Tim RSS feed
Tim এর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • যান্ত্রিক বিপিন
    (১)বিপিন বাবু সোদপুর থেকে ডি এন ৪৬ ধরবেন। প্রতিদিন’ই ধরেন। গত তিন-চার বছর ধরে এটাই বিপিন’বাবুর অফিস যাওয়ার রুট। হিতাচি এসি কোম্পানীর সিনিয়র টেকনিশিয়ন, বয়েস আটান্ন। এত বেশী বয়েসে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এসি সার্ভিসিং করা, ইন্সটল করা একটু চাপ।ভুল বললাম, অনেকটাই চাপ। ...
  • কাইট রানার ও তার বাপের গল্প
    গত তিন বছর ধরে ছেলের খুব ঘুড়ি ওড়ানোর শখ। গত দুবার আমাকে দিয়ে ঘুড়ি লাটাই কিনিয়েছে কিন্তু ওড়াতে পারেনা - কায়দা করার আগেই ঘুড়ি ছিঁড়ে যায়। গত বছর আমাকে নিয়ে ছাদে গেছিল কিন্তু এই ব্যপারে আমিও তথৈবচ - ছোটবেলায় মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঘুড়ি ওড়ানো "বদ ছেলে" দের ...
  • কুচু-মনা উপাখ্যান
    ১৯৮৩ সনের মাঝামাঝি অকস্মাৎ আমাদের বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ(ক) শ্রেণী দুই দলে বিভক্ত হইয়া গেল।এতদিন ক্লাসে নিরঙ্কুশ তথা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করিয়া ছিল কুচু। কুচুর ভাল নাম কচ কুমার অধিকারী। সে ক্লাসে স্বীয় মহিমায় প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করিয়াছিল। একটি গান অবিকল ...
  • 'আইনি পথে' অর্জিত অধিকার হরণ
    ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম ও কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে, দীর্ঘসংগ্রামে অর্জিত অধিকার সমূহকে মোদী সরকার হরণ করছে— আলোচনা করলেন রতন গায়েন। দেশে নয়া উদারবাদী অর্থনীতি লাগু হওয়ার পর থেকেই দক্ষিণপন্থার সুদিন সূচিত হয়েছে। তথাপি ১৯৯০-২০১৪-র মধ্যবর্তী সময়ে ...
  • সম্পাদকীয়-- অর্থনৈতিক সংকটের স্বরূপ
    মোদীর সিংহগর্জন আর অর্থনৈতিক সংকটের তীব্রতাকে চাপা দিয়ে রাখতে পারছে না। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন শেষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে ভারতের অর্থনীতি সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। সংকট কতটা গভীর সেটা তার স্বীকারোক্তিতে ধরা পড়েনি। ধরা পড়েনি এই নির্মম ...
  • কাশ্মীরি পন্ডিত বিতাড়নঃ মিথ, ইতিহাস ও রাজনীতি
    কাশ্মীরে ডোগরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর তাদের আত্মীয় পরিজনেরা কাশ্মীর উপত্যকায় বসতি শুরু করে। কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও ছিলেন। এরা শিক্ষিত উচ্চ মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেনি। দেশভাগের পরেও এদের ছেলেমেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে ...
  • নিকানো উঠোনে ঝরে রোদ
    "তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে ..."সেই অক্ষরগুলোকে ধরার আরেকটা অক্ষম চেষ্টা, আমার নতুন লেখায় ... এক বন্ধু অনেকদিন আগে বলেছিলো, 'আঙ্গুলের গভীর বন্দর থেকে যে নৌকোগুলো ছাড়ে সেগুলো ঠিক-ই গন্তব্যে পৌঁছে যায়' ...
  • খানাকুল - ২
    [এর আগে - https://www.guruchan...
  • চন্দ্রযান-উন্মত্ততা এবং আমাদের বিজ্ঞান গবেষণা
    চন্দ্রযান-২ চাঁদের মাটিতে ঠিকঠাক নামতে পারেনি, তার ঠিক কী যে সমস্যা হয়েছে সেটা এখনও পর্যন্ত পরিষ্কার নয় । এই নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে শুরু হয়েছে তর্কাতর্কি, সরকারের সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে । প্রকল্পটির সাফল্য কামনা করে ইসরো-র শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীরা ...
  • দেশত্যাগ...
    আমার এক বন্ধু ওর একটা ভিজিটিং কার্ড আমাকে দিয়েছিল। আমি হাতে নেওয়ার সময় কার্ডটা দেখে বুঝতে পারলাম কার্ডটা গতানুগতিক কোন কার্ড না, বেশ দামি বলা চলে। আমি বাহ! বলে কাজ শেষ করে দিলাম। আমি আমার বন্ধুকে চিনি, ওর কার্ডের প্রতি এরচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখালে ও আমার মাথা ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

Tim

এই লেখার যা পটভূমিকা বেশ দীর্ঘ, জটিল, এবং মোটেই সরলরৈখিক নয়। এই মুহূর্তে ভারতে রাজনৈতিক অস্থিরতা জেএনইউ তে ঘটে চলা ছাত্র আন্দোলন ও তার অভিঘাতে তুঙ্গে। একই সঙ্গে নানা স্তরে রাজনৈতিক চাপানউতোর চলছে, এবং তার মোটের ওপর নানান ডাইমেনশন পাওয়া যাচ্ছে। এক, অবশ্যই যে ছাত্র সংগঠনেই আন্দোলনের পুরোভাগে। দুই, শাসক বিজেপি এবং তার অনুগত দলগুলি। তিন, ভারতীয় মিডিয়া। চার, এবং এরাই ক্রমশ বেশি করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, বিপুল সংখ্যক মানুষ, যারা আপাতদৃষ্টিতে অরাজনৈতিক। যদিও আমি মনে করিনা অরাজনৈতিক মানুষ হতে পারে, কিন্তু সে অন্য তর্ক। এই লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো একটা যথাসম্ভব নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এই ঘটনাক্রম এবং তার কারণ খতিয়ে দেখা। এটা যতখানি অন্যদের জন্য ততখানিই আমার নিজের জন্য প্রয়োজন। আমরা স্বভাবসিদ্ধ চপলতায় অজস্র জিনিস পড়ি, শুনি, দেখি ও ভুলে যাই। এবং মনে ভুল ধারণা লালন করি। এই ধারণাগুলি চিরকালই বিপজ্জনক ছিলো, তবে সোশ্যাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্ত হওয়ায় আজ তা মাত্রাহীন ত্রাসে পৌঁছেছে।

যাই হোক, আসল কথায় আসি। যে ছাত্র আন্দোলন নিয়ে এত কথা, তার একটা প্রধান অংশ হলো দেশদ্রোহমূলক স্লোগান সংক্রান্ত বিতর্ক। শাসকের অভিযোগ, স্লোগানে ভারতের বরবাদী চাওয়া হয়েছে এবং তা দেশদ্রোহমূলক। ছাত্রদের মুচলেকা, যে এরকম স্লোগান ওঠেইনি। ছাত্রদের সমর্থক একটা অংশের মত, দেশের বরবাদী চাওয়াই যায়, কারণ তা বাকস্বাধীনতা। আমরা আপাতত এই বিপজ্জনক তর্কচক্রের ফাঁদে পা দেবনা, বরং পাশ কাটিয়ে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগে চলে যাব, যা আজাদ কাশ্মীর সংক্রান্ত। তবে যাওয়ার আগে বলে যাব, কে, কোন পরিস্থিতিতে নিজের দেশের বরবাদী চায় সেটা জানা খুবই দরকারি, এবং সম্ভব হলে খতিয়ে দেখাও, যে সত্যিই চাওয়ার খুব একটা দরকার ছিলো কিনা, এবং সর্বোপরি, এর ফলে সত্যিই কোন সমস্যার সমাধান হয় কিনা।

এবার মূল বিষয়। এই ছাত্র আন্দোলনের উপলক্ষ্য আফজল গুরুর বিচার, এবং সেই সূত্রে কাশ্মীর সমস্যা। কাশ্মীর সমস্যা বলে আমরা ছোট থেকেই এই ভূখন্ডের মানুষকে ছোট করে এসেছি। আসলে এ আমাদের নিজেদেরও সমস্যা, যে ইউনিটি ইন ডাইভার্সিটি নিয়ে আমরা ছোট থেকে ম্যারাপ বেঁধে গলা ফাটাই, তার সমস্যা। ভারতীয় সেনা এঅং বিক্ষুব্ধ কাশ্মীরীদের প্রাণের বিনিময়ে আসা এই অখন্ডতার সমস্যা আমাদের চমৎকার দেশাত্মবোধ দেয়, দেয় রোজার মত সিনেমা ও আরো অনেক কিছু। আমরা জানতেও শিখিনা ভূস্বর্গে যে হিংসা দেখে আমরা চ্যানেল পাল্টে ফেলি, তা আমাদেরই শুরু করা মুরগির লড়াই। তাই ছোট করে কাশ্মীরের ইতিহাস, যা আসলে কাশ্মীরে হিংসার ইতিহাস বলাই ভালো। যে তিনটি বই থেকে মূলত আমি ঘুরেফিরে লিখবো, সেগুলো হলো-

১) Our Moon has Blood Clots : The Exodus of the Kashmiri Pandits by Rahul Pandita, Vintage Books/Random House India, 2013
2) Curfewed Night: A Frontline Memoir of Life, Love and War in Kashmir by Basharat Peer, Random House, 2010
3) Kashmir: Roots of conflict, paths to peace by Sumantra Bose

এর বাইরেও অনেক তথ্যসূত্র থাকবে, সেগুলো যখন যেমন আসবে যোগ করে দেব।

প্রথমেই সংক্ষেপে কাশ্মীরের ইতিহাস। ভারতীয়দের ইতিহাস লেখার বদনাম তেমন নেই, কিন্তু কাশ্মীরের ইতিহাস তার উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। আপাতত রাহুলের বই থেকে সংক্ষিপ্তসার।

কাশ্মীর উপত্যকায় হিন্দু পন্ডিতদের ওপর মুসলিম অত্যাচারের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। হিন্দু মুসলমানের যে সম্প্রীতির বাতাবরণ ছিলো একসময়, তা চতুর্ধশ শতাব্দীর সময় থেকে আস্তে আস্তে ঘা খেতে থাকে, যখন সিংহাসনে সুলতান সিকন্দর। তারপর অনেকদিন ধরে আস্তে আস্তে অবিশ্বাসের আবহাওয়া তৈরী হয়েছে। সিকন্দর ছিলেন সুন্নি। এরপর কিছুদিনের শান্ত থাকার পরে তখতে আসে শিয়া সম্প্রদায়, এবং যুগপৎ হিন্দু পন্ডিত ও সুন্নি অত্যাচারিত হয়। ১৫৮৯ সালে মুঘলরা দখল নেয় এবং আওরঙ্গজেবের আমলে ভালোরকম অত্যাচার হয়, তার তীব্রতা ১৬৭১ সালে এতই বেড়েছিলো যে পন্ডিতরা গুরু তেগ বাহাদুরের কাছে সাহায্য চান। ১৭৫২ সালে আফগানরা আসে এবং প্রায় সত্তর বছর ধরে অত্যাচার চলে। এই সময় থেকেই মাস কনভার্শন শুরু হয়, যদিও মাইগ্রেশন তো বহুদিন ধরেই চলছিলো, কখনও কখনও অনেকে ফিরেও আসছিলেন। ১৮১৯ সাল নাগাদ ডোগরা ডাইনাস্টি শাসন করতে শুরু করে কাশ্মীর, এবং এই সময় মুসলমানদের ওপর অত্যাচার হয়, যদিও পন্ডিতা আনপেইড লেবারের কথা বলছেন, ভায়োলেন্স নিয়ে কিছু লেখেন নি (এই বিষয়টায় পরে আসছি)। ১৯৩১ সালে এই বিক্ষুব্ধ মুসলমান কশাই ডোগরা রাজাকে মেরে দেয়, এবং দাঙ্গা হয়। মুসলমানেরা মিছিল করে হিন্দু দোকান ও ঘরবাড়িতে আগুন দেয়, পেটায় ও কয়েকজনকে খুন করে। ১৯৪৭ সাল এলো, যখন হরি সিং ছিলেন রাজা (শেষ ডোগরা রাজা)। তিনি ভারত ও পাকিস্তান কারুর সাথেই যেতে চান নি। কিন্তু ১৯৪৭ এর অক্টোবর মানে পাকিস্তার আর্মি ও টাইবাল লিডাররা কাশ্মীর আক্রমণ করে এবং শেষ মুহূর্তে ভারতীয় আর্মি গিয়ে হামলাকারীদের হটিয়ে দেয়, এই শর্তে যে কাশ্মীর ভারতের অংশ হবে।

এখানেই শেষ না। ১৯৪৮ সালে নেহরুর (যিনি আবার কাশ্মীরী পন্ডিত, এবং মাইগ্রেট করতে বাধ্য হওয়া পরিবারের ছেলে) সাথে শেখ আবদুল্লার প্যাক্ট হয় এবং কাশ্মীরে শান্তি স্থাপনের অঙ্গীকার আসে। কিন্তু আবদুল্লা শান্তির বদলে পন্ডিতদের ওপরে নতুন করে অত্যাচার চালান। ইন্টারেস্টিংলি, আবদুল্লার পরিবারও একদা পন্ডিত, অধুনা মুসলমান এবং হরি সিং এর রাইভ্যাল, মাস কনভার্শনের ফল। তো যাই হোক, এই সময় নতুন করে এক্সোডাস, কনভার্শন ইত্যাদি হয়। মানে কিনা প্যাটার্ন একই, যেই সিংহাসনে যাক, বেশিরভাগ সময় পন্ডিতেরা এবং কখনও তাদের সাথে মুসলমানেরাও অত্যাচারিত হয়েছে।

এবার রাষ্ট্র হিসেবে ভারত ও পাকিস্তানের ভূমিকা, আপাতত সংক্ষেপে, পরে বিস্তারিত আসবে। এবং সেইসঙ্গে ইয়াসিন মালিকের কথা। ১৯৮৬ সালেও ইয়াসিন মালিক সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ করছিলো ইউসুফ শাহের হয়ে। ভোটগণনা শুরু হওয়ার পর যখন ইউসুফ শাহ বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে, হঠাৎ করে গুলাম মহিউদ্দিন শাহকে জয়ী ঘোষণা করে দেওয়া হয়। ইউসুফ এবং ইয়াসিন গণনার রাতেই অ্যারেস্টেড হয়। ১৯৮৭ সাল অবধি জেলে থেকে,তারপর বেরিয়ে দুজনেই পিওকে চলে যায়, মিলিট্যান্ট ট্রেনিং নেয় এবং ফিরে এসে জেকেএলেফ তৈরী করে হিংসা শুরু করে। এটাও লিখে রাখা দরকার যে ইয়াসিন ও ইউসুফ কারুর বিরুদ্ধে কোন ফর্মাল অভিযোগ জমা পড়েনি, আদালতে পেশ করা হয়নি। এবং ইউসুফ শাহের বিরুদ্ধে যিনি দাঁড়িয়েছিলেন, সেই গুলাম মহিউদ্দীন শাহের দলের গুরুত্বপূর্ন সদস্যা ক্ষেমলতা ওয়াখলু পরিষ্কার বলছেন, যে জনমত প্রবলভাবে ইউসুফের দিকে এবং এলিট পরিচালিত এনসির বিরুদ্ধে ছিলো। ভোট ঠিকঠাক হলে যে ইউসুফই জিততেন তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

এই হলো ইয়াসিন মালিকের জঙ্গী হওয়ার প্ল্যাটফর্ম। এই প্রসঙ্গে সুমন্ত্র বোসের বইতে দেখছি, ব্যাপক রিগিং বুথ ক্যাপচারিং ইত্যাদি করে দিনের শেষে কংগ্রেস-ন্যাশনাল কনফারেন্স অ্যালায়েন্স সব সিট পায় এবং মন্ত্রীসভা বানায়।

এরপর আসছে ১৯৯০ সালের ইন্ডিয়ান আর্মির ম্যাসাকার, স্টেট নিযুক্ত গভর্নর জগমোহনের কীর্তি। ২৮-৫০ জন মারা যায়। এই বিষয়ে রাহুল বিপুল সংখ্যক মুসলমানের স্থানীয় মসজিদে জড়ো হওয়ার উল্লেখ করছেন, এবং সেটা একই সঙ্গে অ্যান্টি ইন্ডিয়া ও অ্যান্টি পন্ডিত জনসমারোহ বলা হচ্ছে, যা দাঙ্গার পূর্বাভাসও হতে আরে। এর সাথেই জেনে রাখতে হবে তৎকালীন মন্ত্রীসভার জগমোহনের নিয়োগে আপত্তি, রেজিগনেশন এবং রাষ্ট্রপতি শাসনের কথা।

সুতরাং দেখাই যাচ্ছে যে ১৯৯০ এর সেনা ভায়োলেন্সের আগেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ হিংসার ঘটনা ঘটে। বাশারাত পীর এবং রাহুল পন্ডিতার বইতে বেশ কিছু ঘটনার উল্লেখ আছে, এবং একই সঙ্গে এক আধটা অনুল্লেখিতও। এটা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে ভারত স্বাধীন হওয়ার অনেক আগে থেকেই কাশ্মীরে হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতি অদৃশ্য ছিলো। আশির দশকে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিয়ে হলে দাঙ্গা হয়েছে।

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে বলে নেওয়া দরকার। কাশ্মীর নিয়ে আলোচনায় জনমতের একটা ভূমিকা নিয়ে কথা হয়। হরি সিং এর কাছে কি কি অপশন ছিলো সেটা তো গুরুত্বপূর্ণ বটেই কিন্তু তার চেয়েও বড়ো কথা কাশ্মীরের জনমত কি চেয়েছিলো সেটা খুব গোলমেলে প্রশ্ন। জনমত অগ্রাহ্য করে হরি সিং কাশ্মীরকে ভারতের সাথে জুড়ে দেন- এটা বলা একেবারেই যায়না। আবার একই সঙ্গে এটাও বলা যায়না যে ভোট নিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভারতেই থাকতে চাইতেন। কারণ জনমত কাদের? মাস এক্সোডাসের ইতিহাস এত পুরোনো যে পঞ্জাব ইউপি সব জায়গা থেকে কাশ্মীরবাসী খুঁজে খুঁজে জনমত নিলে হয়ত খানিকটা সুবিচার করা হয়। তাছাড়া পাকিস্তানের এজেন্ডা অগ্রাহ্য করে কাশ্মীরের ইতিহাস পড়া যায়না, ভারতীয় আর্মির সমালোচনাও করা যায়না। দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অভাব কাশ্মীরের (এবং অন্যত্রও), এইটা স্বীকার করে নিয়ে, কেন সেই সম্প্রীতির অভাবটা তৈরী করা হলো, সেই রাজনৈতিক স্বার্থগুলো খতিয়ে দেখা দরকার।

এই ব্লগ লেখার সময়েও শ্রীনগরে জঙ্গীদের সাথে সেনা সংঘর্ষ চলছে ছয় সেনা নিহত। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভয়ের বাতাবরণ তৈরী করার, মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতা আটকানোর চেষ্টা চলছে সেইসব মৃত সৈনিকের লাশ দেখিয়ে। এগুলো আটকানো খুবই দরকার, কিন্তু আরেকটা ভুল ধারণা জনমানসে চারিয়ে দিয়ে সেটা আনতে গেলে ভয়ানক ভুল হবে। যে আন্তরিকতার সাথে আমরা স্বাধীনতার লড়াইয়ে শহীদ কাশ্মীরীদের পাশে দাঁড়াতে চাই, তাদের আন্দোলনকে বোঝার চেষ্টা করি, যে সৌভ্রাতৃত্ব থেকে তাদের জিহাদী মন্ত্রী মগজধোলাইকে জাস্টিফাই করি, সেই একই সৌভ্রাতৃত্ব সেনা জওয়ানদের বেলায় অদৃশ্য হলে অন্যায় হবে। যদি ব্রেনওয়াশিং সমালোচনার যোগ্য হয় তাহলে তা ভারত পাকিস্তান দুয়েরই প্রাপ্য। যদি কোন মৃতদেহ দেখে অকারণ মনে হয়, রাগ হয়, তাহলে তা কোন পক্ষের সেটা যেন বিচার্য্য না হয়।

শেষে, শুকনো তথ্য হিসেবে লিখে রাখিঃ শুধু ১৯৮৯ থেকে ২০০২ সালের মধ্যেই সরকারী মতে চল্লিশ হাজার (প্রো-ইন্ডিপেন্ডেন্স জনমত এর ঠিক দ্বিগুণ) মানুষ মারা গেছেন। এই মৃত্যুযজ্ঞের নানা স্তর, যা ব্যক্তিগত স্কোর সেটলিং থেকে শুরু করে হোম মিনিস্টারের মেয়েকে অপহরণ (১৯৮৯ ডিসেম্বর মুফতি মহম্মদ সঈদের মেয়ে রুবাইয়া মহম্মদকে অপহরণ করে পাঁচ জঙ্গীকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়, যার আফটারম্যাথ জগমোহন নিয়োগ ও আরো অস্থিরতা) সবই আছে।

আপাতত এই। এরপরেও অনেক কথা থাকবে, যেমন ভারতীয় সংবিধানের আর্টিকল ৩৭০ নিয়ে বিতর্ক, যা শেখ আবদুল্লার সময় থেকে বলবর্তী। বাংলাদেশের কথা, পাকিস্তানের মুক্তিযুদ্ধের আফটারম্যাথ এবং ভারত ও পাকিস্তান যে কাশ্মীরকে "ইনডিস্পেন্সেবল" মনে করে, সেই কুযুক্তির অসারতা। হয়ত এর পরের পর্ব লিখবো। কিন্তু দেশপ্রেম, দেশদ্রোহ, আজাদ কাশ্মীর এবং সিডিশনের মত ভারী ভারী কথাগুলোর আগে অন্তত এইগুলো মাথায় রাখলে আলোচনার সুবিধে হবে।


















----------------------------------
পর্ব-২

প্রথম পর্বে অল্প কথায় অনেকখানি সময়ের কথা লেখার একটাই উদ্দেশ্য ছিলো, যাতে একটা সংক্ষিপ্তসার তৈরী থাকে। কয়েকটা জায়গায় খটকা থেকে যায়।

প্রথমতঃ ডোগরা রাজত্বে মুসলমানদের অবস্থা কেমন ছিলো তা রাহুল পন্ডিতার বই থেকে তেমন জানা যায়না। আনপেইড লেবার হিসেবে তাদের খাটানো হতো, এর বেশি রাহুল কিছু বলেননি। অথচ, ভেবে দেখলে এই ডোগরা রাজত্বকালই একমাত্র সময় যখন মুসলমানরা অপ্রেসড, অন্য প্রায় সব সময় তাদের সঙ্গে পন্ডিতেরা একাধারে অত্যাচারিত হয়েছে। অন্য মাইনরিটির কথা তো বলা বাহুল্য। যাই হোক, সুমন্ত্র বোসের বইতে এই ব্যাপারে খানিকটা তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে দেখছি, ডোগরা রাজাদের আমলে মুসলমানদের একরকম ক্রীতদাসের জীবন যাপন করতে হতো। তারা প্রায় সবাই নিরক্ষর ছিলো, মনুষ্যেতর জীবের মত তাদের অবস্থা ছিলো, তাদের সামরিক শিক্ষায় অধিকার ছিলোনা, সেখানে একচেটিয়া প্রাধান্য ছিলো ডোগরা ও রাজপুতদের। মৌলিক অধিকার কি বস্তু সে সম্পর্কে নোংরা অস্বাস্থ্যকর ঘেটো করে থাকা ঐ মানুষগুলোর কোন ধারণাই ছিলোনা। ডোগরা রাজারা কোনরকম খবরের কাগজ যাতে আসতে না পারে সে সম্পর্কে যত্নবান ছিলেন। ১৯২৪ সাল অবধি সমস্ত জম্মু ও কাশ্মীরে কোন সংবাদপত্র বেরোয়নি। ফ্রি প্রেস এবং জনমত রাজ্যশাসনের পরিপন্থী বলে মনে করা হতো। ১৯২০ সাল অবধি গোহত্যা করলে প্রাণদন্ড আবশ্যিক ছিলো। এই সময়ের কিছু লেখাপত্র যা পাওয়া সব ব্রিটিশ প্রতিনিধি দলের। তাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিনের এক্সপ্লয়টেশনের ফলে ঐ মানুষগুলোর মেরুদন্ড বলে আর কিছু অবশিষ্ট ছিলোনা, তাই প্রতিবাদ ইত্যাদি হয় নি।

অবস্থা পাল্টাতে থাকে ১৯৩০ এর দশকে, যখন পাঞ্জাবে থাকা কিছু প্রবাসী কাশ্মীরী অল ইন্ডিয়া কাশ্মীর মুসলিম কনফারেন্স বলে একটা ফোরাম করে গরীব মেধাবী মুসলিম ছাত্রদের স্কলারশিপ দেওয়া শুরু করে। এতে করে একটা নতুন প্রজন্ম তৈরী হয়, যারা মূলত আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এদের মধ্যে প্রধান নাম শেখ আবদুল্লা। ১৯৩১ সালের ১৩ই জুলাই এই তরুণ নেতারা ডোগরা রাজাকে একটি ডেপুটেশন দেওয়ার চেষ্টা করলে দাঙ্গা বেধে যায়, রাজার সৈন্য প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলি চালায়, ফলে ২১ জন মারা যায়। এর ফল হয় সুদূরপ্রসারী। এতদ্ন ধরে মুখ বুঁজে অত্যাচার সয়ে চলা, গোরুছাগলের মত ব্যবহার পাওয়া জনতা ক্ষেপে ওঠে এবং সর্বব্যাপী আন্দোলন শুরু হয়। শেখ আবদুল্লার নেতৃত্বে জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম পলিটিকাল পার্টি তৈরী হয়, যা শুরু শুধু মুসলিমদের হলেও ক্রমশ সেকুলার হয়ে ওঠে, এবং পন্ডিত ও শিখদের অনেকে তাতে যোগ দেন। এর পরে অবশ্য শেখ আবদুল্লা নেহরুর দিকে টাল খাবেন, এবং এই পার্টিও ভেঙে দু টুকরো হবে। অন্যদিকে প্রায় এই সময় থেকেই প্রো-পাকিস্তান লবি জোরদার হবে। যারা মনে করবে ভারত-ছাড়ো আন্দোলন হিন্দু-রাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তাই তাতে যোগ দেওয়ার দরকার নেই। এই যে একবার জম্মু-কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ নড়েচড়ে উঠলো, আর তারা শান্ত হবেনা। প্রায় ছ দশক পরে আবার যখন JKLF তৈরী হবে তখনও এই প্যাটার্ন দেখতে পাওয়া যাবে। এবং এই জনজাগরণের "কৃতিত্ব" ডোগরা রাজারা ছাড়া আর কারুর না। উইকি এ এস চৌহান আর হেস্টিংস ডোনানের বই উদ্ধৃত করে বলছে ১৮৬৩ সালের একটি "অভিযানে" ডোগরা সেনাদল উপজাতি অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে নির্বিচারে হত্যালীলা চালায়। আহতদের পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো, সক্ষমদের ক্রীতদাস করে নিয়ে যাওয়া হয়।

লক্ষনীয়, পন্ডিতা উল্লিখিত মুসলিম কশাই দ্বারা রাজাকে আক্রমণের ঘটনা অন্যত্র নেই। সুমন্ত্র বোসের বইতে নেই, ডোগরা বিষয়ক পেজগুলিতেও নেই।










তিরিশের দশকে শেখ আবদুল্লার জনপ্রিয়তা ও প্রভাব দুইই ছিলো তুঙ্গে। শুরুতে যে All–Jammu and Kashmir Muslim
Conference (MC) দল তৈরী হয়েছিলো, পরে তা ভেঙে দুটি দল হয়, মুসলিম কনফারেন্স (এম সি) এবং ন্যাশনাল কনফারেন্স (এন সি)। পুরো তিরিশ এবং চল্লিশের দশক জুড়ে ধীরে ধীরে এই দুই দলের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়। এন সি যথার্থভাবেই সেকুলারিজম বজায় রাখে, নিজের মুসলিম সত্ত্বা বিসর্জন না দিয়েও। এইটা পরের দিকে উধাও হয়, এবং সেইসাথে সমর্থনও। ফলে শেখ আবদুল্লার নাতি ওমর যখন ২০০২ সালে দলের প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন, তখন এন সি অতীতের ছায়ামাত্র, এবং ওমরের অভিষেকে লোক ভাড় করে আনতে হচ্ছে। এই দলের সাথে জম্মু-কাশ্মীরের মানুষের কোন যোগ নেই, যা একসময় অবিচ্ছেদ্য ছিলো। এন সি তার কর্মসূচীতে প্রবলভাবে কাশ্মীরী ছিলো, উপত্যকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সমেত।

এম সি এবং এন সির মধ্যে যে আইডিওলজিকাল পার্থক্য, তা শেষ পর্যন্ত বজায় থাকবে। স্বাধীনতার সময় কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা তীব্র, তখন দুই দলের নেতারাই হয় জেলে বা এক্সাইলে। হরি সিং এর ভূমিকা নিয়ে এর আগে অল্প লিখেছিলাম। সুমন্ত্র বোসের বইতে দেখছি, হরি সিং এর ইচ্ছে ছিলো পাকিস্তানের সাথেই রফায় আসার, যেহেতু কংগ্রেস (পড়ুন নেহরু প্রমুখ নেতারা) ফিউডাল শাসনব্যবস্থার প্রতি খড়্গহস্ত ছিলেন। এই সময় দুটো ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত কর নিয়ে অত্যাচার করার ফলে পুঞ্চ সেক্টরে হরি সিং এর সেনা বনাম সাধারণ গ্রামবাসী, যারা আবার ব্রিটিশ সেনার হয়ে লড়ে ফেরা ট্রেইন্ড সেনানী, তাদের মধ্যে লড়াই বাধে। অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্তীর্ণ এলাকা রেবেলরা দখল করে, এদের মধ্যে অনেকেই আবার প্রো-পাকিস্তান ছিলো। এইসবের মধ্যেই স্বাধীনতা আসে, এবং সেই সঙ্গে রক্ত ঝরার দিন।

১৯৪৭ এর অগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে নাগাড়ে পাকিস্তান থেকে ইনফিলট্রেট করতে শুরু করে, পরিকল্পিতভাবে এক একটি অঞ্চলে হিন্দু ও শিখ মাইনরিটিদের মারা হয়। আক্রমণকারীরা বেশিরভাগ সীমান্তবর্তী এলাকার রেবেল, লুটপাট ধর্ষণ এইসবের আগ্রহে এসেছিলো, যদিও নেতৃত্ব দিচ্ছিলো পাকিস্তান সেনার চাঁইরা, প্ল্যানিং ও তাদের। দাঙ্গা শুরু হয় একইসঙ্গে, এবং একে একে অঞ্চল হাতছাড়া হতে শুরু করে। বারবার হরি সিং পাক নেতৃত্বকে (লিয়াকত খান এবং জিন্না) খবর দেন, কিন্তু শত চোখ রাঙানিতেও তাদের উত্তর একই থাকে। এক, তারা দাবি করে, এখনও যেমন করেন, ওদিক থেকে কেউ আসেনি। দুই, এটাও দাবি, এই হিংসা হরি সিং এর কুশাসনের ফল। এদিক ওদিক দুদিকই গেল দেখে হরি সিং ভারতের সাহায্য চান।

আমরা প্রায়শই ভাবি ও বলি, কাশ্মীরের জনমত পাকিস্তানের সঙ্গে ছিলো। একেবারে শুরুতে যাইই থাকুক, ১৯৪৭ সালের পাক আক্রমণের সময় জনমত এই ছিলো কিনা সন্দেহ। ভারতীয় সেনা যেখন কাশ্মীরে নামে, তখন বিপক্ষসেনা শ্রীনগরের কুড়ি মাইলের মধ্যেই এসে গেছে। এই সৈন্য ছিলো শিক্ষিত, যুদ্ধের ট্যাকটিক্স তাদের জানা ছিলো। সুতরাং এদের হটিয়ে দেওয়া, তাও জনমতের বিরুদ্ধে, সম্ভব হলো কিকরে? হলো, কারণ জনমত পাল্টাচ্ছিলো। ৭৭% মুসলিম পপুলেশন, এরকম জায়গা দিয়ে আসার সময় আক্রমণকারীরা যথেচ্ছ লুট ও ধর্ষণ করে। বারামুলা, হান্ডওয়াড়া এসব জায়গায় অবস্থা খুবই খারাপ ছিলো।



স্বাধীনতার কথা যখন এসেই পড়লো, তখন ভারত পাকিস্তানের কাশ্মীর নিয়ে দাবিগুলো একবার দেখে নেওয়া যাক। ভারত কাশ্মীরকে তার "ইন্টিগ্রাল পার্ট" হিসেবে দাবি করে, কারণ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সত্ত্বা একমাত্র মুসলিম মেজরিটি রাজ্য কাশ্মীরের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু জম্মু-কাশ্মীরের বাইরে অন্য রাজ্যগুলিতে ১৫০ মিলিয়ন মুসলিম নাগরিক নিয়েও ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য কাশ্মীর কেন আবশ্যিক সে প্রশ্নের কোন উত্তর নেই। অন্যদিকে, পাকিস্তানের কাশ্মীর না হলে চলবেইনা, কারন কাশ্মীর তার "জুগুলার ভেইন", তার জাতীয়তাবাদের স্তম্ভ। কিন্তু সেখানেও অনেক প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর নেই, যেমন কিনা মাল্টি-এথনিক অঞ্চলগুলোয় নিরপেক্ষ সরকার গঠনে ব্যর্থতা পাকিস্তানের জানা সমস্যা, যা ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে স্পষ্ট হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, যারা দু দেশের হয়ে গলা ফাটান, তারা এসব জেনেও কথাগুলো বলেন।

অন্যদিকে কাশ্মীরের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা শেখ আবদুল্লা সম্পর্কে পন্ডিতা এবং সুমন্ত্র বোস দুজনেই "অথরিটারিয়ান" বলে অভিযোগ করেছেন। আবদুল্লা যে গণতান্ত্রিক "নয়া কাশ্মীর" মেনিফেস্টো ১৯৪৪ সালে প্রকাশ করেছিলেন, তা কোনদিনই বাস্তবায়িত হয়নি। ৪৭ এর যুদ্ধে পিছু হঠা পাকিস্তান আবদুল্লাকে কংগ্রেসের এজেন্ট বলেছিলো, পরে আবার ১৯৬৪ সালে আবদুল্লা পাকিস্তান গেলে সেখানে প্রবল সংবর্ধনা পান।

তো, যেমন হয় রাজনৈতিক চাপান উতোর চলতে থাকে। ১৯৪৭ এর নভেম্বরে নেহরু বলেন কাশ্মীরের জনমত যা বলবে তাই হবে, তিনি "ফোর্স্ড ইউনিয়ন" চান না। রাষ্ট্রসংঘ হস্তক্ষেপ করে, তবু কিছু হয়না। ৪৮ এর শীত শেষে যখন যুদ্ধ চলছে, তার মধ্যেই ইউ এন একটা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনে। ঠিক হয়, এক গণভোটে জম্মু-কাশ্মীরের মানুষ ঠিক করবেন তাঁরা কোথায় থাকতে চান। তবে ভোটের আগে পাক আর্মিকে দখলীকৃত অঞ্চল ছেড়ে ফিরতে হবে। পাক আর্মি জায়গা ছাড়েনা। ফলে ভোটও হয়নি। মাঝখান থেকে প্রো-পাকিস্তান এবং আজাদ কাশ্মীরের সমর্থকরা বলত থাকেন ভারত শর্ত মানেনি। একইভাবে ভারতীয় রিজয়েন্ডার আসে, প্রথম শর্ত মানা না হলে ভোট হতে পারেনা, অতএব দায় পাকিস্তানের। অচলাবস্থা অটুট থাকে। একইসঙ্গে মানুষ মরতে থাকে, দুইদিকেই। ৪৯ পর্যন্ত রক্তক্ষয় করে যুদ্ধবিরতি আসে, মূলত দুপক্ষই যখন ক্লান্ত, এবং কেউ একচুলও এগোতে পারছেনা। কাশ্মীর ভাগ হয়, আজাদ কাশ্মীর যার অন্য নাম পাক অধীকৃত কাশ্মীর, এবং ইন্ডিয়ান জম্মু ও কাশ্মীর। ১৯৭২ নাগাদ এই সীমারই নাম হয় এল ও সি।





পর্ব -৩

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭২ এর এল ও সি নামকরণ এইসবের মধ্যেই কাশ্মীরে অনেক রদবদল হচ্ছিলো। মাঝের সময়টা, যা একাধারে শান্তিপূর্ণ ও ঝড়ের পূর্বলক্ষণ। এই সময়ের কাশ্মীরের যা রাজনীতি তাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সমীকরণ বদলাতে থাকে, কিন্তু সবথেকে বড়ো কথা, এতদিন পরে, এই সম্ভবত প্রথম, রক্তক্ষয় বন্ধ হয়। এমনকি ১৯৬৩ সালে যখন দুই বঙ্গে দাঙ্গায় রক্তবন্যা বইছে তখনও কাশ্মীর শান্ত থাকে, যদিও ধর্মীয় রেলিক চুরি যাওয়া নিয়ে দুপক্ষই উত্তেজিত ছিলো।

অবশ্য দাঙ্গা না হলেও এই উত্তেজনা সহজে প্রশমিত হয়না। শেখ আবদুল্লা মাঝের সময়টা জেলেই ছিলেন প্রধাণতঃ। তিনি ছাড়া পেলে এক বিশাল জনসামবেশ হয়, এবং সেখানে তিনি বলেন যে ভারত সরকার কাশ্মীরের পরিস্থিতি "সেটলড" বলে যে বিবৃতি দিয়েছে, তা তিনি মানেন না। এই সেই ১৯৬৪ সাল, এরপরই তিনি দিল্লি এসে নেহরুর সাথে (এর পরের মাসেই নেহরু মারা যাবেন), এবং পাকিস্তানে গিয়ে ইয়াকুব খান প্রমুখের সাথে কথা বলেন। এতে ভারত সরকার ঘাবড়ে যায়, এবং কাশ্মীর আবার নতুন করে অশান্ত হবে এর ফলে। কেন্দ্র সরকার অনেকগুলি দ্রুত বদল আনে। প্রথমেই ৩৫৬ ও ৩৫৭ ধারা জারি করে নির্বাচিত সরকারকে বাতিল করা হয়। বাকি রাজ্যগুলির সাথে কাশ্মীরকে সমপর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়, একইভাবে সেখানে মুখ্যমন্ত্রী ও গভর্নর নিয়োগ করে। এইভাবে হঠাৎ করে একদিন কাশ্মীর অন্য পাঁচটি রাজ্যের মত হয়ে পড়ে। এর ফল ১৯৮০ শেষের দিকে বোঝা যাবে। কিন্তু তার আগে আরো একটু।

১৯৬৪ ডিসেম্বর থেকে ১৯৬৫ র মার্চের মধ্যে আরো কিছু অভূতপূর্ব বদল আসে। প্রথমেই ন্যাশনাল কনফারেন্স (এন সি, যার কথা আগেও হয়েছে) কে কংগ্রেসের অংশ করে নেওয়া হয়। এর ফলে কাশ্মীরের নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পৃক্ত রাজনৈতিক আন্দোলন মুছে ফেলার চমৎকার বন্দোবস্ত হয়। এতে করে একরকম পরিষ্কার হয়ে যায় যে আর্টিকল ৩৭০ বা স্বায়ত্তশাসনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিলো সেসব কোনদিনও কার্যকরী হবেনা। মজার ব্যাপার হলো, লিবেরল সেকুলারিজমের জ্বলন্ত উদাহরণ বলে যাকে মনে করা হয়, সেই নেহরুই এই পথ তৈরী করে গিয়েছিলেন, যে পথে তাঁর উত্তরসূরীরা, আয়রনিকালি, "অখন্ড হিন্দু রাজ" প্রতিষ্ঠা করার দিকে এক পা এগিয়ে যায়। অনতিবিলম্বেই কাশ্মীরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, জোরদার ধরপাকড় হয়। আবারো গায়ের জোরে, রাষ্ট্রের মেশিনারি ব্যবহার করে প্রতিবাদ থামিয়ে দেওয়া হয়, বা অন্তত চেষ্টা করা হয়।

এর মধ্যে আবার '৬২ র চীন যু্দ্ধ হয়ে গিয়েছে। তাতে ভারত যারপরনাই ল্যাজেগোবরে হওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান আশান্বিত হয়েছিলো। তারা তখন থেকেই গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলো। '৬৪ সাল থেকে কাশ্মীরের পরিস্থিতি আবার গরম হয়ে যেতেই এবং সমস্ত প্রধান নেতাদের নানাছলে জেলে ভরে দিতেই পাকিস্তান থেকে একদল আবার ইনফিলট্রেট করে, এবং যুদ্ধ বাধে। পাকিস্তান সেনা ও কিছু যুদ্ধবাজ মিলে ভেবেছিলো একবার লাইন টপকে ঢুকে পড়লে কাশ্মীরীরাও যুদ্ধে যোগ দেবে। কিন্তু তা হয়না, ফলে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার, পাক আক্রমণ বিফল হয়। আবার সন্ধি ইত্যাদি। সুতরাং এটা পরিষ্কার, যতই বাশারাত পীরের মত অনেক মানুষ ভাবুন না কেন, যে পাকিস্তানই তাদের জায়গা, কাশ্মীরীরা তথাকথিত "দেশদ্রোহ", এমনকি অমানবিক ৩৫৬ ধারার পরেও করেনি। তখনো আন্দোলন শান্তিপূর্ণ, জঙ্গী কর্মসূচী নেই। যদিও এই পরিস্থিতি পাল্টাবে কয়েক বছরেই।
'৬৫ র যুদ্ধের পর লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট প্রেমনাথ বাজাজ (ইনি কাশ্মীরেরই, পন্ডিত) লেখেন, কাশ্মীর সমস্যার স্পষ্ট মূল্যায়ণের জন্য এটা মেনে নিতেই হবে যে কাশ্মীরবাসী মুসলমানেরা ভারতের প্রতি খুব একটা বন্ধুভাবাপন্ন নয়। তারা ভারতে থেকে একেবারেই খুশি নয়, এবং চিরতরে এর থেকে মুক্তি চায়, যদিও এর জন্য কোনরকম হিংসার পথ তারা নেয়নি এখনও।

এই হিংসার পথে যেতে আরো ২৫ বছরের রাষ্ট্রীয় গাঁটামো প্রয়োজন হবে। আরো ২৫ বছরের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, বধিরতা তাদের ঠেলে দেবে "দেশদ্রোহের" দিকে।

'৬৬ সাল মানে ইন্দিরা গান্ধির পিএম হিসেবে প্রথম ফেজ। এইসময় জয়প্রকাশ নারায়ন ইন্দিরাকে একটি চিঠিতে লেখেন,
"We
profess democracy, but rule by force in Kashmir. We profess secularism,
but let Hindu nationalism stampede us into establishing it
by repression. Kashmir has distorted India’s image in the world as
nothing else has done. The problem exists not because Pakistan
wants to grab Kashmir, but because there is deep and widespread
discontent among the people."

এর চেয়ে সহজ ভাষায়, স্পষ্ট কথায়, কাশ্মীর সমস্যার মূল্যায়ণ হয়না।

বাজাজ এই একই সময় আরো লেখেন, যে যদি ফ্রি ইলেকশন হয়, তাহলে হয়ত প্রো-পাকিস্তান পার্টি ক্ষমতায় আসবে, এবং আমাদের সেটা মেনে নেওয়া উচিত। কারণ কাশ্মীরবাসীর সেটা কন্সটিটিউশনাল রাইট। স্বাধীন ভারতবাসীর কাছে যা টেকেন ফর গ্রান্টেড, সেই অধিকারকেই তৎকালীন সরকার ভয় পেয়েছিলো, এবং এইটাই তারা সর্বশক্তি দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করে গেছে, যা ১৯৮৬ সালে ইউসুফ শাহ ও ইয়াসিন মালিকের গল্পে আমরা দেখেছি। এই একইভাবে, নির্বিচারে, একের পর এক প্রক্সি ভোটের প্রহসন হতে থাকে পুরো '৭০ এর দশক জুড়ে। শেখ আবদুল্লা যতদিন আর্টিকল ৩৭০ নিয়ে সোচ্চার থাকেন তাঁকে জেলেই থাকতে হয়, ততদিন, যতদিন না তিনি হার স্বীকার করে দিল্লির সাথে আপোসে আসবেন। মজার ব্যাপার হলো, খাতায় কলমে কাশ্মীর আর্টিকল ৩৭০ দ্বারাই শাসিত হচ্ছিলো, কিন্তু '৫৪ থেকে '৭৫ সালের মধ্যে আঠাশটি বিশেষ অর্ডার পাস করিয়ে নেওয়া হয়, যা কাশ্মীরকে ভারতের অঙ্গীভূত হতে সাহায্য করবে। এর সাথে ২৬২ টি ক্লজের ইউনিয়ন ল ও থাকে যা কাশ্মীরের খুঁটিনাটি সমস্ত ব্যাপারে কেন্দ্র সরকারের খবরদারি নিশ্চিত করবে।

সারা জীবন কঠোরভাবে আজাদ কাশ্মীরের জন্য লড়ে এসে সত্তর বছর বয়সে আবদুল্লা আর তাঁর সহকারী আফজাল বেগ দিল্লির বশ্যতা মেনে নিলেন, এর একটা কারণ যেমন বয়স, তেমনি অন্য কারণ '৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ, যা রিজিয়নাল ব্যালেন্স কে ভারতের পক্ষে এনে দিয়েছিলো। আবদুল্লার জনপ্রিয়তা পূর্বতন এন সিকে ঠান্ডা রেখেছিলো, যদিও কাশ্মীরের "জনতা" সম্পর্কে সেকথা বলা যায় কিনা সন্দেহ।

শেখ আবদুল্লা এর কিছুদিনের মধ্যেই নাটকীয়ভাবে জম্মু কাশ্মীরের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েন। '৭২ মের কাসিমের হাউস থেকে সরে দাঁড়িয়ে আবদুল্লাকে রাস্তা করে দেন। কংগ্রেস প্রমাদ গোনে এবং '৭৭ এ আবদুল্লার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে। ভোট হয়, এই প্রথম অবাধ ও নিরপেক্ষ, এবং এন সি জিতে যায়। '৫২ এবং '৭২ এর নির্বাচনে যা হয়নি। বস্তুত এই নির্বাচন রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের কাছে সবথেকে ভালো সুযোগ ছিলো কাশ্মীর সমস্যার অনেকটা প্রশমিত করার। কারণ সেখানকার মানুষ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তখনো পথ খুঁজছেন। শেখ আবদুল্লার ছেলে, উপমহাদেশের "ডেমোক্রাসি ও ডাইনাস্টি"র অপূর্ব যুগ্ম পরম্পরা অক্ষুন্ন রেখে দলের দায়িত্ব নেন, পরে মুখ্যমন্ত্রী হন। এবং এই সময় তিনি কাশ্মীরের অন্য রাজনৈতিক দলগুলির সাথে কথা বলতে শুরু করেন, যা ইন্দিরা একেবারেই পছন্দ করেন না। এর পরে '৮৩ র ভোট আসে, সেখানেও এন সি জেতে। এবং ইন্দিরা তুরুপের শেষ তাসটি বের করেন। এক অভূতপূর্ব নাটকে মন্ত্রীসভার নেতারা দলবদল করে নতুন দল বানান, ও কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে নতুন মন্ত্রীসভা করেন। জনগণ আবার (এই নিয়ে কতবার যে আমিই লিখলাম ভুলে গেছি) রাস্তায় নামে, কার্ফিউ জারি হয় এবং নবনির্বাচিত সরকারের প্রধান জি এম শাহ (শেখ আবদুল্লার জামাই, একদা জেনেরাল সেক্রেটারি, অ্যাম্বিশানে ভর করে মুখ্যমন্ত্রী) "কার্ফিউ চিফ মিনিস্টার" খেতাব অর্জন করেন। কুলোকে বলে সবটাই ইন্দিরা গান্ধি ও তার সহচর গভর্নর জগমোহনের পরিকল্পনা। কুলোকে বলে এই একই জিনিস '৫২ সালে নেহরুও করেছিলেন, শুধু অন্যদিকে ফারুক আবদুল্লার বাবা ছিলেন।

এর মধ্যেই ১৯৭৭ সাল কখন এসে চলে গেছে। জন্মেছেন বাশারাত পীর, "কার্ফিউড নাইট্স" এর লেখক। জন্মেছি আমিও, একই বছরে। আরো অনেকেই ভারতের নানা শহর ও গ্রামে। কিন্তু আমাদের শৈশবগুলো এতই আলাদা আমরা জানিনা। যারা দক্ষিণ কলকাতার প্রান্তবাসী, যারা বরানগরে জন্মেছে এই সময়, তারা খানিকটা, অল্প খানিকটাই, বাশারাতের কথা বুঝতে পারবে। যেখানে বাশারাতের বাবা বাড়ি না ফিরলে ফোন করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে গোটা অঞ্চলে ফোনের লাইন নেই। একদিন একটা গোটা, দীর্ঘ রাত অপেক্ষা করে, ভেঙে পড়ো পড়ো পরিবার তার প্রিয় মানুষটির খবর পাবে। এইগুলো।

তবে রাহুল যেখানে লিখছেন ভারতীয় ক্রিকেট দল মাঠে নামলে গোটা কাশ্মীর দুয়ো দিয়ে অস্থির, বা ইন্দিরা তাঁর প্রথম কাশ্মীর সফরে এলে প্রথম সারিতে বসে থাকা কাশ্মীরীরা তাঁকে যৌনাঙ্গ দেখাচ্ছে - এইগুলো আমরা বুঝবোনা। এইগুলো বোঝার জন্য হয়ত পাঁচ দশ বছরের অত্যাচারের ইতিহাস যথেষ্ট নয়।
পর্ব -৪
-----------------------------------------
আরো এগোবার আগে এক ঝলক চীনের ভূমিকা দেখে নি। চীনের সাথে ভারতের সীমান্ত সংক্রান্ত সমস্যা অনেকদিনের, সেই ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু। সেই ১৮৬৫ সালে জনসন ব্রিটিশ সরকারের হয়ে সার্ভে করলেন, সম্পূর্ণ ভুল সার্ভে। সেটা ধরা পড়ায় তাঁর চাকরি গেল। এরপর আরো ভালো করে সার্ভে হলো এবং ব্রিটিশ ভারতে দেখা গেল দুরকম সীমান্ত দেখা যাচ্ছে আলাদা সময়ের ম্যাপে। একটা বিস্তীর্ণ সময় ধরে ভারত বা চীনের একেবারেই মাথাব্যথা ছিলোনা ঐ অঞ্চল নিয়ে। কোন ডিমার্কেশন ছিলোনা খালি দুদেশের সরকার দুরকম ম্যাপ জানতো। সীমান্তবর্তী অঞ্চল শিংজিয়াং প্রদেশে প্রথমে রেবেলদের আধিপত্য ছিলো । এইভাবে ১৯৫০ অবধি চুপচাপই ছিলো সব। এই সময় নেহরুর সাথে চীনের সম্পর্ক বেশ ভালো, হিন্দি-চিনি ভাই ভাই ইত্যাদি। পঞ্চাশের দশকেই চীন বনিয়ে ফেলে শিংজিয়াং থেকে পশ্চিম তিব্বত পর্যন্ত ১২০০ কিলোমিটারের রাস্তা, যা বর্তমান ডিসপিউটেড আকসাই চীন দিয়ে যায়, যদিও ১৯৫৭ সাল অবধি ভারত জানতোই না এই রাস্তার কথা। ১৯৫৯ সালে তিব্বতের স্বরাজ আন্দোলন ব্যর্থ হলে দলাই লামা ভারতে আশ্রয় চান এবং নেহরু রাজি হন। এতে চীনের সাথে ভারতের সম্পর্ক খারাপ হয়, কারণ তারা ভাবে ভারত তিব্বত নিতে চায়। ক্রমশই দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক আরো খারাপ হবে এরপর, এবং ম্যাকডোনাল্ড ও ম্যাকমোহন লাইন, যা যথাক্রমে পশ্চিম ও পূর্ব সীমান্ত নির্দেশ করে ভারত ও চীনের, সেগুলো নিয়ে দ্বিমত তৈরী হবে। ১৯৬২ সালে আলাপ আলোচনায় ভরসা রাখতে না পেরে চীন ভারত আক্রমণ করবে, এবং বেশ কিছুট অঙ্শ, যা তারা তাদের এলাকা বলে ম্যাপে দেখিয়ে আসছে, সেগুলো সহজেই দখল করে নেবে। অকসাই চীন নিয়ে পিপলস রিপাবলিক অফ চায়নার প্রধান আগ্রহ হলো তা তিব্বতএর কাছে, এবং শিংজিয়াং প্রদেশেরও কাছে, যা তাদের অতীতে বিদ্রোহ ইত্যাদির মাধ্যমে জ্বালিয়েছে। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধে সুবিধে না করতে পারায় পাকিস্তানেরও কাশ্মীর নিয়ে কিছু উচ্চাশা ছিলো। ফলে ১৯৬৩ সালে চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমা সংক্রান্ত প্যাক্ট হয় গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলের ভাগ নিয়ে, যা ভারত স্বীকার করেনা।

সে যাই হোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আশির দশকে কাশ্মীরে কি হলো দেখা যাক। এই সময়টা আমার মতে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। সত্তর আশির দশক থেকেই শিখদের খালিস্তানি আন্দোলন চলছিলো। এইযে অনেকদিন ধরে কাশ্মীরকে জোর করে ধরে রাখার পক্ষে যাঁরা, তাঁরা বলেন আজ কাশ্মীরকে ছেড়ে দিলে কাল পঞ্জাবও আলাদা হতে চাইবে, এইটা মোটের ওপর এই খালিস্তানি আন্দোলনের অবদান। কিন্তু তা শুরু সেরকম উল্লেখযোগ্য কিছু প্রভাব ফেলছিলো বলে মনে হয়না। ১৯৭৭ সালে অকালি দল প্রমুখের কোয়ালিশন উত্তর ভারতে পাঞ্জাবে ক্ষমতায় আসে। শিখ ভোটব্যাঙ্ক হাতানো এবং অকালি দলকে দুর্বল করার জন্য এইসময় ইন্দিরা গান্ধী জার্নেল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে বলে একজন কট্টর ধর্মীয় নেতাকে তোল্লাই দেন। অনতিবিলম্বেই ভিন্দ্রানওয়ালের দল দমদমি তকসাল, সন্ত নিরংকরি মিশন বলে আরো একদল ধর্মীয়/রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে ভায়োলেন্সে জড়ায়, ভিন্দ্রানওয়ালের নাম জগত নারাইনের খুনের মামলায় জড়িয়ে পড়ায় তিনি গ্রেপ্তার হন ও কংগ্রেস থেকে সরে যান ও ১৯৮২ সালে শিখদের স্বরাজের দাবিতে সোচ্চার হতে থাকেন। ভিন্দ্রানওয়ালের অনুগত একদল, এবং আরো অন্য কিছু কট্টর শিখ মিলে এর মধ্যে জঙ্গী আন্দোলনের রাস্তা নেয় ও স্বর্ণমন্দির অকুপাই করে। নেগোশিয়েট করতে পেরে ইন্দিরা গান্ধি আর্মি ডাকেন, আর্মি আসে এবং দুপক্ষের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর মন্দির প্রাঙ্গন জঙ্গীশূন্য হয় (এরই নাম অপারেশন ব্লু স্টার )। এর প্রতিশোধে ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধি নিজের দুজন শিখ দেহরক্ষীর হাতেই খুন হয়ে যান। অনতিবিলম্বে "দেশপ্রেমিক" ভারতবাসী শিখদের মারতে শুরু করে। ২৮০০ মতন শিখকে মারা হয়েছিলো সারা দেশে, এর মধ্যে ২১০০ শুধু দিল্লিতেই। কলকাতায় কার্ফিউ জারি হয়েছিলো, রাশবিহারী থেকে ভবানীপুর অঞ্চলে বহুদিন ধরে যেসব শিখ পরিবার বাস করতেন তাদের অনেক সেইসময় কলকাতা ছাড়েন।

১৯৮৪ র শিখ জেনোসাইড সম্পর্কে ইন্দিরার সুযোগ্য পুত্র রাজীব গান্ধি বলেন, " বড়ো গাছ পড়লে মাটি ওরকম কাঁপেই"।

আশির মাঝখান থেকে কাশ্মীরের রাজনীতিতেই বদলের হাওয়া বইতে শুরু করে। এইখান থেকে আমায় খুবই সাবধানে লিখতে হবে। বাশারাত পীর এবং রাহুল পন্ডিতা দুজনের বইই খুব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত লেখা, তাতে অনেক সময় রঙটা বেশ চড়া। '৮০ থেকে '৯০ অবধি জম্মু ও কাশ্মীরে যা যা হচ্ছিলো, সেগুলোর বিপরীত দুটো দৃষ্টিকোণ পাওয়া যায় যেমন এর থেকে, তেমনি আবার তথ্যের গরমিল চোখে পড়ে। মোটের ওপর রাহুল লিখছেন যখন এই সময়ের কথা, তখন দেখছি সময়টা মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ। হিন্দু মুসলমাল পাশাপাশি থাকছে, স্কুলে পড়ছে, ক্রিকেট খেলছে। এইটা একটা ছবি। আবার সেই দুই সম্প্রদায়ই, পাশাপাশি থাকতে গিয়ে ঠারেঠোরে টিজ করছে (যেমন পন্ডিতার মুসলমান দুধওয়ালা রোজ এসে বলছে আর কতদিন এইসব বাড়ি ফেলে তো পালাতে হবে), স্কুলে পড়ার সময় ধর্মীয় বিদ্বেষ সরিয়ে রাখছে যে সব সময় তা নয় (কৈশোরে পন্ডিতার ক্লাসমেটরা সরস্বতীর ছবি লুকিয়ে ছিঁড়ে ফেলে), ক্রিকেট খেলার সময় মেজরিটি পাকিস্তানকে এবং অল্প কজন ভারতকে সমর্থন করছে এবং সেই নিয়ে চাপা উত্তেজনা তৈরী হচ্ছে। দুজনের বইতেই ক্রিকেট জিঙ্গৈজম নিয়ে একই কথা আছে। এই ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্টের কোন কারণ দেখানো হয়নি বাশারতের বইতে। রাহুলের বইতেও অভিজ্ঞতা হিসেবে বলা আছে সেসব, কেন এই সেন্টিমেন্ট সে নিয়ে কোন কথা নেই। কিন্তু পাবলিক সেন্টিমেন্ট যাই হোক, সশস্ত্র আন্দোলনের কথা কেউ ভাবছেনা, বরং ১৯৮৭ সালের ভোটে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ অংশ নেওয়া দেখে বোঝা যায় অবস্থা শুধরোবার আশা ছিলো। কিন্তু '৮৭ র নির্বাচনে কি প্রহসন হয় সে আমরা আগেই দেখেছি।

আশফাক মজিদ ওয়ানির জন্ম ১৯৬৭ সালে শ্রীনগরে। শহরে সেরা স্কুলে পড়া, সম্পন্ন বাড়ির ছেলে আশফাক আরো হাজার হাজার ছেলের মত '৮৭ র নির্বাচনে মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্টের ভলান্টিয়ার ছিলো। ইয়াসিন মালিকের মতই সেও গ্রেপ্তার হয় ২৩শে মার্চের ক্র্যাকডাউনে। এবং তার সাথে আরো বহু ভলান্টিয়ার। ন মাস জেলে থাকে সে, এর মধ্যে তার বিরুদ্ধে মামুলি একটা অভিযোগ আনে পুলিশ, সেই অভিযোগে ঘটনার তারিখ ৪ এপ্রিল, অর্থাৎ যখন সে জেলে। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আশফাক বাড়ি ফেরেনি আর। তার নাম আবার শোনা যায় ১৯৮৯ সালে, জানা যায় হামিদ শেখ, ইয়াসিন মালিক, জাভেদ মীর আর আশফাক নবগঠিত জে কে এল এফ এর কোর সদস্য, যারা এল ও সি পেরিয়ে মিলিট্যান্ট ট্রেনিং এবং অস্ত্র নিয়ে ফিরেছে।
আশফাক অচিরেই মোস্ট ওয়ান্টেড হয়ে ওঠে, এবং ১৯৯০ সালে, তেইশ বছর বয়সে এনকাউন্টারে মারা যায়। তার শবযাত্রায় কাশ্মীরের মানুষ কার্ফিউ উপেক্ষা করে জড়ো হয় (প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান, ১৯৮২ তে শেখ আবদুল্লার শেষযাত্রাতেও এত লোক হয়নি), শহীদের মর্যাদায় তাকে কবর দেওয়া হয়। তার দুপাশেই এনকাউন্টারে হত আরেক সাথী হামিদ শেখ আর ১৯৮৪ সালে ফাঁসিতে ঝোলানো মকবুল বাটের কবর, যদিও মকবুলের কবরটি খালি, গোলমালের আশঙ্কায় তার দেহ ফেরত দেয়নি প্রশাসন। জে কে এল এফের শুরুর দিকের অপারেশনে ১৯৮৯র অপহরণ উল্লেখযোগ্য। ছজন জে কে এল এফ সঙ্গীকে ছাড়িয়ে নিতে যখন মুফতি মহম্মদ সঈদের মেয়ে রুবাইয়াকে অপহরণ করা হয়। কাকতালীয়ভাবে রুবাইয়ার বয়সও তখন তেইশ। পাঁচজন জে কে এল এফ কমান্ডারকে ছেড়ে দেবে সরকার, রুবাইয়া মুক্তি পাবে, আর কাশ্মীরে ইনসার্জেন্সির "স্বর্ণযুগ" শুরু হবে। এই সময় এক লাখ পন্ডিত ভিটেমাটি ছেড়ে চলে আসবেন। এই বিষয়ে রাহুলের বইতে দেখছি বেনজির ভুট্টোর উস্কানিমূলক বক্তৃতা, আই এস আই এবং প্রো পাকিস্তান মুসলিমদের যে ছবি আঁকা হয়েছে তা খুবই ভয়ানক, এবং পরিকল্পিতভবে হিন্দু পন্ডিতদের এলাকা ছাড়া করার জন্য ভয় দেখানো হচ্ছে মসজিদ থেকে জিহাদের ডাক দিয়ে। অন্য দিকে প্রো পাকিস্তান/প্রো-আজাদি শিবিরের বক্তব্য ভারত সরকার কৌশলে পন্ডিত খেদাও করিয়েছিলো নানাভাবে কমিউনাল সেন্টিমেন্টে হাওয়া দিয়ে, যাতে আজাদ কাশ্মীরের আন্দোলনকে সাম্প্রদায়িক রঙে আঁকা যায় এবং মুসলিম বিদ্বেষী গভর্নর জগমোহন এর কারিগর। প্রসঙ্গতঃ জগমোহনের জন্ম পাকিস্তানে, দাঙ্গার সময় ট্রমাটিক কৈশোর নিয়ে তার ভারতে আসা। জগমোহনের গভর্নর হিসেবে ভূমিকাকে সুমন্ত্র বোস বলছেন "মার্কি, ইফ নট নেফারিয়াস", সুতরাং বাশারাত পীরের কথা একেবারে মিথ্যে নাও হতে পারে।

১৯৯০ সালের পন্ডিত এক্সোডাস সম্ভবত দুয়েরই মিলিত ফল। একদিকে প্রো ইন্ডিপেন্ডেন্স মিছিল চলছিলো, তাতে ধর্মীয় স্লোগান দেওয়া হচ্ছিলো, অন্যদিকে কৌশলে কনফিউশন তৈরী করা হচ্ছিলো, নন-মুসলিম, অ-কাশ্মীরী প্যারামিলিটারি ফোর্সের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছিলো পুরো কাশ্মীর।










সত্যের বহু রূপ। আজ যখন জে এন ইউ কান্ডে দেশ উত্তাল এবং মিডিয়ার ফেব্রিকেটেড খবর বিক্রি করার অভ্যাস জানা যাচ্ছে, তখন খতিয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়, ঠিক কী হয়েছিলো ১৯৯০ সালে। কিছু কিছু খবর তো আমরা জানি। একলাখ পন্ডিতের ঘরছাড়া হওয়ার কথা আমরা "জানি"। ভায়োলেন্সে পন্ডিতদের মৃত্যুও জানি। কিন্তু জে কে এল এফ পন্ডিতদের মারছিলো কি শুধু? না, তথ্য বলছে তাদের টার্গেট ছিলো প্রশাসনে জড়িতে, ধর্ম নির্বিশেষে আমলারা। তাদের মূল অপরাধ, হয় স্পাইং বা কোনভাবে জে কে এল এফ বিরোধী কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ। আরো জানা যাচ্ছে, ১৯৮৯ সালের প্রথম ছমাসে জে কে এল এফ এর হাতে মৃত মোট লোকের মধ্যে ৭৫% মুসলিম, বাকি এলিট পন্ডিত পরিবার। তাহলে এথনিক ক্লিনসিং এর গল্পটা কিন্তু মেলেনা।

এর আগে লিখেছি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অভাবের কথা। আবার সেটা যে একেবারে উধাও হয়ে যায়নি তারও প্রমাণ আছে। হিন্দুদের মাস এক্সোডাস নিয়ে স্বাধীন তদন্ত করা হয় কয়েকটা। একজন তো সুমন্ত্র বোস নিজেই, তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে কথা বলেন। অন্য আরেকটি কাজ করা হয় এক সংবাদপত্রের থেকে। এতে দেখা যায় পন্ডিতদের একটা অংশ মনে করে ধর্মীয় সন্ত্রাস হয়েছে। আবার অন্য অংশ মনে করে প্রো পাকিস্তানের কিছু ফ্রিঞ্জ এলিমেন্ট এই সন্ত্রাস করেছে, কাশ্মীরের সাধারণ মুসলিম একেবারেই দাঙ্গাবাজ নয়। শুধু তাই না, এইসব বিবরণ থেকে পাওয়া যাচ্ছে আরো অনেক মানবিক ছবিও, যেমন কিনা মুসলিমরা দাঙ্গাবাজ এবং মিলিটারির কাছ থেকে লুকিয়ে রাখছে হিন্দু পরিবারকে, বা যারা শুরুতে পালিয়ে গিয়েও পরে ফিরে আসছেন, সেইসব পন্ডিত পরিবারকে সাদরে বরন করছে পড়শি মুসলিমরা সেই সব। এইসব হিন্দু পরিবার প্রচন্ডভাবে আজাদ কাশ্মীরের সমর্থক, অ্যান্টি পাকিস্তান, এবং ভারতীয় আর্মি এদের কাছে শয়তানের মত। ১৯৯০ সালের ২১-২৩ জানুয়ারির মধ্যে শ তিনেক নিরস্ত্র মিছিলকারীকে গুলি করে মেরে দেয় প্যারামিলিটারি। এই সময়েই আজাদ কাশ্মীরের দাবিতে উত্তাল হয় পুরো রাজ্য, ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ ভারতবিরোধী হতে শুরু করে। জে কে এল এফ অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, কিন্তু এর চার বছরের মধ্যেই তাদের সাথে প্রো পাকিস্তান দলগুলির অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হবে, ফলে নিজের্দের মধ্যেই লড়াই করে তারা দুর্বল হবে। আর একই বছরের মাঝামাঝি এসে যাবে ভারত সরকারের দেশদ্রোহ নিবারক টনিক, যার অন্য নাম Armed Forces Special Powers Act, সংক্ষেপে আফস্পা।



পর্ব -৫
--------------------------
আফস্পা নিয়ে অনেক কথা বলার আছে। কিন্তু তার আগে ছোট করে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছুঁয়ে যাই। কাশ্মীর প্রসঙ্গে ইয়াসিন মালিক বা ইউসুফ শাহ কিংবা আশফাক ওয়ানির নাম পরিচিত। কিন্তু ততটা পরিচিত নয় নাদিম খাতিবের নাম। কিন্তু নাদিমের গল্পে লুকিয়ে আছে কাশ্মীর অস্থিরতার এক গুরুত্বপূর্ণ আদর্শগত পট পরিবর্তন।

নাদিম খাতিব ছিলো আশফাকের অভিন্নহৃদয় বন্ধু, একসাথে বেড়ে ওঠা, এক শহরে। নাদিমও সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত পরিবারের ছেলে, এবং তার পরিবার অর্থনৈতিকভাবে একেবারেই আশফাকের মত। কিন্তু আশফাকের রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ নাদিমের মধ্যে কোনদিনই দেখা যায়নি। '৯০-৯২, যখন আশফাকের তৈরী জে কে এল এফ প্রো ইন্ডিপেন্ডেন্সের জন্য লড়ছে, তখন নাদিম দিল্লির ফ্লাইং স্কুলে ভর্তি হয়। ছোট থেকেই তার ইচ্ছে ছিলো সে পাইলট হবে, এবং তাইই সে হয়। আমেরিকা গিয়ে লাইসেন্স নেয় এবং ১৯৯৪ সাল অবধি সেখানেই কাজ করে দু বছরের জন্য বাড়ি ফেরে। আমেরিকা ফিরে যাওয়ার পরের দুবছর সে নিয়মিত তার বাড়িতে ফোন করতো, তারপর একসময় ফোন করা বন্ধ হয়। কিন্তু ১৯৯৯ সালে জম্মুতে পাকিস্তানে উদ্ভূত জঙ্গী সংগঠন আল-বদরের একদল গেরিলার সাথে ভারতীয় সেনার লড়াই হয়, এবং সেখানে নাদিমের মৃতদেহ মেলে। জানা যায় দ্বিতীয়বার আমেরিকা যাওয়ার কদিনের মধ্যেই সে পাকিস্তানে যায়, দীর্ঘদিন ট্রেনিং নেয়, এবং এল ও সি পেরিয়ে কাশ্মীরে ঢোকে। মৃত্যুর পর তার লেখা দুশো চিঠি তার বাড়িতে আসে, যেখানে সে দাবি করেছে আমেরিকা মুসলিম দেশগুলির ওপর যে অত্যাচার চালায়, তার প্রতিকার হওয়া দরকার, এবং "আল্লাহ"র সেই কাজে সে যোগ দিচ্ছে।

আশফাক আর নাদিমের জীবন ও মৃত্যু আমরা যদি খতিয়ে দেখি, তাহলে বুঝবো কাশ্মীরে আন্দোলনের রূপরেখা কিভাবে পাল্টেছে। দুজনের মৃত্যুর মধ্যে প্রায় এক যুগের তফাৎ, আক্ষরিক এবং আদর্শগত, দুই অর্থেই। আশফাক মারা যায় জে কে এল এফের সবথেকে ঘটনাবহুল সময়ে, ফ্রন্টলাইন নেতা ও যোদ্ধা হিসেবে। সেই সময় শ্রীনগর ছিলো আন্দোলনের কেন্দ্র। জে কে এল এফ ছিলো কাশ্মীরের নিজস্ব মানুষদের দল, তা সে যতই তারা অস্ত্র শিক্ষা নিতে পাকিস্তানে যাক না কেন, তাদের শিকড় ছিলো কাশ্মীরের মাটিতে। যে ইসলামিক ঐতিহ্য কাশ্মীরের নিজস্ব, যাতে বহু বছরের সুফিজম, পরধর্ম সহিষ্ণুতা মিশেছে পাশাপাশি থাকার ফলে, সেই কাশ্মীরী ইসলাম ছিলো তাদের ধর্ম, ভারত এবং পাকিস্তানের থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন কাশ্মীর তৈরী করার স্বপ্ন, তা সে যতই আবেগসর্বস্ব হোক সেই স্বপ্নই তাদের জঙ্গী বানিয়েছিলো। এইগুলো শুধু মন ভালো করা কল্পনা নয়, রুবাইয়া সঈদের অপহরণ মামলায় ভারতের পদক্ষেপ নিয়ে পরবর্তীকালে ভি পি সিং সরকার, বিরোধীরা, এবং আন্তর্জাতিক মহল বলে যে তড়িঘড়ি জঙ্গীদের দাবি না মেনে নিলেই ভালো হতো। কারণ কাশ্মীরের ভূমিপুত্ররা কাশ্মীরেরই রুবাইয়ার কোন ক্ষতি করবে, এমন সম্ভাবনা কম ছিলো।

অন্যদিকে নাদিমের মৃত্যুর সময়টা একেবারে অন্যরকম। শ্রীনগরে জে কে এল এফ নিশ্চিহ্নপ্রায়, এবং প্রো ইন্ডিপেন্ডেন্স লড়াই তখন চলছে প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে, যেখানে শুধুই মুসলিম জনগোষ্ঠীর বাস। নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকেই প্রো পাকিস্তান অজস্র ছোট ছোট দল তৈরী হয়েছে পাকিস্তান বা পিওকে তে, তারাই তখন ইনসার্জেন্সি চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের দলে পাকিস্তানি যোদ্ধা আছে, নেতৃত্ব দিচ্ছে কট্টর ফান্ডামেন্টালিজমে দীক্ষিত, পাকিস্তানের মাদ্রাসার পাঠক্রমে শিক্ষিত জিহাদী। তাদের লক্ষ, একবগ্গা, মাইনরিটি শুন্য ইসলামিক কাশ্মীর। তাদের হাই কমান্ডে লস্কর ই তৈবার হাফিজ সঈদ বা জৈশ ই মহম্মদের মাসুদ আজহার। জে কে এল এফ তৈরীর পর এক যুগ কেটে গেছে। কাশ্মীরের আজাদির আন্দোলন, এখন পাকিস্তানের উচ্চাকাঙ্খার পরীক্ষাগার।

আশফাকের মৃত্যু, পথে লোকের ঢল নামিয়েছিলো, কাশ্মীরের বিশাল সংখ্যক মানুষকে স্বাধীনতা আন্দোলনে টেনে এনেছিলো। নায়কের মর্যাদা তার। অন্যদিকে নাদিমের কবর উধমপুর জেলার এক দুর্গম পাহাড়ের ঢালে আরো অসংখ্য নাম না জানা জঙ্গীর কবরের থেকে আলাদা করা যায়না। তার জীবন এবং মৃত্যু একইরকম আদর্শহীন অপচয় বলে স্পষ্ট আমরা বুঝতে পারি।
বস্তুত, ১৯৯৫ থেকে ২০০২ অবধি কাশ্মীর ইনসার্জেন্সির তিনটি পর্যায়। ১৯৯০-১৯৯৫ সালকে সুমন্ত্র বলছেন উত্থানের সময়। '৯৬-'৯৮ তে জে কে এল এফ দুর্বল হয়ে পড়ে, মূলত প্রো পাকিস্তান নতুন নতুন গেরিলা সংগঠনের সাথে অন্তর্দ্বন্দ্বে। তারপর পুরো আন্দোলনই হাইজ্যাক হয়ে যায় প্রো পাকিস্তান, কট্টর ইসলামিক, পাকিস্তান ও ঘুরপথে সৌদীপুষ্ট জিহাদীদের দ্বারা। এই শেষ পর্যায়ে, ১৯৯৯-২০০২ কে বলা হয় ফিদায়েঁ ফেজ, যখন কোণঠাসা গেরিলারা সুইসাইড স্কোয়াডের মাধ্যমে নতুন করে অস্থিরতা কায়েম করে। ইতিমধ্যে '৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধ হয়ে গেছে, যার অন্যতম আর্কিটেক্ট পারভেজ মুশারফ অচিরেই প্রেসিডেন্ট হবেন। ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলবে, সেইসঙ্গে মাঝে মাঝেই পাকিস্তানের জঙ্গী ইনফিলট্রেশন। ২০০১ এর অক্টোবরে কাশ্মীর অ্যাসেম্বলিতে আর ডিসেম্বরে পার্লামেন্টে হামলা হবে। কাশ্মীরে ইনফিলট্রেশন কমবে, খোদ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মুশারফের ওপরই হামলার চেষ্টা হলে। কিন্তু এর মধ্যেই এসে যাবে ২০০৮, অর্থাৎ মুম্বই আক্রমণ, যা প্রশ্নাতীতভাবে লস্করের কাজ।
মজার ব্যাপার হলো, বহুদিন ধরে পাকিস্তানের বক্তব্য, জঙ্গী কর্মসূচীতে তাদের হাত নেই, সীমা পেরিয়ে কেউ আসেনা, এমনকি কয়েক বছর আগে কাশ্মীরের যারা হিংসা আশ্রয় করেছে তারা জঙ্গী এই স্টেটমেন্ট দেন, এবং তার ফলে তাঁর কুশপুতুল পোড়ে - কাশ্মীরেই (এর মধ্যেই চুপি চুপি কার্গিল যুদ্ধে শহীদ দুই পাক সেনাকে নিশান-এ-হায়দার দেওয়া হয়, আরো কিছু মেডেল জোটে অন্য সেনাদের)। এক একবার শান্তির কথা শুরু হয়, যা আমাদের রাষ্ট্রনেতাদের "মন কি বাত", আর এইসব সরকারী স্টেটমেন্ট পাওয়া যায়। কিন্তু লোক মরতে থাকে। ভারতের সেনা, প্যারামিলিটারি, কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ। ১৯৮৯-২০০২ সালের মধ্যে সরকারী মতে চল্লিশ হাজার আর প্রো-পাকিস্তান/প্রো-ইন্ডিপেন্ডেন্স শিবিরের মতে আশি হাজার লোক মারা যায়।

এক একটা যুদ্ধ হয়, লোক মরে, আর রাস্ট্র ক্ষমতার হাতবদল হয়, কখনো ক্ষমতার হাত শক্ত হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান নাস্তানাবুদ হওয়ায় ইন্দিরা বিপুল ভোট পান। কার্গিল যুদ্ধের পর বাজপেয়ী তৃতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন। মুম্বই আক্রমণের পর পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক দাবা খেলায় জেতার জন্য রাহুল গান্ধী পার্লামেন্ট ডিবেটে নিজ দলের পিঠ চাপড়ান। ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেন, কাশ্মীরে অবস্থা খুবই সন্তোষজনক, সেখানে সদ্য সমাপ্ত ভোটে রেকর্ড টার্ন-আউট হয়।

কিন্তু আফস্পার সময় ফুরোয়না। ১৯৯০ সাল থেকে চলে আসা এই আইনে যা আছে, আগে সেটা দেখে নিইঃ
According to the Armed Forces Special Powers Act (AFSPA), in an area that is proclaimed as "disturbed", an officer of the armed forces has powers to:

After giving such due warning, Fire upon or use other kinds of force even if it causes death, against the person who is acting against law or order in the disturbed area for the maintenance of public order,

Destroy any arms dump, hide-outs, prepared or fortified position or shelter or training camp from which armed attacks are made by the armed volunteers or armed gangs or absconders wanted for any offence.

To arrest without a warrant anyone who has committed cognizable offences or is reasonably suspected of having done so and may use force if needed for the arrest.

To enter and search any premise in order to make such arrests, or to recover any person wrongfully restrained or any arms, ammunition or explosive substances and seize it.

Stop and search any vehicle or vessel reasonably suspected to be carrying such person or weapons.

Any person arrested and taken into custody under this Act shall be made present over to the officer in charge of the nearest police station with least possible delay, together with a report of the circumstances occasioning the arrest.

Army officers have legal immunity for their actions. There can be no prosecution, suit or any other legal proceeding against anyone acting under that law. Nor is the government's judgment on why an area is found to be disturbed subject to judicial review.

Protection of persons acting in good faith under this Act from prosecution, suit or other legal proceedings, except with the sanction of the Central Government, in exercise of the powers conferred by this Act.



আফস্পা বলবৎ হওয়ার পরের কিছু ছবি, ভুক্তভোগীদের মেমোয়ার থেকে পাওয়া যাবে। যে বিপুল সংখ্যক কাশ্মীরবাসী বছরের পর বছর এই অত্যাচার সয়েছে, যে মাত্রার অত্যাচার সহ্য করতে হয় তাদের এখনও নানা অজুহাতে, তা বিস্ময়কর।

কাশ্মীরের এক ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীর কথা পাই, যাকে সেনা গ্রেপ্তার করে, এবং স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য মার শুরু হয়। লোকটি তার ভারতীয় বন্ধুদের কথা বলে সেনাদের, বলে যে সে অনেক কর্মী সমাবেশে ছিলো, কিন্তু সেনা বিশ্বাস করেনা। বলে, তুমি পাকিস্তানী।

আফজাল হুসেন একজন স্কুলশিক্ষক। তাকে ১৯৯০ তেই গ্রেপ্তার করা হয়। তিনটি ক্যাম্পে চল্লিশ দিন ধরে তাকে শক দেওয়া হয়, সঙ্গে গরম শিকের ছ্যাঁকা। আফজাল এলাকায় প্রো ইন্ডিয়ান বলে পরিচিত, তার ফিলোজফিতে মাস্টার্স আছে, ভারত থেকেই।

শুধু '৯০ সালেই আফস্পাতে গ্রেপ্তার হয়ে ফিরে না আসা লোকের সংখ্যা, অ্যামনেস্টির ১৯৯৯ সালে করা রিপোর্ট মতে ৮০০ র বেশি। একই হিসেব স্থানীয় সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী সাড়ে তিন হাজার। বাশারাত পীরের বই কাশ্মীরে মিলিটারি ক্র্যাকডাউন এবং আফস্পার জ্বলন্ত ছবি, যেমন রাহুল পন্ডিতার বই কাশ্মীরী মাইনরিটির যন্ত্রণার গল্প।

আলাপ করিয়ে দিই ১৭ বছরের জাভেদ আহমেদ মাগ্রায়ের সাথে। ৩০শে এপ্রিল ২০০৩ সালের ঘটনা। জাভেদকে তার স্টাডিতে পড়াশুনো করতে দেখেছিলো তার পরিবার সেই সন্ধ্যায়। পরদিন সকালে ঘুম জাভেদের বাবা মা দেখলেন, ছেলে নিরুদ্দেশ। বাবা গুলাম নবী বাড়ির বাইরে এসে দেখলেন, সেখান সান্ত্রী বসেছে। তাদের বললেন, ছেলেকে পাচ্ছেন না। তারা বললো, ছেলেকে খুজোনা, বাড়ির মধ্যে যাও। গুলাম নবী দেখলেন ফুটপাথে রক্তের দাগ, আর রক্তাক্ত একটা দাঁত। অনতিবিলম্বে পড়শিরাও জড়ো হলো, এবং এইসব দেখে প্রতিবাদ শুরু হলো। ফলে খানিকটাবাধ্য হয়েই গুলাম নবীকে সেনা অফিসার জানালেন তার ছেলে অমিক হাসপাতালে আছে। সেখানে গিয়ে দেখা গেল হেথা নয়, অন্য কোনখানে। আবার ছুট, এবং সেই তৃতীয় হাসপাতালে জাভেদের মৃতদেহ মিললো। রাষ্ট্র টেস্টিফাই করলো যে জাভেদ একজন "অ্যান্টি ন্যাশনাল ও জঙ্গী" (এই বাক্যবন্ধ আমি অ্যামনেস্টির ২০১৫ সালের রিপোর্ট থেকে তুলে দিলাম, লিখিত বয়ানে যেমন আছে), তাকে এনকাউন্টারে মারা হয়েছে। একজন অফিসার বয়ান দিলো যে পয়লা মে, ২০০৩, চারজনের একটা দলকে তারা ধাওয়া করে, একজন আহত হওয়ায় তাকে ধরা যায়, সেই জাভেদ। অন্য তিনজন পালিয়েছে। জাভেদের বাড়ির লোক, পড়শীরা, শিক্ষকেরা প্রতিবাদ করলেন। একজন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে তদন্ত চললো অনেকদিন। সেনা কর্তৃপক্ষ তদন্তের শেষে জানালেন, জাভেদ জঙ্গী নয়, তার সম্পর্কে সেনার বয়ান মিথ্যা। জানা যায় আসাম রেজিমেন্টের এক সুবেদার কোন কারণ ছাড়াই জাভেদকে খুন করে। সেই সুবেদার বদলী হয়ে যাওয়ায় তাকেতদন্ত কমিটিতে হাজির করানো যায়না। ডাকে সমন পাঠানো হলে তা ফিরে আসে। ২০০৭ সালে কাশ্মীর রাজ্য পুলিশ মিনিস্ট্রি অফ ডিফেন্সকে চিঠি দেয় ন জন সেনার বিরুদ্ধে জাভেদ আহমেদকে হত্যার অভিযোগে প্রসিকিউট করার জন্য। কোন উত্তর আসেনি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ফাইলে ১০ই জানুয়ারি ২০১২ র একটি এন্ট্রি বলছে,
"sanction for prosecution was denied on the grounds that “the individual killed was a militant from whom arms and ammunition was recovered. No reliable and tangible evidence has been referred to in the investigation report.”

এইরকম অজস্র ঘটনা আছে সুমন্ত্র বোসের বইতে, অ্যামনেস্টির রিপোর্টে, ইউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্টে। কুনান পোশওয়াড়ায় ভারতীয় সেনা ৫৩ জন গ্রামবাসী মহিলাকে ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ উঠলে তদন্ত হয়, তাতে জানা যায় পুলিশ কোনরকম অনুসন্ধান করেনি কারণ তদন্তকারী অফিসার ছুটিতে ছিলেন। তিন মাস লেগে যায় মেডিকেল এক্সামিনেশন করতে, এবং কমিটি সিদ্ধান্ত নেয়, ঘটনাটি ভুয়ো এবং ভারতীয় সেনাকে হেয় করার জঙ্গী চক্রান্ত। যদিও গ্রামবাসীর তরফে অভিযোগ কেন সদুত্তর মেলেনা, যে গ্রামবাসীরা, ভারতীয় সেনাদের মতে, অসম্ভব সহানুভূতিশীল। সময় সময় নাকি এই গ্রামবাসীরাই সেনাদের প্রচুর সাহায্য করেছে, এও সেনাদেরই মত। সেই ছুটিতে যাওয়া পুলিশ অফিসারকে কয়েক মাসেই বদলী করা হয়। বাশারাত পীরের বইটার অংশবিশেষ নিয়ে হায়দর সিনেমা হয়েছে।

পরিশেষে অ্যামনেস্টির ২০১৫ রিপোর্ট থেকে কয়েক লাইন।

To date, not a single member of the security forces deployed in Jammu and Kashmir over the past 25 years has been tried for alleged human rights violations in a civilian court. An absence of accountability has ensured
that security force personnel continue to operate in a manner that facilitates serious human rights violations. A former senior military official publicly argued in October 2013: “Immunity under AFSPA allows our soldiers to
make mistakes. Insurgency will come to an end, you need to train soldiers better, I agree, but don’t remove the AFSPA.”
পর্ব -৬

এই লেখার শুরুতে বলেছিলাম, যথসম্ভব নিরপেক্ষ থেকে, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর তুলনামূলক আলোচনার চেষ্টা করবো। যে সমস্ত দিকগুলো নিয়ে লেখার ইচ্ছে ছিলো, তার মধ্যে সবথেকে কঠীন হলো ভারতীয় সেনার কথা লেখা। এর নানা কারণ আছে। এক, সেনা সম্পর্কিত আমার যাবতীয় তথ্য বইপত্র বা নেট থেকে পাওয়া,তাও বই যা পাওয়া যাচ্ছে তা বেশ কম। দুই, বেশ কিছু তথ্যের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ থেকে যাওয়া, এবং তিন, একেবারে নিচুতলার রিক্রুটদের দিক থেকে কোন লেখালেখি না থাকা। সেরকম একটা স্মৃতিকথা খুব দরকার ছিলো।

যাই হোক, যতটুকু যা পাচ্ছি লিখি। প্রথমেই দেখা যাক জওয়ানেরা কেমন আছেন। সম্প্রতি বিবিসির একটি রিপোর্ট বলছে ২০০১ থেকে ২০১২ অবধি ১৩৬২ জন ভারতীয় সেনা (আর্মি, নেভি, এয়ার ফোর্স মিলিয়ে) আত্মহত্যা করেছেন। সেনা অফিসারেরা এই ঘটনাকে "শৃঙ্খলার অভাব" এবং " লীডারশিপ কোয়ালিটির অভাব" বলে দায় সেরেছেন। একই সময়ের মধ্যে ৮৩ জন খুন হয়েছেন নিজের সহকর্মীর গুলিতে, যার আরেক নাম "ফ্রেট্রিসাইড"। এই ধরণের ঘটনা খুবই আধুনিক, এবং কার্গিল যুদ্ধের পর থেকে তা বাড়ছে। ২০১২ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এ কে অ্যান্থনি একটি লিখিত বিবৃতিতে এর কারণ হিসেবে " স্ট্রেস, ব্যক্তিগত ও আর্থিক" সমস্যাকে দায়ি করেন। এর সাথে ধরতে হবে সিয়াচেনের মত জায়গার নিজস্ব বাড়তি চ্যালেঞ্জ, অসম্ভব হায়ারার্কিকাল একটা সিস্টেমে দিনের পর দিন কাজ করতে বাধ্য হওয়া। আমি আশ্চর্য হবোনা, যদি দেখা যায় প্রত্যক্ষ যুদ্ধ বা জঙ্গী হানার চেয়েই এইসব কারণে জওয়ানদের মধ্যে মৃত্যুহার বেশি। অন্যদিকে, খেয়াল করে দেখছি আজ যে সরকার কেন্দ্রে, তাদেরই প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজ কার্গিল যুদ্ধে শহীদ সেনাদের কফিন সংক্রান্ত দূর্নীতিতে জড়ান। এক একটা যুদ্ধ হয়, বা সীমায় কোন "ছোট" সংঘর্ষ, আর কাগজে খবর হয় মৃত সেনারা। যারা রাজনীতির ঘুঁটি বই কিছু নয়। পাকিস্তান আর্মির অবস্থাও কিছু অন্যরকম না। সেখানে পারভেজ মুশারফের একদা সঙ্গী ও অধুনা সম্বন্ধী শাহিদ আজিজ একটা বই লিখেছেন, এবং সেখানে দেখা যাচ্ছে কার্গিল যুদ্ধ সম্পর্কে খোদ সেনাদলের একটা বিশাল অংশ জানতো না। আমার মনে হয় কোন সরকারই, একজন সেনার মৃত্যুকেও যোগ্য মর্যাদা দেয়নি। তা চিরকাল কোল্যাটেরাল ড্যামেজ হিসেবেই থেকে গেছে।

২০০৮ সালে একজন সেপাইয়ের মাইনে কত ? দেখা যাচ্ছে সেই বছরে একজন সেপাই ৩০৫০-৪৬৫০ টাকা মত পান মাসে। এত কম মাইনে সত্ত্বেও, কাশ্মীরের অনন্তনাগে ভারতীয় আর্মিতে যোগ দিতে লম্বা লাইন পড়ে। দেশপ্রেম কি? হয়ত না। স্থানীয় পিডিপি নেতা ইকোনমিক টাইমসকে বলেন, বেকার সমস্যাই মূলতঃ এইজন্য দায়ি। কাশ্মীরীরা এইজন্য যেকোন চাকরি পেলেই বর্তে যায়। একই ব্যাপার দেখা যায় ছত্তিসগড়, বিহার এইসব রাজ্যেও। বর্তমানে মাইনের অঙ্ক নিশ্চই বেশি হবে, কিন্তু ইনফ্লেশান হিসেব করলে তা ২০০৮ সালের থেকে কিছু আলাদা হবেনা বলেই আমার মনে হয়।

কিন্তু চাকরির অভাবই সবটা নয়। পঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ এইসব রাজ্য থেকেও বিস্তর রিক্রুটমেন্ট হয়, যার কারণ আলাদা। ঐতিহাসিক কারণে বেশ কিছু অঞ্চল থেকে ভারতীয় সেনায় বেশি লোক নেওয়া হয়, যা ব্যাখ্যা করতে গেলে আমাদের "মার্শাল রেস" সম্পর্কে জানতে হবে। আমরা ছোট থেকে জানতাম, শিখরা বীরের জাতি তাই তাদের বেশি করে আর্মি রিক্রুট করে। কিন্তু সেটা আসলে অর্ধসত্য। অতীত খুঁড়লে দেখা যাচ্ছে, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পরে ব্রিটিশ সরকার আর্মি রিক্রুটমেন্টে কিছু পরিবর্তন আনে। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আর্মির যা চেহারা হয়, তাতে দেখা যায় বেশ কিছু এথনিসিটি তাতে অনুপস্থিত, আর বেশ কিছু এথনিক গ্রুপের অবিশ্বাস্য উপস্থিতি। ব্রিটিশ সরকার কোনদিন একথা স্বীকার করেনা যে অফিশিয়াল কোন পলিসি ছিলো, কিন্তু একটু ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যাক। উইলিয়াম ডালরিম্পলের "দ্য লাস্ট মুঘল" থেকে দেখা যাচ্ছে, সিপাহী বিদ্রোহের সময় দিল্লিওয়ালারা বিদ্রোহীদের " পুর্বিয়াঁ" বা " তিলঙ্গা" বলে ডাকতো। বিদ্রোহ পূর্ববর্তী সময়ে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনার বড়োসড়ো অংশ এই দুই অঞ্চল থেকে আসতো। কিন্তু '৫৭র বিদ্রোহে ৯০% বেঙ্গল রেজিমেন্ট রেবেল ফোর্সে যোগ দেয়। পূর্ব ও দক্ষিণ থেকে এই যোগদান বেশি পরিমাণে ছিলো বলে বিদ্রোহ দমনের পর ব্রিটিশ সরকার এই এথনিক গ্রুপ থেকে সেনা নিয়োগ একরকম বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে, বিদ্রোহের সময় কয়েকটি এথনিক গ্রুপ ব্রিটিশ সরকার (যা তখন ভারত সরকারও বটে) এর পাশে থাকে, এবং রেবেল দমনে সাহায্য করে। সেইসব এথনিক গ্রুপের মহ্যে পড়ে, ডোগরা, গাড়োয়ালি, গুজ্জর, জাঠ, কুমাউনি, শিখ, রাজপুত, পাঠান, জন্জুয়া, যাদব, মাহার, কোদাভ, গখর, খুম্মন আর খোকর। যেসব এথনিসিটির লোক কমে যেতে শুরু করে, তারা হলো বাঙালী, আওয়াধি, বিহারী, দক্ষিণী এবং মারাঠাদের একাংশ। খাতায় কলমে সরকারবন্ধু এথনিসিটিগুলি "মার্শাল রেস" বলে পরিচিত, এবং সেই পরিচিতি তাদের যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শিতা সম্পর্কিত।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ামাত্র মার্শাল রেস থিওরি বাতিল হয়। কিন্তু কাজের বেলায় সেই একই গল্প। স্বাধীনতা পরবর্তী প্রত্যেক বছরের রিক্রুটমেন্টে এখনও মার্শাল রেস থেকেই বেশি করে নিয়োগ হয়। এর একটা কারণ অবশ্যই উক্ত জাতিগুলির সমরকৌশল ও দেশাত্মবোধ, কিন্তু শুধু সেটাই বিপুল পরিমাণ নিয়োগের কারণ হতে পারেনা। কয়েকটা উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। হরিয়ানার জনসংখ্যা ভারতের 2.2%, আর তারা ভারতীয় আর্মির 7.82% জুড়ে রয়েছে। এইভাবে পঞ্জাব (2.4% , 16.6%), হিমাচল প্রদেশ (0.6%, 4.68%) এরও একই অবস্থা। অন্যদিকে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার ক্ষেত্রে এই সংখ্যাগুলো যথাক্রমে (7.8%, 3.83%), (10.8%, 5.83%), এবং (3.65%, 1.27%)। ভারতীয় সেনার ডেমোগ্রাফিক আরেক সমস্যার জায়গা মুসলিমদের উপস্থিতি। ভারতের মোট জনসংখ্যার ১২% মুসলিম, অথচ সেনাদলে তাদের উপস্থিতি ৩% এরও কম, তার অর্ধেকই আবার একই রেজিমেন্টের (জম্মু কাশ্মীর লাইট ইনফ্যান্ট্রি)। বলা বাহুল্য, মুসলিমদের অনুপস্থিতিও ব্রিটিশ লিগ্যাসি। বিদ্রোহের পরে স্ট্র্যাটেজি হিসেবে মুসলিম সেনাদের পাশাপাশি মুসলিমদের এলিট অংশকেও না নেওয়ার কথা আলোচিত হয়, কারণ ব্রিটিশ সরকারের মনে হয়েছিলো মুসলিমদের একটা বড়ো অংশ ব্রিটিশ সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ।

সুতরাং দেখাই যাচ্ছে, যাকে আমরা ভারতীয় সেনা বলে জানি, তা আদপেই ভারতের জনগণের প্রতিফলন নয়, তার ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিচ্ছবি তা তুলে ধরেনা। যেকোনো ইন্দো-পাক যুদ্ধে তা আদপে হিন্দু মুসলিমের জিহাদী লড়াইয়ের মত দেখতে লাগে, তা সে শুনতে যত খারাপই লাগুক। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের একমাত্র মুসলিম চীফ এয়ার মার্শাল ইদ্রিস লতিফ (১৯৭৮-৮১)। কোন মুসলিম আর্মি জেনারেল হয়নি, যদিও খ্রীষ্টান বা পার্সি নাম আছে। অন্যদিকে একেবারে শীর্ষপর্যায়ে জাঠ ও শিখদের ছড়াছড়ি, সে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা বলয় হোক, বা উচ্চপদস্থ অফিসার্স ক্লাব। সবথেকে বজার ব্যাপার হলো, এই বৈষম্যকেই কোন কোন স্কলার ভারতীয় সেনার মূল শক্তি বলেছেন (অমিত সাক্সেনা, দ্য ডিপ্লোম্যাট), এবং বলা হয়েছে, রাজনীতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতা এসে আর্মি রিক্রুটিং যেন "দূষিত" না করে।



টীকাঃ ২০০৮ সালের সেনা বেতন সম্পর্কে একটু কনফিউশন হওয়ায় খুঁজে দেখলাম গ্রস স্যালারি কত। সেই সূত্রে আরো সাম্প্রতিক তথ্য পাওয়া গেল।

২০১২ সালের হিসেব অনুযায়ী এন্ট্রি লেভেল সেপাই মাইনে পেতেন সব মিলিয়ে ২০০০০ টাকা মাসে (ডিএ ও অন্যান্য অ্যালাওয়েন্স যোগ করে, শুধু এরিয়া অ্যালাওয়েন্স বাদ দিয়ে)। এর সাথে ফ্রি রেশন, মেডিকেল ইত্যাদি বেনিফিট আছে। বিশেষ অঞ্চলে এর সাথে কাউন্টাস ইন্সার্জেন্সি, হাই অল্টিচুড অ্যালাওয়েন্স যোগ হয়।
পর্ব -৭

লেখার বিষয়বস্তুর শেষ নেই, তবে সম্ভবত এটাই শেষ পর্ব। এই পর্বে আমি লিখতে চাইছি স্বশিক্ষিত, সচেতন মানুষের নিরপেক্ষ ইতিহাস জানার অসুবিধেগুলো নিয়ে। আমার মনে হয় এই সমস্যাটা বুঝলে, বা অন্তত তার অস্তিত্ব স্বীকার করলে আমরা রাজনৈতিক মেরুকরণের যে বাড়াবাড়ি দেখা যাচ্ছে, সেটা কমানোর রাস্তা পাওয়া যাবে। এবং এই বিষয়টা একজন আংশিক সময়ের ইতিহাস পড়ুয়া, অল্প সময়ের মধ্যে সীমিত বইপত্র ও সাময়িকপত্র পড়ে যেভাবে এগোয় সেভাবেই দেখবো। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধারাবাহিকভাবে ইতিহাস পড়ে চলার সময়, সামর্থ্য বা ইচ্ছা থাকবে এটা আশা করা যায়না, অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যায় বিশ্বাস করবেন না, এটা খুবই প্রয়োজনীয়।

গত কয়েক বছরে এই সমস্যা আমরা বেশ কয়েকবার দেখেছি। যদিও এই প্রসঙ্গে আমি লিখছি বিশেষ করে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে, সাধারণভাবে সমস্যাটি সমস্ত ইতিহাসাশ্রিত রাজনৈতিক কনফ্লিক্টেই থাকে।

ইতিহাস জানবো কিভাবে? না, ইতিহাসের বই পড়ে। কিন্তু কার লেখা বই? কবে লেখা বই? এবং সবথেকে দরকারি, কেন লেখা হয়েছে সে বই? এইসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে ছাপার অক্ষর দেখে বিশ্বাস করে নেওয়ায় সমূহ বিপদ। কয়েকটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা বোঝা যাবে।

সম্প্রতি ভারতের ৫৩ জন, এবং প্রবাসী বেশ কিছু ঐতিহাসিক দুটি চিঠিতে ভারতে ক্রমশ বেড়ে চলা ইনটলারেন্স নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এর উত্তরে দেশেরই আরো ৪৭ জনের আরেকদল ইতিহাসবিদ একটি স্টেটমেন্ট দেন, এবং প্রথোমোক্ত দলের বিরুদ্ধে ভারতের ইতিহাসচর্চাকে তাদের রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত করার অভিযোগ আনেন। প্রথমোক্ত দলটি "লেফটিস্ট" এবং তাদের ইতিহাস চর্চা মার্ক্সিয়, এই অভিযোগও করা হয়। এখন, একজন গুগল করে পড়াশুনো করা মানুষ, যিনি অ্যাকাডেমিক নন, তিনি এই দ্বন্দ্বে খুবই মুশকিলে পড়বেন। খুব স্পষ্টই দুটি (বা ততোধিক) শিবির থাকায়, পড়ুয়া হিসেবে কাজট কঠিন হবে। শুধু পড়লেই হবেনা আর, বিভিন্ন সোর্স থেকে ভেরিফাই করে তবে বিশ্বাস করতে হবে। যিনি লিখছেন তার রাজনৈতিক কথা মনে রাখতে হবে। এবং যতই এগুলো করা হবে, ততই জানার চেয়ে প্রমাণ-অপ্রমাণের গল্প বড়ো হয়ে উঠবে। রোমিলা থাপার, ইরফান হাবিব, এ এল বাশাম থেকে কোট করলে বা তথ্য দিলে আপনি মার্কসিস্ট ইতিহাস পড়েছেন, পশ্চিমিদের লেখা দ্বারা প্রভাবিত এবং ওতে ভারতের শিকড়ের কথা নেই এইসব বলে উড়িয়ে দেওয়া হবে। আরো নানা যুক্তি আসতে পারে। রোমিলা থাপার প্রসঙ্গে যেমন বলা হয় উনি সংস্কৃতে কাঁচা। এইরকম সব কারণে অথ্য অগ্রাহ্য করা হতে পারে। রাইট উইং এর খুব জনপ্রিয় ইতিহাসবিদের নাম (ভারতে) এমনিতেই দুর্লভ, যদি পাওয়া যায়ও তাহলেও সেখানেও একই ব্যাপার হবে। এটা ঘটনা, যে লেখাপত্রে কিছু ঘটনা কম আলোচিত হয়, এবং অনেক সময়ই তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপারটা সত্যিই খুব বিরক্তিকর। ক্রিস্টিন ফেয়ার যেমন আফগানিস্তান-পাকিস্তানের ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন, এবং খুবই পন্ডিত মানুষ। তার লেখাপত্র যা অল্প পড়লাম, পাক আর্মির ওপর এত ব্যাপক কাজ আর কেউ করেছেন কিনা সন্দেহ। অথচ তিনি দীর্ঘদিন ধরেই খুব সিস্টেমেটিকভাবে কাশ্মীর ইস্যুতে সমস্ত দায় পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে লেখালেখি করছেন। ফেয়ার ড্রোন প্রোগ্রামের কট্টর সমর্থক ও ডিফেন্স উপদেষ্টা, এবং বহুদিন ধরে পাকিস্তান আফগানিস্তানে ড্রোন অ্যাটাকে সিভিলিয়ান মারা যাওয়ার প্রত্যেকটি ঘটনা তিনি অস্বীকার করে আসছেন। মনে রাখতে হবে, ফেয়ার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নামকরা অধ্যাপক। নিউ ইয়র্ক আর স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, বিভিন্ন সাংবাদিকের লেখা বই (অন্যতম পুলিৎজার জয়ী গ্লেন গ্রীনওয়াল্ড), হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি - এই বিপুল পরিমাণ রিসার্চ ডেটা ক্রিস্টিন ফেয়ার অমান্য করেন, এবং ভারতের রাইট উইং এর ধারক ও বাহকেরা সেই ফেয়ারের লেখা কোট করে থাকেন বহুল পরিমাণে- মূলত পাকিস্তান ব্যাশিং এর জন্য। সোশ্যাল মিডিয়াতে ফেয়ার উস্কানিমূলক পোস্টের জন্য খ্যাত, সেখানেই তিনি লেখেন, " আমরা ভুল দেশকে ইনভেড করেছি, পাকিস্তানই আমাদের আসল শত্রু"। এইসব যখন তিনি লেখেন, তখন সমান্তরালে নিউইয়র্ক-স্ট্যানফোর্ডের গবেষণা দেখাচ্ছে কি বীভৎস অবস্থায় দিন কাটে পাকিস্তানের বহু মানুষের। আরো কটা উদাহরণ দেব, নইলে বিশ্বাস হবেনা সত্যের অপলাপ আর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কতদূর যেতে পারে। ২০১০ সালে ফেয়ার অস্বীকার করেন ড্রোনে সিভিলিয়ান মারা যাওয়ার কথা।

From June 2004 through mid
September 2012, available data
indicate that drone strikes
killed 2,562-3,325 people in
Pakistan, of whom 474-881
were civilians, including 176 children.
- The Bureau of Investigative Journalism

একের পর এক স্টাডি প্রকাশিত হলে পরে, ফেয়ার স্বীকার করেন ড্রোনে সিভিলিয়ান মারা যাওয়ার কথা, কিন্তু বলেন এইসব মৃত্যু পাকিস্তানের "মৌলবাদ নির্মূল করার জন্য প্রয়োজনীয়, এবং স্থানীয় মানুষ ড্রোনের পক্ষে"। এর পাশাপাশি স্থানীয়দের সাক্ষাৎকার নিলে জানা যাচ্ছে, ইউএস ড্রোন মিলিট্যান্ট যত না মারছে বানাচ্ছে আরো বেশি, অজস্র সিভিলিয়ানের মৃত্যু ছাড়াও ভয়ানক সাইকোলজিকাল ডিসর্ডারের শিকার উত্তর পশ্চিম পাকিস্তানের গ্রামের মানুষ।

ক্রিস্টিন ফেয়ারের স্কলার হিসেবে ক্রেডিবিলিটি কিন্তু এসব সত্ত্বেও কমেনি, ইউএস ড্রোন প্রোগ্রাম বহাল আছে।

লিভিং আন্ডার ড্রোন্স (স্ট্যানফোর্ড ল স্কুল, আর নিউ ইয়র্ক স্কুল অফ ল দ্বারা প্রকাশিত) অনুযায়ী-

Drones hover twenty-four hours a day over communities in northwest
Pakistan, striking homes, vehicles,
and public spaces without warning.
Their presence terrorizes men,
women, and children, giving rise to
anxiety and psychological trauma
among civilian communities.

দেশের দিকে তাকালে দেখা যাবে একই প্যাটার্ন। ভারতের অহিন্দু ধর্মের মানুষদের উত্থান প্রসঙ্গে, মুসলিম ও হিন্দু রাজাদের মন্দির লুঠের ইতিহাস প্রসঙ্গে দেখা যাবে রাইট ও লেফট উইং ইতিহাসের বিরোধ। কাশ্মীর প্রসঙ্গে, বামপন্থীরা প্রো-ইন্ডিপেন্ডেন্স বা প্রো-পাকিস্তান জনগোষ্ঠীর ভারতবিরোধী উচিত অনুচিত নানা কার্য্যকলাপকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখেন- এটা আরেকটা উদাহরণ। রাহুল পন্ডিতার বই পড়তে গিয়ে যেমন তার প্রো-ইন্ডিয়া স্ট্যান্ড স্পষ্ট হয়েছে আমার চোখে, তেমনি বাশারাত পীরের বই পড়তে গিয়েও দেখেছি সেখানে প্রো-মিলিট্যান্ট ও অ্যান্টি-ইন্ডিয়া অবস্থা খুব স্পষ্ট, এবং একবারের জন্যেও বাশারাত ব্যাখ্যা করেননি কেন এই প্রবল ভারতবিদ্বেষ, যখন কাশ্মীর অপেক্ষাকৃত শান্ত। কিন্তু এই দুটি বইই যেহেতু মেমোয়ার, তাই তা খুবই ব্যক্তিগত, এবং খানিকটা বায়াস থাকলেও মোটের ওপর বইদুটি থেকে সাধারণ মানুষের কাশ্মীরকে জানা যায়। পন্ডিতার বইতে প্রো-আজাদি ক্যাম্পের জন্য কোন বিদ্বেষ নেই, শুধু পরিজনদের জন্য দূর্ভাবনা আছে। পীরের বইতে মিলিট্যান্টদের প্রতি সময়বিশেষে মানুষের অনাস্থা আছে।

সুতরাং ঐতিহাসিক ঘটনাবলী আশ্রয় করে কোন আলোচনা চালাতে হলে সবার আগে দরকার বিন্দুমাত্র সন্দেহ আছে এমন তথ্যসূত্রগুলি প্রথমেই বাতিল করা, তারপর যেগুলো পড়ে থাকলো সেগুলোর একাধিক ভার্শন পড়ে তবেই সিদ্ধান্তে আসা বাঞ্ছনীয়।





রাজনৈতিক এজেন্ডায় ইতিহাস ব্যবহারের প্রয়োগ খুবই পুরোনো গল্প। সরকারী তরফে বহুদিন ধরেই ইতিহাস এবং মিডিয়া ব্যবহার করে এজেন্ডা গেলানো হয়। এজেন্ডা সেটিং এবং তাতে মিডিয়ার ব্যবহার নিয়ে ১৯২২ সালে প্রথম ওয়াল্টার লিপম্যান লেখেন তাঁর বই "পাবলিক ওপিনিয়নে"। সেখানে তিনি মাস মিডিয়ায় পরিবেশিত খবর এবং তার সাথে জনমতের গভীর সম্পর্ক নিয়ে নিয়ে লেখেন। এজেন্ডা সেটিং থিওরি এরপর আরো স্পষ্ট হয় এবং ১৯৬৩ সালে পলিটিকাল সায়েন্সের অধ্যাপক এবং শিক্ষাবিদ বার্নার্ড কোহেন লেখেন ঃ

press may not be successful much of the time in telling people what to think, but it is stunningly successful in telling its readers what to think about. The world will look different to different people, depending on the map that is drawn for them by writers, editors, and publishers of the paper they read."

এজেন্ডা সেটিং এর ইতিহাস ও বিবর্তনও খুবই চিত্তকর্ষক। জনমত গঠনেই শুধু এর ভূমিকা থেমে নেই, তা আরো জটিল। সময় যত এগিয়েছে ততই একটা ফিডব্যাক প্রসেস তৈরী হয়েছে যাতে করে জনমতের প্রভাব সাংবাদিকতায় পড়েছে। আবার ইন্টারনেট আরো প্রসার পেলে যখন ব্লগিং ও ট্যুইট যখন বেড়েছে, তখন সেগুলোও মিডিয়ার পলিসিতে এসেছে, শুধু প্রসেসে না, কনটেন্টেও।

এর পাশাপাশি ইতিহাস ব্যবহারে রাষ্ট্রের ভূমিকা অনেকেই জানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা ছেড়েই দিলাম, একেবারে হাল আমলে ভারতে ও অন্যান্য দেশে জনমত গঠনে, ভোটব্যাঙ্ক প্রভাবিত করতে কাস্টোমাইজড ইতিহাস ব্যবহার খুব ব্যাপক। ২০১৩ সালে "অনেস্ট হিস্টরি" বলে একটি সংস্থা গড়ে ওঠে, যেখানে বেশ কয়েকজন অস্ট্রেলিয় ইতিহাসবিদ আনবায়াসড, স্রেফ প্রমাণিত তথ্যভিত্তিক অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস প্রচার করতে শুরু করেন, কারণ তাঁদের ভয় ছিলো অস্ট্রেলিয়ার সরকার এজেন্ডাভিত্তিক ইতিহাস প্রচার করছে এবং পলিসি তৈরীতে তার সাহায্য নিচ্ছে। এর একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ গালিপোলির যুদ্ধ (টার্কি নিয়ে ব্লগে এই নিয়ে সামান্য উল্লেখ করেছিলাম) স্মরণ করে প্রতিবছর সরকারি ধুমধাম। অনেস্ট হিস্টরির সেক্রেটারি ডেভিড স্টিফেন্স বলেন ঃ

" Governments want a history that reflects their own interests and current agenda. They look back at history and make the war commemoration activities and speeches, school curriculum and so on, into a version they want.

এগুলোও কিন্তু নতুন কথা নয়। আজ থেকে অনেকদিন আগেই What is History বইতে ই এইচ কার ইতিহাসের বিভিন্ন ইন্টারপ্রিটেশন এবং তার বিপদ নিয়ে লিখেছিলেন। একটা কথা খুব স্পষ্ট করে এখানে লিখে রাখা দরকার। এইযে এজেন্ডাভিত্তিক ইতিহাসের কথা বলা হচ্ছে, এ কিন্তু মিথ্যা বা বিকৃত তথ্যের দিয়ে গড়া না। কিন্তু তথ্য বিকৃত না করেও, স্রেফ তথ্যের একটা দিক প্রচার করে এবং অন্যদিকগুলো চেপে গিয়ে চমৎকার জনমত তৈরী করা যায়।

যেমন ধরুন ভারতের প্রেক্ষিতে আর্মির ভূমিকা বা পাকিস্তানের ভূমিকা। একদিকে ভারতীয় সেনা অমানুষিক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয়, ত্রাণ থেকে জীবন দিয়ে পণবন্দী বাঁচানো সবেতেই খুব সদর্থক ভূমিকা। যে বেতন ও আর্থিক সুবিধের বিনিময়ে সেনা এইসব কাজ করে তার দ্বিগুণ পরিমাণ ধার্য্য করলেও অন্য প্রফেশনে থিতু হওয়া লোকজন এই কাজগুলো করবেন না। আবার অন্যদিকে এই আর্মিই আফস্পা এবং অন্যান্য নানা আইনের ফাঁক ব্যবহার করে চরম অত্যাচার চালায়, যার বিবরণ পড়েও মানুষ শিউরে উঠবে। এইবার, দরকারমত, ডান এবং বামপন্থী রাজনীতির লোকেরা আর্মির এই দ্বৈত ভূমিকা ব্যবহার করেন।

একই ভাবে কাশ্মীর সমস্যায় পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে বামপন্থী ও দক্ষিণপন্থী মতো একশো আশি ডিগ্রির দূরত্বে থাকে। কাজেই, যিনি এই লেখাপত্র লিখছেন বা পড়ছেন তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের জায়গা থেকে ইন্টারপ্রিটেশন তৈরী হয় পাল্টায়।

রাজনৈতিক দর্শনের জায়গাটা নিয়ে আরেকটু বলি। সারা পৃথিবিতে মুসলিমরা ক্রমশ সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন, এবং সেখানে মৌলবাদ কে প্রতিরোধ করতে গেলে প্রধাণত ইসলামিক মৌলবাদের বিরোধীতা করতে হচ্ছে। আইসিস যে চরম পরিস্থিতি তৈরী করেছে তাতে অনেকেই ভাবছেন আর যাই হয় হোক এই মৌলবাদ নিপাত যাক। এইটা খুবই ভয়ের জায়গা। কারণ "যাই হয় হোক" টা বেশিরভাগ সময়ই সাময়িক স্থিতাবস্থা এবং ক্রমশ আরো খারাপ দিকে নিয়ে যায়। বিশ্ব ইতিহাস থেকে পশ্চিমবঙ্গের হালের "পরিবর্তনের" ইতিহাস ঘাঁটলে এই কথাই স্পষ্ট হবে। একইভাবে ভারতের বামপন্থীরা ভাবছেন আর যেই আসুক বিজেপি যাক। এবং ব্ল্যাঙ্কেট হিন্দুত্ববিরোধীতা করতে গিয়ে তাঁরা মাইনরিটির করা অপরাধগুলোর গুরুত্ব কমিয়ে দেখছেন। এই প্রবণতা নিরপেক্ষ জনমতকে আর নিরপেক্ষ থাকতে দেয়না, আরো বেশি করে পোলারাইজ করে দেয়, যা বিপজ্জনক।

আরেকটা অসুবিধের জায়গা হলো অতিরঞ্জন। মানুষ বলে যে প্রজাতি পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এতগুলো বছর, তার ইতিহাস এমনিতেই যথেষ্ট ন্যক্কারজনক, এককথায় ভায়োলেন্ট ও জঘন্য। তা এমনিতেই এত আত্মঘাতী ও অমানবিক, যে সেগুলো লিখতে বসলে অতিরঞ্জনের কোন প্রয়োজন থাকা উচিত না। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়্না। তাই হার্ড ফ্যাক্টস এবং এভিডেন্স ভিত্তিক, আবেগবর্জিত ইতিহাস লেখা ও পড়া এই সময়ে দাঁড়িয়ে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।





(৮)

এই সিরিজ যখন লিখতে শুরু করি, কেউ কেউ জানতে চেয়েছিলেন, সমাধানসূত্র কীভাবে পাওয়া সম্ভব? কাশ্মীরের অস্থিরতার কি সত্যিই কোন শেষ নেই? এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা এই পর্বে।

আমাদের রোজকার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখি, কোন বিষয়ে সমাধানসূত্র পাওয়া অনেকটাই নির্ভর করে সমস্যাটা আপনি কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। এই কাশ্মীর সমস্যা বলে যাকে আমরা অনেকদিন ধরে অভ্যাসে চিনি, যুযুধান তিন দেশের কাছে তার গুরুত্ব নির্ধারণ তাই খুব জরুরি। দেশের সংখ্যা তিন বললাম, ভারত, পাকিস্তান আর চীনকে ধরে। কাশ্মীরকে আলাদা দেশ ধরলে (অন্তত তর্কের খাতিরে সে সম্ভাবনাও মাথায় রাখা দরকার) সেটা চার। এই লেখার মাধ্যমে কাশ্মীরের ইতিহাসের যে সংক্ষিপ্তসার আমরা জানলাম, এবং তার সাথে জম্মু কাশ্মীরের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান, ভারত-চীন-পাকিস্তানের জিও-পলিটিকাল আগ্রহ, এইসব খতিয়ে দেখলে এই ধারণাই বলবৎ হয় যে এই সমস্যার এমন সমাধান সম্ভব নয় যা সবাইকে ১০০% খুশি করবে। তাই সুমন্ত্র বোসের বইয়ের একেবারে শেষে, যেখানে সমাধানসূত্র খোঁজা হচ্ছে, সেখানে আগে সমাধান কতটা গ্রহণযোগ্য হলে সেটা সমাধান হবে সেটা সংজ্ঞায়িত করা আছে। তারপর একে একে ত্রিপাক্ষিক সম্পর্কে কিভাবে স্থিতাবস্থা আনা সম্ভব তার রূপরেখা। আমার উদ্দেশ্য পুরো চ্যাপ্টারটা এখানে তুলে দেওয়া নয়, তাই আমি একটা সারসংক্ষেপ দেব শেষে। তার আগে দুটো অন্য কথা।

এক, কাশ্মীর সমস্যা বলতে যদি আমরা শুধুই একাধিক রাষ্ট্রের পারষ্পরিক সমস্যা বুঝি সেটা আদ্যন্ত ভুল হবে। অন্তত আমার কাছে সেটা অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ন একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবনের সমস্যা, যা হিংসা আকীর্ণ এবং অস্থির, বহু বহু বছর ধরে। মানুষ মরছে, তাদের জীবন বিপর্যস্ত, এইটা যদি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা বলে মনে নাহয় রাষ্ট্রের কাছে, তবে সে সমস্যার সমাধান নেই। এই প্রসঙ্গ একটা উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করবোঃ

Whenever things threatened to fall apart during our negotiations—and they did on many occasions—we would stand
back and remind ourselves that if negotiations broke down the outcome would be a bloodbath of unimaginable proportions, and that after the bloodbath we would have to sit down again and negotiate with each other. The thought always sobered us up and we persisted, despite many setbacks. You negotiate with your enemies, not your friends.
—nelson mandela,
reflecting on the transition to a
multiracial democracy in South Africa, 1997

দুই, কাশ্মীর সমস্যাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চাপা উত্তেজনা ও অবিশ্বাস, এবং তার জন্য সীমা সংলগ্ন অঞ্চলে মানুষ কেমন আছেন এটা আমাদের মাথায় রাখা উচিত। সেনার ভূমিকা নিয়ে পর্বে এই বিষয়ে প্রত্যক্ষ হিংসার উদাহরণ আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু যেখানে প্রাথমিকভাবে কোন জটিলতা থাকার কথা থাকেনা সেখানেও শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কের জের বহন করে চলেন সাধারন নাগরিক। এই প্রসঙ্গে শেহনাজ কৌসরের ঘটনাটা মনে করে দেখা যাক।

শেহনাজ "আজাদ কাশ্মীর বা পাক-অধীকৃত কাশ্মীরের" বাসিন্দা। ১৯৯৫ সালের অক্টোবর মাসে, তখন সদ্য বিবাহিতা শেহনাজ শ্বশুরবাড়ির শারীরীক ও মানসিক অত্যাচার থেকে পরিত্রাণ পেতে ঝিলম নদীতে ঝাঁপ দেয়, আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এমনই মন্দ কপাল (কেন মন্দ বলছি এখুনি বোঝা যাবে), শেহনাজ মরেনা, বরং স্রোতে ভেসে এসে ওঠে এল ও সির অন্যদিকে, ভারতে (অর্থাৎ ইন্ডিয়ান জম্মু ও কাশ্মীরে) এবং ট্রেসপাসিং এর দায়ে গ্রেপ্তার হয়। তিনদিন জেরা করার পর ভারতীয় ইন্টেলিজেন্স বোঝে যে শেহনাজ গুপ্তচর নয়। তাকে স্থানীয় পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। আদালতে তোলা হলে সীমা লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত শেহনাজের পনেরো মাসের জেল হয় এবং ৫০০ টাকা ফাইন। পুঞ্চ সেক্টরের একটি জেলে শেহনাজকে রাখা হলে সেখানে দীন মহম্মদ নামে এক কারারক্ষী তাকে উপর্যুপরি ধর্ষন করে। কয়েক সপ্তাহ অত্যাচার সয়ে, ওপর মহলে অভিযোগ পৌঁছলে তাকে অন্য জেলে স্থানান্তরিত করা হয়, এবং কিছুদিনের মধ্যেই জানা যায় শেহনাজ অন্তঃসত্ত্বা। এসে যায় অক্টোবর ১৯৯৬, জন্ম হয় শেহনাজের মেয়ে মোবীনের এবং শেহনাজের জেলের মেয়াদও ফুরিয়ে আসে। কিন্তু মুক্তি মেলেনা, কারণ উই দেশের "পেপারওয়ার্ক" শেষ হয়ে ওঠেনা। এই করে করে চারবছর হয়ে যায়, শেহনাজকে অগত্যা জেলেই থাকতে হয়। ২০০১ সালে সব ফর্মালিটি শেষ হলে মা ও মেয়েকে নিয়ে রওনা দেয় পুলিশ, বর্ডার পার করিয়ে আসার জন্য। ঐ পক্ষেও একদল হাজির থাকে। কিন্তু সেখানে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি তৈরী হয়। পাক প্রতিনিধিদল শেহনাজকে ফিরিয়ে নিতে এলেও তারা মোবীনকে নিতে রাজি হয়না, কেননা সে ভারতীয় নাগরিক (জন্মসূত্রে)। অগত্যা শেহনাজ ও তার মেয়ে ফিরে আসে ভারতেই, এবং সেখানে পাবলিক সেফটি অ্যাক্ট (সাধারণ জঙ্গী ও দেশদ্রোহী কর্মসূচীতে এই ধারা আনা হয়) বলে শেহনাজকে পুনরায় জেলে পাঠানো নয়। পরে হাইকোর্টে মামলা গেলে সেখান থেকে বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে শেহনাজ ও তার মেয়ের সুস্থ পরিবেশে থাকার বন্দোবস্তের নির্দেশ দেওয়া হয়, যদিও তা কার্যকর হয়নি আরো বহুদিন। এই পুরো সময়টাই দীন মহম্মদের বিরুদ্ধে ইনভেস্টিগেশন চলছিলো, এবং মোবীনের পিতৃপরিচয় নির্ধারণের তদন্তও চলছিলো। এই ঘটনাটা আমি এখানে রেকর্ড করলাম এটা বোঝানোর জন্য যে সাধারণভাবে প্রশাসনের কাছে একজন মানুষের জীবন ও সময়ের দাম কত কম। সাধারনভাবে যুযুধান দুই রাষ্ট্রেই কি ধরণের ইনসেন্সিটিভ ব্যবহার পেয়ে থাকে সেখানকার নাগরিকরা।

সুমন্ত্র বোসের বইতে কাশ্মীর সমস্যার সমাধানসূত্র খুঁজতে আরো দুটো আন্তর্জাতিক সমস্যার কথা উদাহরণ হিসেবে আনা হয়েছে। একটা নর্দার্ন আয়ার্ল্যান্ডের সমস্যা, আর দ্বিতীয়টা ইজরায়েল প্যালেস্টাইন কনফ্লিক্ট। দেখা যাচ্ছে সদিচ্ছাজনিত প্রস্তাব ও আলোচনা যেমন খুব তাড়াতাড়ি এই ধরণের সমস্যার সমাধান দেখাতে পারে, তেমনি পরিকল্পনাহীন, অ্যাড হক শান্তি প্রস্তাব অবস্থা আগের থেকে আরো খারাপ করে দিতে পারে। ভারত ও পাকিস্তানের শীর্ষনেতৃত্ব এতদিন ধরে যা করে আসছেন (হঠাৎ করে ধুমধাম সহ বৈঠক, কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পারা, এবং দীর্ঘ নীরবতা) তা আসলে সমস্যাকে জিইয়ে রেখে আরো খারাপ দিকে নিয়ে গেছে। সমাধানসূত্র খুঁজতে হবে ফর্মাল, ধারাবাহিক আলোচনায়। দুই দেশেরই সীমায় কোন পরিবর্তন আনার দরকার নেই, সেরকম দাবিও কেউ করেনি। আলোচনা এতদিন পর্যন্ত বারবার ভেস্তে যাওয়ার অন্যতম কারণ পাকিস্তানের "ক্রস বর্ডার টেররিজম"। একদিকে যেমন স্বাভাবিকভাবেই ভারতের এতে আপত্তি থাকার কথা, তেমনি এটাও বুঝতে হবে যে ইনফিলট্রেশন সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ করা সম্ভবত পাকিস্তানের নাগালের বাইরে। বরং দুই দেশের সরকারের পারষ্পরিক সহযোগিতায় যদি কাশ্মীরের স্থানীয় মানুষ হিংসার পথ থেকে সরে আসতে পারে সেটা আপনা থেকেই এই ক্রস বর্ডার জঙ্গী সংগঠনকে দুর্বল করবে।

তবে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ভারত নিতে পারে কাশ্মীরের মানুষকে তাদের বহু আকাঙ্খিত স্বাধীনতার স্বাদ দিয়ে। যেভাবে আর সমস্ত রাজ্যের মানুষ অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটে মন্ত্রীসভা গঠন করে, যেভাবে সেইসব রাজ্যবাসী, অন্তত খাতায় কলমে, সাংবিধানিক অধিকার দাবি করতে পারে সেভাবেই যদি রাষ্ট্র কাশ্মীরবাসীকে তাদের প্রাপ্য অধিকার ও সম্মান দিতে পারে তবেই তারা "আজাদ কাশ্মীরের" সহিংস আন্দোলনের বিকল্প পাবে। সত্যজিতের গুগাবাবায় হাল্লার চাষী বলেছিলো, যে রাজা খেতে দেয়না তারে খাজনা দেবে কি? কাশ্মীরের মানুষের কাছে যতদিন এই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক থাকবে ততদিন জল্লাদ ডাকা ছাড়া রাজার অন্য গতি নাই।

পরিশেষেঃ কাশ্মীর সমস্যার অন্য অনেক কারণের একটা যে তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং চীন ভারত পাকিস্তানের জি-পলিটিকাল ইন্টার‌্যাকশন তা সর্বজনবিদিত। এমনকি এই সমস্যায় রাষ্ট্রসংঘ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও আমরা জানি (একটা ছোট উদাহরণঃ মুশারফ কার্গিল যুদ্ধ বাঁধান, প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে তাকে আমেরিকা বলে ডিক্টেটর, আবার পরে তাকেই স্বীকৃতি দিয়ে ওয়ার অন টেরর শুরু হয়েছে)। সুতরাং নানান কারণে অকারণে এই ডায়নামিক্স পাল্টাবে। কিন্তু তার জন্য যুযুধান দুই দেশের মানুষের জীবনের দাম সেই সেই রাষ্ট্রের কাছে কমে যেতে পারেনা।

এই লেখা শুরু হয়েছিলো কাশ্মীর আজাদি কেন চায় জানতে, গুজবে ভর না করে সত্যিগুলো খতিয়ে দেখে তবেই কাউকে দেশদ্রোহী বা দেশপ্রেমী বলা যায় কিনা সেটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে। এই লেখার শেষে আমি একগুচ্ছ রেফারেন্স লিংক ও বইপত্রের নাম দেব। যদি পারেন, তাহলে আমার লেখা না পড়ে সেই বইপত্র ও আর্টিকল পড়ুন। ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা ও মেরুকরণের যুগে দাঁড়িয়ে বিচারটা জেনে করবেন কিনা সে সিদ্ধান্ত আপনারই।

(শেষ)










http://honesthistory.net.au/
https://www.wsws.org/en/articles/2015/01/08/hist-j08.html

http://www.trfa.org.uk/sixthform/wp-content/uploads/2014/07/HISTORY-Wh
at-is-history-E.H-Carr.pdf


http://www.thehindu.com/news/national/historians-archaeologists-schola
rs-call-for-unbiased-and-rigorous-new-historiography-of-india/article7
888794.ece


http://timesofindia.indiatimes.com/city/mangaluru/Hindutva-used-to-man
ipulate-religion-for-benefit-Romila-Thapar/articleshow/45988938.cms


http://www.salon.com/2015/11/04/i_am_a_rambo_bch_meet_the_drone_defend
er_who_hates_neo_cons_attacks_glenn_greenwald_and_may_have_conflicts_o
f_her_own/


http://www.india-seminar.com/2003/521/521%20romila%20thapar.htm

Living under Drones: Death, Injury, and Trauma to Civilians From US Drone Practices in Pakistan, Published by International Human Rights and Conflict Resolution Clinic of Stanford Law School (Stanford Clinic) and the Global Justice Clinic at New York University School of Law (NYU Clinic), 2012

“DENIED” Failures in accountability in Jammu and Kashmir, By Amnesty International Ltd, 2015

Our Moon has Blood Clots: The Exodus of the Kashmiri Pandits by Rahul Pandita, Vintage Books/Random House India, 2013

Curfewed Night: A Frontline Memoir of Life, Love and War in Kashmir by Basharat Peer, Random House, 2010

Kashmir: Roots of conflict, paths to peace by Sumantra Bose, Harvard University Press, 2005

Wikipedia.org



9215 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3] [4] [5] [6] [7] [8] [9] [10] [11] [12] [13] [14] [15] [16] [17] [18]   এই পাতায় আছে 336 -- 355
Avatar: ল্যাও

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

এবার গাঁটer এর সাথে গাঁটest এর লেগেছে
😷😷😷😷😷😷
Avatar: pi

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

Voicing serious concern over the situation in Kashmir, China on Tuesday asked India and Pakistan to exercise restraint and avoid actions that "unilaterally" change the status quo and exacerbate tensions between the two countries.

"China is seriously concerned about the current situation in Kashmir," Foreign Ministry spokesperson Hua Chunying said in a written response to media queries about the militaries of India and Pakistan exchanging fire along the Line of Control and the Indian government's move to revoke Article 370 which gave special status to Jammu and Kashmir.
Avatar: pi

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

কাশ্মীরীদের বক্তব্য তো কিছু পাওয়াই যাচ্ছেনা। এই পেলাম স্বল্প।

https://scroll.in/article/932937/existential-threat-kashmiris-react-to
-the-scrapping-of-states-special-status

Avatar: pi

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

Avatar: সৌম্য শাহিন

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

Opening a Window in Kashmir
Ramachandra Guha
World Policy Journal
Vol. 21, No. 3 (Fall, 2004), pp. 79-94
Published by: Duke University Press
https://www.jstor.org/stable/৪০২১০২৩৯


Avatar: Soumya Sahin

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

# Rupee falls again
# Investment is at 15 year low
# Stock market crashes to 17 year low
# Core sector growth is 4 year low
# Unemployment is highest in 45 years

Nation celebrates scrapping of article 370 and 35A.

#Priority_Sorted

Mark this day when millions celebrated one of the most grotesque distortions of their own democracy.

Mark the times when we willfully handed a chunk of our democracy to the whims and muscles of a few men and their toxic ideas.

Article 370 scrapped. State bifurcated. An entire people kept hostage in their own land in Kashmir.

The very idea of Jammu and Kashmir stems from Article 370, and receives attestation through its own Constitution. While people of India put certain restrictions on the power of the State when they constituted it, people of J&K (if we assume, this since Instrument of Accession was not routed through a popular mandate) put an additional condition by virtue of the Accession Instrument. The very condition for membership of the people of J&K to Indian territory is what is embodied in Article 370. Therefore, Indian Parliament, on legal grounds, does not have the power to pass such a legislation, let aside any executive order pertaining to it by the Government of India.

The valley and its undying spirit has survived a zillion brutaliities. It will survive this one too. What died today is yet another part of our own democracy.

We as a nation are cheering along. As did millions in Germany in the 1930s. We cheered our own impending demise.

References:

https://www.theindiaforum.in/article/article-370-federalism-and-basic-
structure-constitution


https://www.huffingtonpost.in/entry/article-370-not-technically-scrapp
ed-law-prof-explains_in_5d483bd8e4b0acb57fd0376b


https://www.thehindu.com/opinion/editorial/scrapping-jks-special-statu
s-is-the-wrong-way-to-an-end/article28827024.ece/amp/#aoh=156507922755
63&amp_ct=1565079236007&referrer=https%3A%2F%2Fwww.google.com&
amp;amp_tf=From%20%251%24s


https://indianexpress.com/article/explained/explained-article-370-has-
not-been-scrapped-but-kashmirs-special-status-has-gone-5880390/


http://indianexpress.com/article/opinion/columns/jammu-kashmir-article
-370-scrapped-special-status-amit-shah-narendra-modi-bjp-5880797/


https://m.hindustantimes.com/india/repealing-article-370-will-put-indi
a-in-tight-spot/story-WWfCtxCuM7AQJfSGbexTGK.html


https://www.bloomberg.com/opinion/articles/2019-08-06/u-k-and-india-na
tionalists-will-regret-brexit-and-article-370?srnd=premium-asia


https://www.bloomberg.com/opinion/articles/2019-08-05/india-s-eliminat
ion-of-kashmir-s-autonomy-will-backfire


https://thewire.in/diplomacy/article-370-india-china-diplomatic-spat-l
adakh-kashmir


https://thewire.in/law/constitution-torn-to-shreds-as-rss-indulges-art
icle-370-fantasy-in-kashmir

Avatar: S

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

Avatar: S

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

এই এস আমি নই।
Avatar: অর্জুন

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি


Caravan খুব ভালো ম্যাগাজিন।
Avatar: Swati Ray

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

ওহ স্যরি S ... ওই caravan এর লিঙ্ক দেওয়া Sটা আমি.লগড ইন ছিলাম না আর গোটা নামটা লিখতে ল্যাদ লাগছিল.
Avatar: Swati Ray

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

এই লিঙ্কটাও বেশ কাজের মনে হল, আরো বছর দশেক বাদে তুলনা করতে কাজে লাগবে

https://sabrangindia.in/article/who-more-developed-jammu-and-kashmir-v
is-vis-rest-india-some-figures

Avatar: PM

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

https://www.theguardian.com/commentisfree/2019/aug/06/the-guardian-vie
w-on-kashmir-danger-ahead


Guardian এর ভিএ টাও থাক। পরে মিলিয়ে দেখা যাবে
Avatar: দ

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

Avatar: ndtv

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

https://www.ndtv.com/india-news/united-nations-chief-antonio-guterres-
calls-for-maximum-restraint-on-kashmir-invokes-shimla-agreemen-2082522

UN chief Antonio Guterres on Thursday urged India and Pakistan to exercise "maximum restraint" and refrain from taking steps that could affect the status of Jammu and Kashmir, as he highlighted the Simla Agreement which rejects any third-party mediation on the issue.
https://www.ndtv.com/india-news/no-policy-change-on-kashmir-urge-india
-pak-to-maintain-calm-us-2082529

"No", replied State Department Spokesperson Morgan Ortagus when asked by reporters if there has been any change in America's policy on Kashmir.
The US policy has been that Kashmir is a bilateral issue between India and Pakistan and it is up to the two countries to decide on the pace and scope of the talks on the issue.


Avatar: Ndtv

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

https://www.ndtv.com/india-news/kashmir-move-within-framework-of-const
itution-russia-backs-india-on-j-k-2083150

Russia has backed India's move on Jammu and Kashmir, saying that the changes in the status are within the framework of the Indian Constitution and hoped that the differences between India and Pakistan are resolved bilaterally on the basis of the Simla Agreement and the Lahore Declaration.
Avatar: দ

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

Avatar: অর্জুন

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি


র গতকালের এই প্রগ্রামটা শুনলেই টের পাওয়া যাবে যে তারা চাপে আছে।


https://www.youtube.com/watch?v=1wf0ex3zpKQ
Avatar: দঃ

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

যখন মেইনস্ট্রীম মিডিয়া ভয়ে থরথর করে কাঁপছে তখন বিবিসি, আলজজিরা এরাই ভরসা। এই হল বিবিসির রিপোর্ট

https://www.bbc.com/news/av/49306816/article-370-tear-gas-at-kashmir-r
ally-india-denies-happened?SThisFB&fbclid=IwAR0iPmDnjyf8konwNCztaq
zYDoCl2SOZvDhYq40aWK6Q8-UvSosP8ZaqiUo

Avatar: ndtv

Re: রাজনৈতিক অস্থিরতা, কাশ্মীর, ও জনমত: আমরা কী জানি

https://www.ndtv.com/blog/nehru-killed-370-way-before-modi-buried-it-2
083849

তথ্যপূর্ণ লেখা , নেহেরু কে বিজেপি যতই বদনাম করুক ইতিহাস অন্য কিছু বলে , নেহেরু আমলে ৩৭০ ধারা নিয়েও ।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3] [4] [5] [6] [7] [8] [9] [10] [11] [12] [13] [14] [15] [16] [17] [18]   এই পাতায় আছে 336 -- 355


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন