RSS feed

দ'এর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • গল্পঃ রেড বুকের লোকেরা
    রবিবার। সকাল দশটার মত বাজে।শহরের মিরপুর ডিওএইচেসে চাঞ্চল্যকর খুন। স্ত্রীকে হত্যা করে স্বামী পলাতক।টিভি স্ক্রিণে এই খবর ভাসছে। একজন কমবয়েসী রিপোর্টার চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলছে। কথা আর কিছুই নয়, চিরাচরিত খুনের ভাষ্য। বলার ভঙ্গিতে সাসপেন্স রাখার চেষ্টা ...
  • মহাভারতের কথা অমৃতসমান ২
    মহাভারতের কথা অমৃতসমান ২চিত্রগুপ্ত: হে দ্রুপদকন্যা, যজ্ঞাগ্নিসম্ভূতা পাঞ্চালী, বলো তোমার কি অভিযোগ। আজ এ সভায় দুর্যোধন, দু:শাসন, কর্ণ সবার বিচার হবে। দ্রৌপদী: ওদের বিরূদ্ধে আমার কোনও অভিযোগ নেই রাজন। ওরা ওদের ইচ্ছা কখনো অপ্রকাশ রাখেন নি। আমার অভিযোগ ...
  • মহাভারতের কথা অমৃতসমান
    কুন্তী: প্রণাম কুরুজ্যেষ্ঠ্য গঙ্গাপুত্র। ভীষ্ম: আহ্ কুন্তী, সুখী হও। কিন্তু এত রাত্রে? কোনও বিশেষ প্রয়োজন? কুন্তী: কাল প্রভাতেই খান্ডবপ্রস্থের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। তার আগে মনে একটি প্রশ্ন বড়ই বিব্রত করছিল। তাই ভাবলাম, একবার আপনার দর্শন করে যাই। ভীষ্ম: সে ...
  • অযোধ্যা রায়ঃ গণতন্ত্রের প্রত্যাশা এবং আদালত
    বাবরি রায় কী হতে চলেছে প্রায় সবাই জানতেন। তার প্রতিক্রিয়াও মোটামুটি প্রেডিক্টেবল। তবুও সকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া, মানে মূলতঃ ফেবু আর হোয়াটস অ্যাপে চার ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখলাম। বলাই বাহুল্য সবগুলিই রাজনৈতিক পরিচয়জ্ঞাপক। বিজেপি সমর্থক এবং দক্ষিণপন্থীরা ...
  • ফয়সালা বৃক্ষের কাহিনি
    অতিদূর পল্লীপ্রান্তে এক ফয়সালা বৃক্ষশাখায় পিন্টু মাষ্টার ও বলহরি বসবাস করিত । তরুবর শাখাবহুল হইলেও নাতিদীর্ঘ , এই লইয়া , সার্কাস পালানো বানর পিন্টু মাষ্টারের আক্ষেপের অন্ত ছিলনা । এদিকে বলহরি বয়সে অনুজ তায় শিবস্থ প্রকৃতির । শীতের প্রহর হইতে প্রহর ...
  • গেরিলা নেতা এমএন লারমা
    [মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে লেখকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তার প্রায় এক দশকের গেরিলা জীবন। কারণ এম এন লারমাই প্রথম সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পাহাড়িদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখান। আর তাঁর ...
  • হ্যামলিনের বাঁশিওলা
    হ্যামলিনের বাঁশিওলার গল্পটা জানিস তো? একটা শহরে খুব ইঁদুরের উপদ্রব হয়েছিল। ইঁদুরের জ্বালায় শহরের লোকের ত্রাহি ত্রাহি রব। কিছুতেই ইঁদুর তাড়ান যাচ্ছেনা। এমন সময়ে হ্যামলিন শহর থেকে একজন বাঁশিওলা বাঁশি নিয়ে এল। শহরের মেয়রকে বলল যে উপযুক্ত পারিশ্রমিক পেলে সে ...
  • প্রেমের জীবন চক্র অথবা প্রেমিক-প্রেমিকার
    "তোমার মিলনে বুঝি গো জীবন, বিরহে মরণ"।প্রেমের চরম স্টেজটা পার করতে গিয়ে এই রকম একটা অনুভূতি আসে। একজন আরেকজনকে ছাড়া বাঁচে না। এই স্টেজটা যদি কোনভাবে খারাপের দিকে যায় তখন মানুষের নানা পাগলামি লক্ষ্য করা যায়। কখনো কখনো পাগলামিটা তার গন্ডি ছাড়িয়ে ছাগলামিতে ...
  • সত্যিটা
    প্রায়-শূন্য করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল তমালী। করিডোরের প্রান্তে হেডমিস্ট্রেসের ঘর। সেখানে মিটিং আছে। ক’দিন ধরে স্কুলে তোলপাড় চলছে। গুরুতর অভিযোগ। আজ সেই নিয়ে মিটিং। হেডমিস্ট্রেস ছাড়াও ম্যানেজিং কমিটির দু-একজন এসেছেন দেখেছে। আর আসার কথা অবন্তীর বাবা-মা’র। ...
  • অলৌকিক জিনিস আজও ঘটে
    অলৌকিক জিনিস আজও ঘটে। এই ঘটনা সত্যিই ঘটেছে, এক বর্ণ বানানো না। যে কেউ চেক করে আসতে পারেন। এক কবি কদিন আগে আমার কানে-কানে মানে ফোনে-ফোনে বলেছিলেন, সন্দীপনের পরেই তুমি। ভেবেছিলাম তিনি নির্ঘাত ইয়ার্কি করেছিলেন। কিন্তু আজ কাত্তিকের ফেবু খুলে দেখি কবি ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বাজম্-ই-শাহ্জাহানাবাদ

লালকিল্লা, দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস, জামা মসজিদ, চওরি বাজার, খারি বাওলি এই নামগুলোর সাথে পরিচয় সেই ক্লাস থ্রী ফোর থেকে| অর্ধেক শব্দের মানে বুঝি, অর্ধেক বুঝি না, কিন্তু শব্দগুলোর মধ্যে কী একটা আকর্ষণ আছে যা টেনে রাখে| আমার কল্পনায় আমাদের উঠোনের নারকেল গাছের নীচের নির্জন কোণা হয়ে যায় লাহোরি গেট আর নিতান্ত মধ্যবিত্ত বাড়ীর স্নানঘরটি একটাও আয়না না থাকা সত্ত্বেও হয়ে যায় শিশমহল| কিছু আত্মীয়স্বজন থাকতেন দিল্লীতে আরও কিছুজন যেতেন তাঁদের কাছে বেড়াতে আর এই যাওয়া আসার পরে পরেই শুনতাম এই নামগুলো আর সম্ভব অসম্ভব নানা গল্প| তা কল্পনার সেই লালকিল্লার সাথে আমার চাক্ষুষ পরিচয় হয় ক্লাস সেভেন নাগাদ; একদিনে দিল্লী ভ্রমণের ঝটিকাসফরে| ফরিদাবাদ থেকে সাত সক্কালে বেরিয়ে দিল্লী গিয়ে প্রথমেই যাওয়া হয় লালকিল্লা, গাইডেড ট্যুরে যতটুকু যা দেখার তা দেখতেই দলের অনেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েন --- "এই খালি খালি মস্ত মস্ত ঘর বারান্দায় দেখার আছেটা কী!" এবং তারপর জামা মসজিদ দেখা হয় না কারণ 'মসজিদের মইধ্যে আসেটা কী? অরার তো কুনো ঠাহুর দ্যাবতাও নাই যে দেখা যাইব, তো মসজিদ দেখনের কাম নাই, এই তো বাইর থেইক্যা দেখা যাইতাসে| বরং কালীবাড়ী গিয়া বসি একটু|" এর অনেক বছর পরে এই জায়গাগুলোর সাথে আমার অল্পস্বল্প চেনাশোনা হয়, যখন আমি দিল্লীতে থাকতে যাই বেশ কয়েক বছরের জন্য, ততদিনে অপছন্দের দলের সাথে গাইডেড ট্যুর নিতে বাধ্য হওয়া অন্য এক জন্মের গল্প হয়ে গেছে|

২০০৬ এর এক রোদ ঝলমলে শীতের দুপুরে সহকর্মী গোপাল এসে জানাল ও গত দুইরাত "বাজমঁমে বিতায়াঁ"| অ্যাঁ!! বলে কি রে লোকটা? বাজম্, মানে মেহফিল? রোজ অফিসে এসে আমাদের সাথে বসে কোবল কোড দ্যাখে, লেখে, আমাদের সাথেই আলুপরাঠা কিম্বা ছোলে বাটুরে খায়, সে কিনা দুই রাত মেহফিলে কাটিয়ে এল! গোপাল ভেঙে বলে হ্যাঁ মেহফিলই বটে, চাঁদনি চওকে 'বাজম্-ই-শাহজাহানাবাদ' নামে একটা উর্দু শায়েরীর সারারাত্রিব্যপী আসরের নাকি আয়োজন করে কারা যেন| ওর এক পরিচিত উর্দুভাষী অধ্যাপকের দৌলতে গোপালও সেখানে নিমন্ত্রিত ছিল| গোপালই জানায় বাজম্ শবের অর্থ শুধুই মেহফিল বা নাচগান, শায়েরীর আসর নয়, যে কোনোরকম সোশ্যাল গ্যাদারিংকেই “বাজম্” বলা যায়| প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঠিক হয়ে যায় আগামী শনিবার আমাদের টীমের আমরা জনা সাত আট মিলে পুরানা দিল্লীর চাঁদনি চওক অঞ্চলে যাব আমাদের নিজস্ব বাজম্-ই-শাহজাহানাবাদ জমাতে| দুপুর নাগাদ যাওয়া হবে, ঘুরে বেড়ানো হবে মূলত জামা মসজিদ, চাঁদনি চওক, পরাঠেওয়াল্লে গলি এলাকায়| করিমস'এ দুপুরের খাওয়াটা হবেই সেটা স্থির, এছাড়া যখন যেমন খিদে পাবে বা খেতে ইচ্ছে হবে, তক্ষুণি সেখানে খেয়ে নেওয়া হবে| অথেন্টিক মোগলাই খাবারদাবারের অজস্র দোকান ঐ অঞ্চলে কাজেই অসুবিধে নেই কোনও|

শাহজাহানাবাদ তৈরী হয়েছিল ১৬৪০ নাগাদ, আগ্রাদুর্গে তীব্র গরম ও স্থানাভাবে মুঘল সম্রাট শাহজাহান স্থির করেন রাজধানী দিল্লীতে স্থানান্তরিত করবেন আর তখনই গড়ে ওঠে যমুনার তীরে প্রায় গোলাকৃতি উঁচু পাঁচিলঘেরা শহর শাহজাহানাবাদ| শাহজাহান এই শহরে পাকাপাকিভাবে চলে আসেন ৮-ই এপ্রিল ১৬৪৮ খ্রীস্টাব্দ| লালকিল্লা ও তার ভেতরের রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ী তৈরী করতে আনুমানিক ব্যায় হয়েছিল প্রায় ৬০ লক্ষ তঙ্কার মত| জামা মসজিদ তৈরীর খরচ প্রায় দশ লক্ষ তঙ্কা| শাহজাহানের প্রিয় কন্যা জাহানা-আরা বেগমের বানানো নকশা অনুযায়ী লালকিল্লার লাহোরি গেট থেকে শুরু হয়ে অপর প্রান্তের্ ফতেপুরী মসজিদ পর্যন্ত বর্গক্ষেত্রাকৃতি বাজার চাঁদনি চওক তৈরী হয়, যার ঠিক মাঝখানে একটি তালাও বা জলাশয়| চাঁদনিরাতে তালাওয়ের জলে প্রতিফলিত চাঁদ নাকি অপূর্ব্ব মায়াজাল সৃষ্টি করত| চাঁদনি চওক গড়ে ওঠে পাইকারি বাজার বা ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে, আজও এটি শহরের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাকেন্দ্র| মুঘল আমলে দোকানগুলি ছিল অর্ধচ্ন্দ্রাকারে সাজানো যা কোনও কারণে আজ আর দেখা যায় না| ঐ তালাওয়ের জায়গায় ১৮৭০ নাগাদ তৈরী হয় ঘন্টাঘর (নর্থব্রুক ক্লকটাওয়ার), যার শীর্ষে ১৯৪৭ সালের ১৫-ই আগস্ট ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করে স্বাধীন ভারতের আত্মপ্রকাশ ঘটে| এখানে বিভিন্ন ধর্মের ধর্মস্থানও অনেকগুলো| সবচেয়ে বড় ও উল্লেখযোগ্য অবশ্যই মুসলমানদের জামা মসজিদ| এরপর আছে জৈনদের শ্রী দিগম্বর জৈন লালমন্দির, হিন্দুদের গৌরীশঙ্কর মন্দির ও শ্রী শিব নবগ্রহ মন্দিরধাম, ক্রীস্টানদের সেন্ট্রাল ব্যপটিস্ট চার্চ, শিখদের সিসগঞ্জ সাহিব গুরুদ্বোয়ার এবং আরও দুটি মসজিদ, সুনহেরি মসজিদ ও ফতেপুরী মসজিদ| কথিত আছে ১৭৩৯ সালের ১১-ই মার্চ এই সুনহেরি মসজিদের ছাদে দাঁড়িয়েই নাদির শাহ্ ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে 'কতল-ই-আম' (দেখামাত্রই কোতল) পর্যবেক্ষণ করেন| আনুমানিক ৩০ হাজারের মত লোক ঐ একইদিনে কোতল হয়|

তো, যেমন ঠিক হয়েছিল সেইমতই আমরা বিভিন্ন থেকে এসে জমা হলাম লালকিল্লার সামনে| সর্বসম্মতিক্রমে লালকিল্লাটা কাটিয়ে দিয়ে হাঁটা শুরু হল| চাঁদনি চওক প্রথমবার ভাল করে দেখে খানিক বিরক্তই লেগেছিল| এ যেন এক মহা ক্যাওস, অজস্র অজস্র দোকান, রাস্তায় উপচে পড়েছে পশরা, তার মধ্যেই লোকজন চলছে, সাইকেল রিকশা আটোও চলছে যে যার মত| আবার তারই মধ্যে দুই তিনজন রাস্তার যে কোনও জায়গায় দাঁড়িয়ে আড্ডা মারছে কিম্বা কোনও গম্ভীর আলোচনা করছে| কোথাও বা নির্বিকার একটা ষাঁড় দাঁড়িয়ে আছে আর ততোধিক নির্বিকার মানুষজন তাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে| খানিক হাঁটার পরে অবশ্য বুঝলাম যে এখানে হাঁটার সময় অটো, সাইকেল রিকশা বা অন্য মানুষজন কাউকেই খুব একটা পরোয়া করার দরকার নেই, নিজের মত হেঁটে গেলে আশপাশ তার সাথে মানিয়ে নেয়| অবশ্য দোকানদারদের ডাকাডাকি চলতেই থাকে, বরং নিজের রেলায় চলতে থাকলে ডাকাডাকির জোর আরও বাড়ে, তায় আবার আমরা ৯ জনের এক দল| সে যাহোক দিগম্বর জৈন মন্দির, গৌরীশঙ্কর মন্দির ইত্যাদি পেরিয়ে গিয়ে একেবারে চাঁদনি চওক আর দরিবা কালান রোডের কোণায় 'জলেবিওয়ালা'র দোকানে গিয়ে থামা| শতাব্দীপ্রাচীন দোকানের মুচমুচে গরম জিলিপী খেয়ে টুক করে দরিবা কালান রোডের জুয়েলারি মার্কেটে ঢুকে পড়া গেল| অজস্র ছোটবড় রূপোর গয়নার দোকান, অল্পকিছু স্বর্ণালঙ্কারও আছে আর আছে বিভিন্ন ধরণের পাথর আর কস্টিউম জুয়েলারি| খানিক এগিয়ে যাওয়া গেল পরাঠেওয়াল্লে গলিতেও| কত যে বিচিত্র জিনিষের পরাঠা ওরফে পরোটা হতে পারে তা এখানে না এলে বিশ্বাস করতাম কিনা সন্দেহ| যে দুই রকম পরোটা সত্যিই দুর্দান্ত লাগল তার একটা পাঁপড় কা পরাঠা আর অন্যটা রাবড়ি পরাঠা| আজ পর্যন্ত আর কোথাও অত ভাল রাবড়ি পরাঠা খাই নি|

খাবার দাবারের কথা হচ্ছে যখ্ন ত্খন আরেকটু বিশদে বলা যাক বরং| ফতেপুরী মসজিদের কাছেই 'জিয়ানি দি হত্তি'র কথা না বললে ভীষণ পাপ হবে| এদের বিশেষত্ব হল রাবড়ি-ফালুদা আর শীতের দিনে দাল-হালওয়া| মিষ্টিছাড়া দুধের রাবড়ি, গুঁড়ো চিনি অথবা সুইটনার, গুঁড়ো বরফ আর ফালুদা একসাথে মিশিয়ে গ্লাসে ঢেলে একটা পাতলা ফিরফিরে প্ল্যাস্টিকের স্বচ্ছ চামচ দিয়ে ধরিয়ে দেয় রাবড়ি-ফালুদা| খাঁটি দুধের রাবড়ির সুগন্ধ আর ফালুদার টেক্সচার যখন জিভে পড়ে, সে এক অবিস্মরণীয় অনুভুতি| দাল-হালওয়া স্রেফ শীতের দিনে পাওয়া যায়| মস্ত বড় থালায় ছড়ানো ঘী চপোঅচপে হালওয়া আর তার ওপরে আমন্ড পেস্তা কাজুর একটা পুরু স্তর| থালার একপাশ দিয়ে কমলাচে সোনালী রঙের হালওয়া খানিক দেখা যায় আর বাকীটা সম্পূর্ণ ঢাকা ঐ ড্রাইফ্রুটসের স্তরের নীচে| এটি পরিবেশনের তরিকা হল একটা প্লেটে প্রথমে এক খাবলা হালওয়া নিয়ে তার ওপরে খানিক ড্রাই ফ্রুটস দিয়ে তারওপরে খানিকটা অর্ধতরল ঘী (যেটা থালার ধারের দিকে গড়িয়ে এসে জমা হয়ে থাকে) দিয়ে খুব হালকাহাতে মিশিয়ে প্লেটটা খদ্দেরকে ধরিয়ে দেওয়া| আহা খাঁটি ঘীয়ের গন্ধে মৌ মৌ সেই হালওয়া যে একবার অন্তত না খেয়েছে তার চাঁদনি চকে যাওয়াই বৃথা| ফতেপুরী মসজিদের কাছেই দুশো বছরের পুরানো আরেকটি দোকান চায়নারাম সিন্ধি হালওয়াই| এদের করাচী হালওয়া অতীব সুখাদ্য| এই করাচী হালওয়া পশ্চিমবঙ্গের কোনও কোনও বিয়েবাড়ীতে 'বোম্বাই হালুয়া' নামে খেয়েছি কমলা সবুজ লাল ইত্যাদি রঙের একধরণের জেলিগোছের খেতে কিছুটা স্পঞ্জি টেক্সচার -- অখাদ্যগোছের একটা ব্যপার| সেই অভিজ্ঞতার্ফলে চেহারা দেখে করাচী হালওয়া মুখে তুলতে চাই নি প্রথমে| কিন্তু সকলের আহাউহু দেখে একটা মুখে দিয়ে দেখি কোথায় বা সেই স্পঞ্জিভাব আর কোথায় বা সেই কিটকিটে মিষ্টি! হালকা মিষ্টিস্বাদের নরম হালওয়া, মুখে দিলে জিভের চাপেই ভাঙতে থাকে| মিষ্টি ছেড়ে একটু অন্যদিকে গেলে করিমসের কথা তো নতুন করে বলার কিছু নেই| শুধু এইটুকু বলে রাখি যে গুরগাঁও বা নিজামুদ্দিনের করিমসে খাওয়ার অভিজ্ঞতার থেকে এখানকার করিমসের অভিজ্ঞতা একেবারে আলাদা| ঐ রাস্তার ওপরে উনুনে ছুঁড়ে ছুঁড়ে বানানো ঈষৎ মিষ্টিস্বাদের নান, যা মুখে দিলেই মিলিয়ে যেতে চায় আর ঐ মস্ত মস্ত হাঁড়িতে রান্না হওয়া ঘী চপচপে বিরিয়ানি কিম্বা মাটন ব্যুরা অথবা মাটন রান, শিককেবাব একবার অন্তত খেতেই হয়|

রাবড়ি-ফালুদা (নেট থেকে পাওয়া ছবি)


http://www.foodnculture.com/wp-content/uploads/2014/06/rabri-faluda.jp
g


শেষ যে অংশটার কথা না বললেই নয় সে হল খারি বাওলি, মূলত মশলার বাজার| ফতেপুরী মসজিদের গা লাগা রাস্তাটা, চাঁদনি চওকের পশ্চিমপ্রান্তে এশিয়ার সবচেয়ে বড় মশলা আর ড্রাইফ্রুটসের মার্কেট এই খারি বাওলি| বাওলি অর্থাৎ ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া চোট জলাশয় আর খারি বা খারা অর্থৎ নোনতা| শাহজাহানাবাদ গড়ে ওঠার আগে এখানে নোনতা জলের একটি জলাশয় ছিল মূলতঃ জন্তু জানোয়ারকে চান করানো বা জল খাওয়ানোর জন্য ব্যবহৃত হত| ১৬৫০ নাগাদ এইখানে গড়ে ওঠে মশলার পাইকারি বাজার যা এখনও রমরম করে চলছে| এই রাস্তায় পা দেওয়ামাত্র দোকানীরা সরবে জানালেন এখানে নাকি সারা পৃথিবীর সব রকমের মশলা ও শুকনো ফল পাওয়া যায়| মশলা ছাড়াও এখানে কিছু সবজীর দোকানও আছে আর আছে বেশ কিছু দুগ্ধজাত দ্রব্যের দোকান| মাওয়া, ঘী, মাখন, পনির বিক্রী হচ্ছে| তাই বলে জায়গাটা ছানার জলে একাকার হয়ে নেই, খুব পরিস্কার নয় বটে তবে জলে জলাক্কারও নয়| এখানেই এক দোকানে খেলাম 'দৌলত-কা-চাট'| নামে চাট হলে কি হবে পাপড়ি চাট বা অন্যান্য চাটগোত্রের জিনিষ নয় এ| মটকি বা ঘট আকৃতির মাটির ভাঁড়ে ঈষদুষ্ণ আধাঘন দুধক্রীম আর তাতে সরু করে কাটা পেস্তা আমন্ড কাজু কিশমিশ, অল্প মাওয়া, জাফরান মেশানো| রূপোলী তবক দেওয়া অদ্ভুত অন্যরকম স্বাদের এক স্বর্গীয় খাদ্য| এও শীতের দিন ছাড়া মেলে না| ১২ টাকায় এক প্লেট অমৃত| খারি বাওলির অন্য প্রান্ত জুড়ে আছে দিল্লীর লালবাতি এলাকা আর সদর বাজার| অসম্ভব বর্ণময় জায়গা এই খারি বাওলি, বিভিন্নরকম মশলা আর শুকনো ফলের রঙে ঝলমল করে আর এক অদ্ভুত গাঢ় সুগন্ধে ছেয়ে থাকে| প্রায় ২৫ বছর বাদে এখানেই দেখলাম রিঠাফল|ছোটবেলায় মাথা ঘষবার আগের রাতে রিঠা ভিজিয়ে রাখা হত, পরেরদিন সকালে ফলগুলি কচলে কচলে নির্যাস বের করে নির্যাসমেশানো সেই জলটা ভাল করে ছেঁকে নিয়ে তাই দিয়ে মাথা ঘষা হত| এ ছিল শ্যাম্পুর স্যাশে বাজারে আসার আগের গল্প| এত ঝকমারির কারণেই তখন মাসে একবারের বেশী মথা ঘষা প্রায় হতই না, মাঝে বিয়েবাড়ী না থাকলে| এতদিন বাদে সেই রিঠাফল দেখে সেইসব দিনগুলো আবার হইহই করে মনে পড়ে গেল|

আমাদের নিজস্ব বাজম্ শেষ হওয়ার আগে আমরা একবার যাই তুর্কমান গেটে| এই সেই অতি কুখ্যাত এলাকা যেখান থেকে উচ্ছেদ করতে গিয়ে সঞ্জয় গান্ধীর পুলিশ ১৯৭৬ এ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অসংখ্য লোক মারে| শোনা যায় সঞ্জয় গান্ধী নাকি তুর্কমান গেট থেকে কোনও বাধা ছাড়া সোজাসুজি জামা মসজিদ দেখতে চেয়েছিলেন আর তাই পুলিশ নামে 'অবৈধ বসবাসকারী'দের উচ্ছেদ করতে| দীর্ঘকাল মিউনিসিপাল ট্যাক্স দেওয়া, বৈধ কাগজপত্রওয়ালা লোকজনদের ঘরবাড়ী যখন বুলডোজারের নীচে গুঁড়িয়ে যেতে থাকে তখন ক্ষেপে ওঠে জনতা, লাঠিসোঁটা পাথর যে যা পারে তাই নিয়ে প্রতিরোধ করতে নামে আর তখনই এলাকার সমস্ত ইলেকট্রিক ও টেলিফোন কানেকশান বিযুক্ত করে বড় বড় ফ্লাডলাইট জ্বেলে পুলিশ প্রথমে নির্বিচারে গুলি চালায় পরে নির্বিচারে গুঁড়িয়ে দেয় সমস্ত সেটেলমেন্ট| সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে কত লোক, পরিবার, মুছে গেছে সঞ্জয় গান্ধীও, শাহজাহনাবাদের জীবন কিন্তু বহমান, সাড়ে তিনশো বছর ধরে অনেক ওঠাপড়ার সাক্ষী থেকে একই রকমভাবে বয়ে চলেছে শাহজাহনাবাদের প্রাণস্পন্দন|


# লেখাটির সংক্ষিপ্ত অংশ 'এই সময়' পত্রিকার রবিবারোতারি'তে ৬-ই ডিসেম্বার প্রকাশিত
গোপালের মোবাইলে তোলা কয়েকটা ছবি


https://lh3.googleusercontent.com/-EjknQ33NU3M/RbEKsj7CBgI/AAAAAAAACzw
/cLZxm19zv_w/s640-Ic42/Jama%252520masjid.jpg



https://lh3.googleusercontent.com/-2lday6FY5FA/RbEJOD7CA_I/AAAAAAAACzw
/V1ptMgXWFJg/s640-Ic42/Jama%252520masjid%252520entrance.jpg



https://lh3.googleusercontent.com/-_y7r4wnnQKY/RbEKfD7CBaI/AAAAAAAACzw
/8AjdbcgvEgU/s640-Ic42/Jama%252520masjid%252520-%252520Amezing.jpg



https://lh3.googleusercontent.com/-buzl3d_ZPmM/RbELIz7CBqI/AAAAAAAACzw
/A-FBz1SjQrE/s640-Ic42/Safdarjung%252520Tumb%252520-%252520Minar.jpg



https://lh3.googleusercontent.com/-r0Atlccbumc/RbEKdj7CBZI/AAAAAAAACzw
/91tDGbp4nik/s640-Ic42/Image%252528095%252529.jpg



https://lh3.googleusercontent.com/-ufsv85NZIY4/RbELBD7CBnI/AAAAAAAACzw
/Ym2BQMYHlss/s640-Ic42/Image%252528096%252529.jpg



https://lh3.googleusercontent.com/-95rpuaLBrS4/RbEKDz7CBPI/AAAAAAAACzw
/IRJLn4V50iI/s640-Ic42/Image%252528065%252529.jpg


https://lh3.googleusercontent.com/-XRIDe5Mk_AY/RbEJtj7CBII/AAAAAAAACzw
/s7ZBkGiSNYA/s640-Ic42/khaaike%252520paan%252520.....jpg


561 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: Abhyu

Re: বাজম্-ই-শাহ্জাহানাবাদ

খুব সুন্দর
Avatar: হুম্

Re: বাজম্-ই-শাহ্জাহানাবাদ

ভালোই, তবে একটু নীরস বর্ণনা লাগল। একটু প্যারাগ্রাফ ব্রেকিং দিলেই ছন্দ এসে যেত। একটানা পড়তে গিয়ে কেমন দমবন্ধ হয়ে আসছিল।
Avatar: hu

Re: বাজম্-ই-শাহ্জাহানাবাদ

লেখাটির আসল অংশই তো এই সময় থেকে বাদ পড়েছে দেখছি!

যাই হোক, যেটা বলার ছিল - এই হালওয়া জিনিসটা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি হলেও মোক্ষ লাভ করেছে ভারতে এসে। টিমের ইরানী বন্ধুর সাজেশানে ইরানী হালওয়া খেয়েছি। সে বড় শক্ত আর কিটকিটে মিষ্টি। আর তুরস্কে গিয়ে সুজির হালওয়া খেলাম কেমন পানসে মত। আমাদের মোহনভোগের পাশে দাঁড়াতেই পারবে না। ভারতের তেল-ঘি-দুধ-মাখন-ছানা খেয়ে এদের সবার স্বাদ খুলেছে।
Avatar: শ্রী সদা

Re: বাজম্-ই-শাহ্জাহানাবাদ

বেশ ভালো লাগলো।
যা বুঝলাম, একটা দিল্লী ট্রিপ করতে হবে জাস্ট খাওয়াদাওয়ার জন্যে ঃ)
Avatar: b

Re: বাজম্-ই-শাহ্জাহানাবাদ

বাল্লিমারান। সেখানে আমার কিছু বন্ধু গিয়ে খেয়ে এসেছিলো একটা গেস্টহাউসে, যেখানে নাকি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আফগান ব্যবসায়ীরা এসে থাকে। যা অর্ডার করে সবকিছুর সাথেই নান কমপ্লিমেন্টারী।

এখানে কাবলিদার কিছু কমেন্ট আশা করছি। উনি নাকি বড় হয়েছেন "তিন, জামা মসজিদ" এই ঠিকানায়।
Avatar: ম

Re: বাজম্-ই-শাহ্জাহানাবাদ

বেশ লাগলো, যদিও আমি হালওয়া রসে বঞ্চিতঃ)

Avatar: de

Re: বাজম্-ই-শাহ্জাহানাবাদ

আহা! কি ভালো সব খাবারদাবার!
Avatar: ranjan roy

Re: বাজম্-ই-শাহ্জাহানাবাদ

দুই দশকের দিল্লির বাসিন্দা এবং দিল্লিতে স্থায়ী বসবাস করনেওয়ালা সিকি এবার দিল্লির বিভিন্ন খাবার ও তার দোকানের ওপরে একটা লেখা নামিয়ে ফেলুক।
ও সিকি!
আর সঙ্গে যদি কুমু/ফরিদা/রাজদীপ ধরতাই দেয় তো সোনায় সোহাগা।
আমার অনুভূতি যে দিল্লি একটা অসব্যের মত খাবার জায়গা। ভ্যারাইটিতে কোলকাতাকে দশ গোল দেবে।
ভয়ে ভয়ে বল্লাম।
Avatar: ন্যাঃ

Re: বাজম্-ই-শাহ্জাহানাবাদ

কলকাতায় খাবারের গল্পটা অন্যরকম, দিল্লিতে একেবারে অন্যরকম। কেউ কারুকে গোল দেবার পজিশনে নেই।
Avatar: Blank

Re: বাজম্-ই-শাহ্জাহানাবাদ

এইবারে খাবো সব কটা।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন