বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

আত্মানং বিদ্ধি

মাভৈঃ

ডেস্টিনি ও ডেস্টিনেশন শব্দদুটি ব্যুৎপত্তিগতভাবে আত্মীয় হইলেও বাজার অর্থনীতির যুগে তাহাদের সে আত্মীয়তা ঘুচিয়া গিয়াছে। বাজার মানুষের ডেস্টিনি নিয়ন্ত্রণ করিতে না পারিলেও তাহাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পূর্ব নির্ধারিত কোনও ডেস্টিনেশনে পৌঁছিতে পারিবার টোপ গিলিতে বাধ্য করিতে সক্ষম হইয়াছে। স্বভাবে যাযাবর মানুষের যত্রতত্র অবাধ বিচরণে বাজারের লোকসান বৈ লাভ নাই, তাই দেশে দেশে সীমান্তসুরক্ষাবাহিনীর নিশ্ছিদ্র প্রহরা। ভিসাপাসপোর্টপারমিটের কাগুজে বাঘগুলি আছে বলেই না ট্রাভেল এজেন্সিগুলির রমরমা! নয়তো কি আর মানুষে চাইলেই বেরিয়ে পড়তে পারে না যেদিকে দুচোখ যায়!

আমি কদাচিত কোথাও সহজে পৌঁছিয়াছি।

গন্তব্য ঠিক করিতে গেলে প্রাথমিকভাবে যাহা প্রয়োজন, তাহা হইল প্ল্যানিং। যদিচ পরিকল্পিত ভ্রমণের চাইতে কদর্য বস্তু কমই আছে। আগেভাগে ছকিয়া রাখা রাস্তায় মেপে পা ফেলিবার মত পাপ (বা পাপেটিং) করিতে আমার বাধে। নেশন/ডেস্টিনেশন, দুইই স্বরূপে বায়বীয়। প্রচলিত ধারণামাত্র। তথাপি উহাদের পসার মন্দ নয়। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম তথা যাবতীয় প্রতিষ্ঠান যতকাল টিকিয়া থাকিবে, ততদিন ইহাদেরও বোলবালা থাকিবে সন্দেহ নাই। যাহা জনগণের চোখের মণি, তাহা আমার চক্ষুশূল। আমি এনার্কিস্ট। ধর্মকর্মে মতি নাই। শেক্ষপীর আমার দীক্ষাগুরু, লেডি ম্যাকবেথ বাল্যসখী। আমি অদৃষ্টবাদে বিশ্বাসী। তাই যাহা চোখে দেখি নাই, কিন্তু আছে বলিয়া বিশ্বাস করি, তাহার আকর্ষণে ঘরছাড়া হই বারম্বার। পথের নেশায় পথে নামি, আকছার পথ হারাই, পূর্বকৃত ভুল হইতে শিক্ষা লইতে অপারগ আমি হন্যে হয়ে খুঁজিয়া বেড়াই সোনার হরিণ। হিমালয়ের মায়াবনে তাহার দেখা পাই অবরেসবরে, যদিও তাহাকে ধরিয়া আনিয়া গৃহবন্দী করিবার পণ অকারণ মনে হয়, বরং জলেজঙ্গলে তাহার সন্ধান করা ঢের সুখের। এই অনুসন্ধিৎসা আমাকে গভীরতর আত্মানুসন্ধানে প্রবৃত্ত করে। প্রতিবার আমি নিজের সম্পর্কে নূতন দু’চারকথা জানিয়া ফিরি।

পথও আসলে একধরণের শৃঙখল। যে পথিক, সে পথের তোয়াক্কা করে না। সবটাই পথ, বা কোনওটাই নয়। তুমি কে হে বলিয়া দিবে কোনটা পথ, কোন দিকে যাইতে হইবে, কত দূর গেলে মিলিবে সরাইখানা, কতটা হাঁটিলে পরে জুটিবে বিশ্রাম?

বাজার কিন্তু সবটুকু বলিয়া দিতে চায়, ম্যাপ আঁকিয়া, হিসাব কষিয়া তোমার সুবিধা করিয়া রাখে যাহাতে তুমি প্রশ্ন করিবার সুযোগটুকুও না পাও। এদিকে তুমিও সমস্ত উত্তর হাতের মুঠোয় পাইয়া মহাখুশি। কারণ তুমি নিশ্চিন্ত। তুমি জানো কোথায় মিলিবে দানাপানি, কোথায় রয়েছে সাচ্ছন্দ্যের বন্দোবস্ত। পথের হদিশ তোমার হাতের মুঠোয়, মুঠোফোন জানে তোমার চেকইন চেকাউটের খতিয়ান... তাহলে তুমি কে? বাজার অর্থনীতির অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়া ট্যুরিস্টমাত্র? কেন তুমি মার্কোপোলো হইলেই বা কি? তোমার ভ্রমণবৃত্তান্ত পাঠপূর্বক বাজার নিজে আসিবে উটের মত পাহাড়ের নীচে! শাইলকের বাণিজ্যবিস্তার হইবে, অথবা আলেক্সান্দ্রীয় সাম্রাজ্যবিস্তার। কি লাভ? তারচে’ বরং নিজেকে জানিয়া লও। সূর্যের সহিত, অপরিচিত জলহাওয়ার সহিত সমীকরণগুলি বুঝিয়া লও। অনেক তো বাঁধা পথে হাঁটিলে, ড্রিম ডেস্টিনেশনে পৌঁছিয়া ফিরিয়াও এলে, আপন ভাগ্য জয় করিতে পারিলে কি? সে নাহয় নাই হল, ভাগ্যজয় দিগবিজয় অপেক্ষা কঠিন। নিদেনপক্ষে পথিমধ্যে নিজের মুখোমুখি হইলে কি?

ইহাই ভ্রমণের উদ্দেশ্য, নিজেকে জানা।

যে লোকালয়ে তোমার বাস, গ্রামে বা নগরে, যেখানে তোমার সামাজিক পরিচিতি বিদ্যমান, সেইখানে তুমি পিঞ্জরাবদ্ধ শের। অনিশ্চয়তা বিহীন সেই কৌমজীবনে তুমি আবাল্য অভ্যস্ত। অতএব তোমার হারাইবার ভয় নাই। চিন্তা নাই। এই চিন্তার অভাব তোমার পরিধি নির্ণয় করে, তোমাকে সীমার মাঝে বাঁধিয়া ফেলে, ক্রমে তুমি অসীমকে ভুলিয়া যাও, নিজেকে ক্ষুদ্র জ্ঞান করিতে করিতে জন্মসংসারের নাগপাশে আবদ্ধ হইয়া গোলকধাঁধায় ঘুরিয়া মর। মুক্তির স্বাদ যে ভুলিয়াছে, মোক্ষ তাহার রুচিবে কেমনে?


অথচ মোক্ষ নাম্নী মহার্ঘ বস্তুর সন্ধানে যুগে যুগে মানুষের নশ্বর জীবন অতিবাহিত হইয়াছে। সে মোক্ষের খোঁজ করিয়াছে বাজারে। বাজার তাহার হাতে ধরাইয়া দিয়াছে অর্থ, কাম, প্রতিষ্ঠা লাভের টিকিট। যদিও এই টিকিট অর্জন করিবার পথ মসৃণ করিয়া রাখে নাই। পথ কঠিন হইলে পরেই পথের অর্জন মূল্যবান বোধ হয়, অর্জন যাহাই হউক না কেন! ফলত জীবনসংগ্রামে পর্যুদস্ত মানুষ তাহার যাযাবরবৃত্তি শিকেয় তুলিয়া বাৎসরিক প্রমোদবিহারে দিনগত পাপক্ষয়ের উপায় খুঁজিয়া লইয়াছে, ভ্রমণকে ভাবিয়াছে সাময়িক মুক্তিলাভের অন্যতর উপায়। অথচ মানবজাতির ইতিহাসে যাহারা পর্যটক বলিয়া খ্যাত, তাহারা কেহ স্থূল আমোদের নিমিত্ত অজানা পথে পা বাড়াননি, সে হিউয়েন সাঙ হোন বা অতীশ দীপঙ্কর। তাঁহাদের ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল মহৎ, কারণ তাহাতে ছিল না বিনোদনী স্বার্থ, ক্ষুদ্র ব্যক্তিসুখের সন্ধানে তাঁহারা ভ্রমণে প্রবৃত্ত হন নাই। ম্যাজেলান বা কলম্বাস যাহার তাড়নায় ঘর ছাড়িয়া ছিলেন, সে কৌতূহল। অজানাকে জানিবার, অচেনাকে চিনিবার অনন্ত জিজ্ঞাসা তাঁহাদের দুঃসাহসী হইতে বাধ্য করিয়াছিল। সাহস একপ্রকার মানসিক অবস্থা। এই অবস্থা মানুষকে বীররসের জোগান দেয়। এই অবস্থা মানুষকে থিতু হইতে দেয় না। এই অবস্থায় মানুষ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হইয়া সকল প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাহ্য করে। ঘর নামক প্রতিষ্ঠান যাহা মাথার ওপর ছাদ গড়িয়া তাহার উড়ান প্রতিহত করে, তাহার গতিবিধি চারটি দেওয়ালে বাঁধিয়া রাখিতে চায়, তাহাকে দায়িত্বকর্তব্যের মায়াজালে বাঁধিয়া রাখে আজীবন, সেই ঘর এমনই এক মোহ, যাহার আকর্ষণ সে ভ্রমণকালেও এড়াইতে পারে না। পাহাড়ে গিয়া সে ঘরের আরাম চায়। গীজারের গরম জল, বোতলবন্দী মিনারেল ওয়াটার, শীততাপনিয়ন্ত্রিত বাহন, উৎকৃষ্ট সুরা ও সুষম আহারের ব্যবস্থা না থাকিলে অভিযোগ করে। বন্য, আদিম, অকৃত্রিম প্রকৃতি তাহার ভীতি উদ্রেক করে। বাজার তাহাকে জন্মাবধি নিয়ন্ত্রণ করে বলিয়াই যে স্থানে সে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করিবার উপায় দেখে না সেই স্থান সে সভয়ে পরিত্যাগ করে। ফ্যামিলি লইয়া সেই পাণ্ডববর্জিত স্থানে যাওয়া যাইবে না, অতএব আমরা/উহারা বিভেদ গড়িয়া ওঠে। একদল যাহারা সপরিবারে/ সবান্ধবে পাহাড়ে বেড়াইতে যায়। অন্যদল যাহারা কাঁধে রুকস্যাক বাঁধিয়া পাহাড়ে হাঁটিতে যায়। দ্বিতীয় দলের পোশাকি নাম ট্রেকার। ইহারা পর্বতারোহী নহে, নিছক ভ্রমণপিপাসু। শখের হাঁটিয়ে। পাহাড়ে হাঁটেন বা হাইক করেন। দুইদলই বাজারের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পাহাড়ে হাঁটিতে গেলে পথপ্রদর্শক প্রয়োজন, প্রয়োজন ভারবাহী কুলি, প্রয়োজন উপযুক্ত পোশাকপরিচ্ছদ, একজোড়া ভালো গ্রিপের শক্তপোক্ত জুতা। ভাবিতে অবাক লাগে, ফা হিয়েন মহাশয় সেই যুগে এইসকল বিলাসিতা ছাড়াই সুদূর চীনদেশ থেকে হিমালয়ের গিরিপথ ধরে মাসের পর মাস পায়ে হেঁটে এদেশে আসিয়াছিলেন। আসিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, ঘুরিয়া ঘুরিয়া সবটুকু দেখিতেন, নোট লইতেন, পরে একান্তে বসিয়া সেইগুলি বিশ্লেষণ করিতেন, পুঁথি আকারে লিপিবদ্ধ করিতেন। তিনি বাজারের দাস ছিলেন না, ছিলেন কৌতূহলের দাস। বিশ্বাসের বলে বলীয়ান খর্বকায় মানুষটি জ্ঞানের উৎস খুঁজিতে খুঁজিতে শাংহাই হইতে পাটনা চলিয়া আসিলেন!

একমাত্র জ্ঞানপিপাসু মানুষই নিজেকে ভ্রমণপিপাসু বলিয়া দাবি করিতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। আমোদপ্রিয় মানুষ আর যাহাই হোক, পথিক নয়। পথ তাহার বিনোদন, ডেস্টিনেশন তাহার প্রয়োজন। এইভাবে মানুষের ভ্রমণচর্যার ক্রমবিবর্তন ঘটিয়াছে। প্রযুক্তির উন্নতি তাহাতে সীলমোহর লাগাইয়া তাহাকে উপহার দিয়াছে গুগল ম্যাপ, সে আর মাঝদরিয়ায় দিশেহারা হইয়া আকাশের ধ্রুবতারা দেখিয়া দিকনির্ণয় করে না। ফলে দূরভাষযন্ত্রের নেটওয়ার্ক পাওয়া যাইবে না, এমন অকুস্থল সে এড়াইয়া চলে। জঙ্গলের ভিতরে বসিয়া কী তরকারি সহযোগে দুপুরের ভাত খাইল, সে খবর বাড়িতে না দিতে পারিলে তাহার উদরস্থ অন্ন হজম হয় না। কোথায় যাইতেছে, কোথায় পৌঁছিল, ইত্যাদি তথ্য মুখবইতে নথিভুক্ত না করা ইস্তক তাহার স্বস্তি নাই।

ক্যারেক্টার ইজ ডেস্টিনি, এইরূপ শুনিয়াছি। আমার চরিত্র ভালো নয়, এইরূপও শুনিয়াছি। কারণ মাস্টার্সের পরীক্ষাশেষে আমি বাড়ি থেকে পলাইয়াছিলাম। দেশ দেখিবার সাধ ছিল। কোথায় গেলে দেশ দেখিতে পাইব জানিতাম না। ইতিহাস বইতে দক্ষিণ ভারতের মন্দির তোরণ ইত্যাদির কথা পড়িতে ভালো লাগিত। রাহুল দ্রাবিড় ছিলেন প্রিয় ক্রিকেটার। ফলত বিন্ধ্যাচলের উত্তরে সীমায়িত আর্যসভ্যতা অপেক্ষা প্রাচীন প্রকৃত ভারতীয় সংস্কৃতির ধারক ও বাহক দ্রাবিড় সভ্যতার প্রতি বিশেষ সহানুভূতির দরুণ সেকেন্দ্রাবাদের টিকিট কাটিয়া রাখিয়াছিলাম পরীক্ষা শুরুর প্রাক্কালে। পরীক্ষা শেষ হইতে একদিন বৈকালে বান্ধবীর বাড়ি যাচ্ছি কাল ফিরিব বলিয়া একখানা ব্যাগ কাঁধে ঘর ছাড়িলাম। পরদিন প্রভাতে হাওড়া হইতে ফলকনামা এক্সপ্রেস ধরিলাম। ট্রেন ছাড়িলে বাড়িতে খবর দিলাম। বলিলাম চিন্তা করিও না, সাবধানে থাকিব, ফিরিয়া আসিব। আমার চরিত্রে দোষ আছে এবং মাথায় সমপরিমাণ গোলযোগ আছে, ইহা আমার পিতামাতা জানিতেন। হয়তো এই দিনটির কথা ভাবিয়াই তাঁহারা শিশুকাল হইতে আমাকে নানাবিধ মাদুলিকবচ পরাইয়া রাখিতেন। কিন্তু মাদুলিকবচ মানুষের ভাগ্য কবেই বা বদলাইতে পারিল? অতএব, যাহা হইবার তাহাই হইল। লোকলজ্জার ভয়ে তাঁহারা পুলিশকাছারী করিলেন না। আমি বিনাবাধায় সেকেন্দ্রাবাদ পৌঁছিলাম। পয়সাকড়ির চিন্তা ছিল না। আণ্ডার- এবং পোস্ট- গ্র‍্যাজুয়েশনের পাঁচটি বছর প্রাইভেটে ছাত্রছাত্রী পড়াইয়া ভালোই আয় হইয়াছিল। ব্যাঙ্কে সেভিংস একাউন্ট ছিল, এটিএম কার্ড ছিল, পকেটের রেস্ত যাহা ছিল তাহা বছর তেইশের একাকিনী মহিলার জন্য যথেষ্ট। আর ছিল দুঃসাহস। ইস্কুলের দিদিমণিরা বলতেন ওভার-কনফিডেন্স। এইসব সম্বল করিয়া আমি নূতন শহরে পা দিলাম। সেখানে কী ঘটিল, সেকথা প্রয়োজন পড়িলে পরে কখনও বলা যাইবে। এইবেলা যাহা বলিতে চাই, তাহা পরীক্ষিত সত্য। বেপরোয়া না হইলে আখেরে ক্ষতি নিজেরই। নিজেকে না জানিলে সকলই বৃথা। সেই প্রথম বার অচেনা ভূমিতে অজ্ঞাতবাস আমাকে শিখাইল জীবন আদতে এক মহাস্রোত, সে স্রোতে নির্ভয়ে গা ভাসাইতে গেলে প্রয়োজন বিশ্বাস, নিজের প্রতি যেমন, অন্যের প্রতি কিছু অধিক। এই বিশ্বাস অতি শক্তিশালী বস্তু। বিশ্বাস ব্যতীত কোনও মহৎ কর্ম সাধিত হয় না। কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করিতে ভয় পায়। এই ভয়ের সুযোগ লইয়া বাজার ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠে। মানুষের অবিশ্বাসের সুযোগেই বিজ্ঞাপনের এত বাড়বাড়ন্ত। গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপনী ছবি দেখাইয়া বাজার মানুষের চক্ষের সামনে নানাবিধ অপশনের ইন্দ্রজাল তৈয়ার করে। বাছিয়া লও তোমার কী চাই, এতগুলা চয়েস দিলাম। আমার নিকট ইত্যাকার কোনও চয়েস ছিল না। যে যুগের কথা বলিতেছি, সেযুগে স্মার্টফোন ছিল না। গুগল বাবাজী ছিলেন ডঙ্গল নামক যন্ত্রের মুখাপেক্ষী, কিন্তু আমার ল্যাপটপ ছিল না। ফলে তামাম পৃথিবী আমার অঙ্গুলির ডগায় আসে নাই। গোলকোণ্ডা দুর্গ হইতে নীচে প্রাচীন হায়দ্রাবাদ শহরটি দেখিতে দেখিতে অবাক হইয়া ভাবিতাম আমি কত ক্ষুদ্র, কত অকিঞ্চিৎকর। চারমিনারের পার্শ্বে একটি মসজিদ ছিল। সেইখানে ভক্তের ঢল নামে না। অনাড়ম্বর, বড়ই শান্ত সে উপাসনাগৃহ। তাহার বিস্তীর্ণ চাতালে কবুতর আসিত ঝাঁকে ঝাঁক। তাহাদের গতিবিধি দেখিতে দেখিতে বুঝিলাম আমি কবুতর হইলে বেশ হইত, আকাশে উড়িতাম, ক্ষুধাবোধ হইলে মাটিতে ফিরিয়া আসিতাম, দানা খুঁটিয়া খাইতাম, বিশ্রাম লইতাম এমনই কোথাও, আবার উড়িয়া যাইতাম।

এইভাবে চলিতেছিল, একদিন খবর পাইলাম এম.এ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হইয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইন দিয়া আমার সহপাঠীগণ মার্কশীট সংগ্রহ করিতেছে। আমি তখন সবেমাত্র হায়দ্রাবাদের নিজস্ব বইপাড়া আবিষ্কার করিয়াছি। মাত্র পঞ্চাশ টাকা প্রতি বই। ফাউন্টেনহেড কিনিলাম, জ্যাক দ্য রীপারের ডায়েরি কিনিলাম, ন্যান্সি ফ্রাইডের পানু কিনিলাম খানকতক। পড়িয়া নিঃশেষ করিতে অধিক সময় লাগিত না। ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল দেখিলাম এক শুঁড়িখানায় অচেনা মানুষদের সাথে, তাহাদের হর্ষবিষাদের শরিক হইয়া মিশিতে লাগিলাম জীবনের মহাস্রোতে। বাড়িতে ফোন করিতাম, মা বলিত ফিরিয়া আয়, ভাই বলিত অনেক হইয়াছে ফিরিয়া আয়। বাবা কিছু বলিতেন না। তিনি আপনার সমস্ত জীবনযৌবন অর্থোপার্জন করিয়া গিয়াছেন। গল্প শুনিয়াছি কৈশোরে তিনিও একবার কাহাকেও কিছু না বলিয়া দার্জিলিং পলাইয়াছিলেন। হয়তো তিনিই কেবল আমার ভ্রমণতৃষ্ণার সহিত রিলেট করিতে পারিয়াছিলেন। আমাকে পরেও কখনও এবিষয়ে কিছু বলেন নাই। আমি যখন ব্যাগবোঝাই বই লইয়া বাড়ি ফিরিলাম, মা বুকে টানিয়া লইলেন, তাঁহার আনন্দাশ্রু দেখিতে পাই নাই, কিন্তু অদৃশ্য অন্তরে তাহার উদ্বেল জলরাশি ঠাহর করিতে ততদিনে আমি শিখিয়া গিয়াছি। খালি চোখে দেখিতে পারা যায় না, কিন্তু স্বমহিমায় বিদ্যমান, এমন বহু বহু কিছু আমাদের চারিপাশে রহিয়াছে, প্রাণবন্ত, সুন্দর, আমরা তাহাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে অনভিজ্ঞ, কারণ আমরা বিশ্বাস করিতে ভয় পাই। এই বিশ্বাসের সহিত ভূতভগবানে বিশ্বাসের সম্পর্ক নাই বলিলেই চলে। আমাদের ঘিরে যে বিপুলা পৃথিবী, তাহার কতটুকুই বা জানি! রাখাল, গোপাল ছাড়াও যে অন্য মানুষ হয়, তাহা আমরা মানিতে পারি কই? গাছের মধ্যেও যে প্রাণ আছে, তাহা জানিতে আমাদের বিজ্ঞান পড়িতে হয়, ফলে আমাদের যাবতীয় জানা পাঠ্যপুস্তকের ছাপার অক্ষরে বন্দী হইয়া থাকে। আমরা অনুভব করিতে ভুলিয়া যাই, কল্পনা করিয়া সময় নষ্ট না করিয়া তথ্য কণ্ঠস্থ করি, তত্ত্ব লইয়া কচকচাই। ঝগড়া করি, যুদ্ধ করি, মসজিদ ভাঙিয়া গুঁড়াইয়া দিই, সেই ক্ষতস্থানে প্রেমের প্রলেপ দিলেই হত, কিন্তু না, সেখানেই আমরা মন্দির গড়িয়া তুলিব। কিন্তু ভারতবর্ষ মন্দির মসজিদে নাই, তাহা আছে বিশ্বাসে। দেশ কী? বিশ্বাস বৈ তো নয়। আমি বিশ্বাস করি এই মাটি আমার দেশ, তাই সে আমার দেশ। কিন্তু ইহা প্রমাণ করিতে গেলে কাগজ চাই, চাই সরকারি ছাপ্পা। সরকারবাহাদুর নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ করিয়া বলেন ইহা তোমার দেশ নয়। রাগে দুঃখে অপমানে তুমি আত্মহত্যা কর। করবে নাই বা কেন? হতদরিদ্র মানুষ, নির্বিবাদী মানুষ কোথায় যাইবে? তাহার কি সে সময় আছে, বল আছে যে সরকারের টুঁটি টিপিয়া ধরিবে? সরকার কে? সে কি একজন? কোথায় তাহার বাস? গদিতে আসীন যে, সে তো এজেন্টমাত্র। অভিনেতা। দেশ চালাইবার ভান করিতে করিতে চক্ষের জল মুছিতেছে। এক বিরাট বাজার বসিয়াছে, তাহার পোশাকি নাম কর্পোরেট। সে তোমাকে চালাইতেছে, তুমি চলিতেছ ঘুরিতেছ ফিরিতেছ রেস্তোরাঁয় খাইতেছ ফেসবুকে ঢেঁকুর তুলিতেছ। তুমি মহাখুশি। ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া তুমি যদি ঘাসের মাথায় হাস্যমুখ শিশিরকণাটিকে দেখিতে পাইতে, তবে জানিতে ইহা বাজারে মেলে না। কোনও সরকার ইহাকে দেশছাড়া করিতে পারে না, ইহার কোনও দেশ নাই। দেশ বলিয়া কিচ্ছুটি হয় না, দেশ একটি ধারণামাত্র। এই ধারণা জনমানসে বদ্ধমূল হইলে শাসনকার্যে সুবিধা হয়, বাজারের বিকিকিনি সহজ হয়। তোমার পায়ে বেড়ি পরাইতে বেগ পাইতে হয় না। তর্কের খাতিরে তুমি বলিবে, তবে ১৯৪৭এ যাহা স্বাধীন হইল, তাহা কী? তাহা দেশ বটে, কিন্তু তুমি কি স্বাধীন? তুমি মানুষ বটে, দেশ তবে ভূমিখণ্ড। এই ভূমিখণ্ড ব্রিটিশ শাসনাধীন ছিল, স্বতন্ত্রতা পাইল, রক্ত ঝরিল, বিপ্লব হইল, ইতিহাস বইগুলি হৃষ্টপুষ্ট হইল, তোমার কী সুবিধা হইল হে? তুমি তো এখনও পরাধীন। আর যদি বল তুমিও স্বাধীন, চল তবে পথে নামি। কাঁটাতার অতিক্রম করি। গিলগিট বালুচিস্তানের নাম শুনিয়াছ? পাকিস্তান রাষ্ট্রে অবস্থিত। গুগল করিয়া ইমেজগুলি দ্যাখ, তুমি তো স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীন নাগরিক, চল যাই, স্বর্গ হইতে ঘুরিয়া আসি। চল খুঁজি শাংগ্রিলা, কৈলাস পর্বতে কারা থাকে, চল দেখি গিয়া। দেখিবার শেষ আছে?

পথের অন্ত নাই। এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হবে তুমি বল তো?

তুমিই বল।

এইভাবে গান শেষ হয়, পথ নয়। কেহই বলিতে পারে না পথের শেষ কোথায়। বাহিরে খুঁজিলে পথ শেষ হইবে না। অন্তরে খুঁজিলে হইতেও পারে। জীবনে প্রথম বার একা একা অপরিচিত শয্যায় শয়ন করিয়া, অদৃষ্টপূর্ব ঘাটে নোঙর করিয়া, কিছুকাল বিশ্রাম লইয়া পুনঃ পথে নামিয়া অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরিয়া যখন গৃহে ফিরিলাম, তখন আমি অন্য মানুষ।

ফিরিলাম বটে, কিন্তু ততদিনে আমার নেশা ধরিয়া গিয়াছে। পথের হাতছানি আমাকে আর ঘরে থাকিতে দিবে না, আমার পিতামাতাও তাহা জানিতেন। পরের বার হইতে বলিয়া যাইতে হইবে, এই অনুরোধটুকু করা ছাড়া তাঁহাদের আর কিছু করার রহিল না। আমি আংশিক স্বাধীনতা পাইলাম।৷




564 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ মোচ্ছব  বুলবুলভাজা  উৎসব ইস্পেশাল ২০১৮ 
শেয়ার করুন


Avatar: Prativa Sarker

Re: আত্মানং বিদ্ধি

লিখনটি কাহার সৃষ্টি? মধুবন্তী ভুঁইয়ের কি ? অতীব প্রসাদগুণ সমন্বিত।
একটি খটকা শুধু রহিয়া গেল। সেক্ষপীর গুরু, অথচ উনি অদৃষ্টবাদী হইলেন কি করিয়া ! গুরু বিশ্বাস করিতেন কাহারও ধ্বংস অথবা সাফল্যের বীজ উপ্ত থাকে তাহার নিজের চরিত্রে। বাহিরের কোন শক্তি তাহার পরিণতির জন্য দায়ী নয়।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন