বঙ্গীয় বারোমাস্যা -- লাইনেই ছিলাম দাদা


লিখছেন -- অমিত মজুমদার


আপনার মতামত         


সময়ের হেরফেরে পৌঁছে গেছি হাঁটুভরা জলে
----------------------------------------

বাপ-পরদাদা যখন মাতৃগর্ভে তারও আগে থেকে, আমরা আছি দাদা। সেই কবে সেকেন্দার কাকু যখন হেলেদুলে এসেছিল, আমরা লাইন দিয়ে পিছন পেতে দিয়েছি। ক্যাঁত শব্দে সীলমোহর প্রাপ্তি এবং হাতে হাতে শোধ - যেমন চলাও তেমনি চলি, যেমন বলাও তেমনি বলি। অথচ শালা ঐ বিশ্বাসঘাতক পুরু! হতচ্ছাড়া শুধু লাইনে এল না তা নয়, বলে বসলে কিনা, ""ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ তো দেখনি! আমার মাটিতে গাড়ু হাতে বসতে এলে আমিও ক্যাঁতাব!'' অত:পর,-""গওয়া হ্যায়, চাঁদ তারে গওয়া হায়'' এবং কাকু শেষ অব্দি "বাপি বাড়ি যা' কেস হয়ে ফুটে গেল। কিন্তু আমরা তো আর ফুল নই যে ফুটে উঠে দোলে দোদুল দোলে। অতএব আবার শুরু হল আমাদের ঐতিহ্যকে বজায় রেখে এগিয়ে চলা। একবার শুধু অন্যথা ঘটে। লখাই (সেন) দার সময়ে ঠিক লাইন করে পালাতে পারিনি। অবিশ্যি দাদা যে অমন বেমক্কা লাফ মারবে তা ভাবতে পারি নাই। ফের ঘুরে দাঁড়ালাম পলাশীতে,-""গর্জিলা মোহনলাল নিকটে শমন''-আমাদের আত্মত্যাগ স্মরণীয় হয়ে আছে, থাকবে। তাই তো আজও বাঙালী কোন দুর্বল মূহুর্তে - যখন তার মনে কোন এক বোধ জন্ম লয় - আত্মমগ্ন বলে ওঠে, ""কোথায় খাপ খুলেছ শিবাজি, এ পলাশী!''


আবাদের ইতিকথা লিখে যাব আখরে আখরে
----------------------------------------

এ আমাদের জন্মগত অধিকার। অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলে,লাইন দিয়ে পিছু পিছু গম্ভীর মুখে গেলাম। বাঁদর তিনটেও সঙ্গে এল। বোসের পোলার চেষ্টা চরিত্র ফুটে ফুলকপি হল বটে, তবু, দেখো আমরা পারছি মাম্মি। একটু যে অসুবিধা হচ্ছিল না তা নয়,কারণ এহ বাহ্য। বাঁদরের উকুন বাছতে বাছতে যাওয়া আর কোন ভদ্দরলোকের সহ্য হয়! কিন্তু উপায় কি, ও বেচারাদের দুটো হাতই এনগেজ। আর ওনাকেই বা দোষ দিই কি করে! হাতে লাঠি, তায় দুপাশে দুই মাতা (বদলোকে বলে, থাম বাপু, আর মাতাল করিস নি!)। অগত্যা, "" ইঁউ হি কাট যায়েগা সফর সাথ চলনে সে''। কিন্তু হা কপাল! সে লাইনদশা আর ঘুচলো না যে চালিয়ে খেলব। সাগরকিনারে গিয়ে নুন আনতে হবে,কাটা ঘায়ে মাখাব শালাদের। বোমাবাজি করবি? ওদিকে বসের হুড়কো, এদিকে আমরাও লাইনেই আছি দাদা। ঘরে পান্তা ফুরাল। হানিফ,মহম্মদ,মকবুল,গগন,বিপিন,শশী লাইন দিয়ে জাতে উঠে গেল কবি অথবা নিছক হাজারীবাগের আতার কল্যাণে। এদিকে ওদিকে একটা লাইন টানার আয়োজন শুরু হল। মরিবার সাধ হয় নাই, কেন যে তবুও লাইন পড়ে গেল লাশের। এবারেও, এবারেও আমরা ঐতিহ্য মেনে কোন বাধা দিইনি।


আমরা তো জানি স্বরাজ আনিতে
পোড়া বার্তাকু এনেছি, খাস
---------------------------

আমরা সেদিন আবার বহুদিন পর বেলাইন হয়ে নাচলাম। পায়ের ভঙ্গীর নীচে অজস্র জারজ সন্তান। কিলবিল করতে করতে তারা একসময় ঠিক লাইনে এসে গেল। বাপ, মেয়ে, তার ছেলে,- ঠিক লাইন করে এগোচ্ছিল। মাঝে একখানা ইঁট বেমক্কা সরে যাওয়াতে যেটুকু ভয় ছিল, দেখা গেল তা অমূলক। আমাদের প্রভুভক্তিকে বেলাইন করবে কে! আবার মারলি! মার শালা, কত মারবি মার। একটু সময় লাগলেও বৌমাকে প্রায় বসিয়ে দিয়েছি,বাকিরাও লাইনেই আছে দাদা।


ঘন্টাকর্ণ উবাচ
-------------

ঘন্টাকর্ণ সোজা সাপটা কথার মানুষ। মেট্রোর টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়ে বলে বসল,""আমাদের প্রভুভক্তি কি যাবে না দাদা? বিদেশী, দেশী, বিদেশী - পুরো aba সিরিজ চলছে!"" আঁতকে উঠে বললুম, করিস কি! এসব কথা বলতে নেই বাপ। আমরাও এখন ওদিক পানেই লাইন দিয়েছি। শুয়োরের খোঁয়াড়ে শুধু নাক ঢুকিয়েছি, বাকিটুকু ইন্‌স্‌টলমেন্টে হবে। ""তবে পিছন থেকে টানছো কেন বাপু? হয় হাম খাও, নয় ক্যাঁতাও''- ঘন্টাকর্ণ এবার রীতিমত ক্ষুব্ধ। আবার তাকে বোঝাতে হল । ছাত্রজীবনের ট্রেনিং। বিকেলে মাঠে খেলতে আসিস থেকে শুরু করে ক্রিকেটে বিজ্ঞাপন, পেপসি-কোক হয়ে কিভাবে বিশ্বায়নের কুফলে পৌঁছে যেতে হয় । হড়হড়িয়ে দিলাম ঘন্টার কানে। কিছুক্ষণ গাঁইঁই করে শেষ অব্দি উঠে পড়ল মেট্রোতে, ঠিক যেমনটি আমরা উঠে থাকি স্বেচ্ছায়। বেশ কিছুদিন ঘন্টা আর বেলাইন হয়নি।


আমরা করব জয় নিশ্চয়
----------------------

আলবাৎ করব। কোন শালা আটকায়! তখন থেকেই তো বলছি দাদা, লাইনেই ছিলাম। মাঝে মধ্যে কি যে হয় ঠিক জানি না। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি। তবে এতদিনের অভ্যেস তো, দেখবেন আবার সব ঠিক হয়ে যাবে। সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ব চির পরিচিত লাইনে, ক্যাঁতাব প্রাণপণে। ঐ দেখুন, বলতে না বলতেই আবার সেই চেনা চেনা সারি। আমরা আছি, লাইনেই ছিলাম, থাকব। শুনছেন না, আমাদের জাতীয় সঙ্গীত - ""ফাটাও বিষ্টু, সামনে হরিপদ।''