দশটি বিধান


লিখছেন -- সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


কুড়ি-কুড়ি ক্রিকেটের মাঠে টু-পিস-পরিহিতা চিয়ারগার্লরা নাচিতেছে দেখিয়া অকস্মাৎ মরালিটির মেজদার ঘুম ভাঙিয়া গেল। চোখ খুলিয়া মেজদা দেখিলেন খেলাধুলা লাটে উঠিয়াছে। খেলার মাঠে উর্বশী-রম্ভারা শরীর খুলে নাচিতেছে, রেশম ত্বকে পিছলে যাচ্ছে আলো আর স্টেডিয়াম-ভর্তি ভুখা জনতা চোখ দিয়ে গপাগপ রেশমি কাবাব গিলছে। দিকে দিকে অনাচার। সোডোমি। হিপি-হিপিনি, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, সমকাম। পাঙ্ক কালচার, নুডিস্ট কলোনি, বিকিনি-বালিকা। দেশ জুড়ে নারীমাংসের মোচ্ছব। ভারতীয় সংস্কৃতির সাড়ে সব্বোনাশ। পাপের পাত্র উপচীয়মান, মানবকুলের আর রক্ষা নাই।

মেজদা-মোজেস পর্বতের দিকে তাকালেন। এই সেই আনএক্সপ্লোরড সিনাই পর্বত, যার এক লক্ষ একুশ হাজার কন্দরের কোনো একটিতে ঈশ্বর তথা কালচার-কাকুর বাস। মেজদা তাঁকে খুঁজতে গেলেন। কড়কড় বাজ পড়িল, কুকুর-বিড়াল বৃষ্টি হইল। পরিচালক কাট বলিলে কালচার-কাকু মেজদাকে একটি শিলালিপি দিলেন। চিয়ার-গার্ল তথা সামগ্রিক নৈতিক অধ:পতনের হাত থেকে ভারতীয় সংস্কৃতিকে রক্ষা করিবার দশটি উপায় তাতে খোদাই করা আছে। বিশ্বের ইতিহাসে পরবর্তী কালে ইহাদের দশটি বিধান বলা হবে।

মেজদা শিলালিপি লইয়া জনসমাজে এলেন। মানবমুক্তির সকল উপায় আমার হাতের মুঠোয়, বলে লেকচার দিলেন। জনতা হাততালি দিল। মেজদা বলিলেন, এই দশটি বিধান মেনে চলা ও প্রচার করা, সকল মানুষের কর্তব্য। অন্যথায় ঈশ্বর উহাদের পাপ দিবেন। শাস্তি দেবেন। অতএব, জনহিতার্থে, সেই দশটি বিধান এখানে প্রকাশ করা হল। এই সেই দশ বিধান, যা ভারতীয় সংস্কৃতিকে কু-আচার ও নৈতিক অধ:পতন থেকে রক্ষা করবে। এই সেই দশ বিধান, যা, জগতে নারীর সম্মান ফিরিয়ে আনবে। এই সেই দৈব প্রেসক্রিপশন, যা, ভারতীয় জনতাকে নরকের অতলে শীঘ্রপতনের হাত থেকে রক্ষা করবে। হে ভারতবাসী অবোধ বালক ও বালিকাবৃন্দ, এই বিধানগুলি পড়ুন ও অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলুন। ইহকালে সুখ পাবেন। পরকালে শান্তি।

১। হিন্দি হোক বা ইংরিজি। বলিউডি হোক বা হলিউডি। সিনেমা দেখবেন না, দেখতে দেবেন না। দেখিলে ঈশ্বর আপনাকে বাম্বু দিবেন। বিকিনি পরা আইটেম-নায়িকাদের খুঁটি ধরে নৃত্য বয়কট করুন। পপকর্ন খাবেন না, শনিবারের বারবেলায় বৌ বাচ্চা ও হারমোনিয়াম বগলে আইনক্সে ঢুঁ মারবেন না। অল্টারনেটিভলি দক্ষিণেশ্বর যান, বেলুড় যান, কালীঘাট যান, যেখানে খুশি যান, শুধু দয়া করে জাহান্নমে যাবেন না।

২। বাড়িতে টিভি চালাবেন না। চালালেও শুধু নিউজ চ্যানেল দেখবেন। ফ্যাশান টিভি হল থ্রি এক্স। এম টিভি অপসংস্কৃতি। দেখবেন না। সাবানের বিজ্ঞাপন দেখলেই টিভি বন্ধ করে দেবেন। ওগুলো নারীশরীরের আখড়া। টিভিতে বিপাশা বসুকে দেখলেই পিছন ঘুরে বসবেন। চটুল শব্দ কানে ঢুকলে মিউট বাটন প্রেস করুন। অন্যথায় জোরে জোরে রামনাম জপ করতে পারেন।

৩। বই পড়বেন না। পড়লেও শুধু বর্ণপরিচয় আর সহজ পাঠ পড়বেন। আর কিচ্ছু না। বাকি সর্বত্র নারীশরীরের রগরগে বর্ণনা। কবিতার নামে পর্নোগ্রাফি। গদ্যের নামে নারীশরীরের পণ্যায়ন। কালিদাস কুমারসম্ভব লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথের কবিতার নাম "স্তন', জীবনানন্দে স্রেফ "নগ্ন নির্জন হাত' টাইপের বেলেল্লাপনা। সন্দীপন? "আমি কারো চোখের দিকে আজ পর্যন্ত চাইনি। পরিচিত, অর্ধপরিচিত, অপরিচিত, অনেকের দিকে চেয়ে দেখেছি। কারো কারো ঠোঁট, নিতম্ব, স্তন, কারো-বা নগ্ন হাত আমার ভাল লেগেছে'। ছ্যা: ছ্যা:। "মালবিকা, তোমার স্তন দাও, দুই হাতে মাখামাখি করি', কে যেন লিখেছেন? যেই লিখে থাকুন, ঠিক করেননি। এসব বুলশিট পড়বেন না। পড়তে দেবেন না।

৪। খবরের কাগজ মানেই পেজ থ্রি। পেজ থ্রি মানেই নায়িকাদের হাফ-নেকেড ছবিছাব্বা। পত্রপত্রিকা মানেই প্লেবয়ের মাসতুতো ভাই। ডেবোনিয়ারের ভাইপো। ওসব পড়বেন না। একে তো বেবিফুডের বিজ্ঞাপনে গামছা পরা নারীশরীরের উপদ্রব। ক্লিভেজ দেখিয়ে মডেলদের পোজ। সাহিত্যের ইলাস্ট্রেশনের নামে যত্রতত্র ন্যাংটো মেয়েমানুষের ছড়াছড়ি। তারপর গপ্পে কবিতায় রগরগে যৌনতার বর্ণনা। "গাঢ়নীল/স্তনতিল/মিডিয়া দেখেছে'। এইসব। কারণে অকারণে শুধু মেয়েদের শরীর। স্তন, উরু,গুরুনিতম্ব, এইসব। মনে রাখবেন, এসব স্রেফ পুরুষতন্ত্রের কারসাজি। নারীকে পণ্য বানানোর চক্কর। নইলে পুরুষের দাড়ি আর রোমশ শরীর নিয়ে কোনো লেখা হয়না কেন? খুলে যাওয়া লুঙ্গি আর ধুতির ফাঁকে দেখা যাওয়া ঠ্যাং নিয়ে কোনো মহাকাব্য নেই কেন? "পুরুষ তোমার লিঙ্গ/সুউচ্চ এক শৃঙ্গ' টাইপের কবিতা কেউ কখনও লিখেছে কি? ঈশ্বর বলেছেন পুরুষতন্ত্রের এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে গর্জে উঠুন। হালুম।

৫। আঁতলামি করবেন না। লম্বা দাড়ি রেখে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আনসেন্সরড মেয়েমানুষের ছবি দেখা বন্ধ করুন। ফিদা হুসেন ন্যাংটো স্বরস্বতীর মূর্তি আঁকলে ইট মারুন। ল্যাজ লাগিয়ে ত্রিশুল নিয়ে তাড়া করুন। ভারতছাড়া করে দুবাইয়ে পাঠিয়ে দিন। সাত্যকি ঘোষের মতো কিছু ফটোগ্রাফার মেয়েদের ন্যাংটো করে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করান। উল্টে-পাল্টে-আর্চ করিয়ে ছবি তোলেন। এসব বেলেল্লাপনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তুলুন। অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে, লড়তে হবে এক সাথে। সিনেমার বদলে রামানন্দ সাগরের রামায়ণ দেখুন। ছবি তুলতে হলে প্রকৃতির শোভার ছবি তুলুন। আঁকতে হলে লেবু-কলা-আপেলের স্টিল লাইফ আঁকুন। আবার কি?

৬। চটুল গান-বাজনা শোনা বন্ধ করুন। মিউজিক ভিডিওতে অশ্লীলতার চাষ হচ্ছে। নাচ-গানের নামে নারীমাংসের দোকান দেওয়া হচ্ছে। মাংস কেটে বিলি করা হচ্ছে। যুবসমাজকে মদ-গাঁজা- নারীশরীর দেখিয়ে মোহগ্রস্ত রাখার চক্রান্ত চলছে। গানের নামে চলছে অভব্যতা। কি সব গানের ভাষা। "চোলির পিছনে কি'। সিনেমার নাম মিনিস্টার ফাটাকেষ্ট, আর তাতে উর্ধ্বাঙ্গ ও নিম্নাঙ্গে দুখানা সোনালি কাপড়ের টুকরোর প্রহসন পরে আইটেমগার্ল গাইছে "ও আমি পারিনা যৌবন সামলাতে/ধুকুপুকু বুক কাঁপে শুধু যে রাতে'। ছি:। শুধু মেনস্ট্রিম না, আঁতেল গানেও অভব্যতার ছড়াছড়ি। "মাঝরাতে নাইটি পরে পোয়েট্রি আসিবে'। "ভিডিও ক্যাসেটে আর নীল সোফাসেটে বসে মিঠে খুনসুটি'। ব্যান্ড থেকে কবীর সুমন, আঁতেল থেকে জীবনের গান, সব বন্ধ করুন। ভারতীয় সংস্কৃতির ধ্বজা উর্ধ্বে তুলে ধরুন।

৭। ইন্টারনেট দেখবেন না। ইয়াহু খুললেই স্ক্রিনের কোণে সুইমসুটের ছবি। মাংসের বিক্রিবাটা চলছে। গুগল খুললেই পিকচার সার্চের অপশন। নষ্ট মেয়ের পষ্ট ছবি। ইউটিউব আর গুগল ভিডিওতে নারীশরীরের নিশির ডাক। মোহময়ীর হাতছানি। ভার্চুয়াল ঝারিবাজি। স্ট্রিপটিজ। বেলিড্যান্স। এই অভব্যতা থেকে নিজেকে রক্ষা করুন। মেল বক্স থেকে ডিলিট করুন যাবতীয় নিষিদ্ধ পাপ। ইন্টারনেট কানেকশন কেটে দিন। নচেৎ ঈশ্বর ক্রুদ্ধ হবেন।

৮। মনে রাখবেন, নারীর শরীরের প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি আলোছায়া, প্রতিটি খাঁজ, গালের টোল, নিটোল গ্রীবা, ইত্যাদি সব সুন্দর জিনিসগুলিই পুরুষের কারসাজি। পুরুষতন্ত্রের পাপ। লোমশ শরীরে গরিলার হাঁটা আর কাঁখে কলসী নিয়ে কুসুমকুমারীর কোমরদুলুনির মধ্যে যদি কোনো তফাৎ লক্ষ করেন, তো সে আপনার চোখের দোষ। কপালের টিপ থেকে কানের পাশে ঝুলে থাকা এক গোছা চুল, ভ্রুভঙ্গী থেকে নিষিদ্ধ উপত্যকা, সোজা বাংলায় সৌন্দর্য বলতে যা-যা জেনেছেন, সব আসলে নোংরামি। কায়দা করে শরীর বেচার ছক। এই চক্রান্ত থেকে নারীশরীরকে রক্ষা করুন। পাইকিরি রেটে বোরখা পরুন(নারী হলে) ও পরান(পুরুষ হলে)।

৯। কি বললেন? অ্যাদ্দিন আপনি হিন্দি সিনেমা দেখেছেন? হলিউডি লাভসিন উপভোগ করেছেন? টিভি দেখেছেন? খবরের কাগজ পড়েছেন? পত্রিকায় চোখ বুলিয়েছেন? ইন্টারনেট সার্ফ করেছেন? মেয়ে হয়ে বোরখা না পরে বেরিয়েছেন? ছেলে হয়ে মা-বোনকে বোরখা না পরে বাইরে বেরোতে দিয়েছেন? সর্বোপরি আইপিএল এ চিয়ার ললনাদের নাচ দেখে সিটি দিয়েছেন? পাপ করেছেন। অবশ্যই পাপ করেছেন। তবে ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই। ঈশ্বর ক্ষমাশীল। একবার তিনি সমস্ত পাপের বোঝা নিজের কাঁধে নেবেন। আপনাকে ক্ষমা করবেন। তবে একবারই। বার-বার নয়। যা করেছেন করেছেন। এবার পাপ বন্ধ করুন। নইলে ঈশ্বর শাপ দেবেন। অধ:পতিত ইসরায়েল বাসীদের মতো আপনি, আপনার চোদ্দগুষ্টি সেই পাপ, সেই শাস্তির আগুনে জ্বলে-পুড়ে খাক হবেন। ইহকালে কনসেন্টেশন ক্যাম্পে আর গ্যাস চেম্বারে গিয়ে পটল তুলবেন। পরকালে তেলের কড়াইয়ে অনন্তকাল ভাজাভাজা হবেন। ঈশ্বর আপনাদের সুমতি দান করুন।

১০। মনে রাখবেন, পুণ্যে পাবেন রসমালাই, পাপের বেতন রামধোলাই। পাপ করলে রেহাই পাবেন না। ঈশ্বরকে আপনি না দেখতে পারেন, ঈশ্বর কিন্তু আপনাকে দেখছেন। কালচারকাকুর নিযুত চোখ, কোটি কোটি হাত। তিনি নিজে না থাকলেও তাঁর প্রতিনিধিরা সর্বত্র বিদ্যমান। সুভাষ চক্কোত্তি থেকে অমর সিং, শিবসেনা থেকে সিপিএম, এই মরালিটির মেজদারা ঈশ্বরের ডান ও বাঁ হাত, তাঁরা সর্বত্র বিদ্যমান। ঈশ্বরের প্রতিনিধি। এঁদের মেনে চলুন। জল উঁচু বললে দল বেঁধে হোপ এইট্টি সিক্সে যান, জল নিচু বললে কোয়েনা মিত্তিরকে অপসংস্কৃতি বলুন। তক্কো করবেন না। এই দশটি বিধান মেনে চলুন। বড়দার এঁটো খান। মেজদার অনুমতি নিয়ে হিসি করতে যান। কথা শুনুন। ইহকালে শান্তি পাবেন, পরকালে অক্ষয় স্বর্গবাস। স্যাটিসফাকশান গ্যারান্টিড।