Ashoke Mukhopadhyay RSS feed

Ashoke Mukhopadhyayএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
    ভারত আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র - মিল কতটুকু?একটি দেশ যদি বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী অর্থনীতি হয়, আরেকটির হাল বেশ নড়বড়ে - মানুষের হাতে কাজ নেই, আদ্ধেক মানুষের পেটে খাবার নেই, মাথার ওপরে ছাদ নেই, অসুস্থ হলে চিকিৎসার বন্দোবস্ত নেই। অবশ্য দুর্জনেরা বলেন, প্রথম ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    গরু বাগদির মর্মরহস্য➡️মাঝে কেবল একটি একক বাঁশের সাঁকো। তার দোসর আরেকটি ধরার বাঁশ লম্বালম্বি। সাঁকোর নিচে অতিদূর জ্বরের মতো পাতলা একটি খাল নিজের গায়ে কচুরিপানার চাদর জড়িয়ে রুগ্ন বহুকাল। খালটি জলনিকাশির। ঘোর বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে পচা লাশের মতো। যেহেতু এই ...
  • বাংলায় এনআরসি ?
    বাংলায় শেষমেস এনআরসি হবে, না হবে না, জানি না। তবে গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আজ ব্লক অফিসে গেছিলাম। দেখে তাজ্জব! এত এত মানু্ষের রেশন কার্ডে ভুল! কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম প্রায় সবার ভোটারেও ভুল। সব আইকার্ড নির্ভুল আছে এমন ...
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বিজ্ঞানের অ(নেক?)-ক্ষমতা # পর্ব-১

Ashoke Mukhopadhyay

১৯৫৬ সালে প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান (১৯১৮-৮৮) ক্যালিফর্নিয়া ইন্সটিটিউট অফ টেকনলজি-তে খ্রিস্টধর্মাবলম্বী ছাত্রদের সঙ্গে মধ্যাহ্ন ভোজনে মিলিত হয়ে একটি বক্তৃতায় বিজ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক বিষয়ে একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। [Feynman 1956]। ষাট বছর পেরিয়ে, সেটি সম্প্রতি বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়াতে খুব গুরুত্ব সহ ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছে।

কেন? কেন??

ফাইনম্যান একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী। সেই যে ষাটের দশকে তিনি ক্যালটেকে স্নাতক ছাত্রদের পদার্থবিজ্ঞানের ক্লাশ নিতে গিয়ে একটা লেকচার-নোট তৈরি করেছিলেন, তিন খণ্ডে আজও তা দুনিয়াভর ছাত্রবন্ধু হয়ে হাতে হাতে ঘুর্ণমান। ছাত্র এবং পুস্তক ব্যবসায়ী—উভয়েরই তাতে বিপুল লাভ হয়ে চলেছে বলে খবর! তা, সেই তিনি যদি বলেন, বিজ্ঞানের সঙ্গে ভগবানের ধারণা খাপ খাওয়ানো একেবারে অসম্ভব নয়, বিজ্ঞানীদের অনেকেই খুব সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ভগবানে বিশ্বাস করেন—ধর্মে বিশ্বাসীদের পক্ষে সেটা আরও কত বড় লাভ হতে পারে, ভেবে দেখুন! সুতরাং, এই সময়ে . . .

সময়টা এমন যে, শোনা যাচ্ছে, আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান ইতিমধ্যে ঈশ্বরের মনের ইচ্ছা জানতে পেরেছে, জীববিজ্ঞানীরা ঈশ্বরের হাত বা পায়ের ছাপ খুঁজে পেয়েছেন, আত্মা-ব্রহ্ম-ভূত-প্রেতের স্বরূপ ধরে ফেলেছেন। হে পাঠক, আপনিও কি শুনেছেন, বিজ্ঞান এখন পুনর্জন্ম বা জন্মান্তরবাদের সপক্ষে প্রমাণ দেখতে পেয়েছে, টেলিপ্যাথি, ইচ্ছাশক্তি, ইন্দ্রিয়াতীত সংবেদন, ইত্যাদির রহস্য পর্যন্ত আবিষ্কার করে ফেলেছে? সম্প্রতি নামকরা লেখকরা বাংলা ইংরেজি ফরাসি জার্মান ও অন্যান্য ভাষায় বইপত্র বা লোকপ্রিয় প্রবন্ধ লিখে মাঝে মাঝেই দাবি করছেন, বিজ্ঞান নাকি এমনি ধারা অনেক কিছু নতুন জিনিস জেনে নিয়েছে। এই সব ধ্যান ধারণাকে নাকি আর বিজ্ঞানের বাইরের জিনিস বলে বাতিল করে দেওয়া যাবে না!
আগে যে সকল যুক্তিবাদী ভাই বন্ধুরা এই সব জিনিসের নাম শুনলেই উত্তেজিত হয়ে তর্ক জুড়ে দিতেন—এগুলো নাকি অবিজ্ঞান, অপবিজ্ঞান, বুজরুকি, বাজে কথা, ভ্রান্ত কুসংস্কার ছাড়া কিছু নয়, তাদের এবার মুখ বন্ধ করার সময় এসে গেল।

হয়ত। তবে, একেবারে মুখ বন্ধ করে ফেলার আগে আমার মনে হয়, আমাদের একবার ভালোভাবে বিচার বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন—বিজ্ঞান সত্যিই এতটা ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছে কিনা!
আর, হ্যাঁ, ফাইনম্যানও আসলে কী বলতে চেয়েছিলেন, সেটাও বুঝে নেওয়া দরকার বলে মনে হচ্ছে।

[১] শেষ কথা কে বলল

বিজ্ঞানের এখন সত্যিই অনেক ক্ষমতা। সেই পঞ্চদশ শতাব্দ থেকে শুরু করে ঊনবিংশ শতাব্দের শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞানের নানা শাখায় ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে, বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির একটার পর একটা চমকপ্রদ সাফল্যের ফলে মানুষের জীবনধারা মাত্র কয়েকশ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং তার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে মানুষের মনে একটা ধারণা দৃঢ়মূল রূপ নিয়েছে যে বিজ্ঞানের পক্ষে জানতে পারার এবং বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির মাধ্যমে করতে পারার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। এখনও পর্যন্ত যা জানতে পারিনি, আগামী দিনে বিজ্ঞানের আরও অগ্রগতির দ্বারা তা জানতে পারব; আজ যে কাজ অসাধ্য মনে হচ্ছে অদূর ভবিষ্যতে প্রযুক্তির এমন বিকাশ ঘটবে যে তা-ও করে ফেলা যাবে। অষ্টাদশ শতকে শিল্প বিপ্লব এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই সীমাহীন(?) ক্ষমতাকে যেন একেবারে হাতেকলমে প্রমাণ করে দিয়ে গেছে। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত ধরলে, বাষ্পীয় ইঞ্জিন, বিদ্যুৎ চালিত মোটর, পেট্রল চালিত যন্ত্র, রেলগাড়ি, মোটর গাড়ি, এরোপ্লেন, জেট প্লেন, রাডার, স্পুতনিক, সোয়ুজ, অ্যাপোলো, ভাইকিং, পাথফাইন্ডার, কৃত্রিম উপগ্রহ, টেলিফোন, গ্রামোফোন, ক্যামেরা, রেডিও, সিনেমা, টেলেক্স, টিভি, টেপ রেকর্ডার, ভিসিআর, ভিডিও, সিডি, ডিভিডি, ফোটোকপি মেশিন, অ্যানালগ কম্পিউটার, ডিজিটাল কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি, মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ক্যামেরা, মাল্টিমিডিয়া—যন্ত্রসভ্যতার একটানা বিজয়রথে মানুষ যেন সময়ের গতিকেও হার মানিয়ে দিয়েছে।

অনেকে হয়ত ভেবেছিলেন, বিজ্ঞানের এই সফল অভিযানে ঈশ্বরচিন্তা, আত্মা-পরমাত্মার ধারণা, ভূতপ্রেত বা অতীন্দ্রিয় অলৌকিক ব্যাপারস্যাপার সবই পুরোপুরি চাপা পড়ে যাবে। মানুষের মন থেকে শিশুপাঠ্য কাহিনির এই সব গল্পই ধীরে ধীরে মুছে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। বিজ্ঞানের কাছে বহু দিক থেকে বহু ক্ষেত্রেই সনাতন ধ্যান ধারণাগুলো ধাক্কা খেলেও ধর্মবিশ্বাসীরা, অলৌকিক রহস্যে আস্থাবান লোকেরা আবার কম্প্রকণ্ঠে বিজ্ঞানকে পালটা চুনোতি জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন: “বিজ্ঞান কি সব বলতে পারে? বিজ্ঞান কি সব কিছু করতে পারে? বিজ্ঞান কি দুনিয়ার সমস্ত রহস্যের ব্যাখ্যা বা সমাধান করতে পেরেছে? বিজ্ঞানীরা কি পরীক্ষাগারে প্রাণ সৃষ্টি করতে পেরেছেন? বিজ্ঞানীরা কি মানুষের মন চিন্তা বুদ্ধির সমস্ত রহস্যের জট খুলতে পেরেছেন?” ইত্যাদি ইত্যাদি।

বিদ্যা দদাতি বিনয়ম্‌। প্রাচীন ভারতে জ্ঞানী মানুষেরা বিদ্যা ও বিনয়ের মধ্যে এই সমানুপাতিক সম্পর্কটা খুব সঠিকভাবেই ধরতে পেরেছিলেন। সত্যিই বিজ্ঞানীরাও সাধারণত খুবই বিনীতভাব নিয়ে চলেন। তাঁরা যা নিশ্চিতভাবে জানেন, তাকেও জোর দিয়ে নিশ্চিত জ্ঞান হিসাবে দাবি করতে দ্বিধা বোধ করেন। ‘যদি’, ‘কিন্তু’, ‘তবে’, ‘হয়ত’, জাতীয় সংশয় বাচক অব্যয়গুলির সাহায্যে নানাবিধ শর্ত আরোপ না করে তাঁরা কোনো কথাই বলতে চান না। উপরের এই সমস্ত দাম্ভিক প্রশ্ন শুনেও তাঁরা পালটা জিগ্যেস করেন না—“এই সব বিষয়ে কি আপনাদের সব জানা আছে? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গত তিন শতকে যা যা করতে পেরেছে, তার কোন কোনটা আপনাদের প্রাচীন জ্ঞান শাস্ত্র দ্বারা করা গিয়েছিল?” বরং গভীর সঙ্কোচ ও কৌতূহল নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন করবেন: “সব জানার কথা যে বলছেন—কোন “সব”-এর কথা বলছেন? কবেকার সব? কোথাকার সব?” আইজ্যাক নিউটন (১৬৪২-১৭২৭) যে কথাটা বলেছিলেন, বেশির ভাগ বড় বিজ্ঞানীরই মনের ভাবটা যেন ওই রকম: বিশাল জ্ঞান সমুদ্রের সৈকতে দাঁড়িয়ে তাঁরা কয়েকখানা নুড়ি ছাড়া আর বেশি কিছু সংগ্রহ করে উঠতে পারেননি। অমিত রায়ের সমস্যা তাঁদের নেই। [ঠাকুর ১৯৬১ক, ৭৪৩] তাঁরা খুব আন্তরিকভাবেই চান, লোকে যেন এই কথাটা পুরোপুরি সত্যি বলে বিশ্বাস করে নেয়। আর যে সমস্ত ব্যাপারে এখনও নিশ্চিতভাবে সব কিছু জানা যায়নি, সেগুলি সম্পর্কে নিজেদের সন্দিগ্ধ অবস্থানও তাঁরা কখনই আড়াল করতে চান না; খোলাখুলিই বলে ফেলেন—“এটা আমাদের একটা অনুমান (conjecture); ওই কথাটা এখনও একটা তত্ত্বকল্প (hypothesis), অমুক ব্যাপারে সবে একটা মডেল (model) দাঁড় করিয়ে বিচার বিবেচনা চলছে;” ইত্যাদি। অর্থাৎ, অনুমান, তত্ত্বকল্প বা মডেলকে জানার এক একটা ধাপ হিসাবে স্বীকার করলেও এগুলোকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে দাবি করেন না।

বিজ্ঞানের পরিচিত জগতের বাইরে সব সময়েই আছে না-জানার বিরাট মুক্ত প্রান্তর। সেই দিকে তাকিয়ে অধ্যাত্মবাদীরা এক সময় নিশ্চিন্ত মনে দাবি করেছিলেন: “Spiritualism begins where science ends.” অর্থাৎ, বিজ্ঞানের যেখানে শেষ অধ্যাত্মবাদের সেখান থেকেই শুরু। একজন বুদ্ধিজীবী একবার “দেশ” পত্রিকায় একটি বড় নিবন্ধে লিখেছিলেন: “বিজ্ঞান যতই এক পা এক পা এগোয় ধর্ম ততই একটু একটু করে পিছিয়ে যায়। তবুও ভগবান দাঁড়িয়ে থাকেন বিজ্ঞানের সীমানার বাইরের আলো-আঁধারিতে।” [গুপ্ত ১৯৯৩] এইভাবে বলবার সুবিধাটা হল, বিজ্ঞান যতই এগিয়ে যাক না কেন, ঈশ্বর এবং ধর্মের জন্য সব সময়ই কিছুটা খোলা জায়গা থাকছে এবং তারা বিজ্ঞানের থেকে একটু হলেও এগিয়ে এবং উপরে বসে থাকছে।

কিন্তু এই কথাতে আমার দুটো খুব বড় আপত্তি আছে।

প্রথমত যুক্তিশাস্ত্রের তরফে। তার মোদ্দা কথাটা হল, বিজ্ঞানের শুরু কোথায় এবং কবে, বলা সম্ভব। কিন্তু শেষ কোথায় তা কি বলা যায়? আজ বিজ্ঞানের যেখানে শেষ বলে মনে হচ্ছে, আগামী দিনে তার জানার সীমানা তাকে ছাড়িয়ে যাবে এবং আরও এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ, অধ্যাত্মবাদের শুরুর জায়গাটাও ক্রমাগত পিছিয়ে যেতে থাকবে। যার শুরুটাই এতটা অনিশ্চিত এবং অপসৃয়মান, তার উপর কতটা ভরসা করা যায়? তাছাড়া, যে কোনো সময় বিজ্ঞানের শেষ মানে তো হল মানুষের জ্ঞানের শেষ। তার বাইরে যা কিছু তা অজ্ঞানতার অন্ধকারে ঢাকা। “আলো-আঁধারি” নয়, শুধুই আঁধার। সেখানে অধ্যাত্মবাদের রাজত্ব হলে তো তাকে অজ্ঞতার সমার্থক বলে ধরে নিতে হয়। অথচ, সপ্তদশ শতাব্দের বিরাট প্রতিশ্রুতিমান কিন্তু অকালে প্রয়াত যুক্তিবাদী দার্শনিক বারুখ স্পিনোজা (১৬৩২-৭৭) সেই কত কাল আগেই আমাদের সাবধান করে বলে রেখেছেন: “Ignorantia non est argumentum!” [Cited by Engels 1974, 201] যার অর্থ, অজ্ঞতা কখনও কোনো কিছুর সপক্ষে যুক্তি হতে পারে না। যে কোনো চিন্তাধারা বা মতাদর্শের পক্ষেই এটা অত্যন্ত মর্যাদা হানিকর।

আমার দ্বিতীয় আপত্তি ইতিহাসের তরফে। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ঘটনাটা বাস্তবে একেবারেই উল্টোভাবে ঘটেছিল। মানবজাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আদিম প্রস্তর যুগ থেকে শুরু করে ধাতু যুগের বেশ কিছুদিন পর্যন্ত মানুষ চলেছিল সরল প্রকৃতিবাদী চিন্তাধারা (primitive naturalism) নিয়ে। কিন্তু সভ্যতার দোরগোড়ায় পৌঁছে যখন থেকে মানুষ দার্শনিক স্তরে সূক্ষ্ম তত্ত্ববিচারে প্রবৃত্ত হল—চিনে কনফুসিয়াস (খ্রিঃপূঃ ৫৫১-৪৭৯), ভারতে যাজ্ঞবল্ক্য (খ্রিঃপূঃ ৬ষ্ঠ-৫ম শতাব্দ), গ্রিসে প্লাতো (খ্রিঃপূঃ ৪২৭-৩৪৭) প্রমুখর দর্শনচর্চার হাত ধরে যার সূচনা—তখন থেকে ভাববাদ অধ্যাত্মবাদই তার প্রায় সমস্ত বৌদ্ধিক অনুশীলনকে গ্রাস করে নিয়েছিল। প্রকৃতিবাদ (naturalism) ও আদি বস্তুবাদ (proto-materialism) তার পাশাপাশি অতি ক্ষীণ ধারায় অত্যন্ত কোনঠাসা অবস্থায় কোনো রকমে টিকে থেকেছিল। কারণ, সেই কালে ধর্মতাত্ত্বিকরা এবং ধর্মীয় সংগঠনের কর্তাব্যক্তিরা ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক দর্শনের বাইরে আর কোনো চিন্তাধারাকেই সমাজের বুকে চর্চা হতে করতে এবং চলতে দিতে চাইতেন না।

এই চতুর্দিক ব্যাপ্ত অধ্যাত্মবাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তির বেড়াজাল ছিন্ন করে বেরিয়ে এসে এবং একটার পর একটা ক্ষেত্রে তার শিক্ষা ও নির্দেশ অমান্য ও অগ্রাহ্য করে তবেই তো পঞ্চদশ শতকে রেনেশাঁসের উষালগ্ন থেকে আধুনিক বিজ্ঞানের জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল। কোনো কোনো বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিক এটা সচেতনভাবে ধরতে পেরেছিলেন, যেমন, রোজার বেকন (১২১৪-৯২), মিগুয়েল সার্ভেতো (১৫১১-৫৩), জিওর্দনো ব্রুনো (১৫৪৮-১৬০০), তোমাসো ক্যাম্পানেল্লা (১৫৬২-১৬৩৯), রবার্ট বয়েল (১৬২৭-৯১), জন টোল্যান্ড (১৬৭০-১৭২২), পল অঁরি দিয়েত্রিচ ওলবাখ (১৭২৩-৮৯), চার্ল্‌স ডারউইন (১৮০৯-৮২), জন টিন্ড্যাল (১৮২০-৯৩), প্রমুখ। আবার কারোর কারোর ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে স্বতস্ফূর্তভাবে, তাঁদের অজ্ঞাতসারে বা অনিচ্ছায়। যথা—নিকোলাস কোপারনিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩), গ্যালিলেও গ্যালিলেই (১৫৬৪-১৬৪২), জোহান কেপলার (১৫৭১-১৬৩০), বা আইজ্যাক নিউটন। কিন্তু সর্বক্ষেত্রেই যেটা সাধারণভাবে ঘটতে দেখা গেছে তা হল, “Science began where and when human thinking took leave from spiritualism”; অর্থাৎ, যে দেশে যখন যার ক্ষেত্রে যতটা পরিমাণে আধ্যাত্মিক চিন্তাধারাকে বিদায় জানানো হয়েছে, চিন্তার জগতে যত এর প্রভাব হ্রাস পেয়েছে, সেখানে তাঁর ক্ষেত্রে তখন সেই অনুপাতেই বিজ্ঞানের বিকাশ ঘটেছে।

হ্যাঁ, দু চারটে উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে বিষয়টা।

ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইত্যাদি দেশের থেকে এটা যেমন ইতিবাচক অভিমুখে বোঝা যায়, তেমনই ইতালির ঘটনাবলি দেখে এটা নেতিবাচক অভিমুখেও মিলিয়ে নেওয়া যায়। প্রথমোক্ত দেশগুলোতে সনাতন খ্রিস্টধর্মের দাপট খুব দ্রুত কমে যাওয়া এবং রোমান ক্যাথলিক চার্চের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ হ্রাস পাওয়ার ফলে বিজ্ঞান দ্রুত এগিয়ে যেতে পারল। আর যে দেশের মাটিতেই ইউরোপীয় রেনেশাঁসের সুগম সঙ্গীত প্রথম বেজে উঠেছিল, শিল্প সাহিত্য ভাস্কর্য সঙ্গীত বিজ্ঞান কারিগরিবিদ্যা ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে পেত্রার্ক (১৩০৪-৭৪), বোকাচ্চিও (১৩১৩-৭৫), লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯), মিকেলেঞ্জেলো (১৪৭৫-১৫৬৪), রাফায়েল (১৪৮৩-১৫২০), কোপারনিকাস, গ্যালিলেও, তরিসেলির (১৬০৮-৩৯) মতো অসংখ্য বহুমুখী এভারেস্ট প্রতিভার জন্ম হয়েছিল, সেখানে ঈশ্বরের মহিমা, বাইবেলের অভ্রান্ততা ও চার্চের শাসন নিয়ে অত্যধিক গোঁড়ামি ও বাড়াবাড়ির ফলে—আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১৮৯৪-১৯৭৪)-র কথায়—সেই ইতালি দেশই সর্বক্ষেত্রে “পিছিয়ে পড়ল”। [বসু ১৯৯২, ১৭৫] বিজ্ঞানের বিকাশ সেখানে অন্তত দুশ বছরের জন্য থমকে রইল। ব্রুনোর নৃশংস হত্যা এবং গ্যালিলেওর উপর রোমান চার্চের ন্যক্কারজনক নির্যাতনের পর বিজ্ঞান—এবং সেই সঙ্গে শিল্প সাহিত্য চারুকলা—সবই চলে গেল ইতালির বাইরে।

আমাদের প্রিয় পবিত্র ভারতভূমি থেকেও একই রকম সাক্ষ্য পাওয়া যায়। বিশ্বের প্রাচীনতম সাহিত্য ঋগবেদ খোলা চোখে পড়ে দেখুন। দেখবেন, সেখানে ঈশ্বর নেই, ব্রহ্ম নেই, আত্মা-পরমাত্মার গল্প নেই, স্বর্গ নরকের উল্লেখ নেই। ঋগবৈদিক কবিরা মনের সুখে সোজা সাপটা অদ্বৈতার্থক ভাষায় ব্যক্ত করেছেন তাঁদের বাস্তব জীবনের রোজনামচা, তাঁদের প্রকৃতি প্রেম, ভোজন প্রীতি, গোধন গোমাংস ও অন্যের উৎপাদিত শস্যের প্রতি তাঁদের দুর্নিবার স্বাভাবিক টান! পৃথিবীর সমস্ত দেশের প্রাচীন কালের মানুষের মতোই স্বাভাবিক এই চাহিদা। তবে, অন্য দেশে কেউ এই ভাবে প্রাণ খুলে সেই ইচ্ছার কথা লিখে যায়নি, বৈদিক জনগোষ্ঠীর লোকেরা রেখে গেছেন।

তাই বুঝি আধ্যাত্মিক ভাবে আপ্লুত স্বামী বিবেকানন্দের (১৮৬৩-১৯০২) অসতর্ক আক্ষেপ: “বেদের প্রথম অংশের আদর্শ অপর অংশ উপনিষদের আদর্শ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। . . . ইহলোকে ও পরলোকে ভোগই এর মূল কথা। . . . অশ্রু নেই, দুঃখ নেই—শুধু হাসি আর আনন্দ। পেটের ব্যথা নেই। যত পার, ভোজসভায় যোগদান কর।” [বিবেকানন্দ ১৯৮৯ক, ২৭১] অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭১-১৯৫১) অবশ্য প্রশংসা করেই লিখেছেন যে বৈদিক ঋষিদের “কামনা-বাসনা এই পৃথিবীতেই অনেকটা বদ্ধ, ধন ধান সৌভাগ্য স্বাস্থ্য দীর্ঘ জীবন, এমন সব পার্থিব জিনিস।” [ঠাকুর ১৯৮৩, ৪]

বন জঙ্গল আর সিন্ধু গঙ্গা যমুনা নদীর অববাহিকায় স্থায়ী বসতের খোঁজে ঘুরে বেড়ানো সেই যাযাবর বৈদিক জনগোষ্ঠীর লোকেরাই মাত্র সাত আটশ বছরের মধ্যে তৈরি করে ফেললেন একটা সুগঠিত সুবিন্যস্ত ভাষা—বৈদিক যুগের কথ্য ভাষাকে সংস্কার করে নির্মিত বলে ‘ক্ত’ প্রত্যয় যোগে যার নাম হল ‘সংস্কৃত’। প্রাচীন সমকালে পৃথিবীতে এর সমোপম আর কোনো ভাষা ছিল না। এতে ছিল মানুষের উচ্চারণক্ষম এবং প্রয়োজনীয় অধিকাংশ স্বনিম (phoneme)-এর আনুষঙ্গিক বর্ণমালা। বর্ণগুলিকে উচ্চারণের পদ্ধতি অনুযায়ী শুধু যে স্বর ও ব্যঞ্জন ধ্বনিতে ভাগ করা হয়েছে তাই নয়, উচ্চারণের শারীরস্থান ও শারীর ক্রিয়া অনুযায়ী তাদের স্থান ও বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত হয়েছে। এই কাণ্ড পৃথিবীর আর কোনো ধ্রুপদী ভাষাতেই দেখা যায় না।

ভাষা তো চিন্তার বাহন। সেই ভাষা নিয়ে যাদের এত সাধনা, এত মনক্ষেপ, বোঝাই যাচ্ছে, জাগতিক সমস্যার বাস্তব সমাধান নিয়ে তাদের বুদ্ধিশীলনের আগ্রহ উদ্দীপনা কত প্রবল ছিল।

ছিল যে, তারও কিছু নমুনা দেখে নেওয়া যাক।

প্রাচীন ভারতে, বৌদ্ধ যুগের সূচনা কালেই, তক্ষশীলায় চরক ও সুশ্রূতর (খ্রিঃপূঃ ৪র্থ শতক) পরিচালনায় চিকিৎসাবিদ্যা (ভেষজ ও শল্য—উভয় ক্ষেত্রেই) একটা সুসংবদ্ধ কাঠামো নিয়ে প্রত্যক্ষ বিজ্ঞান (empirical science) হিসাবে অনেক দূর পর্যন্ত বিকশিত হয়েছিল। গাণিতিক সংজ্ঞা হিসাবে শূন্যের ধারণা এই ভারতবর্ষের কোনো প্রাচীন মনীষীরাও চিনের পাশাপাশি প্রায় আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন। সন্দেহ হয়, আধ্যাত্মিক গুরুদের দাপটেই বোধ হয় তাঁর নাম এবং কাজটা ইতিহাসের পাতা থেকে চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে। সেই তিনি সেদিন ভাবতে পেরেছিলেন, পরম নাস্তিত্ব (absolute nothingness) বলে কিছু হয় না বা হতে পারে না। জগতে এমন কিছুই নেই যা পরম নাস্তিত্ব থেকে উৎসারিত। শূন্য মানে কিছু নয়—তা নয়; শূন্য মানে কিছু একটা নেই। কোনো কিছু নেই মানে হল একটা বিশেষ সময়ে একটা বিশেষ জায়গায় সেই বিশেষ কোনো কিছুর অনুপস্থিতি (absence of something)। আর এইভাবে কোনো বস্তুর বিশেষ ক্ষেত্রে অনুপস্থিতি পরিমাণগতভাবে, অর্থাৎ, অঙ্কের ভাষায়, বোঝাতেই তাঁরা শূন্যকে এইভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। বস্তুবাদী চিন্তার কতখানি ব্যাপ্তি ও গভীরতা থাকলে তবে এইভাবে চিন্তা করা যায়—আজ সকলের ভেবে দেখা দরকার। [শূন্য-ধারণা ও এর উৎপত্তি সম্পর্কে আরও আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য: মুখোপাধ্যায় ২০১৭]

এর কিছু সাহিত্য সাক্ষ্যও আছে।

ঔপনিষদিক যুগে, যখন ভাববাদের ভালো রকম বিকাশ ঘটে গেছে, ঈশ্বর ব্রহ্ম আত্মা পরমাত্মার ধারণা এসে গেছে এবং সেই সব নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে, সেই সময় তৈত্তিরীয় উপনিষদে দেখা গেল, বরুণ পুত্র ভৃগু পরম জ্ঞান লাভ করার পর “হা-বু অন্ন” বলে অন্নের জয়গান করেন, অন্নকেই ব্রহ্ম বলে ঘোষণা করেন; [তৈত্তিরীয় উপনিষদ, ৩/২-১০] আর ছান্দোগ্য উপনিষদে দেখি, আরুণি তাঁর পুত্র শ্বেতকেতুকে ভোজনের সঙ্গে স্মৃতির সম্পর্ক, অর্থাৎ, দেহের উপর মনের নির্ভরশীলতা, বোঝাতে সুন্দর এক পরীক্ষার আয়োজন করে বসেছেন। [ছান্দোগ্য উপনিষদ, ৬/১-৭]

কিন্তু সেই সময়ে শুরু হয়ে গিয়েছিল আধ্যাত্মিক অন্বেষণ—মানুষের জন্মের আগে তার অবস্থা কী ছিল এবং মৃত্যুর পরেই বা তার পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে চুলচেরা গবেষণা ও বিতর্ক। আত্মা কোথা হইতে আসে, কোথায় ফিরিয়া যায়—সেই গোয়েন্দাগিরি! অথচ, মাঝখানের পার্থিব জীবনের আসল অস্তিত্ব আর গুরুত্ব পাচ্ছে না। দর্শন জগতের আচার্যরা প্রায় সবাই তখন ধীরে ধীরে মাটির ধুলিকণা ছেড়ে ধ্যানমগ্ন ভূমাদর্শী ভূমিহীন ভাবচাষি হওয়ার পথে পা বাড়িয়ে ফেলেছেন। যত তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি বা রাজদরবারে প্রতিষ্ঠা বৃদ্ধি পেয়েছে ততই জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে নেমে এসেছে ঘনায়মান অন্ধকার, অন্ধতা ও বন্ধ্যাত্ব।

বৌদ্ধধর্ম এসে বৈদিক যুগের যাগযজ্ঞ পশুবলি জাতীয় আদিম মন্ত্রজালের স্তর থেকে এদেশের মানুষকে মুক্ত করে এক নতুন ভাববিপ্লবে সারা ভারতবর্ষকে আপ্লুত করল, শিক্ষা বিস্তার ঘটাল, তক্ষশীলা নালন্দা বিক্রমশীলা ও অন্য বহু জায়গায় জ্ঞানচর্চার বড় বড় কেন্দ্র স্থাপন করল, ব্যবসা বাণিজ্যে উৎসাহ সৃষ্টি করল। কিন্তু কয়েকশ বছর পরে এই ধর্মেরই একদল দার্শনিক এসে কর্মমুখর মানুষকে বোঝাতে শুরু করল, এই মানব জীবন বড় বিষাদময়; এখানে জরা আছে, ব্যাধি আছে, মৃত্যু আছে, শোক আছে। এই চির দুঃখের চক্র থেকে মুক্তি পেতে হলে পার্থিব কামনা বাসনা ছাড়তে হবে, যাতে আর পুনর্জন্ম না হয়, অর্থাৎ, নির্বাণ লাভ করতে হবে।

এই প্রথম ভারতীয় ভাববাদী আধ্যাত্মিক চিন্তায় এল পুনর্জন্মের ধারণা। তার থেকেই কর্ম এবং কর্ম ফল। বৈদিক ঐতিহ্য থেকে প্রেরণা নিয়ে মীমাংসা দর্শনের প্রবর্তক জৈমিনী এবং তারপরে কুমারিল ভট্ট (২০০ খ্রিঃপূঃ-২য় শতাব্দ) ঐন্দ্রজালিক যজ্ঞ ভিত্তিক কর্মকে ধরে ইহলৌকিক কর্মকাণ্ডের উপর জোর দিয়ে প্রাচীন বস্তুবাদকে বাঁচিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মহাযানী বৌদ্ধ দার্শনিক নাগার্জুন (১ম-২য় শতক) এসে যে শূন্যবাদী দর্শনের প্রচার জুড়ে দিলেন, তাতে ঐহিক জীবনের তাৎপর্য হয়ে পড়ল শূন্য। অবশেষে এলেন শঙ্করাচার্য (৭৮০-৮১২)। নাগার্জুনের শূন্যবাদকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে তিনি যে অদ্বৈত বেদান্ত মত প্রচার করলেন, তা ভাববাদী দর্শনকে নিয়ে গেল মনন জগতের শীর্ষদেশে, আর বিজ্ঞানচর্চাকে ঠেলে দিল পাতালের অতলান্ত অন্ধকার গুদামঘরে।

খুবই বিস্ময়ের কথা, আমাদের দেশের অধিকাংশ জ্ঞানীগুণী ব্যক্তি স্বামী বিবেকানন্দকে অনুসরণ করে এই চূড়ান্ত ভাববাদী জ্ঞানবিরোধী দর্শনকেই বিশাল গুরুগম্ভীর ভাবসমৃদ্ধ জ্ঞানের আকর এবং আমাদের পরম গর্বের বিষয় বলে গণ্য করে থাকেন। মনে হয়, তাঁরা প্রাচীন ভারতবর্ষে জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চার অগ্রগতি ও মধ্যযুগে তার অধঃপতনের ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষ খোঁজখবর না নিয়ে এবং তার কারণকার্য অন্বেষণে মাথা না দিয়েই এই অগৌরবের গরিমায় তৃপ্তি পান। এমনকি, এই দর্শনের দৃষ্টি আচ্ছন্নকারী ভূমিকা সম্পর্কে রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩), ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১) থেকে শুরু করে অনেকেই সতর্ক করা সত্ত্বেও আমরা তাতে কান দিইনি।

সেই ইতিহাস স্মরণ ও বিশ্লেষণ করেই আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (১৮৬১-১৯৪৪) এবং সত্যেন্দ্র নাথ বসু গভীর পরিতাপের সঙ্গে বলেছিলেন যে বেদান্ত দর্শনের মতো নানা রকম ভাববাদী চিন্তাধারার কু-প্রভাবের ফলেই একটা সময় থেকে আমাদের দেশে জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রফুল্ল চন্দ্রের বক্তব্য ছিল: “The Vedanta philosophy, as modified and expanded by Sankara, which teaches the unreality of the material world, is also to a large extent, responsible for bringing the study of physical science into disrepute.” [Roy 1903, 197ff] আর সত্যেন্দ্রনাথ বসু দেখিয়েছিলেন: “আমাদের শিক্ষাকেন্দ্রগুলিতে ধারাবাহিকভাবে যে পারলৌকিকতার পোষকতা করা হত—যা ছিল আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতির মেরুদণ্ডস্বরূপ—তাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হত শাশ্বত সত্যের অতন্দ্র মনন, চিন্তন, নিদিধ্যাসনের উপরে। এরই ফলে ব্যক্তিবিশেষ আত্মজ্ঞান লাভ করতে এবং পৃথিবীকে দুদিনের পান্থশালা মনে করতে সক্ষম হতেন। . . . ভারতীয়রা এরই জন্য শীঘ্রই জাগতিক ব্যাপারে আধিপত্য হারাল . . .।” [বসু ১৯৯২, ৮৩] অধ্যাপক সমরেন্দ্র নাথ সেন (১৯১৮-৯২)-ও মনে করতেন, নবম শতাব্দের দ্বিতীয়ার্ধ (অর্থাৎ, শাঙ্কর বেদান্তের প্রতিষ্ঠাকাল) থেকেই ভারতে বিজ্ঞানচর্চার অবক্ষয় শুরু হয়। [সেন ১৯৯৪, ২, ১০৬]

তবে এর সাথে আরও একটা সমস্যার কথাও মনে রাখা দরকার। প্রফুল্লচন্দ্র ও মেঘনাদ সাহা (১৮৯৩-১৯৫৬)-র মতে, বেদ বেদান্ত উপনিষদ গীতা ইত্যাদি অনুমোদিত এবং মনু ও শঙ্করের মতো চিন্তানায়কদের সমর্থনপুষ্ট বর্ণভেদ তথা জাতিভেদ প্রথার ব্যাপক প্রসারের ফলেই হয়ত সেই সময়ে হাতে কলমে বিজ্ঞানের পরীক্ষা নিরীক্ষা করার অভ্যাস বন্ধ হয়ে যায়। [রায় ২০০১; সাহা ১৯৮৬]

প্রায় সহস্রাধিক বছর পরে, একেবারে ঊনবিংশ শতাব্দে এসে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার দত্ত (১৮২০-৮৬), রাজেন্দ্রলাল মিত্র (১৮২২-৯১), প্রমুখ রেনেশাঁসের প্রতিনিধিবৃন্দ উপলব্ধি করলেন এই সব সামন্তবাদী ভাববাদী দর্শনের জীবন-বিরূপ কল্পলোকায়ত বিজ্ঞানবিরোধী ভূমিকা। জ্ঞানের রাজ্য থেকে অতি সন্তর্পনে সমস্ত অধ্যাত্মবাদী চিন্তা ও যুক্তিকে বহিষ্কার করে তাঁরা আধুনিক বৈজ্ঞানিক ভাবধারা পুষ্ট ধর্মনিস্পৃহ শিক্ষার ভিত স্থাপন করলেন। তারপর থেকেই ভারতেও আধুনিক বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণা আরম্ভ হল। আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু (১৮৫৮-১৯৩৭) থেকে শুরু করে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী একে একে উঠে এলেন। ১৮৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হল ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স। সেখানে গবেষণা করেই ১৯৩০ সালে চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামণ (১৮৮৮-১৯৭০) পেলেন বিজ্ঞানে ভারতের এযাবত একমাত্র নোবেল পুরস্কার।
[চলবে]

427 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: নৈঋত

Re: বিজ্ঞানের অ(নেক?)-ক্ষমতা # পর্ব-১

হুম। চলুক। ভাল লাগছে
Avatar: সিকি

Re: বিজ্ঞানের অ(নেক?)-ক্ষমতা # পর্ব-১

পড়ছি।
Avatar: pp

Re: বিজ্ঞানের অ(নেক?)-ক্ষমতা # পর্ব-১

দারুন হোচ্ছে ।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন