বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

কয়েকটি কবিতা

তনুজ সরকার



শব্দকে হত্যা কর
এই তিনটি তামিল শব্দে
বললেন তিরুভল্লুভর
শব্দকে হত্যা কর

আর্তি একটি গুজরাতি শব্দ
লিখলেন বিনোদ কুমার শুক্ল
হিন্দী ভাষার মুকম্মল কবি তিনি
আর লিখলেন যদিও হিন্দীতে,
আর্তি একটা বাংলা শব্দ
মুকম্মলও,আমি উর্দু শব্দ
কব্জি ডুবিয়ে খাই কিনা

এবার আধিপত্য শব্দটা এখানে লিখছি
বাংলা হরফের সংগঠনে লিখছি
আমি হিন্দী শব্দ আধিপত্যের
আধিপত্য মানি না

একই কথাটা ককবরকে কীভাবে
লিখতে হয় আমাকে জিজ্ঞাসা করবেন না
আজ আপনাদের বলি,
ককবরক থেকে আমি কয়েকটা
অনাবিল খিস্তি তুলতে পেরেছি শুধু

আর যেমন পকেটে পয়সা না থাকলে বলা যাবে
রাঙ খরই,শিখেছি,যে শিখিয়েছে
তার কাছে বাংলা শব্দে কথা বলতে জানা ছিল
তার বাধ্যতামূলক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য বাধ্যতামূলক

এখানে অপ্রাসঙ্গিক,তবু বলছি,অপরিচিত ভাষার খিস্তিতে
আপনাদের সহজেই অভিবাদন করা যায়,জানি

বস্তুত,আমার এমন কোনো প্রিয় শব্দ নেই
যে শব্দ আমি ভাবতে পারি না

অথচ সম্পূর্ণ সঠিক তা নয়
আধিপত্য শব্দটিকে অনেকটা ভাবতে পারলেও
কোনোভাবেই আধিপত্য আমার প্রিয় শব্দ হয়নি

আপনাদের পীড়া হচ্ছে জেনে
আধিপত্য শব্দটা টানা কয়েকবার লিখে
তাদের রেখেছি পাশাপাশি এবং ওপর-নিচে
এভাবে রাখতেই আমার কাছে স্পষ্ট হল
আধিপত্যের ওপরে-নিচে আছে আধিপত্য,
পাশাপাশিও আছে

আবার কোনো কোনো ভাষার শব্দকোষ ঘাঁটলে দেখা যাবে
এই চেহারা-সুরতের কোনো এন্ট্রিই নেই,নাহ্

আধিপত্য শব্দটিকে ভাবতে হলে তবে,তার
প্ররোচনা অন্তত দরকার

শব্দটিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আরো কিছুক্ষণ দেখছি
ঠিক তখনই মনে হল,আপনাদের
গাঙ্গেয় ভাষাতে প্রাচীন সেই প্ররোচনা আছে।





হংসধ্বনিতে তারানাটা শেষ করতে
আজ অতটা সময় নিলেন না তিনি।
প্রায় সাড়ে দশটায় বন্দিশটা ধরলেন যখন,
হলভর্তি লোকের উৎকন্ঠা,বিকেল থেকে আটকে
রাখা কাঁশি,কিভাবে বাড়ি পৌঁছোবোর নৈতিকতা
আর জামার খসখস শুনতে পেলেন বোধহয়

এবং একি,আমরা দেখলাম,যেন হঠাৎই
বিস্মৃত হলেন নিজের চোখের চাইতেও
পুরাতন রাগ।ভূপ।

আমাদের মতন তিনিও কিছুতেই
পারছেন না পৌঁছোতে।বাড়ি।

ঘটনাটির সরলতা এই যে হলজুড়ে বিস্মৃতি পর্যাপ্ত ছিল।
কখনো গলির শুরুটা মনে পড়ছে কারোর তো কখনো তাজউলদের
দোচালার বাইরের শিউলি ফুলের গাছটি দেখতে পাচ্ছে কেউ,
কখনো বা একটা নীল স্কুটার,না
আকাশের নীল নয়,স্কুটারের নীলের মতন নীল,না,নাকি
জোনাকির বাবার স্বপ্নে পাওয়া ও স্বপ্ন উদ্ঘাটনের পড়িমরিতে
কমল হরিজনকে এগারো দিনের চুক্তি দিয়ে বানানো
শীতলা মন্দিরের মাটির গাধাটা যত—নীল?গলির মাঝামাঝি
একটা আধচেনা ময়লা ন্যাকড়া পড়ে ছিল,বড়ই গাছটির ছায়ায়
শিশুরা গোল গোল খেলা করত ন্যাকড়াটিকে কেন্দ্র করে,তখনো
আমাদের মনে হয়নি যে আরে,আমাদের কেন্দ্রে তবে এই,
ফেলে দিলেই হত;আমরা সদ্যই বেবির মোলায়েম পিঠে হাত রেখে
‘বেবির পিঠটা কি মোলায়েম’ বলেছিলাম,এটুকু মনে পড়ে;না,বেবি কুকুর নয়,
পাড়ার সহজ বোলচালে মৃগ,বলেছিলাম,
বাড়ির শক্ত তোষকের নিচে নরম জাজিম পাতা আছে; ফিরতেই হবে

হ্যালো।কিছুক্ষণের ঝড়েই বড় রাস্তার ট্রান্সফর্মারটা
উড়ে গেছে।ফুটব্রিজ ধরে ফিরতে হবে।রাখছি।

রাত এগারোটা।সহসা তিনি বন্ধ করলেন চোখ।
আর হলভর্তি ধরাছোঁয়ার অস্বস্তিতে
আমরা বিশ্বাস করতে শুরু করলাম
আমাদের বুঝি আর দরকারই নেই কিশোরীর

‘আচ্ছা,আমরা না থাকলে কী ওর সুবিধে হবে?’জানতে
চাইল কেউ।অথচ আমি স্পষ্ট শুনলাম কেউ জানতে চাইছে
কীভাবে পৌঁছোবো নয়,কার সাথে পৌঁছোবো,বাড়ি।

বাড়ির চোখ বন্ধ।তার?বন্ধ নয়,নির্বাপিত।বলল আর কেউ।
তিনি আবার চেষ্টা করছেন।শুদ্ধ তান।বিষন্নতা।বৃষ্টি পড়ছে।

কিশোরীকে এবার বহুদূরের বাগিচা মনে হল আমাদের।

রাতের উত্থাপিত বাগিচায়,বাগিচার অনেক হাওয়াতে
ডান হাতের তর্জনী ও ধারণায় সচল অন্য অঙুঠির
মৃদু টিপে যে বিন্দু একাকার,বিচলিত সুরটি তাতে ভরে
আদিগন্ত হাওয়া কেটে কেটে,ক্লান্ত;তবু—
তখন মহাকাশ পর্যায়হীন নক্ষত্র ও পর্যায়ক্রমে গতিতে
সুনশান; একে অপরের কাছে তখনও হৃদয়ের গতি,শূন্যতা—
অযুতসহস্রশতকএকশূন্য ক্রমে—তবু গাভিন চরখাতে
হাওয়া কেটে স্থির সেই বিন্দুকে গোপনে নিঃস্ব করার অধিক
জটিলতা সহজ,যেহেতু সহজ কোনো গাছ,জানতেন,অচিরেই
দাঁড়িয়ে থাকে কৌতূহল শেষে;নিঃস্বতা সংলগ্ন গাছে,গাছের তূণীর ঢাকা
সর্বোচ্চ পাতায়,তবে আনো,পরিচিত লাইটারটি আনো,
এখানেই রহস্য!প্রজ্বলনের সকল দপ্,দপে!

প্রথমে কেঁপে উঠল স্মৃতি,ন্যূনতম শক্তির গাছ।
তারপর কিশোরীর ঠোঁট।সাহেলা রে।

দেররাতের ফুটব্রিজটা কাঁপছে,থেমে থেমে।আর তাজউলের শরীর।
ডান থেকে বাঁয়ে।আরবি শব্দ,অবিকল আরবি শব্দ! সাহেলা রে!
আমি তার হাত ধরলাম।তাজউল আমার।তার মগ্ন দু’হাত ছাড়া
পায়ের কোচরও ভরা ছিল লাস্যে,সাদা শিউলি ফুলের।




মন বন্ধুরে ডাইক্কা কইসি
এই নউ কাঠের নাও
জলে আলাল শরীর বিছায়া দিসি
সারিন্দা বানাও।

মন বন্ধুরে ইশারায় কইসি,
পাট্টা জমিন আমি।
আউশ ধানের মাসে
আল্লায় ঘুইরা কইলে আমিন,

তুমি রাইন্ধ্য আমার হাত।
আমি দ্বীন ফুরাইয়া খামু
তুমার ব্রাক্ষ্মণবাড়ির মাটি,দুই
চক্ষের ডিম আর ফুস্কাপড়া ভাত।

মন বন্ধুয়ে কয় কি ফিরা,
চরে ডুবাইয়া দেহাও মাটি
আর অর্ধেক মুঠাত ভইরা
আনো বাহাসগঞ্জের হাট,

হাটের রূপালি মীনের জ্বর।তইলে
তুমি আমার! আমি কি জানি
আমার দেহ গঞ্জ নাকি শহর
আর বয় নি জানি গায়ের ভিতর

সুরমা মাছের জ্বর! হায়,ঘুম ভাঙ্গাইয়া করলা
তুমি পানের কষের সাওয়াল। সাওয়ালমুড়া
জবাব যহন চাইয়া রইসে চাইয়া,ঘরের
দাওয়াত উড়াল দিয়া বইল শীতলপাটি

আর মুখে পরস্তাব।তার মুখের পরস্তাব।
বন্ধু হাওয়াত বানছে মাচা,বানছে
কেরাসিনের বাতির পিঠে ধুরা সাপের
পেট।সূর্য হইল সরল খাচা।
ও বন্ধু,হাওয়াত বানছো মাচা?

এইবার মন বন্ধুয়ে ইশারায় কইল,
তুমার যাওয়ার পথে আমি খুইজ্যা রাখসি
ঠুট,দেহ টিয়া পাখির ঠুট,তুমি ভাসাইয়া
দিলে নাও,অই নাও হইব সারিন্দা,আমি
যত্ন কইরা রাইন্ধা দিমু কইলজাপুড়া হাত।




অবশ্য,মদ ফুরিয়ে যেতই

বিহারী শ্রমিকদের ঝুপড়ি-ঝুগ্গিতে
আড়াআড়ি পা ফেলে নাচতাম তখন
তাদের সাথে,যদি একটু মদ,আর একটু

ফাঁকা বোতলে,ছোঁ,অসীম,অসীম নাকি!

আমাদের এক বন্ধু বলত
এভাবে মদের যোগাড়ে
সামাজিক কাজ করার খুশবুও কিনা
করে লপালপ,কমরিয়া

শালা,সোয়াইন!

তবে আমি কি যেন বলছিলাম,
হ্যাঁ,কবিতার বিষয়ে
আর কিই বা বলার থাকতে পারে

এছাড়া,যে নাচে ছন্দ ছিল অটুট
আর শরীর ক্ষণস্থায়ী
ঘনঘন সিটিও যে পড়ত,
আপনারা বুঝতেই পারছেন

শরীরবিদ্যা,আরো পরে জেনেছি
আপ্লুত হাঁটুর বিষয়
গুম্ফার অচিরে শরীরটা দিক ভুল
করেই বোধহয়

এদিকে চলে এসেছিল

আমি শুধু ভাবছি,বারবার
তনুজ,তনুজ ডেকে ক্ষেপিয়ে তুলব তাকে।



ছাদের কোষ থেকে
আলতো ঠেলে দিলে
উড়ন্ত,নিট ফল নষ্টে লীন হয়ে যায়

আচ্ছা,সব
ল্যান্ডস্কেপ শিল্পীরা কোথায়?

চক্রে,মাটিতে
চকে টানা ঘটনাচক্র মোতাবেক

ছাদের কোষ থেকে
আবার আলতো ঠেলে দিতেই
বাগানের স্ববিরোধ নিভে,জ্বলে ওঠে

ও আচ্ছা,
কমরেড,তুমিও!



130 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ কাব্যি  বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন