Yashodhara Ray Chaudhuri RSS feed

Yashodhara Ray Chaudhuriএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • বিনম্র শ্রদ্ধা অজয় রায়
    একুশে পদকপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অজয় রায় (৮৪) আর নেই। সোমবার ( ৯ ডিসেম্বর) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। অধ্যাপক অজয় দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা অসুখে ভুগছিলেন।২০১৫ ...
  • আমাদের চমৎকার বড়দা প্রসঙ্গে
    ইয়ে, স-অ-অ-অ-ব দেখছে। বড়দা সব দেখছে। বড়দা স্রেফ দেখেনি ওইখানে এক দিন রাম জন্মালেন, তার পর কারা বিদেশ থেকে এসে যেন ভেঙেটেঙে মসজিদ স্থাপন করল, কেন না বড়দা তখন ঘুমোচ্ছিলেন। ঘুম ভাঙল যখন, চোখ কচলেটচলে দেখলেন মস্ত ব্যাপার এ, বড়দা বললেন, ভেঙে ফেলো মসজিদ, জমি ...
  • ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ?
    যেকোন নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়ে সামনে আসার পর নাগরিক হিসাবে আমাদের একটা ঈমানি দায়িত্ব থাকে। দায়িত্বটা হল অভিযুক্ত ধর্ষকের কঠোরতম শাস্তির দাবি করা। কঠোরতম শাস্তি বলতে কারোর কাছে মৃত্যুদন্ড। কেউ একটু এগিয়ে ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে নেওয়ার ...
  • তোমার পূজার ছলে
    বাঙালি মধ্যবিত্তের মার্জিত ও পরিশীলিত হাবভাব দেখতে বেশ লাগে। অপসংস্কৃতি নিয়ে বাঙালি চিরকাল ওয়াকিবহাল ছিল। আজও আছে। বেশ লাগে। কিন্তু, বুকে হাত দিয়ে বলুন, আপনার প্রবল ক্ষোভ ও অপমানে আপনার কি খুব পরিশীলিত, গঙ্গাজলে ধোওয়া আদ্যন্ত সাত্ত্বিক শব্দ মনে পড়ে? না ...
  • The Irishman
    দা আইরিশম্যান। সিনেমা প্রেমীদের জন্য মার্টিন স্করসিসের নতুন বিস্ময়। ট্যাক্সি ড্রাইভার, গুডফেলাস, ক্যাসিনো, গ্যাংস অব নিউইয়র্ক, দা অ্যাভিয়েটর, দ্য ডিপার্টেড, শাটার আইল্যান্ড, দ্য উল্ফ অব ওয়াল স্ট্রিট, সাইলেন্টের পরের জায়গা দা আইরিশম্যান। বর্তমান সময়ের ...
  • তোকে আমরা কী দিইনি?
    পূর্ণেন্দু পত্রী মশাই মার্জনা করবেন -********তোকে আমরা কী দিইনি নরেন?আগুন জ্বালিয়ে হোলি খেলবি বলে আমরা তোকে দিয়েছি এক ট্রেন ভর্তি করসেবক। দেদার মুসলমান মারবি বলে তুলে দিয়েছি পুরো গুজরাট। তোর রাজধর্ম পালন করতে ইচ্ছে করে বলে পাঠিয়ে দিয়েছি স্বয়ং আদবানীজীকে, ...
  • ইশকুল ও আর্কাদি গাইদার
    "জাহাজ আসে, বলে, ধন্যি খোকা !বিমান আসে, বলে, ধন্যি খোকা !এঞ্জিনও যায়, ধন্যি তোরে খোকা !আসে তরুণ পাইওনিয়র,সেলাম তোরে খোকা !"আরজামাস বলে একটা শহর ছিল। ছোট্ট শহর, অনেক দূরের, অন্য মহাদেশে। অনেক ছোটবেলায় চিনে ফেলেছিলাম। ভৌগোলিক দূরত্ব টের পাইনি।টের পেতে দেননি ...
  • ছন্দহীন কবিতা
    একদিন দুঃসাহসের পাখায় ভর করে,ছুঁতে চেয়েছিলাম কবিতার শরীর ।দ্বিখন্ডিত বাংলার মত কবিতা হয়ে উঠলোছন্দহীন ।অর্থহীন যাত্রার “কা কা” চিৎকারে,ছুটে এলোপ্রতিবাদী পাঠক।ছন্দভঙ্গের নায়কডানা ভেঙ্গে পড়িপুঁথি পুস্তকের এক দোকানে।আলোক প্রাপ্তির প্রত্যাশায়,যোগ ধ্যানে কেটে ...
  • হ্যালোউইনের ভূত
    হ্যালোউইন চলে গেল। আমাদের বাড়িতে হ্যালোউইনের রীতি হল মেয়েরা বন্ধুদের সঙ্গে ট্রিক-অর-ট্রিট করতে বেরোয় দল বেঁধে। পেছনে পেছনে চলে মায়েদের দল। আর আমি বাড়িতে থাকি ক্যান্ডি বিতরণ করব বলে। মুহূর্মুহূ কলিং বেল বাজে, আমি হাসি-হাসি মুখে ক্যান্ডির গামলা নিয়ে দরজা ...
  • হয়নি
    তুমি ভালবাসতে চেয়েছিলে।আমিও ।হয়নি।তুমিঅনেক দূর অব্দি চলে এসেছিলে।আমিও ।হয়নি আর পথ চলা।তুমি ফিরে গেলে,জানালে,ভালবাসতে চেয়েছিলেহয়নি। আমি জানলামচেয়ে পাইনি।হয়নি।জলভেজা চোখে ভেসে গেলআমাদের অতীত।স্মিত হেসে সামনে এসে দাঁড়ালোপথদুজনার দু টি পথ।সেপ্টেম্বর ২২, ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

রূপকথার চার দেশ

Yashodhara Ray Chaudhuri

রূপকথার চার দেশ : কাঝাখস্তান, ইউক্রেন, আর্মেনিয়া, উজবেকিস্তান
যশোধরা রায়চৌধুরী


“যখন খুশি হাঁটতে বেরোন, কোন ভয় নেই”

উজবেকিস্তানের তাশকেন্ত শহর। আমার দেখা চতুর্থ প্রাক্তন সোভিয়েত শহর। এর আগে দেখেছি আস্তানা। শহরটার নামই আগে কখনো শুনিনি। সে হল কাঝাখস্তানের রাজধানী, সদ্য বছর কুড়ি হল। দেখেছি ইউক্রেনের কীভ শহর, দেখেছি আর্মেনিয়ার ইয়েরেভান। তার পর এই তাশকেন্ত।
সোভিয়েতের ঐতিহ্য বহন করা তিন তিনটে শহরের হাল হকিকত দেখেই বোঝা উচিত ছিল চতুর্থ শহরেও মূল ব্যাপারগুলোর ব্যত্যয় হবে না, তবু আমাদের ভারতীয় মন। তাই গা ছম ছম করেছিল।
সন্ধে ছটা থেকে সাতটার মধ্যে গোধূলি নামছিল সে শহরে। শহরটা পার্ক , গাছপালা, বাগানে সাজানো। এত বেশি সবুজের মধ্যে মানুশ হারিয়ে যায়। বড় বড় চওড়া রাস্তা। গাড়িগুলো যাচ্ছে খুব দ্রুত। এবং সংখ্যায় অতি অল্প। তাই নিরিবিলি নির্জন বলতে যা বোঝায় , ফুটপাতগুলো তাই। সবুজ অন্ধকার ছাওয়া রাস্তায় আমি আমার মেয়েকে নিয়ে বেরিয়েছি। মেয়ের বয়স সাড়ে তেরো। আমার বয়স সাড়ে ছেচল্লিস। আমরা এখানকার পথঘাট চিনি না, ভাষা বুঝি না। যে কোন বিপদ এখানে ওঁত পেতে থাকতে পারে।
অচেনা শহরের আঁধার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভয়ে আমার পা জড়িয়ে আসছিল। একটি বেশ ষন্ডা চেহারার লোক উল্টোদিক থেকে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে । পরনে ধূসর ওভার অল। আমাদের পাশ দিয়ে নির্বিকার মুখে লোকটা রাস্তার পাশের ভ্যাটে ময়লার ব্যাগ ছুঁড়ে দিয়ে আবার ফিরে গেল। তারপর দেখা হল এক দঙ্গল ছেলের সঙ্গে । নিজেদের মধ্যে গল্প করছে তারা। তার কিছু পরে, একটা ছোট্ট দোকান। তার সামনে জটলা করে আছে কয়েকটি মা, প্র্যামে বাচ্চাদের নিয়ে।
মায়েরা একলা পাঁউরুটি আনতে রাত এগারোটার সময়েও সারারাত খোলা দু চারটে সুপারমার্কেটে যায় এখানে, আস্তানা বা কীভেও। “খুব সেফ এই শহরটা, মেয়েদের জন্য”। এই নিয়ে চতুর্থবার শুনছি।
আমরা, ভারতীয় মেয়েরা, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে, কথাটা শুনে কেমন কেঁপে যাই। দিল্লি কলকাতা মুম্বই সর্বত্র যে সব ঘটনা ঘটে চলেছে ইদানীং, তার প্রেক্ষিতে, আবার ভাবি, এখনো এমন স্বর্গ আছে পৃথিবীতে? মেয়েদের জন্য সুরক্ষিত শহর, নির্জন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ায় কোন ভয় যেখানে নেই। স্থানীয়রা, আর এখানে পোস্টিং পাওয়া ভারতীয় দূতাবাসের ভারতীয়রা, বলছেন, আরে বাবা, এক্স সোভিয়েট দেশ না, এখনো সেই পুরনো ডিসিপ্লিন আছে অনেকটাই। তাছাড়া নারী আর শিশুদের শ্রদ্ধার ব্যাপারটা এদের মর্মে মর্মে।
হঠাত এক ঝলকে মনে হয়, ভারত সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র, কিন্তু কী পেলাম সেই গণতন্ত্রে? সমগ্রতাবাদী সোভিয়েট শাসনে, এবং এখনকার তথাকথিত গণতন্ত্র, কিন্তু প্রায়শই একনায়কতন্ত্রী এই স্বাধীন দেশগুলি তার নাগরিকদের যা দিতে পেরেছে, আমাদের দেশ কি তা পেরেছে? আমাদের জীবৎকালে রাজনীতির যে দুর্বৃত্তায়ন আমরা দেখলাম, আর জীবনযাপনের যে অবনতি, তা কি ভাবা যায়? এই চারটি দেশই আমাকে দেখাল, একেবারে ন্যুনতম নাগরিক প্রয়োজনগুলো মেটাতে এখনো সরকার দায়বদ্ধ।
মেট্রো আছে চারটি রাজধানীতেই সেই সোভিয়েত সময় থেকেই । এবং এখনো তার ভাড়া অসম্ভব কম, নামমাত্র। আছে সুন্দর পথঘাট, পরিচ্ছন্নতা। আছে পথে পথে ওয়াটার ফাউন্টেন, জল খাবার জন্য। স্বাধীনতার ফলে কিছু আনন্দ বেদনার পরিচয় তো পেলামই। নতুন প্রজন্মের চাহিদা আর পুরনো প্রজন্মের হা হুতাশ দেখলাম। নস্টালজিয়া দেখলাম, সেই যুগের জন্য, যখন “সবকিছু ফ্রি” ছিল। যখন গ্রীষ্মের ছুটিতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বাচ্চারা আরটেক সামার ক্যাম্পে যেত। সরকার মানুষের সব প্রয়োজনের দেখভাল করত।
আবার মেমোরিয়ালও দেখলাম স্তালিনের শাসনের সময়ে মৃত উজবেগ ইন্টেলেকচুয়ালদের নাম করে। স্বাধীন চেতনা ও বুদ্ধিকে জেগে উঠতে দেখলেই নেমে আসত একাধিপত্যের খাঁড়া, সেই দুঃসহ স্মৃতি আর ক্ষোভ এখনো তাজা । রুশ আধিপত্যের প্রতি ঘৃণাও। নিজেদের আইডেন্টিটি নিয়ে গর্ব আর তাকে নানাভাবে তুলে ধরার প্রয়াস।

“আমাদের ধর্মপালনের অধিকার পুরোপুরি । কিন্তু আমরা মৌলবাদী নই”
ইউক্রেনের কীভে নেমেই বিশাল ডেনিপ্রো নদী চোখে পড়ল, আর তার পরেই পেতলের মাজা গম্বুজ, নীল আকাশের নিরিখে একেবারে সোনার পাতের মত ঝকঝক করছে। আকৃতির দিক থেকে কিছুটা আধা চেনা... আসলে মসজিদের গম্বুজের আদল কোথাও যেন। ধবধবে সাদা আর সোনালির কম্বিনেশনে খুব বেশি করে অন্য এক আদল। ঝট করে মনে পড়ল বহু বছর আগে মস্কোতে দেখা ক্রেমলিনের সেই নানারঙা গির্জেটি। সোভিয়েট ছোটদের বইতে ওই গোল গম্বুজ ওয়ালা গির্জের ছবি আঁকা হয়েছে কত কতবার। ওই রংচঙে গির্জের আদলে রুশ উপকথা, রুশদেশের রূপকথা এই বইগুলোর স্কেচ এখনও চোখে লেগে।
কীভের ইন্টার কনটিনেন্টাল হোটেল একেবারে ক্রিশিয়াটিক, শহরের দীর্ঘতম সম্ভ্রান্ততম রাস্তাটির এক প্রান্তে। সামনেই ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাকাডেমি, বিদেশ মন্ত্রক। অন্যদিকে সেন্ট সোফিয়া চ্যাপেল। এরও সাদানীলের শরীর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্দের সময়ে হিটলারের বাহিনী কীভ অকুপাই করে। ১৯৪১ থেকে ৪৩ এই সময়টা কীভ পুরোপুরি ধ্বংস হয়, জ্বলতে থাকে দিনের পর দিন। সেন্ট সোফিয়ার ওপরের অংশের প্রায় কিছুই বাঁচেনি। অন্যান্য গির্জেরও খুব ক্ষতি হয়েছিল। হয়ত আমরা যা দেখলাম অনেকটাই পরে পুনর্নির্মিত হয়েছে। কিন্তু সেই পুরনো আদলকে রাখা হয়েছে।
কীভ , পরে বুঝলাম, অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটির আঁতুড়ঘর। কত কত যে এমন গির্জে, মঠ , উপাসনালয় । পূর্ব ইউরোপের প্রায় প্রাচীনতম শহর কীভ। বয়স ১২০০ বছর। মানে, কীভের জন্ম নবম শতকে। সে শহরে তারপর স্বর্ণযুগ এসেছিল ১১শ বা ১২শ শতকে। সে সময়কার সভ্যতার নানা নিদর্শন তো থাকবেই। কিন্তু শুধু ঐতিহাসিক কিছু ইঁটপাথর নয়। খীষ্টধর্ম এখানে জীবিত ধর্ম। যে জীবন বা পুনর্জাগরণের চিহ্ন আগেও ছিল, সোভিয়েট আমলে সেদিকে হয়ত বা সজ্ঞানে চোখ বুজে ছিল রাশিয়ার ক্ষমতাধরেরা। সোভিয়েট ভাঙার পর, ১৯৯১ তে ইউক্রেন স্বাধিন দেশ হল। মানুষের গির্জেতে গিয়ে পুজো আচ্চা করার ব্যাপারটা খোলাখুলি শুধু নয়, রীতিমত তোড়জোড় করে হতে থাকল। ধর্মভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পায়, বলা চলে একটা জোয়ারের মতই এসেছে ফিরে এই স্বাধীন ইউক্রেনে। প্রতিটা পুরনো গির্জে গমগম করছে লোক সমাগমে। এবং মেয়েদের স্কার্ট পরা ( ট্রাউজারস চলবে না) এবং মাথা ঢাকা, ছেলেদের টুপি খুলে রাখা ইত্যাদি বিধিনিষেধের আরোপও চলছে রীতিমত। মেনে চলার ইচ্ছেটাও মানুষের মধ্যে বিপুল।
আমি এমনিতে মন্দির টন্দিরের ধার ধারি না। সহজে হিন্দু মন্দিরেও ভাবাপ্লুত হই না। গির্জের পরিবেশ অবশ্যই হিন্দু মন্দিরের মত চটচটে, জলাকীর্ণ, পুরোহিতের জবরদস্তি ইত্যাদি থেকে মুক্ত এবং নান্দনিক তাই ভালই লাগে। কিন্তু কীভে খ্রীষ্টধর্মের একটা এমন ভিজে ভিজে দ্রবীভূত রূপ দেখতে পেলাম, ইতিহাসের অংশ ওই আশ্চর্য সব ফ্রেস্কো আর বেলটাওয়ারের সঙ্গে সঙ্গে, অভিভূত লাগে। মন আর্দ্র হয়ে ওঠে। অর্থোডক্স গির্জের সঙ্গে বেশ মিল পাওয়া যাবে যে কোন মন্দিরের। মেয়েদের মাথায় রুমাল বা চাদর ঘোমটার মত করে বাঁধা থেকে শুরু করে ধূপ ধুনো মোমবাতি গান মন্ত্রোচ্চারনে বেশ একটা গমগমে ব্যাপার।
সেন্ট অ্যান্ড্রিউজ চার্চ সবচেয়ে পুরনো বলে কথিত, অনেকগুলো সোনালি ডোম আর স্পায়ারে সাজানো একটা জমকালো ব্যাপার। ভেতরেও ছাত অব্দি কারুকার্য, সোনার জলের কাজ করা। অনেক ছবি, সন্তদের, আইকনের প্রচুর অলংকরণ।
সেদিন এক ছোট্ট সদ্যোজাত কন্যার নামকরণ হচ্ছে। মাথায় পুণ্যজল ছিটিয়ে লম্বা আলখাল্লা পরা সুদর্শন পুরুতঠাকুর মন্ত্র পড়ছেন। রীতিমত জমজমাট ব্যাপার। অন্তত কুড়ি ত্রিশ মিনিটের মত দাঁড়িয়ে শুনলাম, আমার মেয়ে ভিডিও রেকর্ড করল ঘটনাটা।
আর তার কাছাকাছিই আন্দ্রিয়েভস্কি –র পথ অসংখ্য ছোট ছোট দোকানে ভরা। যাবতীয় স্যুভেনিরের কেনাকাটায় দারুণ মনোরঞ্জক ব্যাপার। গেছিলাম সেন্ট ভোলোদিমির ক্যাথেড্রালেও, এর স্থাপত্য আবার নিজস্বতায় অনন্য, বেশ নরম গোলচে ডিজাইন, হলুদ সাদায় কাজ করা। দেওয়ালে ফুললতাপাতার উঁচু উঁচু রিলিফ ওয়ার্কের ছড়াছড়ি এখানে। কারুকার্যের মধ্যে পুবের গন্ধ। এশিয়া আর ইউরোপের সংযোগে দাঁড়ানো এই সংস্কৃতি। যদিও ইউক্রেন নিজেকে ইউরোপীয় ভাবতেই চায়। ভোলোদিমিরেই অর্থোডক্স খ্রীষ্টানদের একমাত্র মহিলা সন্ত, সন্ত বারবারার শরীরের অবশেষ শায়িত। কাচের শবাধারের ওপরে রুমাল দিয়ে মুছিয়ে, ধূপ দিয়ে আরতি করে, সশ্রদ্ধ চুম্বন করে অর্চনা করছেন আজকের ইউক্রেনিয় যুবতীরা। মুখে চোখে দিব্য সুখ। এই ভক্তিভাব এতটাই সত্যিকার, আমাদের মত ধর্মে মতি হারানো মানুষের আশ্চর্য লাগবে।
কীভে আর একটা বিশাল প্রাচীন গির্জে এলাকা আছে, ‘লা ওরা’। দ্রুত উচ্চারণে ‘লাভ্রা’ হয়ে গেছে। একসঙ্গে অনেকগুলো গির্জে একটা অতিপ্রাচীন মঠ। সেখানে , গুহার ভেতর অনেকদূর নামলে মৃত সাধুদের কঙ্কাল দেখা যায়। আমরা সে ট্রেকিং এ যাইনি অবশ্য...। প্রাচীনতম কিছু ফ্রেস্কোর দেখা মিলবে এখানে। অদ্ভুত পরিবেশ। প্রায় গলে পড়ছে রং, তবু স্পষ্ট। দৃশ্যের পর দৃশ্যে যিশুর জীবন, সন্তদের জীবন।
লা ওরার ঘন্টাঘরের ঘন্টা বাজতে শুরু করেছিল তখনই , আমরা যখন ঢুকেছি সেখানে। দীর্ঘ দীর্ঘক্ষণ সে ঘন্টাবাদন শুনেছি আমরা। আর দেখেছি নারী পুরুষের ঢল, ঘন্টাঘরের লোহার থাম ধরে, ঘন্টার ভারী লোহার পাত ধরে ঘন্টার কাঁপন, ভাইব্রেশন অনুভব করার হুজুগ। মাথা নিচু করে পূজানিবেদনের সেই ভঙ্গি।
কেউ কেউ বলছেন, ধর্মের প্রতি এই ফিরে যাওয়া নাকি বিপজ্জনক। পোশাক বা মানামানির একটু বেশি বাড়াবাড়ি চলেছে । ব্যাপারটা লক্ষ্য করে দেখার মত, অবশ্যই।
আর্মেনিয়ার ইয়েরেভানেও ধর্মের ব্যাপারটা দ্রষ্টব্য। আর্মেনিয়ান চার্চের স্থাপত্য একেবারে আলাদা। নিরাভরণ, চৌকো গড়নের। কলকাতার আর্মেনিয়ান চার্চেও এই জ্যামিতিক ছাঁচ দৃশ্যমান। আবার উল্টোদিকে, আর্মেনিয়ান ক্রশে গোলচে, বক্ররেখার অন্তর্জাল। প্রতিটি ক্রশ নাকি আলাদা। প্রতিটি ক্রশে আঙ্গুরলতার মত অন্তর্বয়ন আর প্রচুর অলংকরণের প্রবণতা। তার নাকি নিজস্ব তাত্বিক বৈশিষ্ট্য আছে। শহরের আশেপাশেও কত যে দ্রাক্ষালতা দেখলাম, ছেয়ে আছে রাস্তার ওপরে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই অন্যভাবে প্রভাবিত করেছে শিল্প ফর্মকে। ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের ফলে ওঠাও তো।
শহরের প্রায় ভেতরে একটা অতিপ্রাচীণ গির্জে আছে, ইকমিয়াতজিন। রবিবারে বিশাল প্রার্থনা, গান হয়। আর্মেনিয়ান পুরোহিত বা পাদ্রিদের পূজা ঐতিহ্য পৃথক অন্য দেশগুলির থেকে... এঁদের পোষাকের রং চড়া লাল। গান অসম্ভব সুন্দর। পূজায় জালিকাটা ধাতব ধূপদান, শেকল দিয়ে হাত থেকে ঝুলিয়ে সেটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আরতি করার পদ্ধতিটা বেশ মন কাড়ছিল আমাদের। এখানেও কাচের ওপরে প্রণতি ও চুম্বন দেখলাম, রুমাল দিয়ে কাচ মুছে দিয়ে তারপর ওঠা। আর অনেক মোমবাতি কিনে জ্বেলে দেওয়া আইকনের পাদমূলে।
গেলাম ইয়েরেভানের থেকে অল্প দূরে খোর ভিরাপ-এ । আরারাত পাহাড়ের সামনে , আরারাত সমতলে। লালচে ধূসর।
আরারাত পাহাড় এক বিশাল কাহিনির আকর। স্থানীয় আর একটা নাম তার, শিস মা শিস। আরারাতেই নোয়ার নৌকো গিয়ে ঠেকেছিল। আজ আরারাত তুর্কির অংশভূত, খোর ভিরাপের থেকে কয়েক কিলোমিটার গেলেই আর্মেনিয়ার সীমান্ত। আরারাত কিন্তু তার প্রবল সৌন্দর্য, শ্বেতধবল চুড়ো আর কল্পকথার বাইবেল –সুগন্ধ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর্মেনিয়ার শিয়রে, আর্মেনিয়ানদের মনের রাজা হয়ে।
তবে আরারাতের সামনে ছোট্ট টিলার মাথায় খোর ভিরাপের ইতিহাসও কিছু কম আকর্ষক নয়।
পৃথিবীর প্রথম খ্রীষ্টধর্মাবলম্বী দেশ আর্মেনিয়া। খ্রীষ্টাব্দ তৃতীয় শতকে, মানে, যিশুর মৃত্যুর তিনশো বছরের মধ্যে, অফিশিয়ালি রাজা এই ধর্ম মানলেন। তার আগে ছিল স্থানীয় লোকধর্ম, পাগান বা প্যানথিইস্টিক ধর্ম। বহু দেবতায় বিশ্বাসী এথনিক ধর্ম মুছে রাজকীয় ধর্ম হিসেবে খ্রীষ্ট ধর্মকে চাপিয়ে দেওয়ার ইতিহাস রক্তক্ষয়ী। হয়ত তাই তার উল্টো একটি গল্প প্রচারিত। প্রথম খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচারক গ্রেগরের গল্প।
গ্রেগর যে নতুন ধর্ম নিয়ে এলেন, রাজা তা স্বীকার করলেন না। উল্টে তাঁকে মাটির নিচের অন্ধকূপে বন্দি করে দেওয়া হল। কিন্তু ওই অন্ধকূপে তেরো বছর বেঁচে রইলেন গ্রেগর। ওপরে একটা ফুটো দিয়ে বৃষ্টির জল চুঁইয়ে পড়ত। আর কোন এক ভক্ত রুটির টুকরো ফেলে দিত সেই ফুটো দিয়েই।
১৩ বছর পর রাজা অসম্ভব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মরণাপন্ন। আর রানি , মতান্তরে রাজকন্যা, স্বপ্ন দেখলেন, গ্রেগরকে ডাক। সেই পারবে রাজাকে সুস্থ করে তুলতে। তখন খোঁজ পড়ল। গ্রেগরকে মাটির তলার সেই ডাঞ্জন থেকে তুলে আনা হল। গ্রেগরের আশীর্বাদে রাজা সুস্থ হলেন। যদিও ১৩ বছর অন্ধকারে থাকার ফলে গ্রেগর দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন । অন্ধ গ্রেগর হলেন রাজার খ্রীষ্টধর্মে অভিষেকের গুরু।
এই অন্ধকূপটাকে ঘিরেই তৈরি লালচে ধূসর পাথরে গড়া খোর ভিরাপ। খোর ভিরাপ কথাটার অর্থই ‘গভীর কুয়ো’। প্রাচীনতম মঠ। সে মঠে সরু মই বেয়ে নিচের ঘরটাতে নামাও যায়। ওপরে গির্জেয় তো দর্শনার্থী আছে। সদ্য বিবাহিত দম্পতিদের একটা চল আছে এই মন্দিরে এসে নমস্কার করার। ভিডিওতে তুলে রাখা হয় সেই ঘটন। আমারা যখন ওখানে তখনই এক দম্পতি এল। মেয়েটির সাদা ভূমিলুন্ঠিত গাউনাঞ্চল দেখে আর নিতকনেদের পোশাক আর হাতে ধরা ফুলের সাজি টাজি দেখে আমার মেয়ে তো চোখ ফেরাতে পারছিল না। বইতে পড়া রূপকথার দেশে পৌঁছনোর আনন্দ পেল প্রথম বিদেশ সন্দর্শনে ।
উজবেকিস্তানে মুসলিমরা ঠিক সেভাবেই, নিজেদের প্রার্থনায় মাতেন। শুক্রবার আধবেলা অফিস প্রায় হয়না। যদিও, দেশের প্রেসিডেন্ট কিন্তু দু তিনটে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন উজবেকিস্তানের ব্যাপারে। এক, আঠারো বছরের নিচে ছেলেদের মসজিদে যাওয়াকে খুব একটা উৎসাহ দেওয়া হয়না। মৌলবাদ থেকে দূরে রাখা হয় মসজিদগুলোকে। বেশ নিয়ন্ত্রিত এখানে মুসলিম ধর্মের পালন। উজবেকিস্তানে মূল ভয় , ওদের প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানের তালিবানি হাওয়া না এসে লাগে এ দেশটায় । দেশের সুরক্ষা নিয়ে ঠিক যতটা সচেতন উজবেকিস্তান সরকার, ধর্মে মৌলবাদকে প্রবেশ করতে না দেওয়া নিয়েও ততটা।

ব্যালে্র দেশে, চেরি-স্ট্রবেরির দেশে
রূপকথার আর বাকি রইল কী? দু দুটো ব্যালে দেখলাম আমরা। কীভে রয়াল অপেরা হাউজ। বাড়িটিই তো একেবারে জমকালো। রোজ যাতায়াতের পথে দেখেছি। সে বাড়িতে কারমেন আর বোলেরো দেখার সুযোগ করে দিলেন আমাদের কলকাতার মেয়ে মৃদুলা ঘোষ। আপাতত কীভের বাসিন্দা। বহু বছর ধরে ইউক্রেনিয় ভাষা নিয়ে কাজ করে চলেছেন। মৃদুলাদি টিকিট কেটে নিয়ে গেলেন। জমজমাট অপেরা হাউজের ভেতরটা লাল সোনালির কারুকাজে অপরূপ। বক্সে বক্সে রীতিমত ফ্যাশনদুরস্ত কীভবাসীরা। ব্যালের রোমাঞ্চ তো ওই সামনে ওয়েলে বসে থাকা পুরো অর্কেস্ট্রার লাইভ বাদন আর তার সঙ্গে অসামান্য শারীরিক কসরতে ব্যালে শিল্পীদের প্রায় চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া পারফর্মেন্স।
কীভে ব্যালে দেখে ভেবেছিলাম এ সুযোগ আর কোথাও হবে না। ইয়েরেভানে আবার সুযোগ এল। ওখানেও ন্যাশনাল ব্যালে কোম্পানির ব্যালে দেখলাম। এক কথায় বিস্ময়ে বাক বন্ধ হয়ে গেল। তরুণ তরুণী পারফর্মারদের কী অসামান্য প্রাণোচ্ছলতা আর তুখোড় শিক্ষা। দীর্ঘ লাফে শূন্যে উঠে তিন থেকে চারবার পাক খেয়ে নেবে আসার স্কিল। নারী পুরুষ জুটির কী অপরূপ নাচ। ছোট্টবেলায় রাশিয়ান ব্যালে দেখা হয়েছিল কলকাতায়। বাকি যা দেখা সবই টিভিতে, সিনেমার সামান্য অংশ হিসেবে।
আর সবচেয়ে আশ্চর্য হল এত বিশাল অপেরা হাউজগুলো , যা সরকারি অর্থে তৈরি , অবশ্যই সোভিয়েত যুগে এবং সোভিয়েত “সাংস্কৃতিক” অ্যাজেন্ডার আবহেই, এখনো পুরনো জাঁকজমক টিঁকিয়ে রেখেছে, আর এখনো টিকিটের দাম কী অবিশ্বাস্য রকমের কম। ফ্রান্স জার্মানি সুইজারল্যান্ড বা অস্ট্রিয়ায় যদি ব্যালে দেখতে যেতাম, নিঃসন্দেহে এর তুলনায় দশগুণ দাম দিতে হত টিকিটের জন্য। আর একবার প্রমাণ পেলাম সোভিয়েত দাক্ষিণ্যের।
আমার সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য বোধ হয়, আমরা এই দেশগুলোতে গেছি একেবারে ঘোর গ্রীষ্মে। শীতের দীর্ঘ মাসগুলোতে সবকিছু বরফের তলায় থাকে। গ্রীষ্মে যে ফল আর ফসল হয়, তার অনেকটাই তাই আচার জ্যাম প্রিজার্ভ করে রেখে দিতে হয় শীতের সঞ্চয় হিসেবে। ঈশপের সেই পিঁপড়ের মত, সারা গ্রীষ্ম ওরা শশা ভিনিগারে দিয়ে আচার বানান, টমেটোর সস বানিয়ে বোতলে বোতলে ঢালেন। আর প্লাম চেরি এপ্রিকটের অসম্ভব রসালো সম্ভার, যা আমরা সৌভাগ্যবশত সবটাই তাজা পেলাম, সেগুলোকে জ্যাম ও প্রিজার্ভ বানিয়ে রেখে দেন। মাটির তলার গুমঘরে, গুদোমঘরে থেকে যায় গত গ্রীষ্মের শস্য আনাজ সব্জিরা। বাকি রইল মাংস আর রুটি।

শূল্যমাংসের দেশে
নিরামিষাশী হয়ে যেতে হবে এবার। কোন উপায় নেই। কাঝাখস্তানে ঘোড়ার মাংস হল সবচেয়ে বেশি দামি মাংস। সে মাংস চেখে তো দেখলাম। তাতে কিছু হত না, কিন্তু বাকি মাংসের গুণ ও পরিমানে এক জন্মের মত মাংস খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবার দাখিল! এক টেবিল জুড়ে বিশাল বিশাল থালাভরা অসংখ্য অর্ধপক্ক, শূলপক্ক গোদা মুরগি ও ছাগমাংসের টুকরো, ন্যূনতম মশলাসম্পৃক্ত, প্রায় নুন তেল বর্জিত, শুষ্ক ও বিশালাকৃতি। আমরা বলে ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় বাংলা মায়ের সন্তান। আলু টমেটো পেঁয়াজ রসুনের ঢেউ দেওয়া লালচে হলুদ ঝোলে ভাসমান, মশলা কষার সুবাসে মাংসগন্ধ-উবে-যাওয়া মাংস খেয়ে থাকি। এই যে সুপক্ক আমিষ আমরা খেয়ে থাকি, তা যে আসল আমিষের থেকে কত যোজন দূরে, তা কাঝাখদের মাইনাস চল্লিশ শীতে উত্তাপদান করা এই অর্ধপক্ক মাংসের সম্মুখীন হয়ে বুঝতে পারলাম। হাড়ে কাঁপুনি লেগে গেল। প্রচুর স্যালাড, অল্প রুটি আর অনেক মাংস। এই মরুপ্রজাতির খাদ্য । শক, হুণদের খাদ্য, মোঙ্গল-খাঝাখ বাসীর খাদ্য। ষাট উপজাতির ইউর্ত নামক গোলাকৃতি তাঁবুবাসিন্দাদের খাদ্য। উটমাংস, উটদুগ্ধ, অশ্বমাংস।
বাবরের দেশ উজবেকিস্তানে এসে আবার দেখলাম অপরূপ সব খাদ্য, তাদের কেমন যেন চেনা চেনা নাম। নন, আমাদের কাছে যা রুটি বা চাপাটি বা নান। সুস্বাদু গোল বড় রুটি। আর প্লফ। পুলাও যা থেকে এসেছে। তার মধযে আছে মিষ্টত্ব, প্রচুর বাদাম কিসমিস অঞ্জীর। অথচ সে ভাত রান্না হয়েছে ছাগমাংস বা গরুর মাংসের রসে। উফফফ। সে আবার মাংসের ভয়াবহ বাড়াবাড়ি দেখলাম। রাস্তার ধারে ধারে গোশত লেখা দোকানে গোমাংস বিক্রি হচ্ছে। সমসা ( সামোসা-র পূর্বসূরী) নামের পুর দেওয়া সিঙ্গাড়ায় ব্যবহার হচ্ছে, দুম্বা, অর্থাত ছাগমাংস।
ইতিমধ্যে ইউক্রেনে মাংসের পুর দেওয়া ভেরেনিকি খেয়েছি, ছোট্ট ছোট্ট পাউঁরুটি পাম্পোশকি-র সঙ্গে। তার মাখনের বদলে আবার অ্যানিমাল লার্ড। চর্বির ভেতরে একগাদা রসুন চড়ানো। ওটাই শীতে ওদের রক্ষাকবচ। বেশ এক আদিম ব্যাপার।
আর, আর্মেনিয়ায় আঙ্গুরপাতায় মুড়ে সেদ্ধ করা গোমাংসের কিমা পোরা দোলমা খেয়েছি, যে দোলমার থেকে এসেছে আমাদের পটলের দোলমা। মুরাব্বা কথাটাও আর্মানি। ওদের মোরব্বা কষাটে কাঁচা কাজুবাদামফলের চিনির শিরায় ডোবা সংস্করণ। দারুণ উপকারী। কিন্তু আর্মেনিয় এই গোমাংসের দোলমা আমাদের ঠিক পোষাল না। আসলে এসব দেশে, কোথাও মশলার গন্ধ দিয়ে চাপা দেওয়া হয়েনি মাংসের বদখত গন্ধ। মাংস খেলে তাতে মাংসেরই গন্ধ বজায় থাকুক, ইউরোপ মধ্য এশিয়াবাসী তাই চেয়েছিল।

টাকা ভাঙানো
তাশখন্দে এসে টাকার মূল্যমান সম্বন্ধে সচেতন হলাম। সুম, উজবেকিস্তানের কারেন্সির নাম। এই মুদ্রাটির মূল্য নামতে নামতে, এক ডলারে ২৭০০ সুমে নেমেছে। ইয়েরেভানে দেখেছি আর্মেনিয়ার মুদ্রা দ্রাম, যথেষ্ট নিচে তার মূল্য। এক ডলারে মোটামুটি চারশো দ্রাম। একশো ডলার ভাঙিয়ে চল্লিশ হাজার দ্রাম পাওয়া গেল। এক কাপ কফি খেলাম, এক হাজার দ্রাম দিতে হল। এক বোতল জল কিনলাম, পাঁচশো দ্রাম লাগল। একটা চিপ্সের প্যাকেট ছশো দ্রাম। অভ্যেস হতে সময় লাগে। মনে মনে প্রথমে ডলারে কনভার্ট করে তারপর আবার টাকায় কনভার্ট করলাম। বুঝলাম, আমাদের পঞ্চাশ টাকা ওদের চারশো টাকা। অর্থাৎ কিনা, ওদের আটশো টাকা আমাদের একশো টাকা। মানে হাজার দ্রাম হল ওই একশো কুড়ি টুড়ি গোছের। ঠিক আছে। চলবে। কথায় কথা দুহাজার দ্রাম খরচ করতে লাগলাম পাঁচ ডলার ভেবে, চার হাজার দ্রাম খরচ করতে লাগলাম দশ ডলার ভেবে। একটা আন্দাজ পাওয়া গেল।
সুতরাং, হাজার হাজার টাকা খরচ করতে কেমন লাগে সেটা বেশ মালুম পেয়েছি আর্মেনিয়াতে... তবে তাতে ভারবৃদ্ধি হয়না পার্সের। কারণ ওরা নোট বানানোর সময়ে ১০০০০, ২০০০০ এর নোট চালু করে দিয়েছে। কাজের সুবিধের জন্য, দুটো শূন্য মনে মনে বাদ দিয়ে দিলে তবেই টাকাগুলোর সঠিক মূল্য বোঝা যায়। একটা অংকের হিসেব মাথার মধ্যে সেট হয়ে যায়। ১০০০ এর নোট টা সত্যিই দশ টাকার মত। রাস্তাঘাটে বেরোলেই, একটা দশের নোট লেগে যাবে। বা দুটো।
উজবেকিস্তানের ব্যাপারটা বেশ সাঙ্ঘাতিক। এখানে এসে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচের অভিজ্ঞতা হল। এক ডলারে প্রায় তিন হাজার সুম হওয়ার ফলে, ডলার ভাঙালেই এক থলি সুম। তাড়া তাড়া নোটের কারবার। প্ল্যাস্টিকের ক্যারিব্যাগে করে নোট আসছে। ডলার ভাঙিয়ে সুম করার জন্যও, ব্যাংকে গেলে যে রেট, বাইরে, কালোবাজারের অন্য রেট। অনেক তফাত। প্রায় পাঁচ-সাতশো সুমের। ব্যাংকে ২১০০ সুম, বাইরে ২৭০০ সুম এক ডলারে। তাই অফিসের লোকেরাও বাইরে থেকেই ভাঙিয়ে এনে দিল আমাদের। সব সুমই হয় হাজার নয় পাঁচশোর নোটে। এবার ধরা যাক আপনি এক কাপ কফি খেলেন। আপনার বিল হল সাত হাজার সুম। আপনাকে গুণতে হল ১৪ খানা পাঁচশোর নোট। উফফ। ভাবলেই হাত পা কেলিয়ে যায়। এ টাকা থেকে কী লাভ? শুধু ভারবৃদ্ধি করা।
কে যেন বলছিল এখানে গাড়ি কিনে সুমে দাম দিতে গেলে শূন্য গুণতে গুণতে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। কটা শূন্য বাদ দিতে হবে সেটাই বোঝা ভারি মুশকিল।
আমরা যা যা দেশ ঘুরলাম, তার ভেতরে সবচেয়ে স্ট্রং কারেন্সি পেলাম গ্রিভনাকে, ইউক্রেনের টাকা। এক ডলারে আট গ্রিভনা মতো হয়। ওখানেও জিনিশ পত্রের দাম ভালই। ভাল জিনিসের দাম ভাল। চারটে বার চকোলেট কিনেছি চল্লিশ গ্রিভনার। মানে পাঁচ ডলার। খেলনা পুতুলও ওইরকম, এক এক সত্তর গ্রিভনার পুতুল। সুভেনির প্রায় সবই পঞ্চাশ ষাট সত্তর গ্রিভনা। শেষ দিনে পড়ে থাকা সত্তর গ্রিভনায় অনেক অনেক চকোলেট কিনে ফেললাম।
আস্তানায় কাঝাখ টাকার নামটা ছিল কী? ও হ্যাঁ মনে পড়েছে। টেঙ্গে। দর ছিল কী? বোধ হয় ডলারে ৯০০ টেঙ্গে। ভুলেই গেছিলাম ।


“ভারতীয়? মিঠুন চক্রবর্তীকে চেনেন?”
কাস্টমস অফিসার থেকে শুরু করে, পথেঘাটে সর্বত্র ভারতীয়দের খুব কদর। সবচেয়ে বেশি কদর উজবেকিস্তানে। সালোয়ার কামিজ পোশাকটা ওদের খুব কাছাকাছি হলেও, ভারতীয় পোশাক দেখলেই টের পেয়ে যান , এরা এসেছে সেই স্বপ্নের দেশ ভারত থেকে। সসম্ভ্রমে জিগ্যেস করেন, নিউ দিল্লি? সদলবদলে দাঁড়িয়ে পড়েন ছবি তুলতে।
কাঝাখরাও শাড়ি পরা মহিলা দেখলেই সঙ্গে ছবি তুলতে চান, খুব ভালবাসেন ভারতীয়দের । কোথায় যেন টের পাই, নেহরু সায়েব আর ইন্দিরা গান্ধির বিদেশনীতির সাফল্য। ভারত –সোভিয়েত সুসম্পর্কের আঁচ এখনো অটুট আছে এঁদের সামগ্রিক স্মৃতিতে।
আর, নস্টালজিয়া আক্রান্ত হয়ে তাঁরা যখন ভারতের কথা বলবেন, প্রথমেই সিনেমার কথা তো আসবেই। রাজ কাপুর আর মিঠুন চক্রবর্তীর কথা বললে স্বপ্নে ছেয়ে যাবে চোখ। বিশেষত বর্ষিয়সী নারীদের হার্টথ্রব এই দুই আইকন।
সম্প্রতি মিঠুন গিয়েছিলেন উজবেকিস্তানে। তাশকেন্তের একটা হল ঘর ভরে গেছিল, উপচে পড়েছিল উজবেগ মানুষে। মানুষের আবেগ, ফুলের স্তবক, ভালবাসার বাষ্প নাকি বাষ্পীভূত করে তুলেছিল চোখ মিঠুনের। উনি ভাবতেই পারেননি এভাবে ভালবাসা পাবেন।
দেখলাম এক উজবেগ ভদ্রলোকের গান। ছোট্ট বেলায় স্বপ্ন দেখতেন মহম্মদ রফিকে। অসাধারণ রফিকন্ঠী তিনি। দেখলাম মম চিত্তে নিতি নৃত্যে-র সঙ্গে কাঝাখ তরুণীদের নাচ। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। দেখলাম ইউক্রেনের যুবকদের গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত। দেখলাম বাংলা কবিতা পড়া ইউক্রেনে, মৃদুলাদির কাছে ওরা বাংলা শিখতেন। ইন্ডিয়ান কালচার সেন্টারে কত্থক শেখেন উজবেক বালক-বালিকারা। ওদের শিক্ষিকা উজবেগ মহিলা। চার বছর দিল্লিতে এসে নাচ শিখে গেছেন। অসামান্য হিন্দি বলেন। চোখে স্বপ্ন নিয়ে বললেন, আমার ছাত্রছাত্রীদের আপনারা একবার ডাকতে পারেন না ইন্ডিয়ায়?
ইন্ডিয়া গেছেন আই টেক বা আই সি সি আর-এর স্কিমে অনেক ছেলেমেয়েই। কেউ ভারত সম্পর্কে মুগ্ধতা ভোলেননি। ভারত এখন এশীয় মহাদেশের অন্যতম ক্ষমতাধর দেশ। সেই শ্রদ্ধা ওদের চাউনিতে। দেখে লজ্জা পেয়েছি। মাথা নিচু হয়ে এসেছে এই ভেবে, আমরা এঁদের সম্বন্ধে কত কম জানি। আমাদের সব জানা সীমাবদ্ধ ছোট্ট বেলায় পড়া ওই রূপকথা আর উপকথার বইগুলোয়, যেগুলোকে আজও আমরা ভুল করে বলি রুশ বই।

রূপকথার দেশে জটিলতা (“আমাদের রুসি বলে ডাকেন আপনারা। ছিঃ”)
ছোট্ট গোল রুটি/ চলছি গুটিগুটি / গমের ধামা চেঁছে/ ময়দার টিন মুছে/ ময়ান দিয়ে ঠেসে / ঘি দিয়ে ভেজে/ জুড়োতে দিল যেই / পালিয়ে গেলাম সেই/ বুড়ো পেল না / বুড়ি পেল না /...../ সেয়ানা শেয়াল, তুইও পাবি না !/
অজানি দেশের না-জানি কী ! খুদে ইভান বড় বুদ্ধিমান ! বাবা ইয়াগা..! চুক আর গেক। ইশকুল। বাবা যখন ছোট। ছবি আর গল্প।
আমাদের শৈশবের সেইসব অসামান্য রঙিন ছবির বইগুলো এখনো হাতছানি দেয়। যে সময়ে ছাপাখানার প্রযুক্তিতে, অর্থাভাবে, বাংলা শিশুসাহিত্য চেষ্টা করলেও ওই দামে সুন্দর বই উপহার দিতে পারত না, দুই দেশের ভেতরের সুসম্পর্কের ফলে, সোভিয়েত দেশ, সোভিয়েত নারী ম্যাগাজিন্সের সঙ্গে, অতি অল্পমূল্যে প্রগতি পাবলিশার্স, রাদুগা, প্রাভদা, মীর...নানা প্রকাশনার ঝকঝকে রঙিন সব বই, অসামান্য সব আর্টিস্টের ইলাস্ট্রেশন সহ, আমাদের শৈশব জুড়ে অবতীর্ণ হয়েছিল। সেসব বইকে আমরা ভালবাসতে বাসতে বড় হয়ে উঠলাম, তারপর হাতেখড়ি হল গোর্কি আর শেখভ আর তলস্তয় আর তুর্গেনেভের সঙ্গে। এই অসামান্য বইগুলোর স্মৃতি তরোতাজা হয়ে ওঠে আমার, আবার, ওই দেশগুলিতে গিয়ে। রূপকথার দেশ তাহলে আর বলেছি কেন।
কীভে একটা গোটা গ্রাম রাখা রয়েছে রূপকথার মত, সংরক্ষিত। সত্যিকারের কিছু গ্রাম থেকেই নাকি আসবাব পত্র, কাপড়চোপড় এমনকি কোঠাঘর, কাঠের গির্জে সব তুলে নিয়ে গিয়ে সাজান। পিরিহোভো নামের এই গ্রাম একটা জীবন্ত প্রদর্শনী। ইনস্টলেশন আর্টের মত। কুটির থেকে শুরু করে স্কুলবাড়ীও আছে। স্কুলবাড়িতে বেতও রাখা। কুটিরের পাশে ছোট্ট একটা তেকোনা মত কী। ওটা শীতের দিনে সবজি আনাজপাতি সংরক্ষণ করার জন্য একটা গোলা। মাটির নিচে খুঁড়ে ঘর বানিয়ে, তার ভেতরে সারা গ্রীষ্মের অঢেল ফলনের কিছুটা অংশ রেখে, মাথায় ওইরকম তেকোনা চালা দিয়ে রাখা হত। আমাদের সঙ্গে যে গাইড, ইলিনা, সে বলে তার দিদারাও ওইসব আসবাব ব্যবহার করেছে। ভারি ইস্তিরি অথবা তাঁত। সামোভার।
আমাদের কেবলি মনে পড়ে স্বপ্নদেখার শৈশব।
কিন্তু স্বপ্নদেখার শৈশবের শিক্ষাগুলো সব প্রয়োগ করতে গেলেই ভুল হয়ে যাবে না? বিগত কুড়ি বছরের ইতিহাস আমাদের ভারতীয় মনে যে কিছুমাত্র দাগ কাটেনি। তাই, এই চারটি দেশের স্বাধীণ সত্তাকে স্বীকার করার বদলে বার বার ভুল করে বলে ফেলছি রাশিয়ান গল্প, রাশিয়ার রূপকথা, রাশিয়ার গোলরুটি... এমনকি ডোনাটের মত শক্ত বিস্কুট দড়ি দিয়ে একসঙ্গে অনেক গেঁথে বিক্রি যে করা হচ্ছে উজবেকিস্তানের পথেঘাটে, তাকেও রাশিয়ান বলে ফেলেছিলাম প্রায়।
রুশ কথাটি এখন ট্যাবু। যদিও প্রতি দেশেই সাইনবোর্ড থেকে শুরু করে পথঘাট দোকান বাজার, সর্বত্র এখনো রুশ হরফে, রুশ ভাষায় লেখা দেখতে পাওয়া যাবে। নিজেদের ভাষার সঙ্গে সঙ্গে রুশ ভাষাও বলবেন সকলেই। মোটামুটি রুশ ভাষা যাঁরা জানেন, এই দেশগুলোতে বাজারে বা রেস্তোরাঁতে অসুবিধে হবার কথা নয়। ওয়েট্রেসকে বাবুশকা বলে ডাক দেওয়া, ধন্যবাদের জন্য স্পাসিবা, অথবা ওকে, বা গুড! –এর বদলে “খরোশো!” সর্বত্রই চলবে। তবু, ওঁরা যে রুশি নন, এই কথাটা মনে রাখা দরকার। ভুল করে ওঁদের রুশ বললে ওঁদের মুখ ভার হবে। ওঁরা উল্টে বলবেন, তুমি তো ভারতীয়, তোমাকে যদি কেউ বলে ওই যে পাকিস্তানিটা, কেমন লাগবে তোমার?
ভারতে কাজ করতে আসা ইউক্রেনীয় ইঞ্জিনিয়ার, যাঁরা সচরাচর দলে দলে এসেই থাকেন প্রতিরক্ষা বিভাগের কাজে, কেননা যুদ্ধ যান ও বিমানের অনেকগুলোই এখনো সারাতে পারেন ওই ইঞ্জিনিয়াররাই, অস্ত্রাংশ যন্ত্রাংশের সাপ্লাইও আসে সে দেশ থেকেই, সেই মানুষগুলোর চূড়ান্ত ক্ষোভের কাহিনি শুনলাম এই সূত্রে। ইয়ে রুসি জো আয়া হ্যায় না...। ভারতীয়দের মোটাদাগের রুচি এখনো এভাবেই লেবেলিং করায়, যে কোন সোভিয়েতকে রুশ ভাবতে আমরা অভ্যস্ত। ওঁদের ক্ষোভ, আমাদের আপনারা রুশ বলে ডাকেন। রাশিয়া সোভিয়েত আমলে আমাদের মাথার ওপর বসে শাসন করে গেছে। আমরা পৃথক জাতিসত্তা। আমাদের পরিচয় আলাদা।
প্রতিটি দেশ সযত্নে নিজের জাতিসত্তাকে সংরক্ষণ করছে, নির্মাণ করছে। রাশিয়ার সঙ্গে কারুর কারুর সম্পর্ক ভাল, কারুর বেশ খারাপ। কিন্তু এই একটি ব্যাপারে, নিজের ভাষা , নিজের পোষাক, নিজের সত্তাকে সামনে আনার ব্যাপারে, প্রত্যেকে সমান সচেতন। কাঝাখস্তানের আস্তানা শহরটি খুব নতুন। মাত্র বছর কুড়িই তার বয়স। সে এশিয়ার দুবাই হতে চায়। মধ্য এশিয়ার মরুভূমির বুকের মধ্যে আলাদিনের প্রাসাদের মত ভুঁইফোঁড় উঠে দাঁড়িয়েছে ঝাঁচকচকে বাড়ি ঘর ব্যাংক বাতরিক টাওয়ার বহুতল হোটেল স্টেডিয়াম, তাঁবু আকারের শপিং মল খান শাতির... মনোমুগ্ধকর রুচিসম্মত। ইতিহাসের মিউজিয়ামে অসংখ্য মরু-চারী লোকগোষ্ঠীর কথা। যাযাবর প্রজাতির তাঁবু, উটের চামড়ায় তৈরি গোলাকৃতি ইউর্ত, সেটাই এখন কাঝাখদের প্রতীকচিহ্ন।
উজবেকিস্তানেও আছে কয়েকটি পার্ক। আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মৃ্ত এবং নিখোঁজ উজবেগ সেনাদের স্মরণে ক্রন্দনরতা মায়ের মূর্তি আর ধাতব পাতে খোদাই করা সেই সব বীর ছেলেদের নাম...। আছে স্তালিনের নির্দেশে মৃত উজবেগ ইনটেলেকচুয়ালদের স্মৃতি বেদী। প্রতিমুহূর্তের স্মরণে , যুক্ত সোভিয়েতের সময়কার ক্ষতগুলি নিয়ে কথা বলে চলেছেন তাঁরা। একইসঙ্গে অস্বীকার করার নয়, এই দেশগুলির অসংখ্য স্পোর্টস কমপ্লেক্স, যেখানে প্রায় নিখরচায় ভাগ নেওয়া যায় সবরকমের খেলাধুলোয়, সাঁতারের পুল থেকে মাঠ, কোর্ট সব সাজানো থাকে যে কারুর ব্যবহারের জন্য – এও যেমন সোভিয়েত সংস্কৃতির দান, তেমনই বিশাল বিশাল কারখানা, বিশাল রাস্তা, পার্ক, যাবতীয় কনস্ট্রাকশনের ঐতিহ্যই। এখন , সোভিয়েত পরবর্তী সময়ে অনেক সমস্যা, লড়াই , অনেক অর্থনৈতিক সংকটের ভেতর দিয়ে চলেছে দেশগুলি। কাঝাখস্তান তেল বিক্রি করে বড়লোক, রাশিয়া তাকে হাতে রাখা তেল ও গ্যাসের সম্পদের জন্যই। ইউক্রেন শস্য-ভান্ডার আগেও ছিল, এখনো, তাছাড়া শিল্পেও খুব উন্নত এক দেশ । আর্মেনিয়া অর্থনৈতিকভাবে বেশ সমস্যাসংকুল। স্থানীয় মানুষের মাথাপিছু আয় খুবই কম। উজবেকিস্তান মাঝামাঝি অবস্থানে। টাকার দাম অসম্ভব কম। এক ডলারে উজবেক সোম তিনহাজারের কাছাকাছি। দশ ডলার ভাঙালে স্তূপীকৃত নোট নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে। বাজার হাটে কিলো কিলো কারেন্সি নোট নিয়ে যেতে হবে।
এদের প্রত্যেকের সবচেয়ে বড় সমস্যা, প্রশাসন এখনো বেশ টলোমলো। পায়ের তলায় মাটি পেতে সময় লাগবে। তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি এদের ইমিগ্রেশন অফিসারদের সংশয় সঙ্কুল মুখ দেখে। বিদেশিদের পাসপোর্ট নিয়ে গলদঘর্ম হচ্ছেন এরা। প্রচুর সময় লাগছে ক্লিয়ার করতে ভিসার কাগজ। কেননা প্রতিরক্ষা, কূটনীতি, এসবের ট্রেনিং ছিল না কোন। সবটাই কেন্দ্রীভূত ছিল রাশিয়ার হাতে। ঘড়ির কাঁটার নিয়মে দেশটা চালাচ্ছিল রুশ শাসনযন্ত্র। সেই নিখুঁত যন্ত্রটা চলে গিয়েছে । রয়ে গেছে পুরনো কলকব্জা। অথচ নিজেদের পথ এখন নিজেদের খুজে খুঁজে চলতে হচ্ছে। প্রশিক্ষণ দিয়ে তুলে আনতে হবে নয়া প্রজন্মের সরকারি কর্মচারীদের। নিজের নীতি প্রণয়ন করতে হবে। একটু সন্দেহপ্রবণ, বেশ খানিকটা ভিতু , সংকীর্ণ সেকারনেই এঁদের বিদেশদপ্তর। এইসব দেশগুলোতে যাবার জন্য অ্যাপ্লাই করলে এঁরা কেউই সহজে ভিসা দেবেন না। একবার গিয়ে পড়লে, সহজে টাকাকড়ির লেনদেন করতে দেবেন না। ফেরার সময় আবার বেশি টাকা নিয়ে ফেরা যাবে না। এমন অনেক সমস্যা। সবটাই প্রশাসনিক সমস্যা।
ইউক্রেনের স্থানীয় ইলিনাই আবার জানালেন, প্রশাসনে দুর্নীতি প্রচুর । ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে ট্রেড লাইসেন্স , কোনকিছুই সোজা রাস্তায় নয়। কাঝাখস্তান ও উজবেকিস্তানের তরুণ প্রজন্ম উচ্চাকাংক্ষী, ইংরিজি শিখতে ইচ্ছুক। ওঁরা বুঝে গেছেন, ইংরিজি না শিখলে বিশ্বের উঠোনে খেলতে নামা মুশকিল।
অন্যদিকে পুরনো প্রজন্মের মনে এখনো উজ্জ্বল আছে নিশ্চিন্তির সোভিয়েত যুগ। যখন ভাবতে হত না অনেককিছুই। শিক্ষা থেকে কাজ থেকে খাদ্য থেকে স্বাস্থ্য। স্টেট সবকিছুর দায়িত্ব নিয়ে রেখেছিল। স্টেটের হাতেই থাকত রাশ। অনিশ্চিতি বলে কিছুই ছিল না। সেই স্বর্ণযুগকে পেছনে ফেলে এখন দেশগুলো নতুন করে নিজেদের রাষ্ট্রীয় আইডেন্টিটি খুঁজছে।
অনেক কিছুই লেখা হল না। মনে পড়বে পরে। মনের মধ্যে জারিত হবে। হয়ত আবার পরে লেখাবে। তবে, সন্ধেতে অন্ধকার, গাছগাছালিভরা ফুটপাতে একলা একলা মেয়েদের হাঁটার স্বর্গ হিসেবে, কিছুতেই ভোলা যাবে না দেশগুলোকে।


831 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: সে

Re: রূপকথার চার দেশ

আপনি প্লীজ ভ্রমণকাহিনি লিখবেন না। আপনার অন্য লেখাগুলো খুব ভালো হয়।
Avatar: nabanita

Re: রূপকথার চার দেশ

খুব ভালো লাগলো। আরো লিখুন।
Avatar: sosen

Re: রূপকথার চার দেশ

দারুণ লাগল!
Avatar: ব্যাং

Re: রূপকথার চার দেশ

ভারি ভালো লাগল লেখাটা। প্লিজ আরো লিখুন।
Avatar: hu

Re: রূপকথার চার দেশ

মেট্রো মানে কি সাবওয়ে? তাহলে সেটা কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানাতে নেই। পথে পথে ওয়াটার ফাউন্টেনও আমি দেখিনি। আর হ্যাঁ, টেঙ্গের দাম এখন ডলারে একশো পঁচাশি। বিশ্ব জুড়ে তেলের দাম কমে যাওয়ার ফলে বর্তমান অর্থনীতি বেশ টালমাটাল। তবে মিঠুন চক্রবর্তীকে নিয়ে উন্মাদনাটা সলিড। হিন্দী সিরিয়াল নিয়েও। তার ফলশ্রুতি হিসেবে কাস্ট সিস্টেম নিয়ে অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে হয়।
Avatar: hu

Re: রূপকথার চার দেশ

ধর্মের প্রতি আকর্ষন পৃথিবীর অনেক জায়গার মত এদিকেও ক্রমবর্ধমান। শহর থেকে অনেক দূরে বেরিয়ে পড়লে দেখা যায় সোভিয়েত আমলের ধু ধু রাস্তা, যানবাহন অপ্রতুল। মাঝে মাঝে ঘোড়ার পিঠে চেপে কাউকে যেতে দেখা যায় এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। ঘরবাড়ির অবস্থা খুব ভালো বলতে পারি না। কিন্তু এত কিছু "নেই"-এর মাঝে ঝলমল করে মসজিদের চুড়ো। এক নয়, একাধিক। তবে এটাও ঠিক, শহরাঞ্চলের ছেলেমেয়েদের মুখে শুনি সরকার ধর্মাচারনে উৎসাহ দেয় না। এমনকি ঈদের ছুটিও অপশনাল রিলিজিয়াস হলিডে হিসেবে দেওয়া হয়। ন্যাশনাল হলিডে নয়।
Avatar: b

Re: রূপকথার চার দেশ

ভালই লাগলো। সে-র অসুবিধার কারণ বুইলাম না। এক একজন এক এক রকম ভাবে দেখবেন তো, তাতে কি আছে?
Avatar: সে

Re: রূপকথার চার দেশ

আমার এক্কেবারে ভালো লাগেনি। ইস্কুলের খাতায় লেখা রচনা টাইপের লেগেছে। প্লাস লেখাটা আমায় টানে নি। কষ্ট করে করে পড়তে হলো। তাই নিজস্ব মতামত দিয়েছি। ভালো না লাগলেও আহাউহু করতে হবে এমন কোনো মাথার দিব্যি আছে কি?
Avatar: b

Re: রূপকথার চার দেশ

"আপনি প্লীজ আর লিখবেন না" এটা প্রায় ফতোয়ার মত লেগেছে। আমিও নিজস্ব মতামত দিলাম।


Avatar: Yashodhara Ray Chaudhuri

Re: রূপকথার চার দেশ

এই লেখাটি লিখি ২০১৩ তে। ঘুরে এসেছি ২০১৩ র মে জুন মাসে। হ্যাঁ আস্তানাতে মেট্রো নেই, মানে পাতাল রেল নেই। কীভে পাতাল রেল দেখেছি শুধু।। ... তা, ইউক্রেনে, ২০১৩ র শেষ থেকেই মারামারি আগুন তাজা তাজা ছেলেদের মৃত্যু রাস্তায় রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবরোধ করতে করতে... এসব শুরু হয়ে গেল। তখন আবাপ-তে আর একটি পোস্ট এডিট লিখেছিলাম, সেটাও তুলে দিলাম। "প্রতিদিন খবরের কাগজ খুলে নতুন কোন মোচড় দেখছি। ক্রমশ ঘুরে যাচ্ছে অবস্থা। এখন আর ইউক্রেনের অন্তর্বর্তী সমস্যা নয়। এখন আন্তর্জাতিক ঘুর্নি, কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের চিরপুরাতন রাজনীতির গল্প। রাশিয়া ও ইউক্রেনের তীব্র সংঘাতের ভেতরে এবার আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ছটি ফাইটার জেট নামিয়ে দিলেন পাশেই, লিথুয়ানিয়ায়, বালটিক অঞ্চলের এয়ার পেট্রোল বাড়াতে। এ অঞ্চলের বহুদিনের জটিল রাজনীতি , তেল –গ্যাস-তেল পাইপলাইনের দখল নিয়ে। ছিল আছে থাকবে। যার ভেতরে ঢুকে পড়েছে জাতিসত্তার লড়াইও। ইউক্রেনের উন্নত সামরিক শিল্প, উন্নত কৃষি (এই কালো মাটির দেশটিকে বহুদিন ধরে বলা হত ‘রুটির ঝুড়ি’), ইউক্রেনের কম্পিউটারে দক্ষতা, তেল-গ্যাস ছাড়াও, পরমাণু শক্তি। ফলত জোরালো অর্থনীতি। ইউক্রেনের কারেন্সি গ্রিভনিয়া বেশ দামি, মাত্র আট গ্রিভিনিয়ায় এক ডলার, যেটা অন্য প্রাক্তন সোভিয়েত দেশগুলোর তুলনায় যথেষ্ট বেশি। আবার এই জোরের জায়গাগুলোকে অধিকারের জন্যই রাশিয়ার আধিপত্যবাসনা। আর এজন্যেই উত্তর আমেরিকার ততটা চাপা না থাকা বাসনা ইউক্রেনকে নিজেদের দিকে নিয়ে আসা।

এ মুহূর্তে অগ্নিগর্ভ অঞ্চল। অত্যন্ত জটিল এইসব সমীকরণ। ইউক্রেনে “আপাতত শান্তিকল্যাণ “ বলার সময় এখনো দূর অস্ত্‌।
ইউক্রেনের ভেতরেরই, একটা অংশ ক্রিমিয়া চায় রেফারেন্ডাম-এ রাশিয়ার অংশ হয়ে যেতে। ওই অঞ্চলটির সংখ্যাগুরু জনগণ যেহেতু রুশ বংশোদ্ভূত। অথচ ক্রিমিয়া ইউক্রেনের একটা প্রদেশমাত্র। ইউক্রেনে এখন অন্তর্বর্তী সরকার। তাঁরা কী করবেন? মেনে নেবেন রাষ্ট্রের একটা অংশের বিচ্ছেদ?

কিন্তু আমার লেখা আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে নয়। রাজায় রাজায় যুদ্ধে উলুখাগড়াদেরও অনেক ছোট্ট ছোট্ট গল্প থাকে। এইসব সাধারণ মানুষদের আমরা সচরাচর চিনি না। চিনলে গল্পটা অন্যরকম লাগবে, পড়তে পড়তে প্রতিমুহূর্তে মনে হবে, তারা কেমন আছে , যারা এই আগুনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে?
গত চার মাস ধরে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের ( ওঁদের উচ্চারণে ক্যীভ) সেই সাধারণ মানুষ-ই না চেয়েছিলেন, যোগ দিতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে? পথে নেমেছিলেন? গত নভেম্বর থেকে তীব্র শীত উপেক্ষা করে, ইন্ডিপেন্ডেন্স স্কোয়ারে অবস্থান করছিলেন। তাঁদের ইচ্ছেকে পিষে ফেলতে পারলেন না রুশ-ঘেঁষা রাষ্ট্রপতি ইয়ানুকোভিচ, চেষ্টা করেও। ৮০ জনের মত তরতাজা ছেলে সরকারি বাহিনির স্নাইপার আঘাতে মারা গেল। জনতার ইচ্ছের তাপ তাতেও কমল না। সুতরাং রক্তক্ষয়ী নাটকীয় তরজার পর রণে ভঙ্গ দিলেন ইয়ানুকোভিচ। রাশিয়ার আশ্রয়ে পালিয়ে গেলেন দেশ ছেড়ে।
তারপর রাশিয়ার সেনার কুচকাওয়াজ, ক্রিমিয়া দখল। নামে, বেনামে। সেদিনই কাগজে দেখলাম ছবি, বর্ডারের এ পারে ইউক্রেন সৈন্যের কুচকাওয়াজ, ওপারে রুশ সৈন্য, আর মাঝখানে টলোমলো পায়ে একটি শিশু হেঁটে যাচ্ছে। কে যে তাকে ওইখানে হাত ছেড়ে দিল।
প্রতীকী। ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের প্রতীক। সাধারণ মানুষ, যারা খবরের কাগজে এমনিতে থাকেন না। হঠাৎ হঠাৎ হেডলাইন ফুঁড়ে উঠে আসেন, নিজেদের তুলে আনেন, সাধারণ হয়েও অসাধারণ কিছু কাজ করে। যাঁদের মুখ আমরা চিনি না। ইদানীঙ একের পর এক দেশের খবর আমাদের দুনিয়ায় আছড়ে পড়ে টিভি, ফেসবুক, ইমেলের মাধ্যমে। কতগুলো ছবি পর পর ভেসে যায় চোখের ওপর দিয়ে। কিন্তু আমাদের স্পর্শ করে না ঠিক। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট। ভেনেজুয়েলা। বাংলাদেশ। গ্রিস। তেমনই ইউক্রেন। ফেব্রুয়ারির শেষে মৃতদের অ্যালবাম নেটে ভেসে ভেসে এল আমার দরজায় । লেখা হয়েছিল, এই সব তরুণদের কেউ কবি , কেউ-বা আই টি কর্মী, ইঞ্জিনিয়ার বা সাংবাদিক। কুড়ি তিরিশ বয়সী মৃতদেহগুলো সার সার শুয়ে ছিল, তাদের কেউ কেউ অর্থোডক্স গির্জের পাদ্রিও! অন্য সময় হলে, শ্বেতাঙ্গ তরুণদের এই অ্যালবামটা আমাকে স্পর্শ করত না। আজ করল।
সদ্যই, বছরও ঘোরে নি। দশ দিনের জন্য কিয়েভে গিয়েছিলাম। কিয়েভের রাস্তায় ঘুরেছি ট্যুরিস্টের বেশে। সেই ইন্ডিপেন্ডেন্স স্কোয়ার, যেখানে ফেব্রুয়ারি শেষে আগুন, ধোঁয়া, একের পর এক যুবকের লাশ শায়িত। সেখানেই, বাস ট্রাম না চলা পিচের রাস্তায় বসে পড়ে ছবি তুলেছি।
না, এসব শখের ভ্রমণবৃত্তান্তের স্মৃতিকাতরতা নয়। আসলে মানুষ। সেই দেশটার মানুষদের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। যাদের গায়ের রং “প্রথম বিশ্বের” শ্বেতাঙ্গদের মত। কিন্তু তাদের আশা আকাঙ্ক্ষা, চাওয়া আর না-পাওয়ার , ইচ্ছে অনিচ্ছের সঙ্গে আমাদের যেন কোথায় মিল। কিছুদিন আগে অব্দি যারা লৌহপর্দার আড়ালে “দ্বিতীয় বিশ্ব” ছিল। চকচকে প্রোপাগান্ডা পত্রিকা ছাড়া যাদের ব্যাপারে আমরা কিছুই জানতে পারতাম না। এখন চোখ মুখ পেয়েছে তারা আমার কাছে, মানুষ হিসেবে চোখে পড়েছে, ভেতরের তাপ উত্তাপ আর অনেকটা বিভ্রান্তিসহ।
কিছুদিন আগে অব্দিও ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ বলতে আমি কীই বা বুঝতাম? ইউক্রেনের অস্তিত্বটাই তো ছিল খুব ধোঁয়াটে আমার কাছে। কিছুদিন আগে অব্দি এই দেশটা আমার কাছে ছিল ভূগোলের মানচিত্রে সঠিকভাবে না দেখা একটা কোন দেশ। ওই “এক্স-সোভিয়েত” একটা দেশ। এখন যাকে কমনওয়েলথ অফ ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টেটস বা সি আই এস দেশ নামেও ডাকা হয়। যদিও ওই সি আই এসে কে আছেন কে নেই, তা নিয়েও অনেক বিতর্ক। ইউক্রেন আপাতত কমনওয়েলথে থাকতে অরাজি বলে , বাইরে।
কিন্তু এখন? এসব ছবি দেখলে আমার মনে পড়ছে ইলিনার কথা। ইলিনা ভারতীয় দূতাবাসের কর্মী। এক দাপুটে , ঝলমলে তরুণী। অথবা ভিক্তর। দুজনেই প্রশিক্ষিত অনুবাদক, ইংরিজি শিখেছেন বলেই চাকরি হয়েছে দূতাবাসে, সেকথা জানেন। যদিও উচ্চারণ আরো নিখুঁত করার চেষ্টাটা এখনো জারি । আর আছে অগাধ উচ্চাকাংক্ষা। পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে চান না ভিক্তর। বলেছিলেন, এর আগে ইউরোপ গিয়েছিলাম, পড়তে। এবার আমি আমেরিকায় পড়তে যেতে চাই। অনেক দেশ দেখতে চাই।
ইউক্রেনের তরুণ কবিরা খুব লাজুক কিন্তু আশান্বিত মুখে আমার দিকে তাকায়। তারা ইউক্রেনিয় ভাষায় কবিতা লেখে। আমি তর্জমায় শুনি। সরাসরি বাংলা তর্জমা। বিগত কুড়ি বছরের ওপর ইউক্রেন নিবাসিনী মৃদুলা ঘোষের করা , অন দ্য স্পট। ইউক্রেনিয় যুবকেরা, মেয়েরা আমার মত ভারতীয়ের কাছে জানতে চায়, আমার দেশ সম্বন্ধে তোমরা কী জানো? তারাশ শেভচেঙ্কো নামের ইউক্রেনিয় কবির নামাংকিত মিউজিয়ামে বসে, আমি তাদের প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারি না। আমার জ্ঞান ওদের রূপকথা টথা অব্দি। ছোট্টবেলায় পড়েছি, প্রগতি প্রকাশনের স্টল থেকে কেনা অসম্ভব সস্তার রঙিন বইতে। যে বইগুলো আমাদের কাছে “রুশ বই”। আমরা বড়জোর ইউক্রেনকে নিয়ে একটু সেন্টিমেন্টাল হতে পারি। এইটুকুই তো।
এই তো সেই তরুণ প্রজন্ম। যাদের বয়স বছর কুড়ি, তারা বলছে, আমরা তো সোভিয়েতে জন্মাই নি, আমাদের শুনিও না সোভিয়েতের নস্টালজিয়া। বাবা মায়েরা, দাদু দিদারা, এখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, যখন সবকিছু ফ্রি ছিল, সেই সময়ের গল্প। বলেন, সাঁতারের ক্লাস , গ্রীষ্মাবকাশের আর্তেক ক্যাম্প-এর নিশ্চিন্তি থেকে শুরু করে খাবার দাবার ওষুধ বিষুদের আশ্বাসের কথা। আমরা ওসবকে পাত্তা দিইনা। আমরা “স্বাধীন” ইউক্রেনের ছেলেমেয়ে। আমাদের দেশ কবে উন্নত দেশেদের সঙ্গে এক সারিতে বসবে বলুন দেখি?
তরুণেরা নিজেদের ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে চায়, আর চায় নিজেদের ইউক্রেনীয় নিজস্বতাকে , আইডেন্টিটিকে তুলে ধরতে। তাদের মনে হতেই পারে, যে দেশটার একটা মোড় পেরোলেই একটা করে ষোল বা সতের শতকের গির্জে, আর যে গির্জের আকার আকৃতির সঙ্গে ইউরোপের পুরনো ঐতিহ্যের গভীর মিল, সে দেশ তো আসলে ইউরোপেরই অংশ। তা ছাড়াও, ইউরোপের সঙ্গে মিললেই ত উন্নতি । পাওয়া যাবে নতুন দুনিয়া, পাওয়া যাবে দুর্নীতিহীন প্রশাসন। কিয়েভের ঝকঝকে রাস্তা, ব্র্যান্ডেড প্রোডাক্টভর্তি ক্রিশিয়াটিক অ্যাভেনিউ তাদের কাছে যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। আরো কিছু চাই। সোভিয়েট যুগের নিয়ন্ত্রণরাজ –এর স্মৃতি মুছে ফেলে, নতুন ও স্বচ্ছ প্রশাসন চাই। ইলিনা বলেছিল, ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্যও তো আমাকে টাকা দিতে হয়। আমাদের কোন কিছু সহজে মেলে না। দুর্নীতির প্রতি ঘৃণা ঝরছিল ওর কথায়।
আর হ্যাঁ, ‘রাশিয়া’ শব্দটা কেন যেন সাধারণ ইউক্রেনবাসীর খুব না-পসন্দ। যদিও পথে ঘাটে সব হোর্ডিং রুশ অক্ষরে লেখা। তবু, স্মৃতি থেকেও মুছে ফেলতে চান ওঁরা, রুশ প্রাধান্যের সোভিয়েট সরকার, এখনো ছায়ার মত উপস্থিত প্রবলপ্রতাপান্বিত শক্তি রাশিয়ার ছড়ি ঘোরানো।
যেটা তারা স্বীকার করে সেটা হল, হ্যাঁ, সাদাসিধে জীবনের একটা মান সোভিয়েত শাসন দিয়েছিল তাদের। খাওয়া পরার নিশ্চিত, খেলাধুলো করার সুযোগ। “সবকিছু ফ্রি” কিন্তু নিজের ইচ্ছে মত নয়, সরকারের ইচ্ছে মত। এমনকি কোন সিনেমা দেখবে কোন বই পড়বে তাও তো সরকারই অলক্ষ্যে ঠিক করে দিত।
কিন্তু মানুষ যে আরো কিছু চেয়েছিল। স্বাধীনতা নামে একটা শব্দ ওদের কাঁপায় আজও। তাই ওঁরা ধর্মাচরণের স্বাধীনতাকেও খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। প্রাচীর গির্জেগুলো লোকে লোকারণ্য থাকে। ফুল ধূপকাঠি মোমবাতির গন্ধে মদির থাকে গির্জে, রুমাল দিয়ে সন্তদের অস্থিধারকের কাচ মুছিয়ে দেয় ওরা। চোখ বুজে পূজা করে। সপ্তদশ বা উনবিংশ শতাব্দীর, বা আরো অনেক পুরনো গির্জেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ চোখে পড়ার মত। ঝকঝক করে পেতলের গম্বুজ।
অথচ পাশাপাশি কী বিবর্ণ সোভিয়েত আমলের “ইউটিলিটি” বাড়িগুলি, কারখানাগুলি। এখন সেই সব পুরনো বড় বড় ‘সোভিয়েত’ বাড়ি অনেকটাই ফেলে দেওয়া খেলনার মত, কালচে ধুলোমাখা, ফাঁকা অব্যবহৃত। অনুন্নত। পার্ক বা বিশাল স্টেডিয়াম রক্ষণাবেক্ষনের জন্য “সোভিয়েত” অর্থ আর নেই। সোভিয়েত আমলের মেট্রো খুব ভাল পোক্ত এক সিস্টেম, কিন্তু ভিড় উপচে পড়ছে। মাত্র দু-গ্রিভনিয়া ভাড়া। প্রথম বিশ্বের দেশে অকল্পনীয়। গত কুড়ি বছরে নতুন করে ঢেলে সাজানো হয়েছে সরকার, কিন্তু এখনো পুরনো সোভিয়েত অভ্যাসগুলো অটুট।
অনেক বৈপরীত্য, অনেক স্ববিরোধ। শুধু ইউক্রেন নয়, দেখেছি, অন্য দেশ, যেমন আর্মেনিয়া, উজবেকিস্তানেও তাইই চিত্রটা। পুরনো পরিচয়ের মধ্যে পথ হারানো, আত্মপরিচয় পাবার জন্য টান টান চেষ্টা। ফলত বিভ্রান্তি কিছুটা, কিছুটা অসহায়তা। নিজের দেশের আলাদা জাতিসত্ত্বা দাগিয়ে দেওয়ার জন্য পুরনো সংস্কৃতি, কৃষ্টিকে উঠিয়ে আনা। যা, ‘রুশ’ নয়। আমরা রুশ নই। ‘আমাদের রুশদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন আপনারা। ছিঃ।‘
ইলিনাই আবার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মারক মিউজিয়াম দেখাতে দেখাতে কী আনন্দে গর্বে সোভিয়েত সেনাবাহিনীতে ইউক্রেনের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেছিল আমাদের কাছে। মৃত সোভিয়েত সেনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল তো ইউক্রেনের ছেলেরাই ! এই দেখুন সেই ঘর, যেখানে সব মৃত ছেলেদের ছবি আছে। বিশাল হলঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত সুতো দিয়ে ঝোলানো পুরনো পোস্টকার্ডের মত হলদেটে ছবির সারি। সুররিয়ালিস্ট সিনেমার মত, ছবিগুলো হাওয়ায় দুলছে। ইউক্রেনের অহংকার এরা।
প্রাক সোভিয়েট অঞ্চলগুলির যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণ করবেন নিশ্চয়ই তাত্ত্বিকেরা। যে জটিলতাগুলো দুরূহ অধ্যয়নেরও বিষয়। সে অধিকারী আমি নই। আমার কেবল মনে পড়ছে ওই মুখগুলো। স্যুভেনির বিক্রি করা ছেলেটি অথবা গির্জেতে পাদ্রিসাহবের কাছে নিজের সন্তানকে ব্যাপটাইজ করাতে আসা বাবা-মা। মাথায় রুমাল বেঁধে নতমস্তকে লা-ওরা গির্জেতে বেজে চলা বিশাল পিতলের ঘন্টা ছুঁয়ে থাকা মেয়েরা।
যাঁরা নিজের দেশের কুড়ি বছরের স্বাধীনতার নিরীক্ষার ভেতরে, অথবা তার আগের সত্তর বছরের সোভিয়েত শাসনের স্মৃতির ভেতরে, অপেক্ষা করতে করতে ছটফট করছেন, কবে আসবে সত্যিকারের স্বাধীনতা। "



Avatar: Yashodhara Ray Chaudhuri

Re: রূপকথার চার দেশ

এই পরের লেখাটায় আগেরটার অনেক উপাদান রিপিট বা টুকলি হয়েছে। তবে, প্রশ্নটা হল, এক্স সোভিয়েট দেশগুলো যে রাশিয়ার ছত্রছায়া থেকে বেরোতে চায় , এটা আমাদের এই পঃবঃ কম্যুনিস্টদের ভীষণ বিচ্ছিরি লাগে। এই আবাপর লেখাটা বেরোনর পর পর এক বামপন্থী সংগঠনের অনুষ্ঠানে গেলাম, আর গিয়ে বেশ আক্রান্তও হলাম। ভারত সরকারও ত রাশিয়াকে এখনো বেশ পুজো করছে, কাজেই ইউক্রেনের পক্ষে মুখটি খোলেনি। আপনাদের অনেকেই ও সব দেশে গেছেন কর্মসূত্রে।।এ বিষয়ে আর একটু আলো দেখান।

Avatar: সিকি

Re: রূপকথার চার দেশ

যশোধরাদি, লেখা যখন পোস্ট করছেন, দেখবেন তার ঠিক ওপরে একটা ড্রপডাউন আসছে - অপশন থাকে, আগের লেখাটার সাথে অ্যাপেন্ড করতে চান, নাকি কমেন্ট পোস্ট করতে চান। আপনার ওপরের পোস্টগুলো লেখার নিচে কমেন্ট হিসেবে এসেছে - এটা আগের লেখার সাথে জুড়ে এলে ভালো লাগত।
Avatar: Biplob Rahman

Re: রূপকথার চার দেশ

চমৎকার ঝরঝরে লেখা। চারটি ভ্রমণকাহিনী নিয়ে চারটি আলাদা লেখা হলে আরো ভালো হতো। আর লেখায় প্রতি প্যারার মাঝে লাইন স্পেস থাকলে চোখের আরাম হয়।

এমন সরল লেখায় ভবিষ্যতে আরো বিস্তারিত খুটিঁনাটি সব বর্ণনা চাই। চলুক। :)
Avatar: Tim

Re: রূপকথার চার দেশ

কাজাখস্তানের কথা কিছু কিছু গত তিন বছরে যা দেখলাম, লিখি। আমার মনে হয়েছে (লোকজনের সাথে কথা বলে) যে এখানে মোটের ওপর পোলারাইজ্ড কেস। তরুণ প্রজন্ম রাশিয়ার ছায়া থেকে বেরোতে চায় ও আমেরিকা/ইউরোপ ঘেঁষা। পুরোনো প্রজন্ম রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে। এই টানাপোড়েন সরকার থেকে সাধারণ মানুষ প্রায় সর্বত্রই আছে টের পাই। একদল চাইছে রুবলের সাথে এই মাখামাখি, যা টেঙ্গ্যে কে ধ্বসিয়ে দিচ্ছে সেটা থেকে বেরোতে, অন্যদল চাইছে গুড ওল্ড ফ্রেন্ড রাশিয়ার সাথে এককাট্টা হয়ে থাকতে।
ইউক্রেন নিয়েও এই একই ব্যাপার। রাশিয়াপন্থীদের বক্তব্য অলমোস্ট পুতিনের বক্তিমের সাথে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাবে। সেইসঙ্গে তারা এটাও বলছে যে ইউএস/ইউএন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাশিয়া চিরকালই নিজেকে "ডিফেন্ড" করতে বাধ্য হয়েছে। অন্যরা যা বলছে তা মোটের ওপর সিএনেন/বিবিসিতেই পাওয়া যাবে।
কাজাখ প্রেসিডেন্ট রাশিয়াপন্থী, তাই মস্কোর সাথে গাঁটছড়া বেশ পোক্ত। উনি কিছুদিন আগেই জাতির উদ্দেশ্যে এক ভাষণে বলেছেন কাজাখদের কষ্টের ও সংগ্রামের দিনের জন্য তৈরী থাকতে, যে সচ্ছলতায় তারা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে গত কয়েক বছর তা বজায় নাও থাকতে পারে। রুবল ও তেলের এই খারাপ সময়েও অর্থমন্ত্রী বিবৃতি দিচ্ছেন যে কাজাখ সম্পদ অটুট আছে এবং ডিভ্যালুয়েশন প্রয়োজন নেই। সেই বিবৃতি আবার অন্যেরা মিথ্যে বলছে। আগের বছর ফেব্রুয়ারিতে একটা ডিভ্যালুয়েশন হয়েছিলো, যেদিন হয়েছিলো ঠিক তার আগের দিন সন্ধ্যেবেলা উনি এরকম একটা বিবৃতি দ্যান। একইসঙ্গে তরুণ মন্ত্রীরা ছক কষছে প্রেসিডেন্টকে রিটায়ার করিয়ে বিদেশনীতি পাল্টাতে। সব মিলিয়ে ঘেঁটে ঘ। পাতাল রেল নিয়ে কথা হচ্ছিলো দেখলাম। ঐ রেলের কাজ এখন স্থগিত, মূলত পয়সার জন্য। ২০১৭ সালে এক্সপো হবে, সেটা ভালোভাবে যদি উতরে যায়, আর মস্কো যদি তখনও ভালো থাকে তবে সেসব হবে।

রাশিয়ার ছায়া থেকে বেরোনো অত সোজা নয়। এই সেদিন ডেভিস কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলো কাঝাখরা। খেলোয়াড়দের প্রায় সবাই রাশিয়ান অরিজিন। আবার এদিকে এদের একটা বড়ো অংশ শাইনিং কাজাখদের কাছে ব্রাত্য মনে মনে ক্ষুব্ধ।
Avatar: Yashodhara Ray Chaudhuri

Re: রূপকথার চার দেশ

হ্যাঁ, তেলের জন্য রাশিয়া কাজাখস্তানকে খুব তেল দেয়, আর বাকি সব কিছুর জন্য কাজাখরা রাশিয়ার মুখ চেয়ে থাকে।।একই ধরনের পলিটিকস আর্মেনিয়াতেও আছে। আর্মেনিয়া আজেরবাইজানের আবার জাত শত্রুতা, যা শুনেছি...

লেখার সঙ্গে লেজুড় জুড়ে / লেখাটাকে এডিট করলে ভাল হত? কথোপকথনের ব্যাপারটা হারিয়ে যাবে না তাহলে?


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন