সমষ্টির স্বার্থ


লিখছেন -- সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


সমষ্টির স্বার্থ ১
--------------
পশ্‌চিমবঙ্গে শিল্পায়নের উপদ্রব বেড়েছে আর বিহারে নাকি ডাকাতের। বিশেষ করে ব্যাঙ্ক ডাকাতের। বিহার পুলিশের বড়োকর্তারা এই নিয়ে একাধিক গম্ভীর মিটিং এবং তৎসহ প্রচুর চা, বিড়ি , সরকারি পেট্রোল এবং টিএ বিল খরচার পর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, যে, আসলে দোষটা মোবাইল ফোনের। কেন মোবাইল ফোন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা দক্ষিণমেরুর পেঙ্গুইনদের এ ব্যাপারে কেন দায়ী করা হচ্ছেনা, সে নিয়ে বিশদ তথ্য না পাওয়া গেলেও, সংবাদে প্রকাশ, ব্যাঙ্কে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা সম্পূর্ণ ভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে, যে, ডাকাতরা ডাকাতির কাজে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। যুক্তি মারকাটারি সন্দেহ নেই। বোঝাই যাচ্ছে,এরপর ডাকাতরা স্কুটারে চড়ে এলে স্কুটার নিয়ে ব্যাঙ্কে ঢোকা নিষিদ্ধ হবে। লাল জামা পরে ডাকাতি করে গেলে লাল জামা ব্যান। ট্রেনে চড়ে পালালে নিষিদ্ধ হবে ব্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে ট্রেনে ওঠা। যদি দেখা যায় সকাল নটা থেকে এগারোটার মধ্যেই বেশিরভাগ ডাকাতি হচ্ছে, তাহলে ঐ সময়ে ব্যাঙ্কে ঢোকা নিষিদ্ধ হবে। ইত্যাদি ইত্যাদি।

যাঁরা ভাবছেন, ইয়ার্কি মারা হচ্ছে, তাঁদের অবগতির জন্য জানাই, কেসটা সিরিয়াস। একে বলে ডাকাতি সারানোর সহজ উপায়। এতোকাল শুধু উপসর্গের পিছনে দৌড়ানো হয়েছে, ডাকাতি হয়েছে শুনে পুলিশ দৌড়েছে ডাকাতের পিছনে (সত্যিই দৌড়েছে কিনা খোদায় মালুম)। এখন বোঝা যাচ্ছে, ডাকাতি কোনো রোগ নয়, রোগের উপসর্গ মাত্র। অতএব এইবার উপসর্গ ছেড়ে রোগটিকে ক্যাঁক করে চেপে ধরে দ্রুত নিরাময়ের পথে এগোনো হবে। কাকে কান নিয়ে গেল শুনে ফালতু ডাকাতের পিছনে ছুটলাম,ভুঁড়ি নিয়ে দৌড়নো সার হল ডাকাত ধরা পড়লনা, সাতমন তেল পুড়ল, কিন্তু রাধিকা নাচিলনা -- এইসব বুলশিট ফ্রুটলেস এফর্টে বিহার পুলিশ আর বিশ্বাস করবেনা। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এবার থেকে নির্দেশ না মানলেই কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দু-চাট্টি লোক লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে মোবাইলে কথা বলার গুষ্টিসুখ থেকে বঞ্চিত হবে ঠিকই, কিন্তু সে তো সমষ্টির স্বার্থে। অতএব, কোনো ফালতু অজুহাত শোনা হবেনা। এবার থেকে ব্যাঙ্কে মোবাইল বাজলেই ঘ্যাচাঘ্যাচ হাতে হাতকড়া। এবং, এই পথেই, আশা করা যাচ্ছে চিরমোক্ষ লাভ হবে। বিহার ডাকাতহীন হবে। জগৎ সুখের হবে। যাত্রিকের চোখের সমুখে দেখা যাবে কান্তিময় আলো।


সমষ্টির স্বার্থ ২
-------------

ওদিকে সমষ্টির স্বার্থেই পশ্‌চিমবঙ্গে হতে চলেছে টাটার একলাখি গাড়ির কারখানা। সে কথা জানতে এতদিনে কারো বাকি থাকার কথা নয় (থাকলে কূটকচা৯র পক্ষ থেকে বিনামূল্যে দেওয়া দড়ি ও কলসির জন্য আবেদন করতে পারেন), লেখার কোনো মানেও হয়না। কিন্তু যা-যা ঘটে চলেছে, তাতে কলম সংবরণ করা মুশকিল হয়ে পড়ছে। একদিকে শিল্পের আগমনী গাইছেন "বামপন্থী' সরকার, টাটা-বিড়লার নামে পারলে লাল সেলামই দেন আরকি, সঙ্গে রয়েছে তাবৎ "বাজারি' সংবাদপত্র ও চ্যানেলকুল। অন্যদিকে "দক্ষিণপন্থী' মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কৃষকের জমি কেড়ে নেবার প্রতিবাদে আন্দোলনে। তাঁর অনুগামীবৃন্দ কখনও খালিগায়ে মিছিল করছেন, (শোনা যাচ্ছে কয়েকজন মহিলাও এই মিছিলে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলেন), কখনও বিধানসভা ভাঙছেন, সেই দৃশ্য দেখার জন্য ছুটির দিনে খুলে দেওয়া হচ্ছে বিধানসভা, এবং তাতে এতো ভিড় হচ্ছে, যে, ভিড়ের চাপে পড়ে গিয়ে দু-চারজন আহত হচ্ছেন। কখনও আটচল্লিশ ঘন্টার বন্‌ধ ডাকা হচ্ছে, পরক্ষণেই প্রত্যাহার করা হচ্ছে। একদিকে সিঙ্গুরে গোলমালের ভয়ে মাসখানেক ধরে একশচুয়াল্লিশ ধারা জারি, টিভিতে দেখা যাচ্ছে পুলিশ বাড়ি বাড়ি ঢুকেঠেঙাচ্ছে,অন্য দিকে সরকারি দলের মুখপত্র সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, যে, যারা জমি দিতে পেরেছেন, সেই কৃষকেরা খুশি তো বটেই, আর যারা কপালদোষে দিতে পারেননি, তাঁরা হতাশায় ভেঙে পড়েছেন। তাঁদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার সন্ধান চলছে কিনা মুখপত্র অবশ্য জানাতে ভুলেছেন।

সব মিলিয়ে "সমষ্টির স্বার্থে' এক দুরূহ ব্যাপার স্যাপার চলছে। সেসব সবাই জানেন, নতুন করে বলার কিছু নাই। কিন্তু তবুও এই কূটকচা৯ ফাঁদার উদ্দেশ্য হল কিঞ্চিৎ অযাচিত জ্ঞানবিতরণ। অনেকেই এই শিল্পায়নের মধ্যে দ্বিতীয় এক নবজাগরণের আশা দেখছেন। অনেকেই আবার এই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ষাটের দশকের সেই পুরোনো দিনগুলো ফিরে আসার আশঙ্কা করছেন। অযাচিতভাবে এঁদের সকলকেই আশ্বস্ত করে জানানো যাচ্ছে, ওরকম কিছু হবে টবেনা। মাথার উপরে এখনও সূর্য চন্দ্র ও মার্কস আছেন। সেই মার্কস, যিনি বলেছিলেন, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। কিন্তু "" the first time as tragedy, the second time as farce ''।

কি পন্ডিত লোক মাইরি এই মার্কস, আঠারোশো একান্ন সালে লেখা এই বাক্যটি একদম খাপে খাপ পঞ্চার বাপ মিলিয়ে দেয় আজও, সাধে কি আর লোকে এতো মান্যিগন্যি করে? আসুন, একই সাথে মার্কস ও বিহার পুলিশের জয়ধ্বনি করি। সমষ্টির স্বার্থে।