বইমেলা হোক বা নাহোক চটপট নামিয়ে নিন রঙচঙে হাতে গরম গুরুর গাইড ।

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--8


           বিষয় : বুদ্ধ -- এক অনন্ত অডিসিঃ একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া
          বিভাগ : বই
          শুরু করেছেন :রঞ্জন
          IP Address : 232312.161.560123.106 (*)          Date:08 May 2019 -- 01:12 PM




Name:   রঞ্জন          

IP Address : 232312.161.560123.106 (*)          Date:08 May 2019 -- 01:23 PM

[ গুরুর পাতায় বেশ কয়েকবার বৌদ্ধ দর্শন নিয়ে অনেক মিনিময় হয়েছে। তাতে আপাতঃ জটিল বিষয়ের কিছু প্রশ্ন , যেমন বুদ্ধ ঈশ্বরে আত্মা ও পরজন্মে বিশ্বাস করতেন কি না , বৌদ্ধধর্মকে আদৌ প্রচলিত অর্থে ধর্ম বলা যায় কি না , নির্বাণ খায় না মাথায় দেয় এবং আদি বৌদ্ধধর্মের স্বরূপ কী ছিল, ত্রিপিটকে আসলে কী লেখা আছে-- ইত্যাদি ইত্যাদি।
শিবাংশু দে এখানে উল্লেখনীয় ভাবে কয়েকবার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু আমরা অনধিকারীরা সবসময় বলেছি--'অতি অল্প হইল'।
উনি আশ্বস্ত করেছিলেন যে এ নিয়ে কাজ করছেন এবং একটি বড় বই লিখে এসব প্রশ্নের জবাব দেবেন। তা উনি লিখে ফেলেছেন বেশ বড়সড় এক বই।গত বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে, যা পড়ে আমি যাকে বলে উলুত পুলুত। এই লেখা এক মুগ্ধ পাঠকের পাঠ প্রতিক্রিয়া মাত্র। এর পর প্রশ্নের উত্তর শিবাংশু নিজে দেবেন}


Name:  রঞ্জন          

IP Address : 232312.161.560123.106 (*)          Date:08 May 2019 -- 01:25 PM

বুদ্ধ –এক অনন্ত অডিসিঃ একটি পাঠ-প্রতিক্রিয়া
রঞ্জন রায়
বইটি কেন পড়লামঃ
চার দশক আগে আমার হাতে একটি বই এসেছিল— দিল্লির পিপলস পাবলিশিং হাউসের বুদ্ধ। তাতে দুটি প্রবন্ধ—রাহুল সাংকৃত্যায়ন ও দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা—আমাকে যুগপৎ বিস্মিত ও আনন্দিত করেছিল।
আসলে সেই কুড়ি বছর বয়সে আমরা সবাই আগুনখেকো মার্ক্সিস্ট ছিলাম। মার্ক্সবাদের তিনটি বৈশিষ্ট্য আমাদের আকর্ষণ করত—প্রথমতঃ নৈতিক আবেদন। কেন এই ধরার সন্তানেরা সবাই সমান অধিকার পাবে না ? দ্বিতীয়তঃ নিরীশ্বরবাদ; আকাশবাণীতে শোনা হীরালাল সরখেলের গানঃ
‘ ভগবান, তুমি এখনও কেন যে নীরব রয়েছ, তাই
তোমার সৃষ্টি তোমার বিধান কিছু না মানিতে চাই’।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হল দ্বন্দ্বতত্ত্ব; এর চিন্তাজগতে আবেদন একেবারে অন্যরকম। এর থেকে আমাদের প্রত্যয় হল যে উপরের দুটো ধারণা শুধু আবেগসঞ্জাত নয় , এর গভীর যুক্তিসংগত ভিত্তি আছে। সে ভিত্তি প্রকৃতির বৈশিষ্ট্য, আপন মনের মাধুরীজাত নয় । ব্যস, আমাকে আর পায় কে ? নতুন দাঁত ওঠা শিশুর মত সবাইকে এই বোধবুদ্ধি দিয়ে কামড়াতে থাকি, গায়ে পড়ে তর্ক করি । কিন্তু একটা ব্যাপার মনের মধ্যে খচ খচ করত। এইধরণের দর্শন বা মতাদর্শ নাকি ভারতীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী।
সৃষ্টিকর্তা্‌ পালনকর্তা ও বিনাশকর্তা ঈশ্বরে দ্বিধাহীন আস্থা ভারতীয় মননের ভিত্তি। কাজেই এইসব আমদানী করা বীজ এদেশের জমিতে ফলবে না ।
ওই দুটো প্রবন্ধ বলল যে ছোটবেলা থেকে যা শুনে বড় হয়েছি তার সবটাই যে সত্যি এমন নয় । বুদ্ধ দেহের বাইরে আত্মা ও কোন সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের মাহাত্ম্য প্রচার করেন নি । তিনি দুঃখময় মানব জীবন, তার কারণ, তার নিদান এবং সে অনুযায়ী সঠিক জীবনযাপনের কথা বলেছেন। তাঁর নির্বাণ কোন পরমাত্মার সঙ্গে জীবাত্মার মিলন নয়। এবং প্রচলিত অর্থে বৌদ্ধধর্মকে আদৌ ধর্ম বলা যায় কি না তা নিয়েও সন্দেহ আছে। তাহলে নিরীশ্বরবাদ, যুক্তিবাদ এগুলো অভারতীয় নয়? বরং আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল ট্র্যাডিশনের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ! বুকের ছাতি চওড়া হল। যাক গে, ভুল রাস্তায় হাঁটিনি।
আরও জানলাম—বুদ্ধ শাস্তা বা শিক্ষক বটেন, কিন্তু বিচার করতে বলেন। ভাবতে বলেন। তাঁর ধ্যান কোন অতীন্দ্রিয় উপাসনা নয় । বরং প্রাত্যহিক জীবনের কোলাহল থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে আত্মমগ্ন হয়ে নিবিড় চিন্তা। ইনি বলেন না যে –আমার আচার বিচার ভুলিয়ে দে মা!
বরং শ্রদ্ধা ও ক্ষমতার শীর্ষে বসে বলেন ‘আত্মদীপো ভব’। নিজেই নিজের পথপ্রদর্শক দীপশিখা হও। নিজের প্রচারিত নীতিকেও অজর অমর অচল বলেন না । বরং মানুষ যেমন নৌকোয় চড়ে নদী পার হবার পর নৌকোকে বালির উপর উলটো করে রেখে ঘরে যায়, মাথায় বয়ে নিয়ে যায় না, তাঁর উপদেশও এর বেশি সম্মান আশা করে না ।
যাচ্চলে! ইনি তো গুরুবাদের শেকড় ধরে টান দিয়েছেন।
তাহলে এত যে বুদ্ধমূর্তি, চৈত্য, বিহার, স্তুপ? জাতককথা? ফ্রেস্কো? ইউরোপীয় গির্জার মত?
ধীরে ধীরে বুঝতে পারি কয়েকহাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান, তার অনেক পরিবর্তন, অনেক বাঁকবদল, অনেক ব্যাখ্যা, অনেক দলাদলি। হীনযান, মহাযান, বজ্রযান, ডাকিনীযান ওরে বাবা! তারপর তিব্বতী তংখায় কত চিত্রবিচিত্র কারুকার্য! পদ্মপাণি অবলোকিতেশ্বর, পদ্মসম্ভব, তারাদেবী! বোধগয়া, রাজগীরের বিপুলগিরি আর ধর্মশালা ও ম্যাকলাউডগঞ্জে ধর্মচক্র ঘুরিয়ে ‘ওং মণিপদ্মে হুং’ মন্ত্র বলে পাপস্খালন। তাহলে সনাতনী হিন্দুধর্মের সঙ্গে ফারাক রইল কোথায়!
অহিংসার বাণী? প্রাণীহত্যার বিরোধিতা? ‘নিন্দসি যজ্ঞবিধেয়রহযাতম, সদয়হৃদয়দর্শিত পশুঘাতম’! এ তো আমাদের বৈষ্ণবধর্মেও আছে। তাহলে কী বুদ্ধ আসলে বিষ্ণুর নবম অবতার মাত্র? মাথায় যন্ত্রণা শুরু হয়। আর ‘পতীচ্চসমুৎপাদ তত্ত্ব’ ? মানে বৌদ্ধদর্শনের ল’ অফ কজালিটি? কার্যকারণসম্পর্ক? তার এত রকম জটিল ব্যাখ্যা? একেকটা স্কুল অফ থটস একেকরকম কথা বলে। ‘নির্বাণ’ নিয়েও সেই ঝামেলা। চারটে প্রধান স্কুল অফ থট—বৈভাষিক, সৌত্রান্তিক, মাধ্যমিক(শূন্যবাদী) এবং যোগাচার (বিজ্ঞানবাদী) – সবার ‘নির্বাণ’ ও ‘পতীচ্চসমুৎপাদ’ আলাদা। বেশ সূক্ষ্ম ব্যাপারস্যাপার। এ নিয়ে ন্যায়, মীমাংসা ও বেদান্তের সঙ্গে সে কী তর্ক! একেবারে ‘পাত্রাধার কি তৈল, নাকি তৈলাধার কি পাত্র’ ! মানছি, এর ফলে ভারতের লজিক বেশ উচ্চমার্গে পৌঁছে গেল। কিন্তু বেল পাকলে আমার মত কাকের কী?
আমার সবকিছু গুলিয়ে যায় ।
তা হবে, যদি দুশো বছরের পুরনো মার্ক্সবাদের ব্যাখ্যা নিয়ে আজ ‘যত মত, তত পথ’ হয়ে যেতে পারে, তাহলে এর অডিসি তো আড়াইহাজার বছরেরও বেশি। মনটা একটু শান্ত হয়, কিন্তু মনের মধ্যে সোডার মত প্রশ্ন বজবজিয়ে ওঠে।
আসলে বৌদ্ধদর্শন কি বলতে চায়? আত্মা আছে , না নেই? নিজেদের অনাত্মবাদী এবং ক্ষণিকবাদী (মানে শাশ্বত বলে কিছু নেই) দাবি করলেও পরজন্মের প্রশ্ন আসে কী করে ? আর জাতক কথার গল্পগুলো? যাতে বোধিসত্ত্বের হাজার জন্ম? সবাই নাকি বারাণসী নগরে ব্রহ্মদত্ত রাজার রাজত্বে জন্মেছিলেন? আবার ‘দশরথজাতকে’ রামপন্ডিত, লক্ষ্মণ পন্ডিত, সীতাপন্ডিত—সবাই ভাইবোন! এদের কোথায় রাখি? আচ্ছা, এমন দর্শন, এমন ধর্ম, কিন্তু জন্মস্থল ভারতবর্ষ থেকেই উপে গেল কেন? চিনে বৌদ্ধধর্ম কনফুসিয়স -লাও জু’র পাশাপাশি সমান জায়গা করে নিয়েছে। জাপানে শিন্টো ধর্মকে প্রায় হঠিয়ে দিয়েছে। শ্রীলংকা, বার্মা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কাম্বোডিয়াতে রাজধর্ম হয়েছে, কিন্তু ভারতে? বিষ্ণুর দশাবতারের ন’নম্বর? এ যেন মার্ক্সের জার্মানিতে বিপ্লব না হয়ে রুশ-চিনে কেন হল সে নিয়ে মাথা ঘামানো! মাথার যন্ত্রণা বেড়ে যায় ।নাঃ, বৌদ্ধসাহিত্য পড়তে হবে। নিজের মুখে ঝাল খেতে হবে।
বাংলায় অশ্বঘোষের ‘বুদ্ধচরিত’ আর ইংরেজিতে ‘ধম্মপদ’। ওল্ডেনবার্গের বুদ্ধ ও মিসেস রাইস ডেভিস। আদ্দেক পড়ে হারিয়ে ফেলি ‘মিলিন্দ পঞহো’—রাজা মিনান্দার এবং ভিক্ষু নাগসেনের ডায়লগ। মজ্ঝিমনিকায়ের খোঁজ পাই নে ; খামচা খামচি করি আর্থার লিলি’র বুদ্ধ ও কিছু পেঙ্গুইনের বই নিয়ে , মাথায় ঢোকে না , খেই হারিয়ে যায় ।তবে কি গুরু ধরলে বুঝতে পারবো? ধর্মশালায় ইন্সটিট্যুট অফ বুদ্ধিস্ট ডায়লেক্টিক্সে এক লামাকে ধরি, --বুঝিয়ে দিন, আপনাদের শূন্যবাদ পুরোপুরি অনস্তিত্ব বা নাস্তি বা শূন্য কি না ! উনি খানিকক্ষণ কথা বলে শেষে দিল্লির টিবেটান স্টাডিজ এর অধ্যক্ষের নাম ও ফোন নম্বর দেন। দু’দিন ক্লাস করি । শ্রদ্ধা চটে যায় । কোথায় দর্শন ও লজিক নিয়ে আলোচনা? এ তো ডায়মন্ড সূত্র ও লোটাস সূত্র নিয়ে ‘গতে গতে পরাগতে’ করে আমার মিশনের ধর্মক্লাসের মত। মনে হয়, এই তিব্বতীয় শূন্যবাদী মহাযান আমার কাজে আসবে না । যেতে হবে কোলকাতায় হীনযানীদের খোঁজে।
পেলাম একজন চমৎকার ভিক্ষুর খোঁজ। দেখলাম এঁরা সবাই ত্রিপুরা থেকে আগত বড়ুয়া। এঁরা হীনযানী, অনেক বইয়ের বাংলা অনুবাদ করিয়েছেন। উনি নিজে পালিভাষায় ডক্টরেট। কিন্তু সেই থোড় বড়ি খাড়া! দর্শনে উৎসাহ নেই। বুদ্ধের অলৌকিক সব পুরাণকথায় বিশ্বাস। শ্রীমতী রীজ ডেভিসের একটি চমৎকার বইয়ের বাংলা অনুবাদ দিলেন বটে, কিন্তু সতর্ক করে দিলেন – এ লেখা কিন্তু ভক্তের দৃষ্টিতে লেখা নয় । রোজ সকালে আমাকে হোয়াটস অ্যাপে ধর্মপদের দু’তিনটে সূক্ত পাঠাতেন আর সংগে বুদ্ধের বিভিন্ন মূর্তির ফটো। এমন সময় বার্মায় আর্মির রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে খতম অভিযানের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। অমনই সেই বৌদ্ধ ভিক্ষু অন্য রূপ ধারণ করলেন। রোজ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে তাদের এথনিক ক্লিন্সিংকে ন্যায়োচিত সিদ্ধ করায় মেতে উঠলেন। কোথায় বৌদ্ধভিক্ষু সুলভ মুদিতা, করুণা?
হাতে এল বইটিঃ
এই সময়ে হাতে এল ঋতবাক প্রকাশনের এই বইটি—‘বুদ্ধ, এক অনন্ত অডিসি’। লেখক শ্রী শিবাংশু দে। হার্ডকভারে সুন্দর ছাপা ও বাঁধাই বইটির মূল পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৬০, অক্ষরগুলো বড় নয় । মাঝে মধ্যেই আছে উদ্ধৃতি--- বাংলায় এবং ইংরেজিতে, সেগুলোর ফন্ট সাইজ বেশ ছোট, পড়তে অসুবিধে হয় না , তবে বুঝতে পারি বইটি বেশ বড় – আকারে ও অন্তর্বস্তুতে। শেষ পাতা উলটে দেখি ঋণস্বীকার করা বইয়ের তালিকা, যাতে উৎসাহী পাঠককুল নিজেরা মিলিয়ে নিতে পারেন। সে তালিকা মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মত—বাংলা বই ৪৬, ইংরেজি ৭৭। অবাক হয়ে দেখি দীঘঘনিকায়, মঝঝিম নিকায়, থেরীগাথা সবই বাংলায় আছে। ঠিক করে ফেলি পড়া শেষ হলে লেখককে ধরতে হবে --বইগুলোর প্রাপ্তিস্থান জানার জন্যে।
পড়ে ফেলি প্রকাশকের কথা , সৌম্য ব্যানার্জী নামের একজন ধীমান সুধী পাঠকের বক্তব্য। কিন্তু মুল বইটি পড়ে থাকে আমার বিছানায়, বালিশের পাশে। কেটে যায় একমাস। কারণ সৌম্য ঠিক বলেছেন—এই বইটি পাঠকের কাছে বিশেষ অভিনিবেশ দাবি করে । তারপর এক রবিবারে বইটি হাতে তুলে নিই আর পরের রবিবারের সকালে শেষ করে চুপচাপ শান্ত হয়ে বসে থাকি। কারণ, এটা মনে হল লেখক যেন বইটি আমার জন্যেই লিখেছেন।
কুড়িটি অধ্যায়ে একের পর এক যত্ন করে গড়ে তুলেছেন বুদ্ধের আবির্ভাব, তাঁর জীবনের প্রবাহ এবং দর্শনের কাঠামো। উনি বলতে গেলে আমারই প্রজন্মের এবং চিন্তায় ও মননে মার্ক্সবাদী ইতিহাসচর্চার অনুসারী। কিন্তু কোথাও তাঁর মার্ক্সবাদে আনুগত্য ইতিহাস ও দর্শনচর্চায় স্রোতের মধ্যে নুড়ির মত জেগে উঠে পাঠককে হোঁচট খাওয়ায় না । বরং ওই আনুগত্য তাঁর লেখায় একটা অ্যাকাডেমিক ডিসিপ্লিন এনেছে। বোঝা যায় যে তাঁর কাছে বুদ্ধ কোন আকাশ থেকে খসে পড়া তারা নয়; বরং এক মহামানব যিনি সময়ের থেকে অনেক আগে এসেছিলেন। তবে তিনি ইতিহাসপুরুষ, পৌরাণিক ন’ন, তাই তাঁর চিন্তায় নির্দিষ্ট দেশ-কালের ছাপ স্পষ্ট।
শিবাংশু তুলে ধরেছেন এই মানব বুদ্ধকে। তার জন্যে তাঁকে কয়েক সহস্রাব্দ ধরে গড়ে তোলা বিভিন্ন মিথ, রূপকথা, অলৌকিক মহিমার গল্প থেকে মাখনের মত ছেঁকে বার করতে হয়েছে ইতিহাসের উপাদানকে। অসীম ধৈর্য ও মনোযোগের সঙ্গে তিনি বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী তথ্য খুঁটিয়ে দেখেছেন, সমসাময়িক ইতিহাসের সাক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে কতটুকু গ্রহণযোগ্য, কতটা বেনেফিট অফ ডাউট দেয়া যেতে পারে সে বিষয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্তে পৌঁছেচেন। তাই বইটি আদৌ বিভিন্ন বই থেকে তুলে আনা কাট-পেস্টের পল্লবগ্রাহী সমাহার নয় , বরং নিজের অধ্যয়ন ও জিজ্ঞাসার ফলে প্রাপ্ত উপলব্ধির সমন্বয় । এটা বোঝা যায় অধ্যায়গুলি ও তার ক্রম সাজানো দেখে । আর এই পদ্ধতি শুধু ইতিহাসচর্চার মান্য পদ্ধতিই নয় , বুদ্ধ স্বয়ং আনন্দকে বলে গেছলেন যে তাঁর মহাপরিনির্বাণের পর কেউ যদি কোন বক্তব্যকে ‘বুদ্ধ এইরূপ বলিয়াছেন’ বলে দাবি করে তবে তা এককথায় গ্রহণ বা বর্জন কোনটাই না করে আগে যা স্বীকৃত বাণী তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না তা পরীক্ষা করে নিতে হবে।
এই স্বল্প পরিসরে আমার মুগ্ধতাকে সরিয়ে রেখে আমি বইটির কতকগুলো দিক তুলে ধরতে চাইছি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়ে রয়েছে বুদ্ধের পূর্ব ইতিহাস এবং সমকালীন পরিস্থিতি। এখানে শিবাংশু অনেক পরিশ্রমে গড়ে তুলেছেন একটা ঐতিহাসিক-সামাজিক প্রেক্ষাপট যা প্রায় প্রতিমার চালচিত্রের মত। আমরা দেখি বুদ্ধদর্শন অসাধারণ হয়েও কোন আকস্মিক সমাপতন নয় ।
অনেক সময় যান্ত্রিক মার্ক্সবাদী ব্যাখ্যায় লেখকের নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে জোর করে চেরি-পিক করা কিছু তথ্যকে মেলানো হয়, যেন সবাইকে বাটার সাত নম্বর জুতো পায়ে গলাতে হবে। শিবাংশুর বইটি একটি আনন্দদায়ক ব্যতিক্রম। আমি এবার বলব ত্রয়োদশ অধ্যায়ের কথা , যেখানে বৌদ্ধসাহিত্যের মুখ্যগ্রন্থগুলো, তাদের রচনাকাল, রচনার প্রেক্ষিত ও বর্তমান স্বরূপের কথা । জেনে অবাক হই যে বুদ্ধবচন বলে যা জানি, যা শুনি তার কোনটাই বুদ্ধের জীবৎকালে লিপিবদ্ধ নয় , চার-চারটে মহাসংগীতির বাধ্যবাধকতায় লেখা। এগুলো ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন কালখন্ডে যাদের মধ্যে এক থেকে কয়েক শতাব্দীর ফারাক। এবার ‘পতীচ্চসমুৎপাদ’ এবং ‘নির্বাণ’ নিয়ে বিভিন্ন স্কুলের আলাদা ব্যাখ্যার কারণ বোধগম্য হয়।
তাঁর মহাযানী বৌদ্ধদর্শন ও গুপ্তযুগের রাজতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে আলোচনাটি মূল্যবান। এ নিয়ে অধ্যাপক রামশরণ শর্মা ও দামোদর কোশাম্বীর ভালো থিসিস আছে। তবে শিবাংশুর কৃতিত্ব স্বল্প পরিসরে আদি বৌদ্ধধর্মের উত্থানে বণিককুলের ভূমিকা নিয়ে চমৎকার আলোচনা এবং শুঙ্গবংশীয় রাজাদের সময় অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে মহাযানী দর্শনে সনাতনী দেবদেবীদের নতুন রূপে প্রবেশের বর্ণনাটি।
দশম এবং একাদশ অধ্যায়ে সহজযান ও সহজিয়াবাদ, বিশেষ করে বঙ্গে সহজিয়াসাধনার উৎস হিসেবে মহাযানী বৌদ্ধদর্শনের অবদান নিয়ে চর্চাটি অত্যন্ত আকর্ষক । হটাৎ চোখের সামনে থেকে একটা পর্দা সরে যায় । কেন ছোটবেলায় ‘নেড়ানেড়ি’দের আখড়া শব্দবন্ধের মাধ্যমে বৈষ্ণবদের সাধন নিয়ে বাঙালী ভদ্রলোকদের কটুক্তি অন্য মাত্রা পায় সংঘে ভিক্ষুণীদের স্থান অধ্যায়টি আজকের দিনে একটি জরুরী সংযোজন। নারীদের সম্মান এবং সমান অধিকার বৌদ্ধ সংঘেও আজকের বিচারে ন্যুন। এ নিয়ে শিবাংশু স্পষ্টবক্তা। তবে আমার ব্যক্তিগত আগ্রহ যে শিবাংশু যদি পরবর্তী সংস্করণে এর সঙ্গে বৌদ্ধ সংঘে দাসদের কী অবস্থা এ নিয়ে বিনয়পিটকে কিছু আছে কি না-- যদি এক প্যরাগ্রাফ জুড়ে দেন। ওল্ডেনবার্গ বা অন্য কারও লেখায় পড়েছিলাম যে স্বামীর থেকে পলাতক দাসদের সংঘে নেওয়া হত না ।
ধ্যান, নির্বাণ ও নাস্তিকতা নিয়ে ফোকাসড আলোচনা রয়েছে পঞ্চদশ থেকে সপ্তদশ অধ্যায় পর্যন্ত। অষ্টাদশ অধ্যায়ে মহাপরিনির্বাণসূত্রে বুদ্ধের জীবনের অন্তিম পর্যায়ের ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে জরুরী তথ্য রয়েছে। আবার এক অর্থে এই অধ্যায়ে মূল বক্তব্যের সারসংক্ষেপ রয়েছে।
আমি চেষ্টা করছি বইটির মূল প্রতিপাদ্যটি দু’কথায় তুলে ধরার।
শিবাংশু চেষ্টা করেছেন গবেষণা করে বৌদ্ধধর্ম ও দর্শনের আদি স্বরূপকে তুলে ধরতে; অর্থাৎ এইসব বিভিন্ন যানের অনেক আগে গৌতমবুদ্ধের জীবনকালে তাঁর ধর্মাচরণের রূপটি কী ছিল, তাঁর শিক্ষা আসলে কী ছিল।
বুদ্ধ ঈশ্বর, আত্মা, স্বর্গ-নরক, জন্মান্তরবাদ –এসব নিয়ে মাথাঘামানো অর্থহীন মনে করতেন। কারণ তাঁর জিজ্ঞাসা ‘ কে তুমি, কী হেতু এলে, আপনারে ভুলে গেলে!’ গোছের ছিল না । তাঁর সাধনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সর্বমানবের কল্যাণ।
তিনি যে চার আর্যসত্য পেলেন তাতে ঈশ্বর/আত্মা/মুক্তি এসব নেই। তাঁর মতে জীবন দুঃখময়। দুঃখের কারণ আছে—তৃষ্ণা বা আকাঙ্খা। দুঃখের নিরোধ সম্ভব,-- তৃষ্ণার দমন। কী করে ? অষ্টাঙ্গ মার্গ অনুযায়ী জীবন যাপন করে । অর্থাৎ সৎকার্য, সৎচিন্তা আদি আটটি সৎ বিচারের অনুপালন। তাই শিবাংশু বলছেন যে এটি আসলে প্রচলিত অর্থে ধর্ম নয় , বরং এক জীবনযাপনের নৈতিক গাইড, এতে কোন পূজার্চনা, বলি বা ভোগ দিয়ে দেবতাকে সন্তুষ্ট করে বর পাওয়ার প্রথা নেই। বরং সমস্ত অতিবাদ ছেড়ে মধ্যমমার্গ অনুসরণ করে তৃষ্ণার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ‘ভব’ বা ‘বিকামিং’ এর চক্র থেকে মুক্ত হওয়া-এটাই বুদ্ধ উদ্দিষ্ট নির্বাণ। তাই একে যদি ধর্ম বলতেই হয় তো বলা উচিত ‘সদ্ধর্ম’। এমনকি পতীচ্চসমুৎপাদ বা বুদ্ধ দর্শনের কার্যকারণসম্বন্ধ ব্যাপারটাও এত জটিল নয় যে আমার মত সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে না । সরল ভাবে বললে—যা কিছু উৎপন্ন হয়, তার বিকাশ হয়ে নাশও হয়। সব অস্তিত্বই ক্ষণিক, এছাড়া কোন শাশ্বত তত্ত্ব নেই। কোন কিছু উৎপন্ন হবার পেছনে কোন কারণ থাকে। সেই কারণের বিনাশ বা অনস্তিত্ব ঘটলে ফল বা কার্যটির অস্তিত্বেরও নাশ হয়। যেভাবে দুঃখ উৎপন্ন হয় তৃষ্ণা বা আকাঙ্খা জনিত কারণের ফলে। কাজেই তৃষ্ণার বিনাশ ঘটলে তজ্জনিত দুঃখেরও বিনাশ হয়।
শেষ দুটি অধ্যায়, ‘শাক্যমুনির বাড়ি ফেরা’ এবং ‘বুদ্ধ ও রবীন্দ্রনাথ’ এই বইটিকে এ’ধরণের অন্য বইয়ের থেকে আলাদা করেছে।
প্রথমটি আসলে ভারতে বিশেষ করে কলোনিয়াল কোলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটির স্থাপনা থেকে শুরু করে ইংরেজ রাজপুরুষদের হাতে আধুনিক ভারতবিদ্যা চর্চার সংক্ষিপ্ত, কিন্তু চিত্তাকর্ষক বর্ণনা। দেখা যাবে কীভাবে বুদ্ধজীবনের প্রামাণ্য দস্তাবেজ ও তার ইতিহাসের নির্মাণ নানা ঘুরপথ ও পাকদন্ডী বেয়ে এগিয়ে গেল।
আর রবীন্দ্রনাথের চোখে বুদ্ধ ঠিক কী ছিলেন তার প্রামাণ্য বিবরণ আছে শেষ অধ্যায়ে। আমরা খালি কিছু কবিতার টুকরো, ‘নটীর পূজা’, ‘ভিক্ষুণীর অধম সুপ্রিয়া’ আর ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’ শুনেই অভ্যস্ত। রথী ঠাকুর এবং কবির লেখায় বুদ্ধ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ কতখানি ব্যাপক আমরা জানতাম না । জানতাম না বোধগয়া ও তার ট্রাস্টের অধিকার নিয়ে সিস্টার নিবেদিতা ও বৌদ্ধদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিবেকানন্দের প্রভাবে নিবেদিতা বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার ধরে নিয়ে এর নিয়ন্ত্রণ হিন্দুদের হাতেই রাখতে আগ্রহী ছিলেন। কবির অনাবিল দৃষ্টি অন্যমত পোষণ করায় নিবেদিতার সঙ্গে সম্পর্কে চিড় ধরেছিল—এই তথ্যের জন্যে শিবাংশুকে ধন্যবাদ।
এই বিশাল গ্রন্থরচনার পেছনের অধ্যবসায় এবং স্কলারশিপ অসাধারণ। আমার একটা জায়গায় একটু খটকা লেগেছে।
শিবাংশু বইটির ৯২ পাতায় বলছেন—‘ শূন্যবাদের ভিত্তি রয়েছে পূর্বমীমাংসা দর্শনজাত মায়াবাদে’। মনে হয়’পূর্ব মীমাংসার জায়গায় ‘উত্তর মীমাংসা’ বা শংকরাচার্যের অদ্বৈত বেদান্ত হবে। পূর্ব মীমাংসায় যাগযজ্ঞের যৌক্তিকতা আছে। বিশ্বের অস্তিত্ব আছে। বেদ এবং ব্রহ্মান্ড আবহমানকাল ধরে রয়েছে, কোন স্রষ্টা ঈশ্বর নেই। কিন্তু উত্তরমীমাংসার শংকরাচার্যের ব্যাখ্যায় রয়েছে ব্যক্তি ঈশ্বরের জায়গায় নিরাকার ব্রহ্ম, এবং জগত মিথ্যা, মায়ার সৃষ্টি। তাই দ্বৈতবাদী মধ্বাচার্য এবং আরও অনেকে শংকরাচার্যকে ‘প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ’ বলতেন। অদ্বৈত বেদান্তে নাগার্জুনের মাধ্যমিক দর্শন বা শূন্যবাদের প্রভাব নিয়ে অনেক দার্শনিক সরব হয়েছেন।
প্রকাশকের থেকে জেনেছি যে বইমেলায় প্রকাশের পর এই কয়েকমাসেই প্রথম মুদ্রণের বই প্রায় শেষ। বাংলা বইয়ের পড়তি বাজারে এমন একটি বইয়ের কাটতি জ্ঞানচর্চায় বাঙালীর আগ্রহ নিয়ে আশার কোথা শোনায়। তবে কৃতিত্বের সিংহভাগ নিশ্চয়ই লেখকের প্রাপ্য। পরবর্তী সংস্করণের প্রত্যাশায় রইলাম।
==================================================================




Name:  PM          

IP Address : 342312.108.454523.61 (*)          Date:09 May 2019 -- 08:57 PM

সমালোচক কে অশেষ ধন্যবাদ। এটা পড়ার পরে বইটা না পড়া ক্রাইম। কিভাবে পাবো বইটা?


Name:  রঞ্জন          

IP Address : 232312.180.6790012.243 (*)          Date:09 May 2019 -- 11:26 PM

কলেজ স্ট্রিটে পাওয়া যাচ্ছে।
তবেঁ শিবাংশু আরও বিশদ বলতে পারবেন।


Name:   শিবাংশু           

IP Address : 5645.249.2378.101 (*)          Date:10 May 2019 -- 03:14 PM

@PM
প্রকাশক জানিয়েছেন বইটি পাওয়া যাবে,

কলেজস্ট্রীটের দে'জ পাবলিশিং - 033 2219 7920 / 2241 2330
দে বুকস্টোর - 9836863353
অভিযান বুকস্টোর - 8017194145
অরণ্যমন - 7278992540
ঋতবাক অনলাইন শপ - https://www.facebook.com/rritobak/
বইচই.কম
অ্যামাজন.ইন
------
@রঞ্জন,
অনেক ধন্যবাদ। আপনার এই 'পাঠপ্রতিক্রিয়া'টি বস্তুত একজন আধুনিক, অগ্রসর মননের পাঠক বা অনুসন্ধিৎসুর বুদ্ধজিজ্ঞাসা। একটি নথিবদ্ধ, প্রশ্নশীল অনুসন্ধান। অনুশাসিত বৌধিক পথে উত্তর খোঁজার সনিষ্ঠ শ্রমদান। এলেম লাগে এভাবে ভাবতে।

মন্তব্য করেছিলুম , "শূন্যবাদের ভিত্তি রয়েছে পূর্বমীমাংসাজাত মায়াবাদে।" আপনি সঙ্গতভাবেই জানাচ্ছেন মায়াবাদ হয় উত্তরমীমাংসা নয় আদিশংকরের অদ্বৈতবেদান্তের ফসল। নাগার্জুনকথিত শূন্যবাদ খ্রিস্টিয় দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকে প্রস্তাবিত হয়েছিলো। অতএব শূন্যবাদের ভিত্তি যে 'মায়াবাদ' সেটা শংকর কথিত বেদান্তভাষ্য (দশম শতক) থেকে বহু আগে। মীমাংসা, অথবা কর্ম বা পূর্বমীমাংসা, বেদের কর্মকাণ্ড পর্বের সময়ে সংকলিত হয়েছিলো। মহর্ষি জৈমিনিকে ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের মানুষ। অর্থাৎ বুদ্ধের শ' দুয়েক বছর পরে। তিনিই ছিলেন পূর্বমীমাংসার প্রধান সংকলক ও ব্যাখ্যাতা। এই সময়কালটি বিশেষভাবে বৈদিকযুগের ক্রিয়াশীল পর্ব। উত্তরমীমাংসা সংকলিত হয় বেদের জ্ঞানকাণ্ডের কালে। অর্থাৎ উপনিষদযুগে। মোটামুটিভাবে খ্রিস্টিয় সাল প্রস্তাবনার ঈষৎ আগেপরে। গৌণ উপনিষদ 'সর্বসারে' বলা হয়েছিলো যা কিছু 'আত্মণ' নয়, তাই মায়া। সর্বসার উপনিষদ সংকলিত হয়েছিলো কিছুটা কৃষ্ণ যজুর্বেদের, কিছুটা অথর্ববেদ থেকে উপাদান নিয়ে। 'মায়া' শব্দ বা ধারণাটি বৈদিকসাহিত্যে ভেলকিবাজি বা মিথ্যা প্রপঞ্চ হিসেবে বহুকাল ধরেই উল্লেখিত হয়েছে। অতএব যা কিছু 'আত্মণ' বা শাশ্বত, নিত্য, অবিনাশী নয়, তাই মায়া।

পূর্বমীমাংসায় জৈমিনি বলেছিলেন 'চ উদনা লক্ষণার্থো ধর্ম' (মীমাংসাসূত্র-১/১/২)। অর্থাৎ, ধর্ম তাই, যা বেদের প্রেরণা। অতএব যুক্তিতর্কে কালক্ষেপ না করে বেদবাণীকে অনুসরণ করতে হবে। তার মধ্যেই রয়েছে কর্মের প্রেরণা। এই কারণে দর্শনটির নাম কর্মকাণ্ড। ব্রাহ্মণে এজাতীয় প্রায় সত্তরটি 'প্রেরণা'র উল্লেখ আছে। জৈমিনির মতে এটাই বেদের মূলকথা। মীমাংসকরা ছিলেন অত্যন্ত গোঁড়া প্রকৃতির মানুষ। ধর্ম ও শাস্ত্রের ব্যাখ্যা বিষয়ে তাঁরা ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণু অবস্থান নিতেন। তাঁদের মতে বেদে উল্লেখিত এই সত্তরটির মতো 'প্রেরণা' বা বিধিনিষেধ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনও বিষয় নেই। যেমন, ব্রাহ্মণকে দক্ষিণা দিলে মানুষ তার সুফল লাভ করবে। কর্ম ও ফলকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে সেখানে। মীমাংসার ব্যাখ্যায় উচ্চমার্গের দার্শনিক তত্ত্ব বা মেধাবান মননের স্থান নেই। তাঁরা বলতেন 'শব্দ নিত্য'। অর্থাৎ বেদ অভ্রান্ত ও প্রামাণ্য। কোনও যুক্তি দিয়েই তাকে অতিক্রম করা যাবেনা। তাঁরা ছিলেন ঘোর বস্তুবাদী, যোগবিরোধী, আধ্যাত্মিকতাবিরোধী, ঈশ্বরের প্রতি সন্দেহবাদী। স্থূল ইন্দ্রিয়ে যা ধরা পড়েনা, তার কোনও অস্তিত্ব নেই। আপাতভাবে তাঁদের যুক্তিজাল ছিলো খুবই প্রখর। কিন্তু মূলে ছিলো তা নেতিবাদী চিন্তা।
মজার কথা সদ্ধর্ম এবং মীমাংসার ধারকবাহকরা উভয়েই নিরীশ্বরবাদী হয়েও ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর। শাশ্বত বা আত্মণের বিপরীতে মীমাংসকরা যে মননধারার প্রবর্তন করেছিলেন তার ভিতরে পরবর্তীকালের প্রস্তাবিত মায়াবাদের বীজ ছিলো। নাগার্জুন প্রস্তাবিত শূন্যবাদে ঐ 'মায়াবাদ'কেই পরোক্ষে আশ্রয় করা হয়। পূর্বমীমাংসাকে নস্যাৎ করার প্রবল তাড়নায় উত্তরমীমাংসায় মায়াবাদকে তর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। দীর্ঘকাল পরে আদিশংকর সামগ্রিক প্রপঞ্চটিকে অদ্বৈতবাদের সঙ্গে সমন্বিত করে বেদান্তদর্শনের নতুন প্রভাবী রূপ প্রচলিত করেন। অবশ্য তাঁর আগে কুমারিল এবং প্রভাকরও এ বিষয়ে চর্চা করেছিলেন।

আমাদের দর্শনচর্চার তিনটি বিভাগ আছে। আরম্ভবাদ, পরিণামবাদ ও বিবর্তবাদ। কণাদের বৈশেষিক বা গোতমের ন্যায় আরম্ভবাদী দর্শন। পরিণামবাদকে সৎকার্যবাদও বলা হয়। সাংখ্য ও পাতঞ্জল পরিণামবাদী দর্শন। অদ্বৈতবাদ, মায়াবাদ উভয়েই বিবর্তবাদী দর্শন। প্রমথনাথ তর্কভূষণ বলেছিলেন, " মায়াবাদ অতি প্রাচীন। উপনিষদের মধ্যেই মায়াবাদ প্রথম দেখিতে পাওয়া যায়। ...... বৌদ্ধ মহাযানে মায়াবাদের প্রচুর প্রভাব দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু, এই বৌদ্ধ মায়াবাদ একেবারে শূন্যের উপর স্থাপিত হওয়ায় , উহা ভারতের ব্রাহ্মণগণের হৃদয়রাজ্যে অধিকার লাভ করিতে পারে নাই। এই জন্যই ভারতে বৌদ্ধমায়াবাদ দৃঢ়মূল হইয়া জমিতে পারে নাই। .... এই কারণেই এই মায়াবাদ বহু প্রাচীন হইলেও , উহা শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ বলিয়া , বিদ্বন্মণ্ডলীর মধ্যে পরিচিত হইয়া আসিতেছে। "

আদিশংকরের আগে যে 'মায়াবাদ' এদেশে প্রচলিত ছিলো, তার থেকে শংকরপরবর্তী মায়াবাদ বহুলাংশেই পৃথক। বৌদ্ধমায়াবাদ বা শূন্যবাদের ভিত্তি দর্শনটি পূর্বমীমাংসারই পরোক্ষ ফলশ্রুতি।



Name:  রঞ্জন          

IP Address : 232312.180.6790012.243 (*)          Date:10 May 2019 -- 03:34 PM

ধন্যবাদ শিবাংশু-- আমার দ্বিধা দূর করে দেওয়ায়। আসলে আমি মায়াবাদ বা দুই মীমাংসাকে ঐতিহাসিক ক্রম ও প্রেক্ষিতে দেখিনি। আলাদা করে দুটো দর্শন হিসেবে দেখেছি মাত্র। আপনি সেটা ধরিয়ে দিলেন।
আমি মীমাংসা দর্শনের পরবর্তী বিকশিত রূপ-- জৈমিনি দর্শনের শবরস্বামীর ভাষ্য এবং তা নিয়ে কুমারিল ভট্টের বর্তিকাটুকুই খালি পড়েছি। আর কুমারিল ভট্টের প্রখর যুক্তি এবং মেধার পরিচয়ে মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতের অভাব ছিল।



Name:  রঞ্জন          

IP Address : 232312.180.6790012.243 (*)          Date:10 May 2019 -- 03:42 PM

আর আরম্ভবাদ, পরিণামবাদ ও বিবর্তবাদ হল আমাদের ষড় দর্শনের ল' অফ কজালিটি বা কার্যকারণ সম্পর্ক নিয়ে তিনটে আলাদা থিওরি। অর্থাৎ কারণ ও কার্য আলাদা এনটিটি কি না , কারণ কার্যে পরিবর্তিত হয় কি না , কার্য আসলে আদি কারণের ইভল্যুশন কি না --এই সব। খুবই ইন্টারেস্টিং।
এগুলো নিয়ে, এবং এর সংগে বৌদ্ধ ও জৈন কার্যকারণ সম্পর্কের স্বীকৃত তত্ত্ব নিয়ে আপনি একটা আলাদা করে লিখুন না ,--- বেশ ভাল বই হবে।


Name:   শিবাংশু           

IP Address : 5645.249.2378.222 (*)          Date:11 May 2019 -- 11:04 PM

সমস্ত দার্শনিক তত্ত্বই তো কার্যকারণ সম্পর্ক নিয়ে। তবে যেটা বলছেন সেটাও খুব সত্যি। 'কার্য' ও 'কারণ' পরস্পর জায়গা বদল করে আবহমান কাল ধরে। মার্ক্সীয় উপমানে 'প্রগতিশীলতা' ও 'প্রতিক্রিয়াশীলতা' পরিভাষাগুলি এই টানাপড়েনকে চিহ্নিত করতে চায়। আমাদের দর্শনে অর্থনীতি কীভাবে নিজের ভূমিকা পালন করেছে তাই নিয়ে অনেক শ্রদ্ধেয় পণ্ডিতের কাজ আছে। কিন্তু পাঠক হিসেবে আমি দেখেছি একটা ন্যূনতম অ্যাকাডেমিক প্রস্তুতি না থাকলে জিজ্ঞাসুদের কাছে সেসব গ্রিক বলে বোধ হবে। শাক্যমুনি বা নির্গ্রন্থপুত্র ছাড়াও আরও অসংখ্য ধরনের ডিসকোর্স উঠে এসেছে স্বীকৃত ষড়দর্শনের বাইরে। কথা হলো, যেকোনও তত্ত্বই যথাসম্ভব সহজ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্ত করা যায়। তবে সময়ের ভাষাটি ব্যবহার করা প্রয়োজন। আর একটি ব্যাপার জরুরি। আমাদের ঐতিহ্য এতো ব্যাপক যে কোনও রকম সাধারণীকরণ করাটা বিপজ্জনক হয়ে যাবে। আমাদের সভ্যতার লক্ষ বহুমুখী, সমন্বয়বাদী, সহিষ্ণু। কার্যক্ষেত্রে যদিও অসংখ্য ব্যতিক্রম তত্ত্বটিকে সমর্থন করতে চায়না। তবু তাকে য়ুরোপিয় সরলরৈখিক লজিকে ধরা সমীচীন নয়। সাহেবরাও গত দু-তিন দশক ধরে সেভাবেই ব্যাখ্যা করতে চাইছেন আমাদের সভ্যতাকে।

মনে থাকবে বিষয়টা। লেখার ব্যাপারটা ভেবে দেখবো। :-)

এই সুতোর পাতাগুলি [1]     এই পাতায় আছে1--8