বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বাংলায় কি সতীদাহের প্রচলন ছিল?

সোমনাথ রায়

রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে ‘বেঙ্গল সতী রেগুলেশন অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফে বড়লাট লর্ড বেন্টিঙ্ক। উক্ত আইন বলে কোম্পানির আওতায় থাকা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সমস্ত অঞ্চলে সতীদাহ নিষিদ্ধ এবং সতীদাহে সাহায্য করা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে ঘোষিত হয়। সেই সময় এই প্রেসিডেন্সির আওতায় মূলতঃ বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা, উত্তর ভারতের কিছু অঞ্চল ছিল। উক্ত অঞ্চলগুলিতে বিগত কয়েক বছরে সালপ্রতি প্রায় ৬০০ সতীদাহ হয়েছিল। বেন্টিঙ্ক  ১৮২৯-এর এক রিপোর্টে লিখছেন সে বছর নথিভুক্ত ৪৬৩ জন সতীর মধ্যে ৪২০ জন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার এবং তার মধ্যে ২৫০ জনের বেশি কলকাতা-বিভাগের। লক্ষ্যণীয়, বোম্বে এবং মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে সতীদাহের সংখ্যা এর থেকে অনেক কম ছিল।  এবং এই বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মধ্যে শুধুমাত্র কলকাতা-বিভাগে সতীদাহের সংখ্যা মুর্শিদাবাদ, ঢাকা, পাটনা বা বেনারসের থেকে দশগুণের বেশি। আরও গুরুত্বপূর্ণ উইলিয়াম কেরির রিপোর্ট, যেখানে তিনি বলছেন ১৮১৫ থেকে ১৮১৮-র মধ্যে এই এলাকায় সতীদাহের সংখ্যা বছরে দ্বিগুণের বেশি বেড়েছিল। এবং সাধারণ ধারণার উল্টোদিকে দেখা যায় সতীদের মধ্যে অধিকাংশ মোটেই ব্রাহ্মণ নয় বরং ১৮২৩ সালের রিপোর্টে ৫১% জাতিতে শূদ্র। 

অর্থাৎ, উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে দক্ষিণবঙ্গের হিন্দু বাঙালির সমাজে এক ভয়াবহ সমস্যা সতীদাহ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই অমানবিক প্রথা সারা ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চলত এই এলাকাতেই। রিপোর্টের সত্যতা স্বীকার করলে দেখা যাবে এই সময়ে হুগলিতে প্রতি ১৫০ জন বিধবার একজন সতী হন! এই প্রবন্ধে আমরা খোঁজার চেষ্টা করি বাংলায় এই অনাচার কবে থেকে চলে আসছে? এই সন্ধানে আমরা চারধরণের সূত্র দেখব- ১) ঐতিহাসিক কালের আধুনিক পুনর্নির্মাণের বিভিন্ন আখ্যানে সতীদাহের কী হিসেব পাওয়া যাচ্ছে, ২) ঐতিহাসিকদের লেখা বা গবেষণাপত্র, ৩) বাংলার যে বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার আছে প্রাক-উনবিংশ শতাব্দী, সেখানে সতীদাহের কীরূপ বিবরণ আছে, এবং ৪) বহির্দেশীয় পর্যটকদের বিবরণ।

১) আধুনিক সাহিত্য-সিনেমা- জনপ্রিয় উপন্যাসগুলির মধ্যে নারায়ণ সান্যালের 'রূপমঞ্জরী'তে সতীদাহের উদ্যোগের কথা লেখা আছে। বর্গি আক্রমণের সময় কালে জনৈক বেষ্টা বায়েন গ্রামের উপর বাইরের হানাদারদের হামলা ঠেকাতে গিয়ে শহিদ হলে তাঁর স্ত্রীর সহমরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, এবং কয়েক বছর পরে রূপমঞ্জরী বিধবা হলে তাঁর সহমরণেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়। দুটি ক্ষেত্রেই মহিলাদের অনুমতি নেওয়া হয় না। আবার শেষ পর্যন্ত কোনও উদ্যোগই সফল হয় না। রূপমঞ্জরী একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস, কিন্তু যথাযথ ঐতিহাসিক তথ্যের উপর ভিত্তি করে তা রচিত কী না সন্দেহ থাকে। যে দুই বাঙালি পণ্ডিতার জীবন অধ্যয়ন করে রূপমঞ্জরী চরিত্রকল্পনায় করেছেন, তাঁদের মধ্যে একজন হটী বিদ্যালঙ্কার। লেখক ভূমিকায় তাঁকে চিতাভ্রষ্টা বা সহমরণ থেকে ফিরে আসা বলেছেন। কিন্তু হটি বিদ্যালঙ্কারকে নিয়ে ওয়ার্ড, মদনমোহন তর্কালঙ্কার বা রাজনারায়ণ বসুর লেখায় তাঁর বৈধব্যের কথা লেখা থাকলেও সহমরণের উদ্যোগ নিয়ে কোনও তথ্য নেই। ফলে উপন্যাসে বর্ণিত সতীদাহের উপক্রমটি অসমর্থিত, কবিকল্পনা বলেই মনে হয়। এরপর সন্তোষ দত্ত অভিনীত গোপালভাঁড় সিনেমায় গোপালের মায়ের সতীদাহ দেখানো হয় এবং জব চার্ণকের বিবি-তে জব চার্ণক বাঙালি স্ত্রীকে সতীদাহের চিতা থেকে উদ্ধার করে পুনর্বিবাহ করেন। দ্বিতীয় ঘটনাটির কিছু সত্যতা আছে হয়ত, আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন এবং ডব্লু হান্টার দুজনই এই ঘটনার সমসাময়িক বিবরণ দিয়েছেন। তবে সতীদাহটি অনুষ্ঠিত হচ্ছিল পাটনায় এবং উক্ত মহিলা বাঙালি নন রাজপুত ছিলেন। ১৬০০ সালে বাংলা আর পাটনা এক প্রশাসনিক বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হলেও সেখানকার সামাজিক বিধি এক এরকম কোনও তথ্য পাই না। ফলে পাটনার সতীদাহকে বাংলার ঘটনা মেনে নিলে ইতিহাসের অপলাপই হবে।

এখানে একটা জিনিস বলে নেওয়া দরকার। সতীদাহ ভারত ভূখণ্ডে প্রথম সহস্রাব্দতেও প্রচলিত ছিল। মহাভারতে দু-বার অন্তত সতীদাহের উল্লেখ আছে, রাজা পাণ্ডু এবং ভগবান বলভদ্র প্রমুখ যাদব বীরদের মৃত্যুর বর্ণনায়। রাজপুতানায় যুদ্ধের সময় মহিলাদের জৌহর এবং পুরুষদের সাকা বেশ কয়েকবার হয়েছে, কখনও দিল্লি আগ্রার মুসলমান শাসকদের আক্রমণের সময়ে এবং কখনও বা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধের সময়ে। এবং এই উদাহরণগুলি ছাড়াও সতীদাহ ভারতে বিরল ছিল না, যদিও আকবর থেকে আওরাংজেব অবধি মুঘল শাসকরা বহুবার তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আমরা পরে বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ থেকে ভারতে সতীদাহের চেহারা কিছুটা দেখব। কিন্তু, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এই সমস্যা উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশক জুড়ে বাংলায় প্রবলতর, বিশেষতঃ দক্ষিণ বাংলায়। তাই, এই অঞ্চলটিতে এই প্রথার প্রচলনের ঐতিহাসিক সূত্র খুঁজব।

এরপর আর একটি আকর্ষণীয় তথ্যে আসব, বৈষ্ণব আন্দোলনের এক প্রাণপুরুষ যবন হরিদাসের জীবনকথা। বেনাপোলে হরিদাস আশ্রম থেকে প্রচারিত জীবনীতে (যা ইন্টারনেটে বিভিন্ন সূত্রে সুলভ) লেখা হয় যে তিনি আসলে ব্রাহ্মণ সন্তান এবং তাঁর পিতার মৃত্যুর পরে মায়ের সহমরণের ফলে অনাথ হয়ে যান এবং এক মুসলিম দম্পতি তাঁকে পালন করেন, তাই বাল্যে তিনি মুসলিম-আচারে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু, বৃন্দাবন্দাসের চৈতন্যভাগবত আদি প্রায় সকল আকর গ্রন্থেই হরিদাস ঠাকুরকে জন্মগত মুসলিম হিসেবেই বর্ণনা করা আছে।

দেখা যাচ্ছে, যে আধুনিক বর্ণনার কয়েকটি আখ্যানে বাংলায় প্রাক-উনবিংশ শতাব্দী সতীদাহের প্রসংগ এসেছে, যা মূলতঃ অসমর্থিত বা তথ্যগতভাবে ভ্রান্ত।

২) ঐতিহাসিকদের আলোচনা- প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেকেই বাংলার উনবিংশ শতাব্দীর সতীদের নিয়ে কাজ করেছেন। এছাড়া ভারতের অন্যান্য অঞ্চল, যেমন, রাজস্থানের সতীপ্রথা, তার মনস্তাত্ত্বিক ও পরিচিতিনির্ণায়ক ভূমিকা প্রভৃতি নিয়েও ঐতিহাসিক মহলে চর্চা চলেছে। তবে প্রাক-উনবিংশ শতাব্দীতে বাঙলার সতীদাহ নিয়ে গবেষণা খুব বেশি সম্ভবতঃ নেই। কালীকৃষ্ণ দত্ত, তাঁর 'Alivardi and His Time' বইয়ে লিখছেন যে সেই সময়ে সুবে-বাংলা সতীদাহ বিরল ঘটনা ছিল এবং হাতে গোণা কয়েকটি পরিবারেই দেখা যেত। যাঁরা সতী হতেন, তাঁরা একদমই নিজের ইচ্ছেয় সতী হতেন, তাঁদের আত্মীয়স্বজনরা সাধারণতঃ এই কাজে তাঁদের বাধা দিত। মারাঠা আক্রমণের শুরুর দিল দিকে বাংলায় আসা একটি মারাঠা পরিবারের মহিলার সতীদাহর ঘটনা তিনি উল্লেখ করছেন। ব্রিটিশপূর্ব বাংলায় সতীপ্রথা নিয়ে স্বনামধন্য অধ্যাপক সুশীল চৌধুরীর  বিশদ মতামত পাচ্ছি।  Proceedings of Indian History congress-এ   ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৬ তিনি সতীদাহ নিয়ে কিছু প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তার একটিতে 'Sati as Social Institution and the Mughals' প্রবন্ধে সতীদাহ নিবারণে মুঘল শাসকদের ভূমিকা আলোচনার পূর্বমুখে তিনি লিখছেন বাংলায় সতীপ্রথা দ্বাদশ শতাব্দী থেকে প্রচলিত ছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি সূত্র হিসেবে মূলতঃ মঙ্গলকাব্যগুলির রেফারেন্স দিয়েছেন, তাঁর মতে সেখানে এই সংক্রান্ত বহু উদাহরণ পাওয়া যাবে। প্রাক্‌-কলোনি বাংলার সমৃদ্ধি, তার শিল্প, ব্যবসা, অর্থনীতি ইত্যাদির উপর উজ্জ্বলতম কাজগুলি করে গেছেন সুশীল চৌধুরী। ফলে, তাঁর সিদ্ধান্ত, প্রায় সমস্ত ইতিহাস ছাত্রের কাছে এই আলোচনায় দাঁড়ি টেনে দেওয়ার জায়গা রাখে। তৎসত্ত্বেও, আমরা সাহস করে দ্বাদশ শতাব্দীর বাংলার অবস্থা পর্যালোচনা করে সতীদাহ সংক্রান্ত সূত্রগুলি পুনর্বিবেচনা করতে চাইব।

এই সময় বাংলার এক বিরাট অঞ্চল সেনবংশের শাসনে ছিল, তিনজন সেনরাজা এই পর্যায়ে আসীন হন, যাঁদের মধ্যে বাংলার সমাজব্যবস্থায় বল্লাল সেন এক সুদূরপ্রসারী পরিচয় রেখেছেন। বাংলায় হিন্দুত্বের গোড়াপত্তন বলতে গেলে সেই সময়েই হয়। এই সময় কৌলীন্যপ্রথারও প্রচলন বলে বিশ্বাস। যদিও কৌলিন্যপ্রথার মূল গ্রন্থ কুলজিগুলি আরও পরবর্তীকালে লেখা হতে থাকে। বল্লালসেন নিজে দুটি বই লিখেছিলেন, দানসাগর আর অদ্ভূতসাগর, সেগুলিতে দান এবং জ্যোতিষ সংক্রান্ত আলোচনা আছে। বল্লাল সেনের জীবনী বল্লালচরিত নামে দুটি বইয়ের কথা জানা যায়। যার একটি বল্লাল সেনের রাজগুরু গোপাল ভট্ট রচিত এবং দ্বিতীয়টি ১৫০০ সালের পরে আনন্দভট্ট রচিত। দ্বিতীয় বইটিতে হিন্দু আচার, বিধিনিষেধ এবং প্রায়শ্চিত্তের প্রভূত বর্ণনা পাওয়া যায়। সেই গ্রন্থে বর্ণিত, যে, বল্লাল সেনের সঙ্গে  বায়াদুম্ব (বাবা আদম) নামে এক মুসলিম ফকিরের যুদ্ধ হয়, বল্লাল বলে যান যে তিনি যুদ্ধে হারলে একটি কালো পায়রা উড়িয়ে রাজধানীতে সংবাদ পাঠাবেন। এই যুদ্ধে বল্লালের জয় হয়, কিন্তু, ফকিরের কারসাজিতে পরাজয় সূচক পায়রাটি উড়ে গৌড়ে আসে এবং বল্লালের পরাজয় ও মৃত্যুর খবর অনুমান করে নিয়ে তাঁর চার স্ত্রী অগ্নিকুন্ডে প্রাণ বিসর্জন করেন, এবং বল্লাল বস্তুত বিজয়ী হয়ে ফিরে এসে এই ঘটনা দেখে নিজেও আত্মহত্যা করেন। অথচ, অদ্ভুতসাগর গ্রন্থে বল্লাল নিজেই লিখছেন যে তিনি বৃদ্ধাবস্থায় মৃত্যু আসন্ন জেনে গঙ্গাযাত্রা করছেন। এবং এই জৌহর-প্রতিম ব্রতে বল্লালের যে সকল মহিষীর নাম আনন্দ ভট্ট উল্লেখ করেন, তাঁদের মধ্যে তাঁর প্রধানা মহিষী বিখ্যাত চালুক্য রাজকন্যা রামদেবীর নাম নেই। ফলে আনন্দভট্টের এই বর্ণনার সত্য প্রতিষ্ঠিত নয়। কিন্তু লক্ষ্যণীয়, অনুরূপ কাহিনি বাঙলার অন্যান্য রাজাদের নিয়েও আছে। এবং আমরা পরে মঙ্গলকাব্য আলোচনার সময়ও এই ধরণের কাহিনি পাবো। লক্ষ্যণীয় চতুর্দশ শতাব্দীতে রাজস্থানে জৌহরের একাধিক ঘটনা অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৫০০ সালের পর থেকে রাজস্থানে অনেকগুলি জৌহর ও সাকা (জৌহরের পর জীবিত পুরুষদের শত্রুশিবিরে আত্মঘাতী হানা) পালিত হয়। দিল্লির মুঘলদের বিরুদ্ধে রাজপুতানার হিন্দুদের প্রতিরোধের এক জ্বলন্ত প্রতীক হয়ে লোককাব্যে ছড়িয়ে পড়ে জৌহরের কাহিনিগুলি। সম্ভাবনা থেকেই যায় যে সেই কাহিনি বাংলার সারস্বত ও লোকসমাজে পৌঁছেছিল এবং বীররসের পরিচয় হিসেবে বাঙলার বিভিন্ন কাব্যে এই কাহিনি এসেছে। একভাবে হয়তো উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় সতীদাহের ভূমি এই কাব্যগুলি তৈরি করেছে। কিন্তু, দ্বাদশ শতকে বাংলায় বল্লালের রানিরা জৌহর করেছিলেন, এ তথ্য ভ্রান্ত। প্রসঙ্গতঃ কুলজি গ্রন্থগুলি মূলতঃ পঞ্চদশ শতক থেকে লেখা শুরু হয়, বহু বিকৃতি সত্ত্বেও, বল্লাল সেনের সময় থেকে একভাবে পরম্পরাগত ইতিহাসের সূত্র এই বইগুলি। কুলজি গ্রন্থেও সতীদাহের উল্লেখ আছে বলে চোখে পড়ে না।

উল্লেখ্য, এই সময় থেকেই বাংলায় বৈষ্ণব সাহিত্যের বিকাশ শুরু হয়। বৈষ্ণব সাধনার গৌড়ীয় ধারা এবং রাধাতত্ত্বের প্রতিষ্ঠা হয় জয়দেবের গীতগোবিন্দের মাধ্যমে। ভগবান বুদ্ধকেও বিষ্ণুর অবতারকল্পে হিন্দু উপাসনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে এই দুই ধারাতেই সতীদাহ মান্য নয়। তান্ত্রিক বিশ্বাসেও সতীদাহ নরক-সম্ভব পাপ।

ফলে দ্বাদশ শতাব্দী থেকেই সতীদাহের বহুল প্রচলনের যে তথ্য সুশীল চৌধুরি দিয়েছিলেন, তা প্রশ্নযোগ্য থেকে যায়। মুঘল আমলের বাংলায় প্রসঙ্গে তিনি সূত্র হিসেবে মূলতঃ মঙ্গলকাব্যগুলির নাম দিয়েছেন যা মূলতঃ ষোড়শ শতাব্দীর পরের লেখা। তাঁর মতে এই গ্রন্থগুলিতে সতীদাহের বহু উদাহরণ আছে, আমরা এইবার সেগুলি নিয়ে আলোচনা করব।

৩) বৈষ্ণবসাহিত্য ও মঙ্গলকাব্য- বাংলার ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এক বড় উপাদান বৈষ্ণবসাহিত্য, যা শ্রীচৈতন্যের জন্মের আগে থেকেই বাংলায় বিকশিত হয়েছে। শ্রীচৈতন্য বাংলায় অহিংস করুণাধর্ম প্রচার করেন। চৈতন্য সাহিত্যে হিংসা, হত্যার উল্লেখ নেই বললেই চলে। বরং সুবুদ্ধি রায়ের কাহিনিতে পাই, ব্রাহ্মণসমাজ তাকে মুসলমানের সংসর্গে আসার জন্যে গরম ঘি খেয়ে আত্মহত্যা করে প্রায়শ্চিত্ত করতে বলেন, সেখানে চৈতন্যদেব বিধান দিলেন যে হরিনাম করলেই প্রায়শ্চিত্ত হবে। বৈষ্ণব সাধনায় কৃষ্ণপদ বা গৌরপদ অর্চনা মুখ্য, সতীদাহের কথিত পুণ্যার্জনকে সেখানে ঢোকানো কঠিন। এবং সতীদাহের মতন দৃশ্যতঃ হিংস্র, মর্মান্তিক প্রথার বিপরীতে গৌড়ীয় বৈষ্ণবসমাজ দাঁড়াবে না, মরমিয়া কবিরা সতীদাহ দেখলে খেদোক্তি লিপিবদ্ধ করবেন না, এ প্রত্যয় করতে অসুবিধে হয়। যেটা বলার, বিশাল বৈষ্ণবসাহিত্যের মধ্যে যে হিমশৈলচূড়া আমাদের চোখে পড়ে, সেখানে সতীদাহের কোনও উল্লেখ পাই না, রূপকার্থেও না। তা সম্ভবতঃ প্রথাটির অদর্শনের ফলেই। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সতীদাহ এইসময়ে চলত, আমরা পরে বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ উল্লেখ করব তা নিয়ে। এবং লাহোর থেকে পাটনা অবধি অঞ্চলে বহু জনগোষ্ঠী সতীদাহকে তাদের এক গৌরবাণ্বিত অর্জন হিসেবে দেখত। সেখানে চৈতন্যসাহিত্য বিষয়টিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যেতে পারছে, তার কারণ হয়তো চৈতন্যমণ্ডিত বাংলায় এই নৃশংসতা দাঁত বসাতে পারে নি। বরং বহু বিধবা মহীয়সী বাংলার চেতনাজগৎ আলো করে ছিলেন। শচীমাতা থেকে রানি ভবানি, রানি শিরোমণি এক বিশাল তালিকা পাওয়া যায় তাঁদের। বৈষ্ণবদের মধ্যে জাহ্নবাদেবী প্রমুখা নেতৃস্থানীয়া ছিলেন, সমগ্র বৈষ্ণবসমাজ যাঁদের আজ্ঞাবহ ছিল। বাংলার ইতিহাসে সতী হওয়ার জন্যে গৌরবাণ্বিত কাউকে পাওয়া যায় না, কিন্তু বিধবা অবস্থাতেও নিজেদের সুকৃতির জন্যে ইতিহাস আলো করে থেকেছেন এঁদের অনেকেই।

চৈতন্যসাহিত্যের সমান্তরাল ভাবে বাংলায় মঙ্গলকাব্য লেখা হচ্ছিল এই সময়ে। চৈতন্যসাহিত্য যখন দর্শনের জগতের এক নতুন অধ্যায় আবিষ্কার করছিল, মঙ্গলকাব্য মূলতঃ স্থানীয় উপাসনার প্রচলনগুলিকে স্মৃতি বা পুরাণের সঙ্গে সংযুক্ত করার চেষ্টা করছিল। ব্রাহ্মন্যধর্মের বিভিন্ন লক্ষণ, সমঝোতা এবং তার অ্যাস্পিরেশনের জায়গা মঙ্গলকাব্যের চরিত্রে ফুটে উঠছিল। মঙ্গলকাব্যের ধাঁচটা ছিল লোককাহিনির। ফলে লোকজ চর্চা ও প্রথাগুলি সেখানে অনেক বেশি আসার কথা। দ্বিতীয়তঃ বৈষ্ণবসমাজে যেমন গুরু, গৌর এবং কৃষ্ণের প্রতি সকলে সমান নিবেদিত, নারী-শূদ্রের নিম্নাবস্থার স্বীকৃতি কম, মঙ্গলকাব্যের জগতে কিন্তু পুরুষ-নারী ভেদ অনেক বেশি প্রকট। সুশীল চৌধুরী বলেছেন বাংলায় সতীদাহের প্রমাণে মঙ্গলকাব্য গুলি দেখতে। মঙ্গলকাব্যের মধ্যে অর্বাচীনতর অন্নদামঙ্গলে ‘সহমরণের’ উদাহরণ পাই। ভবানন্দ মজুমদারের জন্মবৃত্তান্তে দেখা যায়, স্বর্গে কুবেরপুত্র এবং তার স্ত্রী একত্রে প্রাণত্যাগ করে মর্ত্যে জন্ম নিলেন, ভবানন্দ হলে আসলে স্বর্গের কুবেরপুত্র। অনুরূপ আরেকটি আখ্যান আছে যেখানে কুবেরের আরেক অনুচর মর্ত্যে জন্ম-হেতু ‘জায়াসহ ত্যাজিল জীবন’। এবং অন্নপূর্ণার প্রতিষ্ঠার কাজ সুরাহা হলে দুজনে একসঙ্গে স্বর্গে ফিরেও যাচ্ছেন। কবিকঙ্কনের চণ্ডীমঙ্গলেও স্বামী-স্ত্রীর একত্রে স্বর্গে যাওয়া আছে। তবে, শ্রীমন্ত এবং তাঁর স্ত্রী শুধু স্বর্গে যাচ্ছেন না, শ্রীমন্ত-র মা, খুল্লনাও যাচ্ছেন। নারী-পুরুষের ঐকান্তিকতা রক্ষায় মঙ্গলকাব্যকার-রা তাঁদের জোড়ে স্বর্গ থেকে নামিয়েছেন এবং স্বর্গে ফিরিয়েছেন। সেখানে সতীদাহ একটি  উপায় বটে। কিন্তু, পুত্র-পুত্রবধূর সঙ্গে মায়ের স্বর্গে যাওয়া, বাবা ধনপতিকে মর্ত্যে ফেলে, বিষয়টাকে সম্ভবতঃ যথাযথ অর্থে সতীদাহ হতে দেয় না। চণ্ডীমঙ্গলে ধনপতি মৃত ভেবে খুল্লনার আত্মবিসর্জনের পরিকল্পনা আছে। আবার খুল্লনার অগ্নিপরীক্ষা (জৌগৃহে প্রবেশ) কালে ধনপতির আত্মহত্যার ইচ্ছাপ্রকাশের কথা বলা আছে। একের মৃত্যুতে দম্পতির আরেকজনের মৃত্যুর ইচ্ছা জাগা তো মানব-ইতিহাসের ঐতিহাসিক সত্যও। বরং আরেকটি অধ্যায়ে দেখি ইন্দ্রের পুত্র নীলাম্বর স্বর্গে যুদ্ধে প্রাণ হারালে, তাঁর স্ত্রী ছায়া ইন্দ্রের প্রভূত বারণ উপেক্ষা করে আগুন জ্বালিয়ে ঘি ঢেলে সেই আগুনে নিজেকে দগ্ধ করছেন। এই বিবরণ কিন্তু প্রকৃত অর্থেই সতীদাহের। এরপর এই ছায়া-নীলাম্বরই মর্ত্যে ফুল্লরা-কালকেতু হয়ে জন্মাবেন। এখানে কয়েকটা জিনিস লক্ষ্যণীয়- ক) সতীদাহের বিষয়ে মঙ্গলকাব্য প্রণেতাদের ধারণা ছিল। মহাভারতে সতীদাহের বর্ণনা এবং বাংলার বাইরে বাকি ভারতে এর প্রচলন এই ধারণা করার পক্ষে যথেষ্ট। খ) সতীদাহ মূলতঃ স্বর্গের চরিত্রদের হচ্ছে (তবে এই দৃষ্টান্ত, হতেই  পারে, পরবর্তীকালের সমাজে সতীদাহের বড় অ্যাপলজি হয়ে উঠছে, যে সতী চিতায় বসছেন তাঁকে এবং তাঁর স্বামীকে স্বর্গভ্রষ্ট দেবতা হিসেবে প্রতিপন্ন করা যেতে পারে)। গ) সতীদাহে মহিলা সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়, অন্যদের বারণ উপেক্ষা করে বসছেন। লক্ষ্যণীয়, মুঘল শাসনে অনিচ্ছায় সতীদাহ নিষেধ ছিল, হয়ত কাব্যকর্তারা সেই নিয়ম সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন। ঘ) মুকুন্দরাম স্পষ্ট করে সতীদাহের কথা লিখছেন, মহাভারতের মাদ্রীর মত জ্বলন্ত চিতায় প্রবেশের বর্ণনা দিচ্ছেন, রূপকের আশ্রয় নিচ্ছেন না। মনসামঙ্গলে বেহুলার ভেলায় মৃত লখিন্দরকে নিয়ে যাত্রা চিতায় প্রবেশ নয়, ফলে সতীদাহের প্রচলন বুঝতে মনসামঙ্গলকে আমরা ধরছি না। ধর্মমঙ্গলেও কিন্তু সতীদাহের বিবরণ পাচ্ছি। বীররসের বর্ণনায় ধর্মমঙ্গল অন্যগুলির থেকে কয়েক কদম এগিয়ে। বহু যুদ্ধের বর্ণনা আছে এই মঙ্গলকাব্যে। কর্ণসেনের প্রথম পক্ষের পুত্ররা (মানিকরামের লেখায় চারপুত্র, ঘনরামের কাহিনিতে ছয়পুত্র) ইছাই ঘোষের সঙ্গে যুদ্ধে মারা গেলে তাদের স্ত্রীরা অনুমৃতা হতেন। অনুমরণের সঙ্গে জৌহরের মিল আছে, যোদ্ধা যুদ্ধে পতিত হলে সেই সংবাদ পেয়ে স্ত্রীরা পৃথক চিতায় প্রাণ দিতেন। সহমরণে একই চিতায় স্বামী এবং জীবিত স্ত্রীর দাহ হতো। যাইহোক, স্ত্রীদের অনুমরণের পাশাপাশি কর্ণসেনের প্রথমা স্ত্রীও পুত্রশোকে আত্মহত্যা করেন। পরবর্তী পর্যায়ে লাউসেনের মৃত্যুর ভুয়ো খবরে, তাঁর চার স্ত্রীকে তার ছিন্ন মুন্ড (যা আসলে নকল) নিয়ে অনুমরণের উদ্যোগ করতে দেখা যায়। পাঠক খেয়াল করবেন, এইরূপ ভুয়ো খবরে স্ত্রী-দের প্রাণবিসর্জনের আখ্যান বল্লালচরিতেও ছিল। বল্লালচরিতের মতন ধর্মমঙ্গলের মূল আখ্যানও ষোড়শ শতাব্দীর। ধর্মমঙ্গলে রাজপুত চৌহান, মারাঠা এবং মুসলিম সৈন্যদের কথাও লেখা আছে। সম্ভবতঃ পশ্চিমভারতের কাহিনিগুলি এইসকল মঙ্গলকাব্যে ছায়া ফেলেছে। এর পাশাপাশি, এও উল্লেখ্য, ধর্মমঙ্গলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একাধিক বিধবা নারীচরিত্রের কথা লেখা আছে। মঙ্গলকাব্যের সতীদাহের আখ্যান মূলতঃ রাজপরিবার বা যোদ্ধা পরিবারের মধ্যে সীমিত। তুর্কি আক্রমণের সময় পূর্ববাংলায় স্থানীয় কিছু হিন্দুরাজা মারা গেছিলেন, তবে সেগুলিতে সতীদাহ হয়েছিল বলে কোনও আখ্যানে পাওয়া যায় না। ব্যতিক্রম, ওই বল্লালচরিতের কাহিনিটি, যার অনুরূপ কাহিনি, সুফি ফকিরের সঙ্গে যুদ্ধের পরে ভুল পায়রার বার্তা পেয়ে রানির অনুমরণ এবং ফিরে সেই দৃশ্য দেখে রাজার আত্মহত্যার গল্প, চন্দ্রকেতুগড় প্রভৃতি বিভিন্ন জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

এপ্রসঙ্গে মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১) উল্লেখযোগ্য। মাইকেল মধুসূদন দত্ত এই কাব্যে ইন্দ্রজিতের মৃত্যুর পর প্রমীলার সতী হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু, বাল্মিকী রামায়ণে (বঙ্গানুবাদ ১৮৪৪, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য) প্রমীলা চরিত্রটিই নেই, তার সতীদাহ তো দূরের কথা। পঞ্চদশ শতাব্দীর কৃত্তিবাস রামায়ণেও কোনও সতীদাহের কথা নেই। রামায়ণের যেহেতু অনেক ভার্সন, খোঁজ নিয়ে দেখা যাচ্ছে, চতুর্দশ শতাব্দীতে অন্ধ্রে রচিত তেলুগুভাষার শ্রীরঙ্গনাথ রামায়ণে ইন্দ্রজিতের স্ত্রী সুলোচনার কথা পাওয়া যাচ্ছে, যিনি যুদ্ধে নিহত ইন্দ্রজিতের ছিন্ন শির নিয়ে চিতায় উঠছেন। মাইকেলের কাব্যে সুলোচনা হয়ে যাচ্ছেন প্রমীলা। অর্থাৎ উনিশ শতাব্দীর মধ্যভাগেও মূল কাহিনিতে দেশের অন্য অঞ্চল থেকে আসা ভার্সনের প্রভাব পড়তে দেখছি।

এও উল্লেখ্য যে নাথসাহিত্য, সিদ্ধাদের কাহিনি, মুসলমানি সাহিত্য এবং অন্যান্য রচনায় সতীদাহ নিয়ে কিছুই পাওয়া যায় না। অথচ, অন্যান্য বিভিন্ন জিনিস খুবই বিশদে অনেক জায়গায় আলোচনা করা আছে, অনেক ক্ষেত্রে মহিলা পদকর্তার সন্ধানও পাওয়া যায়। সতীদাহ সেই গোষ্ঠীতে প্রচলিত না হলেও, জীবন্ত একজনকে পোড়ানো এত গুরুতর ব্যাপার যে অন্য ধর্ম বা গোষ্ঠীর সংবেদনশীল লেখকদের আখ্যানে তা আসা অস্বাভাবিক ছিল না। সতীদাহ এবং জৌহরকে নিয়ে ভারতের অন্যান্য প্রান্তে গাথা, কাহিনি ইত্যাদি প্রচলিত আছে, বাংলায় সেরূপ কিছু পাওয়া যায় না।

৪) বিদেশি পর্যটকদের বিবরণ-   সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপীয় পর্যটক ও ব্যবসায়ী যাঁরা ভারতে আসেন, তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ভারতভ্রমণের বর্ণনা দিয়েছেন। ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে আসার ফলে ভারতের অনেকগুলি বিষয় তাঁরা বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছেন, যা এদেশের বাকি লেখকদের নথিতে সচরাচর ধরা পড়ে নি। যেমন, শবদেহ দাহ করার ব্যাপারটিই এই পর্যটকদের কাছে অভিনব ছিল, অনেকেই বিশদে এর বর্ণনা দিয়েছেন, যে বর্ণনা ভারতীয়দের লেখায় কখনোই আসে নি। সতীদাহ তাদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে কারণ একজন সর্বসমক্ষে আগুনে পুড়ে মরছে, এই ঘটনা পর্যটকদের মনে গভীর অভিঘাত ফেলছিল। টাভার্নিয়ার তাঁর বইতে দুটি অধ্যায়ে যথাক্রমে শবদাহ এবং সতীদাহ নিয়ে লিখেছেন। গুজরাট থেকে দিল্লি অবধি অঞ্চলে, করমণ্ডল উপকূলে এবং সুবে বাংলায় (ইংরিজি অনুবাদে কিংডম অফ বেঙ্গল) সতীদাহের বর্ণনা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন। এই কিংডম অফ বেঙ্গল এক বিস্তীর্ণ এলাকা, তাঁর লেখায়, যার মধ্যে মুর্শিদাবাদ, ঢাকা থাকলেও, তার সবচেয়ে বড় শহর পাটনা।  কিউল নদী কিম্বা ওড়িশার সম্বলপুর, সবই এই কিংডমের অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলে গঙ্গা তীরবর্তী এক শ্মশানে ভুটান থেকে আসা শবদেহ এবং তার স্ত্রীর সতীদাহের বর্ণনা পাচ্ছি। ভুটান এবং সেখানকার পণ্য নিয়ে টাভার্নিয়ার আরেকটি অধ্যায়ে লিখেছেন। সেখানে দেখা তিনি লিখছেন ভুটানের পার্শ্ববর্তী শহর ভারতীয় গোরখপুর। ফলে, এ কথা ধরে নেওয়া যায় যে টাভার্নিয়ার সম্ভবতঃ নেপালের কোনো হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল, যা বর্তমান উত্তরপ্রদেশ-বিহারের সীমানায়, ভুটান অর্থে সেরকম অঞ্চলের কথা বুঝিয়েছেন। হতে পারে, ভুটানের লোকেরা এই রাস্তা ধরে উত্তরভারতে আসত। যাই হোক, টাভার্নিয়ার আরও একটি সূত্র দিচ্ছেন, যা হল, মুঘল সাম্রাজ্যের মধ্যে কোনও নারী সতী হতে চাইলে সে যে অঞ্চলের বাসিন্দা সেখানকার স্থানীয় প্রশাসকের অনুমতি নিতে হত এবং সেই শাসনকর্তা মুসলমান হলে তিনি সচরাচর অনুমতি দিতেন না। এবং সন্তান আছে এরকম কোনও নারী কোনও অবস্থাতেই সতী হতে পারতেন না। টাভার্নিয়ারের বর্ণনা অনুযায়ী কিংডম অফ বেঙ্গলের মধ্যে উক্ত সতীদাহ বস্তুত পাটনা অঞ্চলের গঙ্গাসংলগ্ন কোনও শ্মশানে। লক্ষ্যণীয়, যে পাটনায় সতীদাহ হত, জব চার্নক তাঁর স্ত্রীকে পাটনার কোনও সতী-চিতা থেকে উদ্ধার করেন, এই কাহিনি আমরা আগে উল্লেখ করেছি। সতীদাহের অনুমতির ব্যাপারে স্থানীয় মুঘল প্রশাসকদের অনীহার কথা বার্নিয়েরও কাছাকাছি সময়ে লক্ষ্য করেছেন। তিনি আহমেদাবাদ থেকে আগ্রা আসার পথে, সুরাটে এবং লাহোরে সতীদাহ দেখেছেন এবং তার বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। যদিও মুঘল শাসকরা সতীদাহ রদে আইন প্রণয়ন করেছিলেন এবং স্থানভেদে আঞ্চলিক শাসনকর্তারা সেই আইন নিয়ে খুব নমনীয় হতেন না, বার্নিয়ের বলেছেন সতীদাহ নিবারণে কোনো উৎসাহব্যাঞ্জক আইনের অভাব তিনি বোধ করেছেন। সতী যে হতে চাইছে তাকে নিরস্ত করা এবং সতী হতে গিয়ে কেউ চিতা থেকে উঠে আসলে তাকে সমাজে পুনর্বাসিত করবার ব্যবস্থা থাকার দরকার তিনি মনে করেছেন। মানুচি এর কিছু পরে লিখেছেন যে আওরাঙজিব সতীদাহ সার্বিকভাবে বন্ধ করেছেন।

উত্তরকথন

উপরের বিবরণগুলি থেকে যেটা দেখি যে ভারতে সতীদাহের প্রচলন ছিল এবং তা খুব দুর্লভ ছিল না। মুঘল সম্রাটরা সতীদাহ নিবারণে সচেষ্ট ছিলেন, ইসলাম-অবলম্বী শাসকরাও এর বিরোধী ছিলেন। বাংলার মাটিতে সতীদাহের কোনও বিবরণ পাই না। টাভার্নিয়ার যে সতীদাহটি কিংডম অফ বেঙ্গলে বলেন তা  পাটনা এলাকার এবং খুব সম্ভবতঃ নেপাল-অধিবাসীর কারুর, যেহেতু নেপাল মুসলিম শাসকের অধীন ছিল না।

হলওয়েলের বর্ণনায় বাংলায় যে একমাত্র সতীদাহের বর্ণনা পাওয়া যায়, তা ১৭৪৩ সালে কাশিমবাজারে। এক মারাঠা মহিলা সতীদাহে সামিল হন যদিও তাঁর আত্মীয় বন্ধুরা প্রবল আপত্তি করে, কিন্তু তিনি স্থানীয় ফৌজদারের অনুমতি আদায় করতে পারেন। এই পরিবারটি ভাস্কর পণ্ডিতের সঙ্গে তার আগের বছর বাংলায় আসে এবং সেখানে থেকে যায়।

উপরের এই দীর্ঘ আলোচনায় আমরা এটা দেখতে পাচ্ছি যে বাংলায় প্রাক-ব্রিটিশ পর্বে সতীদাহ হতো এর কোনও প্রামাণ্য ঐতিহাসিক সূত্র নেই। কিন্তু ভারতের অন্যান্য এলাকায় সতীদাহের বর্ণনা পাওয়া যায়। বাঙালি কবিরা অনেকেই সতীদাহের ধারণার সংগে পরিচিত ছিলেন, এবং জৌহরের সংগেও। এবং বাংলার বেশ কিছু জনপ্রিয় সাহিত্যে এই প্রথাকে ঐশ্বরিক মহিমা, রাজপরিবারের বীরত্বের নমুনার সংগে যুক্ত করা হয়। তা সত্ত্বেও বাংলায় দুটি বিষয় এই প্রথার বিকাশের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ভাবে কাজ করেছিল- ক) চৈতন্য এবং তন্ত্রের প্রভাবে এখানে সমাজে ও পরিবারে নারীর অবস্থান শক্তিশালী ছিল, সমাজ তুলনায় অহিংসও ছিল। খ) মুসলমান শাসনকর্তার অধিকারে থাকায় সতীদাহের অনুমতি পাওয়া দুষ্কর ছিল এবং ইসলাম ধর্মে আত্মহত্যা অনুমোদিত নয়, সেই ধারণা স্থানীয় হিন্দুদের মধ্যেও এসেছিল। অধ্যাপক গৌতম কুমার দাস লক্ষ্য করেছেন বাংলায় যে সতীঘাট পাওয়া যায়, তার বয়স দুশ বছরের বেশি নয়। বাংলায় হওয়া একমাত্র সতীদাহের নজির পাচ্ছি মারাঠা আক্রমণের সময়ে ১৭৪৩ সালে হলওয়েলের লেখায়। এবং সেটিও একটি নবাগত মারাঠা পরিবারে, যারা বিগত বছরেই বাংলায় আসেন। লক্ষ্যণীয়, এই সময়ে বর্গি আক্রমণ সামলাতে নবাব আলিবর্দি ব্যতিব্যাস্ত। এই বছরেই মারাঠারা বাংলার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে, আলিবর্দি মুর্শিদাবাদে প্রায় তাহকতেই পারেন নি। মারাঠা আক্রমণ বাঙালির ঘরে ঘরে যুদ্ধকে পোঁছে দেয়। পাশাপাশি মারাঠারা অনেকে এদেশে থিতু হন, তাঁদের সঙ্গে বাঙালিদের আদানপ্রদান হয়, বাংলার কিয়দংশের মধ্যে হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা তৈরি হয় মারাঠাদের থেকে। যাই হোক, এর পরের সতীদাহের তথ্য আসছে হুগলির চুঁচুড়ায়, ১৭৭০ সালে। বাংলায় নবাবি শাসন ততদিনে অস্তমিত। দ্বৈতশাসন পেরিয়ে কোম্পানির রাজ প্রতিষ্ঠিত। এই ১৭৭০ মন্বন্তরের ছিয়াত্তর নামে বাংলার ইতিহাসে কালিমালিপ্ত। বাংলার ১/৩ অংশ মানুষ এতে আক্রান্ত, জনক্ষয় প্রায় এক কোটি। আর, এর কয়েকবছরের মধ্যে ভারতের সবচেয়ে বেশি সতীদাহ নথিভুক্ত হয় হুগলি জেলায়, দেড়শ জন বিধবার একজনকে স্বামীর চিতায় উঠতে হয়।

রমেশচন্দ্র মজুমদার সতীদাহ নিবারণের মূল কৃতিত্ব রামমোহনকে দেন নি, দিয়েছিলেন ইংরেজ শাসকদের। আমরা প্রায় সকলেই যে কটি কারণে বিপুল লুন্ঠন সত্ত্বেও ব্রিটিশ শাসনকে এইদেশের পক্ষে আশির্বাদ মনে করি, তার একটি অবশ্যই সতীদাহ নিবারণ। কিন্তু, খতিয়ে দেখলে মনে হয় বাংলায় সতীদাহ পত্তনে ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ হাত ছিল। প্রত্যক্ষ এই কারণে, যে, মুঘল শাসকদের মতন সতীদাহ নিবারণে তাঁরা কঠোর ছিলেন না, এমন কী ১৭৭২ সালের রেগুলেশনে কোম্পানি দেশীয়দের নিজস্ব ধর্মপালনের উপর থেকে সরকারি বাধানিষেধ উঠিয়ে নেয়। ফলে, মুঘল আমলে চলে আসা সতীর নিজের ইচ্ছেপ্রকাশের আবশ্যকতার আইন বজায় ছিল না। বাংলার মানুষের একাংশের চেতনায় সতীদাহ এক গৌরবাণ্বিত প্রথা ছিল, যদিও তার অনুষ্ঠান বাংলায় ছিল না কিন্তু প্রতিবেশী অঞ্চল ও বাংলায় আসা মারাঠাদের মধ্যে তার প্রচলন নিয়ে তাদের ধারণা অবশ্যই ছিল। আইনি বাধা কেটে যাওয়ায় সতীদাহে উৎসাহ দিতে তাদের আটকায় নি। ব্রিটিশদের পরোক্ষ অবদান আরও ভয়ানক। পলাশী যুদ্ধের পর থেকে বাংলার অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। বিশিল্পায়ন হয়, ভূমিহীন কৃষকের ঢল নামে দেশজুড়ে। বাংলা থেকে অগাধ সম্পদ ব্রিটেনে চালান হয়, ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের কাজে লাগে। ইংরেজদের সঙ্গে আফগান-মারাঠা-শিখ সকলের যুদ্ধের আর্থিক দায়ই বাংলার মানুষকে নিতে হয়। বিশিল্পায়ন এবং দুর্ভিক্ষের চূড়ান্ত অবস্থায় কর্মক্ষম মানুষ নিজেরই খাওয়াপরা জুটিয়ে উঠতে পারে না। এই বিপর্যয়ে সমাজের নিজস্ব বাঁধন ভাঙে, ধর্মীয় চেতনা বিপর্যস্ত হয়। উল্লেখ্য, বৈষ্ণবসাহিত্যের ঐতিহ্যমণ্ডিত ধারা শুকিয়ে যেতে শুরু করে এই সময়ে। এই বিপর্যয়ে সমাজের দুর্বলতর অংশ সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে নারীদের অবস্থার ভয়ানক অবনতি হতে শুরু করে। স্ত্রী শিক্ষা ভেঙে যায়, নারীর উপার্জনের অধিকারও বিপর্যস্ত হয়। ক্রমশঃ এই অবনতি চূড়ান্ততর রূপ নিয়ে সতীদাহের প্রচলনের অনুকূল পরিস্থিতি  তৈরি করে। লক্ষ্যণীয়, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর শুরু অবধি বাংলায় নথিভুক্ত সতীদাহের মধ্যে ৫০%-এর বেশি ছিল শূদ্র এবং দরিদ্র পরিবারভুক্ত রমণী।



598 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


Avatar: এলেবেলে

Re: বাংলায় কি সতীদাহের প্রচলন ছিল?

নিঃসন্দেহে ভালো লেখা তবে লেখাটা আরেকটু বিস্তারিত হতে পারত।

লেখক লিখেছেন --- লক্ষ্যণীয়, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ থেকে উনবিংশ শতাব্দীর শুরু অবধি বাংলায় নথিভুক্ত সতীদাহের মধ্যে ৫০%-এর বেশি ছিল শূদ্র এবং দরিদ্র পরিবারভুক্ত রমণী।

কিন্তু নবদ্বীপে যে সতীপ্রথার ব্যাপক প্রচলন ছিল 'নবদ্বীপ মহিমা' বইয়ে মাত্র একটি ঘটনার উল্লেখেই তার প্রমাণ মেলে। নবদ্বীপ মহিমা-র বয়ানেই বর্ণনা করা যাক :

"১৭৯৯ খৃষ্টাব্দে নবদ্বীপের বঙ্গপাড়ায় এক কুলীন ব্রাহ্মণের মৃত্যু হওয়ায়, তাঁহার ১০০ স্ত্রীর মধ্যে ৩৭ জন সতী হন। তাঁহারা তিন দিন ধরিয়া মৃত স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় প্রাণ বিসর্জ্জন করেন। প্রথম দিন তিন জন, দ্বিতীয় দিন ১৫ জন, এবং তৃতীয় দিন ১৯ জন প্রাণত্যাগ করেন।"
Avatar: rivu

Re: বাংলায় কি সতীদাহের প্রচলন ছিল?

সুশীল চৌধুরীর লেখা গুলো একটু দেওয়া যায়? সার্চ করে দেখলাম পে ওয়ালে আছে।
Avatar: Somnath Roy

Re: বাংলায় কি সতীদাহের প্রচলন ছিল?

১৮২৩ সালের তথ্য যে ৫১% শূদ্র। তবে তখন শূদ্রের মধ্যে কায়স্থকে ধরা হত। অষ্টাদশ শতাব্দীর থেকে বাড়তে শুরু করে সংখ্যাটা।

এই প্রসঙ্গে যে বইপত্রগুলি পড়েছি, তার কয়েকটি এইখানে আপলোড করে দিলাম- https://drive.google.com/drive/folders/1PA-x3zqw2JqC3hgwHmqLxwJKY3KiHF
-P?usp=sharing

Avatar: Somnath Roy

Re: বাংলায় কি সতীদাহের প্রচলন ছিল?

১৮২৩ সালের তথ্য যে ৫১% শূদ্র। তবে তখন শূদ্রের মধ্যে কায়স্থকে ধরা হত। অষ্টাদশ শতাব্দীর থেকে বাড়তে শুরু করে সংখ্যাটা।

এই প্রসঙ্গে যে বইপত্রগুলি পড়েছি, তার কয়েকটি এইখানে আপলোড করে দিলাম- https://drive.google.com/drive/folders/1PA-x3zqw2JqC3hgwHmqLxwJKY3KiHF
-P?usp=sharing

Avatar: এলেবেলে

Re: বাংলায় কি সতীদাহের প্রচলন ছিল?

লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ এই ভূরিভোজনের সুযোগ করে দেওয়ায়। কৃতজ্ঞচিত্তে ডাউনলোডালাম।
Avatar: ~

Re: বাংলায় কি সতীদাহের প্রচলন ছিল?

কিন্তু তাতিন archive.org ব্যবহার করে না কেন? আরো কিছু রিসোর্স পেত সেখেনে। গেজেট ছাড়াও যেমন


https://i.postimg.cc/fLkr8Tr2/screenshot-archive-org-2019-08-03-19-49-
05.png



https://i.postimg.cc/06WfYmpG/screenshot-archive-org-2019-08-03-19-55-
44.png



https://i.postimg.cc/fRfHf0Bj/screenshot-archive-org-2019-08-03-20-00-
27.png


আর shodhganga.inflibnet.ac.in এ কিছু পেপার নাই এ বিষয়ে?
Avatar: এলেবেলে

Re: বাংলায় কি সতীদাহের প্রচলন ছিল?

@~, কোনোটাই ডাউনলোড করা যাবে না সাইট থেকে, তবে ধার নেওয়া যাবে। এগুলোর মধ্যে প্রথম বইটি পেলে আমাকে দিতে পারেন। অবিশ্যি Fischএর ভারতীয় সতীদের ওপর লেখা একটি প্রবন্ধ আমার কাছে আছে।
লেখক কি কৈলাসবাসিনী দেবীর লেখাটি পড়েছেন? হয়তো নতুন কিছু আঙ্গিক যুক্ত হতে পারত প্রবন্ধটিতে।
Avatar: Somnath Roy

Re: বাংলায় কি সতীদাহের প্রচলন ছিল?

আর্কাইভ ওয়ারজি থেকে অনেক কিছু পেয়েছি, বল্লাল সেনের লেখা বই অবধি আছে। পিডিএফ ডাউনলোডও করা যায়।
আমি মূলতঃ প্রাক ১৮৫৭ বাংলায় সতীদাহ নিয়ে বিবরণ খুঁজেছি। কৈলাসবাসিনী সেই পার্স্পেক্টিভে ধরিনি
Avatar: sswarnendu

Re: বাংলায় কি সতীদাহের প্রচলন ছিল?

মহাভারতের তথ্যটায় বোধহয় একটু ভুল আছে৷ মাদ্রী 'সহমৃতা' হয়েছিলেন এই জাতীয় কিছু একটা আছে ( মানে এরকম বলা হয়েছিল, আসলে তাও নয় সে মহাভারতেই আছে )৷ সহমরণে জাননি, কারণ পান্ডু ও মাদ্রীর গলিত শব (১৭ দিনের বাসি মড়া) ও পঞ্চপান্ডবসহ কুন্তীকে মুনিরা হস্তিনাপুর পৌঁছে দেন৷ পান্ডু ও মাদ্রীর মৃতদেহ হস্তিনাপুরে দাহ করা হয়৷

Avatar: কুশান

Re: বাংলায় কি সতীদাহের প্রচলন ছিল?

লেখাটি অসম্ভব ভালো। শ্রমলব্ধ। যদিও উপসংহার এর একাংশ প্ৰক্ষিপ্ত মনে হয়েছে।
যেমন, "উল্লেখ্য, বৈষ্ণবসাহিত্যের ঐতিহ্যমণ্ডিত ধারা শুকিয়ে যেতে শুরু করে এই সময়ে।"
একটি ঔপনিবেশিক শাসনে ভাষা, সংস্কৃতি ও মনন সবকিছুই বদলাতে বাধ্য। তাছাড়া, পাল্টা প্রশ্ন রাখা যেতে পারে চর্যার মতন শক্তিশালী ধারাই বা লুপ্ত হলো কেন? তারও ঐতিহাসিক পটভূমি ছিল।

ঔপনিবেশিক শাসনে "নীল দর্পন" কতটা প্রাসঙ্গিক, "পল্লীগ্রামস্থ প্রজাদের দুরবস্থা বর্ণন" কতটা প্রাসঙ্গিক, আর পদাবলীর লিরিক্স কতটা প্রাসঙ্গিক? যে কোনো ভাষ্যকার আসলে সময়েরই সন্তান। 'হুতোম পেঁচার নকশা' সেই সময়কার নগরজীবনের দলিল বলা যেতে পারে। এই সব চিহ্ন ইতিহাসেরই সাক্ষ্য দেয়।

তথাপি, লেখাটি ভাবনার খোরাক দিলো।




আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন