বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

জনসন্ত্রাসের রাজধানী

সুমন মান্না

                  

আজকাল সকালে অফিসে ঢুকি, একটা কফি নিয়ে ঘরে আসি, তা শেষ হতে না হতেই সিস্টেমে লগ-ইন হয়ে যায়। তারপর থেকে প্রায় যন্ত্রের মতো কাজকর্ম চলতে থাকে। চারটে পেন্ডিং কাজ থাকে, যা শেষ করব ভাবি, নতুন পাঁচটা কাজ চলে আসে “আর্জেন্ট” তকমায়। তার মধ্যে ফোন বাজে, লোকে তাগাদা দেয়, স্কাইপে তে ভেসে আসে কেউ কাজের মাঝখানে, তার কাজের তদবির নিয়ে। মাঝে মধ্যে বাইরের হাওয়া খেতে নামি, ওইটুকু সময়ে একটু “গুরু” খোলা, ফেসবুক করা।

এর মধ্যেই পেট্রল পাম্পগুলিতে পেট্রল ডিজেলের দাম আর প্রধাণমন্ত্রীর মুখ সমানুপাতে বাড়তে দেখি। বিশ্বকর্মা পুজো, সরস্বতী পুজো, গণেশ পুজো আরও সব নানা ধর্মীয় বিসর্জনের সময়ে বড় বড় ট্রাকে ডিজি ও ডিজের যুগপৎ তান্ডবে জ্যামে ফেঁসে থাকা জানলা মোড়া গাড়ির মেঝে কাঁপে। যাদের তান্ডব যত বেশি তাদের ট্রাকে তত বড় ভারতের পতাকা। এও সমানুপাতিক।

খুব একটা কথাবার্তা হয় না অফিসের বাকি লোকজনের সঙ্গে। ২০১৪ র আগে তাও হ'ত। পিজে -টিজে বলতামও, মাঝে মধ্যে প্যান্ট্রিতে দাঁড়িয়ে চা বা কফি নিয়ে গল্পগাছাও চলত। তা বন্ধ একদিনে হয় নি। এক একটা দলের কাছে গিয়ে দাঁড়ালে দেখেছি তাদের কথা থেমে গেছে, এক এক করে সরে পড়ছে। এটা বোঝা যায়। মানুষের কাছে এলে, কাছাকাছি মানুষ থাকলে কোনও শব্দ উচ্চারণ না করেও তাকে বোঝান যায়, সে অপাঙ়্ক্তেয়।

সব নষ্টের মূল ওই ফেসবুক। কলকাতাতেও অফিস করেছি (অবশ্য সে গত শতাব্দীর ঘটনা), সেখানে চুটিয়ে আড্ডা হ'ত অফিসের নিচে চায়ের দোকানে। সিপিএম-কংগ্রেস-তৃণমূল, মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল একে অপরের সিগারেট জ্বালিয়ে এন্তার বাজে বকত। ঝগড়াও। কিন্তু “ওই লোকটা আলাদা” এমন ভাবে দাগিয়ে দিতে দেখিনি। তা যা বলছিলাম, ফেসবুকে দুর্গাঠাকুরকে হাবিবের পার্লারে যেতে দেখে অযাচিত ভাবে কেউ কেউ এসে জ্ঞান দিতে গিয়ে যুক্তির উপদ্রব দেখে পালিয়ে বাঁচেন। ব্যাপারটা বিরক্তির মাত্রা ছাড়য়েছিল বলে সেই দু-একজন কে সামনা সামনি হয়ে গেলে নড করা বন্ধ করেছিলাম। তাদের সঙ্গে এর বেশি সম্পর্ক ছিলও না।

এদের হিসেবে খুব একটা জটিলতা নেই। একে মাছ-মাংস খায়, তার ওপর সিগারেটও ফোঁকে। তার ওপরে দুর্গা-ঠাকুরকে মুসলমানের দোকানে পাঠাল — নেহাৎ কলিযুগ নয়ত কবে বজ্রাঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়! ছিঃ!

পুলাওয়ামা ঘটনার পর “দেশপ্রেম” আচমকা বেড়ে গেল সবার। তারিখটা আবার প্রেমের দিবসেরও। যাতে এইবার কেন জানি না “ভগৎ সিং এর ফাঁসি” ঠিক হয়ে ওঠেনি। তা, এই ঘটনার পর দেশের প্রধাণমন্ত্রী তো ভাষণে ফাটিয়ে দিতে থাকলেন। এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পর বাইরে থেকে আওয়াজ পেয়ে বারান্দায় এসে দেখি মিছিল চলছে জনা পঞ্চাশ লোক, মোমবাতির বদলে হাতে মোবাইলের ফ্লাশলাইট। স্লোগান শুনলাম একবার “ভারতমাতা কি জ্যায়” পিছু পাঁচবার করে “পাকিস্তান মুর্দাবাদ”। বলা বাহুল্য পড়শী দেশের উল্লেখের সময়ে তাদের “জোশ” যেন ফেটে ফেটে বেরোচ্ছিল। পরে শুনি এই মিছিল ছোট ছোট করে সারা দেশে বেরিয়েছে, কলকাতাতেও। যেন রাস্তার ধারে পাকিস্তান বসে বিড়ি বাঁধছে বলে খবর, এরা খুঁজে বেড়াচ্ছে।

দেখেছি এই ইন্ধন সত্ত্বেও দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি করা যায় নি। তাই বোধ হয় পাইন মারতে প্লেন ছোটান হয় পুলাওয়ামা ঘটনার তেরো দিনের মাথায়। সেদিন তো দেশপ্রেমের হদ্দমুদ্দ। অফিসের প্যান্ট্রি তে, লাঞ্চের পর অফিসের বাইরে ছোট ছোট জটলায় মানুষ উদ্ভাসিত। একজন তো সেদিনের হীরো। তার নিজের এক বন্ধু গিয়েছিল সে বিমান হানায়। বোম মেরে ভোরবেলা ঘরে ফিরেই এই ছেলেটিকে ফোন করেছে। এই ছেলেটা তাকে তখন কী খিস্তি মারল তা অবধি পুরোটা উচ্চারণ করল। তখন সেই পাইলট বন্ধু বলে - টিভি খোল। তবে সে দেখল কী ঘটনা। তারপর সে বিমানহানার নিখুঁত বিবরণ, যেন সে পাশেই বসে, একটা পর একটা জঙ্গী দের বাড়ি গুঁড়িয়ে যাচ্ছে, জঙ্গীরা তাদের ঠিকুজি কুষ্ঠী লিখে বুকে সেঁটে পরলোকে যাচ্ছে, সে একেবারে বিরাট কেলো। হোয়াটস্যাপে কী সব ভিডিও আসছে এক একটা মিসাইল তো লোকের পিছু পিছু ধাওয়া করে দৌড় করিয়ে মারছে!

একদম! এর একচুল বাড়িয়ে বলা নয়।

যে দিন উইং কমান্ডার অভিনন্দন বিমান হানা প্রতিহত করতে গিয়ে পাকিস্তানে ধরা পড়েন, সেদিন অফিসে যাই নি। অন্য কাজ ছিল। হোয়াটস্যাপে কিছুটা জেনেছিলাম ভারতীয় পাইলটের “নিখোঁজ” হওয়ার খবর। তার পরে তাকে মারধর বা রক্তাক্ত অভিনন্দন এর নানা ভিডিও র একটা দেখেছি কি দেখিনি ফোনের চার্জ শেষ। বাড়ি ফিরে দেখি “ডন” এর পোস্ট করা একটি ভিডিও যাতে অভিনন্দন চা খাচ্ছেন, তাকে করা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। যা তথ্য দিতে পারবেন না সেটাও পরিষ্কার বলছেন। ভালো লাগল, দেশের পাইলট সুস্থ আছেন জেনে। “ডন” পাকিস্তানের নামকরা সংবাদমাধ্যম। তা, সেই ভিডিও শেয়ার করি।

অবব্যহিত পরেই অফিসের এক প্রাক্তন (দশ বছর আগে এক বছরের জন্য একসঙ্গে একই ডিপার্টমেন্টে একই প্রোজেক্ট এ কাজ করেছিলাম) সহকর্মী স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে জানালেন “আর্মির জওয়ানদের নিয়ে এমন ভিডিও শেয়ার করা ঠিক নয়”। — “ কেন” প্রশ্ন করায় জবাব আসে “এটা ফেকও তো হতে পারে।” তাকে বলি “ডন” কোনও ভুঁইফোঁড় ফেসবুক পেজ নয়, দ্বিতীয়তঃ এই ভিডিওতে আমাদের উইং কমান্ডার কে খুব দৃঢ় ও আত্মপ্রত্যয়ী দেখাচ্ছে, আর সবচেয়ে বড় কথা দুই পড়শী দেশের সেনাবাহিনীর লোক একসঙ্গে চা খেতে খেতে কথা বলছে - এতে তো মানব সভ্যতা ও ইতিহাসের কোনও খারাপ দিক দেখায় না। দুই দেশ পরস্পরের শত্রু হ'লে তো এই ভিডিও শেয়ার করা উচিৎ আরও বেশি করে।

সে বোঝে না। তাকে একটু উপদেশ দিই, বলি, তোমার যদি এই ভিডিও নিয়ে আপত্তি থাকে বা এটা ফেক মনে হয় তাহলে বরং তুমি “ডন” এর সম্পাদক মণ্ডলীর কাছে আপত্তি জানাতে পার বা অনুযোগ করতে পার। তারা এই ভিডিও পাবলিক করেছে। আমার কাছে এইটা “হিউম্যান ভ্যালুর” এর একটা দৃষ্টান্ত মনে হয়েছে। আমি শেয়ার করেছি।

সে খুশি হয় না। বুঝি। বুঝি গত দশ বছরে একবারও সাড়াশব্দ না করা ফেসবুক “বন্ধু” কীসের তাড়নায় এসে আমার ফেসবুক পোস্টের নিচে লিখতেই থাকে, লিখতেই থাকে।

পরের দিন ইমরান খান ঘোষণা করেন উইং কমান্ডার কে নিঃশর্তে ছেড়ে দেওয়া হবে। খবরটা পেয়ে খুব খুশি হই। একজন প্রাক্তন ক্রিকেটার এখনও ক্রিকেটটাকে “জেন্টলম্যানস গেম” হিসেবে রাখতে চাইছেন মনে হল। মনে পড়ল পুলাওয়ামা কাণ্ডের পর ইমরান খানের প্রতিক্তিয়ার কথা যাতে স্পষ্ট বলেছেন “বুঝি, ভারতে নির্বাচন আসছে…”।

পরের দিন ছাড়া পাবেন অভিনন্দন। অফিসে নিউজ চ্যানেলগুলো খোলে না। কাজের ফাঁকে বাইরের হাওয়া খেতে গিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ দেখি, ফেসবুকে দেখি যদি ছাড়া পাওয়ার খবর আসে। সন্ধে হয়ে যায়। বাড়ি ফিরে টিভি চালাই। সব টিভি চ্যানেল একযোগে পাকিস্তানের তুলোধনা করে, কোথাও দেখান হয় না, বলা হয় না যে পাকিস্তানেও লোকজন অভিনন্দনের মুক্তি চেয়ে পথে নেমেছেন। বড় বড় তাবড় রাজনীতিক, বিরাট সব সমর বিশারদ কেউ একবারও বলেন না কীভাবে পাকিস্তানের মতো এক কট্টর দেশের প্রধাণমন্ত্রী হয়ে তাদের মিলিটারিকে বুঝিয়ে এত দ্রুত ভারতের উইং কমান্ডার অভিনন্দনের মুক্তি ঘোষণা করতে পারেন! বিশেষত যে দেশের গত বেশ কয়েকজন প্রধাণমন্ত্রী গদি থাকে নামার পরেই সোজা জেলখানা চলে যান বা রহস্যজনক ভাবে মারা পড়েন।

এক সময়ে অভিনন্দন ছাড়া পান। ওয়াঘা বর্ডারে তাকে নিতে আসা দুই ভারতীয় সেনার একজন তার পাকিস্তানী কাউন্টারপার্টকে একটা আলগা স্যালুট ছুড়ে দেন। ভাল লাগে সেটা দেখতে, তবু সেটার উল্লেখ কাউকে করতে দেখি না।

কিন্তু আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। “মেনি থ্যাঙ্কস ইমরান খান” লিখে পোস্ট করি ফেসবুকের দেওয়ালে। অমনি সার্জিক্যাল স্ট্রাইক শুরু হয়ে যায়। অফিসের একজন বলেন - “এটা কি নিজের পরাজয় স্বীকার করার জন্য?” তাকে বোঝাতে চাই বা বোঝাতে যাই যুদ্ধ-পরিস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও যে এত তাড়াতাড়ি উইং কমাণ্ডার কে ছেড়ে দেওয়া হল তাতে ইমরান খান এর বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা দেখতে পাই, সেসব না বলে একটা থ্যাঙ্কস জানাতে দোষ কীসের - যখন আমাদের উইং কমান্ডার মোটামুটি সুস্থ ও সসম্মানে ফিরে এসেছেন। জবাব আসে — পাকিস্তান যে কত ভারতীয় মেরেছে! বলি - সেইজন্যই তো আরও বেশি থ্যাঙ্কস দেওয়া উচিৎ।

ফিরে আসেন আগের বার চা -খাওয়ার ভিডিও তে কমেন্ট করা প্রাক্তন সহকর্মী, গত দশ বছরে দ্বিতীয়বার ঠিক তিনদিনের মাথায়।

তিনি আরব এমারেটসে থাকেন কাজের সূত্রে, তার উল্লেখ করে জানান — “এতে ইমরান খানের কোনও কৃতিত্বই নেই, পাকিস্তানের ওপর আমেরিকা সমেত প্রতিটি আরব দেশের সাংঘাতিক চাপ ছিল, যা এখানকার খবরের কাগজগুলিতে সরাসরি না লিখলেও ‘'বিট্যুইন দ্য লাইন” জানিয়েছে। শুধু ভারতের মিডিয়াই নাকি ইমরান কে মাথায় তুলে নাচছে। তুমি দেখ, যে মুসলিম দেশগুলো পাকিস্তানের বন্ধু ছিল, তারা আজ ভারতের বন্ধু। পৃথিবীর একটা দেশও বলে নি ভারত কিছু ভুল করেছে বলে। ভারতের আগ্রাসনের নিন্দা কেউই করে নি, তারা শুধু ভারত পাকিস্তান - এই দুই দেশকেই সংযত হতে বলেছে। এই পরিস্থিতিতে যা খুবই স্বাভাবিক উপদেশ। ভারতের এটা সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক জয়। একজন ভারতবাসী হিসেবে এটা আমাদের বোঝা উচিৎ ও স্বীকার করা উচিৎ।”

বলা যেত অনেক কিছুই। যেমন, কীভাবে খবরের কাগজের রিপোর্টে ঠিক বিপরীত অর্থ প্রকাশ পায়। জিজ্ঞেস করা যেত - কোন ভারতীয় মিডিয়া ইমরান খানের প্রশংসা করেছে - আমি তো খুঁজে পাই নি। তবু, তাঁকে সবিনয়ে জানাই যে আমাদের মিডিয়াপ্রসূত হাজার সাফাই সত্ত্বেও আমি যখন দেখি পাকিস্তান দিনের শেষে আমার আমার দেশের একজন উইং কমান্ডার সসম্মানে বাড়ি ফিরে এসেছেন, আমি খুশি হয় ও আমার কৃতজ্ঞতা জানাই। আর আমার কাছে আমার নিজের দেশকে ভালোবাসার অর্থ কিন্তু অন্য দেশকে ঘৃণা করা নয়। তুমি যেভাবে তোমার সাফাই তে সন্তুষ্ট আছ, আমার কাছে আমার যুক্তিটাই যথেষ্ট তাকে থ্যাঙ্কস জানানর জন্য।৷

 আরও একজন, একটু বিনয়ী, দেখা সাক্ষাৎ হ'লে দাদা বলে। বলল - “দয়া করে থ্যাঙ্কস দেবেন না দাদা”। তাকে বলি খেলার শেষেও দুই পক্ষ একে অপরের সঙ্গে হাত মেলায় আর এ ক্ষেত্রে ওনার সিদ্ধান্তে আমাদের উইং কমান্ডার সসম্মানে ফিরে আসেন দেশে অবিশ্বস্য দ্রুততায়। এই ধন্যবাদ তার প্রাপ্য।

 ঘটনাচক্রে এও দেখি যিনি আগে বলেছিলেন “নিজের পরাজয় স্বীকার করার জন্য কি এই ধন্যবাদজ্ঞাপন?” আর যিনি এটা ভারতের অন্যতম সেরা “কূটনৈতিক সাফল্য” হিসেবে দেখেন তারা নিজেরা সহমত হ'ন যে আর যাই হোক “মেনি থ্যাঙ্কস ইমরান খান” লেখাটা নাকি আমার ঠিক হয় নি। এমনকি ওই লেখাটির উল্লেখ করে জানান, দেখ, কেমন পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে জলের মতো যে ভারতের কত বড় জয় হল এতে। সারা বিশ্ব অবাক। একে একে অন্যান্য বিদেশি খবরের কাগজের লিঙ্ক তুলে দিই। কিছু অন্য বন্ধুরা খুঁজে দেন। তবে এরা আর কথা বলেন না।

আর একজন (ইনি আবার বঙ্গসন্তান) প্রশ্ন তোলেন এই থ্যাঙ্কস কি অনেক ভারতীয় কে মারার জন্য? তাঁকে জিজ্ঞেস করি কাকে কবে মারলেন ইমরান খান? সে বলে - কেন আজকেও তো ডিফেন্স এর লোক মারা গেছে। এও জুড়ে দেয় ও তারা আবার ডিফেন্সের লোক, সাধারণ ভারতীয় তো নয়! তার সঙ্গে কথা চালাতে ভাল লাগে না। বলি তা আমাকে তো বলে লাভ নেই, বরং ৫৬” কে বলো, যদি কিছু করেন।

অফিসে ফের আসি যাই। বাইরে হাওয়া খেতে বেরোনর সময়ে আরও একজন সামনাসামনি হয়ে “ক্যা চল রহা হ্যায়” বলে কথা থামিয়ে দেন না। একটু জিজ্ঞাসু চোখে প্রশ্ন রাখেন - আপনি নাকি আজকাল খুব ঝগড়া করছেন ফেসবুকে?

বলি, ইমরান খান কে একটা ধন্যবাদ দেওয়া যাবে না - এটা কোন দেশী নিয়ম? সে শুরু করে, আপনি বুঝছেন না দাদা, জানেন….

থামিয়ে দি। বলি একটা ধন্যবাদের এত সাফাই দরকার পড়ে না। আপনার যুক্তি আপনার কাছে রাখুন।

টিভির নিউজ চ্যানেল দেখি না, সেদিন অভিনন্দন ফিরবে বলে চালিয়ে রেখেছিলাম। আমি এই মুহূর্তে এই দেশ কে বিশ্বের অন্যতম জন-সন্ত্রাসী দেশ বলতে দ্বিধাবোধ করি না। অফিস যাই, কাজ করি, বাইরে হাওয়া খেতে যাই মাঝে মাঝে, দরজা বন্ধ করে লাঞ্চ করার সময়ে স্ত্রী কে ফোন করি।

প্রধাণমন্ত্রী যখন বলেন “দেশ বদলে গিয়েছে” - আমি জানি এই কথাটাই তাঁর বলা একমাত্র সত্যি কথা। কুড়ি বছর ভিনরাজ্যে বসবাস করার পরে এখন, গত কয়েক বছরে আমি বুঝি, কীভাবে ঘেন্নার দৃষ্টি আমাকে ছুঁয়ে যায়, আচমকা এক একটা দলের সামনে পৌঁছে গেলে প্যান্ট্রিতে কফি নেওয়ার সময়ে, তাদের কথা বার্তার তাল কেটে যায়। বিভেদ কীভাবে মানুষকে আলাদা ঘেটোয় আটকে রাখে দেখেছি। এই দেশ আমার অচেনা, টিভি ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগপৎ হানায় একটা বিরাট অংশ এখন একটা মব। শুধু বিপক্ষকে ঘৃণার ভিত্তিতে তৈরি হওয়া তাদের বন্ধুত্ব এই রাজধানী সন্নিহিত অংশের এক বড় অংশকে কট্টর সন্ত্রাসী করে তুলেছে। তাদের নিজের কোনও আলাদা ভাবনা -চিন্তা নেই, যা টিভিতে দেখছে তাই বিশ্বাস করছে। যেন এক মারাত্মক নেশায় বুঁদ।


এইভাবেই দেখি, ক'দিন চলে, কীভাবে চলে। অপেক্ষায় আছি।



2876 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ টুকরো খবর  বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3] [4] [5] [6] [7]   এই পাতায় আছে 105 -- 124
Avatar: S

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

জিডিপি পার ক্যাপিটা আর মাথা পিছু ইনকাম এক জিনিস। যেকোনো দেশের জিডিপি মানে সেই দেশ সামগ্রিকভাবে কত আয় করেছে।
Avatar: lcm

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

Gross domestic product (GDP) is a measure of the market value of all the final goods and services produced in a country. It is not a collection of individual incomes.
Avatar: S

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

সামান্য পার্থক্য।
জিডিপি + বিদেশে থেকে নেট আয় = গ্রস ডোমেস্টিক ইনকাম (জি এন আই)।
জি এন আই / লোকসংখ্যা = পা ক্যাপিটা আয়।
Avatar: lcm

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

হ্যাঁ, থিওরেটিক্যালি তাই। জিডিপি/জিএনপি -- সামগ্রিকভাবে একটি দেশের হিসেবে একমাত্র স্বীকৃত মাপকাঠি, কিন্তু প্রগতি/দারিদ্র্যর সুচক হিসেবে বিতর্কিত। আর অসাম্য তো অন্য জিনিস।
Avatar: sm

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

ক্যাপিটালিস্ট ইকোনমি হলো মার্কেট ড্রিভন ইকোনমি।অর্থাৎ ফ্রি মার্কেট ও মার্কেট সরকারের নিয়ন্ত্রণ মুক্ত।
জার্মানি হয়তো সোশ্যাল সিকিউরিটিতে বেশি খরচা করে। কিন্তু আদ্যন্ত ক্যাপিটালিস্ট নিয়ম রীতি মেনে চলে।
এতো কথা বলার উদ্দেশ্য যতটা হতদরিদ্র প্রজেক্ট করা হয়,আদতে ইন্ডিয়া অতো গরীব দেশ নয়।
Avatar: S

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

সবথেকে বেশি সংখ্যক গরীব লোক ইন্ডিয়ায় থাকে।
Avatar: sm

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

সেই জন্যই তো বুড়ো ঠাকুরদা,ঠাকুমা,এদের সু শাসন সম্পর্কে দু চার কথা বলা।
আদরের নাতি ও কতটা প্রতিশ্রুতি রাখবে,সে সম্পর্কেও সন্দিহান থাকা ভালো।
Avatar: lcm

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

এত কথা বলার উদ্দেশ্য হল, তথাকথিত ক্যাপিটালিস্ট দেশের সরকার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সিনিয়র সিটিজেনের ভাতা - ইত্যাদিতে যা খরচা করে ভারত তা করে না। তাই ভারতে গরীবের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় না। মোট সংখ্যার হিসেবে গরীব বাড়তেই থাকে।
Avatar: PT

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

"poverty leaves a mark on nearly 10 percent of the genes in the genome."
https://www.technologynetworks.com/genomics/news/socioeconomic-status-
leaves-a-mark-on-the-genome-317826

Avatar: aranya

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

সুমন-এর মূল লেখা প্রসঙ্গে -
ফেবু -তে আমি কালে ভদ্রে যাই, তবে কোন স্ট্যাটাস কখনো দিলে তা লাইক পেতে পারে, আবার কেউ প্রতিবাদ / সমালোচনা করতে পারে, সেটা প্রত্যাশিত। যেমন ইমরান খান-এর নির্বাচন পূর্ব কথাবার্তা, মৌলবাদীদের সাথে মাখামাখি ইঃ-র পরিপ্রেক্ষিতে আমিও মনে করি, আমেরিকা এবং অন্য রাষ্ট্রের চাপ + পাকিস্তানের প্রায় দেউলিয়া আর্থিক অবস্থা , এ সব কারণে উনি অভিনন্দন-কে ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, কোন ধন্যবাদ ওনার প্রাপ্য নয়। পুলওয়ামা অ্যাটাকের পর, ভারতের বালাকোট বম্বিং-এর আগে অব্দি, সেই অ্যাটাক-কে স্ট্রং-লি কনডেম করে কোন মন্তব্য-ও দেখিনি ইমরানের কাছ থেকে।

'কীভাবে ঘেন্নার দৃষ্টি আমাকে ছুঁয়ে যায়, আচমকা এক একটা দলের সামনে পৌঁছে গেলে প্যান্ট্রিতে কফি নেওয়ার সময়ে, তাদের কথা বার্তার তাল কেটে যায়' - এটা অবশ্যই একটা ক্রমবর্ধমান সমস্যা। সহনশীলতা কমছে, এ নিয়েও সন্দেহ নেই।
Avatar: Du

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

আমেরিকা ও অন্য রাষ্ট্রের চাপ? ছাড়ার ঘোষণা শোনার আগে এইরকম কিছু শুনিনি। পাকিস্তানের সেনা ভুল করে ভারতে পড়লে বেঁচে থাকতো কি? ছেড়ে দেওয়ার পরে যেজন্যই ছাড়া হোক খানেক হিউমিলিটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো।
Avatar: দ

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

এই সুমন বা শমীকের লেখা পড়তে পড়তে মনে হল এরা বোধহয় নিজেদের সার্কলের বাইরে খুব বেশী মেলামেশা করে না। সবাই ভক্ত সবাই ডিসেন্টের নামেই খিঁচিয়ে ওঠে -- এ কেমন অবিশ্বাস্য। আমার এখানে যেমন ভক্ত প্রচুর তেমনি বিরোধী, টিটকিরি দেওয়া পাবলিকও আছে। ইন ফ্যাক্ট অফিসেই আছে।
দিল্লি এন সি আর নিয়ে শ্রাবণী, রাজদীপ বা স্বাতী লিখলে মনে হয় একটু অন্য কিছুও পাওয়া যেত।
Avatar: ফরিদা

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

অরণ্য দা,
পুলাওয়ামা র ঘটনার পর ইমরান যা বলেছিলেন তার মধ্যে ছিল "জানি, ভারতে নির্বাচন আসছে" বলে একটা জায়গা ছিল। ইঙ্গিত পরিষ্কার। আমাদের দেশের প্রধাণমন্ত্রী কিন্তু দেশবাসী কে উদ্দেশ্য করে কোনো স্টেটমেন্ট দেন নি। পুরো ব্যাটারিটা দিয়েছিলেন নির্বাচনী জনসভায়।

আমার মনে হয় অভিনন্দন কে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে ইমরান এই ব্যাপারটা মাথায় রেখেছিলেন। ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর "ভক্তকূল" এর "হা-হুতাশ" ও চোখে পড়েছিল।

মানছি, ইমরানের ওপর না হয় বাইরের অনেক চাপ ছিল ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু দেশটা পাকিস্তান। যাতে তাদের পূর্ববর্তী প্রধাণমন্ত্রীরা প্রায় অনেকেই গদি ছাড়ার পর রহস্যজনকভাবে মারা যান বা জেলে যান - সেখানে এই রকম সিদ্ধান্ত অন্যরকম লাগে। আমার দেশের উইং কমান্ডার সসম্মানে মুক্তি পেলে একটা থ্যাঙ্কস তো "বনতা হ্যায়" 😊

দ,
হ্যাঁ, মেলামেশা কম। সোসাইটিতে আর অফিসে যে সব জনতা দেখি তাদের সঙ্গে কাজের বাইরে কথা চালানর বিষয়ে বিস্তর অমিল।

এর একটা কারণ মনে হয় এদের কাছে রাজনীতির সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা পুরোটাই অন্যরকম। "মোদিজী" আসার আগে কেউই রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাত বলে জানতাম না। এখন সবাই "মোদিজী" = ভারতবর্ষ = ভারতমাতা = হিন্দু বিপন্ন — এই সমীকরণকেই "রাজনীতি বলে চালাচ্ছে।

তাই নিজেরই দোষে হয়ত সংখ্যালঘু হয়ে দিন গুজরান করছি।
Avatar: aranya

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

বীরেন-এর সেই লাইনগুলো আবছা মনে পড়ে , অনেকটা এইরকম -

একটি কিশোর ছিল একেবারে একা
আরও একজন বন্ধু হল তার
দুয়ে মিলে একদিন গেল কারাগারে
গিয়ে দেখে তারাই তো কয়েক হাজার

মুক্তচেতনার মানুষদের কাছে আজকের ভারতবর্ষ হয়ত দিন দিন কারাগারের মতই হয়ে উঠছে, তবে হাত বাড়ালে বন্ধু মিলবে অনেক, এমনটাই মনে হয়।
তোমরা দেশের সুসন্তান, এত হতাশ হলে চলে
@ফরিদা


Avatar: aranya

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

তুমি যে ফেবু-তে ইমরান-কে ধন্যবাদ দিয়েছ, বা সিকি স্ট্যাটাসে লিখেছে আমি দেশদ্রোহী (আজকের ভারতে সত্যিকার দেশপ্রেমীদেরই দেশদ্রোহী আখ্যা পেতে হয়), এটাকে আমি বর্তমান ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসাবেই দেখছি। সাহসের কাজ, প্রশংসার দাবি রাখে।

বক্তব্যের কনটেন্ট যেমন ইমরান ধন্যবাদ যোগ্য কিনা তা নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে। আমার মত অন্য হলে তোমার পোস্টের নিচে নিজের মতটাও যুক্তি দিয়ে লিখব, তর্কে এনগেজ করব - এগুলো সবই স্বাস্থ্যকর, সভ্য সমাজে হয়ে থাকে, যতক্ষণ না গালাগাল শুরু হয় বা আরও বেশি, থ্রেট এবং শারীরিক আক্রমণ , ক্ষতি করার চেষ্টা ইঃ।
আমার আশা যে তোমার ফেবু 'বন্ধু'-রা এখনও সভ্য সমাজের ডেকোরাম মেনে চলছে
Avatar: aranya

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

দু, আমার জ্ঞান সবই মূলধারার মিডিয়া থেকে। অভিনন্দন-কে ছেড়ে দেওয়ার আগের কদিন আগে ইউরোপের কিছু দেশ এবং আমেরিকার চাপের কথা কাগজেই পড়েছিলাম। মুক্তি দেওয়ার একদিন আগে ট্রাম্প একটা কমেন্ট করেছিলেন - ভারত-পাকিস্তান কনফ্লিক্টের ব্যাপারে -একটা সুখবর আসছে।

ইমরান প্রধান মন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার আগে অবদি, তিনি ও তার দল অনেক মৌলবাদী মন্তব্য করেছেন, মৌলবাদী দল বা প্রতিস্ঠান-দের সাথে হাত মিলিয়ে চলেছেন। হতে পারে সে সবই নির্বাচনী কৌশল, ইমরান আসলে খুবই মুক্তমনা মানুষ, খুশী হব তাহলে, সময়ই তার প্রমাণ দেবে।

'পুলাওয়ামা র ঘটনার পর ইমরান যা বলেছিলেন তার মধ্যে ছিল "জানি, ভারতে নির্বাচন আসছে" বলে একটা জায়গা ছিল' - ফরিদা উবাচ।

- এটা , আমার স্মৃতি যা বলে, পুলওয়ামার ঘটনার পর নয়, বালাকোটে পাইন / কাক ইঃ র ওপর ভারতের বম্বিং-এর পর।

পুলওয়ামা এবং বালাকোট - এই দুয়ের মাঝে ইমরান পুলওয়ামাতে ৪৯ জন ভারতীয় জওয়ান-এর খুন হওয়া নিয়ে কোন দুঃখপ্রকাশ করেন নি।

Avatar: lcm

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

২০১৫ সালে এই দিল্লির লোকেরাই আম-আদমি-পার্টি কে বিপুল ভোট (৫৪%) দিয়েছে -- আপ ৬৭ সিট - বিজেপি ৩ সিট ।
দিল্লির লোকেরা রাজনৈতিক বোধবুদ্ধিহীন অসহ্য খাজা টাইপের - এরকম ভাবার বিশেষ কারণ এখনও হয় নি। ২০২০-তে দেখো কি হয়।
Avatar: Atoz

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

আম আদমি পার্টি র মতন আরো কয়েক ডজন পার্টি যদি উঠে আসতো উত্তরে দক্ষিণে পূর্বে পশ্চিমে ---খুব ভালো হত।
Avatar: S

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

ইমরান খানের অনেক দোষ মানলাম। উনিই গুড তালিবান, ব্যাড তালিবানের গপ্প দিয়েছিলেন। ইত্যাদি।

কিন্তু এক্ষেত্রে অন্তত ওঁর ভুমিকা এবং কাজ সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। পাকিস্তান পার্লামেন্টে উনার স্পীচটা আমার দারুন লেগেছে। শেষে যখন ক্যাজুয়ালি বললেন যে ও হ্যাঁ ইন্ডিয়ার পাইলটকে কাল ছেড়ে দেবো তখন পুরো পার্লামেন্ট অভিনন্দন জানিয়েছিলো। এমনকি পুরো সোশাল মিডিয়া জুড়ে পাইলটকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য পাকিস্তানিরা যে প্রেশার তৈরী করেছিলো, সেটা দেখে অনেক আশা জাগে। পাকিস্তানি মিডিয়ার থেকেও শেখা উচিত অর্নব অ্যান্ড গ্যাঙ্গের।

আমি শুধু ভাবি যে অন্যদিকেও যদি মোদির মতন পাবলিক পিএম হতো আর তারও যদি সামনে ইলেক্শান থাকতো, তাহলে কি হতো?
Avatar: aranya

Re: জনসন্ত্রাসের রাজধানী

পার্লামেন্টে ইমরান-এর স্পীচ আমারও ভাল লেগেছে। তবে সেটা কতটা আন্তরিক, কতটা কৌশল তা সময়ই বলবে

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3] [4] [5] [6] [7]   এই পাতায় আছে 105 -- 124


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন