শ্রমজীবী ভাষা RSS feed

শ্রমজীবী ভাষাএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বার্সিলোনা - পর্ব ১
    ঠিক করেছিলাম আট-নয়দিন স্পেন বেড়াতে গেলে, বার্সিলোনাতেই থাকব। বেড়ানোর সময়টুকুর মধ্যে খুব দৌড় ঝাঁপ, এক দিনে একটা শহর দেখে বা একটা গন্তব্যের দেখার জায়গা ফর্দ মিলিয়ে শেষ করে আবার মাল পত্তর নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ভোর রাতে রওনা হওয়া, আর এই করে ১০ দিনে ৮ ...
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    (টিপ্পনি : দক্ষিণের কথ্যভাষার অনেক শব্দ রয়েছে। না বুঝতে পারলে বলে দেব।)দক্ষিণের কড়চা▶️এখানে মেঘ ও ভূমি সঙ্গমরত ক্রীড়াময়। এখন ভূমি অনাবৃত মহিষের মতো সহস্রবাসনা, জলধারাস্নানে। সামাদভেড়ির এই ভাগে চিরহরিৎ বৃক্ষরাজি নুনের দিকে চুপিসারে এগিয়ে এসেছে যেন ...
  • জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-১৪
    তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায়...আসলে যে কোনও শিল্প উপভোগ করতে পারার একটা বিজ্ঞান আছে। কারণ যাবতীয় পারফর্মিং আর্টের প্রাসাদ পদার্থবিদ্যার সশক্ত স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। পদার্থবিদ্যার শর্তগুলি পূরণ হলেই তবে মনন ও অনুভূতির পর্যায় শুরু হয়। যেমন কণ্ঠ বা যন্ত্র ...
  • উপনিবেশের পাঁচালি
    সাহেবের কাঁধে আছে পৃথিবীর দায়ভিন্নগ্রহ থেকে তাই আসেন ধরায়ঐশী শক্তি, অবতার, আয়ুধাদি সহসকলে দখলে নেয় দুরাচারী গ্রহমর্ত্যলোকে মানুষ যে স্বভাবে পীড়িতমূঢ়মতি, ধীরগতি, জীবিত না মৃতঠাহরই হবে না, তার কীসে উপশমসাহেবের দুইগালে দয়ার পশমঘোষণা দিলেন ওই অবোধের ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি

শ্রমজীবী ভাষা

দিলীপ ঘোষ

যখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম।

গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়াচ্ছে সমবয়সীদের। কলকাতার বেশিরভাগ কলেজের বার্ষিক পত্রিকার মলাটে হালকা থেকে গাঢ় লাল লেনিন, স্টালিন, মাও সে তুং, হাে চি মিন, কারাের না কারাের ছবি শােভা পাবেই, চে গুয়েভারার ডায়েরি অনুবাদ করছেন সুভাষ মুখােপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস সরকার হেরে গিয়ে তৈরি হয়েছে যুক্তফ্রন্ট। সে এক ঘাের লাগা সময়। এরকম সময়েই শুনেছিলাম গােপীবল্লভপুর এবং সন্তোষ রাণার নাম।

১৯৭৭-এ বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এল। একে একে নকশাল আন্দোলনে বন্দি নেতারা ছাড়া পেতে শুরু করলেন। আমি তখন রাজ্য প্রশাসনে যােগ দিয়েছি। সরকার নেতাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিল, এবং শিলিগুড়ি মহকুমায় সেই কাজের দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছিল। সেই সুত্রেই আলাপ হয়ে গেল জঙ্গল সাঁওতাল, পঞ্চানন সরকার, পাঞ্জাব রাও প্রমুখের সঙ্গে। কাগুজে গল্পে যাঁরা বড় বড় গেরিলা যােদ্ধা, তাঁদের কাছাকাছি এসে দেখা গেল সবাই খুব সুভদ্র, মিতভাষী সহজ মানুষ। একধরনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল, যা যতদিন উত্তরবঙ্গে চাকরি করেছি ততদিনই অটুট ছিল। সন্তোষ রাণা তখনও অবশ্য কেবলই একটি উজ্জ্বল নাম।

১৯৯৮ সাল থেকে পঞ্চায়েতের মাধ্যমে গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করেছি পঞ্চায়েত গ্রামােন্নয়ন বিভাগে কর্মরত আমরা কয়েকজন। তৎকালীন বিভাগীয় মন্ত্রী এবং প্রধান সচিবও উৎসাহ যােগাচ্ছেন। সমস্যা ছিল পঞ্চায়েতগুলাে যদিও খাতাকলমে স্ব-শাসিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, সেগুলির কার্যকলাপ সবই বাঁধা কোনও না কোনও সরকারি কর্মসূচির নিগড়ে। ঠিক কীভাবে এগােতে হবে কোনও ধারণা ছিলনা। ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি মেদিনীপুরে বেশ কয়েকটি গ্রাম জুড়ে এরকম একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এটা জানতাম। গ্রামভিত্তিক পরিকল্পনার সেই উদ্যোগের প্রধান রূপকার ছিলেন আইআইটি খড়গপুরের গ্রামােন্নয়ন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক অজিত নারায়ণ বসু। তিনি তখন অবসর নিয়েছেন, কিন্তু আমাদের উৎসাহ দেখে কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই লেগে পড়েছিলেন আমাদের পথ দেখাতে। অফিস থেকে ফেরার সময় মাঝেমাঝেই তাঁর বাড়িতে ঢুকে পড়তাম কিছু প্রশ্ন, কিছু উত্তর সঙ্গে নিয়ে। সেই বাড়ির বারান্দায় চা মুড়ি চিবােতে চিবােতেই একদিন দেখা হয়েছিল সন্তোষ রাণার সঙ্গে। অজিতদা আলাপ করিয়ে দিলেন।

নামী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা সাধারণত সরকারি আমলাদের যে তাচ্ছিল্য এবং অবজ্ঞার বিচিত্র মিশ্রণ দিয়ে আলাপ শুরু করে থাকেন, এ ক্ষেত্রেও সেরকমই কিছু ঘটবে এটাই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু সেরকম কিছু ঘটল না। গলার স্বর, শরীরী ভাষা সবই অপরিবর্তিত, আলােচনায় জড়িয়ে নিলেন আমাকেও। নানা সরকারি উদ্যোগে মানুষের যােগদানের সমস্যাই ছিল আলােচ্য বিষয়। আমি তখন নানা “আনলার্নিং”-এর মধ্যে দিয়ে চলেছি। সরকারি কর্মসূচি রূপায়ণে প্রশিক্ষিত আমি কর্মসুচির সাফল্য মাপতাম খরচের বহর আর আনুষঙ্গিক কিছু সূচক দিয়ে। অজিতদার উন্নয়নের সংজ্ঞা আলাদা। তাঁর ভাষায় সরকারি কর্মসূচিগুলি হ’ল শ্রমজীবী মানুষকে পােষ মানানাের হাতিয়ার। তিনি পরিকল্পনাকে দেখতেন মানুষের “চেতনা” বৃদ্ধির পক্রিয়া হিসেবে। পরিকল্পনার প্রক্রিয়ায় যােগ দিয়ে গ্রামের মানুষ তাঁদের নিজেদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিশ্লেষণ করছেন, সেই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সমাজকে বদলানাের উদ্যোগ নিচ্ছেন। মার্কস পৃথিবীকে একইসঙ্গে ব্যাখ্যা এবং বদলানাের যে কথা বলেছিলেন, গ্রামবাসীদের দ্বারা গ্রাম পরিকল্পনায় সেই দর্শনই প্রয়ােগ করার স্বপ্ন দেখতেন অজিতদা। মূলত ক্লাসিকাল ঢং-এ শ্রেণী, পেশা এসবই আসত আমাদের সান্ধ্য আলােচনায়। জাতি একদমই আসত না তা নয়, তবে সেটা শ্রেণীর হাত ধরে।

আমি বর্ণ হিন্দু পরিবারের সন্তান, বাম আবহে বড় হয়েছি, চাকরির প্রায় পুরােটাই কেটেছে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে, আমাদের এখানে জাতিভেদ নেই, পশ্চিমবঙ্গে জাতি-বর্ণ ইস্যু নয় এটাই ধারণা ছিল। সেই সন্ধ্যায় সন্তোষদা অনেক সময় কাটালেন পশ্চিমবঙ্গে আমাদের “না-দেখতে-পাওয়া” জাতিভেদ নিয়ে। অবাক হয়েই শুনছিলাম তার কথা। কিন্তু বিষয়টা নিয়ে সেই আলােচনার পরে আর বিশেষ এগােনাে হয়নি।

গ্রামভিত্তিক পরিকল্পনা ইতিমধ্যেই শুরু হল, কিঞ্চিৎ সরকারি সাহায্য পাওয়া গেল, ব্রিটিশ সরকার এই উদ্যোগকে মদত দিতে এগিয়ে এলেন, যেটা ব্যক্তিগতভাবে অজিতদা খুব একটা ভালাে চোখে দেখেননি। তাঁর মতে এটা মানুষের নিজেদের উদ্যোগ, বড়জোর রাজ্য সরকারের উদ্যোগ হওয়া উচিত ছিল। বিদেশি অর্থ নেওয়া মানেই মানুষের পরিকল্পনার স্বাধীনতা অনেকটাই কমে যাওয়া। এর অল্প কিছুদিন পরে অজিতদা অসুস্থ হয়ে পড়লেন, পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। সন্তোষদার সঙ্গে আমার যােগাযােগ বিচ্ছিন্ন হ’ল।

এসব ঘটনার বেশ কয়েক বছর পর অনুজপ্রতিম কুমার রাণার বাড়িতে দেখা হয়েছিল কয়েকবার সন্তোষদার সঙ্গে। সৌজন্যমূলক কথাবার্তাতেই সীমাবদ্ধ ছিল সেইসব সাক্ষাৎ। ইতিমধ্যে তাঁর কয়েকটি প্রবন্ধ সংকলনও পড়ার সুযােগ হ’ল। সেসব পড়তে গিয়ে যে বিষয়টি আমার কাছে একেবারেই ‘জ্ঞানাঞ্জন শলাকা’ রূপে প্রতিভাত হয়েছিল সেটি হ’ল বামপন্থী অবস্থান থেকে ভারতীয় সমাজে জাতি-বর্ণের গুরুত্ব নিয়ে লেখাগুলি। আর পাঁচজন বর্ণহিন্দু মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের মতাে আমারও ধারণা ছিল এখানে হিন্দি বলয়ের মতাে জাতি-বর্ণভিত্তিক ‘সেনা’ গঠিত হয় না, ছোঁয়াছুঁয়ি প্রকট নয়, দলিত বলেই ধর্ষিত হয় না কোনও মেয়ে, অতএব এখানে জাতি-বর্ণ গুরুত্বপূর্ণ নয়। সন্তোষদার লেখালেখিতে ধাক্কা খেয়েছিল এই ধারণাগুলাে। ১৯৯১ সালে লিখেছিলেন, ‘নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব ও জাতি-বর্ণের বিলুপ্তি’। মণ্ডল কমিশনের সুপারিশের প্রেক্ষিতে। ভারতীয় মার্কসবাদীদের চিরাচরিত ভঙ্গিটিকেই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন একরকমঃ

“প্রাক্-ঔপনিবেশিক ভারতে জাতি-বর্ণ ব্যবস্থা কীভাবে উদ্বৃত্ত আহরণকে নিয়ন্ত্রিত করেছিল তা তাঁরা দেখেন না অথবা পুঁজিবাদী সম্পর্কে প্রবেশ করার পরও জাতি-বর্ণগত শ্রম বিভাজন কীভাবে চালু আছে এবং উদ্বৃত্ত আহরণের ধরনকে প্রভাবিত করছে তাও তাঁরা দেখেন না। ।।। অনুন্নত দেশগুলিতে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি যে অতি মুনাফা অর্জন করে, তার উৎসই হচ্ছে মুল্যের নিচে কৃষিজ উৎপন্ন দ্রব্য ও শ্রমশক্তি কিনতে পারা। এখন যাঁরা মূল্যের নিচে তাঁদের উৎপন্ন ও শ্রমশক্তি বিক্রি কছেন তাঁরা কারা? তাঁরা হচ্ছেন সামাজিকভাবে নিপীড়িত আদিবাসী, নিম্নবর্ণ, অত্যাচারিত জাতিসত্তা (যেমন ঝাড়খণ্ডিরা) এবং মুসলমানেরা। এটাই হচ্ছে জাতি-বর্ণ বা পরিচয়ভিত্তিক শ্রমবিভাজনের সঙ্গে আধাঔপনিবেশিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার যােগসূত্র।”(প্রবন্ধ সংগ্রহ; গাঙচিল)

১৯৯৬ সালে মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার প্রেক্ষিতে লিখেছিলেন, “জাতি-বর্ণব্যবস্থা, সংরক্ষণ ও মণ্ডল কমিশন।” এখানেই প্রথম দেখলাম বামপন্থী শিবির থেকেই একজন বলছেন যে ভারতে জাতি-বর্ণ ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে উৎপাদন সম্পর্কে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না, এই ধারণাটি ভ্রান্তঃ

“এটা ঠিক যে, সব কুম্ভকার আর হাঁড়ি তৈরির কাজে নিযুক্ত নেই, অথবা সব চর্মকার আর চামড়ার কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কিন্তু তাঁরা কোন পেশায় গেছেন? দেখা যাবে তাঁরা হয়ত খেতমজুর হয়েছেন অথবা ইটভাটায় কাজ করছেন। অর্থাৎ এক ধরনের দৈহিক শ্রম থেকে আরেক ধরনের দৈহিক শ্রমের মধ্যে গেছেন। তেমনিই সব ব্রাহ্মণ নিশ্চয়ই আর পুরােহিত বৃত্তিতে সীমাবদ্ধ নেই। তাদের অনেকে জজ, ডাক্তার, উকিল, আমলা, অধ্যাপক হয়েছেন। এককথায় মানসিক শ্রম ও দৈহিক শ্রমের মধ্যে বড় আকারের যে ভাগাভাগি, সেদিক থেকে বিচার করলে যাঁরা চিরাচরিতভাবে দৈহিক শ্রমের উপর নির্ভরশীল ছিলেন তাঁরা এখনও দৈহিক শ্রমের উপরেই নির্ভরশীল আছেন। (জাতি-বর্ণ ব্যবস্থা, সংরক্ষণ ও মণ্ডল কমিশন; প্রবন্ধ সংগ্রহ; গাঙচিল)।”

রাজ্যের পরিস্থিতি বিশ্লেষণের সময় তিনি বড় ধাক্কা দিয়েছিলেন আমার বহুদিনের লালিত বিশ্বাসকেঃ

“বড় ও মাঝারি সরকারি চাকরি, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিল্পী, লেখক, উকিল, বিচারক, সংবাদপত্রজীবী, অধ্যাপক প্রভৃতিদের যদি একটি গােষ্ঠী হিসেবে ধরা হয় তাহলে দেখা যাবে যে, এই গােষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মাত্র তিনটি উচ্চবর্ণ থেকে আসা মানুষ। এতদিন ধরে অনুসূচিত জাতি ও আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষণ থাকলেও উঁচু সরকারি পদে বসে থাকা উচ্চবর্ণবাদীদের অনীহার কারণে সেই সংরক্ষণের কোটা পূরণ হয় না। মুসলমানরা পশ্চিমবাংলার জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। কিন্তু সরকারি চাকুরিয়াদের মধ্যে মুসলমানদেরঅংশশতকরা এক ভাগও নয়।”(পূর্বোক্ত)

মনে রাখতে হবে, এই লেখাটি তিনি লিখেছিলেন সাচার কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশিত হবার এগারাে বছর আগে। চাকরি করার সময় কোটা না পুরণ হবার বিষয়টির মুখােমুখি হয়েছি অনেকবারই। আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত পদ খালি পড়ে আছে কারণ যােগ্য কাউকে পাওয়া যায়নি, সংশ্লিষ্ট বিভাগ আবেদন জানিয়েই চলেছে পদগুলি সংরক্ষণমুক্ত করে দেওয়ার জন্য, কারণ ‘উপযুক্ত’ প্রার্থীর অভাবে পদগুলাে পূরণ করা যাচ্ছে না। আগে বেশ সহজেই হয়ে যেত ব্যাপারটা, উচ্চবর্ণরা তাদের প্রাপ্যের অতিরিক্ত পেয়ে যেতেন
সরকারের কাছ থেকে। পরবর্তীকালে কড়াকড়ি হয়েছিল কিন্তু আদিবাসীদের হাল যেহেতু ফেরেনি,পদও ফাঁকাই থেকে যেত।

যা নিয়ে সংরক্ষণ-বিরােধীরা আপত্তি তুলে থাকেন, সেই অনুসূচিত জাতি এবং জনজাতিদের মধ্যে সুবিধাভােগী ‘ক্রিমি লেয়ার’-এর বিষয়টি নিয়েও তার বক্তব্য স্পষ্টঃ

“এটা সত্যি যে তপসিলি জাতি, আদিবাসী এবং ওবিসিদের মধ্যে ছােট একটা স্বচ্ছল মধ্যশ্রেণী তৈরি হয়েছে। এদেরকে সংরক্ষণের আওতার বাইরে রাখার কথা বলা হচ্ছে। প্রথমে বােঝা দরকার এই স্বচ্ছল অংশটি কত বড়। জাতীয় নমুনা সমীক্ষার (৬১তম রাউন্ড) ফলাফলে দেখা যায় যে, ।।। ৯৭ শতাংশ তপসিলি জাতি, ৯৮ শতাংশ আদিবাসী ও ৮৮ শতাংশ ওবিসি-র মাসিক আয় ১১৫৫ টাকার কম। ।।। যাদের মাসিক রােজগার ১১৫৫ টাকার কম সেই পরিবারের ছেলেমেয়েদের পক্ষে সংরক্ষণের সুযােগ নিয়ে উচ্চশিক্ষায় বা উঁচুপদের চাকরিতে ঢােকা অসম্ভব না হলেও খুবই কঠিন। এখন যে অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ কিছুটা স্বচ্ছল হয়েছেন তাঁদেরও যদি সংরক্ষণের আওতা থেকে বাদ দেওয়া হয় তাহলে সংরক্ষিত পদ এখন যেটুকু পূরণ হয় তাও হবে না।”(সংরক্ষণ, ক্রিমি লেয়ার ও বিচারবিভাগ; প্রবন্ধ সংগ্রহ; গাঙচিল)

এখনও মেডিকেল কলেজগুলিতে আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত আসন পূর্ণ হয় না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এইসব কলেজের ঢােকার মাপকাঠিটাই এতাে বিচিত্র যে আদিবাসীরা অধিকাংশ সময়েই সেটা ছুঁতে পারেন না। এই নিয়েও একাধিকবার সরকারের কাছে লিখেছিলেন সন্তোষদা। খুব কিছু হয়নি অবশ্য তাতে। রাষ্ট্র (এবং সমাজ) অর্থের বিনিময়ে বিত্তবান গর্দভকেও স্টেথাে ধরার অনুমতি দেয়, কিন্তু মেধাবী নিম্নবর্ণের জন্য সে রাস্তা বন্ধ রাখার নানাফিকির খোঁজে।

প্রসঙ্গত, কেবল ওঁর লেখাতেই বর্ণহিন্দু বাঙালিদের গান্ধীবিদ্বেষের একটা ব্যাখ্যা পেয়েছি। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত একটি লেখায় সােজাসাপ্টা ভাষায় জানাচ্ছেনঃ

“বাংলার ভদ্রলােকের কাছে পুনা চুক্তি সাম্প্রদায়িক আসন বন্টনের চেয়েও খারাপ হিসেবে উপস্থিত হল। তাঁরা পুনা চুক্তির ঘাের বিরােধিতা করলেন। ।।। ১৯৪৭ সালে যখন বাংলা বিভাজনের প্রশ্ন উত্থাপিত হ’ল তখন ভদ্রলােক শ্রেণি হিসেব কষে দেখলেন, বাংলা যদি অবিভক্ত থাকে তাহলে মুসলমান আর দলিতরা মিলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠবেন। তাহলে তাঁদের পক্ষে আর রাইটার্স বিল্ডিং দখল করা সম্ভব হবে না। হিন্দু মহাসভার নেতারা খােলাখুলি এই কথা প্রচার করে হিন্দুদের মধ্যে বাংলাভাগের পক্ষে জনমত গড়ে তুললেন। বাংলায় হিন্দু মহাসভা খুব বড় পার্টি ছিল না। কিন্তু দেশভাগের প্রশ্নে তাদের মত-ই ভদ্রলােকের মতামত হিসেবে বেরিয়ে এল। শরৎ বসুর মতাে বাঘা নেতাও বাংলাকে অবিভক্ত রাখতে ব্যর্থ হলেন। কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাভাগের বিরােধী ছিল, কিন্তু ।।। তারা এই যুক্তি দেয় যে জনমতের দিকে তাকিয়ে তারা বিভাজনের পক্ষে ভােট দেয়। এখানে জনমত বলতে বুঝতে হবে ভদ্রলােকের মত।”(বাংলার জাতীয়
বিকাশের কিছু সমস্যা; প্রবন্ধ সংগ্রহ; গাঙচিল)।

২০০৯ সালে প্রকাশিত হয়েছিল কুমার রাণার সঙ্গে তাঁর যৌথভাবে লেখা “পশ্চিমবঙ্গের দলিত ও আদিবাসী”। এতদিন যে কথাগুলি বলছিলেন এবার বিশদ তথ্যপ্রমাণ সহ পেশ করলেন সেগুলােকে। একটা মজার ঘটনা মনে পড়ল এই অনুষঙ্গে। চাকরি শেষ করার অব্যবহিত পরে রাজ্যের পাবলিক সার্ভিক কমিশনে সর্বােচ্চ প্রশাসনিক সেবার মৌখিক পরীক্ষার পরীক্ষক হতে হয়েছিল। সংরক্ষিত আসনগুলির পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা যখন শুরু হবে, আমি বাের্ডের চেয়ারম্যান এবং অন্য সদস্যদের (যারা আমার মতােই বর্ণহিন্দু পরিবারভুক্ত) বললাম, এখন যাঁরা আমাদের সামনে আসবেন তাঁদের জাতি-বর্ণভিত্তিক অনুপাত হবে এরকম। এঁরা দুজনেই চমকে জানতে চাইলেন আমি কীভাবে সেটা জানলাম। মিলে গেলে বলার প্রতিশ্রুতি দিলাম। সাধারণত বাের্ড দেখে যে সংরক্ষিত জাতির প্রমাণ আছে কিনা। আমার ভবিষ্যদ্বাণীর প্রেক্ষিতে তাঁরা, কোন কোন জাতি-বর্ণ থেকে পরীক্ষার্থীরা আসছেন তার নােট রাখতে শুরু করলেন। দিন চারেক বাদে যখন এই শ্রেণীর পরীক্ষার্থীদের পালা শেষ হ’ল, বাের্ড সংখ্যা মিলিয়ে দেখলেন, আমি যা বলেছিলাম অনুপাতটি তার খুবই কাছাকাছি। আমার গােপন রহস্য সন্তোষদা ও কুমারের গ্রন্থটির কথা বলতেই হ'ল।

সন্তোষদা চলে যাওয়ার পর আমার এক সাংবাদিক বন্ধু মন্তব্য করেছিলেন, সন্তোষদাকে তাঁর কেন যেন গান্ধীবাদী নেতা মনে হত। আমার এই বাল্যবন্ধু যৌবনে গাঢ় লাল রঙের রাজনীতি করেছে, সন্তোষদার রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে ভালই জ্ঞানগম্যি আছে তার। তর্ক করিনি, কারণ আমারও এরকম একটা মনে হওয়ার ব্যাপার ছিল। পেছন ফিরে দুটো চরিত্রগত মিল খুঁজে পাই গান্ধীজীর সঙ্গে।

প্রথম মিলটি হচ্ছে, যা বুঝেছেন তা বলার সাহস। জাতি-বর্ণ নিয়ে এ রাজ্যে লাল-এর নানা ঘনত্বের কোনও বামপন্থী চিন্তককেই কখনও বলতে শুনিনি। ‘এখানে এসব নেই’ জাতীয় আত্মতুষ্টি দেখেছি সবার মধ্যে, সন্তোষদা ছাড়া। জাতি নিয়ে তাঁর বক্তব্যের জন্য যে নিজের দলের সদস্যরাও ‘আওয়াজ’ দিয়েছিলেন তাঁকে, ছােট্ট করে সেকথা লিখে গেছেন তাঁর স্মৃতিকথা, “রাজনীতি এক জীবন”-এ। যা সত্য বলে মনে করেন তার জন্য প্রচলিত বিশ্বাস, সমর্থকদের ধারণার বিরুদ্ধে একটা অবস্থান নেওয়ার অতিদুর্লভ
সাহস গান্ধীজীরও ছিল। সবরমতী আশ্রমের একদম গােড়ার দিকে একটি অচ্ছ্যুৎ পরিবারকে আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে, আশ্রমের প্রধান রসদদার মঙ্গলদাস গিরধরদাস সবরকম আর্থিক সাহায্য দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কস্তুরবা সহ অনেক আশ্রমিকই গান্ধীজীকে বলেছিলেন পরিবারটিকে অন্যত্র পাঠাতে। গান্ধী অনড়।

দ্বিতীয় মিলটি পাই শােনার অভ্যেস এবং ধৈর্যে। চম্পারণে। গান্ধীজীর প্রায় ১৬ হাজার কৃষকের অভিযােগ শােনার বিবরণ পড়েছিলাম ডিজি তেণ্ডুলকরের বইতে। গণ পিটিশন জাতীয় স্বাক্ষরের তলায় স্বাক্ষর সাজানাে নয়, আলাদা করে শােনা এবং লেখা প্রত্যেকের বক্তব্য।

একবার সরকারি কাজে গােপীবল্লভপুর যাওয়ার প্রােগ্রামের কথা জানিয়েছিলাম কুমারকে। কুমার জানালেন সেদিন সন্তোষদাও গােপীবল্লভপুরে থাকবেন, কেন্দ্রীয় সরকারের একটি কমিটি একশাে দিনের কাজ নিয়ে তাঁর পরামর্শ চেয়েছেন, সেই ব্যাপারেই গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলবেন সন্তোষদা। কাজ সেরে পিতানাউ গ্রামে সন্তোষদার বাড়িতে হাজির হলাম। কৌতুহল ছিল গ্রামবাসীদের সঙ্গে ওঁর কথাবার্তা নিয়ে। আলােচনায় যখন বসলেন, তখনআমিও দর্শকাসনে গেড়ে বসলাম।

আমরা যারা গ্রামােন্নয়ন নিয়ে কাজ করেছি তারা জনগণের সঙ্গে আলােচনার একটা ধাঁচে অভ্যস্ত ছিলাম। সেই ধাঁচা অনুযায়ী মুলত বিষয়টির আমরাই অবতারণা করি, ব্যাখ্যা করি, এবং সেসব চুকে গেলে এমন সব প্রশ্ন করি যাতে পছন্দসই উত্তর পাওয়া যায়। সেও অনেক কষ্টে বার করতে হয় কারণ সাধারণ মানুষ সহজে রাষ্ট্রের কোনও প্রতিনিধির কাছেই মুখ খুলতে উৎসাহী হন না যদি না সে বক্তব্যের পেছনে ঘােষিত এবং জোরালাে রাজনৈতিক সমর্থন থাকে।

সন্তোষদা প্রসঙ্গটি তুলে একটি সরকারি কমিটি এ বিষয়ে তাঁর মতামত চেয়েছেন বলে গ্রামবাসীদের জানালেন, কোনও ব্যাখ্যান নেই, বক্তৃতা নেই, শুধু জানানাে। তাঁকে ঘিরে গােল হয়ে বসা গ্রামের মানুষজন তারপর নিজেদের মতােই বলা শুরু করলেন একশাে দিনের কাজের নানা সমস্যার কথা যার বেশিরভাগই আমার জানা ছিল না, যদিও গ্রামে ঘােরাঘুরি করছি অনেকদিনই। আফশােস, সেদিনের কথােপকথনের নােট রাখা হয়নি। বস্তুত আমার চেনা ছকের এতটা বাইরে চলে যাবে বিষয়টা সেটা খানিকটা এগােনাের আগে বুঝিনি। যেটুকু বলেছিলেন, শুনেছিলেন তার অনেক বেশি সময় ধরে। বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করছেন অনেকেই, কিন্তু তিনি ধৈর্য হারাচ্ছেন না, শুনে যাচ্ছেন।

নানা প্রসঙ্গে ওঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলােচনার সুযােগ হয়েছিল গত বছর। সেই কথােপকথন প্রকাশিত হয়েছিল আনন্দবাজার পত্রিকার মেদিনীপুরের পাতায়। বাম-আন্দোলনে দলিত সংগঠন, ছাত্র-যুবদের রাজনীতিতে যােগদান, পঞ্চায়েতের ভূমিকা, রাজ্যে দক্ষিণপন্থীদের উত্থান, নানা বিষয় ছুঁয়ে গেছিল সেই আলােচনা। আলােচনায় উদ্বেগ ছিল কিছু কিছু বিষয় নিয়ে, কিন্তু নৈরাশ্য ছিল না।

শেষদিন পর্যন্ত, অক্সিজেন সাহায্য নিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস চালানাে অবস্থাতেও আশাবাদী ছিলেন। এই আশাই আমাদের উত্তরাধিকার।

[সদ্যপ্রয়াত সন্তোষ রাণার স্মরণে 'শ্রমজীবী ভাষা' পত্রিকা একটি বিশেষ স্মরণ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। এই লেখাটি সেই সংখ্যায় প্রকাশিত অনেকগুলি লেখার মধ্যে একটি।
সংখ্যাটির দাম: ৫০ টকা
পাওয়া যাচ্ছে: কলেজস্ট্রীটে মণীষা গ্রন্থালয়, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, পাতিরাম, পিবিএস, বইচিত্র, বুকমার্ক, ধ্যনবিন্দু ইত্যাদি দোকানে]

276 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: শিবাংশু

Re: পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি

আমরা যারা বঙ্গীয় মূল স্রোতের অংশ নই, গোবলয়ের প্রান্তিক লোকজন, ভারতীয় সমাজতন্ত্রের নিজস্ব ক্যানন তৈরি করার জন্য অতি সীমিত সাধ্যে প্রচার করেছি চার দশক, তাদের কণ্ঠস্বর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সন্তোষ রাণা। এদেশে 'ধর্ম' বা বর্ণাশ্রমের শিকড়কে অস্বীকার করে ক্ষমতাসীন সরকার সমাজতন্ত্রের যে মডেলকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তার দশা এখন তো অতি প্রকট। 'আদর্শ' ও দূরদর্শিতার মধ্যে যে কোনও বিরোধ নেই সে কথাটা তাঁদের কাউকে বুঝিয়ে ওঠা যায়নি। উচ্চবর্গীয় মেধাসর্বস্ব ধ্যানধারণা ইতরবর্গের বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি। ব্যান্ডেজ বেঁধে রক্তে 'রামে'র ক্যান্সার আরোগ্য করা যায়না। যাঁরাই গোটা ব্যাপারটা সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে চিনতে চেয়েছিলেন, তাঁদের অদৃষ্টে কোণঠাসা হওয়া ছাড়া আর কোনও গতি ছিলোনা। সন্তোষ রাণার পর্যায়ের মেধা ও কর্মিষ্ঠতাও মূলস্রোতের সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে আমল পায়নি। গুরু'র পুরোনো কথা 'যারে তুমি নিচে ফেলো' ইত্যাদি এখানেও প্রযোজ্য।

আন্তরিক লেখাটি ভালো লাগলো।
Avatar: Ela

Re: পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি

সন্তোষ রাণার নাম আর গোপীবল্লভপুর ছাড়া আর বিশেষ কিছুই জানতাম না, স্বীকার করতে লজ্জা নেই। লেখাটি পড়ে কিছু জানলাম তো বটেই, আরও জানার খিদে চাগিয়ে উঠল।

ভালো লাগল যে সে তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
Avatar: বেঙ্গলী

Re: পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি

দারুণ লেখা।
কিছুদিন আগে কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতালের ঘনিষ্ঠ কিছু ভদ্রলোকের সাথে আড্ডা হচ্ছিল। অনেক গল্প শুনলাম। এখন অবিশ্যি তাঁরা সবাই বিজেপি করে থাকেন। একজনকে পরে আলাদাভাবে জিজ্ঞেস করায় বললেন শ্রেণী শোষণ বা শ্রেণী সংগ্রাম বরাবর প্রাসঙ্গিক থাকবে, ওটাই মৌল ব্যাপার, কিন্তু আপাতত দেশবিভাগের ত্রুটি সংশোধনের জন্য হিন্দু-মুসলিম ইস্যুই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক।
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি

লালা সেলাম! সন্তোষ রাণাদের মৃত্যু নেই! 💔
Avatar: খ

Re: পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি

ভালো লেগেছে‌।
Avatar: অর্জুন

Re: পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি


পড়লাম । লেখাটা না মেমোয়ার না মূল্যায়ন। সন্তোষ রাণা নাম ব্যক্তিটির সঙ্গে আমার মত তার নাম বিশেষ না শোনা পাঠকের কাছে তার কন্ট্রিবিউশন খুব পরিষ্কার হল না। শ্রেণী, বর্ণ, জাতি ইত্যাদি নিয়ে শ্রী রাণার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাটা কিছু বোঝা গেল হয়তঁ।

' “ হিন্দু মহাসভার নেতারা খােলাখুলি এই কথা প্রচার করে হিন্দুদের মধ্যে বাংলাভাগের পক্ষে জনমত গড়ে তুললেন। বাংলায় হিন্দু মহাসভা খুব বড় পার্টি ছিল না। কিন্তু দেশভাগের প্রশ্নে তাদের মত-ই ভদ্রলােকের মতামত হিসেবে বেরিয়ে এল।'

' কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাভাগের বিরােধী ছিল, কিন্তু ।।। তারা এই যুক্তি দেয় যে জনমতের দিকে তাকিয়ে তারা বিভাজনের পক্ষে ভােট দেয়। এখানে জনমত বলতে বুঝতে হবে ভদ্রলােকের মত।”

ইন্টারেস্টিং ঃ-) ঃ-) (অনেককালের মিল ঃ-P )


Avatar: রঞ্জন

Re: পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি

কয়েকবছর আগে শিবপুরের নবীন দাস (সকলের' সেজদা' আমার নবীনকাকু) আশি পেরিয়ে প্রয়াত হলেন।
কলেজ স্ট্রিটে মুখার্জি পাবলিশার্সের দোতলায় স্মৃতিবাসরে মেরেকেটে জনা তিরিশ। সভাপতি সন্তোষ রাণা, সঞ্চালক অসীম চাটুজ্জে (কাকা)।
সেখানে স্বল্প ভাষণে সন্তোষ জানালেন যে নবীনকাকুর আসল পদবি দাস নয় , দাসাধিকারী--ব্রাহ্মণ। উনি ইচ্ছে করে দাস লিখতেন, ব্রাহ্মণ পরিচয়ে নিতান্ত অনীহা। সন্তোষ এও জানালেন যে আন্ডারগ্রাউন্ড আন্দোলনে হাতিয়ারের যোগানদার হলেও নবীন সবসময় বলতেন--হাতিয়ার কোন সমস্যা নয় , ঠিক জোগাড় হয়ে যায় । আসল হোল হাতিয়ার ধরবে যে মানুষটি, তার মন, তার চেতনা।
তখন কি জানতাম যে সন্তোষও এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন!
কোলকাতায় গিয়ে গাঙচিল থেকে বইটি পড়তে হবে।
Avatar: aranya

Re: পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি

ভাল লাগল


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন