নিরুদ্দেশ সংবাদ


লিখছেন -- সোমনাথ দাশগুপ্ত


আপনার মতামত         


ভবিষ্যতের ডানা থেকে খসে পড়া দু-একটা পালক কখনো কখনো বর্তমানের মায়াবী আলো-বাস্তবতায় ভাসতে ভাসতে অতীতে গিয়ে ল্যাণ্ড করে। ধুলোরোদ আর আবছায়ার মারাত্মক কম্বিনেশন থেকে তাকে চিনে নেওয়ার মতো রুস্তম মার্কেটে এখনো খুব একটা নেই। পুজোপ্যাণ্ডেলের নিয়ন-পাটাতনে ঝিনচ্যাক ছেলেমেয়েগুলো যখন ঘ্যামসে জানিয়ে দিচ্ছিল - ""নবনগর থেকে এসেছেন বিপুল প্রামানিক। আপনি হারিয়ে গেছেন। আপনার বাড়ির লোক আপনার জন্য ....'' তখন লাইনে দাঁড়ানো না-দাঁড়ানো ঝারিপ্রবণ তাবৎ বিস্ময়কুৎকুৎ বাঙালী পাব্লিকের গ্রে-ম্যটারে শুড়শুড়ি লেগেছিল কি?

রায়না কাঁটাপাড়া থেকে আসা বিশু মণ্ডল, মাকন্দা রামনাথপুর থেকে আসা রাজীব নস্কর, শালতমালীর জাহানারা খাতুন, আমতলার বিষ্ণুপদ রুঁই, কুচিন্দার সুশীল মাহাতো, ন্যাবাপোঁতার হারুন ইসলাম আপনি হারিয়ে গেছেন। আপনারা হারিয়ে গেছেন। কলকাতায় প্রতিমা দেখতে এসে, কলকাতার প্রতিমা দেখতে এসে আপনারা হারিয়ে গেছেন। ফিরে আসুন। আমাদের অনুসন্ধান কেন্দ্রের সামনে এসে দাঁড়ান। আপনার বাড়ির লোক আপনাকে খুঁজছে। আপনার আট বছরের মেয়ে আপনাকে খুঁজছে। আপনার কপাল-জোড়া-লাল-সিঁদুর-টিপ-বউ আপনাকে খুঁজছে। আপনার বৃদ্ধ বাবা, শিরা-দড়ি-বটবৃক্ষ লোলচর্ম বাবা আপনাকে খুঁজছে। আপনার গ্রাম, ক্ষেত, পুকুর, ধার-কর্জ অস্তিত্ব, কপিলা গাই, ভাঙা মন্দিরের থান, তুলসীতলা, কুয়োশীতল গভীরতা, হিমশিউলি মাটিঘ্রাণ আপনাকে খুঁজছে। আপনি নিজেকে খুঁজে পেলে আমাদের হ্যালোজেন চমক-এ, আমাদের নিরুদ্বিগ্ন নি:সংকট বেঁচে থাকায় ফিরে আসুন। আমাদের মঞ্চের সামনে এসে দাঁড়ান। এক একটা মানুষের হারিয়ে যাওয়ার চাপ এই সাজানো মণ্ডপ এই পাউডার-চিকণ জনস্রোতের সাবলীল নিশ্চিন্তার বুকে হাটু গেঁড়ে বসে; মাথা চাপড়ায়, হাহাকার করে। আমাদের অস্বস্তি হয়। সমস্ত ব্যক্তিগত দীর্ঘশ্বাস ঝড় হতে থাকে, প্রতিটি চোখের জল - বৃষ্টি। কলকাতা ভেসে যেতে থাকে।

ইতিহাস ঘটনাকে মনে রাখে, স্বর্নমুকুটের আভিজাত্য না থাকলে - নাম নয়। চড়তে থাকা স্কাইস্ক্র্যাপার-কলার, টয়োটা-ফারারী গতি, উড়ালপুলের চাউমিন জট-এ সাজতে থাকা কলকাতা; লাল-নীল-সবুজ আলোয় আলোয় চাম্পি ক্যাটওয়াক ছ্যাঁকা সাঁটিস-ফিগার কলকাতাও নাম ভুলে যায়। টালি-দরমার চা-দোকানের আধবুড়ো পিন্টুদা, গরম কয়লার ইস্ত্রি চালানো সোনামাসি আর তার মেয়েটা - চিংকি, জঙ্গল পরিষ্কার করতে আসা হারুকাকা, নারকেল-সুপুরী পাড়তে আসা আসলাম চাচা - তোমরা কোথায়? সাড়া দাও! তোমরা হারিয়ে গেছ! শিগ্গিরি আমাদের অনুসন্ধান কেন্দ্রের সামনে এসে দাঁড়াও! গ্লোবালাইজেশনের বাপের জন্মের কলকাতা হাতছুঁয়ে তোমাদের দেখতে না পেয়ে থমলাগা ইতি-চাউনিতে ঐ দ্যাখো রাজপথে ভোমলা মেরে গেছে। আমাদের বেড়ে ওঠা, আমাদের বেঁচে থাকা, আমাদের অতীতবোধ - স্মৃতিসুগন্ধে মাড়িয়ে যে নির্মমতায় তোমরা জাস্ট "নেই' হয়ে যাচ্ছ তাতে, মাইরি, লোম-টোম শিউরে উঠছে।

এই যে কালীপুজোর আলো-প্যাণ্ডেল খুলে নিচ্ছে আর তিনদিনের হুড়ুমতাল মস্তির গাড়ি হাড়হিম নৈ:শব্দে ডিমি ডিমি আন্ধেরায় গ্যারেজ হচ্ছে, এর পিছনে কোনো আলেয়া-সংকেত নেই কে বলবে? কুকুর-বেড়াল-গোরু-কাক-চড়াই-হকার তাড়িয়ে ভিতহীন যে ক্যন্টিলিভার টেকনোলজীতে কলকাতার স্বপ্নপুরীর হামলাবোল, তার ঠিক নিচেই শ্মশান। রাত বাড়লে আদুলগা বাংলাখোর মাতাল জমাদারদের খিস্তিবিচিন্তায় জঞ্জালপোড়ানো আলো জ্বলে উঠলে উপরের নিয়নসাম্রাজ্য ফ্যাকাশে দেখায়। দামী কাঠের আসবাবে উইয়ের অবধারিত ঔদ্ধত্যের মতো ছড়িয়ে থাকা অন্ধগলি থেকে সস্তার রঙ ঠোঁটে মেখে কলকাতার রাস্তায় রোগারোগা কালো মেয়েগুলো বেড়িয়ে আসে, দিনভর চামড়া চমকানো ঐশ্বর্যের পোর্সেলিন বডির গায়ে পান-গুটখার লালচে ছ্যাপ ফেলে। কলকাতার বেলেল্লা থাইয়ের পিছনে ভাঙা মোটরগাড়ির স্প্রিংওঠা সীটে বা ঝিঁঝিডাকা হাফ-চাঁদের নিচে আনকা কোনো গাছটাছের আবডালে পেঁচা কি শিয়াল সাক্ষী রেখে শিবের পেসাদীর দম ধরে। দেয়াল ঘেঁষে ছন্‌ছন্‌ করে দুর্গন্ধের ধারাজল জমতে থাকে।

সাঁই-চক্‌চক্‌ বড়লোকের কলকাতার পিছনে তাই আধপেটা লালচোখ আর এক ভুতুড়ে কলকাতা যে গুঁড়ি মেরে বসে নেই, কে বলবে? নাহলে এই যে প্রতিদিন কলকাতা থেকে, কলকাতায় এসে এত এত মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে - এরা কোথায় যাচ্ছে? দিনে দুবার ক্লীন শেভ মুখের ভিড়ে আধপাকা খোঁচাখোঁচা দাড়িওলা ঈষৎ পাগলাটে এইমাত্র-ছিল চোখগুলো এখন কোথায়? দড়িবেড়িয়ার থেকে এসেছেন সুজন হাঁড়ি, লাঠিপুকুর থেকে এসেছেন শেহনাজ চৌধুরি, খড়িশপুকুরের বাঁকে রায়, কামলা চকচাটুরিয়ার লক্ষ্মী হাইত, মিলনবৈষ্ণবপুরের নিতাই গোঁসাই। আপনাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আপনাদের পাওয়া যাচ্ছে না। আপনারা পরিবারের লোকজনের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। আমাদের এগিয়ে চলার গতির সঙ্গে তাল রাখতে পারেন নি, পিছিয়ে পড়েছেন। হারিয়ে গিয়েছেন। আপনারা আমাদের অনুসন্ধান কেন্দ্রের সামনে চলে আসুন। যদি না খেতে পেয়ে বা দ্রুতগামী হাইওয়ে ট্রাকের তলায় বা জমি বন্ধক রেখে গলার কলসী বেঁধে গঙ্গায় হারিয়ে গিয়ে থাকেন তো আপনাদের শরীর, সনাক্তকরণ চিহ্নসহ আমাদের মঞ্চের সামনে এনে হাজির করুন। এই ঝলমলে উৎসব-দিনে, শিল্পনগরীর বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাঝে হুট্‌ করে গায়েব হয়ে যাবেন না। আমাদের ভয় লাগে। আমাদের হাত-পা হিম হয়ে আসে। পাঁজরা বের করে চিৎ হয়ে শুয়ে মুহুর্মুহু হাঁপের টানে কোটর-থেকে-বেড়িয়ে-আসব-আসব-চোখ নিয়ে কোনো অচেনা কলকাতার অশরীরী হাঁ মুখে তোমরা ঢুকে যাচ্ছ না তো? হেই মিলনচাচা! দিলীপ জেঠু! কুমুদকাকী! সাড়া দাও। এইখানে আলোর সামনে এসে দাঁড়াও। আমাদের বেঁচে থাকার ভয় তোমাদের খুঁজছে। আমাদের প্রতিদিনের দৌড়ে যাওয়া গতি তোমাদের খুঁজছে। আমাদের অনিশ্চিত অসহায়তা তোমাদের খুঁজছে।

(অবশ্য সকলেরই জানা আছে যে, দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী এসেছেন এমত মিথ ছড়িয়ে সাইকোলজিক্যালি পূজামণ্ডপে ভিড় বাড়াতেও সব অনুসন্ধান কেন্দ্রেই এসব ঘোষণা করা হয়। তাই সর্বজান্তা বাঙালীর কর্ণেন্দ্রিয়ে হেভি সেজেগুজে বেড়ানো ঘ্যামচ্যাক মেয়েদের হাসি ছাড়া বিশেষ কিছুই এসব দিনে ঢোকেনা। সুতরাং , প্রথম প্যারাগ্রাফে যা বলে দেওয়া হয়েছে সেসব ফালতু রিপীট করার কোনো মানেই হয় না।)