কোফু লশেমির সিনেমা


লিখছেন -- রঙ্গন


আপনার মতামত         



কোফু লশেমি বিশুদ্ধ সিনেমায় বিশ্বাস করেন। তাই কিছু বেয়াড়া সিনেমা ফ্যনাটিক বাদে তাঁর সিনেমা কেউ দেখে নি। কোফু লশেমির সিনেমা যখন দেখানো হয় তখন পর্দাটাকে রাখা হয় হলের মাঝখানে। আর তাকে ঘিরে গোল হয়ে চেয়ারে দর্শক বসে থাকেন। তবে চেয়ারগুলো যেন গায়ে গায়ে না থাকে। দুজন দর্শকের মধ্যে ন্যূনতম দূরত্ব প্রায় তিন ফুটের মত। ন্যাড়া হলঘরে মধ্যে একটা পর্দা রেখে সিনেমা দেখা প্রায় তন্ত্রাভ্যাসের পর্যায়ে চলে যায়। বিখ্যাত ফিল্ম সমালোচক জারিদে কাদা এই সিনেমা সম্পর্কে বলেছেন: " Here cinema is not an art from but a ritual, not an expression but a blank, not something to marvel at, but something to have intercourse with '.

কোফু লশেমির জন্ম এবং বাল্যকাল নিয়ে খুব কম জানা যায়। এইটুকু শুধু শোনা যায় যে খুব সাধারণ ছাত্র ছিলেন। হিসাবশাস্ত্র নিয়ে কলেজে পড়াশোনা করেন। কিন্তু এই সময়ে তাঁর ফিল্মের প্রতি কোনো ঝোঁক দেখা যায় না। শুধু অবসর সময়ে তিনি মন দিয়ে সংখ্যাতঙ্কেÄর চর্চা করতেন। তাঁর বিশেষ প্রিয় বিষয় ছিল গোল্ডবাখ'স কনজেকচার।

(যারা গোল্ডবাখ'স কনজেকচার জানেন না তাদের জন্য: দুইয়ের থেকে বড়ো যে কোনো জোড় সংখ্যা হল দুইটি মৌলিক সংখ্যার যোগফল।)

তিনি প্রথম সিনেমা করতে উৎসাহ পান তাঁর মায়ের লেখা রান্নার ডায়েরি পড়ে। তাতে রন্ধনপ্রণালী ছাড়া আর কিছু লেখা ছিল কিনা জানা যায় না, কারণ তাঁর মা একটি সুপ্রাচীন জাপানী লিপিতে তাঁর ডায়েরি লিখেছিলেন, যে লিপির রহস্য লশেমির মায়ের মৃত্যুর সাথে সাথে হারিয়ে গেছে। কিন্তু এই ডায়েরি যে সিনেমার জন্ম দিল, সিনেমার ইতিহাসে তা দিক্‌চিহ্ন বলা যায়- Insult and the Making of the Gay Self ।

Insult and the Making of the Gay Self প্রথম সিনেমা যেখানে প্রায় রন্ধনপ্রণালীর মত করে সিনেমাটা বানানো হয়। কিন্তু সে এক অপূর্ব চিত্রিত রন্ধনপ্রণালী! চেরিগাছের পাতার পিছনে দুই বৃদ্ধ গো খেলেন, পাইকারী মাছের বাজারে বসে থাকা একটি বাচ্চা মেয়ের হাতে ময়ূরের পালক, প্রথাগতভাবে সুমো কুস্তিগিরেরা বসে চা খায়, পাশে পড়ে থাকে অজস্র হিংস্র মাঙ্গা। কিন্তু একটি ছবির প্রবাহের পর্ব শেষ হলেই পর্দায় দর্শকদের নির্দেশ দেওয়া হয় কোনো একটা কিছু করার জন্য। সেই কর্তব্য কাজটি অবশ্যই শারীরিকভাবে অত্যন্ত কষ্টকর। এইভাবে ধাপের পর ধাপ পেরোতে পেরোতে সিনেমা যখন অন্তিমে গিয়ে পৌঁছায়, তখন আর দর্শকের দেহবোধ নেই। ঠিক যেমন আরতির তুমূল নাচের পরে ঘর্মাক্ত দেহ ধোঁয়াঢাকা মূর্তিতে প্রায় মিশে যায়, ঠিক সেইভাবে পর্দার ছবি দর্শকের সাথে মিশে যেতে থাকে।

Insult and the Making of the Gay Self দেখার পর বিখ্যাত কবি গ্রেগরি কর্সো লশেমিকে নিয়ে একতি কবিতা লেখেন।

" I see this silver line from your eyes into mine

On top of the world
with a fix
others

and you would run around the corner
to the mother of Lashemic

And your gay eyes closed
behind a lens

you're on camera , darling
wow , wow , wow

Got anything to show me?
I'll stick it on film
darling '

লশেমির দ্বিতীয় সিনেমার প্রিন্ট জাপানের ফিল্ম আর্কাইভ থেকে রহস্যময়ভাবে উধাও হয়ে যায়। লশেমিকে অজস্রবার জিজ্ঞাসাবাদ সঙ্কেÄও লশেমি এই ফিল্মটি নিয়ে মুখ খুলতে চান নি। লশেমির সিনেমাতে সিনেমার কোনো বিষয় নির্দিষ্ট করে বলা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু মোটের উপর যা জানা যায়, এই ফিল্মে মূল চরিত্র হিসাবে অভিনয় করে(?) বিভিন্ন পুরুষের বিভিন্ন আকারের লিঙ্গ এবং অন্ডকোষ। সম্রাট হিরোহিতো, আকিরা কুরোসাওয়া এবং বিভিন্ন সুমো মল্লবীরের কন্ঠস্বর ব্যবহার করে ডাবিং সম্পন্ন করা হয়। এই সিনেমাতেই লশেমি দর্শকদের বিভিন্ন নির্দেশ দেওয়া বন্ধ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে এই সময়েই লশেমি রিন আসানো নামে এক জাপানী ব্যবসায়ী ভদ্রমহিলার প্রেমে পড়েন। তবে রিন আসানো একটি দুর্ঘটনায় দুটি পা হারিয়ে ফেলায় লশেমি রিন আসানোর ব্যবসার ভার গ্রহণ করতে বাধ্য হন।

যদিও লশেমি কোনোদিন প্রকাশ্যে স্বীকার করেন নি, কিন্তু অনুমান করা হয় যে এইসময় তিনি গ্রিগরি ইয়াফিমোভিচ নামের এক রাশিয়ান তন্ত্রগুরুর শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। খুব সম্ভবত:, লশেমির দ্বিতীয় সিনেমা প্রদর্শনের সময় তার সাথে গ্রিগরির সাক্ষাৎ হয়। অন্যদিকে লশেমি তাঁর স্ত্রীর মিরিনের ব্যাবসায়ে দারুণভাবে সফল হন। একদিকে স্ত্রীর অসুস্থতা, অন্যদিকে মিরিনের ব্যবসায়ে সাফল্য এবং হঠাৎ সিনেমা তোলা বন্ধ হয়ে যাওয়া তাকে গ্রিগোরির গোপন তন্ত্রের দিকে আরও ঠেলে দেয়। কিন্তু এঁর ফলে দর্শকেরা এক অত্যাশ্চর্য সিনেমা লাভ করেন, যা আপাতত: লশেমির শেষ পূর্ণ দৈর্ঘ্যের সিনেমা। সিনেমাটির নাম: " Observations on the Feeling of the Beautiful and Sublime ' ।

গ্রিগোরির কোনো একটি মন্ত্র পুরো সিনেমাটিতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিজিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যে ছবিগুলি ব্যবহার করা হয় এবং দর্শকদের যেভাবে বসানো হয়, তাতে কোনো একপ্রকার হিপ্নোটিক আবেশ তৈরি হয়। কারণ কোনো দর্শক সিনেমা দেখে বেরিয়ে এসে সিনেমা হলে কি হয়েছিল ঠিকঠাক গুছিয়ে বলতে পারেন নি। এই সমস্ত কারনে জাপান সরকার এই সিনেমার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি বসায়। কিন্তু সেই কমিটির রিপোর্টে লশেমিকে সমস্ত অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি দেওয়া হয়। লশেমির থেকে দর্শকের আরও প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তদন্ত কমিটিরে রিপোর্ট বেরোবার পরেই আসানোর তিন ভাই অভিযোগ আনেন যে লশেমি এবং আসানোর বিয়ে বেআইনী এবং লশেমিকে ব্যব্‌সার মালিকানা থেকে বঞ্চিত করা হোক। জাপানের আদালত এই অভিযোগ মেনে নেন এঅবং লশেমিকে ব্যবসার মালিকানা ছাড়তে হয়। আসানো এবং লশেমি দুজনে এর পরেই মঙ্গোলিয়ায় গ্রিগরির আশ্রমের চলে যান। সেখানেই আপাতত: তারা আছেন বলে জানা যায় এবং এর পরে লশেমির আর কোনো সিনেমার খবর পাওয়া যায় নি।

------------------------------------------------------------------------

এই ধ্যাষ্টামির বিভিন্ন রেফারেন্সগুলো দিয়ে দিই:

১) কোফু লশেমি=মিশেল ফুকো
২)জারিদে কাদা=জাক দেরিদা
৩) Insult and the Making of the Gay Self = মিশেল ফুকোর উপর লেখা বই; লেখক Eribon Didier
৪)গ্রেগরি কর্সো: অ্যালেন গিন্‌স্‌বার্গের সমসাময়িক বিখ্যাত বিটনিক কবি
৫)কবিতাটি: কবিতাটি অ্যান্ডি ওয়ারহলের উপর লেখা একটি কবিতা। শুধু Warhola শব্দের পরিবর্তে Lashemic কথাটা ব্যবহার করা হয়েছে।
৬) রিন আসানো: রিন আসানো মাঙ্গা, অর্থাৎ জাপানী কার্টুনের একটি জনপ্রিয় চরিত্র।
৭)গ্রিগরি ইয়াফিমোভিচ: রাসপুটিনের পুরো নাম গ্রিগরি ইয়াফিমোভিচ রাসপুটিন।
৮)মিরিন: একধরনের হালকা জাপানী মদ।
৯) Observations on the Feeling of the Beautiful and Sublime : ইমানুয়েল কান্টের লেখা একটি দর্শনের বই


জুন ১০, ২০০৭