Samrat Amin RSS feed

Samrat Aminএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    (টিপ্পনি : দক্ষিণের কথ্যভাষার অনেক শব্দ রয়েছে। না বুঝতে পারলে বলে দেব।)দক্ষিণের কড়চা▶️এখানে মেঘ ও ভূমি সঙ্গমরত ক্রীড়াময়। এখন ভূমি অনাবৃত মহিষের মতো সহস্রবাসনা, জলধারাস্নানে। সামাদভেড়ির এই ভাগে চিরহরিৎ বৃক্ষরাজি নুনের দিকে চুপিসারে এগিয়ে এসেছে যেন ...
  • জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-১৪
    তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায়...আসলে যে কোনও শিল্প উপভোগ করতে পারার একটা বিজ্ঞান আছে। কারণ যাবতীয় পারফর্মিং আর্টের প্রাসাদ পদার্থবিদ্যার সশক্ত স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। পদার্থবিদ্যার শর্তগুলি পূরণ হলেই তবে মনন ও অনুভূতির পর্যায় শুরু হয়। যেমন কণ্ঠ বা যন্ত্র ...
  • উপনিবেশের পাঁচালি
    সাহেবের কাঁধে আছে পৃথিবীর দায়ভিন্নগ্রহ থেকে তাই আসেন ধরায়ঐশী শক্তি, অবতার, আয়ুধাদি সহসকলে দখলে নেয় দুরাচারী গ্রহমর্ত্যলোকে মানুষ যে স্বভাবে পীড়িতমূঢ়মতি, ধীরগতি, জীবিত না মৃতঠাহরই হবে না, তার কীসে উপশমসাহেবের দুইগালে দয়ার পশমঘোষণা দিলেন ওই অবোধের ...
  • ৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড
    পুরোনো কথার আবাদ বড্ড জড়িয়ে রাখে। যেন রাহুর প্রেমে - অবিরাম শুধু আমি ছাড়া আর কিছু না রহিবে মনে। মনে তো কতো কিছুই আছে। সময় এবং আরো কত অনিবার্যকে কাটাতে সেইসব মনে থাকা লেখার শুরু খামখেয়ালে, তাও পাঁচ বছর হতে চললো। মাঝে ছেড়ে দেওয়ার পর কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ ...
  • কাশ্মীরের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসঃ ১৯৩০ থেকে ১৯৯০
    ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সূর্য অস্ত যায় ১৯৪৭ এ। মূল ভারত ভূখন্ড ভেঙে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হয়। কিন্তু ভুখন্ডের ভাগবাঁটোয়ারা সংক্রান্ত আলোচনচক্র ওতটাও সরল ছিল না। মূল দুই ভূখণ্ড ছাড়াও তখন আরও ৫৬২ টি করদরাজ্য ছিল। এগুলোতে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

প্রেমিক এজিদ

Samrat Amin

কথায় আছে Everything is fair in love and war. কথাখানি যার জীবনপ্রবাহের সঙ্গে পুরদস্তুর খাটে সে এজিদ। খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বছর তিনেক ( ৬৮০ - ৬৮৩ খ্রী:) মুসলিম উম্মার স্বঘোষিত খলিফা এজিদ ইবনে মাবিয়া। দামেস্কাধিপতি পিতা মাবিয়া ছিলেন নবী করিম (সাঃ) এর একনিষ্ঠ ভক্ত। আদর করে পুত্রের নাম রেখেছিলেন এজিদ। পুত্রের প্রতি অপত্য স্নেহে কখন যেন কালের ফেরে ভুলেই গেছিলেন নবী করিমের ভবিষ্যদ্বাণী - "তোমার পুত্রই হবে আমার কলিজার টুকরো, আমার নয়নের পুত্তলি আমার নাতিদ্বয় ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেনের ঘাতক"। নবী সাহেবের ভবিষ্যদ্বাণী অন্যথা হবার নয়। বাদশাহ নামদার এজিদ পুরো ইমাম বংশকে প্রায় নির্বংশ করে ছেড়েছেন। ভাগ্যক্রমে কোন প্রকারে বেঁচে ফেরেন ইমাম হোসেনের কনিষ্ঠ পুত্র জয়নাল আবেদিন।

ছায়াসঙ্গী মারওয়ানের প্ররোচনায় কারবালার যুদ্ধে ফেরাত নদীর জল আটকে রেখেছিল এজিদ। তাকে পূর্ণ সহযোগীতা করে কুফাধিপতি আব্দুল্লা জেয়াদ। কারবালার প্রান্তরে তৃষ্ণার্ত মদিনাবাসীরা এক এক করে তীব্র জলকষ্টে মৃত্যুবরণ করছে। কাসেদের সংবাদে দামেস্কার রাজসিংহাসনে বসেই তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে দামাস্কার স্যাডিষ্ট মহারাজ এজিদ। কিন্তু এহেন হৃদয়হীন সম্রাটের পিঞ্জরও যে এককালে কোন কুহকিনীর প্রেমের মায়াজালে বাঁধা পড়তে পারে কাঁহাতক আর ভাবা যায় ? হোসেন বংশ ছারখার করে দিয়ে ইমাম পরিবারের জীবিত নারী সদস্যদের এনে দামেস্কায় রাজবন্দী করে রাখে এজিদ। মদিনার নারীকুলের সঙ্গে রাজকারাগারে তখন বন্দী নবীপত্নী বয়স্কা উম্মে সালমা, মরহুম ইমাম হোসেনের স্ত্রী সহেরাবানু, পুত্র জয়নাল ও কন্যা ফতেমা এবং মরহুম ইমাম হাসানের দুই স্ত্রী হাসনেবানু ও জয়নাব। এই সেই জয়নাব যে রমনীর মুখচন্দ্রিমায় ধরনীপতি এজিদের বয়ঃকাল বুঁদ হয়েছিল। হৃদয়ের প্রতি শিরায় শিরায় প্রতি রক্তবিন্দুতে যে অসামান্যা রুপসী কিশোরীর অস্তিত্ব তাঁকে জীবনভর উন্মাদ করে রেখেছে এই সেই জয়নব। মহীপাল এজিদের মহাশক্তিসম্পন্ন মজ্জা পরকর-শোভিত মর্দিত কমলদলের মুমূর্ষু অবস্থায় ঈষৎ আভায় গলে বিপরীত ভাব ধারন করেছিল যার প্রেমে বিভোর হয়ে, এই সেই জয়নব।

স্বৈরচারী এজিদ চাইলে ইমাম পরিবারের নারীকুলকে পুড়িয়ে খাক করে দিতে পারত। কিংবা তাদের পবিত্র রক্তে ধারালো তলোয়ার রাঙিয়েও দিতে পারত। কিন্তু করে নি, শুধু জয়নাবের জন্য। জয়নবের সামনেই জয়নবের আত্মীয়দের মুন্ডচ্ছেদ করতে পারত, করে নি, পাছে হৃদয়ের রানী জয়নব কষ্ট পায়। রাজসভায় জয়নাবকে হাজির করে অট্টহাসি নিয়ে জয়নাবের উদ্দেশ্যে এজিদের হুঙ্কার,
-- "প্রেয়সী জয়নাব, এখন তুমি কার ? যে হাসানের জন্য দামেস্কার মহারানীর বিভাব ঐশ্বর্য ত্যাগ করেছো, যে হাসানের জন্য এই এজিদকে ঘৃনার চোখে দেখেছো, যে হাসানের হাত ধরে জান্নাত লাভের স্বপ্ন দেখেছো, সেই হাসান এখন কোথায় ?"

কথাটা শোনামাত্র নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেনি জয়নব। নিজের প্রতি করুনায় ঘৃনায় নিজেকে শেষ করে দেওয়ার জন্য জয়নব যেই ছুরিটা বের করেছে দৌড়ে এজিদের সেনাপতি ওতবে অলিদ এসে আঁটকায়। এজিদের হৃদয়ের সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে ওঠে আরস । এজিদের মুখের ভাবে স্পষ্ট যে নিজ প্রানের ভয় অপেক্ষা জয়নবের প্রানের ভয় তাঁর অনেক বেশি। প্রেয়সী জয়নাব আত্মহত্যা করতে পারে এই আশঙ্কাতেই সারা শরীরে ক্ষনিকের জন্য রক্তপ্রবাহ যেন থমকে যায়।

বেশ কয়েকবছর আগের কথা। জয়নব তখন অতি সাধারণ প্রজা, আরব মুলুকের ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী আব্দুল জব্বারের কিশোরী স্ত্রী। স্বামী তেমন সুদর্শন পুরুষ না হলেও স্ত্রী জয়নব তার প্রতি ভক্তিমতী ছিল। স্বামী পদসেবাই জান্নাত লাভের সুপ্রশস্ত পথ, সেই চেতনা তার মনে সদা জাগ্রত ছিল। পতিব্রতা কিশোরী জয়নব লৌকিক সুখে মোটেই লালায়িত ছিল না। আর এজিদ তখন কৈশর পেরিয়ে সদ্য যৌবনে পা দিয়েছে। সৈন্য সামন্ত নিয়ে এক ঝলমলে সুন্দর সকালে মৃগয়ায় যাচ্ছেন। রাজকীয় পদযাত্রা দেখতে রাস্তার দুধারে প্রজাগনের উপচে পড়া ভিড়। আব্দুল জাব্বারের বাড়ির পাশ দিয়েই এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে সুদীর্ঘ রাজপথ। উদাসীন কিশোরী জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে অনন্ত বিস্তৃত আকাশপানে। সাদা মেঘের ভেলা, পাখির কূজন, কিশোরীর মন উচাটন। তার মনই জানে কোন আকাশপাতাল ভাবনায় সে ডুবে আছে সারা সকাল। যে মূহুর্তে রাজকীয় পদব্রজ তার বাড়ির পাশের রাস্তার ধূলো ছুঁয়ে যাবে সম্বিত ফেরে কিশোরীর। এজিদকে দেখেই তড়িঘড়ি জানালা বন্ধ করে দেয়। যে এজিদকে দেখার জন্য এত এত উৎসুক মানুষের সমাগম সেই রাজপুত্রদর্শনে কনামাত্র আগ্রহ ছিল না তার। কিন্তু রূপবতী কিশোরীর অসামান্য রূপলাবন্য প্রেমপিপাসু এজিদের চোখ এড়াবে কি করে ? এড়ায় নি। কেই বা জানত যে সেই বিশেষ মুহুর্ত লম্বা ইতিহাস বয়ে আনবে।

পরের দিন গুলো এজিদের কেটেছে অস্থিরতায়। জয়নবের দোলায়মান কানের দুল, কেশ-শোভা মুক্তার জালি, চপল চাহনি শয়নে স্বপনে এজিদকে ব্যাকুল করে দেয়। শিরায় শিরায় রক্তবিন্দুর প্রতি পরমানু অংশে নিদ্রাহীন মধ্যরাত্রিতে জয়নব লাভের চিন্তা তাঁকে উন্মাদ করে দেয়। চিন্তার আধার মস্তিস্ক। কিন্তু ভালবাসার চিন্তাটুকু মস্তিস্কে উঠেই একেবারে হৃদয়ের অন্তস্থলে জায়গা করে নেয়। তা যখন মনে উদয় হয় অন্তরে ব্যাথা লাগে, হৃদপিন্ডে আঘাত হয়। হৃদয়তন্ত্রী বেহাগ রাগে বেজে ওঠে। কিন্তু মুসলিম উম্মার সদস্য পরহেজগার সাচ্চা মুসলমান খলিফা মাবিয়ার পুত্র এজিদের পরস্ত্রীর প্রতি নজর ইসলামে যে গর্হিত অপরাধ। কিন্তু প্রেমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মন কি আর সেই বাধা মানবে, না মানতে চাইবে ? কত কত মহাতেজস্বী জিতেন্দ্রিয় মহাশক্তিবিশিষ্ট মহাপুরুষ এই ফাঁদে পড়ে তত্ত্বজ্ঞান হারিয়েছে, তার সংখ্যাও প্রচুর। ভেবে দেখলে বিশ্বাস হয় মানুষের মনেই ভালবাসার জন্ম, এটা কাউকেই শিক্ষা দিতে হয় না, অন্যের দেখেও এই শিক্ষা আসে না। ভালবাসা জন্মায়। কোন কিছুই একে বাধা দিতে পারে না।

প্রানচঞ্চল এজিদকে দিনকয়েক ধরে আকস্মাৎ এমন উদাস হয়ে যেতে দেখে উদ্বিগ্ন মা আদর করে ছেলেকে কাছে ডেকে বলে,
-- খোকা, বল না তোর কি হয়েছে ? সব সময় এমন উদাস হয়ে থাকিস, কারুর সঙ্গে কথা বলিস না, আনমনা হয়ে জানালার ধারে সারাটা দিন তাকিয়ে থাকিস, ঠিকঠাক খাওয়াদাওয়াও করিস না, কি হয়েছে তোর, খোকা, বল না।
মায়ের দিকে ছলছল চোখে এক ফালি তাকিয়েই আবার জানালার পানে দিগন্ত আকাশে এজিদের উদাস চোখ আটকে যায়। পুত্রের মুখে শত শত বার চুম্বন করে, আদর করে, কাছে টেনেও মা তার খোকার মুখ থেকে একটি কথাও বের করতে পারে নি।
-- তোর কিসের অভাব, খোকা ? তুই দামেস্কার রাজপুত্র, সৈনসামন্ত, ধনদৌলত, ঐশ্বর্য সবই যে তোর। তবুও তোর এত দুঃখবিলাস কেন রে খোকা ? বল না, খোকা, কি হয়েছে তোর ?"

উদ্বিগ্ন পিতাও আর থাকতে পারেন নি। মা-ব্যাটার কথার মাঝেই হাজির হলেন। এজিদ দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। কন্ঠরোধ হয়ে গেল, জীভে জড়তা চলে এল। মায়ার আসক্তির এমনই শক্তি যে বাবা মার কাছে মনের ভাব প্রকাশের সুযোগ পেয়েও কিছু বলতে পারল না। সাধ্যাতীত চেষ্টা করেও পিতার কাছে মনের কথা কিছুতেই খুলে বলতে পারল না। বহুকষ্টে "জ" শব্দটি উচ্চারন করল ঠিকই, কিন্তু সেটা মাবিয়ার কান অব্দি পৌঁছালোই না। কথাটি যেন চোখের জলেই ভেসে গেল, 'জয়' শব্দটি কেবল জলমাত্রই সার হল। চোখের জল গাল বেয়ে ঝরে বুক পর্যন্ত গড়িয়ে গেল। সেই দৃশ্য দেখে স্নেহবৎসল পিতা আশঙ্কা আর উদ্বেগে দগ্ধিভূত হতে লাগল। পিতা বোঝেন নি এজিদ প্রেমের কাঙাল। সে রাজ্য চায় না, সৈন্যসামন্ত, রাজমুকুট, রাজসিংহাসন কিচ্ছু চায় না। সে যে রত্ন চায় সেটা পিতার ভাবনার অগোচর, বুদ্ধিরও অগোচর।

শেষে নিরুপায় হয়ে হাতজোড় করে এজিদ কান্নাভেজা স্বরে বলতে শুরু করে,
-- "আব্বু, আমার দুঃখের সীমা নেই, উপশমের অন্ত নেই। আমি জানি আমার ধন দৌলত সব আছে, কিন্তু সেসব আমার দরকার নেই। যে চোখের চাহনিতে আমি বিদ্ধ হয়েছি সেই বেদনার উপশম নেই। আমি বাঁচতে চাই না, আব্বু। এই পৃথিবী ছেড়ে এমন এক জগতে আমি চলে যেতে চাই যেখানে হতাশা নেই, অভাব নেই, আশা নেই। সেই নির্জন স্থানে আমি যেতে চাই সবাইকে ছেড়ে। এর বেশি কিছু আমি বলতে পারব না। আমায় ক্ষমা করুন।"

দামাস্কার মহারাণী তৎক্ষনাৎ মহারাজ মাবিয়াকে ডেকে কানে কানে ফিসফিসিয়ে কি যেন বললেন। মা তার খোকার মাথায় গালে বার কয়েক হাত বুলিয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে চলে গেলেন। মহারাজ তার মহারানীর কথা মতো এজিদের সর্বক্ষনের ছায়াসঙ্গী মারওয়ানকে তলব করলেন।

-- ভাই, মারওয়ান, তুমি তো সবসময় এজিদের সঙ্গেই থাকো, কি হয়েছে এজিদের, তুমি কি কিছু জানো ?
-- দেখুন বাদশাহ নামদার, আপনি দামেস্কার অধিপতি, আপনি আমার অগ্রজ গুরুজন। আপনার কাছে আমি কিছু গোপন করব না ।
-- তাহলে বলো না কি হয়েছে ??
-- আপনার হৃদয়ের যষ্টি, নয়নের পুত্তলী, মস্তকের অমূল্য মণি, আপনার আশা মুকুল এজিদ এক বিবাহিতা নারীর প্রেমের বাহুডোরে বাঁধা পড়েছে।
-- সে কি কথা ? বিবাহিত নারীর প্রতি নজর ! এ তো চরম গুনাহ!
-- আমি বহুবার তাঁকে বুঝিয়েছি, বুঝতে চাইনি। শুধু বারবার বলেছেন যে তিনি যদি জয়নবকে না পান তাহলে তাঁকে জানাজা ক্ষেত্রে কাফনবস্ত্রে ধরাশায়ী দেখতে পাবেন।
-- মারওয়ান, তুমি সম্পর্কে আমার চাচাতো ভাই। উমায়েদ বংশের অভিজাত রক্ত তোমার শরীরেও বইছে। তুমি বুদ্ধিমান। আমি সারা মুসলিম জাহানকে একসুত্রে বেঁধে রাখতে পেরেছি। দক্ষতার সাথে রাজপাটও সামলায়। কিন্তু প্রেমের বিষাদসাগরে ডুবন্ত নিজ সন্তানকে কি করে তুলে আনব জানি না। সেই বিদ্যে আমার নেই। তুমিই বলে দাও না, মারওয়ান, পিতা হিসাবে আমার কি করা উচিৎ ?
-- আমি আর কি বলব, মহারাজ। যাতে রাজপুত্র এজিদের প্রানরক্ষা হয় সেটাই করুন। আপনি এই দামেস্কার সর্বেসর্বা । আপনার কাছে কোনকিছুই অসাধ্য নয়।
-- আমি মুসলিম উম্মার খলিফা। চরম ইসলাম বিরুদ্ধ কাজ আমি কি করে করব ? আমার ঈমান থাকবে না। সিংহাসন টলে যাবে।
-- আপনাকে কিছু করতে হবে না । ঐ নারীর নাম জয়নব। তার স্বামী আব্দুল জাব্বার নগরের অখ্যাত ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী। তাকে উধাও করে দেন।
-- সেটা আমি পারব না। আমি নবীজির উম্মত। এমন ইসলামবিরুদ্ধ কাজ করতে পারব না। এ কথা শোনাও পাপ। এ ধরনের কথা বলে আমায় জাহান্নামী কোরো না। তুমি আসতে পার।

জগতে শতশত ভালবাসার জন্ম হয়েছে। অনেকেই ভালবেসেছে। তাদের কীর্তিকলাপ ইহ জগতের শেষ দিন পর্যন্ত তাদের প্রেমকাহিনী মানবহৃদয়ে লেখা থাকবে। অনেকে বলবেন, পাত্রপাত্রী বিবেচনা চাই। কিন্তু তাদের বোঝা উচিৎ ভালবাসার সমুদ্র যখন হৃদয়াকাশে মানসচন্দ্রের আকর্ষনে ফুলে ওঠে, তখন আর পাত্রপাত্রী জ্ঞান থাকে না। পিতা, মাতা, সংসার ধর্ম, এমন কি ঈশ্বরকেও মনে থাকে কি না সন্দেহ। এতে এজিদেরই বা কি দোষ? এহেন নৈসর্গিক আদেশ অমান্য করতে এজিদের ক্ষমতা কতটুকু? ভালবাসার ক্ষমতা অসীম। সেখানে এজিদ অতি তুচ্ছ।

যত দিন যাচ্ছে এজিদ বেপরোয়া হয়ে উঠছে। জয়নবকে মনপ্রান সমর্পন করে জয়নব-রূপ-সাগরে আত্মবিসর্জন করে বসে আছে। জয়নবকেই জপমালা করে দিবানিশি জয়নব নাম জপ করছে। জয়নব ধ্যান, জয়নব জ্ঞান, জয়নব চিন্তামণি। প্রায়শই এখন তাঁকে দেখা যায় মারওয়ানের সঙ্গে কি যেন আলোচনা করে অতি সঙ্গোপনে। কাসেদ পাঠিয়ে আব্দুল জাব্বারকে একদিন রাজসভায় ডেকে পাঠালো। লালায়িত আব্দুল জাব্বারও দিন কয়েকের মধ্যে রাজসভায় হাজির। ভিতরের ঘরে এজিদ ও মারওয়ান আব্দুল জাব্বারকে ডেকে নিয়ে যায়। ধূর্ত মারওয়ান খোঁজ নিয়ে আগেই জেনে নিয়েছেন আব্দুল জাব্বার আর পাঁচটি সাধারন মানুষের মতোই সম্পদ ঐশ্বর্যের প্রতি হালকা লোভাতুর। ইনিয়েবিনিয়ে কথার জালে তাঁকে জড়িয়ে আসল কথাটি পেড়ে ফেলে।

-- জাব্বার, তোমার কাছে একটি প্রস্তাব আছে ?
-- কি প্রস্তাব হুজুর ?
-- যদি তুমি আমাদের দেওয়া প্রস্তাবটি মানো তবেই বলব ?
-- আপনারা অভিজাত উমায়েদ বংশের লোক। মান্যবার। আপনাদের প্রস্তাব অমান্য করব আমার ঘাড়ে ক'টি মাথা ?
-- তোমাকে আমরা উমায়েদ পরিবারের জামাই করতে চাই।
-- মানে ?
-- দামেস্কাধিপতি মাবিয়ার রূপবতী রাজকন্যা ও রাজপুত্র এজিদের বোন সালেহার সঙ্গে তোমার বিবাহ দিতে চাই। তুমি কি রাজি ?
এত ঐশ্বর্য এত সম্পদের হাতছানি উপেক্ষা করা আব্দুল জাব্বারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিছুক্ষন আমতা আমতা করার পর মাথা নেড়ে সে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু তার বিবাহিত স্ত্রী জয়নবের কি হবে ? জয়নবের কথা যখন সে ভাবছে তখন এজিদ তার ভাবনাটিকে কেড়ে নিয়ে বলে,
-- কিন্তু তার আগে যে তোমায় একটি কাজ করতে হবে ভাই, জাব্বার ?
-- কি হুজুর ?
-- তোমার স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে ।
-- সেটা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না, হুজুর। আমি তাকে তালাক দিয়ে দিচ্ছি। আমি আজ্ঞাবহ প্রজা। রাজাজ্ঞা অমান্য করব কি করে ?
-- বাহ, এই তো। মুসলিম উম্মার ভাবি খলিফার প্রতি আনুগত্য সাচ্চা ঈমানদারের সাক্ষ্য বহন করে।

এজিদ ও মারওয়ানের গভীর ষড়যন্ত্র সরল আব্দুল জাব্বারের পক্ষে বুঝে ওঠা সম্ভব ছিল না। সে ধন ঐশ্বর্যের লোভে তার পতিব্রতা নিষ্পাপ স্ত্রীকে পত্রযোগে তালাকনামা পাঠিয়ে দেয়। সভাস্থিত অনেকে স্বাক্ষী হিসাবে সেই তালাকনামায় স্বাক্ষরও করলেন। এদিকে রাজপ্রাসাদে শাদীয়ানা বেজে ওঠে। বিবাহের আয়োজন শুরু হয়ে যায়।। মুসলিম বিবাহের রীতি অনুযায়ী ইমাম ও কাজীর উপস্থিতিতে আব্দুল জাব্বার সালেহাকে উপযুক্ত দেনমোহর সহ বিবাহ প্রস্তাব পাঠায়। দুইজন উকিল আব্দুল জাব্বারের প্রস্তাব অন্দরমহলে নিয়ে যায়। সালেহা এজিদের পরিকল্পনামাফিক বিবাহপ্রস্তাবে অসম্মতি জানায়। উকিলদ্বয় ফিরে এলে ঈমাম সাহেব সংবাদ জানতে চান। উকিলদ্বয় বলেন যে পাত্রী সালেহা এমন কাউকে বিবাহ করতে চান না যিনি ধনলোভে বিবাহিত সতী সাবিত্রী পতিব্রতা স্ত্রীকে আগুপিছু না ভেবেই তালাক দেন। অন্য কোন স্বার্থে তিনি যে ভবিষ্যতে সালেহাকেও তালাক দেবেন না তার নিশ্চয়তা কি ? বিবাহে পাত্রীর অসম্মতির কথা শোনামাত্র আব্দুল জাব্বারের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। একূল ওকূল দুকূলই গেল তার। লজ্জায় ঘৃনায় অপমানে উন্মাদের মতো চিৎকার করতে করতে ঘর থেকে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে যায়। তার পর আব্দুল জাব্বারের আর হদিশ পাওয়া যায় নি। পরে শোনা যায় ফকিরবেশে দেশান্তরী হয়েছে নাকি সে। কিন্তু এজিদ ও তার সঙ্গীরা রাজ্যময় রটিয়ে দেয়, আব্দুল জাব্বার ইন্তেকাল করেছে। একান সেকান হতে হতে অপ্রিয় কথাখানি জয়নবের কান অব্দি পৌঁছায়। স্বামীর মৃত্যু সংবাদের মতো দুঃসংবাদ একটি নারীর জীবনে যে কি অন্ধকার নামিয়ে আনে সেটা ভুক্তভোগীই জানে। কিছুদিন একচিলতে ঘর কান্নার জলে ভাসিয়ে দেওয়ার পর চাহারমের দিন নীরবে পুটুলি বেঁধে বৈধব্য বেশে বাপের বাড়ি চলে আসে জয়নব।

এজিদের পথের কাঁটা দূর হল। বিধবা জয়নবকে বিবাহপ্রস্তাব দেওয়াতে আর বাধা রইল না। মারওয়ানের সঙ্গে সলাপরামর্শ করে মোসলেমকে দিয়ে বিবাহপ্রস্তাব পাঠানো হল। পথিমধ্যে ক্লান্ত মোসলেমের সঙ্গে আক্কাস আলির দেখা। আক্কাস আলি এই তল্লাটের একজন ধনবান রূপমান নামাজী পরহেজগার অবিবাহিত যুবক। সে মোসলেমের কাছে জানতে চাই,
-- ভাই, মোসলেম, কোথায় যাচ্ছ এত হন্তদন্ত হয়ে ?
-- রাজপুত্র এজিদের বিবাহপ্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছি বিবি জয়নবের কাছে।
-- হ্যাঁ, শুনেছি আব্দুল জাব্বার ইন্তেকাল করেছে।
-- না, তালাক দিয়েছে ।
-- তাহলে, মোসলেম, আমার কথাটিও বোলো ।
-- বুঝলাম না।
-- এমন সুশ্রী, ধর্মপরায়ণা, নির্লোভ, নম্রস্বভাবা নারীর পতিধর্ম পালন করতে কোন পুরুষই না চাই! আমিও তোমাকে উকিল নিযুক্ত করলাম। প্রথমে রাজপুত্র এজিদের প্রস্তাব দিও। তাতে রাজি না হলে আমার প্রস্তাবটি পাড়বে।
-- আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি চলি। এখনও অনেক পথ বাকি।
-- বেশ।

কিছু দূর যাওয়ার পর মোসলেম দেখলেন একটি ঘন বনে ইমাম হাসান সশস্ত্র পশু শিকারে বেরিয়েছেন। ইমাম হাসান মদিনার অধিপতি। সহজসরল জীবনযাপন করেন। মদীনার রওজা শরীফে নামাজ আর কোরান তেলোয়াত করে তার দিন কাটে। মাবিয়ার সঙ্গে চুক্তির পর নিজেকে রাজনৈতিক সংসর্গ থেকে দূরে রেখেছেন এতদিন। কেবল মদিনাবাসীর অনুরোধেই কোনক্রমে ভাই হোসেনের সঙ্গে মদিনার সিংহাসন ও ইমামতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। মোসলেমকে দেখেই ইমাম হাসান অভিভাদন জানালেন,

-- আসসালামো আলাইকুম, মোসলেম ভাই।
-- ওয়ালাইকুমাসাল, শাহজাদা ইমাম হাসান।
-- তা, দামেস্কা থেকে এত দূরে, কি ব্যাপার ?
-- চললুম জয়নবের বাড়ি বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে ?
-- কার বিবাহের প্রস্তাব, কাকে ??
-- দুটি প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছি। প্রথমটি বাদশাহ নামদার এজিদের, আর দ্বিতীয়টি আক্কাস আলির। দুজনেই আব্দুল জাব্বারের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী জয়নবের পাণিপ্রার্থী ।।
-- তাই নাকি ?
-- হ্যাঁ, আক্কাস আলি আল্লাহর দিব্যি করে বলেছেন যে আগে এজিদের প্রস্তাব এবং তারপর যেন তার প্রস্তাবটি দিই। এবারে জয়নব যার প্রস্তাব গ্রহন করবেন।
মুচকি হেসে ইমাম হাসান বললেন,
-- আক্কাস আলির প্রস্তাব নিয়ে যখন যাচ্ছ তখন এই গরীবের কথাটিও মনে রেখো, মোসলেম। এজিদ ও আক্কাসের প্রস্তাব গুলি দেওয়া হলে আমার কথাটি জয়নবকে বলবে। তোমাকে উকিল নিযুক্ত করলাম।

জয়নব অসামান্যা রূপবতী। তার রূপজ মোহকে অস্বীকার করার শক্তি আরব মূলুকে খুব কম পুরুষেরই ছিল। ইমাম হাসানও সেই মোহ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেন নি। এজিদ ও আক্কাস আলি ছিল অবিবাহিত। জয়নবকে তাদের প্রস্তাব দেওয়াটা মানায়। কিন্তু ইমাম হাসানের ঘরে ইতিমধ্যে দুই স্ত্রী রয়েছে -- হাসনে বানু ও জায়েদা। তারপরেও জয়নবকে বিবাহপ্রস্তাব দেওয়ার আবশ্যিকতা কি সেটা তিনি নিজেই জানেন। তার উপর ইমাম হাসানের জয়নবের বয়সী কিশোর ছেলে রয়েছে -- আবুল কাশেম। এমনও নয় যে জয়নবের বিবাহ হচ্ছে না, বরং তাকে বিবাহ করার জন্য আরব মূলুকের বহু পুরুষ উদগ্রীব। কি জানি! নৈসর্গিক নির্দেশ ইমাম হাসানই বা কি করে খন্ডন করে। অপ্রত্যাশিত প্রস্তাব ও তদুপরি বিবাহের দায় ইমাম হাসানকে নিজের জীবন দিয়েই চোকাতে হয়েছিল।

মোসলেম শেষমেস আব্দুল জাব্বারের ছোট বাসভবনে এসে পৌঁছান। কালাতিপাত না করে এক এক করে জয়নবকে সমুদায় প্রস্তাব দেন। প্রথমে এজিদের, তারপর আক্কাসের ও শেষে ইমাম হাসানের। ধর্মপরায়ণা নারী ইহজগতের সুখস্বাচ্ছন্দে বিশ্বাসী নয়। তিনি পরকালের জান্নাতুল ফেরদৌসের ভাবনায় আচ্ছন্ন। পার্থিব জগতে কৃচ্ছসাধন ও দ্বীনি কায়দায় জীবনযাপন তাকে মৃত্যুর পর জান্নাতের দৌড়গোড়ায় পৌঁছে দেবে। মনেপ্রানে পরহেজগার নামাজী জয়নব সেটা বিশ্বাস করে। তাই এজিদ ও আক্কাস আলির রূপজ মোহ, ধনদৌলত ও ঐশ্বর্যের হাতছানি সে হেলায় দূরে ঠেলে দিতে পারে। তার থেকে বরং তার পছন্দ সহজসরল জীবনের অধিকারী ইমাম হাসানকে। নবী করিম (সাঃ) এর প্রৌপুত্র, হজরত আলি এবং বিবি ফতেমার জ্যাষ্ঠ পুত্র ইমাম হাসানকেই সে পতি রূপে গ্রহন করতে চাই। স্পষ্ট করে জয়বব সে কথা মোসলেমকে জানিয়ে দেয়।

এদিকে এজিদ মোসলেমের প্রতীক্ষায় দিন গুনছে। পিতা মাবিয়া বার্ধক্যরোগে শয্যাশায়ী। এজিদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। পিতার সেবাশুশ্রূষাতেও মন নেই। জীবনের সায়াহ্ন ঘনিয়ে আসছে দেখে মাবিয়ে এজিদের উপর খিলাফতের দায়িত্ব অর্পন করেন। মুসলিম উম্মার সদস্যদের ভোটাভুটি বা অনুমতির তোয়াক্কা তিনি করেন নি। এজিদের খলিফা পদে উত্তরণে কুফা ও মদিনাবাসীরা তীব্র ক্ষোভ ফেটে পড়ে। মাবিয়া আমল দেন নি। যে মাবিয়া একদিকে পরহেজগার ধার্মিক এবং নবী সাহেবের সাচ্চা উম্মত, অন্যদিকে সেই মানুষটাই খিলাফতের নামে অনৈসলামিক রাজতন্ত্র কায়েম রাখার লোভে লোভাতুর। মাবিয়ার ধার্মিকতা ততদিন অব্দি জীবিত ছিল যতদিন তার স্বার্থ অক্ষুন্ন ছিল।

সদ্য খিলাফতের দায়িত্ব পেয়েও এজিদ তখন অন্যজগতে বিভোর। সেই সুকোমল ভূবনমোহিনী মুখশ্রী, পটলচেরা চোখের আড় চাহনি -- দিবারাত্র তাঁর মানসপটে আঁকা। ভ্রুযুগলের অগ্রভাগ যেন সুতীক্ষ্ণ তীরের মতো হৃদয় ভেদ করে হৃদয়েই বাঁসা করে নিয়েছে। গালের হালকা টোল, ঈষৎ হালকা গোলাপি আভা বার বার দেখার আশায় তাঁর মন ব্যাকুল। সামান্য অলঙ্কার, যা জয়নবের কানে দুলতে দেখেছেন সেই দোলায় তার মাথা আজ পর্যন্ত অবিশ্রান্ত দুলছে। সেই হাসিপূর্ন মুখখানির হাসির আভা, জয়নবের অজ্ঞাতে একবার দেখেছেন, কত বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছেন, কত শতবার চোখের পলক ফেলেছেন, তবুও চোখের কাছ থেকে সরে যায় নি। সবকিছুই বারবার মনে জাগছে। নাওয়াখাওয়া ভুলে ঘরের মধ্যেই ক্রমাগত পায়চারি করে যাচ্ছেন। কিন্তু বিবাহবাসরে জয়নবকে কি বলে সম্মোধন করবেন ঠিক করতেই পারছেন না। স্বপ্নের সেই নায়িকা কিছু সময়ের মধ্যেই সম্পূর্ণ তার নিজের হতে চলেছে। মোসলেম এলেই সবিস্তারে সেকথা শুনবেন। বার বার শুনে মনের খোরাক মেটাবেন। এত দিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হবে! রাত আর পেরোয় না এজিদের।

পরদিন সকালেই মারওয়ান এজিদের ঘরে হাজির হলেন। চিন্তিত উদ্বিগ্ন এজিদকে থেকে তার সান্তনা,
-- এত চিন্তার কিছু নেই এখন। ধরুন, পুরোটাই আপনার হাতের মুঠোয়, বাদশাহ নামদার।
--চিন্তা হয়, বন্ধুবর। তীরে এসেও তরী ডোবে। জয়নবের বৈধব্যব্রতও যে এখনও শেষ হয় নি। স্বামীশোকে আকুল। সে আমায় গ্রহন করবে তো ??
-- করবে না কেন ? এত ধনদৌলতের মোহ নিমেষে ত্যাগ করবে এমন নারী এই ধরাধামে এখনও জন্মায় ননি।
-- কি জানি ? হয়ত তাই।

ওদিকে মোসলেম বেশ কিছুক্ষন আগেই ভোর ভোর ফুরে এসেছেন। এজিদ জানতেন না। মোসলেমও অপ্রিয় সত্য কথাটি এজিদকে বলতে চাননি। তিনি জানতেন, কথাটি শুনলে এজিদ কতটা বিমর্ষ হয়ে পড়বেন। তাই এজিদের বুদ্ধিমতী মাকে পুরো ব্যাপারটি জানান। মাতৃভক্ত এজিদ প্রতিদিনের মত সেদিনও মাকে সালাম দেওয়ার জন্য মায়ের কাছে হাজির হয়। তখনই অপ্রিয় সংবাদটি মায়ের কাছ থেকে পায়। কথাটি শুনে এজিদ আর নিজেকে স্থির রাখতে পারেন নি। মাথায় রক্ত উঠে যায়। সুন্দরী রমণী জয়নবের প্রেমে আত্মহার দামেস্কার যুবরাজ জয়নবকে না পেয়ে উন্মাদ হয়ে ওঠে। পরের দিনই এজিদের কাছে খবর আসে জয়নব স্বেচ্ছায় মদিনাধিপতি হাসানের তৃতীয় স্ত্রী হিসাবে হাসানের বাসভবনে উঠেছে। । রাজসিংহাসনে বসেই হাসানের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার আগুন জ্বলতে থাকে তার। প্রেমের উল্টোপিঠ বোধ হয় এমনই -- আগুনে, ভয়ংকর, হিংসায় ভরপুর। যে ইমাম হাসান ও হোসেনের সঙ্গে তাঁর শত্রুতা নিয়তিতে বাঁধা ছিল তাদের সঙ্গে পাকাপাকিভাবে সম্মুখ সমরে নেমে পড়ে এজিদ।

জয়নবও জানত না যে হাসানের পবিত্র গৃহে পদার্পণ করেও তাকে সপত্নীবাদের কবলে পড়তে হবে। জয়নবের আগমন ইমাম হাসানের দ্বিতীয় স্ত্রী জায়েদার ভাল লাগে নি। সেই ভাল না লাগাতে শান দিতে দিতে জায়েদার সপত্নীবাদ হিংস্রতার শিখরে পৌঁছায়। জায়েদার সঙ্গী মাইমুনাকে ছদ্মবেশী মারওয়ানের মাধ্যমে লোভ দেখিয়ে ইমাম হাসান হত্যায় প্ররোচনা দেয়। শেষমেস ন্যায় ধর্ম ও নীতি বিসর্জন দিয়ে হীনপথে অর্থের লোভ দেখিয়ে হাসানের দ্বিতীয় স্ত্রী জায়েদার মাধ্যমে হাসানকে বিষপ্রয়োগে মেরে ফেলে। দ্বিতীয়বার বৈধব্যব্রত গ্রহন করে অভাগী জয়নব। শোকাকুল মদিনাবাসী ছোট ভাই হোসেনকে হাসানের পদে স্থলাভিষিক্ত করে। ওদিকে মারওয়ান এবং ওতবে ওলিদের নেতৃত্বাধীন সেনাদল মদিনা নগরের কাছে পাহাড়ঘেরা প্রান্তরে শিবির করে আছে। হোসেন জানত যেকোন সময় তাকে বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। পিতৃতুল্য দাদার বিয়োগ বিরহে কাতর হোসেন নিজেকে পুরীপুরিভাবে ধর্মাচারনায় সঁপে দেয়। রওজা শরীফের চার দেওয়ালের মধ্যেই তার দিনরাত কাটতে থাকে। এই সেই রওজা শরীফ যেখানে তার নানাজানের কবর রয়েছে। সেই পবিত্র স্থান তার কাছে সবচেয়ে নিরাপদ বলে মনে হয়েছিল।

ওদিকে হোসেন মদিনায় থেকে গেলে তাঁকে বধ করা সম্ভব নয়। হোসেনকে মদিনা ত্যাগ করানোর জন্য মারওয়ান নানা কিসিমের ষড়যন্ত্র করতে থাকে। অর্থ ও সম্পদের লোভে একাজে তাকে পূর্ণ সহযোগীতা করে কুফাধিপতি আব্দুল্লাহ জেয়াদ। যে জেয়াদ একসময় ছিল হোসেনের প্রানের বন্ধু সেই জেয়াদ হোসেনের সঙ্গে বেইমানি করে। পরিবারের মানুষের নিরাপত্তার কথা ভেবে ইমাম হোসেন গোটা পরিবার সহ সৈনসামন্ত লোক লস্কর নিয়ে কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। তখনও হোসেন জানত না আব্দুল্লা জেয়াদের ষড়যন্ত্রের কথা। মরুপথে দীর্ঘ যাত্রায় তারা পথ ভুল করে দূর্ভাগ্যক্রমে কারাবালার প্রান্তরে এসে পড়ে। সুদীর্ঘ পথ পেরিয়ে জল ও খাবার শেষ হয়ে যায়। কাছেই ফেরাত নদী। কিন্তু এজিদের সৈন্যসামন্ত সেই নদীর জল আটকে রেখেছে। এক ফোটা জলের জন্য মদিনাবাসী হাহাকার করতে থাকে। হোসেনের কাছে জলের জন্য আবদার করে। কিন্তু হোসেন অসহায়। হোসেনের সৈন্যরা প্রচুর শত্রুসৈন্য নিধন করলেও ফেরাত নদী উদ্ধারে ব্যার্থ হয়। শেষে ইমাম হোসেন সম্মুখ সমরে নেমে এজিদ সৈন্যদের হঠিয়ে ফেরাত নদীর জল উদ্ধার করে। হোসেন তৃষ্ণা নিবারণ করতে গেলে লুকিয়ে মারওয়ান তাঁকে তির ছুঁড়ে মারে। হোসেন ধরাশায়ী হয়। সীমার তাঁর মুন্ডুটা কেটে দামেস্কায় এজিদের কাছে হাজির হয়। হোসেনের স্ত্রী সায়রাবানু, পুত্র জয়নাল আবেদিন, কন্যা ফতেমা, হাসানের দুই স্ত্রী হাসনেবানু ও জয়নাব, নবীপত্নী উম্মে সালমা সহ মদিনার নারীকুল ও শিশুরা দামেস্কায় এজিদের কারাগারে বন্দী হয়।

আজ এত বছর পর সেই তন্দ্রাহরিনী কাঙ্খিত জয়নব তার রাজকারাগারে বন্দী। এত কাছে পেয়েও জয়নবের হৃদয়ে আজও তাঁর ঠাঁই নেই। প্রেয়সী জয়নবের হৃদয়ে আজও তার জন্য লালিত হয় ঘৃনা। তাহলে এত প্রানহানি, এত রক্তক্ষয়, কি লাভ হল ? যার জন্য এত কিছু সেই জয়নবকে আজও বাহুডোরে বাঁধতে পারল না। এক সময় যে ঘরে পিতা মাবিয়া নামাজ পড়তেন সেই ঘরে এজিদ শুয়ে একা। বিনিদ্র রজনী। চোখের দুই ধার দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল অনবরত। কি কুক্ষনেই যে জয়নবের রূপে তার চোখ পড়েছিল। সেই পটলচেরা চোখ আর কানের দূলের দোলায় কি অনর্থই না ঘটে গেল। কত প্রাণ অকালে ঝরে গেল! কত মায়ের কোল খালি হল! কত নারী স্বামীকে হারিয়ে অকুল পাথারে ভেসে গেল! বিনা দোষে বিনা কারনে কত পুন্যাত্মার জীবনপ্রদীপ নিভে গেল। এত কিছু ঘটল, তবুও এজিদের প্রেমের আগুন আজও নিভল না। সেই অমূল্য ধন হাতের নাগালে এসেও আশা পূরণ হল না, স্ববেশে এল না। হাসানের পর হোসেনকে বধ করেও সেই আগুন আরও আরও জ্বলতে থাকল। বন্দুহারা, রাজহারা এবং ধীরে ধীরে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলল বেচারা। ধিক এমন প্রণয়ে! ধিক রমণীর রূপে! শত ধিক কুপ্রেমবিলাসী পুরুষে! শত ধিক পরস্ত্রী-অপহারক রাজায়।

হতাশার জীবন সহ্য হয় নি এজিদের। ধীরে ধীরে শরাবের নেশায় দুদন্ড শান্তি খুঁজে চলে একসময়ের দৌর্দন্ডপ্রতাপ দামেস্কাধিপতি এজিদ। দিন নেই রাত নেই, শুধু প্রলাপ বকে। না ঘুমিয়েই কেটে যায় রাতের পর রাত। শরাবে আর হতাশায় পেয়াল পূর্ণ করে আর পেটে ঢালে। আর কি যেন বিড়বিড় করে মনে মনে। তার জীবনের রক্তাক্ত ইতিহাস, হাসান হত্যায় সাগায্যকারী হাসানের দ্বিতীয় স্ত্রী জায়েদার প্রকাশ্য রাজসভায় শিরচ্ছেদ, কারবালার ধূ ধূ প্রান্তর, রক্তাক্ত ফেরাত নদীতে ভাসমান হাজার হাজার নরমুন্ড, তৃষ্ণার্ত মদিনাবাসীর হাহাকার, হোসেনের রক্তাক্ত কাটামুন্ডু নিয়ে সীমারের রাজসভায় আগমন -- কত কত কথা এজিদের মানসপটে এক এক করে ভেসে আসছে, তার ইয়ত্তা নেই। নেশার তীব্রতা যত বাড়েছে ততই বাড়ছে চিন্তার বেগ। আবার পেয়াল পূর্ণ হল। নিমেশের মধ্যেই শেষ। প্রতি বার পানে তার জলন্ত হৃদয় আরও বেশি বেশি করে জ্বলে উঠছে।

--- কেন চেয়েছিলাম ? সেই জলন্ত রূপরাশির প্রতি কেন চেয়েছিলাম ? কেন? সেই ভূবনমোহিনী রূপে কেন মজেছিলাম? কেনই বা মৃগয়ায় বেরোলাম সেদিন? কেনই বা তাকালাম আব্দুল জাব্বারের ছোট্ট কুড়ে ঘরের জানালার পানে? হে ঈশ্বর !
*******

মীর মোশারফ হোসেনের "বিষাদ সিন্ধু"র আলোকে।
তথ্যসুত্র -- হিষ্ট্রি অব ইসলাম (কারেন আর্মষ্ট্রং),
আফটার দ্য প্রফেট (লেসলি হেজলেটন)

485 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: প্রেমিক এজিদ

আরব্য রজনী কিছুটা ক্লান্তিকর। বালক বয়সে ঠাকুরমার ঝুলির সাথে কিছুটা পড়েছিলাম। তখন ভাল লেগেছিল হয়তো, ঠিক ইয়াদ নাই।
Avatar: কুশান

Re: প্রেমিক এজিদ

কিন্তু জয়নাল আবেদীন তো শেষ যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধজয় করে বলেই জানতাম।
মীর মোশারফে তো তাই ছিল।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন