Muhammad Sadequzzaman Sharif RSS feed

Muhammad Sadequzzaman Sharifএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • কাশ্মীরের ইতিহাস : পালাবদলের ৭৫ বছর
    কাশ্মীরের ইতিহাস : পালাবদলের ৭৫ বছর - সৌভিক ঘোষালভারতভুক্তির আগে কাশ্মীর১ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে চলে যাবে এই ব্যাপারটা নিশ্চিত হয়ে গেল, তখন দুটো প্রধান সমস্যা এসে দাঁড়ালো আমাদের স্বাধীনতার সামনে। একটি অবশ্যই দেশ ভাগ সংক্রান্ত। বহু আলাপ-আলোচনা, ...
  • গাম্বিয়া - মিয়ানমারঃ শুরু হল যুগান্তকারী মামলার শুনানি
    নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস—আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে করা গাম্বিয়ার মামলার শুনানি শুরু হয়েছে আজকে। শান্তি প্রাসাদে শান্তি আসবে কিনা তার আইনই লড়াই শুরু আজকে থেকে। নেদারল্যান্ডের হেগ শহরের পিস ...
  • রাতপরী (গল্প)
    ‘কপাল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যায়। পালানোর কি আর উপায় আছে!’- এই সপ্তাহে শরীর ‘খারাপ’ থাকার কথা। কিন্তু, কিছু টাকার খুবই দরকার। সকালে পেট-না-হওয়ার ওষুধ গিলে, সন্ধেয় লিপস্টিক পাউডার ডলে প্রস্তুত থাকলে কী হবে, খদ্দের এলে তো! রাত প্রায় একটা। এই গলির কার্যত কোনো ...
  • রাতপরী (গল্প)
    ‘কপাল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যায়। পালানোর কি আর উপায় আছে!’- এই সপ্তাহে শরীর ‘খারাপ’ থাকার কথা। কিন্তু, কিছু টাকার খুবই দরকার। সকালে পেট-না-হওয়ার ওষুধ গিলে, সন্ধেয় লিপস্টিক পাউডার ডলে প্রস্তুত থাকলে কী হবে, খদ্দের এলে তো! রাত প্রায় একটা। এই গলির কার্যত কোনো ...
  • বিনম্র শ্রদ্ধা অজয় রায়
    একুশে পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অজয় রায় (৮৪) আর নেই। সোমবার ( ৯ ডিসেম্বর) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অধ্যাপক অজয় দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা অসুখে ভুগছিলেন।২০১৫ ...
  • আমাদের চমৎকার বড়দা প্রসঙ্গে
    ইয়ে, স-অ-অ-অ-ব দেখছে। বড়দা সব দেখছে। বড়দা স্রেফ দেখেনি ওইখানে এক দিন রাম জন্মালেন, তার পর কারা বিদেশ থেকে এসে যেন ভেঙেটেঙে মসজিদ স্থাপন করল, কেন না বড়দা তখন ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুম ভাঙল যখন, চোখ কচলেটচলে দেখলেন মস্ত ব্যাপার এ, বড়দা বললেন, ভেঙে ফেলো মসজিদ, জমি ...
  • ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ?
    যেকোন নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে সামনে আসার পর নাগরিক হিসাবে আমাদের একটা ঈমানি দায়িত্ব থাকে। দায়িত্বটা হল অভিযুক্ত ধর্ষকের কঠোরতম শাস্তির দাবি করা। কঠোরতম শাস্তি বলতে কারোর কাছে মৃত্যুদন্ড। কেউ একটু এগিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ার ...
  • তোমার পূজার ছলে
    বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না ...
  • The Irishman
    দা আইরিশম্যান। সিনেমা প্রেমীদের জন্য মার্টিন স্করসিসের নতুন বিস্ময়। ট্যাক্সি ড্রাইভার, গুডফেলাস, ক্যাসিনো, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, দা অ্যাভিয়েটর, দ্য ডিপার্টেড, শাটার আইল্যান্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট, সাইলেন্টের পরের জায়গা দা আইরিশম্যান। বর্তমান সময়ের ...
  • তোকে আমরা কী দিইনি?
    পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন -********তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে - অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

Muhammad Sadequzzaman Sharif

দেশভাগ। অদ্ভুত উদ্ভট কাণ্ড আমাদের পূর্বপুরুষদের। প্রাচীন এই পৃথিবীতে কত কাণ্ডই তো ঘটেছে, কোন কিছুই নতুন নয়। কিন্তু এমন ধারার কাণ্ড আর হয়নি। আর ভাগ তো ভাগ, মানুষজন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলল যেন এই ভূমিতে তারা কোনদিন ছিলই না। এমন ভাবে তাদের কে দেশ ত্যাগ করানো হল যেন এরা এই দেশের কেউ না, কোন কালে ছিলও না। অথচ দুইদিন আগেও হয়ত একে ওপরের সুখে সুখী হয়েছে, দুঃখে কষ্ট পেয়েছে। নানান সামাজিক রাজনৈতিক প্যাচ মোচড়ে একদিন হুট করে খবর হল এই দেশ আর তোমাদের না, এই ভিটে মাটি তোমাদের না, তোমার বাপ দাদার আমলের যা কিছু তোমার তা তোমার না। তুমি এই দেশের কেউ না। পরিস্থিতি এমন করে ফেলা হল যে কেউ আর কাও কে বিশ্বাস করছে না। এমন এক স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সুদীর্ঘ উপন্যাস নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে।

নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ক্লাসিক বাংলা উপন্যাস। এর বেশি কিছু জানা ছিল না। আর কিছু টুকটাক, যেমন সবাই এর খুব প্রশংসা করেছে, দেশভাগ উপজীব্য করে লেখা হয়েছে এই উপন্যাস। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় মারাও গেলেন এই বছরেই। যখন হাতে নিলাম পড়ার জন্য প্রথমেই থমকে গেলাম। আমি অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার ধরনের সাথে পরিচিত ছিলাম না। তাই থমকে গেলাম ভাষার প্রয়োগ দেখে। দুই এক পাতার পড়ে বুঝলাম আমি আমার অজান্তেই এমন এক জিনিস হাতে নিয়েছি যার তুলনা হয়ত আর নাই। দক্ষ শিল্পী যেভাবে তুলির আঁচর দিয়ে অসামান্য শিল্পকর্ম তৈরি করে ফেলে, আসলে দক্ষ শিল্পী বললে ভুল বলা হবে, শিল্প মাধ্যমে দক্ষ কথাটা যায় না, বলা যায় জিনিয়াস কোন শিল্পী, যেমন আমাদের সুলতান, কামরুল ইসলাম, জয়নুল আবেদিন তেমন কেউ যেন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে বিশাল এক ক্যানভাসে অদ্ভুত সুন্দর ভাবে অতুলনীয় এক শিল্পকর্ম করেছেন। প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা শব্দ, বাক্য যেন তুলির আঁচর। বাংলাদেশকে এত সুন্দর করে, এত রূপসী করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে মুগ্ধতার কোন সীমা থাকে না আর। পুরো উপন্যাস কেমন যেন মোহে আবিষ্ট করে রেখেছিল পুরো সময় ধরে। শেষ হতেই মনের ভিতরে একটা হাহাকার, সমস্ত বাস্তুহারাদের জন্য গলায় কেমন একটা দলা জমে যাচ্ছিল। আবার একটা অপরাধ বোধ কেন জানি ঘিরে ছিল আমাকে। যেন ওরা আমার কারনেই দেশ ত্যাগ করেছে, যেন আমিই দায়ী এর জন্য।

দেশ ভাগ নিয়ে কাহিনী। কত রকমের লেখাই তো পড়া হয়েছে এই বিষয় নিয়ে। উপন্যাসও তো আছে প্রচুর। সব জায়গায় ইতিহাস পাঠ করায় সবাই। গল্পের ছলে ইতিহাস বলে যায়। ভালও লাগে এই ধরনটা। কিন্তু এ কেমন এক উপন্যাস যেখানে দেশভাগের গল্প বলছে অথচ ইতিহাসের কোন পাঠ কেউ করাচ্ছে না? বাংলাদেশের পল্লী এক গ্রাম, যে চিত্র আঁকা হয়েছে, আশেপাশের যে বর্ণনা পাওয়া গেছে তাতে বোঝা যায় নারায়ণগঞ্জ এলাকার দিকের গল্প। নরসিংদীর দিকে বাড়ি ছিল অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের, সম্ভবত সেখানকার কথাই বলে গেছেন তিনি। রূপগঞ্জের নাম পাওয়া যায়, বারোদির নাম, শীতলক্ষ্যা নদী এ সব মিলিয়ে জায়গাটা চেনা যায়। এই গ্রামটাকে তিনি পুরো বাংলাদেশ রূপে তুলে ধরেছেন। এই গ্রামে হিন্দু মুসলিম আছে, তাদের ভিতরে সখ্যতা আছে, বিরোধ আছে, আর গল্প কিছুদূর এগুতেই কদর্য রাজনীতিও হালকা করে আসতে থাকে। মুসলিম লীগের একটু আনাগোনা, ব্যাস, গল্প আবার সম্ভ্রান্ত ঠাকুর পরিবার আর তাদের ঘিরে উঠা সমাজ নিয়ে এগুতে থাকে। আস্তে আস্তে পুরো ভারতবর্ষে যেমন দেশভাগের উত্তাল পাগলা হাওয়া লাগে, এই গ্রামেও লাগে। ধীরে লয়ে এগুনো এই ষণ্ড ভয়াল থাবা মেলে সামনে হাজির হয়। দেশভাগের শিকার হয়ে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়রা বাংলাদেশ ত্যাগ করে, তীব্র কষ্ট নিয়ে সাজানো গোছান সংসার নিমিষে শেষ করে দিয়ে চলে যান তারা কিন্তু তবুও কোথাও তিনি কোন একটা শক্তিশালী ঋণাত্মক চরিত্র তৈরি করেননি। উনার লেখার মাধুর্য এটাই। তিনি এত বড় একটা উপন্যাস লিখেছেন কিন্তু কোন নায়ক বা প্রধান চরিত্র নেই। মজাটাই এটা যে এই উপন্যাসের মূল নায়ক সময়, বাংলার গ্রাম আর মানুষ। ওই সময়টাই এমন এক সময় যে সময়ে আলাদা করে আর কারো নায়ক হতে হয় না। সময় নিজেই এমন এক কাণ্ড করে গেছে।

ঠাকুর বাড়ি নিয়ে গল্প এগিয়েছে। সাথে সাথে এসেছে তৎকালীন বাংলার চরম দারিদ্র্য অবস্থা। মানুষ বিল থেকে শালুক তুলে খাচ্ছে, শাপলা খাচ্ছে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় চুরি করছে, পরনে কাপড় জুটছে না আর এর মধ্যে একদল এসে বলছে সব তো হিন্দুদের হাতে, তাই আমরা গরীব, মুসলমানরা গরীব। বলছে সব জমি কাদের? হিন্দুদের, সব বড় বড় চাকরি কাদের কাছে? হিন্দুদের কাছে। বীজ বপন করা হয় যত্ন করে। বিপরীত চিত্রও পাওয়া যায়। ঠাকুর বাড়িতে থাকে ইশম নামের এক মুসলমান। সারা বছরের বাধা কামলা ধরনের। কিন্তু কী চমৎকার তার চিন্তা ভাবনা। তাকে হিন্দুরা ঘরে ঢুকতে দিচ্ছে না, ছোঁয়া লেগে গেলে গোসল করে পবিত্র হচ্ছে তারা কিন্তু ইশম এতে কোন দোষ দেখে না। এটা তাদের ধর্মের ব্যাপার! ফাতিমার নানী ঠাকুরমা কে দেখতে আসে, এসে নিজেই পিড়ি নিয়ে বাইরে বসে যায়, কোন অভিযোগ পাওয়া যায় না কোথাও। যেন খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু যারা সব ধ্বংসের নিয়ত নিয়ে বসে ছিল তারা এই সব দেখত পায় না। দেশ ভেঙ্গে তিন টুকরো।

ইশম সোনাকে নিয়ে ঘুরে, তরমুজ খেতে কাজ করে। ইশমের দুনিয়া খুব সোজা সরল। ইশম যখন শুনে দেশ ভাগ হবে তখনও বিশ্বাস করে না। ওর কথা হচ্ছে আরে, কার দেশ? দেশ তো একটাই, এইটা ভাগ হয় কীভাবে? জমি এখানে, মাটি এখানে তাহলে দেশ ভাগ হয় কীভাবে? ইশম বোঝে না। সোনাও বুঝে না। সোনা গল্পের অন্যতম বড় চরিত্র, কেউ যদি জোর করে প্রধান চরিত্র বলে খুব বেশি দোষ দেওয়াও যাবে না। সোনা চরিত্রটা যে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই, এটুকু নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। সোনা আর তার পাগলা জ্যাঠামশাই মিলে অদ্ভুত এক রসায়ন তৈরি করে। বড় জ্যাঠামশাই বা পাগলা জ্যাঠামশাই খুঁজে বেড়ায় নীলকণ্ঠ পাখি, খুঁজে যায় শুধু। নীলকণ্ঠ পাখি খুঁজে যায় সোনাও, সামু, দাদা ঠাকুর। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজ কেউ পায় না। কিংবা পায় কিন্তু ধরে রাখতে পারে না।

উপন্যাসের শেষ দিকে সোনা তার পাগলা জ্যাঠামশাইয়ের উদ্দেশ্যে অর্জুন গাছের গায়ে যখন পাগলের মত চাকু নিয়ে লিখতে থাকে - ‘জ্যাঠামশাই আমরা হিন্দুস্তান চলিয়া গিয়াছি, ইতি সোনা’ তখন একটা তীক্ষ্ণ চাকু যেন বুকের ভিতরে এসে লাগে। একটা বরফ শীতল চাকু যেন এফোঁড়ওফোঁড় করে দেয় আমাদের। দেশ ত্যাগ করছে ঠাকুর পরিবার, জলের দামে বিক্রি করে দিয়েছে বাড়ি ঘর, জায়গা জমি। যারা বাড়ি কিনেছে তারা এসে টিনের চাল এসে খুলে নিয়ে যাচ্ছে, প্রতাপশালী ঠাকুর পরিবার তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে, এর মধ্যে সোনা তার বড় জ্যাঠামশাইয়ের উদ্দেশ্যে লিখে রাখছে, ‘জ্যাঠামশাই আমরা হিন্দুস্তান চলিয়া গিয়াছি, ইতি সোনা’ । এই দৃশ্য যে হাহাকার তৈরি করে, যে তীব্র বেদনার জন্ম হয় তার চিহ্ন আগে কোথাও ছিল কী? দেশভাগের শিকার হইনি, বাস্তুভিটা হারানো কী জিনিস জানি না কিন্তু দেশভাগের কষ্ট, ভিটেমাটি ছেড়ে ভিন্ন দেশে চলে যাওয়ার তীব্র কষ্ট যেন মর্মে এসে লাগে এই সময়ে। মনে হচ্ছিল আমি আমার বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ হচ্ছি। মনে হয়েছে যদি পারতাম তাবে পথ আগলে দাঁড়াতাম। যদি পারতাম তবে ইতিহাসের চাকা উল্টে দিতাম। এখন লজ্জা লাগে, কী এক অন্ধ আবেগে ভেসে গিয়েছিল সবাই। বুকে তীব্র কষ্টের জন্ম নেয় এখন। পুরো উপন্যাস শেষ হয়েছেই এক অদ্ভুত হাহাকার তৈরি করে।

বাংলাদেশের রূপ বৈচিত্র্য বর্ণনা করেছেন লেখক অদ্ভুত মুনশিয়ানায়। একটা জায়গায় লিখেছেন - "এই যখন দৈনন্দিন সংসারের হিসাব, তখন বৃন্দাবনী দুই মেয়েকে বাংলাদেশের মাটির কথা শোনায়। শরৎকালে শেফালি ফুল ফোটে, স্থলপদ্ম গাছ শিশিরে ভিজে যায়, আকাশ নির্মল থাকে, রোদে সোনালী রঙ ধরে-এই এক দেশ, নাম তার বাংলাদেশ, এদেশের মেয়ে তুমি। এমন দেশে যখন সকালে সোনালী রোদ মাঠে, যখন আকাশে গগন ভেরি পাখি উড়তে থাকে, মাঠে মাঠে ধান, নদী থেকে জল নেমে যাচ্ছে, দু'পাড়ে চর জেগে উঠেছে, বাবলা অথবা পিটকিলা গাছে ছেঁড়া ঘুড়ি এবং নদীতে নৌকা, তালের অথবা আনারসের, তখনই বুঝবে শরৎকাল এ-দেশে এসে গেল।" চোখ বন্ধ করে শরতের আকাশ দেখা যায় না এই বর্ণনা পড়ে?

শেষ মুহূর্তে লেখক যেন একটু তাড়াহুড়ো করেছে বলে মনে হয়েছে। এত বিশাল একটা ক্যানভাসে শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো যেন কেমন লেগেছে। দৌড় দিয়েই ভাষা আন্দোলনে চলে আসা খুব তাড়াতাড়ি মনে হয়েছে। যেহেতু এরপরে আরও তিনটা উপন্যাস লেখা হয়েছে তাই হুট করে সোনার বর্তমান পরিস্থিতি না দেখালেও হয়ত চলত। দেশ ছেড়ে সবাই চলে গেছে, এখানেই থামলে হয়ত ভাল হয়ত। কিংবা এর যে আরও তিন পর্ব বের হবে তা লেখক হয়ত ঠিক করেনি তখনও, সেক্ষেত্রে ঠিকই আছে। এই উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে ভাষা, অন্তত আমার দৃষ্টিতে। বাংলাদেশের ভাষা এত চমৎকার করে উপস্থাপন সম্ভবত আমি আর কোথাও দেখিনি। আমার বারবার মনে হচ্ছিল আরে এত আমার মুখের বুলি! ফেলু যতবার বলেছে হালার কাওয়া ততবার আমি মুগ্ধ হয়েছি। সোনার মুখের ভাষা কিংবা সোনা যেন আর কেউ না, সোনা হচ্ছি আমি। লেখক যেন আমার শৈশব বর্ণনা করে গেছেন।

এই উপন্যাস শুধু আমাকে আবিষ্ট করেনি। পুরো বাংলা সাহিত্যকেই আবিষ্ট করে রেখেছে। জানলাম ভারতের বারোটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এই উপন্যাস। লেখক হিসেব অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছেন দেশে বিদেশে নানা পুরষ্কার। লেখক সমরেস মজুমদার বলেছেন - “নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে এই সময়ের সেরা উপন্যাস” সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ বলেছেন - “এটা পথের পাঁচালী পড় দ্বিতীয় উপন্যাস যা বাংলা সাহিত্যের মূল সুরকে অনুসরণ করেছে।” আমার কাছে দ্বিতীয় না। আমি নিশ্চিত ভাবেই জানি নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজের মত উপন্যাস আমি কোনদিন পড়িনি। এবং কোন মতেই কেউ ভেবে নিবেন না আমি বাংলা সাহিত্যের খোঁজ খবর না নেওয়া লোক। তুলনা খুব খারাপ জিনিস, আম কাঁঠালের তুলনা চলে? তাই তুলনা করে লাভ নাই। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজের মত করে বাংলাদেশকে বর্ণনা আর কোথাও এত চমৎকার করে করা হয়েছে? জানি না। দেশ ভাগ নিয়ে কয়টা উপন্যাস কালের গায়ে আঁচর কেটে গেছে?

গ্রন্থালোচনা শেষ না করে চলবে লিখে দিতেই পারি। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজের পড়ে লেখক লিখেছেন মানুষের ঘরবাড়ি, অলৌকিক জলযান, ঈশ্বরের বাগান নামে আরও তিনটা উপন্যাস, যা এই কাহিনী সূত্র ধরেই লেখা। ঢাকা থেকে দূরে থাকার কষ্ট এতদিন একবারের জন্যও পাইনি। কিন্তু কালকে রাতে যখন নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে শেষ করলাম রাত চারটায় তখন বুকের ভিতরে জমাট একটা বেদনা জমে যাচ্ছিল এবং এরপরেই খুব করে মনে হল আমি এর বাকি খণ্ড গুলো এই মুহূর্তে পাব না, আমার শহরে এর কোন ব্যবস্থা নাই। অনলাইন হতাশ করে দিয়েছে আমাকে। কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না দ্বিতীয় পর্ব মানুষের ঘরবাড়ি। খুঁজে হয়ত পাবই কিন্তু এখন যেমন পাগল পাগল অবস্থায় আছি তা হয়ত থাকবে না আর। সে যাই হোক, যদি কোন উপন্যাস পড়ে সারা জীবন মনে রাখতে চায় কেউ, যদি কেউ মনে করে দেশভাগের সময় বাংলাদেশের পল্লী একটা গ্রামে কেমন অবস্থা গেছে, যদি কেউ সম্প্রীতির বাংলাদেশকে দেখতে চায়, রূপসী বাংলা কে দেখতে চায় তাহলে বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ুন, আপনিও বের হয়ে পড়ুন নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে। সাথে পাবেন সোনা, লালটু, পলটু, পাগলা জ্যাঠামশাই, ধনবউ, ইশম, ফাতিমা, জোটন, সামু, রঞ্জিত, মালতিদের।

282 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: aranya

Re: নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে - অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

সত্যিই অসাধারণ বই - নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে
Avatar: aranya

Re: নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে - অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

'মনে হয়েছে যদি পারতাম তাবে পথ আগলে দাঁড়াতাম' - এমন করে যদি সবাই ভাবত..


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন