বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

দেবাশিস্‌ ভট্টাচার্য

প্রেক্ষাপট



একটি অসাধারণ ইংরিজি বাক্য আন্তর্জাল-পরিসরে প্রায়শই ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়, যার বাংলা তর্জমা মোটামুটি এই রকম হতে পারে - ‘ধর্ম হল অজ্ঞ জনসাধারণের কাছে পরমসত্য, জ্ঞানী পণ্ডিতের কাছে মিথ্যা কুসংস্কার, আর শাসকের কাছে শাসনের জবরদস্ত হাতিয়ার’। আজকের দিনের ভারতের রাষ্ট্র ও রাজনীতির রকমসকম যিনি লক্ষ করেছেন, তাঁকে নিশ্চয়ই কথাটার অর্থ আর বলে বোঝাতে হবে না। গুজব আছে, কথাটা নাকি বলেছিলেন প্রাচীন রোমান আইনজ্ঞ সেনেকা, কিম্বা হয়ত কবি-দার্শনিক লুক্রেশিয়াস, যদিও তাঁরা যে ওটা কোথায় বলেছিলেন সে আর কেউ বলতে পারে না। কেউ কেউ খোঁজখবর করে দেখেছেন, ও রকম একটা বাক্য আসলে আছে অষ্টাদশ শতকের ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গিবন-এর ‘দ্য হিস্ট্রি অফ দ্য ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অফ দ্য রোমান এম্পায়ার’ নামক পৃথুল গ্রন্থে, যদিও সেটা রোমান সমাজের ধর্ম প্রসঙ্গেই বলা। তো, কথাটা যেখান থেকেই আসুক না কেন, ধর্ম বিষয়ে ওর চেয়ে সত্যি কথা বোধহয় খুব কমই আছে। মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যসিদ্ধির ব্যাপারে ধর্মের কার্যকারিতার কথা প্রাক-খ্রিস্টীয় ভারতের ‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’ থেকে শুরু করে পঞ্চদশ শতকীয় ইউরোপের রাজনীতিতাত্ত্বিক মাখিয়াভেল্লির ‘দ্য প্রিন্স’ পর্যন্ত অনেক গ্রন্থেই উচ্চারিত হয়েছে। প্রতারণা, হিংস্রতা, ঘৃণা আর গুরুগম্ভীর মিথ্যাকে সম্বল করে মানুষকে বশ্যতা স্বীকার করানোর জন্য ধর্মের চেয়ে ভাল হাতিয়ার পাওয়া মুশকিল। যদিও উন্নত দেশগুলোতে ধর্ম আজ নিশ্চিতভাবেই পিছু হঠছে, কিন্তু গরিব দেশগুলোতে ধর্ম আজও জড়িয়ে রয়েছে সমাজ-রাজনীতি-প্রশাসন-সংস্কৃতির অলিতে গলিতে। আমাদের দেশের রাষ্ট্র ও সমাজের জাতীয় স্তরে যখন চলছে আশারাম-রামদেব-রামরহিমের মত ধর্মীয় রাঘব-বোয়ালদের খেলা, তখন শহরে ও গ্রামে বাবাজি-মাতাজি-তান্ত্রিক-ওঝা-গুণিন-জ্যোতিষীদের হাতে প্রতিদিনই লুণ্ঠিত হচ্ছে অসহায় বিশ্বাসী মানুষের সম্পদ, সম্মান ও নিরাপত্তা। খুব বড়সড় অপরাধ না হলে বিশ্বাসী ভক্তরা এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে চান না, জানালেও পুলিশ-প্রশাসন এদের প্রশ্রয় দেয়, বা যে সমস্ত বিরল ক্ষেত্রে তারা ব্যবস্থা নিতে চায় সে সব ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রচলিত আইন-ব্যবস্থার অপ্রতুলতা। ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে নতুন আইন তৈরির দাবি ওঠে সেই প্রেক্ষিতেই। এ ধরনের আইন প্রণয়নের জন্য ১৯৯৫ সাল থেকে চেষ্টা করতে করতে ধর্মীয় বুজরুকদের হাতে শেষ পর্যন্ত নিহত হয়ে গেলেন মহারাষ্ট্রের যুক্তিবাদী আন্দোলনের অগ্রণী সংগঠক নরে৩ন্দ্র দাভোলকর। তবে, ২০১৩ সালে নিহত হবার কয়েক মাসের মধ্যেই জনমতের চাপে আইনটিকে অর্ডিন্যান্স হিসেবে পাশ করতে বাধ্য হয় মহারাষ্ট্রের সরকার, পরে ওই রাজ্যের বিধানসভাও তা অনুমোদন করে।

নিষ্ক্রিয়তার কয়েকটি অজুহাত



এই ব্যাপারে নতুন আইন তৈরির দাবিকে প্রায়শই নিরুৎসাহিত করা হয় কয়েকটি প্রশ্ন তুলে। এবং, আশ্চর্যের বিষয়, প্রায়শই এই প্রশ্নগুলো তোলেন এমন মানুষেরা, যাঁরা এ দাবির পেছনের বাস্তব সমস্যাটিকে স্বীকার করেন, বা অন্তত স্বীকার করার ভান করেন। এখানে এ রকম প্রশ্নের সবচেয়ে পরিচিত তিনটি নমুনা তুলে ধরে সেগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা যাক। প্রথম প্রশ্ন - ‘নতুন আর একটা আইন করে কীই বা ছাই হবে? বে-আইনি কাজকর্ম তো কতই হচ্ছে, দোষীরা ধরা পড়ছে কোথায়? ধর্মীয় রাঘব-বোয়ালরা সব প্রভাবশালী লোক, আইন হলেও কি আদৌ তাদের শাস্তি হবে?’ হ্যাঁ, সন্দেহ নেই, আইন হলেই যে দোষীরা সব আপনা থেকে জেলে ঢুকে গিয়ে ধর্মীয় প্রতারণা ও নিপীড়ন সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে, এমন কোনও সম্ভাবনাই নেই। কিন্তু, সেভাবে ভাবলে তো খুন-ধর্ষণ-ডাকাতি-জালিয়াতি কোনও কিছুর বিরুদ্ধেই আইনের দরকার নেই, যেহেতু এই প্রত্যেকটা অপরাধই অহরহ ঘটে চলেছে, এবং অপরাধীরা মোটেই সব সময় ধরা পড়ছে না। আসলে, আইনের প্রয়োগ হোক বা না-ই হোক, আইনটি চালু হওয়ার অর্থ হল, রাষ্ট্র অন্তত নীতিগতভাবে স্বীকার করছে যে এ ধরনের কাজগুলো অন্যায়। সেটাই তো সাফল্যের প্রথম ধাপ! দ্বিতীয় প্রশ্ন - ‘একটা আইন তৈরির চেয়ে মাঠে নেমে জোরদার আন্দোলন কি অনেক বেশি কাজের নয়? আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি হলে, এবং সাধারণ মানুষ সচেতন হলে, তবেই তো এ সব কুকর্ম বন্ধ হওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হবে!’ হ্যাঁ, আন্দোলন না হলে নিছক একটা আইন সৃষ্টি করে বিশেষ লাভ হবে না, এটা অতি সত্যি কথা। কিন্তু, এই সত্যি কথাটাকে এ ভাবে হাজির করার মধ্যে রয়েছে একটি লুকোনো কুযুক্তি। সেটা হচ্ছে, আইন ও আন্দোলনকে মনে মনে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী বিকল্প ধরে নিয়ে তাদের কার্যকারিতার তুলনা করতে যাওয়া, যেন দুটো একসাথে হতে কোনও ভয়ঙ্কর নিষেধ আছে। আসলে, এরা মোটেই বিকল্প নয়, বরঞ্চ পরিপূরক। ঠিকঠাক আইন হলে আন্দোলনের দাবিগুলো সুনির্দিষ্ট অর্থ ও আকার পাবে, সরকারের ওপর বাড়বে চাপ। আর, উল্টোদিকে, জোরাল আন্দোলন থাকলে আইনটা বইয়ের পাতায় বন্দী হয়ে থাকবে না, তার বাস্তব প্রয়োগ হবে। যুক্তিবাদী আন্দোলনের কর্মীরা কাজ করতে গিয়ে প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেছেন এ সমস্যার দুটো দিকই। তাঁরা যেমন ইচ্ছুক ও সচেতন পুলিশ অফিসারকে দেখেছেন ধর্মীয় বুজরুকির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রশ্নে জোরাল আইনের অভাব নিয়ে খেদ প্রকাশ করতে, তেমনি দেখেছেন ‘ড্রাগ্‌স্‌ অ্যান্ড ম্যাজিক রিমেডিজ অ্যাক্ট ১৯৫৪’ জাতীয় আইনকে ধারাবাহিক আন্দোলনের ফলে বিস্মৃতির অতল থেকে আবার বাস্তব প্রয়োগের জগতে ভেসে উঠতে।

তবে, এর চেয়ে আরেকটু বিবেচনাসাপেক্ষ তৃতীয় ও শেষ প্রশ্নটি। সেটা অনেকটা এই রকম - ‘নতুন আইন আদৌ লাগবে কেন, যখন এই সমস্ত অপরাধীদের প্রচলিত আইনেই শাস্তি দেওয়া সম্ভব?’ বলা দরকার, এ প্রশ্নে কিঞ্চিত গোলমাল আছে। এখানে কুসংস্কার-বিরোধী আইনকে পশ্চিমবঙ্গে (বা কেন্দ্রীয়ভাবে) প্রচলিত কোন নির্দিষ্ট আইনটি বা আইনগুলোর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে? এরকম তুলনা করার মত আইন আদৌ ছিল নাকি, থাকলে আর নতুন আইনের কথা উঠবে কেন? আর, যদি কেউ এ কথা বলতে চেয়ে থাকেন যে, বর্তমান ভারতীয় দণ্ডবিধি ও অন্যান্য নানা চালু আইন দিয়েই (যেমন ম্যাজিক রেমেডিজ অ্যাক্ট) কাজ চলবে, তাহলে তাঁকে আগে প্রচলিত আইনগুলোর বিষয়ে একটু ভাল করে জেনে নিতে অনুরোধ করব । এ নিয়ে আমি পত্রপত্রিকায় লিখেছি, সভা-সমিতিতে বলেছি, তাছাড়া, ২০১৬ সালে একটি আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-গবেষকদের সভাতেও এক সংক্ষিপ্ত লিখিত প্রস্তাব দিয়ে এসেছি। এই সব লেখা ও প্রস্তাব কেউ চাইলেই পেতে পারেন । এখানে আমার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করব। তবে, এই প্রশ্নটির জবাব অল্প দু-কথায় হবে না, একটু বিস্তারে যেতে হবে। আর তারও আগে জানতে হবে, ওই ধরনের কী কী আইনের অস্তিত্ব ইতিমধ্যেই আছে।

চালু আইনে সমস্যাটা কোথায়



প্রচলিত আইনে ধর্মীয় বা কুসংস্কারভিত্তিক অপরাধের বিরুদ্ধে হাতিয়ার একেবারেই নেই এমন নয়, যদিও তা হাতেগোনা, এবং যেটুকু আছে তার সীমাবদ্ধতাও খুবই প্রকট। মুশকিল হচ্ছে, এই আইনগুলো বানানো হয়েছে সাধারণ অপরাধের কথা মাথায় রেখেই, ফলে কোনও বিশেষ ধর্মীয় বা কুসংস্কারভিত্তিক অপরাধের বিরুদ্ধে সেগুলোকে প্রয়োগ করতে গেলে সেই বিশেষ অপরাধের ক্ষেত্রে এই সাধারণ আইনগুলো ভাঙা হয়েছে কিনা সেটা দেখতে হয়। যেমন, খুন, ধর্ষণ ও আর্থিক-প্রতারণা হল প্রচলিত আইনের (এ ক্ষেত্রে ভারতীয় দণ্ডবিধি বা ‘আই পি সি’) যথাক্রমে ৩০২, ৩৭৬ ও ৪২০ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এখন, কোনও একটি বিশেষ ঘটনার ক্ষেত্রে অপরাধী যদি এগুলো করে থাকে, তো তাকে এইসব ধারায় অভিযুক্ত করা যাবে। কিন্তু, সব সময় ব্যাপারটা অত সহজ হয় না। চালু আইনে ধর্ম বা কুসংস্কার সংক্রান্ত অত্যাচার বা প্রতারণা এসব নিয়ে কোনও কথাই নেই, সাধারণভাবে অত্যাচার বা প্রতারণা সংক্রান্ত ধারা আছে। একে তো এইসব ক্ষেত্রে পুলিশ কিছু করতেই চায় না, আর তার ওপর যদি বা কোনও সচেতন পুলিশ অফিসার ব্যবস্থা নিতে আগ্রহীও হন, তো তাঁকে ওইসব ধারায় কীভাবে কেসটাকে ফেলতে হবে সে নিয়ে অনেক ফিকির বার করতে হয়। যেমন, ওঝা যদি ভূত ঝাড়ায়, তো তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে পুলিশকে দেখতে হবে যে সে টাকা নিয়েছিল কিনা (সে ক্ষেত্রে ৪২০ ধারা চলবে) বা মারধোর করেছে কিনা (সেক্ষেত্রে হয়ত ৩২৩ ধারা দেওয়া যাবে)। কারণ, 'ভূত ছাড়ানো' ব্যাপারটাতে তো আর এমনিতে কোনও আইনি বাধা নেই! ফলে, টাকা নেওয়া বা মারধোর সেভাবে প্রমাণ না করা গেলে সেই ওঝা আইনের হাতের বাইরেই থেকে যাবে। প্রচলিত আইনের এই সীমাবদ্ধতার কারণে, এমন আইন চাই যাতে কুসংস্কারমূলক কাজগুলোকেই বিশেষভাবে বে-আইনি হিসেবে সংজ্ঞা দেওয়া হবে, শুধুমাত্র কুসংস্কারের মধ্যে দিয়ে ঘটা সাধারণ অপরাধগুলোকে নয় । মহারাষ্ট্রের যুক্তিবাদী আন্দোলনের নেতা নরেন্দ্র দাভোলকর তাঁর নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে যে আইনটি তৈরি করতে সরকারকে বাধ্য করে গেলেন ২০১৩ সালে, সেই আইনটি ঠিক এই কাজটাই করেছে।

কিন্তু শুধু এটুকুই যথেষ্ট নয়। আসলে, মহারাষ্ট্রে যেমন একটিমাত্র কুসংস্কার-বিরোধী আইন পাশ হল (কর্ণাটকেও বোধহয় তোড়জোড় চলছে), সে রকম বিশেষ বিশেষ আইন চাই তো বটেই, সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য আইনেও যুগোপযোগী সংস্কার চাই, না হলে ভাল কাজ হবে না । প্রতারণা ও ধর্ষণের সংজ্ঞাকে ধর্ম ও কুসংস্কারের ক্ষেত্রে প্রসারিত করা প্রয়োজন, যা করতে গেলে মৌলিক সংস্কার সাধন করতে হবে ‘ইন্ডিয়ান পেনাল কোড’ (সংক্ষেপে আই পি সি) বা ভারতীয় দণ্ডবিধিতে। তাছাড়া, সংশোধন করা দরকার ধর্মীয় ভাবাবেগ আঘাত সংক্রান্ত আইনগুলোও। আর সংস্কার প্রয়োজন মেডিক্যাল আইনে, অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার জন্য। এ নিয়ে পরে আরেকটু বলা যাবে।

এ ধরনের কিছু নতুন আইন



ওপরে বলেছি, মহারাষ্ট্রে ২০১৩ সালে এ রকম একটি আইন হয়েছে, কাছাকাছি আইন বানাবার তোড়জোড় চলছে কর্নাটকেও। এই বাংলাতেও কুসংস্কারবিরোধী আন্দোলনের কিছু অগ্রণী কর্মী এ ধরনের একটি আইনের খসড়া পেশ করেছেন এ রাজ্যের আইন কমিশনের কাছে, যদিও তার পরিণতি এখনও আমরা জানি না। এই ধরনের আইনগুলোতে তন্ত্রমন্ত্র তুকতাক ইত্যাদির সাহায্যে কারুকে কিছু সুবিধে করে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বা ক্ষতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন সংসর্গ, জড়িবুটি চিকিৎসা এইসব কীর্তিকলাপকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এবং এইসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে জেল ও জরিমানার ব্যবস্থা থাকছে। তা ছাড়া, এই আইনকে প্রয়োগ করার পরিকাঠামোটি ঠিক কেমন হবে, সে ব্যাপারেও সরকারকে নির্দিষ্ট রূপরেখা দেওয়া থাকে ওই আইনের ভেতরেই।

এ ছাড়া এ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে আছে ডাইনি-শিকারের বিরোধী আইন, অর্থাৎ, কোনও ব্যক্তিবিশেষকে এলাকার মাতব্বররা ‘ডাইনি’ বলে ঘোষণা করে তার ওপর নির্যাতন চালাচ্ছেন ও একঘরে করছেন - এ ধরনের ক্রিয়াকলাপের বিরুদ্ধে আইন। এ আইনকেও কুসংস্কারবিরোধী আইন বলা যেতে পারে। এ ধরনের আইন ওড়িশা, বিহার, ছত্তিশগড় ও আসামে আছে। আইন-গবেষকরা নাকি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছেও এ ধরনের একটি আইনের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন বলে শুনেছি।

চালু আইনের আরও কয়েকটি দিক



বর্তমানে যে আইন-ব্যবস্থা চালু আছে, তাতে আই পি সি বা ভারতীয় দণ্ডবিধি ছাড়াও কিছু আইন আছে যারা এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বলে গণ্য হতে পারে। ওপরে বলেছিলাম, সে সব আইন নিয়েও একটু বলব, এইবারে সে নিয়ে কথা বলা যাক। প্রথমে ধরা যাক ‘মেডিক্যাল’ বা চিকিৎসা-সংক্রান্ত আইনের কথা। ‘ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, আইনিভাবে নথিভুক্ত একজন চিকিৎসাবিজ্ঞান-স্নাতক ছাড়া আর কেউই কোনও রুগির চিকিৎসা করতে পারেন না। ‘ড্রাগ্‌স্‌ অ্যান্ড কসমেটিক্স অ্যাক্ট, ১৯৪৫’ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কতকগুলো গ্রন্থ বা নথিপত্রে উল্লিখিত কিছু ওষুধপত্র ছাড়া আর কোনও কিছুকেই ‘ওষুধ’ বলে বিক্রি বা প্রয়োগ করা যায় না, এবং হাঁপানি, টাক, যৌন-অক্ষমতা ইত্যাদি রোগ সারিয়ে দেবার দাবিও করা যায় না। আর, ‘ড্রাগ্‌স্‌ অ্যান্ড ম্যাজিক রেমেডিজ (অবজেকশনেব্‌ল্‌ অ্যাডভার্টাইজমেন্ট) অ্যাক্ট, ১৯৫৪’ অনুযায়ী, তন্ত্রমন্ত্র জড়িবুটি এইসব দিয়ে রোগ সারাবার দাবি করে প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন করা যায় না। কাজেই, বোঝা যাচ্ছে যে, এই সব আইনগুলো দিয়ে তন্ত্রমন্ত্র তুকতাক সহযোগে ভুয়ো চিকিৎসা খানিকটা আটকানো সম্ভব। কিন্তু, কুসংস্কার-নির্ভর প্রতারণা রোধে এই সব আইনের সীমাবদ্ধতাও ততোধিক। প্রথমত, এ দিয়ে শুধু চিকিৎসা-সংক্রান্ত বুজরুকিই আটকানো যাবে, অন্য বুজরুকি নয়। কেউ তুকতাক করে মামলা জিতিয়ে দেবে এমন আশ্বাস দিলে এ সব আইন আর প্রাসঙ্গিক থাকবে না। তার ওপর, বুজরুকটি যদি আদালতে এসে বলে, সে মোটেই চিকিৎসা করছিল না, সে শুধু অলৌকিক কোনও শক্তির কাছে রোগির ভালর জন্য প্রার্থনা করছিল, তাতেও সে সহজেই আইনের হাত এড়িয়ে পালাতে পারবে। আর সর্বোপরি, আমাদের আইন আধুনিক বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা-ব্যবস্থাকেও অনুমোদন দেয় (আয়ুর্বেদ হোমিওপ্যাথি হেকিমি সিদ্ধা ইত্যাদি), কাজেই বিজ্ঞান-অবিজ্ঞানের সীমারেখা সেখানে যারপরনাই পাতলা।

যুক্তিবাদী মানসিকতা প্রসারের পথে আরেকটি বাধা হল ‘ধর্মীয় ভাবাবেগ’ রক্ষাকারী দুই আইন - ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৮ ও ২৯৫এ ধারা। প্রথমটি ব্যক্তি ও দ্বিতীয়টি গোষ্ঠীর ‘ধর্মীয় ভাবাবেগ’ রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। এ ধরনের আইনের একেবারেই দরকার নেই, এমন নয়। ধর্মীয় বিদ্বেষ-ঘৃণা-হিংস্রতার অবাধ প্রচার আটকানোর জন্য এ ধরনের আইনের অবশ্যই দরকার আছে। কিন্তু এই আইনগুলোকে প্রায়শই ব্যবহার করা হচ্ছে মৌলবাদী দেশগুলোতে চালু ‘ব্ল্যাসফেমি’ আইনের কায়দায়, ধর্মের সমালোচনাকে আটকাতে। এই ধরনের অপব্যবহার আটকাবার জন্য এই আইনের ভেতরেই ধর্মের শৈল্পিক, যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী সমালোচনার সুরক্ষার বন্দোবস্ত করা প্রয়োজন, যে ধরনের সুরক্ষার বন্দোবস্ত রয়েছে অশ্লীলতা-বিরোধী ২৯২ ধারার মধ্যে।

এই আইনগুলোকে সমর্থন জোগানোর জন্য কিছু পরিবর্তন হয়ত প্রয়োজন ভারতীয় দণ্ডবিধিতেও। যেমন, ধর্মীয় ভয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে কোনও মহিলাকে যৌন-সংসর্গে লিপ্ত করানোকে ‘ক্রিমিন্যাল ফোর্স’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা প্রয়োজন, যাতে এই ধরনের যৌন-সংসর্গ আদালতের কাছে ধর্ষণ বলে সাব্যস্ত হতে পারে।

আর, সেই সঙ্গে আনা উচিত আরও দুয়েকটি বিশেষ আইন, যাতে সুরক্ষিত করা হবে সংবিধান-উল্লিখিত ধর্মনিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক মূল্যবোধকে, সুরক্ষা ও সমর্থন জোগানো হবে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকারদের, বিশেষত মহিলা শিশু ও নিম্নবর্গের মানুষদের।

পরিবর্তন প্রয়োজন শিক্ষাক্ষেত্রেও। আইন হওয়া উচিত, যাতে প্রথম থেকেই শিশুরা দীক্ষিত হতে পারে বিজ্ঞান ও মানবতার শিক্ষায়, তফাত করতে শেখে সত্য আর মিথ্যের, ইতিহাস ও পুরাণের।

উপসংহার



দাবি আমাদের অনেক, প্রত্যাশা আর স্বপ্নও তো অনেকই। আর, ঠিক ততটাই কঠোর হচ্ছে আমাদের দেশের বাস্তবতা। এ সব দাবি পূরণের থেকে আমরা এখনও বহু দূরে। তবু, দাবিটা তো উঠুক কম সে কম। মানুষ তো অন্তত জানুন, এগুলোও চাইবার ছিল। এটা তো ঠিকই যে, পরাক্রান্ত সব মিথ্যেই একদিন ইতিহাসের কাছে তামাদি হয়ে যায়, “শিশুপাঠ্য কাহিনিতে থাকে মুখ ঢাকি”। পড়ে থাকে, বেঁচে থাকে শুধু সত্যের একান্ত নির্যাসটুকু। এক্ষেত্রেও যে একদিন তাইই হবে তাতে সন্দেহ নেই। এ তো শুধু কিছু ধর্মীয় অপরাধীকে জেলে পোরার ব্যাপার নয়, কিছু নিপীড়িতকে নিছক স্বস্তি ও সুবিচার দেওয়ার প্রশ্নও নয়। এ লড়াই আসলে উৎসারিত হচ্ছে সত্য ও ন্যায়ের জন্য মানুষের চিরকালীন আকাঙ্ক্ষা থেকে, আমাদের অস্তিত্ব ও ইতিহাসের সেরা অর্জনগুলোর থেকে, আমাদের সংবিধানের সারবস্তুর সেরা অংশটি থেকে।

সঠিক দাবিগুলো কে করছে তাতে কিচ্ছুই যায় আসে না। তার কিছু নিজস্ব নৈর্ব্যক্তিক শক্তি থাকে, জানেন তো?



2079 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮ 
শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3] [4] [5] [6]   এই পাতায় আছে 21 -- 40
Avatar: স্বাতী রায়

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

বাংলার থেকে কুসংস্কার বিরোধী আইনের যে খসড়াটি গেছে তার সম্বন্ধে জানব কোথা থেকে?

Avatar: Debasis Bhattacharya

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

sm, আমি আপনাকে মাফ করিলাম, কারণ আপনি কী বলিতেছেন আপনি জানেন না ।

'বিবৃতি' ও তাহার 'প্রমাণ' যে এক বস্তু নহে, বিজ্ঞান-বিষয়ক মন্তব্য করিবার সময়ে আপনাকে তাহা স্মরণে রাখিতে সনির্ব্বন্ধ অনুরোধ করি । প্রমাণ-রহিত গুচ্ছ গুচ্ছ আখাম্বা বিবৃতি বিজ্ঞানের চক্ষে অতি কটু দৃশ্য বলিয়া গণ্য হইয়া থাকে ।

এবং, এই যে নিরূপায় হইয়া আমাকে আজ যুক্তিবাদী যিশু সাজিতে হইল, ইহার জন্য আপনিও আমাকে নিজগুণে মাফ করিবেন ।
Avatar: Debasis Bhattacharya

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

সিকি, আমি জানি যে আমাকে বলেন নি । আপনার কথার খেই ধরে আমার বাক্যপূরণটি বিশুদ্ধ ইয়ার্কি, কিছু মনে করবেন না ।
Avatar: Debasis Bhattacharya

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

স্বাতী রায়, খসড়াটি বানাতে যিনি মূল উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাঁর নাম ও ফোন নম্বর আপনাকে দিয়ে দিতে পারি । এ ছাড়া, আমার কাছেও আইন-প্রস্তাবটি পিডিএফ আকারে আছে, আপনার ইমেল আইডি পেলে মেল করতে পারি । আবার, যদি ফেসবুকে থাকেন, তো আমাকে ইনবক্সে ডাকলে সেখানেও দিয়ে দিতে পারি । কোনটা আপনার পক্ষে সুবিধে, বলুন ।
Avatar: sm

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

দেবাশিস ,কোন বিবৃতি ,প্রমান রহিত সেটা খুলে বলুন। নয়তো ভাববো, আপনি বিজ্ঞানের লোক নন বা অনধিকার চর্চা করছেন।
আমার দৃঢ় ধারণা, চিকিৎসা বিদ্যা সংক্রান্ত বিষয়ে আপনি একজন নাইভ।
Avatar: Debasis Bhattacharya

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

আমি সব বিষয়েই নাইভ, শুধু চিকিৎসা কেন । আমি যেসব নিয়ে কথা বলে থাকি, যেমন বিজ্ঞান সমাজ আইন দর্শন, এগুলো নিয়ে কথা বলতে গেলে নাইভ হওয়া বাধ্যতামূলক, কারণ অতগুলো বিষয়ে কেউই একসাথে এক্সপার্ট হতে পারে না (আমি একটাতেও নই) । তবে কিনা, 'নাইভ'-রাও সত্যি বলতে পারে, যদি যুক্তিটা ঠিক থাকে । যুক্তির তো ওটাই সুবিধে । যুক্তিটা ঠিকঠাক রাখতে পারলে 'অনধিকার চর্চা' বলে কিছু হয় না ।
Avatar: দোবেড়ের চ্যাং

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

সেই কে যেন কয়েছিল- আপন বিশ্বাসের পক্ষে অজুহাতকেই যুক্তি বলা হয়।
Avatar: Atoz

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

মাখিয়াভেল্লি শুনে মনে হল-
"ওরে মাখিয়াভেল্লি / তুই তো মাখিয়া ফেল্লি! " ঃ-)
Avatar: Atoz

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

হোমিওপ্যাথি কলেজ আছে এত, ডাক্তারি পাশ করে বেরোন অনেকে সেসব কলেজ থেকে, রীতিমতন ডিসপেন্সারি খুলে ডাক্তারি করতে শুরু করেন। কারুর কারুর ভালো পশার।
তো, বিরোধিতা যারা করছেন, তাঁরা যদি সরাসরি হোমিওপ্যাথি কলেজগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেন, হোমিওপ্যাথি ডাক্তারদের সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে ডাক্তারি বন্ধ করাতে উদ্যোগ নেন --- ব্যাপারটা কেমন হবে বলে মনে হয়?
ঃ-)
Avatar: sm

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

তো, দেবাশিস,আজে বাজে না বকে,আমার পোস্টে বিজ্ঞান বিষয়ক কি কি বিবৃতি পেয়েছেন, যেটা আপনার মনে হয়েছে প্রমান করা যাবে না বলে ফেলুন। আমি একে একে প্রমান দেবার চেষ্টা করবো।
তার পর আপনি,যুক্তিবাদী যীশু না শিশু সেটা ফয়সালা হবে খন।
Avatar: খ

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

ওভার অল এই প্রস্তাব ও আলোচনা র কোয়ালিটি অন্য অনেক আলোচনা র থেকে অনেক ভালো হয়েছে। রাগারাগি টা সম্পূর্ণ আ্যভয়ডেবল।
Avatar: sm

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

আরে রাগারাগির কি আছে?বিবৃতি ও প্রমান নিয়ে পোস্ট পড়েছে,তাই জানতে চাইছি।
দেবাশীষ এর পোস্ট পড়ে মনে হয় একজন পাকা ব্লগার।
তা, তিনি বিটিং এরাউন্ড দ্য বুশ না করে প্রপার উত্তর দিক না কেন?
এখানে তো প্রচুর অযৌক্তিক কথা চলছে।কেউ হোমিওপ্যাথি ওষুধ খাওয়ালে, উনি এফ আই আর করবেন।তা, আমি জিগালাম দেবাশীষ কি শিশু যে ওনাকে জোর করে বাইকেমিক খাওয়াবে?
তা,উত্তরে বললেন উনি নাকি যুক্তিবাদী যীশু!
Avatar: PT

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

"যদি দুই ব্যক্তি পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তি তে ম্যাজিক রেমেডি নিতে চায়, তাতেও আপত্তির কিছু নেই।"
এটা একটি লক্ষণরেখা ছ্ড়ানো উক্তি।আশা করি ম্যাজিক রিমেডি আর হোমিওপ্যাথি এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয়নি।

"আর মানুষের ক্ষতি?সেতো বিজ্ঞান যা করেছে, অতো ক্ষতি করার ক্ষমতা আর কারো নেই।"
এই উক্তিটি একেবারের এলেবেলে। বিজ্ঞান ক্ষতি করেনা। বিজ্ঞানের অপব্যবহার করে অন্যের ক্ষতি করে ক্ষমতাশালী মানুষ।
Avatar: sm

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

পরমাণু অস্ত্র,বন্দুক, নার্ভ গ্যাস, দূষণ এগুলো বিজ্ঞানের দান নয় বলছেন?এতে কোটি কোটি মানুষ মারা যায় নি বলছেন?
বিজ্ঞান মানুষের ই সৃষ্টি। এর অপব্যবহার ও মানুষ ই করেছে ও করবে।ধর্ম ও মানুষের সৃষ্টি। এর অপব্যবহার ও মানুষই করে। একটাকে নিষিদ্ধ করার দাবী উঠলে আর একটা নয় কেন?
দুই, এখানে হোমিওপ্যাথি ও ম্যাজিক রেমেডি এক নিঃশ্বাসে লেখক ই উল্লেখ করেছেন। উনি এফ আই আর এর কথাও উল্লেখ করেছেন।
পারস্পরিক বোঝাপড়া আমার উক্তি।আমার যদি মনে হয় হাঁটুর ব্যথার জন্য ডাক্তারের কাছে না গিয়ে মন্দিরের পুরোহিতের ঝাড়ণ এর হওয়া খাবো, সেটা সম্পূর্ন আমার ডিসিশন।
Avatar: amit

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

যথারীতি আলুচোনা জিজিতে গেছে আবার। সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে :) :) ।
Avatar: PT

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

"পরমাণু অস্ত্র,বন্দুক, নার্ভ গ্যাস, দূষণ এগুলো বিজ্ঞানের দান নয় বলছেন"
পরমাণুর শক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক। তার জন্য বিজ্ঞান দায়ী নয়। উল্টো উদাহরণ আছে। DNA-এর সঙ্গে সালফার মাস্টার্ডের বিক্রিয়া অনুসরণ/অনুকরণ করে ক্লোরাম্বুসিল ওষুধের আবিষ্কারের রাস্তা তৈরি হয়।

দূষণ সৃষ্টি এবং রোধ দুটোর-ই দায় মানুষেরঃ
In 2015, Oslo announced a plan to ban all cars from its city center by 2019.....Instead of kicking out cars, Oslo's council said in June 2017 that it will just make it harder for them to get there by ban parking spaces. A few months earlier, Norway also confirmed that it will phase out diesel and gas-powered cars nationwide by 2025.

প্যারাসিটামলে জ্বর সারায় কিন্তু সেটা গিলে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত একান্তই নির্বোধ ছাগলদের।
Paracetamol overdoses are a common method of suicide and a frequent cause of liver damage.

"হাঁটুর ব্যথার জন্য ডাক্তারের কাছে না গিয়ে মন্দিরের পুরোহিতের ঝাড়ণ এর হওয়া খাবো....."
নাঃ, তাহলে এই অবস্থান ঠেলতে ঠেলতে ঝাড়-ফুঁক, ওঝা, ডাইনি সব কিছু চলে আসবে। তার পরে পুত্র সন্তান লাভের জন্যে মেয়েদের যা খুশী খাওয়ানো জায়েজ হতে থাকবে....ইত্যাদি, ইত্যাদি। তবে যে অসুখ আর সারবে না তার জন্যে ঝারণ, মারণ, উচাটন, বাণ, জ্যোতিষ সব কিছুই মানসিক আশ্রয় দিতে পারে।
Avatar: sm

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

আপনি তো বেসিক প্রশ্নের উত্তর দিলেন না? ধর্মের বিষফল ও বিজ্ঞানের বিষ ফল দুটোর জন্যই যদি কিছু মানুষ দায়ী হয়, তবে একটাকে নিষিদ্ধ করার দাবি কেন?
দুই, ক্লোরাম বুসিল তথা আগের যুগের কেমোথেরাপি কতো ক্ষতি করেছে সেটাও ভালো করে পড়ুন। পড়ুন ও পড়ে তর্ক করুন।
যেন নার্ভ গ্যাস তৈরি করার উদ্যেশ্যই ছিলো কেমোথেরাপি আবিষ্কার। কি রকম ফালতু যুক্তি রে ভাই!
প্রসঙ্গত আমি স্টেন্ট এর কথাও উল্লেখ করেছিলাম।
দুই, ম্যাজিক রেমেডি তখনই খারাপ যতক্ষণ বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে বা আর্থিক লেনদেন হচ্ছে।
হোমিওপ্যাথি একটি স্বীকৃত চিকিৎসা।যার পছন্দ সে করাবে ,যার পছন্দ নয় ,সে করাবে না। কোন জোর জবস্তি নয় তো.
Avatar: Debasis Bhattacharya

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

sm, যেভাবে দাপুটে ভঙ্গীতে অকাতরে এলোমেলো কথা বলছেন, দেখে বেশ একটু অবাকই লাগল ।

প্রথমে একটু হাল্কা রসিকতা করছিলুম, এখন দেখছি এ ঠিক তামাশার ব্যাপার নয় । আমাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে 'নাইভ' বলছেন, তো তাহলে আপনি নিজে নিশ্চয়ই চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ, সত্যি নাকি ? কোন চিকিৎসার, হোমিওপ্যাথির, না জড়িবুটির ? নাকি, আধুনিক চিকিৎসার ? আধুনিক চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ হয়েও আপনি যদি মনে করেন, হোমিও-চাইনিজ-ম্যাজিক সবই ঠিকঠাক কাজ করে, এবং রুগি 'স্বেচ্ছায়' তা নিতে চাইলে অবাধে এইসব বুজরুকি চলতে দেওয়া উচিত, তাহলে তা আর ইয়ার্কি-ফাজলামোর ব্যাপার থাকে না, তাকে তখন বেশ একটু ভয়ে শিউরে ওঠার মতন ব্যাপার বলেই মানতে হবে । অস্পৃশ্যতা সতীদাহ নরবলি এসব ক্ষেত্রেও দু-চারজন 'ইচ্ছুক' লোক পাওয়া যায়, সেই যুক্তিতে এসব অবাধে চলতে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করে থাকেন বুঝি ?

"চিকিৎসা বিজ্ঞান হলো স্ট্যাটিসটিক্স এর ওপর বেস করে গড়ে ওঠা বিদ্যা" --- এই উপলব্ধিটিও কি আপনার চিকিৎসা-বিশেষজ্ঞতা থেকেই উৎসারিত ? কেন, আপনার বিশেষজ্ঞতার কোর্সে অ্যানাটমি ফিজিওলজি বায়োকেমিস্ট্রি ফার্মাকোলজি মাইক্রোবায়োলজি এইসব ছেলো না কো ? স্ট্যাটিসটিক্স বা পরিসংখ্যান কাজে লাগে শুধু কোনও বিশেষ ওষুধ বা চিকিৎসা-পদ্ধতির কার্যকারিতা বিষয়ে নিশ্চিত হবার জন্য । আর, তার সাথে রোগ-কে বোঝবার জন্যও যে কিছু চেষ্টা জারি আছে, এবং তাতেও যে অল্পবিস্তর ফল মিলেছে, সে খবর কি আপনার কাছে আজও পৌঁছয় নি ? রোগের পেছনে যে জীবাণু সংক্রমণ থাকে, হৃৎপিণ্ডের নালি বন্ধ হয়ে গেলে যে দেহের অন্য অংশ থেকে নালি কেটে নিয়ে এসে হৃৎপিণ্ডে বিকল্প নালি বানাতে হয়, সে সব কথা সমীক্ষা করে করে আর স্ট্যাটিসটিক্স-এর ফর্মুলা কষে কষে জানা গিয়েছিল বুঝি ?

হোমিওপ্যাথির অকার্যকারিতা নিয়ে কত সব কথাবার্তা হয়ে গেল, ইউরোপে একের পর এক দেশে সরকার হোমিওপ্যাথি থেকে হাত তুলে নিচ্ছে, কিছুই কি খবর রাখেন না ? জেনে রাখুন, হোমিওপ্যাথিতে পরিসংখ্যানগত 'প্রমাণ' পাওয়া গেছে বলে যা যা বলা হয় তার সবই মিথ্যে । এ সমস্ত 'পেপার' সাধারণত হোমিওপ্যাথরা নিজেরাই লেখেন, যার গবেষণার মান অত্যন্ত নিচু । 'ডাবল ব্লাইন্ড' পরীক্ষানিরীক্ষার কঠোর নিয়মকানুন তাঁরা আদৌ ঠিকঠাক মানেন না । অসংখ্য পরীক্ষানিরীক্ষার ফলাফল থেকে মোদ্দা কথাটি জানতে যে 'মেটা-অ্যানালিসিস' বা 'সিস্টেমেটিক রিভিউ' করা হয়, তাতে নিচু মানের কারণে এইসব গবেষণাকে বিবেচনাই করা হয়না । আর, ভাল মানের গবেষণা যা যা হয়, তার ফলাফল সাধারণত শূন্যই আসে । এইসব সমীক্ষার ফলাফল 'কক্‌রেন ডেটাবেস'-এ পাওয়া যায়, দেখে নিতে পারেন । হ্যাঁ, নামি জার্নালে বেরোনো বিরল দুয়েকটি গবেষণাপত্রও আছে, যাতে হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতার দাবি করা হয়েছে, এবং হোমিওপ্যাথরা তাঁদের লেখাপত্রে কুমির ছানার মত সেগুলোকেই বার বার তুলে ধরতে থাকেন । কিন্তু, নামি জার্নালে এইসব বেরনোর পরই তার কড়া সমালোচনা হয়, এবং তার ফলাফল অগ্রণযোগ্য বলে অচিরেই বাতিল হয়, কিন্তু সে সব কথা চেপে গিয়ে হোমিওপ্যাথরা ওই দু-একটি ব্যাঙের আধুলি সম্বল করে বিকট হইচই লাগান ।

কুসংস্কার-বিরোধী আইনের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে আমার এই লেখাটি মূলত তাঁদের জন্য যাঁরা কম সে কম বুজরুকিকে বুজরুকি বলে চিনতে পেরেছেন --- সেটা না পারলে এই সব আইনের প্রয়োজনীয়তা বোঝা যাবে কী করে ? আর, বুজরুকিকে বুজরুকি বলে যাঁরা এখনও সনাক্তই করে উঠতে পারেননি, তাঁদের প্রয়োজন অন্য লেখাপত্তর । সে সব লেখাও বিস্তর আছে । ইংরিজিতে তো বটেই, বাংলাতেও । রেফারেন্স লাগলে বলবেন ।
Avatar: দ

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

খিক!

যাইহোক জানার ছিল যে সারা ভারতে ঐ অ্যান্টি সুপারস্টিশান এন্ড ব্ল্যাক ম্যাজিক আইনটি কার্য্যকর নায় তাই না? আমাকে একজন বললেন সারা ভারতে কার্য্যকর এমন আইন নাকি ইতিমধ্যেই আছে, প্রবীর ঘোষ ব্যবহারও করেছেন।
তো এই বিষয়ে আমার খটকা লাগছে খুব।
Avatar: PT

Re: ধর্মীয় কুসংস্কার, নিপীড়ন ও প্রতারণার বিরুদ্ধে আইন কেন না হলেই নয়

"ক্লোরাম বুসিল তথা আগের যুগের কেমোথেরাপি কতো ক্ষতি করেছে সেটাও ভালো করে পড়ুন।"
এগুলো আমি ক্লাসে পড়াই। কাজেই পড়েই তক্কে নেমেছি।
সিন্থেটিক কম্পাউন্ড শরীরের ভেতরে গেলে ক্ষতি হতে পারে সেটা প্রত্যাশিত। সেটা জেনে বুঝেই নানাবিধ পরীক্ষা করেই তার ওষুধ হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। কথা হচ্ছে যে যখন কোন অসুখ সারানোর কোন ওষুধই নেই তখন সাইড এফেক্ট জেনেই ওষুধ দেওয়া হয়। এই জাতীয় ওষুধের একটি যথাযথ উদাহরণ হচ্ছে ৮০-র দশকে ব্যবহৃত AZT। AZT-র সাইড এফেক্ট জানা থাকা সত্বেও সেটি প্রয়োগ করা হয়েছিল কেননা HIV-র জন্য আর কোন ওষুধ জানা ছিল না। এখন যে ককটেল ড্রাগ প্রয়োগ করা হয় তার প্রত্যেকটার-ই কোন না কোন সাইড এফেক্ট আছে।

"যেন নার্ভ গ্যাস তৈরি করার উদ্যেশ্যই ছিলো কেমোথেরাপি আবিষ্কার।" এরকম কোন তত্ব আমি লিখিনি। কাজেই নিছক তক্কে জেতার জন্য ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করার কোন প্রয়োজন নেই।

"হোমিওপ্যাথি একটি স্বীকৃত চিকিৎসা।"
Calling homeopathy and astrology useless and harmful practices, Nobel laureate Venkatraman Ramakrishnan came down heavily on the two, saying real science is far more interesting than “bogus” fields.

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3] [4] [5] [6]   এই পাতায় আছে 21 -- 40


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন