সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • সোনারপুরে সোনার মেলা
    শীত ভাল করে পড়তে না পড়তেই মেলার সীজন শুরু হয়ে গেছে। গুরু এবারে ওমনিপ্রেজেন্ট – গাদাগুচ্ছের মেলাতে অংশ নেবার মনস্থ করেছে। একেবারে সূচনাপর্বেই সোনারপুর মেলা – বোতীনবাবুর দৌলতে তার কথা এখন এখানে অনেকেই জানেন। তো সেই সোনারপুর বইমেলাকেই পদধূলি দিয়ে ধন্য করব ...
  • এন জি রোডের রামলাল-বাংগালি
    রামলাল রাস্তা পার হইতে যাইবেন, কিছু গেরুয়া ফেট্টি বাঁধা চ্যাংড়া যুবক মোড়ে বসিয়া তাস পিটাইতেছিল— অকস্মাৎ একজন তাহার পানে তাকাইল।  রামলাল সতর্ক হইলেন। হাত মুষ্টিবদ্ধ করিলেন, তুলিয়া, ক্ষীণকন্ঠে বলিলেন, 'জ্যায় শ্রীরাম।'পূর্বে ভুল হইত। অকস্মাৎ কেহ না কেহ পথের ...
  • কিউয়ি আর বাঙালী
    পৃথিবীতে ছোট বড় মিলিয়ে ২০০র' কাছাকাছি দেশ, তার প্রায় প্রতিটিতেই বাঙালীর পদধূলি পড়েছে। তবে নিউজিল্যাণ্ড নামে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে একটি দ্বীপমালা আছে, সে দেশের সঙ্গে ভারতীয়দের তথা বাঙালীদের আশ্চর্য ও বিশেষ সব সম্পর্ক, অনেকে জানেন নিশ্চয়ই।সে সব সম্পর্কের ...
  • মহামহিম মোদী
    মহামহিম মোদী নিঃসন্দেহে ইতিহাসে নাম তুলে ফেলেছেন। আজ থেকে পাঁচশো বছর পরে, ইশকুল-বইয়ে নিশ্চয়ই লেখা হবে, ভারতবর্ষে এমন একজন মহাসম্রাট এসেছিলেন, যিনি কাশ্মীরে টিভি সম্প্রচার বন্ধ করে কাশ্মীরিদের উদ্দেশে টিভিতে ভাষণ দিতেন। যিনি উত্তর-পূর্ব ভারতে ইন্টারনেট ...
  • পার্টিশানের অজানা গল্প ১
    এই ঘোর অন্ধকার সময়ে আরেকবার ফিরে দেখি ১৯৪৭ এর রক্তমাখা দিনগুলোকে। সেই দিনগুলো পার করে যাঁরা বেঁচে আছেন এখনও তাঁদেরই একজনের গল্প রইল আজকে। পড়ুন, জানুন, নিজের দিকে তাকান...============...
  • কাশ্মীরের ইতিহাস : পালাবদলের ৭৫ বছর
    কাশ্মীরের ইতিহাস : পালাবদলের ৭৫ বছর - সৌভিক ঘোষালভারতভুক্তির আগে কাশ্মীর১ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে চলে যাবে এই ব্যাপারটা নিশ্চিত হয়ে গেল, তখন দুটো প্রধান সমস্যা এসে দাঁড়ালো আমাদের স্বাধীনতার সামনে। একটি অবশ্যই দেশ ভাগ সংক্রান্ত। বহু আলাপ-আলোচনা, ...
  • গাম্বিয়া - মিয়ানমারঃ শুরু হল যুগান্তকারী মামলার শুনানি
    নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস—আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে করা গাম্বিয়ার মামলার শুনানি শুরু হয়েছে আজকে। শান্তি প্রাসাদে শান্তি আসবে কিনা তার আইনই লড়াই শুরু আজকে থেকে। নেদারল্যান্ডের হেগ শহরের পিস ...
  • রাতপরী (গল্প)
    ‘কপাল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যায়। পালানোর কি আর উপায় আছে!’- এই সপ্তাহে শরীর ‘খারাপ’ থাকার কথা। কিন্তু, কিছু টাকার খুবই দরকার। সকালে পেট-না-হওয়ার ওষুধ গিলে, সন্ধেয় লিপস্টিক পাউডার ডলে প্রস্তুত থাকলে কী হবে, খদ্দের এলে তো! রাত প্রায় একটা। এই গলির কার্যত কোনো ...
  • রাতপরী (গল্প)
    ‘কপাল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যায়। পালানোর কি আর উপায় আছে!’- এই সপ্তাহে শরীর ‘খারাপ’ থাকার কথা। কিন্তু, কিছু টাকার খুবই দরকার। সকালে পেট-না-হওয়ার ওষুধ গিলে, সন্ধেয় লিপস্টিক পাউডার ডলে প্রস্তুত থাকলে কী হবে, খদ্দের এলে তো! রাত প্রায় একটা। এই গলির কার্যত কোনো ...
  • বিনম্র শ্রদ্ধা অজয় রায়
    একুশে পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অজয় রায় (৮৪) আর নেই। সোমবার ( ৯ ডিসেম্বর) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অধ্যাপক অজয় দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা অসুখে ভুগছিলেন।২০১৫ ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড

শক্তি দত্তরায় করভৌমিক

পুরোনো কথার আবাদ বড্ড জড়িয়ে রাখে। যেন রাহুর প্রেমে - অবিরাম শুধু আমি ছাড়া আর কিছু না রহিবে মনে। মনে তো কতো কিছুই আছে।
সময় এবং আরো কত অনিবার্যকে কাটাতে সেইসব মনে থাকা লেখার শুরু খামখেয়ালে, তাও পাঁচ বছর হতে চললো। মাঝে ছেড়ে দেওয়ার পর কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ ঝাঁকিয়ে তুললো ফর্টিসিক্সের স্মৃতি, ভাবলাম লিখে ফেলা যাক। তারই কিছু ঝাড়পোঁছ করে এখানে। ঝাড়পোঁছ হলো একটু, কিন্তু গোছানো গেলনা, গল্পের আঁকাবাঁকা রেখা গতিও সোজা হলো না। তা হোক, স্মৃতির খেয়ার আজগুবি চাল।

~~~
হরিগঙ্গা বসাক রোড
~~~
আমাদের আগরতলা ছিলো ছোট্ট একটা সাদাসিধে শহর। বুক জুড়ে লাল ধুলোর রাস্তা -মাঝখানে কামান চৌমুহনী, কামান একটা নিরীহ; উঠতি যুবকরা তার পাশে দাঁড়িয়ে আড্ডা দেয়, সাহিত্য শিল্প করে, আবার টিটকারি ইত্যাদিও করে বটে।
হরিগঙ্গা বসাক রোড কে তখনো কেউ কেউ বলেন মোগরা রোড। ধুলি ধূসরিত সেই পথে - রাজপথে হেঁটে যান এক আপন ভোলা পথিক। মৃদু স্বরে কি সুর ভাঁজেন আপন মনে লম্বা নন বেঁটেও নন। তিনি নাকি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে সুপণ্ডিত, সেতার ও বাজান। বিত্তহীন বিত্তের লোভহীন মানুষটি মনের মতো ছাত্র পেলে গান শেখান। আমার সঙ্গে কোন দিন চেনা হয়নি -ছোট ছিলাম তো, মনে আছেন তিনি। আমি রাস্তার ধারে ছোটো একটি খড় ছাওয়া ঘরের জানালার কাছে পড়ার টেবিলএ বসে আগরতলা দেখতাম। আমি যেন লেডী অফ শ্যালট -তবে উনি ছায়া দেখতেন আমি সত্যি, বাস্তব। উনি রাজকন্যা ছিলেন, আমিও একটু কবিতা লিখছি স্কূলম্যাগাজিনে, কবিকন্যা বটে। ওই পথ দেখেই তো জীবনের পথ চলা শুরু।
পোস্টঅফিস চৌমূনী আর প্যারাডাইস চৌমুনীর মাঝখানে দুটো লোহার বীম তোলা কালভার্ট। লোকে বীম না বলে ভীম বলে, আমরাও। ভীমের মতোই শক্তপোক্ত কিনা। প্যারাডাইসের দিকে চাঁদ ওঠে, পোস্ট অফিসের দিকে ডোবে -পূর্ণিমাতে। বুদ্ধ পূর্ণিমার দিনটা মনে পড়ে। এই শহরে মে মাস খুব সুন্দর মাস। সরণী জুড়ে গোলাপী মেফ্লাওয়ারের ঝালর ঝোলে, হলুদ সোঁদাল, লাল সবুজ কৃষ্ণচূড়া। ত্রিপুরার মে মাস -ইওরোপে যেমন অক্টোবরে ফল কালার - আমাদেরও মাতাবাড়ী উদয়পুরের রাস্তা, আঠারোমুড়া বড়মুড়া সবখানেই জারুলের বেগুনী, বাঁদরলাঠির হলুদ আর কৃষ্ণচুড়ার লাল - আর সবুজ যে কত রকম - ফিকে গাঢ় কালচে তা তো বলারই নয়। চার দিকে বিয়ের বাজনা, বিয়েতে বাজনা মাষ্ট। প্যাঁ - পোঁ - প্যাঁপোঁ ঢ্যাং ঢ্যাং -তাতেই সবাই খুশি। বিয়েবাড়িতে সিঙ্গাড়ার গায়ে রসগোল্লার রস - কি মজা! গড়িয়াপূজা নববর্ষ, হালখাতা, আর রবীন্দ্রজয়ন্তী -ত্রিপুরা কবিকে প্রথম সম্মান জানিয়েছে - ভারত ভাস্কর। আমি স্কূলএ আবৃত্তি করবো কবির লুকোচুরি কবিতাটি।

~~~
সুন্দর
~~~
ঘনায়মান সন্ধ্যায় পথে অনেক লোক। সেই বয়সের চোখে সবাইকে সুন্দর দেখে। মেয়েরা বেশিরভাগ সাজেন সুচিত্রা সেনের মত। ছেলেরা কেউ হিন্দী কেউ বাংলা ছবির নায়কদের মতো বা অন্যরকম। গান্ধীটুপি খুব দেখা যায় -ধুতি, ট্রাউজার, শার্ট, পাঞ্জাবী সবকিছুর সঙ্গে, কংগ্রেস অফিস কাছে যে। বাচ্চারা অবশ্য সবাই সাদাসিধে। কিছু আদর্শবাদ কিছু বা অভিভাবকের অর্থাভাব। আমরা তখন ফ্যাশন কিছু বুঝতামও না, ছিটের জামা। কাঠি কাঠি হাত পা নিয়ে ধ্যারধ্যার করে লম্বা হচ্ছিলাম তো। তাই নূতন জামার ঝুল একটু বেশি দিত মা। বেশীদিন পরানো যাবে।
আমি আমার সেই দাদুর বাড়ীর উত্তর ঘরের জানালার কাছে চেয়ারে আসীন হয়ে মানুষ দেখতাম, রবীন্দ্র পল্লী বা মেলার মাঠ সরকারী বাড়ী গুলোতে যাঁরা থাকতেন, তাঁরা বিকেল বেলা সপরিবারে বেড়াতে বেরোতেন, তাঁদের মেয়েরা হয়তো আমাদের স্কুলেই পড়ে, তাঁরা প্রায়শই কলকাতার ডায়ালেক্টে কথা বলে - আমরা বলি ঘটি কথা, ছোট মাসি আবার বলেন পরিষ্কার কথা। স্বভাব তার্কিক আমি বলি আমাদের কথা কি অপরিষ্কার নাকি? ওদের মায়েরা একটু বেশী সুবেশা, সব চেয়ে বড় কথা আমাদের মায়েরা ঘরের কাজ করে সময়ই পান না। কি করে পাবেন - সকালে আমাদের আসাম, ত্রিপুরায় জলখাবার হচ্ছে ভাত, সকালে গরম গরম রান্না হবে, দুপুরে আবার রান্না হবে সন্ধ্যায় আবার হালুয়া, নিমকি কি ঘিয়ে ভাজা চিড়ে হবে জল খাবার, আবার রাতের রান্না। হাসি মুখে এসব করেও সেলাই এমব্রয়ডারি উল বোনা। দূর প্রবাসী আত্মীয়দের সঙ্গে চিঠি পত্র লিখে যোগাযোগ রাখা মায়েরই কাজ। ছেলেরা শুধুই বাজার করবেন, তার পর গৃহদেবতার পুজো -নিত্যই অতিথি সমাগম, পল্টুদার মতো যে কেউ এসে মাথায় দু ঘটি জল ঢেলে বলবে ভ্রমর মাসি -ভাত বাড়, আজকে কি মেনু? মার হোটেলে নিত্য নূতন মেনু। আবার আমাদের অংক, ট্রান্সলেশন ও রান্না ঘরে পিঁড়িতে বসে মার কাছেই করতে হয়। আমাদের মায়েরা কখন আর বেরোবেন বাড়ী ছেড়ে? আমরা এত কি বুঝি, মনে হয় মাও যদি এরকম বেড়ায় আমাদের নিয়ে তো বেশ হয়। ওই জানালায় বসে দেখি অনিল সঙ্গীত বিদ্যালয় অর্থাৎ উজির বাড়ীর সদস্যরা সরোদ বাদক অনিল কৃষ্ণের জন্মদিনে অকাল প্রয়াত শিল্পীর শ্মশানে যাচ্ছেন শোভাযাত্রা সহকারে বাজনা বাজিয়ে, খর গ্রীষ্মে লক্ষ্মী নারায়ণ জিউ যাচ্ছেন বাজনা সহ হাওড়া নদীতে স্নান করতে। হরি কর্তা গুনগুন করতে করতে পথ চলেন, শক্তি হালদার নামে একজন শিল্পী, তাঁর আঁকা ছবি দেখি বুদ্ধ মন্দিরের দেয়ালে, রবীন্দ্র ভবনে। অবাক লাগে এত রং কোথায় পান? আর একজন সুন্দর মানূষ পথ দিয়ে যান আমাদের এক বন্ধুর মামা, খুব রূপবান, পরে শুনেছি ভালো খেলোয়াড় ছিলেন, কি খেলা জানতাম না। ডক্টর দে -তাঁকে শুধু তাঁর রূপের কারণেই মনে আছে। কেনই বা থাকবে না? ফুল পাখী, পাহাড়, ঝর্ণা সুন্দর হলে তার মূল্য থাকে, মানুষের রূপ বৃথা? অমি মানি না, ভোরের সূর্য পর্বতের চূড়ায় রং ঢেলে বলে রূপবান হও, চাঁদ সমুদ্রের জলে রূপো ঢেলে বলে সুন্দর হও, মা শিশুর কপালে চুমো খেয়ে বলেন সুন্দর হও, তাই তো? ছোট বেলায় কি আর এতো গুছিয়ে ভাবতাম?

~~~
পোস্টঅফিস চৌমুহনী, সাহিত্য বাসর
~~~
একজন হেঁকে যায় -কান পরিষ্কার করাইবেন নি -কে যে নিজের কান অন্যের হেফাজতে যত্ন করান কে জানে। কেউ কেউ নিশ্চয় করান। আমার এক দাদু একবার করিয়েছিলেন। আবার সুযোগ পেলে আমিও করাতাম বোধ হয়। একটু পরে হজমী গুলি যায়। কি অপূর্ব স্বাদ। দু চার দিন খেয়েছি, মা টের পায়নি। বাঁচা গেছে। সন্ধ্যার পর সুরেলা পুরুষ কন্ঠ -পটেটো, ফাউল চ-অ-অ-প। তখনো চিকেন বলা শুরু হয় নি। রক্ষণশীল দাদুর অগোচরে ন'মাসী একদিন খাইয়েছিল উত্তরঘরে, মানে দাদুকে লুকিয়ে দাদুরই বৈঠকখানায়। সেই নিষিদ্ধ খাদ্যের আস্বাদ বোধ হয় পরজন্মেও মনে থাকবে।
পোস্টঅফিস চৌমুহনীতে কর্নেল পুকুরপাড়ে মঙ্গল সিংহের জাহাজ প্যাটার্নের একতলা বাড়ীতে সাহিত্য বাসরের অধিবেশন হতো। আমি তখন ক্লাস ফাইভের বেশী নয়, হয়তো ভুল হবে। পল্টুদা থাকলে চিন্তা ছিলো না, ঘর জোড়া পুঁথি বই দলিল দস্তাবেজ ডাইরি খবরের কাগজ ঘেঁটে দিন ক্ষণ বলে দিত। জানিনা তাঁর সংগ্রহ কোথায় আছে, কি ভাবে আছে। মনে আছে অশ্বিনী আঢ্য বলে এক ভদ্রলোক সুন্দর লেখায় পুরো বিবরণ লিখতেন। সেই সাহিত্য বাসরের রজত জয়ন্তী পালিত হয়েছিলো। সাহিত্যিক শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায় এসেছিলেন মনে হয়, দুর্গাবাড়ীতে অনুষ্ঠান হয়েছিলো কদিন ধরে। ত্রিপুরেশ মজুমদারের পরিচালনা অভিনয়ে বিসর্জন --কি বলিষ্ঠ নিক্ষেপে পাথরের কালী মূর্তি ছুঁড়ে ফেলেছিলেন -আজকের ধর্ম রাজনীতির দিনে ভাবা কঠিন। অনন্ত দেব্বর্মণ বজ্র সেন আর বন্দনা দেববর্মণ শ্যামা -কি অসাধারন নাচ আর অভিনয়। শ্যামাতে অংশ নিয়েছিলেন রাজবাড়ীর মেয়েরা তাঁদের ঐতিহ্যমণ্ডিত পুষ্পালংকার আর অপরূপ লাবণ্য এবং নৃত্যকুশলতা নিয়ে। গান কারা গেয়েছিলেন জানি না, নেপথ্যে তো। সাহিত্য বাসরের অনুষ্ঠানে শ্যামা নৃত্য নাট্য আর বিসর্জন নাটক ছাড়া আমি বোধহয় আর কিছু দেখিনি। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত গেয়েছিলেন মীনা কুমারী নামে এক কুমারী। গান করতে করতে সংগতকারকে বকেছিলেন একটু, খুব অবাক হয়েছিলাম। তবে গান আর নাটকের আগে আলোচনা বক্তব্য রাখা তো ছিলোই। তখন বিনোদনের কী আয়োজনই বা ছিলো, যেখানে যে অনুষ্ঠান হয় বড়দের সঙ্গে ছোটরা যায়। কোন অনুষ্ঠানই সময়ে আরম্ভ বা শেষ হয়না মশার কামড়ে, গরমে বা শীতে অস্থির হয়ে উঠি। যেতেও অস্থির আসতেও অস্থির। পণ্ডিত গঙ্গা প্রসাদ শর্মা আর নিবারণ ঘোষ সবখানে বক্তৃতা দেন। নিবারণ চন্দ্র ঘোষ পণ্ডিত ব্যাক্তি; পণ্ডিত গঙ্গা প্রসাদ শর্মা বিশাল দেহী স্থুলোদর, খালি গা হাসি মুখে পান খাচ্ছেন, বড় সংসার ফলতঃ অনিবার্য দারিদ্র্য কিন্তু প্রসন্নচিত্ত। নিশ্চয়ই ভালো বলেন নইলে কি আর লোকে শুনতো। তা ছোটরা ওই পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তৃতার কি বোঝে। গলার স্বর ওঠে নামে। নানা সংস্কৃত শ্লোক বাংলা ইংরেজী কবিতা বলেন শ্রোতারা নিজেদের মধ্যে গল্প করেন, উদ্যোক্তারা মাঝে মাঝে বক্তৃতার মধ্যেই গোলমাল থামানোর জন্য অনুরোধ করেন বা তিরস্কার করেন। গলার স্বর নামলে আমরা ভাবি এই বুঝি থামলো, না আবার স্বর উঁচু হয় আবার নীচে নামে ওপরে ওঠে। জল খান পান খান বক্তৃতা চলে আমাদের খিদে পেয়ে যায়। কেউই অনেক না বলে থামতেন না।
আমি সাহিত্য বাসরে যেতাম বাচ্চুমাসীর সঙ্গে। তখনও টাউন বাস হয়নি। দুচারজন রিকশা নেয়। বাকি রা বাচ্চা কাচ্চা কোলে হেঁটে ই কলকল করতে করতে বাড়ি ফিরে যায়। শীতের কামড় বেশি হতে পারে, ঝড়বৃষ্টি হতে পারে, গুণ্ডা বদমাশ নেই। মেয়েরাও নিরাপদ।

আগরতলা তখন সাহিত্য বাসর, শিল্পী সংসদ, মিলনী নাট্য সংস্থা, -আরও নাম হয়তো বলার মতো আছে, আমি বলতে পারলাম না, স্মৃতি সঙ্গ দিল না - এঁদের মাধ্যমে সংস্কৃতি চর্চার ধারা বয়ে নিয়ে চলেছে। উদ্বাস্তু সমস্যা সংকুল মফঃস্বল ত্রিপুরা এবং উপজাতি অধ্যুষিত পাহাড়ি জনজীবনও কিন্তু তার নিজস্বতা ও ঐতিহ্যে বিশিষ্ট। পাহাড়ি অঞ্চলে বৈশাখ মাসে গড়িয়া দেবতা তাঁর সোনার প্রতিমা কি বাঁশের প্রতীকে পূজিত হন, সুন্দর অনাড়ম্বর আন্তরিকতাময় সজ্জিত মণ্ডপে, অঞ্চল প্রদক্ষিণ করেন, নাচ হয় গান প্রতিধ্বনিত হয় পুষ্পল পর্বতে - গড়িয়ালো সিঙ্গালো - । উদ্বাস্তু গৃহিণীর অসচ্ছল ঘরেও আলপনা আঁকা হয়, নাড়ু, সেউয়াই হয়, কীর্তনের আসর বসে। আর চলে রবীন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠান, গ্রামের স্কুলে টগর ফুলের মালা পরে কবিগুরু শোনেন নিখুঁত সুর আর গ্রামীন উচ্চারণে - আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধুলার তলে। চাষী অভিভাবকটি আবৃত্তি করছেন - দুই বিঘা জমি।
এক পঁচিশে বৈশাখেই মৃত্যুর সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ পরিচয়। - আমি লুকোচুরি কবিতাটি আবৃত্তি প্র্যাকটিস করছিলাম,আমাকে ন'মাসী এসে বললো - খুকু একটু মেজর দত্তের বাড়ী যাবি? ডঃ মেজর দত্ত - আমার দাদুর ছাত্র ছিলেন। ছুটে এলেন, আমার দাদু উপযুক্ত দুই পুত্র এবং অকালে স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন, তবু কবিতা লিখতেন, বলতেন - মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে। আটটি কন্যা সন্তানের পাঁচটা তখনও অবিবাহিত। অন্ধ মানুষ। চলে গেলেন যখন মেজর দত্তের কাছ থেকে খবর পেয়ে শচীন্দ্র লাল সিংহ, সুখময় সেন সব গণ্যমান্য সুধীজন মাস্টার মশাই এর অসহায় পরিবারটির পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। এই ছিলো আগরতলার সংস্কৃতি। পিতৃহারা কন্যাদের হাহাকারে ডুবে গেলো আমার সেবারের চাঁপার গাছে চাঁপা হয়ে ফোঁটা।

~~~
মা
~~~
আমার মা আমার চেয়ে কম করেও বাইশ বছরের বড় ছিলেন, বেশি হওয়াও বিচিত্র নয়, পড়াশোনায় ভালো ছিলেন তার চেয়ে বড় কথা আগ্রহী ছিলেন, স্বাবলম্বী হতে চাইতেন। ষোল বছরে আমার দিদিমা মারা যান। তখন দাদুর দশটি সন্তান, দুটি অতি শিশুকালে মৃত নইলে বারোটি হোত। বহু প্রসবিণি সুন্দরী ধনীকন্যা স্বভাবতই রুগ্ন এবং খিটখিটে হয়ে উঠেছিলেন। তখন জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্ভব ছিলো না, মায়ের ছোট বোনটির বয়েস তখন তিন মাস। ক্রমান্বয়ে। রুগ্ন - অতি রুগ্ন বোনটি মার সন্তানাধিক ছিলো। জিওমেট্রি আঁকতে হোত একটা ভাই বা বোনকে কোলে নিয়ে, মা বেঁচে যখন ছিলেন তখনও। তাঁর মাযের মৃত্যুর পর এই বিশাল সংসারের দায়িত্ব পড়লো মা'র ওপর, আগরতলা মহারানী তুলসী বতী স্কুলের কৃতী ছাত্রী তাঁর বাবার কাছে পড়াটা শেষ করার আবেদন জানালে অসহায় স্কুল শিক্ষক পিতা বলেছিলেন --তুমি পড়লে আমার সংসার দেখবে কে? মেনে নিয়েছিলেন মা। আমি পড়ায় অবহেলা করলে দুঃখে ভেসে যেতেন মা, -আমি ছোটবেলায় শুনেছি মা বলতেন সকরা অর্থাত্ এঁটো আবার কি তাইলে তো নিজের পেটই এঁটো -মাছ ছুঁয়ে যদি অপবিত্র হয় তবে পুকুরে বা নদীর জলে স্নান করলে কি করে পবিত্র হয়? এই যুক্তিবাদী প্রশ্নের উত্তর পাননি, নিয়ম মেনে গেছেন।
মাকে তখনকার দিনের ত্রিপুরার থেকে সুদূর আসামের গোয়ালপাড়া জেলায় বিয়ে দেয়া হয়, তখন কেউ ভাবেননি সন্তানাধিক ভাইবোনদের দীর্ঘ অদর্শন তাঁর কেমন লাগবে, পিতা তাঁকে একরাত্রির জন্যও কোথাও যেতে দেন নি। শুনেছি এমনি একটি মেয়েকে সম্পূর্ন অপরিচিত পাত্রের সঙ্গে সুদূরে বিয়ে দিয়ে পাঠানোর প্রশ্নে পিতার দ্বিধাহীন সিন্ধান্ত মাকে অবাক করলেও মা মেনে নিয়েছিলেন কিন্তু বিয়ের সময় উদ্বেগে চিন্তায় প্রবল জ্বর এসেছিলো, মাথায় জল ঢালার ফাঁকে ফাঁকে সাজানো হচ্ছিলো, সাত পাক ঘোরানো হচ্ছিলো। জ্বরের মধ্যেই মা শুনেছিলেন -বড়রা বলছেন --- ভ্রমর --- হ্যাঁ এই সুন্দর নামটি আমার মাযের। আমি জানতাম মা চিরজীবন চেয়েছেন -মেয়েরা আপন ভাগ্যকে জয় করুক। মা চেয়েছেন আমি মা'র মতো না হই, আমি আমার মায়ের মনের মতো হয়েছি। মা'র ইচ্ছে ছিলো আমার পড়া শেষ হলেও নিজে পড়বেন, সুযোগ পাননি।
আমার বাবা মানুষ হিসাবে মুক্তমনা, সৎ, সৃজনশীল, তালপুকুরে ঘটি ডোবে না এমন পরিবারের খেয়ালী মেধাবী, জেদী এবং রাগী জমিদারপুত্র। কয়েক বছর পর পর ভালো চাকরী ছাড়তে তাঁর দ্বিধা নেই। এই মানুষটিকে মা গর্বের সঙ্গে ভালোবেসে সংসারে যাবতীয় কষ্ট সয়েছেন। আমরা তিন ভাইবোন মায়ের বিচক্ষণ পরিচালনায় মানুষ(?) হয়েছি। বাবা একদিন বলেছিলেন -তোমাদের মায়ের মতো মা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ব্যস ঐ টুকু। মা ভালো সেলাই জানতেন, রান্নায়, সন্দেশ তৈরির নিপুণতার জন্য আলাদা স্বীকৃতি কিছু পাননি। আমিও তো ভাবতাম মা হলে এ সব পারাই যায়।

~~~
মিঠুমাসি
~~~
সেদিন বিজয়া দশমী। যখন সামনে চলার পথ হারিয়ে যায় তখন মন কেবল পেছন পানে হাঁটে। মায়ের হাতের তৈরী নারকেলের মিষ্টি সুরসপোয়া, ইচারমাথা, ঠাকুরমার ডেলিকেসি সজনে পাতার কাটলেট -পরবর্তী কালে শাশুড়ীমায়ের হাতে সাগরদই ছোলার ডাল অর ক্ষীর নারকেলের তক্তি, রাশি রাশি খাবার -হাঁড়ির পর হাঁড়ি, থালার ওপর থালা -সবচে তলায় বড় পরাতে জল। পিঁপড়ে আছে আবার ফ্রিজে এঁটো থাকে, আমিষ থাকে। প্রণাম, কোলাকুলি, এসোজন বোসজন, শিষ্টাচার, লৌকিককতা। এদিকে হরিগংগা বসাক রোডে আমার মাতামহ পরিবারের সুপ্রাচীন ভদ্রাসন -সেখান থেকে বিজয়ার শোভাযাত্রা ভালো দেখা যায়। সে বাড়ীতে আনন্দমেলা। আমার মিঠু মাসি মিষ্টি আর নিমকিতে ভান্ডার ঘর বোঝাই করে রাখেন - সবাইকে মিস্টিমুখ করাতে তো হবেই। তাঁর মা বাবা নেই তখন, ভাইয়েরা অকাল প্রয়াত, কিন্তু তিনি তো কেন্দুয়াই চৌধুরী বাড়ীর কন্যা দোল দূর্গোত্সবের পুরোনো আপ্যায়নের ধারাটি তিনি বজায় রাখবেন, না তাঁর আর্থিক সঙ্গতি বেশী নয়।
তিনি সেই মহিলাদের একজন, আগরতলার মেয়ে যারা দেশ ভাগের পর হৃতসম্পদ পরিবার গুলোর রক্ষাকর্ত্রীর ভূমিকা নিয়েছিলেন, তাঁদের আত্মত্যাগে ভাই বোনেরা প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁদের অভিভাবকরা হয়তো প্রাচীন আভিজাত্যের বেড়াজাল ছিঁড়ে চাকুরী করার মানসিকতা বা যোগ্যতা অর্জনই করেননি। ডক্টর গোবিন্দ চক্রবর্তী একবার দৈনিকসংবাদে একটি নিবন্ধে লিখেছিলেন কুঞ্জবনে অবস্থিত একটি রেডক্রসের শিশু হাসপাতালের কথা, সেখানে কিছু ঐরকম মেয়েদের শিশু পরিচর্যার ট্রেনিং দেয়া হয়, আমার মিঠু মাসি স্বর্গত কুমকুম চৌধুরী তাঁদেরই একজন। চিরকুমারী এই মানুষটির সেবা আর আত্মত্যাগই ছিলো ধর্ম -কতো রোগীকে বিনা স্বার্থে সেবা করেছেন কতো নিরুপায়কে সামান্য সঙ্গতি থেকে সাহায্য করেছেন যাঁরা উপকৃত তাঁরা ছাড়া কেউ জানেনি। দীর্ঘ দীর্ঘ বছর চাকুরী জীবন সুনামে সম্মানে অতিক্রম করেছেন। আই.জি.এমএর শত বর্ষে এঁকে কেউ ডাকেনি যদিও সারাজীবন তিনি এক ঠিকানায়ই কাটিয়েছেন, অবশ্য সমাজসেবিকার তকমার তাঁর দরকারও ছিলো না। সেদিন মাতৃ বিসর্জনের দিনে তাঁকে স্মরণ করলাম, বায়লজিক্যাল মাদার না হয়েও যিনি অনেকের মা।

~~~
মহারাজার আমল
~~~
ছোটবেলা থেকেই দেখেছি আগরতলার যাঁরা পুরোনো বাসিন্দা মহারাজার আমল থেকেই আছেন তাঁদের পরিবার সমূহের মধ্যে একটা নিবিড় আত্মীয়তা বন্ধন। পরিশীলিত চালচলনে আভিজাত্য, ভাষা পূর্ববঙ্গীয়। কুমিল্লা, ঢাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রভাব স্পষ্ট কিন্তু উচ্চারণ শিষ্ট কণ্ঠস্বর কোমল। আমার এক দাদু রাজসভার মন্ত্রী অসিত চন্দ্র চৌধুরী অন্যজন লেখক এবং শিক্ষক রোহিণী চন্দ্র চৌধুরী। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের মধ্যে নিবিড় সুসম্পর্ক ছিলো। উজীর বাড়ির নাজির বাড়ির ছেলেমেয়েরা ঊমাকান্ত বা তুলসীবতী স্কুলেই পড়তেন। আমি বড় হয়ে ও দেখেছি বঙ্কিমি বাংলায় যেমন আসতে আজ্ঞা হোক বা বসতে আজ্ঞা হোক্ বলা হোতো রাজপুরুষরা বলতেন এক কাপ চা দেওন যাক্, চলেন বাগানে চেয়ার পাইত্তা বওন যাক্। রাজার আত্মীয়দের কর্তা সম্বোধনের রীতি ছিলো, তবে তাঁরা সবার সঙ্গেই দোলে বা বিজয়া নববর্ষ রবীন্দ্র জয়ন্তী বা নাটক অভিনয়ে যোগ দিতেন। বছরের একদিন ভোরে উজীর বাড়ির অনিল সঙ্গীত বিদ্যালয় থেকে যন্ত্র সঙ্গীত বাজিয়ে শাদা পোষাকে কিছু মানুষ রাজবাড়ির শশ্মানে যেতেন সরোদ শিল্পী প্রয়াত অনিল দেববর্মনকে মৃত্যুদিনে শ্রদ্ধা জানাতে। কতো সাধারণ মানুষ তাঁদের অনুগামী হয়ে নীরবে সেই শোকে অংশভাগী হতেন। বিজয়া দশমীর দিনে সুন্দর বর্ণাঢ্য মিছিল হয়তো এখনো হয় সে কথা পরে হবে। সবই দেখতাম ওই ৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোডের বাড়ির জানালায় বা গেটের পাশে দাঁড়িয়ে। নেহরু মারা গেলেন চিতাভস্ম নিয়ে শোক মিছিল, শ্রীলঙ্কার থেকে ত্রিপিটক উপহার এলো বেনুবন বিহারে, হাতির পিঠে ত্রিপিটক নিয়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মিছিল হোলো, কী সমারোহ। নেতাজীর জন্মদিনে বিশাল শোভাযাত্রা, কতো বিচিত্র সাজে ছাত্র ছাত্রীরা। প্রত্যেকের চেষ্টা কতোদূর নিখুঁত হবে। স্বাধীনতা দিবসে প্রজাতন্ত্র দিবসে ট্যাবলো তাও দেখার মতো।

~~~
পড়শি
~~~
আগরতলার মণিপুরী সমাজ তাঁদের নিষ্ঠাবান নির্বিরোধী জীবনশৈলীর শিল্পিত চেতনা নিয়ে বিশিষ্ট। তাঁদের মেয়েরা নৃত্যকুশলা লাবণ্যময়ী, প্রত্যেকটি কাজে জাপানীদের মতো সৌন্দর্য্য সম্পাদনে এঁদের জুড়ি নেই। ফুলের অলংকারে এক ধরনের পাতা ব্যবহার করেন সুগন্ধী, অথচ নাম পচা পাতা! বিয়ের কণেরা সেই অপরূপ অলংকার অঙ্গে ধারণ করতেন সম্প্রদায় নির্বিশেষে। কারুকার্যমণ্ডিত কলাপাতা বা খোলের বাসনে নানা রকম সুগন্ধী শাক আর মশলা ভাজা দিয়ে সিংজু নামে খাবার তৈরী করতে জুড়ি নেই। রাসনৃত্য, রথ বন্দনার সময় কি শালীন শুচি পোষাক পরেন এঁরা। মৃতদেহ বহনেও সাদা ধপধপে পোষাকে খোল বাজিয়ে তখনকার দিনে একটা আলাদা রুচি বোধের পরিচয় রাখতেন। নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব তাই কোন কোন পরিবার গোঁড়া ছিলেন কিন্তু অপরকে আঘাত বা আহত করার মানসিকতা ছিলো না। আমাদের স্বর্গত বন্ধু ভদ্রা প্রত্যেক ছুটিতে হস্টেল থেকে বাড়ী গেলে নাকি বিংশ শতাব্দীতেও গোবর খেয়ে ঘরে ঢুকতে হতো -হোষ্টেলে যে মাংস রান্না হয় তাই।
এখন যখন ধর্মান্ধতা আর ধর্ম বিরোধিতা দুইয়েরই বাড়াবাড়ি দেখি তখন মনে হয় নিরীহ ধর্মপ্রাণ পূর্বপুরুষের উদারতার উত্তরাধিকার কি হারিয়েই ফেললাম আমরা? তুমি তোমার মতো -আমি আমার মতো তবু সৌহার্দ্য অটুট একি আজকের ঐতিহ্য?
স্থানিক সংস্কৃতির প্রসঙ্গে মনে হলো সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার কথা। সম্প্রদায় বিশেষের খাদ্য ভাষা এবং পরিধেয় নিয়ে বিরূপতা, বিদ্রুপ অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ঠুরতার রূপ নেয়। পশ্চিমবঙ্গে সংস্কৃতি গর্বিত মানুষেরা অন্যদের চেয়ে এ ব্যাপারে কম অগ্রণী নন। আদিবাসীদের খাদ্যাভাস ভিন্নতর, পশ্চিমবঙ্গে আদিবাসীদের মধ্যে মেঠো ইঁদুর খাওয়ার চল আছে। ত্রিপুরায় ভোটের কাজে নাগা জওয়ানরা যখন আসেন তখন পথ - কুকুরের সংখ্যা কমে যায়। কোহিমায় কুকুরকে প্রচুর পরিমাণ চাল খাইয়ে রোস্ট করা একটা ডেলিকেসি। মিজো, রিয়াংরা সাপ খান, আমার ছাত্র মাতাই কতর রিয়াঙ্গ মেধাবী সরল আদিবাসী ছাত্র কলকাতার প্রগতিশীল একটি হস্টেলে বন্ধুদের কাছে সাপ খাওয়ার গল্প বলে কি হেনেস্তা হয়েছিল সেটা না বলাই ভালো। আমরা নর্থ ইস্টের লোকেরা লুকিয়ে লুকিয়ে শুঁটকি রান্না করে কম ওয়াক থু শুনেছি? ভাগ্যিস বাংলাদেশ স্বাধীন হল ঢাকা এপার বাংলার বিশিষ্টজনদের নানা অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করতে শুরু করল তবে নাটকে সিনেমায় বাঙ্গাল কথা শুধু আর ভাঁড়ামোর উপকরণ রইলো না, শুঁটকি ও একটু স্বীকৃতি পেলো। তবে বাঙ্গালরা যে ঝাল ছাড়াও ভালো রান্না করতে পারে সেটা অনেকেই মানেন না। বাঙালরাও কম যান না -ঘটিরা শামুক -গুগলি খান সে বড় নিন্দার। সহজ পাচক একটি সুলভ প্রোটিন অবহেলিত হবে কেন কেউই ভাবেনি। শ্রীমা তো অসুস্থ ঠাকুরকে ওই পথ্যই দিতেন। আমাদের এক দিদিমণি কলকাতার লোক ছিলেন, আগরতলার মেয়েরা মুড়ি খায় বলে হাসতেন। অত টাকা প্লেন ভাড়া দিয়ে অনেকেই তখনই কলকাতা আসিনি, পরে তো বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্ধমান পশ্চিমবঙ্গে নানা ভাবে মুখরোচক মুড়ি বিলাস দেখে মুগ্ধ -মানুষ যত বেশী গ্রহণ ক্ষমতাসম্পন্ন হন তত মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হন। প্রয়াত ক্যমুনিস্ট নেতা এবং ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্য মন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তী তেমনই একজন। তাঁর জীবনের দীর্ঘ একটা সময় কেটেছে পশ্চিমবঙ্গে চট কল শ্রমিকদের মধ্যে। অন্য একটা সময় আত্মগোপন করেছেন পার্বত্যত্রিপুরায়। বলতেন, উচ্চিংড়ে ভর্তা আর বাঁশের করুল সেদ্ধ বুনোওল পোড়া দিয়ে তৃপ্তিকর ভোজনের গল্প। রাজতন্ত্র আর মহাজন পীড়িত দুঃস্থ মানুষগুলো কে ভালোবেসে ছিলেন বলেই না তাঁদের ক্ষুধার খাদ্য তাঁরও অমৃত হয়েছিলো।
ত্রিপুরি পাছড়া, মনিপুরী ফানেক, নাগা, লুসাই দের বর্ণাঢ্য পোশাক এখন একটু এদিক ওদিক করে ফ্যাশনেবল করা হচ্ছে এখন, দু’দিন আগেও এইসব নিয়ে কত বিদ্রুপ সইতে হয়েছে এঁদের।
আর ভাষা? ত্রিপুরার রাজ পরিবার বাংলা ভাষার অনুরাগী ছিলেন। ত্রিপুরার রাজ মুদ্রাতে বাঙলা ভাষা দেখে বিদ্যাসাগর মশাই মুগ্ধ হয়েছিলেন। সেই রাজ বাড়ীর এক বধূ কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো তোমরা কেন তোমাদের ছেলে মেয়েদের এখন আর বাংলা পড়াও না? তিনি বলেছিলেন - আমরা ইংলিশ যেমন ই বলি না কেন তারা ট্রাইবাল উচ্চারণ নিয়ে সামনাসামনী মজা করেনা, সত্যি ত্রিপুরায় ত্রিপুরিরা সংখ্যালঘু এখন। বাংলা বলতে কিছু টা অসুবিধা হলেও বলতে হয়, বাস কন্ডাক্টর থেকে মাস্টারমশাই অনেকেই প্রকাশ্যেই পরিহাস মুখর হন। আদিবাসীরা অপমানিত হন। আমাদের নিজেদের বাংলা উচ্চারণ কেমন ভাবেন না। বাঙালীরা আবার নিজদের মধ্যেই দ্বিধাবিভক্ত। উদয়পুর মহকুমা শহরের অনাদি বাবুর বাড়ী ভাড়া থাকেন ভাট পাড়ার ঘটি অলক বাবু। অলক বাবুর ছেলে অপু বলছে -মা দেখ অরুপ পেয়ারাকে গয়াম বলছে। অমনি অনাদি বাবুর ছেলে অরূপ বলছে বাবা দেখ - অপু গয়ামরে পেয়ারা কয়। দু জনেই কি ঠিক নয়?তেমনই কৈলাসহরের গৌরীদি কে নদীয়ার মীরাদি -এমা তোমরা শীমকে উড়ি বল? গৌরীদি -ছি, তুমি তাইন উড়িরে শীম কও?

~~~
৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড
~~~
আগরতলার পোস্ট অফিস চৌমুনি আর প্যারাডাইস চৌমুনির মাঝামাঝি ছোট্ট বেড়ার তিনটি ঘর নিয়ে বাড়িটি। ঠিকানা ৪৬ নং হরিগঙ্গা বসাক রোড। অনেক পুরোনো চিঠিতে ঠিকানা দেখেছি মোগরা রোড। দেশ একসময়ে অখণ্ড ছিলো। এখনকার বাংলাদেশের মোগরা আর আগরতলার জীবনরেখা এক ছিলো। বাড়িটি ঐতিহাসিক বললে ভুল বলা হবে না। প্রায় একশো বছর আগে আমার মাতামহী পঞ্চাশ টাকায় একটি বাছুর বিক্রি করেছিলেন, বিষয়বুদ্ধিসম্পন্না ওই বালিকা বধূটি তখনকার দিনে ঐ টাকা দিয়ে শখ করে রাজধানী আগরতলায় ওই জমিটুকু কিনেছিলেন। পীযূষ রাউত পুরোনো দিনের কবিতার আসরের বন্ধু। প্রশ্ন জেগেছে তাঁর মনে একশো বছর আগে একটা বাছুরের দাম কি পঞ্চাশ টাকা ছিলো? সঙ্গত প্রশ্ন, ভাবছি আমিও। উত্তর জানা নেই। পীযূষ কবিতা লেখেন, সিনেমা দেখতে ভালোবাসেন, জীবনানন্দে একনিষ্ঠ, তাঁকেও ভাবিয়ে তুলেছে আমার দিদিমার বাছুরের দাম, হায় কপাল! ওদিকে রৌহিন নিতান্তই ছেলেমানুষ তার প্রশ্ন বাছুর বেচা টাকায় রাজধানীতে জায়গা কেনা যায়? এর একটা উত্তর আছে, সম্পূর্ণ সঠিক কিনা জানি না। তবুও বলছি, রাজন্য আমলে পার্বত্য ত্রিপুরার চেয়ে বৃটিশ শাসিত ত্রিপুরা জেলার কাছাকাছি শহর গুলো যেমন কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ ইত্যাদির গুরুত্ব বেশি ছিলো। বাঙালিরা প্রয়োজনে ওসব শহরে বসত করতেন। পাহাড়ের আদি বাসিন্দারা তখনও খুব একটা শহরমুখী হননি। মহারাজার ঘনিষ্ঠ দেববর্মন পরিবার গুলি পর্যাপ্ত বাসোপযোগী ভূসম্পত্তির অধিকারী ছিলেন। বাঙালি রাজকর্মচারীদের বাসের জন্য মহারাজাই জমি দিতেন। প্রজারা যে যতোখানি বেড়া দিয়ে দখল করতে পারে, অনুমোদন দিতেন। মহারাজা বীরবিক্রম কলেজে যাঁরা কাজ করতেন তাঁদের জন্য বিদ্যাপত্তনের জমি ছিলো। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হসপিটালের স্টাফের জন্য নির্দিষ্ট জমি ছিলো। শুধু কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ছিলো শুনেছি যেমন কেউ দোতলা বাড়ি করতে পারবে না। কারণ রাজবাড়ি দোতলা। প্রত্যেক বাড়ির সামনে ফুল বাগান থাকতে হবে। তাছাড়া অনুমোদন সাপেক্ষে সামান্য নজরানার বিনিময়ে বাড়ির জমি পাওয়া যেতো তাই বোধহয় সংস্কৃতি এবং বিদ্যাচর্চায় উন্নত হলেও আগরতলার জমির দাম কম ছিলো।
আমার দাদু রোহিণী চন্দ্র চৌধুরী তদীয় পত্নী সুশীলা চৌধুরীর বারোটি সন্তান এই বাড়িতেই জন্মগ্রহণ করে। এর মধ্যে দু’টি ছেলে মেয়ে শুনেছি অতি শৈশবে মারা যায়। দুটি ছেলে যথাক্রমে আট এবং ষোল বছর বয়সে মারা যায়। আমার দাদুর আদিনিবাস তথা পৈতৃক বাড়ি ছিলো আখাউড়া চেকপোস্ট থেকে মাত্র দেড় মাইল দূরে কেন্দুয়াই গ্রামে। দাদুরা সেখানে প্রচুর সম্পত্তির মালিক, জমিদার ছিলেন, দুর্গোত্সব হোতো। তদুপরি তাঁরা ত্রিপুরার রাজসভায় মন্ত্রী আগরতলায় নামী শিক্ষক এবং অন্যান্য রাজপদে কাজ করতেন। র‌্যাডক্লিফ সাহেবের টানা রেখায় সেই দেড় মাইল দূরের বাড়ি তাদের পরবাস হয়ে যায়। পুত্রহীন নিঃস্ব শিক্ষক হিসেবে আটটি কন্যা সন্তানের পিতা অসহায় হয়ে পড়েন। আমার দিদিমা সর্বকনিষ্ঠ কন্যাটিকে ছ’মাস বয়সী রেখে আরো ও সাতটি সন্তানকে রেখে দাদুকে অথৈ জলে ফেলে রেখে স্বর্গলাভ করেন। বড়মাসির বিয়ে হয়ে গেছিল দিদিমা বেঁচে থাকতেই ষোল বছর বয়সে। আমার মা ভালো ছাত্রী ছিলেন। তুলসীবতী স্কুলের ছাত্রী। পড়া ছেড়ে মায়ের ফেলে যাওয়া বিরাট বেপথু সংসার, দুগ্ধ পোষ্য রুগ্ন ভাইবোনদের দায়িত্ব নিলেন। অতঃপর এই বাড়িকে কেন্দ্র করে আমার আগরতলা। স্বাধীনতার সমসাময়িক আমি। এই বড়িতেই এক অগ্রহায়ণের দুপুরে সময়ের আগেই জন্ম নিয়ে বেঁচে ও যাই। এই বাড়িতেই শৈশব কৈশোর প্রথম যৌবনের অনেক দিন কেটেছে, আমার বিয়ে।
****
৪৬হরিগঙ্গা বসাক রোডের বার-বাড়ির বেড়ার ঘরের জানালায় রাজপথ ঝিকোয়। রাতে সামান্য দূরে আখাউড়া স্টেশন থেকে ভেসে আসে রাতের রেলগাড়ির ঝিকঝিক শব্দ, রেলের বাঁশী। ছোটরা জানি না কতো কাছে, না অনেক দূরে। বড়দের হৃদস্পন্দনে দ্রুত লয় ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের ছিলো আমাদের নেই। ত্রিপুরা তখন রেল যোগাযোগ হারিয়েছে। ভরসা ছোট ডাকোটা প্লেনে কোলকাতা আর করিমগঞ্জ অবধি দুর্ঘটনা প্রবন বিপদ সংকুল পাকদণ্ডী পথে "মুড়ির টিন বাস"। সীমান্তে নাকি দেখা যায় কেন্দুয়াই চৌধুরীদের পারিবারিক শ্মশানের শিব মন্দিরের চূড়ো। দাদু মারা গেলেন সাতান্ন সনে। বহুদিন আগে মাত্র ঊনত্রিশ বছর বয়সে মারা গেছেন দশটি সন্তান রেখে বারোটি সন্তানের মা আমার দিদিমা। মা বলেন, - সুরেন্দ্র পালের গাড়ি করে মাকে তো নিয়ে গেছিল কেন্দুয়াই, আমরা কাঁদতেও পারিনি। ছোট্ট ভাইবোন গুলো কাঁদছে খিদেয়। কোথায় গরম জল পাই, বার্লি গুলবো। চিতা না নিভলে বাড়িতে উনুন জ্বলবে না। আমরা শুনি, ব্যাপারটা কি আর বুঝতে পারি ঠিক। প্রতিটি ঘটনা দেশভাগের স্মৃতি উসকে দেয়। ওপারের আত্মীয়বন্ধুদের এপারে আসতে বাধা এপার থেকে নিতান্ত দায়ে না পড়লে ভয়ে কেউ ওপারে যায় না। দুর্বোধ্য সব কথা পাসপোর্ট ভিসা। গরীব গুর্বো মানুষেরা প্রাণ বাজি রেখে আসে যায় যে পথে তাকে নিজেরাই বলে চোরাপথ। কিন্তু তারা চোর নয় ওই দেশে ওদের নিজেদের খেতি জমি বাড়ি। এমন হিন্দু মুসলমান দুইই আছে। আমাদের প্রজন্মের এক অদ্ভুত ছেলেবেলা। বইএ পড়ি ভারত আমার স্বদেশ। স্বাধীনতা নূতন। তাকে নিয়ে আদিখ্যেতা ও অনেক। এদিকে স্বাধীনতা মানে পার্টিশন, দাঙ্গা। ভারতের ম্যাপের বাইরে অনেকটা সবুজ অংশ সেখানে কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকা। কেউ জিজ্ঞেস করে দেশ কই? উত্তরে বলতে হয় ওই সব নামের একটা। বড়রা সর্বদা অতীত আঁকড়ে থাকেন আমরাও তাই খানিকটা ন্যস্টালজিক, দুঃখবিলাসী। তা বলে কি হৈচৈ আনন্দ দুষ্টুমিতে কম যাই? না। আমরা সামাজিক বৈষম্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিছু একটা করার অ-সুনির্দিষ্ট প্রতিজ্ঞা নিয়ে বড় হতে থাকি।

~~~
মংলা সিংএর দীঘি
~~~
আমাদের বাড়ির সামনে রাজপথ ওপারে মঙ্গল সিংহের দীঘি, আগরতলায় কথ্য ভাষার টানে মংলা সিং। শুনি তাঁরা ক্ষত্রিয়। তখন রাজকাহিনী টাহিনী পড়ে ক্ষত্রিয়দের বীরত্বের কাহিনী পড়ে মুগ্ধ। তবে ওঁদের পাড়ায় যুদ্ধ বিগ্রহ নেই। আগরতলায় তখনো ওয়াটার সাপ্লাই নেই, রাস্তার ধারে ধারে নর্দমার পাশে আর্টিজান টিউব ওয়েল। একটা বাঁকানো লোহার নল দিয়ে দিনরাত জল পড়ে। পাম্প করতে হয়না। মাটির তলার জল নিয়ে অপচয় সম্পর্কে তখনো কেউই কিছু ভাবেই নি। বাড়িতে বাড়িতে একটি করে টলটলে জলে ভরা ডোবা তাকে বলে কুয়া। কাপড় কাঁচলে ধপধপে জেল্লা বেরোয়। বাসনা মাসি ঘাটে বসে বাসন মাজে। কুলগাছে বসে দুষ্টু কাঠবিড়ালী তার মাথা লক্ষ্য করে আধখাওয়া কুল ছুঁড়ে মারে। ধুরু আপদ বলে মাসি জোরে জোরে কেলে হাঁড়ি ছাই মাটি দিয়ে ঘষে ঘষে মাজে। ছোট ছোট কুচি পানার ফাঁকে ফুটো কলসী ভাসে। ভেতরে বাসা বেঁধে থাকে বড়বড় শোল মাগুর শিং মাছ। মাঝে মাঝে জেলে এসে জাল ফেলে, কলসী থেকে বার করে ইয়া বড় তৈলাক্ত মাগুর। সীমের বীচি দিয়ে জিভে জল আনা ডালনা রান্না হয়। স্পেশাল আগরতলার ডেলিকেসি। খাওয়া হয় টিউব ওয়েলের জল। লোহার উপাদান সমৃদ্ধ সেই জলে আগরতলা বাসীর হলদেটে দাঁত। আমার আবার তখন গজদাঁত দেখা দিয়েছে। সবাই খেপায় -দাঁতের উপরে দাঁতনি। হলুদ সবারই দাঁত, ওই নিয়ে কেউ কিছু বলে না। অনেকেই স্নান করতে যায় মঙ্গল মামার পুকুরে। ঝাঁপাই জোড়ে, সাতার কাটে। আমার ও ইচ্ছে করে পান্নাদি বন্যা ওদের সঙ্গে সাঁতার কাটতে, গায়ে মাথায় কী সুন্দর সোঁদাল ফুল ঝরে পড়ে। বাড়িতে আপত্তি মেয়েরা বাড়ির বাইরে কেন স্নান করবে। তর্ক করি কেন মেয়েরা সমুদ্রে স্নান করতে পারে আরতি সাহা সাঁতার কেটে প্রাইজ পেয়েছে আমি বুঝি ওই পুকুরে ডুব দিয়ে স্নান করতে পারিনা? এক এক দিন পারমিশন পাই, আমার এক দিদা আসেন উড়শীউড়া থেকে। শাদা শাড়ি, ছোট কদমছাট চুল। সৈন্ধব লবণ দিয়ে সিদ্ধ ভাত খান তোলা উনুনে। দিদার জন্য পুকুরে ডুব দিয়ে একঘটি জল আনি খাবার জন্য। দিদাকে কলের জল খেতে নেই। বিধবা যে।
পুকুর পাড়ে মঙ্গল সিংহের জাহাজ প্যাটার্নের বাড়িতে ভাড়া থাকেন টেরিটোরিয়েল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান শচীন্দ্র লাল সিংহ। ত্রিপুরা তখন কেন্দ্র শাসিত রাজ্য - পরে যখন স্বায়ত্ব শাসন পায় তখন ত্রিপুরার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী তিনিই। উনি সিংহ পাড়ারই। সারাজীবন স্বদেশী করেছেন, জেল খেটেছেন, বাড়িঘর দেখেননি কখনো। তুতো ভাইয়ের বাড়িতে ভাড়াই থাকেন। সামনের দিকে একটা ঘরে শনিবার শনিবার সাহিত্য বাসরের অধিবেশন হয়। অশ্বিনী আঢ্য বলে এক মামা সেক্রেটারি। বড় খাতা নিয়ে কী লেখেন। তরণীদি নামে একজন দেববর্মা মাসি আসেন। দুদিকে দুটি খোঁপা বেঁধে আসেন অপরাজিতা রায়, পরে আমার দিদিমণি। আসেন করবী দেববর্মন। তখন মাসি ডাকতাম, বড় হয়ে দিদি।
এই সিংহ পাড়া নিয়ে একটু মজার গল্প আছে। মা বলতেন, মা যখন কিশোরী, বিয়ে হয়নি তখন, মঙ্গল মামাদের একটা ক্লাব ছিল। নামটা মজার - লগুড়াঘাত সঙ্ঘ। পাড়ার কারোকে শাসন করার দরকার হলে আঘাত করতে দ্বিধা করতেন না তাঁরা। বৃটিশ ভারত থেকে স্বাধীন ত্রিপুরাতে আশ্রয় নিতে আসতেন পলাতক বিপ্লবীরা। নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা হোতো ক্লাবের তরফে। লাঠি খেলা, কুস্তি সব হোতো।
বাড়ির কুঁচোকাঁচা কেউ বেশি বায়না বা কান্নাকাটি করলে ছোট মাসির বকুনি বাঁধা ছিলো ---সিং পাড়ার মাইয়া যেমন শ্বশুর বাড়ি যায়। সিংহদের মেয়েরা নাকি শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার সময় খুব কাঁদে। কেঁদে কেঁদে গাড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ে যায়। পরে ছোট মাসির বিয়ে হলে দেখলাম ছোট মাসি ও কম কাঁদলো না। আসলে কি, সিংহরা তো ক্ষত্রিয়। ক্ষত্রিয়দের সঙ্গেই তাদের বিয়ে হোতো। ত্রিপুরায় ক্ষত্রিয় কম সবাই প্রায় সবার আত্মীয়। রাজ্যান্তরে সুদূর শ্বশুর বাড়ি। ভাষা সংস্কৃতি আলাদা। বাপের বাড়ি আসার সুযোগ কম তাই ওদের এতো কান্না।

~~~
শুধু দূরে যেতে যেতে কেঁদে চাওয়া
~~~
এক সময় একাকার হয়ে যায় আগরতলা, করিমগঞ্জ, হাওড়া গোমতী কুশিয়ারা ব্রহ্মপুত্র, অনাদি অনন্ত কাল নিরবধি। ফর্টিসিক্সের বেড়ার ঘর ছেড়ে বাবার হাত ধরে হেঁটে চলি তেজপুর বমডিলা হাইওয়ে ধরে, একপাশে দরং জেলার দিগন্ত ব্যাপী ধানকাটা মাঠের রিক্ততা অন্যপাশে বসতির আকাশে জ্বলছে প্রদীপ, হেমন্ত গোধূলির আকাশের মতো ধূসর স্মৃতি। আকাশে একটা ম্লান লালচে চাঁদ ওঠে। বলি, বাবা, চাঁদ দেখো আমাদের সঙ্গে চলেছে, কোথায় যায় বাবা? -বাবা বলেন, এরপরের পূর্ণিমা হবে, রাস পূর্ণিমা। রাস কি বাবা? পিচ রাস্তার কুচকুচে মসৃণ পরিসরে দেখা দিয়েছে বিষধর শঙ্খনি সাপ। চাঁদের আলোতে কষ্টে গা ঘষটে চলতে চাইছে ভয়াল বিষধর। পারছে না। আমার অসম সাহসী বাবা একটা লাঠি খুঁজছেন। নির্দেশ দিচ্ছেন -ভয় পেয়ো না। তুমি কিন্ত স্বাধীন দেশের মেয়ে। স্বাধীনতার তখনো হয়তো মাত্র এক দশক পেরিয়েছে কি পেরোয নি। এতোদিন পরেও নির্ভীক হতে পারলাম কই? কোন দিনই তো গর্জে উঠলাম না, লাঠিও খুঁজলাম না বাবা!

অন্য কোনদিন হবে আসামের গল্প। সিং পাড়ার সদ্যবিবাহিতা মেয়েদের মত মানুষের ভেসে ভেসে চলা, নতুন জায়গায় মানিয়ে নেওয়া, নির্বাসন ও পুনর্বাসন, নব নব দুরাশায় শুধু আগে চলে যাওয়া।

আর ছেচল্লিশ হরিগঙ্গা বসাক রোডের বেড়ার ঘরে চুইঁয়ে পড়া মিঠে রোদের গল্পখানি জড়িয়ে থাকে আমার অস্তিত্ত্ব, আমাদের ছোট্ট সাদাসিধে শহর, রাহুর প্রেমে পুরোনো কথার আবাদ।

357 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: খাতাঞ্চী

Re: ৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড

.
Avatar: Ela

Re: ৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড

মাঝে মাঝে প্রাণে তব পরশখানি দিও।

বাইশে শ্রাবণের উপযুক্ত দরদী লেখা। ভালো থাকুন আর এরকম আরও অনেক অনেক লিখতে থাকুন।
Avatar: কল্লোল

Re: ৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড

দিদি। বহুকাল পর পল্টুদার কথা। আমার সাথে খুব সামান্য পরিচয়। যখন জানলেন আমি উমাকান্তবাবুর প্রপৌত্র, আমায় রাজমালার একটা খন্ড দিয়ে দেন, যাতে ত্রিপুরা রাজগীর দলিলগুলি আছে। সেখানেই উমাকান্তবাবুর নিয়োগ পত্রটি আছে। খুব বেহিন্দ মনের মানুষ হিলে উনি।
Avatar: শঙ্খ

Re: ৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড

মায়া মায়া
Avatar: রঞ্জন

Re: ৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড

নমষ্কার।
এ লেখা চলুক, চলতে থাকুক। ময়মসিংহের কথাও হোক।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন