খবর্নয় (জানুয়ারী ৬)


লিখছেন --- দ্বৈপায়ন বসু


আপনার মতামত         


আবহাওয়া দপ্তর
-----------------
ঝড়, বৃষ্টি বা যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের হুঁশিয়ারী দেওয়াটা আবহাওয়া দপ্তরের একটা বড় কাজ। কিন্তু কতটা নিখুঁত ভাবে তাঁরা আগাম খবর দিতে পারেন এই ব্যপারে? পরিসংখ্যান বলছে যে, আবহাওয়া দপ্তরের ফোরকাস্ট মোটেই খুব একটা নির্ভরযোগ্য নয়। আমাদের কোলকাতার আবহাওয়া দপ্তরের কথা তো ছেড়েই দিলাম, অতি উন্নত দেশের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, ডপলার রাডার, সুপার কম্পিউটারেরও সাফল্যের হার শতকরা ৬০% এর বেশী নয়। সেখানে কোনো মানুষ যদি দাবী করেন যে এই সমস্ত অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই ওয়েদার ফোরকাস্ট করে দেবেন তিনি, এবং তার সাফল্যের হার ৮৫% এরও বেশী, তবে কেমন লাগবে শুনতে?

ঠিক এমনটাই দাবী নর্থ ডাকোটার এক বাসিন্দা, পল স্মোকভের। ৮৪ বছরের বয়সের এই বৃদ্ধের দাবী যে তিনি প্রায় নিখুঁত ভাবে বলে দিতে পারেন আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি। তবে এই কাজে তাঁর দরকার হয় শুয়োরের প্লীহা। চমকাবার কিছুই নেই, পলএর রান্নাঘরে গেলেই দেখা যাবে যে দেয়াল থেকে ঝুলছে খানদুই শুয়োরের প্লীহা। সে দুটি দেখে পল বলেছেন যে এই বছরটা মোটামুটি ভালোই যাবে। কোনো বড়সড় দুর্যোগ আসবে না তাঁদের অঞ্চলে। পল নিজে ১৭৫০ একর বড় একটি খামারের মালিক। এছাড়াও তাঁদের খামারের আশেপাশে ছড়িয়ে আছে আরো অনেকগুলো খামার। এত বড় বড় খামার দেখাশোনা করার জন্য ঐ অঞ্চলের প্রায় প্রত্যেকের দরকার হয় আগে থেকে আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি জানার। এই ব্যপারের তাঁর সমস্ত প্রতিবেশীদের সাহায্য করেন পল। খামারের শুয়োরের প্লীহার চেহারা দেখে বলে দেন কতটা পাল্টে যেতে পারে আবহাওয়ার মর্জি। প্লীহার যে অংশটি পাকস্থলীর সাথে যুক্ত থাকে, সেই অংশ টি যদি চওড়া হয়, এবং তারপর যদি প্লীহা ক্রমশ সরু হয়ে আসে, তাহলে তার অর্থ দাঁড়ায় যে শীতকাল আসবে অনেক আগেই, এবং বসন্ত হবে খুব ছোট। কিন্তু যদি এর উল্টোরকম হয় প্লীহার চেহারা, তবে তার মানে দাঁড়ায় যে সেই বসন্তে আবহাওয়া হবে খুব খারাপ। এই বছরে পল যে সমস্ত শুয়োরের প্লীহা দেখেছেন সেগুলো বেশীর ভাগ একরকম, খুব একটা সরু বা চওড়া নেই সেগুলোতে। তাই এই বছরে আবহাওয়ায় কোনো বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা বেশ কম।
পলের এই ওয়েদার ফোরকাস্টিং এর খবর Old Farmer's Almanac এর সম্পাদিকা জ্যানিস কে জানানো হলে তিনি বলেন যে এই পদ্ধতিটি খুবই পুরনো পদ্ধতি। আগে অনেক মানুষ পারতেন এই ভাবে ওয়েদায় ফোরকাস্ট করতে। আজকাল এনাদের সংখ্যা কমে গেছে খুব। আর খুব আশ্চর্য ব্যপার হলো যে, এদের ফোরকাস্ট বেশীর ভাগ সময়ে মিলেও যেত।

পল কে এই ব্যপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান যে, এই বিদ্যা তিনি শিখেছেন তার বাবার কাছ থেকে। প্রায় ১০০ বছর আগে ইউক্রেন থেকে এদেশে চলে আসেন পলের বাবা। সেই সময়ে না ছিল ওয়েদার স্টেশান, না ছিল টিভি চ্যানেল। ফলে আবহাওয়ার ব্যপারে তাঁদের এক মাত্র ভরসা ছিল এই আদিম পদ্ধতি। এমন কি এই গ্রামে ইলেকট্রিক্সিটি আসে ১৯৪৯ এ, ফলে রেডিওতেও ওয়েদার ফোরকাস্ট শোনার উপায় ছিল না পলের। তাই পুর্বপুরুষের অধীত বিদ্যা দিয়েই কাজ চালাতেন তিনি। এখনো তিনি ভরসা করেন সেই পুরনো পদ্ধতি তেই। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে National Weather Service সম্প্রতি জানিয়েছে, এই বছর ডাকোটার শীতকালীন আবহাওয়া মোটামুটি ঠিকঠাক থাকবে। কোনো বড় পরিবর্তন আসবে না। অর্থাৎ এবারেও মিলে যেতে চলেছে পল স্মোকভের ভবিষ্যৎবাণী।

লেনিনের মেরুকরণ
------------------
গত দেড় মাস ধরে নরওয়ে এবং আমেরিকার যৌথ উদ্যোগে একদল বিজ্ঞানী তাঁদের রুটিন অভিযান চালাচ্ছিলেন দক্ষিণমেরু তে। প্রতি বছরের শেষেই এই অভিযান চালানো হয় একবার করে। অভিযানের লক্ষ্য থাকে বছরের শেষ দিনে পৃথিবীর দক্ষিনতম বিন্দুকে নতুন করে চিহ্নিত করা, কারণ বড় বড় হিমবাহ গুলোর চলাফেরার দৌলতে প্রতি বছরই পাল্টে যায় পৃথিবীর দক্ষিণতম বিন্দুর অবস্থান। এবছরের এই অভিযান ও চলছিল যথারীতি নিয়মমাফিক ভাবে। বিপুল বরফের পাহাড় ভেঙে আর সমুদ্র পেরিয়ে বিজ্ঞারীরা এগোচ্ছিলেন মেরুর দিকে। এই সময়ে বহু দুর থেকে তাঁদের চোখে পরে যে মেরুর কাছাকাছি দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত চেহারা, উত্তর দিকে মুখ ফেরানো আছে তার, ভঙ্গিটাও বড্ড বেশী রকম চেনা। শুরু হয় জল্পনা, কল্পনা। অবশেষে সব সমস্যার সমাধান হয় সপ্তাহ দুয়েক বাদে।

দু' সপ্তাহ পরে, যখন বিঞ্জানীরা ঐ অঞ্চলে পৌঁছান তখন দেখেন যে তাঁদের সন্দেহ একেবারে সঠিক। দক্ষিণমেরুর, বিশাল বরফের রাজ্যে, প্রায় বরফ ঢাকা হয়ে দাড়িয়ে আছেন রুশ বিপ্লবের প্রাণ পুরুষ লেনিন। সমুদ্র তল থেকে ৩৭১৮ মিটার উঁচুতে, দক্ষিণমেরুর সুদূরতম বিন্দুতে লেনিনের আবক্ষ মুর্তি রয়েছে বসানো। মস্কোর দিকে ফেরানো আছে তাঁর মুখ। যথারীতি তৎপরতা শুরু হয়ে যায় বিজ্ঞানীদের মধ্যে। কি ভাবে ঐ মুর্তি ওখানে এলো তা জানার জন্য শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। ৮২ ডিগ্রী ৬ মিনিট দক্ষিণ এবং ৫৪ ডিগ্রী ৫৮ মিনিট পুর্বে খুঁজে পাওয়া যায় এক বহু পুরনো রাশিয়ান বেস স্টেশান। ১৯৫৮ র ডিসেম্বর নাগাদ এই অঞ্চলে আসেন কিছু রুশ বিজ্ঞানী। তারাই এখানে বানিয়েছিলেন সেই বেস স্টেশান, আর মস্কোর দিকে মুখ করে বসিয়েছিলেন লেনিনের বিশাল আবক্ষ মুর্তি। প্রথম দিকে মনে করা হচ্ছিলো যে মুর্তিটি হয়তো মার্বেলের তৈরী , কিন্তু পরে দেখা যায় যে ওটি তৈরী হয়েছে প্লাস্টিক দিয়ে। তাই এত বছরেও খুব একটা ক্ষতি হয়নি মুর্তিটির। নরওয়ের বিশেষজ্ঞরা জানান যে ঐ অঞ্চলটি হলো অস্ট্রেলিয়ান জোন। প্রচন্ড দুর্গম হওয়ার কারণে ওখানে অভিযাত্রীরা খুব কম যান। তাই এত বছর ধরে কেউ লক্ষ্য করেন নি আবক্ষ লেনিনকে। যাই হোক, লেনিনের মুর্তি খুঁজে পাওয়া ছাড়াও, বিজ্ঞানীরা সফল হয়েছেন তাঁদের মুল লক্ষ্যে। পয়লা জানুয়ারীর দিন তাঁরা চিহ্নিত করতে পেরেছেন পৃথিবীর দক্ষিণতম বিন্দুকে। এই বছর প্রায় ১০ মিটার মতন সরে ছিল পৃথিবীর দক্ষিণমেরু।

Guiness is good for you
-----------------------------

গিনেস কম্পানির এই বিখ্যাত স্লোগানটা মনে পড়ছে কি? ১৯২০তে তৈরী হওয়া সেই স্লোগান, আর তার সাথে গিলরয়ের আঁকা সেই বিখ্যাত ছবিগুলো। গিনেস খেলে নাকি শরীর ভাল থাকে, গিনেস নাকি রক্ত পরিষ্কার রাখে। এমনই সব দাবী উঠেছিল বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে। আর তার ফলেই তৈরী হয়েছিল গিনেসের সেই বাজার মাতানো স্লোগান। এক সময় তা এতই বিখ্যাত হয় যে ইউরোপে ব্লাড ডোনারদের গিনেস খেতে দেওয়া শুরু হয় ব্লাড ডোনেশানের পর। এমনকি গর্ভবতী মহিলাদেরও প্রেসক্রিপশানে থাকতো গিনেস। কিন্তু তারপর সময় বদলালো, চললো অনেক মামলা মোকদ্দমা। শেষে কয়েক দশক আগে গিনেস কোম্পানি তুলে নিলো তাদের ব্র্যান্ড স্লোগানটাকে। অ্যালকোহলের মতন ক্ষতিকর জিনিসকে স্বাস্থ্যকর বলে প্রচার করার দোষ চাপলো গিনেসের ঘাড়ে।

কিন্তু এতদিনে মনে হয় গিনেসের সেই বিখ্যাত স্লোগানটা সত্যি হওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সম্প্রতি University of Wisconsin এর বিশেষজ্ঞরা জানালেন যে গিনেস খাওয়ার অভ্যাস হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে। কারণ গিনেসের মধ্যে থাকা কিছু অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ব্লাড ক্লট হতে দেয় না। সাধারণত রক্ত পরিবাহী ধমনীগুলোতে যদি কোনো ভাবে ব্লাড ক্লট করে যায়, তবে সেই ব্যাক্তির হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বেড়ে যায় প্রচন্ড ভাবে। এই ধরনের সমস্যায় সাধারনত অল্পমাত্রার অ্যাসপিরিন দেয়া হয় রোগীকে। অ্যাসপিরিন রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না। কিন্তু গবেষণায় প্রকাশ যে সেই একই কাজ করতে পারে গিনেস। মোটামুটি এক পাঁইট মতন গিনেস যদি প্রতিদিনের খাওয়ার সাথে খাওয়া যায় তাহলে ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা কমে যাবে খুব। সুস্থ থাকবে হৃদয়।

Wisconsin এর গবেষকরা পরীক্ষা চালান অন্যান্য বীয়ারের ওপরেও, কিন্তু শুধুমাত্র গিনেসেই রয়েছে এই আশ্চর্য্য গুণ। তবে গিনেসের এই নতুন গুণপনায় মোটেই খুশী নন অনেকে। এই ধরনের গবেষণা মানুষের মাদক নেওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দেবে বলেই তাঁদের বিশ্বাস। এমনকি Diageo কোম্পানী, যাঁরা এখন গিনেস বানান, তারাও গিনেসের এই নতুন খুঁজে পাওয়া গুণ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজী নন। তবে গিনেস প্রেমিকদের মনে হয়তো ফের ফিরে ফিরে আসছে সেই লাইনগুলো,
Toucans in their nests agree
Guinness is good for you
Try some today and see
What one or toucan do.

জানুয়ারী ৬, ২০০৮