শিবাংশু RSS feed

শিবাংশু দে-এর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • আমাদের চমৎকার বড়দা প্রসঙ্গে
    ইয়ে, স-অ-অ-অ-ব দেখছে। বড়দা সব দেখছে। বড়দা স্রেফ দেখেনি ওইখানে এক দিন রাম জন্মালেন, তার পর কারা বিদেশ থেকে এসে যেন ভেঙেটেঙে মসজিদ স্থাপন করল, কেন না বড়দা তখন ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুম ভাঙল যখন, চোখ কচলেটচলে দেখলেন মস্ত ব্যাপার এ, বড়দা বললেন, ভেঙে ফেলো মসজিদ, জমি ...
  • ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ?
    যেকোন নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে সামনে আসার পর নাগরিক হিসাবে আমাদের একটা ঈমানি দায়িত্ব থাকে। দায়িত্বটা হল অভিযুক্ত ধর্ষকের কঠোরতম শাস্তির দাবি করা। কঠোরতম শাস্তি বলতে কারোর কাছে মৃত্যুদন্ড। কেউ একটু এগিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ার ...
  • তোমার পূজার ছলে
    বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না ...
  • The Irishman
    দা আইরিশম্যান। সিনেমা প্রেমীদের জন্য মার্টিন স্করসিসের নতুন বিস্ময়। ট্যাক্সি ড্রাইভার, গুডফেলাস, ক্যাসিনো, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, দা অ্যাভিয়েটর, দ্য ডিপার্টেড, শাটার আইল্যান্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট, সাইলেন্টের পরের জায়গা দা আইরিশম্যান। বর্তমান সময়ের ...
  • তোকে আমরা কী দিইনি?
    পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন -********তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, ...
  • ইশকুল ও আর্কাদি গাইদার
    "জাহাজ আসে, বলে, ধন্যি খোকা !বিমান আসে, বলে, ধন্যি খোকা !এঞ্জিনও যায়, ধন্যি তোরে খোকা !আসে তরুণ পাইওনিয়র,সেলাম তোরে খোকা !"আরজামাস বলে একটা শহর ছিল। ছোট্ট শহর, অনেক দূরের, অন্য মহাদেশে। অনেক ছোটবেলায় চিনে ফেলেছিলাম। ভৌগোলিক দূরত্ব টের পাইনি।টের পেতে দেননি ...
  • ছন্দহীন কবিতা
    একদিন দুঃসাহসের পাখায় ভর করে,ছুঁতে চেয়েছিলাম কবিতার শরীর ।দ্বিখন্ডিত বাংলার মত কবিতা হয়ে উঠলোছন্দহীন ।অর্থহীন যাত্রার “কা কা” চিৎকারে,ছুটে এলোপ্রতিবাদী পাঠক।ছন্দভঙ্গের নায়কডানা ভেঙ্গে পড়িপুঁথি পুস্তকের এক দোকানে।আলোক প্রাপ্তির প্রত্যাশায়,যোগ ধ্যানে কেটে ...
  • হ্যালোউইনের ভূত
    হ্যালোউইন চলে গেল। আমাদের বাড়িতে হ্যালোউইনের রীতি হল মেয়েরা বন্ধুদের সঙ্গে ট্রিক-অর-ট্রিট করতে বেরোয় দল বেঁধে। পেছনে পেছনে চলে মায়েদের দল। আর আমি বাড়িতে থাকি ক্যান্ডি বিতরণ করব বলে। মুহূর্মুহূ কলিং বেল বাজে, আমি হাসি-হাসি মুখে ক্যান্ডির গামলা নিয়ে দরজা ...
  • হয়নি
    তুমি ভালবাসতে চেয়েছিলে।আমিও ।হয়নি।তুমিঅনেক দূর অব্দি চলে এসেছিলে।আমিও ।হয়নি আর পথ চলা।তুমি ফিরে গেলে,জানালে,ভালবাসতে চেয়েছিলেহয়নি। আমি জানলামচেয়ে পাইনি।হয়নি।জলভেজা চোখে ভেসে গেলআমাদের অতীত।স্মিত হেসে সামনে এসে দাঁড়ালোপথদুজনার দু টি পথ।সেপ্টেম্বর ২২, ...
  • তিরাশির শীত
    ১৯৮৩ র শীতে লয়েডের ওয়েস্টইন্ডিজ ভারতে সফর করতে এলো। সেই সময়কার আমাদের মফস্বলের সেই শীতঋতু, তাজা খেজুর রস ও রকমারি টোপা কুলে আয়োজিত, রঙিন কমলালেবু-সুরভিত, কিছু অন্যরকম ছিলো। এত শীত, এত শীত সেই অধুনাবিস্মৃত কালে, কুয়াশাআচ্ছন্ন পুকুরের লেগে থাকা হিমে মাছ ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

বুদ্ধকথা

শিবাংশু

অশান্তি তাঁকে ক্রমাগত আঘাত করে যায়। সবাই শান্তিতে, স্বস্তিতে দিনযাপন করে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি তার স্বাদ পাচ্ছেন না। তাঁর জাগতিক কোনও কিছুর অভাব তো ছিলোনা। ঊনত্রিশ বছর বয়স হয়েছে। একজন যাবতীয় ক্ষাত্রবিদ্যায় নিপুণ নৃপতিপুত্র। বধূ শুয়ে ছিলো ঘরে, শিশুটিও ছিলো। তবু অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়, কোন বিপন্নতা তাঁকে ঘরছাড়া করেছে, তিনি নিজেও বুঝে উঠতে পারেন না। জরা, ব্যধি, মৃত্যু'হীন এক মানবসমাজ তো নিতান্ত অসম্ভব সন্ধান। যদি রক্তমাংসের মানুষ এই প্রাকৃত পরিণতি'কে স্বীকার করতে বাধ্য হয়, তবে তার জন্য দুঃখবোধ কেন? দুঃখের কারণ কী? দেশত্যাগী হয়ে যখন মগধের পথে অগ্রসর হলেন, তখন বিশ্বাস ছিলো গঙ্গার দক্ষিণ প্রান্তে মগধের রাজধানী রাজগৃহ সারা গাঙ্গেয় উপত্যকার সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু। জ্ঞানী, সাধক, বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা সেখানে বসবাস করেন। কেউ তো তাঁর বিপন্নতাটি বুঝতে পারবেন। কিন্তু তিনি নানা সাধুসঙ্গ করে অনুভব করলেন মানুষের অধ্যাত্মসাধনার লক্ষ্য অনন্ত স্বর্গলাভ করা। যে স্বর্গে অগণিত রিপুতাড়িত দেবতা, অপ্সরা, প্রমোদমত্ত অস্তিত্ত্বের ভিড়। এতো কামনার পরাকাষ্ঠা। কামনা কি মানুষকে কখনও মোহমুক্ত করতে পারে? 'স্বর্গ' মানে বিবশ মানুষের বাস্তব থেকে পলাতক হয়ে কামনার অগ্নিকে আহুতি প্রদানের এক কল্পিত ভূগোল। তিনি রাজগৃহের কাছে গৃধকূট পর্বতে একটি একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন। মাধুকরী করতে আসা এই তরুণ সন্ন্যাসীর ব্যক্তিত্বের খবর লোকমুখে শুনে স্বয়ং রাজা বিম্বিসার তাঁকে আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁর বংশপরিচয় বিশদ শুনে তাঁকে রাজ হস্তীবাহিনীর সেনানায়কের পদ দিতে চাইলেন। সেকালে অনন্য সম্মান। কিন্তু সিদ্ধার্থ স্থির করে নিয়েছিলেন সংসারধর্ম তাঁর জন্য নয়।
-------------------------------------

বারাণসি গমিষ্যামি গত্বা বৈ কাশিকা পুরীম।
ধর্মচক্রং প্রবর্তিষ্যে লোকে স্বপ্রতিবর্তিতম ।।
কাশীপুরী গমন করে বারাণসিতে লোকের মুক্তির জন্য ধর্মচক্র প্রবর্তন করলাম ( আজীবকের প্রতি শাক্যমুনি বুদ্ধ)

মহাভিনিষ্ক্রমণের পর সিদ্ধার্থ প্রথমে গিয়েছিলেন কোসল রাজ্যে আলার কালামের কাছে। অরিয়পরিয়সেন সূত্তে বুদ্ধের জবানিতে লেখা হয়েছে, ' মঙ্গলকর পথ ও শ্রেষ্ঠ, লোকোত্তর, শান্তিময় তত্ত্বের সন্ধানে আমি আলার কালামের কাছে গেলাম। নিদানকথা, বুদ্ধচরিত ও ললিতবিস্তরে এ বিষয়ে নানা বিপরীত কথা বলা হয়েছে। প্রথম দুটি গ্রন্থে বলা হয়েছে সিদ্ধার্থ প্রথমে রাজগৃহে রাজা বিম্বিসারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ও তার পর মগধে আলার কালামের কাছে দর্শনশিক্ষা করতে যান। তৃতীয় গ্রন্থটিতে বলা হয়েছে তিনি প্রথমে বৈশালী গিয়ে আলার কালামের শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। পরে রাজগৃহে এসে রাজা বিম্বিসারের নির্দেশে উদ্দক রামপুত্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তবে এই তিনটি গ্রন্থই বুদ্ধের দেহাবসানের অনেক পরে, পঞ্চম শতকে, সংকলিত হয়েছিলো। তাই স্বয়ং বুদ্ধের উক্তিটিকেই প্রামাণ্য ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু আলার কালাম বা উদ্দক রামপুত্তের কাছে সিদ্ধার্থকে দেবার মতো কিছুই ছিলোনা। তাঁরা ছিলেন সংসারত্যাগী উপাসক, নিজস্ব ধরনে সাধনা করতেন। তাঁদের থেকে সিদ্ধার্থের প্রাপ্তি বলতে চারটি ধ্যান ও চারটি স্তব। তাতে তাঁর আর কী হবে? কোসল ত্যাগ করে এলেন রাজগৃহের নানা প্রসিদ্ধ শ্রমণদের থেকে দর্শনতত্ত্ব শিখতে। এই শ্রমণরা নানারকম তপস্যা করতেন। তাই দেখে সিদ্ধার্থ তপস্যা করতে শুরু করলেন। প্রথমে হটযোগ, তার পর কৃচ্ছ্বসাধন, উপবাস, খাদ্যগ্রহণ করে আবার উপবাস, এরকম চললো ছ'বছর। কিন্তু ধ্যানমার্গ, তার স্তরভেদ, কঠোর কৃচ্ছসাধন ও তপস্যা , অর্থাৎ সেসময় যা যা কিছু প্রচলিত সাধনবিধি ছিলো সব কিছু নিয়েই পরীক্ষানিরীক্ষা করলেন। এটা প্রমাণ করে তিনি আদ্যন্ত একজন মানুষ ছিলেন, কোনও স্বর্গচ্যুত দেবতা নয়। পরবর্তীকালে তাঁকে দেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে নানা প্রচেষ্টা হয়েছে।
সেই সময় বৈদিক ধর্মের অন্যমেরুতে একটি সামাজিক মন্থন চলছিলো। ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয় জাতির অত্যাচারে সংখ্যাগুরু মানুষ কোনও নতুন 'ধর্মীয়' উত্থানের অপেক্ষায় মুহ্যমান। এ বিষয়ে চর্চা আরণ্যক ও উপনিষদেও আছে। ব্রাহ্মণ্যধর্ম ব্যতিরেকে যেসব মুনিঋষি তখন সমাজে ছিলেন তাঁরা ব্যক্তিগত দর্শনের গন্ডিতে আবদ্ধ, নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা তাঁদের ছিলোনা। এঁদের মধ্যে ছিলেন, অজিত কেশকম্বলি, পুরাণ কাশ্যপ, পাখুদা কাত্যায়ন, সঞ্জয় বেলটঠিপুত্ত, মোক্ষলি গোপাল, চার্বাক প্রমুখ। তাঁরা হয়তো প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি বীতরাগ ছিলেন, কিন্তু নিপীড়িত মানুষকে শূশ্রূষা দেওয়া ছিলো সাধ্যের অতীত। তাঁদের পঞ্চভূতবাদ, বিক্ষেপবাদ, অক্রিয়বাদ, নিয়তিবাদ ইত্যাদি ছিলো মস্তিষ্কের ব্যায়াম, প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিতান্ত তাত্ত্বিক। এই সব জড়নীতির প্রেক্ষাপটে তীর্থংকর মহাবীর প্রচার করছেন পঞ্চমহাব্রত ও ব্রহ্মচর্য। জাগতিক প্রয়োজনকে অস্বীকার করে কঠোর উপবাস ও নিবেদিত সন্ন্যাস জীবনের ব্রত।
সিদ্ধার্থকে এসব কিছুই প্রভাবিত করতে পারলো না। কঠোর, কঠোরতর তপস্যা ও কৃচ্ছসাধনের পীড়ন প্রত্যাখ্যান করে তিনি অবলম্বন করলেন 'মধ্যপথ'। প্রচার করলেন সংক্ষিপ্ত স্মৃতিনির্দেশ, পঞ্চশীল। তাঁর তপস্যাপর্বের পাঁচ সঙ্গী, কোন্ডিণ্য, বপ্প, ভদ্দিয়, মহানাম ও অস্মজি মনে করলেন বুদ্ধ কঠোর তপস্যার চাপ নিতে অক্ষম এবং 'মধ্যপন্থা' আসলে আরামের কাছে আত্মসমর্পণ। তাঁরা ত্যাগ করলেন বুদ্ধকে। মগধ ছেড়ে তাঁরা যাত্রা করলেন বারাণসির দিকে।
-----------------------------------------
২.
'অনেক জাতি সংসারং সন্ধাবিস্সং অনিব্বিসং
গৃহকারকং গবেসন্তো দুঃখ জাতি পুনপ্পুনং ।
গহকারক ! দিটঠোহসি, পুন গেহং ন কাহসি
সব্বা তে ফাসুকা ভগ্গা গহকূটং বিসংখিতং।
বিসঙ্খারগতং চিত্তং তণ হানং খয়মজঝগা ।
(ধম্মপদ)
'জন্ম জন্মান্তর পথে পথে ফিরেছি কিন্তু সন্ধান পাইনি। এ গৃহ যে নির্মাণ করেছে কোথায় সে গোপনচারী। বার বার দুঃখ পেয়ে এবার তোমার দেখা পেলাম, হে গৃহকারক! আর তুমি এ গৃহ রচনা করতে পারবে না। তোমার স্তম্ভ, গৃহভিত্তি সব ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার চিত্ত আজ সংস্কারবিগত, তৃষ্ণার থেকে মুক্ত আমি আজ।'
নৈরঞ্জনা নদীর ধারে এক বৈশাখী পূর্ণিমার রাতে প্রথম প্রহরে তাঁর মনে পড়লো পূর্বজীবনের কথা। দ্বিতীয় প্রহরে লাভ করলেন দিব্যচক্ষু, তৃতীয় যামে দর্শন করলেন ভবচক্র ( প্রতীত্য সমুৎপাদবাদ) এবং চতুর্থ প্রহরে সর্বজ্ঞান অধিগত করে অর্হত্ত্ব প্রাপ্ত হলেন সিদ্ধার্থ। উল্লিখিত উপলব্ধি উচ্চারণ করার পর শাক্যমুনি পরমকারুণিক গৌতম বুদ্ধের জন্ম হলো।
বুদ্ধত্ব লাভের পর আট-দশ দিন গৌতম বুদ্ধ বোধিবৃক্ষের চারদিকে তপস্যাযাপন করলেন। মহাবগ্গ অনুযায়ী এই সময়ই প্রতীত্যসমুৎপাদ তত্ত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু সংযুক্তনিকায় বলে এই উপলব্ধি বুদ্ধের অনেক আগেই হয়েছিলো। এই তত্ত্ব জটিল। তবে মূল কথা হলো তৃষ্ণা ও তার ফলরূপ দুঃখের আকর মানুষের অবিদ্যা। কীভাবে অবিদ্যাকে বিনাশ করে স্তরে স্তরে তৃষ্ণা ও দুঃখ জয়ের শেষে মোক্ষলাভ হয় তার বিস্তৃত ব্যাখ্যা আছে এই তত্ত্বে। কিন্তু কার কাছে প্রচার করবেন তাঁর অর্জিত দর্শন? প্রথমে প্রয়াস করলেন তাঁর প্রথম 'গুরু' উদ্দক রামপুত্তের সঙ্গে এই তত্ত্ব নিয়ে বিনিময় করেন। কিন্তু সংবাদ পেলেন উদ্দক প্রয়াত হয়েছেন। তার পর খোঁজ নিলেন আলার কালামের কুশল। দুর্ভাগ্য আলারও তখন আর ধরাধামে নেই। এই নবদর্শনকে সম্যক হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে এমন কাউকে আর মগধে পেলেন না। বুদ্ধ কাশীর পথে অগ্রসর হলেন।
---------------------------------------
৩.
দীর্ঘ, দুর্গম বনপথ অতিক্রম করে তিনি পৌঁছোলেন বারাণসির উপান্তে ঋষিপত্তনে ( ইসসিপত্তন)। পথে গঙ্গানদী পেরোলেন সাঁতার দিয়ে। তাঁর কাছে নৌকোযাত্রার পাথেয় ছিলোনা। তাঁর পঞ্চশিষ্য শুনলেন বুদ্ধ এসেছেন, কিন্তু কৌন্ডিণ্য ব্যতিরেকে বাকিরা স্থির করলেন কঠিন তপোশ্চর্যা যে মানুষের কাছে ত্যজ্য, তিনি গুরু হতে পারেন না। কিন্তু যেহেতু তিনি রাজসন্তান তাই ন্যূনতম সম্মান তাঁর প্রাপ্য। তাই পাঁচ জনেই অপরাণ্হে এলেন ঋষিপত্তনের দক্ষিণে সেই প্রান্তরে যেখানে বুদ্ধ ধ্যানমগ্ন ছিলেন। বুদ্ধকে দর্শনমাত্র তাঁরা বুঝতে পারলেন যে এই বুদ্ধ একজন অন্য ব্যক্তিত্ব। ধর্মদর্শন আলোচনা করতে করতে তাঁরা আরো উত্তরের দিকে মৃগদাবের পথে যাত্রা করলেন। রাত্রির প্রথম যামে বুদ্ধ উপবেশন করলেন একস্থানে,
। তার পর মৌনতা অবলম্বন করে ধ্যানমগ্ন হলেন। দ্বিতীয় প্রহরে তিনি ধ্যান সম্বরন করে পঞ্চশিষ্যের কাছে আত্মউন্মোচন করলেন। সেই নিশীথ আকাশের নীচে সুপ্ত চরাচরে তিনি প্রকাশ করলেন তাঁর উপলব্ধির মূলতত্ত্ব।
" হে ভিক্ষুগণ, একদিকে সংসারী মানুষের উপভোগ্য ইন্দ্রিয়সুখ, অপরদিকে ফলহীন দুঃখকর ব্রহ্মচর্য্য, এই উভয়ই ধর্মার্থীগণ পরিত্যাগ করিবে। আমি এক মধ্যপথ আবিষ্কার করিয়াছি, যে পথ অবলম্বন করিলে চক্ষু উন্মীলিত হয়, দিব্যজ্ঞান জন্মে, শান্তিলাভ হয়, মানব নির্বানপ্রাপ্ত হয়। সৎদৃষ্টি, সদবাক্য, সৎসঙ্কল্প, সদ্ব্যবহার, সদুপায়ে জীবিকা আহরণ, সৎচেষ্টা, সৎস্মৃতি, সম্যক সমাধি, আমার আবিষ্কৃত এই অষ্ট পথ। দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখনিরোধ, দুঃখনিরোধের পথ, আমার প্রচারিত এই চারিটি মহাসত্য। " তার পর সারা রাত্রি ধরে তিনি আলোচনা, ব্যাখ্যা, বিনিময় করলেন তাঁর হৃদয়ের উপলব্ধি। এই পঞ্চশিষ্য তাঁকে রাজগৃহ-উরুবেলায় ত্যাগ করে চলে এসেছিলেন। বিশদ আত্মমন্থন করে তাঁরা অনুভব করেছিলেন গৌতম বুদ্ধ বিনা তাঁদের গতি নেই। তাঁরা তো গুরুর অপেক্ষাতেই দিনযাপন করছিলেন বারাণসিতে।
পরদিন ব্রাহ্মমূহুর্তে কৌন্ডিণ্য বুদ্ধের প্রথম শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। তার পর একে একে বপ্প, ভদ্দীয়, মহানাম ও অস্মজি বুদ্ধের শরণ নিলেন।
-----------------------------------------
৪.
'নত্থি রাগসম অগ্গি, নত্থি দসসমো কলি,
নত্থি খন্দাদিসা দুক্খা, নত্থি সন্তিপরং সুখং।
জিঘচ্ছা পরমা রোগা, সঙ্খারা পরমা দুখা,
এতং ঞত্বা যথাভূতং নিব্বানং পরমং সুখম ।।'
চৌখন্ডিস্তূপ থেকে দু-আড়াই কিমি উত্তরে এগিয়ে গেলে সারনাথের মূল পুরাতত্ত্ব অবশেষের অবস্থান। বুদ্ধ পদার্পণ করার সময় এখানে ছিলো বিস্তীর্ণ বনভূমি । স্থানটি হরিণ অধ্যুষিত হবার জন্য সেটি মৃগদাব নামেও কথিত হতো। এই মৃগদাবের সন্দর্ভ ধরেই পরবর্তীকালে জাতককথার সূত্রপাত হয়। আসলে সারনাথ নামটিই এসেছে মৃগরাজ সারঙ্গনাথের নাম থেকে। এখনও সেখানে একটি সরকার স্থাপিত হরিণ অভয়ারণ্য রয়েছে। সেখানে মূলতঃ বিদেশী বুদ্ধভক্তদের ভিড় দেখতে পেলুম। মূল চত্বরটির প্রবেশপথের পাশ থেকে শুরু হয়ে যায় বৌদ্ধ মঠের ভগ্নাবশেষ। চক্রপথের ডানপাশে শ্রমণ ও ভিক্ষুদের সারবাঁধা বাসস্থানের ভগ্নাবশেষ রয়েছে। সেগুলি পেরিয়ে গেলেই ধর্মরাজিকাস্তূপ। এই স্তূপটির মাহাত্ম্য বিষয়ে পরে আলোচনা করছি। ধর্মরাজিকা স্তূপ থেকে ঈষৎ উত্তরমুখী হলেই প্রাচীন মূলগন্ধকুটিবিহার মন্দিরের ধ্বংসস্তূপ।
-----------------------------------
৫.
' বারাণসির উত্তর-পূর্বদিকে বরণা ( বরুণা) নদী পেরিয়ে ১০ লি মতো গেলে 'লু ঈ' বা মৃগদাব সঙ্ঘারামের দেখা পাওয়া যায়। এর সীমানা আট ভাগে বিভক্ত, একটি ঘেরা দেওয়াল দিয়ে সব গুলি সংযুক্ত রয়েছে। কয়েকতল উঁচু বুরুজগুলি সংলগ্ন ঝুলবারান্দা ও সেগুলির কারুকাজ খুব নিপুণ হাতের কাজ। এই সঙ্ঘারামটিতে ১৫০০ মতো ভিক্ষু রয়েছেন। তাঁরা হীনযান মতের সম্মতীয় শাখার উপাসক। বিরাট সীমানার মধ্যে প্রায় দুশো ফুট উঁচু একটি বিহার দেখলাম। তার শীর্ষদেশে একটি সোনায় মোড়া আমের প্রতিকৃতি রয়েছে। দালানগুলির ভিত্তি পাথরের। সিঁড়িও পাথরের, কিন্তু বুরুজ ও কুলুঙ্গিগুলো ইঁটের তৈরি। কুলুঙ্গিগুলো চারদিকে একশোটি সারিতে সাজানো ও তার প্রত্যেকটিতে একটি করে সোনার বুদ্ধমূর্তি রয়েছে। বিহারের মধ্যে দেশি তামা দিয়ে তৈরি একটি বুদ্ধমূর্তি। ধর্মব্যাখ্যানের রত এই মূর্তিটির আকার স্বাভাবিক মানুষের সমান।'
মূলগন্ধকুটিবিহারের এই বর্ণনা করেছিলেন হিউ এন সাং আনুমানিক ৬৪০ সালে। তাঁর বিবরন পড়ে মনে হয় চতুর্থ ও পঞ্চম শতকে গুপ্তযুগে নির্মিত এই বিহারটি সেই সময় পূর্ণ গৌরবে বিরাজ করতো। বুদ্ধ নিজে তাঁর অনুগামীদের যে চারটি স্থানকে 'অভিজাহিতাত্থানানি' অর্থাৎ অপরিবর্তনীয় তীর্থভূমি বলে নির্দেশ দিয়েছিলেন ঋষিপত্তনের মৃগদাব, যেখানে মূলগন্ধকুটিবিহার নির্মিত হয়েছিলো, তার অন্যতম। বাকি তিনটি উরুবেলা (বোধগয়া), সংকস্সা ও শ্রাবস্তীর জেতবন। বৌদ্ধদর্শনের পবিত্রতম কেন্দ্র হিসেবে ঋষিপত্তনের বিহারটি সমগ্রবিশ্বে স্বীকৃত ছিলো। একটি রটনা আছে যে গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক নাকি ঋষিপত্তনের বিহারটি বিধ্বস্ত করেছিলেন। এই রটনাটির সূত্র কিন্তু আবার এই হিউ এন সাং। তিনি ৬৪৪ সালে ভারত ত্যাগ করেছিলেন এবং তাঁর ঋষিপত্তন আগমন তার দুচার বছর আগেই। তাই তাঁর পূর্বোক্ত বিবরনের সঙ্গে এই স্থানে শশাঙ্কের ধ্বংসলীলার আখ্যান ঠিক মেলেনা। একথা ঠিক অঙ্গ, বঙ্গ ও মগধদেশে শশাঙ্ক 'বেদবিরোধী' শ্রমণদের বহু প্রতিষ্ঠান বিনষ্ট করেছিলেন এবং সেইকালে তীব্র বৌদ্ধবিরোধিতার কারণে বেশ বিখ্যাত বা কুখ্যাতও ছিলেন। শ্রীহর্ষের সঙ্গে তাঁর বহুবিদিত শত্রুতা এবং সেই কারণে শ্রীহর্ষানুগত হিউ এন সাঙের রচিত ইতিহাসে তাঁর সম্বন্ধে সমদর্শী বিশ্লেষণ থাকার সম্ভাবনা নিতান্ত কম মনে হয়।
হিউ এন সাং 'ধর্ম-ব্যাখ্যানে রত' যে বুদ্ধমূর্তিটির কথা উল্লেখ করেছেন সেটি বুদ্ধের উপবিষ্ট 'ধর্মচক্রপ্রবর্তনমুদ্রা'র প্রতিচ্ছবি। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী সেটি ধাতুনির্মিত ছিলো। কিন্তু ঊনবিংশ শতকে মূলবিহারের খননসূত্রে লব্ধ এই মুদ্রায় বুদ্ধের প্রস্তরমূর্তিটির ( যেটি এই সময় সারনাথ জাদুঘরে রয়েছে) মতো উচ্চকোটির ভাস্কর্য আমি দেশে আর একটিই দেখেছি। সেটি পাটনা জাদুঘরে আরো চারশো বছর আগে মৌর্যযুগের শেষ পর্যায়ে নির্মিত বিখ্যাত দিদারগঞ্জের যক্ষী মূর্তি।
-----------------------------------
৬.
এই বিহারটির বাইরে হিউ এন সাং দশটি স্তূপ, তিনটি সরোবর ও 'হেঁটে যাবার ভঙ্গিমায়' তথাগতের একটি 'মহান করুণা ও ভাবব্যঞ্জক' মূর্তি দেখেছিলেন। এছাড়া তিনি একটি প্রায় তিনশো ফুট স্তূপ দেখেছিলেন এখানে। ' এই স্তূপটির নীচের ভিত্তি বেশ চওড়া ও নির্মানটি অনেকটা উঁচু। এটি বিভিন্ন ধারার কারু ও শিল্পকাজ শোভিত এবং মহার্ঘ বস্তু দিয়ে সুন্দর করে সাজানো'। এই স্তূপটিই আদিরূপে সম্রাট অশোক নির্মিত 'ধর্মচক্র স্তূপ' ছিলো, পরবর্তীকালে পালিভাষায় ধম্মখ বা বর্তমানকালে ধামেখ স্তূপ নামে পরিচিত। এটিকে পঞ্চম শতকে গুপ্তযুগে বিশাল আকার দেওয়া হয়। এর নীচের অংশে আটদিকে আটটি কুলুঙ্গি করা আছে এবং পাথরে উৎকীর্ণ নানা জ্যামিতিক বিন্যাস , স্বস্তিক, পুষ্প-পত্র, পক্ষী ও মানুষিক নক্শা দেখতে পাওয়া যায়। কারুকৃতি হিসেবে এর তুলনা সাঁচীর স্তূপের সঙ্গে করা যেতে পারে। এর দক্ষিনে রয়েছে ধর্মরাজিকা স্তূপ। এখন শুধু এর চক্রাকার ভিত্তিভূমিটিই অবশিষ্ট রয়েছে। সারনাথের উপর বারাণসির অন্যান্য মন্দিরের মতো বারম্বার তুর্কি ও অন্যান্য বিধর্মী আক্রমণ হয়েছে। ফলতঃ এর গরিমাময় প্রাচীন স্থাপত্যের প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই শুধু ধামেখ স্তূপটি ছাড়া। কিন্তু ধর্মরাজিকা স্তূপটির যতোটা অবশেষ বাকি ছিলো, অষ্টাদশ শতকে কাশীনরেশ চেত সিংএর দিওয়ান জগত সিং একটি বাজারের দোকানপাট নির্মাণের জন্য তার ইঁটগুলি ভেঙে নিয়ে যায়। এই স্তূপে একটি সবুজ পাথরের আধারের মধ্যে বুদ্ধের দেহাবশেষ ছিলো। এই লোকটি বুদ্ধের আত্মার শান্তি কামনায় তা গঙ্গায় বিসর্জন দেয়। শূন্য আধারটি এই মূহুর্তে ভারতীয় জাদুঘর, কলকাতায় রক্ষিত আছে। এই নিদর্শনটি ব্যতিরেকে এই স্তূপটির অভ্যন্তরে বেশ কিছু অমূল্য পুরা সামগ্রী পাওয়া গিয়েছিলো, কিন্তু তার কোনও হদিশ এখন আর পাওয়া যায়না। ধর্মরাজিকা স্তূপটি প্রাক অশোকপর্ব থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিলো। কারণ প্রাপ্ত লোককথা বা ইতিহাস অনুযায়ী এই বিশেষ স্থানটিতেই বুদ্ধ তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যকে ধর্মচক্রপ্রবর্তন বিষয়ক উপদেশ দিয়েছিলেন। অশোক পিয়দসসি ইতোপূর্বে স্থাপিত স্তূপটিকে বিবর্ধিত করেছিলেন। তার পর গুপ্তযুগে দুবার এবং পরবর্তীকালে আরো দুবার এই স্তূপটির আকার বৃদ্ধি করা হয়েছিলো। কিন্তু জগত সিংয়ের কল্যাণহস্তের আশীর্বাদে এখন শুধু এর ভিত্তিভূমিটিই অবশিষ্ট আছে।
সিংহলে প্রাপ্ত মহাবংশে বলা হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে যখন অনুরাধাপুরায় মহাস্তূপের উদ্বোধন হয়েছিলো তখন ঋষিপত্তন থেকে প্রায় দ্বাদশ সহস্র ভিক্ষু ও শ্রমণ সেখানে সমাগত হয়েছিলেন। পঞ্চশিষ্যকে দীক্ষা দেওয়ার পর যশ নামে কাশীর এক প্রতিপত্তিশালী ব্রাহ্মণ বুদ্ধের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তিনি সপরিবারে ঋষিপত্তনে এসে তাঁর শরণ গ্রহণ করেন। এই ঘটনার পর বারাণসিতে বুদ্ধের জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এক বছরের মধ্যে ষাট জন অনুগামী তাঁর ধর্মে দীক্ষা নেন। এই সব শিষ্যকে বুদ্ধ নবধর্ম প্রচার করতে বিভিন্নদিকে প্রেরণ করেন ও নিজে ফিরে যান উরুবেলায়।
------------------------------------
৭.
এই পরিসরে এখনও বেশ কিছু স্তূপ ও চৈত্যের ভগ্নাবশেষ দেখা যায়। দেখা যায় অশোক পিয়দসসির স্থাপিত ধর্মচক্র সিংহস্তম্ভের ভগ্ন মূল ভিত্তিটি। এই স্তম্ভটি তুর্কি আক্রমণে ভূলুন্ঠিত হয়। কিন্তু সৌভাগ্যবশতঃ এই স্তম্ভের শীর্ষদেশে স্থাপিত চতুর্দিকে সিংহচিণ্হিত মূর্তিটি ভূলুণ্ঠিত হলেও তার ক্ষতি সামান্যই হয়েছিলো। এই সিংহমূর্তিটিই স্বাধীন ভারতের সরকারি প্রতীক। সিংহমূর্তিগুলির নীচে চারটি পশুমূর্তি, হস্তী, বৃষ, অশ্ব ও সিংহ এবং চব্বিশ শলাকার চক্র উৎকীর্ণ রয়েছে। এই চক্রটি ভারতীয় জাতীয় পতাকার মধ্যমণি। এই চতুর্সিংহ ও অন্য চারটি পশু ভারতবর্ষের চতুর্দিকে সার্বভৌম সম্রাট অশোকের অধিকার প্রচার করছে। একদিকে প্রায় ভূমিগত অবস্থায় রয়েছে এককালের জমকালো পঞ্চায়তন মন্দির।
সারনাথ শুধু বৌদ্ধধর্মের শ্রেষ্ঠ তীর্থ নয়। সার্বভৌম ভারতধর্মের যে সংহত রূপ বারাণসি নামক ধারণার মধ্যে দেখি, সারনাথ তার সার সংক্ষেপ বলা যায়। যখন ঐ অঙ্গনপরিসরের মধ্যে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম তখন এই ভাবনাটিই মনের ভিতর ক্রমশঃ অনুরণিত হয়ে যাচ্ছিলো। ইতিহাসের নানাপর্যায়ে বিভিন্ন চিন্তানায়কের থেকে ভারতদর্শন বা ভারতধর্ম বিষয়ে যেসব বোধের মণিমুক্তো আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেছে, ঋষিপত্তন বা সারনাথের ঐ নাতিবিশাল ভূখন্ডটি তার মূর্ত নিদর্শন।
----------------------------------
৮.
যেসব উৎসাহী মানুষ সারনাথ দর্শনে আগ্রহী, তাঁদের অবশ্যকর্তব্য এর সন্নিহিত জাদুঘরটি মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করা। স্থানিক জাদুঘর সারাদেশে অসংখ্য দেখেছি, কিন্তু এই ছোট্টো সংগ্রহশালাটি এককথায় অনুপম এবং শিহরণ জাগায়। মৌর্য, কুষাণ, গুপ্ত ও পালযুগের বিভিন্ন পুরানিদর্শন ও ভাস্কর্যের যে নমুনা এখানে আমি দেখেছি তার সত্যিই কোনও তুলনা নেই। পূর্বোক্ত ধর্মচক্রপ্রবর্তন মুদ্রায় বুদ্ধের মূর্তিটি ও অশোকের সিংহস্তম্ভ ছাড়াও বহু বোধিসত্ত্ব ও সনাতনধর্মের দেবদেবীর ঈর্ষণীয় সংগ্রহ এই জাদুঘরটিতে দেখা যায়।
ঋষিপত্তনের বৌদ্ধ এলাকার সঙ্গে লাগোয়া রয়েছে জৈন তীর্থংকর শ্রেয়সনাথের মন্দির। একটি মহাবৃক্ষকে কেন্দ্রে রেখে এই মন্দিরের সন্নিহিত উদ্যানটি মনে হয় শান্তিকল্যাণ। বারাণসি শ্রেয়সনাথের জন্মস্থান। এই মন্দিরটির বিপরীতদিকে রয়েছে বিখ্যাত বৌদ্ধ সাধক, পন্ডিত ও চিন্তানায়ক সিংহলের অনাগারিক ধর্মপাল কর্তৃক ১৯৩১ সালে স্থাপিত মূলগন্ধকুটিবিহারের নবমন্দিরটি। মনে করা হয় ঋষিপত্তনে গৌতমবুদ্ধ এই মন্দিরটির ভূমিতে অবস্থিত একটি মঠে বসবাস করতেন। এই মন্দিরটিতে তক্ষশিলা থেকে সংগৃহীত কিছু বৌদ্ধ পুরানিদর্শন রয়েছে। অনাগারিক ধর্মপাল ছিলেন আধুনিককালে ভারতভূমির বৌদ্ধ নবমূল্যায়ণের পথিকৃৎ । ১৮৯১ সালের বুদ্ধপূর্ণিমায় তিনি কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহাবোধি সমাজ। আজকের সারনাথের সংস্কার ও বিকাশের ক্ষেত্রে তিনিই ছিলেন মূল প্রেরণা। তাঁর সমাধিমন্দিরও রয়েছে এই পরিসরেই।
-------------------------------------
৯.
সূর্যাস্তের সময় এগিয়ে এলো। ফিরে যাচ্ছিলুম আবার বারাণসির মূল শহরের আস্তানার দিকে। 'বেদবিরোধী' বুদ্ধকে একসময় ব্রাহ্মণ্য শক্তিকেন্দ্র চরম আক্রমণ চালিয়েছিলো বিধর্মী অভিযোগে। আদি শংকরের পূর্বসূরি কুমারিলভট্টের নেতৃত্বে যে সংখ্যায় বুদ্ধভক্তদের হত্যা করা হয়েছিলো, চারশো বছর তুর্কি অত্যাচারেও ততো বৌদ্ধনিধন হয়নি। ব্যক্তিক নীতিবোধ যখন গোষ্ঠীগত 'ধর্ম'বিশ্বাসে রূপান্তরিত হয়, মানবিকচর্যা ও মূল্যবোধের তুমুল বিপর্যয় তখনই সম্ভবামি এবং যুগে যুগে তার অন্ধ অনুকরন ইতিহাসকে কলংকিত করে রাখে। কিন্তু এই ঋষিপত্তনে শাক্যমুনি গৌতম বুদ্ধ তাঁর এক প্রিয়তম শিষ্য সারিপুত্তকে যা বলেছিলেন, তাঁর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কালের উপনিষদেরও মর্মবাণীর মধ্যে সেই একই আকূল পথনির্দেশ পাওয়া যায়।
' অপারূতা তেসং অমতস্স দ্বারা
যে সোতবন্তো পমুঞ্চন্তু সদ্ধং,
বিহিংস সঞঞী পগুণং ন ভাসিং,
ধম্মং পণীতং মনুজেসু ব্রহ্মে ।' ( মহাবগ্গ)
অমৃতের দুয়ার আজ উন্মুক্ত। যাহারা শ্রবণে সক্ষম, তাহারা শোন। শ্রদ্ধাদ্বারাই এই অমৃতের সাক্ষাৎকার লাভ হইবে। হিংসা অপগুণ হইতে মুক্ত হও। ধর্ম এইরূপে মানুষের সার্থকতা প্রণয়ন করে।
..................................................
আজ বৈশাখী পূর্ণিমা...


898 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3]   এই পাতায় আছে 23 -- 42
Avatar: phaaltu

Re: বুদ্ধকথা

আচ্ছা, এটা বোধহয় জীবন আর জড় এর দ্বান্ধিক সমস্যা।
তার মানে কি তখনকার কালে বুদ্ধ একমাত্র যিনি ভেবেছিলেন জড় থেকে জীবন হয়?
Avatar: Atoz

Re: বুদ্ধকথা

তাহলে ঐ জাতক সিরিজ? নানা জন্মে জন্মে নানারূপে---
জন্মের আগেও কিছু নেই, মৃত্যুর পরেও কিছু নেই--এদিকে ঐ জাতক কাহিনিমালা যা কিনা জাতিস্মর হয়ে বলে বলে গেছেন, এই দুটো বিপরীত ব্যাপার কেমন করে একইসঙ্গে চল্লো?
Avatar: phaaltu

Re: বুদ্ধকথা

তাও বটে।
আচ্ছা, সে সব কি বুদ্ধ বলেছেন, না পরে জুড়েছে?
Avatar: Atoz

Re: বুদ্ধকথা

কিছুকিঞ্চিৎ বুদ্ধ নিজেই বলেছিলেন মনে হয়(হয়তো তাঁর বলার নেপথ্যের ভাবনাটা বা ব্যাখ্যাটা বলেন নি ), পরে বিশাল লতাপাতা নকশা জুড়ে ইয়া ইয়া কাহিনি হয়েছে, লোকজনে বানিয়ে নিয়েছে। ছবিটবিও তো এঁকেছে পরে অজন্তা ইলোরা ইত্যাদিতে।
Avatar: Atoz

Re: বুদ্ধকথা

কয়েকটা সূত্র সত্য ইত্যাদি দিয়ে তৈরী একটা মতবাদের মধ্যে যখন পরবর্তীকালে ব্রহ্মার চোখ, তুষিত স্বর্গ, ইন্দ্র ইত্যাদি দেবতারা উড়ে আসছেন বুদ্ধের উপদেশ শোনার জন্য, অসিতদেবলও আসছেন, মায়াদেবীও আসছেন, অন্যদিকে তারা, নীল সরস্বতী, তন্ত্রের নানা ব্যাপার ঢুকে একেবারে ইয়া ব্বড় ব্যাপার হয়ে গিয়েছে, তখন লোকজনের কাহিনি বানানোর ও অন্যদিক থেকে এনে জুড়ে দেবার ক্ষমতাকে একেবারেই হাল্কা করে দেখা উচিত নয়।
Avatar: শিবাংশু

Re: বুদ্ধকথা

শাক্যমুনির সমসময়ে, অর্থাৎ আদি ও মধ্য বৈদিক যুগে যেসব ঐশী অস্তিত্ত্বের উপাসনা করা হতো তাঁরা সব বিভিন্ন প্রাকৃত শক্তি; অগ্নি, বরুণ, মরুৎ, পর্জন্য, অর্যমা ইত্যাদি। এই উপাসনার উদ্দেশ্যই ছিলো এই সব শক্তিকে ভজনা করে ঐহিক লাভ সন্ধান করা। বস্তুত বিভিন্ন বেদের যাবতীয় ব্রাহ্মণে শুধু দেহি দেহি রব। গুপ্তযুগের পরবর্তীকালে সব পুরাণেও এই দৈব ভিক্ষাবৃত্তির বিরাম নেই। বরং তা আরো প্রকট হয়েছে। এমত স্পিরিচুয়াল বাতাবরণে গরিষ্ঠের কাছে শাক্যমুনির উপদেশ পৌঁছে দেবার সর্বাধিক সমস্যা ছিলো সেখানে কোনও নগদ'বিদায়ের প্রত্যাশা ছিলোনা। ব্রাহ্মণরা খুব জোরের সঙ্গে দাবি করতো যজ্ঞ ইত্যাদি করলে হাতে হাতে গোধন, ভূধন, স্ত্রীধন, কাঞ্চন সব লাভ হবে। উপরন্তু বোনাস হিসেবে অনন্ত স্বর্গবাসের ব্যবস্থাও হয়ে যাবে। সেখানে শাক্যমুনি স্বর্গের অস্তিত্ত্বেই বিশ্বাস করেন না। উপরন্তু পাবার মধ্যে রয়েছে শুধু নির্বাণের হাতছানি। আর নির্বাণ মানে শুধু নেতি নেতি। সব কিছু বিনাশপ্রাপ্ত হবার নিশ্চিত আহ্বান। 'নির্বাণ' মানে এক অনির্বচনীয় অবস্থা। যাকে ধরা যায়না, ছোঁয়া যায়না, বোঝা যায়না। শাক্যমুনি বলেন দুঃখ দূর করো, দুঃখের কারণ দূর করো, তৃষ্ণা দূর করো, কামনা দূর করো, তবেই মোক্ষ, তবেই নির্বাণ। এদিকে ব্রাহ্মণরা বলে যাচ্ছেন যজ্ঞবলে যে সম্পদলাভ হবে তা দিয়ে তুমি সব ঐহিক দুঃখের সমাধান করে দিতে পারবে। এখানে একটা 'কিন্তু' আছে। এই লাভ কিন্তু সবার জন্য নয়। তা শুধু উচ্চবর্ণের মৌরসিপট্টা। তবে সংখ্যাগুরু অন্ত্যজদের জন্য কী উপায় নির্দিষ্ট হবে? এই অনিশ্চিত অধ্যাত্ম স্পেসটিকে বুদ্ধের আশ্বাস দখল করে নিলো। সেই ট্র্যাডিশন আজও চলেছে।
----------------------------------------
প্রথমযুগের বৌদ্ধরা নির্বাণের এই 'চতুষ্কোটিবিনির্মুক্ত' আত্মার বিনাশকে স্বীকার করে নিয়েছিলো। কিন্তু কালক্রমে এতোটা বিমূর্ত কোন ধারণার প্রতি বিশ্বস্ত থাকা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়লো। শূন্যরূপ আত্মার ধারণাকে পরিবর্তিত করে তারা বললো জীবন হলো 'ভাব'পদার্থ আর নির্বাণ হলো 'অভাব'। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তাদের কাছে এটাও স্পষ্ট হলো যে সংসারও বস্তুত নেতিপদার্থ, অর্থাৎ তাকেও 'অভাব' বলা যায়' । এই যুক্তিতে ভব ও নির্বাণ দুইই শূন্য। বৌদ্ধ ধর্মের এই পর্যায়টা আসতে প্রায় এক হাজার বছর লেগে গিয়েছিলো। আমাদের ইতিহাসে সেটা চর্যাপদের যুগ। লামা সরহপাদের দোহা'তে আছে,
" অপণে রচি রচি ভব নির্বাণা।
মিছেঁ লোঅ বন্ধাবএ অপনা।।
অর্থ, ভব শূন্যরূপ, নির্বাণও শূন্যরূপ। ভব ও নির্বাণে কোনও ভেদ নেই। মানুষ আপন মনে ভব রচনা করে, নির্বাণও রচনা করে। এইভাবে তারা নিজেদের ক্রমশঃ বদ্ধ করে ফেলে। পরমার্থ সন্ধান করতে গেলে কিছুই পাওয়া যাবেনা। সবই শূন্যময়। তাঁদের স্লোগান হলো ' শুদ্ধ বুদ্ধ মুক্ত স্বরূপ"। পরম যোগীও মুক্ত, চরম পাপিষ্ঠও মুক্ত। এই পথেই সহজিয়া বৌদ্ধমতের যাত্রা শুরু হলো। তবে আগেই বলেছি, তা পরবর্তীকালের ক্রমবিকাশ।
-----------------------------------
মহাযানীরা, কেবল শূন্যতায় পর্যবসিত হওয়াই জীবনের চরম উদ্দেশ্য, এই ম্যাক্সিমটি মেনে নিতে পারলেন না। তাঁরা এর সঙ্গে 'করুণা' নাম দিয়ে একটি ধারণার সূচনা করলেন। এটি ব্যক্তিগত সাধারণ করুণাভাব নয়। সর্বজীবে, সর্বভূতে করুণা। ইতোপূর্বে নির্বাণের সূত্রে তাঁরা রূপধাতুকে অরূপধাতুতে পরিবর্তিত করেছিলেন। সে কারণে সমস্ত পদার্থকেই আকাশের মতো অনন্ত অনুভব করতেন। এই নবসংযোজিত করুণাভাবকেও তাঁরা আকাশের মতো অনন্ত ঘোষণা করলেন। যে নির্বাণ এতোদিন শুধু শূন্য ছিলো, নিশ্চল, নিষ্প্রাণ, নিস্পন্দ, করুণাভাব তাতে প্রাণসঞ্চার করলো। অরহৎ হয়ে যাঁরা মুক্তির সাধনা করার সংকল্প করেছিলেন তাঁরা পার্থিব জগতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী বিজড়িত থাকলেও তার প্রতি পূর্ণ উদাসিন ছিলেন। নির্বাণের সঙ্গে করুণার সংযোজনে তাঁরা শুধু আত্ম উদ্ধারের জন্যই ব্যাকুল থাকাটা সমীচীন মনে করলেন না। জগৎ উদ্ধারের তাঁরা আকুলতা বোধ করলেন। ব্যক্তিগতভাবে নির্বাণ লাভ করে লক্ষ্যপূর্তির স্বার্থসন্ধ উপায়কে তাঁরা ত্যাগ করলেন। আমি মুক্ত হবো আর কোটি কোটি জীব সংসারের মায়ায় বদ্ধ থাকবে, এই আত্মপরতাকে তাঁরা বিসর্জন দিলেন। মহাযানী বৌদ্ধ দর্শন, বাকি সব কীর্তিকে যদি অস্বীকারও করি, শুধু এই উপলব্ধিটির জন্য বৃহত্তর মানবজাতির কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকলো। শাক্যমুনির পরম করুণাময় প্রতিচ্ছবিটি এভাবেই মূর্ত হয়ে ওঠে আগামী পৃথিবীর কাছে। এই পর্যায়ের নিরীক্ষার মাধ্যমে আরেকটি নতুন ধারণার সৃষ্টি হলো। এক নিবেদিত দৈবী কল্যাণকারক অস্তিত্ব, বোধিসত্ব। যিনি বোধির পথে অগ্রসর, কিন্তু বুদ্ধত্ব লাভ করেননি। আপামর মানুষের কল্যাণহেতু যাঁর পথচলা।
----------------------------------------
Avatar: শিবাংশু

Re: বুদ্ধকথা

phaltu ও Atoz,

আপনারা যেসব প্রশ্ন ও প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছেন তা হয়তো আমার লেখায় আসবে কোন সময়। তখন আরো বিশদে আলোচনা হতে পারে।
Avatar: একক

Re: বুদ্ধকথা

এতো ভাস্ট সাবজেক্ট এত স্বল্প পরিসরে.......দারুন এগোচ্ছে !
Avatar: phaaltu

Re: বুদ্ধকথা

শাক্যমুনি থেকে মহাযান - এই বিবর্তনের একটা parallel তো মনে হচ্ছে নরেন্দ্রনাথের বিকাশ। রামকৃষ্ণ তাকে বটগাছ হতে বলেন, ব্যক্তিগত মুক্তিচিন্তা ছেড়ে অন্যদের উন্নতির দায়িত্ব দেন - আমার তো এরকমই ঠেকছে।
Avatar: Atoz

Re: বুদ্ধকথা

আমারো এই কাহিনিটা মনে পড়ছিল। রামকৃষ্ণ বললেন, "হ্যাঁরে লরেন তুই কী চাইলি মায়ের কাছে?"
নরেন্দ্রনাথ বললেন , "ভবচক্র থেকে নিজের মুক্তি প্রার্থনা করলাম।"
রামকৃষ্ণ অত্যন্ত আহত হয়ে বললেন, "কী!!! তোকে আমি কত আশা নিয়ে পাঠালুম, আর তুই কিনা নিজের মুক্তি চাইলি? ওরে তুই নিজের মুক্তি নিয়ে চলে গেলে অন্য বদ্ধজীবেদের কী হবে? তুই যে তাদের মুক্ত করবি! যা যা আবার যা, গিয়ে মাকে আবার বল সত্যি করে কী চাস।"
Avatar: Abhyu

Re: বুদ্ধকথা

আতোজের ভাবটা ঠিকই আছে, তবে কাহিনীটা নেহাতই কবিকল্পনা :)
Avatar: Atoz

Re: বুদ্ধকথা

অভ্যু, বলো কী!!!!
ঃ-)
Avatar: Abhyu

Re: বুদ্ধকথা

টইটা ঘাঁটবো না। ভাটে বলছি।
Avatar: শিবাংশু

Re: বুদ্ধকথা

একজন বোধিসত্ত্ব ছিলেন । যাঁর নামটা সবারই খুব চেনা। অজন্তা গুহায় পদ্মপাণি তাঁর প্রতিকৃতিটির সঙ্গে আমরা শৈশব থেকে পরিচিত। তাঁর নাম অবলোকিতেশ্বর।
তিনি যখন সংসারের সব কৃত্যকর্তব্য শেষ করে, বোধিসত্ত্বের উপযুক্ত ধ্যান ধারণাদি সম্পন্ন করে ধর্মস্তূপের শিখর থেকে শূন্যতা ও করুণাসাগরে ঝাঁপ দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন অসংখ্য মানুষের আর্তকোলাহল তাঁর কানে এলো। তখন তাঁর আমিত্ব নেই, তিনি আকাশের মতো অনন্ত সত্ত্বা, সাগরের মতো অনিঃশেষ তাঁর করুণা। তিনি প্রশ্ন করলেন, কিসের কোলাহল? লক্ষকোটি দুঃখনিপীড়িত জীব আর্তস্বরে বোধিসত্ত্বকে বললো, আপনি করুণার অবতার। আপনি যদি নির্বাণপ্রাপ্ত হয়ে যা'ন তবে আমাদের কে উদ্ধার করবে? ব্যথিত অবলোকিতেশ্বর তখন ঘোষণা করলেন, যতোক্ষণ জগতের একটিমাত্র জীবও বদ্ধ থাকবে, আমি নির্বাণ গ্রহণ করবো না।
---------------------------------------------
সে সময় বৈদিক ধর্মে দৈবী দয়া, অনুগ্রহ ইত্যাদি প্রাপ্ত করার জন্য নানা উপায় ব্যক্ত ছিলো। কিন্তু তার মধ্যে করুণার কোনও উল্লেখ ছিলোনা। উল্লেখ্য, দেবতা দয়া করেন, অনুগ্রহ করেন, বরপ্রদান করেন, কিন্তু তখন পর্যন্ত কোনও দেবতাকে করুণাময়রূপে আমরা দেখিনি। বস্তুত করুণা এমন একটা ভাব যা একজন মানুষ অন্য একজন মানুষের প্রতিই বোধ করতে পারে। এই করুণার মাত্রা যোজনা করেই বৌদ্ধ দর্শন পৃথিবীর আর পাঁচটা ধর্মমতের থেকে একটা মহত্তর স্থান অর্জন করে ফেলে। আরো কিছুকাল পরে খ্রিস্টিয় দর্শনে করুণা একটা গরিমা হিসেবে গৃহীত হয়। খ্রিস্টের ধর্মে এই সংযোজনটি নিতান্তভাবে বৌদ্ধমত থেকে পাওয়া। কারণ আর কোনও সেমিটিক ধর্মে এ জাতীয় গরিমা নেই। বস্তুত খ্রিস্টিয় প্রথম শতক থেকে পঞ্চম শতক , অর্থাৎ প্রাক গুপ্তযুগ থেকে গুপ্তসাম্রাজ্যের শীর্ষ কাল পর্যন্ত ভারতবর্ষে বৌদ্ধদের মধ্যে এই মতটিই সর্বমান্য ছিলো। সঙ্গত কারণেই তাঁদের ধারণা হয়েছিলো এর থেকে মহান কোনও অধ্যাত্ম মত বিকশিত হতে পারেনা। কারণ সমান্তরাল ব্রাহ্মণ্যমতে তখন ধর্মানুষ্ঠান মানে পশুবলি, যজ্ঞানুষ্ঠান বা অগভীর লোকাচারের বহ্বাড়ম্বর। বৌদ্ধদর্শনের এই করুণাময় মুখটিই সেদিন মানুষ মহাযান বলে জানতো। বোধিসত্ত্বেরা সর্বদা করুণায় অভিভূত। তাঁরা জন্মের বাঁধন থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে গেছেন, তবু জীবের উদ্ধারের জন্য বারম্বার জন্ম নিতে দ্বিধা করছেন না। জীবের কল্যাণের জন্য তাঁরা স্বয়ং বুদ্ধের পঞ্চশীলের সঙ্গেও আপোস করতে প্রস্তুত। নাগার্জুনের শিষ্য আর্যদেব তাঁর 'চিত্তবিশুদ্ধিপ্রকরণে' বলেছিলেন, জগৎহিতায়, জীবের মঙ্গলের জন্য যদি কোনও আগ্রহী ব্যক্তি আপাতভাবে কোনও দোষও করে, তা ধর্তব্য নয়।
----------------------------------------
এই পর্যায়টি ছিলো বৌদ্ধধর্মের শীর্ষ সমৃদ্ধি এবং তা মহাযানী মতের আশ্রয়েই বেড়ে উঠেছিলো। শাক্যমুনির পরবর্তী প্রায় হাজার বছর ধরে সারা দেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, অধ্যাত্মিক, সর্বক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উন্নতির ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। এই ঐহিক সাফল্যের ইতিবাচক প্রভাব ধর্ম ও দর্শনের উপর গভীরভাবে পড়েছিলো। আর্থ-সামাজিক বিবর্তনের সঙ্গে তাল রেখে নির্বাণের পরিভাষাও বদলে যেতে থাকে।
-------------------------------------
মহাযান ও হীনযানে নির্বাণের প্রকৃতি, স্বরূপ ও প্রয়োগ একেবারে ভিন্ন। থেরবাদী বা প্রত্যেক বুদ্ধরা, যাঁরা বস্তুত হীনযানী, মনে করতেন যেসব মানুষ চারটি আর্যসত্য, অষ্টাঙ্গিক মার্গ নিষ্ঠাভরে মেনে চলেন, বহুকাল অভ্যেসের পর তাঁরা 'সোতাপন্ন' বা অধ্যাত্ম উন্নতির স্রোতের মধ্যে পড়ে যান। তাঁদের বারম্বার জন্ম হলেও তাঁরা আবার সংসারের মায়ায় ফিরে যাননা। 'সোতাপন্ন' মানুষ যখন আরো একবার জন্মগ্রহণ করেন তখন তাঁর অবস্থা হলো 'সকৃদাগামী'। অর্থাৎ তিনি আর জন্মগ্রহণ করবেন না ও নির্বাণের অধিকারী হয়ে গেলেন। স্বয়ং গৌতমবুদ্ধ'কে 'সকৃদাগামী' মনে করা হতো। সকৃদাগামী মানুষ সাধনার পরবর্তী স্তরে হয়ে যান 'অনাগামী' ও তার পর 'অরহৎ'। অরহৎ হবার পরেও যদি কেউ কিছুদিন জীবিত থাকেন তবে তিনি মুক্তপুরুষ হিসেবে জ্ঞাত হ'ন। তার নাম স্বউপাধি শেষনির্বাণ। এই নির্বাণে কিছু 'উপাদান' অর্থাৎ পুনর্জন্মের রেশ কিন্তু থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ সমগ্র কর্মক্ষয় এখনো হয়নি। এই জীবন্মুক্ত অবস্থায় অরহৎ আরো কিছুদিন থাকতে পারলে তাঁর সব কর্মের ক্ষয় হয়, কোনও সঞ্চয় থাকেনা। তখন তাঁর মৃত্যুর কাল উপস্থিত হয়। মৃত্যুর পর তিনি 'নিরুপাধি শেষনির্বাণ' ধাতুতে প্রবেশ করেন। তখন তাঁর কোনও কর্ম থাকেনা, কর্মজনিত সংস্কারও থাকেনা, তিনি নির্বাণ অর্জন করেন। হীনযানী বা প্রত্যেকযানীদের কাছে যাবতীয় জাগতিকমাত্রাগুলির কোনও সম্মান নেই। তাঁদের জন্য জগতের থাকা না থাকা কোনও পৃথক ভাবসঞ্চার করেনা। নির্বাণপ্রাপ্ত হলে তাঁরা একেবারে নৈসর্গিক গুণসম্পন্ন হয়ে পড়েন। কাঠ, পাথর, মাটির মতো প্রাণের লক্ষণহীন। পারিপার্শ্বিক থেকে সম্পূর্ণ বিযুক্ত ও তিরোহিত।
-------------------------------
মহাযানীরা স্বভাবতই হীনযানীদের এই নির্বাণপ্রক্রিয়াটি'র নিন্দা করে থাকেন। তাঁদের মতে গোটা ব্যাপারটাই নীরস, নিষ্ঠুর, স্বার্থপর ও সংকীর্ণমনা। তাঁরা বিশ্বাস করেন নির্বাণ মানুষকে করুণাময় করে, পরার্থপর করে। ব্যক্তিগত অর্জনের থেকে সমষ্টির কল্যাণই একজন নির্বাণপ্রাপ্তের প্রেয় লক্ষ্য। তাঁরা বলেন 'নির্বাণ'কে নিষেধমুখে, অর্থাৎ নেতিবাদী চর্চার অভিমুখ থেকে দূরে রাখতে হবে। নির্বাণের সার্থকতা নির্ধারিত হবে বিধিমুখে, অর্থাৎ ইতিবাচক চর্চায়। হীনযানীদের কাছে নির্বাণ মানে আত্মার, জ্ঞানের, বুদ্ধির বিনাশ। কিন্তু মহাযানীরা মানেন না যে পরম কারুণিক শাক্যমুনি এইরকম নেতিবাচী দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাণকে পরিস্থাপিত করেছেন। তাঁদের মতে জীবনে চারটি আর্যসত্য ও অষ্টাঙ্গিক মার্গের সুপথে স্থিত হয়ে সাধনা করাই নির্বাণের উদ্দেশ্য। মানবহৃদয়ের যাবতীয় আকাঙ্খা, ঈপ্সা'কে বলিদান দিয়ে বিনাশ করা নির্বাণের উদ্দেশ্য হতে পারেনা। আশা-আকাঙ্খাকে চরিতার্থ করতে হবে, কিন্তু তাতে বদ্ধ থেকে গেলে হবেনা। সর্বদা তার ঊর্ধে যাবার প্রয়াস পেয়ে যেতে হবে। এর নাম নিরালম্ব নির্বাণ। এই পথে বোধিচিত্ত যাবতীয় ক্লেশ, কুদৃষ্টি থেকে অব্যাহতি পাবেন এবং ধর্মকায়ের পবিত্র মূর্তি দেখতে পাবেন। তাঁর পথপ্রদর্শক হবে সর্বভূতে করুণা ও সর্বব্যপী জ্ঞান। তিনি 'সম্যক সব্বোধি' অর্জন করবেন এবং নির্বাণ লাভের জন্য কোনও দুর্বলতা বোধ করবেন না। তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য হবে সর্বজীবের পরিত্রাণ এবং সে জন্য তিনি বারম্বার জন্ম নিতেও দ্বিধা করবেন না। তিনি সর্বব্যপী প্রজ্ঞাবল লাভ করবেন এবং সমস্ত প্রাণীর মুক্তির জন্য জীবনের যাবতীয় উৎসাহ নিয়োগ করবেন। তাঁর নির্বাণে তৃপ্তি নেই, নির্বাণে আসক্তি নেই, নির্বাণে বসতিও নেই। তাঁর ভব বা নির্বাণ কোনও আলম্বনই নেই। তাই তাঁর নির্বাণের নাম নিরালম্ব নির্বাণ।
---------------------------------------
মহাযানীদের মধ্যে আরেক রকম নির্বাণেরও খোঁজ পাওয়া যায়। সেটি ভব বা নির্বাণের অতীত এক পরম মুক্তি । ধর্মের যে তত্ত্ব বা তথত, তাকে তাঁরা ধর্মকায় বলে থাকেন। যিনি মুক্তিলাভ করেন তিনি তথাগত, অর্থাৎ তিনি পরমসত্যে আগত হয়েছেন। ধর্মকায় মহাযানীদের এক নিজস্ব ধারণা। ধর্মকায়ের ইচ্ছা আছে, বিবেক , করুণা ও বোধি আছে। সব সজীব পদার্থ ধর্মকায়ের অংশ। ধর্মকায় তত্ত্ব দিয়ে মহাযানীরা সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যাখ্যা করেন। হীনযানীদের মধ্যে প্রকৃতির সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে কোনও আগ্রহ নেই। মহাযানীদের কাছে নির্বাণ মানে চৈতন্য বা চিন্তার বিনাশ নয়, তা কেবল অহমভাবের নাশ করে। নিষেধমুখে ( নেতিবাদীব্যাখ্যায়) অহং মানে এক অলীক কল্পনা এবং অহমজাত যাবতীয় ভাবও অলীক। আর বিধিমুখে ( ইতিবাচক ব্যাখ্যায়) অহং মানে করুণা বা সর্বভূতে দয়া। অতএব নির্বাণ মানে সংকীর্ণ, অলস অহমগ্রস্ত মনোবৃত্তি থেকে নতুন জীবনের উল্লাসে উৎফুল্ল হয়ে সমগ্র জীবজগতের উদ্ধারের জন্য নিযুক্ত হওয়া। যতোক্ষণ একটিও প্রাণী বদ্ধ থাকবে, ব্যক্তিগত নির্বাণের কোনও সার্থকতা থাকবে না।
Avatar: phaaltu

Re: বুদ্ধকথা

এ অতি সুন্দর, শিবাংশুদা, বিন্দুতে সিন্ধু - আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের সাথে নির্বানের ভাষ্যের বিবর্তন।

ধর্মের মধ্যে Introduction of করুণা নিশ্চিতই বহু মানুষকে শান্তি দিতে সাহায্য করেছে, purpose driven life এ অনেক বেশি সাহায্য করেছে। শুধু নৈর্বক্তিক দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে এটা ধর্মকে property থেকে religion এর দিকে আরো ঠেলে দিয়েছে।

চারিদিকে mindfulness নিয়ে খুব আলোচনা শুনি। মাঝে মাঝে মনে হয়, বুদ্ধের ভাষায় এই নির্বান - এ কি আসলে সদাজাগ্রত mindfulness যা কোনরকম আসক্তি ছাড়া পরের পর কাজ করে যেতে সমর্থ - a continuous presence of well-established mindfulness?
না কি efficiency আর productivity কেন্দ্রিক আমার এই দৃষ্টি দিয়ে তা বিচার করা মুশকিল?
Avatar: শিবাংশু

Re: বুদ্ধকথা

phaltu,

আপনাকে ধন্যবাদ। এতোটা মন দিয়ে এই রীতিমতো জটিল বিষয়টিকে ধরতে চাওয়ার জন্য।

একটা কথা আমার চিরকালই মনে হয়, ব্রাহ্মণ্য ধর্মে রীতি'র থেকে নীতি এসেছে। সদ্ধর্মে নীতিই রীতিকে নির্মাণ করতে চেয়েছে। এর কারণেই অহংকারী আর্যরা, যারা নিজেদের আচার, লৌকিকতার ঐতিহ্যকে নির্ভুল ও গরিমাময় মনে করতো, খুব সহজে ব্রাহ্মণ্যধর্মে স্বচ্ছন্দ হতে পেরেছে। সদ্ধর্ম থেকে মহাযান বা থেরবাদ, যেখানে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের মেরুদন্ড বর্ণাশ্রম'কেই অস্বীকার করা হয়েছে, স্বতস্ফূর্তভাবে অনার্য কৌম সমাজের প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে। বিকাশের শীর্ষে থেকেও সদ্ধর্মে মানুষের প্রতি মানুষের করুণাবোধই প্রধান অনুপ্রেরণা। দৈব অনুগ্রহের তাড়না নয়। মানুষের আনুগত্য জয় করার জন্য প্রধান বৌদ্ধ রাজারা, পিয়দস্সি, কণিষ্ক থেকে হর্ষবর্ধন, দেবপাল, সচরাচর অকারণ হিংসার আশ্রয় নিতে চাননি। সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে গেলে রাজা'র শ্রমণভাব অবলম্বন করা প্রজার জন্য হিতকর নয়। বীর্যহীন রাজা প্রজার পক্ষে চূড়ান্ত দায়। তাই বৌদ্ধধর্মে অনুগত প্রধান রাজারা নির্বীর্য ছিলেন না। ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুযায়ী রাজ্যবিস্তার করলেও ব্রাহ্মণ্য রাজাদের থেকে তাঁদের কঠোরতা বা নিষ্ঠুরতার গল্প অনেক কম শোনা যায়। এখনও পর্যন্ত কোনও বৌদ্ধ রাজা'কে অশ্বমেধযজ্ঞ করে আনুগত্য আদায়ের গল্প শুনিনি। পরবর্তীকালে যখন বৌদ্ধমতে পুরোহিততন্ত্রের নীতিহীনতার কারণে চূড়ান্ত অবক্ষয় দেখা দেয়, তখনও দরিদ্র অনার্যসমাজের শ্রমজীবী মানুষ, যাদের বৃহত্তর অংশ তখনও ইসলামে আশ্রয় নেয়নি, ন্যূনতম নৈতিক মূল্যবোধে বিশ্বস্ত ছিলো।









Avatar: ranjan roy

Re: বুদ্ধকথা

শিবাংশু,
আপনার ওই লাস্ট প্যারাটা জাস্ট অসাম।
আমার সামান্য পাঠে এগুলো অতি সরলীকৃত স্টিরিওটাইপে আবদ্ধ ছিল।
মহাযানের উৎথানের সঙ্গে গুপ্তসাম্রাজ্যের সময় ভারতে সামন্ততন্ত্রের শেকড় মজবুত হওয়াকে অঙ্গাঙ্গী ভাবতাম। ফলে মহাযানের প্রতি অকারণ বিতৃষ্ণা ও থেরবাদের প্রতি না বুঝে অধিক শ্রদ্ধা ছিল।
অনেক্গুলো জানলা খুলে গেল।
Avatar: Atoz

Re: বুদ্ধকথা

তাহলে বাংলায় ঐ সর্বনাশ কখন হলো? কখন বৌদ্ধধর্মে নানা অদ্ভুত তন্ত্রমন্ত্র ও অদ্ভুত আচার ঢুকে ব্যাপারটা সেই জগাই মাধাইয়ের আমলের বীভৎসতা হয়ে গেল? যেটা কিনা হরিনামের বিপুল বন্যায় ভাসিয়ে দিয়ে তবে কিছুটা ধুয়ে মুছে দিতে পারলেন চৈতন্য?
Avatar: b

Re: বুদ্ধকথা

আমার ধারণা সেন যুগে। একই দিকে রাজতন্ত্র হয়ে গেলো প্রচন্ড গোঁড়া, আকাট হিন্দু, চতুরাশ্রমের নিগড়ে বাঁধা। আর ঐ বীভৎসতা বা ঐ সব, এগুলো এখন আরোপিত বিশেষণ লাগে, চৈতন্যের মহিমা বেশী করে প্রচার করার জন্যে। চৈতন্য নিজেও বেশ বৌদ্ধবিদ্বেষী ছিলেন।
Avatar: শিবাংশু

Re: বুদ্ধকথা

Atoz,
বাংলার ইতিহাসে নৈতিকতার যে অবক্ষয়পর্বের কথা আপনি বলছেন, সেটি বজ্রযান ও সহজযানের সুবাদে আসা বিশৃঙ্খলতা। এ বিষয়ে কিছু চর্চা আমার গুরুতে কালী ও তন্ত্র বিষয়ক আলোচনায় করেছি। আগ্রহী হলে দেখতে পারেন। সত্যি কথা বলতে ঐসব বিবর্তনের মধ্যে সদ্ধর্মের রেশ শেষ হয়ে গিয়েছিলো। সে এক অন্য ইতিহাস।

b,
একটা মতানুযায়ী চৈতন্যের সমসাময়িক ছিলেন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ ( কালক্রম নিয়ে মতভেদও আছে)। লড়াইটা ছিলো, ইতরবর্গ'কে কে অধিকার করতে পারে, শাক্তরা না বৈষ্ণবেরা। বৈষ্ণবদের মধ্যে সেরিব্রাল মানুষের সংখ্যাধিক্য ছিলো। তাই তাঁদের কলমের জোর বেশি। আমরা সেকালের ইতিহাসটা তাঁদের চোখ দিয়েই বেশি দেখতে পাই। মজার কথা শ্রীচৈতন্যের অল্টার ইগো নিত্যানন্দ ও তাঁর পুত্র বীরভদ্র কিন্তু সহজিয়া মতের অনুগামী ছিলেন।

বহুস্তরীয় ও জটিল ইতিহাস আমাদের। সরলীকরণ করতে গেলেই বিপদ।

মন্তব্যের পাতাগুলিঃ [1] [2] [3]   এই পাতায় আছে 23 -- 42


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন