উদয়ন ঘোষচৌধুরি RSS feed

মোদ্দা ব্যাপার হল, বাঙালি সব জানে। সব মানে, সঅঅঅব। ব্রহ্মা যা জানে না, বাঙালি তা-ও জানে। মোদী থেকে মারাদোনা – লাইফে কে কি করতে পারল না, বাঙালি জাস্ট একটা বিড়ি খেতে খেতে বলে দেবে। উদয়ন বাঙালি, তাই সে-ও সব জানে। অন্তত সেরকমই মনে করে সে। সিনেমা নিয়ে, বইপত্র নিয়ে, বেড়ানোর গপ্পো নিয়ে, আর আরও হ্যানত্যান ইত্যাদি নিয়ে প্রচুর ভাঁটায়। সেইসব বুকনিবাতেলা এবার আপনার ক্লিকে। প্রকাশিত বই : উদোর পিণ্ডি, সৃষ্টিসুখ, ২০১৪; লিঙ্গ নেই মৃত্যু নেই, উবুদশ, ২০১২

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা... বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার দিন
    বিএনপি এখন অস্তিত্ব সংকটে আছে। কিন্তু কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। ক্ষমতার তাপে মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল দলটার। ফলাফল ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড মেরে হত্যার চেষ্টা। বিরোধীদলের নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা করলেই ...
  • তোমার বাড়ি
    তোমার বাড়ি মেঘের কাছে, তোমার গ্রামে বরফ আজো?আজ, সীমান্তবর্তী শহর, শুধুই বেয়নেটে সাজো।সারাটা দিন বুটের টহল, সারাটা দিন বন্দী ঘরে।সমস্ত রাত দুয়ারগুলি অবিরত ভাঙলো ঝড়ে।জেনেছো আজ, কেউ আসেনি: তোমার জন্য পরিত্রাতা।তোমার নমাজ হয় না আদায়, তোমার চোখে পেলেট ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ২
    বার্সিলোনা আসলে স্পেনের শহর হয়েও স্পেনের না। উত্তর পুর্ব স্পেনের যেখানে বার্সিলোনা, সেই অঞ্চল কে বলা হয় ক্যাটালোনিয়া। স্বাধীনদেশ না হয়েও স্বশাসিত প্রদেশ। যেমন কানাডায় কিউবেক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মনে হয় এরকম একটা জায়গা থাকে, দেশি হয়েও দেশি না। ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ১
    ঠিক করেছিলাম আট-নয়দিন স্পেন বেড়াতে গেলে, বার্সিলোনাতেই থাকব। বেড়ানোর সময়টুকুর মধ্যে খুব দৌড় ঝাঁপ, এক দিনে একটা শহর দেখে বা একটা গন্তব্যের দেখার জায়গা ফর্দ মিলিয়ে শেষ করে আবার মাল পত্তর নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ভোর রাতে রওনা হওয়া, আর এই করে ১০ দিনে ৮ ...
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

হৃদয় বুঝেছে অনুপম

উদয়ন ঘোষচৌধুরি


বুকের বাঁ দিকে একটা মাছ তড়পায়। মাঝে-মাঝেই। তড়পানি থামাতে বেরিয়ে পড়া এদিক-ওদিক। কখনও কখনও ঠিকও থাকে না। সেটাই হল এবারও। হাওড়া থেকে রাতের ট্রেনে। সাতসকালে আদ্রা। কোথায় যাব, জানি না। ব্যাগ পিঠে হাঁটছি। দূরে জয়চণ্ডী পাহাড়। শেষ মাঘের নরম কুয়াশা। শান্ত রাস্তা। দু পাশের বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠ বড় ঝিল চিরে চলে গেছে সোজা। ডান দিকটা পূব। জয়চণ্ডীগড় স্টেশন। কুসুম রঙের জামায় ঈশ্বর উঠছেন। কাঁধে বাপির আলতো টোকা। ইশারায় দেখি, হাইটেনশন লাইনের ওপর আশ্চর্য নীল পাখিটা। কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। নিজের মনে দেখছে নিজের সকাল। আমরা দাঁড়িয়ে পড়েছি। শহরে অবাঞ্ছিত আর এখানে অযাচিত – আমাদের দিকে ফিরেও দেখছে না ও! কোনও নির্ভীকের মতোই হঠাৎ উজ্জ্বল ডানা মেলে উড়ে এল মাঠের ওপর। আবার বসল। উৎফুল্ল চন্দ্রানীর ক্যামেরায় চোখ। আর কে যেন ফিসফিস করছে আমার মস্তিষ্ক-কোষে :

হে আকাশ, হে সময়গ্রন্থি সনাতন,
আমি জ্ঞান আলো গান মহিলাকে ভালোবেসে আজ;
সকালের নীলকণ্ঠ পাখি জল সূর্যের মতন।

তিন লাইনের এই ছবিটা যে ঠিক কিরকম হতে পারে, আশ্চর্য সেই সকাল দ্যাখাল আমাকে। কেউ কেউ বলেন, প্রকৃত একটা কবিতা বুঝতে এক জীবনও লাগতে পারে। কথাটা, হতে পারে, সত্যি। হতে পারে, আঁতলামি। জানি না। তবে, এটুকু মনে হয়, আমার এই জীবনটা যদি মিলিয়ে দিতে পারি আরও কারুর জীবনের সঙ্গে, হয়ত তাহলে বোঝা অনেক সহজ। হতেই পারত, ওই ছবিটা আমি দেখিনি। অন্য কেউ যদি দ্যাখেন, আর বুঝিয়ে দ্যান আমাকে? সেরকম এক আশায় (এক অর্থে, লোভ) পাতা খুলেছি 'সোনালি ডানার চিল'-এর।

নামকরণেই ধরতাই, জীবনানন্দের জীবনাশ্রয়ী এই উপন্যাস। আপাতব্যর্থ প্রার্থনাগানের মতো যে জীবন আড়ালে। এমন একজনকে নিয়ে এই কাহিনি, যার বাঁচাটা একেবারেই হিরোয়িক ছিল না। কেমন যেন পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানো। শহর থেকে। জীবিকা থেকে। সম্পর্ক থেকে। সারাজীবন পালাতে পালাতে ধুঁকতে ধুঁকতে মৃত্যু। সেভাবে কেউ জানল না। বউ বলল, কবিতাকে না হয় অনেক কিছু দিল! আমাকে কি আর দিল! সংসার-পালনে অক্ষম স্বামীর প্রতি তিতিবিরক্ত সে। মেয়ে বড় হয়ে গেছে। বিয়ের কোনও জোগাড় নেই। মহানগরের বুকে বউ একসময় বেছে নিতে চাইল অভিনেত্রীর পেশা। (উদারমনাদের বলি, এ হল সেই সময়, ওই পেশাকে যখন কেউই সুনজরে দেখত না।) জাস্ট বাধ্যবাধকতাটা ভাবতে গেলে কেঁপে যেতে হয়।

অথচ লোকটা কুঁড়ে নয়। মাথামোটা নয়। সে যুগের তুলনায় বেশ তুখোড় পড়াশোনা। কেন কে জানে, ভাল চাকরি পেয়েও লোকটা করে উঠতে পারে না! কে যেন খামচায়! সে জানে, ভুল হচ্ছে। ভুল হয়ে যায়। তবু সে ঠ্যাকাতে পারে না। ছোটবেলা থেকে নিজেকে আয়নায় দ্যাখে। এই মুখ এই গঠন তার পছন্দ নয়। লজ্জা পায় সে নিজেকে নিয়ে। একা থাকতেই খানিক ভাল লাগে তার। আর এভাবেই একসময় অজান্তে পেয়ে যায় মুখচোরার খ্যাতি।

একা হয়ে পড়ছিলেন লেখকও। প্রতিটি মানুষেরই, মনে হয়, কোনও না কোনও সময় আসে এই একাকীমনন। রাত্রির গড়িয়ে যাওয়া টের পেতে পেতে একদিন, এক বন্ধুর পরামর্শে, লেখক ঢুকে পড়েন ওই লোকটার জীবনে। ভূমিকায় তেমনই বলেছেন তিনি। ‘অন্ধকারের কবি’ ‘অচরিতার্থ প্রেমের কবি’ ‘হতাশার কবি’ ‘মৃত্যুময়তার কবি’ বলে ছাপ্পাই মারা হয়েছিল যাকে। লেখক দেখলেন – যেন প্রায় আবিষ্কার করলেন – সে ছিল এক রক্তমাংসের মানুষ। যন্ত্রযাপনের যে যুগে যখন কেউই আর প্রকৃত সৎ নয়, তখন কোনও ‘কবি’-ই বা কিভাবে হবেন! লেখক তাকে চিরে নিলেন একেবারে নিজের পাঁজরের মতন। হ্যাঁ, এভাবেই আপন করে লোকটাকে পেলেন লেখক। দ্যাখালেন আমাদের। কয়েকটি উদাহরণ : প্রাকবৈবাহিক প্রেমিকার ঘরে শৃঙ্গারমুহূর্তে মেয়েটি এড়িয়ে যায় শরীর খারাপের কারণে (লোকটির ডায়েরি থেকে আন্দাজ হয়, প্রেমিকা রজঃবেদনাকাতর)। যদিও কার্যত বেকার, তবু বিয়ের লোভে, হবু-স্ত্রীর কাছে সে কথা চেপে যায় লোকটা। এদিকে কামশীতল স্ত্রী হরহামেশা বিরক্ত স্বামীর পরশে। লোকটি জানতে চায়। বৌ বলে, অনটনের ভাঁড়ারে অবাঞ্ছিত আরেকটি গর্ভসঞ্চারের ভয়। রোজগারে অপারগ লোকটি বেছে নিতে যায় জীবনবীমা বেচার কাজ। নিজেকে যে বেচতে পারে না, সে আর কোন কাজে লাগে! একসময় কবিতাও ছেড়ে যায় তাকে। অনেকদিন লেখা বন্ধ থাকে। মাঝে কিছু গল্প উপন্যাসের ব্যর্থ চেষ্টা – যা শুধু ট্রাঙ্কবদ্ধই হয়ে থাকে। নিশুতি রাতে একা-একা ঘুরে বেড়ায় সে। খুঁজে বেড়ায় ফেলে আসা বরিশালের ছোট্ট কুমোরপোকা। মানুষের মতো এই পোকাটাও গোটা জীবন লাগিয়ে দ্যায় একটা সুস্থ ঘর বানাতে। হাঁটতে হাঁটতে লোকটা এসে দাঁড়ায় প্রতিবেশী গৃহস্থালির জানলায়। অন্ধকারের আলোতে দ্যাখে আবদ্ধ দুই নরনারীর সঙ্গমস্নান। শুনতে পায় স্নিগ্ধশীৎকার। ইন্দ্রিয় পুড়তে থাকে তার। প্রার্থনা করে, তার স্ত্রীরও যেন জুটে যায় কোনও যোগ্য প্রেমিক। এমনকি এ-ও ভাবে, তরুণী মেয়ে ও প্রাক-প্রৌড়া মা পেয়ে যাক কোনও একই পুরুষ – অন্তত তাতেও যদি শান্তি পায় পৃথ্বী!

এসব তো হল কাহিনি-বিন্যাস। এবার একটু নির্মাণ দেখি। চরিত্রায়নে গভীর মুনশিয়ানা। মানসপটের খোঁজে লেখক ঘেঁটে ফেলেছেন জীবনানন্দ-সম্পৃক্ত তাবৎ উপাদান, শিল্প-ভাবনা, স্ত্রী-ভাই-বোন-বন্ধুসহ অন্যদের স্মৃতিকথা। লোকটা কবিতা লিখত বলে অযথা তাকে ঋষি বা দেবতা বানিয়ে দ্যাননি তিনি। অথবা প্রচলিত ঘরানায় দ্যাখাননি যে বউ-ই ছিল খাণ্ডারনি ভিলেন। দিনরাত ছোবল মারছে স্বামীকে – এমন নারীও নয় সে একেবারেই। বরং এরকমই মনে হয়, প্রত্যেকেই প্রত্যেকের কক্ষপথে যথাযথ – শুধু কেউ যেন কারুর বিন্দু ছুঁতে পারছে না। অনেকটা ক্লাসিক গ্রিক বা শেক্সপিয়ারিয়ান ট্র্যাজেডি। মানুষ শুধুই ঘটনাক্রমের সাক্ষী। ইনারশিয়ার দাস। অদৃষ্টের ট্যাইর‍্যানিতে পাক খাচ্ছে সকলেই। নামকরণেও পাওয়া যায় লেখকের উজাগর দৃষ্টি। নায়ক শুধুই ‘আনন্দ’ – ঠিক যেমন যথার্থ সফল ‘জীবন’ তার কাছে নেই। স্ত্রী ‘প্রভা’ – দুর্দশা কেড়ে নিয়েছে যার ‘লাবণ্য’। আপাত-এয়ো হয়েও সে যেন আদতে বিধবা।

প্রতিটি পরিচ্ছেদের শুরুতে রাখা হয়েছে জীবনানন্দেরই কবিতার লাইন। পরিচ্ছেদগুলি পড়তে পড়তে মনে হয়, কোনও ঐশী বা দৈবীলব্ধতায় নয়, কবির নিত্যযাপন থেকেই উঠে আসছে ওইসব মন্ত্রমুগ্ধ শব্দরাজি। অনেকেই বলেন, এই কবির লেখা বুঝতে পারা মুশকিল; হয়ত এই বই তাদের সাহায্য করবে খানিক আলোকপাতে। বুঝতে শেখাবে ওই লোকটাকে, প্রতিনিয়ত যুঝতে-থাকা একটা মানুষকে; কেউ টের পাচ্ছে না, গহীনে সে পচাচ্ছে নিজেকে – আলোবাতাসহীন যে পচন সার হয়ে উঠল একদিন। বদলে দিল বাংলা কবিতার আঙ্গিক। পাঠকের হাত ধরে নিয়ে গ্যালো ভাষা ও শব্দের নতুন দ্যোতনায়। নিয়ে গ্যালো প্যাঁচা, ফড়িং, ইঁদুর, আর মেয়েমানুষের চুলের নোনতা গন্ধের কাছে। অ্যালেন গিনসবার্গ যথাযথ বলেছিলেন, “...(Jibanananda) did introduce what for India would be ‘the modern spirit’: bitterness, self-doubt, sex, street diction, personal confession...” কেননা, তিমিরবিলাসী নন – আসলেই তিমিরবিনাশী তিনি।

সংলাপ স্বাভাবিকভাবেই কল্পনাপ্রসূত। এছাড়া উপায়ও নেই। বন্ধুরা কেউ কেউ আত্মকথা লেখার অনুরোধ করলেও সলজ্জে এড়িয়ে গেছেন কবি। লেখক তাই মূলত নির্ভর করেছেন জীবনানন্দের চিন্তাপ্রবাহের ওপর। সাহায্য নিয়েছেন কবির চিঠিপত্র, ডায়েরি ইত্যাদির। প্রচলিত ভঙ্গিতে লিখতে চাননি তিনি। কেননা, মূল চরিত্রই এখানে আপাতঅর্থে অপ্রচলিত। অনাধুনিক। গ্রামপতনের আর্তনাদ আর নগরপত্তনের উল্লাসে বেদনাকাতর। Content creates its form and frame – ভূমিকায় লেখক বলেছেন – “এই (জীবনানন্দের মানবিক) ‘অবস্থান’কে উপন্যাসের ‘আধুনিক’ কাঠামো ধারণ করতে অক্ষম।” তবুও কোথাওই মনে হয় না গদ্যব্যবহারে অকুলান আবেগ। কোথাওই লাগে না অনাবশ্যক রহস্যকুয়াশার ঘোর। জীবনানন্দকে জ্যান্ত করে তুলতে ধূসরমানবকে ফুটিয়ে তোলার পরীক্ষায় এখানেই জিতে যান লেখক। রেখে দ্যান নিজস্ব ছাপ। চমৎকার গদ্যভাষা। বারবার পড়বার মতো। বিশুদ্ধ নির্দেশের মতো। নিঃসঙ্গ চেতনার মতো।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা খুব দরকারি – লেখক, আমরা জানি, ঘোষিতভাবেই প্রতিষ্ঠান-বিমুখ। তাই হয়ে উঠতে পারেন প্রকৃত সাহসী ও অকপট। চমৎকার কিছু সত্য দেখিয়ে দ্যান নির্মোহ কলমে। কয়েকটি উদাহরণ : বইপাড়ার হাতে গোনা কিছু সম্পাদক ও প্রকাশক, যারা ছাপতেন জীবনানন্দের কবিতা, তারাও সম্পূর্ণ নিতে পারেননি কবির স্ফুরণ। বুদ্ধদেব বসুর পছন্দ নয় 'মহাপৃথিবী'-র পরবর্তী লেখার বাঁক। সঞ্জয় ভট্টাচার্য একটু-আধটু চাইলেও পয়সা সংকুলানে নিজেই কাতর। সিগনেট প্রেসের দক্ষ ও ভিন্ন ভাবনার ডিকে গুপ্ত ভাল বিক্রি সত্ত্বেও কোনও ঝুঁকি নিতে পিছপা। বরং বের করেন 'বনলতা সেন'-এরই পরিবর্ধিত সংস্করণ। কেরিয়ারের শুরুতে এখানে মলাটের কাজ করতেন সত্যজিৎ রায়। তার আঁকা প্রচ্ছদ পছন্দ হয় না কবির। লেখক বসিয়েছেন দ্ব্যর্থহীন ডায়লগ, “বিদিশার নিশা তিনি (সত্যজিৎ) দেখতে পাননি... তার কোনও আভাস নেই ছবিটাতে”। পাঠক নিশ্চয় দ্বিমত হবেন না, নিজক্ষেত্রে বিশ্বমানের শিল্পী হলেও রায়বাবুর কবজি ছিল না কবির মানসীকে রূপ ও রং দেওয়ার। ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’ কোনও আঁকিয়ে এখনও পেরেছেন কি না, জানা নেই। ‘পূর্ব্বাশা’ যখন তার বইয়ের বিজ্ঞাপনে লেখে ‘আধুনিক বিখ্যাতদের মধ্যে নির্জনতম’ বা অন্নদাশংকর বলেন ‘আমাদের মধ্যে শুদ্ধতম’ – কবির মৃদু ব্যাঙ্গ পেয়ে যাই, “...এ কথার কি মানে? কোনও মানে নেই, ননসেন্স বাট শুনতে ভাল।” আর লেখক এসব লিখে গেছেন কোনও রাখঢাক না করেই। এমনকি কোনও নামোল্লেখেও কোথাও দ্বিধা করেননি তিনি।

কাল্পনিক কিছু প্রবাহ থাকলেও আখেরে তথ্যনিষ্ঠ, বস্তুনিষ্ঠ, ইতিহাসনিষ্ঠ। পরতে পরতে উঠে এসেছে সে সময়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, স্বাধীনতা আন্দোলন, দেশভাগের দাঙ্গা, সাহিত্যগোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, প্রকৃতির চিত্রকল্পময়তা, বিভক্ত বাংলার দগদগে রক্তাক্ত মুখ। এই বই কাঁদায় না। হাসায় না। দ্যাখায়। ভাবায়। বাংলা সাহিত্যের একাগ্র পাঠকের কাছে এই বই একাধারে ব্যক্তি ও সময়ের দর্পণ। চূড়ান্ত রিসার্চ না হলে এই কাজ সম্ভব ছিল না।

একটা কথা উপন্যাসটি শেষ করে মাথায় আসে। অনেককে নিয়েই তো অনেক হল, এই মানুষটিকে নিয়ে একটি ফিল্ম বানালে কেমন হয়? চরিত্ররেখা, দৃশ্যনির্মাণ, এবং সংলাপের কাজটা প্রভূত পরিশ্রমে লেখক করেই রেখেছেন। জানি, জীবনানন্দের ধূসরযাপন ফুটিয়ে তোলার পাঠক্রম কোনও ইনসটিটিউশনে পাওয়া যাবে না, তবু একটু চেষ্টা হলে মন্দ কি! 'নস্টালজিয়া', 'ড্রিমস', বা 'দারসু উজালা' যারা দেখেছেন, বোধ হয়, সম্ভাবনায় মতভেদ রাখবেন না। প্লিজ, ভাববেন নাকি কেউ?

সোনালি ডানার চিল / সুরঞ্জন প্রামাণিক / উবুদশ, কলকাতা – ১২ / ৯৪৩৩৮১৯১০৩, ৯৪৭৭০৩৫৮৭৬



289 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: pharida

Re: হৃদয় বুঝেছে অনুপম

বাহ।
Avatar: 0

Re: হৃদয় বুঝেছে অনুপম

"তবে, এটুকু মনে হয়, আমার এই জীবনটা যদি মিলিয়ে দিতে পারি আরও কারুর জীবনের সঙ্গে, হয়ত তাহলে বোঝা অনেক সহজ। হতেই পারত, ওই ছবিটা আমি দেখিনি। অন্য কেউ যদি দ্যাখেন, আর বুঝিয়ে দ্যান আমাকে? সেরকম এক আশায় (এক অর্থে, লোভ) পাতা খুলেছি 'সোনালি ডানার চিল'-এর।"
খুলতে হলো - টুপি। বইটা কিনতে হবে। এ রিভিউ পড়ার পর ছট্‌ফট্‌ লাগছে :-)
Avatar: মনোজ ভট্টাচার্য

Re: হৃদয় বুঝেছে অনুপম

হায় চিল ! সোনালি ডানার চিল !

লেখার শেষে এসে মনে হল সত্যিই - ' সে সময়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, স্বাধীনতা আন্দোলন, দেশভাগের দাঙ্গা, সাহিত্যগোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, প্রকৃতির চিত্রকল্পময়তা, বিভক্ত বাংলার দগদগে রক্তাক্ত মুখ। এই বই কাঁদায় না। হাসায় না। দ্যাখায়। ভাবায়। বাংলা সাহিত্যের একাগ্র পাঠকের কাছে এই বই একাধারে ব্যক্তি ও সময়ের দর্পণ।' - খুব সুন্দর এই ব্যাখ্যা !

মনোজ
Avatar: ranjan roy

Re: হৃদয় বুঝেছে অনুপম

উদয়নবাবু,
বইটা কিনতে চাই? কত দাম? দিল্লিতে কীভাবে পাবো? ফ্লিপকার্টে হতে পারে? প্লীজ জানাবেন।
আরও এমন সব বইয়ের খোঁজ চাই, লিখুন প্লীজ!
Avatar: দ

Re: হৃদয় বুঝেছে অনুপম

বাঃ! ইন্টারেস্টিং লাগল।
অনেক ধন্যবাদ বইটির সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য।
Avatar: উদয়ন

Re: হৃদয় বুঝেছে অনুপম

রঞ্জনবাবু, যতদূর জানি, বইটি আপাতত বোধহয় পাওয়া যায় না। দু-চার কপি প্রকাশকের কাছে থাকলেও থাকতে পারে। ওপরে ফোন নং-এ কথা বলতে পারেন।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন