বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ইরান বিপ্লবের আসল ও নকল

সৌরভ ভট্টাচার্য

সুধী,
ইন্টারনেটের গলিঘুঁজি দিয়ে যখন এতখানি এসেছেন তখন কোথাও না কোথাও, বড়রাস্তায়, নিশ্চয়ই দেখেছেন নেদাকে। নেদা আগা সোলতান। মেয়েটা বিক্ষুব্ধ তেহরানের রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। হয়ত প্রতিবাদে যোগ দিতে, হয়ত নয়। হঠাৎ এক মোটরবাইক তাকে উপহার দিয়ে যায় একটি বুলেট। ইউটিউবে, ব্লগে, টুইটারে ছড়িয়ে পড়েছে তার বুলেটবিদ্ধ, মুখ-দিয়ে-রক্ত-ওঠা, শেষ কয়েকটি মুহূর্তের দৃশ্য। ইরানের "সবুজ বিপ্লবের" প্রতীকী দৃশ্য।
বিপ্লব!!

সুধী, বিরক্ত হয়েছেন আপনি। নেদা শহুরে, অভিজাত, পশ্চিমী। এক ঝলক দেখেই তার শ্রেণীচরিত্র নির্ধারণ ক'রে ফেলেছেন আপনি। প্রশ্ন করেছেন, এ কেন সমাজ বদলাতে চাইবে? আবার এও বুঝতে পেরেছেন, কর্পোরেট মিডিয়া কেন নেদাকে জোয়ান অফ আর্ক বানাতে চাইছে। হয়ত নেদার প্রতি আপনার করুণা হয়েছে। বেচারা!

একটু পিছিয়ে গেছেন, দুজন প্রার্থীর তুলনা করেছেন। আহমেদিনেজাদ: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেন, গরীব মানুষকে তেলের মুনাফা বিলিয়ে দেন, সংরক্ষণের অর্থনীতিতে বিশ্বাসী ; আর মৌসাভি : ঠিক যেন পশ্চিমী লিবারাল, নরমপন্থী, খোলা বাজারের কথা বলেন। আহমেদিনেজাদের সমর্থন সমাজের নীচুতলায়, দেশের গ্রামে গঞ্জে। স্বাভাবিকভাবেই ওনার জেতার কথা। (ত্রুটি আছে, তবে শোধরাবার সম্ভাবনা আছে, কারণ তাঁর শ্রেণীটা ভালো।) হয়ত ১২ই জুন কিছু গোলমাল হয়েছে - কিন্তু ভোটে রিগিং আমাদের দেশে হয় না? আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, "সবুজ বিপ্লবের" কথা শোনা যাচ্ছে কিন্তু শুধু তেহরানে। ব্যাখ্যা ক'রে বুঝিয়েছেন, স্বাধীনতার পশ্চিমী মাপকাঠিতে আমাদের মত দেশকে বিচার করা যায় না। এবং দেখিয়েছেন, গ্লোবাল মিডিয়ার ঠিক কতখানি স্বার্থ জড়িয়ে আছে আহমেদিনেজাদকে হিটলার প্রতিপন্ন করার পেছনে ; কিভাবে ইরাণের শাসকশ্রেণীর গোষ্ঠীদ্বন্দ্বকে পুঁজিবাদী মিডিয়া বিপ্লবের রূপ দিয়ে আহমেদিনেজাদকে বিশ্বের দরবারে অবৈধ প্রমাণ করতে চাইছে। সাদ্দামের বিরুদ্ধেও কি আমেরিকা একই খেলা খেলে নি? আরও আগে, সোভিয়েত রাশিয়া? কোথায়, হন্ডুরাসের অসাংবিধানিক ক্যু-র ব্যপারে তো কোন কথা বলছে না সেই মিডিয়া! আপনি আপনার দীর্ঘ বক্তব্য শেষ করেছেন প্র্যাক্সিসের কথা ব'লে : বৃহত্তর বিশ্বরাজনীতিতে ঠিক কার উদ্দেশ্য সফল করছি, এই দ্বন্দ্বে কাউকে সমর্থন করার আগে সেকথা যেন ভেবে দেখি।

সুধী, আমার অন্য এক বন্ধু কিন্তু নেদার শ্রেণী দেখেনি, সে নেদাকে দেখেছে একজন নারী হিসেবে। সে বলল, বলতো, অদৃশ্য বাসিজ স্নাইপার হঠাত দূর থেকে একটা মেয়েকেই বেছে নিল কেন? আর, তেহরানের বাইরের কোন কথা শুনতে পাই না ব'লে একথা কেন মানতে হবে যে আন্দোলন রাজধানীতেই আটকে আছে? শহরের বাইরে বিদেশী ফটোগ্রাফার নেই, ইন্টারনেট নেই, কিন্তু বাসিজ আছে, পুলিশ আছে। অনেক খোঁজ ক'রে সে জানালো, আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সিরাজে, ইস্ফাহানে, অপেক্ষাকৃত গরীব দক্ষিণ তেহরানে, শ্রমিক অধ্যুষিত য়াজদ-এ মানুষের সংগঠিত প্রতিরোধে পুলিশ ঢুকতে পারেনি।

আচ্ছা, না হয় আন্দোলনের ভৌগোলিক অথবা শ্রেণীগত চরিত্র বিশ্লেষণের মধ্যে না-ই গেলাম। নাহয় ধরেই নেওয়া গেল, আন্দোলন তেহরানের উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত সমাজের সংকীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ। সেই সীমিত আন্দোলনে এমন কী শক্তি নিহিত থাকতে পারে যাকে দমন করতে রাষ্ট্রকে লাঠি নয়, বারুদ ব্যবহার করতে হয়? দেশজুড়ে বিচ্ছিন্ন করতে হয় মোবাইল সংকেত, ইন্টারনেট যোগাযোগ? যার মোকাবিলায় জেলহাজত ভ'রে ওঠে সাংবাদিক, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীর মত আপাত-নিরীহ মানুষে? সুধী, এই ছাত্ররা পুঁজির শ্রেণীচরিত্র বদলাতে চায় না, তবুও দেখুন, ওরা বুক পেতে দেয় বন্দুকের সামনে। উচ্চবিত্তের কি কোন চাওয়াই বৈধ নয়? দেখুন, যাকে আপনি সুবিধাভোগীদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বলেন, সেই দ্বন্দ্বের একপক্ষের হাতে রাইফেল, অন্যপক্ষের হাতে সবুজ ফিতে। তাদের শুধু এইটুকু দাবী, তাদের ভোটের মূল্য দেওয়া হোক। এই ন্যুনতম গণতান্ত্রিক দাবীর উত্তর যদি হয় নেদার নিয়তি, যদি সন্তানের মৃতদেহ মর্গ থেকে উদ্ধার করতে পিতাকে দিতে হয় "বুলেট ফী", সুধী, আপনি কি সত্যিই মনে করেন এই রাষ্ট্রে সসম্মানে সংরক্ষিত হবে শ্রমিকের অধিকার?

সুধী, আমার বন্ধু হয়ত একটু বেশী আবেগে আপ্লুত। আমি বুঝি, যা যা পড়ছি, যা যা দেখছি, তার অনেকটাই হয় পশ্চিমী মিডিয়া নির্মিত, নয়ত আমার আবেগতাড়িত বন্ধুর অশ্রুতে অস্বচ্ছ। জানা প্রায় অসম্ভব, আহমেদিনেজাদের ৬৩% ভোটে ঠিক কতটা জল। জানা অসম্ভব, পুলিশি নৃশংসতার কতটা সত্য, কতটা অতিরঞ্জন। গপ্পো আরো জমিয়ে দিয়ে মেক্সিকোর ইরানী রাষ্ট্রদূত আমাদের জানিয়েছেন, নেদাকে মারিয়েছে সি আই এ।

এত ধোঁয়াশার মধ্যে আমি শুধু এইটুকু সত্যকে আঁকড়ে আছি যে ২৬শে জুন তেহরানের রাস্তায় নির্দোষ নেদাকে হত্যা করা হয়েছে। স্থান-কাল নির্দিষ্ট এই একবিন্দু সত্যকে অবজ্ঞা ক'রে আমি বৃহত্তর কোন অক্ষে আমার নীতিবোধকে লটকে দেব, এই ঔদ্ধত্য আমার নেই। সুধী, আমাকে ক্ষমা করবেন।


জুলাই ৫, ২০০৯

119 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

কোন বিভাগের লেখাঃ বুলবুলভাজা 
শেয়ার করুন



আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন