ন্যাড়া RSS feed
বাচালের স্বগতোক্তি

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...
  • খানাকুল - ২
    [এর আগে - https://www.guruchan...
  • চন্দ্রযান-উন্মত্ততা এবং আমাদের বিজ্ঞান গবেষণা
    চন্দ্রযান-২ চাঁদের মাটিতে ঠিকঠাক নামতে পারেনি, তার ঠিক কী যে সমস্যা হয়েছে সেটা এখনও পর্যন্ত পরিষ্কার নয় । এই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে শুরু হয়েছে তর্কাতর্কি, সরকারের সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে । প্রকল্পটির সাফল্য কামনা করে ইসরো-র শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীরা ...
  • দেশত্যাগ...
    আমার এক বন্ধু ওর একটা ভিজিটিং কার্ড আমাকে দিয়েছিল। আমি হাতে নেওয়ার সময় কার্ডটা দেখে বুঝতে পারলাম কার্ডটা গতানুগতিক কোন কার্ড না, বেশ দামি বলা চলে। আমি বাহ! বলে কাজ শেষ করে দিলাম। আমি আমার বন্ধুকে চিনি, ওর কার্ডের প্রতি এরচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখালে ও আমার মাথা ...
  • পাঠকের সঙ্গে তাদের হয় না কো দেখা
    মানস চক্রবর্তীকবিতা কি বিনােদনসামগ্রী? তর্ক এ নিয়ে আপাতত নয়। কবিতা কি আদৌ কোনাে সামগ্রী? কোনাে কিছুকে পণ্য হয়ে উঠতে হলেও তার একটা যােগ্যতা দরকার হয়। আজকের দিনে কবিতা সে-অবস্থায় আদৌ আছে কি না সবার আগে স্পষ্ট হওয়া দরকার। কবিতা নামে একটা ব্যাপার আছে, ...
  • হে মোর দেবতা
    তোমারি তুলনা তুমি....আজ তাঁর জন্মদিন। আমার জংলা ডায়রির কয়েকটা ছেঁড়া পাতা উড়িয়ে দিলুম তাঁর ফেলে যাওয়া পথে।দাঁড়াও পথিকবর....জন্ম যদি তব অরণ্যে," সবুজ কাগজেসবুজেরা লেখে কবিতাপৃথিবী এখন তাদের হাতের মুঠোয়"(বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)মহাভারত...
  • বেকার ও সমীকরণ
    'বেকার'-এই শব্দটি আমাকে আজন্ম বিস্মিত করেছে। বাংলায় লেখাপড়া শিখে, এমনকী একাদশ শ্রেণীতে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে, সে কী বাংলায় পদার্থবিদ্যার বিদ্যা বালানীয় চর্চা! যেমন, 'ও বিন্দুর সাপেক্ষে ভ্রামক লইয়া পাই।' ভ্রামক কি রে? ভ্রম না ভ্রমণের কাছাকাছি? না, ভ্রামকের ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

আমার এ ঘর

ন্যাড়া

ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল বালেশ্বরে। চাঁদিপুরে গেছিলাম সাতদিনের জন্যে। গিয়ে দেখি প্রেশারের ওষুধ আনিনি। বালেশ্বরে গেলাম ওষুধ কিনতে। বলল, "আনিয়ে দেব, কাল আসুন।" বাজারে চা খেতে গিয়ে আলাপ হল ভদ্রলোকের সঙ্গে। স্বাস্থ্যবান, দেহাতি চেহারা। খেটো ধুতির ওপর মোটা সুতির পাঞ্জাবি, গলায় তুষের উড়ুনি। ভদ্রলোক যে কোন প্রদেশের বোঝা মুশকিল। আমার সঙ্গে পরিষ্কার বাংলায় কথা বললেন, দোকানির সঙ্গে উড়িয়ায়, সঙ্গে দুজন আদিবাসী মজুর ছিল - তাদের সঙ্গে কোন এক উপভাষায়। আমার জঙ্গলপ্রীতির কথা জেনে বললেন, "আসুন না। জঙ্গল দেখে যান। আমাদের বসতি আছে কাছের জঙ্গলে। এসে থেকে যান।" আমি জিগেস করলাম, "বসতি মানে?" ভদ্রলোক হেসে বললেন, "অনেক মানুষ আছেন, জানেন তো, যাদের সংসার আর ধরে রাখতে পারে না। তারা আমাদের এই বসতিতে এসে ঠাঁই নেন।"

- জায়গাটা কোথায়?
- কাছেই, এখান থেকে ঘন্টা কয়েকের রাস্তা। আমি মাঝে মাঝে শহরে আসি।
- নাম কী জায়গাটার?
- এখন বুঝলেন সব জায়গার নতুন নাম হয়েছে। শহরের লোকেরা বলে ঘাটগাঁওর জঙ্গল। আমরা পুরনো লোকেরা এখনও বিন্ধ্যই বলি। এ সবই আগে বিন্ধ্যর অন্তর্গত ছিল। এখান থেকে সাতকোশির বাস ধরবেন। সাতকোশিতে নেবে বলবেন কলিমাটির হাটে যাব। পথে একটা নদী পেরোবেন খেয়ায়। নদীর ওপারেই কলিমাটির হাট। সেখানে কাউকে বস্তি বললেই দেখিয়ে দেবে। কলিমাটি অব্দি পুরোটা বাসেই যেতে পারেন, কিন্তু সে আপনাকে অনেক ঘুরিয়ে আনন্দপুর দিয়ে নিয়ে যাবে। সময় বেশি লাগবে। বাসও ভাল নয়, বাসরাস্তাও ভাল নয়। সারা গায়েহাতে ব্যথা হয়ে যাবে ঝাঁকুনি আর ধুলো খেতে খেতে। আর বাসও দিনে একটা। আর এদিক দিয়ে গেলে সাতকোশির পরেই আপনার পাহাড়-জঙ্গল শুরু। যে জঙ্গল আপনি দেখতে চাইছেন।

জঙ্গল শুনেই মন নেচে উঠেছিল। কিন্তু শহুরে মন তো, মনে হল জঙ্গলে রাস্তা হারিয়ে ফেলব না তো! ভদ্রলোক বললেন, "সে ভয় যে নেই একেবারে বলব না। যদিও রাস্তা সিধে, কিন্তু তাও কাঁচা আর পথও কম নয়। এক কাজ করুন, আপনি আজই আমার সঙ্গে চলুন।" আমি বললাম, "আজ? আমার সব কিছু তো চাঁদিপুরের হোটেলে। জামাকাপড়ও সঙ্গে নেই কিছু।" ভদ্রলোক কথাটা উড়িয়ে দিলেন, "ও একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আর তা না হলে একটা কাজ করুন। কাল কলিমাটির হাট অব্দি আসুন। আমি এসে সেখান থেকে আপনাকে নিয়ে যাব।" আমি একটু কুণ্ঠিতই হয়ে গেলাম, "আমার জন্যে আবার আপনাকে কলিমাটির হাট অব্দি আসতে হবে।" ভদ্রলোক হেসে ফেললেন, "কলিমাটি তো দু ক্রোশও হবে না। লোককে আনতে আমাকে কোথায়-না-কোথায় যেতে হয় সে শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। তাহলে ওই কথাই রইল। কাল কলিমাটির হাটে চলে যাবেন। বেশি দেরি করবেন না। জঙ্গলে সন্ধ্যে তাড়াতাড়ি নাবে।"

পরের দিন সাতকোশিতে বাস থেকে যখন নাবলাম তখন বেলা আড়াইটে, উড়িষ্যার রোদ প্রায় মাথার ওপরে, কিন্তু আকাশের কোণে কুচকুচে কালো মেঘ জমছে। বাসস্টপে চায়ের-কাম-মনোহারির দোকানে কলিমাটির হাটের রাস্তা জিগেস করতে বাংলা-মেশানো-ওড়িয়ায় যা বলল তার মর্ম হল, "এ রাস্তা ধরে সিধে চলে যান। ওই যেখানে দেখলেন বাসটা বাঁয়ের দিকে চলে গেল, ওইখানে পৌঁছে দেখবেন ডানদিকে পায়ে হাঁটা পথ বেরিয়ে গেছে মাঠের ওপর দিয়ে। সে ধরে কোশখানেক গেলে ঘাট পাবেন। খেয়া পেরিয়ে ওঘাটে নেবেই কলিমাটির হাট পেয়ে যাবেন। তাড়াতাড়ি পা চালান, বর্ষা আসছে।"

জায়গাটা এত পাহাড়ি হবে বুঝিনি। পাহাড়ি, মেঠোপথ গেছে বড় বড় গাছের বনের মধ্যে দিয়ে। দেখে মনে হল শাল-সেগুনের জঙ্গল। ক্রোশ তো শুনেছিলাম মাইলখানেক। পাহাড়ি রাস্তায় আন্দাজমতন প্রায় দেড়-দু-মাইল, মানে সোয়া একঘন্টা হাঁটার পরেও না নদী, না ঘাট - কোনটারই দেখা নেই। পথ হারিয়েছি বলেও মনে হচ্ছে না। দিব্যি স্পষ্ট পায়ে হাঁটা পথ। এদিকে ঝাঁকড়া গাছের ফাঁক দিয়ে যতটুকু আকাশ দেখা যাচ্ছে তাতে বুঝতে পারছি মেঘ অনেকটা আকাশ ঢেকে দিয়েছে। ইতস্তত করছি আর এগোব কিনা এমন সময়ে দেখলাম উল্টোদিক থেকে একজন মরদ আর তার বউ কাঁধে কেঁদুয়া পাতা নিয়ে আসছে। "ঘাট" বলতে সামনে হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল। বুঝলাম ঠিক দিকেই যাচ্ছি। আরও প্রায় পয়ঁতাল্লিশ মিনিট হাঁটার পরে নদীর ধারে এসে পৌঁছলাম। আকাশ তখন সম্পূর্ণ কালো। সূর্য নেই। অন্ধকার এমন যে মনে হচ্ছে সন্ধ্যে নেবে এসেছে। ঘড়িতে যদিও সাড়ে চারটে। নদী এখানে বেশ চওড়া। ঘাট বলতে যা বোঝায়, সেসব কিছু নেই। পাড়ের একটা জায়গা ঢালু হয়ে নেবে গেছে। সেটাই বুঝলাম ঘাট। তবে ফাঁকা। ত্রিসীমানায় কোন নৌকো-টৌকো তো নেইই। চরাচরে না কোন মানুষজন, না কোন পশুপাখী। কুকুর-টুকুর কিচ্ছু না। অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। খালি শালের বন থেকে পোকার শব্দ। এবার মনে ভয় ঢুকল। নৌকো না পেলে এখন আবার দু ঘন্টা এই জঙ্গল ধরে ফিরে যাওয়া বিপজ্জনক ব্যাপার। আমি একটু এগিয়ে দেখব কিনা ভাবছি হঠাৎ একটা ছোট ডিঙি নৌকোর আবির্ভাব। এতই ছোট সে নৌকো যে চোখে পড়েনি। ওপার থেকে বেয়ে আসছে।

ঘাটে লাগাতে দেখলাম আর কেউ নেই, নৌকোয় শুধু মাঝি। বিনাবাক্যব্যয়ে চড়ে বসলাম। এত ছোট নৌকো যে ভয় করছিল। কিন্তু মাঝি দেখলাম পাকা হাতে লগি ঠেলে দাঁড় বাইতে আরম্ভ করল। জিগেস করলাম, "এ নদীর নাম কী গো?" মাঝি বলল, "কেউ বলে গুপ্তগঙ্গা, কেউ বলে বৈতরণী"। আমি ভাবলাম বৈতরণীই বটে। এই নৌকোয় পাহাড়ি নদী পেরোন আর বৈতরণী পেরোন একই কথা। তবু ভালয় ভালয় এদিকে এসে নাবলাম। মাঝি বলল যে একটু এগোলেই কলিমাটির হাট। এদের "একটু"-কে আর বিশ্বাস নেই। আমি ঘন্টাখানেক হাঁটার জন্যে তৈরি ছিলাম, কিন্তু ঘাট থেকে উঠে পাঁচ মিনিট হাঁটতে না হাঁটতেই হাটে পৌঁছে গেলাম। নামেই হাট, আছে একটা-দুটো দোকান। আর মাঠ। মাঠেই বোধহয় হাট বসে। তবে এখন কেউ কোত্থাও নেই। সম্পূর্ণ ফাঁকা। গরু-ছাগল-কুকুর-টুকুরও নয়। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার। শহুরে চোখে আজব ঠেকে। এমন সময়ে দোকানঘরের পেছন থেকে ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। দেখে যে কী পরিমাণ স্বস্তি পেলাম বলতে পারব না। অথচ ইনি তো আমার প্রায় সম্পূর্ণই অপরিচিত। গতকালই আলাপ হয়েছে, তাও বড়জোর মিনিট দশেকের জন্যে। কিন্তু ওনার আহবানে এমন কিছু ছিল যার টানে আমি হোটেলে তালা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েছি।

আমাকে দেখে হাসলেন। শুধু বললেন, "চলুন।" আমি আকাশের দিকে উদবেগের দৃষ্টি দিতে উনি বললেন, "আমরা পৌঁছে যাব। তার আগে জল আসবে না।" হাটের মাঠর ধারেই শুরু হয়েছে শাল-সেগুনের বন। তার মধ্যে দিয়ে পথ। পথ বলছি বটে, কিন্তু কোন চিহ্ন নেই। শুঁড়িপথও না। অথচ ভদ্রলোক কোনদিকে দৃকপাত না করে খুব সহজভাবে হাঁটতে লাগলেন। এখানেও পাহাড়ি রাস্তা। কিছুটা চড়াই, আবার একটু উৎরাই, আবার চড়াই। কিন্তু মোটের ওপর চড়াই যাচ্ছি বলেই মনে হল। যেতে যেতে কথা হচ্ছিল। বললেন এরকম বসতি নাকি আরও অনেক আছে। এক এক বসতি এক এক ধরণের লোকেদের জন্যে। উনিই চালান এই বস্তি। ওনাকেই মাঝে মাঝে লোকালয়ে আসতে হয়, নইলে বস্তির লোকজন বস্তি থেকে বেরোয় না। কতজন আছে জিগেস করায় হেসে বললেন, "গিয়েই দেখুন না। হয়ত আপনার চেনা কেউ থাকতে পারে।" তারপরে আমার কথা জিগেস করলেন। কেন জঙ্গল দেখতে চাই। জঙ্গল আমার চিরদিনই খুব প্রিয়। কিন্তু গেলবছর মা মারা যাবার পরে জঙ্গলের নিঃসঙ্গতার আকর্ষণ যেন চেপে বসেছে, নিরন্তর হাতছানি দিচ্ছে। "আর বাবা?", ভদ্রলোক জিগেস করলেন। বাবা মারা গেছেন প্রায় দশ বছর হল। কিন্তু বাবা যাবার পরে এরকম অনুভূতি হয়নি।

চলা দেখে বোঝা যায় এই পথে ওনার নিয়মিত যাতায়াত। কোনরকম সংশয়ের ব্যাপার নেই। ডানদিক-বাঁদিক করে প্রায় ঘন্টা দেড়েক চলার পরে ওনার বস্তিতে এসে পৌঁছলাম। বস্তি একটা পাহাড়ের গায়ে। কাজেই কত বড় দেখে বুঝতে পারলাম না। তার ওপর ততক্ষণে অন্ধকার ঘন হয়ে গেছে। শুধু কতকগুলো কুঁড়ে ঘর নজরে পড়ল। কিন্তু একটা ছেড়ে কোন ঘরেই আলো নেই। ভদ্রলোক বললেন, "এখানে লোকে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। অন্ধকার হয়ে গেলে আর কিছু করার নেই।" যে ঘরে আলো, সেই ঘরে আমায় নিয়ে বললেন, "এখানেই আজ রাতে থাকুন। আপনার আসল ঘর এগিয়ে ডানদিকের তিননম্বর। সকালে উঠে চলে যাবেন। আমি হয়ত তার আগেই বেরিয়ে যাব। কুণ্ঠা বোধ করবেন না। দেখবেন ঘরের দাওয়ায় একজন পুরুষ আর একজন মহিলা বসে আছেন। ওনাদের সঙ্গেই থাকবেন।" এই বলে ভদ্রলোক শোবার খাটিয়া দেখিয়ে দিলেন। একটা ছোট চৌকির ওপর থালায় দেখলাম খাবার আর জল রাখা। শৌচকাজ বললেন ঘরের পেছনের জঙ্গলে করতে। এ জঙ্গলে বন্যপ্রাণী-টানির ভয় নেই। এই বলে ভদ্রলোক বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি বললাম, "কবে ফিরব সেটা ঠিক করা হলনা। আমার হোটেলের বুকিং রোববার অব্দি।" ভদ্রলোক ঘাড় ঘুরিয়ে হেসে বললেন, "এখান এলে কেউ ফেরে না।"

পরেরদিন যখন ঘুম ভাঙল তখন সবে রোদ ফুটছে। পাখীরা তারস্বরে ডাকতে শুরু করেছে। নতুন জায়গা। আর ঘুম হবে না। উঠে পড়লাম। শরীরে একটুও ক্লান্তি নেই। মনটাও অসম্ভব হালকা লাগছে। জঙ্গলে হাঁটার এমনই মহিমা। বাইরে এসে দেখি রাতে বৃষ্টি হয়েছে খুব। আর যেটা রাতের অন্ধকারে বুঝতে পারিনি সেটা হল যে বস্তিটা কত বড়। ঘরের সামনে রাস্তা। আর রাস্তার দু ধারে সারি সারি কুটির। যতদূর চোখ পড়ে রাস্তা আর কুটিরের সারি চলে গেছে। তবে দুটো কুটিরের মাঝে অনেক যায়গা। আর চতুর্দিক নানারকম গাছে ভর্তি। আর ঘরগুলোর মুখও সব রাস্তার দিকে নয়। খুব সুন্দর লাগল। কেউ এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই। পাখীর ডাক না থাকলে ভাবতাম ভূতের জায়গা। ভুল বললাম। শুধু একটা ঘরের সামনের দাওয়ায় দুজন বসে আছে। গুণে দেখলাম ওটাই আমার থাকার ঘর। ভাবলাম ওনারাও উঠে পরেছেন, আমিও উঠে পড়েছি, গিয়ে আলাপটা সেরে রাখি। পরে ঝোলা নিয়ে যাব।

রাস্তা থেকে দাওয়ার উঠতেই আমাকে দেখে বাবা হাসিমুখে তাকিয়ে রইল। মা স্বস্তির গলায় বলল, "এসে গেছ!"

652 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: চয়ন মান্না

Re: আমার এ ঘর

অসাধারণ হয়েছে, আমি সাধারণত বিস্মিত হই না, কিন্তু এই গল্পটা অবাক করেছে। অভিনন্দন জানালাম
Avatar: anandaB

Re: আমার এ ঘর

এই সিরিজ এর (?) সবচেয়ে ভালো এটি। সংকলন করে রাখার মতো। অসম্ভব ভালো লাগলো
Avatar: শঙ্খ

Re: আমার এ ঘর

প্রেডিক্টেবল কিন্তু ভালো লেগেছে।
Avatar: aranya

Re: আমার এ ঘর

আমিও আন্দাজ করেছিলাম বটেক, তবে খাসা হয়েচে


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন