বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

১ এর ঙঃ সাময়িক যবনিকা

অনমিত্র রায়

( প্রথম কিস্তির পর )

 

নামটা থেকেই আশা করি বোঝা যাচ্ছে যে এই কিস্তির অনেকগুলো অলিখিত প্রিকোয়েল আছে। কথা ছিল দু’কিস্তি লেখার, তাই লিখে ফেললাম। এই মুহূর্তে আর সম্ভবও নয়। পরে কখনও সত্যি সত্যি দরকার পড়লে খ, গ আর ঘ লেখা যাবে। এই কিস্তিতে কিছু তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করব সেইসব প্রশ্নের যেগুলি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে ঘুরেফিরে পেয়েছি। যদিও চারবছর পর এসব প্রশ্ন শুনলে কিরকম যেন ‘এতদিন কোথায় ছিলেন’ মার্কা মনে হয়, আমরা তো আপনার শহরেই কাজ করছিলাম স্যার! আওয়াজ খাচ্ছিলাম, গালাগাল খাচ্ছিলাম, এবং এইসব খেতে খেতেই কাজ করছিলাম। সেদিন আপনি জানতে চাইলে কত ভাল হতো বলুন তো; যখন অনেক কিছু প্রমাণ করার ইচ্ছে ছিলো, সারা রাত কাজ করে সকালের চা খেয়ে বমি করে এসে আবার কাজে বসে যেতাম লোক নেই বলে! বিদেশি অ্যাওয়ার্ড জোটেনি বলে কানে পৌঁছয়নি নাকি আওয়াজটা? আনন্দবাজার লেখেনি, এফেম চ্যানেল বলেনি, রিভিউ করেনি কোনও ফ্রেঞ্চকাট ফিল্মবোদ্ধা। গৌতম ঘোষ কি অঞ্জন দত্তকে নন্দনে জুতো ছুঁড়ে গ্রেফতারও হইনি কেউ... হলে জানতে পারতেন নিশ্চয়ই। পরেরবার ক্রাউডফান্ডেড ছবি করতে হলে আগে ছোট্ট করে ওরকম কিছু করে নেব নাহয়! অথবা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ঢুকে নন্দন-১ এর পর্দাটা ছিঁড়ে দেব। আচ্ছা, কোনটা করলে ঠিক এরকমভাবে ফ্রন্ট পেজে আসা যাবে বলুন তো, যাতে কোনভাবেই আপনাদের নজর এড়িয়ে যাবে না ব্যাপারটা? নাকি সাগরপার থেকে হাততালির আওয়াজ না ভেসে এলে কোনোকিছুকেই আপনারা সিরিয়াসলি নেবেন না? সত্যজিৎ রায়ের মূর্তি ভেঙে দিলেও নেবেন না? সমালোচনা তো করবেন নাকি? ‘মিসগাইডেড’ বলে কাগুজে মিসাইলটুকু তো দাগবেন? ওতেই চলবে!
 
নো বাজেট কি? – এই মহার্ঘ্য প্রশ্নটা বহুদিন ধরে জ্বালাচ্ছে। এটাকেই আগে শেষ করা যাক। এ বিষয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় মত বোধহয় এটাই যে কোন ছবিই আসলে নো-বাজেট হতে পারে না। কিন্তু যাঁরা এটা মনে করেন তাঁরা হয়তো মাথায় রাখেন না যে নো-এক্সপেন্স বলা হয়নি। এবার যাঁরা জীবনে কোনরকম কোনো প্রোজেক্ট বা প্রোডাকশনের সাথে যুক্ত থেকেছেন তাঁরা বলবেন যে বাজেট তো বাবা সব কিছুরই হয়, হ্যাঁ এটা হতে পারে যে তোমরা হিসাবটা করো না। তবু ইনভিসিবল হলেও সেটা তো আছেই। - ব্যাপারটা ঠিক ওরকম নয়, অন্তত ফিল্মের ক্ষেত্রে। প্রথমে বলে নেওয়া যাক যে নো-বাজেট ছবিকে জিরো বাজেট বা মাইক্রো বাজেটও বলা হয়ে থাকে। আমরা অবশ্য নো প্রেফিক্সটা বসানোরই পক্ষপাতী। এবার প্রশ্নটার উত্তর দুদিক থেকে দেওয়া যায়। প্রথমে সহজ উত্তরটা দিই। ধরা যাক, পটলবাবুর শখ বাগান করা, জবাদি মোবাইলের সদ্য বাজারে আসা সেট কিনতে পছন্দ করে, আবার আলুদা অফিসের বাচ্চা মেয়েদের সাথে উইকএন্ডে ডিনারে যায়; মানে হ্যাবিট থেকে হবি অবধি যে অঞ্চলটা মানুষের জীবনে, তার পিছনেও তো মানুষ টাকা খরচ করে। আর কে কোনখাতে কতটা খরচ করলো সেটা তার সামাজিক পরিচয়ও গড়ে দেয় কিছুটা মাত্রায়। চাঁপাবৌদি যেমন বাড়ি গেলেই নতুন ফ্রিজ, নতুন এসি দেখাতে শুরু করেন, এক্কেবারে প্রাইস ট্যাগ সহ, সেটাতেই তাঁর আনন্দ। ঠিক সেরকমই, আমি ছোটবেলায় ক্রিকেটারদের ছবি জমাতাম খাতায়, বন্ধুদের দেখাতাম বাড়ি এলে, বড় হয়ে সিনেমা বানিয়েছি। ব্যাপারটা পৃথিবীতে বেশিরভাগ লোকই যেহেতু করেনা তাই আমার বা আমাদের এই অদ্ভুত স্বভাব অনেকেই নজর করেছে। একটা পরিচয়ের মতো। বেঁচে থাকারও তো একটা খরচ আছে, নিঃশ্বাস নেওয়ারও। ইচ্ছা থাকলে সেই টাকাটাতেও ছবি বানানো যায়। নো-বাজেট ফিল্ম কিছুটা এরকমই। সারা পৃথিবীতেই। তবে এর বাইরে আরও কতগুলো ব্যাপার আছে। সেগুলোকে দ্বিতীয় তথা জটিল উত্তরটির অন্তর্গত করলাম। 
 
নো-বাজেট ফিল্ম খায় না মাথায় দেয় জানতে গেলে তার পূর্বসূরিদের কথাও জানতে হবে। মানে আকাশ থেকে পড়েছে মনে হলেও কোনকিছুই তো আর সেভাবে জন্ম নেয়না। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে নো-বাজেটের মতো আরও কতগুলো শব্দ চালু আছে। বিগ বাজেট, লো বাজেট ইত্যাদি। সেগুলো সকলেই খুব চট করে বুঝে ফেলে থাকেন, নামগুলো বোধগম্য এবং বহুলপ্রচলিত হওয়ায়। কিন্তু, এগুলোরও কিছু ইতিহাস আছে। যেটা বোঝা যায় সেটা হল যে, বিগ বাজেট আর লো বাজেট যখন আছে তখন নিশ্চয়ই গড়বাজেট বলেও একটা ব্যাপার আছে এবং সেখান থেকেই এই নামদুটির জন্ম। কিন্তু যেটা বোঝা সহজ নয়, সেটা হল যে কেউ নিজের ছবিকে লো বাজেট কেনই বা ঘোষণা করতে যাবে, বিগ বাজেট বললে তবু না হয় একটা ঘ্যাম নেওয়া যায়, এককথায় বুঝিয়ে দেওয়া যায় যে মাল্টিস্টারার এবং ঝিংকু টেকনোলজির ঝলক পাওয়া যাবে, বেশ স্পিলবার্গ কি ক্যামেরন মার্কা। অনেকে মনে করতে পারেন যে লো-বাজেট বললে হয়তো কিছুটা বিপ্লবী বিপ্লবী হাওয়া তৈরি করা যায়, সেই জন্য। হ্যাঁ, সেটা কিছুটা সত্যি তবে সেটা হওয়ার কারণটা কিন্তু সরাসরি সিনেমার ইতিহাসের সাথে জড়িত। আসলে বিগ বাজেট শব্দটার মধ্যে কোনও গর্ব কিম্বা অহং-ই থাকতো না যদি না লো বাজেট থাকতো।  ‘পোভার্টি রো স্টুডিওস’ শব্দটার সাথে হয়তো অনেকেরই পরিচয় আছে। এই শব্দটা কিন্তু বিগ বাজেট ছবি আসার আগেই এসে গেছিলো। ১৯২৮ এ ছবিতে শব্দ আসার পর ছবি তৈরির খরচ এমনিই বেড়ে যায়। কিন্তু ১৯২৯ থেকে আবার আমেরিকার অর্থনৈতিক অবসাদগ্রস্ততার শুরু। এই পরিস্থিতিতে ‘পোভার্টি রো স্টুডিওস’ এর সংখ্যাও বেড়ে যায় ক্রমশ। কারণ, ‘ডাবল বিল’ এসে গিয়ে লো বাজেট সিনেমার ডিস্ট্রিবিউশনের নতুন জায়গা খুলে গেছিলো। 
 
একটু ভেঙে বলি। যাঁরা জানেন না তাঁদের সুবিধা হবে। শুরুর দিকে বাজেট নিয়ে কেউই বিশেষ মাথা ঘামাতো না। মোদ্দা ব্যাপার ছিল যত কম টাকায় সম্ভব ছবি কর এবং যত বেশি সম্ভব মুনাফা তোলো। যখন এই সত্যটা আবিস্কার হল যে বেশি টাকা ঢাললে আরও আরও বেশি মুনাফা করার সম্ভাবনা আছে তখন থেকেই ছবির বাজেট বাড়তে শুরু করল। মার্কেট ধরার জন্য বিভিন্ন শহরে অফিস খোলার খরচ তো ছিলই। তারপর একদিন স্টারের জন্ম হল। পৃথিবীর প্রথম স্টার সম্ভবত ড্যানিশ অভিনেত্রী আস্তা নিয়েলসেন। শোনা যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা যাওয়া অনেক সৈনিকের পকেটে বা জিনিসপত্রের মধ্যেই নাকি এঁর ছবি পাওয়া যেত। আমেরিকাতে তথা হলিউডে ‘পোভার্টি রো স্টুডিওস’ বলতে সেইসব স্টুডিওকে বোঝানো হতো যারা আস্বাভাবিক কম টাকায় ছবি করতে পারতো। এদের বেশিরভাগই ছিলো ক্ষণস্থায়ী। কিছু কিছু আবার বেশ কয়েকবছর ব্যবসা করেছিল। শব্দটির ব্যবহার শুরু ২০-র দশকে এবং ৬০-এর দশকের পর আর সেভাবে কখনও ব্যবহার হয়নি। এইবার ‘ডাবল বিল’ হল গিয়ে অর্থনৈতিক অবসাদকে মোকাবিলা করার একটা ব্যবস্থা। ৩০-এর দশকে স্বাভাবিকভাবেই শো পিছু দর্শকের সংখ্যা কমে যাচ্ছিলো। এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য তখনকার বড় ডিস্ট্রিবিউটররা এক নতুন পন্থা নিলেন। তাঁরা ঘোষণা করলেন যে এখন থেকে দর্শকরা একটি সিনেমার টিকিট কেটে পরপর দুটি সিনেমা দেখতে পাবেন। মানে টিকিটের দামে হেরফের হলোনা। এ যেন একটির সাথে আরেকটি ফ্রি! স্বাভাবিকভাবেই এই নতুন ব্যবস্থা তুলনায় বেশি দর্শক টানতে সক্ষম হলো এবং চটজলদি জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। এখন দুটো সিনেমা তো দেখানো হবে, টিকিটের দামও বাড়বে না, তাহলে টাকা আসবে কোথা থেকে? এখানেই লো বাজেট সিনেমার নতুন একটা দিগন্ত খুলে গেলো। গরিব স্টুডিওগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো। তাদের নামমাত্র খরচে বানানো ছবি বড় ডিস্ট্রিবিউটররা কিনে নিয়ে ওই দ্বিতীয়ার্ধে দেখাতে লাগলো। ডিস্ট্রিবিউটরদের পক্ষে সাধ্যের মধ্যে যোগান ঠিক রাখার এর চাইতে ভালো পথ আর কিছু হতে পারতো না। প্রসঙ্গত, ডাবল বিল এর দ্বিতিয়ার্ধে দেখানো হতে থাকার ফলে এই কম বাজেটের ছবিগুলির নাম হয়ে যায় বি-মুভি, যা পরবর্তীতে অন্য একটি ধারার সমার্থক হয়ে দাঁড়াবে। এই বি-মুভিই ১৯২৮ থেকে ১৯৩৯ অবধি ওয়েস্টার্ন এর মতো ধারাকে টেনে নিয়ে গেছে। হরর ফিল্ম এর জন্ম এখানে, ফিল্ম নোয়া-র জন্ম এখানে। মানে যা যা বিগ বাজেট প্রেস্টিজিয়াস ছবিতে হতো না, তার সবই প্রায় হতো এই লো বাজেট ছবিগুলিতে। এবং যেটা যে মুহূর্তে ব্যবসায়িক ভাবে সফল হতো, গ্রহণীয় হয়ে যেত প্রথম সারির ছবির কাছে। এইভাবেই ৩৯-এ স্টেজকোচ বা ৪১-এ দা মাল্টিস ফ্যাল্কন। অবশ্য সবেরই রিলিজ যেহেতু বড় ব্যানারে তাই চট করে বোঝার উপায় নেই যে কোনটা পয়সাওয়ালা স্টুডিও আর কোনটা গরিব স্টুডিওতে তৈরি। বিশেষ করে ফিল্ম নোয়া-র স্টাইলটাই এমন যে সেক্ষেত্রে মার্কামারা নাম ছাড়া একেবারেই বোঝার উপায় নেই। 
 
যাই হোক, মূল জায়গায় ফিরে আসি। এই যে ইন্ডাস্ট্রিতে যে-ছবি সচরাচর হয়না, সেই ছবিটা নির্দ্বিধায় করে ফেলার ট্র্যাডিশন বা এক্সপেরিমেন্ট চালিয়ে যাওয়ার জায়গা, সেইখান থেকেই আজকে যখন কেউ নিজের ছবিকে বলে লো বাজেট তখন সেটাতে একটা অন্যধারার গন্ধ পাওয়া যায়। এটা এখন আর হ্যাটার জায়গায় নেই, রীতিমতো স্টেটমেন্ট হয়ে গেছে। যার জন্যই এর সঙ্গে নো বাজেটকে অনিবার্যভাবে গুলিয়ে ফেলেন অনেকেই। নো বাজেট ছবির ইতিহাসটা সম্পূর্ণ আলাদা। হ্যাঁ, এখন উইকিপিডিয়া জাতীয় ওয়েবসাইট পড়লে জানতে পারবেন যে পথের পাঁচালিও নাকি নো-বাজেট। তবে ওটা ব্যাক ক্যালকুলেশন। কনজিউমার মার্কেটে ডিজিটাল ক্যামেরা আসার আগে নো বাজেট সিনেমা বলে কিছু ছিলো না। কারণ, ১৬ বা ৩৫ মিলিমিটারের খরচ অনেক বেশি। ৮ মিলিমিটারও তুলনায় খরচসাপেক্ষ, বিশেষত পোস্ট প্রোডাকশন। পথের পাঁচালির সময় দেড়লাখ মানে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে অঙ্কটা কিন্তু নিতান্ত কম নয়। আমেরিকার হিসাব ধরলে প্রথম নো বাজেট ফিল্ম ১৯৯৮ সালে, ক্রিস্টোফার নোলানের ফলোয়িং, ১২,০০০ ডলারে তৈরি। তবে সব শব্দই কখনও না কখনও জন্ম নেয়। ১৯৯৮ তে শব্দটা কিন্তু জন্ম নেয়নি। নোলানের ব্যাপারটাও ওই ব্যাক ক্যালকুলেশন। কোনো শব্দের জন্ম হতে গেলে সেটা কাউকে না কাউকে ব্যবহার করতে হয়। ২০০২ সালে ডি আই ওয়াই ওর ডাইঃ হাউ টু সারভাইভ অ্যাস অ্যান ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্টিস্ট নামে একটি ডকুমেন্টারি তৈরির সময় মাইকেল ডাব্লিউ ডিন নামে এক ব্যক্তি প্রথম শব্দটি যেচে ব্যবহার করেন। রাউল ওয়াল্‌শ্‌ এর দা বিগ ট্রেল যেমন ১৯৩০ সালে বিগ বাজেট শব্দটার জন্ম দিয়েছিলো ঠিক সেভাবেই ডিন এই ছবিটা করে নো বাজেট শব্দটার জন্ম দেন। ছবিটার বাজেট ছিলো ৬,০৫০ ডলার। ডিন বিভিন্ন জায়গায় ছবিটা দেখানোর ব্যবস্থা করেন, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন শহরে। প্রোমোশনের খরচ হয় আরও ১৪,০০০ ডলার। দু’বছর বাদে অবশেষে ছবিটা ১০,০০০ ডলার লাভ করেছিলো। ডিনের ক্ষেত্রে নোলানের কাজটা অতটা প্রভাব ফেলেনি। ওনার কাছে লো বাজেট ছবির প্রোডাকশন আমূল পাল্টে দিয়ে নো বাজেট ছবি তৈরি হওয়ার পথ করে দিয়েছিলো মূলত যে সিনেমা সেটি হলো ব্লেয়ার উইচ প্রোজেক্ট, ৩০,০০০ ডলারে তৈরি আর সান্ড্যান্সে দেখানোর জন্য তৈরি প্রিন্টের খরচ আরও ৩০,০০০। মোট ৬০,০০০ ডলার। ছবিটির আজ অবধি মোট ব্যাবসার পরিমান ২৪৮,৬৩৯,০৯৯ ডলার। ছবিটির এই অতিমানবিক সাফল্যের পর স্বাভাবিকভাবেই ডিস্ট্রিবিউটরদের নজর ঘন ঘন গিয়ে পড়তে লাগলো আরও আরও কম টাকায় তৈরি ছবির ওপর। বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে মাইক্রো বাজেট ফিচার (৫০,০০০ ডলারের কমে তৈরি) ফিল্মের জন্য আলাদা কম্পিটিটিভ সেকশন খুলে গেলো। কিন্তু এই ম্যাজিক সাফল্য এরপর অধরাই রইলো। বরং ত্রুফো-র ভবিষ্যদ্বাণী কিছুটা ফলে গেলো। সিনেমা একটা ব্যক্তিগত জিনিষ হয়ে উঠলো অনেকের কাছেই। একইসাথে ইন্ডাস্ট্রিটাও আর ক্লোজ্‌ড্‌ জায়গা রইলোনা। তার অনেকগুলো বিকল্প তৈরি হলো, ছোট ছোট কমিউনিটি রূপে। খোদ লস অ্যাঞ্জেল্‌সের বুকে ফিল্ম কারেজ নামে এরকম একটি কমিউনিটি রয়েছে। পিট্‌স্‌বার্গে ইন্ডিজ ফর ইন্ডিজ নামে একটা তৈরি হতে হতে হলো না ২০১০ সালে। এদের সাথে যুক্ত অধিকাংশ পরিচালকই ক্রাউডফান্ডেড সিনেমা বানিয়ে থাকেন। ফিল্ম কারেজ –এর ডেভিড ব্রেনিন বা পিট্‌স্‌বার্গের লুকাস ম্যাকনেলি... ব্রেনিনের গুডবাই প্রমিস –এর বাজেট ছিলো ১৬,০০০ ডলার, ম্যাকনেলির আপ কান্ট্রি-র বাজেট ৪,০০০ ডলার। 
 
আশা করি, নো বাজেট ফিল্ম কি, সেটা কেন এবং কিভাবে শুধুমাত্র বাজেটের ওপর নির্ভরশীল নয়, ক্রাউডফান্ডেড ফিল্ম হলে যে নো বাজেট হতে পারে না সেরকমটা নয় – ইত্যাদি ব্যাপারগুলো স্পষ্টভাবেই বোঝাতে পেরেছি। এর মাঝে একঘন্টার জন্য কারেন্ট গেছে, সেই ফাঁকে আমি দাড়ি কাটতে গিয়ে গলা কেটেছি, দু’কাপ চা করেছি, ইত্যাদি। এখন বিকেল সাড়ে তিনটে। সারা রাত ঘুমোইনি। তবে এখনও হাজারখানেক শব্দ এগোবে লেখাটা, আজ আর স্ক্রিপ্ট টা এগোনো হবে না, এই যা। সবসময়ই এটা হয়। লেখার শুরুতে আমার যে রাগটা থাকে সেটা শেষে এসে আর থাকেনা। তখন পাঠকের ওপরে কিরকম যেন মায়া হয়, যে এরাই বা কি করবে, যে যার নিজের বস্তায় বন্দি। আমার মতোই। তবে আমার বাড়ির ঠিক সামনে মাইক লাগিয়ে কারা যেন কোরাসে রাম নারায়ণ রাম গাইছে এখন। আমার অসম্ভব মানসিক জোর, গত তিনঘন্টা ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করে আমি লিখে যাচ্ছি। যাই হোক, এতো গেলো আমেরিকার কথা। আমার ডিসার্টেশন লেখার সময়ও এরকমই ঘটেছিলো। পয়েন্ট এস্টাব্লিশ করার জন্য ইউরোপ আমেরিকা ঘুরতে না ঘুরতেই ওয়ার্ড লিমিট শেষ। কিন্তু আমেরিকার কথা বলতেই হয়। কারণ, ওটা নিয়ে বেশিরভাগ লোক জানে। কানেক্ট করাতে সুবিধা হয়। দ্বিতীয়ত, মার্কেটের দখল যেহেতু প্রায় শুরু থেকেই আমেরিকার, ফিল্মের ইতিহাসের রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে কাজ করা অধিকাংশ ঘটনাই ওদেশে ঘটেছিলো। ঠিকঠাক ভাবে দেখলে মন্তাজের আসল আবিস্কর্তাও গ্রিফিথ সাহেব, থিয়োরি যতই অন্য জায়গায় লেখা হোক না কেন। রাশিয়ানপন্থীরা এতে রেগে যেতে পারেন তবে আইসেনস্টাইনের ছবির অনেক জায়গাই একপ্রকার জোর করেই দেখতে হয় আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, ঠিক লেনি রিফেন্সটাহ্‌লের ছবির মতোই, ফর্ম যতই সুন্দর হোক না কেন। তার চেয়ে জিগা ভার্তব অনেক ভালো। আর এমনিও, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বানানো প্রোপ্যাগান্ডামূলক ছবি আমাদের অন্তত সরাসরিভাবে কোনও কাজে আসেনা। কিন্তু কথা বলা দরকার থার্ড সিনেমা নিয়ে, ইমপারফেক্ট সিনেমা নিয়ে, মার্জিনাল সিনেমা, সিনেমা নোভো, সিনেমা ভেরিতের সাথে সম্পর্ক নিয়ে। যেগুলো কোনদিনই বলা হলোনা। আর এখানে এখন বলার মতো স্পেসও বাকি নেই। ছবির কাজের চাপ একটু কমে এলে তখনও যদি মানুষজনের মধ্যে উৎসাহ দেখি বলবো নিশ্চয়ই। আপাতত আমরা কী করতে চেয়েছিলাম সেটা বলে এই কিস্তি শেষ করা যাক। 
 
বহুদিনই কলকাতায় মূলত দু’ধরণের সিনেমা হয়। না, আর্ট ফিল্ম আর কমার্শিয়াল ফিল্ম জাতীয় কোনও অপগন্ডসুলভ ভাগাভাগির কথা বলছিনা। এই দু’ধরণের সিনেমাকে ভাগ করছি ডিস্ট্রিবিউশন মডেলের জায়গা থেকে। প্রথম ধরণের ছবি সরাসরি দেশের মার্কেট থেকে টাকা তুলতে চায়, হল রিটার্ন, টিভি রাইট্‌স্‌, ডিভিডি রাইট্‌স্‌ ইত্যাদি থেকে। আরেকধরণের ছবি হলো ফেস্টিভ্যাল সার্কিটের জন্য বানানো ছবি। যেটা বিদেশে প্রশংসা পাবে, সেখানে কিছু টেরিটোরিয়াল রাইট্‌স্‌ বেচে টাকা তুলে নিয়ে তারপর দেশে উচ্চমার্গের ছবি হিসেবে চর্চ্চিত হবে সীমিতসংখ্যক দর্শকের মধ্যে। শুধু কলকাতা নয়, সাধারণভাবে গোটা ভারতবর্ষেই এরকমটাই হয়। কিছু পরিচালক অবশ্য আছেন যাঁরা সব দিকেই হাত বাড়িয়ে দেখতে চান। যেমন স্ক্রিপ্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড এলো জাপান থেকে, পোস্ট-প্রোডাকশনের টাকা সানড্যান্স থেকে, আবার রিলিজ এর আগে ক্রাউডফান্ডিং ও হলো। এরকম অনেকে করে থাকেন, তবে আলাদা করে আর নাম করে করে ক্যাটাগরি বিভাজন করলাম না। তৃতীয় আরেকধরণের ছবিও হয়, তবে সংখ্যায় খুবই কম। সেটা হলো সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তথ্যচিত্র, কিছু ক্ষেত্রে কমিউনিটি ফিল্ম এর কায়দায় তো কিছু ক্ষেত্রে ইন্ডিপেন্ডেন্টলি প্রোডিউস্‌ড্‌। দুই ক্ষেত্রেই আমাদের দেশে এই ধরণের তথ্যচিত্রর মান অসম্ভব খারাপ। সাধারণত, আন্তর্জাতিক পুঁজি না লেগে থাকলে আন্তর্জাতিক মানের ধারে কাছে যায়না। 
আমরা এর কোনোটাই করতে চাইনি। চা বাগানের সমস্যার কথা শহরে কি বিদেশে বেচতে চাইনি। আমরা মূলত চেয়েছি নিজেরা যে পরিস্থিতিতে বেঁচে আছি সেটা তুলে ধরতে বিভিন্নভাবে। এবং সেটা আমরা যে সমাজে বেঁচে আছি সেখানেই ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি। কেউ কেউ সিরিয়াসলি নেয়ইনি ব্যাপারটা তো কেউ কেউ আবার হিরো বানিয়ে দিয়েছে, মাথায় তুলে নাচে পারলে। দুটোই সমান ক্ষতিকর ও বিরক্তিকর। যেটা বোঝা দরকার যে প্রথম যে দুধরণের সিনেমার কথা বললাম সেটা কিন্তু সারা পৃথিবীর ক্ষেত্রেই সত্যি। অনেকেই একটা তৃতীয় পথ খুঁজছে। আমরাও খুঁজছি। সেই পথটা মানুষ পাশে না দাঁড়ালে তৈরি হতে পারে না। প্রোডিউসার আর ডিস্ট্রিবিউটররা ব্যবসা করতেই এসেছে, ওরা সেটাই করবে। যে বানাচ্ছে তার সাথে যে দেখছে তার সরাসরি যোগাযোগ হওয়াটা দরকার। যারা লাভের গুড় খায়, লাভ না দিতে পারলে কোনও মেকারকেই ছুঁড়ে ফেলতে তাদের বাধবেনা আর তারা যে লাভটা করছে তাতে দর্শকেরও কিন্তু শেষ অবধি কোনো লাভ নেই। সরাসরি সংযোগ হলে তবেই ইন্ডাস্ট্রির বাইরে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ জায়গা গড়ে উঠতে পারে। ক্রাউডফান্ডিং বললে অধিকাংশ লোকই ভাবে শেয়ার বাজার যেমন নো-বাজেট বললে কম খরচে হলিউডি কেতের ছবি। কিন্তু ভেল্কি দেখানোর হলে তো এইসব মেকাররা পি সি সরকারের বাড়ির বাইরে লাইনই দিতে পারতো। ক্রাউডফান্ডিংটাকে এই সংযোগের একটা পন্থা হিসাবে কি ভাবা যায় না? নো-বাজেট ফিল্ম বললে একটা অন্য ফিল্ম ল্যাঙ্গুয়েজ, অন্য এস্থেটিক্সের একটা সিনেমা কি ভাবা যায় না? সত্যি বলতে কি ট্রায়ারদের ওই ডগমা ৯৫টা না করলেও চলতো। ওদের হাতে সব থাকার পরও শুধু নতুন সিনেমা খুঁজতে গিয়ে ওরা নিজেদের ওপর নিজেরা লিমিটেশন আরোপ করেছিলো। কিন্তু ওইভাবে একটা মনগড়া নতুন ভাষার জন্ম দেওয়া গেলেও আসল জিনিষটাকি আর বেরোয়? ফাইভ কেন, একটা শর্ট ফিল্ম করতে গেলেও ৫০০ অবস্ট্রাকশন সামাল দিতে হয় আমাদের। স্মার্ট সাজার জন্য ১০টা ইংরিজি গালাগাল আমি দিতেই পারি, কিন্তু প্রকৃত দেশজ গালাগালটা তখনই বেরোবে যখন আমার সত্যিকারের রাগটা হবে। ডগমা জাতীয় ব্যাপারগুলো কিরকম যেন মেকি! মানে একটা গোটা রাত জুড়ে অসম্ভব ভয় পেলে মাথার সব চুল সাদা হয়ে যায়, এই কথা শুনে কোনও এক বালক সারা রাত বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবলো সে খুব ভয় পাচ্ছে আর পরেরদিন চুলে সাদা রঙ করে স্কুলে গেলো। তারপর বন্ধুদের গল্প শোনালো কি ভয়ানক একটা রাক্ষস তাকে ধাওয়া করেছিলো। ওই রঙটা ধুলে উঠে যাবে। ভাষাটা সেখানেই তৈরি হবে যেখানে ভ্যাকুয়ামটার হাঁ সবচেয়ে বড়, যেখানে প্রয়োজনটা দেখা দিয়েছে। ইতালির স্টুডিওগুলো বোমে উড়ে না গেলে ‘রোম-ওপেন সিটি’ টা হতো না। ওটা কেউ এরকম ভেবে বানায়নি যে বেশ তো তাহলে মনে করা যাক যে আমাদের এখন কোনো স্টুডিও নেই! পরিস্থিতিটা ইতিহাস তৈরি করে দেয়। কতদিন জুরাসিক পার্ক আর টাইটানিক দেখব আমরা সিনেমাহলে গিয়ে? ছ’ফুটিয়ার পর্দাজোড়া বাঁদরনাচ কতদিন দেখব? বন্দুক, মেয়ে, গান, হিরো, ভিলেন, সিটি, হাততালি – এটাই তাহলে সিনেমার শেষ রূপ ভারতবর্ষে? 
 
যার পেটে ভাত জোটেনা সিদ্ধান্তটা শেষ অবধি তাকেই নিতে হয় যে সে ভাগচাষি হবে, না মাওবাদী এবং সে সিদ্ধান্তের দায় সম্পূর্ণরূপে তার। 
বাকিরা বরং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিক!
 
                                                       

 

 

 



275 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ উৎসব ইস্পেশাল ২০১২  আলোচনা 
শেয়ার করুন


Avatar: i

Re: ১ এর ঙঃ সাময়িক যবনিকা

কিছুই জানতাম না। অনেক জানলাম। এছাড়া, লেখা হিসেবেও খুব ভালো।
Avatar: sri

Re: ১ এর ঙঃ সাময়িক যবনিকা

যাদের যাদের নো-বাজেট নিয়ে অনেক প্রশ্ন ছিল তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া গেছে কিনা জানাবেন।।
Avatar: রূপঙ্কর সরকার

Re: ১ এর ঙঃ সাময়িক যবনিকা

খুব সুন্দর হয়েছে লেখাটা। ছবি দেখার ইচ্ছে রইল।
Avatar: ritam ghosal

Re: ১ এর ঙঃ সাময়িক যবনিকা

oshadharon lekha hoeche...ammmo ekti no budget independent cinema banate giye para porsi,college er principal,bajar er alu wala,opogondo bondhu bandhob,parar dada...sobar je poriman proso ebong koutuhol er mukhomukhi hoechi...tate khisti chara mukhe ar kichu asto na..tobe sob theke jwalaton koreche ei prosno ta "achha eta banie tumi ki kono taka poisa pabe??" :/ :(
Avatar: ritam ghosal

Re: ১ এর ঙঃ সাময়িক যবনিকা

oshadharon lekha hoeche...ammmo ekti no budget independent cinema banate giye para porsi,college er principal,bajar er alu wala,opogondo bondhu bandhob,parar dada...sobar je poriman proso ebong koutuhol er mukhomukhi hoechi...tate khisti chara mukhe ar kichu asto na..tobe sob theke jwalaton koreche ei prosno ta "achha eta banie tumi ki kono taka poisa pabe??" :/ :(
Avatar: ritam ghosal

Re: ১ এর ঙঃ সাময়িক যবনিকা

sudhu ektu apotti theke gelo anamitra babu...nolan er "following " naki "doodle bug" -konta prothom no budget film???
Avatar: Anamitra

Re: ১ এর ঙঃ সাময়িক যবনিকা

Ritam babu, Doodle Bug ekta 3 minute er chhobi. Amar kono paddhoti jana nei 3 minute er chhobigulir average budget track korar moto. ekhane sei jonno following er ullekh roechhe sudhumatro. Hyan, Doodle Bug e anek kaj e bina khoroche kore neoa gechhilo bote, emon ki chroma-r screen tao naki nijeder hate toiri chhilo. Tobe 16 mm raw stock ta somvoboto kinte hoechhilo.

Jai hok, ekhane ei alochona-r sutropat amader 90 minute er chhobi jar budget kina 2.5 lakh (jeta ekhono otheni, aro 80,000 dure) taka setake keno amra no-budget bolchhi sei kothar uttor dite gie. Setao ekta karon muloto purno doirgho chhobi nie alochona korar.


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন