বইমেলার ঠিকানা - এক চর্বিত চর্বণের উপাখ্যান


অমিত মজুমদার


আপনার মতামত         


বছর আট নয় আগে সদ্য বীরভূম থেকে আসা এক ছাত্র কলেজে কলেজ সুলভ মুক্তির স্বাদ পায়নি। কেবল বছরের বিশেষ একটা সময়ে নিজের আদলে মুক্তির খোলা মাঠে দৌড়ে যেত হাফ সোয়েটারে। সে বড় সুখের সময় ছিল যখন বছরের ঐ কটা দিন প্রথম অর্ধের পর কলেজ ছুটি হয়ে যেত ছেলেটির নিজস্ব নিয়মে। রোদ্দুর মেখে ভাঁজ করা নিদাঘ ডানা মেলে দেওয়া ছিল নিপাট সারল্যে। ছিল তখনও পর্যন্ত কোলকাতার রাস্তাঘাত সম্পর্কে অবহিত না থাকা জনিত ভয় এবং কলেজ গেট থেকে বের হতেই বাস থেকে ""বইমেলা, বইমেলা, ময়দান, বইমেলা'' চিৎকারে সেই ভয় নামক কুয়াশার পাতলা হতে হতে মিলিয়ে যাওয়া - অপূর্ব সে আলো। বাস ঢুকছে, দেখা যাচ্ছে বইয়ের স্টল, প্যাভিলিয়ন, জমতে থাকা মাথা, তৎক্ষণাৎ নেমে পড়া সেই জমিনেই - টিকিটের লাইন - দ্রুত পায়ে ঢুকে পড়া আকাঙ্খিত মরুদ্যানে, সম্মোহিত প্রাণ।


পটভুমিকা থেকে দ্রুত সরে আসে মন। কয়েকবছর ধরে চলেছে এক নতুন উপদ্রব - ময়দানে বইমেলা বন্ধ হোক। হেতু পরিবেশ দূষণ এবং নতুন স্থান নির্দেশ করা হয়েছে ধাপার মাঠ থুড়ি বাইপাস। পরিবেশ দূষণ রোধ কথাটি যতখানি জনপ্রিয় হয়েছে স্বভাবতই ততখানি অন্তরে প্রবেশ করেনি। গরীব তথা নিম্নমধ্যবিত্তদের কাছে এটির কোন অস্তিত্ব নেই (বিশদ ব্যাখ্যা প্রয়োজনে বারান্তরে করা যাবে খন), মধ্যবিত্তদের কাছে এর অবস্থান খবরের কাগজ ও তার নানবিধ ব্যবহার (বিশেষত বাড়িতে বাচ্চা থাকলে), টেলিভিশন ও বাজার করাকালীন রাস্তাঘাটে এবং উচ্চবিত্তদের কাছে এর অবস্থান শুধুমাত্র নিজের বসবাসের গণ্ডীটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পরিবেশ দূষণের প্রতিকারে আমরা সকলে ততখানিই ভূমিকা পালন করে থাকি যতখানি করে থাকি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া দূর্নীতি রুখতে। তার উপর আমরা পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক, অতএব অঘোষিত বামপন্থী এবং ঘোষিত সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তি। আমাদের একটা আলাদা ""ইয়ে'' আছে (যদিও এই ""ইয়ে''টা যে ঠিক কি তা ব্রহ্মের মতই অজানিত, তবুও অবশ্যই আছে)। অতএব পরিবেশ দূষণ হেতু বইমেলার স্থান পরিবর্তনের কথা শোনা মাত্রই আমাদের অবধারিত প্রতিক্রিয়া - "" আরে শালা, পরিবেশ মারাচ্ছে!! সমোসকিতি বন্ধ করে দেব বললেই হল!!'' তো এসব কটু উক্তির উষ্ণতা থেকে বের হয়ে এলে একথা অনস্বীকার্য যে পরিবেশ দূষণ যে হয় তা সত্য। অন্য মেলাগুলির তুলনায় এই বইমেলার দিনসংখ্যা ও লোকসমাগম অনেক বেশী এবং অবধারিত ভাবে দূষণ ও অনেক বেশী। তাই, হে বন্ধু, বাইপাস যাও, ময়দানের চিরসবুজ মাঠ তোমার তাণ্ডব থেকে মুক্তি পাক। হক কথা, এতদিন চলে এসেছে বলেই মাঠের দফারফা ঘটিয়ে আগামী দিনেও চালানো হবে এমন দাবীকে মোটেই স্বাগত জানানো যায় না। অতএব বাইপাস সার্জারি।

প্রথম প্রশ্ন হল, যাব কিভাবে? ইচ্ছেডানা বাস্তবে কাজ করেনা। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি কিছুটা হয়ে থাকলেও বাইপাস এ বিষয়ে এখন ও ময়দানের থেকে অনেকখানি পিছিয়ে। সংরক্ষণের আওতায় আনা যায় কিনা তা বিদ্বজনেরা ভেবে দেখবেন, কিন্তু যে বিপুল পরিমাণ লোক সমাগম বইমেলায় হয়ে থাকে তার ভার বাইপাসের সাম্প্রতিক পরিবহণ ব্যবস্থা নেবে কিভাবে? শুধু বারুইপুর, বালীগঞ্জ বা দমদম নয় আশেপাশের বহু শহরতলী, রাজ্যের অন্যান্য জেলা এমনকি ভিন রাজ্য থেকেও বহু লোক আসেন এই একটি মেলাতে সামিল হতে। বইমেলা ফেরত কোলকাতার লোকেদের অনেকের ক্ষেত্রে একটি বড় ও নিরাপদ ভরসা মেট্রো রেল, যে সুবিধা থেকে বাইপাস শতহস্ত দূরে। ভরসা বলতে প্রধানত অটো ও ট্যাক্সি, যা ব্যয়বহুল এবং ঝোপ বুঝে কোপ মারতে সিদ্ধহস্ত। পরিবহন ব্যবস্থার সুপরিকল্পিত ও নিয়মিত উন্নতি ঘটার আগে বইমেলা স্থানান্তর অতএব ইতিহাসের বিখ্যাত ""পাগলা রাজার'' রাজধানী স্থানান্তরণের মত মূর্খামি হয়ে দাঁড়াবে বলেই মনে হয়।

দ্বিতীয় সমস্যা হল স্থানাভাব। বইমেলার বর্তমান আয়তনকে জায়গা করে দিতে বাইপাসের নির্ধারিত স্থান সক্ষম এমন কথা শুনলে শুধু ঘুড়ায় কেন শ্রদ্ধেয় জ্যোতিবাবুও হেসে ফেলবেন। কাজেই এমন সর্বজনবিদিত সত্যকে মেনে নিয়ে বলা হয়েছে যতদিন দিল্লীর প্রগতি ময়দানের অনুরূপ বৃহৎ ও স্থায়ী মেলা প্রাঙ্গণ তৈরী না হচ্ছে ততদিন ছোট আকারেই হোক বইমেলা - অনেকখানি পকেট ডিকশনারীর আদলে আর কি। বড় বড় প্রকাশকরা অসুবিধায় পড়বেন না, মার খাবে ছোট প্রকাশনাগুলি এবং লিটল ম্যাগাজিনের স্টলগুলি। এসব ক্ষতি ছেড়ে দিলেও আমাদের মন ভরবে ঐ পকেট বুক সংস্করণে! অনুষ্ঠানের সংখ্যা কমে যাবে, কিছু ভালো, কিছু ঘষাপেটা আলোচনা শোনা যাবেনা। ঐ বিশাল ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ একা হয়ে যাওয়ার চেতনা, ধুপ করে কোন স্টলের পাশে বসে পড়া ক্লান্ত হয়ে আনমনে - হারিয়ে যাবে এসব। যতক্ষণ পারা যায় বইমেলা হয়ে থেকে যাওয়ার অঙ্গীকার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে সাততাড়াতাড়ি - নিরাপত্তার কারণে,বাড়ি ফেরার চিন্তায়। এসবই ঘটে যাবে অবলীলাক্রমে, যদি নির্বাসনে দাও তাকে, বাইপাসে। এর প্রতিকার হিসাবে আর এক অভিনব দাওয়াই এর প্রস্তাব করা হয়েছে। বইমেলা থেকে সমস্ত খাবারের দোকান ও আরো কিছু আনুষঙ্গিক দোকান ছাঁটাই করা। সত্যিই তো, দুপুর দুটো থেকে রাত আটটা - এর মধ্যে আবার ক্ষিদে পাওয়ার কি আছে বাবা! সমোসকিতি ও করবে আবার লাইন দিয়ে হাঘরের মত খাবে, অতসব একসাথে হয়না বাপু। অথচ এসব শোরগোলের মাঝে কেউ বলে দিচ্ছে না যে এতবছর ধরে একটা বৃহৎ এবং স্থায়ী মেলাপ্রাঙ্গণ গড়ে তোলা যাচ্ছে না কেন। প্রতিবছর আদালতে মামলা, না না করে অবশেষে ""এই শেষবার'' বলে সেনাবাহিনীর অনুমোদন দান এবং ময়দানে বইমেলার সপক্ষে রাজ্যসরকারের বিশেষ পক্ষপাত ও সক্রিয় সহযোগীতা সাধারণ মানুষের মনে দলের তথা নিজের সংস্কৃতিমনস্ক রূপটিকে তুলে ধরার প্রয়াস নয়তো! তা না হলে আজ ও এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান রূপায়িত করা হয়না কেন!

পরিবেশ বিঘ্নিত না করে আমরা বইমেলা চাই পূর্ববৎ। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আধার তৈরি হোক যথাবিধি। যোগদানের ব্যবস্থাকে ছাঁটাই না করে উন্নত হোক নতুন ঠিকানার পরিবহণ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা। পিছনে ফেলে রেখে অতীতের স্মৃতি, দলে দলে চলে যাব নতুন গৃহে , শান্তিপূর্ণ ভাবে। ততদিন, বাপুসকল মিছে গোল কর না।