Tapas Kumar Das RSS feed

Tapas Kumar Dasএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • অরফ্যানগঞ্জ
    পায়ের নিচে মাটি তোলপাড় হচ্ছিল প্রফুল্লর— ভূমিকম্পর মত। পৃথিবীর অভ্যন্তরে যেন কেউ আছাড়ি পিছাড়ি খাচ্ছে— সেই প্রচণ্ড কাঁপুনিতে ফাটল ধরছে পথঘাট, দোকানবাজার, বহুতলে। পাতাল থেকে গোঙানির আওয়াজ আসছিল। ঝোড়ো বাতাস বইছিল রেলব্রিজের দিক থেকে। প্রফুল্ল দোকান থেকে ...
  • থিম পুজো
    অনেকদিন পরে পুরনো পাড়ায় গেছিলাম। মাঝে মাঝে যাই। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়, আড্ডা হয়। বন্ধুদের মা-বাবা-পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। ভাল লাগে। বেশ রিজুভিনেটিং। এবার অনেকদিন পরে গেলাম। এবার গিয়ে শুনলাম তপেস নাকি ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একটু পরে তপেসও এল ...
  • কাঁসাইয়ের সুতি খেলা
    সেকালে কাঁসাই নদীতে 'সুতি' নামের একটা খেলা প্রচলিত ছিল। মাছ ধরার অভিনব এক পদ্ধতি, বহু কাল ধরে যা চলে আসছে। আমাদের পাড়ার একাধিক লোক সুতি খেলাতে অংশ নিত। এই মৎস্যশিকার সার্বজনীন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে জনপ্রিয়। মনে আছে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় একদিন ...
  • শুভ বিজয়া
    আমার যে ঠাকুর-দেবতায় খুব একটা বিশ্বাস আছে, এমন নয়। শাশ্বত অবিনশ্বর আত্মাতেও নয়। এদিকে, আমার এই জীবন, এই বেঁচে থাকা, সবকিছু নিছকই জৈবরাসায়নিক ক্রিয়া, এমনটা সবসময় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না - জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-পরিণ...
  • আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাই...
    দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা বুয়েটে পড়ার সুযোগ পায়। দেশের সবচেয়ে ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহে বুয়েট। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন ছাত্রকে শিবির সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলল কিছু বরাহ নন্দন! কাওকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কি খুব সহজ কাজ? কতটুকু জোরে মারতে হয়? একজন মানুষ পারে ...
  • ইন্দুবালা ভাতের হোটেল-৭
    চন্দ্রপুলিধনঞ্জয় বাজার থেকে এনেছে গোটা দশেক নারকেল। কিলোটাক খোয়া ক্ষীর। চিনি। ছোট এলাচ আনতে ভুলে গেছে। যত বয়েস বাড়ছে ধনঞ্জয়ের ভুল হচ্ছে ততো। এই নিয়ে সকালে ইন্দুবালার সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। ছোট খাটো ঝগড়াও। পুজো এলেই ইন্দুবালার মন ভালো থাকে না। কেমন যেন ...
  • গুমনামিজোচ্চরফেরেব্বাজ
    #গুমনামিজোচ্চরফেরেব্...
  • হাসিমারার হাটে
    অনেকদিন আগে একবার দিন সাতেকের জন্যে ভূটান বেড়াতে যাব ঠিক করেছিলাম। কলেজ থেকে বেরিয়ে তদ্দিনে বছরখানেক চাকরি করা হয়ে গেছে। পুজোর সপ্তমীর দিন আমি, অভিজিৎ আর শুভায়ু দার্জিলিং মেল ধরলাম। শিলিগুড়ি অব্দি ট্রেন, সেখান থেকে বাসে ফুন্টসলিং। ফুন্টসলিঙে এক রাত্তির ...
  • দ্বিষো জহি
    বোধন হয়ে গেছে গতকাল। আজ ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ, সন্ধ্যাবেলায় আমন্ত্রণ ও অধিবাস। তবে আমবাঙালির মতো, আমারও এসব স্পেশিয়ালাইজড শিডিউল নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই তেমন - ছেলেবেলা থেকে আমি বুঝি দুগ্গা এসে গেছে, খুব আনন্দ হবে - এটুকুই।তা এখানে সেই আকাশ আজ। গভীর নীল - ...
  • গান্ধিজির স্বরাজ
    আমার চোখে আধুনিক ভারতের যত সমস্যা তার সবকটির মূলেই দায়ী আছে ব্রিটিশ শাসন। উদাহরণ, হাতে গরম এন আর সি নিন, প্রাক ব্রিটিশ ভারতে এরকম কোনও ইস্যুই ভাবা যেতো না। কিম্বা হিন্দু-মুসলমান, জাতিভেদ, আর্থিক বৈষম্য, জনস্ফীতি, গণস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অভাব, শিক্ষার অভাব ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বহু যুগের ওপার হতে

Tapas Kumar Das

কেলেভূতকে (আমার কন্যা) ঘুড়ির কর (কল ও বলেন কেউ কেউ) কি করে বাঁধতে হয় দেখাচ্ছিলাম। প্রথম শেখার জন্য বেশ জটিল প্রক্রিয়া, কাঁপকাঠি আর পেটকাঠির ফুটোর সুতোটা থেকে কি ভাবে কতোটা মাপ হিসেবে করে ঘুড়ির ন্যাজের কাছের ফুটোটায় গিঁট বাঁধতে হবে - যাতে করে কর এর দুদিকের সুতো সখৎ সাম্যবাদী হয়ে উঠবে এবং আকাশে উঠে ঘুড়ি আচরণ করবে সুশীল সমাজের মতো মধ্যপন্থায় থেকে - সেই সূক্ষ্ম হিসেব অনেকটা রান্নায় নুন দেওয়ার মতোই।

এখন তার বয়েস দশ হতে চললো, কিন্তু কেলে যখন নিতান্তই শিশুমাত্র তখন থেকেই আমার একটা চেষ্টা ছিল আমার নিজের এক টুকরো ছোটোবেলা তার জন্য রিকন্সট্রাক্ট করার। অর্থনৈতিক ভাবে ভিখারির মতো, তথাপি চারিপাশের গ্রামের বা আধা মফস্বলের মানুষদের ভালোবাসা পেয়ে রাজার মতো যে শৈশব আমার, তা এই চিৎকৃত, ভোগবাদী সমাজে পুনর্নির্মাণ অসম্ভব সেটা আমি জানি। তা সত্বেও আমি চেয়েছিলাম কমবয়েসের টুকরোটাকরা ভালো লাগার বা বিস্ময়ের জিনিসগুলির অভিজ্ঞতার যদি পুনঃ-উপস্থাপনা সম্ভব হয়, বা সেই জীবনের কিছু জিনিস ফিরে দেখার ব্যবস্থা করা যায়। ফিজিক্স স্পিনারের রমরমার মধ্যেই তাই গুলি খেলতে শিখিয়েছি মাটিতে পিল করে। লাট্টু কিনে এনেছি, আল দেওয়া কাঠের লাট্টু লেত্তি অনেক কষ্টে জোগাড় করতে হয়েছে। ভোমা লাট্টু পাইনি যদিও কোথাও, সাধারণ ছোট মাপের টুকুই পেয়েছি কেবল। কার দেওয়া লাট্টু (আমরা গ্রাম মফস্বলের বাংলা মিডিয়ামে পড়া ক্যাবলারা ইয়ো-ইয়ো কে ওই নামেই চিনতাম) জোটাতে গিয়ে দারুন অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। পাড়ার পুণ্য'দার দোকান, যেখানে তার ছেলে বসেন এখন, সেখানে সেই কার দেওয়া লাট্টু খুঁজতে গিয়ে পেয়ে গিয়েছিলাম আমার সময়কার লাট্টু একটি! নিজের চোখ কেই বিশ্বাস হয়নি, ঠিক দেখছি তো? ১৯৮২ সালে, আমার বয়েস বারো ছুঁই ছুঁই তখন, দিল্লি এশিয়াডের ম্যাসকট ছিল আপ্পু - সেই সময় আরো অনেক কিছুর মতোই কার দেওয়া লাট্টুতেও আপ্পুর ইন্টাগ্লিও চালু হয়েছিলো। এবং আশ্চর্য! আশ্চর্য! পুণ্যদার দোকানে আমার চোখের সামনে সবুজ প্লাস্টিকের আপ্পু লাট্টু! হাকুচ নোংরা সেই লাট্টুর ওপরে আমি ঝাঁপ দিয়ে পড়ি - পুণ্যদার ছেলে আমাকে সেটা বিনাপয়সায় দিয়ে দেন। এক টুকরো শৈশব হাতে নিয়ে প্রায় নাচতে নাচতে বাড়ি ফিরি আমি। সেই লাট্টু কালো কারে লাগিয়ে মেয়ে পনপন করে ঘোরায় এখনো।

দুধ দোয়ানো দেখাতে নিয়ে গেছিলাম। ঝকঝকে মাজা বালতি দুই হাঁটুর মাঝখানে রাখা তার মধ্যে চ্যাঁচোঁ করে এসে পড়ছে দুধের গরম ধারা - দেখে সে ভারী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে, এবং দাবি করে সেও দুধ দুইবে। গয়লা পাড়ার যাদব কাকিমারা (এ ঘটনা এলাহাবাদের) তাকে কথা দিয়েছেন দুধ দুইতে দেবেন, তবে আরেকটু বড়ো হোক, কারণ যতই ছাঁদা লাগানো থাকনা কেন গোরুর পেছনের দু পায়ে, তাও লাথি ছোঁড়ার একটা আশঙ্কা থেকেই যায়। ফলে মেয়ে এখন কদিন অপেক্ষায় আছে।

দুধ দুয়েছি (সখ করে, কৌতূহলে। প্রয়োজনে নয়), তাঁত বুনেছি (গন্ডগ্রামে বাবার অফিসে, সাঁওতাল দের সাথে, বাবা ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্টে ছিলেন), মা কয়লা ভেঙে পাতা উনোন (তোলা উনুন আর পাতা উনুন, দুরকমের উনুন হয়) জ্বালাতো, কয়লা ভেঙে দিয়েছি মাকে, তবে গুল দিতে পারতাম না, আর ঘুঁটে দিতে ঘেন্না হতো - মা করতো সেগুলো নির্দ্বিধায়, এবং সেসব দিয়েই রান্না হতো, শুকনো পাতা বা কাঠকুটোও থাকতো মিশে জ্বালানিতে কখনো। পরে গুলের বদলে রেডিমেড কোক-গুল আসে বাজারে - অবলেট-স্ফেরয়েড শেপের। এইসব গল্প মেয়েকে বলায় সে আমার দিকে ভ্যাবলা মুখে তাকিয়ে থাকে - গুল দেওয়া বলতে সে মিথ্যা কথা বলা বোঝে - `ঠাম্মা কি খারাপ মেয়ে ছিলো তাহলে?' - ওরে না রে ছাগল - বলে ধমক দিতে গিয়েই আমার মনে হয়, সত্যি ই তো, জানবেই বা কি করে গুল কাকে বলে? জ্ঞান হয়েছে যার কুকিং রেঞ্জ দেখে সে এমনকি কয়লা কাকে বলে তারইবা কি জানে? `দাঁড়া কয়লা দেখাবো তোকে' - প্রতিশ্রুতি দি আমি। কিন্ত তারপর হিমশিম খাই - উত্তরপ্রদেশের অজ গাঁ ঢুঁড়ে ফেলেও কয়লা জোটাতে পারি না কোথাও। আর গুল উত্তর ভারতের কালচারে নেই। ওদের ঘুঁটে গুলো ও বাঙালি ঘুঁটের মতো নয়, লম্বা মতো, বোধহয় খাপরার চালে দিতে সুবিধা হয় ওরকম আকার হলে।

শেষ আশা হিসেবে এলাহাবাদ স্টেশনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম কদিন, প্ল্যাটফর্ম টিকেট কেটে। যদি কয়লাবাহী মালগাড়ি থামে কখনো। একদিন শিকে ছিঁড়লো বেড়ালের ভাগ্যে। লাইন থেকে খোয়ার টুকরো তুলে মালগাড়ির ফাঁকের ভিতর দিয়ে হাত গলিযে ঠুকে ঠুকে ভেঙে আনলাম কয়েক টুকরো কয়লা। একদম সার্টিফায়েড ওয়াগান ব্রেকারের মতো। এনথ্রাসাইট নয়, নিচু জাতের অশোধিত কয়লা, অনেকটা কাঠকয়লার মতো ফোঁপরা লাগে হাত দিলে, লিগনাইট বোধহয়। যাই হোক, মেয়ের কয়লা দেখা হলো, হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে (এবং অবধারিত ভাবে গালে কালী মেখে ভূত হয়ে)।

তা ঘুড়ি ওড়ানোটাও তো শিখতে হবে বইকি মেয়েকে। বাজি বানানোও। বাবা আর আমরা দুই ভাই মিলে কালীপুজোয় বাজি বানাতাম, আড়িয়াদহ শখের বাজারের দশকর্মা ভান্ডার থেকে সোরা (পটাশিয়াম নাইট্রেট), গন্ধক, কাঠকয়লা কিনে গুঁড়িয়ে ছেঁকে, লোহাচূর (হলুদ আলোর জন্য) এলুমিনিয়াম চুর (সাদা আলো), স্ট্রনসিয়াম (লাল আলো) আর ব্যারাইটা (সবুজ আলো) মিশিয়ে। প্রধানতঃ বসা তুবড়ি। বাজি বানানোর বই ছিলো। তাতে ভাগ থাকতো মশলার। টানাটানির সংসার ছিলো, ষ্ট্রানসিয়াম-ব্যারাইটা প্রায় কখনোই কেনা হতো না, দাম অনেক - লোহা আর এলুমিনিয়াম চুর দিয়েই মূলতঃ বানানো হতো তাই।

গতকাল অর্থাৎ বিশ্বকর্মা পুজোর আগের দিন কয়েকটা ঘুড়ি কিনলাম, আর রেডিমেড মাঞ্জা দেওয়া সুতো। আজ সকালে সেগুলোতে বসে বসে কর বাঁধছিলাম অফিস যাওয়ার আগে, মেয়েকে বোঝাচ্ছিলাম, কি করে বাঁধতে হয়। ছ্যামড়া-ছেমড়ি বড়ো পাকা হয় আজকাল, পেট থেকে পড়েই সর্বজ্ঞ - .একটু দেখাতে না দেখাতেই বলে উঠলো, বুঝেছি! বুঝেছি!

`কি বুঝেছিস? মারবো এক থাবড়া! করে দেখা'তো নিখুঁত ভাবে! পাকামো খালি। '

`ইঁহহহহ থাবড়া মারবে! কেন শুনি? তোমার ছোটবেলায় প্রথমবারেই ঠিকঠাক করতে পারতে এসব? বললেই হলো?'

কি? কি বললো? আমার ছোটোবেলা? থমকে যাই। অদ্ভুত এক কুয়াশার পর্দা নেবে আসে চোখের সামনে সহসা - যেন অন্য জন্ম থেকে, অন্য কোন পৃথিবী থেকে কে ডেকে ওঠে - বাবু! বাবু! ভাতকটা টা খেয়ে নিয়ে তারপর যা বাবা ....

গ্রামের শেষে ভূষণ্ডির মাঠ। মাঠের ধারে ঘর। টিনের চাল মাটির দেওয়াল। ঘরের সামনে স্থলপদ্ম আর আমের গাছ। পেছনে কয়েকটা কাঁঠাল গাছ ঘেঁষাঘেঁষি করে জটলা করে আছে। তা ছাড়িয়ে ধূ ধূ ফাঁকা। রাতের বেলা সেই কাঁঠালতলা থেকে আওয়াজ উঠতো মড়মড় কটকট করে। শিয়ালে খুলি চিবোচ্ছে মানুষের বাচ্ছার। চিরামতি নদীর ধারে শ্মশান, তা বাদে গো ভাগাড়। সাপে কাটা বাচ্ছা অনেক সময় না জ্বালিয়ে ভাসিয়ে দিতো মানুষে, অন্ধ বিশ্বাস ছিল জলের ছোঁয়ায় বেঁচে ওঠে যদি (গাঙুরের জলে মান্দাসিনীর ভেসে যাওয়ার উপকথায় অনুপ্রাণিত হয়ে হয়তোবা)। জল নেবে গেলে আদিগন্ত বালিতে পড়ে থাকা ছোট্ট মৃত শরীরের হাত পা মাথা ছিঁড়ে আনতো শেয়ালে, মহাভোজ হবে। সেই খুলি চিবোনোর আওয়াজে মার বুকের ভেতরে আরো গুটিসুটি মেরে ঢুকে যেতাম মাঝরাতে, হঠাৎ ঘুম ভেঙে। চড়কের মেলায় গাজনের মিছিল বেরোতো, তান্ত্রিকরা নাচতে নাচতে যেতো, অনেকের হাতে বাচ্ছার মাথা - টাটকা। চুল লেগে তখনো, সেই চুলের মুঠি ধরে ঝোলানো। ওই ভূশণ্ডির মাঠ মার্কা মাঠের নাম ছিলো স্কুল মাঠ, স্কুল বাড়ির লাগোয়া তার শুরু বলে। জায়গাটা কালিয়াগঞ্জ, তখন পশ্চিম দিনাজপুর, এখন উত্তর দিনাজপুরে পড়ে, আমার জীবনের প্রথম আট বছর ওখানেই কেটেছে। স্কুল মাঠকে আড়াআড়ি চিরে দু ভাগ করে যে হেঁটো রাস্তাটা চলে গেছে, সেই রাস্তায় গাজনের ওই বীভৎস দৃশ্য দেখে আমার ভাই একবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে, ভীষণ ভয় পেয়েছিলো (স্বাভাবিক)। অনেকদিন ধরে টানা জ্বর, কেঁপে কেঁপে উঠতো রাতের বেলায়। হিতেন ডাক্তারবাবুর দাগওয়ালা মিক্সচারের শিশিতেও সে জ্বর ছাড়েনি। অনেকদিন ভুগিয়ে ছিলো। এখন বুঝি ওটা বোধহয় পোস্ট স্ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার ছিলো। তখন অত জানতাম বুঝতাম না। তবে তাতে কিছু এসেও যায়নি - কম বুঝেই জীবন অনেক সুন্দর ছিলো। আদর ছিল ভালোবাসা ছিলো ভোরের রোদের মতো চারিদিক ঘিরে।

ও কেলেভূত! স্প্লিট এসি চালিয়ে ঘুমোস, কুকিং রেঞ্জে রান্না শেখার চেষ্টা করিস ইউটিউব দেখে - আমাদের ছোটোবেলা তোরা কি করে বুঝবি বাপ আমার?

ঘুড়ি ওড়াতে শিখিনি তখন। বাবা ঘুড়িতে সাদা (মাঞ্জাবিহীন) সুতো বেঁধে দিতো খানিক। সেই সুতো বাঁ হাতে ধরে (পরে ঘুড়ি ও বাঁ হাতেই বাড়তাম) পোঁপাঁ দৌড় লাগাতাম ভূশণ্ডির মাঠে - ডান হাতে মুঠ করে ঢলঢলে হাপ্ - পেন্টুলের কোমর চেপ্পে ধরা - হড়কে নেমে এসে লেংটু বেরিয়ে পড়লেই গেছি আরকি? নিশ্চিন্তে ঘাস চিবোনো ছাগলছানা হঠাৎ এই দৃশ্য দেখে ভড়কে গিয়ে দৌড় লাগাতো। এলাকার সবচেয়ে শক্তিশালী কুকুর ছিল বাঘা - কুকরদের মধ্যে ডন! বিশাল চেহারা, একদমই রাস্তার কুকুরের মতো দেখতে না। কারো বাড়ির এলসেশিয়ান সাময়িক মোহে ডি-ক্লাশড হতে গিয়ে কোনো পোথো নেড়ির এক রজনীর বরিষণে মোর সরোবর গেছে ভরিয়া দশা করে দিয়ে গেছিলো সম্ভবতঃ - বাঘার জন্ম ইতিহাস তেমন বলেই মনে হতো আমার। সেই বাঘার বাচ্ছা গুলো ছুটে আসত আমার পিছু পিছু - উড়ন্ত ঘুড়ি কে ফুলকো রুটি ভেবেই হয়তো? কে বলেছে রুটি সুকান্তরই একচেটিয়া ইনডেক্সিক্যাল সাইন!

সুতরাং দৃশ্যটি আইকনিক - সিকনি টানতে টানতে দৌড়োনো এই অধমের আগে আগে ভয় খেয়ে ছুটছে ছাগলছানা ম্যাহ্যা ম্যাহ্যা করতে করতে আর পশ্চাৎধাবন করছে খেউ খেউ (তখনো ঘেউ ঘেউ করার মতো ডাঁটো হয়নি) করতে করতে বাঘার পরবর্তী প্রজন্ম। এই হলো আমার ঘুড়ি ওড়ানোর প্রথম পাঠ।

পরবর্তী পাঠসমূহ আড়িয়াদহে। ১ নং হরিচরণ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে। আমার জন্মস্থল। সেই বাড়ি (ভাড়া থাকতাম) এবং সেখানে বসবাস করা মানুষদের অশৈলী কান্ডকারখানা নিয়ে লিখতে বসলে মহাভারত হয়ে যাবে, মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি তো তুশ্চু! সে গল্প পরে হবে। তবে ওই বাড়ি আমার মাথার ভেতরে শিকড় চারিয়ে দিয়েছে বরাবরের মতো। অন্নদাতার ভাড়া করা কুত্তা হিসেবে আধা পৃথিবী খেপ খেটে এসেও বাড়ি বললে কেন জানিনা এখনো আমার সেই ১ নাম্বার হরিচরণ চ্যাটার্জি স্ট্রিট ই মনে পড়ে। যদিও বাড়িটি আর নেই। অমোঘ সোসিও-পলিটিক্যাল ডাইনামিক্স অনুযায়ী সেটি এখন এক বৃহৎ `ফেলাট-বাড়ি'। তবে হৃদয় থেকে তাকে উপড়য় সে সাধ্য কার!

মাঞ্জা দিতাম। পেলাষ্টিকের চিনা সুতো কথা হলো কোনো? সুতো হবে বর্ধমান, গান, চেন - এইসব। আমাদের ছোটোকালে সুতোসমাজে কুলীনতম ছিল চেন (Chain মার্কা) সুতো, খুব সম্ভব মাদুরা কোটস ম্যানুফ্যাকচার করতো। জম্মের সাধ ছিলো একটা হাজার (গজ। একটা রিলে মানে কাটিমে কতটা সুতো থাকবে তা গজে মাপা হতো, আড়াইশো, পাঁচশো আর হাজার - এই তিন মাপে রিল বিক্রি হতো কমার্সিয়ালি) চেন সুতোয় মাঞ্জা দেবো। ইস্কুল জীবনে হয়ে ওঠেনি। দৌড় ছিল গান (বন্দুক মার্কা সুতো) অবধি বড়োজোর। গান একটু মোটা সুতো ছিলো। ভারি। ঘুড়ি বহুদূর বেড়ে গেলে, প্যারাবোলার মতো ঝুলে থাকতো সুতো নিজের ওজনে, দৃশ্যতই।

মাঞ্জার জন্য সবচেয়ে ভালো কাঁচ হচ্ছে কাটা বাল্বের (ইনক্যান্ডিসেন্ট ইলেকট্রিক বাল্ব) - ফিনফিনে কাঁচ গুঁড়োতেও সুবিধা। প্রধানতঃ বিশ্বকর্মা তেই ওড়াতাম ঘুড়ি। সরস্বতী পুজো তো প্রতিমা(দের) দেখার জন্য - প্যান্ডেলে নয়, রাস্তায়! ঘুড়ি আর প্রতিমা দুটো একসাথে সামলাবো কি করে রে বাবা! ভি-ডে'র চল টল তখনো হয়নি বাপু! আর চকোলেট বললে বড়োজোর এক্লেয়ার্স বুঝতাম। মৌসুমী মোড়ে তপনদার দোকানে মোটা কাঁচের জারে থাকতো।

ফলে বছরে ওই একবারই ঘুড়ি পর্ব। সারা বছর ধরে লোকজনের বাড়ি থেকে চেয়েচিন্তে মুখ খ্যাঁকানি খেয়ে যতো কাটা বাল্ব জোগাড় করতাম। বাল্ব ভাঙার কায়দা আছে। হামানদিস্তায় গোটা বাল্ব টা ফেলে একটা পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিতে হবে - প্রথম বাড়িটা খেয়ে বাল্ব বার্স্ট করে সজোরে - অত্যন্ত ধারালো টুকরো কাঁচ বুলেটের মতো ছোটে - সেগুলো আটকে যাবে ন্যাকড়ায়। তারপর ঘটাং ঘটাং করে গুঁড়ো থেকে গুঁড়োতর করে যাওয়া। ফিলামেন্ট এর জায়গাটা তুলে ফেলে দিতে হতো। পরে যখন টিউবলাইট (ফ্লুরোসেন্ট টিউব) বাজার নেয়, তখন টিউব দিয়েও মাঞ্জা করেছি। ব্যাপারটা সামান্য গোলমেলে ছিল যদিও। কাঁচের ভিতরের সাদা ফ্লুরোসেন্টের কেমিক্যাল লেয়ার কাটা জায়গায় (মাঞ্জা দিতে গিয়ে যে হাত কাটেনি সে জনতা মাঞ্জাই দেয়নি কোনোদিন!) লাগলে মাঝে মাঝে খানিক বিষিয়ে যেতো। তবে ওই বয়েসে ওসবের পরোয়া কেই বা করে। আমরা কমপ্ল্যান বয়/গেয়ার্ল (ওরকম ই লাগে উচ্চারণ টা আমার) ছিলুম না, `দেখলেই বোঝা যায় গ্ল্যাক্সো বেবী, গ্ল্যাক্সো বেবী' ও না। আমার সঙ্গী ছিলো আমার সমবয়েসী (আমার থেকে এগারো দিনের ছোটো) পিসি, বাবার মামাতো কাজিন, বাবা আর বাবার সেই মামা, প্রায় সমবয়েসী ছিলেন। কি কারণে যে তার ডাকনাম পুমা (ভালো নাম বর্ণালী সরকার) ছিলো জানা নেই, তখনো মাল্টিন্যাশনাল ব্র্যান্ড ভারতে ঢোকেনি, পুমা র প্রোডাক্ট আধা মফঃস্বল আড়িয়াদহ তে কারো চোখে দেখার প্রশ্নই আসে না। তা সত্ত্বেও সেই আন্দিজ পর্বতমালা নিবাসি জন্তুর সমনামী হয়ে উঠেছিল কেন আমার সেই পিসি তা খোদায় মালুম। আমি ডাকতাম পুঁয়া বলে, খেপে গেলে বলতাম পোঁয়া! আমাতে পুঁয়াতে আর দু তিন জন সাঙ্গপাঙ্গ মিলে মাঞ্জা দেওয়া হতো।

সাবু ও এরারুট চাই। সাবু রাতভর ভিজিয়ে রেখে ঢিমে আঁচে জাল দিতে হবে এরারুটের সাথে। একটু তুঁতে (কপার সালফেট) মিশিয়ে নিলে ভালো, অনেকদিন রাখলেও লাটাইয়ের সুতো পোকায় কাটবেনা তাহলে। ভালো করে ফুটিয়ে তার মধ্যে মিহিস্য মিহি করে ছাঁকা কাঁচের গুঁড়ো আর রং (আমার হলুদ মাঞ্জা খুব ভালো লাগতো) দিয়ে মিশিয়ে অতি ধৈর্য্য ধরে জাল দিতে হবে, ডেলা বা দানা থাকা চলবে না, কাঁচের গুঁড়ো একজায়গায় থিতিয়ে (ডিপোজিটেড) হলেও চলবে না। হয়ে গেলে ঠান্ডা করে নিতে হবে।

এবারে দুটো গাছ চাই। মানে গাছের গুঁড়ি। বা ল্যাম্পপোস্ট। বা যে কোনো রকমের খুঁটি। সুতোর কাটিম ধরে (সাধারণতঃ একটা সরু কিন্তু শক্ত কাঠি বা উলকাঁটা সুতোর রিলের গর্তে ঢুকিয়ে) সামনে চলবে একজন, পিছনে একহাতে মাঞ্জার বাটি অন্য হাতে মুঠ ভর্তি মাঞ্জা নিয়ে (মুঠ থেকে প্রায়শঃ যা কিনা অগ্রবাহু গড়িয়ে কনুই হয়ে গায়ে মাখামাখি হবে - একটা গামছা জড়িয়ে রাখা দরকার প্যান্টের বা স্কার্টের ওপরে তাই ) এগোবে - মুঠের মাঞ্জার মধ্যে দিয়ে সুতো চলবে সেই মাঞ্জা মাখতে মাখতে। তৃতীয় জনের কাজ টিপনি কাটা। অর্থাৎ তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের ফাঁকে একটা ছোটো, ভেজা ন্যাকড়ার টুকরো ধরে সেই ন্যাকড়া দিয়ে মাঞ্জা লাগা সুতো চেপে/টিপে এগিয়ে যাওয়া - সাবুদানা বা কাঁচ বা অন্য কোনো কিছুই যাতে না জমে থাকে - মাঞ্জা যেন সুষম হয় একদম। এই টিপনি কাটার লোকটিরই সবচেয়ে অভিজ্ঞ এবং ওস্তাদ হওয়া প্রয়োজন। টিপনি দুরকম হতে পারে, টেনে খেলার সুতো হলে চাপ একটু বেশি দিতে হবে, লেটে (ছেড়ে) খেলার সুতো হলে একটু বেশি খরখরে থাকা বাঞ্ছনীয়। তবে টেনে আর লেটে খেলার আলাদা আলাদা লাটাই হতো একেবারে টপ ওস্তাদদের। আমরা আম জনতা এক সুতোতেই সবরকম খেলতাম - মাঞ্জা টা সাধারণতঃ টেনে খেলার হিসেবেই টিপনি দেওয়া হতো। রোদে শুকিয়ে গেলে লাটাইয়ে গুটিয়ে নেওয়া। দু রকম লাটাই হতো - একটা যেমন আজকাল দেখা যায় - দুদিকে চাকা ওয়ালা। অন্যটা (ও আর দেখাই যায় না, পাওয়াও যায় না) চাকা ছাড়া - একদিক ফাঁকা অন্যদিকে সেল্ফ-ফোল্ডেড - অনেকটা ধানের গুছির পিছনটার মতো দেখতে। এই লাটাইয়ের একটা বিশেষ নাম ছিলো - ভুলে গেছি (বুড়ো হচ্ছি :( )

ঘুড়ির লাইনের টপ মাস্তানরা দু তিন হাজার মাঞ্জা দিতো - ইয়া ইয়া লাটাই! ছোকরা শিক্ষানবীশরা সেই লাটাই ধরতো আর দাদারা প্যাঁচ খেলতো। আমি মিনমিন করে ওড়াতাম আমাদের ছাদ থেকে। প্রথম প্রথম ছোটবেলায় যখন ওড়াতে পারতাম না ঘুড়িতে গ্যাস বেলুন বেঁধে উড়িয়ে ইচ্ছাপূরণ করেছি। ক্বচিৎ সামনের বাড়ির বড়ো ছাদ থেকে, ওই বাড়ির ছোটো ছেলে টোটন (শুভাশিস মহাপাত্র) আমার বন্ধু ছিলো, আর তার দিদি অপর্ণা দি ছিলেন আমার আরেক পিসি, কাল্টু পিসির (কিন্তু ধবধবে ফর্সা! ভালো নাম কৃষ্ণা সরকার। সে সময় ওরকম সব নাম ছিলো, বেলঘরিয়ায় আমার এক পিসেমশাইয়ের নাম ছিলো বিটলে) অতি ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। ফলে সে বাড়িতে আমার অবাধ যাতায়াত ছিলো। সবাই স্নেহ করতো।

পাড়ার দাদারা ওড়াতো ঝুরি সিংয়ের বাড়ির ছাদে - দল বেঁধে। টোটন দের বাড়ির পাশে খানিক জঙ্গল, তার পাশে বাপন (ডাক্তার অরিন্দম রায়, সুনীল জেঠুর ছেলে) দের বাড়ি। এই দুই বাড়ির লাইনের পিছনে ঝুরি সিংয়ের হানাবাড়ি। বাড়ির পেছনে মাঠ ছিল একটা। মাঠের বাঁদিকে বাঁশবন, বাঁশবনের বাঁ দিকে তাপসীদের বাড়ি। সেই মাঠের উল্টো দিকেই পুণ্যদার দোকান - ঘুড়ি লাট্টু গুলি মাছ ধরার ছিপের ও তার সরঞ্জামের, মানে ফাৎনা ইত্যাদি, ময়ূরের পালকের কাঠি, বিপুল সম্ভার। আমার কাছে দোকানটা পুরো প্যান্ডোরার বাক্সের মতো ছিলো। ব্যাঙ্ক লুঠ করার মতো দোকানটা লুটে নেওয়ার ইচ্ছা হতো মাঝে মাঝে।

ঝুরি সিংয়ের বাড়ি ভুতুড়ে জায়গা। ওখানে থাকতো বিদ্যাসাগর নাম এক ভিখারী। রাস্তার আলোর নিচে বসে ভিক্ষা করতো বলে তাকে ওই নাম দিয়েছিলো লোকে। ওই নামে ডাকলে রেগে গিয়ে অশ্রাব্য গালি দিতো। এই বিদ্যাসাগর আর `পায়ে গু বুড়ি' ছিলো গালি-অভিধান। সেই বৃদ্ধাকে `পায়েয়েয়েয়েয়েয়ে গুউউউ((এরকম করে খেলিয়ে ছাড়া হতো আওয়াজটা)!' বলে একবার ডাক দিলে ওনার মুখ খুলে যেতো। যে সব বাক্যবান্ধ বেরিয়ে আসতো তা একেবারে গরম লোহার শলার মতো ঢুকে যেতো কানের পর্দা ফুটো করে। গালির ঐরকম বৈচিত্র ও তীব্রতা আমি খুব একটা শুনিনি কোথাও। সম্প্রতি ফেসবুকে কিছু কিছু মহিলা ও পুরুষের ভক্ত বেড়েছে দেখি, তাঁরা নাকি ভালো গালি দিতে পারেন এই কারণে। আমি তাঁদের সেইসব টাইপ করা গালি পড়ে মুচকি মুচকি হাসি শুধু - মাঝে মাঝে মনে হয় পায়ে গু দিদার স্টক টা ওনাদের সামনে উগরে দি একবার :) `ইনএডিকোয়েট' ফিল করা কাকে বলে জন্মের মতো জেনে যাবেন তাঁরা। আর তার সাথে বিদ্যাসাগর দাদুর স্টক যোগ করলে তো কথাই নেই!

ঝুরি সিংয়ের বাড়িতে বিদ্যাসাগর মরে পড়ে ছিলো। এক রবিবার ঘোর সাঁঝে আমি আর আমার এক সঙ্গী গিয়ে আবিষ্কার করি সেটা। কাউকে বলিনি। ভয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। পরে সবাই জানতে পারে, মিউনিসিপ্যালিটি থেকে বডি সরিয়ে নেয় বোধহয়। ঝ্যালঝ্যেলে ছেঁড়া ফ্লানেলের কোট, চিট ময়লা ধুতি সরে গিয়ে পাঁশুটে নীল রঙের ফুলে ওঠা অন্ডকোষ বেরিয়ে ঝুলছে, ত্যাড়াব্যাঁকা হিন্ডলিয়ামের ভিক্ষার সানকি টা অর্ধেক ভর্তি গ্যালগ্যালে লালায় অনেক্ষন ধরে গড়িয়ে নেমেছিল মুখ থেকে, যা বোঝা যায়। মৃত্যু কি সম্মানহীন, কি দীন করে দিতে পারে প্রকৃতির সুন্দরতম সৃষ্টি এই মানবদেহকে, সেদিনই প্রথম তা উপলব্ধি করি। সেই বিভৎস গা শিউরানো স্মৃতি মাথা থেকে যেতে সময় লেগেছিলো।

ঝুরি সিংয়ের বাড়ির ছাদ থেকে কোনোদিন আমি ঘুড়ি ওড়াইনি।

ঘুড়ি এক কালে নিজেই বানাতাম - কেনার সামর্থের অভাবে। খবরের কাগজেও বানিয়েছি। ঘুড়ি বানানোর কাগজ কিনে (রঙ্গিন পাতলা কাগজ, যা দিয়ে জন্মদিনে শিকলি বানিয়ে সাজায় আজকাল) তা দিয়েও। মা'র ঘর ঝাঁট দেওয়ার ঝ্যাঁটায় অকালে টাক পড়ে যেতো - সেখান থেকে পছন্দসই কাঠি বার করে করে ঘুড়ির কাঁপ আর পেটকাঠি বানানোতে। কাঁপ কাঠি শক্তিশালী হবে, পেটকাঠি তুলনায় সামান্য নরম হলে ভালো। জুড়তাম ভাত দিয়ে। ভাতের আঠা দারুন আঠা! ছেঁড়া ঘুড়ি সবসময় ভাত দিয়েই জুড়েছি। ফ্যানের নয়, ভাতের, মানে সেদ্ধ হওয়া (ভাত হয়ে যাওয়া) চালের। খবরের কাগজে মুড়ে ভাত নিতাম পকেট এ - মার রান্না করা ভাতের হাঁড়ি থেকে চুরি করতাম। সাধারণতঃ কিছু বলতো না মা। তবে একান্নবর্তী সংসারের জোয়াল ঠেলে মাথা গরম থাকতো হয়তো কখনো মা'র (ভীষণই রেয়ার যদিও - মা ছিলো অন্নদা - মার স্টেবিলিটি নষ্ট করা অতি কঠিন কাজ ছিলো) - তখন হাতপাখার বাঁট। আমার ছোটো ভাই যখন লায়েক হলো এবং আমার দেখানো পথে চলতে শুরু করলো, তখন মা একবার হাতের কাছে কিছুই না পেয়ে ঝুড়ি থেকে মোটা সজনে ডাঁটা তুলে তার `প্রপার ইউজ' করেছিলো।

না, আমার মা বাবা পলিটিক্যালি কারেক্ট, প্যারেন্টিং এর কোর্স করা পোগোতিশীল অভিভাবক ছিলেন না। এবং ছিলেন না বলে আমরা, তাঁদের দুই ছেলে, গর্বিত, ও বিশেষভাবে তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।

ঘুড়ি যখন কেনার ক্ষমতা হতো, কিনতাম পুণ্যদার দোকান থেকেই প্রধানতঃ। সে কত্ত রকমের ঘুড়ি। সিকি তে আধ তে এক তে - তিন সাইজের ঘুড়িই চলতো বেশি। সাধারণ উড়ুয়ে রা আধ তে ই কিনতো, কখনো সখনো খুব শখ করে একটা এক তে। মাঝে একবার কটা দো'তে এলো - হৈহৈ পড়ে গেলো পাড়ায়। সেগুলো কে কিনে উড়িয়েছিলো এখন আর তা মনে নেই। পুটু'দা বংশী' দা ভালো ওড়াত, তারাই কি?

মনে আছে, একবার জমানো পয়সায় দুটো সাধের ঘুড়ি কিনে ফিরছি, দুই ফিচেল জনতা, সাইকেলে করে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হাত থেকে টুক করে টেনে নিয়ে হাওয়া হয়ে গেলো। অতিশয় ক্যাবলা ছিলাম তখন, মাধ্যমিক পাশ করা অবধি একেবারেই আতাক্যালানে ছিলাম। হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। সামনের বাড়ি থেকে অজন্তা, আমার ই বয়েসি, আর বুড়ো, আমার আরেক বন্ধু, রেগে গিয়ে চেঁচাচ্ছে কিরে বুজু (আমার পাড়ার ডাকনাম) যা যা ধর বদমাসগুলোকে - দৌড়ো! আর আমি হাঁ করে ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে আছি।

এভাবে মানুষের হাত থেকে ঘুড়ি কেড়ে নিয়ে যায় মানুষ। হাত থেকে জিনিস কেড়ে নিয়ে যায়। কেড়ে নিয়ে যায় বহুদিন ধরে একটু একটু করে জমিয়ে তোলা গড়ে তোলা মান সম্মান। হৃতধন, হৃতসম্মান মানুষ হাঁ করে দাঁড়িয়ে সেই ভদ্রবেশী তস্কর দের দেখে। অজন্তা আর বুড়োর মতো কেউ এগিয়ে আসে হয়তো - খেপে গিয়ে চিৎকার করে - যা যা দৌড়ো - ধর শয়তানগুলোকে - একদম টুঁটি টিপে ধর! আমরা আছি! সেইসব অজন্তাদের আর বুড়োদের জন্যই খেলায় রয়ে যাই - মাঠ ছেড়ে দিই না।

পুণ্যদার দোকানে মোটামুটি সব রকমের ঘুড়ি আসতো, পরে তপন দার দোকানেও, এবং বোধহয় ননীগোপালদার দোকানেও। এ ছাড়া আর দোকান ও তো ছিলো না তেমন। মাথাবোড়া (মাথাপোড়া প্রকারান্তরে), মোমবাতি, বল, এইসব ডিজাইন গুলো ভালো লাগতো। সবথেকে প্রিয় ছিলো কালো সাদা হাঁড়িকাঠ। একরকমের কাগজ হতো, সাধারণ ঘুড়ির কাগজের থেকে একটু আলাদা, একটা আলাদা জেল্লা থাকতো তাতে, সামান্য সেল্ফ টেক্সচার। আমাদের পরিভাষায় সেগুলোকে বলা হতো অস্ট্রেলিয়ান পেপার। কেন বলা হতো তা জানা নেই। অস্ট্রেলিয়া থেকে ওই কাগজ আসে এরকম কোনো তথ্য পরেও পাইনি কোথাও। তবে অস্ট্রেলিয়ান পেপারের কালো ঘুড়ি অসাধারণ লাগতো আমার, মোহগ্রস্থ হয়ে যেতাম একেবারে।

একবার দেখেছিলাম। সবাই সেদিনের মতো নামিয়ে নিয়েছে, আকাশে প্রায় কোনো ঘুড়ি ই নেই তখন। বহু বহু ওপরে অস্ট্রেলিয়ান পেপারের এক তে একটা কালো সাদা হাঁড়িকাঠ, কেটে গিয়ে ভেসে যাচ্ছে মেঘের রাজ্যে। শেষ বিকেলের মরা আলো মাঝে মাঝে এসে পড়ছে তার ওপর। কি গভীর সেই ভেসে যাওয়া, কি মহান অথচ উদাসীন - কোথাও শিকড় নেই, কোনো তাড়া নেই তার, কেউ তাকে ডাকেনি তাই তার কোনো গন্তব্য ও নেই।

তারপর থেকে প্রায়ই স্বপ্নে দেখি সেই ঘুড়িটাকে। কিংবা বোধহয় নিজেকেই।

1046 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: Ekak

Re: বহু যুগের ওপার হতে

বাহ বাহ, খেটে খুটে সব জোগার করা চাট্টিখানি নয়।

আমার ছোটবেলার গুলতি টা দাদুর দেওআ। মা ও তাতে হাত পাকিয়েছেন। তো সেটা নষ্ট হয়ে জাওআর পর , ব্রাবোর্ন রোড এর গুল্তি মার্কেট থেকে কিনেছিলুম সে মোটেই ভালো নাঃ(

এই প্রসঙ্গে আরো দুহ্খের কথা মনে পড়লো, ফুলদাদুর নিজে হাতে বানিয়ে দেওআ গুবগুবা ,সেটাও কোথায় হারিয়ে গ্যালো ঃ/
Avatar: T

Re: বহু যুগের ওপার হতে

আরেঃ, লাইনের লোক তো। চমতকার, চমতকার। হেই বিশ্বকর্মাতেও হুলিয়ে ঘুড়ি ওড়ালাম। লাল একতেল, কালো ল্যাজ। ঐ অস্ট্রেলিয়ান পেপার। দুডজন সাপ্লাই ছিল। আর দু-হাজারের মাঞ্জা লাটাই। এখন আমাদের এদিকে আর সাদা সুতো পাওয়া যায় না। ছেলেবেলায় বর্ধমান সুতোয় মাঞ্জা দিয়েছি প্রচুর। এখন হোলসেল সব মেটিয়াবুরুজের মাল। কিছু লখনৌ থেকে আসে। ঘুড়ির দাম বেড়েছে প্রায় দশগুণ।
Avatar: কুমু

Re: বহু যুগের ওপার হতে

সুন্দর লেখা।
কেলেভূত নামটি ভাল লাগল না।
Avatar: ফরিদা

Re: বহু যুগের ওপার হতে

দুরন্ত।

কিছু লেখা নিজে নিজে নিজেকেই লিখিয়ে নেয়। এটা তেমন লাগল।
Avatar: শঙ্খ

Re: বহু যুগের ওপার হতে

বাহ, দারুণ!
Avatar: বিপ্লব রহমান

Re: বহু যুগের ওপার হতে

ঢাকার এই পাষানপুরীতে আমাদেরও শৈশবে ঘুড়ি (আমরা বলতাম "ঘুড্ডি") বানানো,
ফিউজ বাল্ব গুড়ো করে বার্লি ও রং জ্বাল করে সুতো মাঞ্জা করা ছিল।

এমন কি ভাত+আঠা, মার হাত পাখা বা ভাত রান্নার বাঁশের হাতা (চলতি ভাষায় " নাকড়") এর দু-একটি মোক্ষম বাড়িও ছিল।

সত্যিকথা বলতে, গ্ল্যাক্সো বেবিই ছিলাম, ইঁচড়েপাকা বড় ভাইবোনদের দুষ্টুমির সাগরেদ হিসেবে জুটে গিয়েছিলাম।

দোতলা বাড়ির ছাদে ওড়ানো হতো রঙিন ঘুড়ি। তখন সাতের দশকে দোতলা- চার তলার ওপরে বাড়ি ছিল না। খুব বড়জোর ছয়তলা। এখনকার মতো লিফট ওয়ালা বিশাল অট্টালিকা? প্রশ্নই আসে না।

তখন ঢাকার আকাশ অনেক ফাঁকা ছিল। ঢাকাকে তখন হাফ মফস্বলই বলা যায়। মুদি দোকানেই চাল-ডাল-নুনের সাথে বিক্রি হতো ঘুড়ি, লাটিম, মার্নেল, গুলতি, টেনিস বল।

তখন জীবন ছিল দোয়েলের, ফড়িংয়ের।...

মুগ্ধ হয়ে লেখাটি পড়তে পড়তে নিজেরও এক চিলতে শৈশব মনে পড়ে গেল। এখন সে সব মালাকাইটের ঝাঁপি বলে মনে হয়। আরো লিখুন। 👌
Avatar: Tim

Re: বহু যুগের ওপার হতে

খুব সুন্দর লেখা। তাপসবাবুর শৈশব যেরকম, শহরতলির দিকে অনেকটা সেরকমই ছিলো আমাদের ছোটবেলা, আশির দশকেও। ঘুড়ি আর বাজির সিজন এলেই কমলুকাকু একটা নোটিস টাঙ্গাতো। ঘুড়ির পয়সা যায় উড়ে আর বাজির পয়সা যায় পুড়ে। সে এইদুটো জিনিস কখনো বিক্রি করতোনা।
Avatar: r2h

Re: বহু যুগের ওপার হতে

খুব ভালো লাগলো।

কেলেভূত নামটা আমারও ভালো লাগলো না। ব্যাক্তিগত প্রেক্ষিতে এটি অতি আদরের নাম তা বুঝতে একেবারেই অসুবিধে হয়না, কিন্তু আদারওয়াইজ ডেরোগেটরি টার্ম, দুঃখজনক ভাবে।

বেশি খুঁতখুঁত করছি হয়তো।
Avatar: Tim

Re: বহু যুগের ওপার হতে

এইরকম বহু নাম হয়েছে, বিশেষতঃ আদরের ডাকনামের মধ্যে। খ্যাঁদা-খেঁদি, ভুতো, গাবলু, এগুলোও কিন্তু একরকম করে শারীরীক বৈশিষ্ট্যই ইঙ্গিত করে। প্রশ্ন হলো, এগুলোকেও ডেরোগেটরি বলবো কিনা। (জোরে জোরে ভাবছি, কেলেভূত নাম আমারও পছন্দ হয়নি)।
Avatar: র২হ

Re: বহু যুগের ওপার হতে

হ্যাঁ, তাও ঠিক।
হতেই পারে নাম/ ডাকনাম/ আদরের নাম হিসেবে প্রচলিত হওয়াতেই মূল অ্যাসোসিয়েশনগুলি গেছে।
Avatar: Ekak

Re: বহু যুগের ওপার হতে

খেঁদি অবশ্যই আদরের নাম, কিন্তু লোকের সামনে ডাকার নাম নয় ঃ) এই টুকু খেয়াল রাখলেই তো হলো।
Avatar: Atoz

Re: বহু যুগের ওপার হতে

আমাদের এক আত্মীয়া তাঁর স্বামীকে ডাকতেন হ্যাব্লাকাত্তিক, অবশ্যই জনান্তিকে। ঃ-)
Avatar: i

Re: বহু যুগের ওপার হতে

সুকুমার রায়ের লেখায় সর্বপ্রথম মাঞ্জা শব্দটি জানি। সেই ব্যোমকেশের মাঞ্জা গল্প- চীনে শিরিস ,বোতলচুর আর কড়্‌‌কড়ে এমেরি পাউডার মিশিয়ে সুতোয় মাখালে চমৎ‌কার মাঞ্জা... পাড়াতেও মাঞ্জা দিতে দেখেছি-দুই ল্যাম্পোস্টের মধ্যে সুতো টাঙিয়ে মাঞ্জা দেওয়া চলত-মাঞ্জা শব্দটা তখন উৎসবের ছিল।
এখনও বিশ্বকর্মা পুজোর আগে প্রতিবছরই ঘুড়ি, মাঞ্জা দিয়ে স্মৃতিমেদুর লেখাপত্র প্রকশিত হতে দেখি। পড়িও। তেমনই পড়ি মাঞ্জায় গলা কেটে আহত নিহত হওয়ার মর্মান্তিক সব ঘটনা। মাঞ্জা শুনলে এখন সেই সব দুর্ঘটনার বিবরণ মনে চলে আসে।

লেখা প্রসঙ্গে-
ছোটোবেলার স্মৃতিতে একটি পাগল , একটি মৃত্যুর অনুষঙ্গ থাকে বোধ হয় প্রায় সবারই।
এই লেখাটি আমার বেশ ভালো লেগেছে-একটু এডিট করলে খুব ভালো ছোটো গল্প হয় -'ঝুরি সিংয়ের বাড়িতে বিদ্যাসাগর মরে পড়ে ছিলো' - একটা সাঙ্ঘাতিক লাইন।

আর, আমাদের ছোটোবেলায় রাশান বইএর বাংলা অনুবাদে একটি প্রিয় চরিত্র ছিল কেলেভূতো-কেলেভূতো নয় তেমন/ কথায় কথায় ছিঁচকাঁদন...লেখক হয়ত নিজের শৈশবের প্রিয় চরিত্রর নামে মেয়েকে আদর করে ডাকেন। সে কেলেভূতো যদিও মানুষ ছিল না।
Avatar: i

Re: বহু যুগের ওপার হতে

টাঙিয়ে শব্দটা ঠিক লিখি নি। টানা দিয়ে বা আর কিছু হবে -মনে পড়ছে না।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন