ব্যাঙ্গালুরুর ফ্যাৎরা পুজো


কল্লোল দাশগুপ্ত


আপনার মতামত         


ব্যাঙ্গালুরুর ফ্যাৎরা পুজো
কল্লোল দাশগুপ্ত



সাঁঝের ঝোঁকে তিন মূর্তি হাজির। জলপথে আড্ডা চলছিলো এক শুক্কুর সন্ধ্যায় বন্ধু পম্পা-নীলাঞ্জনের ছাদে, সেখানে প্রায় চাঁদেরই সাম্পান বেয়ে হাজির, সৈকত, বরুণ আর গৌরব। তিনজন তিন আকৃতির। সৈকতকে ভীমের রোল দিলে আর কেউ ঠেক খাবে না। গৌরব বেশ গণেশ মতন, আর বরুণ ফ্রেঞ্চ কাটে কাত্তিকটি। এরা তিনজনাই বেঙ্গলী-ইন-ব্যাঙ্গালোরের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর। সাঝেঁর ঝোঁকে এহেন অতর্কিত হামলা - কওহে ইহার কারণ কী?

ধীরে ধীরে প্রকাশ, ব্যাঙ্গালোরের কোন পুজোতেই মন বসছে না। সবই বড়ো মৌরসী পাট্টাওয়ালা, রামগড়ুর টাইপ। একটা ফ্রিক-আউট পুজো চাইই।

তো চালাও পানসী বানারঘাট্টা (ইটি ব্যাঙ্গালোরের খোলা চিড়িয়াখানা)।

পচ্চুর মিটিন ইত্যাদি করে ঠিক হলো বাজেট ৩ লাখ। হ্যাঁ, তিন লাখ। ততদিনে তিন মুর্তি তিরিশ হয়েছেন। আর.টি.নগরে প্রতিমার বায়না করা হয়েছে - পঁচিশ হাজার টাকায় (পুরো মাদুগ্গা ফ্যামিলী সহ)। ঠাকুর মশাই, রাঁধুনী আর ঢাক আসবে মেদিনীপুর থেকে। বি.টি.এম লে-আউটে একটা ফাঁকা জমি পাওয়া গেছে। কোন একটা ব্যাঙ্ক অফিসারদের কোঅপারেটিভ করে কেনা জমি, তাতে একটি পাকা মঞ্চ, একটি ৫০০০ স্কোফু:এর মাঠ, একটি ক্লাব ঘর ও একটি ঝুরি নামা বটবিক্ষ আছে। ভাড়া দিনে হাজার টাকা। আমরা তো বটবিক্ষটি দেখেই হুল্লাট রকমের ফ্ল্যাট। তখনই ঠিক হয়ে গেলো গো গ্রীণ। বটবিক্ষটির একটি ডালও বাঁকানো চলবেন্না।

থিম থিম করে চেগেছিলো ক'জনা। আমি বল্লুম আরে থিম তো সে কবেই ঠিক হয়ে গেছে। ব্যাটা আহাম্মুক, থিম কি আজগের? কব্বে রামচন্দ থিম সিল মেরে দিলে - অকাল বোধন। আব্বার কী থিম চাই, অ্যাঁ!
তা সেই ঠিক হলো।

বটবিক্ষটি অশোকবন। তাতে হুল্লুমান ও সীতে ও চেড়িবৃন্দ। রামচন্দর তীর-ধনুক তাগ করে আছে নিজের চোখের দিকে। আর চারপাশে দেব-রাক্ষস-বানরদল। কিছু লীলপদ্মও থাকবে। তবে এসবই হবে মুখোশে। মুখোশগুলো ঝোঝ্যুল্যমান, কালো তারে উপর থেকে ঝুলিয়ে নীচে থেকে টানা।

লোকে ভারী খুশী, এইত্তো থিমও হলো।

এরপর আরও মিটিন, আরও মিটিন। তাতে চাঁদা তোলা, সংস্কিতি, স্টল (অনেক জায়গা আছে), ভোগ (ঢালাও খিচুরী আর লাবড়া হবে, যে আসবে সেই পাবে, নো কুপন বিক্কিরি), জল(পান ও ত্যাগ) ইত্যাদি নানা গম্ভীর বিষয় নিয়ে বিস্তর আলুচানা শেষে দায়িত্ব ভাগ ও কী করিতে হইবে তা বিশদ হলো।

হটাৎ কে যেন চুলকে দিলে, পুজোর ফিতে কাটা হবেন্না? সমস্যা হলো ফিতে কাটে কে? এটা পম্পার ঘাড়ে। ও একটা এন.জি.ও'র ব্যাঙ্গালোরের কত্তা। ওর নানান কাজে কম্মে ফিতে কাটার লোকের দরকার হয়। ফলে পম্পা ফিতে কাটার লোক জোগাড়ে বিশেষজ্ঞ। সম্ভব অসম্ভব তালিকায় বিবিএমপি'র চেয়ারম্যান থেকে, নাট্যব্যক্তিত্ব জগদীশ রাজ, পেইন্টার সুরেশ হেবলিকর থেকে গায়ক পল্লবী অরুণ নানান নামটাম ঘুরে দেখা গেলো সময় আছে, রাজিও আছে, কে? না, চারু শর্মা। ঐযে ক্রিকেট নিয়ে বলে টলে। তো তাই সই।

ওদিকে সমিস্যে, ঢাকি রাঁধুনী দিদি,জুনিয়র-ঠাকুর এদের থাকার বন্দোবস্তো হয় কোথায়। সিনিয়র ঠাকুরমশয় তার প্রতেজে বরুণের বাসায় থাকবেন বলে ঠিক হয়েছে। সমিস্যে থাকলেই পম্পা আছে। সে গিয়ে বল্লে হালদারদাকে। হালদারদার মেশিন-টুলসের কারবার। ওনার কারখানার দোতলায় একটি মস্তো হলঘর আছে। সেখানে জর্মন সায়েবরা অবধি থাকে(ওরা হালদারদার কারবারের পার্টনার)। নাটকের মহলা, সেট রাখা, পুজোর ডেকরেশনের কাজে, কলকাতা থেকে নাটকের দল এলে, হালদারদার দ্বারস্থ হই। পম্পার দৌলতে হালদারদা কল্পতরু। কাজেই থাকার জায়গার সমস্যা আর রইলোই না।

এইভাবে হু হু করে পঞ্চমী। প্যান্ডেল খাড়া হয়েচে। মুখোশ-টুখোশ সব হাজির, কিন্তু হুল্লুমান, সীতে আর রামচন্দরের মুখোশ আসে নি। জিজ্ঞাসা করতে বল্লো - ও হচ্ছে।

পচ্চুর নাল-লীল চেয়ার এসে গেচে। আমরা কজন গম্ভীর হয়ে বটবিক্ষের তলায় নাল-লীল চেয়ারে বসে অপেক্ষা কচ্চি, মা আসবেন। মন-টন ফুরফুরে। এমন সময় খপর এলেন মোবাইল বয়ে। ওদিকে ভীষণ বিষ্টি। আমাদের মায়ের কারিগরের অতো পলিথিন নেই। লে হালুয়া। ইস্পট ডিশিসন। মাকে ওখানেই থাক, কাল সক্কালে নিয়ে আসা যাবে খনে।

পরদিন সক্কালে মা এলেন। এট্টু বাঁটকুল গোছের। মানে পঁচিশ হাজারে যতটা টানা যায় আরকি। মুখ-চোখ ডাঙ্গর ডাঙ্গর। গণেশটি ভুঁড়িটুড়ি সমেত পাক্কা, তবে এট্টু পুরোনো টাইপ। কদিন আগেই গণেশ চতুর্থী গেছে। এটা নিগ্‌ঘাত খদ্দের না পাওয়া গণেশ। তা, পঁচিশ হাজারে........... হেঁ হেঁ। লক্ষী সরস্বতী ঠিকই আছে। কাত্তিকটি আমার খুব সন্দেহ ছিলো আসলে যম। মানে, এখানে যমের পুজোও হয়, বাহন কাক। আর ময়ূরপুচ্ছাধারী কাকের গপ্পো কে না জানে।

ওদিকে রামচন্দর, হুল্লুমান আর সীতের মুখোশের বদলে এলো কাট আউট। ব্যাটা শিল্পীকে বোঝানোই যাচ্ছে না কাট আউট চলবে না। সেও আমাদের বোঝাতে পারছে না। কী বোঝাতে পারছে না, সেটাই মালুম হচ্ছে না, তো বুঝবো কী। শেষ কালে আমরা হাল ছেড়ে দিলাম, আর সে - তখনই বলেছিলাম গোছের মুখ করে সে সব লাগাতে লাগলো মন্ডপের গায়ে। ঝোলাঝুলির ক্ষারবারই নেই। আমাদের আর এন্থু হলো না, তা নিয়ে কিছু বলি।

এখানে এরকমটাই হয়। সে অনেককাল আগের কথা। ১৯৯৫। আমি কাজে এসেছি হেড অপিসে। কাজের পর বন্ধুর সাথে তার বাড়ি যাবো, আড্ডা মারতে। সেদিন আবার বন্ধুর বউয়ের কী যেন উপোস। তা, সে বলেছে,

- ওগো দুটো শোনপাপড়ি এনো। তাই দিয়ে জল খাবো।

তো ফেরার পথে এক মিষ্টির দোকানে নামা হলো। বন্ধু দোকানীকে টু পিস দিয়ে শুরু করলো, তারপর দো পিস, দোঠো, দো দো, শেষে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে আঙ্গুলে ভি দেখালো। দোকানী মাথা নাড়লো। বন্ধু নিশ্চিন্তে কাউন্টারে হেলান দিয়ে সিগারেট ধরালো (তখনো রাস্তায় ঘাটে ও কম্মোটি করা যেতো)। এট্টুস পরে একটা ঢাউস বাক্স এলো এবং দোকানী হাসি মুখে হাঁকলেন হান্ড্রেড রুপি। বন্ধু প্রথমে ভেবেছিলো ও আর কারুর হবে। সে পাত্তা না দিয়ে, দোকানীকে বল্লে,

- কুইক মাড়ি।

দোকানী অমায়িক দাঁতের দোকান খুলে যা বল্লে তার অস্যার্থ,

- হুজুর আমনার মাল আমনার সামনেই।

- হোয়াট ইজ দিস?

- সোহন পাপড়ি স্যর, টু কিলো।

আমার বন্ধু হাল ছেড়ে দিয়ে একশো টাকা দিয়ে, দু কিলো শোনপাপড়ি নিয়ে ঘরে ফিরলো। বউকে ডেকে হাতে প্যাকেটটা ধরাতে, বউ বল্লে,

- এটা কী গো?

- শোনপাপড়ি

- এই অ্যাত্তো? তোমার কি মাথা খারাপ? বল্লাম দুটো আনতে। অ্যাতোগুলো এখন কে খাবে, অ্যাঁ .............

বন্ধু কেমন অসার সংসার গোছের চাউনি দিয়ে বল্লে

- আস্তে আস্তে খেও।

সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলিতেছে। কাউরে কিছু বোঝানো যায় না।

তা সে যাই হোক, আমাদের প্রাণে বড়ো ফুত্তি হলো। মা এসে গেছেন ঢাকি ঠাকুরমশাইরা সমেত, সাথে করে একটি রাঁধুনীও। ঢাকি দুজন যেমন হয়। গাঁট্টা গোঁট্টা চেহারা। এসে অবধি দনাদ্দন ডাল-ভাত-তরকারী সাঁটাচ্ছে। অভিযোগ বলতে,

- আমনাদের ইদিকে তক্কারী ক্যামোন চিমড়ে চিমড়ে।

তাতে কে একজন হুশ করে দীগ্‌ঘশ্বাস ফেলে বল্লে,

- এ দেশে অমনধারাই ভাইটি। সব তক্কারী বুড়ো হলে খায়। কচি কিচ্চুটি পাবেন্না। ঝিঙ্গে, ঢ্যাঁড়শ, ডাঁটা সব ইয়া ইয়া সাইজ আর পুরো চিমড়ে। মায় নঙ্কা অবধি ঘাস ঘাস মতোন। খেলেই মনে হয় গরু হয়ে গেচি।

ঠাকুরমশয় প্রত্যেককে কড়ার করিয়ে নিয়েছেন, পুজোর পর ব্যাঙ্গালোর ঘোরাতে হবে। প্রত্যেকে সেই নিয়ে বেশ চাপে। যে কোন ছুতোতেই একটা ব্যাঙ্গালোর ট্যুর গাইড নিয়ে আলুচানা করতে চাইছে। সক্কলেই বলে দিয়েছে

- ওরে মলগুলো ঘোরা, ব্যাঙ্গালোরে আর আছেটা কি।

ষষ্টির দিন ঢাকে কাঠি পড়লো। পুজোর জায়গায় নানান আইটি-অনাইটি লক্ষী-সরস্বতী অবতারেরা ঠাকুরমশয়ের দিকে ওৎ পেতে বসে। মুখ থেকে কথা খসছে কি না খসছে - কাম তামাম। কিন্তু সে তো হলো গে মামুলী কাজ, যেমন, থালাটা দাও, জলটা বাড়াও, প্রদীপ কোই ইত্যাদি। কিন্তু যেই এট্টু স্পেশালাইজড পুজোর কাজের ফরমাইশ হচ্ছে তখন সামান্য গন্ডোগোল।

তারও সমাধান আছে। পম্পার বাড়ি থেকে পুজোর বাসন এলো, আমার বাড়ি থেকে পুজো ক্যাপটেন। মানে, ইয়ে আমার বউ। সে পুজোর ব্যাপারে সাংঘাতিক যোগ্যতাসম্পন্ন। একে বামুনবাড়ির মেয়ে, তার ওপর কালীঘাটের। তার হবি হলোগে পালা পাব্বনে উপোস করা। তার দারুণ ট্রেনিংয়ে লক্ষী-সরস্বতীরা দিব্য কাজকম্মো কত্তে লাগলো।
দুক্কুর বেলা পাত পেড়ে খিচুরী, লাবড়া।

সন্ধ্যে হতে না হতেই বিচিত্রানুষ্ঠান। আমাদের এক বন্ধু তার মা বাবাকে নিয়ে মহালয়ার অ্যাব্রিজড ভার্সন নামিয়ে দিলে।

মূল মন্ডপের পাশেই অপিস। লোকজান বেঙ্গলী-ইন-ব্যাঙ্গালোর লেখা টিশার্ট পড়ে কাপ্তানী করছে, চাঁদা নিচ্ছে, ফোন ধরছে, অঞ্জলির খপর দিচ্ছে।

এদিকে ক্ষী ক্ষান্ডো। গোটা চারেক সছানা-সদ্যমাতরম চলে এসেছে, তাদের প্র্যাম-ট্র্যাম নিয়ে। আহা সে এক দৃশ্য। প্র্যামের মালিক প্র্যামে সুন্দর, তাদের মায়েরা আড্ডা-পুজো-অপিসঘর সামলেচ্ছে, দিব্য চমৎকার। আমাদের কি বুদ্ধি। একটা টিনের চালওয়ালা ঘেরা জায়গার বন্দোবস্তো করে ফেলেছি। তাতে পুচকুদের খাওয়ানো, ন্যাপি পাল্টানো চলছে। স্পন্সর মম অ্যান্ড মি নামে একটি চেইন স্টোর।

ওদিকে সারি সারি স্টল। কোথাও এগ, চিকেন, মাটন রোল, তো কোথাও বার্গার, হট ডগ। কোথাও কোক-পেপসী তো কোথাও চা-পান। বিরিয়ানী আর সন্দেশও আছে। দেখলেই খিদে পাচ্ছে, শুঁকলে আরও বেশী। ফলে স্টলে খাবার কমছে, আমাদের গতর বাড়ছে।

এইভাবে সপ্তমী চলে এলো।

পুজো বেশ হুডো হুডো করে শুরু হয়ে গেছে। নানান বয়সের নানান মাপের নানান সাজের লোকজন অঞ্জলি দিতে শুরু করেছে। মাচানের ওপর কৃষ্ণা, বনানী, প্রিয়া, সুজাতা ও আরও অনেকে ফুলটুল দিচ্ছে, ছোট ঠাকুরমশয় মাইকে মন্ত্র বলছেন, অন্য সক্কলে সেটা আবার আওড়াচ্ছে। মন্ত্র শেষ হলেই নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমহ বলে ফুল ছোঁড়া হচ্ছে তাগ করে। সব মিলিয়ে প্রায় কলকাতার পাড়া পাড়া ভাব। মাঝে মাঝে ঢাক বাজছে ও ফাঁকে ফাঁকে গান চলছে। যে সব শিল্পীরা কর্কট রোগে আক্রান্ত, তাঁরা একটা রবীন্দ্রনাথের গান ও আবৃত্তির সিডি করেছেন। একটি কলকাতা অংকোলিঙ্ক উদ্যোগ। আমার বউ সেগুলো বিক্কিরি করবে বলে ট্যাঁকে করে নে এসেছে। বিক্কিরির টাকা কলকাতা অংকোলিঙ্কে যাবে। খুব মন খারাপ লাগলো যখন ঐ সিডিতে সৌমিত্র চট্টোর গলা পেলাম।

দুপুরে যথারীতি খিচুরী ও লাবড়া, সক্কলে মিলে হৈ হৈ করে খাওয়া আর এর ওর পেছনে লাগা। ওদিকে নামলো বিষ্টি। ও:, কী বিষ্টি, কী বিষ্টি। আমাদের সঞ্জীব ভীষণ তৎপর মানুষ, নিশ্চই সাইড ব্যাকে খেলতো। কি নিখুঁত ট্যাকেল করলো। সবাই যখন বালি বালি করছে, ফটসে এক গাড়ি খোলামকুচি সাইজের স্টোন চিপ নামিয়ে দিলে। তাতেও কাদা হলো, তবে ম্যানেজসই।

সন্ধ্যেবেলা বানারঘাটার বানরসেনা হযবরল নামালো চমৎকার। হিজবিজবিজ আর শেয়াল একদম ফাটাফাটি। তারপর আমাদের তামিল বন্ধু কারেকোতে বাংলা আর হিন্দি গান গাইলো। ওর নাম চন্দ্রকুমার। মনোহরপুকুরের ছেলে। লেকমার্কেটের মধুলিকার সাথে দেশপ্রিয় পার্কে প্রেম ও বিয়ে। মধুও তামিল। দুটোই দিব্যি বাঙ্গালী। তাপ্পর আলপিন বলে একটা ব্যাঙ্গালোরের বাংলা ব্যান্ড ছিলো। আমাদের আবার অন্য একটা নেমত্তন্ন ছিলো বলে শোনা হলো না।

দ্যাখ না দ্যাখ অষ্টমী এসে গেলো। সকাল থেকে অঞ্জলির সে কি হুড়োহুড়ি। না খেয়ে না দেয়ে হত্যে দিয়ে আছে পাব্লিক, মায়ের চরণে ফুল দেবো গো। ওদিকে প্যান্ডেল জুড়ে চকিতে ডাক আসছে ভ্রুপল্লবে। না, না আমায় নয়। চাদ্দিকে ইয়াং প্রাণের বন্যা। তারাই ডাকাডাকি কচ্ছে। মোবাইলে মৃদু হাসি / ইয়ারফোনে ভালোবাসি। পটাপট এগ-চিকেন রোলের সাথে পেপসি উড়ছে। বটবিক্ষের তলায় চেয়ারে চেয়ারে জটলা। কেউ কেউ সাহসী হাগ দিচ্চে, ঢাকের বাদ্যির সাথে। অষ্টমী জমে পুউরো ক্ষীর।

আমাদের পলিসি ভেজ ভোগ। কারন কানেক্টিং কমিউনিটিজ। রেখেছো বাঙ্গালী করে - এ বদমান ঘোচাতে বদ্ধপরিকর বেঙ্গলী-ইন-ব্যাঙ্গালোর। ফলে অষ্টমীতেও খিচুড়ি-লাবড়া। ওদিকে ঠাকুরমশয় অষ্টমীর ভিড় দেখে এন্থু পেয়ে চন্ডী পড়ছেন। সে কী হুংকার। সাউন্ড সিস্টেমওয়ালা পজ্জন্ত ভেবলে গেলো। ঐ চেহারা থেকে এমন গজ্জন। বাপ রে। পরে ঠাকুরমশয় বানারঘাটা চিড়িয়াখানায় উটের খাঁচার সামনে ভুট্টা খেতে খেতে স্বীকার করেছিলেন - অ্যাতো লোক দেকে চাগিয়ে গেছিলো মশয়।

এসব কত্তে কত্তে সন্ধ্যে হলো। গিটার-মাউথ অর্গানের যুগলবন্দী, ছাতা ধর হে দেওরা নাচ পেরিয়ে, সারাংশ নামে আর এক বাংলা ব্যান্ড।

রাত বাড়ছে। সন্ধি পুজো রাত একটা পঞ্চান্নয়। যারা উপোস, তারা বাদে অন্যদের খাওয়া দাওয়া হলো। আর তাপ্পর নানা রকমারী আড্ডায় ভেসে গেলো অষ্টমী রাত। কোথাও বাংলা ফোকের উৎস থেকে মহীনের ঘোড়াগুলি। কোথাও ঋত্বিক আর সত্যজিতের চিরকালীন ঝগড়া। কোথাও শক্তি-সুনীল বানাম জয়। কোথাও নির্ভেজাল পেছনে লাগা। এর মধ্যে মাচানের ওপর দুগ্গোপুজোর গপ্পো।

কি না, কে যেন বলেছে দুগ্গাঠাকুরের প্রতিমার চালচিত্তিরে শিব অতো ছোট কেন। ব্যাস পুজো ক্যাপটেন গপ্পো বলে দিলো।

তো, দুগ্গা তো বাপের বাড়ি যাবেন বলে বায়না ধরেছেন। আর শিব বাবাজি কিছুতেই রাজি হচ্ছে না। বলে,
- না না, অতদিন বাপের বাড়ি থাকা চলবে না। এদিকে সংসার কে দেখবে শুনি, অ্যাঁ? নন্দী-ভৃঙ্গী কি জলে ভেসে এয়েচে? আমার ষাঁড়টাকেই বা জাবনা দেয় কে? সাপেদের দুধকলা?

দুগ্গা ভালো মুখে যতটা পারলেন বোঝালেন। তা, গ্যাঁজাখোরেরা আর কবে ভালো কথায় কান দিয়েছে। তখন দুগ্গা খচেমচে তার নব রূপ দ্যাখাতে শুরু করলেন। শিব তো পাঁচটাতেই কাৎ। আন্না আন্না করতে করতেই নটা মুত্তি খতম। শিব তখন আন্না হাজারের সামনে মনমোহন। বল্লেন,

- ঠিক আছে বাবা যাও।

তবে কিনা শিব তো, গাঁটে গাঁটে বুদ্ধি। বল্লে

- আম্মো, সঙ্গে যাবো।

শিব চলেন ডালে ডালে তো দুগ্গা পাতায় পাতায়।

- যেতে পারো, তবে একদম নুকিয়ে। কেউ যেন খ্যালই না করে। তোমায় দেখলেই পিতাশ্রীর বদন হাঁড়ি হবে। আমার গিফট-টিফটগুলো ভোগে যাবে।

সেই থেকে দুগ্গা বাপের বাড়ি আসলে শিবও সঙ্গে আসেন কিন্তু ছোট্টটি হয়ে যাতে কেউ খ্যাল না করে।

এর মধ্যে সঞ্জীবের সাথে একদল মালায়ালী ধুতি পড়া মানুষ সন্ধিপুজো দেখতে এলেন। আমরা পুলকিত, এইত্তো কানেক্টিং কম্যুউনিটিজ হচ্ছে। এটি পরে দশমীর দিন কি রূপ নিয়েছিলো তা দশমীর গপ্পেই বলবো।

সন্ধিপুজো সেরে বাড়ি গিয়ে বিছানায় পিঠ লাগাতে না লাগাতে নবমী এসে গেলো।

আবার সক্কালে উঠেই নানান ঝক্কি। কী না, আমার বউয়ের ওপর নবমীর ভোগের ভার পড়েছে। আমি একা নাস্তিক মানুষ। আমার বাড়িতে সব বাসনই মাছ-মুর্গীর মতো নিরামিশ থেকে শুয়োর গরুর মতো আমিষের ঝোলে ঝালে অম্বলে চোবানো। ফলে লত্তুন বাসন পত্তর মায় হাতা খুন্তি পজ্জন্ত কিনতে হলো। বয়স বাড়লে কতো কী হয়। আমিও কেমন সোনা হেন মুখ করে সঅঅঅব কিনে আনলাম, সুজি, ময়দা, ঘি সমেত। লুচি আর মোহনভোগ হলো। আমি বউকে বোঝাতে সক্ষম হলাম যে কোয়ালিটি চেক ছাড়া ঠাকুর তো ঠাকুর, মানুষকেই কেউ কিছু দ্যায় না। আমি তো মানুষ নই, সে তোমার চেয়ে ভালো আর কেই বা জানে। ফলে কোয়ালিটি চেকটা হয়েই যাক। কোয়ালিটি চেক হলো। মানে, ঝক্কাস রকমের উললল্‌স।

আমরা তো ভোগটোগ নিয়ে প্যান্ডেলে হাজির। নবমীর অঞ্জলি তখন প্রায় শেষ। বড় ও ছোট ঠাকুর মশয়েরা দম নিচ্ছেন চায়ে চুমুক দিয়ে, এমন সময় ছোট ঠাকুর মশয়ের চোখে পড়লো, এক প্রৌঢ় ও সম্ভবত: তাঁর নাতি কেমন জুলু জুলু চোখে ওদের দিকে চেয়ে আছেন। ছোটা ঠাকুর মশয় ডাকলেন,

- কী ব্যাপার, অঞ্জলি দিবেন?

- হ্যাঁ, মানে আর তো কেউ নেই, তাই.......

- আরে:, তাতে কী। আসেন আসেন।

শুধু দাদু নাতির অঞ্জলি হলো। আমরা ভিড় করে দেখলাম। ভদ্রলোক কী খুশী, কী খুশী। নাতিকে অঞ্জলি দেওয়াতে পেরেছেন বলে।

নবমীতে সকলেরই এক কথা, যাক পুজো ঠিকঠাক নেমে গেলো। এটাই আমাদের প্রথমবার। তাই সকলের চিন্তা ছিলো, কি হবে কি হবে ভাব। প্রচুর মানুষ এসেছেন, এটাই আমাদের বিরাট পাওয়া। সেদিন সন্ধ্যায় আমাদের ম্যাডক্স স্কোয়ার রিক্রিয়েটেড। অর্থাৎ সারা প্যান্ডেল জুড়ে ছোট ছোট ভাগে গান আর আড্ডা, যে যার মতো। আমরা ঝানুরা, আমি সৌমিক ও আরও অনেকে শুরু করে দিলাম। তাপ্পর দিব্যি এদিক ওদিক থেকে অনেকে চলে এলেন, যারা নেহাৎ ঠাকুর দেখতে এসেছিলেন, ও জমে গেলেন। প্রায় রাত দুটো অবধি চলেছিলো আমাদের ম্যাডক্স স্কোয়ার। তবে নামটা আমার পছন্দ নয়। ওটা মোটেও ম্যাডক্স স্কোয়ারে হয় না। এটা বরং বইমেলার মাঠ রিক্রেয়েটেড।

পরদিন দশমী। সক্কালে দশমীর পুজো, অঞ্জলি, ঠাকুর বরণ, সিঁদুর খেলা সেরে প্রতিবিম্ব বিসর্জন। তারপর - আসছে বচ্ছর - আব্বার হব্বে.............

এই প্রতিবিম্ব বিসর্জনটা জানতাম না। কোনকালে পুজো টুজোয় থাকতুম না। সেই ছোট্টবেলায় বুকে ব্যাজ লাগিয়ে ভলেন্টারী থেকে এক্কেবারে যাকে বলে উপদেষ্টা। ওদিকে তো মুখ্যুর যাশু। বৌকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেলো, যে দর্পণ, কাজল ও বেলপাতা দিয়ে প্রতিমার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়, সেগুলো প্রতিমার সাথে বেঁধে রাখা হয়। দশমীর দিন সব সেরে ঘট নড়িয়ে, দর্পণ, কাজল ও বেলপাতা বাঁধন ছিঁড়ে একটা বড় গামলা জলে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ঐ জলের গামলা আর তাতে দর্পণ এমনভাবে রাখা হয়, যাতে জলে ডোবা দর্পণ দিয়ে প্রতিমার মুখ দেখা যায়। ওটাই নাকি আসল বিসর্জন। এর পর প্রতিমার বিসর্জন নেহাৎই আচার মাত্র। এরকম একটা ভার্চুয়াল বিসর্জনের এতো নান্দনিক ভাবনা যাঁর বা যাঁদের মাথায় এসেছিলো, তাঁদের কোটি কোটি প্রণাম।

হঠাৎ দেখি বেশ কিছু মানুষ, পরনে মালায়লী ধুতি, উর্দ্ধাঙ্গ অনাবৃত, সাথে তিনটি মালায়ালী ঢোল, একটি তাসা জাতীয় তাল বাদ্য, পাঁচটি শিবের ডমরুর জাম্বো সংস্করণ, তিনটি শিঙ্গা ও পাঁচটি ঝাজ (মেগা কত্তাল) নিয়ে প্যান্ডেলে হাজির। সঞ্জীব বল্লে, এঁরা আমাদের সন্ধিপুজো দেখতে এসে খুব আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েন। ওঁরা প্রস্তাব দেন দশমীর সকালে আমরা অনুমতি দিলে এখানে পারফর্ম করবেন।

তো শুরু হলো ওঁদের বাদ্যি। ওঁদের বাজনা আমাদের স্রেফ ভাসিয়ে নিয়ে গেছিলো দুঘন্টার জন্য। তালবাদ্যর এমন অনিন্দ্য সুন্দর অনুষ্ঠান, আমি শুনিনি। শংকর ঘোষ মশয়ের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি। আমি আর কি করি, শিবাংশু আর ন্যাড়া কে ফোন করলাম। ওদের শোনাতে চাইছিলাম, মোবাইলে আর কতটুকু ধরা যায়। আর এতো শুধু শোনার নয় দেখারও। বাজনার সাথে সাথে বাদকদের শরীর নানা বিভঙ্গে দুলছিলো। চোখে চোখে তালের নানান ভগ্নাংশ নিয়ে খেলার মজা। আর সেই সব জটিল খেলার শেষে সমে এসে পড়ার তৃপ্তি। সতেরোজন মানুষ নাকি বিমুর্ত সঙ্গীতের মুর্ত রূপ সারা মন্ডপ জুড়ে নাচছিলো, খেলছিলো। আমরা স্তব্ধবাক, মায়াতাড়িতের মতন শরীরের সমস্ত রোমকূপ দিয়ে তা আস্বাদন করছিলাম।

আমি কাঁদছিলাম। আমার এই এতোটা জীবনের শ্রেষ্ঠ দশমী।

এরপর তো পুউউরো কলকাতা ভাসান রিক্রিয়েটেড। সেই লরি, সেই ঢাক, সেই উদ্দাম ভাসান নাচ; আর, দুগ্গা ঠাকুর মাঈকি... আসছে বছর...। ব্যাঙ্গালোরের পাব্লিক সিঁদুর মাথা মুখেদের ভাসান নাচ দেখে পুলকিত। তারা দিব্যি উৎসাহও দিচ্ছিলো। সিটি পড়ছিলো দু তরফ থেকেই।

হুলিমাভু লেকে পৌঁছানো গেলো দিনের আলো থাকতে থাকতে। ছেলেরা ঠাকুর নামাতে আর মেয়েরা ঢাকের সাথে নাচতে ব্যাস্ত। তার মধ্যে পেতলের ঘটটি নিয়ে এক লোকাল বিচ্ছু কেটে পড়লো। আমাদের সঞ্জীব (সেই যে বৃষ্টি পড়তেই সপ্তমীতে স্টোনচিপ নিয়ে এলো) তার ড্রাইভারকে বলতেই সে খুঁজে পেতে ঠিক উদ্ধার করলো। মা দুগ্গা এ বছরের মতো হুলিমাভু লেকে ভাসান গেলেন। প্যান্ডেলে ফিরে আসা হলো যে যার বাড়ি ঘুরে ফ্রেশ হয়ে। রাতে পাঁঠার মাংস-ভাত। ফুল মস্তি।

এই আমাদের ব্যাঙ্গালোরের ফ্যাৎরা পুজো।


ছবি: সুমেরু মুখোপাধ্যায়