সিকো


লিখছেন -- সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


কানে স্ট্যান্ডিং ওভেশন পাবার পর, অবশেষে আমেরিকা জুড়ে শুভমুক্তি পেতে চলেছে, মাইকেল মুরের নবতম ছবি সিকো। এবার তিনি আক্রমণ করছেন আমেরিকার হেলথ কেয়ার সিস্টেমকে। এবং সেই নিয়ে যথারীতি আমেরিকা তোলপাড়। চ্যানেলে চ্যানেলে মাইকেল মুর। ওপ্রা উইনফ্রির সঙ্গে মাইকেল মুর। সরকার আপনার বিরুদ্ধে তদন্ত করছে, ভয় পাচ্ছেন? সুইট একটি হাসি হেসে মাইকেল জানালেন নট অ্যাট অল। সানফ্রানসিস্কোয় দশ হাজার নার্স মিছিল করছেন স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে। সঙ্গে কে? কে আবার, মাইকেল মুর। বিভিন্ন টক শো তে উপস্থিত হবার ফাঁকে টুক করে ডেমোক্র্যাট নেতাদের সঙ্গে এক আধখানা মিটিং সেরে নিচ্ছেন, কে আবার মাইকেল মুর।

আমেরিকার স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং তার তুরীয় মুডের মুরীয় সমালোচনা সম্পর্কে আলোকপাত করার জন্য এই কূটকচা৯ ফাঁদা হয়নি। এখানে বলার কথা একটাই, যে, খেয়াল করুন, মিডিয়ার এই প্রবল হুল্লোড়, ছাপাখানা সেলুলয়েড আর ডিজিট্যাল মিডিয়ার এই সমবেত ভুতনৃত্যের উপলক্ষ্য একটিই, একটি তথ্যচিত্র এবং কেবলমাত্র একটি তথ্যচিত্র। কোনো আইটেমনৃত্য নেই, অ্যাকশন নেই, নাচা নেই গানা নেই, সুপারস্টার নেই, এমনকি সে অর্থে কোনো স্টোরি লাইনও নেই। এবং তা সত্ত্বেও সিনেমাটি আগামী কয়েকমাস ধরে আমেরিকার বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে রমরমিয়ে চলবে। না: গ্রীষ্মের দুপুরের সুখস্বপ্নবিলাস নয়, মুরের আগের সিনেমাতেও এই একই জিনিস আমরা দেখেছি। পক্ষে বিপক্ষে যে যেদিকেই থাকুক, গোটা আমেরিকা এবং গোটা দুনিয়া হাঁ করে দেখেছে একটি তথ্যচিত্র, যার নাম ফারেনহাইট নাইন ইলেভেন।

এই সাফল্যের রাজ কি? কি সেই অপূর্ব হ্যামলিনের বাঁশির যাদু, যাতে শুক্কুরবারের সাঁঝবেলায় পার্টি ও পরচর্চা ছেড়ে যুগল ও প্রৌঢ়রা উঁকি মারছেন অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহের আনাচে কানাচে? সুধী বুদ্ধিজীবীরা গোটা দুনিয়া জুড়েই বহু বছর ধরে আমাদের শুনিয়ে আসছেন, সিরিয়াস জিনিসের আর বাজার নেই। এখন নিশ মার্কেটের নিশি ডাকের যুগ। গোপাল পড়াশুনা করিবে, আর রাখার চরাবে গরু। অ্যাকাডেমিকরা তত্ত্বালোচনা করিবেন, আর পাবলিক গিলবে নুন শো'র মোহিনী মায়া। এই হল ভবিতব্য। তদুপরি বিগত কয়েক দশকে নাকি আরেকটি বিষবৃক্ষের জন্ম হয়েছে, যার নাম নিউজ চ্যানেল। আজকাল নাকি হরর ফিল্মেও ভিড় হয়না, অ্যাকশন পিকচার দেখে বেরিয়ে এসে জনতা বলে, ধুস এটা ঠিক সিএনএন এর মতো ভালো না। এখন নিউজ চ্যানেলের কাল, হাতে গরম ভায়োলেন্সের যুগ। রিয়েলিটি শো। ফাঁসিতে সাদ্দাম ঝুলে পড়ছেন, প্রায়-লাইভ দেখা যাচ্ছে ইন্টারনেটে। ইরাকের হাসপাতালে বোমবাওয়ালি লাইভ টেলিকাস্ট করছে বিবিসি, ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া মানুষ শেষ নি:শ্বাস ফেলার আগে শেষ কামড় দিয়ে যাচ্ছেন মিডিয়াকে। ডিনার টেবিলের পারিবারিক মিলনোৎসবে ঢুকে পড়ছে গাজা স্ট্রিপের গুলিবিদ্ধ তরুণীর লাশ, সাঁঝের ককটেল পার্টিতে যাবার আগে তিয়েন আন মেন স্কোয়ারে ট্যাঙ্কের সামনে দুহাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়া ছেলেটিকে দেখতে দেখতে প্রেমিককে চুম্বন করছে লম্বাচুলের মেয়েটি। গোল্ডেন গেট ব্রিজ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করার ছবি তুলবেন বলে দুবছর ধরে ব্রিজের পাশে ক্যামেরা বসিয়ে রাখছেন পরিচালক। এইসব।

এমতাবস্থায়, রিয়েলিটি যখন ঘরে ঘরে, তখন হাইফান্ডা ফিল্মি তত্ত্ব নিয়ে মাথা ঘামাবে কোন আহাম্মক? ধোঁয়া-ধোঁয়া নদীর পাড়ে ছিরকুটে বৃদ্ধ উবু হয়ে বসে, তারপরেই জাম্পকাটে অন্ধকার ঘরে প্রদীপ নিভিয়া গেল, এবার অন্ধকারে পাবলিক যা বুঝবি বুঝে নে, পয়সা দিয়ে এসব হাইফান্ডা বুলশিট দেখার চেয়ে টিভির পর্দায় চোখ রাখা ভালো যেখানে পরিষ্কার এবং লাইভ দেখা যাচ্ছে, এই উড়ে গেল প্যালেস্টাইনে হামাসের দপ্তর, লাইভ চিল্লাচ্ছেন গাজা স্ট্রিপের সন্তানহারা বৃদ্ধা, কথা না বোঝা গেলেও কিসু যায় আসে না, কারণ কিছু কিছু অভিব্যক্তি ভাষার অধিক -- এই খুল্লমখুল্লা রিয়েলিটি , যা ভিভিড এবং ক্লিয়ারকাট, তার কাছে কোথায় লাগে আর্ট ফিলিমের সংগ্রামী অভিনয়?

তো, প্রশ্ন হল পৃথিবীজোড়া এই কেলোর কীর্তি, যাকে পন্ডিতরা বলবেন বিশ্বপরিস্থিতি, তার মধ্যে মাইকেল মুরের সাফল্য কি ভাবে ফিট করে? শিল্পগুণ? পলিটিকাল বক্তব্য? গুলি মারুন। এর থেকে ঢের বেশি শিল্পসম্মত এবং পলিটিকালি কারেক্ট জিনিসপত্র বাজারে বেরিয়েছে, লোকে জাস্ট খায়নি। প্রচার? প্রোপাগান্ডা? উঁহু। ফারেনহাইট নাইন এলেভেনের এতোখানি বাণিজ্যিক সাফল্যের পরও এবারের ফিল্মটি অর্থাৎ সিকোকে ইনসিওর করতে রাজি হয়নি আমেরিকার কোনো প্রথম সারির ইনসিওরেন্স কোম্পানি, শেষমেশ ক্যানসাস সিটির একখানি অখ্যাত ইনসিওর‌্যান্স কোম্পানি রাজি হওয়ায় রক্ষা। আসলে অন্যকিছু নয়, মাইকেলের পদতলে বসে যেটা শেখা উচিত তাবৎ বুদ্ধিজীবীকুলের, সেটা হল তাঁর ভাষা। ভাষা মানে শিল্পভাষা নয়, নিউজ চ্যানেলের ভাষা। রিয়েলিটিকে নিয়ে ডিল করার পদ্ধতি। নিউজ চ্যানেল কি রিয়েলিটি দেখায়? না। তারা রিয়েলিটি দেখানোর ভান করে। রিয়েলিটি শো গুলি কি রিয়েল? না। তারাও এডিটেড। কেয়ারফুলি কেয়ারলেস। মাইকেল মুর এই পদ্ধতিটিকে নিজের মতো কপি করে তুলে এনেছেন তথাকথিত সৃষ্টিশীল ফিল্মমেকিং এর মধ্যে। কিভাবে?

এক। উনি তথ্যচিত্র বানাচ্ছেন, ফিচার ফিল্ম নয়। এমনিতে ডকু বা ফিচারের সীমারেখা খুব ডিফাইন্ড নয়, মাইকেলের নিজে নিজের সিনেমাকে বলেন "মুভি', সিনেমাগুলোকে পার্সোনাল ফিল্ম বললেও চলে, কিন্তু দুনিয়া জানে উহারা ডকুমেন্টারি। কেন ডকু? না, সেটা রিয়েলিটির কাছাকাছি, কোনো বানানো গপ্পো নয়। সত্যি সত্যিই ডকুমেন্টারি রিয়েলিটির কাছাকাছি আর বাকিরা দূরবর্তী কিনা সে আলোচনায় মারুন গুলি, জনতা জানছে "সত্য ঘটনা' নিয়ে ডকু, যেন ঘটনাস্থল থেকে বিবরণ দিচ্ছেন সিএনএনএর সাংবাদিক। ব্যস।

দুই। লক্ষ্য করুন ন্যারেট করার পদ্ধতি। বলার ধরণ। যা ফর্মাল এবং ইনফর্মালের খুব কেয়ারফুলি বানানো এক মিক্সচার। ন্যারেট করার ধরণটি ফরমাল, তথ্যচিত্রের মতো, কিন্তু বাকি বহু জিনিসই ইনফর্মাল। ক্যামেরার সামনে মাঝে মাঝেই চলে আসেন স্থূলকায় মাইকেল মুর, এবং তাঁর আচার আচরণ, মাঝে মাঝে ক্যাবলার মতো তাকানো, ঘটনার সামনে বিমূঢ় হয়ে যাওয়া,সঙ্গে ক্যামেরার একটু নড়ে যাওয়া, নিউজ রিলের ধাঁচে অ্যাঙ্গেলের একটু এদিক ওদিক হয়ে যাওয়া, দর্শককে আশ্বস্ত করে, যে তারা রিয়েল ফুটেজ দেখছে, কোনো বানানো চিত্রনাট্য নয়। কিন্তু এতদ্‌সত্ত্বেও, ফিল্মটি আদতে এডিটেড, কারণ সব মিলিয়ে তা স্মার্ট। এখানে সিরিয়াসনেসের সঙ্গে মিশে আছে হিউমার, ঠিক যেখানে দর্শককে একটু রিলিফ বার দরকার, সেখানে একটু রিয়েল ফুটেজ দেখিয়ে রিলিফ দেওয়া হচ্ছে, কোনোরকম "আমি সিরিয়াস সিনেমা বানাচ্ছি তুই দেখবিনা মানে?' ধরণের কলার চেপে ধরার অ্যাটিটিউড নেই।

তিন। সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট, ডকুতে রিয়েলিটিকে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। ইনজেক্ট করা হচ্ছে। ডকুর প্রয়োজনে তৈরি করা হচ্ছে রিয়েলিটিকে। রজার অ্যান্ড মি স্মরণ করুন। সিইও রজার সাহেবের সঙ্গে মিট করতে গেলেন মাইকেল। দেখা হলনা। সেটাই সিনেমা। দেখা করার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইতে যাচ্ছেন মাইকেল, সঙ্গে ক্যামেরা। সিকিউরিটিকে এড়িয়ে এলিভেটারে উঠে পড়তে চাইছেন, ক্যামেরা সেই দৃশ্য ধরছে। চিত্রনাট্য না বানিয়ে স্রেফ ক্যামেরা নিয়ে রিয়েলিটিকে ফেস করা হচ্ছে। এডিটিং টেডিটিং পরে দেখা যাবে, এমন একটা ভাব। ঠিক একই জিনিস দেখা যাবে ফারেনহাইট নাইন ইলেভেনে, যখন মার্কিন সংসদের বাইরে সেনেটারদের ধরে ধরে মাইকেল উদ্বুদ্ধ করবেন, যেন তাঁরা নিজেদের সন্তানদের যুদ্ধে পাঠান। শেষকালে সেনেটাররা এড়িয়ে যাবেন, জনৈক সেনেটার মাইকেলকে দেখে পালাচ্ছেন, ছবিতে দৃশ্যটি দেখে প্রতিটি প্রেক্ষাগৃহে হাসির হিল্লোল উঠেছিল। ফুটেজটি "রিয়েল'। লক্ষ্যণীয়, যে সিরিয়াস বিষয়ের মধ্যে রিয়েলিটি এখানে আসছে রিলিফ হিসাবে।

সেই একই জিনিস আরও একটু বড়ো স্কেলে আমরা দেখব সিকোতে। মাইকেল দেখাচ্ছেন, নাইন ইলেভেনের রেসকিউ ওয়ার্কাররা অনেকেই টক্সিক জিনিসপত্র ঘেঁটে প্রবল ভাবে অসুস্থ। ইনসিওর‌্যান্স না থাকায় অনেকেরই চিকিৎসা ঠিকঠাক হচ্ছেনা। অন্যদিকে গুয়ান্তানামো বে তে নাইন ইলেভেনের "ষড়যন্ত্রকারী'রা অনেকেই বন্দী। মাইকেল খোঁজ নিয়ে জানলেন, তারা রাষ্টের খরচে চিকিৎসা পাচ্ছে। অতএব, চলো গুয়ান্তানামো বে। একদল অসুস্থ রেসকিউ ওয়ার্কারদের নিয়ে ক্যামেরা বগলে বোট ভাড়া করে মাইকেল চললেন গুয়ান্তানামো বে। সিনেমায় দেখা যাবে, বোট থেকে মাইকেল চোঙা ফুঁকছেন, বিচিত্র সব দাবীদাওয়া নিয়ে। যথা, সন্ত্রাসবাদীদের যদি রাষ্টের খরচে চিকিৎসা দেওয়া হয়, তাহলে এই লোকগুলিকেও দেওয়া উচিত। বলা বাহুল্য বিবেকসুলভ এই কমিকাল আচরণের পরেও তাঁদেরকে নামতে দেওয়া হয়নি সেখানে। অতএব কি করা, বোট ঘুরিয়ে লোকজন নিয়ে মাইকেল সোজা চলে গেলেন কিউবার মূল ভুখন্ডে, সঙ্গে অবশ্যই ক্যামেরা। সেখানে এইসব লোকেদের চিকিৎসা হবে টবে, সঙ্গে আসবে মাইকেলের রাজনৈতিক বক্তব্য।

এই সেই পদ্ধতি, যেখানে রিয়েলিটিকে তৈরি করেন মাইকেল, যা নিউজ চ্যানেলের ঘরাণা দিয়ে শুরু করেও তাকে অতিক্রম করে যায়। চলে যায় ডাইরেক্ট ফিল্মের টেরিটোরিতে। গুয়ান্তানামো বে তে নৌকা নিয়ে পাড়ি দেওয়ার ফুটেজটি "রিয়েল', কিন্তু সেই রিয়েলিটিকে আগে থেকে ডিজাইন করতে হয়েছে। ম্যানুফ্যাকচার করতে হয়েছে। কোনো নিউজ চ্যানেলের বাবারও ক্ষমতা ছিলনা এই এক্সক্লুসিভ খবরটি আগেভাগে পরিবেশন করার। সেইখানেই মাইকেলের জিত। চব্বিশ ঘন্টার নিউজ চ্যানেল জনতার সংবেদনশীলতা আর সিরিয়াসনেসের বারোটা বাজালো গো বলে কান্নাকাটি না জুড়ে মিডিয়ার কায়দা ব্যবহার করেই তাকে টেক্কা দেওয়া। মিগুয়েল লিতিনের কথা আমরা জানি, ডাইরেক্ট ফিল্মের কথাও জানি। পরিস্থিতি ভিন্ন, কিন্তু কায়দা একই। দুনিয়া যদি মিডিয়ার কল্যাণে সুররিয়েল হয়ে ওঠে, রিয়েলিটিই যদি হয়ে ওঠে ভার্চুয়াল, তবে কান্নাকাটি নয়, ক্যামেরা বন্দুক বা খাগের কলম নিয়ে সিধে দুনিয়ার সামনে দাঁড়ান।চিত্রনাট্য নয়, তৈরি করুন পাল্টা রিয়েলিটি। দুনিয়া বাপবাপ করে দেখবে।

মাইকেল মুর বা মিগুয়েল লিতিনের কাছ থেকে আমাদের পন্ডিতমশাইদের শেখার যদি কিছু থাকে, সেটা এইটুকুই।



২৩শে জুন,২০০৭