সুকান্ত ঘোষ RSS feed

কম জেনে লেখা যায়, কম বুঝেও!

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • দক্ষিণের কড়চা
    গরু বাগদির মর্মরহস্য➡️মাঝে কেবল একটি একক বাঁশের সাঁকো। তার দোসর আরেকটি ধরার বাঁশ লম্বালম্বি। সাঁকোর নিচে অতিদূর জ্বরের মতো পাতলা একটি খাল নিজের গায়ে কচুরিপানার চাদর জড়িয়ে রুগ্ন বহুকাল। খালটি জলনিকাশির। ঘোর বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে পচা লাশের মতো। যেহেতু এই ...
  • বাংলায় এনআরসি ?
    বাংলায় শেষমেস এনআরসি হবে, না হবে না, জানি না। তবে গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আজ ব্লক অফিসে গেছিলাম। দেখে তাজ্জব! এত এত মানু্ষের রেশন কার্ডে ভুল! কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম প্রায় সবার ভোটারেও ভুল। সব আইকার্ড নির্ভুল আছে এমন ...
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...
  • খানাকুল - ২
    [এর আগে - https://www.guruchan...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

ক্রিকেট

সুকান্ত ঘোষ

১।

সেলিব্রিটি পাবলিকদের মাঝে মাঝে সাংবাদিকরা ইন্টারভিউ নেবার সময় গুগলি প্রশ্ন দেবার চেষ্টা করে। তেমনি এক অখাদ্য গুগলি টাইপের প্রশ্ন হল, আপনি জীবনে সবচেয়ে বড় কমপ্লিমেন্ট কি পেয়েছেন এবং কার কাছ থেকে। বলাই বাহুল্য আমি বিখ্যাত কেউ নেই, তাই আমাকে এই প্রশ্ন কেউ করে নি। কিন্তু আমি নিজে নিজেকে অনেক করেছি সেই জিজ্ঞাসা।

প্রচন্ড ভেবে ভেবে দেখা গেল - লাইফে কমপ্লিমেন্ট পাবার মতন তেমন কিছু তো করি নি! অবশ্য ক্লাস সেভেন থেকে প্রায় টুয়েলভ পর্যন্ত কার্তিক, চঞ্চল সহ অনেক জনতাকে দায়িত্ব নিয়ে ইংরাজী পরীক্ষার পাস মার্ক সরাবরাহ করার ব্যাপারটা যদি না ধরা হয়। অবশ্য তখন জানতাম না কমপ্লিমেন্ট কি জিনিস!
কোন কমপ্লিমেন্টই জীবনে পাই নি বলে যখন প্রায় স্থির করে ফেলেছি, তখনি মনে পড়ে গেল ক্রিকেট খেলার কথা! সে কি সময় ছিল তখন - টেনিস বল ক্রিকেটই জীবনের ধ্যান-জ্ঞান। হেলমেট পড়ে আন্তর্জাতিক উইকেট কীপাররা স্টাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে ফাষ্ট বোলারদের কীপ করা ব্যাপক ভাবে চালু হবার অনেক আগে থেকেই আমি সেই জিনিস করে এসেছি দীর্ঘকাল।

আমাদের দিকে তখন একদিনের টুর্ণামেন্ট ছয়-আট ওভার এবং রানিং টুর্ণামেন্ট ১৪-১৬ ওভার করে হত। একদিনের টুর্ণামেন্টে শীতের দিনে বেলা পড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওভারের সংখ্যাও কমে আসত। অনেক অনেক ফাইনাল ম্যাচ খেলেই দুই ওভারের। ব্যাটসম্যান বল দেখতে পাচ্ছে না, আম্পায়ার দেখতে পাচ্ছে না, আমি উইকেটকীপার দেখতে পাচ্ছি না - বোলার আলো আঁধারীতে বল ছুঁড়ছে, এই জিনিস চলে এসেছে বছরের পর বছর। আর কম ওভারের খেলা হবার জন্যই ক্রীজের বাইরে বেরিয়ে ব্যাট হাঁকাবার একটা ডিম্যান্ড ছিল।

তা যাই হোক, আমাদের নিমো গ্রামের সাথে রাই- ভ্যালারি ছিল পাশের গ্রাম বিষ্ণুপুরের। তবে আমাদের অবস্থা সেই আশি-নব্বই দশকের ভারতীয় দলের মত হলে, বিষ্ণুপুর ছিল পাকিস্তান। কি সব প্লেয়ার! তবে ছয় ওভারের খেলায় বেশী ভালো খেলোয়ারের দরকার হত না - চারজন ভালো প্লেয়ার থাকলেই হত - বাকিরা দুধেভাতে। বিষ্ণুপুরের পিঙ্কি আর গোপাল এই দু জনেই বেশীর ভাগ খেলা শেষ করে দিত। পরের দিকে গোপালের ভাই এসে 'চাক' বোলিং শুরু করার পর বিষ্ণুপুর প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়ল।

তেমনি এক সময়ে, কাঁঠালগাছির মাঠে নিমো গ্রামের সাথে সেমি-ফাইন্যাল খেলা হচ্ছে বিষ্ণুপুরের। বিষ্ণুপুর বেশীর ভাগ সময় নিজেদের প্লেয়ায় নিয়েই খেলত - মানে 'হায়ার' তেমন কেঊ খেলত না ওদের হয়ে। তবে সেই বার কেন জানি না এক বাইরের ব্যাটসম্যান ওদের দলে খেলতে এল।
ফুতুদা বল করছে, সেই ব্যাটসম্যান ব্যাট করতে নামল ওয়ান ডাউনে। প্রথমে রানার্স এন্ডে ছিল। উইকেটের পিছনে আমি। এক রান হলে পড়ে এবার সেই ব্যাটসম্যান ক্রীজে এল ফেস করতে ফুতুদাকে। হঠ করে মাঠের বাইরে থেকে বিষ্ণুপুরের খোকনদার নির্দেশ এল নতুন ব্যাটসম্যানের কাছে। খোকনদা ছিল বিষ্ণুপুরের ক্রীকেট টিমের মেন্টর কাম কর্মকর্তা কাম প্রধান উৎসাহী সমর্থক। আমি স্ট্যাম্পের কাছে থাকার জন্য শুনতে পেলাম, সেই নির্দেশ হল, ক্রীজ ছেড়ে সে যেন না বেরিয়ে খেলে। আসলে চেনাশুনা প্লেয়ার হলে তাকে বলতে হত না, আমি কীপিং করলে সবাই ক্রীজেই প্রোথিত থাকত, কিন্তু এ হল নতুন প্লেয়ার আমাদের এলাকায়, তাই সেই নির্দেশ। পরের গল্প সোজা, ফুতুদা বল করল, সেই ব্যাটা এগিয়ে গিয়ে মারতে গেল এবং ফলত বল মিস করে স্ট্যাম্প।

এবার সেই ছেলে ব্যাট বগলে করে মাঠ থেকে বেরুচ্ছে - ভেসে এল খোকানার চিৎকার - "বোকাচোদাকে হাজার বার বললাম ক্রীজ থেকে বেরুস না, বেরুস না! নাই সেই বেরুবে! তুমি বাঁড়া জানো না, কে আছে উইকেটের পিছনে!"

এই এতোদিন পরে আমি খোকনদার সেই বক্তব্যকে কমপ্লিমেন্ট হিসাবেই নিলাম!

বাই দি ওয়ে, গল্পে কোন জল নেই। উত্তর খেলোড়ারী জীবনে ফুতুদা এখন সফল ব্যবসায়ী - মেমারী নিমতলা মার্কেটে 'নিউ লাইট কর্ণার' নামক বিশাল চালু ইলেক্ট্রিক্যাল এর দোকান। সুকান্ত ঘোষের লেজেন্ডারী উইকেট কিপিং-র গল্প তার কাছ থেকে এখনো যাচাই করে নেওয়া যাবে।

খোকন-দার ডায়লগ এখনো আমায় হন্ট করে - "তুই কিপিং ছেড়ে বাঁড়া কেন যে বালের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলি!"


২।

তেমনি এক শীতের দিনে পড়ন্ত বেলায় নিমো স্টেশনের পাশে কুমারদের জমির আলে লুঙ্গিটা ঠিক করে উবু হয়ে বসে আলম আমাদের বলল, “বুঝলি টনি আর মকসুদকে তুলতে হবে খুব শিগগিরি। ওরা যা শুরু করেছে আজকাল তোরা ভাবতে পারবি না”। টনি আর মকসুদ হল আমাদের পাশের গ্রাম কেজার ছেলে। আলমের প্রস্তাব শুনে আমাদের হালকা টেনশন এসে গেল। বিশেষ করে যখন পাশের গ্রাম থেকে তোলার কোন হিষ্ট্রি তখনো আমাদের ছিল না।
আলম আমার সেই ন্যাংটো বেলার বন্ধু – বাবা মারা যাবার আগের দিন পর্যন্ত মনে এই ধারণা পুষে রেখেছিল যে মাধ্যমিকে আমার নাম্বার আশানুরূপ না হবার মূল কারণ ছিল আলম। তবে বাবার মতে ড্যামেজিং জিনিসটি ছিল আমাদের নিমো গ্রামের শিবতলায় ভ্যাঁটা খেলা। ভ্যাঁটা (বা গুলি খেলা) খেলে খেলে নাকি আমার নাম্বার সেই ক্লাস সিক্স থেকে কমতে শুরু করেছে, মাধ্যমিকে গিয়ে দ্যাট টাচড্‌ দ্যা রক বটম। আলমকে আমি ভ্যাঁটা খেলায় হারাতে পারি নি – সেই প্রশ্নই ওঠে না, শুধু আমি না, নিমো গ্রামেই আলমকে বীট দেবার মত কেউ ছিল না।

আলমের আরেক পরিচয় হল সে পচা মোড়লের নাতি, যে পচা মোড়ল ছিল গিয়ে আমাদের গ্রামে চাল পোড়া, হাঁড়ি চালা, জল পোড়া, বাণ মারা – এই সব ব্যাপারে সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট।

বি ই কলেজ জনিত আমার এক ক্ষতেও আলম প্রলেপ দিয়েছিল পরোক্ষ ভাবে – তবে তেল পোড়া, জল পোড়া বা তাবিজ দিয়ে নয়। বি ই কলেজ আমার পোটেনশিয়ালকে ঠিক ব্যবহার করতে পারে নি – এ ছাড়া আর বিশেষ লার্জ স্কেলের কিছু অভিযোগ কলেজের প্রতি আছে বলে আমি তো এই মুহুর্তে মনে করতে পারছি না। অনেকে কারপেন্ট্রী ক্লাস, মেসে রান্না হওয়া ৫ দিনের পুরানো মাছ, বা নাকুর গান, চাকুরী না পাওয়া এই সব জিনিস নিয়েও টালাবাহানা করে, কিন্তু আমি সেই সব ক্ষুদ্র জাগতিক জিনিস নিয়ে নাড়াঘঁটা করে নিজের স্ট্যান্ডার্ড নীচে নামাতে পারলাম না।

আসলে বি ই কলেজ জানত না সে কি হারাচ্ছে। আর তা ছাড়া আমার পোটেনশিয়ালকে ঠিক মত ব্যবহার না করতে পারার মূল কারণ তো আর কলেজ নিজে ছিল না, ছিল ন্যাংটো (বিশেষ্য)। ন্যাংটোকে দিয়েই কলেজ কাজ চালালো সেই কত বছর। মানলাম না হয় যে ন্যাংটো বাকি অনেক কিছু আমার থেকে ভালো পারত, কিন্তু তা বলে এটা?

বি ই কলেজ ব্যবহার না করতে পারলেও, আমার বাল্যবন্ধু আলম আমার পোতিভাকে শুষে নিয়ে ব্যবহার করেছিল ক্রিকেট টুর্ণামেন্টে। আলম ক্রিকেটও খেলত ভালোই – ক্লাশ ইলেভেন পর্যন্ত আমাদের সাথে বেশ খেলল – তার ন্যাচার‍্যাল বোলিং অ্যাকশন ছিল অফ কাটার। এটা কেউই জানত না, কেবল আমিই জানতাম উইকেট কিপিং করার দারুণ। তা সেই আলম হট করে ১৬ বছর বয়েসে কম্পিটিটিভ ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে পুরোপুরি ক্রিকেট কর্মকর্তা বনে গেল। এর পর থেকে তার প্রধান কাজই হয়ে দাঁড়ালো ক্রিকেট টিম তৈরী করা এবং টুর্ণামেন্ট ধরা।

এবার আমরা এই সব ব্যাপারে আলমকে চ্যালেঞ্জ করতে পারতাম না – কারণ কে কোথায় ভালো খেলছে, সেটা তার থেকে কেউ আর ভালো জানত না। কারণ ক্রিকেট প্লেয়ার স্কাউটিং আলম শুরু করেছিল সেই হিরো সাইকেলের আমলে (অবশ্য অনেকে অ্যাভন ব্যবহার করত), হিরো হোন্ডা গ্রামের ঘরে ঘরে তখনো ঢোকে নি। ভাঙাচোরা সাইকেল নিয়ে মেমারী ব্লক পুরো চষে ফেলে প্লেয়ারদের ডাটাবেস তৈরী করা সে কাজ চাট্টীখানি ছিল না। আলম সেই কাজ করেছিল বছরের পর বছর প্রধানত সুতপা বিড়ির সাহায্য নিয়ে। তার সেকেন্ডারী সাহায্যে ছিল আমাদের সমবয়সী বা জুনিয়ার কেউ, আলমের সাইকেল চালক হিসাবে।

মোটামুটি আমাদের ‘তোলা’ প্লেয়ার ৩ থেকে ৪ জন থাকত ম্যাক্সিমাম, তবে বেশীর ভাগ সমইয়েই মাত্র ২ জন। যদি আমার স্মৃতি ভুল না করে, তা হলে নিমো গ্রামের হয়ে হায়ার খেলার সূচনা করেছিল আমাদের সময়ে মেমারীর কাত্তিক পোল্লে (কালীতলা পাড়া) এবং ক্রিষ্টির তনুপ। তবে সেই সব ছিল ৫ ফুট ২ এর খেলা। সিনিয়র খেলায় এন্ট্রি পেয়ে এরা আমাদের হয়ে আর কোনদিন খেলে নি, যদিও আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে সিনিয়ার হয়েও তনুপ কোনদিন ৫ ফুট ২ পেরিয়েছিল কিনা! কাত্তিক পোল্লের সাথে আমার সম্পর্ক আবার অন্য রকম, আমাদের হয়ে ফ্রীতে খেলেছিল। ওই ইংরাজী পরীক্ষা আর ক্রিকেট - মিথোজীবিতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আমাদের মধ্যে।

তা যা বলছিলাম, সিনিয়র লাইফে নিমো ভারত ক্রিকেট সমাজের টিমে আমাদের ব্যাচে প্রথম ‘তোলা’ (যাকে হায়ার করা বলে আর কি) ওই টনি আর মকসুদ। এবং বলতে নেই, মোহনপুর মাঠে তারা দুই জনেই মান রেখেছিল। মকসুদ দারুণ বল করেছিল, আমি একটা ম্যাচে চারটে স্টাম্প। গোটা একদিনের টুর্নামেন্ট মোট স্ট্যাম্পিং মনে হয় দশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আমরা ভেবেছিলাম সেমিফাইন্যাল পর্যন্ত যেতে পারব না – তাই কেউ বাড়ি থেকে তৈরী হয়ে যাই নি (মানে চান করে, মুড়ি খেয়ে)। সেই ফাইন্যালে ওঠার পর গ্রামের সাপোর্টাররা গামছা বেঁধে মুড়ি নিয়ে গেল বাড়ি থেকে – মোহনপুর মাঠ যাকে বলে একবারে মিডিল অভ নো-হ্যোয়ার। ফাইন্যাল খেলতে গিয়ে আমার কেষ্ট স্যারের কাছে প্রাইভেট মিস – কোন বোকাচোদা আমার ভালোর জন্য সেই খবর আবার আমার বাপের কানে তুলে দেয় – ফলতঃ বাপের হাতে উদুম ক্যালানী – ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে কাপ জিতে ফেরার ফলে নিমোর সিনিয়ররা বাড়ি ঢোকার আগে নিমো বটতলায় কোচোর দোকানে সিঙ্গারা, এবং বাসি দানাদার খাইয়ে বাড়িতে ছেড়ে ছিল। ফলতঃ বাপের ক্যালানী তত বেশী মনে এফেক্ট ফ্যালে নি, পেট ভরা থাকার জন্য।

আলম আমাদের নন-প্লেয়িং ক্যাপ্টেন ছিল না ঠিকই – কিন্তু আমাদের হয়ে টস করতে ওই যেত। কেন না পচা মোড়লের নাতি আলম যে টসে জিতবে প্রতিবার এমনি আমাদের বিশ্বাস ছিল এবং আলম তার মর্যাদা রেখেছিল ৯৫% ক্ষেত্রে। আমরা জোর জবরদস্তি করে আলমকে ওর দাদুর কাছ থেকে টসে জেতার ডার্ক আর্টটা শিখে নিতে চাপ দিয়েছিলাম।

শীতকালে আলমের ফুলটাইম জব ছিল ক্রিকেট কর্মকর্তা, গ্রীষ্মের সময় তখনও ফুটবল খেলা হত, ফলতঃ ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত, বর্ষা আর শরতের মাঝের সময়টায় সে ব্যস্ত থাকত মাছ ধরা নিয়ে – আর বছরের বাকি সময়টায় সে বড় ভাইয়ের আন্ডারে জামা কাপড়ের টেলারিং কাজ করত। এবং সমস্ত সময়েই আলমের কনস্ট্যান্ট সাথী ছিল লটারী এবং জুয়া। তবে সেই লটারী এবং জুয়া খেলার গল্প অন্য সময়। ওই বিষয় গুলি জটিল, অনেক গবেষণা এবং অনেক উত্থান-পতন তার মধ্যে জড়িয়ে আছে।

শুধু কর্মকর্তা হিসাবে নয় – আলম আর হাবা, এই দুই পাবলিকের জন্য নিমো ক্রিকেট মাঠে ড্রেস কোড চালু হয়। ড্রেস কোড মানে, লুঙ্গি পরে ব্যাট করতে নামা যাবে না। একে তো টেনিস বলের খেলায় এল বি ডব্লু ছিল না, তার পর এরা দুজন লুঙ্গি ছড়িয়ে ব্যাট করতে নামা চালু করলে, বোল্ড করে প্রায় অসম্ভব হয়ে গেল। বল যতই জোরে যাক, ব্যাট বীট হলে বল গিয়ে জড়াবে সেই দুই পায়ের মাঝে ছড়িয়ে থাকা লুঙ্গির ভাঁজে। তা হলে বাকি রইল ক্যাচ এবং স্টাম্পিং-রান আউট। সে এক জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়াতে, নিমো ভারত সেবক সমাজের কার্যকরী সমিতির মিটিং ঠিক হল – নো লুঙ্গি।

আলম আমাদের অনেক টুর্নামেন্ট দিয়েছিল – আমরা হেরেছিলাম বেশী, জিতেছিলাম ও অনেক। তবে আলম কিন্তু আমাদের গ্রামের সবচেয়ে সফল হায়ারড প্লেয়ার ফুতুদাকে স্কাউট করে আনে নি – সে এসেছিল সঞ্জুর বন্ধু হিসাবে। সঞ্জু ছিল আমাদের গ্রামের বাই ফার দ্যা গ্রেটেষ্ট প্লেয়ার অব অলটাইম। এমনও শুনেছিলাম যে লোকে নিমোর খেলা দেখতে এসেছিল সঞ্জুর ব্যাটিং-বোলিং এবং আমার কিপিং দেখবে বলে। নিমো গ্রামের বুকে ফাষ্ট বোলিং এবং এগিয়ে গিয়ে বুক চিতিয়ে ছয় মারা সঞ্জুই শিখিয়েছিল। একটা সময় পর্যন্ত ফুতুদা প্রায় আমাদের গ্রামের ছেলে হয়ে উঠেছিল – সময় এগুতে এগুতে এক সময় বন্ধু বিচ্ছেদ হয়, পাবলিকেরা স্বাভাবিক ভাবেই ত্রিকোণ প্রেমের ব্যাপার টেনে আনে, তবে সেই সব গল্প এবং একবার টুর্নামেন্ট ফাইন্যালে জেতার জন্য ২৬ না করতে পারার গল্প পরের বার।

অনেক দিন হল শীতকালে বাড়ি যাই না – নিমোর হয়ে ক্রিকেটও অনেকদিন খেলি নি। আগের বার বাড়ি গিয়ে ফুতুদার ইলেকট্রিকের দোকানে একটা ইস্ত্রী কিনতে গেছি। ফুতুদা বলল, কিরে সুকান্ত একবার শীতকালে আয়, একবার বুড়ো হাড়ে একবার নামা যাক – আর আলমকে না হয় টিম বানাতে বলা যাবে। ফুতুদাকে বললাম ক্রিকেট ছাড়ো, “আলম এখন মাছ ধরা নিয়ে ব্যস্ত। এই তো দু-দিন আগে দেবীপুর থেকে মাছ ধরে এলাম”।

[ক্রমশঃ]




----------------------------------------------
ক্রিকেট – ৩ (থার্ডম্যান)
----------------------------------------------

নিমো ভারত সেবক সমাজ ক্লাবের দরজা থেকে সাইকেল স্টার্ট দেবার আগেই সন্তু সেই বার প্রথম অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ঘোষণা করল। এমন দাবীর সাথে আমরা আগে পরিচিত ছিলাম না – সন্তু জোরের সাথে দাবী করল থার্ডম্যান এলাকায় সে ফিল্ডিং করবে! ক্রিকেটের চিরকালীন ঐতিহ্য মেনে আমাদের দলেরও বাজের দিকের ফিল্ডার থার্ডম্যানে ফিল্ডিং করত, এবং তারা বোলার হত। মোটামুটি পাপাই-ই সেই জায়গায় ফিল্ডিং করে এসেছে দীর্ঘকাল। তা এবার রসুলপুরের আমবাগান মাঠে কি জিনিস স্পেশাল এল যে থার্ডম্যানে ফিল্ডিং করার জন্য গোঁ ধরে বসে থাকতে হবে, সেই নিয়ে আমরা ধ্বন্ধে পরে গেলাম। ক্ষণিক অনুসন্ধানের পর জানা গেল যে, আমবাগান মাঠের থার্ডম্যানের মাধুর্য্য হল কোয়েল-দোয়েলের উপস্থিতি!

যে মাঠে ম্যাচ খেলতে যেতাম আমাদের ওদিকে সেই সব মাঠ গুলি বেশীর ভাগ সময়েই বসত বাড়ি থেকে দূরে হত, মানে গ্রামের প্রান্তে – অনেক গ্রামের মাঠ তো আবার যাকে বলে মিডিল অব নো-হোয়্যার! ফলে আমাদের ম্যাচের দর্শক সবাই মদ্দ পুরুষ, বিভিন্ন এজ গ্রুপ এর, বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ। মেয়ে দর্শকের উপস্থিতিতে খেলার সৌভাগ্য আমাদের খুব একটা হয় নি, মেয়ে বন্ধু খেলার মাঠে নিয়ে আসা তো অনেক পরের গল্প। ওই রসুলপুরের আমবাগান মাঠটিই যাকে বলে বসত বাড়ির মাঝে ছিল এবং তার থার্ডম্যান এলাকায় (সেই সময়ে টেনিস বলে খেলা হলে ওভার শেষে এন্ড চেঞ্জের ব্যাপার ছিল না) বাড়ি ছিল কোয়েল-দোয়েল দের। মানে তাদের প্রকৃত নাম কি আর জানা ছিল! আমাদেরই কেউ ভালোবেসে নাম দিয়েছিল কোয়েল-দোয়েল। তা খেলা থাকলে মনোরম শীতের রোদ পিঠে নিয়ে একটা চ্যাটাই এ বসে কোয়েল দোয়েল খেলা দেখত। হাতে বেশীর ভাগ সময়েই উলকাঁটা এবং মুখে যেন প্রশয়ের হাসি। কিসে প্রশয় আমি বলতে পারব না, তবে সেই হাসিই ডেকে এনেছিল আমাদের নিমো ক্রিকেট দলের ভিতর প্রথম মিউটিনি।

পাপাই রেগে গেল প্রস্তাব শুনে – বলল, “বাঁড়া কেজার মাঠে খেলার সময় কাউকে তো দেখি না থার্ডম্যান নিয়ে মারামারি করতে, মালপাড়া মাঠেও তো বাঁড়া থার্ডম্যানে কাউকে পাওয়া যায় না । আর আমবাগান হলেই থার্ডম্যান নিয়ে মারামারি!” প্রসঙ্গত কেজার মাঠের থার্ডম্যানের পাশেই ছিল ওই গ্রামের ভাগাড় আর মালপাড়া মাঠের থার্ডম্যানের শেষে একটা হালকা নীচু নালা আছে, যেখানে গ্রামের লোক হাগে লিটারেলি থার্ডম্যান বাউন্ডারিতে বসে। যে ভাগাড়ের এবং কাঁচা গুয়ের গন্ধ সহ্য করে এতোদিন থার্ডম্যানে ফিল্ডিং করে এসেছে তাকে কোয়েল-দোয়ে্লের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া আমাদের কাছে সত্যিই অমানবিক মনে হল। তো পাপাইকে সরানো হল না তার চিরাচরিত জায়গা থেকে, কিন্তু থ্রেট দেওয়া হল – ক্যাচ মিস করে নিমো গ্রামের মান-সম্মান ডুবিয়েছ কি কোয়েল-দোয়েলের সামনে, তো তোমাকে তুরন্ত অন্য জায়গায় ফিল্ডিং-এ ট্রান্সফার করা হবে। তো এই সব আলোচনা করে মাঠে গিয়েও ঝামেলা ফিল্ডিং সাজাতে! জেলেদের মনা-কে যতই বলি তুই ফার্ষ্ট স্লিপে দাঁড়া, সে ততোই পিছিয়ে যায়! যে প্রায় পিছিয়ে গিয়ে থার্ডম্যানে পাপাই-এর কোলে উঠে পরে এমন অবস্থা! কোয়েল-দোয়েলের টান এমনি অমোঘ ছিল সেই কালে।

এই আমবাগান মাঠেই ডেবিও হয় আমাদের গ্রামের ট্যালেন্ট হান্ট থেকে খুঁজে পাওয়া বোলার সেনো-দার। সেনোদা মানে হল গিয়ে স্নেহাশিস পাল – যে মাঠে নামার আগে স্কোরার ভালো নাম জিগেস করলে বলতে পারে নি, বলেছিল সেনো। স্নেহাশিস নামটা আমরা জেনেছিলাম ওর দাদার কাছ থেকে। তা সেই সেনো-দাকে খুঁজে পাওয়াও এক চমকপ্রদ ব্যাপার। সেনোদা সবসময়ই ব্যস্ত থাকত চাষ বাস নিয়ে, শীতকালে সেই ব্যস্ততা তো মাঝে মাঝে চূড়ান্ত হয়ে যেত তার। এই মাঠে আলু পাতছে, সেই আলু জমিতে কানি দিচ্ছে, কাল জল পাওয়াচ্ছে, তারপর সার দিচ্ছে, স্প্রে মারছে – আবার আলুতোলা – মোটামুটি সেনোদার চরম ব্যস্ততা। আমাদের সাথে গরম কালে সেনোদা লুঙ্গি কাছা মেরে নেমে বিকেলে ফুটবল খেললেও ক্রিকেট কোন দিন খেলে নি।

তা সেই বার ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলার আহ্বান এল আমবাগান থেকে দুপুর ১২টা নাগাদ, খেলতে বেরোতে হবে বেলা ১ টার মধ্যে তবে যদি একটা ১২ ওভারের ম্যাচ হয়। এদিকে ছেলে হচ্ছে না নিমো টিমে – সবাই নানা দিকে বেরিয়ে গেছে। বিশেষ করে বোলার শর্ট পরছে। তো সেই সময় দেখা গেল সেনো-দা ফিরছে আলু জমিতে জল পাইয়ে। রিন্টু বলল, “এই যে সেনোদা, এত কষ্ট করে মাসলম্যানের মত চেহারাটা ধরে রেখেছ, তা আমাদের একটু সাহায্য করলেও তো পার দু-ওভার বল করে”! সেনোদার হাতে টাইম ছিল সেদিন, তা রিন্টুর কথা সিরিয়াসলি নিয়ে সেনোদা বলল, “দে তা হলে বলটা, চেষ্টা করে দেখি”। বললে বিশ্বাস হবে না, সেই সেনোদা ছুটা এসে বিশাল জোরে করল একটা বোলিং। হাত কি আর পুরো ঘোরে! আর তখনো মার্কেটে রশিদ মালিঙ্গা আসে নি – আমাদের নিমো স্টিয়ারিং কমিটি ভাবতে বসল যে সেনোদার বোলিং অ্যাকশন ম্যাচে আম্পায়ার অ্যালাও করবে কিনা। যাই হোক সেই দিন আমাদের হাতে এমনই কেউ ছিল না, সেনো-দাকে নিয়ে গেলাম আমরা আমবাগান মাঠে খেলাতে। কোয়েল-দোয়েলের কথাও বলা হল। এত দিন পরে ভাবতে অবাক লাগে, কি বোলিং এই না করল সেনো-দা সেই ম্যাচে। আমবাগানের কেউ চিনত না সেনো-দাকে, সবাই জিজ্ঞেস করছে, কি রে বোলারটাকে কোথা থেকে হায়ার আনলি! ৫ উইকেট পেয়েছিল সেই ম্যাচে, আমি করেছিলাম ২ টো স্ট্যাম্প সেনো-দার বলে।

তার পর থেকে আমরা সেনো-দাকে রিকোয়েষ্ট করতে লাগলাম আমাদের টিমে মাঝে মাঝে খেলার জন্য। সেনো-দা বলল, “আলু আগে”, অর্থ হল আলু জমি সামলে যদি সময় পায় তবে সে আমাদের সাথে খেলতে যাবে। তাই সই, আমাদের টিমে খেলতে যেত মাঝে মাঝে সেনো-দা। কিন্তু প্রধান সমস্যা ছিল সেনো-দা ফিল্ডিং করবে কোথায়! শর্টে ফিল্ডিং দেওয়া যাবে না, কারণ সে হেঁট হতে হতেই বল পেরিয়ে যাবে তাকে। তার মানে দিতে হবে বাউন্ডারি লাইনের পিছনে টেনিস বলে যেদিকে বল কম যায় ম্যাচের সময়। পয়েণ্ট-এলাকার পিছনে ধার্য হল তার জায়গা। কিন্তু সেনো-দা ম্যাচ চলাকালিন গল্প শুরু করে দিত বাউন্ডারির ধারের দর্শকের সাথে, গল্প মানে ওদিকে চাষ বাস কেমন হচ্ছে, আলুর দাম কেমন ইত্যাদি।

এক বার গুচ্ছ কেলেঙ্কারি হয়েছিল সেনো-দাকে নিয়ে গ্যাঁড়াঘাটা মাঠে। ম্যাচের শুরুতে দু-ওভার বল করে নিয়ম মত সেনো-দা চলে গেল বাউন্ডারিতে। বেশীর ভাগ সময় সেনো-দা শেষের দিকে এসে বাকি দু-ওভার করে যায় বোলিং। সেই বার কেন জানি না, ইনিংসের মাঝখানে সঞ্জ বোলিং করার জন্য সেনো-দাকে ডাকল। কিন্তু কোথায় সে! আমাদের গ্রামের টাবলু-কে ফিল্ডিংকে ঢুকিয়ে সেনো-দা হাওয়া। টাবলুকে জিজ্ঞেস করা হল, “কি রে সেনো-দা কোথায়?” টাবলু বলল সেনো-দা তো পটাশ কিনতে গ্যাছে! পটাশ কিনতে গেছে মানে! বোঝা গেল যে সেবার নিমোর ওদিকে জমিতে দেবার সার পটাশের শর্টেজ ছিল একটু। কোথাও পটাশ পাওয়া যাচ্ছে না। বাউন্ডারিতে ফিল্ডিং করতে করতে সেনো-দা জানতে পারে যে সেই এলাকায় নাকি পটাশ পাওয়া যাচ্ছে সমবায়ে। ব্যাস, আর কি সেনো-দা ক্রিকেট মাঠে থাকে! টাবলু-কে ফিল্ডিং এ ঢুকিয়ে, মাল হাওয়া। ভেবেছিল ইনিংসে শেষের দিকে বোলিং করার আগে ফিরে আসবে, কিন্তু সঞ্জ সে খেলার মাঝেখানে বোলিং করতে ডাকতে সে কে আর জানত! সেই ম্যাচে সেনো-দা আর মাঠে এসে পৌঁছয় নি, পটাশ পেয়ে সেখান থেকেই বাড়ি চলে গিয়েছিল। অগত্যা আমাকেই বাকি দু-ওভার হাত ঘোরাতে হয়েছিল।

কোয়েল-দোয়েল ছিল আমাদের ক্রিকেট জীবনের প্রথম অনুপ্রেরণা মহিলা দর্শক হিসাবে – আমাদের গ্রামের মেয়েরা কেউ গ্রামের মাঠে আমাদের খেলা দেখতে আসতে না। কিন্তু কোন কারণেই হোক গ্রামে মেয়ে কুটুম্ব এলে তারা বিকেলের দিকে আমাদের মাঠে খেলা দেখতে আসত। সেই দিন খেলার মাঠে প্রবল কম্পিটিশন, কাউকে ডাকতে হত না বিড়ি ফেলে খেলতে আসতে। কিন্তু সেখানেও প্রবলেম দিয়েছিল থার্ডম্যান – আমাদের খেলার মাঠের থার্ডম্যানের শেষেই শুরু হত নিমো স্টেশন। মেয়েরা খেলা দেখত থার্ডম্যানের দিকে নিমো ষ্টেশনের কনক্রিট চেয়ারে বসে। থার্ডম্যান পাপাই-য়ের জায়গা বলে অনেকে তাড়াতাড়ি খেলা শেষ করে স্টেশনে চলে যেত – সন্ধ্যে হলেই যে থার্ডম্যান থেকে বাড়ি ফিরে যাবে কুটুম্ব মেয়েরা। এক সময় বেলা পড়ে আসে, ওরা বাড়ি ফিরে যেত – থার্ডম্যান অন্ধকার হয়ে এল আস্তে আস্তে। একা পাপাই ফিল্ডিং করে যায় মন দিয়ে, ওর ছোঁড়া বল আমার হাতে আসে। আমি মুখ তুলে আর কাউকে দেখতে পাই না, আঁধার সত্যি নেমে এসেছে নিমো স্টেশনে শীতের বেলায়।

[ক্রমশঃ]

-----------------------------------------------------------
ক্রিকেট – ৪ (শ্রীহরি সঙ্গ)
-----------------------------------------------------------

সেদিন রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষে হোটেলে টিভি তে ক্রিকেট খেলা দেখতে গিয়ে আবার নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গেলাম। কয়েক দিন আগেই চিকেন-পক্স থেকে উঠেছি, শরীর দুর্বল – আর তার পরে নষ্টালজিয়ার আক্রমণ আমাকে একেবারে কাবু করে দিল। গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মত এই স্মৃতি মন্থনের সাথে আবার জুড়ে ছিল বঞ্চনার এবং না পাবার ইতিহাস। ঋষভ পন্থ নিজের প্রথম টেষ্টের দ্বিতীয় বলে ক্রীজ থেকে বেরিয়ে এসে ছয়ে মেরে চারিদিকে বাঃ বাঃ শুনে ক্লান্ত হতে গেল। আর আমি কি পেয়েছিলাম সেই কয়েক দশক আগে নিজেদের প্রথম ‘কেনা’ ব্যাটে ছয় মেরে? আমিও পন্থের মত ছয়টা মেরে মুখটা তুলে বাহবা নেব কিনা ভাবছিলাম – ভাবা তখনও শেষ হয় নি, তার মাঝেই কামারদের লালটু-র মা একটা তাল বাখড়া নিয়ে মাঠের ধারে ছুটে এল, “কোন বুকশুলো আমার ভাতের হাঁড়িতে বল মেরেছে রে”? কেউ আর ছয় মারার কৃতিত্ব নিতে চায় না! লালটুর মা ক্রিকেট না বুঝলেও যার হাতে ব্যাট, সেই বল মেরেছে সেটা বুঝতে পেরেছিল – ফলতঃ আরো কাঁচা খিস্তি খেয়েছিলাম সেই গর্বিত আমি।

এই ‘বুকশুলো’ গালাগাল যে ঠিক কি জিনিস আমি জানতাম না, তবে আমাদের দিকে এটা খুব চলত। একটু সফট টাইপের গালাগাল ছিল মনে হয় – কারণ মূলত বয়স্ক ভদ্রমহিলাদেরই সেই গালাগাল দিতে দেখতাম। আলম যতই বলতে লাগল – “ও চাচী, ও বল ভাতের হাঁড়িতে গেলে কিছু হবে না – খান্না বল গো”। চাচী খান্না বলের কোয়ালিটি জানে না – চাচী যা জানে সেটা হল, সেই বল বাঁশ তলাতে প্রায়শঃই খেলতে খেলতে চলে যায়। আর বাঁশ তলার পরিচ্ছন্নতা কে না জানে! চাচীর নিজের ফ্যামিলি সহ, পুরো কামার এবং ময়রা পাড়া বাঁশতলাতেই প্রাতকৃত্য সারত। আলম এবার অন্য অ্যাঙ্গেল দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগল, “চাচী, তুমি বরং ভাতটাকে আরো একটু বেশী ফুটিয়ে নাও – বলের ময়লা সব নষ্ট হয়ে যাবে”। চাচী বলল, “এ্যাই, তুই পচা মোড়লের নাতি না? এতো পড়াশুনা শিখলি কোথায়”? আলম বলল, “গুরুপদ মাষ্টার বলেছে যে জলে ফোটালে জীবাণু মরে যায়”। গুরুপদ মাষ্টারের নাম শুনে লালটুর মা একটু থমকে দাঁড়ালো। কোন এক কারণ বশতঃ নিমো উন্নত অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যলয়ের হেড মাষ্টার গুরুপদ মণ্ডলকে গ্রামের পাবলিক খুবই ভয় এবং সম্মান করত – ভয় খাবার দলে বাঘা বাঘা মস্তানও ছিল। এই ভাবেই গুরুপদ মাষ্টার সশরীরে উপস্থিত না থেকেও ভগবানের মত সেই দিন আমাদের তাল বাখড়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল।

এবার হালকা জিওগ্রাফী – আমাদের ছোট বেলার মাঠ ছিল ‘শুভ’-র তলা। মানে হল গিয়ে ‘শুভ’ ঠাকুরের মন্দিরের পিছনের মাঠ। সেই মাঠের ফাইনলেগে ছিল শুভর মন্দির – ডিপ স্কোয়ার লেগে ছিল নেউলে/শম্ভু কামারের কামারশালা, অফের দিক জুড়ে এবং লঙ লেগে ছিল বাঁশতলা। আর কামার শালার পিছনেই ছিল কামারদের বাড়ি – চার ভাই, নেউল, শম্ভু, লক্ষী এবং বুধো। সেকালে যেমন হত, শম্ভু কামারের বড় ছেলে হরি আর শমভু কামারের নিজের ভাই বুধো প্রায় একই বয়েসেই ছিল। নেউলের ছেলে লাল্টু আমাদের বন্ধু আর হরি আমাদের বাল্য কালের ক্যাপ্টেন। বেশ বড় বেলা পর্যন্ত আমরা কামারদের হাতে গড়া কাঠের ব্যাট দিয়েই খেলে এসেছি – মূলত নেউলে কামার তৈরী করে দিয়েছিল। পরের দিকে সব জিনিসটা ক্যাপ্টেন হরি নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছিল। হরি নিজেই আমাদের ব্যাট বানাত – বেশীর ভাগ ব্যাটই শাল কাঠের বানানো ছিল, এবং খুবই ভারী। সেইবার প্রথম ব্যাট কেনা হল – ডি এফ এস ব্যাট ছিল মনে হয় – যত না প্রয়োজনের তাগিদে, তার থেকেও বেশী প্রতিবেশীর চাপে। ক্রিকেট টুর্ণামেন্ট খেলতে গিয়ে আমাদের ব্যাট নিয়ে হাসি মস্করা চালু হয়ে গিয়েছিল – কত আর অন্যদের থেকে ধার করা ব্যাট নিয়ে মান সম্মান বাঁচাবো। সেই কেনা ব্যাট হাতে নিয়ে আমাদের তো কি বলব ঘাঁটা ঘাঁটি অবস্থা। ব্যাট যে এতো হালকা হতে পারে, আর হালকা ব্যাটে খেলে যে এতো মজা, সে আর কে জানতো। রফিক বল করল, আর আমি লেগের দিকে ক্রশ ব্যাটে হাঁকালাম – কামারশাল পেরিয়ে সেই বল গিয়ে পড়বি তো উঠোনে বসানো কাঠের জালে রান্না চাপানো লালটুর মায়ের ভাতের হাঁড়িতে।

হরি আমাদের সবার ক্যাপ্টেন – আমাদের কারো কারো নিজেদের বাবা-মায়ের মুখের উপর কথা বলার ক্ষমতা ছিল, কিন্তু ক্যাপ্টেন হরির উপর কথা বলা, সেটা তো আমরা ভাবতেই পারতাম না। আমাদের ছেলে বেলার সাথে তখনো ‘ক্যালানি’ জিনিসটা অঙ্গাঅঙ্গি জড়িয়ে ছিল। আমরা যেমন হরির মুখের উপর কথা বলা ভাবতে পারতাম না, তেমনি আমাদের বাবারা, “বাপি, হরি আমাকে মেরেছে” – জাতীয় নালিশ শুনতে অভ্যস্ত ছিল না। নালিশ করলে, উলটে বাপের হাতে ক্যালানি – দুই ক্যালানির মধ্যের স্পেকট্রামের মধ্যে ডবল্‌ এজেড সোর্ডে-র উপর আমরা মানুষ হচ্ছিলাম। আর আমাদের প্রকৃত মানুষ করে তোলার জন্য গুরুপদ মাষ্টারের ক্যালানির মধ্যে আমি আর ঢুকছি না আলোচনায়। সেই ক্যালানির জন্যই করিম চাচার ছেলে নিজে চায়ের দোকান দিতে পেরেছে, না হলে পরের চায়ের দোকানে কাপ ধুয়ে অমানুষ হয়েই থাকতে হত।

হরির তৈরী ব্যাটেই আমাদের চলে যাচ্ছিল – বলও তেমন একটা কিনতে হয় নি। হরি আমাদের কাপ্তানি শুরু করে সেই রবার-ডিউস বলের সময় থেকে। রসুলপুর স্কুল থেকে ফেরার সময় দোকান থেকে বল চুরি করে আনার দায়িত্ব হরি-ই পালন করে এসেছে চিরকাল। গাছের ডাল থেকে পাকা গাব যেমন ঝুলে, যারা গাব গাছ দ্যাখেন নি, তারা মনে করুণ গাছের ডালে বসা বীর বাঁদরের লাল রঙের বীচি যেমন ঝোলে, ঠিক তেমনি ঝুলত সেই আমলে রবার ডিউস বল গুলি নাইলনের নেট থেকে দোকানের সামনে। হরির টেকনিক ছিল খুবই সিম্পল, “কাকু পিছনের ওইটা একটু দ্যাখান তো”। কাকু ঘুড়লো পিছনের মালটা দ্যাখাতে, হরি চালালো ব্লেড হালকা করে নাইলনের নেটে। ওঃ, সে তো চুরী নয়, সে এক শিল্প! সিজারিয়ান বেবী ডেলিভার করার সময় ভালো ডাক্তার যেমন বেবীর মাথাটা বেরুবে ঠিক তেমন পরিমাপে পেটটা কাটে, শ্রীহরির ব্লেড ঠিক তেমনি একটা বল ঝুপ করে পড়বে এমন ফাঁক সৃষ্টি করত নেটে। বল পড়ল ঝুপ করে – না, মাটিতে নয় – পড়ত ফাঁক করে রাখা হরির শান্তিনিকেতনী ব্যাগে। এই এ্যাতো বড় অপারেশন হয়ে যেত, দশ সেকেন্ডের মধ্যে! তবে ভাববেন না যেন, বল চুরী হত বলে আমাদের চাঁদা দিতে হত না! চাঁদা আমাদের দিতে হত – বল কোথা থেকে আসবে সেটা হরির ব্যাপার। তবে ব্যাটের চাঁদা আমরা খুব একটা দিই নি যত দিন না ব্যাট কেনা চালু হয়।

হরির বয়স কত আমরা ঠিক জানতাম না – সাইজে আমাদের মতই ছিল। ইনফ্যাক্ট আমরা বয়সের সাথে সাথে লম্বা হচ্ছিলাম, কিন্তু হরি কনস্ট্যান্ট! পরের দিকে আমরা ক্রমশঃ হরিকে ছাড়িয়ে গেলাম মাপে – ওদিকে হরি তখনো চার ফুট দশ খেলে যেতে লাগালো! হরি ব্যাট ভালো করত – তবে তার অবস্থা সেই ইন্ডিয়ান বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যান যারা শুধু নিজের মাঠেই ভালো খেলে, তেমন ছিল বলতে গিয়ে। নিমোর মাঠে হরি যতটা বিক্রম দেখাতে পেরেছিল, তার অর্ধেকও পারে নি সে বাইরের মাঠে গিয়ে। অফের দিকে পাঁচ এই সব নিয়মও তখন ছিল না – হরি ব্যাট করতে নামনে ওফের দিকে শুরু পয়েন্ট আর লঙ অফ – বাকি সব লেগে সাইডে বাউন্ডারি লাইনে! হরির ছয়ের নাম ছিল – গ্রামের টুর্ণামেন্টে হরির ম্যাচও জিতিয়েছিল। আমাদের ক্যাপ্তানি করে আর শীতকালে ক্রিকেট টুর্ণামেন্ট চালনা করেই হরির পকেট খরচ উঠে আসত। হরির বিখ্যাত অ্যাকাউনটিং সিষ্টেমের জন্য আমাদের কোন ক্রিকেট টুর্নামেন্ট লাভের মুখ দেখে নি কোন দিন। অথচ তখনকার দিনে নর্ম ছিল যে বছরে একটা বা দুটো ক্রিকেট টুর্ণামেন্ট চালিয়ে ওপেক্স-টা তুলে ফেলা। মাঝে মাঝে ক্যাপেক্স ও চলে আসত সেই লাভ থেকে, মানে নতুন জিনিস পত্রও কেনা হত, ব্যাট – উইকেট ইত্যাদি। আমাদের তো আর সেই সব খরচ ছিল না – হরির তৈরী কাঠের ব্যাট, হরির তৈরী কাঠের উইকেট, হরির চুরী করা বল – কে বলে ক্রিকেট বড়লোক দের খেলা?

হরি তোতলা ছিল – ফলতঃ আমাদের টিমের মোটো “কথা কম কাজ বেশী”। হরি নিজে কম কথায় কাজ সারত – আর কথা বার্তা বেশীর ভাগই থ্রেট মূলক, “ক্যাচ মিস করলে গাঁড় ভেঙে দেব” (একটু বড়দের জন্য), “বোকাচোদাকে বাপের বিয়ে দেখিয়ে দেব” (টিমের ছোটদের জন্য), “খানকির ছেলে কোন কম্মের নয়” (সম বয়েসিদের জন্য) ইত্যাদি। টিমে ডিসিপ্লিন বলে বস্তু ছিল হরির আমলে। লেজেন্ডারি ক্যাপ্টেনের ভিসনারী আইডিয়া – হরি বুঝতে পারল যে টিমে ক্রমশঃ ক্ষোভ জমা হচ্ছে এই মর্মে যে সব টিমের টুর্ণামেন্ট চালিয়ে লাভ হয়, আর আমাদের কেন হয় না! সেই ক্ষোভ মেটাতে, হরি একবার টুর্ণামেন্টে ফিনান্স ম্যানেজ করার জন্য ডাকল বামুনদের ঝন্টুকে – যে ঝনটু তখন ক্লাস নাইন, আর সেই বয়েসেই সে নাকি হিসাবে নিকাশে খুব দক্ষ! টুর্ণামেন্ট হয়ে গেল – লেজান্ডারি ক্যাপ্টেনের লেজান্ডারি ট্রেজারার বিশাল হিসাব কষে দেখালো, আমাদের সাকুল্যে লাভা হয়েছে পঁয়ত্রিশ পয়সা! হিসাব প্রকাশের পরের দিন নিমো স্টেশনে স্কুল যাবার সময়, আমি ঝন্টুকে বললাম, “কি বালের হিসাব করলি যে পঁয়ত্রিশ পয়সা লাভ থাকে? কত খেলি তুই হরির কাছ থেকে?” সেই বলার পর থেকে ঝনটু আমার সাথে পরের পাঁচ বছর কথা বলে নি। ‘বাল’ কিস্তি হিসাবে এমন কিছু কড়া নয় যে পাঁচ বছর তার এফেক্ট থাকবে, তা ঝণটু যতই বামুনের ছেলে হোক! মূল কথা বোঝা গেল পাঁচ বছর পর, ঝণটুর প্রথম বলা বাক্যেঃ “তুই সেদিন পম্পা-র সামনে আমাকে গালাগাল করে পয়সা মেরেছি বলেছিলি কেন?” একটু বুঝতে সময় লাগল, সেদিন মানে কোন দিন! নিমো স্টেশনে সেদিন পাল্লা-ক্যাম্পের পম্পা শাড়ি পরে পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। পম্পার ততদিনে দেখা শোনা শুরু হয়ে গ্যাছে বিয়ের জন্য – হয়ত সে শুনলে খুশিই হত তার জন্য কোন ছেলে পাঁচ বছর তার পাশের বাড়ির পোলার সাথে কথা বলে নি। তবে সে গল্প প্রেমের – প্রেমের সাথে ক্রিকেটের সম্পর্ক থাকলেও ঝন্টুর সাথে ক্রিকেটের কোন সম্পর্ক ছিল না!

বল চুরি থেকে হরি যে ক্রমশঃ আরো বড় চুরির দিকে হাত বাড়াবে তা আমরা বুঝতে পারছিলাম। বয়স হবার সাথে সাথে হরির কনট্রোল কমে যাচ্ছিল আমাদের উপর। আমরা আস্তে আস্তে সিনিয়ার ক্রিকেট টিমে ঢুকে পড়লাম – হরির হাত খরচের চাহিদা বেড়ে গেলেও উপার্জন কমে গিয়েছিল নিদারুণ। তেমনি একদিন রাতে হরি ধরা পড়ে গেল বামুনদের উত্তমের মুদিখানা দোকানে চুরি করতে গিয়ে। হরি ঢুকেছিল টালি সরিয়ে, কিন্তু জানতো না যে উত্তমের ভাই অশোক সেই দিন রাতে দোকানে শুয়েছিল। অশোকের দোকানে শোয়ার পিছনে নাকি পাহারা ছাড়াও একটা জৈবিক ব্যাপার ছিল। দোকানের পাশেই জেলেদের বাড়ি থেকে কোন এক বউকে নাকি রাতের বেলা দোকানে ঢুকতে দেখেছিল অনেকে। অশোকের অবৈধ সম্পর্কের জেরে কারো কিছুই হল না, সেই বউ টার স্বামিও কিছু বলত না জেনে শুনে, কারন দোকান থেকে ফ্রিতে আসত মুদিখানা – এই সব কম্পেলেক্সিটিতে হরির পিছন মারা গেল ধরা পড়ে। তাকে শিবতলায় নিয়ে এসে মারা হল খুব – সেই সব দূর্বল হরি দ্বারা অত্যাচারিত হয়েছিল বহুদিন তারা নিজেদের হাতের সুখ করে নিল। হরি গায়েব তার পর অনেকদিন।

এর প্রায় দশ বছর পরে, একদিন দেখি হরি আমাদের গ্রামে, আমি তখন বাইরে থাকি – আমাকে বলল, “ভাই, কেমন আছ? বাইরে একা একা আছ, তা অসুবিধা হয় না”? যে হরি আগে গাঁড় ভেঙে দেবার হুমকি দিত, সেই হরি এখন আমার আসুবিধার খোঁজ নিচ্ছে! আমি হালকা চাপে পড়ে গেলাম – বুঝতে পারলাম না যে হরি রুক্ষ ভিলেন থেকে মোলায়েম ভিলেনে পরিণত হয়েছে কিনা। কিন্তু গ্রামের লোক আমাকে বলল, হরি এখন খুব ভালো ছেলে হয়ে গ্যাছে। বিয়ে থা করে ঠাকুর ভক্ত হয়েছে। একটা মেয়ে আছে যার নামে সে একটা লেদ-ওয়েল্ডিং এর দোকান দিয়েছে নিমো গ্রামের জি টি রোডের বটতলায়। গ্রাম থেকে পালিয়ে হরি হাওড়াতে ওয়েল্ডিং এর কাজ শিখেছিল অনেক দিন। গ্রামে আমার নতুন বাড়ি করার সময় হরি এসে বলল, “ভাই, আমাকে তোমার গ্রীল এর এবং আর যা লোহার কাজ আছে দাও না, তা হলে খুব সুবিধা হয়”। আমার বউ গ্রীল এর ডিজাইন এঁকে দিল, খুবই জটিল – আমাদের দিকে তেমন কাজ কেউ করে নি তখনো। বললাম, “কি রে হরি, পারবি তো”? বিশ্বাস করে কাজ দিয়েছিলাম আমার ছেলেবেলার ক্যাপ্টেনকে। সে মর্যাদা রেখেছিল খুব সুন্দর কাজ করে।

এখনো হরি রাতে কালি পূজো করে মদ খেয়ে বাড়ি ফেরে রোজ রাতে – রেল লাইন পেরিয়ে, সাইকেলে করে। গ্রামের সবাই বলে এই ভাবেই একদিন নাকি হরি একদিন মারা যাবে মাতাল হয়ে রেলে কাটা পড়ে নয়ত রেলের ধারে ক্যানালের জলে ঢুবে। জানি না কি হবে আদপেই - তবে হরি বেঁচে থাকবে আমাদের প্রথম ক্রিকেট ক্যাপ্তেন হিসাবে, অন্তত আমার কাছে।

[ক্রমশঃ]

---------------------------------------------------
ক্রিকেট – ৫ (অমিত বিক্রম)
---------------------------------------------------

“দাদু, আজ একটা বিশাল গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আছে – আজ কাকা-কে ছাড়তেই হবে”
ঘোষেদের অমিত প্রস্তাব দিল বাবাকে। এমন প্রস্তাব নিয়ে অবশ্য হামেশাই, মানে সপ্তাহে নিদেন পক্ষে বার দুয়েক আসত আমাদের বাড়িতে সে। বাবা অমিতকে কি বলে বারণ করবে ঠিক বুঝতে পারত না। যাই বলুক, তার কাউন্টারে অমিতের জবাব প্রস্তুত, সে ছিল দক্ষ সেলস ম্যানদের বাবার বাবা। আর এদিকে আমার বাবা তখন পরত দোটানায়। বাবা হালকা নিষেধ ছাড়ল বাতাসে –

- ক্লাস এইটের ছেলেকে নিয়ে তোরা নিমোর বড়দের ক্রিকেট টিম করছিস, তোদের লজ্জা করে না
- দাদু, তুমি কি বলছ এটা – ভালো খেলার সাথে আবার বয়স কি?
- তা ‘ও’ কি করবে তোদের টিমে?
- কাকা ছাড়া নিমোর টিমে কিপিং করবে কে! আমাদের খেলা তো তুমি কোনদিন দেখতে গেলে না দাদু, গেলে জানতে যে কাকাকে ডাকতে কেন আমি আসি। কাকার কিপিং অন্য লেভেলের।
এর পর বাবা একটু নরম হল – যতই হোক নিজের ছেলের প্রশংসা শুনতে কে না ভালোবাসে। তবুও, বিনা জেরায় তো আর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
- তা যতই ভালো কিপার হোক, অন্য কাউকে দিয়ে তো চালিয়ে নিতে পারিস। ওই তো ছয় না হলে বারো-চোদ্দ ওভারের খেলা তো তোদের
- দাদু, তোমাকে আর কতবার বলব – কাকা না খেললে আমাদের চান্স মাঠে নামার আগেই অনেক কমে যাবে। আর কাকা না গেলে কিপিং করবে কে? কলঘরের বোতন গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়বে কেউ কিছু বলার আগেই। বোতনকে দিয়ে কিপিং আর ছাগল দিয়ে যব মারা একই ব্যাপার।

বাবার এবার সংকট, একদিকে ছেলে বখে যাচ্ছে ক্রমশ – মানে পড়াশুনার থেকে ক্রিকেটেই বেশী সময় যাচ্ছে। আর অন্যদিকে নিমোর মান সম্মান নিয়ে টানাটানি – যতই হোক বাবা একসময় নিমো ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন ছিল বলে কথা। দাদু মারা যাবার পর শ্রাদ্ধের কিছু দিন পরেই পাঁজরা মাঠে ফুটবল ফাইন্যাল ছিল – বাবা ন্যাড়া মাথায় বিশাল নাকি ভালো খেলেছিল, এমন ভালো যে দর্শক চিৎকার করছিল নিমো টিমের বাকিদের বাবাকে পাশ বাড়ানোর জন্য। “জগগু-কে বল বাড়া – জগগুকে বল বাড়া”, সেই চিৎকারে পাঁজরা মাঠ ভরে উঠেছিল। আমি তখন খুব ছোট, অমিত সেই গল্প মাঝে মাঝে বাপকে বলে ব্ল্যাকমেল করত,

- দাদু, তুমি ওই দিন ন্যড়া মাথা নিয়ে না নামলে নিমো জিততে পারত?

বাবা সফট হয়ে যেত – এবং আমার খেলতে যাবার পারমিশন। ঘোষ পরিবার এমন নিমো গ্রামে লতায় পাতায় বিস্তার করেছিল যে, অমিত আমার থেকে বয়েসে প্রায় বছর দশেকের বড় হলেও সম্পর্কে আমার ভাইপো হত। অমিত কিন্তু চিরকাল আমাকে ‘কাকা’ ই বলে এসেছে – সামাজিকতার লজ্জা-টজ্জার ব্যাপার আমাদের দিকে ছিল না।

টিভিতে দেখা ছাড়া ক্রিকেট খেলার সাথে সাদা পোষাকের যে একটা সম্পর্ক আছে সেটা প্রথম ওই অমিতকে দেখেই শেখা আমাদের। অমিতের বাবা, মানে আমাদের সুকু-দা কাজ করত কলকাতায় – সেখানেই থাকত বোনের বাড়িতে সপ্তাহের দিনগুলিতে, শনি-রবিবার বাড়ি। তা বাপ কাজ করা হেতু অমিতের ছিল চেনা শুনা কলকাতায়। সেই সময় কথিত ছিল অমিত নাকি ‘এরিয়ান’-স্‌ ক্রিকেট ক্লাবে ট্রায়াল দিয়ে চান্স পেয়েছে ডিউস বল ক্রিকেটে। সত্যি -মিথ্যে বলতে পারব না এই এত দিন পরেও, তবে আমাদের কাছে প্রমাণ বলতে একটা ঢাউস কিটস ব্যাগ ছিল অমিতের, আর গোটা দুয়েক ডিউস বলের ব্যাট যাদের উপর বলের লাল রঙের ছাপ খেলার, যাহা সেই ব্যাটে নতুন লাল বল খেলা হয়েছে তা প্রমাণ করে। আর ছিল সাদা পোষাক এবং শীতের সময়ে খেলার সাদা সোয়েটার নীল বর্ডার দেওয়া।

একদিন ম্যাচে কিপিং করতে নামছি, অমিত একটা সাদা রঙের প্লাষ্টিকের ওই হাতের তালু মোড়ালে যেমন হয়, তেমন একটা জিনিস আমার হাতে দিয়ে বলল –

- কাকা এটা লাগিয়ে নাও

আমি হাতে জিনিসটা নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে কিছুই বুঝতে পারলাম না কোথায় লাগাতে হবে

- ওই, কোথায় লাগাবো?
- আরে কাকা, এটাকে অ্যাবডোমেন গার্ড বলে।
পাশে বিটু বসে ছিল – সে জানতে চাইল,
- কি বলে?
- আরে অ্যাবডমেন গার্ড রে বাবা।
- সেটা আবার কি?
- মানে গোদা বাংলায় ‘বীচির গার্ড’
- তা বাঁড়া সেটা বললেই হত এতক্ষণ। সুকান তোর বীচি সামলাবার গার্ড এনেছে ভাইপো কলকাতা থেকে, লাগিয়ে নে।

বিটু বিড়ি খাওয়া ছেড়ে আমার পাশে চলে এল কি করে এই নতুন মাল ফিট হবে দেখতে। আরো দু চার জন্য পাবলিক জড়ো হয়ে গেল চারপাশে ‘বীচ-গার্ড’ দেখতে – উৎসাহী জনতা সার্কেলের মাঝে আমি। এদিকে কলা কিছুই তো বুঝতে পারছি না, কেমন করে সেট করব। বীচির উপরে সেট করতে গেলেই তো গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। সেই গার্ডের আবার দুই প্রান্ত বিষম ভাবে তৈরী, একদিন গোলাকার হলে অন্যদিকটা একটু ছুঁচালো। কোনদিকটা ঠিক নীচে থাকবে বুঝতে পারছি না – পারমুটেশন কম্বিনেশন যাই করি না কেন, মাল গড়িয়ে যায়। আর গোলাকা্র দিকটা নীচে দিয়ে দেখলাম পা দুটো শালা কাছে আনতেই পারছি না – মনে হচ্ছে পায়ের ফাঁকে যেন পুলিশ কিছু গুঁজে দিয়েছে। অমিতকে গড়িয়ে পড়ার ব্যাপারটা বলাতে সে আমার কাছে এগিয়ে এল ব্যাপারটা সরজমিনে তদন্ত করতে।

- কাকা, এটা জাঙিয়ার বাইরে নয়, জাঙিয়ার ভিতরে ঢোকাতে হবে।
- মানে?

আমার সন্দেহ ক্রমশ প্রকট হচ্ছে যে সেই অ্যাবডমেন গার্ড বহুল ব্যবহৃত, এবং বহু বীচির স্পর্শ পাওয়া। এই ফাঁকে একটা ফিলসফিক্যাল কথা বলে রাখি – অনেকের মনে ধারণা আছে যে গ্রামের ছেলে পুলের মধ্যে মনে হয় হাইজিনিক ফিলিংটা কম ছিল। এমনটা কিন্তু নয় মোটেই, আমরা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিলাম। পরবর্তী লাইফে কিছু শহুরে ছেলেদের দেখে বুঝতে পেরেছি যে তাদের থেকে আমরা অনেক বেশী পরিষ্কার থাকতে ভালোবাসতাম। আর তা ছাড়া জানি না এই বিষয়টা নিয়ে রোমিলা থাপার বা রামাচন্দ্র গুহ কিছু লিখেছেন কিনা – ব্যাপার হল ইউরোপিয়ান পাবলিকদের সাথে আমাদের মূল পার্থক্য হল এই যে, ওই মাল গুলোর হাইজিন বডিতে বলতে গেলে কেবল হাতে। মানে হাতের আঙুল ঠেকিয়ে কাউকে কিছু দেওয়া যাবে না ইত্যাদি, আর ওদিকে হেগে জল দিয়ে ধোব না! পুরো কন্ট্রাডিকটরি ব্যাপার স্যাপার। আর তা ছাড়া, স্নান না করার ফলে গায়ের গন্ধ এই সব আর নাই বা বললাম।

তাই সেই বহু বীচির স্পর্শ পাওয়া অ্যাবডোমেন গার্ড আমাকে নিজের বীচিতে ঠ্যাকাতে হবে জেনে আমি খুবই বিক্ষুব্ধ হলাম। আমাকে অমিত ভাইপো আস্বস্ত করল যে, এমন ভাবেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাররাও গার্ড ব্যবহার করে পরস্পরের গহীনের ছোঁয়া পাওয়া। যাই হোক, ম্যাচ শুরু হতে চলেছে বলে আমি লাগিয়ে নিতে গেলাম, মাল তবুও লাগে না। আবার অমিত এল ডিপ স্কোয়ার লেগ থেকে দেখতে

- কাকা, এটা অ্যাবডোমেন গার্ডের দোষ নয়। তোমার জাঙিয়াটাই প্রচুর ঢোলা, গার্ড তো গড়িয়ে পড়বেই!
আমি গেছি প্রবল রেগে
- নিমোর কটা ক্লাশ এইটের ছেলে জাঙ্গিয়া পরে আর? বাবাকে অনেক বলে কয়ে জাঙ্গিয়া কিনেছি,
- সে ভালো করেছো, কিন্তু এত বড় কেন?
- আরে এত বড় কোথায়! মাত্র এক সাইজ বড়।

এই এক সাইজ ব্যাপারটা আমাদের জিনে ঢুকে গিয়েছিল – সব কিছুই একসাইজ বড়, জামা, প্যান্ট, জুতো – সব। অনেকে দাবী করত এটা নাকি করা হত মাল বেশী দিন পড়া যাবে বলে, ছোট বেলায় পাবলিক নাকি তাড়াতাড়ি বেড়ে ওঠে। কিন্তু আমি ঠিক সিওর ছিলাম না ব্যাখ্যাটা নিয়ে। কারণ তা না হলে ক্লাস ফাইভে ভর্তি করতে গিয়ে এক ক্লাস উঁচুতে ভর্তি করা যাবে কিনা তা জিজ্ঞাসা করে কেন?
যাই হোক সেই দিন আর গার্ড ফিট করা গেল না – পরের ম্যাচের টাইট জাঙ্গিয়ার জন্য অপেক্ষা করতে অ্যাবডোমেন গার্ড গিয়ে ঢুকে গেল অমিতের কিট ব্যাগে।

এই অমিত আর কলঘরের বোতনের জন্যই নিমো টিমের খেলার মাঠে প্রবেশ একটু সম্মান জনক হত – না হলে বাকি যা অ্যাপিয়ারেন্স ছিল সে আর কহাতব্য নয়। আলম পড়ে এসেছে বড়-ভাইয়ের তৈরি ঢোলা প্যান্ট।

‘বড়-ভাই’ আমাদের দিকের খ্যাতনামা কারিগর। বড়-ভাই ই একমাত্র আমার দেখা টেলর যে দূর্গা-পূজার সময়েও ওভারটাইম করত না, সন্ধ্যে সাতটাতেই কারবার খতম। বড়-ভাইয়ের হাতের কাজের খ্যাতির জন্য অনেক উঠতি ছেলে পুলে নতুন কিছু স্টাইলে বানাবার জন্য আসত তার দোকানে। পরে যখন আলম বড়-ভাইয়ের কাছে কাজ করতে ঢুকল, তখন যানতে পারলাম যে, দিনে পাঁচ -টা প্যান্ট কাটা হচ্ছে বড় ভাইয়ের লাইফের মন্ত্র। ফলে অনেকে লাইন দিয়েও প্যান্ট কাটাতে পারত না। একবার এক উঠতি ছেলে কিভাবে যেন বড়-ভাইকে পটিয়ে ফেলে নতুন স্টাইলে প্যান্ট কেটে দেবার জন্য। এবার ফার্ষ্ট ফরোয়ার্ড প্যান্ট ডেলিভারী নেবার দিন। সেই ছেলে খালি বলে বড়-ভাইকে, “এই খানে প্লেট ঠিক আসে নি, এই খানে আরো দুটো ফলস্‌ বোতাম লাগানোর কথা ছিল”। বড়-ভাই শান্ত মনে সব কিছু শুনল, দিয়ে জানতে চাইল, ‘তুই প্যান্টের ছিটটা কোথা থেকে কিনেছিলি”। ছেলে বলে, “ওই তো সুধীর বস্ত্রালয় থেকে ১৭০ টাকা দিয়ে”। বড়-ভাই আলতো করে টেবিলের উপর থেকে কাঁচিটা তুলে নিয়ে প্যান্টটা কুচি কুচি করে কেটে দিল। সেই ছেলের মুখ হাঁ হয়ে গ্যাছে। বড়-ভাই আরো শান্ত ভাবে ড্রয়ার থেকে ১৭০ টাকা বের করে ছেলেটিকে কুচো প্যাণ্টের সাথে দিয়ে বলল, “যা, অন্য কোথা থেকে মন মত কাটিয়ে নিবি”। বড়-ভাইয়ের গল্প আবার পরে আসবে, কারণ আলমকে কাজের সময় পেতে হলে বড়-ভাইকে হাতে রাখতে হত।

একবার তো খেলার সময় জেলেদের তবলা সেই সাদা রঙের রূপা কোম্পানির থার্মাল প্যান্ট-গেঞ্জি পরে নেমে গিয়েছিল। জুতো-টুতো এই সবের কোন বালাই ছিল না, আমরা সবাই খালি পায়ে – কেবল আমিত আর বোতনের পায়ে ‘কাটা বাটা’। কাটা-বাটার উত্থানও আমাদের দিকে চমকপ্রদ এবং অমিতের হাত ধরেই। অমিতের বাবা সুকুদা আমাদের তামাম নিমো গ্রামের ‘মানে-বই’, টেষ্ট-পেপার ইত্যাদি ঢাউস বই গুলি কলকাতা থেকে এনে দিত – ৩৫% থেকে ৪০% ছাড়ে। নিজে কিছু রাখতে কিনা বলতে পারব না – আর রাখলেও আমাদের কোন বক্তব্য ছিল না। মেমারীর কাগজ ঘরের লোক গুল বেশ হারামী টাইপের ছিল, কিছুতেই ১০% এর বেশি দিত না। তা এ হেন বাপের ছেলে অমিত শুরু করল ‘কাটা-বাটা’-র ব্যবসা আমাদের ক্রিকেট ময়দানে। কাটা-বাটা মানে হচ্ছে ওই বাটার ‘পাওয়ার’ বলে যে মডেল টা আসত না, সেটার রিজেক্ট গুলো। আধুনিক অর্থে মনে হয় ফ্যাক্টরী আউটলেট কনসেপ্ট। নাকি অমিত ধর্মতলা থেকে পাতি নকল মাল কিনে এনে ছাড়ত মার্কেটে, তাই বা কে জানে। আসতে আসতে ক্রিকেট টিমের প্লেয়ারদের রেগুলার পোষাকের মধ্যে ‘কাটা-বাটা’ ঢুকে পড়ল।

সেই মনে হয় প্রথম বার আমি অমিতের সাইকেলে গ্রাম বৈঁচী মাঠে খেলতে গেছি। মাঠে গিয়ে যে যার ব্যস্ত হয়ে পড়ল – সিনিয়ারদের কেউ কেউ বিড়ি ধরিয়ে আলু জমির দিকে চলে গেল গজ গজ করতে করতে, “বাঁড়া মাঠে কোন টিম আসে নি, অমিত বাড়ি থেকে সকাল সকাল গিয়ে ডেকে এনে নিমো টিম হাজির করল, পায়খানাটা পর্যন্ত ভালো করে করতে দিল না!” কেউ কেউ খৈনী বানাতে বসে গেল – নিমো ক্রিকেট টিমে এই খৈনী ব্যাপারটা আমাদের ফাষ্ট বোলার মানু (অর্থাৎ মানস) ধরিয়েছিল। তার আগে টিম মেম্বারদের নেশা বলতে ছিল তাড়ি, ধেনো, বিড়ি এবং মাঝে মাঝে গাঁজা। খৈনী ছিল আমাদের অনেকেরই অপছন্দের, কিন্তু মানুর মুখ চেয়ে সেই খৈনীর ঝাপড় অনেক সহ্য করতে হয়েছিল।

তা যা বলছিলাম, আমরা নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেও, অমিত তার কিটস ব্যাগ খুলে সাদা পোষাক পরে নিয়ে ব্যাট হাতে স্যাডো করতে শুরু করে দিল। আলম আমাদের হয়ে টসে জিতে এল – সিনিয়ারদের কাছে জানতে চাওয়া হল কি নেওয়া হবে – ব্যাটিং নাকি বোলিং? অনেকে ভাবতে পারেন যে, কেন ভাই আগেই তো আলোচনা করে রাখতে পারতে যে টসে জিতলে কি নেওয়া হবে। কিন্তু ব্যাপার অত সহজ নয়। ব্যাটিং না বোলিং কি নেওয়া হবে সেটা নির্ভর করে সেই সময় মাঠে কে রয়েছে খেলার মত। তা সেই বৈঁচী মাঠের টস জেতার পর চিৎকার শুরু হল কি হবে কি হবে বলে – আলু জমির মাঝে থেকে মুখে বিড়ি পোঁদে হাগা নিয়ে তরুণদা চিৎকার দিল, “ব্যাটিং নে, ব্যাটিং – বাকিরা চলে আসবে কয়েক ওভারের মধ্যে”।

খেলা শুরু হল – আমাদের ওপেনার বিটুর পারফরমেন্স চিরকাল সুইং বোলিং-এর সামনে ভারতীয় ব্যাটসম্যান-দের মত। এই গেল এই গেল রব – তা সেই ম্যাচেও নিয়ম মেনে বিটু আউট হয়ে গেল। অমিত নামবে চার নম্বরে, আমাদের তিন নম্বরে নামার লোক তখনো ফাইনাল পেচ্ছাপ বসে নিচ্ছে। অমিত ভাইপো সাদা পোষাক পরে ওয়ার্ম আপ করেই ঘেমে গেল সেই শীতের সময়েও। সময় এগিয়ে গেল – অমিতের মাঠে নামার সময় চলে এল। অমিত মাঠে নামছে – পুরো দস্তুর খেলোয়ার সাদা পোশাকে, পায়ে কাটা বাটা, হাতে লাল ছাপ যুক্ত ব্যাট, মাথায় সেই সাদা ক্রিকেট টুপি। বিপক্ষ দল ভাবলো কি প্লেয়ার নামছে রে বাবা! অমিত যে নিমো গ্রামের ছেলে সেটাই ওরা বুঝতে পারছে না – আমাদের গ্রামের ফিচেল সাপোর্টার গুলো রটিয়ে দিয়েছে যে অমিত কলকাতা থেকে হায়ার খেলতে এসেছে নিমোর হয়ে। বিপক্ষ টিমের ক্যাপ্টেন তার প্রায় সব প্লেয়ারকে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে দিল – বলাই বাহুল্য ইনার সার্কেল বলে কোন বস্তু আমাদের খেলায় ছিল না, ফলতঃ প্লেয়ার প্লেসমেন্ট নিয়ে বাধা নিষেধেরো কোন ব্যাপার ছিল না –

প্রায় সব ফিল্ডার মাঠের সীমান্তে – বোলার বল করল, অমিত প্রথম বলেই বোল্ড। বোল্ড হবার পর অমিত যে মাঠ ছাড়বে তেমন নয়। সে খুব গম্ভীর মুখে পীচের মাঝ খানে গিয়ে খানিক ক্ষণ ব্যাট দিয়ে পীচটা ঠুকল। বোলার, আম্পায়ার – কি ভাবে রিয়্যাক্ট করবে ভেবে পাচ্ছে না। ধীর পায়ে অমিত বেরিয়ে আসছে – এর পরে নামবে সন্তু। অমিত বলল – “বোলিং-এ কিচ্ছু নেই, পীচের দোষ”।
অমিত আমাদের ক্রিকেটিয় এটিকেট শিখিয়েছিল, আমাদের বীচির গার্ড চিনিয়েছিল, এনেছিল আমাদের মাঠে কাটা-বাটা। এমনকি আমার উইকেটকিপার হয়ে ওঠার পিছনেও অমিতের অবদান ছিল অনেক – সেই প্রথম বাচ্চাদের খেলায় স্কাউটিং করে আমায় সিনিয়ার টিমে কিপিং এর দায়িত্ব দিয়েছিল। আমি অনেক অনেক দিন ওর সাইকেলে ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে গেছি, আমাকে বাড়ি বয়ে ডেকে নিয়ে গ্যাছে দিনের পর দিন, আমার বাবাকে পটিয়ে। অমিত নিজে কবে আমাদের ম্যাচ জিতিয়েছিল আমার আর মনে পড়ে না – তবে মনে পড়ে কোন একটা ম্যাচে অমিত বেশ কয়েক ওভারটা টিকে ছিল এবং হাঁটু গেড়ে সুইপ মেরেছিল বেশ কয়েকটা।

অমিতের নিমো ক্রিকেট জীবেনের ইতি হয় সেই যে বার একটা চীট ফান্ড ফেল করল (পিয়ারলেস কি?)। জীবিকা বলতে অমিত তখন সেই চীট ফান্ডে অনেক গ্রামের লোকের ইনভেষ্ট পেয়েছিল। ওকে সবাই ভালো বাসত বলে বিশ্বাস করে টাকাও দিয়েছিল। চীট ফান্ড উলটে গেলে, অমিত বেপাত্তা। তার বাড়িতে দিন রাত বিক্ষোভ। সবাই মনে করল অমিত ইচ্ছে করে ঠকিয়েছে। গ্রামের পঞ্চায়েত বসে ঠিক করল ওদের যা জমি আছে তা যাদের টাকা মার গ্যাছে তাদের মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে। শেষবার অমিত যবে আমাদের বাড়ি আসে, সেবার ক্রিকেট খেলতে আমাকে ডাকতে নয়। শুনতে পেলাম বাবাকে বলছে, “দাদু, বিশ্বাস কর – আমি ইচ্ছে করে কাউকে ঠকাই নি। আমি যাই হোক, ঠকবাজ নই”।

প্রায় দু দশক হয়ে গেল অমিত ভাইপোর সাথে আমার দেখা নেই – সে কোথায় আছে গ্রামের কেউ না না। চীট ফাণ্ডের ঘটনা নয় – এই এখনো আমাদের গল্পে মাঝে মাঝে উঠে আসে অমিতের ক্রিকেটের ড্রেস। আর আমার রয়ে গ্যাছে তার কাছে কৃতজ্ঞতা আমাকে উইকেটকীপার বানানোর জন্য।

[ক্রমশঃ]



1880 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 18 -- 37
Avatar: Tim

Re: ক্রিকেট

দারুণ হচ্ছে এটা।
Avatar: নীলাদ্রি চক্রবর্তী

Re: ক্রিকেট

অসাধারণ লেখা । কলকাতার আশেপাশে টেনিস ক্রিকেটে খেপ খেলে বেড়ানো বহু প্লেয়ার রয়েছে। অনেক ফাস্ট ডিভিশন বা রঞ্জি খেলা প্লেয়ার উঠে এসেছে টেনিস ক্রিকেট খেলেই। আপনি আপনার ক্রিকেট নিয়ে আরও কিছু লিখুন। অন্যান্য লেখা তার পরে বা একই সাথে আসুক। আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ, এইরকম সুন্দর একটা লেখা উপহার দেয়ার জন্য।
Avatar: cb

Re: ক্রিকেট

থার্ডম্যানে ফিল্ডিং করা র মেন চাপ হল যে বল মিস করা যাবে না। করলেই ওই কাঁচা ইয়ের মধ্য থেকে বল কুড়িয়ে আনতে হবে। আমি নেই, আপনেরা করুন গিয়া!!!
Avatar: সুকি

Re: ক্রিকেট

ধন্যবাদ সবাইকে।

দেবজ্যোতি বাবু, আপনি কি মেমারীতে চাকুরী করেন নাকি? তা আমি ধরুন প্রায় কুড়ি বছর আগের কথা বলছি।
Avatar: সুকি

Re: ক্রিকেট

ক্রিকেটের পরের পর্বটা দিলাম।
Avatar: b

Re: ক্রিকেট

এক্ষেলেন্তো।
Avatar: ফরিদা

Re: ক্রিকেট

আমরা সবাই যে যার মাঠে পৌঁছেছি। আলো আর নেই, কিছু দেখা যাচ্ছে না। বল ছুটে আসছে।

বিদ্ধ হব বলে দাঁড়িয়ে রয়েছি। আউট না হলে ব্যাটিং ফেলে যাই কীভাবে!

দারুণ লেখা।
Avatar: dd

Re: ক্রিকেট

ব্রাভো
Avatar: Tim

Re: ক্রিকেট

সুকির লেখাগুলোর সংকলন হবে? খুব ভালো ডকুমেন্টেশন হচ্ছে, এবং যেটা উঠে আসছে তাহলো ঐ সময়ে গ্রাম মফস্বল আর শহরের প্রান্তসীমার মধ্যে একদল বাচ্চার বেড়ে ওঠার মধ্যে রকমফের কম ছিলো। অন্তত যারা খেলাধুলো করছে তাদের মধ্যে যে ছিলো সেতো দেখতেই পারছি। আমি আমাদের এলাকা (টালিগঞ্জ), এবং সোনারপুর রাজপুর এলাকা (দঃ চব্বিশ পরগনা) নিজেই দেখেছি। খেলাধুলো করা জনতা মোটামুটি এইরকমই ছিলো। ডালের কড়ায় খোলা নর্দমা থেকে উঠে আসা কালোজামের মত বল খুবই কমন ছিলো। দেওয়ালে ববি প্রিন্টের মত স্পট পড়ে যেত। মুখের ভাষাও একইরকম ছিলো।

সাঁঝের ঝোঁকে অনিচ্ছুক বোলার, ফিল্ডারেরা হয় কমে গেছে নয় অন্ধকারে ঢেকে, আর আশা নিরাশায় দোদুল্যমান একজন ব্যাটসম্যান। এর চেয়ে বড়ো কবিতা আর কি আছে?
Avatar: সুকি

Re: ক্রিকেট

ছোট বি, ফরিদা, ডিডি দা, টিম - কে ধন্যবাদ।

টিম একটা খুব ইন্টারেষ্টিং পয়েন্ট তুমে ধরেছে - আমার মাঝে মাঝে খুব জানতে ইচ্ছা করে এবং বলতে গেলে একটা তুলনামূলক আলোচনা পড়তে ইচ্ছে করে, এই যে মফঃস্বলে বেড়ে ওঠা, গ্রামে ও শহর এই নানা জায়গা থেকে বেড়ে ওঠা এদের মধ্যে মিল বা অমিল কোথায়! এই নিয়ে লেখা নেই যে তা নয়, কিন্তু বেশির ভাগই গুচ্ছ আঁতেল লেখা - মফঃস্বল বা শহর দুই পক্ষেরই কেমন যেন একটা দেখানো ভাব, যেন প্রতিযোগিতা হচ্ছে! একটা নির্মোহ লেখা পেতে ইচ্ছা করে।
Avatar: Tim

Re: ক্রিকেট

নতুন পর্ব পড়লাম। যথারীতি জমজমাট লেখা হয়েছে। যে তুলনামূলক আলোচনার কথা উঠলো, সেটা এই অমিতের গল্পে জলজ্যান্ত ফুটে উঠেছে। একদিন সে মহাকাব্য লেখা হবে হয়ত। সুকি সত্যিই অবিশ্বাস্য কীপার। কিচ্ছু গলছেনা। ফার্স্ট স্লিপ আর পয়েন্ট থেকে হাত মিলিয়ে নিলুম। ঃ-)
Avatar: dd

Re: ক্রিকেট

এটা দারুন হচ্ছে, যাকে বলে দুর্ধর্ষ।
Avatar: দ

Re: ক্রিকেট

পড়ে ফেললাম। ডিডিদাদার সাথে গলা মিলিয়ে দারুণ বলে গেলাম।
Avatar: সুকি

Re: ক্রিকেট

দুঃখিত মাঝে আসা হয় নি।

টিম, ডিডিদা, দ-দি এবং আরো যদি কেউ পড়ে থাকেন সবাইকে ধন্যবাদ।

বহুকাল ক্রিকেট খেলা হয় নি।
Avatar: avi

Re: ক্রিকেট

গুরুর মিটে তো দেখি আড্ডা, গান, বই, খাওয়াদাওয়া হয়ই। ক্রিকেটের ভয়েসটাও আসুক একবার। এমনিতেও ক্রিকেট ভারতের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের অন্যতম। একটা ক্রিকেট ম্যাচ করা গেলে দারুণ হয়।
Avatar: Tim

Re: ক্রিকেট

প্রবল সমর্থন। গুরু আয়োজিত ক্রিকেট ও ফুটবল ম্যাচ আমার বহুদিনের শখ। ছেলেবেলার শখ।
Avatar: aranya

Re: ক্রিকেট

আম্মো আছি।
যদিও এই বুড়ো বয়সে কোচের রোল, বা রেফারী/আম্পায়ার-এর ভূমিকাই মানাবে ভাল
Avatar: aka

Re: ক্রিকেট

কি কান্ড এইটা এতদিন পড়ি নি। এতো হুবহু আমার গল্প মনে হচ্ছে
Avatar: pi

Re: ক্রিকেট

একেবারেই আমার গল্প না, রিলেট করার মত আছে বলতে দাদাদের নিয়ে, তবু দারুণ লাগছে পড়তে!
Avatar: avi

Re: ক্রিকেট

মিতালী-ঝুলন-হরমন যা দেখাচ্ছেন, ভবিষ্যতের পাইদিরা নিজের গল্প হিসেবেই রিলেট করবেন নির্ঘাত।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2]   এই পাতায় আছে 18 -- 37


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন