Soumyadeep Bandyopadhyay RSS feed

নিজেকে পল্লবগ্রাহী মনে করে কলার তোলেন | অল্প কিছুদিন হলো জলচর থেকে উভচর হওয়া সম্ভব হয়েছে | প্রচুর নিষিদ্ধ বস্তু সেবন করে করে শীঘ্র খেচর হবার সম্ভাবনা ও প্রচুর | বর্তমানে আন্টার্কটিকায় হনুমান সম্পদ নিয়ে বিশদ গবেষণায় ব্যস্ত |

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • দক্ষিণের কড়চা
    গরু বাগদির মর্মরহস্য➡️মাঝে কেবল একটি একক বাঁশের সাঁকো। তার দোসর আরেকটি ধরার বাঁশ লম্বালম্বি। সাঁকোর নিচে অতিদূর জ্বরের মতো পাতলা একটি খাল নিজের গায়ে কচুরিপানার চাদর জড়িয়ে রুগ্ন বহুকাল। খালটি জলনিকাশির। ঘোর বর্ষায় ফুলে ফেঁপে ওঠে পচা লাশের মতো। যেহেতু এই ...
  • বাংলায় এনআরসি ?
    বাংলায় শেষমেস এনআরসি হবে, না হবে না, জানি না। তবে গ্রামের সাধারণ নিরক্ষর মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আজ ব্লক অফিসে গেছিলাম। দেখে তাজ্জব! এত এত মানু্ষের রেশন কার্ডে ভুল! কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানলাম প্রায় সবার ভোটারেও ভুল। সব আইকার্ড নির্ভুল আছে এমন ...
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...
  • খানাকুল - ২
    [এর আগে - https://www.guruchan...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

নান্টু ফার্স্ট হয় নি

Soumyadeep Bandyopadhyay



রাজেন কলকাতা ছেড়ে গেছে প্রায় বছর দশেক | উত্তর কলকাতার গঙ্গার ধারের বাড়ী ছেড়ে তার নতুন আস্তানা ব্যাঙ্গালোরের সরজাপুর | বউ বাচ্চা , দু কামরা , গাড়ী মাঝে মাঝে অফিস টুরে বা সস্তা দামে বিদেশ ভ্রমণ , ছুটি ছাটায় মা বাবাকে এখানে নিয়ে আসা ইত্যাদি নিরুপদ্রব অভ্যস্ত জীবন যাপন চলছিল বেশ | শনিবারের বিকেল , টুটুল কে নিয়ে তার মা গেছে ক্রাফট স্কুলে | গাড়ী টাও নিয়ে গেছে | ওখানে ওকে পৌছে দিয়ে সরাসরি চলে যাবে বন্ধুদের গেট টুগেদারে | সুরমিতাও চাকরী করতো , কিন্তু টুটুল হবার পর থেকে সে এখন ফুলটাইম মা |
ব্যাঙ্গালোরে এসময়ের সন্ধ্যে বড় মায়াময় | অল্প ঠান্ডা হাওয়া , আর্দ্রতা হীন এই প্রাক শরতের শহর | এ সময় কোনো না কোনো অফিস কলিগের বাড়ীতে পার্টি চলেই | কিন্তু মনের ভিতর কেমন একটা একা থাকার ইচ্ছে ওকে আজ বেরোতে দিচ্ছিলো না | হাতে এখন অন্তত ঘন্টা তিনেক সময় , তাই সেলার থেকে আগের বার দুবাই থেকে আনা ডিউটি ফ্রি গ্লেনমোরান্জে থেকে একটা পেগ নিয়ে স্পোর্টস চ্যানেল সার্ফ করছিল সে | কিছুক্ষণ বাদেই স্প্যানিশ লীগের ম্যাচ শুরু হবে | হঠাৎ একটা চ্যানেলে চোখ আটকে গেলো | ন্যাশনাল গেমসে সাঁতার প্রতিযোগিতা দেখাচ্ছে | এখন ৪০০ মিটার ফ্রীস্টাইল মেন | একটা লম্বা শিষের সাথে আটজন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াচ্ছে ব্লকে , টেক ইওর মার্ক আর তারপরে ঘন্টা বাজার সাথে সাথে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সবকটা উদগ্র শরীর | স্ক্রীনের ধারের স্টপওয়াচে স্প্লিট দেখাচ্ছে ন্যাশনাল রেকর্ড আর মিট রেকর্ডের | শেষ পর্যন্ত ফার্স্ট হলো কর্ণাটকের শাহীন , ভাষ্যকার ঘোষনা করলো ন্যাশনাল রেকর্ড ওরই ছিল | মিট রেকর্ড হলো, তবে ন্যাশনাল রেকর্ড ভাঙ্গে নি | বাংলা থেকে থার্ড হলো তনুময় মাঝি | যাক , তাও ভালো | কিন্তু কি অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে সাঁতারে ....অবাক হয়ে গেলো রাজেন |
সাথে সাথে ওর মনটা চলে গেল বছর পনের আগের সেই ভিজে শরীর পৃথিবীতে , যখন সাঁতারই ছিল ধ্যান জ্ঞান | সেই লড়াই ছিলো অনেক সরাসরি , মুখোমুখি | আর আজ দৌড়ের সংজ্ঞা পাল্টে গেছে কতটা!
তার সাথে এটাও মনে পড়ল , সামনের সপ্তাহে তার কলকাতা যাবার কথা আছে , সেলস মিটিং এ | নিয়ম মত কিছু ধমক ধমক দিতে হবে, গাজর ঝোলাতে হবে চোখের সামনে আর সব থেকে ভয় দেখাতে হবে সুকুমার কে | ওর বেচু দলে নতুন আমদানী মাস আটেক আগে , এর মধ্যে শেষ দু কোয়ারটারে একবারেও বিক্রীর কোটা পূর্ণ করতে পারেনি | মোটামুটি ভদ্র ভাবে বোঝাতে হবে (মানে যতটা অবধি বললে এইচ আরের কাছে নালিশ না যায়) যে পরের দুমাসে ঘাটতি মেটাতে না পারলে এবার আসতে হবে | সব তথ্য এক্সিকিউটিভ ডায়েরি তে পরিষ্কার পর পর লিখে রেখেছে রাজেন, এসব ব্যাপারে কোনো রিস্ক নিতে সে রাজী নয় |
স্মৃতির কামড় খেয়ে সেদিনই রাতে হোয়াটস আপে ধরল কযেকজন সাঁতারের বন্ধুকে , বলল কলকাতা আসছি সামনের সপ্তাহে, দেখা হতে পারে | আশ্চর্য সমাপতন , ওরা বলল সামনের সপ্তাহ শেষের দিকে কলকাতায় সিনিয়র রাজ্য সাঁতার আছে | ভালই হলো , এক ঢিলে দু পাখি মারা যাবে | একটু টুর টা বাড়িয়ে নেবে রাজেন , বউ মেয়েকে দুদিন এখানে রেখে পাঠিয়ে দেবে কোন্নগরে মামার বাড়ীতে | ওখানে টুটুলের ন্যাওটা আরেকটা পুঁচকে আছে | এদিকে ভালো একটা সাঁতার প্রতিযোগিতাও দেখা হয়ে যাবে | কলকাতায় এলে বরাবরই নিজের বাড়ীতেই ওঠে রাজেন | এ কদিন মায়ের হাতের রান্না আর বাবার সাথে চায়ের টেবিলে তুফান না তুললে ঠিক জমে না তার কলকাতা ভ্রমণ |
সেই মত প্ল্যান করে পরের বৃহস্পতি বার তাড়াতাড়ি ক্লায়েন্ট মিট সেরে সুভাষ সরোবরের দিকে রওনা দিল রাজেন | সেই চেনা চেনা ক্লোরিনের গন্ধ , নামকরা ছেলে মেয়েদের ঘিরে উত্সুক জটলা | তার সাথে উপরি প্রচুর পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা হলো , বেশিরভাগই নয় রেল, নয় পুলিস বা আর্মি তে | আড্ডা জমে উঠলো পাওয়া না পাওয়া , সাঁতারের সেকাল একাল, নিজেদের ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যত এসব নিয়ে এমন সময় পিঠে একটা দুর্বল থাপ্পড় পড়ল , চিনতে পারছিস ভাই ? সেই প্রায় সন্ধের অন্ধকার আলোতে রাজেন ওকে চিনতে পারল , নান্টু | হুড়হুড় করে একরাশ বেনো স্মৃতি ভেসে এলো | ওর মত অদ্ভূত ছেলের কথা মনে রাখতে কারই বা আর ভুল হতে পারে ?
শেষ ওর সাথে দেখা হয়েছিল এরকম ই একটা রাজ্য সাঁতার প্রতিযোগিতায় | ...রাজেন প্রথম হয়েছিল, ও হয়েছিল পঞ্চম বা ষষ্ঠ | সেটা আশ্চর্য্ নয়, বাংলায় প্রথম তিনজনের মধ্যে ওকে কোনোদিনই দেখা যায়নি | এমনিতে , কোনো প্রথম বা দ্বিতীয় সাঁতারুর পঞ্চম বা ষষ্ঠ কে মনে রাখার কোনো কারণ নেই কিন্তু ওই যে , ও ছিলই অদ্ভূত | প্রতিভার অভাব ও পোষাতে চেষ্টা করত উত্সাহ আর হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করে | একবার এরম ই কোনো একটা সাঁতারের প্রতিযোগিতায় ও নিজে না কাটলেও,প্রায় ৬০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে এসেছিল শুধু দেখতে | এসব বাকিদের কাছে অভাবনীয় ছিলো | কিন্তু ও একটা জিনিস বোঝে নি বা বুঝতে চায়নি , সবার জন্য সবকিছু নয় | সাঁতার ওর জন্য ছিলো না |


শেষ যে বার রাজেন প্রথম হয় সেটা ২০০১, তার পর সাঁতার ছেড়ে দিযে ওর সাথে আর যোগাযোগ ছিল না| কিন্তু আজ হঠাৎ ওকেই এত আপন কেন মনে হলো সে জানে না | সেটা কী ওর আপাত চিমসে যাওয়া জীবন যাকে দেখে নিজের তুলনামূলক সাফল্যের খতিয়ান সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায়, নাকি নেহাতই প্রাক্তন কোনো খেলোয়াড় দের প্রতি আত্মীয়তা ? কে বলতে পারে |
আলো নিভছে পুলে , আস্তে আস্তে সবাই চলে যাচ্ছে অন্ধকার সুইমিংপুল ছেড়ে, রাজেন ওকে বলল চ আমার সাথে একটু আড্ডা মারি একসাথে | খেয়ে দেয়ে একবারে বাড়ি ফিরবি |
এই ভাবেই ওকে নিয়ে রাজেন এলো মধ্য কলকাতার একটা পুরনো কিন্তু নামকরা পানশালায় | ও কিছুতেই মদ খেতে রাজী হলো না , এমনকি বিয়ার ও নয় | খেতেও চাইল না বিশেষ কিছু | পেটে নাকি আলসার হয়েছে | একটু খাবার নাড়াচাড়া করে , খানিক টা দ্বিধা দ্বন্দ , খানিকটা অবজ্ঞার সাথে রাজেন ওকে জিগ্গেস করল, তারপরে কি করছিস এখন ? একটু ইতস্তত করে উদাসী ভাবে নান্টু কথা বলা শুরু করল | নিজে না খেলেও , চারিদিকের সমবেত নেশা উত্সবের একটা ফল আছেই | একটু বাদেই ও যেন অন্য কোনো জগতে চলে গেল | সেখানে কেউ নেই , শুধু নান্টু একা , যেন মন্ত্রোচ্চারণ করে যাচ্ছে | একমাত্র শ্রোতা রাজেন |
রাজেনরা সবাই যখন একের পর এক অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে , বাকিদের বেশিরভাগই চাকরী পেয়ে গেছে সাঁতার কেটে ও তখনও অন্য লড়াই তে ব্যস্ত ছিল | ও নিজের ক্লাবে কোচিং শুরু করলো | এতেও আশ্চর্যের কিছু ছিল না , কত জনেই করে | কিন্তু ওর লক্ষ্য ছিল আলাদা | প্রতিবার এরম স্টেট মিটে যারা প্রথম তিনে আসতে পারত না, তাদের কে তৈরী করার পাগলামো পেয়ে বসেছিলো ওকে | প্রায় হাত পা জোরাজুরি করে , এসব ছেলেদের কোচিং এর দায়িত্ব নিত ও | কারো বাবা মা আবার ভাগিয়ে দিতো , কিন্তু ও কোনদিন নিরাশ হয়নি | এদের সবাই যে খুব ইচ্ছুক হত তা নয় , একবার একজন তো প্রায় হাতাহাতি করে চলে এসেছিল ওর কোচিং থেকে | কিন্তু টিঁকে যাওয়া বাকিদের নিয়ে চলত তার এই অসাধ্য সাধনা | রোজ সকালে ৬ থেকে ৮ টা আর বিকেলে ৫ থেকে ৭ টা ঘড়ি ধরে দুটো লেনে প্র্যাকটিস হত সোম থেকে শনি |
যেহেতু ও কোনদিন প্রথম তিনজনের মধ্যে ঢোকেনি, তাই ও খুব ভালো করে ওদের মনস্তত্ব বুঝতে পারত | ওদের সাথে থাকত , সুখ দুঃখের কথা ভাগ করে নিত | কেউ কেউ খেতে না পেলে , নিজের দোকানে এনে খাওয়াত আর সাঁতার কাটাত | তদ্দিনে বাবা মারা গেছে, মা আর ওর সংসার | দোকান টা একটু বড় হয়েছে | সারাদিন যাতে ক্লাবে পড়ে থাকতে পারে , বিয়েও করে উঠতে পারেনি | কিন্তু কি অদ্ভূত ওর এই কোচিং মডেল | বেশিরভাগ ছাত্র যারা পরের বছর ই প্রথম টিমে চান্স পেয়ে যায়, ও আর তাদের কোচিং করানোর সুযোগ পাবে না | তাদের জন্য আসবেন প্রধান কোচ বাপিদা , তাঁর পেডিগ্রীই আলাদা , প্রাক্তন জাতীয় চ্যাম্পিয়ন | আবার নতুন তথাকথিত ব্যর্থ ছাত্র রা আসে পরের বছর | তাদের পিছনে আবার ওর লড়া শুরু | দিন থেকে দিন সহকারী কোচের দিন যাপন |
কোনো স্বীকৃতি নেই, কোনো কাগজে ওর নাম কোনদিন ই বেরোবে না অথচ প্রতিদিন সেই এক গত বাঁধা সকাল ৬ টা থেকে রাত ১০ টার জীবন সংগ্রাম শুধুমাত্র দ্বিতীয় শ্রেনীর সাঁতারুদের প্রথম শ্রেণী তে নিয়ে আসার জন্য | এরম ভাবে সব কিছু চলে যাচ্ছিল , কিন্ত কথায় আছে কপালের নাম গোপাল | একদিন , ট্রেনে কলকাতা আসছিল কোনো কাজে , রানিং ট্রেনে নামতে গিয়ে পচা আমে পা পিছলে পড়ে যায় | স্টেশনের কাছে ঢুকছিল বলে ভাগ্যিস, স্পিড কম ছিল- একটা পা চিরতরে জখম হয়ে ফাঁড়া টা কেটে যায় | রাজেন এবার বুঝলো, ওর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলার কারণ |

কথা শেষ করে কিছুক্ষন যেন ঘোরের মধ্যে চুপচাপ বসে রইল ও | রাজেন একটা কোল্ড ড্রিংক দিতে বলল | এতক্ষণে যেন আরেকবার ভালো করে নান্টু কে দেখল রাজেন | কাঁধের কাছে জামাটা অল্প অল্প পিঁজে গেছে , হনু বেরিয়ে এসেছে দুটো ডিগডিগে সমান্তরাল রগের ওপর | হালকা না কাটা দাড়িতে বয়সের ছোপ | শুধু যখন কোনো ছাত্রর কথা বলছে অল্প ঘোলাটে চোখের মাঝে মাঝে ঝিকিয়ে উঠছে লোহা শান দেবার সময় ঠিকরিয়ে ওঠা আগুন কুচি | রাজেন জানতে পারলো, এবারে যে ন্যাশনাল গেমসে থার্ড হয়েছে , সে এককালে ওর কাছে সাঁতার কেটেছিলো দু সিজন | রাজেন একা একাই তিন পেগ টেনে নিয়েছিল এরমধ্যে | একা খেলে ওর অল্পেও নেশা চড়ে | নান্টুর মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন একটা লাগছিল রাজেনের | ও তো বেশ দিব্ব্যি আছে , মনে হচ্ছে | ভাবতে গিয়ে একটা ঈর্ষার ছোট্ট মোচড় লাগলো কি কন্ঠায় |
নান্টুর কোল্ড ড্রিংক শেষ হয়ে গেছে| এবার রাজেনের দিকে আরেকবার ভালো করে দেখলো তারপর আর একবার হাত টা চেপে ধরে বলল , আসি রে ভাই শেষ ট্রেন টা ধরতে হবে | বেশী দেরী হলে বুড়ী টা চিন্তা করবে | তারপর একটা চাপা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, অনেকদিন বাদে তোকে দেখে খুব ভাল লাগছে, ভালো চাকরি করছিস, ভালো আছিস আমার মত এই ভুতের বেগার খাটতে হচ্ছেনা | যাবার আগে কি রাজেনকে ব্যঙ্গ করেই কথা টা বলল নান্টু? কে জানে | স্টেশন অবধি এগিয়ে দেওয়া নিশ্চয় উচিত ছিল , কিন্তু রাজেনের কেন কে জানে নড়াচড়া করতেই ইচ্ছা করলো না | মাথা দুপ দুপ করছে , শরীর ছেড়ে দিচ্ছে যেন|
বাড়ী ফিরে অনেকক্ষন বই নাড়াচাড়া করলো রাজেন | ঘুম আসছেনা | নান্টুকে নিয়েই ভাবছিল সে অনর্গল | অনেকক্ষণ বাদে, সে তার এক্সিকিউটিভ ডায়রী টাতে লিখলো রাজেন – আমি কালকে সবার আগে একবার আলাদা করে বসব সুকুমারের সাথে | বলব ওর সাথে আছি | ওকে সময় দেব বাকিদের থেকে বেশী , ওকে ঠিকঠাক গাইড করতেই হবে | সাঁতারের প্রথমজন, ষষ্ঠর কাছে এত সহজে হারবে না কিছুতেই |
এর পর রাজেনের সাথে ওর আর দেখা হয়নি | তবে একটা ফোন এসেছিল, প্রায় মাস পাঁচেক পরে | একটা ছুটির দিন সকালে | বউ মেয়ে যথা রীতি বাইরে গেছিল , আর সুযোগের সদ্ব্যবহার করে রাজেন সিগারেট টানছিলো একের পর এক | ঘরটা ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় সাদা হয়ে গেছে | শিশিরের ফোন টা আসে তখনি | নান্টু মারা গেছে দু দিন আগে | অনেকটা শ্লেষ্মা , কান্না জড়িয়ে যা বলল তার নির্যাস হলো , ওদের দোকানটা যে বাজারে সেখানে রাতে আগুন লাগে | কেউ বলছে শর্ট সার্কিট , কেউ বা বলছে বাজার উঠিয়ে ওখানে কোনো একটা মাল্টিপ্লেক্স ওঠানোর প্ল্যান করেছে কিছু প্রোমোটার , ওদেরই কীর্তি ওটা | পুজোর আগে অর্ডারের চাপ ছিল , তাই দোকানেই ছিল ও | আগুন দেখে সবাই প্রায় বেরিয়ে এসেছিল | শুধু একটা চালচুলোহীন ভিখিরির বাচ্চা ছাড়া | ওটা শুয়েছিল, কোনো একটা অন্য দোকানের পেছনে | অনেকটা ঘুরে এসে , আবার বেড়া ভেঙ্গে ওকে বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করে নান্টু | চিরকাল পিছিয়ে পড়াদের চান্স দিতে দিতে নিজে ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় পথ হারিয়ে আর বেরোতে পারেনি | ৬০% থার্ড ডিগ্রী বার্ন নিয়ে সে রাতেই কোনো অন্য জগতে সাঁতার কাটতে চলে গেছে নান্টু |বাচ্চা টা বেঁচে গেছে যদিও |

স্বাভাবিক ভাবেই এসব ঘটনার মাঝে রাজেনকে আর ফোন করে উঠতে পারেনি কোনো বন্ধুরা |


এর পর আরেকটু সিনেম্যাটিক হতেই পারত | ঘর টা অল্প বিস্তর দুলে উঠতো , ঝাপসা হয়ে ঘরের দেয়াল আকাশে মিশে যেতো , হয়ত এক অব্যর্থ ম্যাচ কাটে রাজেনের হাতের মোবাইল ফোন পড়ে যেতে যেতে মিশে যেতো ঘট থেকে ঝরে পড়া নান্টুর সাদা কালো নাভি ভস্ম কণায় | কিন্তু শিশির ফোনের ওধার থেকে বুঝতে পারেনি যে একটা আপাত অপ্রাসঙ্গিক কথা মনে পড়ে রাজেনের ভুরুটা কুঁচকে গেছিলো | রাজেন একবার বেঙ্গল প্র্যাকটিসে লুকিয়ে দড়ি টেনে এগিয়ে যেতে গিয়ে ব্যাপক ঝাড় খেয়েছিলো কোচের কাছে | আজ মনে হচ্ছিল নান্টু অন্যায় ভাবে দড়ি টেনে এতটা এগিয়ে গেছে যে রাজেন ওকে আর কিছুতেই ধরতে পারবে না | ওই হাসিটার জবাব বকেয়াই রয়ে যাবে এ জীবতকালে |




263 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: aranya

Re: নান্টু ফার্স্ট হয় নি

'প্রতিবার এরম স্টেট মিটে যারা প্রথম তিনে আসতে পারত না, তাদের কে তৈরী করার পাগলামো পেয়ে বসেছিলো ওকে '

- ইন্টারেস্টিং। ভাল লাগল
Avatar: π

Re: নান্টু ফার্স্ট হয় নি

হ্যাঁ, এরকম কিছু পাগল বোধহয় সত্যিই আছেন।
ভাল লাগল।
Avatar: Du

Re: নান্টু ফার্স্ট হয় নি

খুব ভালো লাগলো
Avatar: AP

Re: নান্টু ফার্স্ট হয় নি

খুব ভালো লাগলো।

Avatar: Soumyadeep Bandyopadhyay

Re: নান্টু ফার্স্ট হয় নি

নিজের জীবনের প্রায় ১৫ বছর সাঁতার কেটেই গেছে় তাই এরম লোক জন অনেক দেখেছি ় তাদের প্রতি একটা অক্ষম ট্রিবিউট ়
Avatar: ranjan roy

Re: নান্টু ফার্স্ট হয় নি

সৌম্যদীপকে অনেক ধন্যবাদ, এই রকম লেখার জন্যে।
Avatar: Soumyadeep Bandyopadhyay

Re: নান্টু ফার্স্ট হয় নি

ধন্যবাদ রঞ্জন বাবু :)


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন