নায়কোচিত


লিখছেন -- সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়


আপনার মতামত         


টালিগঞ্জের নায়করা অফিস টাইমে মেট্রোরেলে চড়ে বিক্ষোভ দেখাতে গেছেন, তাঁদের জন্য মেট্রোরেলের চাট্টি কামরা বে আইনী ভাবে সংরক্ষিত ছিল, যাত্রীরা সেখানে উঠতে গেলে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি বলে যাঁরা বাজার গরম করার চেষ্টা করছেন, তাঁরা চক্রান্তকারী। জনমানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করাই তাঁদের একমাত্র কাজ। তাঁরা ভুলে গেছেন, নায়করা হলেন জাতির মুখ। ফিল্মে রোমান্স এবং অ্যাকশন করে তাঁরা জগৎ উদ্ধার করেন। একাই একশ জনের মহড়া নেন, পিটিয়ে দেশের শত্রুদের প্যান্টুল খুলে দেন, সোজা কথা? সত্যি কথা বলতে কি, তাজমহল, শচীন তেন্ডুলকার আর বলিউড ছাড়া দেশে আছেটা কি? পার্লামেন্ট আর রাষ্ট্রপতিভবন? ছো:। ইটের তৈরি ওরকম আখাম্বা বিল্ডিং সারা পৃথিবীতে গুচ্ছের আছে, কিন্তু দেখান তো আর এক পিস সলমন খান বা রাজকাপুর? জানেন কি সাম্যবাদী রাশিয়াতেও নাকি ছেলে-বুড়ো কথায় কথায় "মেরা জুতা হ্যায় জাপানী' বলে কোরাসে গান ধরত? নার্গিসকে নাকি স্বয়ং ক্রুশ্‌চেভ বলেছিলেন -- কি বলেছিলেন জানা যায়না, নিশ্‌চয়ই ভালো-ভালো কথাই বলেছিলেন, সুন্দরী ফিল্মস্টার বলে কথা। এতো শুধু সিনেমার কথা, ছোটোপর্দাই বা কম কিসে? বড়ো বড়ো কথা বলছেন, টেলিভিশান চ্যানেলগুলো কি পরিমান সামাজিক দায়িত্ব পালন করে খোঁজ রাখেন? একেকটা মেগাসিরিয়াল কতো কর্মসংস্থান যোগায় জানেন? অস্বীকার করতে পারেন, সেরেফ টিভিতে দেখাল বলেই কুয়ো থেকে প্রিন্সকে তুলতে সেনাবাহিনী নেমেছিল? নইলে ঐ অজ পাড়াগাঁয়ের একটা কুয়োতে পড়ে কে খাবি খাচ্ছে তার খোঁজ কে রাখত? ঐ তো রানীগঞ্জের কোন একটা খনিতে কারা নাকি ডুবে মরলো, কেউ পুঁছেছে? যত্তোসব।

ফালতু গাল না দিয়ে সার কথাটা বুঝুন দাদা। ভুলে যাবেননা সিনেমা আর টিভিই হল দেশের একমাত্র মুখ। বড়ো বা ছোটোপর্দায় যাদের থোবড়া দেখা যায়না, তারা মুন্ডহীন। অ্যাননিমাস। ফিল্মের এক্সট্রা। আর ফিল্মের নায়করা জাতির জনক। তফাত আছে না? ফিল্মি নায়িকার বাড়িতে একটা ব্ল্যাঙ্ক কল এলেই পুলিশ বাপ-বাপ করে বোম্বে থেকে পুনা দৌড়য় কে ফোন করেছে তাকে অ্যারেস্ট করতে, নায়িকাকে একটা আওয়াজ দিলেই গোটা সিটিসেন্টারে স্পেশাল ফোর্স নেমে যায়,আপনার জন্য হবে এসব? থানায় গিয়ে বলুন, বাড়িতে ব্ল্যাঙ্ক কল এসেছে, এফ আই আর করব, বড়বাবু আপনাকেই লক-আপে ঢুকিয়ে বাটাম দেবেন। বলুন রাস্তায় চ্যাংড়া ছোঁড়ারা আওয়াজ দিয়েছে, মিষ্টি হেসে মেজবাবু বলবেন লো-কাট জামা-টামা গুলো পরা এবার বন্ধ করো মা। ফিল্মি নায়ক-নায়িকারা রেস্তোরায় বসে চুমু খেলে, আপনি যদি তার ছবি তোলেন, তাহলে সেটা হল তাঁদের প্রাইভেসিতে হস্তক্ষেপ, আপনার পিছনে গোটা সোসাইটি "ছুঁয়োনা ছুঁয়োনা ছি/ ও যে পাপারাৎজি' বলে নেমে যাবে। আর আপনি আমি যদি পার্কে বসে চুমু খাই, তাহলে সেটা পাবলিক নুইসেন্স, পুলিশ তুলে নিয়ে ম্যারেজ সার্টিফিকেট দেখতে চাইবে। তফাতটা বুঝেছেন?

সোজা বাংলায় আপনি হলেন অ্যাননিমাস। মূর্খ পাবলিক। রাইট ফাইট আপনার জন্য না। মন্ত্রীর স্ত্রী ট্রেনে উঠবেন বলে যদি লাঠি উঁচিয়ে পুলিশ কামরা থেকে নেমে যেতে বলে তো সুড়সুড় করে নেমে যাবেন। ফিল্মি নায়কদের লাল-কার্পেট অভ্যর্থনা দেবার জন্য সরকারী দেহরক্ষীরা যদি ঘাড়ধাক্কা দেয় তো সোনামুখ করে খাবেন। হিরোরা পাবলিক ট্রান্সপোর্টে শখ করে যাতায়াত করবেন বলে এই টুকু স্যাক্রিফাইস করবেননা? হাজার হলেও ওনারা মহৎ কাজে প্রতিবাদ করতে যাচ্ছেন, কষ্ট করে ট্রেনে উঠছেন, আহারে, বেচারিদের পয়সা কড়ি একেবারেই নেইগো, কটা বাসও ভাড়া করতে পারেনি বলে কোথায় একটু সহানুভূতি প্রকাশ করবেন, তা না অকারণে চিল্লামিল্লি।

এতো করে বোঝালাম, তবু বুঝবেননা? যান-যান আপনাদের চেনা আছে। আজকে পুলিশ কেন নামিয়ে দিল বলে গজগজ করছেন, সেতো আমরা তুলছি বলেই। দুদিন বাদেই হেডলাইন থেকে হাওয়া করে দেব, তখন এসব বিপ্লব ফুটুর ডুম হয়ে যাবে। তিনদিন পরেই পাবলিক মেমোরি থেকে সব উবে যাবে, তখন আবার এই পুলিশের পিছনেই স্যারস্যার করে ঘুরবেন। মন্ত্রী দেখলেই ছোটো ছেলেটার চাকরির কথা তুলবেন। রাস্তায় নায়ক দেখলেই হ্যাহ্যা করে পিছন পিছন দৌড়বেন অটোগ্রাফ নেবো বলে। আর পাড়ায় এসে চায়ের দোকানের ভজুর কাছে রেলা নেবেন -- জানিস অমুককে দেখলাম, ঠিক দুফুট দূরে -- কি স্কিন মাইরি, ঠিকরে আলো বেরোচ্ছিল। কাজেই চেঁচাচ্ছেন চেঁচান, শির উঁচিয়ে চেঁচান, শিরা ফুলিয়ে চেঁচান, যা করতে পারেন করে নিন, ও নিয়ে আমাদের বিশেষ মাথাব্যথা নেই।