখার ভেতরে ঘামতে ঘামতে
এখন শুনি
আমার কঠোর শৈশব
আমার জঠর ভরা কান্না আমার যত্নে বাঁধা কন্ঠনালী
সব চুঁইয়ে নেমে আসছে মৃত্যু আর সব রকমের ভালোবাসার সুর।



দাম্পত্য

নরম ক্রিমের গন্ধ। লিটারাল কষ্টমেশা সুখ।
ফিসফিস শব্দ, আলো চুঁইয়ে আসা টানা পর্দা, ঘর।
ক্রেমাফিন। ভালোবাসা... বাসতে শেখা? অন্যমন, ডিপ্রেশন, নেশা
আত্মসুখ... বিটারনেস...তুমি শুধু স্নেহযত্নকামী
দুইজন দুরকম, দুইজনই কাতর বিশ্রাম চাওয়া প্রাণী
দেওয়ালে মাথাটি কুটে সারারাত জাগ্রত, আকুল
পিঠে ব্যথা, যা তোমার... যা আমার... কাশির ওষুধ...

উৎসমুখ। গোমড়া মুখ। বিরক্তি ও ইরিটেশনের।
জ্বর, উচ্চকিত হাসি, ভুলবকা, ছেড়ে রাখা শাড়ি
অগোছাল, ধুলোময়, প্রস্তাবিত নতুন ট্রেনিং
উপুড় ট্যারচা শোওয়া, খাটজুড়ে আত্মরতি আঁকা
স্তূপীকৃত বালিশের বাঁকা, টেড়া, উর্ধ, নত, মুখ...

তোমার কি অভ্যেস হল আমাকে, না বেশি বেশি করে
আমারই অভ্যেস হয়ে উঠল তোমাকে, স্যাক্রোস্যাংক্ট?


কোন সদ্যমৃতার প্রতি

সারা গায়ে ট্যাটু আঁকা, তুমি তো রেবেল, রাগী যুবতী
সারা গায়ে রিং গাঁথা, তুমি তো সুরের দেবী হতে চেয়ে
খরখরে অ্যাসিড হলে, পাথরে পাথর ঘষলে, আগুন চমকালে

তারপর কী যে হল, গান শুধু গান হতে হতে
একদিন জেলে গেলে, একদিন সাবস্টেন্স অ্যাবিউজ
একদিন বিয়ে করলে, প্রবল পিটুনি খেলে, আরো আরো সাবস্টেন্স অ্যাবিউজ

তারপর জিমি হেনড্রিক্স-সম, জিম মরিসন-সম, আরো আরো রকগান দেবতার মত
মরে গেলে একেবারে, ঠিক ঠিক ২৭ বছরে

কে মারল তোমায়, ওগো পাথরের মেয়ে?
কে মারল তোমায়, ওগো পাজি মেয়ে, দুষ্টূ মেয়ে, নো-গুড বালিকা?

পাবলিক হু-হু দিল, আর তুমি হু হু জ্বলে গেলে?




ছবি: মৃগাঙ্কশেখর গাঙ্গুলি