Roshni Ghosh RSS feed

Roshni Ghoshএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • কাশ্মীরের ইতিহাস : পালাবদলের ৭৫ বছর
    কাশ্মীরের ইতিহাস : পালাবদলের ৭৫ বছর - সৌভিক ঘোষালভারতভুক্তির আগে কাশ্মীর১ব্রিটিশরা যখন ভারত ছেড়ে চলে যাবে এই ব্যাপারটা নিশ্চিত হয়ে গেল, তখন দুটো প্রধান সমস্যা এসে দাঁড়ালো আমাদের স্বাধীনতার সামনে। একটি অবশ্যই দেশ ভাগ সংক্রান্ত। বহু আলাপ-আলোচনা, ...
  • গাম্বিয়া - মিয়ানমারঃ শুরু হল যুগান্তকারী মামলার শুনানি
    নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস—আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে করা গাম্বিয়ার মামলার শুনানি শুরু হয়েছে আজকে। শান্তি প্রাসাদে শান্তি আসবে কিনা তার আইনই লড়াই শুরু আজকে থেকে। নেদারল্যান্ডের হেগ শহরের পিস ...
  • রাতপরী (গল্প)
    ‘কপাল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যায়। পালানোর কি আর উপায় আছে!’- এই সপ্তাহে শরীর ‘খারাপ’ থাকার কথা। কিন্তু, কিছু টাকার খুবই দরকার। সকালে পেট-না-হওয়ার ওষুধ গিলে, সন্ধেয় লিপস্টিক পাউডার ডলে প্রস্তুত থাকলে কী হবে, খদ্দের এলে তো! রাত প্রায় একটা। এই গলির কার্যত কোনো ...
  • রাতপরী (গল্প)
    ‘কপাল মানুষের সঙ্গে সঙ্গে যায়। পালানোর কি আর উপায় আছে!’- এই সপ্তাহে শরীর ‘খারাপ’ থাকার কথা। কিন্তু, কিছু টাকার খুবই দরকার। সকালে পেট-না-হওয়ার ওষুধ গিলে, সন্ধেয় লিপস্টিক পাউডার ডলে প্রস্তুত থাকলে কী হবে, খদ্দের এলে তো! রাত প্রায় একটা। এই গলির কার্যত কোনো ...
  • বিনম্র শ্রদ্ধা অজয় রায়
    একুশে পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অজয় রায় (৮৪) আর নেই। সোমবার ( ৯ ডিসেম্বর) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অধ্যাপক অজয় দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা অসুখে ভুগছিলেন।২০১৫ ...
  • আমাদের চমৎকার বড়দা প্রসঙ্গে
    ইয়ে, স-অ-অ-অ-ব দেখছে। বড়দা সব দেখছে। বড়দা স্রেফ দেখেনি ওইখানে এক দিন রাম জন্মালেন, তার পর কারা বিদেশ থেকে এসে যেন ভেঙেটেঙে মসজিদ স্থাপন করল, কেন না বড়দা তখন ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুম ভাঙল যখন, চোখ কচলেটচলে দেখলেন মস্ত ব্যাপার এ, বড়দা বললেন, ভেঙে ফেলো মসজিদ, জমি ...
  • ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ?
    যেকোন নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে সামনে আসার পর নাগরিক হিসাবে আমাদের একটা ঈমানি দায়িত্ব থাকে। দায়িত্বটা হল অভিযুক্ত ধর্ষকের কঠোরতম শাস্তির দাবি করা। কঠোরতম শাস্তি বলতে কারোর কাছে মৃত্যুদন্ড। কেউ একটু এগিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ার ...
  • তোমার পূজার ছলে
    বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না ...
  • The Irishman
    দা আইরিশম্যান। সিনেমা প্রেমীদের জন্য মার্টিন স্করসিসের নতুন বিস্ময়। ট্যাক্সি ড্রাইভার, গুডফেলাস, ক্যাসিনো, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, দা অ্যাভিয়েটর, দ্য ডিপার্টেড, শাটার আইল্যান্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট, সাইলেন্টের পরের জায়গা দা আইরিশম্যান। বর্তমান সময়ের ...
  • তোকে আমরা কী দিইনি?
    পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন -********তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

#বাহামণিরগল্প

Roshni Ghosh


অনেক অনেক দূরে শাল বনের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটা লাল মাটির পথ ছিল আর পথের শেষে ছোট্ট একটা গ্রাম। সেই গ্রামে একটা ছোট্ট মেয়ের বাড়ি। জানি এ পর্যন্ত পড়েই আপনারা ভুরু কুঁচকে ভাবছেন, এ আর নতুন কথা কি? পথের শেষে গ্রাম থাকবেই আর সে গ্রামে যে একটা না একটা মেয়ে থাকবে সেও তো জানা কথাই। এ আর নতুন কি? আহা, ধৈর্য ধরে একটু শুনুনই না. হয়তো নতুন কিছু আছে এ গল্পের শেষে।

যাকগে যা বলছিলাম, গ্রামের সেই ছোট্ট মেয়ে একটা কুঁড়েঘরে থাকে তার মা বাপের সাথে। মেয়ের নাম বাহামনি, না আপনাদের সিরিয়ালের নয়, এই বাহামনি একটা ছোট গ্রামের মা বাপের আদরের একটা ছোট মেয়ে। মা-বাপ ভোর থাকতে উঠে রান্নাবান্না করে, নিজেরা খেয়ে মেয়ের জন্য খাবার ঢেকে রাখে। তারপর লাল মাটির পথ ধরে জঙ্গল পেরিয়ে যায় ইঁটভাটায় কাজ করতে। আর ছোট্ট বাহা ঘুম থেকে উঠে মুরগিকে খেতে দেয়, ঘর নিকোয় তারপর নিজে খেয়েদেয়ে বেরিয়ে পরে ইস্কুলের দিকে। ইস্কুলে কেন? ওমা বলিনি বুঝি? ইস্কুলে যে মিড-ডে মিল দেয়। বাড়িতে একা একা থাকলে নয়তো খাবে কি ছোট্ট মেয়েটা? মা বাপের তো ফিরতে ফিরতে সেই সন্ধ্যে পেরিয়ে রাত্তির। রাত্তিরে ওরা বাড়ি ফিরলে মা রান্না করে ভাত আর শাক। আর কিছু কেনার পয়সা জোটে না ওদের। নমাসে-ছমাসে পয়সা পেলে সাথে একটু চুনোমাছ। সেদিনগুলো ওদের উৎসবের দিন। মা যখন রান্না করে, বাহা তখন বাপের কোলের কাছটিতে বসে বসে তার সারাদিনের গল্প শোনায়, ইস্কুলে সে কি করলো, কাঠবেড়ালীটা আজ গাছ থেকে কবার ওঠানামা করেচে এই সব কত্ত কি। বাপেও গল্প শোনায় মেয়েকে ইঁটভাটাতে তারা কিরকম করে ইঁট বানায়, মালিকের খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা নকল করে দেখায়। খাওয়া-দাওয়া হলে তিন জন শুয়ে পড়ে, পরের দিন তো আবার সক্কাল সক্কাল উঠতে হবে তিনজনকেই।

ইস্কুল জায়গাটা মন্দ না, কিন্তু বেশিরভাগ দিদিমনিরাই বড় রাগি। পান থেকে চুন খসলেই বকা দেন। কিন্তু ওর মধ্যেও কয়েকজন দিদিমনি আবার বড্ডো ভালো। হাতে ধরে তারা মেয়েদেরকে অ-আ-ক-খ শেখান, অংকের মজা বোঝান। রোজ ইস্কুল যেতে যেতে বাহার আস্তে আস্তে নেশা লেগে গেলো। পড়াশুনোর নেশা, বই পড়ার নেশা। মা বাবা রাত্তিরে যখন বাড়ি ফেরে, মেয়ে তখন তার পড়াশুনার গল্পও শোনায় বাবামাকে। বাহা খেয়াল করেনা বাবা কিন্তু আগের মতন তাকে আর ইঁটভাটার গল্প শোনায় না, অন্যমনস্ক ভাবে হুঁ হাঁ করে যায় খালি। রান্নাও কমে গেছে আগের থেকে, এখন শুধু নুন আর ভাত হয় রোজ রোজ।

তা মেয়ের যেমন নতুন নেশা লাগলো, বাপ মায়ের নতুন নেশা লেগেছে তদ্দিনে, তবে পড়াশুনার নয় চোলাইয়ের। আসলে হয়েছে কি, ইঁটভাটাতে গোলমাল, বাপ মা মাইনেকড়ি পায় না ঠিকমতন। রোজই কাজে যায় শুকনোমুখে, ভাবে আজ নিশ্চয়ই ঠিকমতন মাইনে পাবে, আর রোজই হতাশমুখে ফেরত আসে। তা সেরকম একদিন ফেরার পথে এক বন্ধু মা বাবাকে নিয়ে গেলো চোলাইয়ের ঠেকে। বাপ মা এর আগেও যে চোলাই খায়নি তা নয়, কিন্তু সেসব উৎসবের দিনে আনন্দ করতে, আর এদিন খেলো, দুঃখ ভুলতে, মনের চিন্তা তাড়াতে। চোলাই খেলে যে বাস্তবটা দূরে সরে যায়. তখন মনে রাখতে হয়না, মাইনেকড়ি হচ্ছে না, ঘরে খাবার নেই, ছোট্ট মেয়েটার পরনের জামাকাপড়ও নেই। মেয়ের যত পড়াশুনার নেশা বাড়ে, বাপ মায়ের পাল্লা দিয়ে বাড়ে চোলাইয়ের নেশা।

দিনে দিনে এমন হলো, বাপ মা সকালে উঠেই কাজে যায় আর মাঝরাতে টলতে টলতে বাড়ি ফেরে। বাহা যতটুকু পারে বাড়ির কাজ করে, তারপরে চলে যায় ইস্কুলের দিকে। মিডডে মিলের একটু খেয়ে বাকিটা বাঁচিয়ে আনে রাতের জন্য। বাপ মায়ের মদের নেশার সাথে মেয়ের পড়াশুনার নেশা পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। এমনি করে সিক্স, সেভেন, এইট সব টপকে যায় বাহা। নাইনে উঠে আরেক বিপদ, মিডডে মিল বন্ধ। তবে খায় কি মেয়েটা দুপুরে? বাপ মায়ের যা অবস্থা, তাতে চাইলেও খাবার পাবেনা বাহা। মা বাপের মতন ইটভাঁটায় কাজ করতে যেতে পারে কিন্তু তাহলে তো ইস্কুল যাওয়া হবে না। তবে কি সে লেখাপড়া ছেড়ে দেবে? নাহ, এতো সহজে সে হাল ছাড়ার মেয়ে বাহা নয়। সে খোঁজ নিয়ে দেখলো, বাড়ির কাছের জঙ্গল থেকে শালপাতা কুড়িয়ে মহাজনকে দিলে, মহাজন টাকা দেবে। প্রতি একশোটা শালপাতা পিছু ছ টাকা। খুবই সামান্য টাকা, এটাকায় আমার-আপনার একবেলার ফুচকার খরচও মেটে না। বাহা কিন্তু এই টাকাকে সম্বল করেই নেমে পড়লো ওর পরের লড়াইতে। সূর্য ওঠার আগে মেয়ে ওঠে, একদফা শালপাতা কুড়িয়ে মহাজনকে দিয়ে, টাকা বুঝে ইস্কুলে যায়, ইস্কুল ফেরত আবার একদফা শাল পাতা কুড়িয়ে টাকা বুঝে নেওয়া। তারপরে তো রান্না বান্না, পড়াশুনা আছেই। এভাবেই আস্তে আস্তে মাধ্যমিকটাও পেরিয়ে গেলো বাহা। ইলেভেন-টুয়েলভের লড়াইটা আরো কঠিন।

একে তো পড়াশুনা আগের থেকে কঠিন, তার ওপরে মা বাপের প্রায় সম্পূর্ণ দায়িত্ত্বই এখন বাহার ওপরে। ওর ওই শালপাতা বেচার টাকাতেই সংসার চলে আজকাল। মাবাপের রোজগারটুকু পুরোটাই যায় চোলাইয়ের পেছনে। আর যেন টানতে পারছে না ছোট্ট মেয়েটা। একদিন সেকথাই ইস্কুলে বসে বসে ভাবছিলো মেয়ে হঠাৎ ওর হাত ধরে কে যেন টান মেরে বললো "ফুটবল খেলবি?"। বাহা তাকিয়ে দেখে রুক্মিণী ওর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে হাসছে। রুক্মিণী, রুক্মিণী কিস্কু বাহার প্রাণের বন্ধু, বাহার ঘরের অবস্থা প্রায় সব টুকুই জানে সে। সেজন্যই বাহার আরো রাগ হলো। সব জেনেও রুক্মিণী এরকম করে বলে কি করে তাকে?

বাহা একটু রাগ রাগ মুখেই বলল "তুই জানিস না আমাদের বাড়ির অবস্থা? এর মধ্যে তুই খেলার কথা বলিস কি করে? আর এদিকের কোন মেয়ে এই ধাড়ি বয়েসে ফুটবল খেলে যে হঠাৎ তোর মাথায় ফুটবল খেলার ভূত চাপলো? ওসব তো ছেলেদের খেলা।" রুক্মিণী একটা কথারও উত্তর না দিয়ে মিটিমিটি হাসতে হাসতে বাহার হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিলো। "আরে, তুই ডিম্-পাউরুটি কোত্থেকে পেলি?" উত্তরের অপেক্ষা না করেই বাহা ডিমে কামড় দিতে গিয়ে থমকে যায়... "তোর কই?" আবার মিটিমিটি হাসতে হাসতেই রুক্মিণী বলল "ফুটবল খেলে পেয়েছি। একটা পাগলা মতন দাদা এসেছে। নাকি আমাদের ফুটবল খেলা শেখাবে। আর যারা যারা শিখবে, সবাইকে খাওয়াবে।"

"কিন্তু, গ্রামের লোকে কি বলবে রে আমরা ফুটবল খেললে?" "ছাড় তো তোর গ্রামের লোক. আজকে কে দুটো খাবার দিতে আসে তোদের মুখে? তুই যা রোজগার করিস তাতেই তো চলে। ভালো কথা বলি শোন, ফুটবল খেলতে চল, না হোক রাতের খাবারটা জোগাড় হয়ে যাবে। সে সময়ে পড়তে পারবি।" বাহা একটু ভাবে। ইস্কুলেও তো একসময় মিডডে মিলের লোভেই পড়তে এসেছিল। আজকেও নয় যাবে খাবারের লোভে। আর তার থেকেও বড় কথা এখানে একটু সময় দিলে ওর আসল নেশা লেখাপড়ার জায়গাটাকেও আরেকটু সময় দিতে পারবে বাহা।

ফুটবল খেলতে খুব লজ্জা করছিল বাহার। একে তো পরনে খাটো হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি। প্রানপনে হাফপ্যান্টটা নিচের দিকে টানছিলো ও। তার ওপরে কোচের ধমক, "জামার দিকে মন না দিয়ে বলের দিকে তাকা সবাই।" শুধু বাহা নয়, যে কজন খেলছিল সবারই এক দশা। খাবারের জন্যই খেলতে এসেছে বেশিরভাগ মেয়ে। শাড়ি বা সালোয়ার ছাড়া কিছু পরেনি কোনোদিন কেউ হাফপ্যান্টে তো অস্বস্তি হবেই। এসবি অন্যমনস্ক হয়ে ভাবছিলো বাহা তখনি শুনলো কোচ শিবুদা জিগেস করছে "আচ্ছা তোদের কারোর ওপর রাগ হয়?" কেউ কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই বাহা অবাক হয়ে দেখলো ওর ডান হাতটা কখন যেন নিজের থেকেই ওপরে উঠে গেছে। ঠিক ইস্কুলের দিদিমণিরা প্রশ্ন করলে যেরকম হাত ওঠে সেরকম। শিবুদা এতক্ষন ওকে আলাদা করে লক্ষ্য করেননি, এবারে জিগেস করলেন "নাম কি রে তোর?" "বাহা, বাহামনি।" "আচ্ছা, এদিকে যায় এবার, এই বলটার সামনে, এবার এটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বল তোর কার ওপরে রাগ হয়।" "আমার... আমার না ভীষণ রাগ হয় চোলাইয়ের দোকানগুলোর ওপরে, আমার বাবামাকে তো ওরাই কেড়ে নিলো। আমার রাগ হয় ওই ইঁটভাটার মালিকের ওপরে, উনি ঠিকমতন মাইনেকড়ি দিলে বাবামা এরকম নেশা করতো না।" "তুই এবারে ওই বলটার দিকে ভালো করে তাকা, মনে কর ওটাই চোলাইয়ের দোকান, ওটাই ইঁটভাটার মালিক। এবার প্রানপনে ওটার গায়ে একটা লাথি মারতো দেখি।" বাহার মনের মধ্যে কিরকম একটা করছিলো। এখানে বলার আগে ও সত্যি বোঝেনি ওর মনে ঠিক কতটা রাগ জমে আছে এই চোলাইয়ের দোকান বা ইঁটভাটার মালিকের প্রতি। কেমন একটা ঘোরের মধ্যেই বলটায় লাথি মারলো ও। সবার হাততালিতে চমক ফিরলে দেখলো বলটা বহুদূরের গোলপোস্টের জালে জড়িয়ে আছে। শিবুদা এবার ওকে জড়িয়ে ধরে বললো "বুঝলি বাহা, আমাদের সবার জীবনেই নানা সমস্যা আছে। আমাদের কাজ হল ওগুলোকে লাথি মেরে গোলের ভেতর পাঠিয়ে দেওয়া। আজকে যেরকম করলি তুই ঠিক সেরকম। এবার থেকে বলটাকে ধরলেই তোর সমস্যাগুলোর কথা ভাববি। তোর রাগটাকে খেলার মাঠে ঝেড়ে বের করে দিবি। দেখবি, সমস্যাগুলো তখন আর অত বড় মনে হবেনা।"

কথাগুলো শুনেছিল বাহা। প্রথমে একটা কথাও বিশ্বাস করেনি, মনে মনে ভেবেছিল সব গাঁজাখুরি। কিন্তু ধীরে ধীরে বাহা কথাগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। ওর সব সমস্যাগুলোকে লাথি মেরে গোলে পাঠিয়ে মন দিতে শুরু করেছিল লেখাপড়ায়।

তারপরে? তারপরে আবার কি? বাহাদের টিম কিছু প্রাকটিস ম্যাচ খেলেছে, নিজেদের ওপর ভরসাটাও আরো অনেকগুন বেড়ে গেছে। আর এবারের উচ্চমাধ্যমিকে বাহামনি কোন গৃহশিক্ষকের সাহায্য ছাড়াই সসম্মানে পাশ করেছে। পাশের খবর পেয়েই বাহা ছুটে গেছিলো শিবুদাকে খবর দিতে। এই লোকটা ততদিনে ওর নিজের দাদার মতোই হয়ে গেছে। দাদার হাত ধরে ও একটু আধটু কম্পিউটার চালাতে শিখেছে আর সব থেকে বড় কথা, শিখেছে নিজেকে বিশ্বাস করতে, নিজের ওপর ভরসা রাখতে। পাশের খবর পেয়েই শিবুদা একগাল হেসে বাহাকে জড়িয়ে ধরে বলল "তোর একটা সমস্যা তুই সমাধান করেছিস, তাই গোলের দায়িত্ব এবার আমার ঘাড়ে. তোর কলেজের খরচটা আমি দেব। যা এবার ওই গোলটাও দিয়ে আয়।" বাহা প্রণাম করতে যেতেই শিবুদা জিগেস করলো "কিরে আমার গুরুদক্ষিনা দিবিনা?" "কিন্তু আমি কি দেব তোমায়? আমার তো কিছুই নেই।" "কে বললো তোর কিছু নেই? তোর এই জেদটা আছে, একটা মাথা আছে। এগুলোকে কাজে লাগা। নতুন ছাত্রীদের পড়া। আজকে যদি তুই পড়াশুনা না করতি, তাহলে হয়তো এদ্দিনে তুইও চোলাইয়ের নেশায় বসে থাকতি। আজকের এই নতুন ছাত্রীদের সেটা শেখাতে পারবি না? চেনাতে পারবি না ওদের ভালো আর মন্দ নেশার পার্থক্য?" ছলছল চোখে একগাল হেসে ঘাড় নাড়ে বাহা, পারবে না মানে? পারতেই হবে ওকে।

পুনশ্চ: যারা এতক্ষন আমার এই বকবক পড়লেন কষ্ট করে, তাদের বলি বাহামনি বা শিবুদা দুজনের কেউই কিন্তু কাল্পনিক চরিত্র নয়। বাহামনির কথা আমি প্রথম শুনি শ্রীজার ফাউন্ডার-ডিরেক্টর শিবুদার কাছে। গল্পের খাতিরে একটু ফাঁকফোকর ভরাট করা ছাড়া বাহামনির সম্পর্কে লেখা পুরো গল্পটাই সত্যি। শুধু মনের জোর সম্বল করে একটা অসম লড়াই চালাচ্ছে মেয়েটা। আপনারা একটু সাহায্য করবেন ওকে প্লিজ? বেশি কিছুই না, নতুন ছাত্রীদের পড়ানোর জন্য নাইন-টেনের বই সংগ্রহ করছে শ্রীজা। আজকে প্রায় আটটা গ্রাম জুড়ে দেড়শো ছাত্রীর পড়ার ব্যবস্থা করতে চাইছে শ্রীজা। আর তার জন্য গড়ে তুলতে চাইছে প্রতিটি গ্রামে একটা করে লাইব্রেরি। আপনাদের চেনা পরিচিত অনেকেই তো মাধ্যমিক দিয়েছে এবার, ওদের বইগুলো সংগ্রহ করে একটু যদি শ্রীজা কলকাতা মুখপাত্র কে দেন, বাচ্চা মেয়েগুলো একটু লড়াইয়ের হাতিয়ার পায়। পারবেন আপনারা এটুকু সাহায্য করতে? বাহার মতন বাকি মেয়েদেরও প্রতিকূলতার লড়াইয়ে সামিল হতে? শ্রীজা কলকাতা মুখপাত্রের নাম অপরাজিতা দত্ত আর ওনার ইমেইল এড্রেস হল [email protected] অনেক আশা নিয়ে আপনাদের কাছে আবদার করলাম, প্লিজ নিরাশ করবেন না কিন্তু।

229 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: dd

Re: #বাহামণিরগল্প

খুব ভালো লাগলো জেনে।

কাজের কাজ এখনো কিছু লোক করে যায়। কলকাতায় থাকি না, তাই শুভেচ্ছা ছাড়া আর কিছু দেবার নেই।
Avatar: সিকি

Re: #বাহামণিরগল্প

বাঃ। দারুণ।
Avatar: de

Re: #বাহামণিরগল্প

আমি বম্বেতে থাকি - তাই বইপত্র এখান থেকে পাঠানো খুব মুশকিল হবে। কিন্তু অন্য কোনভাবে ডোনেশন দিয়ে কি হেল্প করতে পারি? অথবা আমি কলকাতায় গেলে বই কিনে দিয়ে আসতে পারি। কোন ভাবে সুবিধে হবে একটু জানাবেন -
Avatar: aranya

Re: #বাহামণিরগল্প

ভাল লাগল খুব। অপরাজিতা-র সাথে যোগাযোগ করব


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন