সুকান্ত ঘোষ RSS feed

কম জেনে লেখা যায়, কম বুঝেও!

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • দক্ষিণের কড়চা
    গরু বাগদির মর্মরহস্য➡️মাঝে কেবল একটি একক বাঁশের সাঁকো। তার দোসর আরেকটি ধরার বাঁশ লম্বালম্বি। সাঁকোর নিচে অতিদূর জ্বরের মতো পাতলা একটি খাল নিজের গায়ে কচুরিপানার চাদর জড়িয়ে রুগ্ন বহুকাল। খালটি জলনিকাশির। ঘোর বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে পচা লাশের মতো। যেহেতু এই ...
  • বাংলায় এনআরসি ?
    বাংলায় শেষমেস এনআরসি হবে, না হবে না, জানি না। তবে গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আজ ব্লক অফিসে গেছিলাম। দেখে তাজ্জব! এত এত মানু্ষের রেশন কার্ডে ভুল! কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম প্রায় সবার ভোটারেও ভুল। সব আইকার্ড নির্ভুল আছে এমন ...
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...
  • খানাকুল - ২
    [এর আগে - https://www.guruchan...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

শকওয়েভ

সুকান্ত ঘোষ


“এই কি তবে মানুষ?
দ্যাখো, পরমাণু বোমা কেমন বদলে দিয়েছে ওকে
সব পুরুষ ও মহিলা একই আকারে এখন
গায়ের মাংস ফেঁপে উঠেছে ভয়াল
ক্ষত-বিক্ষত, পুড়ে যাওয়া কালো মুখের
ফুলে ওঠা ঠোঁট দিয়ে ঝরে পরা স্বর
ফিসফাস করে ওঠে যেন -
আমাকে দয়া করে সাহায্য কর!
এই, এই তো এক মানুষ
এই তো এক মানুষের মুখ!”

হিরোশিমা বিস্ফোরণের থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন তামিকি হারা, তখন তাঁর প্রায় চল্লিশ বছর বয়স। তামিকি কি ভাগ্যবান ছিলেন নিজের কাছে বা আমাদের মতে? জানি না – তবে এটা জানি ভাগ্যবানের তকমা গায়ে বেশীদিন লাগিয়ে না রেখে ১৯৫১ সালে আত্মহত্যা করেন তিনি।

৬ই আগষ্ট, সকাল ৯টা বেজে ১৩ মিনিট, সাইজোর কাছাকাছি একজন এয়ার-রেড সতর্কবার্তা প্রেরণকারী পর্যবেক্ষক আকাশে তিন-টি শ্ত্রুপক্ষের প্লেন দেখতে পেয়ে সেই বার্তা পাঠাবার সঙ্গে সঙ্গে বার্তাগ্রাহক স্টেশনে সেই মুহুর্তে কর্মরত এক স্কুলছাত্রী লিখে নিলো, “চুগোকু মিলিটারী ডিষ্ট্রিক্ট ইনফরমেশন। তিনটি খুব বড়সড় শত্রুপক্ষের প্লেন দেখা গেছে যারা সাইজো থেকে পশ্চিমে উড়ে যাচ্ছে। জরুরী সর্তকবার্তা”। লেখা শেষ হলে সেই ছাত্রী সরাসরি হিরোশিমা রেডিও স্টেশনে যোগাযোগ করে তাদের সতর্ক করল।

রেডিও স্টেশনে তখন অনুষ্ঠান সঞ্চালন করছিলেন মাসানবু ফুরুটা। এমন নয় যে আকাশে বোমারু বিমান দেখা সেই প্রথম বা সেই বিমান দেখার পর কি করতে হবে তা অজানা। মাসানবুর গলার স্বরে নাকি থাকত এক আশ্চর্য স্থিরতা, তিনি স্থির-ধীর কন্ঠে নাগরিকদের জানাতেন তাদের করণীয়। আর সেই করণীয় তো বলতে গেলে রোজকার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। একটা কালো বোতাম দাবিয়ে চলতে থাকা অনুষ্ঠানটিকে থামালেন এই বলার জন্য যে “চুগোকু মিলিটারী ডিষ্ট্রিক্ট ঘোষণা – তিনটি বিশালাকার শত্রু বিমান এগিয়ে আসছে ...” মাসানবু সেই প্রথম বারের জন্য এর থেকে বেশী ঘোষণার সুযোগ পেলেন না। সমস্ত বেতার কেন্দ্র সহসা হেলে গিয়ে মাসানুবা-কে মাটি থেকে কে যেন ছুঁড়ে দিল আকাশের দিকে! সাইকু স্ট্রীটের ডঃ কাউরু সিমা-র ক্লিনিকের ঠিক ১৯০৩ ফুট উপরে, আওই ব্রীজের থেকে ২০০ মিটার দূরে, লিটিল বয় ফাটল। শহর জুড়ে সাইরেন বেজে ওঠার সুযোগ পাবার আগেই, হিরোশিমার মাথায় যেন আকাশ ভাঙল – সেই প্রথম বারের মত তেমন ভয়ঙ্কর রূপে।

সবদিক বিশ্লেষণ করলে এই বিষয়ে প্রায় সন্দেহই থাকে না যে হিরোশিমা এবং নাগাসাকির বিষ্ফোরণ যুদ্ধর স্থায়িত্বকে ছোট করে দিয়েছিল। আমেরিকা পরমাণু বোমা না ফেললে জাপানীরা আর কতদিন প্রতিরোধ বা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারত সে এক অন্তহীন আলোচনা এবং তর্কের ব্যাপার। এটা মনে হয় যে সেই চালিয়ে যাওয়া যুদ্ধ আরো বেশী প্রাণ কেড়ে নিত – কিন্তু সেই সংখ্যা হিরোশিমা-নাগাসাকির থেকে বেশি হত - বা সমান সমান – তা সমন্ধেও নিশ্চত করে কিছু বলা যায় না – কারণ পরমাণু বোমা ওই দুই শহরে ঠিক কত মানুষের প্রাণহানী ঘটিয়েছে এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানা প্রায় দুঃসাধ্য।
কত মানুষ মরেছিল বা আরো কত মরতে পারত সেই নিয়ে তর্ক এবং অনিয়শ্চয়তা থাকলেও, যে বিষয়ে তর্কের অবকাশ অনেক কম ছিল তা হল সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্পর্কে জন্মানো ভীতি (কল্পিত বা অনুমান সাপেক্ষ) ও আশঙ্কা পরমাণু বোমের ব্যবহারের পিছনের চিন্তাভাবনায় অনেকটাই প্রভাব ফেলেছিল। ব্যবহৃত যুক্তিগুলি সবই ছিল বহু ব্যবহৃত এবং বহু অনুশীলনীত, কিন্তু আমেরিকার জাতীয় আর্কিইভে পাওয়া একটি নথি চমকপ্রদ অন্তদৃষ্টি প্রক্ষেপণ করে সেই দিন গুলিতে আমেরিকার মেজাজ ও চিন্তাভাবনা বিষয়ে।

১৯৪৫ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর জেনারেল গ্রোভস্‌ এক মেমোরেন্ডাম লেখেন এবং পাঠিয়ে দেন বিগ্রেডিয়ার জেনেরাল লরিস নরস্টাডলে যিনি ছিলেন ততকালীন আমেরিকার স্ট্রাটেজিক এয়ার ফোর্সের চিফ্‌ অব স্টাফ। সেই মেমোরেন্ডামের সাথে সংযুক্ত ছিল তিন পাতার এক টপ সিক্রেট রিপোর্ট এই নামের, “রণনীতিগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাশিয়ান জায়গাগুলি ধ্বংসের জন্য প্রয়োজনীয় বোমার আনুমানিক মূল্যায়ন” (“Estimated Bomb Requirements for Destruction of Russian Strategic Areas”)। সেই নথিতে তিনটি কলাম ছিল – প্রথম সারিতে তেষট্টি-টি প্রধান রাশিয়ান শহরের তালিকা, যার শুরুতে ছিল মস্কো এবং শেষে উখটা্‌। দ্বিতীয় সারিতে উল্লেখিত ছিল প্রতিটি শহরের এলাকা হিসাব বর্গ মাইলে এবং তৃতীয় সারিতে ওই শহর গুলি ধ্বংস করতে কতগুলি পরমাণু বোমা লাগবে তার বিশদ। মস্কোর জন্য ছটা বোমাই কাফি – ওই তালিকার সমস্ত শহরকে নিশ্চিহ্ন করতে করতে দরকার পরবে ২০৪ টি পরমাণু বোমা।

এই তিন পাতার নথিটিতে কোন তারিখ ছিল না – জাতীয় আর্কাইভ উল্লেখ করেছে ৩০শে আগষ্ট ১৯৪৫ বলে। তবে এটা নিশ্চিত যে সেটা সেপ্টেম্বরের আগের তৈরী কারণ জেনারেল গ্রোভস ১৫ই সেপ্টেম্বরের পাঠানো মেমোরেন্ডামের সাথে ওই তালিকা জুড়েছিলেন। এবং একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে ঠিক তারিখ যাই হোক – এর তাৎপর্য কিন্তু বিষ্ময়কর বা ভীতপ্রদ। যুদ্ধ শেষের মাত্র এক মাস বা হয়তবা মাত্র পনেরো দিনের মধ্যেই কিন্তু আমেরিকার রণনীতির নির্ধারক ব্যাক্তিদের দৃষ্টি ইউ এস এস আর এর উপর পড়ে গিয়েছিল। ওদিকে তখনো হিরোশিমা এবং নাগাশাকিতে মৃতদেহের সৎকার চলছে। আর যাই প্রাপ্তি হয়ে থাকুক না কেন, হিরোশিমা এবং নাগাশাকির বিভীষীকা এটা তর্কের উর্দ্ধে করে দিয়েছিল যে অন্য জায়গায় পরমাণু বোমার ব্যবহার ঠিক কি ডেকে আনতে পারে। ওপেনহাইমারের অভিশাপ তিনি দেবার আগেই প্রযুক্ত হয়ে গিয়েছিল!

এই লেখাতে বেশী সামরিক বা রাজনৈতিক কচাকচির দিকে যাব না – বরং আমরা চেষ্টা করব মানবিক-দিকটা একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে। যা ঘটেছিল তা ভালো না খারাপ, তার পক্ষে বা বিপক্ষে কি যুক্তি আছে সেই সব ধাঁধার মধ্যেও বেশী না ঢুকে চেষ্টা করব একটু দেখে নিতে সেই সময়ে সেই ঘটনার সাথে যুক্ত মানুষদের নিজেদের উপলব্ধি।

সময়ের হিসাবে দেখলে লিটিল বয় ফেটেছিল সকাল ৯ টা সতেরো মিনিট নাগাদ। একথা আমরা সবাই জানি একটা মাত্র বোমা বিস্ফোরণের যে এমন রূপ হতে পারে তা এর আগে মানুষ জানত না। তাই যা ভেবেই বিশ্লেষিত হোক না কেন, সেই ভয়ঙ্করের রূপ বর্ণণায় কিছু বিশেষণের ঘাটতি থেকেই যাবে। বিস্ফোরণের প্রথম বিলিয়নথ্‌ সেকেণ্ডের ভগ্নাংশে বিস্ফোরণের কেন্দ্রে তাপমাত্রা পৌঁছেছিল প্রায় ৬০ মিলিয়ণ ডিগ্রী সেন্ট্রিগ্রেড – সূর্য-পৃষ্ঠের তারমাত্রার থেকে যা প্রায় ১০০০০ গুণ বেশী। সেই প্রবল তাপপ্রবাহ বিষ্ফোরণের কেন্দ্র থেকে প্রচণ্ড বেগে শহরের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সেই অভূতপূর্ব, অপার্থিব, অকল্পনীয় আলোর ঝলকের নাকি পরে নাম দেওয়া হয়েছিল – পিকা। কিন্তু যারা নাকি সেই আলোর ঝলক দেখার পরও বেঁচেছিল, তাদের কাছে সেই ঝলক এক অদ্ভূত সুন্দরও ছিল – এমন এক সৌন্দর্য, যা আগে নাকি কেউ প্রতক্ষ করে নি। তবে সেই সৌন্দর্য প্রতক্ষ্য করার মত ভাগ্যবান সকলে ছিল না – কারণ আলোর ঝলক চোখ দেখে তা মস্তিষ্কের কাছে বিশ্লেষণে পাঠাবার আগেই হাজার হাজার মানুষ পুড়ে ছাড়খার হয়ে গিয়েছিল। তাদের দেহ পুড়ে যাওয়া কাঠের ভগ্নশেষের মত ভঙ্গুর হয়ে হয়ে ছড়িয়েছিল সেই জায়গা গুলিতেই যেখানে তারা ক্ষণিক আগেই হাঁটছিল, খাচ্ছিল, বেড়াচ্ছিল, হয়ত বা ভালোবাসছিল।

বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে এক কিলোমিটার পরিধিতে নির্গত তাপের পরিমাণ এতই ছিল যে মানুষের শরীরের ভিতরের অঙ্গপ্রতঙ্গ মুহুর্তে - মানে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে পুরোপুরি ভষ্মিভূত করে দিতে পেরেছিল। ঘরবাড়ি, পশুপাখি, গাছ পালা সব মনে হচ্ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে মুহুর্তে ছাই হয়ে গেছে – যে সব বাড়ি ঘরে লোহার ব্যবহার হয়েছিল, সেই লোহা যেন মোমের মত গলে পড়েছে। কথায় বলি – সময় থমকে গ্যাছে – হয়ত সেই প্রথম বারের মতই আক্ষরিক অর্থে সময় থমকে গিয়েছিল। না গলে যাওয়া হাতের ঘড়ির বা দেওয়াল ঘড়ির থমকে যাওয়া দেখে নির্ধারণ করা গিয়েছিল সেই বোমার সঠিক বিস্ফোরণের সময়। অনেক অনেক ক্ষেত্রে তাপের প্রকোপ এতই বেশী ছিল যে, বসে থাকার ছাপ ছাড়া, সেই জায়গায় মানুষটার শরীরের কোন নিদর্শনই পরে ছিল না।

আর সেই প্রথম কয়েক সেকেন্ড পেরিয়ে যাওয়ার পর যা হয়েছিল, তাও মানুষের যুদ্ধ ইতিহাসের জন্য প্রথমবার। পরমাণু বিস্ফোরণে নির্গত সেই অদৃশ্য গামা-রে আর নিউট্রন কণারা ভেদ করে যাচ্ছিল মানুষের চামড়া, শেষ করেছিল শরীরের জীবিত কোষগুলি, এমনকি পরিবর্তন আনছিল আমাদের কোষের গঠনেরো! পুড়ে যাওয়া শরীর, আগে অদেখা আলোর তীব্র ঝলক, ধূলোর ঝড় – সবই ইঙ্গিত দিয়েছিল জাপানীদের কাছে সেই মুহুর্তে যে হিরোশিমা ধবংস হয়েছে এক ‘অন্য’ বোমার বিস্ফোরণে যা আগে মানুষ যুদ্ধে কোনদিন প্রতক্ষ্য করে নি। হাজার হাজার মানুষ তো সঙ্গে সঙ্গে মরে গিয়েছিল শুধু তাপপ্রবাহে – আর তা ছাড়াও আরো হাজার হাজার মানুষ মরবে ক্রমশঃ – কেউ পরবর্তি কিছু দিনে, কেউ কয়েক মাস পর – কেউবা কয়েক বছরে।

আলোর ঝলকের পর এসেছিল সেই শকওয়েভ। কেন্দ্র থেকে নির্গত হয়েছিল প্রায় ৭২০০ মেইল প্রতি ঘন্টা বেগে – প্রচন্ড বেশি চাপের সেই প্রবাহ চুরমার করে দিয়েছিল ঘর, দরজা, অফিস, স্কুল, মন্দির – হাসপাতাল –সব। ওপেনহাইমারের গনণা অনুযায়ী ১৮৫০ ফুট মাটি থেকে উপরে লিটিল বয় ফাটলে, তার ধ্বংসকারী ক্ষমতা হবে সবচেয়ে বেশি – কিন্তু বাস্তব সেই সব গণণা ছাপিয়ে গিয়েছিল। প্রায় ৬০০০০ বাড়ি ঘর ধবংস করেছিল লিটিল বয় – আর মেরেছিল আরো ৫০০০০ হাজার মানুষ যারা মারা গিয়েছিল ছুটে আসা স্পিলনটার, বাড়ি ঘর চাপা পড়ে।

ক্রমনুসারে দেখতে হলে লিটিল বয়ের প্রভাব ছিল এই – আলোর ঝলক, বিস্ফোরণ, আগুনের গোলা এবং ধ্বংসলীলা। মোটামুটি বলা হয় যে প্রায় ৮০০০০ হাজার মানুষ নাকি মারা গিয়েছিল সেই প্রথম কয়েক সেকেন্ডে – সঠিক হিসাব অবশ্য কোনদিনই জানা যাবে না। যারা বেঁচে ছিল, তাদের স্মৃতিতে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল সেই মুহুর্ত, সেই বিভীষীকাঃ

সুনাও সুবোই - বিস্ফোরণ কেন্দ্র থেকে ১২০০ মিটার দূরে সিটি হলের কাছে আলোর ঝলক প্রথম দেখতে পায়, যা তার মতে রূপালী-লাল ধরণের। তবে বেশি কিছু বোঝার আগে সে ছিটকে পড়ে তিরিশ ফুট দূরে রাস্তার ওপারে।

যোসিটো মাতসুয়াজি - বিস্ফোরণ কেন্দ্র থেকে ২৭০০ মিটার দূরে টয়লেটে অর্ধনগ্ন অবস্থায় অনুভব করে প্রথম। সে এক প্রবল জোরালো সাদাটে আলো – গায়ে হাজারো ছুঁচ ফোটার মত বেদনা – টয়লেটের দেওয়াল ভেদ এবং তাকে মাটিকে ছুঁড়ে ফেলা। সে প্রথমে ভেবেছিল, মনে হয় ভূমিকম্প হচ্ছে।

তাকিও নাকামে – মাত্র ৫৫০ মিটার দূরে ছিল বিস্ফোরণ কেন্দ্র থেকে। সে আলোর ঝলক দ্যাখে নি বরং তার নাকি মনে হচ্ছিল ঘরটা গলে গ্যাছে প্রায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে এক তীব্র মেঘের গর্জনের মত আওয়াজ শুনেছিল – সেই তেমন গর্জন, যা শুনে ট্রিনিটি টেষ্টের সময় বিজ্ঞানীরা ছুটে গিয়ে বাঙ্কারে ঢুকে পড়েছিল। পরে জাপানীরা এই গর্জনের নাম দিয়েছিল ‘ডন’- এই ভাবে বিস্ফোরণের পরের কয়েক সেকেন্ডকে জাপানীরা বর্ণণা করেছিল – “পিকা – ডন”, অর্থাৎ ঝলক এবং গর্জন।

ডঃ সুয়ানটারো হিডা বিস্ফোরণ কেন্দ্র থেকে ছয় কিলোমিটার তাঁর ক্লিনিকে ছিলেন সেই সময় – তিনি মনে করতে পারছেন যে, লন্ডভন্ড হবার ঠিক আগে তিনি এক ছয় বছরের বালিকাকে ইঞ্জেকশন দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলেন না যে তিনি আদৈ ইঞ্জেকশন-টা দিয়ে উঠতে পেরেছিলেন কিনা! এক ভাববহ তাপপ্রবাহ বয়ে যাবার পর তিনি বেরিয়ে এসেছিলেন ক্লিনিকের বাইরে – বাইরের আকাশ তখনো নীল – কোন গাছ তখনো হেলে নি, না কেঁপেছিল গাছের পাতা – মনে হচ্ছিল যে সমগ্র পৃথিবী জুড়ে যেন এক ক্ষণিকের নীরবতা – ডাক্তার ভাবলেন তিনি কি স্বপ্ন দেখেছেন? ভাবতে ভাবতে তিনি হিরোশিমার দিকে ঘুরে তাকালেন –
সে এক অদ্ভূত লাল চক্রের মত কি যেন এক ছুটে আসছে হিরোশিমার দিক থেকে – প্রচন্ড বেগে – পাহাড়ের উঁচু নীচু না মেনে, ধান জমির উপর দিয়ে, সেই বন জঙ্গল, সেই গ্রামের বাড়ি-ফার্ম বাড়ি সব কিছুর উপর দিয়ে এক ঢেঊ যেন তাঁকে তাড়া করছে। হঠ করে গ্রামের বাড়ির চাল থেকে উড়ে আসতে লাগল টালি-গুলি, যেমন ভাবে ঝড়ে গাছ থেকে পাতা উড়ে যায়। সেই বিস্ফোরণের ধাক্কা সুয়ানটোরোকে ছুঁড়ে দিল দুটো ঘর পেরিয়ে, গিয়ে লাগল ফ্যামিলি রুমের দেওয়ালে। ধুলো এবং ধ্বংসাবশেষ তাঁর গা ঢেকে দিল ক্রমশঃ – সেই ধ্বংসের মধ্যে থেকে দেখতে পেলেন যে কিছু দূরে পড়ে রয়েছে তাঁরই মত সেই ছয় বছরের মেয়েটা – যাকে তিনি ইঞ্জেকশন দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

তোশায়কি তানাকার মাথার উপরেও ঘরের চাল ভেঙে পড়েছিল, ঠিক যখন সে শহরের দক্ষিণে উজিনা বন্দরের কাছে এক আর্মি ক্লাশরুমে বসে ছিল। বিস্ফোরণের আকষ্মিকতা কাটিয়ে তোশায়িকি নিজেকে মাটি থেকে তুলে নিয়ে দমবন্ধ করা হলুদ ধূলোর ভিতর দিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করল। ভাগ্যবান ছিল সে – কারণ ক্লাশরুমের সেই পুরু দেওয়াল তাকিয়ে বাঁচিয়েছিল বিস্ফোরণের প্রকোপ থেকে অনেকটা। কিন্তু তোশায়কি নিজেকে ভাগ্যবান মানে নি – কারণ সে বেঁচে গেলেও, তার পরিবার ছিল মাত্র আশি মিটার দূরে বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে। মাত্র চব্বিশ ঘন্টা আগেই সেই বাড়ি দিয়ে ঘুরে এসেছে – খেয়েছে স্ত্রীর রাঁধা তার প্রিয় ডিস্‌। বিস্ফোরণের সময় তোশায়কির বউ এবং পরিবার বাড়ির মধ্যেই ছিল।

আমি হিরোশিমা গেছি কয়েক বার - আজকের সেই সুকিয়েন গার্ডেন অত্যাধুনিক হিরোশিমা শহরের মাঝে এক মরুদ্যান যেন। অনেক ধৈর্য নিয়ে পুন-নির্মাণ করেছে জাপানীরা সেই শহরের, সেই বাগানের। আরও অনেক টুরিষ্টের মত, সেই আইকনিক হিরোশিমা ডোমের সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তুলেছি। ছবি ঠিক না এলে, আবার ফিরে গিয়ে পোজ দিয়েছি ডোমের সামনে। এর অনিতদূরের সেই মোতোয়াসু নদী – যার উপর পাথরের ব্রীজ নতুন করে বানানো হয়েছে। আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটি – আর মনে পড়ে যায় এক জাপানী স্কুল শিক্ষক সিগিমতো আশুয়িকু-র লেখা হিরোশিমাকে কে নিয়ে হাইকু। সিগিমতো বেঁচে গিয়েছিলেন – বিস্ফোরণের পাঁচ দিনের পর তিনি ফিরে এসেছিলেন হিরোশিমাতে বন্ধুদের খুঁজতে। মরা মানুষ পেরিয়ে যাচ্ছেন – অসংখ্য পোড়া শরীর ডিঙিয়ে, নদীর জলেও ভেসে উঠেছে মৃত মানুষের দেহ, মরা মাছের মত। লেখা লিখি শুরু করলেও, তিনি বলছেন যে তাঁর সেই সময়কার অনুভব বোঝানোর মত ভাষা তিনি জোগাড় করে উঠতে পারেন নি।

“হিরোশিমা ডে
আমি বিশ্বাস করি হাড় জমা আছে
ওই বাঁধানো রাস্তার নীচে”

[ক্রমশঃ]


[কৃতজ্ঞতাঃ Stephan Walker, “Shockwave: The Countdown to Hiroshima”, John Muaary, 2005]


563 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: I

Re: শকওয়েভ

পড়ছি।ভালো লাগছে।
Avatar: Amit

Re: শকওয়েভ

খুব ভালো লাগলো । পরের পর্বের জন্য অপেক্ষায় থাকলাম
Avatar: Du

Re: শকওয়েভ

পড়ার সময়তেও নিঃ শ্বাস বন্ধ হয়ে যায় শব্দগুলো বোঝা কঠিন হয়ে এতে থাকে।
Avatar: dd

Re: শকওয়েভ

ইন্টেরেস্টং টপিক।

বছর তিনেক আগেও,একটা টইতে সুকি এই প্রবন্ধেরই কিছুটা লিখেছিলেন। মনে পড়ে গেলো।
Avatar: সুকি

Re: শকওয়েভ

হ্যাঁ ডিডিদা, আপনি ঠিকই ধরেছেন। ৩ টে স্তবক আমি আগে লিখে রেখেছিলাম - কিন্তু সময়াভাবে এগুতে পারি নি লেখাটা নিয়ে। আর তা ছাড়া যুদ্ধ, ইতিহাস ইত্যাদি স্ট্র্যাটিজিক ব্যাপার আপনি (বা আরো অনেকে) আমার থেকে অনেক বেশী ভালো জানেন বা বোঝেন। আমি ভাবছিলাম আমার সীমিত ফান্ডা দিয়ে ওই মানবিক দিকটা নিয়ে যদি কিছু লেখা যায়। তবে কিনা, এই নিয়ে এত বেশী লেখা হয়েছে যে, নতুন কি আর যোগ করব! বাংলায় লিখে রাখব এই ভেবেই এগুনো।


Avatar: শঙ্খ

Re: শকওয়েভ

পড়তে পড়তে বিষণ্ন লাগে, তবু আরো পড়তে ইচ্ছে করে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন