Anamitra Roy RSS feed

Anamitra Royএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা... বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার দিন
    বিএনপি এখন অস্তিত্ব সংকটে আছে। কিন্তু কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। ক্ষমতার তাপে মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল দলটার। ফলাফল ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড মেরে হত্যার চেষ্টা। বিরোধীদলের নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা করলেই ...
  • তোমার বাড়ি
    তোমার বাড়ি মেঘের কাছে, তোমার গ্রামে বরফ আজো?আজ, সীমান্তবর্তী শহর, শুধুই বেয়নেটে সাজো।সারাটা দিন বুটের টহল, সারাটা দিন বন্দী ঘরে।সমস্ত রাত দুয়ারগুলি অবিরত ভাঙলো ঝড়ে।জেনেছো আজ, কেউ আসেনি: তোমার জন্য পরিত্রাতা।তোমার নমাজ হয় না আদায়, তোমার চোখে পেলেট ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ২
    বার্সিলোনা আসলে স্পেনের শহর হয়েও স্পেনের না। উত্তর পুর্ব স্পেনের যেখানে বার্সিলোনা, সেই অঞ্চল কে বলা হয় ক্যাটালোনিয়া। স্বাধীনদেশ না হয়েও স্বশাসিত প্রদেশ। যেমন কানাডায় কিউবেক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মনে হয় এরকম একটা জায়গা থাকে, দেশি হয়েও দেশি না। ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ১
    ঠিক করেছিলাম আট-নয়দিন স্পেন বেড়াতে গেলে, বার্সিলোনাতেই থাকব। বেড়ানোর সময়টুকুর মধ্যে খুব দৌড় ঝাঁপ, এক দিনে একটা শহর দেখে বা একটা গন্তব্যের দেখার জায়গা ফর্দ মিলিয়ে শেষ করে আবার মাল পত্তর নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ভোর রাতে রওনা হওয়া, আর এই করে ১০ দিনে ৮ ...
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

Anamitra Roy

পর্ব ১: আমরা

ভণিতা করার বিশেষ সময় নেই আজ্ঞে। যা হওয়ার ছিল, হয়ে গেছে আর তারপর যা হওয়ার ছিল সেটাও শুরু হয়ে গেছে। কাজেই সোজা আসল কথায় ঢুকে যাওয়াই ভালো। ভোটের রেজাল্টের দিন সকালে একজন আমাকে বললো "আজ একটু সাবধানে থেকো"। আমি বললাম, "কেন? কেউ আমায় ক্যালাবে বলেছে নাকি"? সে বললো, " না, বলা তো যায় না আজ কে কাকে ক্যালাবে... তাই..."

এইবার কথা হচ্ছে, ফাটা দু'রকমের হয়। এক হলো ভয়ে ফেটে যাওয়া, আর দুই, প্রকৃত অর্থেই ফাটা, অর্থাৎ যখন কিনা চচ্চড় করে শব্দ বেরোয়। প্রথমে আমরা দ্বিতীয় রকমের ফাটার কথায় আসবো কারণ ওটা অনেক বেশি রিয়েল।

ঘটনা হলো, আমার ফাটে না সেভাবে। যার ফাটে সেই জানে কোথায় ছাপ দিয়েছে আর কেন দিয়েছে! আমার সমস্যাগুলো খুব কিউট ধরণের। এই যেমন, দুধওলা চারঘন্টা আগে কোল্যাপসিবলের ফাঁকে দুধের প্যাকেট গুঁজে রেখে চলে গেছে, বেল বাজায়নি, ব্যাস! দুধ গেলো কেটে! কিংবা, "আসছি" বলে সাড়ে ষোলো মিনিট অপেক্ষা করানোর পর ওলা ড্রাইভার বুকিং ক্যানসেল করে দিলো রাত পৌনে বারোটার সময়। অথবা, দুপুর বারোটায় দিয়ে যাবে বলে সন্ধ্যে সাতটায় জলের ড্রাম দিয়ে গেলো জলের লোক! এইসব। খুচরো ধরণের। বাদবাকি দেশে যতই গরম বাড়ুক না কেন যতক্ষণ এসি অন আছে আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি হচ্ছি মতামত ব্যক্ত করা শ্রেণীর প্রতিভূ এবং বলাবাহুল্য সব বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করা আসলে একধরণের বিলাসিতা। যার ক্ষেতে যথেষ্ট জলের যোগান নেই সে মেট্রোরেলের কামরায় চুমু খাওয়া যাবে কিনা, কিংবা নেতাজী নগরের মাথায় সন্ধ্যে সাড়ে আটটা নাগাদ কোনো একলা মেয়ে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে পারবে কিনা এসব নিয়ে মনে হয় ততটাও ভাবিত নয়। যার কারখানা আজ দশ বছরের ওপর বন্ধ ৩৭৭ ধারা নিয়ে মানে বই খুলে বসতে তার বয়ে গেছে। নিজের পেট না ভরা অবধি মানুষ আসলে খুবই ইনহিউম্যান। কে আফরাজুল, কাশ্মীরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোন বাচ্চা মেয়ের সাথে কি হয়েছিল --- এসব জেনে তাদের কি লাভ! জেনে ফেললেও ওটাও আরেকটা খবরের মতোই, বিরাট কোহলির শূন্য রানে আউট হওয়া যেমন; না হলে ভালো হতো, কিন্তু হয়েই যখন গেছে ভেবে আর কি করবে! তাকে হয়তো এখন গোসাবা থেকে ঢাকুরিয়া কি ধর্মতলা গিয়ে কাজ ধরতে হবে আজকের। ওসব ভাবাভাবি যাদের ঘরে আলো বেশি হয়েছে তাদের জন্য। এই যেমন আমি। আমার ঘরে এতো আলো যে আমি জনে জনে বিতরণ করে বেড়াতে পারলে বেশ একটা ব্যাপার হতো। দেশেরও মঙ্গল হতো আর আমারও নামডাক। কিন্তু আমি তো ক্যালানি খাবো না! আমি জয়নগরের ভেতর কোনো তস্য গ্রামে গিয়ে ডাকসাইটে কোনো তৃণমূল কর্মীকে ডেকে, "শোনো হে, জিজেক বলেছেন..." বলবো না তো! আমি বড়জোর জ্ঞান মঞ্চ কি অ্যাকাডেমি অবধি যেতে পারি ছুটির দিন দেখে। সেরকম ব্যস্ত দিনে আমি বালিগঞ্জের ওপারেও যাই না খুব একটা। বালিগঞ্জও কি ছাতা গিয়ে উঠতে পারি? এই যে সেবার গড়িয়া স্টেশন রোডের ওপর একটা ভয়ানক ঘটনা ঘটে গেলো; সুলতানা না কি যেন নাম মেয়েটার, লাশ পাওয়া গেলো ল্যাংটো, বডির নিচের হাফ নেই, গাড়ি দিয়ে পিষে দিয়ে গেছে। এলাকাবাসী কেউ কিছু দেখেনি স্বাভাবিকভাবেই, রাতের বেলায় ঘটেছে কিনা! সবাই দরজা জানলা এঁটে এসি চালিয়ে ঘুমোচ্ছিলো। ওদিকে পুলিশ বলছে অ্যাকসিডেন্ট; এইটা অবশ্য বলতে পারছে না যে অ্যাকসিডেন্টই যদি হবে গায়ের জামাকাপড় গেলো কোথায়! তা, কিছু লোকজন মিলে একটু থানায়-টানায় গিয়েছিলো যাতে করে ঠিকঠাক তদন্তটুকু অন্তত হয়, কিন্তু আমি কি গেছি? না, যাইনি! আমি তখন ব্যস্ত ছিলাম। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টগুলো অবশ্য পড়েছি আমি সবকটাই। সেসব পড়ে আমার বেশ একটা সুচিন্তিত মতামতও তৈরী হয়েছে, কিন্তু গিয়ে উঠতে পারিনি। তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীদের নাম শোনা যাচ্ছিলো ঘটনাটায়, ভেবেছিলাম সিপিএমের লোকেরা যাবে, কিন্তু ওরা যায়নি। তা সে আর আমি কি করবো, সেটা ওদের ব্যাপার, আমি কোনো পার্টি করি না। আমি একটা সাধারণ ভবেশ জোশি। সুপারহিরো নই। তায় আবার আমি বাঙালি, লম্বাও নই বিশেষ আর গায়ে জোরও নেই সেরকম। প্রায়ই অ্যাসিডিটিতে ভুগি, গলা-বুক জ্বালা করে। আমার পাছায় মোটা লাঠির বাড়ি পড়লে পাছায় যে ভালোই ব্যাথা হবে সেটা আমি জানি, তিনচারদিন ঠিক করে বসতে পারবো না হয়তো। এবার আমার সমস্যা হচ্ছে যে আমি সংবেদনশীল। তা সেটা নিতান্তই আমার একারই সমস্যা। বিভিন্ন খারাপ খবর দেখলে আমার ভেতরে নানানরকম রিয়্যাকশন হয়। আরও বড় মুশকিল এই যে, আমি শিক্ষিত। আমার শিক্ষা আমায় গ্যাসবেলুনের মতো ফোলা একটা ইগো দিয়েছে। স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ঢোঁক গিলে নিতে আমার ইগোতে বাধে। ফেসবুকে লিখলে ক্যালানি খাওয়ার চান্স্ কম, তাই ফেসবুকে লিখি। গাঁড়ে দম নেই যে মাইক ভাড়া করে একা শিয়ালদা স্টেশনে গিয়ে দাঁড়িয়ে যাবো। যাওয়া বলতে ওই কলেজ স্কোয়ার আর মেট্রো চ্যানেল, তাও সেরকম বড়সরো কিছু ঘটলে। সেখানেও কি একা যাই নাকি? একা গিয়ে লোকাল লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জনমত গঠন করি? না তো! ফেসবুকে ঘোষণা করে চারগাছা সমমনস্ক বাল বেঁধে নিয়ে যাই বগলে, দিনকাল যা পড়েছে বলা তো যায় না না কখন কি ঘটে যাবে! এই হয়তো ক্যাডার লেলিয়ে দিলো! ওইসব রিস্ক কে নেবে? মাথা খারাপ! তারচেয়ে দলবেঁধে গিয়ে রোড শো দেওয়া অনেক নিরাপদ।

তো এই আমি, আর আমার চারগাছা সমমনস্ক পরিচিত মানুষ, এই হলাম আমরা, কলকাতার বিপ্লবপ্রিয় নাগরিক সমাজ। সমস্যাগুলো ঠিক আমাদের নয়। অন্যান্যদের সমস্যা, আমরা ফিল করি মাত্র। লড়াইটাও তাই ঠিক আমাদের নয়। অন্যান্যরা লড়লে আমরা নেতৃত্ব দিয়ে ধন্য করতে পারি নিশ্চয়ই। আমাদের সংগঠন নেই কোনও সেভাবে। কিন্তু আমাদের আশা দেশের ছাত্রসমাজ লড়বে। আমাদের আশা জনগণ ছুঁড়ে ফেলে দেবে ফ্যাসিস্টদের। এহেন আমরা, সরল বিশ্বাসে, জনগণের উপর আস্থা রেখেছিলেম। আমরা ভেবেছিলেম, আর যাই হোক বিজেপি অন্তত জিতবে না। জনগণ আমাদের ৭-১ পুরে দিয়েছে। জনগণ জার্মানী, আমরা ব্রাজিল, ঠিক এতটাই জনবিচ্ছিন্ন আমরা। আসুন আমরা যে যার নিজের পেটের ভেতর ঢুকে যাই এবং জয় শ্রী রাম বলা প্র্যাকটিস করতে শুরু করি।

(চলবে)
পর্ব ২: ভটকতি আতমা

না, সুচিত্রা সেন-এর কথা বলছি না। অনেকেই বলছেন দেখছি সিপিএমের তথা বামফ্রন্টের ভোট বিজেপিতে গেছে। এখন কথা হলো বামফ্রন্টের ভোটটা ঠিক কি বস্তু? ভোট যে দেয় তার, আর যেখানে দেয় সেখানেই যায়, মানে সেরকমই অন্তত হওয়া উচিত। গতবার অমুকের ভোট তমুক পেয়েছিলো, এইবার তার বদলে আরেকজন পেয়েছে --- এই জাতীয় উদ্ভট কথা বলার কোনও মানে নেই। ভোট জনগণের। একটা সময় সেই ভোট বামফ্রন্ট পেতো, একটা সময়ের পর থেকে আর পাচ্ছে না। বামফ্রন্টের বা সিপিএমের ভোট বলে কিছু হয়না। যেহেতু ভোটগুলো বামফ্রন্ট পেতো তাই হয়তো শিক্ষিত বিশ্লেষণক্ষম জনমানসে এরকম ধারণা হয়ে থাকবে যে এই ভোটাররা বাম কর্মী বা সমর্থক ছিলেন। কিন্তু আদপে তা নয়। ভোট আসতো, সেকথা সত্যি, কিন্তু কিভাবে আসতো সেটাও ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। জ্যোতি বসু যে কোনো ধবধবে ধুতি পরা টকটকে লাল মুক্তিসূর্য ছিলেন না সেই সত্য আবারও নতুন করে চেপে যাওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে চারিপাশে। যে দলের দুই শ্রেষ্ঠ সম্পদের নাম তপন ঘোষ আর শুকুর আলি তাদেরকে যে জনগণ এশিয়া জুড়ে শান্তিপূর্ণ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আশায় ভোট দিতো না একথা বোধহয় আলাদা করে বলে দেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। সামবডি হ্যাজ টু ডু দ্য ডার্টি ওয়ার্ক --- এই আপ্তবাক্য মেনে নিয়ে, সমস্ত ডার্টিওয়ার্কের দায় দলের সম্পদকুলকে আউটসোর্স করে দিয়ে ষাট এবং সত্তরে প্রথম যৌবন পেরোনো এককালের লড়াকু বাঙালী, যারা কিনা তদ্দিনে আপাতভাবে মোটামুটি স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত, শান্তিতে সন্ধেবেলা কালচার মারাচ্ছিলো। ভোটে ক্যাচাল হতো না? দিব্যি হতো, গোটা বাংলা জুড়েই হতো। ছাপ্পা পড়তো না? দিব্যি পড়তো! বোমা পড়তো না বিরোধী দলের কর্মীর বাড়িতে? হে হে! বলে দিতে হবে নাকি! তবে কিনা আমরা নিশ্চিন্তে ছিলাম। আমরা জানতাম সব কন্ট্রোলে আছে, ওপর থেকে সব সামলে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে সেরকম বুঝলে কারণ সব আমাদের দলের লোকেরাই করছে। ঠিক এতটাই বিরোধীশূন্য ছিল বাংলা। শুধু আটানব্বই সালে একটু গেলো গেলো হাওয়া উঠেছিল মাত্র একবার। তা, ওই পর্যন্তই, হয়নি কিসুই!

আমার বড় হয়ে ওঠা হুগলি শিল্পাঞ্চলের মফঃস্বলে মোটের ওপর বামমনোভাবাপন্ন একটি লালচে মোটামুটি মধ্যবিত্ত পরিবারে। ক্লাস থ্রি-ফোর অবধি আমার ধারণা ছিল কংগ্রেস খুব ভালো পার্টি কারণ কংগ্রেস দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে; বইপত্রে সেরকমই পড়েছিলাম বলে মনে পড়ছে। জানতাম অমুক কাকু খুব পার্টির কাজ করে তাই পার্টি অমুক কাকুকে চাকরি করে দেবে। আবার কেউ কেউ বলতো, না না দেবে না, ওর চাকরি হয়ে গেলে পার্টির কাজ কে সামলাবে! তার চেয়ে ওকে পঞ্চায়েতে ছোটোখাটো পদ দিয়ে দেবে একদিন। তারপর ভোটের আগ দিয়ে একদিন বন্দুক দেখলাম, সিনেমার মতো কালো নয়, ধূসর রঙের। ভয় করেনি, কারণ যার কাছে বন্দুকটা দেখেছিলাম সেও আমার ছোট থেকেই চেনা, সেইভাবে জ্ঞান হওয়ার আগে থেকেই প্রায়। সেও আমাকে হয়তো বিশ্বাস করতো কোনো কারণে, তাই দেখে ফেলেছি জেনেও ভয় দেখানোর জন্য কিছুই বলেনি। এমনকি, "কাউকে বলিস না", এটুকুও না। সেই প্রথম বুঝলাম রাজনীতি ব্যাপারটা অত সহজ নয়, এর মধ্যে অনেক লড়াইয়ের ব্যাপার আছে। সরল মনের বাচ্চা মানুষের কাছে যে কোনো লড়াইয়ের দুটো পক্ষ হয় --- ১) হিরোপক্ষ, আর ২) ভিলেনপক্ষ। বন্দুকধারী এই লড়াকু লোকটি যেহেতু আমার চেনা তাই বোঝাই যাচ্ছে যে হিরো হওয়ার দৌড়ে তার টিম এমনিই এগিয়ে ছিল। তার ওপর আবার যেদিন শুনলাম যে কংগ্রেস নাকি কোথায় কোন বরানগর-কাশীপুর না কোথায় যেন একরাত্রে তিনশো' লোককে মেরে ফেলেছিলো সেদিন তো সব জলের মতো পরিষ্কার হয়েই গেলো একেবারে! "লড়াই লড়াই লড়াই চাই/ লড়াই করে বাঁচতে চাই" --- পাগলা, যে লড়াইতে ভয় পায় না সেই তো আসল হিরো! শুধু একটাই ক্ষোভ! এসএফআই-এর দাদারা স্কুলগেট থেকে একটাকা করে চাঁদা নিয়ে যাওয়ার সময় যদি একটু বুঝিয়ে বলে দিয়ে যেত যে কিসের লড়াই আর কেন, এই লেখাটা লিখতে আজ এত বছর পর একটু সুবিধা হতো হয়তো বা। যাক গে!

তবে সবকিছু বোধহয় পরিকল্পনামাফিক চলছিলো না আমাদের হিরোপক্ষের। ২০০৪ সাল, আমি তখন ইলেভেনে পড়ি। রাত সাড়ে এগারোটার সময় একদিন কাঁধে ঝোলা নিয়ে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছি, অক্সিলিয়াম-ডনবস্কো পেরিয়ে ঠিক যেখানে রাস্তাটা বাঁদিক বেঁকে দুভাগ হয়ে একটা গেছে টায়ারবাগান আর আরেকটা লিচুবাগান, পুলিশকাকুরা দাঁড় করালো। কাকুরা জিপের সামনে জটলা করছিলো। আমায় দেখে কি খেয়াল হলো কে জানে! সাইকেলের ব্রেকটা চেপে দাঁড় করিয়ে দিলো।
- এত রাত্রে এখানে কি করছিস?
- বাড়ি যাচ্ছি।
- এত রাত হলো কেন বাড়ি ঢুকতে? ব্যাগে কি আছে?
- বই খাতা।
- কই দেখি?
আমি ব্যাগটা কাঁধ থেকে খুলে এগিয়ে দিলাম। ব্যাগের ভিতর খানকয়েক খাতা, ডায়রি, বই এইসবই ছিল।তার মধ্যে একটা মার্ক্সবাদ বিষয়ক বইও ছিল। সেরকম বিস্ফোরক কিছু নয়, তবে সিপিএমের প্রকাশ করা কিছুও নয়, লেখকের নাম মনে নেই এখন আর। ওই বইটাতে নজর আটকে গেলো মাতব্বর মহাশয়ের। - "কোন কলেজ?" - জিজ্ঞেস করতে করতে ব্রেক থেকে হাত সরিয়ে বেশ জোরেই আমার কবজিটা চেপে ধরলো। - "স্কুলে পড়ি। কলেজিয়েট। ইলেভেন" - আমার উত্তরটা কেউ শুনলো বলে মনে হলো না। তিনি তখন পাশে আরেকজনকে বইটা দেখাচ্ছেন। - "এর তো ইন্টারেস্ট একটু অন্যদিকে মনে হচ্ছে। এটাকে তুলবো নাকি"? - আমি বুঝতে পারলাম আমার ব্যাগে নিতান্তই কোনো একটা সন্দেহজনক হলেও হতে পারে মার্কা বই থাকার জন্য আমাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হবে কিনা বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০০৪ সাল, দেশ স্বাধীন হয়েছে ৫৭ বছর আগে। আমি গলায় একটু জোর এনে বললাম, "কাকু, এক মিনিট। আমি একজন সাংবাদিক। 'রাজ্য আলেখ্য' নামে পাক্ষিক কাগজটায় আমি স্পোর্টস-এর বিভাগটা দেখি। আমাদের সম্পাদক, রথীন ভট্টাচার্য্য, টেলিগ্রাফের প্রাক্তন সাংবাদিক। ওনার বাড়ি কনকশালীতে। ওখানে মিটিং থাকায় বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেছে"।
পুলিশকাকু আমার হাতটা আলতো করে ছেড়ে দিলো। "ও, তুই রথীনদার কাগজে আছিস। যা, বাড়ি চলে যা। কদ্দুর যাবি"?
- "ডানলপ এস্টেট"।
- "সাবধানে যা। এত রাত করিস না কখনো আর"।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে বাকি পথটা আমি ভাবছিলাম, আমার নাহয় রথীনদা আছে, যার নেই? তার ব্যাগে এরকম আউট অফ সিলেবাস বই পেলে তারপর কি করতে পারে ওরা? থানায় নিয়ে যাবে? মারবে? বাবামাকে ডাকবে? কিন্তু কেন? বই-ই তো একটা! পরে এক সবজান্তা মার্কা বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কথাটা। সে বলেছিলো, "আসলে তোর হালকা হালকা দাড়ি আছে তো! তাই নকশালের ভূত দেখেছে ওরা"! সেই প্রথম নকশাল এবং তাহার ভূতের সাথে পরিচয় ঘটে আমার। পরে সত্যিকারের নকশালদের সাথেও এই বন্ধুটিই পরিচয় করিয়ে দেয়। তার আগে আমাদের চুঁচুড়া শহরেও যে নকশাল-এর মতো "ব্রিলিয়ান্ট" লোকজন আছে আমি জানতুমই না। গিয়ে দেখলাম নকশালরা বাসস্ট্যান্ডের পাশে একটা ছোট্ট ঘরে চা খায় আর আড্ডা মারে! আর সব রাজনৈতিক দলের মুণ্ডপাত করে বসে বসে; বিশেষ করে সিপিএমের। তাছাড়া নকশালদের কি যেন একটা নাটকের দলও আছে। একটা পত্রিকাও চালায় তারা, নাম "দিনান্তের অন্বেষণ"। অর্থাৎ কিনা দিবস গোঙায়নু, দিন গিয়াছে সন্ধ্যা নামিয়েছে, এখন পার হওয়ার অপেক্ষা। তবে কিনা হরির দেখা মেলে নাই এখনও, তাই অন্বেষণ জারী রহিয়াছে। এইখানেই একদিন আড্ডা মারতে মারতে বিহারে লালুর সরকার উল্টে গেলো ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর। সবাই সমস্বরে বললো, "লালুও উল্টে গেলো সালা, আমাদের সিপিএম আর ওল্টাবে না"! আরেক রাউন্ড লাল চা-র অর্ডার দেওয়া হলো তারপর।

(চলবে)
পর্ব ৩: নিউ ওয়েভ তথা নব্যনকশাল

এইভাবে চায়ের গ্লাসে সিপিএমকে ডুবিয়ে মেরে দিব্যি দিন কাটছিলো চুঁচুড়া কোর্ট-মাঠ-ঘড়ির মোড়-বাসস্ট্যান্ড অঞ্চলে। আমার ধারণা ছিল নকশালরা লুকিয়ে লুকিয়ে ঘোরে। রাতের অন্ধকারে প্রবল গরমেও গায়ে শাল জড়িয়ে মুখ না ঢেকে বাড়ি থেকে বেরোয় না। নকশাল হয়ে গেলে কাউকে জানতে দিতে নেই। ওবাবা, কোথায় কি! এখানে দিব্যি সবাই স্বাভাবিক জামাকাপড় গায়ে সাইকেল নিয়ে আসতো যেতো। আশেপাশেও লোকজন মোটামুটি জানতো যে এইখানে নকশালরা আড্ডা মারে। কেউ তাদের নিয়ে বিশেষ ভাবিত ছিল না। উল্টে লোকজনের কথাবার্তা শুনলে মনে হতো গোটা চুঁচড়ো জুড়ে সব্বাই বোধহয় একধাক্কায় নকশাল হয়ে গেছে, এতটাই সমর্থনের সুর তথা সিপিএম বিরোধিতা মিশে থাকতো তাদের মতামতে। পুলিশ পাত্তাও দিতো না। পুলিশের জিপ ওই ঘরের সামনে দিয়ে যাতায়াত করলে কোনোদিন কাউকে সামান্যতম উৎকণ্ঠা প্রকাশ করতেও দেখিনি।

বোঝাই যাচ্ছে, কতরকমের নকশাল হয় আমার কোনো ধারণাও ছিল না তখনও অবধি। এরপর একদিন একটা ফোন এলো অচেনা নম্বর থেকে। দেখি আমার সেই সবজান্তা বন্ধুটি। দেখি ফিসফিস করে কথা বলছে ফোনে।
- কি হয়েছে? ফিসফিস করছিস কেন? এটা কার নম্বর?
- আমি একজায়গায় আছি। বুথের নম্বর এটা। সব কথা বলা যাবে না। নন্দনবাবুর সাথে যোগাযোগ আছে তোর? একটা খবর পৌঁছে দিতে পারবি?
- তুই নিজে ফোন করে নে না। নাম্বার নেই তোর কাছে?
- ফোনে বলা যাবে না। ফোনে সব কথা বলা যায় না।
- আচ্ছা, কি বলতে হবে?
- বলবি আমি সিপিআইএমেল সেকেন্ড সিসি জয়েন করেছি। দেখা করে বলবি কিন্তু।
- আচ্ছা, দেখা করে বলবো। কিন্তু সেটা আবার কি বস্তু?
আমার বন্ধুটি গলা বিকৃত করে "নকশাল নকশাল" বলতে বলতে ফোনটা কেটে দিলো।

নন্দনবাবু আমাদের স্কুলের ইতিহাসের টিচার ছিলেন। দুর্দান্ত পড়াতেন। কোনো বিষয়ের ওপর একবার ওনার ক্লাস করে নিলে আর বই খুলতে হতো না। নন্দনবাবু নকশাল ছিলেন বলে শুনিনি কখনও। অবশ্য এরকম কোনো ব্যাপারও নেই যে কেউ নকশাল হলে তাকে বুকের ওপর "আমি নকশাল" লিখে পোস্টার টাঙিয়ে ঘুরতে হবে। তাছাড়া তদ্দিনে আমার নকশাল বিষয়ক ধারণা পাল্টেছে অনেকটাই। নকশালরা যে মোটেও কোনো রেয়ার স্পিসিজ নয় সেটা আমি দিব্যি জেনে গেছি। চারপাশে অনেক নকশাল আছে আমাদের, ঘাপটি মেরে থাকে সব। যাই হোক, নন্দনবাবুকে ইস্কুলে গিয়ে দেখা করে জানালাম খবরটা। নন্দনবাবু কিরকম যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন "হুম" বলে। তারপর বললেন, "ওকে বল নিজের মাথাটা মেরামত করতে। ওসব করে কোনও লাভ নেই"। কিসের কি আমি কিছু বুঝলাম না। শুধু বললাম, "আচ্ছা"। তারপর জিজ্ঞেস করলাম, "স্যার, কতগুলো নকশাল পার্টি আছে মোটামুটি বাংলায়"? নন্দনবাবু ফোঁস করে হেসে ফেললেন বিচ্ছিরিভাবে। ওনাকে ওইভাবে হাসতে কোনোদিন দেখিনি। তারপর, "একদিন বাড়িতে আয়", বলে পিঠ চাপড়ে দিয়ে করিডোর ধরে হেঁটে টিচার্সরুমের দিকে চলে গেলেন।

নন্দনবাবুর বাড়িতে আমার আর যাওয়া হয়নি কখনও। কলেজের ক্লাস শুরু হয়ে যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আমি কলকাতায় টালিগঞ্জে এক বন্ধুর বাড়িতে থাকতে চলে আসি পাকাপাকিভাবে। এরপর ২০০৬ এর বইমেলা মিটে যাওয়ার পর একদিন হঠাৎ উদ্দেশ্যহীন ভাবে বিপ্লবীয়ানা করতে করতে আমার খেয়াল হয় যে আমার তখনও পুরোপুরিভাবে নকশাল হয়ে ওঠা হয়নি। কিভাবে নকশাল হওয়া যায় জানতে চাওয়ায় আমার সবজান্তা বন্ধুটি আমাকে বলে যে এখন নকশাল হয়ে আর কোনো লাভ নেই। নকশালরা ঝুলে গেছে, কোনো কাজটাজ করছে না আর। এখন হতে গেলে মাওবাদী হতে হবে। তবেই একমাত্র দেশের মুক্তি ঘটলেও ঘটতে পারে। এদ্দিনে আমি বুঝলাম, যে, ওই চুঁচড়ো বাসস্ট্যান্ডের পাশের আড্ডাটা আমার অত বোরিং কেন লাগতো! ঠিকই তো! নকশালরা শালা কোনো কাজই করে না। খালি চা খায় আর আড্ডা মারে!
বেশ! আমি তবে মাওবাদীই হবো! দেশের মুক্তির ব্যাপার যখন বুক পেতে গুলি খেয়ে নেবো চাপ নেই!
কিন্তু হবো কিভাবে? খুব একটা জটিল কাজ নয়, তার জন্য টালিগঞ্জ থেকে একটা অটো ধরে যাদবপুর যেতে হবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মাওবাদী আছে, তারা শিখিয়ে দেবে। কি এক যেন পত্রিকা আছে "ছাত্রফৌজ" নামে। তার যে সম্পাদক, সেই অভিজ্ঞানদা সবজান্তাকে বলেছে আমায় অভিষেকদার সাথে দেখা করিয়ে দিতে। অভিষেকদা ঘাঘু মাল, রাতবিরেতে এসএফআই চমকে বেড়ায়! ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স এর ছাত্র, আঠারো রকম ভাষা জানে। তাছাড়া মাওবাদী যখন, বোঝাই যাচ্ছে যে ব্রিলিয়ান্ট; কাজেই এই নিয়ে আর কথা বাড়িয়ে কোনও লাভ নেই। মার্চ মাসের কোনো এক সূর্যমুখর দিনে আমিও পৌঁছে গেলাম, ওল্ড পিজি হোস্টেল রুম নম্বর তিরিশ। পৌঁছলাম কি শুধু, তারে কি আর কেবল পৌঁছনো কয়, সে এক মহা-অ্যারাইভাল! এমন পৌঁছন পৌঁছলাম যে একেবারে একরাত পার করে পরের দিন বিকেলবেলা যখন বেরোলাম ততক্ষনে আর্টস ইউনিয়নে টেবিল টেনিস খেলে, এসএফআই-এর পোস্টার ছিঁড়ে, সুজিতদার ক্যান্টিনের মোহময় ডালডা মাখানো পরোটা খেয়ে আমি একেবারে পুরোদস্তুর মাওবাদী হয়ে গেছি।

তবে সিরিয়াসলি, সেদিনকার একটা কথা আমার মনে আছে। আমি বলছিলাম, রাষ্ট্রক্ষমতা যে দখল করতে হবে সে বিষয়ে তো কোনো সন্দেহই নেই, কিন্তু এভাবে করা যাবে কি? অভিষেকদা বলেছিলো "সেটা আমিও জানি না। আমার কাছে তো কোনো ব্লুপ্রিন্ট নেই। রাস্তাই রাস্তা। আমিও হাঁটছি, তুইও মনে হলে হেঁটে দেখ কোথায় পৌঁছনো যায়"! এই সততা আমি আমার চেনা রাজনীতির সাথে যুক্ত কোনো ব্যক্তির মধ্যে কোনোদিন দেখিনি। বস্তুত তাদের যতটুকু চিনতাম, আশাও করিনি কোনোদিন। কোনো ভাঁওতাবাজি নয়, হ্যাঁ-কমরেড-আমরাই-লালসূর্য-তুলবো-যাদবপুরের-ঝিলপাড়ে নয়, অনিশ্চয়তার গর্তটাকে হাত দিয়ে ফাঁক করে দেখিয়ে দেওয়া। কখনও কখনও এইটুকুই দরকার হয় একটা সদ্যপরিচিত কিশোরকে তার পক্ষ ছিনিয়ে দেওয়ার জন্য। হিরোপক্ষ।

'নব্যনকশাল' শব্দটা কে প্রথম লেখায় ব্যবহার করেছিল একসময় জানতাম নিজে সাংবাদিক ছিলাম যখন, এখন ভুলে গেছি। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে সম্ভবত অশোক দাসগুপ্ত। সে হলে হবে না হলে না হবে, তাতে কিছু এসে যায় না। তবে মাথায় রাখতে হবে কথা হচ্ছে মার্চ ২০০৬-এর। আর ঠিক দু'মাস বাদে একদিন খাসেরভেরীতে চাষীরা কালোপতাকা দেখাবে টাটাকর্তাদের। কোনো পরিশীলিত মার্জিত শব্দ বেছে লেখা ছড়া নয়; স্লোগান উঠবে, "খানকির ছেলে বুদ্ধ/ তোর আজকে শ্রাদ্ধ!" সেও এক ২৬শে মে ছিল, আজ ঠিক তেরো বছর পূর্ণ হলো সেই ঘটনার। একে একে বিলাস সরকার, দেবলীনা ঘোষ, অমিত চক্রবর্তী(?) ইত্যাদি বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া এককালের ছাত্ররাজনীতির রথী-মহারথীদের সাথে পরিচয় ঘটবে আমার। ২০০৬, মানে আমার আঠারো বছর বয়স। চন্দননগরের এসডিপিও তখন কল্যাণ মুখার্জী। বিলাস সরকারের হাত ভেঙেছিল, আর সিপিএমের কি ভেঙেছিল সেটা সিপিএম পাঁচ বছর বাদে বুঝেছে। আজ থেকে ঠিক চারদিন বাদে দিল্লিতে দ্বিতীয়বার শপথ নিয়ে আবারও পাঁচ বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়ে বসবে নরেন্দ্র মোদী। তারপর কি হবে জানিনা, তবে এইমুহূর্তে চিৎকার করে আবারও বলা দরকার যে জনগণের দোষ ছিল না। দোষ পার্টি নেতৃত্বর। গোটা ঘটনাটা এড়ানো যেত। ঔদ্ধত্য যখন অন্ধ করে দেয় অনেক পথই আর চোখে পড়ে না। আলোচনায় বসতে তখন ইগোতে বাধে! চাষাভুষোর সঙ্গে আবার কিসের আলোচনা! আরে, ওরা তিরিশ/ আমরা দুশো পঁয়তিরিশ!
বল বানচোদ, আজ বল! আজ ন্যাকাকান্না কাঁদছিস কেন? আজকে এসে মনে পড়ছে শূন্য থেকেই শুরু? আজ বলবি না, ওরা উনিশ/ আমরা টোটাল ফিনিশ? জনগণ অশিক্ষিত আর তোদের জ্যোতি বসু একা ফিদেল কাস্ত্রো? বুদ্ধ ভটচাজ একা মার্কেজ আর বাদবাকি সব স্বপনকুমার? সত্যি কথাটা মেনে নিতে বাধছে এখনও যে সিপিএম কমিউনিজমের মুখোশ পরা একটা ফ্যাসিস্ট পার্টিতে পরিণত হয়েছিল? হ্যাঁ, একটু নরম অন্যান্য ফ্যাসিস্টদের তুলনায়, কিন্তু ফ্যাসিস্ট! ১০০ ভাগ খাঁটি ফ্যাসিস্ট! উদ্ধত, নাকউঁচু, কানে কালা, চোখে না দেখা, ভোটবাক্স ভরানোর জন্য শিল্পপতিদের দালালি করা একটা পার্টি!
গায়ে লাগছে? সেদিন সন্ধেবেলা যখন ঝকঝকে ধুতি পরে বুদ্ধবাবু নন্দন থেকে বেরোনোর সময় মেশিনগান হাতে লোক দিয়ে ধাক্কা মেরে মেরে সামনে থেকে পাবলিক সরাচ্ছিলি তোরা তোদের সেলিব্রিটি মুখ্যমন্ত্রীর জন্য, সেদিন মাথায় রাখা উচিত ছিল, যে দেশ ওই পাবলিকের, আর ভোটও ওই পাবলিকেরই। মেশিনারী যেদিন ফেল করবে তোদের কেউ খুঁজে পাবে না বাংলায়। লাল বাংলার লাল দুর্গে কার ঠাঁই আছে আর কার নেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। খুব গায়ে লাগছে না রে আজ? এক কাজ কর বরং, ফেসবুকে ছবি দিয়ে লেখ, "সেদিনও ছিলাম, আজও আছি", বা ওইধরণের ন্যাকামার্কা কিছু। তারপর নিজেই পড় নিজে কি লিখলি। তোরা কেমন কমিউনিস্ট নিজেদের কাছেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। দেশ দাউদাউ করে জ্বলার সময় সত্যিকারের কমিউনিস্টরা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেউভেউ করে কেঁদেছে আর ন্যাকাকাব্যি মারিয়েছে এমন উদাহরণ বিশ্বের ইতিহাসে কোথাও নেই। আর আদর্শ মারাস নে বাবা, ওটা তোদের কোনোদিনই ছিল না। তোরা সব পারিবারিকভাবে কমিউনিজম ইনহেরিট করেছিস, কারণ ওটাই সহজভাবে এসেছে তোদের কাছে। তোদের বাবারা কংগ্রেস হলে তোরাও কংগ্রেসই হতিস, এতটাই বিপ্লবী তোদের অধিকাংশ। কথায় কথায় ক্যালাতিস না তোরা পাড়ায় পাড়ায় কলেজে কলেজে। ক্ষমতার আস্ফালন করতিস না উঠতে বসতে? ঠিক সেইজন্যেই একবার সিস্টেম ফেল করতেই তোদের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের পুর বানিয়ে পিসিমা চপ ভেজে দিয়েছে। এবার হনুমানে পকোড়া বানাবে। বাঁচতে চাইলে ভয় পাওয়া বন্ধ কর। রাস্তায় বেরো। ভরাডুবির পর চারদিন কাটতে চললো, এখনও একটাও মিছিল হলো না জানান দিতে যে তোরা সত্যি সত্যিই মিলিয়ে যাসনি। পাবলিককে পরে জ্ঞান দিবি, আগে নিজেরা বিশ্বাস করতে শেখ যে রাস্তাই একমাত্র রাস্তা!
(চলবে)
পর্ব ৪: তোমার নাম আমার নাম

বুদ্ধবাবু ছিলেন ভালো। বলেছিলেন মাওবাদী পার্টিকে নিষিদ্ধ করবেন না, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবেন। বুদ্ধবাবু আরও বলেছিলেন, মাওবাদীরা হত্যার রাজনীতি করে। হা হা! মজাদার! আমার এখন প্রায় একত্রিশ বছর বয়স। এই একত্রিশ বছরে আমার তো মনে পরে না আমি ভারতবর্ষের কোনো রাজনৈতিক দলকে হত্যার রাজনীতি ছাড়া আর অন্য কোনো ধরণের রাজনীতি করতে দেখেছি বলে। জ্যোতি বাবুর ভাষায় "রোদে পোড়া, জলে ভেজা" যে রাজনীতি ভারতবর্ষে চলে তার অন্যতম শক্তিশালী একটি স্তম্ভের নাম হত্যা। চলার পথে পায়ের সামনে কাঁটা থাকলে কাঁটা তুলে ফেলাই নিয়ম। প্রথমে ভয় দেখাও, তারপর মারধর করো, হাজত-ফাজত দেখাও, শুধরে গেলে ভালো; তারপরও যদি ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই করেছে তো... স্থানীয় দুষ্কৃতীদের ভাগবাঁটোয়ারা নিয়ে বিবাদ তো চলতেই থাকে; এর সাথে পার্টির কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনীতির স্বরূপ এটাই, আমরা শহুরে বাবুরা দু'পেগ স্কচ ডাউন করে যেরকমটা ভাবি সেটা নয়। এটা যে পার্টিই আসবে করবে, করতে বাধ্য। আমরা অবশ্য এইসব কাঁচড়ার অনেক ওপরে থাকি, আমাদের গায়ে কোনো আঁচ আসার কথা নয়। আমি নিজে, অত্যন্ত বামবেষ্টিত পরিবেশে বড় হয়েও, অন্তত তিনজনকে চিনতাম যাদের কোনো না কোনো আত্মীয়কে সিপিএমের লোকেরা পিটিয়ে বা গুলি করে মেরে ফেলেছিলো। তাদের মধ্যে একজনের জন্য নিজেরাই শহীদ বেদীও বানিয়ে দিয়েছিলো আবার ওই পাড়াতেই। এগুলো সবকটাই আশির শেষ এবং নব্বই দশকের ঘটনা। রাজনীতি এক আজব চিড়িয়া, সাধারণের বোধের অতীত। আমার নিজের এক বামকর্মী পিসেমশাইকেই সামান্য চাকরির রিক্রুটমেন্ট নিয়ে মতানৈক্যের জন্য এমন মেরেছিলো যে ডাক্তার বাহাত্তর ঘন্টা সময় দিয়ে দেয়। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে পিশান কংগ্রেসে যোগ দেয়, পরবর্তীতে তৃণমূল। তবে কিনা হত্যার রাজনীতি শুধু মাওবাদীরাই করে, আর কেউ করে না; কংগ্রেস করে না, তৃণমূল করে না, বিজেপি করে না, আর সিপিএম-এর তো প্রশ্নই ওঠে না! ওরা তো বিরোধী খুঁজে খুঁজে বাড়ি বয়ে গিয়ে নেরুদার কবিতা শুনিয়ে আসতো, মূর্খ জনগণই যা বুঝলো না!

"দোসরা ডিসেম্বর
রাজা বাঁদরগুলোর গায়ে রবারের বল ছুঁড়ে মজা দেখছেন
দে ওই বাঁদিকে কোণে দাঁড়িয়ে দাঁত খিঁচোচ্ছে ওই ব্যাটার
মাথা ফাটিয়ে দে
রাজা জানেন বাঁদরের রক্ত আর পুলিশের রক্তে ফারাক
বাঁদরের রক্ত লাল আসলে এক রাষ্ট্রীয় মিথ্যা..."

গোটাটা মনে নেই। কবীর সুমন, জয় গোস্বামীদের সাথে এক প্রতিবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল কবিতাটা। আমার ক্ষুদ্র লিটলম্যাগপ্রধান সাহিত্যজীবনে সে কি কম গর্বের কথা! ক'দিনই বা লিখছি তখন! সেদিনই বুঝে গেছিলাম যে আমি বড় হলে লেজেন্ড হবো, কেউ ঠেকাতে পারবে না! আসলে প্রতিক্রিয়া হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। সেই প্রথম টিভিস্ক্রিনে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দেখছি আমরা। পুলিশকে টিয়ার গ্যাস রাবার বুলেট ছুঁড়তে দেখছি। দেখছি চেঁচিয়ে কাঁচা কাঁচা খিস্তি করতে করতে লাঠি তুলে তেড়ে যাচ্ছে চাষীদের দিকে। ঘন্টার পর ঘন্টা চলছে তান্ডব। মানুষ পালাচ্ছে, যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে, তাড়া করে করে মারছে পুলিশ। সহ্য হয়নি! তখন "অন্য কলকাতা" আর "স্ফুলিঙ্গ" নামে দুটো পত্রিকার সাথে যুক্ত আমরা। নাম থেকেই আশা করি বোঝা যাচ্ছে যে দুটোর পেছনেই মাওবাদীদের অল্পবিস্তর মদত বা সমর্থন ছিল। সজ্জনদের জন্য আবারও মনে করিয়ে দিই যে তখনও সিপিআই (মাওবাদী) এরাজ্যে নিষিদ্ধ ছিল না, কাজেই এই বক্তব্যের রেফারেন্স টেনে আমাকে ১২৪এ খাওয়ানো যাবে না, খাওয়াতে গেলে কপিগুলো জোগাড় করতে হবে আর সেটা যদি কেউ করে উঠতে পারেন এত বছর বাদে তাহলে স্যার আপনিই আমার এযাবৎ সমস্ত কাজকর্মের সবচেয়ে বড় ফ্যান! আপনার জন্য খেয়ে নেবো, চাপ নেই! তবে কিনা এই অতিরিক্ত উৎসাহটা আপনি মানুষের মঙ্গলসাধনের উদ্দেশ্যেও কাজে লাগাতে পারেন, চয়েস আপনার। যাই হোক, "স্ফুলিঙ্গ"-র পক্ষ থেকে আমরা ঠিক করলাম একটা কনভেনশন ডাকা হবে, বিষয় শিল্পায়ন, কৃষিজমি অধিগ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় দমন। হুবহু মনে নেই, তবে এরকমই কিছু। তারিখ ১৪ই ডিসেম্বর। এরই মাঝে ডিসেম্বরের চার্ তারিখ অভিষেকদারা এজেসি বোস রোডে লেক্সাস মোটর্স্-এর শোরুম ভাঙচুর করলো কয়েকজন মিলে। আমি সেই দলে ছিলাম না। আমি সংস্কৃতিক কর্মী। আর তাছাড়া আমি কোনোদিন সরাসরি আরএসেফ বা কোনো সংগঠনেই নাম লেখাইনি যে এসব প্রোগ্রামে ডাক পাবো। আমার ধারণা ছিল ওতে আমার ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ঘটতে পারে। বাংলা ভাষায় বলতে গেলে, আমি গাঁজা বা মদ খেলে, অথবা মিটিং-এ এসে প্রেম করার বদলে প্রেম করার জন্য মিটিং-এ না এলে পার্টি বাওয়াল দিতে পারে। এরকম বন্দোবস্ত আমার মতো একজন মহান স্বাধীনচেতা শিল্পী, যে কিনা অচিরেই লেজেন্ড হবে, তার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না কোনোভাবেই। কাজেই সবজান্তা দায়িত্ব নিয়ে আমাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেও আমি ওপথ মারাইনি। তাছাড়া আমার পার্টির কর্মপদ্ধতি নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্নও ছিল, হয়তো আমার নিজের শ্রেণীচরিত্রের কারণেই। কিন্তু ছিল। সেইসব প্রশ্নের আমি কোনো ঠিকঠাক উত্তর পাইনি আমার কমরেডদের থেকে। প্রশ্নগুলিকে পুনরায় বহুদিন বাদে কোবাদ গান্ধী জেলে বসে যেসব লেখাপত্তর লিখেছিলেন তার মধ্যে খুঁজে পেয়ে আমি নিশ্চিত হই যে দোষ শালা আমার শ্রেণীচরিত্রের না, সমস্যা আছে এবং সেগুলোকে অ্যাড্রেস করা প্রয়োজন। সেটা যত তাড়াতাড়ি করা যাবে ততই মঙ্গল। এইসব কথাবার্তা যে এরকম চেপেচুপে লিখছি তার কারণ একটাই, যাঁরা জানেন তাঁরা জানেন। আর যাঁরা জানেন না, তাঁরা বাইরে থেকেই দেখুন, জানার প্রয়োজনও নেই বিশেষ। এছাড়া বলা যেতে পারে যে, কমরেডদের প্রায় প্রত্যেকেরই অল্পবিস্তর অহেতুক আলুর দোষ ছিল, এবং তাঁরা অনেকেই মারাত্মক রকমের ঢপবাজ। বস্তুত কিছু কিছু কমরেডকে তাঁদের আলুদের তাড়না এতটাই সাইকো করে তুলেছিল যে মেয়েরা না তাকালেও তাঁরা ভাবতেন যে মেয়েরা তাঁদের দিকেই তাকাচ্ছে। অথচ এরপরও সেইসব কমরেডরা মারাত্মক রকমের রক্ষণশীল ছিলেন। আমি আর শ্রীপর্ণা প্রকাশ্যে চুমু খেলে তাঁদের সমস্যা হতো। দেশবাসীর দোহাই দিতেন তাঁরা চুমু প্রতিরোধ করতে। বলতেন, মাও বলেছেন কমরেড তুমি একা একা এগিয়ে যেতে পারো না। তুমি রেলগাড়ির ইঞ্জিন, বাকি বগিগুলোকেও তোমায় সাথে টেনে নিয়ে যেতে হবে। তখন গান্ডু ভেবে পাত্তা দিতাম না। একবার তো আমি আর আরেক বন্ধু একটা গোটা দুপুর দাঁত কেলিয়েছিলাম স্বপনদার (দাসগুপ্ত, পিপলস মার্চ-এর সম্পাদক) গড়িয়া স্টেশনের কাছের ভাড়াবাড়িতে বসে। একটা বই খুঁজে পেয়েছিলাম আমরা দু'জন। চীনের বই, বাংলা অনুবাদ। সেখানে সিপিসির কমরেডদের নৈতিক স্খলনের বিবরণ দেওয়া আছে। তার মধ্যে একটা পয়েন্ট এরকম যে চীনের কমরেডরা নাকি অন্য কমরেডদের বৌদের সাথে "ঘুমোতেন" এবং এর ফলে পার্টির মধ্যে ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ নষ্ট হতো। গোটা বইটা জুড়ে জায়গায় জায়গায় "ঘুমোনো" শব্দটার ব্যবহার রয়েছে বারেবারে। যৌনতা নয়, শোওয়া নয়, একেবারে ঘুমোনো। অন্যের বউয়ের সাথে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কিভাবে পরিবেশ নষ্ট করা যায় এইটা ভেবে ভেবে আমাদের হাসি থামাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। কয়েক বছর পরে বুঝেছি পিতৃতান্ত্রিকতা কিরকম মজ্জায় ঢুকে ছিল এইসব তথাকথিত বিপ্লবীদের। এই একটা জায়গায় বোধহয় মাওবাদীরা বিজেপির থেকে ততটাও আলাদা নয়। পার্টিতে ছেলেমেয়েদের একসাথে হাত ধরে ঘোরা বারণ ছিল একটা সময় অন্যান্য কমরেডদের মনে বাজে প্রভাব পড়বে বলে। এখন কি নিয়ম জানিনা। তবে আমি যে গ্রূপটার কথা বলছিলাম সেটা পরে খুব বাজে ভাবে ভেঙে যায়। এর প্রেমিকাকে সে ভাগিয়ে নেয়, তারপর এ আবার অন্য কার একটা প্রেমিকাকে মলেস্ট করে, এইসব যাচ্ছেতাই ঘটনা। আমরা অবশ্য তার বেশ কিছুদিন আগেই দূরত্ব বাড়িয়ে নিয়েছিলাম।

যাই হোক, চব্বয় ফিরে আসি। সে বছর কবিতা উৎসব ছিল ডিসেম্বরের ছয় থেকে আট। ততদিনে রাজ্যে চটিপুলিশের আবির্ভাব ঘটে গেছে। কৃষক থেকে সাংবাদিক, যেখানে যাকে মনে হচ্ছে পেঁদিয়ে ছালচামড়া গুটিয়ে দিচ্ছে সিপিএমের পুলিশ। তা একদিকে এইসব হবে আর আরেকদিকে সুবোধ সরকার মঞ্চে উঠে "মনিপুরের মা"-র দুঃখে কেঁদে ভাসাবে সেটা তো আর হতে দেওয়া যায় না। মানে দেওয়া যায় হয়তো, কিন্তু আমার মতো উড বি লেজেন্ডের পক্ষে সেটা মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। ঠিক করলাম আট তারিখ কবিতা উৎসব চলাকালীন উৎসবের বিরোধিতা করে লিফলেট বিলি করবো। তার সঙ্গে ১৪ তারিখের কনভেনশনের প্রচারে গোটা নন্দন চত্ত্বর জুড়ে পোস্টারিং। লড়াইটা শুধু গ্রামেই নয়, লড়াই শহরেও, জনমত গঠনের লড়াই। সেই লড়াইতে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে আমাদের। কিন্তু কোথায় কি! কেউ পাত্তাই দিলো না আমার প্রস্তাবটাকে! বললো টিম দেওয়া যাবে না। দু'দিন আগে শোরুম ভাঙচুর হয়েছে, সবার পেছনে ডাবল ডাবল খোচড় লেগে রয়েছে তারপর থেকে। সবাই একসাথে উঠে গেলে কনভেনশনটাই করা যাবে না। ওটার জন্যও তো টিম দরকার! আমি বললাম টিম লাগবে না। আমি নিজের দায়িত্বে করবো। এরপর কারুর আর কিছু বলার ছিল না, ভাগ্যিস সংগঠনে নাম লেখাইনি!

ডিসেম্বরের আট তারিখ সকালবেলা শেওড়াফুলির কাছে জিটি রোডের ওপর পুলিশ সাংবাদিকদের উদ্মা ক্যালালো। আগে কখনও এতটা ক্যালায়নি। খানদুয়েক ক্যামেরা ভাঙলো, জনাছয়েক ইনজিওর্ড, তার মধ্যে দু'জন রীতিমতো বাজেভাবে, হাড়ফার ভেঙে গেছে। এদের সবাইকেই প্রায় আমি চিনতাম, কয়েকজনের সাথে আড্ডাও মেরেছি। মাথায় আগুন জ্বলে গেলো। ঝগড়া হয়ে গেলো দুজনের সাথে। একজন আমার নাট্যকার ছোটমামা যাকে সাংবাদিক নিজে "আমি মিথ্যে কথা লিখেছি" বললেও মানত না সিপিএমের কোনো দোষ থাকতে পারে, আর আরেকজন আমার সাংবাদিকতার শিক্ষক যিনি কিনা ঘটনাচক্রে তখন "আজকাল" পত্রিকার মুখ্য বার্তা সম্পাদক। "আজকাল" তখন সেইসব খবর ছাপছে যেগুলো ছাপতে কিনা "গণশক্তি"ও লজ্জা পাবে। বোঝাই যাচ্ছে কি ধরণের কথোপকথন হয়ে থাকতে পারে! সারাদিন এইসব বাওয়ালীর পর সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার সময় পরিকল্পনামাফিক আমরা চারজন অ্যাকাডেমির সামনে এসে উপস্থিত হলাম।

(চলবে)
পর্ব ৫: আমরা-ওরা

কমিউনিস্টরা আর ফ্যাসিস্টরা একে অপরকে প্রতিফলিত করে। দু'তরফেই ঐতিহাসিকভাবে কমরেড শব্দটার ব্যবহার রয়েছে; একটুও ঢপ দিচ্ছিনা, মুসোলিনি-র কয়েকটা কোটেশন ঘাঁটলেই খুঁজে পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই। আরও মজার ব্যাপার এই যে, মুসোলিনি আসলে লেনিনের অন্যতম প্রিয়পাত্র ছিলেন। লেনিন মনে করতেন মুসোলিনির নেতৃত্বে ইতালিতে কমিউনিস্টদের ক্ষমতা দখল করার সম্ভাবনা ছিল। ১৯১৪ সালে মুসোলিনিকে ইতালিয়ান সোস্যালিস্ট পার্টি থেকে বহিস্কার করা হয়। পরবর্তীতে মুসোলিনির আদর্শ বদলে যাওয়া নিয়ে লেনিন রীতিমতো আক্ষেপ প্রকাশ করেছিলেন বলে শোনা যায়। এই মুসোলিনি একদা বলেছিলেন, রাষ্ট্র আর কর্পোরেটের জোটই হচ্ছে ফ্যাসিজম। তার চেয়ে আরেকটু এগিয়ে আমরা বলতে পারি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, কর্পোরেটের টাকা, কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক শক্তি আর গণতন্ত্রের ভড়ং একজায়গায় মিশলে যেটা হয় সেটারই নাম সিপিএম। এমনিতেই কমিউনিজম ব্যাপারটা একটা আধুনিক ঈশ্বরবিহীন ধর্ম হলেও হতে পারে, আর কে না জানে যে ধর্ম জনগণের আফিম। আফিমে বুঁদ হয়ে থাকলে অনেক কিছুই টের পাওয়া যায় না। এই যেমন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রছাত্রীই এটা বোঝেন না যে খিস্তি করা বা গাঁজা খাওয়ার সঙ্গে ডিক্লাসড হয়ে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই, কিংবা চার-পাঁচ বছর সচেতনভাবে বাপমার শ্রেণীচরিত্র অস্বীকার করে প্রতিমাসে খানতিনেক মিছিলে হেঁটে বেড়ালেই কেউ পেটি বুর্জোয়া থেকে প্রলেতারিয়েত হয়ে যায় না। এইসব হলো আফিমের প্রভাব, চীনের আফিম। ধর্ম আসলে প্রথা এবং মূল্যবোধের একটা সমষ্টি ছাড়া আর কিছুই নয়। য়ুভ্যাল নোয়া হারারি কমিউনিজম-এর সাথে প্রচলিত ধর্মের মিলগুলো খুব মজাদারভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন 'সেপিয়েন্স' বইটাতে। প্রবর্তক এবং সংস্কারক থেকে ধর্মগ্রন্থ অথবা প্রতীক কিংবা ভবিষ্যদ্বাণী, বাৎসরিক উৎসব অথবা বিশেষ উদযাপনীয় দিবস, খুঁজলে সবই পাওয়া যাবে কমিউনিজমে। শুধু কমিউনিজম নয়, লিবারালিজম, ক্যাপিটালিজম, ন্যাশনালিজম এবং নাৎসীজম-কেও এইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। হারারি এই 'ধর্ম'-গুলোকে "ন্যাচারাল-ল রিলিজিয়ন" নামে ডেকেছেন। তবে এগুলোর মধ্যে কমিউনিজমের সঙ্গে অন্যান্য প্রচলিত ধর্মের একটি বিশেষ মিল আছে। সেটা হলো, কমিউনিজমে বিশ্বাসী একজন মানুষ একই সাথে অন্য কোনো ধর্মে বিশ্বাসী হতে পারেন না। মজার না?

এইটাই হলো আমার মুশকিল! এই যে এত জেনে গেছি, এই জন্যেই আমার আর কিছুই হওয়া হবে না। সেই যে সেদিন ভেবেছিলাম যে দেশ কেলিয়ে সীনে পে গোলি খা লেগা, সেদিন কেউ ঠুকে দিলে আজ আমি প্রাতঃস্মরণীয় শহীদ হয়ে থাকতাম কোনো না কোনো পার্টির কাছে। তিমিরবরণ দ্য সেকেন্ড! মনে হয় তৃণমূলই বেদীটা বানাতো। কিন্তু সেদিন যখন হয়নি, আজকে আর হচ্ছে না। চুতিয়া নই আমি! দেখে মনে হতে পারে, কিন্তু নই সত্যি সত্যিই। আমার এখন জেল হলে বাড়িতে একটা বাজার করার লোকও থাকবে না। কাজেই যে লড়াই একান্তই আমার নয়, সেটা আমি লড়তে যাবো না আজকে আর। ফেসবুকে মোদীর খিল্লি ওড়াবো যদ্দিন ওড়াতে দেয় তদ্দিন। খুব প্রতিবাদ করবো সোশ্যাল মিডিয়ায়! কিন্তু রাস্তায় জয়শ্রীরাম শুনলে ঢোঁক গিলে মেনে নেবো। কলার চেপে ধরে বলতে বললে বলেও দেব, আমি তো আর সত্যিই বিশ্বাস করিনা, কিন্তু তাই বলে মাঝরাস্তায় ক্যালানি কে খাবে! চালিয়াতি করে দু-একটা মহৎকাজ হলেও হতে পারে, কিন্তু ক্যালানি খেয়ে কোনো মহৎ কাজ হয় না। পাল্টা দিতে হয়, আর সেই পাল্টা দেওয়ার ক্ষমতা বা শিরদাঁড়ার কোনোটাই, আমার সহনাগরিকদের মতই, আমারও আজ আর নেই। সেদিন ডলারের দাম বাড়লে "দেশটাকে বেচে দিলো রে হায় হায়" বলে চেঁচামিচি জুড়তাম, আজ ডলারের দাম বাড়লে আমার ব্যক্তিগত লাভ বেশি। ডোনাল্ড ট্রাম্প দিল্লিতে বসুক, আমার বাবার কি! আমি আয়কর দিই, ট্রাম্পসাহেব যদি তার বদলে আমাকে ঠিকঠাক সার্ভিস দেন ওনাকে মেনে নিতে আমার তো অন্তত কোনো আপত্তি হবে না। সার্ভিস বলতে এমন কি আর, ভারতীয় হিসেবে আমার কতটুকুই বা দাবী! কারেন্টটা একটু কম যাক, ভালো চালডালের দাম একটু হাতের মধ্যে থাকুক, সরকারী হাসপাতাল ঘুরে না দাঁড়ালেও চলবে, বেসরকারীতে যেন অন্তত খরচটা একটু কম হয়, বৃষ্টিতে রাস্তাঘাটে জল একটু কম জমুক, একটু ঝকঝকে থাকুক রাস্তাঘাট, এইসবই তো! আর প্রকাশ্যে আমার চোখের সামনে বাপু যেন কোনো ভায়োলেন্স না ঘটে। হ্যাঁ, আর ওই রাতবিরেতে অন্তত শহরাঞ্চলে মেয়েদের নিরাপত্তার ব্যাপারটা! এইরকম টুকটাক। এইটুকু ব্রিটিশও যদি ফিরে এসে দিতে পারে গভর্নিংটা ওদেরকেই আউটসোর্স করে দেব না হয়! একটু খেয়েপরে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে শান্তিতে থাকতে চাই, এমন কি আর চেয়েছি। এইটুকু তো করাই যায়! বস্তির মানুষ, গ্রামের মানুষ সত্যিই ভালো আছে কিনা সেসব তো আমি আর গিয়ে দেখতে যাচ্ছি না। মাসে দু'বার মাইক নিয়ে হেঁকে গেলেই হবে, যা বলবে মেনে নেবো নির্দ্বিধায়! এছাড়া আর তো কোনো উপায় দেখছি না। কারণ শেষ অবধি আমরা সবাই লিডারদের দোষ দেব, কেউ লিডার হবো না। ঠিকই আছে! লড়াইটা কি মধ্যবিত্তের নাকি যে মধ্যবিত্ত লড়বে? শ্রমিকের নেতৃত্বে কৃষকের লড়ার কথা তো! আমি বাল না শ্রমিক না কৃষক, লাউয়ের মাচায় বেগুন হয়ে ফুটে আমার লাভ আছে? রেজ্জাক মোল্লা বলেছিলো পার্টিতে ঘামের গন্ধওলা লোক কমে গেছে। আর আজ এই আমি যদি মাসে দু'বোতল পার্ক অ্যাভিনিউ-র ডিও শেষ করে বিপ্লবে নেতৃত্ব দেব ভাবি তাইলেই কাম সারসে আর কি! কোনো লড়াই-টরাইতে আমি তো অন্তত আর যাচ্ছি না! দশ-বারো বছরের ছোট কেউ যদি যায় তার প্রতি পূর্ণ সমর্থন রইলো।

সেদিন যা যা রটেছিল তার সবটাই ঘটেছিলো কিনা আমার সত্যিই জানা নেই। যেমন তাপসী মালিকের ঘটনাটা, ১৮ই ডিসেম্বর সম্ভবত; ওই ঘটনার সত্যাসত্য বিচার করা অসম্ভব। সকাল ৬টা নাগাদ গ্রামবাসীরা আগুন জ্বলতে দেখে দৌড়ে গিয়েছিলো বলে জানা যায়। তার আগে ঠিক কি ঘটেছিলো কেউই জানতো না। এরকম হতেই পারে যে আমরা যা দেখতে চেয়েছিলাম তাই আমাদের দেখানো হয়েছিল। হতেই পারে যে সিপিএমের সাথে ওই ঘটনাটার কোনো সম্পর্ক ছিল না। সিপিএম বেকার কেস খেয়ে যাবো গন্ডগোল বেড়ে যাবে এইসব ভেবে চেপে দিতে গিয়ে আরও বড় কেস খেয়ে গেছে। সম্ভাবনার কথা বলছি, নিশ্চিত কিছু নয়। যেমন সুলতানার কথা যদি ধরি, ওই সময় গড়িয়া অঞ্চলে একটা শক্তিশালী বিরোধী পার্টির উপস্থিতি থাকলে ঘটনা অন্যরকম হতেই পারতো। তাপসী মালিকের দেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রমান লোপাট করার জন্য, আর সুলতানার দেহের নিচের অংশ ট্রাক জাতীয় ভারী কিছু দিয়ে পিষে দেওয়া হয়। তাপসী-র ঘটনায় মিডিয়া হামলে পড়েছিল, আর সুলতানার ঘটনা যতটা সম্ভব চেপে দেওয়া হয়। আবার তাপসী আসলে কে ছিল সেই বিবরণও সময়ে সময়ে বদলে গেছে। প্রথমে জানা গিয়েছিলো তাপসীর বাবা জমি দিতে অনিচ্ছুক একজন কৃষক। তারপর জানা গেলো তিনি ভাগচাষি। তারপর জানা গেলো তাপসী কৃষিজমি রক্ষা কমিটির সক্রিয় সদস্য। তারও পর জানা যায় যে তাপসী আসলে কমিটির কনিষ্ঠতম এবং অত্যন্ত সক্রিয় একজন অর্গানাইজার ছিল। তাপসী কে ছিল আসলে তাপসীই জানতো বোধহয় একমাত্র। পরে প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া গেছিলো কিনা, বা পাওয়া গিয়ে থাকলেও তারা প্ৰকৃতই প্রত্যক্ষদর্শী না সাজানো সেসব আমার আর জানা নেই। তবে ঘটনাটা অনেক মানুষকে নাড়া দেয় কারণ তাপসীর বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। তখন কি ছাই আমিও এত ভেবেছি? আমি তখন বব ডিলান শুনছিলাম, "I met a young woman whose body was burning"... আমাদের যা যা খারাপ হয় তার সবকিছুর মূলে তো ওরাই থাকে সবসময়; বা না থাকলেও অন্তত সেরকমই তো বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়।

শিল্প হলে ভালো হবে না খারাপ হবে সেটা নিয়ে দ্বিমত ছিল অবশ্যই, কিন্তু তার চেয়েও বড় সমস্যা ছিল শিল্প আনার পদ্ধতি নিয়ে। সিঙ্গুরের পঞ্চায়েত কর্মীদের সঙ্গে আমি নিজে কথা বলেছি সেই সময়। লিস্টটা খুব হঠাৎ করেই টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছিল, জনে-জনে বোঝানো তো পরের কথা, পঞ্চায়েত স্তরে সরকারের তরফে যথেষ্ট প্রচার করার সময়ই পাওয়া যায়নি। তারপর লাঠি দিয়ে গুঁতিয়ে সবাইকে লাইনে আনার চেষ্টা শুরু হয়। খুব তাড়া ছিল বুদ্ধবাবুর শিল্প করার। টাটারা যা যা চেয়েছিলো, রেডিমেড সড়ক থেকে সস্তায় জলের যোগান, সবকিছুর উপযুক্ত ব্যবস্থা করে উর্বর কৃষিজমি ওদের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন উনি। গোটা প্রজেক্ট এরিয়াতে একমাত্র একটা অঞ্চলে কিছুটা বন্ধ্যা জমি ছিল, নাম মনে নেই এখন। বাদবাকি সব দো-ফসলী চার-ফসলী জমি। প্রয়োজনে বিক্ষুব্ধ সবাইকে বিরোধী এবং প্রতিক্রিয়াশীল বলে দেগে দিতেও উনি পিছপা হননি। ফল যা হওয়ার ছিল তাই হয়েছে।
হিরোপক্ষ আর ভিলেনপক্ষ, আমরা আর ওরা; এখন কে হিরো আর কে ভিলেন সেটা নির্ভর করছে কে কোনদিক থেকে দেখছে তার ওপর। গোটা ব্যাপারটাই কাল্পনিক। আমি নিজের চোখ দিয়ে দেখছিলাম, তখনও আমি নিজেকে কমিউনিস্ট ভাবি, সর্বহারার পক্ষের লোক। এখনও কি ভাবিনা কিছুটা? জানি ভাঁওতাবাজি, তবু নিজেকে নির্বিবাদে বুর্জোয়া বলে মেনে নিতে ক'টা বাঙালীই বা পারে!

(চলবে)
পর্ব ৬: হিন্দু খতরে মে হ্যায়

জনিদা হিরো ছিল। এটা আমার একার কথা নয়, যাকে জিজ্ঞেস করবেন সেই বলবে, হ্যাঁ, বুকের পাটা ছিল বটে জনিদার। জনিদাকে তখনও আমি নিজের চোখে দেখিনি, কেউ কেউ দেখেছিলো, তাদের থেকেই শোনা। অবশ্য ঘটনাটা ঘটতে কে বা কারা দেখেছিলো আমার জানা নেই। আমি যাদের থেকে শুনেছি তারাও কোথাও না কোথাও শুনেছিলো যে এরকমটা ঘটেছে। একটু রাতের দিকের ব্যাপার তো, খুব বেশি লোক ছিল না ফলত রাস্তায়। যে ক'জন প্রত্যক্ষদর্শী ছিল তাদের মনের ওপর ঘটনাটা এমন ইম্প্যাক্ট ফেলেছিলো যে তারপর লোকমুখে ছড়াতে ছড়াতে জনিদা একটা ব্যাপার হয়ে যায়। ব্যাপার মানে রীতিমতো ব্যাপার, যেন তিরঙ্গা-র ব্রিগেডিয়ার সূর্যদেব সিং; না তলোয়ার কি ধার সে, না গোলিয়োঁ কি বৌছার সে টাইপ!
সালটা বোধহয় ২০০০ কিংবা ২০০১ হবে, মহরমের তাজিয়া নিয়ে যাওয়ার সময় কোনো এক অত্যুৎসাহী মুসলিম যুবক পেয়ারাবাগান সংলগ্ন অঞ্চলে ঝুলতে থাকা ভারতবর্ষের একটি জাতীয় পতাকা সোর্ড চালিয়ে নামিয়ে দেয়। পতাকাটা খুবই নিচু কোনো পোলে টাঙানো ছিল নাকি ছেলেটি উঁচু পোল বেয়ে উঠেছিল সেসব আমার জানা নেই। প্রশ্ন করে জানার ইচ্ছেও হয়নি, কারণ এরপরেরটা শুনে আমি ছিটকে গেছিলাম। যেরকম শোনা যায়, জনিদা তখন ওই এলাকাতেই কোনো সিগারেটের দোকানে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলো। গোটা ঘটনাটাই জনিদার চোখের সামনে ঘটে। তারপর জনিদা একা "হোয়ে হোয়ে হোয়ে" বলতে বলতে এগিয়ে যায় মিছিলের দিকে। মিছিলে থাকা বয়স্ক লোকেরা তাকে নিরস্ত করার জন্য বলে, "ছেড়ে দিন, বাচ্চা ছেলে, ভুল করে ফেলেছে।" কিন্তু জনিদা ছাড়েনি। ছেলেটিকে মাটিতে পরে থাকা ওই জাতীয় পতাকার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে বলতে বাধ্য করে, "মা, ক্ষমা করে দাও মা, ভুল হয়ে গেছে!" ছেলেটিকে মারধর অবশ্য করেনি জনিদা। দু'ঘা দিতেই পারতো, কিন্তু দেয়নি। শুধু ছেড়ে দেওয়ার আগে বলেছিলো "মনে রাখবি, যে দেশে থাকিস সেই দেশ তোর সবচেয়ে বড় মা! দেশকে অসম্মান করবি না কখনও!"

উপরের বিবরণ থেকে মোটের ওপর তিন ধরণের সিদ্ধান্তে আসা যায় ---
১) জনিদা সুপারম্যান, এবং তাজিয়া নিয়ে বেরোনো লোকগুলো সেটা জানতো, তাই লাগতে যায় নি!
২) মিছিলের লোকগুলো সহনশীল ছিল এবং তারা ছেলেটির ওই পতাকা নামানোর কাজটাকে মন থেকে সমর্থন করেনি।
৩) গোটাটাই ঢপ, হয় জনিদা নিজে আর নয়তো অন্য কেউ চেলেছিলো, জনিদাকে বাচ্চাদের চোখে হিরো বানাবে বলে।
কি ঘটেছিলো সেটা ইম্পরট্যান্ট নয়, ইম্পরট্যান্ট ব্যাপার যে জনিদাকে কিন্তু বাচ্চারা হিরোই মনে করতো। টুইটারের আগের যুগে জনিদাই সেই @রাষ্ট্রীয়ওয়ারিয়র৯৯৯, রক্তমাংসের। মনে রাখতে হবে, ২০০০ বা ২০০১-এর পেয়ারাবাগান মানে সিপিএমের ঘাঁটি, এলাকার শেষ কথা অনিল বসু। তবে অতদূর যাওয়ার আগেই ক্যাচাল সামলে গেছিলো। এইভাবেই সামলে যেত ক্যাচালগুলো, স্ট্যান্ডিং ইন্সট্রাকশন কিছু থেকে থাকবে হয়তো। বিরোধীও ছিল না সেরকম যে খুঁচিয়ে বাওয়াল বাধাবে। যে কটা পার্টির প্রভাব ছিল জনগণের ওপর তাদের সবার অ্যাজেন্ডাতেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ব্যাপারটা কমন ছিল। যে দু-একটা ঘটনা নিতান্তই সামলানো যেত না, সেগুলোর খবর চেপে দেওয়া হতো। এখন আর ওইভাবে খবর চাপা যায় না, ফেসবুকে ভিডিও চলে আসে। কিছু লোক তো আবার এতটাই অত্যুৎসাহী যে চেনা লোকদের ফোন করে "আরে এখানে তো দাঙ্গা হচ্ছে" বলে খোশগল্প জোড়ে। যেন একটা রগরগে বিষয় পেয়েছে আলোচনার, তিন-চারজনের সাথে ডিসকাস না করলে দিনটাই মাটি! সে আমলে মোবাইল ছিল না এত। কি হয়েছে কবে হয়েছে এসব স্থানীয় লোকজন ছাড়া কেউ জানতো না। এই যেমন জনিদারটা চুঁচড়োর ঘটনা, যদি সত্যি সত্যি ঘটেই থাকে আট কিলোমিটার দূরে আমাদের ব্যান্ডেল অবধি কিন্তু খবর পৌঁছয়নি সেভাবে। আমি চুঁচড়োয় স্কুলে পড়তে যেতাম বলে জেনেছি। আর এখন হলে হোয়াটস্যাপ-এ ফরোয়ার্ড হয়ে যাবে, মুসলিম সন্ত্রাসবাদী আর হিন্দু বীর-এর কাহিনী। ঠিকই আছে! একটা সময় মাস-দু'মাস অপেক্ষা করতে হতো "আমরা ভালো আছি, তোমরা কেমন আছো" এইটুকু বলার জন্য। তাও সব চিঠি সবসময় যে পৌঁছবেই তারও গ্যারান্টি ছিল না কোনও! একটু পয়সাওয়ালাদের ঘরে অবশ্য টেলিফোন ছিল, কিন্তু সেও তথৈবচ। ব্যান্ডেল থেকে গুপ্তিপাড়া ফোন করতে এসটিডি চার্জ লাগতো, আর বহরমপুরে ফোন করলে তো মনে হতো আন্দামান থেকে সমুদ্র পেরিয়ে আওয়াজ ভেসে আসছে। তারপর সবকিছু খুব তাড়াতাড়ি পাল্টে গেলো। প্রথমে ইন্টারনেট এলো পাড়ার সাইবার ক্যাফেগুলোর হাত ধরে। সেখান থেকে ঘরে ঢুকে এলো ২৫৬ কেবিপিএস ডায়াল আপ কানেকশন। তদ্দিনে হাতে হাতে মোবাইল উঠতে শুরু করে দিয়েছে স্পাইস, কম্যান্ড, এয়ারটেল আর হাচ-এর হাত ধরে। তারপর কোয়ার্টি কিপ্যাড হয়ে সোজা স্মার্টফোন! মোবাইলে ইন্টারনেট থেকে ফেসবুক, থ্রিজি, ফোরজি, হোয়াটস্যাপ গোটা ব্যাপারটাই ঘটে গেলো একটা দশকেরও কম সময়ে! মানুষ কি করবে? নিকষ অন্ধকারে হঠাৎ চোখ থেকে দশফুট দূরে গোটা একটা নক্ষত্র জ্বলে উঠলে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। আর একটা নির্বোধ লোমশ বাঁদরকে জ্বলজ্বলে মুক্তোর স্তুপের ওপর ছেড়ে দিলে দু-একটা সে গিলবে না তাও কি কখনও হয়! গলায় তো আটকাবেই, না আটকালেই বরং আশ্চর্য হতাম!

- তুই তাজিয়া নিয়ে যাচ্ছিস যা, এসব বাড়াবাড়ি করার কি আছে! দেশের পতাকা কেটে নামাবি তাই বলে?
- যে দেশে থাকে সেই দেশকেই অসম্মান করতে কি করে পারে কে জানে বাবা!
- ও মালগুলো ওরকমই!
এই পয়েন্টে সবাই সেদিন সহমত হয়েছিলাম আমরা, যে ওই মালগুলো ওরকমই! কেন হয়েছিলাম কে জানে! মুসলিম বন্ধু কি ছিল না আমাদের কারো? আমার তো ছিল! আমি উচ্চবর্ণের হিন্দু পরিবারে জন্মেছি, কাশ্যপগোত্রীয় ব্রাহ্মণ, আসল পদবী চট্টোপাধ্যায়। ত্রিপুরার রাজারা আমাদের রায়মহাশয় উপাধি দিয়েছিলেন। যদিও এসব আমি ছোটবেলায় জানতাম না। নার্সারি স্কুলে প্রথম শুনি যে ধর্ম বলে একটা ব্যাপার হয় এবং হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান ইত্যাদি অনেক ধর্মের লোক ভারতবর্ষে থাকে মিলেমিশে। আমি জানতাম না যে আমি হিন্দু পরিবারে জন্মেছি; মানে জন্মে গেছি, এখন আর কিছু করার নেই! আমার বরং বৌদ্ধ আর খ্রীস্টান নামদুটো বেশি পছন্দের ছিল। বাড়ি ফিরে শানের মেঝের ওপর পাতা মাদুরে পাশাপাশি শুয়ে মা'কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "মা, আমরা কি বৌদ্ধ?" মা বলেছিলো, না, আমরা হিন্দু। পছন্দ হয়নি। কিরকম যেন হিং হিং গন্ধ শব্দটায়, ঠিক স্মার্ট নয়। খ্রীস্টানের মধ্যে বরং একটা টান-টান এফেক্ট আছে, হিন্দুতে সেটা নেই একেবারেই। এসব তিন বছর বয়সের আগের কথা, তখনও আমরা কেওটা লাটবাগানের ভাড়াবাড়িতে থাকি। তারপর ডানলপ এস্টেটে এসে প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে আগামী কয়েকবছর আমার সবচেয়ে প্রিয় দুটো বন্ধুর নাম হবে হানিফ আলী আর আজিমুদ্দিন। কম ঈদ সাঁটাইনি ঈশ্বরবাহা অথবা সাহাগঞ্জ কাঁসারীপাড়ায়। তখন ঈশ্বরবাহায় ঈদের দিন গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার চল ছিল, একটাকা পাওয়া যেত তাতে। সেইসব একটাকাগুলো কাঠি আইসক্রীম খেতে আর বন্দুক দিয়ে বেলুন ফাটাতে কাজে আসতো। পরোটা মাংস খেয়ে আইসক্রিম খেয়ে জিভ লাল করে বসে থাকতাম। আজ হুগলীতেও হিন্দু মৌলবাদী পার্টির রাজনৈতিক উত্থানের মধ্য দিয়ে সেইসব দিনগুলো অনেক দূরে চলে গেলো!

এই ঈশ্বরবাহাতেই প্রথম দেখেছিলাম একটা কালার টিভি ঘিরে গোটা পাড়ার ভীড় ভেঙে পড়তে। ভারতের খেলা ছিল, ৯৯-এর ক্রিকেট বিশ্বকাপ। শচীন আউট হলে ঈশ্বরবাহাকেও একইভাবে দুঃখ পেতে দেখেছি। তারপরও সেদিন মেনে নিতে বাধেনি যে ওই মালগুলো ওরকমই। আসলে ওদেরকে যখন আমরা ওরা বলে চিহ্নিত করি, খুব জরুরি হয়ে পরে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের সাথে ওদেরকে এক করে ভাবা। নাহলে ওদের পুরোপুরি ওরা করে দেওয়ার প্রসেসটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ওরা তাই যা আমরা নই। কাজেই আমরা খুব ভারতীয় হলে ওরা ভারতবিরোধী হতে বাধ্য, আমরা ধর্মনিরপেক্ষ হলে ওরা মৌলবাদী, আমরা প্রগতিশীল হলে ওরা প্রতিক্রিয়াশীল। এইধরণের যেকোনো বিভাজনরেখা টানা হয় প্রাথমিক কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে, তারপর দাগবরাবর তুলে দেওয়া হয় দেওয়াল। দেওয়ালের ওপাশে কি আছে না আছে উঁকি দিয়ে দেখার দায় এড়িয়ে থাকা যায় তাতে। ওরা সবাই একরকম, কারণ ওরা দেওয়ালের ওপাশে থাকে। ওরা আমাদের মতো নয়, আর আমাদের একবার হাতে পেলে ওরা ছেড়ে দেবে না, কাজেই ওদের কথা যত না শোনা যায় ততই ভালো। এইভাবে এক সেলফ-ইম্পোজড অন্ধত্বের ভরসায় আমরা 'আমরা' হয়ে উঠি।আর আমরা তো শুধু আমাদের বিপদের কথাই বলবো।

ঈশ্বরবাহায় কোনোদিন কারো চোখের দিকে তাকিয়ে আমি কোনো খতরা মেহসুস করিনি, কিন্তু হিন্দু ডেফিনিটলি খতরায় আছে। বাঙালি যেমন যেদিন ভাঙা ভাঙা ইংরিজিতে মাইনে বাড়ানোর জন্য মর্নিং ইভনিং টোয়েন্টি লিভস ফল মাই হাউস লিটল পে হাউ ম্যানেজ বলছিলো সেদিন তার জাতিসত্বা আহত হয়নি, আজ এয়ারপোর্টে হিন্দি শুনলে ব্যোমকে যায়! বস্তুত যেখানে যেখানে আমরা ওদেরকে 'ওরা' বলে চিহ্নিত করার মাধ্যমে 'আমরা' হয়ে উঠেছি সেখানেই আবিষ্কৃত হয়েছে নিত্যনতুন খতরা। 'এ মালটা আমাদের মতো নয় কেন' --- এই হলো সেই খতরার আদি-অকৃত্রিম রূপ।
(চলবে)
পর্ব ১০: কচি ঘাসে দুটি ফুল

আজ আমি প্রায় সারাদিন ধরে লিখছি বলা চলে। এরপরও যদি বিপ্লব না হয় আমার কিছু করার নেই। প্রথমেই সেই অমোঘ প্রশ্নের উত্তর দিয়ে ফেলা যাক, যে পর্ব ৬ লেখার পর হপ্তাদুয়েক ঘাপটি মেরে থেকে আজ হঠাৎ ফিরে এসে আমি পর্ব ১০ লিখতে বসলাম কেন! জানিয়ে রাখা যাক যে এসব পরিকল্পনা অনুযায়ী হচ্ছে না, নিয়তিদেবী করিয়ে নিচ্ছেন। হয়েছে কি, আমি "পর্ব ৭" লিখছিলাম দুপুর থেকে সন্ধ্যে অবধি, সেটা পোস্ট করতে গিয়ে উড়ে গেলো। তারপর ঘন্টাদুয়েক বাদে মনের জোর সংগ্রহ করে এসে "পর্ব ৭ অথবা ৮" নাম দিয়ে লিখতে গেলাম, সেটাও তলিয়ে গেলো সার্ভারের গর্ভে। তারপর ভাবলাম "পর্ব ৭ অথবা ৮ অথবা ৯" নাম দিয়ে লেখার চেয়ে বরং একেবারে "পর্ব ১০" লিখে রাউন্ড ফিগার করে দিই, তাতে যদি ফাঁড়া কাটে! শনিবারের বারবেলা যাকে বলে আর কি! এবার যদি এটাও পোস্ট করার আগে উড়ে যায়, মাইরি বলছি, আর কোনোদিন বিপ্লব করতে যাবো না। আর তাতে যে অপূরণীয় সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষতি হয়ে যাবে দেশের তার জন্য এক এবং একমাত্র গুরুচন্ডা৯-র ওয়েবসাইটই দায়ী থাকবে। প্রতিক্রিয়াশীল সাম্রাজ্যবাদী ওয়েবসাইট একখানা!

শেষ পর্বটা ঠিক সেরকম জমেনি। জানি। সব পর্ব সেরকম জমবেই এমনও ধরে নেওয়ার কোনো কারণ দেখি না। ব্লগ লিখছি, গীতাঞ্জলি লিখতে বসিনি যে সব সময় নোবেল পাওয়ার লেভেলে এফোর্ট দিতে যাবো। লেখাটা শুরু করেছিলাম কারণ টাটকা টাটকা বিজেপি ফের জিতে যাওয়ার খবরে মারাত্মক রাগ হচ্ছিলো। তায় আবার বাংলায় অতগুলো সিট্! কিন্তু এখন আর অত রাগ হচ্ছে না, নিতান্ত মাথার ব্যায়াম হবে বলেই লিখছি। শেষ কি লিখছিলাম হালকা হালকা মনে আছে, বিশদে মনে নেই। রাগের একটা টুইস্টেড বহিঃপ্রকাশ ঘটছিলো সিপিএমকে খিস্তি করে। আর তাতে পাবলিকের বেশ মনোরঞ্জন হচ্ছিলো খেয়াল আছে। এই পাবলিকের মনোরঞ্জনই হলো আসল কথা, সে তুমি সমরেশ মজুমদারের মতো গোলগল্পে ন্যারেটিভের বাইজি নাচই দেখাও আর সুবিমল মিশ্র-র মতো কলামে কলামে জাক্সটাপোজিয়ে একা একা প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার জিল ব্রালটার হয়েই ঘোরো, হাততালির আওয়াজই হলো পপুলারিটির উৎস। অর্থাৎ কিনা, পাবলিকের উৎসাহই হলো সেই বস্তু যা লেখক থেকে প্রকাশনা সবকিছুকেই মহান বানায়। এবং নাচটা সমস্ত লেখকই নেচে থাকেন, কেউ মাধুরী দিক্ষীতের মতো "মার্ ডালা, মার্ ডালা" করে এগিয়ে আসেন প্রকাশ্যে তো কেউ জম্পেস ব্রেক ড্যান্স দিতে দিতে বলেন "ওরা নাচছে, আমি কিন্তু আসলে নাচছিনা"; যার যার নিজের নাচার কায়দা এসব। আমিও নাচবো, নাচবো বলেই লিখতে বসেছি। একজন বাঙালী লেখকের আর কিই বা করার থাকতে পারে নাচ দেখানো ছাড়া কম্পিটিশন যেখানে স্মার্টফোনে স্ট্রিম হতে থাকা ক্রিকেট বিশ্বকাপের সঙ্গেও। তবে কিনা এই ম্যাচিওরিটি আমার বাচ্চা বয়সে ছিল না। তখন নিজেকে হেবি ঋত্ত্বিক ঘটক ভাবতুম। এত শক্ত ভাষায় ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে লেখার অভ্যাস ছিল যে রাজনীতিতে পরিপক্ক অভিজ্ঞ দাদারা বলেই দিয়েছিলো, "ভাষা সরল না করলে ছাত্ররাজনীতিতে পপুলার হওয়া যাবে না।" তাই আমি পপুলার হইনি। সিনেমা বানাতে গেছি সেও শেষ করতে পারিনি। করবো কি করে, আমার রাজনীতিতে পরিপক্ক অভিজ্ঞ দাদারা আমার কাজের মধ্যে রাজনীতি দেখেননি কিনা! তাই তাঁরা সেসব নিয়ে কাউকে কিছু বলতেও যাননি। রাজনীতি মানে তো হরিপুর আর লালগড় নিয়ে দেখার অযোগ্য ডকুমেন্টারি বানানো, যেখানে প্রোপ্যাগান্ডার নিচে আন্ডারলাইন করে দেওয়া থাকবে। হিমাচল প্রদেশ থেকে কোচি অবধি মূলধারার সংবাদপত্রগুলো লিখে ফেলার পরও কোনো লিটিল ম্যাগাজিনের দাদা প্রয়োজন মনে করেননি নিজের পত্রিকায় দু'লাইন লিখে দেওয়ার। কারণ প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা মানেও ওই আনন্দবাজার আর সুনীল গাঙ্গুলিকে গালাগাল করাই মূলত। ওইটে না থাকলে বোধহয় জাত চেনা যায় না, কনফিউজিং লাগে। যাক গে, থাক সেসব কথা। একেকবার লিখতে যাচ্ছি লেখা একেকদিকে চলে যাচ্ছে। এই বিষয়টা নিয়ে ঝাঁপি খুলে বসলে উপন্যাস নেমে যাবে। আর তাহলেই যেটা বলতে এসেছিলাম আর বলা হবে না।

হয়েছে কি, শেষ পর্বটা মনে হয় সিপিএমকে খিস্তি না করার ফলেই সেরকম জমেনি। আসলে করার জায়গাও ছিল না সেরকম। বিজেপিকে হয়তো করা যেত কিছুটা, কিন্তু গত পাঁচবছরে ওদের এত খিস্তি করেছি যে নিজেরই বোর লাগে এখন। দেখা যাক, কবে মুড্ হয় আবার। তবে চিন্তার কিছু নেই, যাঁরা সিপিএমকে খিস্তি করতে দেখে মজা পাচ্ছিলেন তাঁদের জানানো থাক যে এখনও ঝোলার ভেতর অনেক বড় বড় হুলো আছে। ভুলে গেলে চলবে না যে আমি কিন্তু এখনও ২০০৬ সালের সেই কবিতা উৎসব চলাকালীন নন্দন চত্বরের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছি নিজেকে। ঠিক সময়ে ফিরে আসা যাবে সেখানে। বস্তুত সিপিএম হচ্ছে আমার সবচেয়ে কাছ থেকে দেখা ফ্যাসিস্ট পার্টি, সম্ভবত আপনারও তাই। ফলে যখনই যেখানে ফ্যাসিজমের ভূত দেখা যাবে, মূল বিষয়ে আসার আগে আমি সিপিএমকে একবার না একবার খিস্তি করবোই করবো। এ হলো সেই, সব পুজোর আগেই গণেশ না নারায়ণ কিসের যেন একটা পুজো দেওয়া হয় না, সেরকম ব্যাপার। এর আরও একটা দিক আছে অবশ্যই। তবে সেটা বললে সিপিএম সমর্থকদের বার খেয়ে যাওয়ার চান্স আছে তাই বলবো না। ডিটেলে না গিয়ে বলা যেতে পারে যে, হাজার হোক বাঙালী তো, তাই হোক না ঢপের কমিউনিস্ট, কিন্তু ওই কমিউনিস্ট, তারপর মার্ক্স্, ওইসব শব্দগুলো শুনলেই এখনও কিরকম যেন শিহরণ-শিহরণ ব্যাপার হয়; বেশ ব্যাকগ্রাউন্ডে জর্জ বিশ্বাসের গলায় আমার প্রতিবাদের ভাষা-ফাসা বেজে ওঠে কির'ম যেন। কৈশোরের প্রথম চাপের মতো ব্যাপার এসব, রোম্যান্টিসিজম মাত্র, সিরিয়াস কিছু নয়; দেশে একটা ঠিকঠাক রাজনৈতিক দল থাকলেই ঘুঁচে যেত। কিন্তু নেই, আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে বানাবোও না, কাজেই পাশবালিশ জড়িয়ে মার্ক্সবাদ জিন্দাবাদ বলে ঘুমিয়ে পড়াই আপাতত আমাদের একমাত্র সম্ভাব্য স্যালভেশন।

এদিকে একটা ভয়ানক মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। এই সিপিএম-বিজেপি ভাগাভাগিতে তৃণমূল কংগ্রেসকে ঠিক করে খিস্তিটা করা হচ্ছে না। ওরা অবশ্য ততটা সিগ্নিফিক্যান্টও নয় বেশি শব্দ খরচ করার মতো। একটা পার্টি ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে ২০১৯-এর মধ্যেই যদি বিজেপিতে প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েই থাকে তাহলে আর ক'টা কথাই বা লেখা সম্ভব এরকম একটা দলকে নিয়ে? যখন যে প্রসঙ্গে গালাগালি দেওয়া দরকার নিশ্চয়ই দেব। আপাতত এই পর্বে নিজেই নিজেকে একটা রিক্যাপ দিচ্ছি যে কি লিখছিলাম কেন লিখছিলাম, এইসব। তৃণমূলের কথা যখন এলোই, একটা কথা না বললেই নয় যে, দলটার সমস্ত স্তরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে একটা অস্বাভাবিক এবং প্রায়-অলৌকিক পর্যায়ের ঘুষ খাওয়ার ক্ষমতা ছিল। ক্ষমতায় আসার বেশিদিন পরের কথা নয়, ২০১২-১৩-র শীত সম্ভবত, সেবার চন্দননগরের এক সার্কাসের তাঁবুতে গিয়ে চারটে আলাদা আলাদা দল, সবকটাই তৃণমূলের, চারবার ঘুষ আদায় করেছিল। এরপর পাঁচ নম্বর দল যখন যায়, সার্কাসের মালিক স্বাভাবিকভাবেই বলেন যে আর কোথা থেকে দেব, চারজনকে তো দিয়েছি অলরেডি। পাঁচ নম্বর দলটি অনেক ঝোলাঝুলির পর শেষে যখন বোঝে যে এক পয়সাও পাওয়া যাবে না কোনোভাবেই, "ঠিক আছে, তাহলে এগরোলই খাওয়ান" বলে ফ্রিতে এগরোল খেয়ে ফিরে আসে। এইরকম চশমখোরীর দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সিপিএমকে আমি শুনিনি কখনও। গত বছর চারেক ধরে গোটা রাজ্য জুড়ে নাকি এমন অবস্থা যে কন্ট্র্যাক্টররা আর সরকারের কাজ ধরতে চায় না! কেন? না, কাজ ধরলেই নেতাদের ঘুষ দিতে হবে, আর সে ঘুষের পরিমান এমনই যে তারপর যা লাভ থাকবে তাতে আর খাটনি পোষাবে না। প্রাইমারীর টিচার হওয়ার ঘুষ ৩ লক্ষ থেকে বাড়তে বাড়তে নাকি ১৭ লক্ষ! যে এতটাকা ঘুষই দিতে পারবে তার আর চাকরির কি দরকার জিজ্ঞেস করতে গেলেও উত্তর রেডি আছে। হিসেব কষে দেখি দেওয়া হবে যে ওই টাকাটা ব্যাংকে কিংবা পোস্টাপিসে রাখলে ক'বছরে কত টাকা হতো আর মাসমাইনে থেকে ওটা ক'বছরে গোটাটা উঠে এসে আজীবন কিরকম লাভের উৎস হয়ে থাকবে। অঙ্ক পরিষ্কার, কোনও গল্প নেই।

আসলে এরকমই হওয়ার ছিল। কারণ তৃণমূল কংগ্রেস পার্টিটা মূলত একটা ধান্ধাবাজদের পার্টি। পার্টিটার শুরু বিক্ষুব্ধ কংগ্রেসীদের হাত ধরে। ঘাবড়ে যাওয়ার কিছু নেই, বিক্ষুব্ধ কংগ্রেসী ব্যাপারটা শুনতে জটিল লাগলেও বোঝার অসুবিধা হওয়ার কথা নয় সেরকম। মমতা ব্যানার্জি কেন কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন সেটা ফিরে গিয়ে পড়লেই বোঝা যাবে। সোজা কথা হলো আমায় যদি পাত্তা না দাও আমি ভাই আলাদা পার্টি খুলে ভোট খাবো। হয় তুমি আমায় এবং আমার শিবিরের লোকেদের তোয়াজ করবে আর নাহলে তোমায় আমি দেখিয়ে দেব কি করতে পারি --- এই হলো এক লাইনে তৃণমূলের জন্মের ইতিহাস। আলাদা করে বলে দেওয়ার মনে হয় না দরকার আছে বলে যে এইধরণের চরিত্রের লোকেরা আসলে ধান্ধাবাজ। এছাড়া একটা অংশ এসেছে ২০০৬ সালে সিঙ্গুর আন্দোলন শুরু হওয়ার পর যারা কিনা আরও বড় ধান্ধাবাজ। সিপিএম করতে গিয়ে পাত্তা পায়নি বলে তৃণমূলে আসা লোকজন এরা। এই যে বেচারাম মান্না, কৃষিজমি রক্ষা কমিটির এতবড় নেতা, এ তো আসলে সিপিএমের লোক। পঞ্চায়েতে পাত্তা পেতো না। জমি নিয়ে এত নাটক হয়ে গেলো, এদিকে ওর তো শুনেছি পৈতৃক জমি ছিল এককালে, সেসব নাকি আন্দোলন শুরু হওয়ার বহু আগেই বেচে দিয়ে বসে ছিল। বোঝাই যাচ্ছে কিসের টানে এদের আন্দোলন করতে আসা। এরপর আরও একটা দল এসেছিলো ২০০৯-১০ নাগাদ। এরা আরও বড় ধান্ধাবাজ, নন্দীগ্রাম-লালগড় শুরু হয়ে যাওয়ার পর ক্ষমতা যে পাল্টাচ্ছেই সেই বিষয়ে আরেকটু সিওর হয়ে নিয়ে তারপর এসেছিলো। একবার মাস রেটে ক্যালানি শুরু হলে এদের একটাও যে দূর্গের দরজা আগলে দাঁড়িয়ে থাকতে যাবে না তাতে আর আশ্চর্য কি! এই সমস্ত ধান্ধাবাজগুলো ছাড়াও একটা অংশ ছিল তৃণমূলে যারা সিপিএমের উৎপাতে অসহ্য হয়ে গিয়ে এই পার্টিটাকে বিকল্প ভেবে যোগ দিয়েছিলো। এদের বেশিরভাগই দলটার চরিত্র বোঝার পর হয় বসে গেছে আর নাহলে নিজেদের চরিত্র পালটে ফেলেছে। অনেকেই রয়েছে এদের মধ্যে যারা দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে বোমা-গুলি-চোখ রাঙানি-মারধর উপেক্ষা করে পার্টির কাজ করে যাওয়ার পর আজ আর পাত্তা পায় না। আজ এলাকায় সব নতুন নতুন নেতারা এসেছে যারা পার্টির সব দায়িত্ব সামলে নিয়েছে মোটামুটিভাবে। তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলে এখন নিজের পার্টির লোকই বাড়ি এসে শাসিয়ে যায়। এইসব লোকেরা তাহলে কোথায় যাবে? এরা কি "পার্টির ভালো হোক" বলে হিমালয় চলে যাবে ভেবেছিলাম আমরা? সিপিএমকে তাদের আর দরকার নেই এখন জীবনে, কারণ তৃণমূলই এখন সিপিএমের জায়গাটা নিয়ে নিয়েছে। স্বভাবতই, তৃণমূল যে সিপিএমের পরিণতিও ভাগ করে নেবে সে তো অবশ্যম্ভাবী।

তৃণমূল কংগ্রেস কিন্তু আসলে দক্ষিণপন্থী দল। অথচ মমতা ব্যানার্জীর রাজনৈতিক উত্থানের গ্রাফ দেখলে মনে হয় উনি সিপিএমের যেকোনো নেতার থেকে অনেক বড় মাপের কমিউনিস্ট। কি করে এরকমটা হলো? আসলে এখানে একটা বিশ্বাসঘাতকতার গল্প আছে, যে বিশ্বাসঘাতকতার বৃত্তটা সম্পূর্ণ হয়েছিল ২০১১ সালের ২৪শে নভেম্বর। ওইদিনটা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবর্ষের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। আপাতত এর বেশি কিছু লিখছি না। প্রয়োজন হলে পরে লিখবো নিশ্চয়ই। যাঁদের জানার ইচ্ছে একটু হাতড়ে দেখে নেবেন প্লিজ, যে ঐদিন ঠিক কি হয়েছিল, আর কিভাবে হয়েছিল। আপাতত বরং একটু প্রসঙ্গ পাল্টানো যাক। গত ইলেকশনের রেজাল্টের পর থেকে দেখা যাচ্ছে বেশ অনেকেই মেনে নিয়েছেন যে জনগণ ব্যাপারটা আসলে অশিক্ষিত-মূর্খ-চিন্তাশক্তিরহিত-অপদার্থ-গাড়লদের একটা সমষ্টি। কিন্তু জনগণই তো পাঠক। তাহলে বুদ্ধিমান লেখকদের কি হবে? লেখক সেরকম বুদ্ধিমান হলে তো এহেন জনগণ তাঁর কথার মাথামুন্ডু কিছুই উদ্ধার করে উঠতে পারবে না! তাহলে লেখকের কি করণীয়? চিন্তার কিছু নেই, উপায় আছে। এইধরণের কেসে যেটা করতে হবে যে, যারা বুঝলো তাদেরকেই বলতে হবে জোরে জোরে অনবরত হাততালি দিতে থাকতে। সম্ভব হলে সময়সুযোগ বুঝে নিজেও ভীড়ের মধ্যে ঢুকে গিয়ে, অথবা পয়সা দিয়ে লোক ভাড়া করে হাততালি দেওয়াতে হবে। সেরকম জবরদস্ত আওয়াজ হলে খানকয়েক মাল এমনিই জুটে যাবে তালি মারার জন্য, তাদের দেখে আরও খানকয়েক। এইভাবেই ক্রমশ বড় হয়ে উঠবে লেখকের আত্মপরিচিতির কলোনি। এভাবেই হয়, এবং এভাবেই হবে। হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। এত ট্যালেন্ট নিয়ে শেষে সেরকম বিখ্যাত না হয়েই মরে যেতে হলে তার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছু হয় না। অত দুর্ভাগ্য মেনে নেওয়া যাবে না কোনোভাবেই। অদৃষ্টের কাছে আত্মসমর্পণ আমাদের ধাতে নেই। মনে রাখতে হবে, বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস!
ধ্যাত্তেরি!
কি বকতে কি বকছি!
ইয়ে, হাততালির আওয়াজই পপুলারিটির উৎস। ইত্যাদি।
(চলবে)
পর্ব ১১: চা ও নচিকেতা

এদিকে আমার লেখার সময় হচ্ছে না, আর ওদিকে বাংলায় বাওয়ালির কমতি নেই। যেরকম যেরকম যা যা মাথায় আসে সব যদি টাইমে টাইমে লিখে ফেলতে পারতাম ট্রাম্পকে সরিয়ে দিতাম শালা এদ্দিনে আমেরিকা থেকে। কিন্তু ভালো কাজ করতে গেলেই হাজারটা বাধা। এই যে আমায় লেখার জন্য কেউ পয়সা দেয় না, এটা কি একটা বড় বাধা নয় দেশ ও দশের মুক্তির পথে? কিন্তু কে কাকে বোঝাবে! মাঝে মাঝে মনে হয় সৃষ্টিকর্তার মাথাটাও মমতা ব্যানার্জির মতই; প্রশাসনিক বোধবুদ্ধি কিস্যু নেই, কাদের কাদেরকে লেখক বানিয়ে রেখে দিয়েছে! ধুর! এই গুরুচন্ডা৯-কেই নাহয় আইডিয়া দিত আমায় হরিদাস পাল সেকশনের অফিসিয়াল অ্যাম্বাসাডার বানানোর জন্য, কিছু রয়াল্টি তো অন্তত আসত! লেখার সময় বার করতে পারতাম আরও খানিকটা। তা না আজ ফার্টিলিটি আকুপাংচার, কাল হোলিস্টিক হিলিং, পরশু আমেরিকান ছাগলদের রিটায়ারমেন্ট ফান্ড; কি এমন পাপ করেছি বাবা যা আমার পাশের লোকটা করেনি? একটু নিজের মত সিনেমা বানানো কি লেখালিখি করার জন্যও তো পয়সা দিতে পারতো কেউ একটা! আমি যে এখনো পুরোপুরি পাগল হয়ে যাইনি, বা হয়ে গিয়ে থাকলেও ওপেনলি লোকজনকে কামড়ে বেড়াচ্ছি না, এর জন্যই পৃথিবীর আমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত! মাঝে মাঝে মনে হয় মাস শ্যুটারদের সাইকোলজি আমি বুঝি। মানে যারা প্লেন মাস শ্যুটার, ধর্ম না দেখে, হোমো না হেটেরো বিচার না করে র‍্যান্ডাম ঠুকে দেয়। আমার ধারণা এরা আসলে লিখে ছবি এঁকে গান গেয়ে সিনেমা বানিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলো, তারপর জীবনের কঠিন সত্যগুলির মুখোমুখি হতে হয়েছে। যথা চেতন ভগতের বইয়ের বিক্রি, লালের উপর কালো পুঁটকির মিলিয়ন ডলার দাম, জাস্টিন বিবারের ফ্যানসংখ্যা, অথবা মিশন ইম্পসিবল ফলাউটের বক্স অফিস স্ট্যাটিস্টিক্স, ইত্যাদি। তাই তারা বলেছে মাতা দ্বার খোলো, তথা বালের জীবন ভাই, তার চেয়ে মরে যা, মরে গেলে শান্তি পাবি, মনেও থাকবে না যে একদিন বেঁচেছিলি, কিছু একটা করার চেষ্টা করছিলি জীবনটা নিয়ে! বাসুদেব দাসগুপ্ত যখন বলেছিল, চারপাশে সবসময় এমন পরিস্থিতি হয়ে থাকে যাতে লিখতে না পারি, সেদিন বুঝিনি। আজ বুঝি, লেখা ছেড়ে না দেওয়াটাই আসলে একটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার।

তবে ওপরের লাইনগুলো যতটা নৈরাশ্যবাদী আমি লোকটা ঠিক ততটাও নই। তাই ষড়যন্ত্র যতই থাক না কেন সেসব, আমার বিশ্বাস, আমারে দাবায়া রাখতে পারবা না। আমি ঠিক ফাইট দিয়ে টাইম করে হেলতে দুলতে আমার মূল্যবান মতামত ব্যক্ত করতে চলেই আসবো। নবজাতকের কাছে এই আমার ইসে! একটু লেট হবে মাঝেমধ্যে এই যা। যেমন গোটা রাজ্য এখন ডাক্তারদের কর্মবিরতি নিয়ে তোলপাড়, এদিকে আমার এখনও সিপিএম কিংবা তৃণমূলের আমল অথবা বিজেপির উত্থানের প্রেক্ষাপট, কোনোটাই ভালো করে কভার করা হয়নি। তা এসব সমস্যা লেজেন্ডদের হয়েই থাকে, কোনো নতুন কথা নয়। জয় গোস্বামীও তো এক পৃথিবী লিখবেন বলে একটা খাতাও শেষ করেননি। তা সেই হিসেবে আমি তো এই সেদিনকার ছেলে, আর উনি সেই কবেত্থেকে লিখছেন! আমার আর এমন কি দোষ!

ডাক্তারদের নিয়ে পশ্চিমবাংলায় মাঝেমধ্যেই গন্ডগোল বাধে। আমরা যখন ইস্কুলে পড়তাম তখনও একবার বেধেছিলো মনে আছে। সেবার তো নচিকেতা "ও ডাক্তার" বলে এক্সেপশনালি বাজে এবং বোকাবোকা সেন্টুমার্কা একটা গানই বেঁধে ফেললো। সেই গানের আবার কি পপুলারিটি বাপরে বাপ! ওই গানে ডাক্তারদের ভগবান এবং জনগণকে গর্ধভ বলা হয়েছিল। আরও বলা হয়েছিল যে কিভাবে ডাক্তাররা টুপি পরাচ্ছে কেউ কিছুই বুঝছেনা। যা বোঝার সব সবার হয়ে দায়িত্ব নিয়ে নচিকেতা একাই বুঝছে। ইত্যাদি। তা নচিকেতাকেও দোষ দেওয়া যায় না, তদ্দিনে ওর ঝুলে গেছে। লেখার হাত। পরে "তুমি আসবে বলে", " বুড়ো সলোমন" ইত্যাদির মাধ্যমে একটু উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা হয়তো করে থাকবে, সেসব অত ভালো মনে নেই। তারপর তির্যক না কি যেন একটা অ্যালবামে ফাইনালি টিভিকে বোকাবাক্স-র বদলে লক্ষনীয় রকমের ইনোভেটিভভাবে "বোকাচোদাবাক্স" নামে অভিহিত করার পর ভদ্রলোক একটি চায়ের দোকানে পরিণত হন, যার নাম, আবারও, লক্ষনীয় রকমের ইনোভেটিভভাবে, চা ও নচিকেতা।
যাই হোক, নচিকেতা আমাদের লেখার বিষয় নয়। সেভাবে দেখতে গেলে অবশ্য কোনকিছুই নয়, তাছাড়া বলে রাখা ভালো চায়ের দোকান হয়ে বেঁচে থাকতেও ক্যাপা লাগে, আমার সেটুকুও নেই। এমনকি গুরুচন্ডা৯ও এখনো পর্যন্ত আমায় নিদেনপক্ষে হরিদাস পাল সেকশনের ব্র‍্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডারও করেনি। নিজেকে না মেপে ওসব বড় বড় কথা বলে কোনো লাভ আছে আমার! অনেকে বলে; সাড়ে তেরো খানা সুকান্ত কি সুনীলকে নকল করে কবিতা লিখে কবীর সুমনের ফেসবুক ওয়ালে গিয়ে "আপনি একটা বাল" লিখে আসে। আমার ওসব পোষায় না। আমার ধারণা এই লোকগুলোই ক্রেডিট কার্ড বস্তুটাকে জনপ্রিয় করেছে।

ডাক্তারদের ওপর মানুষ মাঝেমাঝেই ব্যোমকে যায় কেন আমি সেই আলোচনায় যাবো না। আমার ওই বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান নেই। এবং আমি যেহেতু সোস্যাল মিডিয়ার কোনও সেলিব্রিটি লেখক নই তাই আমার মেনে নিতে কোন বাধা নেই যে আমি মোটেই সব বিষয়ে জানি না। ইন ফ্যাক্ট, আমি আসলে বেশিরভাগ বিষয়েই জানি না। তবে এটা আমার ধারণা যে যেমন নব্বইয়ের দশকে রেলের ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সমস্যার জন্য স্টেশন মাস্টাররা মার খেতো এখন সেরকমই স্বাস্থ্যব্যবস্থার সার্বিক মাইন্ডলেস ফাক অবস্থার জন্য ডাক্তারদের মার খেতে হচ্ছে। এটা ভারতবর্ষ। এখানে পাবলিক এভাবেই রিয়্যাক্ট করতে অভ্যস্ত। একটু ধমকধামক দু একটা চড়থাপ্পড় ছাড়া যে এদেশে খুব একটা কাজ হয় না এটা আমরা অধিকাংশই ভেতরে ভেতরে বিশ্বাস করি। ফ্যাসিজম আমাদের ভেতরে, বাইরে এই মমতা-মোদী থেকে সিপিএমের ইতিহাস সবই আসলে তার প্রতিফলন। এর যথেষ্ট কারনও আছে। সেই কারনগুলো আমাদের ইতিহাস খতিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে। সেই ইতিহাস থেকে বংশপরম্পরায় প্রাপ্ত শিক্ষাই আমাদের ভেতরের জগতটাকে তৈরি করেছে। বস্তুত ভারতীয় গণতন্ত্র ঠিক ততটাই গণতন্ত্র যতটা মাওবাদী যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের লম্বাচুলো হিপিকাটিং ছেলেটি। দুটোই কন্সেপ্ট লেভেলে এবং বাস্তবসম্পর্কবিহীন। আরও মজাদার যে, দুটোই স্বঘোষিত!

আজ ওয়ার্ল্ডকাপে ইন্ডিয়া পাকিস্তান ম্যাচ আছে। আজ মোদীর ভারতবর্ষ একযোগে সব কাটার বাচ্চাকে দেখে নেবে। এই বাইনারীর উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আজ অ্যাকাডেমিতে জয়রাজরা নাটকের শো ফেলেছে। যদিও খুবই বোকা বোকা ব্যাপার, যেন সত্যিই কিছু করা যায় এভাবে, তবু সাধুবাদ জানাই। ওই সৌখিন হোক তবুও এ গান একফালি প্রতিরোধ মার্কা একটা প্রতীকি ফ্লেভার পাচ্ছি। ওদের নাটকের দলটার ভালো হোক। আমি আপাতত শুতে যাই। উঠে যদি খেলা সেরকম বোরিং হয় আবার লিখতে আসবো নিশ্চয়ই। লেখা বন্ধ না করাটাই আপাতত প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ।

3132 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 21 -- 40
Avatar: Amit

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

খেয়েছে। ১৯৪৭ র ইতিহাস টেনে আনলে এখন কি হবে ? ঐতিহাসিক সব ভুল বা বঞ্চনা তো আর ফিরে গিয়ে শোধরানো যাবে না। আমি ২০১৯ এ দাঁড়িয়ে বামেদের কি করা উচিত সেটা জিগাইতে যাচ্ছিলাম। পপুলেশন র ৭০-৮০% হয়তো ৪৭ এর পরে জন্মেছে, তারা সেই ইতিহাস ঘুরে দেখতে আদৌ আগ্রহী নয়।

কেন্দ্র সরকার কি রাজ্যে রাজ্যে ট্যাক্স স্ল্যাব আলাদা করে ধরে দেয় ? যদি সেটা হয়েও থাকে, ট্যাক্স ছাড়াও অনেক রাজ্যে এক্সট্রা ইনভেস্টমেন্ট আসে, সেটা কেন্দ্র সরকার হতে পারে, রাজ্য সরকার ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক বা অন্য কথা থেকে ঋণ নিয়ে করতে পারে। উদা: গুজরাট , তামিলনাড়ু ইত্যাদি। সেখানে সব রাজ্যকে সমান ভাবে বেনিফিট দেওয়া হয়, একেবারেই নয়। সেখানে বহু পলিটিকাল একুয়াশন কাজ করে।যেমন অন্ধ্র কবে থেকে স্পেশাল স্টেটাস র জন্য দাবি জানিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু বামেরা কি আবার সেই বঞ্চনার ন্যারেটিভ নিয়ে যাবে লোকের কাছে ?

কেন্দ্রীয় সরকার র বঞ্চনা শুনে শুনে ৩৪ বছর কাটিয়েছি। তারপর 2011 থেকে আরো ৮ বছর। কিন্তু কোনো সমাধান তো পাওয়া যায়নি। এখন সেই যুক্তি মানতে গেলে, বেশি করে কেন্দ্র সরকারের ইনভেস্টমেন্ট আনতে গেলে তো রাজ্যে বিজেপি আসাই ভালো, এক সরকার থাকলে চুলোচুলি কম হবে।মোদির লুক ইস্ট পলিসি তে যদি ইকোনমিক করিডোর তৈরী হয় সব পুবের রাজ্য জুড়ে, তাহলে তো সেটা অনেক ভালো। মোদী তো গ্রান্ড প্ল্যান দেখিয়েছে লুক ইস্ট পলিসিতে, একেবারে সিঙ্গাপুর অব্দি।

তাহলে এখন বামেদের আনলে রাজ্যের বা কারোর ইন্টারেস্ট টা ঠিক কোথায় ? লোকে তো সেই কথাই আগে জিগাবে। হিসেবে মিলছে না।
Avatar: Ishan

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

হিসেবে মিলবেনা কেন? আমিও তো একই কথা বলছি। যে কাজটা মোদী অনেক ভাল পারে (গুজরাত মডেল), তার জন্য বামদের তো একেবারেই দরকার নেই। খামোখা লোকে ভোট দেবে কেন? এর আগে, ঠিক হোক বা ভুল, লোকে বামদের বাম ন্যারেটিভের জন্য পছন্দ বা অপছন্দ করত। ন্যারেটিভটাই না থাকলে বাম রা থাকবে কেন? এবার অলটারনেটিভ ন্যারেটিঊ খোঁজার দায়িত্ব বামেদের। আমি আমার মতো বললাম। যে, ২০১৯ এ রাজ্যের অটোনমি এবং আয়করের ৮০% চাওয়া উচিত। আরও বাকি যাযা বললাম। সেটাই মানতে হবে, একেবারেই তা নয়।

তবে, কেন্দ্র এবং রাজ্যে একই সরকার সম্পর্কে একটি তথ্য। ৪৭ থেকে ৬৭ এই ২০ বছর কেন্দ্র এবং রাজ্যে একই সরকার ছিল, যে কুড়ি বছর বাংলার পতন হয়।
Avatar: dc

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

দেখুন, বামেরা তাদের মেসেজ জনতার কাছে পৌঁছতে পারেনা তার পাতি কারন কমিউনিজম থিওরেটিকালি যাই হোক না কেন, প্র্যাক্টিকালি ব্যাপারটা ফেল করেছে।

তার চেয়ে আমাদের ক্যাপিটালিস্টদের মেসেজ লোকের কাছে পৌঁছনো সোজা কারন আমরা প্র্যাক্টিকাল কথা বলি (আবার আমাদের ইকোনমিক থিওরিও আছে, অ্যাডাম স্মিথ থেকে কেইন্স থেকে ফ্রিডম্যান হয়ে সোলো-সোয়ান সাহেবরা যেরকম বানিয়েছেন)। আমরা বলি সরকার বা বুরোক্রেসি ইনেফিসিয়েন্ট আর ইনোভেটিভ না। কাজেই সরকার রেগুলেটার এর কাজ করবে, আর ব্যবসা চলবে রেগুলেটেড ফ্রি মার্কেট নিয়ম অনুযায়ী। ইনভেস্টররা নিজেদের মতো করে ইনভেস্ট করবে আর প্রফিট ম্যাক্সিমাইজ করবে। সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর ইনফ্রা ডেভেলপমেন্টে জোর দেবে। কোম্পানির সিইও কতো মাইনে পায় আর লাইন ম্যানেজার কতো মাইনে পায় সেসবে নাক গলাবে না, সেসব কোম্পানির বোর্ড ঠিক করবে, কারন সিইও ডেলিভার না করতে পারলে তাকে এক মিনিটে ফায়ার করে দিতে পারে।

এখন ভারতে নব্বুই সালে মনমোহন সিং কয়েকটা সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন (যার জন্য ওনাকে ভারতের সেরা ফিনান্স মিনিস্টারদের মধ্যে ধরা হয়), লাইসেন্স রাজ অ্যাবোলিশ করে ব্যবসার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রন কিছুটা কমিয়েছিলেন। তাছাড়া এক্সচেঞ্জ রেট পার্শিয়ালি ফ্লোট করিয়েছিলেন। কিন্তু কাজটা সম্পূর্ণ হয়নি, ফলে ভারতে এখন একটা আধ খ্যাঁচড়া আধা ফিউডাল আধা ক্রোনি ক্যাপিটালিজম টাইপের ব্যাপার চলছে। তার ওপর বিজেপি এসে ইকোনমি আরও চটকে দিচ্ছে।

আমরা ক্যাপিটালিস্টরা চাই সরকার আরও ট্রান্সপারেন্ট হবে, রেগুলেশানের ওপর জোর দেবে, এয়ারলাইন, টেলিকম ইত্যাদি সেক্টর থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবে, পাবলিক সেক্টর থেকে ডাইভেস্ট করে দেবে। বড়ো ইন্ডাস্ট্রি আর লার্জ স্কেল ইনভেস্টমেন্ট করার ক্ষেত্রে বাধা দেবে না। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-ইনফ্রা তে অনেক বেশী ইনভেস্ট করবে। সরকারের রোল গভর্নেন্স এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে।
Avatar: Amit

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

এই টইতে মূল লেখাটা খুব ভালো চলছে, এতো প্রশ্ন করে করে বেপথ করতে চাই না। অন্য কোনো টোয়ি খোলা যাক ক্যাপিটালিস্ট/ কমিউনিস্ট ন্যারেটিভ ইত্যাদির জন্য। আগেও কয়েকটা ছিল।
Avatar: lcm

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

জেনারেলি এসব (রাজ্য রাজনীতি... এসেট্রা) নিয়ে লেখা পড়তে আজকাল বোরিং লাগে, কিন্তু এটা স্রেফ লেখার স্টাইলে দারুণ হচ্ছে -
Avatar: sm

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

ডিসির ওপরের পোস্ট টা পড়ার পর যুগপৎ মুঘধ ও বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি।সত্যিই সরকারের উচিত না ,বাজারের ও ব্যবসার কাজে নাক গলানো।ওটাকে মার্কেট এর নিয়ম অনুযায়ী ই চলতে দেওয়া উচিত।কিছু কিছু ক্ষেত্রে খালি রেগুলেটর এর কাজ করবে।
এ পর্যন্ত গপ্পো ঠিক আছে।কিন্তু আমার বক্তব্য হলো,পুঁজিও যাতে সরকার সরবরাহ না করে।শিল্পপতিরা নিজেদের পুঁজি নিজেরা খুঁজে নিক।সরকারী ব্যাংক থেকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা লোন নেওয়া বন্ধ করুক।আপাতত এটুকু হলেই ভারতে চলবে।

Avatar: dc

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

অবশ্যই। ব্যাংকিং সেক্টর পুরোটাই প্রাইভেটাইজ করা উচিত। শিল্পপতিরা বাধ্য হবে ফান্ড পাওয়ার জন্য ট্রান্সপারেন্সি আর অ্যাকাউন্টেবিলিটি বাড়াতে।
Avatar: sm

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

এটা করতে পারলে,ভারতে স্বর্ণ যুগ আসবে।কোন বাম ও ডানপন্থা লাগবে না।ট্যাক্সের টাকাতেই, মনের আনন্দে সরকার জনহিতকর প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারবে।
শিল্প চাই বলে রাজ্যে রাজ্যে প্রতিযোগিতা চলবে না।মিডিয়ার নাটকবাজি কমবে।
Avatar: S

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

অনামিত্র তোমার লেখা খুব ভালো লাগছে। আর বিরক্ত করবোনা। বামেদের ন্যারেটিভ নিয়ে সত্যিই একটা টই খোলা উচিত। সেখানেই আলোচনা চলুক।
Avatar: রঞ্জন

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

লেখাটা চলুক।

এই ফাঁকে ডিসিকে বলিঃ
অংক কি এতটাই সরল?
তাহলে ২০০৯ এ ফ্রিডম্যান ফেইল করলেন কেন? কেন স্টিগলিজদের প্রেস্ক্রিপশন বেশি কাজে দিল?
ভারতে সমস্ত ব্যাংক প্রাইভেট ছিল ১৯৬৯ অব্দি। তাতে পারদর্শিতা ছিল? ছোট ডিপোজিটারের টাকা সেফ ছিল?
তাতে ইকনমি এগুচ্ছিল?
ইন্দিরা গান্ধীর ১৯৬৯ ব্যাংক ন্যশনালাইজেশনের ইম্প্যাক্ট ইকনমিকে লং রানে স্ট্রাকচারাল জড়তা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করল। বিশেষ করে কৃষি উৎপাদন ও ইনফ্রাস্ট্রাকচারে।
যার লাভ অবশ্যই প্রাইভেট সেক্টর পেল। ওদের তখন কোন মোটিভেশন ছিল না ইনফ্রাস্ট্রাকচারে ইনভেস্ট করার।
আজ ভারত ফুড প্রোডাকশনে সেলফ সাফিশিয়েন্ট; ছোটবেলায় ভাবতে পারতাম না । এক্ষণ প্রবলেমটা ওভার প্রোডাকশন ও ইঙ্কমপিটেন্ট মার্কেট চেইনের।
কাজেই প্রাইভেট প্লেয়াররা মাঠে খেললেও কোচ বা ক্যাপ্টেনের মত সরকারের রোল থাকা উচিত।
২। কিন্তু বাম মানসিকতায় পাবলিক সেক্টর নিয়ে একটা অবসেশন আঁচে যেন প্রাইভেট হলেই ক্যাপিটালিজম, আর পাবলিক সেক্টর হলেই সমাজতন্ত্রের কাছাকাছি!
লেনিনের মডেলেও ওটা সোস্যালিজম ছিল না , বরং স্টেট এন্ড ব্যুরক্র্যাটিক ক্যাপিটালিজম ছিল --এটা বলার সময় এসেছে। ওয়ার্কার রা আদৌ ক্যাপিটালের মালিক ছিল না , ওয়েজ লেবারই ছিল।
৩ আসলে দরকার দায়বদ্ধতা-- প্রাইভেট হোক, কি পাবলিক। সেটারই অভাব।

অনমিত্র কই?
Avatar: PM

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

"অবশ্যই। ব্যাংকিং সেক্টর পুরোটাই প্রাইভেটাইজ করা উচিত। শিল্পপতিরা বাধ্য হবে ফান্ড পাওয়ার জন্য ট্রান্সপারেন্সি আর অ্যাকাউন্টেবিলিটি বাড়াতে"।--- সদ্য সদ্য ইয়েস ব্যান্ক আর আইিসিআসিআই ব্যন্ক এর গ্রস দুর্নীতি দেখার পরেও কি করে এতো জোর গলায় বলছেন ? ইয়েস ব্যান্ক এ এখনো পুরো খুলাসা হয় নি তাও


Rন্হনদার সাথে একমত


Avatar: dc

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

রঞ্জনদা, অংক কখনোই সরল হয় না ঃ-) ওভারল মডেল হওয়া উচিত সরকার যতোটা সম্ভব ব্যবসায়ে সরাসরি পার্টিসিপেশান বন্ধ করবে, কারন ব্যবসা করাটা সরকারের কাজই না। সরকারের কাজ হলো রেগুলেশান, গভর্নেন্স, আর ইনফ্রা ডেভেলপ করা, শিক্ষা-স্বাস্থে বেশী খরচ করা, দেশের লোককে বিনামূল্যে অথবা নামমাত্র মূল্যে শিক্ষা আর স্বাস্থ্য বেনিফিট দেওয়া (অন্তত একটা লেভেল অবধি)।

এগুলো ছাড়াও উচিত স্টেট আর রিলিজিয়নের সেপারেশান, যা বোধায় আমাদের দেশে প্রায় কখনোই হয়নি, যার ফলে আজ আরেসেস/বিজেপি ওদের বিষাক্ত ক্যাম্পেনে সফল হয়েছে।

"কাজেই প্রাইভেট প্লেয়াররা মাঠে খেললেও কোচ বা ক্যাপ্টেনের মত সরকারের রোল থাকা উচিত" - একমত।
Avatar: dc

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

পিএমদা, দুর্নীতি তো সব ক্ষেত্রেই আছে, সরকারি ক্ষেত্রেও আছে, বেসরকারি ক্ষেত্রেও আছে। ওটা ডিসাইডিং ফ্যাক্টর হওয়া উচিত না।
Avatar: amit

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

এটাকে ছাড়ান দ্যান। আর একটা খুলে দিয়েছি। এই ইকোনমিক সাবজেক্ট টা অনেক বেশি ডিসকাসন র দরকার, তর্কাতর্কির জোরে আসল লেখাটা হারিয়ে যাবে।
Avatar: dc

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

ধন্যবাদ অমিত। এখানে আর পোস্ট করছি না ঃ-)
Avatar: গবু

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

ষষ্ঠ পর্বের অপেক্ষাতে রইলাম অনামিত্র!
Avatar: shakil

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

I believe that is one of the so much significant info for me. And I'm glad studying your article. But want to remark on some common issues, The website taste is ideal, the articles is, in reality, great: D. Just right task, cheers
https://bestbuycapm.com/best-tripod-under-100/
Avatar: গবু

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

পড়ছি। অপেক্ষায়।
Avatar: গবু

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

পড়লাম। ঝাঁজটা কমেছে, তাও চলুক , আছি।

Avatar: য্যান গ্যান

Re: বাম-Boo অথবা জয়শ্রীরাম

2011 ২৪ নভ বললো , একবার কিষেণজির নাম বললো না ।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 21 -- 40


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন