ন্যাড়া RSS feed
বাচালের স্বগতোক্তি

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বার্সিলোনা - পর্ব ১
    ঠিক করেছিলাম আট-নয়দিন স্পেন বেড়াতে গেলে, বার্সিলোনাতেই থাকব। বেড়ানোর সময়টুকুর মধ্যে খুব দৌড় ঝাঁপ, এক দিনে একটা শহর দেখে বা একটা গন্তব্যের দেখার জায়গা ফর্দ মিলিয়ে শেষ করে আবার মাল পত্তর নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ভোর রাতে রওনা হওয়া, আর এই করে ১০ দিনে ৮ ...
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...
  • দক্ষিণের কড়চা
    (টিপ্পনি : দক্ষিণের কথ্যভাষার অনেক শব্দ রয়েছে। না বুঝতে পারলে বলে দেব।)দক্ষিণের কড়চা▶️এখানে মেঘ ও ভূমি সঙ্গমরত ক্রীড়াময়। এখন ভূমি অনাবৃত মহিষের মতো সহস্রবাসনা, জলধারাস্নানে। সামাদভেড়ির এই ভাগে চিরহরিৎ বৃক্ষরাজি নুনের দিকে চুপিসারে এগিয়ে এসেছে যেন ...
  • জোড়াসাঁকো জংশন ও জেনএক্স রকেটপ্যাড-১৪
    তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায়...আসলে যে কোনও শিল্প উপভোগ করতে পারার একটা বিজ্ঞান আছে। কারণ যাবতীয় পারফর্মিং আর্টের প্রাসাদ পদার্থবিদ্যার সশক্ত স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। পদার্থবিদ্যার শর্তগুলি পূরণ হলেই তবে মনন ও অনুভূতির পর্যায় শুরু হয়। যেমন কণ্ঠ বা যন্ত্র ...
  • উপনিবেশের পাঁচালি
    সাহেবের কাঁধে আছে পৃথিবীর দায়ভিন্নগ্রহ থেকে তাই আসেন ধরায়ঐশী শক্তি, অবতার, আয়ুধাদি সহসকলে দখলে নেয় দুরাচারী গ্রহমর্ত্যলোকে মানুষ যে স্বভাবে পীড়িতমূঢ়মতি, ধীরগতি, জীবিত না মৃতঠাহরই হবে না, তার কীসে উপশমসাহেবের দুইগালে দয়ার পশমঘোষণা দিলেন ওই অবোধের ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

আমার এ ঘর

ন্যাড়া

ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল বালেশ্বরে। চাঁদিপুরে গেছিলাম সাতদিনের জন্যে। গিয়ে দেখি প্রেশারের ওষুধ আনিনি। বালেশ্বরে গেলাম ওষুধ কিনতে। বলল, "আনিয়ে দেব, কাল আসুন।" বাজারে চা খেতে গিয়ে আলাপ হল ভদ্রলোকের সঙ্গে। স্বাস্থ্যবান, দেহাতি চেহারা। খেটো ধুতির ওপর মোটা সুতির পাঞ্জাবি, গলায় তুষের উড়ুনি। ভদ্রলোক যে কোন প্রদেশের বোঝা মুশকিল। আমার সঙ্গে পরিষ্কার বাংলায় কথা বললেন, দোকানির সঙ্গে উড়িয়ায়, সঙ্গে দুজন আদিবাসী মজুর ছিল - তাদের সঙ্গে কোন এক উপভাষায়। আমার জঙ্গলপ্রীতির কথা জেনে বললেন, "আসুন না। জঙ্গল দেখে যান। আমাদের বসতি আছে কাছের জঙ্গলে। এসে থেকে যান।" আমি জিগেস করলাম, "বসতি মানে?" ভদ্রলোক হেসে বললেন, "অনেক মানুষ আছেন, জানেন তো, যাদের সংসার আর ধরে রাখতে পারে না। তারা আমাদের এই বসতিতে এসে ঠাঁই নেন।"

- জায়গাটা কোথায়?
- কাছেই, এখান থেকে ঘন্টা কয়েকের রাস্তা। আমি মাঝে মাঝে শহরে আসি।
- নাম কী জায়গাটার?
- এখন বুঝলেন সব জায়গার নতুন নাম হয়েছে। শহরের লোকেরা বলে ঘাটগাঁওর জঙ্গল। আমরা পুরনো লোকেরা এখনও বিন্ধ্যই বলি। এ সবই আগে বিন্ধ্যর অন্তর্গত ছিল। এখান থেকে সাতকোশির বাস ধরবেন। সাতকোশিতে নেবে বলবেন কলিমাটির হাটে যাব। পথে একটা নদী পেরোবেন খেয়ায়। নদীর ওপারেই কলিমাটির হাট। সেখানে কাউকে বস্তি বললেই দেখিয়ে দেবে। কলিমাটি অব্দি পুরোটা বাসেই যেতে পারেন, কিন্তু সে আপনাকে অনেক ঘুরিয়ে আনন্দপুর দিয়ে নিয়ে যাবে। সময় বেশি লাগবে। বাসও ভাল নয়, বাসরাস্তাও ভাল নয়। সারা গায়েহাতে ব্যথা হয়ে যাবে ঝাঁকুনি আর ধুলো খেতে খেতে। আর বাসও দিনে একটা। আর এদিক দিয়ে গেলে সাতকোশির পরেই আপনার পাহাড়-জঙ্গল শুরু। যে জঙ্গল আপনি দেখতে চাইছেন।

জঙ্গল শুনেই মন নেচে উঠেছিল। কিন্তু শহুরে মন তো, মনে হল জঙ্গলে রাস্তা হারিয়ে ফেলব না তো! ভদ্রলোক বললেন, "সে ভয় যে নেই একেবারে বলব না। যদিও রাস্তা সিধে, কিন্তু তাও কাঁচা আর পথও কম নয়। এক কাজ করুন, আপনি আজই আমার সঙ্গে চলুন।" আমি বললাম, "আজ? আমার সব কিছু তো চাঁদিপুরের হোটেলে। জামাকাপড়ও সঙ্গে নেই কিছু।" ভদ্রলোক কথাটা উড়িয়ে দিলেন, "ও একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আর তা না হলে একটা কাজ করুন। কাল কলিমাটির হাট অব্দি আসুন। আমি এসে সেখান থেকে আপনাকে নিয়ে যাব।" আমি একটু কুণ্ঠিতই হয়ে গেলাম, "আমার জন্যে আবার আপনাকে কলিমাটির হাট অব্দি আসতে হবে।" ভদ্রলোক হেসে ফেললেন, "কলিমাটি তো দু ক্রোশও হবে না। লোককে আনতে আমাকে কোথায়-না-কোথায় যেতে হয় সে শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। তাহলে ওই কথাই রইল। কাল কলিমাটির হাটে চলে যাবেন। বেশি দেরি করবেন না। জঙ্গলে সন্ধ্যে তাড়াতাড়ি নাবে।"

পরের দিন সাতকোশিতে বাস থেকে যখন নাবলাম তখন বেলা আড়াইটে, উড়িষ্যার রোদ প্রায় মাথার ওপরে, কিন্তু আকাশের কোণে কুচকুচে কালো মেঘ জমছে। বাসস্টপে চায়ের-কাম-মনোহারির দোকানে কলিমাটির হাটের রাস্তা জিগেস করতে বাংলা-মেশানো-ওড়িয়ায় যা বলল তার মর্ম হল, "এ রাস্তা ধরে সিধে চলে যান। ওই যেখানে দেখলেন বাসটা বাঁয়ের দিকে চলে গেল, ওইখানে পৌঁছে দেখবেন ডানদিকে পায়ে হাঁটা পথ বেরিয়ে গেছে মাঠের ওপর দিয়ে। সে ধরে কোশখানেক গেলে ঘাট পাবেন। খেয়া পেরিয়ে ওঘাটে নেবেই কলিমাটির হাট পেয়ে যাবেন। তাড়াতাড়ি পা চালান, বর্ষা আসছে।"

জায়গাটা এত পাহাড়ি হবে বুঝিনি। পাহাড়ি, মেঠোপথ গেছে বড় বড় গাছের বনের মধ্যে দিয়ে। দেখে মনে হল শাল-সেগুনের জঙ্গল। ক্রোশ তো শুনেছিলাম মাইলখানেক। পাহাড়ি রাস্তায় আন্দাজমতন প্রায় দেড়-দু-মাইল, মানে সোয়া একঘন্টা হাঁটার পরেও না নদী, না ঘাট - কোনটারই দেখা নেই। পথ হারিয়েছি বলেও মনে হচ্ছে না। দিব্যি স্পষ্ট পায়ে হাঁটা পথ। এদিকে ঝাঁকড়া গাছের ফাঁক দিয়ে যতটুকু আকাশ দেখা যাচ্ছে তাতে বুঝতে পারছি মেঘ অনেকটা আকাশ ঢেকে দিয়েছে। ইতস্তত করছি আর এগোব কিনা এমন সময়ে দেখলাম উল্টোদিক থেকে একজন মরদ আর তার বউ কাঁধে কেঁদুয়া পাতা নিয়ে আসছে। "ঘাট" বলতে সামনে হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল। বুঝলাম ঠিক দিকেই যাচ্ছি। আরও প্রায় পয়ঁতাল্লিশ মিনিট হাঁটার পরে নদীর ধারে এসে পৌঁছলাম। আকাশ তখন সম্পূর্ণ কালো। সূর্য নেই। অন্ধকার এমন যে মনে হচ্ছে সন্ধ্যে নেবে এসেছে। ঘড়িতে যদিও সাড়ে চারটে। নদী এখানে বেশ চওড়া। ঘাট বলতে যা বোঝায়, সেসব কিছু নেই। পাড়ের একটা জায়গা ঢালু হয়ে নেবে গেছে। সেটাই বুঝলাম ঘাট। তবে ফাঁকা। ত্রিসীমানায় কোন নৌকো-টৌকো তো নেইই। চরাচরে না কোন মানুষজন, না কোন পশুপাখী। কুকুর-টুকুর কিচ্ছু না। অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। খালি শালের বন থেকে পোকার শব্দ। এবার মনে ভয় ঢুকল। নৌকো না পেলে এখন আবার দু ঘন্টা এই জঙ্গল ধরে ফিরে যাওয়া বিপজ্জনক ব্যাপার। আমি একটু এগিয়ে দেখব কিনা ভাবছি হঠাৎ একটা ছোট ডিঙি নৌকোর আবির্ভাব। এতই ছোট সে নৌকো যে চোখে পড়েনি। ওপার থেকে বেয়ে আসছে।

ঘাটে লাগাতে দেখলাম আর কেউ নেই, নৌকোয় শুধু মাঝি। বিনাবাক্যব্যয়ে চড়ে বসলাম। এত ছোট নৌকো যে ভয় করছিল। কিন্তু মাঝি দেখলাম পাকা হাতে লগি ঠেলে দাঁড় বাইতে আরম্ভ করল। জিগেস করলাম, "এ নদীর নাম কী গো?" মাঝি বলল, "কেউ বলে গুপ্তগঙ্গা, কেউ বলে বৈতরণী"। আমি ভাবলাম বৈতরণীই বটে। এই নৌকোয় পাহাড়ি নদী পেরোন আর বৈতরণী পেরোন একই কথা। তবু ভালয় ভালয় এদিকে এসে নাবলাম। মাঝি বলল যে একটু এগোলেই কলিমাটির হাট। এদের "একটু"-কে আর বিশ্বাস নেই। আমি ঘন্টাখানেক হাঁটার জন্যে তৈরি ছিলাম, কিন্তু ঘাট থেকে উঠে পাঁচ মিনিট হাঁটতে না হাঁটতেই হাটে পৌঁছে গেলাম। নামেই হাট, আছে একটা-দুটো দোকান। আর মাঠ। মাঠেই বোধহয় হাট বসে। তবে এখন কেউ কোত্থাও নেই। সম্পূর্ণ ফাঁকা। গরু-ছাগল-কুকুর-টুকুরও নয়। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার। শহুরে চোখে আজব ঠেকে। এমন সময়ে দোকানঘরের পেছন থেকে ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। দেখে যে কী পরিমাণ স্বস্তি পেলাম বলতে পারব না। অথচ ইনি তো আমার প্রায় সম্পূর্ণই অপরিচিত। গতকালই আলাপ হয়েছে, তাও বড়জোর মিনিট দশেকের জন্যে। কিন্তু ওনার আহবানে এমন কিছু ছিল যার টানে আমি হোটেলে তালা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়েছি।

আমাকে দেখে হাসলেন। শুধু বললেন, "চলুন।" আমি আকাশের দিকে উদবেগের দৃষ্টি দিতে উনি বললেন, "আমরা পৌঁছে যাব। তার আগে জল আসবে না।" হাটের মাঠর ধারেই শুরু হয়েছে শাল-সেগুনের বন। তার মধ্যে দিয়ে পথ। পথ বলছি বটে, কিন্তু কোন চিহ্ন নেই। শুঁড়িপথও না। অথচ ভদ্রলোক কোনদিকে দৃকপাত না করে খুব সহজভাবে হাঁটতে লাগলেন। এখানেও পাহাড়ি রাস্তা। কিছুটা চড়াই, আবার একটু উৎরাই, আবার চড়াই। কিন্তু মোটের ওপর চড়াই যাচ্ছি বলেই মনে হল। যেতে যেতে কথা হচ্ছিল। বললেন এরকম বসতি নাকি আরও অনেক আছে। এক এক বসতি এক এক ধরণের লোকেদের জন্যে। উনিই চালান এই বস্তি। ওনাকেই মাঝে মাঝে লোকালয়ে আসতে হয়, নইলে বস্তির লোকজন বস্তি থেকে বেরোয় না। কতজন আছে জিগেস করায় হেসে বললেন, "গিয়েই দেখুন না। হয়ত আপনার চেনা কেউ থাকতে পারে।" তারপরে আমার কথা জিগেস করলেন। কেন জঙ্গল দেখতে চাই। জঙ্গল আমার চিরদিনই খুব প্রিয়। কিন্তু গেলবছর মা মারা যাবার পরে জঙ্গলের নিঃসঙ্গতার আকর্ষণ যেন চেপে বসেছে, নিরন্তর হাতছানি দিচ্ছে। "আর বাবা?", ভদ্রলোক জিগেস করলেন। বাবা মারা গেছেন প্রায় দশ বছর হল। কিন্তু বাবা যাবার পরে এরকম অনুভূতি হয়নি।

চলা দেখে বোঝা যায় এই পথে ওনার নিয়মিত যাতায়াত। কোনরকম সংশয়ের ব্যাপার নেই। ডানদিক-বাঁদিক করে প্রায় ঘন্টা দেড়েক চলার পরে ওনার বস্তিতে এসে পৌঁছলাম। বস্তি একটা পাহাড়ের গায়ে। কাজেই কত বড় দেখে বুঝতে পারলাম না। তার ওপর ততক্ষণে অন্ধকার ঘন হয়ে গেছে। শুধু কতকগুলো কুঁড়ে ঘর নজরে পড়ল। কিন্তু একটা ছেড়ে কোন ঘরেই আলো নেই। ভদ্রলোক বললেন, "এখানে লোকে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে। অন্ধকার হয়ে গেলে আর কিছু করার নেই।" যে ঘরে আলো, সেই ঘরে আমায় নিয়ে বললেন, "এখানেই আজ রাতে থাকুন। আপনার আসল ঘর এগিয়ে ডানদিকের তিননম্বর। সকালে উঠে চলে যাবেন। আমি হয়ত তার আগেই বেরিয়ে যাব। কুণ্ঠা বোধ করবেন না। দেখবেন ঘরের দাওয়ায় একজন পুরুষ আর একজন মহিলা বসে আছেন। ওনাদের সঙ্গেই থাকবেন।" এই বলে ভদ্রলোক শোবার খাটিয়া দেখিয়ে দিলেন। একটা ছোট চৌকির ওপর থালায় দেখলাম খাবার আর জল রাখা। শৌচকাজ বললেন ঘরের পেছনের জঙ্গলে করতে। এ জঙ্গলে বন্যপ্রাণী-টানির ভয় নেই। এই বলে ভদ্রলোক বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। আমি বললাম, "কবে ফিরব সেটা ঠিক করা হলনা। আমার হোটেলের বুকিং রোববার অব্দি।" ভদ্রলোক ঘাড় ঘুরিয়ে হেসে বললেন, "এখান এলে কেউ ফেরে না।"

পরেরদিন যখন ঘুম ভাঙল তখন সবে রোদ ফুটছে। পাখীরা তারস্বরে ডাকতে শুরু করেছে। নতুন জায়গা। আর ঘুম হবে না। উঠে পড়লাম। শরীরে একটুও ক্লান্তি নেই। মনটাও অসম্ভব হালকা লাগছে। জঙ্গলে হাঁটার এমনই মহিমা। বাইরে এসে দেখি রাতে বৃষ্টি হয়েছে খুব। আর যেটা রাতের অন্ধকারে বুঝতে পারিনি সেটা হল যে বস্তিটা কত বড়। ঘরের সামনে রাস্তা। আর রাস্তার দু ধারে সারি সারি কুটির। যতদূর চোখ পড়ে রাস্তা আর কুটিরের সারি চলে গেছে। তবে দুটো কুটিরের মাঝে অনেক যায়গা। আর চতুর্দিক নানারকম গাছে ভর্তি। আর ঘরগুলোর মুখও সব রাস্তার দিকে নয়। খুব সুন্দর লাগল। কেউ এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই। পাখীর ডাক না থাকলে ভাবতাম ভূতের জায়গা। ভুল বললাম। শুধু একটা ঘরের সামনের দাওয়ায় দুজন বসে আছে। গুণে দেখলাম ওটাই আমার থাকার ঘর। ভাবলাম ওনারাও উঠে পরেছেন, আমিও উঠে পড়েছি, গিয়ে আলাপটা সেরে রাখি। পরে ঝোলা নিয়ে যাব।

রাস্তা থেকে দাওয়ার উঠতেই আমাকে দেখে বাবা হাসিমুখে তাকিয়ে রইল। মা স্বস্তির গলায় বলল, "এসে গেছ!"

622 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: চয়ন মান্না

Re: আমার এ ঘর

অসাধারণ হয়েছে, আমি সাধারণত বিস্মিত হই না, কিন্তু এই গল্পটা অবাক করেছে। অভিনন্দন জানালাম
Avatar: anandaB

Re: আমার এ ঘর

এই সিরিজ এর (?) সবচেয়ে ভালো এটি। সংকলন করে রাখার মতো। অসম্ভব ভালো লাগলো
Avatar: শঙ্খ

Re: আমার এ ঘর

প্রেডিক্টেবল কিন্তু ভালো লেগেছে।
Avatar: aranya

Re: আমার এ ঘর

আমিও আন্দাজ করেছিলাম বটেক, তবে খাসা হয়েচে


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন