বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

না-তারকার পুজো -- সোনা-অষ্টমী

প্রতিভা সরকার

পুজো নানারকম। খবরের কাগজ আর টিভিতে পাবেন সেলিব্রিটির পুজো। সে পুজো সিনেমা রিলিজের। লাইফ স্টাইল ম্যাগাজিনে পাবেন সাজসজ্জার পুজো, খাওয়াদাওয়ার পুজো। গুরুর এবারের সিরিজ এসবের বাইরে অন্য পুজোর সন্ধান দেবে। যেখানে হয়তো আলো-টালো পৌঁছয়না। পৌঁছলেও অন্যরকম। পড়ুন পুজোর মধ্যে অন্য এক পুজোর খবর। রোজ একটি করে। পড়ুন আগের পর্বটি।


এটার নাম সোনা-অষ্টমী। মানে সোনাগাছির অষ্টমী। এমনিতেই সারা বছর দ্যাখনদারি রোশনাইতে ভরে থাকে হিজবিজবিজ গলিগুলো। অষ্টমীর দিন তার যৌবন যেন ফেটে পড়ে, কী উদ্দাম, আর কী নিষিদ্ধের প্রতি আকর্ষণ !

- ঠাকুর দেখতে যাও ?   
- আমার ঘরে একজন থাকে। বাচ্চা আন্টি বলে। ও যদি মেয়েটাকে নিয়ে যায়।   
- তুমি ?
- আমি অসুস্থ। মানসিকভাবেও স্থির নই। বাচ্চার বাবা থাকছে না এখন আমার এখানে। সরি, পুজোর দিনে কিছু ভালো কথা শোনাতে পারলাম না আপনাকে।   

এতো সুন্দর মুখ, ঝলমলে সাজ আর পালিশ করা কথা ! স্বপ্নাকে আধো অন্ধকারে মনে হচ্ছে যেন কোনো রাণী। এই গলি যেখানে বড় রাস্তায় মিশেছে সেখান থেকেই শুরু ছোট ছোট টুনি বালবের  চাঁদোয়া।  তার আভা এসে ওর গালে পড়েছে। তালাবন্ধ আপনে আপের সেন্টারের দেওয়ালে হেলান দেওয়া মেয়ে অষ্টমী পুজো উদযাপন করবে ব'লে খদ্দেরের জন্য দাঁড়িয়ে আছে।
সেন্টারের ইন চার্জ বেবি হালদার দরজা বন্ধ ক'রে চাবিটা ব্যাগে ঢুকিয়ে আমায় এগিয়ে যাবার ইশারা করে। তারপর স্বপ্নাকে বলে,
- একদম কান্নাকাটি নয়। টা টা।

দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটে ঢুকেই দেখি চারজন মেয়ে এক আধবুড়ো রোগা লোককে টানাহেঁচড়া করছে। লোকটি ভারী আশ্চর্যরকম শান্ত গলায় তাদের ম্যানেজ করবার চেষ্টা করছে 'আগে ব্যাগটা ছাড়ো', 'চটিটা খুলে গেল তো' এইসব ব'লে। আমি ভেবেছিলাম লোকটার কোনো অন্যায়ে মেয়েগুলো অতো মারমুখী। পথপ্রদর্শক বললো, না ওরা প্রত্যেকেই রোগা নিরীহমতোকে ঘরে ঢোকাতে চাইছে।

স্বপ্না বললো একদম বাজে অবস্থা, দিদি। মানুষের কাছে টাকা নেই। খাবে না ফুরতি করবে! এখন এ তল্লাটে বেশি দেখতে পাবে উঠতি ছোঁড়াদের, স্কুলকলেজ ফেরত। এদের মনে প্রেমের জোয়ার, পকেটে ভাটার টান। পুজোর সময়ও মস্তি জমে না এখন এখানে। এমনিতেই আমরা অনেক, তারপর বাইরে থেকেও অনেক আসে এইসময়। অষ্টমী নবমী সবই সমান।

কিছু সহকর্মীকে বলতে শুনেছি, রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করব না। উল্টোদিকের এই মেয়েরা কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে শুরু ক'রে এনআরসি সবকিছু নিয়েই আলোচনা করতে তৈরি। সাফ বলে, বাবার ঠিক নেই তায় আবার বংশের ঠিকুজি। কোথায় পাঠাবে আমাদের পাঠাক।
খাদের কিনারায় সারা জীবন ঝুলতে বাধ্য হ'লে কিছু সময় বাদে খাদে পড়াটাই শ্রেয় মনে হয়।

স্বপ্নার কান্নার রহস্য আমিও জানি। যাকে এরা ভালবাসা এবং সুরক্ষার ছলনায় ভুলে টাকাপয়সা, শরীর, ছাদ, আনুগত্য দিয়ে পোষে তাকে বলে বাবু। বাবুকেই স্বামীজ্ঞানে ভজনা। মেয়েটির টাকাপয়সা ঝেড়ে পুরনো পরিবারের কাছে বাবুর ফেরত যাওয়া চলে অবিরাম। তখন স্বপ্নারা কাঁদে, সেজেগুজে কাঁদে, খদ্দেরের হাত ধরে টানাটানি করবার সময়ও কাঁদে। আসলে মুঠো মুঠো ব্যথা কমাবার পিলে ওদের গায়ের ব্যথা মরলেও মনের ব্যথা কমে না।

অষ্টমীর জনজোয়ার ফুলেফেঁপে উঠলে কোন বাস অটো কিছু পাইনা। শুধু সঙ্গে সঙ্গে চলে মাথার ওপরের আলোর অফুরন্ত চাঁদোয়া, পাশে হাঁটে হাজার হাজার লোক। মৃদু আলোয় তাদের টুকরো কথা, পা ঘষটে চলার আওয়াজে কেমন ঘোর লেগে যায়। হঠাত মনে হয় যেন কোন জাহাজের ডেকে আছি। কিম্বা হাঁটছি কোনো মিছিলে।  আমাদের সব কথাবার্তার সময় উপস্থিত থাকা স্বপ্নার ছ বছরের মেয়েটিকে যেন দেখি আমার হাত ধরে হাসিমুখে হাঁটছে। এরা সন্তানের সামনে কিছু লুকোয় না, লুকোবার সুযোগও নেই।  একটু আগেই বাচ্চাটা সেন্টারে কাগজ পেন্সিল নিয়ে একটি নৌকার ছবি এঁকেছে আমার জন্য।

 পরের প্রজন্মের শিশুদের অন্য কোথাও, অন্য কোনো জীবনে নেবার কথা ছিলো কি !

এ বালুচরে আশার তরণী তোমার যেন বেঁধো...



338 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: রুখসানা কাজল

Re: না-তারকার পুজো -- সোনা-অষ্টমী

সেই ঝুলে ঝুলে ত জীবন চলে না। চোখের জলে লেখা অষ্টমী গদ্য।
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: না-তারকার পুজো -- সোনা-অষ্টমী

"এই মেয়েরা কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে শুরু ক'রে এনআরসি সবকিছু নিয়েই আলোচনা করতে তৈরি। সাফ বলে, বাবার ঠিক নেই তায় আবার বংশের ঠিকুজি। কোথায় পাঠাবে আমাদের পাঠাক।"

শাবাশ সোনাগাছি! পুরো ভারতবর্ষে এনার্সিকে লাথি মারার হিম্মত একমাত্র তোমরাই রাখ। 🌷
Avatar: কুশান

Re: না-তারকার পুজো -- সোনা-অষ্টমী

সত্যিই আসলে কোনো কাব্য আছে কি আদৌ এই জীবনে?

পড়ে মন খারাপ হয়ে গেল।

ছোটবেলায় একটি মেয়ে আমাদের খেলার দলে ছিল। তার মা তথাকথিত খারাপ পাড়ায় থাকত। একজনের কাছ থেকে বস্তিতে দূরে বাড়ি নিয়েছিল। সেখানে মেয়েদের রেখেছিল। যাতে প্রভাব না পড়ে। তখন এত বুঝতাম না। মেয়েটির বোন আমাকে ভাইফোঁটা দিত। তখন এসব বুঝতাম না। মনে পড়ে গেল হঠাৎ ওদের মুখ।

আপনার লেখনী প্রান্তিকের কথাই বলে। যা আমরা লিখতে পারি না।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন