মিডিয়া মনস্কতা


লিখছেন -- সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


মিডিয়া এক।
------------

বাংলায় চুরি ক্রমশ: বাড়ছে-- মরুদ্যান শুকিয়ে গেল বলে। হপ্তা দুই আগে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর গোঁফচুরি হয়ে গেল। একটি বন্ধুত্বের সাইটে ছবি-টবি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর একটি "ফেক' প্রোফাইল বানিয়েছিলেন জনৈক যুবক, তাই নিয়ে মিডিয়ার হুল্লোড় যেন যৌবনের জলতরঙ্গ, রুধিবে কার পিতৃদেব। মুখ্যমন্ত্রীর আইডেন্টিটি চুরি হয়ে যাচ্ছে, সম্মানহানি হচ্ছে, রাজ্যের ভাবমূর্তি ম্লান হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি থেকে শুরু করে থেকে শুরু করে কোনো কোনো গপ্পের গোরু "ইহা একটি চক্রান্ত' পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তাও কপাল ভালো, এর মধ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কালো হাত কেউ দেখতে পাননি। (অবশ্য দেখতে পেলেও নির্ঘাত চেপে গেছেন, এই শিল্পায়নের বাজারে মার্কিন বহুজাতিক নিয়ে প্রশ্ন তোলার বুকের পাটা আর কোন বাপের ব্যাটার আছে?) গপ্পের শেষে দুই যুবক জানালেন তাঁরা ফুক্কুড়ি করে কাজটি করেছিলেন, এর পিছনে কোনো সন্ত্রাসবাদী অভিসন্ধি ছিলনা -- তাঁদেরকে ধরে পুলিশের কিঞ্চিৎ বাটামপ্রদানের পর মিডিয়ার শান্তি হল।

যাঁরা এই হুজুগটি তুললেন, অর্থাৎ মিডিয়ার একাংশ, তাঁরা কস্মিনকালেও বন্ধুত্বের ঐ সাইটটি ঘুরে দেখেননি বলাই বাহুল্য। কারণ নিদারুণ অজ্ঞতা এবং বিষয় সম্পর্কে কিচ্ছু না জেনে অন্যকে আলোকিত করার মহৎ প্রচেষ্টায় যাঁরা ব্রতী তার নামই মিডিয়া। একটু ঘুরে দেখলেই জানতে পারতেন, যে, সেলিব্রিটিদের নিয়ে ক্যাওড়ামো, নেটের একটি পবিত্র অধিকার। সেলিব্রিটি হতে গেলে এই জাতীয় ঝামেলা কিছু পোয়াতেই হবে। ঐশ্বর্য রাইয়ের চিকন গন্ডদেশে সুপার ইম্পোজ করে বসিয়ে দেওয়া হতেই পারে স্যাম পিত্রোদার দাড়ি,জর্জ বুশের মাথা ফুঁড়ে বেরোতেই পারে দুখানা শিং, দেশনেতার সম্পর্কে চারক্ষরের বিশেষণমালায় ভরপুর নোটিসবোর্ড ঝুলতেই পারে প্রকাশ্যে, এবং এই অধিকার নিয়ে কিচ্ছু বলা যাবেনা -- এই হল নেটের অলিখিত নিয়ম। এই মিডিয়া নামধারীদের ঘেঁটি ধরে ঐ বন্ধুত্বের সাইটে একটি গাইডেড টুর করাতেও ইচ্ছে করে। যে, দেখো হে খোকন, দেখে যাও, গাদা গাদা সেলিব্রিটির ফেক প্রোফাইল ঝুলে আছে আকাশে বাতাসে। যথা ডোনাল্ড র‌্যামসফিল্ড। যথা সুভাষচন্দ্র বসু। এবং বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয়তম এন্টারটেইনার জর্জ বুশের, না হলেও খান পঞ্চাশেক ফেক প্রোফাইল আছে, হ্যাঁ ঐ সাইটটিতেই। তার কোনোটিতে জর্জ বুশের নাকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে জোকারের লাল স্টিকার। কোনোটায় বুশের মুখে সুপার ইম্পোজ করা হয়েছে লাদেনের পাগড়ি আর দাড়ি। বানিয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। জনৈক হিন্দিভাষীর বানানো প্রোফাইলে বুশ জানাচ্ছেন লাদেন আর ওমরকে তিনি "ঢুঁড় ঢুঁড়কে' মারবেন। জনৈক বঙ্গভাষী বুশ জানাচ্ছেন, "আমি আপনাদের অতি পরিচিত জর্জ বুশ'। তাঁর প্রিয় মুভি নাকি "ওয়ার অফ দা ওয়ার্ল্ডস' । সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নাকি তাঁর প্রিয় খেলা। একটি প্রোফাইল জানাচ্ছে, তিনি নাকি বাই-কিউরিয়াস। ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই অকালপক্ক মিডিয়াকে একটু বিদেশি টিভি দেখাতেও ইচ্ছে করে। বিকল্প মিডিয়া টিডিয়া না। সেরেফ বাজারি ফক্স আর এবিসি। যে, দ্যাখো হে সোনামনি, খোদ আমেরিকায়, জর্জ বুশের দেশে জিমি কিমেল শোতে এই হাজির করা হচ্ছে এক "ফেক' জর্জ বুশকে। তাঁকে নিয়ে প্রচন্ড সিরিয়াসলি ইন্টারভিউ নেওয়া হচ্ছে, তিনি বুশোচিত উত্তর দিচ্ছেন, অর্থাৎ এন্তার ইয়ার্কি ফাজলামো মারা হচ্ছে। এবং শো শেষ হবার পর, এটুকুও বলে দেওয়া হচ্ছে না, যে এই মালটি লক্ষীবাবুর আসল সোনা ও চাঁদি নয়।

বলাবাহুল্য, এসব নিয়ে জর্জ বুশ বা ডোনাল্ড র‌্যামসফিল্ড কেউই হল্লা মাচাননি। কারণ জর্জ বুশ, হ্যাঁ, এমনকি জর্জ বুশও জানেন, যে, এই নিয়ে যত শোরগোল তুলবেন, আপনি ততই খোরাক হবেন। সেসব দিনকাল চলে গেছে, যে আপনি বিখ্যাত লোক, ফিল্মি হিরো কি রাজনৈতিক সুপারস্টার, অতএব টিভি চ্যানেলে এসে চাট্টি লেকচার দিয়ে যাবেন, আর আমরা সেসব সোনা মুখ করে গিলে নিয়ে চলে যাব পাড়ার চায়ের দোকানে। এখন, এই নেট নিষিক্ত দুনিয়ায়, আম্মো হিরো নাম্বার ওয়ান গোবিন্দ দাস। নেটে ব্লগ বানাবো, আপনার বাপান্ত করব, আপনার ছবি নিয়ে কার্টুন বানাবো। আপনি চেপে গেলে ভালো, রিয়াক্ট করলেই আরো খোরাক করব। দুনিয়া শুদ্ধু লোকে সেসব দখবে এবং আপনি একটি জীবন্ত কিংবদন্তীতে পরিণত হবেন।

বুশ, হ্যাঁ বুশও এটা বোঝেন। কিন্তু মিডিয়া, হায় বাংলার মিডিয়া,সে শুধু কুয়োয় বসে রয়। দুই হাত তুলে অভিনন্দন গ্রহণ কর হে বঙ্গীয় মিডিয়া, কান্ডজ্ঞান ও বোধবুদ্ধিতে তুমি যে বুশেরও অধিক।


মিডিয়া দুই।
-----------

উপরের যে লেখাটি পড়লেন, এই মূহুর্তে তার লিংক যদি আপনি আপনার তিন বন্ধুকে না পাঠান, জানেনকি, তাহলে আপনার সর্বনাশ হবে? এবং মেলে বা অন্যভাবে আপনার লিংক যারা পেলেন, তারা প্রত্যেকে যদি আরও তিনজনকে শ্রদ্ধাসহকারে সেই লিংক ফরোয়ার্ড না করেন, তাহলে তাদেরও সর্বনাশ আসন্ন। জানেনকি, একজন জিম্বাবোয়ে নিবাসী বাঙালী ভদ্রলোক, এই লেখাটি পড়ে ব্যঙ্গ করেছিলেন, তাঁর মাথায় বজ্রপাত হয়? আরও একজন বারাসাতের ভদ্রমহিলা এই লেখা পড়ে লেখাটিকে "জাল মাল' বলেন ও মেশিন শাটডাউন করে দেন। সেই দিনই তাঁর নগদ পঞ্চাশ টাকা ছিনতাই হয় এবং মাথার চুল উঠতে শুরু করে টাক পড়ার উপক্রম হয়। তিনি দেরি না করে পাঁচশো কপি ছাপিয়ে লেখাটি বিলি করেন, পরের দিনই চোর ধরা পড়ে, এবং এখন তাঁর কোমর ছাপানো চুল। একজন ছাত্র, পরীক্ষার আগের দিন টেনশনের চোটে পড়া ফেলে নেট সার্ফ করতে গিয়ে এই লেখাটি পড়ে এবং সাতজনকে পাঠায়। পরীক্ষায় সে গোল্ড মেডেল পায়।

এই অবধি পড়ে, যাদের গোফের ফাঁকে, লেডিস এবং/অথবা মাকুন্দ হলে মোহিনী ওষ্ঠের প্রান্তে বিদ্রূপের হাসির লক্ষণ দেখা দিয়েছে, এবং বুলশিট বলে উঠে যাবার তাল করছেন, তাঁদেরকে আগেই বলে দিচ্ছি সাধু সাবধান। "এই মেলটি আরও পাঁচজনকে না পাঠালে আপনার অ্যাকাউন্ট ডিলিট হয়ে যাবে' জাতীয় মেল দেখে আপনি কি ডিলিট মেরেছেন অ্যাদ্দিন? বা, "জিম্বাবোয়ের জনৈক ব্যাঙ্কারের রেখে যাওয়া একশ মিলিয়ান ডলারের একমাত্র উত্তরাধিকারী আপনি' এই জাতীয় মেল নিয়ে রঙ্গরসিকতা করেছেন? অ্যাদ্দিন যা করেছেন করেছেন, সেসব আমরা মাইন্ড করছিনা, তবে এখন সময় এসেছে, আর করবেননা। নিজেকে পাল্টান। স্প্যাম-ট্যাম জাতীয় শব্দ আপনার অভিধান থেকে অবিলম্বে ডিলিট করুন। কারণ বঙ্গীয় সংবাদপত্র জানাচ্ছে, স্প্যাম নয়, ওগুলি সিরিয়াস। ঐ সব মেল দিয়ে নাকি বিভিন্ন গম্ভীর সমাজসেবাও হয়ে থাকে। বঙ্গীয় সংবাদপত্রের একটি প্রতিবেদনে জানা গেল, জনৈক পিতা নাকি তাঁর সন্তানের প্রাণভিক্ষা করে একটি মেল লিখেছেন দুনিয়ার জাগ্রত বিবেককে। সেই মেল যতবার ফরোয়ার্ড করা হবে, যতবার এই বাণী একটি মেল আইডি থেকে অন্য মেল আইডিতে যাবে, ততবার বত্রিশ পয়সা করে জমা হবে তাঁর অ্যাকাউন্টে। এবং এই পয়সা নাকি দিচ্ছে এওএল।

বঙ্গীয় মিডিয়ার খবর। অতএব ভুল হবার কোনো চান্সই নেই। এ থেকে আমরা যে জিনিসগুলি জানতে পারি, তা হল:

এক। স্প্যাম তুচ্ছতাচ্ছিল্যের জিনিস নয়, বরং হইলেও হইতে পারে, ঈশ্বরের বাণী। অতএব পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ স্প্যামের বিরুদ্ধে যে আইন কানুনগুলি বানিয়েছে, সেগুলি অবিলম্বে ছেঁড়া কাগজের বাক্সে পাঠানো উচিত।

দুই। এওএল গৌরীসেনের কোম্পানী এবং ঈশ্বরের অন্য নাম। পৃথিবীর কোন প্রান্তে কে কোন অ্যাকাউন্ট থেকে কোন অ্যাকাউন্টে কি মেল চালাচালি করছে, কি তার বিষয়বস্তু, সব এওএলের জানা। সোজা বাংলায়, আপনি রাম শর্মা, রহিম শেখকে যদি চিঠি লেখেন, যে, জিম্বাবোয়ের জনৈক পিতা বড়ো দু:খী, তবে এওএল হাত গুণে জেনে নেবে সেই খবর, এবং তৎক্ষণাৎ সাড়ে বত্রিশ পয়সা জমা করে দেবে সেই ভদ্রলোকের নামে।

অতএব, এবার থেকে বাড়িতে যদি "অবিলম্বে পাঁচজন লোককে এই চিঠিটি পাঠিয়ে দিন, নচেৎ সন্তোষী মার শাপে ঘোর অমঙ্গল হবে' এই মর্মে কোনো পোস্টকার্ড পান, তাহলে ভুলেও ছেঁড়া কাগজের বাক্সে ফেলবেননা। বরং যত্ন করে কপি করবেন, এবং পাঁচের জায়গায় পারলে পঞ্চাশজনকে অবিলম্বে পাঠাবেন। আর হ্যাঁ, এই লেখাটির লিংকও মিনিমাম তিনজনকে পাঠাতে ভুলবেননা যেন। নচেৎ ঘোর অমঙ্গলের আশঙ্কা। জনৈক তারাপীঠ নিবাসী ভদ্রলোক এই লেখাটির প্রিন্ট-আউটের উপর থুথু ফেলেছিলেন, তাঁর বাড়িতে সেই রাতেই ডাকাতি হয়। জনৈক গান্ধীবাদী নেতা, লেখাটি পড়ে ব্যঙ্গের হাসি হেসেছিলেন, সেই দিনই তাঁর মন্ত্রীত্ব যায়। জনৈক সাংবাদিক এই লেখাটির লিংক তিরিশ জনকে পাঠান এবং এক মাসের মধ্যেই চিফ রিপোর্টার হন। জনৈক কমিউনিস্ট চোঙা ফুঁকে এটি অশোকনগর বাজারে প্রচার করায় এক লাফে ডিসিএম হয়ে যান।

অতএব, আপনি, যদি এই লেখা পড়েন, তবে অবিলম্বে তিনজনকে লিংক পাঠিয়ে চক্ষু মুদে পাঁচ মিনিট বসুন, দেখবেন, আপনার মনষ্কামনা পূর্ণ হবে। লেখা শেষ, এবার কাজে নেমে পড়ুন। আর হ্যাঁ, বঙ্গীয় মিডিয়ার নামে একবার জয়ধ্বনী দিতে ভুলবেননা যেন।