Muhammad Sadequzzaman Sharif RSS feed

Muhammad Sadequzzaman Sharifএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • দক্ষিণের কড়চা
    গরু বাগদির মর্মরহস্য➡️মাঝে কেবল একটি একক বাঁশের সাঁকো। তার দোসর আরেকটি ধরার বাঁশ লম্বালম্বি। সাঁকোর নিচে অতিদূর জ্বরের মতো পাতলা একটি খাল নিজের গায়ে কচুরিপানার চাদর জড়িয়ে রুগ্ন বহুকাল। খালটি জলনিকাশির। ঘোর বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে পচা লাশের মতো। যেহেতু এই ...
  • বাংলায় এনআরসি ?
    বাংলায় শেষমেস এনআরসি হবে, না হবে না, জানি না। তবে গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আজ ব্লক অফিসে গেছিলাম। দেখে তাজ্জব! এত এত মানু্ষের রেশন কার্ডে ভুল! কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম প্রায় সবার ভোটারেও ভুল। সব আইকার্ড নির্ভুল আছে এমন ...
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...
  • খানাকুল - ২
    [এর আগে - https://www.guruchan...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে - অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

Muhammad Sadequzzaman Sharif

দেশভাগ। অদ্ভুত উদ্ভট কাণ্ড আমাদের পূর্বপুরুষদের। প্রাচীন এই পৃথিবীতে কত কাণ্ডই তো ঘটেছে, কোন কিছুই নতুন নয়। কিন্তু এমন ধারার কাণ্ড আর হয়নি। আর ভাগ তো ভাগ, মানুষজন এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলল যেন এই ভূমিতে তারা কোনদিন ছিলই না। এমন ভাবে তাদের কে দেশ ত্যাগ করানো হল যেন এরা এই দেশের কেউ না, কোন কালে ছিলও না। অথচ দুইদিন আগেও হয়ত একে ওপরের সুখে সুখী হয়েছে, দুঃখে কষ্ট পেয়েছে। নানান সামাজিক রাজনৈতিক প্যাচ মোচড়ে একদিন হুট করে খবর হল এই দেশ আর তোমাদের না, এই ভিটে মাটি তোমাদের না, তোমার বাপ দাদার আমলের যা কিছু তোমার তা তোমার না। তুমি এই দেশের কেউ না। পরিস্থিতি এমন করে ফেলা হল যে কেউ আর কাও কে বিশ্বাস করছে না। এমন এক স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সুদীর্ঘ উপন্যাস নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে।

নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ক্লাসিক বাংলা উপন্যাস। এর বেশি কিছু জানা ছিল না। আর কিছু টুকটাক, যেমন সবাই এর খুব প্রশংসা করেছে, দেশভাগ উপজীব্য করে লেখা হয়েছে এই উপন্যাস। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় মারাও গেলেন এই বছরেই। যখন হাতে নিলাম পড়ার জন্য প্রথমেই থমকে গেলাম। আমি অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার ধরনের সাথে পরিচিত ছিলাম না। তাই থমকে গেলাম ভাষার প্রয়োগ দেখে। দুই এক পাতার পড়ে বুঝলাম আমি আমার অজান্তেই এমন এক জিনিস হাতে নিয়েছি যার তুলনা হয়ত আর নাই। দক্ষ শিল্পী যেভাবে তুলির আঁচর দিয়ে অসামান্য শিল্পকর্ম তৈরি করে ফেলে, আসলে দক্ষ শিল্পী বললে ভুল বলা হবে, শিল্প মাধ্যমে দক্ষ কথাটা যায় না, বলা যায় জিনিয়াস কোন শিল্পী, যেমন আমাদের সুলতান, কামরুল ইসলাম, জয়নুল আবেদিন তেমন কেউ যেন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে বিশাল এক ক্যানভাসে অদ্ভুত সুন্দর ভাবে অতুলনীয় এক শিল্পকর্ম করেছেন। প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা শব্দ, বাক্য যেন তুলির আঁচর। বাংলাদেশকে এত সুন্দর করে, এত রূপসী করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে মুগ্ধতার কোন সীমা থাকে না আর। পুরো উপন্যাস কেমন যেন মোহে আবিষ্ট করে রেখেছিল পুরো সময় ধরে। শেষ হতেই মনের ভিতরে একটা হাহাকার, সমস্ত বাস্তুহারাদের জন্য গলায় কেমন একটা দলা জমে যাচ্ছিল। আবার একটা অপরাধ বোধ কেন জানি ঘিরে ছিল আমাকে। যেন ওরা আমার কারনেই দেশ ত্যাগ করেছে, যেন আমিই দায়ী এর জন্য।

দেশ ভাগ নিয়ে কাহিনী। কত রকমের লেখাই তো পড়া হয়েছে এই বিষয় নিয়ে। উপন্যাসও তো আছে প্রচুর। সব জায়গায় ইতিহাস পাঠ করায় সবাই। গল্পের ছলে ইতিহাস বলে যায়। ভালও লাগে এই ধরনটা। কিন্তু এ কেমন এক উপন্যাস যেখানে দেশভাগের গল্প বলছে অথচ ইতিহাসের কোন পাঠ কেউ করাচ্ছে না? বাংলাদেশের পল্লী এক গ্রাম, যে চিত্র আঁকা হয়েছে, আশেপাশের যে বর্ণনা পাওয়া গেছে তাতে বোঝা যায় নারায়ণগঞ্জ এলাকার দিকের গল্প। নরসিংদীর দিকে বাড়ি ছিল অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের, সম্ভবত সেখানকার কথাই বলে গেছেন তিনি। রূপগঞ্জের নাম পাওয়া যায়, বারোদির নাম, শীতলক্ষ্যা নদী এ সব মিলিয়ে জায়গাটা চেনা যায়। এই গ্রামটাকে তিনি পুরো বাংলাদেশ রূপে তুলে ধরেছেন। এই গ্রামে হিন্দু মুসলিম আছে, তাদের ভিতরে সখ্যতা আছে, বিরোধ আছে, আর গল্প কিছুদূর এগুতেই কদর্য রাজনীতিও হালকা করে আসতে থাকে। মুসলিম লীগের একটু আনাগোনা, ব্যাস, গল্প আবার সম্ভ্রান্ত ঠাকুর পরিবার আর তাদের ঘিরে উঠা সমাজ নিয়ে এগুতে থাকে। আস্তে আস্তে পুরো ভারতবর্ষে যেমন দেশভাগের উত্তাল পাগলা হাওয়া লাগে, এই গ্রামেও লাগে। ধীরে লয়ে এগুনো এই ষণ্ড ভয়াল থাবা মেলে সামনে হাজির হয়। দেশভাগের শিকার হয়ে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়রা বাংলাদেশ ত্যাগ করে, তীব্র কষ্ট নিয়ে সাজানো গোছান সংসার নিমিষে শেষ করে দিয়ে চলে যান তারা কিন্তু তবুও কোথাও তিনি কোন একটা শক্তিশালী ঋণাত্মক চরিত্র তৈরি করেননি। উনার লেখার মাধুর্য এটাই। তিনি এত বড় একটা উপন্যাস লিখেছেন কিন্তু কোন নায়ক বা প্রধান চরিত্র নেই। মজাটাই এটা যে এই উপন্যাসের মূল নায়ক সময়, বাংলার গ্রাম আর মানুষ। ওই সময়টাই এমন এক সময় যে সময়ে আলাদা করে আর কারো নায়ক হতে হয় না। সময় নিজেই এমন এক কাণ্ড করে গেছে।

ঠাকুর বাড়ি নিয়ে গল্প এগিয়েছে। সাথে সাথে এসেছে তৎকালীন বাংলার চরম দারিদ্র্য অবস্থা। মানুষ বিল থেকে শালুক তুলে খাচ্ছে, শাপলা খাচ্ছে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় চুরি করছে, পরনে কাপড় জুটছে না আর এর মধ্যে একদল এসে বলছে সব তো হিন্দুদের হাতে, তাই আমরা গরীব, মুসলমানরা গরীব। বলছে সব জমি কাদের? হিন্দুদের, সব বড় বড় চাকরি কাদের কাছে? হিন্দুদের কাছে। বীজ বপন করা হয় যত্ন করে। বিপরীত চিত্রও পাওয়া যায়। ঠাকুর বাড়িতে থাকে ইশম নামের এক মুসলমান। সারা বছরের বাধা কামলা ধরনের। কিন্তু কী চমৎকার তার চিন্তা ভাবনা। তাকে হিন্দুরা ঘরে ঢুকতে দিচ্ছে না, ছোঁয়া লেগে গেলে গোসল করে পবিত্র হচ্ছে তারা কিন্তু ইশম এতে কোন দোষ দেখে না। এটা তাদের ধর্মের ব্যাপার! ফাতিমার নানী ঠাকুরমা কে দেখতে আসে, এসে নিজেই পিড়ি নিয়ে বাইরে বসে যায়, কোন অভিযোগ পাওয়া যায় না কোথাও। যেন খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু যারা সব ধ্বংসের নিয়ত নিয়ে বসে ছিল তারা এই সব দেখত পায় না। দেশ ভেঙ্গে তিন টুকরো।

ইশম সোনাকে নিয়ে ঘুরে, তরমুজ খেতে কাজ করে। ইশমের দুনিয়া খুব সোজা সরল। ইশম যখন শুনে দেশ ভাগ হবে তখনও বিশ্বাস করে না। ওর কথা হচ্ছে আরে, কার দেশ? দেশ তো একটাই, এইটা ভাগ হয় কীভাবে? জমি এখানে, মাটি এখানে তাহলে দেশ ভাগ হয় কীভাবে? ইশম বোঝে না। সোনাও বুঝে না। সোনা গল্পের অন্যতম বড় চরিত্র, কেউ যদি জোর করে প্রধান চরিত্র বলে খুব বেশি দোষ দেওয়াও যাবে না। সোনা চরিত্রটা যে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই, এটুকু নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। সোনা আর তার পাগলা জ্যাঠামশাই মিলে অদ্ভুত এক রসায়ন তৈরি করে। বড় জ্যাঠামশাই বা পাগলা জ্যাঠামশাই খুঁজে বেড়ায় নীলকণ্ঠ পাখি, খুঁজে যায় শুধু। নীলকণ্ঠ পাখি খুঁজে যায় সোনাও, সামু, দাদা ঠাকুর। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজ কেউ পায় না। কিংবা পায় কিন্তু ধরে রাখতে পারে না।

উপন্যাসের শেষ দিকে সোনা তার পাগলা জ্যাঠামশাইয়ের উদ্দেশ্যে অর্জুন গাছের গায়ে যখন পাগলের মত চাকু নিয়ে লিখতে থাকে - ‘জ্যাঠামশাই আমরা হিন্দুস্তান চলিয়া গিয়াছি, ইতি সোনা’ তখন একটা তীক্ষ্ণ চাকু যেন বুকের ভিতরে এসে লাগে। একটা বরফ শীতল চাকু যেন এফোঁড়ওফোঁড় করে দেয় আমাদের। দেশ ত্যাগ করছে ঠাকুর পরিবার, জলের দামে বিক্রি করে দিয়েছে বাড়ি ঘর, জায়গা জমি। যারা বাড়ি কিনেছে তারা এসে টিনের চাল এসে খুলে নিয়ে যাচ্ছে, প্রতাপশালী ঠাকুর পরিবার তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে, এর মধ্যে সোনা তার বড় জ্যাঠামশাইয়ের উদ্দেশ্যে লিখে রাখছে, ‘জ্যাঠামশাই আমরা হিন্দুস্তান চলিয়া গিয়াছি, ইতি সোনা’ । এই দৃশ্য যে হাহাকার তৈরি করে, যে তীব্র বেদনার জন্ম হয় তার চিহ্ন আগে কোথাও ছিল কী? দেশভাগের শিকার হইনি, বাস্তুভিটা হারানো কী জিনিস জানি না কিন্তু দেশভাগের কষ্ট, ভিটেমাটি ছেড়ে ভিন্ন দেশে চলে যাওয়ার তীব্র কষ্ট যেন মর্মে এসে লাগে এই সময়ে। মনে হচ্ছিল আমি আমার বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ হচ্ছি। মনে হয়েছে যদি পারতাম তাবে পথ আগলে দাঁড়াতাম। যদি পারতাম তবে ইতিহাসের চাকা উল্টে দিতাম। এখন লজ্জা লাগে, কী এক অন্ধ আবেগে ভেসে গিয়েছিল সবাই। বুকে তীব্র কষ্টের জন্ম নেয় এখন। পুরো উপন্যাস শেষ হয়েছেই এক অদ্ভুত হাহাকার তৈরি করে।

বাংলাদেশের রূপ বৈচিত্র্য বর্ণনা করেছেন লেখক অদ্ভুত মুনশিয়ানায়। একটা জায়গায় লিখেছেন - "এই যখন দৈনন্দিন সংসারের হিসাব, তখন বৃন্দাবনী দুই মেয়েকে বাংলাদেশের মাটির কথা শোনায়। শরৎকালে শেফালি ফুল ফোটে, স্থলপদ্ম গাছ শিশিরে ভিজে যায়, আকাশ নির্মল থাকে, রোদে সোনালী রঙ ধরে-এই এক দেশ, নাম তার বাংলাদেশ, এদেশের মেয়ে তুমি। এমন দেশে যখন সকালে সোনালী রোদ মাঠে, যখন আকাশে গগন ভেরি পাখি উড়তে থাকে, মাঠে মাঠে ধান, নদী থেকে জল নেমে যাচ্ছে, দু'পাড়ে চর জেগে উঠেছে, বাবলা অথবা পিটকিলা গাছে ছেঁড়া ঘুড়ি এবং নদীতে নৌকা, তালের অথবা আনারসের, তখনই বুঝবে শরৎকাল এ-দেশে এসে গেল।" চোখ বন্ধ করে শরতের আকাশ দেখা যায় না এই বর্ণনা পড়ে?

শেষ মুহূর্তে লেখক যেন একটু তাড়াহুড়ো করেছে বলে মনে হয়েছে। এত বিশাল একটা ক্যানভাসে শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো যেন কেমন লেগেছে। দৌড় দিয়েই ভাষা আন্দোলনে চলে আসা খুব তাড়াতাড়ি মনে হয়েছে। যেহেতু এরপরে আরও তিনটা উপন্যাস লেখা হয়েছে তাই হুট করে সোনার বর্তমান পরিস্থিতি না দেখালেও হয়ত চলত। দেশ ছেড়ে সবাই চলে গেছে, এখানেই থামলে হয়ত ভাল হয়ত। কিংবা এর যে আরও তিন পর্ব বের হবে তা লেখক হয়ত ঠিক করেনি তখনও, সেক্ষেত্রে ঠিকই আছে। এই উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হচ্ছে ভাষা, অন্তত আমার দৃষ্টিতে। বাংলাদেশের ভাষা এত চমৎকার করে উপস্থাপন সম্ভবত আমি আর কোথাও দেখিনি। আমার বারবার মনে হচ্ছিল আরে এত আমার মুখের বুলি! ফেলু যতবার বলেছে হালার কাওয়া ততবার আমি মুগ্ধ হয়েছি। সোনার মুখের ভাষা কিংবা সোনা যেন আর কেউ না, সোনা হচ্ছি আমি। লেখক যেন আমার শৈশব বর্ণনা করে গেছেন।

এই উপন্যাস শুধু আমাকে আবিষ্ট করেনি। পুরো বাংলা সাহিত্যকেই আবিষ্ট করে রেখেছে। জানলাম ভারতের বারোটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এই উপন্যাস। লেখক হিসেব অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছেন দেশে বিদেশে নানা পুরষ্কার। লেখক সমরেস মজুমদার বলেছেন - “নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে এই সময়ের সেরা উপন্যাস” সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ বলেছেন - “এটা পথের পাঁচালী পড় দ্বিতীয় উপন্যাস যা বাংলা সাহিত্যের মূল সুরকে অনুসরণ করেছে।” আমার কাছে দ্বিতীয় না। আমি নিশ্চিত ভাবেই জানি নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজের মত উপন্যাস আমি কোনদিন পড়িনি। এবং কোন মতেই কেউ ভেবে নিবেন না আমি বাংলা সাহিত্যের খোঁজ খবর না নেওয়া লোক। তুলনা খুব খারাপ জিনিস, আম কাঁঠালের তুলনা চলে? তাই তুলনা করে লাভ নাই। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজের মত করে বাংলাদেশকে বর্ণনা আর কোথাও এত চমৎকার করে করা হয়েছে? জানি না। দেশ ভাগ নিয়ে কয়টা উপন্যাস কালের গায়ে আঁচর কেটে গেছে?

গ্রন্থালোচনা শেষ না করে চলবে লিখে দিতেই পারি। নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজের পড়ে লেখক লিখেছেন মানুষের ঘরবাড়ি, অলৌকিক জলযান, ঈশ্বরের বাগান নামে আরও তিনটা উপন্যাস, যা এই কাহিনী সূত্র ধরেই লেখা। ঢাকা থেকে দূরে থাকার কষ্ট এতদিন একবারের জন্যও পাইনি। কিন্তু কালকে রাতে যখন নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে শেষ করলাম রাত চারটায় তখন বুকের ভিতরে জমাট একটা বেদনা জমে যাচ্ছিল এবং এরপরেই খুব করে মনে হল আমি এর বাকি খণ্ড গুলো এই মুহূর্তে পাব না, আমার শহরে এর কোন ব্যবস্থা নাই। অনলাইন হতাশ করে দিয়েছে আমাকে। কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না দ্বিতীয় পর্ব মানুষের ঘরবাড়ি। খুঁজে হয়ত পাবই কিন্তু এখন যেমন পাগল পাগল অবস্থায় আছি তা হয়ত থাকবে না আর। সে যাই হোক, যদি কোন উপন্যাস পড়ে সারা জীবন মনে রাখতে চায় কেউ, যদি কেউ মনে করে দেশভাগের সময় বাংলাদেশের পল্লী একটা গ্রামে কেমন অবস্থা গেছে, যদি কেউ সম্প্রীতির বাংলাদেশকে দেখতে চায়, রূপসী বাংলা কে দেখতে চায় তাহলে বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ুন, আপনিও বের হয়ে পড়ুন নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে। সাথে পাবেন সোনা, লালটু, পলটু, পাগলা জ্যাঠামশাই, ধনবউ, ইশম, ফাতিমা, জোটন, সামু, রঞ্জিত, মালতিদের।

228 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: aranya

Re: নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে - অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

সত্যিই অসাধারণ বই - নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে
Avatar: aranya

Re: নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে - অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়

'মনে হয়েছে যদি পারতাম তাবে পথ আগলে দাঁড়াতাম' - এমন করে যদি সবাই ভাবত..


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন