শিবাংশু RSS feed

শিবাংশু দে-এর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    (টিপ্পনি : দক্ষিণের কথ্যভাষার অনেক শব্দ রয়েছে। না বুঝতে পারলে বলে দেব।)দক্ষিণের কড়চা▶️এখানে মেঘ ও ভূমি সঙ্গমরত ক্রীড়াময়। এখন ভূমি অনাবৃত মহিষের মতো সহস্রবাসনা, জলধারাস্নানে। সামাদভেড়ির এই ভাগে চিরহরিৎ বৃক্ষরাজি নুনের দিকে চুপিসারে এগিয়ে এসেছে যেন ...
  • জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-১৪
    তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায়...আসলে যে কোনও শিল্প উপভোগ করতে পারার একটা বিজ্ঞান আছে। কারণ যাবতীয় পারফর্মিং আর্টের প্রাসাদ পদার্থবিদ্যার সশক্ত স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। পদার্থবিদ্যার শর্তগুলি পূরণ হলেই তবে মনন ও অনুভূতির পর্যায় শুরু হয়। যেমন কণ্ঠ বা যন্ত্র ...
  • উপনিবেশের পাঁচালি
    সাহেবের কাঁধে আছে পৃথিবীর দায়ভিন্নগ্রহ থেকে তাই আসেন ধরায়ঐশী শক্তি, অবতার, আয়ুধাদি সহসকলে দখলে নেয় দুরাচারী গ্রহমর্ত্যলোকে মানুষ যে স্বভাবে পীড়িতমূঢ়মতি, ধীরগতি, জীবিত না মৃতঠাহরই হবে না, তার কীসে উপশমসাহেবের দুইগালে দয়ার পশমঘোষণা দিলেন ওই অবোধের ...
  • ৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড
    পুরোনো কথার আবাদ বড্ড জড়িয়ে রাখে। যেন রাহুর প্রেমে - অবিরাম শুধু আমি ছাড়া আর কিছু না রহিবে মনে। মনে তো কতো কিছুই আছে। সময় এবং আরো কত অনিবার্যকে কাটাতে সেইসব মনে থাকা লেখার শুরু খামখেয়ালে, তাও পাঁচ বছর হতে চললো। মাঝে ছেড়ে দেওয়ার পর কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ ...
  • কাশ্মীরের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসঃ ১৯৩০ থেকে ১৯৯০
    ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সূর্য অস্ত যায় ১৯৪৭ এ। মূল ভারত ভূখন্ড ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হয়। কিন্তু ভুখন্ডের ভাগবাঁটোয়ারা সংক্রান্ত আলোচনচক্র ওতটাও সরল ছিল না। মূল দুই ভূখণ্ড ছাড়াও তখন আরও ৫৬২ টি করদরাজ্য ছিল। এগুলোতে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-১৪

শিবাংশু

তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায়...

আসলে যে কোনও শিল্প উপভোগ করতে পারার একটা বিজ্ঞান আছে। কারণ যাবতীয় পারফর্মিং আর্টের প্রাসাদ পদার্থবিদ্যার সশক্ত স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। পদার্থবিদ্যার শর্তগুলি পূরণ হলেই তবে মনন ও অনুভূতির পর্যায় শুরু হয়। যেমন কণ্ঠ বা যন্ত্র যদি সঠিক কম্পাংকে না বাজে বা রঙের দুনিয়ায় পরস্পর পরিপূর্ত বর্ণিকাবিভঙ্গ বিষয়ে যদি আঁকিয়ের ধারণা না থাকে, তবে তো প্রথম বেড়াটিই পেরোনো যাবেনা। যে সব শিল্পীদের সিদ্ধিলাভ হয়ে গেছে, তাঁদের শিল্প পরিবেশন, পদার্থবিদ্যা কেন, মননেরও প্রাথমিক স্তরগুলি অনেকাংশে পেরিয়েই শুরু হয়। এই সত্য সঙ্গীতশিল্প, চিত্রশিল্প বা নাট্যশিল্প সবার জন্যই প্রযোজ্য। তেমনই প্রাথমিক স্তরের শ্রোতাদের কাছে শুধু কানে শুনে বা নিজস্বমাপের শ্রবণ অভিজ্ঞতার নিরিখেই সঙ্গীত পরিবেশনার মান নির্ধারিত হয়। এঁরা সঙ্গীতস্বর্গের বাইরের দেউড়ির অতিথি। কিন্তু যখন এই সব শ্রোতারা সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে সুরের অন্দর মহলের দিকে যাত্রা করেন, তখন তাঁদের উচ্চকিত মতামতের জগৎ নিঃশব্দে গভীরগামী হয়ে যায়। তখন তাঁরা যা 'ভালো' লাগে, তা নিয়েই এতো মগ্ন হয়ে থাকেন যে যা 'ভালো' লাগেনা, তা নিয়ে নষ্ট করার মতো সময় পান'না।

https://www.youtube.com/watch?v=a0mEn0d2hgU
আমি এখন সময় পেলেই অধিকারীজনদের সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বর্তমান আর ভবিষ্যত নিয়ে বিনিময় করি । যেহেতু সে মাথার চারিপাশে । গায়নের ধরনে শোনার অভ্যেস পাল্টায়, না শ্রোতারাই ঠিক করে দেন কীভাবে গান গাইতে হবে। বিশ্বায়িত বাজারের পণ্য হিসেবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্থানটি ঠিক কোথায় ? নিবেদিত শ্রোতা বলেন, সাহানাদেবীর গানের থেকে কাননদেবীর গানের পেশকারি অধিক উজ্জ্বল । আমিও এ বিষয়ে একমত । আমরা সাহানাদেবীর একান্ত অনুরাগী শ্রোতা । এমন কি কবি নিজেই বলতেন, সাহানাদেবীর গলায় তাঁর গান পূর্ণ মর্যাদা পায় । কিন্তু রাইচাঁদ বড়াল বা পঙ্কজকুমার কাননদেবীর গানের মধ্যে কোন রসায়নটি যোজনা করতেন, যাতে তাঁর গান অধিকাংশ শ্রোতার ভালো লাগতো । আমার এলেমমতো অনুসন্ধান করে সেকালের তথাকথিত বাণিজ্যসফল শিল্পীদের পরিবেশনার মধ্যে আপোস করার অভিপ্রেত খুঁজে পাইনি । তাঁদের নিষ্ঠা, সচেতন শ্রোতার কাছে এখনও প্রাসঙ্গিক। ঠাকুরবাড়ির কুলুঙ্গি আর শান্তিনিকেতনের উপাসনাগৃহের বাইরে যে সংখ্যাগুরু শ্রোতার দল, তাঁদের জন্য পঙ্কজকুমার, সঙ্গে কুন্দনলাল যে রসটি পরিবেশন করতে পারতেন, দাবি অনুযায়ী অনেক বেশি উৎসমুখী, 'শুদ্ধ' ঘরানার শিল্পীরা সেটা পারতেন না ।

https://www.youtube.com/watch?v=_ppB_WK0VoY
অথচ ইন্দিরাদেবী দেবব্রতকে আলাদা করে পথনির্দেশ দিতেন, একক গাইতে উৎসাহিত করতেন । শান্তিনিকেতনের ধারায় অন্যমাত্রার স্ফূর্ত গায়ন নিয়ে এসেছিলেন সুচিত্রা । ছয় থেকে আট দশকে একসঙ্গে এতোজন সিদ্ধ শিল্পী রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনের মান'কে যে পর্যায়ে তুলে দিয়েছিলেন, সেটা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জটি পরবর্তী শতকের শূন্য ও প্রথম দশকের গায়কদের নাগালের বাইরে চলে গেলো । একেবারে শীর্ষস্থানে থাকা পরিবেশকরাও ' গলাটা ভালো' জাতীয় মন্তব্যের সীমায় বাঁধা রয়ে গেলেন ।

https://www.youtube.com/watch?v=L_U4IB1AwCo
আসলে সময় বড়ো কম আর পৃথিবীতে আনন্দের উৎস এতো বিস্তৃত মানচিত্রে ছড়ানো আছে যে নিজেকে সতত টলস্টয়ের সেই গল্প, ' একটা মানুষের কতো জমি চাই'য়ের চরিত্র প্যাহমের মতো লাগে। যা দেখি, তাকে'ই পেতে চাই নিজের করে, কিন্তু সদর্থকভাবে। নেতিবাচী ব্যসনের কোনও স্থান রাখতে পারিনা এই ছোটো জীবনে। রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার যে অভ্যেস মানুষের শ্বাসক্রিয়ার মতো অবিরল‚ অনর্গল বেড়ে ওঠে তার পিছনে দীর্ঘ প্রস্তুতি থাকে। অভ্যেসটি আমাদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিজেও পরিণত হয় । বয়সের সঙ্গে আমার শরীরের দৈর্ঘ্য‚ প্রস্থ‚ মনের মধ্যে গড়ে ওঠা নানা রকম বেড়া‚ তাদের ভাঙা, আবার গড়ে তোলার খেলা চলতে থাকে। সংক্ষেপে আমার ঐহিক জীবন। তাকে জড়িয়ে ধরে আঙুরলতার মতো গান শোনার অভ্যেসটিও একসঙ্গে আকাশের দিকে হাত বাড়াতে চায় । রবীন্দ্রসঙ্গীত এই মুহূর্তে জীবনে যেভাবে ছায়ানিবিড় মহীরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে‚ সেখানে মুগ্ধতা‚ প্রেম‚ সম্মোহন‚ আকর্ষণ ইত্যাদি ধ্বনি শব্দার্থে যথেষ্ট অভিঘাত আনতে পারেনা। হয়তো একটা শব্দই কিছুটা কাছে যেতে পারে। পরিপূর্ণতা । আমাদের প্রজন্মের সৌভাগ্য‚ গত একশো বছরের অধিক কাল‚ বিগত তিন-চার পুরুষ ধরে রবীন্দ্রসঙ্গীত নামক যে শিল্পধারা গড়ে উঠেছে ‚ তার শ্রেষ্ঠ ফলগুলি আস্বাদন করার সুযোগ আমরা পেয়েছি। এর ভালো দিকটা হলো‚ মানুষ হয়ে জন্মাবার সূত্রে একটা সেরা সম্পদ লাভ । আর আপাত বিপজ্জনক দিকটাও মনে রাখতে হয়। আমাদের প্রত্যাশা, রস আস্বাদনের মাত্রার মান, আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে । এই শিল্পে সের্গেই বুবকা বা এডুইন মোজেসের দল বা ‘তোমারি তুলনা তুমি প্রাণ’ যাঁরা ছিলেন‚ খেলা সাঙ্গ করে বাড়ি ফিরে গেছেন । একসঙ্গে আকাশে অগুন্তি নক্ষত্র ছিলো যখন‚ তার শ্রেয়ফল আমাদের নসিব হয়েছিলো । আবার যখন অন্ধকার আকাশ, একটি-দুটি মিটমিটে তারা, নিষ্প্রভ সীমাবদ্ধতায় কোনমতে জেগে থাকার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিলো‚ তার সাক্ষী থাকার সুযোগও হয়েছে আমাদের ।

https://www.youtube.com/watch?v=IYgNBEyAHdQ
যে ব্যাপারটা বহুদিন আগেই জেনেছি যে কবির কাঙালও যখন বলে‚ আমায় ভিখারি করেছো‚ আরো কী তোমার চাই ? এই ভিখারি তো আসলে কপিলবাস্তুর রাজকুমারের মতো । আমাদের ঐতিহ্যে প্রথম মানুষ‚ যিনি ভিক্ষাবৃত্তির মধ্যেও রাজকীয় সম্ভ্রমের সঞ্চার করেছিলেন । যিনি তাঁর ভুবন শূন্য করে ফেলেন আরেক কাঙালের আশ মেটাতে । এভাবে সর্বহারারও এক রাজসিক পরিচয় গড়ে ওঠে । রবীন্দ্রসঙ্গীত আমাদের সেই রাজসিক উত্তরাধিকার । সন্ধ্যাকাশে ঊর্দ্ধকর হয়ে দাঁড়ালে থরে থরে ঝরে পড়া আপন প্রাণের ধন । তাকে তো ‘ম্যাজেস্টিক’ হতেই হবে ।
যেরকম বলেছি, রসবস্তু উপভোগের তিনটি পথ আছে। শুধু হৃদয় দিয়ে, শুধু মস্তিষ্ক দিয়ে, অথবা হৃদয় ও মস্তিষ্কের মধ্যে ভারসাম্যের ভিত্তিতে একটা অবস্থান নিয়ে কোথাও পৌঁছোনো । নিজের গান সৃষ্টি করার সময় রবীন্দ্রনাথ শিল্পের সেরিব্রাল দিকটা নিয়ে শেষকথা বলে দিয়েছেন। তাই তাঁর গান প্রকৃতভাবে উপভোগ করতে গেলে শুধু তাঁর প্রকল্পিত সেরিব্রাল ম্যাপিংটাকেই মনে রাখতে হবে। কোনো খোদকারি করার অবকাশ নেই। গলায় তারযন্ত্র ঝুলিয়ে, মেটাল বাস দুন্দুভির সঙ্গে 'প্রাণশক্তি'র প্রেরণা প্রচুর শারীরিক লম্ফঝম্প যোগ করে ফেলে অনেকেই কবির গান আজকের শ্রোতার কাছে প্রাসঙ্গিক করে তুলতে চান। অন্য একটা একটা ফ্যাসাদ, 'রাগভিত্তিক' রবীন্দ্রসঙ্গীত নামে একটা জঁর তৈরি করতে চাওয়া। এরকম চলতে থাকলে অবিলম্বে দেখতে পাবো 'রাগভিত্তিক' মোজার্ট বা শোঁপ্যা'র কম্পোজিশন নিয়ে জনতা কাজ শুরু করে দিয়েছে। 'নতুন কিছু করো' সহ্য হবার একটা সীমা থাকে।
এই প্রসঙ্গে দেখি বছর দুয়েক আগে এক কর্মশালায় বিশিষ্ট শিল্পী প্রমিতা মল্লিক আজকের অনুরাগী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু পথনির্দেশ দিয়েছিলেন।

"....দ্বিতীয় দিনে শিল্পী প্রমিতা মল্লিকের কাছে শিক্ষার্থীদের আশা কানায় কানায় পূর্ণ হয়েছে। একশো বছর আগের লেখা কবিগুরুর ‘ওরে আমার হৃদয় আমার’ গান দিয়ে শুরু করেন কর্মসূচি। দাদরা তালে গানটির লাইন ধরে অর্থ, গানের মূল বিষয়, গানটির পিছনের ঘটনা এবং ওই সময় কী কী গান কবি রচনা করেছিলেন সবটাই আলোচনায় তুলে আনেন। গান শুরুর আগে শোনান ১৯১৪ সালের কবির নৈরাশ্যের এক চিঠি। কাকে লেখা সেই চিঠি, নৈরাশ্য কেটে যাওয়ার পরে কী গান তিনি রচনা করেছিলেন সবই জানিয়েছেন। এই প্রসঙ্গ আনতে গিয়ে তিনি জানিয়েছেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে গেলে আগে নজর রাখা উচিত কোথায় গাইছি, কেমন শ্রোতা আর গান নির্বাচনের কথা। ১৮৯৬ সালের মাঘোৎসবে গাওয়া বিলম্বিত ত্রিতালে ভাঙাগান ‘মহাবিশ্বে মহাকাশে’ গানটিও শেখান শিল্পী।"
(রবীন্দ্রসঙ্গীত কর্মশালাঃ আরও শেখার চাহিদা থেকেই গেল-পাপিয়া মিত্র/ খবরonline, ১৮/০৮/২০১৬)

https://www.youtube.com/watch?v=P_fSvGuCYhc
কবির গান একান্তভাবে স্বয়মসম্পূর্ণ একটি শিল্পরীতি এবং তার ধরনটা একটা স্বীকৃত স্ট্রাকচার মেনে চলে। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে নানা অধিকারীর নিজস্ব ব্যাখ্যার মধ্যে কবি'র প্রতি যথেষ্ট আনুগত্য ও নিষ্ঠা হয়তো থাকে। কিন্তু বহু সময়েই সুর ও অন্যান্য প্রয়োগের দিকগুলি নিয়ে ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে নিজস্ব অবস্থানটি অনেক বেশি জোরালো হয়ে যায়। গুণী ও সমর্থ শিল্পীদের গায়ন অবস্থানগুলি শ্রোতাদের কাছে সচরাচর লোকপ্রিয় হয়ে থাকে। কিন্তু যতো গুণী অধিকারীই হোন না কেন, তিনি কবির অবস্থানের উর্ধে যেতে পারেননা। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রতি নিজস্ব অবস্থান প্রকট করার আগে বিষয়টি নিয়ে কবির বক্তব্য অনুধাবন করাটা প্রয়োজনীয়। নতুনত্বের খাতিরে তদ্গত, আত্মগত বা উৎকেন্দ্রিক যে অবস্থানই নেওয়া হোকনা কেন, তা যেন কবিকে অতিক্রম না করে ফেলে।

https://www.youtube.com/watch?v=1aGwOBgyWTo
শুধুমাত্র 'সময়ের দাবি' বা 'জনরুচির চাহিদা' জাতীয় কিছু বিমূর্ত কারণ রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য যদি প্রযুক্ত নাই হয়, তবে ক্ষতি কী? সবাই জানে রবীন্দ্রসঙ্গীত কারও 'বাপের সম্পত্তি' নয়। কিন্তু পূর্বপুরুষের ইচ্ছাটাও যেন উত্তরপুরুষের বিবেকের কাছে নস্যাৎ না হয়ে যায়, এটা তো খুব বড়ো কিছু প্রত্যাশা নয়। কবি কেন নীচে উদ্ধৃত এই উক্তিটি করেছিলেন, আজ তা প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড়ো বেশি হয়েই মনে বাজছে তার তাৎপর্য।
" ……..আমার গান যাতে আমার গান ব’লে মনে হয় এইটি তোমরা কোরো। আরো হাজারো গান হয়তো আছে-তাদের মাটি করে দাও-না, আমার দুঃখ নেই। কিন্তু তোমাদের কাছে আমার মিনতি–তোমাদের গান যেন আমার গানের কাছাকাছি হয়, যেন শুনে আমিও আমার গান বলে চিনতে পারি। এখন এমন হয় যে, আমার গান শুনে নিজের গান কিনা বুঝতে পারি না। মনে হয় কথাটা যেন আমার, সুরটা যেন নয়। নিজে রচনা করলুম, পরের মুখে নষ্ট হচ্ছে, এ যেন অসহ্য। মেয়েকে অপাত্রে দিলে যেমন সব-কিছু সইতে হয়, এও যেন আমার পক্ষে সেই রকম।
বুলাবাবু, তোমার কাছে সানুনয় অনুরোধ–এঁদের একটু দরদ দিয়ে, একটু রস দিয়ে গান শিখিয়ো-এইটেই আমার গানের বিশেষত্ব। তার উপরে তোমরা যদি স্টিম রোলার চালিয়ে দাও, আমার গান চেপ্টা হয়ে যাবে। আমার গানে যাতে একটু রস থাকে, তান থাকে, দরদ থাকে ও মীড় থাকে, তার চেষ্টা তুমি কোরো। "
(গীতালি- ৩০ জুন ১৯৪০, ১৬ আষাঢ় ১৩৪৭)

https://www.youtube.com/watch?v=M5S-VanTivE
আমাদের অধুনা প্রজন্মের বিবেকপ্রহরী কবি শঙ্খ ঘোষ । এই মনস্বীশ্রেষ্ঠ মানুষটি যখন গুরুর থেকে পাওয়া উত্তরাধিকার 'বিশ্বাস হারানো পাপ' প্রত্যয়ে অবিচল থাকতে পারেননা, তখন অনুজদের জন্য শুভবোধের প্রতি বিশ্বাসযোগ্য থাকার চ্যালেঞ্জটিও বেড়ে যায়। রবীন্দ্রসঙ্গীত আমাদের শ্রেষ্ঠতম উত্তরাধিকারের একটি। আমরা যেন সেই পতাকাবহনের শক্তি অর্জন করতে পারি।

'এখানে আমাকে তুমি কিসের দীক্ষায় রেখে গেছ?
এ কোন জগৎ আজ গড়ে দিতে চাও চারদিকে?
এ তো আমাদের কোনো যোগ্য ভূমি নয়, এর গায়ে
সোনার ঝলক দেখে আমাদের চোখ যাবে পুড়ে।

বুঝি না কখনো ঠিক এরা কোন নিজের ভাষায়
কথা কয়, গান গায়, কী ভাষায় হেসে উঠে এরা
পিষে ধরে আমাদের গ্রামীণ নিশ্বাস, সজলতা,
কী ভাষায় আমাদের একান্ত বাঁচাও হলো পাপ।

আমার ভাইয়ের মুখ মনে পড়ে। গ্রামের অশথ
মনে পড়ে। তাকে আর এনো না কখনো এইখানে।
এইখানে এলে তার হৃদয় পাণ্ডুর হয়ে যাবে
এইখানে এলে তার বিশ্বাস বধির হয়ে যাবে

বুকের ভিতরে শুধু ক্ষত দেবে রাত্রির খোয়াই।
আমার পৃথিবী নয় এইসব ছাতিম শিরীষ
সব ফেলে যাব বলে প্রস্তুত হয়েছি, শুধু জেনো
আমার বিশ্বাস আজও কিছু বেঁচে আছে, তাই হব

পঁচিশে বৈশাখ কিংবা বাইশে শ্রাবণে আত্মঘাতী।
(আত্মঘাত - শঙ্খ ঘোষ)

https://www.youtube.com/watch?v=ZiHjWTK4W_g
(শেষ)





79 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: শিবাংশু

Re: জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-১৪

ভেবেছিলুম বাইশে শ্রাবণেই শেষ কিস্তিটি পত্রস্থ করবো। কিন্তু ব্যাপারটা একটু নাটকীয় হয়ে যাবার সম্ভাবনা ছিলো। পরিহার করলুম। এই দীর্ঘ লেখাটি যাঁরা পড়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে বিভিন্নভাবে ভেবেছেন, আলোচনা করেছেন, তাঁদের ধন্যবাদ।

একটাই প্রার্থনা রইলো সবার কাছে, তাঁর গান যাতে তিনি শুনলে চিনতে পারেন সেটুকু প্রয়াস ও রুচিবোধ যেন আমাদের বজায় থাকে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন