বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

পরিচয় পাত্র

বিধিসম্মত সতর্কীকরণঃ এই লেখায় ব্যোমকেশের কাহিনী বিবৃত করা হবে না, আলোচনা করা হবে না এই ব্যোমকেশ ব্যোমকেশ হিসেবে সফল না অসফল তা নিয়ে, তুলনা করা হবে না পূর্ববর্তী নানা ব্যোমকেশের সঙ্গে, কে কেমন অভিনয় করেছেন তা নিয়ে একটি শব্দও থাকবে না কেননা সেটা নিতান্তই গৌণ বলে মনে করছেন প্রতিবেদক। বরং এই ব্যোমকেশকে যেভাবে পড়া যায় সেভাবেই পড়ার চেষ্টা এখানে করা হল। মনে হয় না প্রচলিত ছবি আলোচনার পদ্ধতিতে দিবাকরবাবুর ব্যোমকেশকে ধরা যাবে।  

দিবাকর ব্যানার্জি ইতিপূর্বে প্রমাণ করেছেন যে তাঁর আন্তর্জাতিক সিনেমার সঙ্গে মোটের ওপর পরিচিতি রয়েছে। কখনো আলেহান্দ্রো গনজালেজ ইনারিতু প্রতিম নেটওয়ার্ক ন্যারেটিভের আশ্রয় নিয়েছেন তিনি (‘লাভ, সেক্স আউর ধোঁকা’), কখনো ভারতীয়করণ ঘটিয়েছেন কোস্তা গাভরাসের ‘জেড’ এর মত ক্লাসিক ছবির (‘সাংহাই’)। কিন্তু এতদসত্ত্বেও ব্যোমকেশের জন্যে তাঁর দর্শকের মানসিক প্রস্তুতির অভাব ছিল বলেই মনে হচ্ছে চারপাশের প্রতিক্রিয়া দেখে। বাংলায় এ ছবি করলে তাঁর এমনকি প্রাণ সংশয় হওয়ার সম্ভাবনা ছিল এমনটাই আমার অন্তত মনে হচ্ছে। একটা ওয়েল-ডিফাইনড লিটারারি টেক্সটকে চলচ্চিত্রের বয়ানের অন্তর্ভুক্ত করলে তার নানা ইন্টারপ্রিটেশন উঠে আসে স্বাভাবিক নিয়মেই, এবং দর্শকের কাছে সেটা সবসময় রুচিকর নাও ঠেকতে পারে। এজন্যেই অনেকে নিজের ছবি-করিয়ে হিসেবে স্বাধীনতাটা বজায় রাখার জন্য স্বল্পপরিচিত বা অপরিচিত টেক্সট বেছে নেন, ফলে তার পাঠের ধরন নিয়ে আর প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু দিবাকর যে কাজটি করেছেন তার নজির অন্তত ভারতীয় মূলধারার ছবিতে খুঁজে পাচ্ছি না। ব্যোমকেশের এমন (অ)বিনির্মাণ, গোটা ক্যাননকেই কার্যত হুমকির মুখে ফেলে দেওয়া অথচ তাকে নিপুণভাবে ন্যারেটিভের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা, ইতিপূর্বে দেখেছি বলে মনে করতে পারিনা। 

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি দিবাকরবাবুর ব্যোমকেশ সম্ভবত শরদিন্দুর প্রতি বিশ্বস্ততম। চরণে চরণে তাঁর সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষা এখানে অপ্রাসঙ্গিক, কেননা ছবির এস্থেটিক নানা পরিবর্তন ইতিমধ্যে ঘটে গেছে, ভারতীয় মূল ধারার সিনেমায় প্রভাব রেখেছেন যারা তাদের নামগুলো বদলেছে। ফিল্ম টেক্সটে সত্যান্বেষী, পথের কাঁটা, অর্থমনর্থম, উপসংহার, মগ্ন মৈনাক এবং চিড়িয়াখানা মাঝে মাঝেই অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে ঢুকে পড়েছে, অথচ ছবির কোন ন্যারেটিভ ক্লোজার নেই। এই স্বচ্ছন্দগতি এবং স্বাধীনতা দিবাকরকে সাহায্য করেছে তাঁর ছবির অন্য দুই দিকের পুষ্টিসাধনে, যে দুই দিক এ ছবি প্রসঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে প্রধান আলোচ্য বিষয় হওয়ার দাবী রাখে। এইবার সরাসরি সে প্রসঙ্গে যাই। 

প্রথম হল সিনেমাটোগ্রাফি। গ্রীক চিত্রগ্রাহক নিকোস আন্দ্রিতসাকসিস ইতিমধ্যেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে এক সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত জানিয়েছেন কিভাবে চিরাচরিত সিপিয়া রঙে ছবিকে মুড়ে দিয়ে তাকে পিরিয়ড ফিল্ম করে তোলায় তিনি অনাগ্রহী ছিলেন, বরং আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে অতীতের দিকে এক ধরনের রেট্রো দৃষ্টিপাত নিবদ্ধ করাই তাঁর কাম্য ছিল। হিন্দি ছবির নিজের অতীতের দিকে ফিরে দেখা সাম্প্রতিক সময়ে নতুন নয়, কিন্তু ব্যোমকেশ তাকে একটু বিশেষ মর্যাদা দান করে। আবার কলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দি জনপ্রিয় ছবির যে কাঠামো তা থেকেও ব্যোমকেশ স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় বিশ্বাসী, এ যেন ঘষা কাঁচের মধ্যে দিয়ে চিরচেনা শহরকে দেখা, যেন ব্যোমকেশের প্রোজেক্টেড শহর রয়েছে একটা আস্তরণের আড়ালে আর তার এপাশ থেকে সেটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করছে ক্যামেরা আই। নিকোসের অস্ত্র ছিল দুটি। এক হল অতীতের সিনেমার মত হার্ড এবং ডিরেকশনাল লাইটিং আর নায়িকার, এই noir র ফাম ফাতালের, সিডাকট্রেসের উপরে সফট লাইটিং। দু ধরনের আলোকসম্পাতের বৈপরীত্য এখানে এক ধরনের বিরোধাভাস তৈরি করে, যা অতীতের সিনেমায় ছিল। দুই হল noir র উপযোগী আলো ছায়ার এক্সপ্রেশনিজম। এই জঁরের ছবি প্রসঙ্গে নিকোস বিশেষভাবে একটি নিও-নোয়া প্রসঙ্গ আনেন, সে ছবিটি হল সেই চিরকেলে রোমান পোলানস্কির ‘চায়নাটাউন’ (ইতিমধ্যেই এর একটি সফল adaptation হিন্দি ছবিতে হয়েওছে, আমি ‘মনোরমা সিক্স ফিট আন্ডার’ প্রসঙ্গে বলছি)। নিকোস নিজে গ্রীক  এবং প্রথম জীবনে গ্রীক ছবিতে কাজ করতেন, পরে লন্ডন ফিল্ম স্কুলে পড়ার সূত্রে ইউরোপ জুড়েই কাজ করে বেড়াতেন তিনি, বুডাপেস্ট সহ পূর্ব ইউরোপের নানা অঞ্চলে চিত্রগ্রাহক হিসেবে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। এখানে উল্লেখ করা হয়ত অসমীচীন হবে না যে গ্রীক নব তরঙ্গ নামক যে চলচ্চিত্র আন্দোলন এখন নিকোসের নিজের দেশেই চলছে তার দুই প্রধান উপাদানের একটি সুররিয়ালিজম এবং অপরটি ফিল্ম নোয়া। Noir-ish উপাদানের বাহুল্য গ্রীসের সমসাময়িক সিনেমায় রয়েছে। নব্বইয়ের দশকের পরিচালকদের (নিকোস প্যানাইয়োটোপুলস প্রমুখ) ছবিতেও তা উল্লেখ্য।  

ব্যোমকেশ বকশির অপর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এর নানা জঁর নিয়ে নিরন্তর খেলা করার প্রবণতা। এত বেশি ক্রস-জেনেরিক কাজ আমি জনপ্রিয় হিন্দি ছবিতে দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না। এ ছবি স্পষ্টভাবেই নোয়া বা নিও-নোয়া অনুসারী, অন্যদিকে এর মধ্যে রয়ে গেছে স্পুফ ছবির নানা উপাদান, পূর্ব এশীয় গ্যাংস্টার ছবি, যাকে আমরা বলি ইয়াকুজা ফিল্ম, তার নানা উপাদান। নোয়া জঁরের অতলান্তিক পেরোবার সময়কাল ব্যোমকেশের সময়কালেই, সেই চল্লিশের দশক। জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট ফিল্মমেকাররা নাৎসি জার্মানির বেড়াজাল পেরিয়ে মার্কিন দেশে পৌঁছে যান আর সঙ্গে নিয়ে যান তাঁদের সিনে-এস্থেটিক, যা নোয়ার জন্ম দিতে সাহায্য করে। পরে আবার নোয়া ইউরোপে ফিরে আসে, কিন্তু সে এক অন্য কাহিনী। আবার জার্মান-মার্কিন নোয়া নির্মাতাদের ছবিতে পূর্ব এশীয় ড্রাগ চালানদাতা, জুয়ার আড্ডা মালিক, ক্যাসিনো কর্তা ভিলেনের মত স্টক চরিত্রের অভাব নেই, জোসেফ ফন স্টার্নবার্গের ১৯৪১ সালের বিখ্যাত ‘সাংহাই জেশ্চার’ মনে করে দেখা যেতে পারে।  পূর্ব এশিয়া প্রসঙ্গে এক ধরনের orientalist দৃষ্টি এই জাতের ছবির পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে। হালফিলে দাবী উঠেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পূর্ব এশিয়ার ডিকলোনাইজেশন, বৈপরীত্য হিসেবে পূর্ব এশিয়াতেই বিশ্বযুদ্ধের আগে এবং সময়ে নতুন কলোনিয়াল সেন্টার হিসেবে টোকিওর উদ্ভব, পূর্ব এশিয়াকে এক নির্দিষ্ট বয়ানে আবদ্ধ করে ফেলার প্রবণতা, এবং ঠাণ্ডা লড়াই উত্তর দুনিয়ায় সে থেকে বেরিয়ে আসা বিষয়ক আলোচনায় এশিয়াকে একটি মেথড হিসেবে পড়তে হবে (তাইওয়ানের স্কলার কুয়ান সিং-চেন এ নিয়ে একটি বিখ্যাত বই লিখেছেন)। আমাদের দেশের পপুলার কালচার, সিনেমা আর পাল্প ফিকশনে পূর্ব এশিয়ার উপস্থিতি কিন্তু একইভাবে এসেছে, স্বপনকুমার থেকে কিরীটী রচয়িতার কালো ভ্রমর সিরিজ মনে করুন। বাংলা সিনেমায় নানাভাবে পূর্ব এশীয় চরিত্র এসেছে, সে মৃণাল সেনের ‘নীল আকাশের নীচে’র চীনা হোক বা সত্যজিতের ব্যোমকেশে জাপানি পর্যটকের ছদ্মবেশ। আর পথের দাবী অবলম্বনে ‘সব্যসাচী’র কথা তো বলাই বাহুল্য (বাংলা সিনেমায় পূর্ব এশিয়ার উপস্থাপন নিয়ে  ফেলিসিয়া চ্যান, এঞ্জেলিনা কারপোভিচ ও জিন ঝ্যাং সম্পাদিত পূর্ব এশীয় সিনেমা ও টেলিভিশনে জঁর আলোচনার সংকলনে মধুজা মুখোপাধ্যায়ের রচনাটি দ্রষ্টব্য)।  দিবাকর নিজেও সাক্ষাৎকারে পথের দাবী, কালো ভ্রমর প্রসঙ্গ এনেছেন। তাঁর ছবি ব্যোমকেশকে পরিচিত করে এক পপুলার কালচারাল আইকন হিসেবে, অন্তত এই আইকনের মেকিং এর জায়গাটা স্পষ্ট করতে চায় ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সি’। ইচ্ছাকৃতভাবেই তাই এই ছবি এবং বিশেষ করে তার শেষাংশ পূর্ব এশীয় গ্যাংস্টার ছবি বা ইয়াকুজা ফিল্ম এবং সেই ছবির স্পুফকে মনে পড়ায়। তাকেশি মিকের ‘ফর লাভ’স সেক’ বা আপিচ্যাটপং উইরাসীথাকুলের ‘অ্যাডভেঞ্চার অব দি আয়রন পুসি’ যেমন এক্সটেণ্ডেড স্পুফ। স্পুফের ক্ষেত্রে নানা আশ্চর্য কাণ্ডকারখানা থাকা স্বাভাবিক,  একধরনের সাসপেনশন অব ডিসবিলিফ এজাতীয় ছবি দাবী করবেই। আর ইয়াকুজা ফিল্মের ক্ষেত্রে তাকেশি মিকে বা পেন-এক রাতানারুয়াংয়ের ছবি আজ ফেস্টিভ্যাল সার্কিটে নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করেছে। দিবাকরের কাজে এঁদের প্রভাব আছে বলেই আমার মনে হয়েছে। 

এই ক্রস জেনেরিক মহাযজ্ঞের আয়োজনে ব্যোমকেশ এবং শরদিন্দু ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে রয়েছেন, কেননা ৪০ এর দশকের শহর তার নানা অনুপুঙ্খ বাস্তবতায় অন্য কোন গোয়েন্দা কাহিনীতে আসতে পারে না। আর নোয়ার উপাদান শরদিন্দুর রচনায় প্রভূত, ব্যোমকেশের কাহিনীর ডার্ক, সিনিস্টার চেহারায় তার ছাপ আছে, আছে যৌন ঈর্ষা আর এসপিওনেজের কাহিনীতে (মগ্ন মৈনাক মনে করুন)। এই প্রতিটি উপাদানই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী এশীয় উপনিবেশগুলির ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত, এবং যুক্ত ফিল্ম নোয়ার সঙ্গে। হালফিলের ইউরোপের শ্রেষ্ঠ নির্মাতারা নোয়ার মোড়কে তাই মুড়ে ফেলছেন উত্তর-ঔপনিবেশিক শহরের মিথ আর বাস্তবতা (হোয়াও পেদ্রো রডরিগেজ ও হোয়াও রুই গেরা দা মাতার সাম্প্রতিক ‘দ্য লাস্ট টাইম আই স ম্যাকাও’ উল্লেখ্য)। 

দিবাকরের প্রচেষ্টা তাই সমকালীন (কোন তুলনার মধ্যে যাচ্ছি না, যাওয়াটা উচিত নয়) এবং তাঁর ব্যোমকেশ তাই দর্শককে সঙ্গে নিয়েই ইতিহাসে প্রবেশ করে।  

 



577 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ আলোচনা 
শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 3 -- 22
Avatar: পরিচয়

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

ভারতে জঁর কিভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে তা নিয়ে নানা তর্ক রয়েছে। যেমন ওয়েস্টার্ন। নিজের মতো করে একে ভারতীয় প্রেক্ষিতে অ্যাডাপট করেছেন অনেকে, হিন্দিতে সবচেয়ে স্মরণীয় উদাহরণ অবশ্যই শোলে, এছাড়াও তেলুগুতে অনেক ওয়েস্টার্ন হয়েছে। তেমনই নোয়ার উদাহরণ ভারতে সেই ৪০ এর দশক থেকেই রয়েছে, ছবিতে noir-ish উপাদানের উপস্থিতি রয়েছে। গুরু দত্তের 'আর পার' মনে করুন। সেসময় এধরনের বেশ কিছু ছবি হয়েছে। আর হালফিলের 'মনোরমা সিক্স ফিট আন্ডার' এর কথা তো বলেইছি লেখাতেই। --পরিচয়
Avatar: কল্লোল

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

আমরা গোলা পাব্লিক কি করি বলুন তো!! ছবিটা দেখবো? পরিচয় পড়ে মনে হলো দেখা উচিৎ। তা না হলে কি যে হারাবো তা বুঝেই পাবো না। আবার অভিষেক পরে তো মনেই হলো, এ আর দেখে কি হব্বে!! সুমন পড়ে মনে হলো, তা বেশ। বন্দ্যোপাধ্যায়-ব্যানার্জির লড়াই, না মানে, ঠিক লড়াই না, ঐ ইয়ে আর কি!
কি করি বলুন তো?
অবশ্য, ব্যাঙ্গালোরে কি চলছে?
Avatar: সুরজিত্‍ সেন

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

এই প্রথম একটি পাঠযোগ্য রিভিউ পড়লাম। আশা করি, অদূর ভবিষ্যতে বাঙালি ফিল্ম অডিয়েন্স সাবালক হয়ে উঠবে। অবশ্য যে বাঙালিকে ভারত এখনও সত্যজিত আর ঋত্বিক( ২০১৩ সালে জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত ছবি দুটি হল ১. মেঘে ঢাকা তারা - কমলেশ্বর (দেখেছি - পরিচালকের অশিক্ষা আর ঋত্বিকের অপব্যাখ্যার শেষ কথা ২. অপুর পাঁচালি - কৌশিক (দেখিনি) দিয়েই চেনে তার পক্ষে তার পক্ষে কতদূর সাবালক হয়ে ওঠা সম্ভব কে জানে ! আজ বাঙালির সম্বল শুধু 'রণে বনে জঙ্গলে...............
Avatar: জলপাই

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

অবশ্যই দেখবেন। আমি আজ দেখব ভাবছি।
Avatar: শতঞ্জীব গুপ্ত

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

সিনেমাটা এখনও দেখা হয় নি। কিন্তু লেখাটা ভালো লাগলো। বিশেষ করে ছবির গ্রীক সিনেমাটোগ্রাফারের কাজ নিয়ে নিয়ে যে অংশটা লিখেছেন।আমার নিজের ধারনা যে ডিজিট্যাল সিনেমাটোগ্রাফির এই যুগটায় সিনেমাটোগ্রাফাররা তাঁদের স্বাতন্ত্র হারাচ্ছেন। স্যুটিংটাই হচ্ছে বিশেষ ধরনের ‘গ্রেডিং’-এর কথা মাথায় রেখে। যেখানে ‘কালারিস্ট’-এর একটা বড়ো ভূমিকা। সিনেমাটোগ্রাফার ও পরিচালকের image aesthetics– এর মতো করে গ্রেডিংটাকে সাজানো একটা কঠিন কাজ। দেশী-বিদেশী অধিকাংশ ছবির সিনেমাটোগ্রাফিতেই আজকাল তাই একধরনের মেধাহীনতা দেখতে পাই। এই সময়ে দাঁড়িয়ে হার্ড ও ডিরেকশনাল লাইটিং-কে ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করাও একটা বড়ো ব্যাপার।সেটাই কিন্তু অতীতের বহু সিনেমায় “noir র উপযোগী আলো ছায়ার এক্সপ্রেশনিজম” কে তৈরী করত।

এই সিনেমাটোগ্রাফারের সঙ্গে দিবাকরের কাজ কিন্তু সেই LSD, সাংহাইতেও ছিল। মনে হচ্ছে এঁদের জোট আরো মজবুত হচ্ছে।

ইদানীং নানান ঘটনাচক্রে বড়ো পর্দায় ছবি দেখা হচ্ছে না প্রায়। তবে এটা সেভাবেই দেখতে ইচ্ছে করছে।
আপনি তো অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন বলে জানতাম। তা ওখানেও কি রিলিজ করেছে ছবিটা, বড়ো পর্দায়?


Avatar: parthapratim

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

স্পেক্টাকুলারএক্সপেরিএন্স
সেট থেকে শুরু করে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক টু অসাধারণ ক্যামেরার কাজ।দিবাকর ব্যানারজির এই কাজ আমার বহুদিন মনে থাকবে। সুশান্ত এর অভিনয় সন্মন্ধে অনেকের অভিযোগ যে এটি ছ্যাবলা ব্যোমকেশ.... কিন্তু মনে রাখতে হবে এটি ব্যোমকেশ এর সূচনা। আর দিবাকর বুদ্ধিমান এর মত ব্যোমকেশ কে একজন রক্তমাংসের যুবক হিসেবেই দেখিয়েছেন। পারসোনালিটি দেখাতে গিয়ে ভেতরের মানুষ টাকে মেরে দেননি। এটি অত্যন্ত সমকালীন কাজ। পরিণত ব্যোমকেশ দেখতে হলে শজারুর কঁাটা দেখুন গিয়ে। ভাল লাগবে এ ব্যোমকেশ অন্য জিনিস। মনে রাখতে হবে এ ব্যোমকেশ ভেতো মোটেই নয়। সে মুঙ্গেরের থেকে কলকাতায় আসে। এ বাংলার তিন কোটির ব্যোমকেশ নয় । বরং চৌত্রিশ কোটির ব্যোমকেশ। শুধু বাঙালীবাবু দের দিকে তাকিয়ে এ ব্যোমকেশ রহস্য সন্ধানে নামেনি। অতিতে দাড়িয়েও এ ব্যোমকেশ আধুনিক। বেমানান একটুও নয়। বড় কৃতিত্ব হয়তো অসাধারণ সেট। প্রাক স্বাধীনতা র ক্যালকাটা অসাধারন ভাবে রহস্যময় আলোর স্মৃতিচারণায় ফুটে উঠেছে। গতি সঞ্চার করেছে আবহ সংগীত। ক্যামেরার কাজ এককথায় ইউনিক (Y)। ছবিতে অজিত মোটেই ব্যোমকেশের লেজ নয়।। সে ব্যোমকেশকে চড়ও মারে। এই যুগান্তকারী ঘটনা মনে করিয়ে দেয় অপুর সেই চড় মারার কথা যাও সমালোচনাতে বিদ্ধ হয়েছিল। আর বক্সীর এই নবরূপী ভাষ্য যাদের পছন্দ হয়নি তাদের মনে করিয়ে দিই যে কমিক্স থেকে শুরু করে গ্রাফিক নভেল ; সিরিয়াল মুভি কোন কিছুতেই এই "পরিবর্তন " খুবই ডমিন্যান্ট একটি ফ্যাক্টর।যারা জাস্টিস লিগ পড়েছেন তারা জানেন সেখানের ব্যাটম্যান সুপারম্যান চরিত্ররা ঠিক পরিচিত নয়। রবার্ট ডাউনি জুনিয়র যখন শারলক হোমস করেন তিনি কতটা ডয়েলের টেক্সট এর প্রতি অনুগত থাকেন তা বিশ্লেষণ এর বিষয়। এমনকি আধুনিক প্রযুক্তিকে সাথে করে যখন শারলক টিভিতে আসে তখন তাকে দেখে অবাক লাগলেও সেই কেত দেখে আমরা সবজান্তা র মত ঘাড় নেড়ে হাতিতালি দিই। কিন্তু যখন ব্যোমকেশ কে যখন বাঙালীর বর্মী Bakshi থেকে সারা ভারত তথা পৃথিবীর জন্য Bakshy বানানো হয় আর সারা ভারত যখন তার প্রশংসা করে তখন আর তা আমাদের ভালো লাগে না। কারণ আমরা তো বেশি বুঝি।।। আর ব্যোমকেশ তো আমাদের। আমরা যা বলবো তাই হবে মনে করিয়ে দিই সে যুগ আর নেই। যখন সারা পৃথিবী দ্রুত গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হচ্ছে তখন এই ফালতু আঞ্চলিক আর তথাকথিত নস্টালজিক কথাবার্তা র কারণ বুঝি না। ব্যোমকেশ কে সত্যান্বেষী না বলে ডিটেকটিভ কেন বলা হল তা নিয়ে হচ্ছে বাদবিবাদ। আরে বাবা সত্যান্বেষী কথাটা কি সারা ভারতের মানুষ জানেন না Truth Seeker Byomkesh Bakshy দিলে নামটা খুব ভাল শোনাত।
ব্যোমকেশ কে অন্য লেভেলে নিয়ে গেছেন দিবাকর। সে শুধু সত্যের সন্ধান ঈ করে না। বুদ্ধি খেলিয়ে কলকাতা শহর কে ধ্বংস এর হাত থেকে রক্ষাও করে। অসাধারন যৌবন অহংকার বা স্বদেশপ্রেমীকতায় সে ব্রিটিশ পুলিশের ও সাহায্য নেয় না। কাহিনীর বিস্তৃতি বিশাল আর শরদিন্দু থেকে অনেক জটিল। একমাত্র হয়তো অমিতাভ ঘোষের Sea of Poppies trilogy এর কাহিনীবিস্তৃতির সাথেই এর মিল পাওয়া সম্ভব। কারন ওই উপন্যাসের মত এখানেও দেখানো হয়েছে ব্রিটিশ কর্তৃক ভারতে আফিম চাষ আর চীন দেশে এ সেই আফিমের রমরমা ব্যাবসা। গল্পে জাপানীদের গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ একটা ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া। জাপানীদের আফিম ব্যাবসাতে নামার ইচ্ছে ও কলকাতা কে তাদের আফিম সিটি করার ভয়ানক প্ল্যানেই এই সিনেমার ক্লাইম্যাক্সস অসয্য সাসপেন্স হয়ে ওঠে। হলিঊড সাউথ আর কোরিয়ান ফিল্মের থেকে সর্বগ্রাসী কপি র বাজারে এরিকম একটি অরিজিনাল গল্পের থেকে তৈরী সিনেমা বাংলা সাহিত্যের ও মর্যাদা বৃদ্ধি করলো।যারা এর রসগ্রহণে অসমর্থ হয়েছেন তাদের প্রতি আমার সাজেশন আপনারা শরদিন্দু আর ফেলুদার গল্পো যেমন আগে যেমন পড়ে নিয়ে তারপর হলে সন্দীপ রায় বা অঞ্জন দত্তের তার মুভি এডাপটেশন দেখতে গিয়ে পড়া বিষয় পুরোপুরি সিনেমার পরদা য় উদ্ভাসিত হতে দেখে নিজেও আপন বোধগম্যতার আনন্দে উচ্ছসিত হয়ে উঠতেন তাই উঠুন। এ ব্যোমকেশ ভারতীয়।। and not so much a বাঙালী। সিনেমার অসাধারন এন্ডিং বুঝিয়ে দদেয় আরো ব্যোমকেশ আসছে। তার গতি কোন নব্যবঙ্গীয় রোধ করতে পারবে বলে মনে হয় না। আপাতত তার অপেক্ষায় আছি। তা এই বিহারী ব্যোমকেশের চালচলন দেখে মনে হল সে কলকাত্তাইয়ান কুয়োর ব্যাঙ হয়ে কাটাবে না। Most likely পরের ব্যোমকেশ এই হয়তো এই ভারতীয় সুপার স্লিউথ এর আন্তর্জাতিক পটভূমিকাতে দেখা যাবে। And I am eagerly waiting to see our very own Byomkesh Bakshi (or Bakshy whatever) goes International.
#NB অনেকে অভিযোগ করেছেন সিনেমাতে তারান্তিনো থেকে কোরিয়ান থ্রিলার টু শারলক অনেক কিছু অনুকরণ করা হয়েছে। আমার সেরকম কিছু মনে হয়নি তবে সিনেমাটা দেখে বুঝতে পেরেছি যে দিবাকর চাইনিজ আর হংকং ফিল্মস ; তারান্তিনো শারলক এসব অসাধারন আত্মস্থ করেছেন এবং তার ফলস্ব্ররূপ তার এই ফিল্মে সেসবের রেফারেন্স সিনেমাটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে আর সিরিয়াসলি বলছি সিনেমাটি থেকে এই রেফারেন্স গুলো খোঁজার সময় আমি নিজে রহস্যসমাধানের স্বাদ পেয়েছি।Its not copy but assimilation.
আমার রেটিং ৮.৫/১০
আর শোলের পর আবার একটি অসাধারন ভিলেন চরিত্র উপস্থাপনা করা র জন্য নীরজ কবিকে পিঠ চাপড়ানি
Avatar: জলপাই

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

খাসা সিনেমা। কল্লোলদা দেখে নিন।
Avatar: গোলা বাংগালী

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

বাংলা পাঠক/দর্শকের প্রিয় চরিত্র বোমকেশকে নিয়ে একজনা আন্তর্জাতিক আঁতেলের বানানো ফিলিম কেন বাংগালী দর্শক দেখবে তা এই প্রতিবেদন পাঠের দুঃ্সাহসিক চেষ্টা কোরে বোধগম্য হোল না। যাঁরা এখানে প্রতিবেদকের পিঠ চাপড়ালেন তাঁরা যে খুব উঁচু ডালের আঁতেল এটুকু বুঝেছি। কিন্তু বেনাবনে এই মুক্তো বিতরন কেন। আপনেরা অনেক বিদ্যে বোঝাই, এটা বোঝাবার জন্য?
Avatar: b

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

কিন্তু নষ্টনীড়ের গল্প নিয়ে ঘেঁটে ঘ করে বানানো চারুলতা কি বাঙালী দর্শক দেখে নি?
Avatar: সিকি

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

এমনকি গু গা বা বা ও তাই। মূল গল্পের থেকে দিব্যি আলাদা।
Avatar: পরিচয়

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

শতঞ্জীববাবুকে উত্তর দিয়েছি ফেসবুকেও। হ্যাঁ, অস্ট্রেলিয়াতেই আছি আমি, এবং এ দেশে ছবি রিলিজও করেছে। থিয়েটারে দেখেই এটা লেখা।
Avatar: Srabani Dasgupta

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

দু খন্ড বোমকেশ মন থেকে সরিয়ে রেখে সিনেমা তা দেখলাম , মন্দ লাগে নি । তবে ওই র কি ---- সিনেমার নাম তা যা খুশি দেয়া যেতে পারত ।
চরিত্রের নাম আর গুটি কয়েক গল্পের বিভিন্ন অংশ মিশিয়ে সিনেমা টা কিন্তু খাসা ।
Avatar: গোলা বাংগালী

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

তাহলে ব্যোমকেশ নামটা শুধু ভুল বুঝিয়ে বাড়তি দর্শক টানার কৌশল মাত্র? তাহোলে ডিটেকটিভ স্বপনকুমার লিখলে কোন দোষ ছিল কি?
Avatar: b

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

অচলপত্রে বেরিয়েছিলো। "সত্যজিৎবাবু সিনেমার নাম চারুলতা না রেখে একটি দূরবীনের জীবন-ও-মৃত্যু রাখতে পারতেন। "
Avatar: গোলা বাংগালী

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

তুলনা চলে কি? সত্যজিত কিন্তু মূল গল্পের নামটা পাল্টেছিলেন এবং গল্পকে মূলতঃ অনুসরন কোরেছিলেন।
Avatar: b

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

হ্যাঁ, সত্যজিত বাবু বলে একুশ খুন মাপ।
Avatar: hu

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

সত্যজিৎবাবু চিড়িয়াখানার গল্পটাও তো বদলে ছিলেন। ব্যোমকেশ কস্মিনকালেও মেকাপ নিয়ে জাপানী সাজে নি।
Avatar: দী

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

পার্থপ্রতিম-কে: টিভির শার্লক অত্যন্ত খাজা লেগেছিল। মানে ইংরেজি বলিউড মনে হচ্ছিল, ওই স্লামডগের মত।
Avatar: গোলা বাংগালি

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

সত্যজিত বাবুকে মাফ কোরতে হবেনা। বরং আপনাদের পরমরমণীয় ফিলিমটির নাম রাখুন আন্তর্জাতিক মশলায় জারানো বোমকেশ ঘন্টো।
Avatar: সোম

Re: ব্যোমকেশের (অ)বিনির্মাণ

উরেস্শাবাস, লোকটা কত কিছু জানে রে। আদ্ধেকটা লেখা তো মাথায়ই ঢুকলো না।
তবে মনে হলো যে দেখতেই বলছে । তাহলে দেখবখন ।
তবে আমাদের মতন মধ্য মেধা টাইপ লোকজনে বুঝতে পারবে তো?



মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 3 -- 22


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন