সুকান্ত ঘোষ RSS feed

কম জেনে লেখা যায়, কম বুঝেও!

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • গল্পঃ রেড বুকের লোকেরা
    রবিবার। সকাল দশটার মত বাজে।শহরের মিরপুর ডিওএইচেসে চাঞ্চল্যকর খুন। স্ত্রীকে হত্যা করে স্বামী পলাতক।টিভি স্ক্রিণে এই খবর ভাসছে। একজন কমবয়েসী রিপোর্টার চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলছে। কথা আর কিছুই নয়, চিরাচরিত খুনের ভাষ্য। বলার ভঙ্গিতে সাসপেন্স রাখার চেষ্টা ...
  • মহাভারতের কথা অমৃতসমান ২
    মহাভারতের কথা অমৃতসমান ২চিত্রগুপ্ত: হে দ্রুপদকন্যা, যজ্ঞাগ্নিসম্ভূতা পাঞ্চালী, বলো তোমার কি অভিযোগ। আজ এ সভায় দুর্যোধন, দু:শাসন, কর্ণ সবার বিচার হবে। দ্রৌপদী: ওদের বিরূদ্ধে আমার কোনও অভিযোগ নেই রাজন। ওরা ওদের ইচ্ছা কখনো অপ্রকাশ রাখেন নি। আমার অভিযোগ ...
  • মহাভারতের কথা অমৃতসমান
    কুন্তী: প্রণাম কুরুজ্যেষ্ঠ্য গঙ্গাপুত্র। ভীষ্ম: আহ্ কুন্তী, সুখী হও। কিন্তু এত রাত্রে? কোনও বিশেষ প্রয়োজন? কুন্তী: কাল প্রভাতেই খান্ডবপ্রস্থের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। তার আগে মনে একটি প্রশ্ন বড়ই বিব্রত করছিল। তাই ভাবলাম, একবার আপনার দর্শন করে যাই। ভীষ্ম: সে ...
  • অযোধ্যা রায়ঃ গণতন্ত্রের প্রত্যাশা এবং আদালত
    বাবরি রায় কী হতে চলেছে প্রায় সবাই জানতেন। তার প্রতিক্রিয়াও মোটামুটি প্রেডিক্টেবল। তবুও সকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়া, মানে মূলতঃ ফেবু আর হোয়াটস অ্যাপে চার ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখলাম। বলাই বাহুল্য সবগুলিই রাজনৈতিক পরিচয়জ্ঞাপক। বিজেপি সমর্থক এবং দক্ষিণপন্থীরা ...
  • ফয়সালা বৃক্ষের কাহিনি
    অতিদূর পল্লীপ্রান্তে এক ফয়সালা বৃক্ষশাখায় পিন্টু মাষ্টার ও বলহরি বসবাস করিত । তরুবর শাখাবহুল হইলেও নাতিদীর্ঘ , এই লইয়া , সার্কাস পালানো বানর পিন্টু মাষ্টারের আক্ষেপের অন্ত ছিলনা । এদিকে বলহরি বয়সে অনুজ তায় শিবস্থ প্রকৃতির । শীতের প্রহর হইতে প্রহর ...
  • গেরিলা নেতা এমএন লারমা
    [মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে লেখকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তার প্রায় এক দশকের গেরিলা জীবন। কারণ এম এন লারমাই প্রথম সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে পাহাড়িদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখান। আর তাঁর ...
  • হ্যামলিনের বাঁশিওলা
    হ্যামলিনের বাঁশিওলার গল্পটা জানিস তো? একটা শহরে খুব ইঁদুরের উপদ্রব হয়েছিল। ইঁদুরের জ্বালায় শহরের লোকের ত্রাহি ত্রাহি রব। কিছুতেই ইঁদুর তাড়ান যাচ্ছেনা। এমন সময়ে হ্যামলিন শহর থেকে একজন বাঁশিওলা বাঁশি নিয়ে এল। শহরের মেয়রকে বলল যে উপযুক্ত পারিশ্রমিক পেলে সে ...
  • প্রেমের জীবন চক্র অথবা প্রেমিক-প্রেমিকার
    "তোমার মিলনে বুঝি গো জীবন, বিরহে মরণ"।প্রেমের চরম স্টেজটা পার করতে গিয়ে এই রকম একটা অনুভূতি আসে। একজন আরেকজনকে ছাড়া বাঁচে না। এই স্টেজটা যদি কোনভাবে খারাপের দিকে যায় তখন মানুষের নানা পাগলামি লক্ষ্য করা যায়। কখনো কখনো পাগলামিটা তার গন্ডি ছাড়িয়ে ছাগলামিতে ...
  • সত্যিটা
    প্রায়-শূন্য করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল তমালী। করিডোরের প্রান্তে হেডমিস্ট্রেসের ঘর। সেখানে মিটিং আছে। ক’দিন ধরে স্কুলে তোলপাড় চলছে। গুরুতর অভিযোগ। আজ সেই নিয়ে মিটিং। হেডমিস্ট্রেস ছাড়াও ম্যানেজিং কমিটির দু-একজন এসেছেন দেখেছে। আর আসার কথা অবন্তীর বাবা-মা’র। ...
  • অলৌকিক জিনিস আজও ঘটে
    অলৌকিক জিনিস আজও ঘটে। এই ঘটনা সত্যিই ঘটেছে, এক বর্ণ বানানো না। যে কেউ চেক করে আসতে পারেন। এক কবি কদিন আগে আমার কানে-কানে মানে ফোনে-ফোনে বলেছিলেন, সন্দীপনের পরেই তুমি। ভেবেছিলাম তিনি নির্ঘাত ইয়ার্কি করেছিলেন। কিন্তু আজ কাত্তিকের ফেবু খুলে দেখি কবি ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

সুকান্ত ঘোষ

এটা আজকাল প্রায় সবাই জানেন যে ইংল্যাণ্ডের ন্যাশেনাল ডিস্‌ কিন্তু ফিস্‌ এ্যাণ্ড চিপস্‌ নয়, ওটা হল চিকেন টিক্কা মশালা। ভারতীয় সভ্যতায় ইংরেজদের অবদান নিয়ে জাদুঘর ভর্তি বই আছে এবং ইদানিংকালের পণ্ডিতরা প্রায় সবাই একমত হয়েছেন যে, বৃটিশ সভ্যতায় আমাদের মূল অবদানই হল নানাবিধ ‘কারি’। যেটুকু দ্বিমত তা ওই টিক্কা মশালা নাকি চিকেন মাদ্রাস কোনটা ন্যাশেনাল ডিস্‌ হওয়া উচিত তা নিয়ে। আমি এত রকমের ‘কারি’র নামই শুনিনি ইংল্যাণ্ড আসার আগে – তবে ব্যাপার হল গিয়ে অন্য যে কোন বিষয়ের মতই এর ভিতরেও প্রচুর জল আছে। এমন সব খাবার ভারতীয় বলে চালানো হয় যার সাথে ভারত তো দূরের কথা, এশীয় ভূখণ্ডেরই কোন সম্পর্ক নেই ! যেমন ধরেন ‘চিকেন ভিণ্ডালু’ – এটা আদপেই আমাদের খাবার নয়, যতদূর সম্ভব পর্তূগীজ, তবে ইন্ডিয়ান বলে দেদার বিকোচ্ছে। ২০০৬ সালের হিসাব অনুযায়ী ইংল্যাণ্ডে ৯৫০০ মত রেষ্টুরান্ট ছিল – এই হিসাব ডায়নামিক, কারণ কেউ খোলে তো কেউ বন্ধ, সুতরাং ব্রহ্মাণ্ডের মতই রেস্তোঁরা ব্যবসায় ইকিউলিব্রিয়াম নেই। আর তা ছাড়া এই ব্যাবসাই আমাদের উপমহাদেশীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে সাহায্য করেছে বৃটিশ ভূখণ্ডে। কেবলমাত্র রেষ্টুরান্ট জগতেই একজন পাকিস্থানী বা একজন বাংলাদেশী ওদের তৈরী খাবারকে ইন্ডিয়ান বলে সগর্বে পরিচয় দেয় – যার থেকে আরও একবার প্রমাণ হয় “আপনি বাঁচলে বাপের নাম” প্রবাদবাক্যটি পদার্থবিদ্যার সূত্রের মতই সর্বত্র প্রযোজ্য – দেশ, কাল, জাতি এবং ফেস্‌বুকের বেড়া ঢিঙিয়ে।

‘কারি’ শব্দটি তামিল – অধুনা অক্সফোর্ড অভিধানে ঠাঁই পেয়েছে। কোন এক অজ্ঞাত কারণ বশতঃ ইণ্ডিয়ান রেষ্টুরান্টগুলি ‘বালটি’ রেষ্টুরান্ট নামেই পরিচিত – বিশেষ করে বার্মিংহাম এলাকায়। আমার মনে হয় কোন বাঙালীই এহেন নামকরণের পিছনে নিজের দেশপ্রেমের ছাপ রেখেছেন। হয়ত অভ্যস্ত হবার আগে প্রথমদিকে বৃটিশদের কারি খেয়ে পরের দিন যে অবস্থা হত তাতে করে ওই ভদ্রলোক নিজের দেশের বালতি হাতে করে একটি বিশেষ জায়গার দিকে দৌড়বার সিমিলারিটি খুঁজে পেয়েছিলেন ! তবে কোন কোন রেষ্টুরান্ট-এ এখনো ছোট্ট পিতলের বালতি করেই খাবার পরিবেশন করা হয়। মেনুকার্ড দেখলে আপনার মাথা ঘুরে যাবে – পাতিয়ালা, মাদ্রাস, হায়দেরাবাদ সহ স্বাধীনতা পূর্ব প্রায় সব রাজকীয় স্টেটগুলোই খাদ্য তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে – কেবল মনে হয় ‘মাইহার’টাই যা বাদ। তবে ইন্টারনেটের যা ব্যপ্তি আজকাল, মাইহার – আলাউদ্দিন খাঁ – রবিশংকর – নোরা জোনস, এই এক ফিউশন রেষ্টুরান্ট খুলল বলে! বার্মিংহাম এলাকার কিছু রেষ্টুরান্ট মালিকের সাথে চেনাশোনা থাকার জন্য রান্নার অন্দরমহলে উঁকি দেবার সৌভাগ্য হয়েছিল। এঁরা প্রায় সবাই সিলেটি – ফলতঃ দুই প্রকার বাংলা বলতেন – আমার সাথে একরকম এবং নিজের পরিবারের সাথে অন্যরকম। তো যাই হোক যেটা বলার, মেনু কার্ডের ৯০টা কারি ডিসে্‌র মূল সারবস্তু কিন্তু তিনটি প্রাইমারী ডাব্বা থেকেই লব্ধ। লাল, সবুজ ও নীল প্রাথমিক রঙের মতই ওই তিনটি ডাব্বার ঝোল থেকেই সবের উৎপত্তি। এরপর দাও ছড়িয়ে কিছু লঙ্কা, ধনে, জিরে বা এলাচদানা। সব খাবারই কিন্তু কাষ্টমাইজড্‌ ইউরোপীয়ান পাবলিকদের জন্য। আমার এক্সট্রা স্পাইসি অর্ডারে এক্সট্রা বলতে থাকত পেট চেরা কিছু সবুজ কাঁচালংকা বা রকমফেরে কিছু ছেটানো লংকার গুঁড়ো।

তবে এটা স্বীকার করতেই হবে যে আর যাই হোক ‘নান’ অর্ডার করে আমি কিন্তু কোনদিন আফসোস করি নি। ইয়ে, আমি নান অর্ডার মানে রুটিজাতীয় খাবার নানের কথা বলছি আর কি। একবার ফ্রী স্কুল স্ট্রীটে দাঁড়িয়ে থাকার সময় যে নান সাপ্লাই লাগবে কিনা জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল সেই নান নয়। তা আমার মনে হয় ইংল্যাণ্ডের নানগুলো (খাবার নান রুটি)যেন বেশী সুস্বাদু ছিল – বিশেষ করে ওই ফ্যামিলি নান। ইয়াব্বর একখান টেবিলের মাঝ এনে রাখে আর সবাই চারদিক থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় – অদ্ভূতঃ। আরো একটা জিনিস, তা হল ম্যাঙ্গো লস্যি – সেটাও অতীব সুস্বাদু ছিল। বাকি সব আনুসাঙ্গিক যেমন – পাঁপড়, সমোসা, পেঁয়াজি এদের নিয়েও কোন আক্ষেপ থাকার কারণ ছিল না।

আমার সব বন্ধুরাই ভারতীয় কারির ফ্যান – ব্যতিক্রম যোসেফ আর আইরীন। যোসেফের প্রথম দিকে অসুবিধা হত মশালা যুক্ত খাবার খেয়ে – এখন সয়ে ফেলেছে ইমিউনিটি ব্যবস্থা শক্ত করে। আর আইরীনতো ভেজ্‌ বিরিয়ানী খেয়ে চোখমুখ লাল করে ফেলে এখনও – এটাকে আমি আমার ব্যর্থতা হিসাবেই দেখি এবং গ্রীসের বুকে কারির গুণাগুণ ছড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া করে আমি এখনও কুন্ঠিত আছি। আমাদের ল্যাবে একবার সুইজারল্যাণ্ড থেকে একটি ছেলে সামার ট্রেনিং করতে এসেছিল। তো আমাদের প্রফেসরের সমার বারবিকিউতে সবাই গেছি নিজের দেশের কিছু খাবার নিয়ে (এটাই ট্রাডিশন ছিল)। আমি নিয়ে গেছি ইণ্ডিয়ান চিকেন কারি – বারবিকিউতে কারি রান্না করে নিয়ে যাবার জন্য যা সাহস লাগে তার অর্ধেক সাহসে ইংলীশ চ্যানেল পারাপার করা যায়। তা সুইজারল্যাণ্ডের ছাত্রটি প্রথমবার অংশগ্রহন করছে – সব খাবার চাখতে চাখতে আমার কারির সামনে হাজির। কোনরূপ সর্তকবার্তা প্রেরণের আগেই ব্যাটা একটা চায়ের চামচে করে একটু ঝোল তুলে মুখে দিল – তারপর কি বলব দাদা, প্রথমে গাল লাল হল, তারপর কপাল। দেখলাম চশমা খুলে চোখ মুছছে – আস্তে আস্তে মাথার ছোট্ট টাক মত সাদা জায়গাটাও লাল হয়ে গেল – ছুটে বেরিয়ে বাগানে গিয়ে পায়চারী করছে, সাথে হু, হা ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত আমারই আনা ইন্ডিয়ান মিষ্টি দিয়ে বেচারাকে শান্ত করা হল।

টনি ছিল আবার এর বিপরীত – বেশ ঝাল খেতে পারত। টনি ডার্বি এলাকার ছেলে – যে এলাকাটা প্রায় সাদা বাংলায় ‘চাষা’ জাতীয় ইংরেজে ভর্তি ছিল। ওখানকার একটা স্থানীয় পাব + রেষ্টুরান্টে প্রতি বৃহস্পতিবার ২-ফর্‌-১ মিল সার্ভ করা হত। তা টনি সেখান থেকেই চিকেন টিক্কা মশালা খেয়ে আসছে গত ১৭ বছর ধরে। ভাবলে অবাক হতাম যে ও অন্য কোন কারি ডিস্‌ খাবার কথা ভাবেইনি কোনদিন – টনির বাবার সাথে আলাপ হবার পর অবাক ভাবটা কমেছিল। একেবারে স্ট্রং প্রিন্সিপ্যাল এর লোক – "ইফ্‌ সামথিং ওয়ার্কস্‌, ডোন্ট্‌ মেস উইথ ইট"। টনির বাবার প্রিন্সিপ্যালে চললে, আশির দশকের মাঝামাঝি কোকাকোলা কম্প্যানি কোকের স্বাদ পাল্টে পেপ্‌সির মত করে মার্কেট ধরে রাখতে চাইত না। কোক কম্প্যানির অবস্থা - প্রায় না গাছের পেলাম , না পেলাম তলার – মত হয়েছিল। যারা পেপসি্‌ খাচ্ছিল তারা পেপসিই খেতে থাকল, মধ্যে থেকে কোক ফ্যানের নতুন স্বাদ অপছন্দ করে কোক বর্জন করল। আমি ব্যক্তিগত ভাবে টনির বাবার আদর্শ অনুযায়ীই চলতে চেষ্টা করেছি এযাবৎ। মাধ্যমিকে ফিজিক্স পরীক্ষা ২ ঘন্টা ৩০ মিনিটে শেষ করে ভালো নম্বর পেয়েছিলাম – তার পর থেকে ফিসিক্স রিলেটেড কোন পরীক্ষাতেই আমি আড়াই ঘণ্টার বেশী হলে থাকি না। সব প্রশ্নের উত্তব জানা থাকলেও এর হেরফের নেই, আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই যা হবে তাই।

একবার টনি আমাকে বলল যে চিকেন কারির একটা রেসিপি দিতে, ওর ফ্যামিলির সবাই ভারতীয় খাবার ভালোবাসে। ঠিক হল পরের বার যেদিন আমি ওর বাড়ি যাব তখন আমি একবার সারাকে (টনির স্ত্রী) রেঁধে দেখিয়ে দেব। ডার্বি এলাকার একটা ভালো এশীয়ান বাজার আছে। আমি নিজে সুপার মার্কেটের মাংসের থেকে কসাইয়ের কাছে কেনা টাটকা মাংস বেশী পছন্দ করতাম। ওখানে অনেক উপমহাদেশীয় মাংসের দোকানগুলিতে টাটকা মাংস পাওয়া যেত। টনিকে নিয়ে তেমনি এক দোকানে গেলাম – তবে এর মধ্যে একটা বৈপরীত্য আছে। ওই দোকানগুলির মাংস ভালো হলে কি হবে – যেখানে মাংস কাটা হত সেই জায়গাগুলি ছিল সাংঘাতিক রকমের নোংরা এবং দুর্গন্ধ যুক্ত। কি করে ফুড-ইনেস্পেক্টরদের চোখ এড়াত কে জানে ! আজকাল আমার মনে হয় কলকাতার গার্ডেনরীচ এলাকার মতই ইংল্যাণ্ডের এশীয়ান অধ্যুষিত এলাকায় পুলিস জাতীয় কিছু ঢুকতে ঠিক সাহস পেত না! অঘোরীবাবা, বামাক্ষ্যাপার দেশের লোক হবার জন্য গন্ধ বা পরিচ্ছন্নতার জাগতিক ব্যাপার থেকে আমি উর্দ্ধে হলেও টনি তো তা নয়! ফলতঃ ওকে বাইরে রেখেই মাংস কিনতে হল। বড় গল্প ছোট করে বলতে গেলে সেইদিন টনির বাড়ির মাংসটা খুব একটা ভালো রাঁধতে পারি নি। ঝোলের পরিমাণ বেশী হয়ে গিয়েছিল। ভাত রাঁধার সময় কতটা চাল নেব তা নিয়ে ধন্ধে ছিলাম – মোট খানেবালা চার জন, সস্ত্রীক টনি এবং ওর বাবা মা। পাত্রে চাল ঢালি আর টনিকে জিজ্ঞাসা করি – আর নেব ? যতটা চাল আমায় নিতে বলল, আমি ভাবলাম কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। ওই পরিমাণ চাল কমপক্ষে সাতজন খাবে ! পরে খাবার সময় সে ভুল ভাংলো এবং সে যা মাংসের ঝোল দিয়ে তৃপ্তি করে খাওয়া দেখলাম তাতে করে আমার গ্রামের আলিমের কথা মনে পড়ে গেল। আমার রান্নার খুব তারিফ হল এবং সেটা যে নিছকই ইংরাজ বিনয় নয় তা ঝোল শূন্য হাঁড়ি দেখেই বুঝলাম।

আলিমের দেহের আকার-আয়তন দেখে ওর খাদ্য গ্রহণ শক্তির ঠিক ধারণা করা যেত না – আমার মনে হত পাকস্থলীটাই ওর কাঠামোয় প্রাধান্য পেয়েছে। আলিম কাছে থাকলে খাবার নষ্টের কোন ভ্য় থাকত না। চাষা বাড়ির ছেলে হবার জন্য ছোট বেলায় একটা কথা মায়ের মুখে খুবই শুনেছি। পাতে বেশি খাবার দিলেও সেখান থেকে তুলে নেবার কোন রীতি ছিলা না। একই কথাই রিপিট হত – “যা খাবি খা, বাকীটা গরুর ডাবায় দেব”। তা আশেপাশে আলিম থাকলে ব্যাপারটা তেমনই দাঁড়াত, কেবল গরুর বদলে আলিম। এদের দুয়েরই মহৎ গুণ এই ছিল যে, যা দেবে তাই আবেশ করে চোখ বুজে খেয়ে যাবে।

ছাত্র অবস্থায় আমার বাসস্থল রিচমণ্ড হিল রোডের আমার স্প্যানীশ বন্ধু ফউষ্টো ছিল ওই আলিমেরই বিদেশী সংস্করণ। আজ পর্যন্ত কোন খবরের দুর্নাম করতে আমি শুনিনি ওর মুখ থেকে। এই ফউষ্টোরই রাঁধা পাইয়া (বা পাইয়ালা) আমি ইংল্যাণ্ডে প্রথম খাই – আর এটা এমনই একটি খাবার যার প্রকৃত স্বাদ কি হওয়া উচিত সে সম্পর্কে আমি এখনও নিশ্চিত নই। আমেরিকা এবং ইউরোপের নানা দেশে আমি নানা ধরণের পাইয়া খেয়েছি। এদের মধ্যে বলিউডি সিনেমা গুলির মত একটা প্রগাঢ় মিল আছে – সব সিনেমাতেই যেমন চার-পাঁচটা গান থাকে তেমনি এই সব পাইয়াতেও চার-পাঁচ ধরণের মাছ-মাংস থাকত। বাকি রইল স্টোরি লাইন, ভালোবাসার যেমন বলিউডি সিনেমার ভিত্তি, তেমনি পাইয়ার ভিত্তি হল রাইস। আমি যেটুকু দেখাছি তাতে পাইয়া রাঁধা খুব একটা শক্ত বল্র মনে হয় নি। ফউষ্টো অর্কেষ্টার কণ্ডাক্টরের মত পাইয়া রান্নার জন্য প্রস্তুত হত, আর আমরা ফুলুট বাজানো সহযোগী। আমাদের কাজ ফউষ্টোর নির্দেশ মত কাজ করা – পিপার (ক্যাপ্সিকাম্‌), গাজর, ট্যামেটো, পেঁয়াজ ইত্যাদি কুঁচানো হল। একটা কানা উঁচু তাওয়ার মত চ্যাপ্টা পাত্রে উহা রাঁধা হত – আদপে স্প্যানীশ ভাষায় ওই বিশেষ পাত্রটিকেই পাইয়ালা বলা হয়, আর সেই থেকেই খাদ্যের ওই নাম। তাওয়াতে সব্জীগুলো ফ্রাই করা হল। তারপর ওই তাওয়াতেই চাল ঢেলে সব্জী এবং মাংসের টুকরগুলো সাজিয়ে দেওয়া হল। শামুক-ঝিনুক, অক্টোপুস সহ হাতের কাছে থাকা যাবতীয় শীতল ও উষ্ণ রক্তের প্রানী, মেরুদণ্ডী বা অমেরুদণ্ডী - সবই ও পাইয়াতে চালানো যায়। হালকা একটু হলুদ রং এবং পছন্দ মত মশালা - ব্যাস , অল্প জল ঢেলে সিদ্ধ করতে থাকুন । চাল সিদ্ধ হয়ে এলে পরিবেশন। ব্যক্তিগতভাবে এটা আমার প্রিয় খাদ্যের মধ্যেই ছিল যতক্ষণ না ফউষ্টো ওর সেই বিয়ার যুক্ত স্পেশাল রেসিপি আমাদের খাইয়েছিল। আসলে ওই সব ভাজাভুজি করতে গিয়ে প্রায়ই প্যানে ধরে যেত সব্জী বা মাংস, তা বিয়ার দিয়ে প্যান পরিষ্কার হবার পদ্ধতি আবিষ্কার হবার পর দেখলাম ফউষ্টো সবাইকে ডেকে ডেকে দেখাচ্ছে পদ্ধতির হাতে কলম নমুনা। ফলে পাইয়ার বিয়ার সংযুক্ত হয়েই চলেছিল এবং শেষ পর্যন্ত প্রায় তিনলিটার বিয়ার শেষ ! খেতে গিয়ে টের পাওয়া গেল আবার গেলও না। আগেই বলেছি পাইয়ার টেষ্ট কেমন হবে তার কোন বেস্‌ স্কেল অন্ততঃ আমার কাছে ছিল না। ফলে এ বলে বার্সিলোনার পাইয়া এমন তো কারমেন বলে ওদের টলেডোর পাইয়ার স্বাদ এমন! আমি তাই গঙ্গা না পদ্মা এই বিতর্কে না গিয়ে দুই ইলিশই চালিয়ে গেছি।

তবে কারমেনকে নিয়ে প্রবলেম ছিল অন্য - আণ্ডারগ্র্যাজুয়েট ছাত্র হবার জন্য কিনা কে জানে, ওর মনে প্রশ্ন ছিল অবিশ্রান্ত। আমি তো ওর প্রশ্নে জেরবার হয়ে কারি রান্নাই ছেড় দেব ভেবেছিলাম - হলুদ দেওয়া হচ্ছে কেন, টক দইয়ের কি এফেক্ট, গরম মশলার ব্যবহার কবে থেকে চালু হয়েছিল, ধনেপাতা উপরে ছড়ানো থাকে কেন ইত্যাদি। এত্যো প্রশ্নের উত্তর খুব কম জায়গা থেকেই পাওয়া যাবেঃ প্রথমতঃ ট্রেনে আয়ুর্বেদ সংক্রান্ত চটি বই বিক্রী করা খোকনদা, অদ্রীশ বর্ধনের ‘আমার মা সব জানে’ বইটিতে এবং ইদানিং কালের এফ।এম এর বুলাদি বা হ্যালো রূপা বলছি। আমার হাতের কাছে এর কিছুই না থাকায় কারমেনের প্রশ্নের উত্তরে যে পরিমাণ কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছিল তা জানতে পারলে জুল ভার্ণ পর্যন্ত সস্নেহে কাছে টেনে নিতেন। এর থেকেও ভয়ঙ্কর ছিল কারমেনের সাথে সুপারমার্কেটের খাবার কিনতে যাওয়া। বেকড বিনস্‌ সেকশনের সামনে ওর তম্নয় হয়ে ভাবতে থাকার সাথে লিওনার্দোর বা কনষ্টেবলের ছবির সামনে ভাবালুতরাই একমাত্র তুলনা করা যায়।

রিচমন্ড হিল রোড আমার জীবনে ততটাই স্থান জুড়ে আছে যতটা আছে বি টি রোড বাংলা সাহিত্যে। আমি ৪ বছর যে বাড়িটায় বসবাস করেছিলাম সেখানে সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্যবশতঃ ২২ টা আলাদা দেশের পাবলিক থেকেছে আমার সাথে – সব সময় সেই দেশের সংখ্যাটা স্থির ছিল এমন নয়, তবে বেশির ভাগ সময়ের মিলে জুলে, তালে গোলে ছিলাম আমরা সবাই। আর সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য ব্যাপারটা আপনি যেমন ভাবে দেখবেন – কালচারাল এক্সপোজার পেতেন পারেন, আবার দূর্বল চিত্ত হলে কালচারাল শক ও। তবে আমি আগের পর্ব গুলোতে যেমন বলেছি, এখানেও সেটা বলে রাখি, সেই সব জটিল সমাজ বা মনস্তত্বাবিক গল্প ফাঁদার জায়গা এটা নয়, এখানে আমি শুধু খাবার দাবার নিয়েই নাড়াঘাঁটা করব।

বৃটিশ স্টুডেন্ট হলে বেশী কোন প্রবলেম নেই, কারণ ওদের কোন নিজস্ব খাদ্য নেই, তাই রান্না জানার হ্যাপাও নেই – সামনে কোন ইন্ডিয়ান রেষ্টুরাণ্ট থাকলে না পিৎজার দোকান থাকলেই ওরা খুশী। ওদের অবজার্ব করে আপনি খাদ্য বিষয়ে বেশি কিছু শিখতে পারবেন না – যা পারবেন তা ওই পানীয় বিষয়ে। তাই এই মুহুর্তে মালগুলোকে আলোচনার বাইরে রাখছি। আমার বিশেষ উৎসাহ ছিল ইতালিয়ান বা ফ্রেঞ্চ ছাত্র-ছাত্রীদের রান্না-বান্না সর্ম্পকে। তবে সব কিছুর উর্দ্ধে ছিল এক তাইওয়ানিজ মাল – জেসন যার নাম ইংলিশ নাম। যাঁরা জানেন না তাদেঁর এই ফাঁকে বলে রাখি, চাইনীজ বা তাইওয়ানীজ বা জাপানী মালগুলোর একটা করে ইংলীশ নাম থাকত, কারণ মূল ভাষায় ওদের নাম উচ্চারণ প্রায় অসম্ভব। প্রায় বললাম এই কারণেই যে আজকাল দেখি ভারতীয় পাবলিক ডাচ ভাষায় কথা বলছে – এই দুঃসাধ্য কাজ যাঁরা করতে পেরেছে, তারা হয়ত চেষ্টা করলে চাইনীজ ও বলতে পারে, দুনিয়া আফটার অল এক আজব জায়গা। জেসনের আসল নাম মনে হয় ছিল চুয়াং মিং ডট্‌ ডট্‌ ই।টি।সি।। জেট লি, ব্রুস লি, স্ট্যান লি এদের সিনেমা গুলো দেখে নিয়ে একটা পারমুটেশন – কম্বিনেশন করে নিয়ে নাম বানিয়ে নিলেই হল। তা ছাড়া শেক্ষপীর তো বলেই গেছেন - নামে কি এসে যায়, তাই জেসন কে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, ও সেই চীজ্‌ই থাকবে। বাই দি ওয়ে, আমি একবার জার্নাল পেপার সার্চ করতে গিয়ে শুধু সারনেম এর জায়গায় ‘লি’ লিখেছিলাম, সার্চ ইঞ্জিন হ্যাং করে গিয়েছিল – আপনারাও তাই একটু খেয়াল রাখবেন।

আমাদের রিচমন্ড হিল বাড়িতে ঢোকার শর্ট – কার্ট রাস্তা ছিল রান্না ঘরের মধ্যে দিয়ে – দু টো বড় বড় রান্না ঘর ছিল আমাদের – ৩০ টা মত পাবলিক থাকত সেই জন্য। জেসনের সাথে আমি ওই বাড়িতে ছিলাম প্রায় ২ বছর – কথা হয়েছিল সাকুল্যে তিনবার। তার মধ্যে একবার ছিল ইন্টারন্যাশানাল মিল পার্টিতে যেখানে আমি ওকে চাইনীজ ফ্রায়েড রাইসটা এগিয়ে দিতে বলেছিলাম, তাতে করে জেসন আমাকে ওর পেয়ারের দোস্তো ভেবে নিয়েছিল অন্তত ন্যানো সেকেন্ডের জন্য হলেও! আমি জেসন কে রান্নাঘর ছাড়া কোথাও দেখি নি – আমি সকালে ৭ টায় ল্যাবে যাচ্ছি, জেসন তখন প্রাতরাশ সারছে। আমি বিকেলে ফিরছি, জেসন তখন রাতের খাবার বানাচ্ছে। শনিবার বা রবিবার দুপুরে দেখা হলে জেসন তখনো রান্না করছে দেখা যেত। আমি প্রথম দিকে ভেবেছিলাম যে ও মনে হয় ইংল্যান্ডে রান্না বিষয়ক কোর্স করতে এসেছে। কিন্তু পরে জানা গেল মালটা নাকি ‘এডুকেশন’ নামক কোন একটা বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করছে। দেশে ফিরে ও এখন কি শেখাচ্ছে জানি না, তবে ভারতের মত মিড ডে মিল ওখানে চালু থাকলে ওর বেশীর ভাগ সময়টাই যে সেখানে কাটবে সেটা বলে দিতে কোন অমৃতলাল হবার দরকার নেই। এডুকেশন কে এডুকেশন – সাথে ভ্যারাইটি মিড ডে মিল!

তবে জেসনের রান্না একটা দেখার বিষয় ছিল – অন্তত ৮-১০ টা নানা সাইজের বাটি মশলা এবং আরো নানাবিধ সব্জি কুঁচানো রাখার জন্য চারপাশে সুন্দর করে সাজানো। এ ছাড়া রয়েছে রান্না মূল পাত্রগুলি – চাইনীজরা মূলত যেটা ব্যবহার করে – ওক নামক এক পাত্র। খাবার স্বাস্থ্যকর কিংবা হলেও কতটা তা বলতে পারব না, তবে সুগন্ধ (মাঝে মাঝে দূর্গন্ধও) বেরোত। আর হত ছ্যাঁক-ছোঁক শব্দ। এটা দিচ্ছে, ওটা দিচ্ছে – খুবই কনফিউসিং ব্যাপার। শেষেমেশে অবশ্য সেই নুডুলস বা রাইসই দাঁড়াত বেশীর ভাগ দিন। আর যে দিন অন্য রকম দেখতাম, সেদিন খাবার ইতিহাস বা প্রকৃতি জিজ্ঞেস করার সাহস হত না – যদি পাছে টেষ্ট করতে বলে! মেন চাইনীজদের খাবারে একটা জিনিস দেখতাম সেটা হল যে ওরা ফ্রেস সব্জী নিয়ে বেশী নাড়াঘাঁটা করে না বা তেলে বেশি ভাজে না – মাঝে মাঝে ১০ সেকেণ্ড মত গরম জলে ডুবিয়েই তুলে নিত। ফলে ওরা প্রকৃতই সব্জীর স্বাদ পেত – আমাদের ভারতীয় রান্নার মত কেবল মশালার স্বাদ নয়। কনট্রাস্টটা একবার ভাবুন – বাড়িতে আমাদের মা-মাসি-পিসি-কাকিমাদের দেখেছি তরাকারী চাপিয়ে অন্য কাজ করতে চলল, ওই দিকে মাল ফুটছে তো ফুটছেই! কুমড়ো ফুটে ফুটে তার অনু পরমাণু আলাদা হয়ে যেত প্রায়।

আমাদের ঘটিদের ঘরে একটা কথা খুব চালু ছিল – যে বাঙালরা নাকি সব কিছু খায়, অর্থাৎ নঞর্থক বাচ্যে বললে বাঙালরা কিছুই ফেলে না! আমি এতে প্রবলেম টা কি সেটা ঠিক বুঝতে পারতাম না – অবশ্য আমার মনে হত গড়পড়তা ঘটির থেকে গড়পড়তা বাঙাল ভালো রান্না করার জন্য ঘটিরা ইনফিরিওটী কমপ্লেক্স থেকেই সেই গুঞ্জন ছড়িয়ে ছিল মার্কেটে। ফেলে দেওয়া জিনিস বলতে কি বোঝানো হত? যেমন ধরুণ কুমড়োর খোসা, চালকুমড়োর পাতা, কুমড়ো ফুল, ঝিঙের খোসা ইত্যাদি – এছাড়া কচুর লতি তো ছিলই। তো চাইনীজ খাবার সেই আমাদের ভাষায় বাঙাল খাবারের মতই ছিল - প্রায় কিছুই ফেলা যেত না, সি-উইড পর্যন্ত। দুনিয়ার মাশরুম থেকে শুরু করে যত আজব দেখতে সব্জী ওই মাল গুলো যোগাড় করত চাইনীজ সুপারমার্কেট থেকে। দুটো জিনিস আপনি আন্টার্কটিকা গেলেও পাবেন গ্যারান্টি সহকারে – এক ম্যাকডোনাল্ডস ও দুই চাইনীজ সুপারমার্কেট। এই ফাঁকে বলে রাখি জাপানীরা ম্যাকডোনাল্ডসকে বলত ‘ম্যাকাডুনারুদু’ – যেটা আমার কানের ফ্রীকোয়েন্সির সাথে খুব ম্যাচ করত। ম্যাকডোনাল্ডস, বার্গার কিং ও কে।এফ।সি কে নিয়ে তুলনা মূলক আলোচনা অন্য কোন পর্বে।

সব চাইনীজদের রান্না পদ্ধতি প্রায় একই রকম – আমাদের আর এক বন্ধুকে দেখেছি প্রায়ই সুইট পট্যাটো রান্না করতে – স্যুপ, তরকারী ইত্যাদি। কে নাকি ওকে বলে দিয়েছিল চীন থেকে আসার সময় যে সুইট পট্যাটোর মত সব্জী আর পাওয়া যায় না বিদেশে – মানে সবচেয়ে জম্পেশ জিনিস। তা সেই ওই মেয়ে খেয়ে গেল প্রায় ৪ বছর – তবে আর যাই হোক, সুইট পট্যাটো আর যাই করুক ওকে ফিগার মেনটেন করতে সাহায্য করেছিল এটা আমরা সবাই মেনে নিয়েছিলাম। কুমড়ো বিষয়ে বেশ একটা রসাল ব্যাপার তৈরী হয়েছিল থাইল্যাণ্ডের মেয়েদের সাথে রান্না নিয়ে কথা বার্তা বলে। ইংল্যাণ্ডের ছেলেদের কোন এক বিশেষ কারণে থাই মেয়েদের প্রতি এক দূর্নিবার আকর্ষণ আছে, ফলে আমাদের ইউনির্ভাসিটির কোন থাই মেয়ে একলা থাকত না প্রথম দু-তিন মাস ছাড়া। তা আমরা জানলাম যে থাই ভাষায় কুমড়োকে বলা হয় – ‘ফাক্‌’। সেবাষ্টিয়ানের (সংক্ষেপে সেব) লজিক অনুসারে তা হলে বড় কুমড়োকে অবশ্যই ‘গ্রাণ্ড ফাক্‌’ বলা উচিত। সেব তখনও আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে থাই গার্লফ্রেণ্ড যোগাড় করার, তাই প্রায় সব পার্টিতেই গিয়ে থাই মেয়েদের সাথে সরাসরি কুমড়ো বিষয়ক আলোচনা চালু করত। সেব-ই প্রথাম ল্যাবে শুনতে পায় যে এক থাই মেয়ে অন্য একটা চাইনীজ মেয়ের সাথে আলোচনা করছে যে “দে ডু নট্‌ গেট গুড ফাক্‌ ইন ইংল্যাণ্ড”। সেব ভেবেছিল যে থাই মেয়েরা তা হলে খুবই ওপেন কালচারে মানুষ এবং সেটার পর আরো বেশী করে ও থাই মেয়েদের প্রেমে পড়ে যায়। এমনকি ‘ফাক্‌’ রহস্য উন্মোচনের পরের এর অন্যথা হয় নি – প্রেম সব দেশেই অন্ধ সেটা আর একবার সেব চার বছর বান্ধবীহীন থেকে প্রমাণ করেছিল।

আর ছিল দুই তাইওয়ানীজ মেয়ে যাদের বাপের পয়সার ওই গই নেই, পড়তে নয়, ওদের মূল লক্ষ্য ছিল কালচারাল এক্সপিরিয়েন্স লাভ করা। তা ওরা সেই জিনিস অর্জন করেছিল, আমরা পেয়েছিলাম নানা এক্সপেরিমেন্ট জাত খাবার। এদের মধ্যে সব চেয়ে বেশী এ্যাকটিভ ছিল আইভি ও রিয়া। যত উদ্ভট খাবার যোগাড়ে আইভি প্রায় আনপ্যারালাল দক্ষতা অর্জন করেছিল। কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল তাইওয়ান থেকে আনার ওর ফ্লেভারড বিস্কুট টাইপের জিনিস গুলো। সে জিনিস যে কি বেসিক মালমশলা দিয়ে তৈরী সেটা জানার সাহস করি নি – ইনফ্যাক্ট যে বানিয়েছে সেও মনে হয় ঠিক করে বলতে পারবে বা। এর মধ্যে কিছু ছিল মাছের ফ্লেভার দেওয়া – আমাদের শুঁটকি মাছের গন্ধও তার কাছেই শিশু। পার্থক্য একটাই যে, শুঁটকি মাছ মহাসিন্ধুর ওপার থেকেও জানা দেয় যে সে আছে, আর এই তাইওয়ানীজ বিস্কুট মুখে দেবার পর। এ জিনিস কেবল আপনি জানবেন কি খাচ্ছেন, পাশের জন টেরটিও পাবে না যে আপনার মুখের মধ্যে কি বিল্পব ঘটছে। এই সব ক্ষেত্রে আপনি কি করবেন? ভারতীয় সভ্যতা মেনে খুব সুন্দর বলে ঘাড় নাড়বেন নাকি ডাচ ঐতিহ্য মত ডাইরেক্ট বলে দেবেন যে আপনার মুখে অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসছে! আমি দ্বিতীয় পথ অবলম্বন করেছিলাম আর যোসেফ ভারতীয় সংস্কৃতি।

সেই জিনিস খাবার এফেক্ট যোসেফের লাইফে হিরোসিমা-নাগাসাকির রেডিয়েশন এফেক্টের মতই দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। কিন্তু ব্যাপার হল যোসেফের রুম আর আমার রুম পাশাপাশি, কিছু এক্সপেরিমেন্টও আমরা ল্যাবে একসাথে করতাম। ফলে ওই মৎস ফ্লেভারড জিনিস পুরো না খেয়েও আমি তার সাইড এফেক্ট সর্ম্পকে প্রয়োজনের থেকেও বেশী জ্ঞান লাভ করেছিলাম। পুরো পূজা সংখ্যার ভ্রমণ কাহিনী বা পাণ্ডব গোয়েন্দার সর্বভারতীয় অভিযানের কেস – না দেখেও যে লেখা যায় সেই সত্যিটা আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলুম।

সেই আইভি তার সঙ্গীসাথী সহ আমার নিমো গ্রামে পদার্পণ করেছিল গত বছর – আমাকে আসার আগে জিজ্ঞাসা করেছিল কিছু আনতে হবে কিনা – আমি বলেছিলাম আর যাই হোক ওই বিস্কুট টাইপের জিনিসগুলো যেন না আনে। ওই জিনিস আমাদের গ্রামের লোকজন খেলে হলে আমাকে পঞ্চায়েতে ডাকা হতে পারে বিচারের জন্য – চাই কি ফাইনও করা হতে পারে। আইভী আমার কথা রেখেছিল, তবে সঙ্গে এনেছিল আরো অদ্ভূত কিছু মাল – আমার ভাগ্য ভালো যে গ্রামে এখন কেব্‌ল টিভি চলে এসেছে আর তাই পাবলিকও নানা ধরণের চকোলেটের ছবির সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। সেই তাইওয়ানীজ চীজগুলি চকোলেটের মত দেখতে হওয়াতে আমি চকোলেট বলেই চালিয়েছিলাম। কিন্তু আরো একবার দেখলাম যে আইভী করিতকর্মা মেয়ে – দেখতে দেখতে গ্রামের এক বিশাল অংশের ছোট ছেলে মেয়েদের সাথে ভাব করে ফেলেছিল এবং দেদার সেই ‘চকোলেট’ বিলিয়েছিল। জানিনা না কি ভাষায় কথা বলেছিল, তবে ও ফিরে যাবার অনেক দিন পর পর্যন্ত গ্রামের পাবলিক আর ‘চকোলেট’ লেফট ওভার আছে কিনা এবং আইভী কেমন আছে জানতে চাইত।

আমি, যোসেফ, আইভী ও রিয়া প্রায় নিয়ম করে প্রতি বিষ্যুতবার ‘বিগ জোন্স’ খেতে বেরোতুম। বিগ জোন্স হ ল জাঙ্ক ফুডের এক চেন জাতীয় দোকান – যার গালভরা নাম হল ‘কেবাপ্‌ শপ’। যত তৈলাক্ত খাবার এইখানে পাওয়া যেত – যাঁরা আমাদের দেশে তেলেভাজা খেয়ে তারপর ওই জিনিস খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে খারাপ রায় দিতেন, তাঁদের জানাই যে এই জাতীয় লোক বিশ্বের সব দেশেই বর্তমান। তবে মূল পার্থক্য হল খাবার পর তার বাহ্যিক এফেক্টে – আমাদের দেশে তেলজাত খাবার খেয়ে পাবলিক কেমন যেন শুঁটকে মেরে যায়, বা ভাইস ভার্সা, অর্থাৎ শুঁটকে লোকেরাই যেন তেলেভাজার দিকে প্রকৃত আকৃষ্ট হয়। কিন্তু বিলেতে ওই তেলমাল খেয়ে পাবলিক ফুলত। আমেরিকার অবস্থা তো আরো খারাপ – প্লেনে আগে না উঠলে আপনার সীটের আধখানা হাতছাড়া হয়ে যাবার প্রবল সম্ভাবনা। যাত্রার সারাক্ষণ আপনাকে অপরের পাছার আধখানা কোলে করে বইতে হবে। যাইহোক কেবাপ্‌ মূলত হয় চিকেন বা ল্যাম্ব। একটা লোহার দণ্ডের চারদিকে মাংস চাপে চাপে জড়ানো। এই মাংস আমাদের কাবাবের মতন নয়, মানে এই মাংসে কোন মশলা দেওয়া থাকে না, থাকে কেবল প্রবল পরিমাণে নুন। এই জিনিস খাবার প্রাথমিক শর্তই হল, এর উৎস সম্পর্কে কোন টেনশন মনে রাখলে হবে না। কারণ আপনি এর উৎস জানতেই পারবেন না – লোকে বলে যে দুনিয়ার যত ফ্যাট থেকে শুরু করে আবর্জনা জাতীয় মাংস সব চটকে ওই মোক্ষম জিনিস তৈরী হয়। তা ওই মাংস একটা দন্ডে ঘুরতে থাকে, দণ্ডের পিছনে আগুন (ইলেকট্রিক হিটিং) মৃদু জ্বলে। আপনি চাইবেন আর সেই মাংস কেটে কেটে দেওয়া হবে। যতদিন না সব মাংস বিক্রী হবে ততদিন ওই দণ্ড ঘুরতেই থাকবে এবং সেই দই-লস্যি খাবার মত ভাগ্য ভালো হলে আপনি শেষের দিকের মাংসটা পেতে পারেন। সেই জিনিসের টেষ্ট লিখে বোঝানো অসম্ভব।

আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী কেবাপ্‌ বিক্রী বাড়ত রাতের বেলায় – যত রাত হত পাবলিকের মাতলামোর ম্যাগনিচিউড তত বাড়ত। কেবাপ্‌ শপ গুলির স্ট্র্যাটেজিক পজিশন প্রায়শঃই থাকত পাব বা বারগুলির ঠিক পাশে। রাত ২-৩টের দিকে ওই সব দোকানে ঢোকা যেত না ভিড়ের ঠেলায় – হঠ করে কোন মাতালের মনে পড়ল যে তার খিদে পেয়েছে। সেই সন্ধ্যের ৭ টা থেকে মাল খেয়ে আর নেচে পেটে টান পড়েছে। এই জাতীয় মাতালেরা সাধারণত গ্রুপে থাকে আর গ্রুপ লিডারকে অনুসরণ করে। তো সবার তখন একসাথে খিদে পেয়ে যায় প্রতিবর্ত ক্রিয়ার নিয়ম অনুসারে। কেবাপ্‌ শপ গুলি সেই ক্ষুধার্ত মাতালদের খাদ্য দিত, আর দিত ক্লান্ত ঠ্যাংদের বিশ্রামের জায়গা।

দিনের বেলায় কিছু কিছু কেবাপ্‌ শপ গুলির মতন দোকানগুলিতে ফিস্‌ অ্যাণ্ড চিপস্‌ বিক্রী হত।ফিস্‌ অ্যাণ্ড চিপস্‌ ছাড়া ইংল্যাণ্ডের খাদ্যাভাস আলোচনা করা আর শেক্ষপীরকে বাদ দিয়ে ইংরাজী সাহিত্য আলোচানা করা প্রায় একই ব্যাপার। অবশ্য আজকাল ফিস্‌ অ্যাণ্ড চিপস্‌ এর ইমর্পটেন্স ইংরাজ সমাজ জীবনে শেক্ষপীরের থেকে অনেক বেশী। তা এই ফিস্‌ অ্যাণ্ড চিপস্‌ ও আমরা মাঝে মাঝে খেতুম কেবাপ্‌ কে সরিয়ে রেখে।

কেবাপের উপরে ছড়ানো থাকত সস্‌ - সেটা মেয়োনীজ বা কেচ্‌ আপ, বা অন্য কোন নাম না জানা সস ও হতে পারত। আমি, যোসেফ, আইভী ও রিয়া সেই জিনিস বাড়িতে বয়ে নিয়ে এসে ডাইনিং রুমে বসে বসে খেতাম। যোসেফ ল্যাম্ব কেবাপ্‌ পছন্দ করত, আমি সেটা গন্ধের জন্য বেশী খেতে পারতাম না। কেমন একটা বোঁটকা গন্ধ বেরোত সেই মাল থেকে। যাই হোক খেতে খুবই মুখরোচক যাকে বলে, তবে রাতের দিকে ঘুমের হালকা একটু প্রবলেম হত, মাংসে প্রচুর পরিমাণে নুন থাকার জন্য রাতের দিকে জলটান পড়ত পাকস্থলীতে, ফলে ঘন ঘন জলপান। পরের দিকে মাথার কাছে জল রেখে শুতুম কেবাপ খাবার পর। কিন্তু আমার কোনদিন পেট খারাপ করে নি ওই কু-খাদ্য খেয়ে যেটা আমার প্রায়ই হত দেশে অজানা জায়গার চপ্‌-সিঙাড়া খেয়ে। তবে আমার যা মনে হয় এর মূল কারণ ছিল কোকাকোলা – কেবাপ খেয়ে একপেট কোক পান করে ফেল। বিষে বিষে বিষক্ষয়, আদি অকৃত্রিম হোমিওপ্যাথিক স্ট্র্যাটিজি।

আমাদের কোকাকোলা স্টকে থাকত যোসেফের ঘরে। বাইরে ঠাণ্ডা কিনলে প্রায় চারগুণ দাম দিতে হত, স্টুডেন্ট লাইফে হিসেব করে লাইফ চালানোর জন্য আমি ও যোসেফ ঠিক করেছিলাম কোক ঘরেতে স্টক করাই ভালো। প্রথমদিকে রান্নাঘরের ক্যান্টিনে বড় রেফ্রিজেটারেই আমরা কোক ক্যান গুলি রাখতাম। পরে একটা দুই ফুট বাই দুই ফুট টেবিল টপ ফ্রিজ আমরা জোগাড় করে ফেলেছিলুম, মানে কেউ রাস্তার ধারে ফেলে দেবার জন্য রেখেছিল, আমরা সেটা ল্যাব থেকে ফেরার সময় আপন করে তুলে এনেছিলাম। সেই ফ্রিজে আমরা ক্যান স্টক করে রাখতাম সুপারমার্কেট থেকে পাইকারীদরে কিনে এনে। একবার শীতের দুপুরে আমরা যোসেফের গাড়িতে করে সুপারমার্কেট যাচ্ছি এমন সময় পিছনে সাইরেন দিতে দিতে এসে পুলিস আমাদের থামাল।

এই ফাঁকে যোসেফের গাড়ীটা বিষয়ে একটু বলে নেওয়া ভালো কারণ সেটাই ছিল চার বছর আমাদের বাজার বয়ে আনার বাহন। গাড়ীটা যোসেফের বাবা ওকে গিফট করেছিল জন্মদিনে – একটা কোল্ড-ওয়ার সময় কালের ভক্সওয়াগন, ২০০ পাউণ্ড দিয়ে কেনা। কিন্তু ঘটনা হল গাড়ী যত পুরানো হয়, তার ইনসিওরেন্স ততই বেশী, ফলে চার বছরে যোসেফ গাড়ির দামের থেকে বেশী ইনসিওরেন্স প্রিমিয়াম দিয়েছিল। একবার বিরক্ত হয়ে যোসেফ আমাকে নিয়ে গাড়িটাকে ডিসকার্ড করার জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল – আমাদের জানানো হল যে ওই গাড়ী ফেলতে মিনিমাম ৩০০ পাউন্ড খরচা আছে, ফলে আমরা বিফল মনোরথে গাড়ি নিয়ে ফিরে এলাম। পরে আমি আমার ভারতীয় বুদ্ধি লাগিয়ে এই ডেইলিমা থেকে যোসেফকে উদ্ধার করি। আমাদের লাষ্ট ইয়ারে যোসেফের কাকার ছেলে এল পড়তে, আমি যোসেফকে বললাম যে সবচেয়ে সস্তায় গাড়ি থেকে মুক্তি পাবার উপায় হচ্ছে ওই গাড়ী আবার কাউকে গিফট করা। ক্রিসকে সেই গাড়ী তার জন্মদিনে গিফট করা হয়েছিল – পরের দিকে শুনি যোসেফের সম্পর্কে তার একটু ক্ষুণ্ণতার সৃষ্টি হয়েছে, যেটা আমার মতে খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। তবে ক্রিস যে পরামর্শটা কার দেওয়া সেটা জানত না তা বুঝতে পারলাম যখন ও আমার কবিতার বইয়ের একটা কভার করতে রাজী হয়ে যায়।

সেই গাড়ি নিয়ে আমরা বাজার করতে বেরুব, দেখলাম যে গাড়ীর কাঁচ পুরো বরফ পরে ঢেকে গেছে, ঝাড়লে যাচ্ছে না, পুরো স্ক্রাব করতে হবে। যোসেফ বলল যে এই তো কাছেই দোকান, এত কষ্ট করে বরফ সরিয়ে আর কি হবে, আর তা ছাড়া এই শীতের দিনে রাস্তায় আছেটাই বা কে – তাই সে ড্রাইভারের পাশের দরজাটা খুলে রেখে গাড়ির বাইরে মুখ বাড়িয়ে ড্রাইভ করার পরামর্শ দিল। আমাদের কাছে সেটা খুবই যুক্তিপূর্ণ কথা বলেই মনে হল। যোসেফ জানাল যে সে এমনটা অনেক বারই করেছে ওর দেশে। প্রসঙ্গ উল্লেখ্য যোসেফের বাড়ি মালটা নাম দেশ, যেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি। তাই ওর দেশে যোসেফ গাড়ির বাইরে মুখ বাড়িয়ে ড্রাইভ করত বরফ এড়াতে নয়, বরং গরমের হাত থেকে বাঁচতে। এমন ভাবে আমরা ৫০০ মিটার গেছি কি, পুলিস এসে হাজির – প্রথমে যোসেফের দরজা খুলে চালানোর যুক্তিটা ওরা বুঝতে পারে নি। পরে বুঝতে পেরে হকচকিয়ে গিয়ে শুধুমাত্র সর্তক করে আমাদের ছেড়ে দেয়।

যোসেফ টুকটাক খাবার বানাতে পারত নিজে – তার মধ্যে ওর ফেভারিট ছিল ওয়াইন দিয়ে মাংস রান্না যতদিন না সে আমার ভারতীয় স্টাইলে রান্না করা ঘোড়ার মাংসটা খেয়েছিল। সেই ঘোড়ার মাংস রান্না আমি আগেই লিখেছি যা খেয়ে যোসেফ মালটা দেশটার খাদ্যাভ্যাসই বদলে দেবার কথা ভেবেছিল। একদিন যোসেফ ঠিক করল যে সে আমাদের তার দেশের ঐতিহ্যময় রান্না ‘লাসানিয়া’ বানিয়ে খাওয়াবে। সেই গল্প পরের পর্বে -



510 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: ন্যাড়া

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

একদা আমার এক জাপানি রুমমেট ছিল। নির্বিরোধী লোক। দোষের মধ্যে আমার থেকেও অপরিস্কার আর মাঝে মাঝে তার ম্যাকারেল বেক করার সাধ জাগত। সেদিনগুলো সারা সন্ধ্যে আমি আধ মাইল দূরের কফি শপে আশ্রয় নিতাম। দেখতাম আমাদের অধিকাংশ নেবারও সেখানে জুটেছে।

সুকির খাবারের সিরিজটা খুব এনজয় করছি।
Avatar: amit

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

দারুন হয়েছে লেখাটা।
Avatar: amit

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

বালতি কারি শব্দ-টি শুনেছিলাম পাকিস্তান-এর কোনো এক ম্লেচ্ছ প্রদেশ থেকে উত্পত্তি, তবে তোমার ব্যাখাটা আরো সঠিক বলে মনে হয়, এট লিস্ট প্রাক্টিকাল অপ্প্লিকেসন এর দিক থেকে।
Avatar: Bhagidaar

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

অপরিস্কার জাপানি? আছে নাকি সেরকম কিছু!
Avatar: b

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

না অমিতবাবু। ওটা আফটারথট। তপন রায়চৌধুরীর লেখায় পড়ে দেখবেন।

Avatar: ন্যাড়া

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

b-বাবু/বিবি ও গুরুর ভ্রাতা ও ভগিনীগণ, বছর পনেরো আগে দেশ পত্রিকায় তপন রায়চৌধুরীর বিলেতের দিশি রেস্টুর‌্যান্ট এবং প্রসঙ্গতঃ বালটি-কারি নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেটি কোথায় পাওয়া যেতে পারে?
Avatar: b

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

ভীমরতিপ্রাপ্তের পরচরিতচর্চার নতুন এডিশনে ওনার এই সব লেখাগুলো দেওয়া আছে।
Avatar: ন্যাড়া

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

থ্যাংকু।
Avatar: d

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

রোমন্থন বইটার শেষে আছে ন্যাড়াদা। আগেও কৃশানু বলেছিল, আপনারটা বোধহয় পুরানো এডিশান, তাই পাননি।
Avatar: ন্যাড়া

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

হ্যাঁ, এখন মনে পড়ল। বুড়ো বয়েসের এই মুশকিল, সব ভুলে যাই। প্লাস হতভাগ্য, নতুন এডিশন নাই।
Avatar: PM

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

দারুন লেখা
Avatar: সুকান্ত ঘোষ

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

b-বাবু, d-বাবু এঁরা সবাই ঠিকই বলছেন - তপন বাবুর বই "রোমন্থন অথবা -" এর নতুন সংস্করণে এমন একটি প্রবন্ধ আছে, নাম "অথ কারি-সংবাদ তথা বালতি তত্ত্ব"।

তপন বাবুর এই নিয়ে অন্য লেখা আছে কিনা জানি না - তবে বাঙাল নামা বা এই বইতে আর নেই। আর সাকুল্যে বালিত-তত্ত্বে তপন বাবু ব্যয় করেছেন এক প্যারাগ্রাফ। মজার কথা হল, বিলেতে রান্না-বান্না কিছু নিয়ে বলতে গেলেই পাবলিক এই প্রবন্ধের উল্লেখ দেন। তপন বাবু লিখছেন - "বার্মিংহামের এক প্রতিভাবান সিলেটি সেই উত্তেজনা বহুগুণ বাড়িয়ে দিলেন। তিনি কড়হাই গোসতের নতুন নামকরণ করলেন 'বালতি গোসত্‌'। তা থেকে এক সম্পূর্ণ রন্ধনশৈলী জন্ম নিল - নাম 'Balti Cuisine'।" ব্যাস এই টুকুই। আমিও যদিও মনে করি তপনবাবুর এই অনুমান প্রায় অভ্রান্ত, তবে তাঁর সেই বক্তব্যকে প্রায় বেদ বাক্য মেনে সব জায়গায় রেফারেন্স দেবার মতনও কিছু নয়। আর অন্য কিছু ডাটা দিয়ে তিনি তাঁর লেখাকে সমর্থণ করেন নি। তাই তপনবাবুর 'বালতি-তত্ত্বের' ব্যাখ্যায় যতটা দাবি, ঠিক ততটাই দাবি সেই তত্ত্বজ্ঞানী ইংরাজের যিনি লিখেছিলেন বালতি তত্ত্ব বার্মিংহামে নয়, বরং উদ্ভূত হয়েছিল খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকে বালতিস্তানে।
Avatar: b

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

না না। বক্তব্যটা এই যে বালতি ক্যুইজিনের সাথে বালতিস্তানের কোনো সম্পর্ক নেই। বস্তুত ভারতে কোথাও, কোনো রেস্টুরেন্টে বালতিস্তান পেয়েছেন কি?

এবার সেই বালতি ক্যুইজিন বালতি না মগে তৈরি হয়েছিলো কি না, নাকি কোনো বুদ্ধিমান সিলেটি সেটা বার করেছিলেন, এ গুলো সব, কি বলে, অল্টারনেটিভ হাইপথেসিস।

আর সত্যি বলতে, তপন বাবুর লেখাটা মজা করে লেখা, কাজেই সেখানে ডাটা ইত্যাদি দাবী একটু বাড়াবাড়ি নয় কি?
Avatar: Abhyu

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

সুকান্ত বাবুর লেখাটা খুবই সরেস।
Avatar: শঙ্খ

Re: চিকেন টিক্কা মশালা, রিচমন্ড হিল রোড এবং কয়েকজন

একেবারে মনের মতো টপিক আর লেখনী। বাক আপ সুকি।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন