পুজোর চিঠি


শঙ্খশুভ্র ঘোষ


আপনার মতামত         


পুজোর চিঠি
শঙ্খশুভ্র ঘোষ


আর ঠিক দুমাস বাদে পুজো।

অমল ধবল পালে খুব একটা হাওয়া এখনো লাগে নি, বরং আগের হপ্তাটা যা গরম গেল, "ভিক্ষে চাইনে মা, কুকুর সামলা' অবস্থায় নিয়ে এসেছে আপামর ইউ এসের পূর্ব উপকূলবাসীদের। সাউথ জার্সি, ফিলাডেলফিয়া ইত্যাদি নাকি সেই '৫৭ সালে এইরকম গরম পেয়েছিলো, আমাদের এদিকটা ঠিক ততটা না হলেও "ছোটে মিয়াঁ শুভানাল্লা', চল্লিশের ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে ঘোরাঘুরি করেছে। (দেখেছো? ডিগ্রী সেলসিয়াস বেরিয়ে এলো, ফারেনহাইটে ব্যাটারা কী সব এইট্টি নাইন্টি হাঁকে, শুনেই গরম লাগে, ওসব সাহেবসুবোদের জন্যে, তারচেয়ে দ্যাশের টান, ঐ সেন্টিগ্রেডই ভালো)

এমতাবস্থায় হঠাৎ করেই একটা মেল পেলাম, আটলান্টায় আমাদের পূজারির এবারের সিলভার জুবিলি মানে ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বেশ বড়সড় করে পুজো প্লাস অনুষ্ঠান হবে, তার আমন্ত্রণ পত্র।

পূজারি কী? পূজারি হল আটলান্টার একটি নন-প্রফিট অর্গ, মনে প্রাণে বাঙালী, দুর্গা পুজো ছাড়াও লক্ষ্মীপুজো, দীপাবলি, নিউ ইয়ার পার্টি, সরস্বতী পুজো, দোল, সামার পিকনিক, বৈশাখী ইত্যাদি সারাবছর ধরে বেশ অনেকগুলো অ্যাকটিভিটি অর্গানাইজ করে।

আমাদের বললুম কেন? কারণ আটলান্টায় থাকার সময় আমি ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছলুম পূজারির সঙ্গে, প্রবাসে পুজোর যে আনকোরা স্বাদ পেয়েছিলুম, সেই সব মনে করে, সশরীরে পূজারির পুজোয় থাকতে না পারলেও মনটা ওইখানেই যেন পড়ে থাকে।



সব জায়গার পুজোর একেকটা নিজস্ব ফ্লেভার থাকে। পাড়ার পুজো মানে "চক্ষুদুটি ছানাবড়া মুখখানা তার হাঁড়ি' টাইপ চাঁদার বিল, মাস্‌সিমা/মেস্‌সোমসাই, লাবড়া দিয়ে খিচুড়ি ভোগ পাশে বাঙালীদের অধুনা বিলুপ্তপ্রায় সিঁথির সিঁদুরের মত একচিলতে টমেটোর চাটনির লাল টিকা, ন্যাওটা ছোঁচা বেড়ালের মত যখন তখন ঢোকার স্পেশাল পাস, ন্যাফথ্যালিনের গন্ধ মারতে প্রায় আধবোতল "এক্স' ডিও ঢালা পাঞ্জাবী গলিয়ে অষ্টমীর অঞ্জলি - ওরে দৌড় মার দৌড়, এটাই লাস্ট অঞ্জলি বলছে (যদিও বক্তা-শ্রোতা উভয়েই জানে আরো কমসেকম গোটা চারেক রাউন্ড হবে)।

তা বাদ দিলে থাকে বেপাড়ার পুজো (এবং অতি অবশ্যই কেয়ারফুলি কেয়ারলেস সানন্দার পাতা থেকে উঠে আসা খুকিরা), যেগুলো সদলবলে দুপুর নাগাত বেরিয়ে পড়ে দেখতে হবে, তারই ফাঁকে টুক করে পার্কস্ট্রিটে পিটারক্যাটে চেলো কাবাব বা সিজলার মেরে আসা, (ব্যাটারা আবার স্ট্যাগ দেখলে গরজ দেখায়, মরণ), বিকেলের ঝোঁকে কোঁৎ করে পেপসির বোতলে রাখা রামে একবার চুমুক না মারলে কা তব কান্তা, কস্তে গার্লফ্রেন্ড, সপ্তমীসায়াহ্ন অতীব বিচিত্র, তারপর সন্ধ্যেবেলা যে করেই হোক ম্যাডক্সে একবার ঢুঁ মারতেই হবে, ওখানে নাকি বচপন কা বিছড়া হুয়া জুড়ুয়া ভাইএর সঙ্গেও ফিরসে মুলাকাত হয়ে যায়, পুরনো স্কুল কলেজের বন্ধু/শত্রু/মুখ-দেখাদেখি-নেই/বন্ধু-কী-খবর-বল ইত্যাদি তো তুশ্চু। প্লাস এই সেদিন অবধি যৈবনহীন কলকাতায় যৎকিঞ্চিৎ "হটি' দেখতে পাওয়া যেত, তার সিংহভাগই নাকি ঐ একটি প্যান্ডেলে। পোস্ট "নলবন' (এই শব্দটা বোল্ড, ১৪ পয়েন্ট, করপুলেন্ট ফন্টে) জেনারেশনের প্রলেতারিয়েতরা অবশ্যই এই গতে পড়বে না, তাদের হারানোর জন্য আছে ফেসবুকের প্রোফাইল, জয় করার জন্য আছে সিটিজেন পার্কের নিভৃত খোপচা। দুনিয়ার "ফোসলা' এক হও।

এই হল আবাসী পুজোর মোটামুটি চেনা ছক। অনাবাসী পুজোরও নিজস্ব কিছু ছক আছে।

আমেরিকাতে যতটুকু দেখেছি, দুরকমের পুজো হয়। ভারত সেবাশ্রম বা মন্দির-টন্দির হলে পাঁজিপুঁথি মেনেই পুজো হয়। আর নন-প্রফিট বা ক্লাব টাইপ কিছু হলে উইকেন্ডের পুজো। শনিবার সকালে শুরু, রোববার শেষ, দুপুরে প্রসাদের লাইনে "গুড় গুড় গুড় গুড়িয়ে হামা খাপ পেতেছেন গোষ্ঠমামা', বিকেলে নিজের বা পাশের চেয়ারে বসা দম্পতির বাচ্চার "হাত ঘোরালে নাড়ু দেবো' নৃত্যপরিবেশনে হাততালি, রাত্তিরে অতিথিশিল্পীর প্রোগ্রাম দেখে মেলেচ্ছদেশে কালচারাল পরিতৃপ্তির ঢেঁকুর।

পূজারির পুজোয় যোগদান করার গল্পটা শোনাই বরং।

জার্সিতে এসেছি। কল্লোল বা বি এস এস বা আরেকটু লম্বা দুইপা ফেলিয়া স্প্রিংফিল্ডের পুজো দেখতে যাবো এই সব প্ল্যান রেডি, দুম করে সেপ্টেম্বরের গোড়ায় আটলান্টায় বদলি হলুম। ভালো করে খেয়াল করার আগেই দেখি পুজো দরজায় কলিংবেল বাজাচ্ছে।

কিংকর্তব্য? একবার ভাবলুম জার্সিতে চলে এসে পুরোনো প্ল্যানটাই এক্সিকিউট করি। তারপর পেনসিলভ্যানিয়াবাসী এক বন্ধু তার ওখানে পুজো দেখার সাদর আমন্ত্রণ জানালো।

লাস্ট মোমেন্টে কায়াকে টিকিট কাটতে গিয়ে দেখি, হায়! অভাগা যেদিকে চায়, শচীন আউট হয়ে যায়। মাঝরাত্তিরের ফ্লাইটগুলোতেও টিকিটের যা দাম, অন্য সময় ডিল পেলে তাতে আর কিছু দিলে বিজনেস ক্লাসে যাওয়া যায়।

অগত্যা আটলান্টাই ভরসা। এত নাকি বাঙালী থাকে এখানে, পাঁচটা পুজো হয়, একটা কিছু ব্যবস্থা নিশ্চয়ই হবে। বাঙালীকে বাঙালী না দেখিলে কে ... ইত্যাদি।

গুগল করে দেখলুম প্রথম নামটা পাচ্ছি 'বাগা'। বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অব গ্রেটার আটলান্টা। এদিক সেদিক হাটকে দেখলুম, এটাই আটলান্টার সবচেয়ে বড় পুজো। এদিকে আমি যেখানটায় থাকতুম, তার ধারে পাশে চেনাজানা বাঙালী কেউ নেই। অর্কুটে আটলান্টার বাঙালী কমিউনিটিতে আবেদন করলুম, ধারে কাছে কেউ যদি থাকে, দুটো রেসপন্স এলো, একজন বলেছে, ঐ বাংলিশে লেখা বক্তব্য সে বোঝে নি, কেননা সে আদতে ওড়িয়া (দাশঅ)। আরেকজন জানালো সে পুজোতে দেশে যাচ্ছে, ফিরে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।

পরে একটি বাঙালী ছেলের সঙ্গেও আলাপ হল, সে ওখানে পড়ছে, দেখা গেল, সেও বাগাতেই যায়, ভলান্টিয়ার, তবে কী ভাবে যাবে, কখন যাবে কিছুই ঠিক নেই, রানটাইম ডিসিশন নেবে।

আমি একদিন আর থাকতে না পেরে বাগার ওয়েবসাইট দেখে বোর্ড অব ডিরেক্টরস খুঁজে এক দু জনকে ফোন লাগালুম, আমার প্রবলেমটা হল আমার গাড়ি নেই, কোনভাবে যদি কেউ আমাকে পিক আপ করে নিতে পারে।

দেখা গেল বাগা এশিয়ান দেশগুলির মতো জনসংখ্যার চাপে জর্জরিত, তারা আর এলিতেলির ইমিগ্রেশন নিয়ে ভাবিত না, অনেক কেঁদেককিয়ে এইটুকু বেরোল, আমি যাহোক করে ডিকাটুর বা অ্যাভনডেল কোন একটা স্টেশনে এসে ওয়েট করতে পারলে, "যদি' "কেউ' "কোনকারণে' ঐদিক দিয়ে যায়, "তাহলে' "হয়ত' পিক আপ করে নেবে।

অনেকগুলো "ইফ যদি ইজ হয় / বাট কিন্তু নট নয়' দেখে কানের কাছে সেই যাত্রাপালার বিবেকের ক্যারেক্টারের মত কেউ প্রম্পট করলো, "ওপথে বাড়াসনে তুই পা-হা'। চলে হয়ত যেতে পারবো, রাত্তিরে ফিরবো কী করে? গ্যাংস্টারের দয়া শংকর নই যে অপারেশনে গেলে ফেরার পথ নিয়ে চিন্তা থাকে না।

মনটা দমে গেল। শুক্রবারের সকাল। রাত পোহালেই পুজো।

গুগলের লিস্টিতে পরের নামটাই পূজারি। কপাল ঠুকে ফোন করলুম। বিওডি তে একটা নাম দেখলুম সমরেশ মুখোপাধ্যায়। কী মনে হল ওঁকেই ফোন করলুম।

ম্যাজিক!!!

সমরেশদা প্রচন্ড ভাবে এনকারেজ করলেন পুজোতে আসবার জন্যে, আর কথা দিলেন, দুপুরের মধ্যে আমার কাছাকাছি পূজারির কোন মেম্বার আছে কিনা দেখবেন, যে কিনা আমাকে একেবারে বাড়ি থেকেই পিক আপ করে নেবে। হলও ঠিক তাই। দুপুরবেলা, ডানউডির পেরিমিটার মলে মেসিজ এ জামাকাপড় কিনছি মনের আনন্দে, ঐ আমার পুজোর কেনাকাটা, সৌম্যদার ফোন এলো যিনি খুব কাছে না হলেও আশেপাশেই থাকেন, সমরেশদার সঙ্গে কথা হয়েছে, আমার সঙ্গে কথা বলে প্ল্যানটা পাকা করে নিতে চান।

প্ল্যান হল, এটা ওটা কথা হচ্ছে, হঠাৎ কী একটা কথা প্রসঙ্গে জানলুম, ঐ পুজো যেখানে হচ্ছে, বিকেলবেলা সৌম্যদার (প্রসঙ্গত: বলে রাখি, ইউ এসে পুজো গুলো সাধারণত: স্কুল ভাড়া করে হয়) সেই স্কুলে যাবার প্ল্যান। মণ্ডপ সাজানো, রিহার্শাল, ঠাকুর বসানো এই সব অনেক অনেক কাজ আছে।

আমি হুজুগে পাবলিক। পুজোর হুজুগ ছাড়া যায়? পট করে বললুম, আমি যদি কোন কাজে লাগতে পারি, এসব ব্যাপারে আমার বেজায় উৎসাহ। সৌম্যদা প্রস্তাবটা লুফে নিলেন।

ব্যস। সেই বিকেলে সেই যে গেলুম, আমার পুজো শুরু হয়ে গেল। একেবারে ফ্রম দ্য স্ক্র্যাচ অনাবাসী পুজোর লাইফ সাইকেল দেখলুম, এবং, কী আনন্দ, আমিও তাতে পুরোমাত্রায় সামিল। অ্যাকটিভলি।

ঠাকুর আনা, মঞ্চ বানানো, সেট করা, সাজানো, কালচারাল প্রোগ্রামের জন্য অডিটোরিয়াম অ্যারেঞ্জমেন্ট ইত্যাদি স-ব স-ব রকম কাজ। দেখলুম। শিখলুম। করলুম। তার পাশাপাশি এন্তার ছবি তুলছি, ভিডিও করছি। পূজারির প্রচুর মেম্বার। অনেকের সঙ্গে আলাপ হল। খুব আন্তরিক ব্যবহার দেখলাম অনেকের।

তার পরের দিনও সকাল থেকে কাজ। দুপুরের মধ্যে বহু লোক আমাকে চিনে গেলেন, আমিও অনেককে চিনে গেলাম। তখনো আমার নিজের পুজোর চাঁদা দেওয়া বাকি, আমি ক্যাশ আনতে ভুলে গেছি, কার্ডে পেমেন্ট করা মুস্কিল, সেই আমিই বসে গেছি কালেকশন সেকশনে :)।

আবার যখন জার্সিতে ফিরে এলুম, এখানেও কোন একটা পুজোয় গুঁতিয়ে গাঁতিয়ে অ্যাকটিভলি ঢোকার চেষ্টা করেছিলুম, দেখলুম ঐ সকালে গিয়ে চেয়ার সাজানো আর দুপুরে খাবারের লাইনে পরিবেশনের দায়িত্বে থাকা ছাড়া আর কোন কিছু কাজ কেউ ভাবতে পারছে না। ধুর ধুর!

এখানে সেই সাদা কাশফুল দেখতে পাইনা, কেমন যেন পাঁশুটে রঙা হয়, শিউলির তো নামোনিশান নেই, যদি কারোর বাগানে থাকে, দেবে কেউ আমাকে একমুঠো?

তবু ভাবতে ভালো লাগে, পুজো আসছে, নাহয় মাসখানেক বাদেই। আবার মহালয়া শুনবো, স্থানীয় কোন পুজোয় যাবো, ঐ নমো নমো করে, শর্টকাটের মা মাসি এক করে কিছু একটা পুজো হবে, ঠাকুরমশাই দুর্গাপুজোর মাঝে কেন জানি (দুর্গা তো কোন ছার, হিমালয়, মানে দুর্গার বাপও বলতে পারবে না) "ওম জয় জগদীশ হরে' গাইতে শুরু করে দেবেন, অতিথি হেমন্ত কন্ঠী শিল্পী গান গাইবার বদলে শোনাতে থাকবেন, আর আধঘন্টা বাদে তাঁকে অমুক পুজোতে গান গাইতে যেতে হবে, আর জানেন তো, তিনি এবারে পৌনে ছয় জায়গা থেকে গান গাইবার ডাক পেয়েছেন। লোকাল প্রোগ্রামের সময় অ্যানাউন্সার এসে অমুক বউদিকে গান গাইবার অনুরোধ জানাবেন, অমনি হ্যাঁচোড় পাঁচোড় করে বউদি এসে খাতা দেখে "হাঁই মারো মারো টান হাঁইয়ো, হাঁইয়ো, হাঁইয়ো' শুনিয়ে যাবেন, পাড়ার ক্রিকেটে "এইটা লাস্টবল' টাইপ কায়দায় ইচ্ছে করে ওভার বাড়ানোর মত পাঁচমিনিটের গান দশমিনিটে টেনে নিয়ে গিয়ে, গুটিকতক বেঞ্জামিন ডোনেট করেছেন কি সুপ্ত-লুপ্ত-গুপ্ত প্রতিভাকে অ্যান্টাসিড মেরে চাপা দিতে?

তবু সে আসছে; আসুক।

অনেক রাতও হল। আলোটা নিভিয়ে দিয়ে বরং লো ভল্যুমে ইন্দ্রানী সেনের গাওয়া গানটা মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকি, কেন জানি না, এই গানটা শুনলেই আমার মনে হয় পুজো এসে গেছে:

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে....
ছবি: মৃগাঙ্কশেখর গাঙ্গুলি