Punyabrata Goon RSS feed

[email protected]
Punyabrata Goonএর খেরোর খাতা।

আরও পড়ুন...
সাম্প্রতিক লেখালিখি RSS feed
  • ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা... বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তন হওয়ার দিন
    বিএনপি এখন অস্তিত্ব সংকটে আছে। কিন্তু কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। ক্ষমতার তাপে মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল দলটার। ফলাফল ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড মেরে হত্যার চেষ্টা। বিরোধীদলের নেত্রীকে হত্যার চেষ্টা করলেই ...
  • তোমার বাড়ি
    তোমার বাড়ি মেঘের কাছে, তোমার গ্রামে বরফ আজো?আজ, সীমান্তবর্তী শহর, শুধুই বেয়নেটে সাজো।সারাটা দিন বুটের টহল, সারাটা দিন বন্দী ঘরে।সমস্ত রাত দুয়ারগুলি অবিরত ভাঙলো ঝড়ে।জেনেছো আজ, কেউ আসেনি: তোমার জন্য পরিত্রাতা।তোমার নমাজ হয় না আদায়, তোমার চোখে পেলেট ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ২
    বার্সিলোনা আসলে স্পেনের শহর হয়েও স্পেনের না। উত্তর পুর্ব স্পেনের যেখানে বার্সিলোনা, সেই অঞ্চল কে বলা হয় ক্যাটালোনিয়া। স্বাধীনদেশ না হয়েও স্বশাসিত প্রদেশ। যেমন কানাডায় কিউবেক। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মনে হয় এরকম একটা জায়গা থাকে, দেশি হয়েও দেশি না। ...
  • বার্সিলোনা - পর্ব ১
    ঠিক করেছিলাম আট-নয়দিন স্পেন বেড়াতে গেলে, বার্সিলোনাতেই থাকব। বেড়ানোর সময়টুকুর মধ্যে খুব দৌড় ঝাঁপ, এক দিনে একটা শহর দেখে বা একটা গন্তব্যের দেখার জায়গা ফর্দ মিলিয়ে শেষ করে আবার মাল পত্তর নিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে ভোর রাতে রওনা হওয়া, আর এই করে ১০ দিনে ৮ ...
  • লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া
    -'একটা ছিল লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া।আর ছিল একটা নীল ঝুঁটি মামাতুয়া।'-'এরা কারা?' মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড়ো করে অদ্ভুত লোকটাকে জিজ্ঞেস করে।-'আসলে কাকাতুয়া আর মামাতুয়া এক জনই। ওর আসল নাম তুয়া। কাকা-ও তুয়া বলে ডাকে, মামা-ও ডাকে তুয়া।'শুনেই মেয়েটা ফিক করে হেসে ...
  • স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি
    স্টার্ট-আপ সম্বন্ধে দুচার কথা যা আমি জানি। আমি স্টার্ট-আপ কোম্পানিতে কাজ করছি ১৯৯৮ সাল থেকে। সিলিকন ভ্যালিতে। সময়ের একটা আন্দাজ দিতে বলি - গুগুল তখনও শুধু সিলিকন ভ্যালির আনাচে-কানাচে, ফেসবুকের নামগন্ধ নেই, ইয়াহুর বয়েস বছর চারেক, অ্যামাজনেরও বেশি দিন হয়নি। ...
  • মৃণাল সেন : এক উপেক্ষিত চলচ্চিত্রকার
    [আজ বের্টোল্ট ব্রেশট-এর মৃত্যুদিন। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যিনি সার্থকভাবে প্রয়োগ করেছিলেন ব্রেশটিয় আঙ্গিক, সেই মৃণাল সেনকে নিয়ে একটি সামান্য লেখা।]ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কীভাবে যেন পরিচালক ত্রয়ী সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এক বিন্দুতে এসে মিলিত হন। ১৯৫৫-তে মুক্তি ...
  • দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল পড়ে
    পড়লাম সিজনস অব বিট্রেয়াল গুরুচন্ডা৯'র বই দময়ন্তীর সিজনস অব বিট্রেয়াল। বইটার সঙ্গে যেন তীব্র সমানুভবে জড়িয়ে গেলাম। প্রাককথনে প্রথম বাক্যেই লেখক বলেছেন বাঙাল বাড়ির দ্বিতীয় প্রজন্মের মেয়ে হিসেবে পার্টিশন শব্দটির সঙ্গে পরিচিতি জন্মাবধি। দেশভাগ কেতাবি ...
  • দুটি পাড়া, একটি বাড়ি
    পাশাপাশি দুই পাড়া - ভ-পাড়া আর প-পাড়া। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের মধ্যে তুমুল টক্কর। দুই পাড়ার সীমানায় একখানি সাতমহলা বাহারী বাড়ি। তাতে ক-পরিবারের বাস। এরা সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত। দুই পাড়ার সাথেই এদের মুখ মিষ্টি, কিন্তু নিজেদের এরা কোনো পাড়ারই অংশ মনে করে না। ...
  • পরিচিতির রাজনীতি: সন্তোষ রাণার কাছে যা শিখেছি
    দিলীপ ঘোষযখন স্কুলের গণ্ডি ছাড়াচ্ছি, সন্তোষ রাণা তখন বেশ শিহরণ জাগানাে নাম। গত ষাটের দশকের শেষার্ধ। সংবাদপত্র, সাময়িক পত্রিকা, রেডিও জুড়ে নকশালবাড়ির আন্দোলনের নানা নাম ছড়িয়ে পড়ছে আমাদের মধ্যে। বুঝি না বুঝি, পকেটে রেড বুক নিয়ে ঘােরাঘুরি ফ্যাশন হয়ে ...


বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

শরাব-বন্দী আন্দোলনঃ দল্লী-রাজহরার অভিজ্ঞতা

Punyabrata Goon

দল্লী-রাজহরার ঠিকাদারী শ্রমিকদের মধ্যে বড়ো অংশটাই ছিলেন আদিবাসী, অল্প কিছু অ-আদিবাসী। আদিবাসীরা মদ খাওয়াকে অপরাধ বলে মনে করেন না। জঙ্গল থেকে মহুয়া কুড়িয়ে এনে তাঁরা ঘরে মদ চোলাই করেন। পারিবারিক যে কোনও অনুষ্ঠান, যে কোনও সামাজিক উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ মদ্যপান। স্ত্রী-পুরুষ, বয়স্ক-অল্পবয়স্ক—উৎসবে সবাই মদ খাবেন—এটাই রীতি।

এ রীতি ভেঙ্গে গিয়েছিল দল্লী-রাজহরায়। ’৭৭-এ ছত্তিশগড় মাইন্স শ্রমিক সংঘ ইউনিয়ন গঠনের আগে যেখানে প্রায় ৯৫% শ্রমিক মদের নেশা করতেন, সেই হার নেমে এসেছিল ৫%-এরও কমে। অথচ শংকর গুহ নিয়োগী শহীদ হওয়ার সময় অর্থাৎ ১৯৯১-এ এঁরা সারা ভারতের ঠিকাদারী খনি শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দৈনিক মজুরি পাওয়া শ্রমিক। কেমন করে এঁরা মদের নেশা ছাড়লেন তা নিয়েই আজকের কাহিনী।

আগেই বলেছি ১৯৭৭-এর আগে এই শ্রমিকরা বিভক্ত ছিলেন দুটো কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়নে। দিনে ১২ ঘন্টা অক্লান্ত পরিশ্রম করে মজুরি মিলত ৩ টাকা থেকে সাড়ে ৩ টাকা। পেটভরা খাবার, পরনের কাপড় জুটতো না, শ্রমিক পরিবারের শিশুরা স্কুলের মুখ দেখতে পারতো না।

’৭৭-এ অর্থনৈতিক আন্দোলনে প্রথম বিজয়ের পর দৈনিক মজুরি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৬ টাকা। শ্রমিকদের মজুরি-বৃদ্ধির প্রভাব পড়ল মদ বিক্রির ওপর। ১৯৭৬-’৭৭-এ দল্লী-রাজহরায় দেশী মদ বিক্রি হয়েছিল ২৪,৫৮৮ প্রুফ লিটার, ’৭৭-’৭৮-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫,৩০৪ প্রুফ লিটারে। নিয়োগী উপলব্ধি করলেন, শ্রমিক-নেতাদের বোঝালেন—যদি শ্রমিকদের মদের নেশা দূর না হয় তাহলে মজুরি বাড়লেও শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হবে না।

সিএমএসএস মদ্যপান-বিরোধী প্রচার শুরু করে। মদের শারীরিক, পারিবারিক ও সামাজিক কুপ্রভাবগুলো বোঝানোর জন্য ছোট ছোট সভা, প্রচার-পত্র, পোস্টার, ইত্যাদির সাহায্য নেওয়া হয়। শ্রমিকরা বুঝতে থাকেন, কিন্তু মদ খাওয়া ছাড়ানোর জন্য একটা ধাক্কার দরকার ছিল।

’৭৮-এ একটা ঘটনা ঘটে। শহর থেকে ৬-৭ কিলোমিটার দূরে একটা গ্রাম চিখলী, সেই গ্রামের একটা আদিবাসী পরিবার নিজেদের ব্যবহারের জন্য চোলাই করে কিছুটা মদ বানায়। আইন আদিবাসীদের মদ বানানোয় কিছু ছাড় দেয়—তাঁরা নিজেদের জন্য ঘরে মদ বানাতে পারেন, কিন্তু সে মদ বিক্রি করতে পারেন না। আদিবাসী যদি নিজের মদ নিজেই তৈরী করে নেন তাহলে মদের ঠিকাদারের দোকানের মদ কিনবে কে? তাই স্বভাবতই শরাব-ঠিকাদার চায় না যে আদিবাসীরা নিজেদের মদ নিজেরাই বানান। সে সময় দল্লী-রাজহরার শরাব-ঠিকাদার ছিল তৎকালীন শাসক দল কংগ্রেসের সদস্য, আবার স্থানীয় বিধায়ক (সে সময় রাজ্যের অর্থমন্ত্রী) ঝুমুকলাল ভেড়িয়ার খুবই ঘনিষ্ঠ। ঠিকাদার খবর পেয়ে চিখলী গ্রামের সেই আদিবাসী স্ব্বামী-স্ত্রীকে আবগারী পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করায়, তাঁদের ধরে আনা হয় ঠিকাদারের ঘরে। তাঁদের মারধোর চলতে থাকে, গায়ে এসিড ঢেলে দেওয়া হয়। স্বামী-স্ত্রীর আর্তনাদের আওয়াজ শুনতে পান মদ খেতে যাওয়া কিছু সিএমএসএস সদস্য। ইউনিয়ন দপ্তরে খবর পৌঁছয়। অল্প ক্ষণের মধ্যে কয়েক হাজার ভাটিখানা ঘিরে ফেলেন, গুন্ডাদের হাত থেকে স্বামী-স্ত্রীকে রক্ষা করেন। ঠিকাদার পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে বাঁচে।

বছর খানেক ধরে বারবার শ্রমিকরা নেতাদের মুখে শুনছিলেন যে পুঁজিপতিরা কিভাবে মদের মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষদের শোষণ করে। এই ঘটনায় তাঁরা প্রত্যক্ষ করলেন শোষণের নগ্নতম রূপ। এক সভায় হাজারো শ্রমিক শহীদদের নামে মদ ছাড়ার শপথ নেন। কিন্তু ছাড়ব বললেই কি মদ ছাড়া যায়? শ্রমিকরা নিজেরাই শপথ ভঙ্গকারীদের জন্য কিছু আর্থিক ও সামাজিক শাস্তি নির্ধারণ করলেন। কিছু শ্রমিক এমন ছিলেন যাঁরা মদের ওপর শারীরিক ভাবে নির্ভরশীল (physically dependant)—তাঁদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হল, তাঁদের পারমিট দেওয়া হতো, সেই পারমিট দেখিয়ে তাঁরা দোকান থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ মদ কিনতে পারতেন।

মদ ছাড়ানোর জন্য ছত্তিশগড় মাইন্স শ্রমিক সংঘ কতোগুলো অভিনব ব্যবস্থা নেয়, ব্যবস্থাগুলোকে কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিত
নারী শ্রমিক ও এলাকার মহিলাদের সংগঠন মহিলা মুক্তি মোর্চা—
• কাউকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া গেলে পরের দিন তাঁকে ইউনিয়ন অফিসে উপস্থিত মানুষ-জনের সামনে আধঘন্টা মদ্যপানের স্বপক্ষে ভাষণ দিতে বলা হতো।
• পুরুষ শ্রমিক মদ খেয়ে স্ত্রী-সন্তানদের মারধোর করলে তাঁরা ইউনিয়নে অভিযোগ জানাতেন। দোষীর বিচার করতেন মহিলা মুক্তি মোর্চার মুখিয়ারা—কখনও কখনও শাস্তি হিসেবে অর্থদন্ড করা হতো, অর্থের ৫-১০% ইউনিয়ন ফান্ডে জমা পড়ত, বাকীটা শ্রমিকের অজান্তে তাঁর স্ত্রীকে দিয়ে দেওয়া হতো।
• বারবার শপথ ভঙ্গ করলে শ্রমিককে খনির কাজ থেকে সাসপেন্ড করে ইউনিয়নের কাজে ডিউটি দেওয়া হতো।
• যাঁরা মদ ছাড়তে চাইছেন কিন্তু ছাড়তে পারছেন না, তাঁদের ইউনিয়ন নেতারা একটানা বেশ কিছুদিন সন্ধ্যাবেলা (মদ খাওয়ার সময়টা) নিজেদের সঙ্গে রাখতেন। এতে করে একদিকে মদ খাওয়ার সময় পেরিয়ে যেতো, অন্যদিকে নেতার জীবনযাত্রা-চিন্তাভাবনা-কাজকর্ম শ্রমিকের ওপর প্রভাব ফেলতো।
• মদ থেকে শ্রমিকদের দূরে রাখতে সন্ধ্যায় লোকগীতি, নাটক, ইত্যাদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মনোরঞ্জনের আয়োজন করা হতো।

এইসব ব্যবস্থায় কতোটা ফল হয় তার একটা ধারণা পাওয়া যায় ১৯৮২-তে প্রকাশিত পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিস (PUCL)-এর রিপোর্ট ‘জনবাদী আন্দোলন বনাম শরাব, পুঁজি ও হিংসা কী রাজনীতি’ থেকে। দেখা যায় ’৭৮ থেকে ’৮২-র মধ্যে দশ হাজারেরও বেশী মানুষ মদ ছেড়েছেন। ২০শে জানুয়ারী, ’৮১-তে এক সাংবাদিক দেখেন—যেখানে আগে পাক্ষিক বেতনের দিন দল্লী-রাজহরায় প্রায় ৫০০০ বোতল মদ বিক্রি হতো, সেখানে মাত্র ৪০-৫০ বোতল বিক্রি হচ্ছে। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখেন মদের দোকানের ঠিকাদার ১৬ লাখ টাকা দিয়ে মদের দোকানের ঠিকা নিয়েছিল, কিন্তু তার ২ লাখ টাকাও আয় হয়নি।

শাসকচক্র ও মদ-ব্যবসায়ীরা কিন্তু চুপ বসে থাকেনি। আন্দোলনকে ভাঙ্গতে ’৮১-র ১১ই ফেব্রুয়ারী ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি সহদেব সাহু ও সংগঠন সচিব শংকর গুহ নিয়োগীকে এনএসএ (National Security Act)-এ গ্রেপ্তার করা হয়। ’৮২-র ১৮ই এপ্রিল অখিল ভারতীয় নশাবন্দী পরিষদের দল্লী-রাজহরা শাখার সভাপতিকে ট্রাক চাপা দিয়ে মারার চেষ্টা করা হয়। এসব দমন-পীড়নে আন্দোলন ভাঙ্গেনি, বরং শ্রমিকরা আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন।

নিয়োগী এই আন্দোলনের ওপর শাসকদের আক্রমণের ধারকে ভোঁতা করতে গান্ধীবাদীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা অখিল ভারতীয় নেশাবন্দী পরিষদকে আন্দোলনের সমর্থনে যুক্ত করেছিলেন। পরিষদের নেত্রী সুশীলা নায়ার, পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মন্ত্রী ফরওয়ার্ড ব্লকের ভক্তিভূষণ মন্ডল আন্দোলনের সংহতি শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ান।

মদ্যপান-বিরোধী আন্দোলন যখন পুরোদমে চলছে তখন ১৯৮১-তে কিছু সমাজসচেতন তরুণ চিকিৎসক শ্রমিক সংঘের সঙ্গে কাজ করতে আসেন, যাঁদের কথা স্বাস্থ্য আন্দোলন প্রসঙ্গে বলেছি। এঁরা মদ্যপানের শারীরিক কুপ্রভাব সম্বন্ধে মানুষকে সচেতন করতে ছোট ছোট আলোচনাসভা চালান, পত্র-পত্রিকায় লিখতে থাকেন। ’৮০-র দশকের শেষে লোক স্বাস্থ্যশিক্ষামালার পুস্তিকা বেরোয়—‘মদ্যপান কে বারে মেঁ সহী জানকারী’। মদের ওপর শারীরিক ভাবে নির্ভরশীলদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে মদ ছাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ (অর্থাৎ যে সময় এই লেখাটা প্রথম লিখি)—দল্লী-রাজহরায় ঠিকাদারের মদের দোকান নেই, মদ বিক্রি হয় সরকারী দেশী মদের দোকানে। যে সামান্য কিছু মানুষ মদ খেতেন, তাঁরাও আন্দোলনের আগেকার মতো খোলাখুলি মদ খেতেন না বা নিয়মিত মদ খেতেন না। মদ্যপান এলাকার মানুষ সামাজিক অপরাধ বলে মনে করতেন। আশার বিষয় ছিল—পরবর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ সিএমএসএস-এর সদস্যদের সন্তানদের মধ্যে মদ্যপানের হার ছিল প্রায় শূন্য।

মদ্যপান বিরোধী আন্দোলনের প্রভাবে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হয়। ’৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় কাজের খোঁজে গ্রাম ছেড়ে চলে এসে যেসব মানুষ লোহাখনিতে ঠিকাদারী শ্রমিক হিসেবে ভর্তি হন, তাঁদের অধিকাংশ গ্রামে ভূসম্পত্তির অধিকারী হন। ব্যাংকে প্রত্যেকের সঞ্চয় জমে ওঠে। আগে শ্রমিকদের কাছে সাইকেল অবধি ছিল না, এখন সবার কাছে সাইকেল তো আছেই, অনেকে মোপেড, স্কুটার বা মোটরসাইকেল কেনেন। ২০-২৫ বছর আগে যাঁরা ট্রাকের ড্রাইভার হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছিলেন, অর্থ-সঞ্চয় করে তাঁদের অনেকে ট্রাকমালিক হন। শ্রমিক পরিবারের সন্তানরা প্রায় কেউই নিরক্ষর নন—এমনকি গ্র্যাজুয়েট, পোস্টগ্র্যাজুয়েট হয়েছেন কেউ কেউ। অনেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষক, সরকারী কর্মচারী। তহশীলদার, এমনকি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদেও দল্লী-রাজহরার শ্রমিক পরিবারের সন্তান পৌঁছান। শরাব-বন্দী আন্দোলন সত্যিসত্যি দল্লী-রাজহরার জীবনধারাকেই বদলে দেয়।

দল্লী-রাজহরার সফল আন্দোলন থেকে শিক্ষা নেন তেলেঙ্গানার সামাজিক আন্দোলনের সংগঠকরা, উত্তরপ্রদেশের উত্তরাখন্ড সংঘর্ষ মোর্চার সংগঠকরা—নিজেদের এলাকায় তাঁরা অনেক মানুষকে মদের নেশা থেকে মুক্ত করেন।

[ দুঃখের বিষয় হলো—নিয়োগীর মৃত্যুর পর পরবর্তী নেতৃত্বের বিচ্যুতি, মেশিনীকরণে সায় দিয়ে শ্রমিক সংগঠনকে অবলুপ্তির পথে নিয়ে যাওয়া—এসবের ফল দেখা যায় শরাব-বন্দী আন্দোলনেও। ২০০৭-এ দল্লী-রাজহরায় গিয়ে আমার নিজের কানে শোনা-চোখে দেখা—যাঁরা মদ ছেড়েছিলেন তাঁদের অনেকে, এমনকি ইউনিয়নের নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন তাঁরাও কেউ কেউ আবার মদ ধরেছেন হতাশা কাটাতে। শহীদ হাসপাতালে আমাকে অপারেশনে এসিস্ট করত যে যুবক, এক ল্যাবরেটরী টেকনিশিয়ান (গ্র্যাজুয়েট—যার বাবা শ্রমিক-গীতিকার, মদের বিরুদ্ধে অনেক গান লিখেছেন-গেয়েছেন যিনি)—এরা অবসর সময়ে মদ খায় অন্য কিছু করার নেই বলে। ]


285 বার পঠিত (সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে)

শেয়ার করুন


Avatar: বিভীষণ

Re: শরাব-বন্দী আন্দোলনঃ দল্লী-রাজহরার অভিজ্ঞতা

এক রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠার কারনে দল্লী-রাহজরা সম্বন্ধে কিছু জানতাম। আজ আরো একটি অসাধারন আন্দোলনের কথা জানলাম। এ প্রসঙ্গেই মনে উঁকি মারছে আর কিছু প্রশ্ন। স্বল্পবিত্ত শ্রমিক মহল্লার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মত মধ্যবিত্ত মহল্লাতেও মদ্যপানের একটা কালচার বহুদিন-ই রয়েছে। যে মধ্যবিত্ত যুব সমাজ (আমি নিজে যুবক বলে বোধহয় যুব সমাজ নিয়েই প্রশ্ন করতে বেশি আগ্রহী) একদিন সত্তরের দশকে দাপিয়েছিল, আজ সেই সমাজের এক বৃহৎ অংশ অবসর যাপনের হাতিয়ার করে নিয়েছেন ভদকা হুইস্কি সহযোগে বন্ধুবান্ধবের সাথে আড্ডা এনজয় করাকে। এমন কি, কখনো চোখে পড়ে রাজনীতি-সচেতনতাও এই সংস্কৃতির বাইরে বের করে আনছে না। প্রশ্ন হল দিন বদলের আদর্শের সঙ্গে এই কালচার কি আদৌ খাপ খায়? শুধু মদ্যপান নয়, টোট্যালিটিতে এই সংস্কৃতিকে দেখলে কী যুক্তিগ্রাহ্যভাবে পরিস্ফুট করা যায়, এ কালচার যেমন আন্দোলন বিমুখতার জন্য দায়ী তেমনি আবার দীর্ঘদিনের আন্দোলন বিমুখতার মানসিকতা এই সংস্কৃতির ভিত্তি দৃঢ় করছে? না কী এই সংস্কৃতির এমন সামর্থ্য আছে যে, এ জন্ম দেবে নতুন করে দিন বদলের নতুন স্বপ্ন দেখা? হয়তো সময়ের সামর্থ্য রয়েছে প্রশ্নগুলোর সঠিকতম উত্তর দেওয়ার। কিন্তু বহু্দিনের বহু আন্দোলনের আঁচে দৃঢ়, লেখকের অভিজ্ঞতার মাপকাঠিতে আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে খুব ইচ্ছে করছে।


আপনার মতামত দেবার জন্য নিচের যেকোনো একটি লিংকে ক্লিক করুন