ঘরে ফেরার গান


লিখছেন -- অর্পণ


আপনার মতামত         


অনেক মানুষের মত মুকেশ আজকাল ঘরে ফেরে খুব ক্লান্ত চরণে, সঙ্গী তার সবজি বিক্রির নিজস্ব ঠেলাখানি। খুব ভোরে দিন শুরু হয় তার, দক্ষিণ দিল্লীর উপান্তে তার ঘিঞ্জি বাসা। সেখান থেকে এক ঘন্টা দূরে পাইকারি বাজার, সেখান থেকে আরো এক ঘন্টার পথ সবজিমান্ডি। এই তার চেনা পৃথিবী এবং এর বাইরেও যে আরেকটা পৃথিবী আছে, প্রতিদিনের চেনা পৃথিবীর বাইরের সেই পৃথিবীটা তাই কখন দ্রুত পালটাতে শুরু করেছিল মুকেশ টের পায়নি । পাবার কথাও নয়। অথচ রোদের তাপ বাড়তে থাকলে একসময় সে বাধ্য হয়ে ছায়া অনুসন্ধান করে এবং অনেকের মত জানতে পারে রাস্তার উল্টোদিকে নতুন রিটেল চেনের কথা, সেখানে ঠাণ্ডাঘরে সবজি জমানোর কৌশল, উপভোক্তাদের বদলে যাওয়া পছন্দ এরকম কিছু দরকারি অদরকারি কথা। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। সম্বল বলতে পড়ে থাকে তাদের ছেড়ে আসা গ্রামের বাড়ি। তাদের ঘর। আহা। সেখানে ফেরার আবছা পথ, বিনির্মাণকামী।

শুধু মুকেশরাই ঘরে ফিরছে তাই না, জানা গেছে খুব সাম্প্রতিক কালে আমেরিকা থেকে ঘরে ফিরেছেন ষাটহাজার ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী। আরো জনতা ফিরবেন বলে প্লেনের টিকিট কিনতে লাইন লাগিয়েছেন। এই নবীন যুবার দল ঘরে ফিরছেন নতুন স্বপ্নের মায়াঞ্জন চোখে। সুদূর তেপান্তরের শাইনিং ইন্ডিয়ার প্রাচীন কমণ্ডলু থেকে বেরিয়ে এসেছে জিনের বাদশা, আশ্চর্য ভোজবাজিতে তৈরী হচ্ছে নয়নাভিরাম মায়াপুরী, বিপণন মল, রাতারাতি গজিয়ে উঠছে ঝাঁচকচকে উপনগরী। সেই পরিকথায় ডানা মেলে উড়ে চলে ঘরের পানে জাদু কার্পেট, উত্তেজক চাকরির প্যাকেজ, নিছক মধ্যবিত্ত থেকে আরো উঁচুতে অনেক উঁচুতে ডানায় রোদের গন্ধ মেখে নেয় চিল। ঘরে ফেরে সফল মাঝবয়সী মেধারা। ঘরেরই অমোঘ টানে।

মগজে কারফিউ ঠেলে কত মানুষ খুঁজতে থাকে ফেলে আসা ঘরের ঠিকানা, সতত, মানসপটে আঁকা কপোতাক্ষ নদের তীরে। নতুন কিছু গড়বার স্বপ্ন পেরিয়ে এসে খেয়াল ছিল না এতদিন আজ রয়ে গেছে শুধু তার অবশেষ। তাই কী অচেনা ঠেকে যখন বহুদিন পরে মনে পড়ে যায় প্রতিবাদের ভাষাও হতে পারে এমন স্বতস্ফূর্ত। এমন অরাজনৈতিক প্রশ্রয়ে। জানা ছিল না নিজেদের মত করে জন্ম নিতে পারে এমনভাবে আমাদের অপমান, হীনমন্যতা ও ক্লীবতার সন্তানগুলি। জন্মনিরোধক না ব্যবহার করা হেতু জন্মানো অগুণতি সন্তান। এলোমেলো। কিন্তু নিজেদের মত করে সুন্দর। নতুনভাবে আবার ঘরে ফেরার তাগিদ অনুভব করি আমরা। নিজের কাছে। নিজের ঘরে। রাজনৈতিক শরণার্থী হয়ে বাঁচার দিন কি শেষ হল এই খানিক বিষণ্ন প্রায়শ্চিত্তে?

এরই মাঝে ঘরে ফিরবে বলে মানুষ অপেক্ষা করে থাকে অন্য কোথাও। বারুদের গন্ধের মাঝে পাত পড়ে গণখিচুড়ির, কাটা হয় পরিখা। পত্রপত্রিকার কভারে বেরোয় তাদের ছবি। কুমীরছানার মত প্রদর্শনীও চলে শহরের রাজপথে। এইসব প্রান্তিক মানুষজনের ভবিষ্যতের কথা ভেবে শহুরে বাবুবিবিরা গলা ফাটান, যাদের জমি যাবে না কোনদিন, পুড়বে না যাদের বাস্তুভিটে, লেখা হয় দিস্তা দিস্তা প্রবন্ধ। তালেগোলে মহানগরের বুকে সর্বদলীয় বৈঠকের আয়োজনও হয়, জলভরা তালশাঁস ও সুগন্ধী দার্জিলিং চা সহযোগে, থাকে না সেখানে স্বজন হারানো ঘর খেদানো মানুষজনেরা কেউ, যাদের ঘরবাড়ি জীবিকা ফিরিয়ে দেবার জন্য এত আয়োজন।

সব পাখি ঘরে ফেরে, সব নদীও ফেরে উৎসমুখে, ফুরালে সব কথামালা। ঘরে ফেরে একবিংশ শতাব্দীর ক্লান্ত শ্রমিকের পাল, রাতদুপুর হলে, ধ্বস্ত শরীর মনে জাগে না উল্লাস। ঘরে ফেরে ভ্রাম্যমাণ দেহপসারিণী, শহর ছাড়িয়ে শহরতলিতে তার ঘর, লাস্ট লোকাল ট্রেনে ফুরায় জীবনের সব লেনদেন। ঘরে ফেরে দিওয়ানা, লাস্টসিনে তুমুল শিসধ্বনিতে ভেঙ্গে যায় দেশকালের সীমানা। ঘরে ফেরেন প্রতিবেশী দেশের নেত্রী, ফিরে আসে পরিযায়ী মেঘ, বিকিয়ে যাওয়া কিশোরী, ফেরে রূপোলি ইলিশের ঝাঁক। তবুও সুভাষ আজো ঘরে ফেরে নাই। ফিরলো না আরো কারা যেন এখনো।

ত্রাণশিবির আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অধিবাসীরা এখনো কি ভরসা খোঁজেন দিনে আর রাতে?