বই বৈ তো নয়


লিখছেন বৈজয়ন্ত চক্রবর্ত্তী


আপনার মতামত         


লক্ষ্য করে দেখবেন, ইদানীং বঙ্গীয় মধ্যবিত্ত সমাজের (মধ্যবিত্ত বোল্ড এবং আন্ডারলাইন সমেত) যাবতীয় তক্কোবাজির শুরু হয় আবেগ দিয়ে, তারপর ঢোকে সি পি এমাদি, এবং শেষে নির্জলা খেউড়। সিঙ্গুর-নন্দীগেরাম, সি এ বি নির্বাচন থেকে বইমেলা- সবেতেই মোটামুটি একই প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। বলতেই পারেন যে "তুমি কোতাকার কোন হনু এলে বাওয়া যে গাছের ডালে ন্যাজ ঝুলিয়ে জ্ঞান মারাচ্চো?" আম্মো আলাদা কিছু নই। সেই আবেগ, সি পি এমাদি এবং খেউড়। তবে
জিনগত মর্ষকামিতার জন্য খালি আয়নায় তাকাই আর দেখি নৈনিতালের একটা ভ্যাদভেদে পুরোনো আলু। তো এই আলুকিত সমাজের জ্ঞানীজনেরাই যখন এই সব বাচালতা পড়ে থাকেন, অতএব নিজেদের নিয়ে চর্বিতচর্বণ করাই ভালো। আপাতত: মিডিয়ার এই চর্বিতচর্বণের ফোকাল পয়েন্ট হল বইমেলা। এখানেও একটা লক্ষ্মণরেখা আছে। সি পি এম বিরোধী মিডিয়া ময়দানে বইমেলার বিপক্ষে। সি পি এম সমর্থক মিডিয়া ময়দানে বইমেলার পক্ষে। আর বৃহত্তম বাংলা মিডিয়া হাউস কেন ময়দানে বইমেলার বিপক্ষে তা নিয়েও নিন্দুকে অনেক কিছু বলে। কিন্তু এই যে প্রায় স্বভাবের দোষে আবার খেউড়ে ঢুকে পড়ছি, এর থেকে কাটান পাওয়ার জন্য মোদ্দা গপ্পোটা একটু আউড়ে নিই।

আমাদের গপ্পোটা শুরু হবে শেষের পর থেকে। অর্থাৎ যখন মহামান্য আদালত কইলেন যে আজ থেকে ময়দানে বইমেলা নিষেধ, অদ্যকার মত "সবা বঙ্গ"। কারণ এর আগের পর্বের মালপত্র ঘাঁটলে কখন কি হয়ে যায় কিচ্ছু বলা যায় না। গিল্ডের কর্তারা দেখলেন বুদ্ধবাবু সোমনাথবাবুর হাত ধরেও কিছু হল না। অতএব সব
অকূলের কূল সব অগতির গতি সুভাষবাবু। প্রতি বইমেলা থেকে গিল্ড যা
রোজগার করে তার পুরোটাই ঝাড় হয়ে যেত কিছু না করতে পারলে।
এইবার কিছু না কিছু তো করতেই হয়। চল পানসী বেলেঘাটা-যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন। ইদিকে এই পুরো প্রক্রিয়াতে বঙ্গীয় বুদ্ধিজীবিত্বের পিতামহ প্রপিতামহরা পাত্তা পেলেন না। তাদের বড়ই গোঁসা এবং তাদের বড়ই আবেগ। তারা ফতোয়া জারি করলেন যে মেলা হলে ময়দানে, নইলে আর কোথাও নয়। এদিকে যে সমস্ত প্রকাশক গিল্ডে
বেশি পাত্তা পান না, তারা আবার বললেন বিকল্প বইমেলা করবেন। হতেই পারে। বামফ্রন্ট ছাড়া সব কিছুরই বিকল্প আছে। তো আপনি যদি ফর দ্য টাইম বিং, আবেগ টাবেগলো ব্যাক আপ ড্রাইভে রেখে একটু কচলাকচলি করেন, বুঝবেন যে আসলে সব কিছুই হল ট্যাকার গল্প। গিল্ডকে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যেতে হল কারণ
নাইটাকার থেকে কানাটাকা ভালো। লেখকদের ঝাড় কারণ ময়দানের দাবী থেকে সরে এলে লং টার্মে বিক্রিবাটা, হম্বিতম্বি এবং অটোগ্রাফ বিতরণে মন্দা পড়বে। গিল্ডে পাত্তা না পাওয়া প্রকাশকদের ঝাড় কারণ বিক্রি হবে কম, ইদিকে গিল্ডকে একই পয়সা দিতে হবে। তবে শুধু পয়সা নয়, রাজনীতি যে আছে বুঝতেই পারছেন। এবং সেই রাজনীতি শুধু বুদ্ধ সুভাষ নন, সবুজপন্থী উকিলদের দুজনদের কালো কোট লক্ষ্য করুন। দুইজনই কংগ্রেস বা তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন এম এল এ। একজন আবার রবীন্দ্র সরোবরের পরিবেশ সংক্রান্ত মামলায় সুভাষ দত্তের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। আর একজন বুদ্ধবাবুকে একহাত দেখে নিয়ে এতই পুলকিত যে বই বেচা আর দাদের মলম বেচার মধ্যে কোনো ফারাক খুঁজে পান নাই। কিন্তু বাঙালী
মধ্যবিত্তের কাছে বই এতই পবিত্র, নিষ্কলঙ্ক, সতীসুলভ যে তাতে মালকড়ির গন্ধ এলে হৃদয়ে চাপ পড়বে। সেই রুতর চাপ এড়াতে দুইখান কথা বাজারে বের হয়েছে- এক, আমাদের আবেগের কি কোনো মূল্য নাই, আর দুই, কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা কলকাতা তথা বাংলা তথা ভারত তথা ডট ডট ডটের গর্ব। এই দুইখান কথার পিছনে আমারও দুইখান কথা বলার ছিল।

সারা পশ্চিমবঙ্গে আজ প্রায় সাড়ে তিনশো বইমেলা হয়। ক্যানিং থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত। এই সব বইমেলার উদ্যোক্তাদের পিছনে গিল্ডও নাই আর সরকারও নাই। স্থানীয় উৎসাহীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এই সব বইমেলার আয়োজন করেন। গিল্ডের কেষ্টুবিষ্টুদের নিজেদের পাবলিশিং হাউসলোর কোনোটাই এইসব অখ্যাত বইমেলায় স্টল দিতে রাজি হন না। তাদের দুই একজনকে প্রায় হাতে পায়ে ধরলে
খ্যামাঘেন্না করে একখান স্টল দেন। কলকাতার সাহিত্যিক কবিরা পায়ের ধুলো
দিয়ে এই সব মেলাকে ধন্য করেন। কেউ খবরও রাখেন না এই সব মেলা কি কষ্ট করে কিছু মোষ তাড়ানো মানুষ চালিয়ে যাচ্ছেন। একটু ভুল করছি। কলকাতা বইমেলা ছাড়া আর এক বইমেলা নিয়েও পাবলিশার এবং সাহিত্যিকেরা যথেষ্ট উৎসাহী। তা হল সল্লেকের মেলা। কারণ ওখানে মন্ত্রী-আমলা সমেত হরেক হোমরাচোমরা সেলিব্রিটিদের আখড়া। সরকার এবং সেলিব্রিটিরা যে মেলাকে ঠেকনা
দিয়ে দিয়ে জাতে তুলেছেন, সেই মেলা হল গিয়া বাঙালীদের আন্তর্জাতিক গব্বো। আর যে মেলালো কিছু নামডাকহীন মানুষ উদয়াস্ত খেটে দাঁড় করালেন, তাদের নিয়ে গিল্ডের এক কর্তা বললেন ওরা তো আমাদের টুকলি করে। এই সাড়ে তিনশ মেলায় ফুড পার্ক, এ টি এম, রেডিও টিভি চ্যানেল- কেউই থাকে না। বই থাকে। আর কিছু বেলুনওয়ালা, বাচ্চাদের প্লাস্টিকের খেলনা, ফুচকা, আলুর দম। অনেক লোকে যান বই নেড়ে চেড়ে দেখতে। অনেক বাচ্চা যায় বাংলা বই কিনতে। এখনও
মফ:স্বলের অধিকাংশ ইস্কুল কলেজ বাংলা মিডিয়াম। অতএব বাংলা বইয়ের গড় চাহিদা শহর কলকাতার থেকে বেশি বইই হবে। আমার জানা কোনো রাজ্য নেই যেখানে ছোটো ছোটো মফ:স্বল শহরে এতলো বইমেলা হয়। অথচ এই নিয়ে আমাদের কেষ্টুবিষ্টুদের একটা কথাও বলতে শোনা যায় না। মোটের উপর এই হল আমাদের আলুকিত সমাজের বইপ্রেম এবং উথলে ওঠা, উপচে পড়া আবেগের যোগফল।

পাঠক পাঠিকাগণ, x মহ/মহী এবং তদীয় শিষ্যশিষ্যাগণকে তাঁদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের জন্য প্রণাম করুন এবং সন্ধেবেলা নকুলদানা চড়ান। কিন্তু সাধারণত: আমরা কেউই যেমন ঠাকুরদেবতাদের বলা ভালো ভালো কথা মানি না, ঠিক সেইভাবে এইসব আবেগ টাবেগে লি মারুন। মোদ্দা কথা, প্রতি বছর অন্তত:
একটা বইমেলা চাই, যেখানে বই ঘাঁটব এবং কিনব। কলেজ স্ট্রিট আছে বটে, কিন্তু সেখানেও সব প্রকাশকের আস্তানা নেই এবং সবাই বই ঘাঁটতেও দেন না। এই হল একটা মওকা। দুই তিনটে মওকা হলেও মনে হয় না কোনো দু:খের কারণ আছে। যেখানে ইচ্ছে হোক, গড়িয়া থেকে শ্যামবাজার, আউটরাম ঘাট থেকে রাজারহাট। আবার অন্য কোথাও হয় তো দূষণের জন্য মামলা হবে। বইমেলা আবার হয় তো
সরবে। এখানে ওখানে শেষে সরতে সরতে, বইয়ের জন্য মলময় শহরের ফাঁকফোকর খুঁজতে খুঁজতে, বইমেলা এক স্বত:স্ফূর্ত ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের মত কলকাতার গলিঘুঁজি আচ্ছন্ন করে ফেলুক। ধূসরকে আচ্ছন্ন করুক, সবুজকেও আচ্ছন্ন করুক। সেই বইমেলার জন্য গিল্ডের দরকার নেই, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের দরকার নেই,
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের দরকার নেই। অরুণাভ ঘোষেরা খুঁজেই পাবেন না কে মেলা করছে, কারণ সবাই মেলা করছে; বা কোথায় মেলা হচ্ছে, কারণ সর্বত্র মেলা হচ্ছে। নিজেদের আলমারির বই নিয়ে রাস্তায় নামুন। নিজেদের মধ্যে বই কেনাবেচা করুন। নিজের পাড়ার লাইব্রেরিটাকে বাঁচানো যায় কি না দেখুন। কিংবা নতুন নতুন
লাইব্রেরি তৈরি করুন। এই কাজলো সরকার-গিল্ড-সেলিব্রিটি কেউই করবে
না। আমাকে-আপনাকে করতে হবে।

তারপরেও আবেগ-সি পি এমাদি-খেউড়ের প্যাটার্নটা অব্যাহত থাকতেই পারে। তবে আশার কথা যে পাশাপাশি বইটাও থাকবে।