বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

চিরন্তন কুণ্ডু



শমী তুই ?
-    - বল না কে ?
শমীর মা ?
-    - না, শমী শমী শমী ।
কেমন আছিস ?
-    - আমি ছুটে এসেছি । খুব দূরে ছিলাম । যেন আর একটা জগতে ।  কে যেন ডাকল ।
আমাদের সঙ্গে তোর যোগ আছে ?
-    - ভুলে যাই মাঝে মাঝে । কিন্তু যখন মনে পড়ে, সে এক মজা ।
তোর মা তোর কাছে থাকেন ?
-    - ইচ্ছে করলেই ছুটে আসি । কিন্তু দূরে থাকলে বড় ভাল লাগে ।
বেলাদিদি, রানিদিদি - তাদের দেখতে পাস ?
-    - বেলাদিদি আর আমি অনেকক্ষণ থাকি ।
বেলাদিদির সঙ্গে ভালবাসা আছে ?
-    - খুব । কিন্তু আমি ভারি চঞ্চল, তাই তিনি রাগ করেন ।
এখানকার দাদাকে মনে আছে ?
-    - সব মনে আছে । মাঝে মাঝে ভুলে যাই । যেদিন মনে পড়ে, সেদিন আমার ছুটির বেলা ।
শান্তিনিকেতন মনে পড়ে ?
-    - পড়ে । ভারি মজার । ধ্রুবকে মনে পড়ে ।
ভোলা তোর কাছে যায় ?
-    - আমি গিয়েছিলুম, কিন্তু সে কেমন যেন ।
তোর জ্বর হলে আমি কবিতা পড়তুম, মনে আছে ?
-    - সব মনে আছে । যখন মনে করতে বসি, মনে হয় যেন ছবি দেওয়া গল্পের মতো ।
কোন কবিতা মনে পড়ে ?
-    - মনে কর যেন বিদেশ ঘুরে, মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে ।
‘পঞ্চনদীর তীরে’ মনে আছে ?
-    - খুব সুন্দর, কিন্তু আমার মুখস্থ ভুল হয়ে যায় । আগেও কি হত ?
শিলাইদার বোট মনে পড়ে ?
-    - পড়ে । এখানে জল আছে তেমনি । কিন্তু শান্তিনিকেতন নেই – কোথাও নেই ।
শান্তিনিকেতন মনে আছে ?
-    - সব মনে নেই । আমায় একটা খবর দিতে পার ?
কী খবর ?
-    - বেলাদিদি কি আসবেন ?
ডেকে দে ।
-    - আচ্ছা থাক, আমি যাচ্ছি ।

এই সংলাপ রবীন্দ্রনাথ ও শমীন্দ্রনাথের । তবে মুখোমুখি নয় । রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠ পুত্র শমী মারা গেছেন ১৯০৭ এ, মাত্র এগারো বছর বয়সে । আর এই আলাপ ১৯২৯ এর ৬ই নভেম্বর । প্ল্যানচেট টেবিলে মিডিয়ামের মাধ্যমে ।
বাংলার অনেক বিখ্যাত মানুষই মৃত্যুপারের অস্তিত্ব নিয়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছেন । এঁদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেরা প্ল্যানচেটচর্চা করেছেন । দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এরকম এক আসরে প্রয়াত ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের আত্মার কাছে অরবিন্দের মামলার দায়িত্ব নেবার নির্দেশ পেয়েছিলেন । সাহিত্যিকদের মধ্যেও বেশ কয়েকজন এই পথের পথিক হয়েছিলেন । রবীন্দ্রনাথ তাঁদের মধ্যে একজন । জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে মাইকেল মধুসূদনের যাতায়াত ছিল । রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে একবার প্ল্যানচেটে মাইকেলকে আনার কথা রয়েছে – “আমাদের বাড়িতে মাইকেলের গতিবিধির পরে আমার জন্ম । আমি তাঁকে দেখিনি । একবার প্রেতবাণীবহ চক্রযানে তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, সেটা সাক্ষ্যরূপে আদালতে গ্রাহ্য হবে না ।“ এটা সম্ভবতঃ ছোটবেলার কথা । ১৮৮০-৮১ সালেও রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে ঠাকুরবাড়িতে এরকম চক্র বসত । স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর পরেও তিনি নাকি অনেকবার স্ত্রীকে এনেছিলেন । এমনকি প্ল্যানচেটে মৃণালিনী দেবীর  সমর্থন না পাওয়ায় পুত্র রথীন্দ্রনাথের বিয়ের অনেক সম্বন্ধ ভেঙে যায় এবং শেষপর্যন্ত তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ীই বিয়েটা হয় ।
তবে এই অধ্যায়ের অনেকদিন পরে, ১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চার এক নতুন পর্ব শুরু হয় । তিনি জানতে পারেন তাঁর বিশিষ্ট বন্ধু এবং প্রয়াত অধ্যাপক মোহিতচন্দ্র সেনের কন্যা উমা দেবী ওরফে বুলা মিডিয়াম হয়ে থাকেন । এই খবর রবীন্দ্রনাথের কৌতূহল জাগাল, সন্দেহও । সেই বছরই ৬ই নভেম্বর তিনি চিঠিতে লিখছেন – “সেদিন বুলা এসেছিল । হঠাৎ কথায় কথায় প্রকাশ পেল তার হাতে প্রেতাত্মা ভর করে পেন্সিল চালিয়ে কথা কইতে পারে । বলা বাহুল্য শুনে মনে মনে হাসলুম । বললুম – আচ্ছা দেখা যাক । প্রথম নাম বেরোল মণিলাল গাঙ্গুলি । তার কথাগুলোর ভাষা এবং ভঙ্গির বিশেষত্ব আছে । উত্তরগুলো শুনে মনে হয় যেন সেই কথা কইছে ।”
প্রসঙ্গতঃ, এই মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় অবনীন্দ্রনাথের জামাই, সাহিত্যিক এবং নিজেও পরলোকচর্চায় উৎসাহী ছিলেন । ‘ভূতুড়ে কাণ্ড’ বলে একটা বইও লিখেছিলেন তিনি । যাইহোক, এই পর্বে চক্রের অধিবেশন নিয়মিত বসতে শুরু করল । মিডিয়াম হিসেবে উমা দেবীকে ভর করে রবীন্দ্রনাথের ডাকে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে আছেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, কাদম্বরী দেবী, মৃণালিনী দেবী, কন্যা মাধুরীলতা, শমীন্দ্রনাথ, মেজদাদা সত্যেন্দ্রনাথ, ভাইপো হিতেন্দ্রনাথ ও বলেন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথের স্ত্রী সাহানা দেবী, ভাইঝি অভিজ্ঞা, মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়, কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, সুকুমার রায়, বন্ধু মোহিতচন্দ্র সেন, শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন অধ্যাপক সতীশচন্দ্র রায় ও অজিতকুমার চক্রবর্তী প্রভৃতি । এছাড়া অপরিচিত কেউ কেউ না ডাকতেই চলে এসেছেন । এই সব আসরে উমা দেবীর হাতে এমন সব কথা বেরিয়ে আসতে থাকে যে রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক সন্দেহ ক্রমে ধাক্কা খায় । শুরুতে যে কথোপকথন রয়েছে, তার মধ্যেও এরকম নমুনা রয়েছে । কিছুদিনের মধ্যেই এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে লিখছেন – “বুলা তার পরে আরেকদিন এসে পেন্সিল ধরেছিল । এদিনও ভাববার মতো অনেক লেখা বেরিয়েছে । একটা বড় আশ্চর্য কথা পাওয়া গেছে । শমী এসেছিল । অন্য অনেক কথার মধ্যে সে বললে – ‘শান্তিনিকেতনের ধ্রুবকে আমার মনে পড়ে’ । সে অনেক দিনের কথা । ধ্রুব এবং আর দুটি ছেলে শান্তিনিকেতনে আমারই বাড়িতে শমীর সঙ্গে একত্রে ছিল । বেলা তাদের দেখাশোনার ভার নিয়েছিল – তাদের পড়াশোনাতেও সাহায্য করত । ওর নাম যখন উঠল আমি কিছুতেই মনে আনতে পারলাম না । অপূর্ব বললে, হাঁ ধ্রুব বলে এক ছাত্র ছিল । রাত্রে বিছানায় শুয়ে হঠাৎ ওই তিনজনের কথা মনে পড়ল । ধ্রুবকে বেলা খুবই স্নেহ করত । তার কথা শমীর মনে পড়বে এটাই সঙ্গত । কিন্তু বুলার হাত থেকে একথা বের হলো কী করে ? শমীর কথাগুলি ভারি মজার রকমের । সুকুমারের কথাও খুব যেন তারই মতো । মোহনলাল এগুলো লিখে নিয়েছে, কোনো এক সময়ে দেখতে পারো ।”
এই সব আসরের সংলাপ থেকে জানা যায় ভাইঝি অভিজ্ঞা এসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর জন্য বোটে কী গান লিখেছিলেন সেই প্রশ্নের উত্তরে ‘তুমি রবে নীরবে’ গানটির কথা জানিয়েছেন । সুকুমার রায় দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন ইউরোপে রবীন্দ্রনাথের ছবির সমাদর হবে, পুত্র সত্যজিৎকে শান্তিনিকেতনে নেবার জন্যও অনুরোধ করেছেন । মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন মিডিয়াম কাউকে ভাবতে থাকলে তার কাছে খবর পৌঁছয় “হাওয়ার ভিতর দিয়ে । এ এক রকমের wireless ।” কন্যা মাধুরীলতার কথায় তিনি ‘তপতী’র অভিনয়ের সময় উপস্থিত ছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথকে যুবাবেশে সুন্দর মানিয়েছিল । সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এসে ‘পলাতকা’-র ‘মুক্তি’ কবিতাটি শুনতে চেয়েছেন । এই আসরের অভিজ্ঞতা রবীন্দ্রনাথের সন্দেহের মূলে ভালরকম নাড়া দিয়েছিল বলেই মনে হয় । পরবর্তীকালে মৈত্রেয়ী দেবীর সঙ্গে আলাপে বলেছিলেন – “যা সিস্টেমেটিক্যালি প্রুভড হবে না, তাতেই অবিশ্বাস ! কটা বিষয় প্রমাণ হয়েছে সংসারে ? তাছাড়া এমন কিছু থাকা সম্ভব, যা প্রমাণ হয়নি, হতে পারে না । কারণ তা সব মানুষের কাজের গম্য নয় । সে গোপনে থাকবার জন্যই meant. দৈবাৎ কোন কোন মুহূর্তে কোন কোন বিশেষ ব্যক্তির মনে তার এতটুকু প্রকাশ পায়, কিন্তু প্রমাণ করবার মত কোন স্থূল চিহ্ন রেখে যায় না । এই তো, (বুলা) কী রকম করে সব লিখত বল তো ? আশ্চর্য নয় তার ব্যাপারটা ? … ও কেন মিছে কথা বলবে ? কী লাভ ওর এ ছলনা করে ? … এমন সব কথা লিখেছে যা ওর বিদ্যাবুদ্ধিতে কখনও সম্ভব নয় । যদি স্বীকার করবে, একটুও সময় না নিয়ে আমি প্রশ্ন করা মাত্র তার ভাল ভাল উত্তর, উপযুক্ত উত্তর ও ফসফস করে লিখে যেতে পারে তাহলে ওকে অসামান্য বলে মানতে হয় । আমি কী প্রশ্ন করব, তা তো আর ও আগে থেকে জানত না যে প্রস্তুত হয়ে আসবে ? এই ধর না, নতুন বৌঠান আমার সঙ্গে কী রকম ভাবে কথা বলতে পারেন, তা ওর পক্ষে বোঝা শক্ত । তিনি বললেন – ‘বোকা ছেলে, এখনও তোমার কিছু বুদ্ধি হয়নি’ । একথা এমনি করে তিনিই আমায় বলতে পারতেন । ওর পক্ষে আন্দাজ করে বলা কি সম্ভব ? তা ছাড়া আরও অনেক কথা লিখেছিল, যা ও জানতে পারে না বা তেমন করে প্রকাশ করতে পারে না । একবার একটা খাঁটি  কথা লিখলে – ‘তোমরা আমাদের কাছে এত রকম প্রশ্ন কর কেন ? মৃত্যু হয়েছে বলেই তো আমরা সবজান্তা হয়ে উঠিনি ।’ কত অদ্ভুত অদ্ভুত কথা সে লিখেছিল, অনেক বোঝাও গেল না । শমী বলছে – ‘আমি বৃক্ষলোকে আছি, সেখানে এক নূতন জগৎ সৃষ্টি করছি ।’ কে জানে কী তার মানে । যে রকম দ্রুত গতিতে লিখে যেত, আশ্চর্য লাগত । একটা কথা শুনে তার অর্থ বুঝে উত্তর লিখে যাওয়া, এক মুহূর্ত বিরাম না করে, আমি তো মনে করি না যে সহজে সম্ভব ।”
রবীন্দ্রনাথের এই চর্চাকে তাঁর সচিব কবি অমিয় চক্রবর্তী ‘মহাপৌরুষেয় ছেলেমানুষী’ আখ্যা দিয়েছেন । কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজে একে ছেলেমানুষি ভাবতেন না । তথাকথিত যুক্তিবাদের  চৌহদ্দিতে আটকে থেকে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করার পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না । “পৃথিবীতে কত কিছু তুমি জানো না, তাই বলে সে সব নেই ? কতটুকু জানো ? জানাটা এতটুকু, না-জানাটাই অসীম । সেই এতটুকুর উপর নির্ভর করে চোখ বন্ধ করে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া চলে না । আর তাছাড়া এত লোক দল বেঁধে ক্রমাগত মিছে কথা বলবে, এ আমি মনে করতে পারিনে । তবে অনেক গোলমাল হয় বই কি । কিন্তু যে বিষয়ে প্রমাণও করা যায় না, অপ্রমাণও করা যায় না, সে সম্বন্ধে মন খোলা রাখাই উচিত । যে কোন একদিকে ঝুঁকে পড়াটাই গোঁড়ামি ।” বলা বাহুল্য, প্রথাভাঙা এই মানুষটি পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি ।
বুলার অকালমৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথের এই প্ল্যানচেটপর্বও শেষ হয় । তবে তাঁর পরলোকচর্চার প্রসঙ্গে ইতি টানবার আগে শমীন্দ্রনাথের কথায় একবার আসা কর্তব্য । এই সন্তানটি আকৃতি প্রকৃতিতে অনেকটা বাবারই মতো । রথীন্দ্রনাথের কথায় – “বড় হলে সে যে কবি হবে, বাবার প্রতিভা তার মধ্যেই প্রকাশ পাবে, আমার সন্দেহ ছিল না ।” মা-মরা এই সন্তানটিকে রবীন্দ্রনাথ সঙ্গে সঙ্গে রাখতেন । বন্ধু ভোলার সঙ্গে মুঙ্গেরে বেড়াতে গিয়ে কলেরায় আক্রান্ত হলেন শমী । রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন থেকে ছুটে গেলেন । কিন্তু তাঁর চিকিৎসা ও সেবাকে ব্যর্থ করে শমীর মৃত্যু হল । গঙ্গার ঘাটে শেষকৃত্য করলেন রবীন্দ্রনাথ । প্ল্যানচেটের পর্বে শমী এসেছেন অনেকবার । কখনো বলেছেন মৃত্যুর পরে তিনি নদীর ধারে দাঁড়িয়েছিলেন এবং সে নদী মুঙ্গেরের গঙ্গা, রবীন্দ্রনাথের নতুন কোন কবিতাকে বিশ্রী বলেছেন, কখনো বলেছেন রবীন্দ্রনাথের কাজ দখিন হাওয়ার মত আর তাঁর কাজ যেন ঝড়ের হাওয়া । আরো বলেছেন তিনি সেখানে অন্য এক জগৎ তৈরি করছেন, আবার বাবাকে ফরমাশ করেছেন ‘শমীর পৃথিবী’ নাম দিয়ে ছবি বা লেখার মধ্যে দিয়ে একটা রচনা করতে যা নাকি সেই সৃষ্ট জগতের সঙ্গে মিলতে হবে । অসহায় বাবা পুত্রের কাছে খবর না পেয়ে অন্যদের কাছে এই নতুন জগতের সন্ধান করেছিলেন, কিন্তু পুত্রের তা পছন্দ হয়নি । পরবর্তী সংলাপে এই চঞ্চল বালক ও তাঁর স্নেহবুভুক্ষু পিতার একটা অন্তরঙ্গ পরিচয় রয়েছে ।

আস্তে আস্তে লেখ না বাছা । তুই বড়ো দুরন্ত ।
-    - তুমি কেন মণিদার কাছে জিজ্ঞেস করলে ? আমার কাছে বুঝি জিজ্ঞেস করবে না ?
তুই যে জবাব দিস না, তাই ।
-    - বলব, আগে তোমার হোক সৃষ্টি ।
আগে আমার হবে ? আমি কি তোর পৃথিবী ভাবতে পারি ? বলই না কেমন করে জানব তোর পৃথিবী ?
-    - আচ্ছা, শান্ত হবো । রাগ করছো ?
আমি রাগ করিনে । তুই কাছে এলে খুব খুশি হই ।
-    - মজা লাগে আসতে, তাই ছুটে আসি ।
আচ্ছা লক্ষ্মী ছেলে, ধীরে ধীরে একটা ছবি আঁক না । নন্দবাবু এখানে আছেন ।
-    - না সে হবে না । আমার যে কত কাজ !
তোর তো কাজের অন্ত নেই । তোর কী কাজ ?
-    - তুমিই তো ডাকলে ?
তুই এখানে কাজ করছিলি ?
-    - আর মণিদাকে কেন জিজ্ঞেস করলে ? যাও –
আচ্ছা, আর জিজ্ঞাসা করবো না । তোদের কি বিশ্রাম নেই ? তোদের ঘুম নেই ?
-    - বিশ্রামে কী মজা !
খুব মজা ? বিশ্রাম কি করিসনে ?
-    - করি, ক্লান্ত হলে ।
নিয়মমত বিশ্রাম করিস ?
-    - আমাদের তো বাতি নিবে যায় না ।
যেমন আমাদের নিবে রাত্তিরে কাজের পর, তোদের কি তেমনি আছে ?
-    - তা নেবে । অনেকে বসে বসে ঘুমোয়, ভাল লাগে না ।
মনের বাতি তো নেবে, শক্তির বাতি কি নেবে ?
-    - আমরা দুজন ঘুমোব, তাই জেগে আছি ।
কারা দুজন ঘুমোবি ? বেলা আর তুই ?
-    - কতদিন জেগে থাকব ?
তুই কি আমার সঙ্গে ঘুমোবি ?
-    - যাচ্ছি ।
কতদিনে আমার ঘুম আসবে ? তোর সঙ্গে কবে দেখা হবে ?
-    - মিডিয়ামকে একটু দয়া কর ।
আমার হাত দিয়ে বলতে পারবি ? আমার হাত তো বেশ ঠাণ্ডা ।
-    - ডাকছ, (তবে) পারবো না আসতে এখন ।

রবীন্দ্রনাথের প্ল্যানচেটচর্চা সত্যিই ওপারের সঙ্গে কথোপকথন হোক বা ছেলেমানুষি, এই সংলাপে প্রিয়জনের বিয়োগে ক্লান্ত এক অতিমানবের একান্ত হাহাকার শোনা যাচ্ছে – এ নিয়ে হয়তো বিতর্কের জায়গা নেই ।

প্রিয়জনবিয়োগের পর তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের আকাঙ্ক্ষায় প্ল্যানচেটচর্চায় আগ্রহী হয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের আরেক লেখক – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় । বাংলা তেরোশো পঁচিশ সনের ছয় অগ্রহায়ণ । প্রথমা স্ত্রী গৌরী দেবী ও শাশুড়ি কামিনী দেবী ইনফ্লুয়েঞ্জার আক্রমণে একই রাত্রে প্রয়াত হলেন । কিছুদিন পরেই বিভূতিভূষণের ছোট বোন মণি সন্তান প্রসব করতে গিয়ে মারা গেলেন । বিধ্বস্ত মানসিক অবস্থার মধ্যে বিভূতিভূষণ এক সন্ন্যাসীর দেখা পেলেন । কথায় কথায় সন্ন্যাসী জিজ্ঞেস করলেন তিনি মৃতা স্ত্রীকে দেখতে চান কিনা । সন্ন্যাসীর শাস্ত্রজ্ঞান দেখে আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি । কয়েকদিন যাতায়াতের পর গৌরীকে দেখার ইচ্ছে সন্ন্যাসীর কাছে প্রকাশ করলেন । সন্ন্যাসীই তাঁকে মণ্ডল – অর্থাৎ প্ল্যানচেটের - পদ্ধতি শিখিয়ে দিলেন ।
কিছুদিনের মধ্যেই প্ল্যানচেট নিয়ে মেতে উঠলেন বিভূতিভূষণ । কিন্তু পরে সেই সন্ন্যাসীকে আর খুঁজে পেলেন না । লোকের কাছে শুনলেন তিনি তীর্থভ্রমণে গিয়েছেন । অগত্যা নিজের উৎসাহে তিনি খুঁজে বের করলেন অন্য এক আস্তানা – কলেজ স্কোয়ারের থিওসফিকাল সোসাইটি । সেখানকার সভ্য হিসেবে নাম লেখালেন তিনি । আত্মা ও পরলোক বিষয়ক দেশবিদেশের বিভিন্ন  বই, পত্রপত্রিকার নাগাল পেলেন সেখানে । রবীন্দ্রনাথ থেকে দীনবন্ধু মিত্র, সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শিশিরকুমার ঘোষের প্ল্যানচেটচর্চার খবর জানতে পারলেন । সেখানকার প্ল্যানচেটের আসরেও যোগ দিলেন । টেকচাঁদ ঠাকুরের ‘অন দি সোল’ বইখানাকে মনে হল মৃত্যু আঁধারে এক জ্যোতিশিখা ।
প্ল্যানচেটের উৎসাহের সঙ্গেই আত্মার পরমতত্ত্ব জানতে উদগ্রীব হয়ে উঠলেন বিভূতিভূষণ । নতুন এক জগতের দরজা খুলে যাচ্ছে তাঁর সামনে । কিন্তু সাংসারিক বাধ্যতা তো এড়ানোর উপায় নেই । হুগলীর জাঙ্গিপাড়া গ্রামে দ্বারকানাথ হাইস্কুলে সহকারী প্রধানশিক্ষকের চাকরি নিয়ে যেতে হল তাঁকে । তাঁর মুখে প্ল্যানচেটের কথা শুনে সেখানেও স্থানীয় কিছু মানুষ আগ্রহী হয়ে উঠলেন । স্কুলবাড়িটা ভিড়ের বাইরে । অতএব সূর্যাস্তের পর সেখানেই আসর বসতে শুরু করল । বিভূতিভূষণের বন্ধু ইস্কুলের অস্থায়ী প্রধানশিক্ষক বৃন্দাবন সিংহরায়ও সেই আসরে যোগ দিলেন ।
কিন্তু গ্রামের একটা শিবিরে এই নিয়ে বিক্ষোভ দেখা দিল । তাদের আর্জি পৌঁছল শ্রীরামপুরের সাব-ডিভিশনাল অফিসারের কাছে । ব্যাপার খতিয়ে দেখতে এক সরকারি কর্তা এলেন । বিভূতিভূষণের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর তাঁর বিশ্বাসকে একরকম চ্যালেঞ্জই জানালেন এই পরিদর্শক – প্ল্যানচেটে বসবেন তিনিও, আত্মা আনতে পারবেন কি বিভূতিভূষণ ? বিভূতিভূষণের  পিছিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই নেই । আসর বসল । মিডিয়ামের হাতে নড়ে উঠল পেনসিল । হার মানলেন পরিদর্শক ।
‘দৃষ্টিপ্রদীপ’ এবং ‘দেবযানে’র লেখক পরলোক এবং জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন । জীবনের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী তাঁর হয়তো অবিশ্বাস করার উপায়ও ছিল না । প্রথম গল্প ‘উপেক্ষিতা’-র প্রকাশের সময় (পরে এই অংশটি বাদ যায়) তার মধ্যেও ছিল সেই অপার্থিবের ছায়া  – ‘এ আমি কাকে দেখলুম বলব ? আমাদের এই পৃথিবীর জীবনের বহু ঊর্ধ্বে যে অজ্ঞাত রাজ্যে অনন্তের পথের যাত্রীরা আবার বাসা বাঁধবে, হয়তো সে দেশের আকাশটা রঙে রঙে রঙিন, যার বাতাসে কত সুর, কত গন্ধ, কত সৌন্দর্য, কত মহিমা, ক্ষীণ জ্যোৎস্না দিয়ে গড়া কত সুন্দরী তরুণীরা যে দেশের পুষ্পসম্ভার-সমৃদ্ধ বনে উপবনে ফুলের গায়ে বসন্তের হাওয়ার মতো তাদের ক্ষীণ দেহের পরশ দিয়ে বেড়াচ্ছেন, সেই অপার্থিব দিব্য সৌন্দর্যের দেশে গিয়ে আমাদের এই পৃথিবীর মা-বোনেরা যে দেহ ধারণ করে বেড়াবেন – এ যেন তাঁদের সেই সুদূর ভবিষ্যৎ রূপেরই একটা আভাস আমার বউদিদিতে দেখতে পেলুম ।’
স্বভাব-উদাসীন এই মানুষটি নিজের লেখার বিরূপ সমালোচনা নির্লিপ্তভাবেই নিতেন, কিন্তু অতিলোকচিন্তা নিয়ে তর্ক উঠলে নিজের অভিজ্ঞতায় ভর করে সোচ্চার হয়ে উঠতেন । সজনীকান্ত দাস তাঁর আত্মস্মৃতিতে বলেছেন – “আমি বিজ্ঞানের ছাত্র, আচারে ব্যবহারে কালাপাহাড় বলে অখ্যাতিও আছে ।” পরলোকচর্চার জন্য বিভূতিভূষণকে তীব্র ব্যঙ্গ করতেন জানিয়ে তিনি আরো বলেছেন – “পথভ্রষ্ট(?) বৈজ্ঞানিকদের আলোচনায়ও দেখিয়াছি এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে অনেক তত্ত্ব জানিয়াছি । বিভূতিকে বাহির হইতে কখনও আমল দিই নাই, ঠাট্টা করিয়া তাহার দৃঢ় বিশ্বাসকে উড়াইয়া দিয়াছি ; কিন্তু ভিতরে ভিতরে ফল্গু ধারার মতো মৃত্যু পরপারের এই টুকরা রহস্যটি আমাকে বরাবরই প্রভাবিত করিয়াছে আর বিভূতিকে স্বীকার করিয়াছি ।” এই ‘টুকরা রহস্য’ বলতে যে ঘটনা, তা ঠিক প্ল্যানচেটের ব্যাপার না হলেও এই প্রসঙ্গে বলে নেওয়া যায় ।  সজনীকান্তের মেজদার মৃত্যুর আগে তাঁর বাবা রুগ্ন পুত্রের শিয়রে জেগে ছিলেন । শেষ প্রহরে দেখলেন একটা অস্বাভাবিক লাল আলোয় ঘর ভরে গেল আর মুমূর্ষু পুত্র উঠে বসে কাকে যেন বলল – এই যে আমি যাচ্ছি । এই ধরণের অভিজ্ঞতা সজনীকান্তের বাবার জীবনে প্রথম নয়। তিনি বুঝলেন তাঁর অজু চলে যাচ্ছে । এবং তাই হল । কিন্তু তার পরদিন দুপুরে যা ঘটল, সজনীকান্তের বিবরণে – “হঠাৎ বাবা কী দেখিয়া মাকে ডাকিলেন – আমরাও তাকাইলাম, আমরা সকলেই বিস্ময়ে বিমূঢ় হইয়া দেখিলাম, মেঝের ঠিক মাঝখানে রক্ষিত একটি চেয়ারে একটা লাল আলোয়ান গায়ে জীর্ণ শীর্ণ মেজদাদা আসিয়া বসিয়াছেন । মা – ‘বাবা আমার’ বলিয়া মূর্ছিত হইয়া পড়িলেন, পরক্ষণেই দেখি সে অন্তর্ধান হইয়াছে ।”
প্ল্যানচেট ছাড়া আরো অনেক ঘটনায় বিভূতিভূষণ পরলোকের ছায়া দেখেছিলেন । পুত্র তারাদাস যখন আড়াই বছর বয়সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হল, তখন তিনি দেখেছিলেন আদরের বাবলুকে কে যেন নিয়ে যেতে এসেছে । নিজের আয়ুর বিনিময়ে পুত্রের প্রাণ চেয়ে নিয়েছিলেন তিনি । নিজের মৃত্যুর আগে ধারাগিরিতে বেড়াতে গিয়ে একদিন একটি মড়ার খাটিয়া দেখতে পান, শবের মুখের কাপড় সরিয়ে নিজেরই মৃতদেহ প্রত্যক্ষ করেছিলেন ।
তবে প্ল্যানচেটকে তার প্রাপ্য গুরুত্বের বেশি দিতে তিনি প্রস্তুত ছিলেন না । অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর শাশুড়ির মৃত্যুর পর প্ল্যানচেট শুরু করেন । সেই সময় এক চিঠিতে বিভূতিভূষণ তাঁকে লেখেন – “প্রেতলোকের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ করবার কিছু নেই । পৃথিবীর ঊর্ধ্বে বহু স্তর বিদ্যমান, বিশ্বে বহু লোক, বহু স্তর, বহু গ্রহ, মৃত্যুর পর যেখানে জীবনে গতি হয় । এই সব ‘সুপারমানডেইন ওয়ার্ল্ডসে’ আছে এবং ঋষিরা প্রাচীন যুগে তাদের অস্তিত্ব জেনেছিলেন । বৃহদারণ্যক ও ঈশোপনিষদে এদের কথা আছে । এগুলির আকর্ষণ অতি তীব্র – পৃথিবীর জীবনের পরে যখন এই সব লোকে গতি হয় তখন পৃথিবীর আনন্দ এদের আনন্দের কাছে তুচ্ছ বলে মনে হয় বটে, কিন্তু সেই আসক্তি বা কামনাই পুনর্জন্মের বীজ বপন করে।
প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা হচ্ছে এই সব বিভিন্ন লোকালোকের আসক্তি ও মায়া কাটিয়ে সর্বলোকাতীত বিশ্বসত্তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার চেষ্টা । ভগবানকে পাওয়া এরই নাম । ধর্মজীবনের আরম্ভ তখনই হবে যখন আমাদের মন নিরাসক্ত হবে জাগতিক রসাকাঙ্ক্ষায় । তাঁকে জানলেই সব জানা হল । নতুবা প্রেতলোকের আবিষ্কারের আর নতুন একটা দ্বীপ আবিষ্কারের মধ্যে কোন তফাৎ নেই । দুটোর কোনটাই আধ্যাত্মিক ঘটনা নয় ।”
বিভূতিভূষণ, প্রকৃতপক্ষে, এই আধ্যাত্মিক জীবনের সন্ধানী ছিলেন ।

সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের লেখা আজকের পাঠকের তত পরিচিত না হলেও এককালে তিনি ছিলেন জনপ্রিয় সাহিত্যিক । তাঁর বন্ধুদের মধ্যে মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় তখন নতুন ছাপাখানা খুলেছেন । সাহিত্যিকদের একটা আড্ডা বসত সেখানে । সৌরীন্দ্রনাথ ছাড়াও সেখানে আসতেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, চারু বন্দ্যোপাধ্যায়, অজিতকুমার চক্রবর্তী প্রমুখ । অজিতকুমার তখন শান্তিনিকেতনের তরুণ অধ্যাপক । তিনি একবার এসে নিজের অবসাদের কথা বন্ধুদের বললেন – তাঁর আজকাল মনে হয় পৃথিবীর রূপ-রস-আলো ক্ষীণ হয়ে আসছে, যা করবার তাড়াতাড়ি করতে হবে, মানুষের জীবন কখন আছে কখন নেই ইত্যাদি । বন্ধুরা এ নিয়ে কৌতুক করলেও অজিতকুমার নাছোড় । শেষ পর্যন্ত তাঁর চাপাচাপিতেই আড্ডাঘরে প্ল্যানচেটের আসর বসল । স্মরণ করা হল শান্তিনিকেতনেরই অধ্যাপক সতীশচন্দ্র রায়কে – যাঁর আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র বাইশ বছর । সতীশচন্দ্র উপস্থিত হলে অজিতকুমারের এমন মনোভাবের কারণ জানতে চাওয়া হল । জবাব পাওয়া গেল – “জীবনে নিস্পৃহতা জাগার দরুন ।” অন্যান্য কথার মধ্যে কাগজে একটা ভবিষ্যদ্বাণী ফুটে উঠেছিল । অজিতকুমারের আয়ু আর বড়জোর সাত-আট বছর, সমবেত বন্ধুদের মধ্যে তাঁকেই সবার আগে চলে যেতে হবে – এরকমই ছিল প্ল্যানচেট-লিখন । সবারই মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল । এর কয়েক বছর পর অজিতকুমারের মৃত্যু হয় । সৌরীন্দ্রমোহন তাঁর ‘পরলোক বিচিত্রা’ বইয়ে সে প্রসঙ্গে লিখেছেন – “আশ্চর্যের বিষয়, কলকাতার প্রথম যুদ্ধের সময় ইনফ্লুয়েঞ্জার সেই বীভৎস তাণ্ডবলীলা । সেই সময়ে যেদিন শুনলুম, অজিত ইনফ্লুয়েঞ্জায় শয্যাগত, সেদিন আমাদের উদ্বেগের সীমা ছিল না এবং আমাদের সে উদ্বেগকে গভীর বেদনায় পূর্ণ করে অজিত পরলোকে গমন করলেন – প্ল্যানচেটের কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলেছিল ।”
 
মণীন্দ্র গুপ্তের বয়স পঁচাশি পেরিয়েছে, কিন্তু তিনি এখনও সৃজনশীল । তাঁর কবিতা ও গদ্যে বিচিত্র বিষয়ের সন্ধান চলেছে বরাবর । তিনি এক লেখায় তাঁর যৌবনের প্ল্যানচেট-অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন । নতুন পাড়ায় এসে তাঁর এক প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপে জানতে পারলেন সে ভদ্রলোক রাত্রে খাওয়াদাওয়ার পর নীল আলো জ্বেলে প্ল্যানচেট করেন । তাঁর নাম অশোক, স্ত্রী অহনা । প্ল্যানচেট করতে অন্ততঃ তিনজন লোক চাই বলে ওঁরা মণীন্দ্রকে দলে ডেকে নিলেন । এখানে তেপায়া টেবিল বা পেনসিল নেই । একটি ফ্রেমে বাঁধানো কাঁচ । সিগারেটের প্যাকেটের কাগজ কাঁচি দিয়ে ছোট ছোট চৌকো করে কেটে তাতে এ থেকে জেড আর এক থেকে শূন্য লিখে কাঁচ আর ফ্রেমের ফাঁকে গুঁজে দেওয়া । ক্রিমের কৌটোর একটা ছোট্ট ঢাকনা কাঁচের মাঝখানে রেখে তাতে তর্জনীর ডগা ছুঁইয়ে তিনজনকে তিনদিকে বসতে হবে । আত্মা এলে সেই আঙুল ছোঁয়ানো ঢাকনা বা ঘুঁটি নিজে নিজেই নড়ে এ-বি-সি-ডি মারফত উত্তর দেবে ।

“ব্যাপারটা এইরকম – ঘুঁটি নড়বার পর জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কে এসেছেন? আপনার নাম কী? ঘুঁটিটা এক মুহূর্ত স্থির হল, যেন প্রশ্নটা শুনল, তার পর চলল প্রথমে এন, তার পরে আই, তার পরে আবার এন, শেষে এ অক্ষরের কাছে । NINA ! নিনা ! – পাশের বাড়ির সদ্যোমৃত ওই মেয়েটার কথাই তো আমরা ভাবছিলাম ।
-    - মৃত্যুকালে তোমার বয়স কত ছিল ?
ঘুঁটি চলল প্রথমে দুইয়ের কাছে, পরে গেল শূন্যের কাছে। এবং তার পরে অন্ধের মতো ঘুরতে লাগল, অন্য কোথাও আর গেল না । অর্থাৎ কুড়ি ।
-    - তোমার মৃত্যু কি স্বাভাবিক ছিল ?
ঘুঁটি নড়ে গিয়ে এন ছুঁল, ও ছুঁল – নো ।
আমরা অবাক হয়ে এ ওর মুখের দিকে তাকালাম । অশোক এ ব্যাপারে অভ্যস্ত লোক । সে শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল – নিনা, কেউ কি তোমাকে মেরেছে ?
ঘুঁটি লিখল – হ্যাঁ ।
-    - কে ?
ঘুঁটি উত্তর দিল না । বন বন করে ঘুরতে লাগল । যেন সে চুল লুটিয়ে আকুল হয়ে কাঁদছে ।
-    - নিনা, তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে ? চলে যেতে চাও ?
নিনা কোন উত্তর দিল না । ঘুঁটি প্রবল বেগে ঘুরতে লাগল । মেয়েটা কি খেপে গেছে । সব তছনছ করে দিতে চায় । শেষে ঘুঁটি আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে স্থির হল । নিনা ঘুঁটি ছেড়ে চলে গেছে ।”

এই অভিজ্ঞতা মণীন্দ্রের কাছে একেবারে নতুন । ঘুঁটিটা যেন রক্তমাংসের একটা জ্যান্ত মেয়ে, যে চাপচাপ রক্তের মধ্যে ছটফট করছিল । ধাতস্থ হতে সবারই একটু সময় লাগল ।

“অশোক বলল, এবার অন্য জগতের মানুষ ভগবান বুদ্ধকে ডাকা যাক ।
-    - বুদ্ধ! – আমি অবাক – বুদ্ধ আসবেন ?
-    - কেন নয় ? বুদ্ধও তো মানুষ ছিলেন, মারা গিয়ে উনিও তো পরলোকেই আছেন ।
আমার মনে হল, অশোক হয়তো থিয়সফিস্ট, কিন্তু বাকি দুজন – অহনা এবং আমি রাত্তিরবেলা বসে একটা অজানা রহস্যের খেলা খেলছি । খেলাটা কত দূর যেতে পারে আমাদের কোনো ধারণা নেই ।
বড় আলো নিভিয়ে ছোট আলো জ্বালানো হল । আমরা ঘুঁটিতে আঙুল রেখে বুদ্ধকে ভাবতে লাগলাম । বুদ্ধের কপালে শ্রমের রেখা, চোখে করুণা, ঠোঁটের দু কোনায় দু ফোঁটা বৃষ্টির মতো একটু আলতো হাসি ।
অনেকক্ষণ পরে ঘুঁটি এবার অতি ধীরে চলল, যেন ঘুমের মধ্যে কেউ অনিচ্ছুক, মনোহীন চলেছে ।
-    - আপনি কে এসেছেন ? দয়া করে আপনার নাম লিখুন ।
ঘুঁটি লিখল, সিদ্ধার্থ ।
সিদ্ধার্থ ! কে সিদ্ধার্থ ? ঘুঁটি থেমে আছে, চলছেই না । বোধ হয় উনি চলে গেছেন । হঠাৎ অহনা বলল, আরে, তাই তো – সিদ্ধার্থই তো ওঁর নাম । তোমরা নাম লিখতে বলেছিলে, উনি ওঁর পিতৃদত্ত নামই লিখেছেন । আমরা যেন একটা ধাক্কা খেলাম – কী অপরিসীম আমাদের মূর্খতা আর অচেতনা । ঘুঁটির অচলতায় মনে হচ্ছিল সিদ্ধার্থ আমাদের কাছে আর থাকতে অনিচ্ছুক । অশোক জিজ্ঞেস করল – আপনার কি কষ্ট হচ্ছে ? আপনি কি চলে যেতে চান ? সিদ্ধার্থ লিখলেন – হ্যাঁ । আমরাও কথা খুঁজে পাচ্ছি না । অশোক বলল – আপনাকে নমস্কার । আসুন আপনি । বলামাত্র ঘুঁটি নিঃসাড়, স্তব্ধ । উনি চলে গেছেন । আসা যাওয়া সবটাই কী শান্ত, কী নিশ্চিন্ত, কী আত্মস্থ ।”

এইসব আসরে বিখ্যাতদের মধ্যে জওহরলাল নেহরু, বিদ্যাসাগর প্রভৃতিকে আনা হয়েছিল । অনেক সময় আবার খারাপ আত্মা এসে হাজির হত, প্রশ্নের ভুল উত্তর দিয়ে ধরা পড়ত । কিন্তু চলে যেতে বললেও যেত না । একবার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকা হলে আরেকজন এসে জানালেন বিভূতিভূষণ আসবেন না কারণ তাঁর নতুন জন্ম হয়েছে । নতুন জন্মের ঠিকানা জানতে চাওয়া হলে “ঘুঁটি আস্তে আস্তে একটু এদিক ওদিক চলল । শেষে লিখল – দে খ তে পা চ্ছি না । ঘুঁটির ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল – কোথায় যেন একটা পর্দা পড়ে আছে, আমরা ওপার দেখতে পাই না, ওঁরা এপার দেখতে পান না ।”
কিছুদিন প্ল্যানচেট চালানোর পর মণীন্দ্র অবশ্য এই পাট চুকিয়ে দেন । “শুয়ে শুয়ে বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ার সুখ ছেড়ে রাত দুটো পর্যন্ত কতগুলো মিথ্যুক, অজ্ঞান, তৃতীয় শ্রেণীর দেহহীনের সঙ্গে কাটাবার কোনো মানে হয় ! অতএব একদিন আমি ঝপ করে প্ল্যানচেটে যাওয়া বন্ধ করলাম ।” তবে এই বিষয়টা তাঁর কাছে এখনও যেন এক ধোঁয়াশা – “এতদিন পরে, যেদিন মনে পড়ে, প্ল্যানচেট আমার কাছে এখনও একটা রহস্যাবৃত ব্যাপার । ওর সত্য-মিথ্যা আমি কিছুই বুঝি না । আমরা কোনো কারচুপি করিনি, তাহলে ঘুঁটিটা চালাত কে ? কে সেই চতুর্থ ব্যক্তি ? মৃতেরা ? মৃতেরা তো ফাঁপা বুদবুদের মতো একদল লোক । এই জগৎ এবং ওই জগৎ - দুই জগৎই অন্ধে আর অজ্ঞানে ভরে আছে ।”

মৃত্যুর ওপার নিয়ে মানুষের জিজ্ঞাসা আজকের নয় । এই প্রশ্নের সর্বজনগ্রাহ্য মীমাংসা হওয়া প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয় । সংবেদনশীল এবং কৌতূহলী মানুষেরা এই প্রশ্ন উথথাপন করবেন এবং নিজেদের মত করে তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা চালাবেন – এটা তাই প্রত্যাশিত বলেই ধরে নেওয়া যায় । প্ল্যানচেটের মাধ্যমে এপারের সঙ্গে ওপারের সেতুবন্ধনের প্রয়াস তারই একটা অংশ । বিভিন্ন যুগের কিছু বিশিষ্ট মন এ পথে আকৃষ্ট হয়েছে । এখানে তেমন কয়েকটি উদাহরণ রইল মাত্র । অতীত বর্তমান মিলিয়ে এই তালিকা আসলে দীর্ঘ । এবং পুনরাবৃত্তি যদি ইতিহাসের ধর্ম হয়, সম্ভবতঃ ভবিষ্যতেও এই পথে সন্ধানী পথিকের অভাব হবে না ।



সূত্র –
রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চা – অমিতাভ চৌধুরী
পথের কবি – কিশলয় ঠাকুর
অনন্তের লুকোচুরি – সুভাষ ঘোষাল
উলটো কথা – মণীন্দ্র গুপ্ত



596 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 1 -- 20
Avatar: de

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

ভারী সুন্দর ঝরঝরে লেখা! বিষয়বস্তু যদিও তর্কসাপেক্ষ ঃ)
Avatar: riddhi

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

ব্যাপক লাগল পড়তে। রবীন্দ্রনাথের কেসটা নিয়ে এধার ওধার শুনেছি, পড়িনি কখনো। অমিতাভ চৌধুরীর বইটা পড়তে হবে।
Avatar: riddhi

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

শমীর সাথে দুটো সংলাপে মিডিয়াম কে ছিলেন? বুলা দেবী?
Avatar: lcm

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

জানলাম, প্ল্যানচেট-এর বাংলা কী? মন্ডল, না, প্রেতবানীবহ চক্রযান? দ্বিতীয়টা বোধহয় মিডিয়াম।
Avatar: Anirban RC

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

ভালো লাগল ।
"রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চা" আগে পড়েছি ।
বিভূতিভূষন'এর গল্পগুল জানতাম না ।
ধন্যবাদ ।
Avatar: dukhe

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

riddhi (11 April 2013 00:24:46 IST), হ্যাঁ, বুলা দেবী।
Avatar: কৃশানু

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

ভালো লাগলো। কি সুন্দর ঝরঝরে লেখা।
আমি বিশ্বাস করি না, কিন্তু পড়তে বেশ ভালো লাগে। রবীন্দ্রনাথ এর চর্চা নিয়ে জানতাম, তবে এতটা ডিটেইলে নয়। বিভূতিভূষণ এর ব্যাপারে জানতাম, বাকি গুলো সবই নতুন।
খুব সুন্দর হয়েছে দুখে দা।
Avatar: san

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

ভাল্লাগলো।
Avatar: প্পন

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

লেখাটা সুখপাঠ্য হয়েছে। দুখেবাবুকে ধন্যবাদ।

শরদিন্দুবাবুর এই নিয়ে কোন চর্চা ছিল বলে জানেন কি?
Avatar: dukhe

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

lcm (11 April 2013 02:19:46 IST), দুটোই প্ল্যানচেটের বাংলা বলেই জানি। চক্র বা মণ্ডল চালু কথা। মিডিয়াম বোধহয় মাধ্যমই হবে।
প্পন (11 April 2013 11:05:04 IST), শরদিন্দুর চর্চা ছিল কিনা জানি না।
Avatar: প্পন

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

দুখে, ধন্যবাদ। আমার কৌতূহলের সূত্র এখানে। কিছু সন্ধান পেলে লেখাটার একটা পরিবর্ধিত সংস্করণ নামাবেন।

"‘ভারতীয় মনোবিজ্ঞানের জনক’ গিরীন্দ্রশেখর বসু প্ল্যানচেট করতেন। তাঁর বন্ধু শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ভাই রাজশেখর বসুও থাকতেন সেখানে।"

সূত্রঃ http://www.anandabazar.com/archive/1120531/31binodan1.html
Avatar: dukhe

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

প্পন(11 April 2013 12:52:35 IST), দেখলাম। কাল্টিভেট করতে হচ্ছে!
Avatar: সৈকত

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

ডিটেলস জানি না। ব্যোমকেশ সমগ্র, দ্বিতীয় খন্ডের শেষে যেখানে শরদিন্দুর পরিবার, জীবন ইত্যাদি নিয়ে লেখা আছে সেখানে দেখছি

"প্ল্যানচেটে তাঁর বিশ্বাস ছিল। প্ল্যানচেট টেবিলে অনেক বিদেহী আত্মার মুখে বিস্ময়কর কথা শুনেছেন, অনেক অবিশ্বাস্য ঘটনা পরে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।"
Avatar: aka

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

ভালোKই লাগল। আমরাও প্ল্যানচেট করেছি পয়সা দিয়ে গুলশন কুমারকে।
Avatar: রূপঙ্কর সরকার

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

অমিতাভ চৌধুরীর বইটা পড়েছি, বিভুতিভূষণের কাহিনীও জানি। তারাদা আর আমি এক কলেজেই পড়তাম। তারাদা জি-সেক ছিলেন। কিন্তু আপনি দয়া করে সংকলনটি বর্ধিত করুন। আপনার লেখার বাঁধুনি অসাধারণ। আমার নিজের কিছু অভিজ্ঞতা আছে। অবশ্য প্রকাশ্যে আলোচনায় আগ্রহী নই। আপনার কাছে এ বিষয়ে আরও কিছু শোনার অপেক্ষায়।
Avatar: anirban basu

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

আকাদা, গুলশন কুমার-কে? একটু ডিটেল দাও। কি বল্লেন ভদ্রলোক? :-D
Avatar: S

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

সত্যজিত রায়ের অনেক গল্পে প্ল্যানচেটের কথা পড়েছি।
Avatar: শঙ্খ

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

দুখে বাবু-ই চিরন্তন কুন্ডু? মানে ঝাঁকিদর্শনের লেখক?

ক্ষী ক্ষান্ড!!

Avatar: Yan

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

ঃ-)

Avatar: aranya

Re: বাঙালী সাহিত্যিকদের প্ল্যানচেটচর্চা

ভাল লাগল, সুন্দর লেখা।

রুপঙ্কর-বাবু, আপনার অভিজ্ঞতা গুলো লিখুন না। গুরু পাঠক-দের সহনশীলতা বাড়ছে, মনে হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, সৌরীন্দ্রমোহন, মণীন্দ্র গুপ্ত - কেউই এখনও অব্দি আওয়াজ খান নি দেখছি ;-)

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 1 -- 20


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন